ইউসুফ ইদ্রিসের গল্প : জানাজা


অনুবাদ : সুদেষ্ণা দাশগুপ্ত
বু’ল মেতওয়ালি মসজিদের দরজায় এসে দাঁড়ায়। মাঝ-দুপুরের রোদ গায়ে পড়ে ওর সাদা মুখটাকে ঝলসে দিচ্ছিল। রোদের ঝলকানিতে তার চুলগুলোকে ঠিক বরফ-সাদা খরগোশের মতো দেখাচ্ছিল। পলকহীন চোখের পাতা গনগনে সূর্যের রোশনির সামনে জোর করে খুলে রাখায় তার চোখ উত্তরোত্তর রক্তিম হয়ে উঠছিল। একটুক্ষণ সে রোদ আড়াল করে দাঁড়ায় তারপর ঘাড় উঁচিয়ে মাথা বাড়িয়ে দেয় অন্দরের ছায়ার দিকে। মসজিদের ভেতরে ঝাপসা চোখে যার জন্য তার আসা, তাকে খোঁজে। দেখে সে একটা থামের নিচে বসে ঘুম তাড়ানোর চেষ্টা করছে।
“শেখ মোহাম্মাদ,” তার আনুনাসিক স্বরে ডাকে। কিন্তু মেঝেতে উপুড় হয়ে সিজদা করা নামাজি’দের গুঞ্জনে তার ডাক হারিয়ে যায়, শুধু মসজিদের উঁচু দেওয়ালে সেই গুঞ্জন-ধ্বনির ফাঁকা প্রতিধ্বনি মুখরিত হতে থাকে। সে আরও গলা তুলে হাঁক পাড়ার চেষ্টা করে যাতে শেখ মোহাম্মাদ তার ডাক শুনতে পায়, আর এই চেষ্টায় তার মুখ লাল টকটকে মোরগের ঝুঁটির মতো দেখায়।

অবশেষে শেখ মোহাম্মাদ শুনতে পায়, আর এমনভাবে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে যেন সে তার অপেক্ষাতেই ছিল। দ্রুত দরজার দিকে তাকায় আর আবু’ল মেতওয়ালিকে দেখে পা-ঘষটে এগোয়। আবু’ল মেতওয়ালি ধাতস্থ হয়, এবার খোঁজাখুঁজির ধকল থেকে তার চোখ দুটো রেহাই পাবে। চোখের পাতা দুটো শক্ত করে বুজে রাখে আবার, শুধু সামনের ঘটনাগুলো দেখার জন্য সরু একটা ফাঁক রেখে দেয়।

“তোমার এত দেরি হলো যে, বাছা(মাবরুক)?” শেখ জানতে চায়।

আবু’ল মেতওয়ালির ভদ্রতা করার অত সময় নেই, জবাব দেওয়ার প্রয়োজন সে মনে করল না। তার বদলে নিজের বয়ে আনা পোঁটলাটা দরজার বাইরে বেরিয়ে আসা বেঞ্চে রাখে। যার মধ্যে রঙচটা কম্বলে জড়ানো এক বাচ্চার লাশ ছিল।

“দোওয়া পড়া শুরু করো, শেখ মোহাম্মাদ।” সে আদেশ করে।

শেখ থতমত খায়। ঘাড় উঁচিয়ে একবার বাঁদিকে আরেকবার ডানদিকে দেখে। হাসে, অকপট ধূর্ত হাসি, কিছু একটা বলতে যায় আর তখনই আবু’ল মেতওয়ালি বিরক্ত হয়ে তাকে থামায়।

“থাক, তুমি দোওয়া পাঠ শুরু করো তো!” তাড়া দেয়। আরও জোরে চোখ কুঁচকিয়ে যেন শেখ মোহাম্মাদ আর সূর্য, দুজনের কাছ থেকে নিজেকে সুরক্ষিত রাখার চেষ্টা করে। গায়ের জোব্বাটা সজোরে ঝাপটে কষে টেনে দেয় তার অসন্তোষ বোঝাতে। সকাল থেকে প্রায় একশোবার সোজা করে পরে নেওয়া মাথার পাগড়ীটা আরেকবার দু’হাতে খুলে সোজা করে পরে নেয়।

নিজের জায়গায় আরও গেঁড়ে বসে, যতক্ষণ পর্যন্ত না শেখ দোয়া পড়তে শুরু করে। মসজিদের চারপাশের অগুনতি ফেরিওয়ালা আর তাদের সামনে দাঁড়ানো খদ্দেরদের দর কষাকষির কোলাহলে তার মনোযোগ ছিন্ন হয়। কিন্তু চোখে রোদ এসে পড়ায় সে ছায়ার দিকে চোখ সরিয়ে নেয়। সেখানে তখন পূর্ণমাত্রায় দোদুল্যমান একটা জিকির চলছিল। নানা লোকের ভীড়ের বৃত্তে ছিল এক আধ-চালাক শেখ। যার পরনে ছিল লালরঙা এক উত্তরীয় আর কাঁধে ঝোলানো ছিল একটা চামড়ার থলি। আল্লাহই জানেন তার ভেতরে কী আছে! জিকিরটির নেতৃত্ব তিনি দিচ্ছিলেন একটা তসবিহ’কে হাতে ধরা লোহার নলের ওপর বাড়ি মেরে মেরে, আর একঘেয়ে দোওয়া পাঠ করে। তাঁর কন্ঠ ছিল তাঁর মুখের চেয়েও বেশি অরুচিকর।

বাতাসে করতাল বাজাতে বাজাতে যখন যষ্টিমধুর শরবত বিক্রেতা ওখানে এসে দাঁড়ায়, আবু’ল মেতওয়ালি টের পায় তার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। কাঁচের পাত্রে রাখা চকচকে শীতল গুটিগুলোর দিকে তাকিয়ে সে লোভ সামলাতে পারল না। আধ পিয়াস্ত্রে বার করে শরবতওয়ালার দিকে বাড়িয়ে দেয়, আর সুড়ুত করে গেলাসের ওপর ফেনায়িত চুড়ো এক নিঃশ্বাসে মুখে টানে, আর আল্লাহর নাম করে বাকি পানীয় ঢকঢক করে গিলে ফেলে। তৃষ্ণার্ত ছাতি প্রাণ ফিরে পাওয়ার পর সে কোমরের পকেটে হাত ঢুকিয়ে আবার একটা আধ-পিয়াস্ত্রে বার করে শরবতওয়ালার দিকে ছুঁড়ে দেয়। দ্বিতীয় গেলাস শরবত গলায় তুফান তুলে ঢকঢক করে গিলে নেয়।

এরপরই একটা ঢেকুর তোলে আর তার শরীর ঘামে ভিজে আসে। একটু দূরে দাঁড়ানো ডুমুরওয়ালার দিকে একটা চোরা চাহনি দিয়েই মুখ ফিরিয়ে নেয়, তেমন ভক্তি হয় না ডুমুর-ফলগুলো দেখে। দরজার কাছে ফিরে দেখে শেখ মোহাম্মাদ তার প্রার্থনার শেষ পর্যায়ে এসে সিজদা করছে।

“শান্তি ও মহান আল্লাহর মেহেরবানি তোমার ওপর বর্ষিত হোক।” শেষ পর্যায়ের দোওয়া পড়তে পড়তেই সে গোর-খোদক (কবর খননকারী)-এর দিকে ফেরে। গলার স্বর জোরালো ও তীক্ষ্ণ করে সে আবু’ল মেতওয়ালিকে তিরস্কার করারই ইঙ্গিত দেয়। পর মুহূর্তেই গলা নামিয়ে মৃদু স্বরে প্রার্থনা শেষ করে। গোরখোদক (আবু’ল মেতওয়ালি) তার দিকে সন্দ্বিগ্ধ দৃষ্টিতে তাকায়।

“তুমি তোমার মুসলিম ইমানদারির সাথে ছেলেটির কিবলাহ সম্পন্ন করেছ তো শেখ?”

প্রার্থনা শেষ করে শেখ মোহাম্মাদ গলা তোলেন, “আল্লাহ কৃপা করুন, দোওয়া কবুল...” কিন্তু গোর-খোদক তাকে থামিয়ে জিজ্ঞেস করে, “তুমি আল্লাহর নামে শপথ করে বলতে পারো তো যে অজু ঠিকঠাক করে হয়েছে?”

“...এবং আমাদের নবী মুহাম্মাদ ও তাঁর পরিবারকে রক্ষা করো, তাঁর স্বজনদের রক্ষা করো।” প্রার্থনা শেষ হয়।

“কী ব্যাপার ভাই, তুমি কি আমায় বিশ্বাস করো না?” শেখ প্রশ্ন করে। আবু’ল মেতওয়ালি বিড়বিড় করে অর্থহীন কিছু বলে যার মানে সে নিজেও বোঝে না। পোঁটলাটা তুলে নেয়।

“এটা নিয়ে কটা হলো?” তড়িঘড়ি প্রার্থনা শেষ করে শেখ জানতে চায়।

গোর-খোদক থামে, আবার তার মধ্যে পুরনো অস্বস্তি ফিরে আসে। হালকা পোঁটলাটাকে মনে হয় যেন হাজার পাথরে ভরা। যা সে এড়িয়ে যেতে চাইছিল, তা শত চেষ্টা করেও এড়াতে পারল না।

“এটা নিয়ে সাত নম্বর শেখ মোহাম্মাদ,’’ ধীরে জবাব দেয় আবু’ল মেতওয়ালি।

“কী বলছ, সাত নম্বর মানে? আমার পুরো মনে আছে লেডি মিসকা, আর ওম হাসেম আর আরোও ঈশ্বরের সন্তানের সব, এবারেরটি নিয়ে মোট আটজন।”

“সাত, আল্লাহর নামে শপথ করে তোমাকে বলছি শেখ মোহাম্মাদ।”

“দেখো, ভাই মেতওয়ালি, তোমার একটা পরিবার আছে। তোমার কপটতা করা শোভা পায় না। আমার বেশ মনে আছে, আচ্ছা আমি বলছি শোনো, গোনো তো প্রথম থেকে। এল হানাফি থেকে সক্কাল সক্কাল নিয়ে এলে ওই বাচ্চা ছেলেটিকে। ওটি ছিল প্রথম। তারপর বাচ্চা মেয়েটি, তোমার ভাইঝি......”

“শোনো শেখ মোহাম্মাদ আমি বলছি তো –কেবল সাতজনই। আর এটা যদি অসত্য হয় তাহলে আমি আমার বিবিকে তালাক দেব।”

“আমি তোমায় বলছি হে ...”

“কিন্তু আমি তো তোমায় বলছি যে এটা সাত নম্বর, এটা যদি মিথ্যে হয় তাহলে আমি আমার বিবিকে তালাক দেব।”

“বেশ, তোমার কথাই মেনে নিচ্ছি। আল্লাহই সাক্ষী থাকবেন।”

“তাহলে কত দূর পারিশ্রমিক তুমি পেয়েছ?”

“একটা দশ পিয়াস্ত্রে নোট।”

গোর-খোদক হিসেব কষে, “তাহলে সাতজনের জন্য তুমি আমার কাছ থেকে আর চার পিয়াস্ত্রে পাও।”

“কিন্তু ...মানে শোনো একটু...।”

“কিন্তু ---আবার কী?”

“মানে আমি বলতে চাই, ...দেখো, ...আরে কী আর বলব? এক পাউন্ড টমেটোর কত দাম বলো, আর ঢ্যাঁড়শ কত করে তুমি জানো? আর কাজ-কম্ম তো নেই বললেই চলে। উদযাপন বলতেও তো কিছুই নেই, না কোনো অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার অনুষ্ঠান, না কিছু। আর চিন্তা করো, কাল বিবির জন্য আবার অ্যাসপিরিন কিনতে হলো...”

“ওহ ছাড়ো তো হে, এত ভ্যাজোর-ভ্যাজোর কোরো না। তোমার তো পোয়া বারো। গরমকাল আসছে, মড়ক লাগল বলে, তখন তুমি এত ব্যস্ত হয়ে পড়বে যে খেয়াল থাকবে না তুমি আসছ নাকি যাচ্ছো। তুমি একজন ধার্মিক লোক, নাও এটা রাখো।”

গোর-খোদকের বাড়িয়ে দেওয়া পাঁচ পিয়াস্ত্রে নোটটা নেওয়ার আগে শেখ মোহাম্মাদ ইতস্তত করে, হাত কচলায়। কিছুক্ষণ আঙুলে ঘষে বুঝে নেয়, গলটা ঝুঁকিয়ে জোব্বার ভেতর ঢুকিয়ে নেয়। চোখ কুঁচকিয়ে পিটপিট করে, কাগজের নোটকে দু-আঙুলে ঘষে পাকায়, এমন ভাব করে যেন ফেরত দিয়ে দেবে, কিন্তু তারপরই যেন অন্য ভাবনা মাথায় আসে। জলে ঝাপসা হয়ে আসা চোখে তাকায়।

“ঠিক আছে, মাবরুক(বাছা) আমি এক পিয়াস্ত্রে বেশিই নিলাম।”

যদিও তার কথা কারুর কানে পৌঁছল না। আবু’ল মেতওয়ালি পোঁটলাটি নিয়ে ততক্ষণে বাইরের ভীড়ে উধাও হয়ে গেছে।
-------------
THE FUNERAL CEREMONY by Yousuf Idris




অনুবাদক পরিচিতি
সুদেষ্ণা দাশগুপ্ত
কলকাতায় থাকেন।
কথাসাহিত্যিক। আবৃত্তিকার।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ