ইউসুফ ইদ্রিসের গল্প : অভাবগ্রস্ত



ইংরেজি হতে বাঙলায় ভাষান্তর: মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ

বদু অভাবগ্রস্ত মানুষ। শুধু এখন নয়। তার এই হীনাবস্থা দীর্ঘদিনের। জীবনভর সে চেষ্টা করেছে এই অবস্থা কাটিয়ে উঠতে, কিন্তু পারেনি।

জীবনটা সে শুরু করেছিল বাবুর্চি হিসেবে। হ্যাগ ফায়েদ নামের একজন সিরিয়ান বাবুর্চির কাছ থেকে সে বিদ্যাটি শিখেছিল। কাজটির ওপরে সে এতোটাই দক্ষতা অর্জন করেছিল যে, তার শিক্ষক তার তৈরি করা যথাযথভাবে মসল্লা দেওয়া সস দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু কোনোকিছুই চিরস্থায়ী হয় না। কাজেই বাবুর্চির চাকুরি থেকে সে হোটেলের পাশের একটি ওয়ার্কশপে কর্মচারী হিসেবে নিয়োজিত হয়েছিল। সেখানে তাকে চাকুরি হতে তাকে বরখাস্ত করা হয়েছিল। তারপর সে এক ব্লক দূরের একটি দশ-তালা বিল্ডিঙের দারোয়ান হিসেবে চাকুরি পেয়েছিল। কিন্তু কোনোকারণে তাকে এখান হতেও বরখাস্ত করা হয়েছিল। এরপর সে তার বিশাল শারিরীক কাঠামো ও শক্তিশালী মাংসপেশির অধিকারী হবার কারণে ট্রাকের কুলির চাকুরি পেয়েছিল। কিন্ত শেষ পর্যন্ত হারনিয়ার রোগী হয়ে যাবার কারণে এখানেও চালিয়ে যেতে পারেনি। পেশীবহুল শরীরের পাশাপাশি তার একটি ভালো কন্ঠস্বর ছিল। সেটি খুব আনন্দদায়ক না হলেও পুরো রাস্তার মানুষদেরকে নিজের চারপাশে জড়ো করতে পারত, যখন সে শষা, তরমুজ ও আঙ্গুর বিক্রি করত।

একসময়ে সে দালাল হিসেবে দিনরাত অলিতে গলিতে ঘুরে বেড়াত, একটা খালি রুমের খোঁজে। খুঁজে পাবার পর সেটিকে সে ছলচাতুরী করে ১০ পিয়েস্টারের বিনিময়ে আগ্রহী গ্রাহকদের কাছে ভাড়া দিত। তবে মেস ওয়েটার হিসেবে তার কোনো তুলনা ছিল না। তার সবচেয়ে ভালো সময়ে সে অন্য কারো সহযোগিতা ছাড়াই একাকী পুরো একটি ক্যাফের গ্রাহকদেরকে সার্ভিস দিতে সক্ষম ছিল। কখনোই কোনো অর্ডার সম্পন্ন করতে তার দেরি হতো না বা কোনো গ্লাস ভাঙ্গত না।

তার স্ত্রীর সাথে সে একটা বড় বাড়ির একটি ঘরে বাস করত। তার চারপাশে ছিল অনেক প্রতিবেশী। মোটের ওপরে তার প্রতিবেশীরা ভদ্র ধরণের মানুষ ছিল, যদিও কিছুদিন পরপর তার স্ত্রীর সাথে তাদের স্ত্রীদের ঝগড়া লেগে যেত। তবে প্রতিবেশীরা তার প্রতি সহানুভূতিশীল ছিল এবং তাকে টাকা ধার দিত, যখন তার কোনো কাজ থাকত না। প্রতিদিনের খাবার যোগাড় করতে তার কষ্ট হলেও জীবনকে এভাবেই সে মেনে নিয়েছিল।

সুতরাং আবদু অভাবগ্রস্তই ছিল। তবে তার এবারের অভাবটা ছিল দীর্ঘস্থায়ী। তার কাছে মনে হচ্ছিল যে, এই অভাব অন্তহীন সময়ের জন্যে। তার পায়ের তলা ক্ষয়ে গিয়েছিল পরিচিতজন ও পুরোনো বন্ধুদের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে। প্রতিবারেই সে খালিহাতে ঘরে ফিরে আসত এবং রাগান্বিতভাবে ঘরের দরজায় করাঘাত করত। তার স্ত্রী দরজা খোলার পর তার সাথে কোনো কথা না বলেই সে বিছানায় গিয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করত। স্ত্রী নাফিসা’র অবিরত বকবকানি স্বত্বেও। কিন্তু নাফিসা তাকে কথা শুনতে বাধ্য করত সারাদিনের ঘটনাবলির ফিরিস্তি দিতে দিতে। সে বলত বাড়ির মালিক তাকে কীভাবে ভয় দেখিয়ে গেছে, প্রতিবেশীরা তাকে দয়া করে কয় টুকরা রুটি দিয়ে গেছে, পরবর্তী ভোজ অনুষ্ঠান কবে হবে, জামফলকে সে কতটুকু পছন্দ করে, তাদের যে ছোট্ট মেয়েটি মরে গেছে এবং জামফলের জন্মদাগ নিয়ে তাদের যে সন্তান জন্মাগ্রহন করবে, যেহেতু সে জাম পছন্দ করে ইত্যাদি সম্পর্কে।এর পরেও সে কথা বলতে থাকত এবং এমনই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ত যে তার কন্ঠস্বর অসহ্য রকমের তীক্ষ্ণ হয়ে যেত, যতক্ষণ পর্যন্ত না তা আবদু’র সহ্যের সীমারেখা ছাড়িয়ে যায়।

এই সময়ে সে প্রতিবেশীদের চোখে তার জন্যে সহানুভূতি বা তাদের কন্ঠে শুভাকাঙ্ক্ষা কোনোকিছুই সহ্য করতে পারত না, কারণ তাদের এই শুভেচ্ছার দৃষ্টি বা কথা তার খালি পেটের জন্যে অথবা নাফিসার প্রায় উলঙ্গ দেহের জন্যে ভালো কিছুই বয়ে আনতে পারত না।

একদিন বাড়িতে ফিরে আসার পর নাফিসা তাকে বলল যে, তলবা তাকে ডেকে পাঠিয়েছে। এটি তার ভেতরে একটু আশার সঞ্চার করল, যদিও সে জানত না তাকে কেন ডাকা হয়েছে। সে সাথে সাথে উঠে তলবা’র ঘরে গেল। তলবা বাড়ির সবচেয়ে ভালো ভাড়াটিয়া ছিল, কারণ সে একটা হাসপাতালে পুরুষ নার্স হিসেবে কাজ করত। এছাড়াও সে এই বাড়িতে ভাড়াটিয়া হিসেবে সবচেয়ে পরে এসেছিল।

তলবা তাকে খুব আন্তরিকভাবে স্বাগত জানাল। বিষয়টি আবদু’কে কিছুটা হলেও অবাক করল। তারা যখন পরস্পরের সাথে পরিচিত হচ্ছিল, তখনই আবদু তাকে তার নিজের সম্পর্কে বলছিল। সে তার অতীতের ভালো দিনগুলোতে বাস করত এবং এক সময়ে যে সে খুব ভালো ভালো চাকুরি করেছে সেগুলো সম্পর্কে বলতে ভালোবাসত। যাই হোক, সে অনুভব করত যে তার বর্তমান দরিদ্র পোশাকের কারণে তার গৌরবের দিনগুলো ঢেকে আছে। গর্বে তার বুক ফুলে যেত যে দিনগুলোতে সে গুরুত্বপূর্ণ পদে চাকুরি করত সেগুলো সম্পর্কে বলার সময়ে। কিন্তু যখন সে তার বর্তমান দুরাবস্থার কথা মনে করত, তখন সে আবার বেদনার্ত হয়ে উঠত। মানুষের খারাপ আচরণ তাকে কষ্ট দিত এবং অতীতের প্রাচুর্যপূর্ণ জীবনের রোমন্থন তাকে ভারাক্রান্ত করত। তখন তার কন্ঠস্বর বুজে আসত এবং সেগুলোকে মনে হতো শুধুই ফিসফিস শব্দ, যা উঠে আসত তার অধঃপতনের সীমাহীন গহ্বর হতে। শেষে সে তলবাকে অনুরোধ করল তার জন্যে একটা চাকুরি জোগাড় করে দিতে।

তলবা তাকে শুনল, এবং শেষে তাকে জানাল যে তার জন্যে একটা চাকুরি অপেক্ষা করছে।

সেই রাতে আবদু খুব আনন্দিত হয়ে তার বাসায় ফিরল। শেষে সে নাফিসাকে তলবা’র দয়ালু হৃদয় সম্পর্কে জানাল। তাকে বলল পরদিন নিজের বাসন মাজার কাজ শেষ করার পর তলবা’র বাসায় গিয়ে তার স্ত্রীর সঙ্গ দিতে।

পরেরদিন ভোরে সূর্যোদয়ের সময়ে আবদু ও তলবা হাসপাতালের ব্লাড ট্রান্সফিউশন ডিপার্টমেন্টের সামনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল। অন্য আরো অনেকেই সেখানে এসে অপেক্ষা করতে লাগল। সকাল দশটায় দরজা খুলল এবং সবাই ভেতরে ঢুকল। ভেতরের নীরবতা তাকে খুশি করল। বাতাসের সাথে কার্বলিক এসিড মিলে তার মধ্যে সামান্য বমির ভাব সৃষ্টি করল। তাদের সবাইকে লাইনে দাঁড় করানোর পর জেরা শুরু হলো। তারা তার পিতার ও মাতার নাম, এমনকি তার চাচা/মামার নাম জানতে চাচ্ছিল, এবং তার ছবিও চাইল। সে শুধুমাত্র তার পরিচয় পত্রের ছবিটা তাদেরকে দেখাতে সমর্থ হলো, যেটা সে সবসময়ে বহন করত দুর্ঘটনা ও পুলিশের সাথে সমস্যা হলে ব্যবহার করার জন্যে।

তারা তার শিরার ভেতরে ইনজেকশন ঢুকিয়ে একটা পুরো বোতল রক্ত নিলো এবং তাকে পরের সপ্তাহে আসতে বলল।

সেই সপ্তাহেও সে খুবই অভাবগ্রস্ত ছিল এবং চাকুরি খোঁজ করছিল। কারণ, প্রতিবেশীদের দেওয়া রুটির টুকরার কিছুই অবশিষ্ট ছিল না। নির্ধারিত দিনে সে আবার সে হাসপাতালে গেল। সকাল দশটার সময়ে সেটির দরজা খুলল। “তুমি না,” তার সামনে দাঁড়ানো লোকটিকে তারা বলল। লোকটি নড়ল না। “তোমার রক্ত ভালো না,” তারা তাকে বলল এবং লাইন থেকে তাকে সরিয়ে দিলো।

আবদু’র অন্তর কেঁপে উঠল, কিন্তু যখন তার টার্ন আসার পর তারা তাকে জানাল যে তারা তার রক্ত নেবে, তখন তার মন্ থেকে দুশ্চিন্তা কেটে গেল। সে অনড়ভাবে সেখানে দাঁড়িয়ে রইল এবং আগের মতো হাসল ও আনন্দপ্রকাশ করল, অপেক্ষা করতে লাগল। যদিও তার খুব ক্ষিধে পেয়েছিল।

খুব তাড়াতাড়িই তার টার্ন এলো। তারা তার বাহুটিকে একটা গর্তের ভেতরে ঢুকিয়ে দিলো, যেটি শুধু তার বাহুটিকে ধারণ করার জন্যেই যথেষ্ট ছিল। সে একটু ভয় পেল, কিন্তু যখন সে দেখল যে তার দুইপাশেই দুইজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে, তখন তার ভয় কমে গেল। হঠাৎ তার মনে হলো যে তার বাহুটি একটা বরফের টুকরার মধ্যে আবদ্ধ করে রাখা হয়েছে। দন্ডের মতো কিছু একটা তার বাহুর ভেতরে ঢুকল বলে সে অনুভব করতে পারল। একটু চিৎকার করে সে চুপ হয়ে গেল। এরপর সে তার চারপাশে তাকাতে লাগল। মাথা উঁচু করে সামনের গ্লাস পার্টিশনের মধ্যদিয়ে সামনে তাকাল। সেটির পেছনে দুইজন সুন্দর মেয়েকে দেখতে পেল, যাদের দাঁতগুলো তার স্ত্রীর দাঁতগুলোর মতো বাঁকা ও উঁচু ছিল না। তারা তার স্ত্রীর মতো নিরানন্দ কালো পোশাকও পরে ছিল না এবং খুব শান্তভাবে নড়াচড়া করছিল। একটু নিবিড়ভাবে তাকিয়ে সে বুঝতে পারল যে তারা আসলে মেয়ে ছিল না। ছিল উজ্জ্বল মুখের দুইজন যুবক। সে তাদেরকে সুন্দরী মেয়েদের সাথে ভেতরে দেখে ঈর্ষান্বিত বোধ করল এবং ভাবল যে কোনো ফন্দিফিকির করে যদি সে তার বাহুকে বাহুকে প্রসারিত করে মেয়েদের মাস্ক পর্যন্ত পৌঁছুতে পারত, তাহলে মাস্ক সরিয়ে দিয়ে সে তাদের সুন্দর চিবুকগুলোর একটাতে চিমটি কাটতে পারত।

আবদু মাস্কের পেছনের মুখগুলোকে পর্যবেক্ষন করতে লাগল যতক্ষণ পর্যন্ত না তাদের মুখগুলো অস্পষ্ট হয়ে মিলিয়ে গেল এবং গ্লাস স্ক্রিনটি উজ্জ্বল আলোর ঝিলিক দিতে লাগল ও মাস্কগুলো ওপরে নীচে ওঠানামা করতে লাগল। হঠাৎ সে খুব ক্লান্তি অনুভব করল। তার বাহু একবার শীতল হয়ে গেল, তারপর গরম হলো, তারপর আবার শীতল হলো।

“কতটুকু নিচ্ছে তারা?” সে তার ডানদিকের লোকটিকে জিগ্যেস করল।

“আমি জানি না। আধা লিটার, তারা বলে,” লোকটি বলল। আলাপচারিতা এখানেই থেমে গেল।

“ঠিক আছে, কাজ শেষ হয়েছে,” কেউ একজন বলল, তার বাহুতে চাপ দিতে দিতে।

আবদু উঠে দাঁড়াল এবং ভারসাম্যহীনভাবে হাঁটল। যখন সে টাকা চাইল, তারা তাকে অপেক্ষা করতে বলল। সুতরাং সে অপেক্ষা করল। তারা ট্যাক্স কেটে রাখার পর তাকে এক পাউন্ড ও তিরিশ পিয়েস্ত্রা দিলো। এমনকি দয়াপরবশ হয়ে তাকে তারা সকালের নাস্তাও দিলো।

বাড়িতে যাবার আগে সে কসাইয়ের দোকানে গেল এবং এক পাউন্ড মাংশ কিনল। সবজির দোকান থেকে আলু কিনল। যখন সে তার রুমের দরজায় আঘাত করল, তখন তার মুখ মৃদুহাসিতে পূর্ণ ছিল। নাফিসা আনন্দে উজ্জ্বল হলো এবং হাসিমুখে স্বামীর সম্বোধনের জবাব দিলো, যখন সে দেখল সে কী এনেছে। সে দ্রুত এসে তার কাছ থেকে জিনিসগুলো নিয়ে নিলো। কেবলমাত্র তার শরম থেকেই আবদু বুঝতে পারল সে তাকে কতটুকু ভালোবাসে।

খুব শীঘ্রই স্ত্রী রান্নায় বসে গেল, এবং ভাঁজার গন্ধে তাদের ঘরটি ভরে গেল। সেটি ক্রমশ ঘর থেকে পুরো বাড়িতে ছড়িয়ে পড়ল এবং তাদের প্রতিবেশীদের কাছে পৌঁছে গেল। তাদের কেউ কেউ খুশি হলো এবং অন্যরা তার প্রতি মায়া থেকে বেদনার্ত হলো।

যখন আর গিলতে পারছিল না, সেই পর্যন্ত আবদু তার খাওয়া চালিয়ে গেল। পরমূহুর্তেই আবেগাক্রান্ত হয়ে সে রুম হতে বেরিয়ে গেল এবং একটা তরমুজ নিয়ে ফিরে এলো। সেই রাতে তার স্ত্রী একবারের জন্যেও তার নৈমিত্তিক হৈচৈ করল না। কেবল অনুগত, নম্র ও প্রেমিকার মতো ঘুঘুধ্বনি করল।

সপ্তাহ শুরু হবার আগেই আবদু তার সকল অর্থ খরচ করে ফেলল। তারপর নির্ধারিত দিনে সে আবার হাসপাতালে ফিরে গেল। নিজের বাহুকে প্রসারিত করল এবং তারা তার থেকে রক্ত নিয়ে তাকে নির্ধারিত অর্থ ও অতিরিক্ত হিসেবে খাবার দিলো।

আবদু তার এই নতুন চাকুরি নিয়ে খুবই খুশি হলো, কারণ এই চাকুরিতে তাকে কারো কাছ থেকে অর্ডার নিতে হতো না। এমনকি কেউ তাকে গালাগালিও করত না। তাকে শুধু যা করতে হতো, তা হলো সপ্তাহের একটা নির্দিষ্ট দিনে তাকে পরিচ্ছন্ন একটা জায়গায় হাজির হতে হতো, যেখানে প্রতিটা জিনিসই ছিল সাদা। সেখানে সে দামের বিনিময়ে আধা লিটার করে রক্ত দিতো। তার স্ত্রী তার উপার্জনকে সুন্দরভাবে খরচ করত এবং সপ্তাহের মধ্যেই তার রক্ত আবার পূর্ণ হয়ে যেত। তারপর সপ্তাহ শেষে সে আবার ফিরে যেত আরও রক্ত দিতে এবং তারা তাকে আরও অর্থ দিতো।

এভাবেই তাদের দিন চলছিল। অনেক লোকজন তাদেরকে ঈর্ষাও করতে লাগল।

তার স্ত্রীর ক্ষেত্রে অবশ্য এটা পরিস্থিতির ওপরে নির্ভর করত। যখন আবদু খাবার নিয়ে বাড়িতে আসতো, তখন তার মুখ হাসিমাখা হয়ে থাকত এবং আনন্দে সে প্রায় কেঁদে ফেলত। কিন্তু যখন সে সারা সপ্তাহ ধরে ঘুমাত, তখন সে তাকে শান্তিতে থাকতে দিতো না। তাকে তার শুকনো পা ও জীর্ণশীর্ণ মুখ নিয়ে ত্যক্ত বিরক্ত করত। তাকে নোংরাভাবে বলত পাড়ার মেয়েরা তাকে নিয়ে কী ধরণের কথাবার্তা বলে থাকে। কীভাবে তারা তাকে মুখের ওপরে বলে দেয় যে, তার স্বামী জীবিকার জন্যে রক্ত বিক্রি করে থাকে। কখনো কখনো সে তার সাথে মুরগীর মতো শোরগোল পাকাত, যখন সে রাতে গরম থাকত। দিনের বেলায় সে তাকে ঘর হতে বের হতে দিতো না এবং তার চারপাশে চক্কর দিতে দিতে তার সকল কথার জবাব দিতো, ঠিক যেন আবদু ছিল একটি অসুস্থ শিশু।

এগুলোর সবকিছু আবদু সহ্য করতে করতে পারত না। এগুলো তাকে কষ্ট দিত, কিন্তু কীই বা করতে পারত সে। প্রতিবার রক্ত দেওয়ার পর তার মাথা ঘোরাত এবং সন্ধ্যা পর্যন্ত তাকে হাসপাতালের দেয়ালের পাশেই শুয়ে থাকতে হতো। এটাও সত্য ছিল যে, লোকজন সমালোচনা করলেও এই অর্থ দিয়েই তার রান্নাঘরের চুলা জ্বলত এবং ঘরের ভাড়া পরিশোধ করা হতো। সুতরাং সে লোকজনকে পাত্তা দিত না এবং তারা সবাই নরকে গেলেও তার কিছুই যায়-আসত না।

তবে একদিন সে হাসপাতালে গেলেও অন্যদিনের মতো তার বাহুকে তারা গর্তের মধ্যে প্রবেশ করালো না। পরিবর্তে তারা তাকে রক্ত দিতে নিষেধ করে দিলো।

“কেন রক্ত নেবে না?”

“এনিমিয়া।“

“এনিমিয়া কী?”

“রক্ত কণিকার অভাব।“

“তাতে কী হয়েছে?”

“তোমার রক্ত নেয়া যাবে না।“

“আমি কী করব এখন?”

“শক্তিশালী হবার পর আবার এসো।“

“আমি তো এখন শক্তিশালীই আছি। চাইলে আমি ঐ দেয়াল ভেঙে ফেলতে পারব।“

“তুমি অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাবে।“

“চিন্তা করো না।“

“তুমি মরে যেতে পারো।“

“আমি সেই রিস্ক নিতে রাজী আছি।“

“সেটা তোমার জন্যে মানবিক হবে না .........তোমার ভালোর জন্যেই......”

“এবং তোমরা যা করছ তা কি মানবিক?”

“ এটা এরকমই ......”

“তুমি কি বলতে চাচ্ছ যে তোমাদের করার কিছুই নেই?”

“না, কিছুই করার নেই।“

সেইদিন তারা তাকে খাবার দিতেও ভুলে গেল, এবং আবদু আবার অভাবগ্রস্ত হলো।

--------------
মূলগল্প: Hard Up

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ