ঝুম্পা লাহিড়ীর গল্প: পি’র সেই সব পার্ট


মূল: ঝুম্পা লাহিড়ি
ভাষান্তর – উৎপল দাশগুপ্ত


প্রথমেই বলে নেওয়া ভাল যে পি’র পার্টিগুলো প্রতি বছর ওর বাড়িতেই হত, কোনো শনিবার বা রবিবারের বিকেলের দিকে, যে সময়টাতে এই শহরে মানুষেরা সাধারণত হালকা শীতের একটা সুখকর আমেজ উপভোগ করে।

পরিবারের সকলের সঙ্গে শীতের ছুটির অন্যান্য দিনগুলো কাটানো বেশ গুরুভার মনে হত এবং রীতিমত একঘেয়ে, তার তুলনায় বছর ঘুরতে না ঘুরতেই পি’র জন্মদিন পালন মনে হত অনির্দেশ্য সম্ভাবনাময় হালকা মেজাজের একটা জমায়েত। জনাকীর্ণ সেই গৃহের হইচই-হট্টগোলের দিনটার জন্য আমি উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করে থাকতাম – সারি সারি ফুটন্ত জলভরা পাত্র, সেজেগুজে থাকা বউদের রান্নাঘরে গিয়ে কাড়াকাড়ি করে কাজ করার ব্যস্ততা। লাঞ্চের আগেই বেশ কয়েক গেলাস প্রোসেকো১ পান করে মস্ত্‌ হয়ে যেতাম, নানা স্বাদের ক্ষুধাবর্ধক খাদ্যবস্তু চেখে দেখতাম। তারপর মুক্তবায়ু সেবনের জন্য বহির্প্রাঙ্গণে গিয়ে অন্যান্য প্রাপ্তবয়স্ক মানুষদের মধ্যে শামিল হয়ে যেতাম, তার সঙ্গে চলত ধূমপান আর উঠোনে বাধাবন্ধহীন হয়ে চলতে থাকা বাচ্চাদের ফুটবল খেলা নিয়ে টীকা-টিপ্পনী। পি’র পার্টিতে পরিবেশটা হত খুবই আন্তরিকতাপূর্ণ, তবে একটা আলগা ভাব থাকত, কারণ যঁদের আমন্ত্রণ জানানো হত, তাঁদের মধ্যে অনেকেই পরস্পরের সঙ্গে হয় ঘনিষ্ঠ্যভাবে পরিচিত হতেন নাহয় একে অপরকে একেবারেই জানতেন না। দুই স্বতন্ত্র গোষ্ঠীর সম্মুখীন হতে হত, সাগরের দুই বিপরীতমুখী স্রোতের আবর্ত, নিখুঁত প্রতিসম আকৃতি ধারণ করে প্রতি মুহূর্তে কেবল একে অপরকে বিলীন করে দেওয়ার প্রচেষ্টা। এক পক্ষে থাকতাম আমি আর আমার স্ত্রী, পি’র পুরনো বন্ধুবান্ধবের দল আর ওর বর, যারা কিনা প্রতি বছরই আসতাম, আর অন্য পক্ষে, কিছু বিদেশী মানুষ, হয়ত বছর কয়েক যাঁদের নিয়মিত আসতে দেখা যেত, বা হয়ত দুয়েকবার মুখ দেখিয়েই হারিয়ে যে্তেন।

বিভিন্ন দেশ থেকে ওঁরা আসতেন, কর্মসূত্রে, ভালবাসার টানে, বায়ু-পরিবর্তনের মানসে, কিংবা হয়ত অন্য কোনও অজ্ঞাত কারণে। এই ভবঘুরে গোষ্ঠীই আমার কৌতুহল জাগিয়ে তুলত – হয়ত আমার ভবিষ্যতের কোনও কাহিনীর চরিত্রের প্রোটোটাইপ হিসেবে, এমন ধরণের মানুষ দৈবক্রমে যাঁদের দেখা পাওয়ার এবং উদ্দেশ্যহীনভাবে পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ কেবল মাত্র পি’র বাড়িতেই পেতাম। খুব অল্প সময়েই এঁরা দেশের প্রায় প্রতিটি জায়গায় ঢুঁ মেরে নিতেন, ছোট ছোট শহরগুলো রাখতেন সপ্তাহান্তে ভ্রমণের জন্য, ফেব্রুয়ারি মাসটা ছিল ওঁদের পাহাড়ে পাহাড়ে স্কী করে বেড়াবার সময়, আর জুলাই মাসে আমাদের সমুদ্রের স্ফটিক-স্বছ জলে ওঁরা সাঁতার কাটতেন। চলনসই ভাবে হলেও আমাদের ভাষাতেই কথা বলার অভ্যেস করে ফেলতেন, আমাদের খাদ্যাভ্যাস গ্রহণ করে নিতেন, দৈনন্দিন বিশৃঙ্খলার সঙ্গে আপোস করে নিতেন। রাতারাতি ওঁরা আমাদের ইতিহাস সম্বন্ধে বেশ ওয়াকিবহাল হয়ে উঠতেন, সেই সব ঐতিহাসিক ঘটনাক্রম যা ছাত্রাবস্থায় আমাদের মনে রাখতে হত কিন্তু পরবর্তীকালে বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে গেছে – কোন সম্রাট কোন সম্রাটের পরে রাজত্ব করেছেন, তাঁদের কীর্তিকাহিনী। আমাদের শহরের সঙ্গে এঁদের একটা কৌশলগত সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেলেও এঁরা মনেপ্রাণে কখনোই এখানকার স্থায়ী নাগরিক হয়ে উঠতেন না, কারণ তাঁরা জানতেন এই সফর একদিন না একদিন শেষ হয়েই যাবে এবং ওঁরা বিদায় নেবেন।

আমি যে গোষ্ঠীর অংশ ছিলাম – অর্থাৎ আমারা যারা রোমে জন্মেছি, এখানেই বেড়ে উঠেছি, যারা এই শহরের উদ্বেগজনক অবক্ষয় নিয়ে আক্ষেপ করে থাকি অথচ ছেড়ে চলে যাবার কথা মনেও আনতে পারি না – সেই গোষ্ঠীর থেকে এঁরা কত আলাদা। এমন ধরণের মানুষ যাঁদের কাছে মধ্য তিরিশে নতুন একটা জায়গায় এসে আস্তানা গাড়া – নতুন ডাক্তারখানা খুঁজে নেওয়া, নতুন কোনো স্টল থেকে খবরের কাগজ কেনা, অচেনা কোনো ক্যাফেতে এসে বসা – এই সব কিছুই হল প্রস্থান, স্থানচ্যুতি আর পুরোদস্তুর বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবার সমতুল।

পি হল আমার স্ত্রীর বহুদিনের বান্ধবী। পরস্পরকে ওরা অনেক বছর ধরেই চেনে, আমাদের ডেটিং শুরু হবার অনেক আগে থেকেই, প্রমাণসই অট্টালিকার সারি দেওয়া যে পাড়া, সেই এক পাড়াতেই দুজনে বেড়ে উঠেছে। ছোটবেলায় সন্ধের অন্ধকার হওয়া পর্যন্ত ওরা একসাথে খেলাধুলো করেছে; একই প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গেছে, এবং তারপর একই মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের কঠোর অনুশাসনে লেখাপড়া করেছে; পিয়াৎজ়ার পেছনের জায়গাটা তখনও নিরিবিলিই ছিল, সন্দেহজনক একজন লোকের কাছ থেকে নিষিদ্ধ সিগারেট কেনার জন্য ঘুরতে ঘুরতে সেখানে চলে যেত। একই বিশ্ববিদ্যালয়ে গেল, তারপর স্নাতক হওয়ার পর শহরের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় দুজনে মিলে একটা অ্যাপার্টমেন্টের পাঁচতলাটা ভাড়া নিল। গ্রীষ্মের সময় দুজনে একসঙ্গে বিদেশ ভ্রমণে বেরিয়ে পড়ত – সেই সব অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলতে এখনও ওরা ভালবাসে। তারপর হৃদয়ঘটিত ব্যাপারের সূত্রপাত হল – নতুন বছরের প্রাক সন্ধ্যার একটি পার্টিতে আমার সঙ্গে আমার স্ত্রীর দেখা হল; আর পি বিয়ে করল এক রাশভারি কিন্তু বন্ধুভাবাপন্ন আইনজীবীকে – নাতিদীর্ঘ সুদর্শন মানুষ তবে সামান্য তির্যকদৃষ্টি – এবং অনতিবিলম্বেই চার সন্তানের জননী হয়ে গেল – পর পর তিনটি পুত্রসন্তান আর তারপর তিন পদ আহারের শেষে পরম উপাদেয় মিষ্টান্নের মত একটি কন্যা।

কন্যার জন্মের অনতিকাল পূর্বেই পি’কে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়তে হয়েছিল। প্রথিতযশা এক চিকিৎসক – অবশ্যই পার্টিতে যাঁরা আমন্ত্রিত হতেন, তাঁদেরই একজন – জটিল এক শল্য চিকিৎসার সাহায্যে ওর প্রাণরক্ষা করেন। তখন থেকেই এই মিলনোৎসব নিয়মিত বার্ষিক অনুষ্ঠানে পরিণত হল – পি’র জন্মদিনের কাছাকাছি কোনও এক রোদ ঝলমলে অপরাহ্ণে, কলহাস্যময় বিলাসবহুল অপরাহ্ণভোজে বিভিন্ন ধরণের মানুষের সমাবেশ ঘটত। পি চাইত ওর বাড়ি সরগরম হয়ে উঠুক, সমস্ত বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে হৈচৈ করতে – আত্মীয়স্বজন থেকে শুরু করে, প্রতিবেশীরা, এমনকি ওর ছেলেমেয়েদের সহপাঠীদের বাবা-মা সকলেই আসুন। অন্তত পঞ্চাশবার নিজে হাতে দরজা খুলে অতিথিদের সাদর অভ্যর্থনা জানিয়ে খাদ্য পরিবেশন করত, গৃহস্বামিনীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে সবার সঙ্গেই দু’চারটে বাক্যালাপ করত।

বলা যেতে পারে আমার স্ত্রীর সুবাদেই বছরে একবার ওই বাড়িতে যেতাম। বাড়িটা ছিল শহরের উপকণ্ঠে নিরিবিলি এক জায়গায়। ওখানে যেতে হলে আপনাকে আঁকাবাঁকা শহুরে পথ ধরে যেতে হবে, ছবির মত সুন্দর সেই রাস্তা, দু’ধারে সার বেঁধে সাইপ্রেস আর স্খলিতবসনা আইভির সমারোহ। শহরের জনকোলাহল পেছনে ফেলে সেই রাস্তা হাওয়ার বেগে আপনাকে ক্রমশ সমুদ্রের পানে টেনে নিয়ে যাবে। খানিকটা যাবার পরে ডান দিকে আপনাকে একটা ছুঁচলো বাঁক নিতে হবে, সতর্ক না থাকলে জায়গাটা নজর এড়িয়ে যাওয়া অসম্ভব নয়। এর পর আপনি একটি বসতিপূর্ণ গোলকধাঁধায় গিয়ে পড়বেন, অপরিসর, ছায়াচ্ছন্ন কাঁচা রাস্তা। বাড়িগুলো আপনার দৃষ্টিগোচর হবে না, পাথরে খোদাই করা বাড়ির নম্বরযুক্ত বড় বড় প্রবেশদ্বারগুলোই কেবল দেখতে পাবেন।

আমার মনের মধ্যে গত পাঁচসাতটা পার্টির স্মৃতি মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। প্রতি বছরের অভিজ্ঞতাই আলাদা বলে মনে হয়, কিন্তু প্রতি বছরের স্মৃতিই মোটামুটিভাবে একই রকম। সেই উদ্দেশ্যহীনভাবে কথা বলা এবং পরমুহূর্তেই ভুলে যাওয়া, ঝালিয়ে নেওয়ার মানসে প্রায় মরচে পড়ে যাওয়া দুটো বিদেশি ভাষা চলনসই ভাবে বলার প্রচেষ্টা। সেই একইভাবে বুফের টেবিলে থরে থরে সাজানো সুস্বাদু খাদ্যের বারংবার সংযমহীন আক্রমণ, হয়ত একটু বেশিই বাড়াবাড়ি করে আর ওজন বেড়ে যাওয়া আশঙ্কা মন থেকে সরিয়ে রেখে, এবং অবশেষে অতিভোজনের কারণে হাঁসফাঁস করতে থাকা। বন্ধুবান্ধবদের হাই-হ্যালো করা, চল্লিশোত্তর এবং পঞ্চাশোত্তর মহিলারা, যাঁরা প্রবীণাদের দলে নাম না লেখানোর জন্য বদ্ধপরিকর, তাঁদের গণ্ডদেশ একটি করে চুম্বন। ওঁদের পরিধানের মহার্ঘ সৌরভে মশগুল হয়ে যাওয়া, ওঁদের গ্রীবার ত্বকের অচির উষ্ণ স্পর্শ, মার্জিত আঁটসাঁট পোশাক যা ওঁদের বয়স অনেক কমিয়ে দেয়, সেই পোশাকের তারিফ করা। পি’র পার্টিতে আমি সাদরে গৃহীত হতাম, আতিথেয়তা প্রদর্শন করা হত এবং তৎক্ষণাৎ সানন্দে অলক্ষিত এবং মুক্ত হয়ে যেতাম। আমাদের গতে বাঁধা ত্রুটিপূর্ণ জীবনচর্যার থেকে, নৈরাশ্য থেকে, বিচ্ছিন্ন হবার সুযোগ পেতাম। অন্তত কয়েক ঘন্টার জন্য সময়কে ফাঁকি দেওয়া, কাঁধ থেকে দায়দায়িত্বের বোঝা নামিয়ে রাখা, আমি বেশ উপভোগ করতাম।

এক বছরের পার্টির থেকে অন্য বছরের পার্টির পার্থক্য করা, ঘটনাক্রম, বৈশিষ্টগুলোকে পৃথকভাবে চিহ্নিত করা আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি, যতক্ষণ পর্যন্ত না একটি বছরে পার্টিতে একটি অঘটন, এই সাধারণ পরম্পরায় যতি টেনে আমার জীবনধারায় ছন্দপতন ঘটালো।

সে বছরের প্রতিটি ঘটনাই আমার অবিকল মনে আছে। যেমন আমার মনে আছে, সে বছর স্বাভাবিকের তুলনায় রাস্তায় যানবাহন বেশি ছিল, ফলে আমরা এক ঘন্টা দেরি করে পৌঁছলাম। সেটা অবশ্য কোনও ব্যাপারই নয়; পি’র ওখানে সর্বদা বুফের আয়োজন করাই থাকত। মনে আছে, আমার বউ একটা কোনো ঘটনা নিয়ে কথা বলছিল , আমি গাড়ি চালাচ্ছি আর ও অনর্গল বকবক করে চলেছে, আর আমি না শুনেও শোনার ভান করে যাচ্ছিলাম। সত্যি বলতে কী, ওর ঘড়ঘড়ে গলা আর ফেনিয়ে ফেনিয়ে বলার চেষ্টায় আমি বেশ বিরক্তই বোধ করছিলাম। ও একটি আর্ট গ্যালারি পরিচালনার দায়িত্বে ছিল। আমার ইচ্ছে হচ্ছিল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরা পথটুকু নীরবে গাড়ি চালানোর, এদিকে ও সমানে ওর মক্কেল আর প্রতিশ্রুতিশীল তরুণ শিল্পীদের নিয়ে কথা বলেই চলল। গাড়ি থেকে নামার সময় জুতোটা পালটে নিল, স্বস্তিদায়ক ফ্ল্যাট জুতোর বদলে হিল দেওয়া শৌখিন জুতোটা পরে নিল, যার ফলে ওর দৈর্ঘ্য দুয়েক ইঞ্চি বেড়ে গিয়ে আমার থেকেও মাথায় সামান্য ছাড়িয়ে গেল।

পি যেহেতু ওর ছেলেমেয়ের সব বন্ধুদেরই নিমন্ত্রণ করে, বাড়ির দিকে যেতে যেতে প্রথমেই যেটা নজরে পড়ল, ছোট বড় এক দঙ্গল ছেলেমেয়ে রোদের মধ্যে উঠোনে খেলাধুলো করছে। ওদের কোটগুলো ঘাসের ওপর ফেলে রাখা, সাঁতারে যাবার সময় তোয়ালেগুলো যেভাবে নদীর পাড়ে ফেলে রেখে যাওয়া হয়, সেইভাবে। শিশু আর কিশোর কিশোরীরা প্রবল উৎসাহে দৌড়োদৌড়ি করছে, ঘামছে আর পি’র কুকুরদুটো ঘেউ ঘেউ করতে করতে ওদের পেছন পেছন ছুটছে।

একটু স্মৃতিমেদুর হয়ে আমাদের ছেলেটার কথা ভাবলাম, আমাদের একমাত্র সন্তান যাকে আমার স্ত্রী আর আমি এই পৃথিবীর আলো দেখিয়েছি। এই তো সেদিনও ও আমাদের সঙ্গেই আসত, কোট খুলে রেখে এদের মতই উঠোনে খেলাধুলোয় মেতে উঠত। কিন্তু এখন তো ও সাবালক হয়ে উঠেছে, কলেজ থেকে স্নাতক হয়ে বেরিয়েছে, কয়েকমাস হল বিদেশে নতুন জীবন শুরু করেছে, বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চতর শিক্ষার জন্য গেছে।

ওর অনুপস্থিতিতে আমার স্ত্রীর মন খারাপ হয় না – আসলে ছেলে ক্রমশ আরও বেশি করে স্বাধীন হয়ে উঠুক, সেটাই ঐকান্তিকভাবে ও কামনা করে। ওর মতে ছেলে যে মোটামুটি স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছে, এবং ওর জীবনে একটি মেয়ের আবির্ভাব ঘটেছে, আমাদের কাছ থেকে দূরে চলে গেছে, সেটাই হল অভিভাবকত্বের দুর্গম পথ পরিক্রমা করে আসার পর আমাদের বহু আকাঙ্খিত এবং আনন্দময় পরিণতি। এর অর্থ হল আমাদের কাজটা আমরা সার্থকভাবে করতে পেরেছি, আর এই লক্ষ্যপূরণ উদযাপন করার মত উপলক্ষ। ওর এই পরম নিশ্চিন্ত ভাবটা আমার কাছে অত্যন্ত বিস্ময়কর মনে হত; যে কিনা ছেলেকে এতদিন ধরে ছায়ার মত আগলে রেখেছে, ওর খাওয়াদাওয়া, ফুটবল খেলা, পরীক্ষা, পরীক্ষার ফলাফল সব ব্যাপারে এমন নিবিড়ভাবে খেয়াল রেখে এসেছে। কিন্তু এখন আমি উপলব্ধি করতে পারি যে ওর সমগ্র দৃষ্টি সম্মুখে রেখেই এগিয়ে গেছে, পেছন ঘুরে দেখার অবকাশ খুব কমই এসেছে, আর সেজন্যই ওর মনোযোগ এখন ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে, ওর প্রণয়ঘটিত জীবন নিয়ে, ওর হবু সন্তানদের নিয়ে – এক কথায় আমাদের থেকে ছেলের সম্পূর্ণ ভিন্ন হয়ে যাওয়ার জোরকদম প্রস্তুতি। নিজের ব্যপারে বলতে পারি – প্রতিদিন ছেলেকে দেখতে না পাওয়া, ওর কণ্ঠস্বর, এমনকি ওর অপটু হাতে বেহালা বাজানো শুনতে না পাওয়া, কী করছে না করছে জানতে না পারা, মুদিখানার জিনিসে ওর প্রিয় ফ্রুটজ্যুসটা শামিল না করা – আমাকে কষ্ট দেয়। হ্যাঁ, আমি ওর জন্য অবশ্যই গর্ববোধ করি, ওর ভবিষ্যৎ নিয়ে আমি রীতিমত আশাবাদী, তবুও নিজেকে কেন জানি না খুব নিঃস্ব লাগে।

বেল বাজালাম আমরা, দরজাটা যদিও ভেজানোই ছিল। পি আর ওর বরের সঙ্গে গণ্ডদেশে চুম্বন বিনিময় হল, প্রতিবারের মত এবারও ওরা আমাদের অভ্যর্থনা করবার জন্য নিজেরাই চলে এসেছে। পি’কে চমৎকার লাগছে, সত্তরের দশকের ছাপা কাপড়ের একটা পোশাক পরেছে, যেটা নাকি ওর মায়ের ছিল, লক্ষণীয় করে তোলার জন্য কোমরে চামড়ার বেল্ট লাগিয়েছে – বেশ ঝলমলে লাগছে ওকে। দু’চারটে উপহার নিয়ে এসেছিলাম ওদের জন্য – সুগন্ধী মোমবাতি, গায়ে মাখার ক্রীম, একটা নতুন উপন্যাস, যেটার নাম তখন সবার মুখে মুখে। মিনিটখানেক গল্প করতে না করতেই বেলটা আবার বেজে উঠল, আমাদের হলঘরের ভেতর দিয়ে নিয়ে যাওয়া হল। আমরা কোট খুলে নিয়ে সোফার ওপর ছুঁড়ে ফেললাম, আগে থাকতেই ওখানে পাঁচমিশেলি জামাকাপড়ে পর্বতপ্রমাণ স্তুপ হয়ে আছে। বাড়ির ভেতর বেশ আরামদায়ক উষ্ণতা, কিন্তু আমার বউয়ের আবার ঠাণ্ডা লাগার ধাত, পরে আছে একটা হাতকাটা পোশাক, তাই ঠিক করল যে উলের ছাইরঙা শালটা কাঁধে জড়িয়েই রাখবে।

তারপর হাঁটতে হাঁটতে আমরা বার-এ গেলাম আর দু’গ্লাস প্রোসেকা ত্যুলে নিলাম। একটুক্ষণ চোখে চোখ রেখে আমরা পরস্পরের স্বাস্থ্যকামনা করলাম। তারপর কোনো রকম বিরূপ ভাবনা ছাড়াই আমরা নিজের নিজের মত সারা বিকেল ভিন্ন ভিন্ন বৃত্তে পার্টিতে বিচরণ করে গেলাম, দুজনে দুজনের দিকে নজরই দিলাম না।

আমি বাড়িময় ঘোরাঘুরি করতে লাগলাম, যেন আমার খুব পছন্দের জায়গা, যে জায়গাটা সম্বন্ধে আমি মোটামুটি ভালই জেনে গেছি, তবে জানাটা কখনোই পূর্ণাঙ্গ হয়নি, একজনের পর একজন বন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ হতে লাগল। একমাত্র এই বাড়িতে, আমরা – যে সব দায়দায়িত্ব আমাদের অন্য সময় ব্যতিব্যস্ত রাখে, ব্যক্তিগত এবং পেশাগত যে সব বাধ্যবাধকতা আমাদের গ্রাস করে ফেলে – সব ভুলে গিয়ে কিছুক্ষণের জন্য পরম শান্তিলাভ করি, নিজেদের হারিয়ে যাওয়া সত্তাকে ফিরে পাই। খাওয়াদাওয়া করি, নতুন কোনো খবর থাকলে ভাগাভাগি করে নিই, উদ্দেশ্যহীনভাবে আড্ডা দিই।

পুরো সময় জুড়েই আমি সেই অন্য গোষ্ঠীটির দিকে বিশেষ নজর রেখে যাচ্ছিলাম – আমার সম্ভাব্য কল্পিত চরিত্ররা, বিদেশিরা, যাদের সঙ্গে আমার খুব অল্পই বাক্য বিনিময় হবে, কিংবা হয়ত শুধুই দৃষ্টি বিনিময়। ওদের দৃষ্টিকোণ নিয়ে আমি কৌতুহল বোধ করি। ওদের প্রতি আমার আগ্রহের কারণটা ঠিক এই রকম – আমরা একই বাড়িতে এসে জড়ো হয়েছি, অভিন্ন পারস্পরিক বন্ধুর জন্যই এই উদযাপন করছি, অভিন্ন আনুষ্ঠানিকতায় সমষ্টিগতভাবে অংশগ্রহণ করছি, তবুও সন্দেহাতীতভাবে আমরা দুটি স্বতন্ত্র প্রজাতি, একে অপরের থেকে আলাদা। ক্রমশ ওরা স্বচ্ছন্দ নিভৃত আলাপচারিতায় মজে যাবে আর আমরা আমাদের। ওদের আচার আচরণ দেখে মনে হত, ওদের ছিন্নমূল হয়ে আসার সিদ্ধান্তের জন্য ওরা বেশ গর্বিত, মধ্য বয়সে পৌঁছে ফিরে দেখার মত একটা বিষয়। ওদের জগতটা যেন, আমার মনে হয়, আমার দিকচক্রবাল রেখার সীমানা অতিক্রম করে রূপ পরিগ্রহ করেছে, যে সব ঝুঁকি আমি কখনোই নেবার সাহস করিনি; এমন একটা জগত যা আমার সন্তানকে চিরতরে আমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে গেছে।

বাড়ির ভেতরে একটা চক্কর লাগিয়ে আমি বহির্প্রাঙ্গণে গিয়ে হাজির হলাম। লুকিয়ে লুকিয়ে একটা সিগারেট ধরালাম, বাড়ি ছেড়ে বেড়াতে বেরোলে ধূমপানে নিজেকে অল্প যেকটা ছাড় দিয়ে থাকি তারই একটা, তারপর উঠোন জুড়ে শিশু আর কিশোরের শোরগোল তুলে ফুটবল খেলা দেখতে লেগে গেলাম। লনের ধারে ছড়িয়ে থাকা গাছেরা আলো পড়ে সোনালি বর্ণ ধারণ করছে। প্রথম দিকে আমরা কেবল পুরুষমানুষরাই ছিলাম। এক মিনিটের জন্য পি এসে আমাদের সঙ্গে কথা বলে জেনে নিল আমাদের কোনো পানীয় বা আহার্যের প্রয়োজন আছে কিনা। আমাদের প্রত্যেকের সঙ্গেই এমন ব্যবহার করত যেন সবার সঙ্গেই ওর আজীবন বন্ধুত্ব, যদিও অনেক অতিথিকেই ও চিনত না।

“আপনার লনটা কিন্তু ভারি চমৎকার। এখানে একটা স্যুইমিং পুল থাকলে বেশ হত,” একজন ভদ্রলোক ওকে বললেন।

“খুব একটা লাভ নেই। প্রতিবার গরমকালে মাসদুয়েক আমরা সমুদ্রের ধারে কাটাই,” পি জবাব দিল।

“ও তাই নাকি? কোথায় যান?”

“ছোট্ট একটা দ্বীপ আছে, একটু দূরেই, কিন্তু বেশ সেকেলে। আনাজপাতি কিনতে হলে আপনাকে নৌকো নিয়ে যেতে হবে।”

“আলসেমি হয় না?”

“একেবারেই না। আসলে এই যে অসুবিধেটা – এটার জন্যই আমি মুখিয়ে থাকি। ওখানে আমি যাচ্ছি, যখন আমি খুব ছোট্ট মেয়ে ছিলাম, তখন থেকেই।”

“কী দারুণ ব্যাপার!”

“অগাস্ট মাসে পুরো দ্বীপ রোজ়মেরির সুগন্ধে ভরে যায়। ছোট্ট একটা বাতিঘর আছে, ঠিক মাঝখানে একটা পুল আছে, আর চারদিকে সমুদ্র। ব্যাস, এটুকুই সব,” পি বলল।

আমি কখনো ওই দ্বীপে যাইনি, তবে বউয়ের কাছে গল্প শুনেছি, প্রতি গরমকালেই, সপ্তাহখানেকের জন্য পি’এর পরিবারের অতিথি হয়ে নাকি ওখানে যেত। ওর কাছেই শুনেছিলাম, একজন ভদ্রলোক, খুবই ভাল সাঁতারু – প্রতিবার কুড়ি খেপ করে দিনে দু’বার ওই পুলে চক্কর লাগাতেন – এক বছর বন্ধুর পেছনে ধাওয়া করতে করতে জলের মধ্যেই হার্ট অ্যাটাক করে মারা যান, বাচ্চা থেকে বুড়ো, এমনকি নিজের ছেলেমেয়েদের চোখের সামনেই। ওই দৃশ্য দেখে আতঙ্কিত হয়ে বউ ওখানে আর কোনোদিনও যাবার কথা মনে আনেনি। পি আর ওর পরিবারের সঙ্গে আমরা অনেকবারই সপ্তাহান্তে গ্রামাঞ্চলে ঘুরতে গেলেও, ওই দ্বীপে কখনোই যাইনি।

“সত্যি কথা হল, পুলের জলে সাঁতার কাটতে আমার ভাল লাগে না,” কথাটার রেশ টেনে পি বলে উঠল, যেন আমি মনে মনে কী ভাবছি সেটা ও ধরে ফেলেছে।

“ভাল না লাগার কারণ?”

“ওই জলে প্রাণের ছোঁয়া পাই না।”

আমরা অন্যান্য সমুদ্র, অন্যান্য দ্বীপ নিয়ে গল্প করতে লাগলাম, নৌকা বাওয়ার আনন্দের সঙ্গে সমুদ্র সৈকতে বেড়াতে যাওয়া নিয়েও আলোচনা করলাম; পয়সাওয়ালা মানুষদের অসার বকবকানি আর কি। কিন্তু কথা বলতে বলতে খেয়াল করলাম উঠোনে এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে এসেছে। ছেলেমেয়েরা আর চেঁচামেচি করছে না। কিছু একটা ঘটেছে।

কী ব্যাপার আমরা দেখার জন্য গেলাম। এক দঙ্গল বাচ্চা, এই জনাবারোর মতন হবে, একটু দূরে থমকে দাঁড়িয়ে আছে। ওদের বৃত্তের মাঝখানের জমির ওপর একজন কেউ শুয়ে আছে।

একটু এগিয়ে যেতেই একজন বালককে – বেশ সুন্দর দেখতে, বারো বছরের আশেপাশে বয়স হবে - দেখতে পেলাম, মাথার চুল এলোমেলো, পা’দুটো দুদিকে ছড়ানো – ব্যাপারটা ভাল ঠেকছে না। ও কি অজ্ঞান হয়ে গেছে? নাকি তার চাইতেও গুরুতর কিছু ঘটেছে? আমরা কেউই বুঝে উঠতে পারছিলাম না। ডাক্তারবাবু এসে পড়লেন, সেই ডাক্তারবাবু যিনি অনেক বছর আগে একবার পি’র জীবন রক্ষা করেছিলেন। দীর্ঘদেহী রোগা পাতলা মানুষ, কালো কেশরাশি কাঁধ অবধি নেমে এসেছে, ঝুলন্ত গোঁপ, শান্ত, সদাশয় আচরণ।

শুকনো মুখে একজন মহিলা বালকটির পাশে বসে আছেন। ওর মা-ই হবেন, আমার মনে হল। আগে ওঁকে লক্ষ্য করিনি। অন্তত একঘন্টা ধরে এই ভিড় বাড়ির বিভিন্ন কক্ষে সবাই মিলে যাওয়া আসা করেও, একই টেবিল ঘিরে চক্কর কেটেও, অভিন্ন খাদ্যসামগ্রী গ্রহণ করেও, আমরা কেউ কারোর সামনাসামনি পড়িনি।

ভদ্রমহিলা বিদেশিনী, মুখের চোখের গড়ন দেখেই অনায়াসে বুঝতে পারা যায়। গ্রীষ্মকালীন পোশাক পরেছিলেন যা এখনকার ঋতুর সঙ্গে একেবারেই মাননসই নয়; বেশ ভারি আর খটমট একটা হার ওঁর নিরাবরণ ত্বকের ত্রিভুজের ওপর লুটিয়ে আছে। বিশেষ মেক-আপও করেননি – ওয়াইন-রঙা নেল পালিশটুকু ছাড়া – তবে ওঁর সৌন্দর্য পরিপূর্ণতা লাভ করেছে। ওঁর ঘন কালো কেশ ঘাড়ের কাছে খোঁপা করে রাখা। বয়সে উনি আমার স্ত্রী’র থেকে অন্তত দশ বছরের ছোট হবেন, দৃষ্টিশক্তির তীক্ষ্ণতাও বেশি। ওঁর গার্হস্থ্য জীবনযাপন হয়ত কিছুটা বেলাগাম – আমার মনে হল।

“কী হয়েছে?” ডাক্তারবাবু ওঁর কাছে জানতে চাইলেন।

“ঠিক জানি না। ও যখন খেলছিল, আমি ভেতরে ছিলাম। তারপর ওর বন্ধুদের একজন এসে আমাকে খবর দিল যে ওর শরীরটা ভাল লাগছে না। আমি যখন এলাম, ও কাঁপছিল – একটু অস্থির আর দিশেহারা লাগছিল।”

ভদ্রমহিলা নিজের আর আমাদের ভাষা মিলিয়ে একটা জগাখিচুড়ি ভাষায় কথা বলছিলেন, তবে বুঝতে কোনো অসুবিধে হল না।

“তারপর?”

“বলল যে মাথাটা খুব ঘোরাচ্ছে, আর কয়েক সেকেন্ডের জন্য কিছু শুনতেও পাচ্ছিল না, সব রকম আওয়াজই নাকি বন্ধ হয়ে গেছিল।”

“দয়া করে আমাদের একটু জায়গা করে দিন,” ডাক্তারবাবু বললেন।

ভিড় পেছনে সরে গেল। ছেলেটির সঙ্গে কেবল ওর মা রইলেন, আর তার সঙ্গে ডাক্তারবাবু আর পি। আমি নিজেও কয়েক পা পিছিয়ে গেলাম, আর তখনই একটা ভাবনা আমাকে তটস্থ করে দিল যে আমার পুত্রের সঙ্গেও একই ব্যাপার ঘটতে পারে – পারেই তো! – রবিবার বন্ধুদের সঙ্গে পার্কে যখন ফুটবল খেলে, বাবা মায়ের কেউই তো তখন কাছে থাকে না।

মিনিট দুয়েক কেউ কোনো কথা বলল না। ডাক্তারবাবু ছেলেটিকে পরীক্ষা করতে লাগলেন, পা দুটো তুলে দেখলেন, কপালে হাত দিয়ে দেখলেন, ওর কবজি ধরে পরীক্ষা করলেন। একটু বাদে ছেলেটি নিজে থেকেই উঠে বসল, এক ঢোঁক জলও খেল।

“তেমন গুরুতর কিছু হয়নি, সিনোরা,” ডাক্তার বোঝালেন।

“কিন্তু এরকম হল কেন? ও তো সর্বদাই খুব ছটফটে, আগে তো এরকম কখনো হয়নি।”

“আপনার ছেলে একটা মৃদু ‘শক’ পেয়েছে। দুপুরে হয়ত পেটভরে খায়নি। বাচ্চাদের স্বভাবই হল অগ্রপশ্চাত না ভেবেই দৌড়াদৌড়ি করে বেড়ানোর, মাঝে মাঝে বিশ্রাম নেবার কথা মনেই থাকে না। অতিরিক্ত উত্তেজনায় এরকম ঘটনা ঘটতে পারে। সকালে আপনার ছেলে ব্রেকফাস্ট করেছিল?”

“হ্যাঁ।”

“ওর দুশ্চিন্তা করার স্বভাব আছে?”

কেমন যেন মনে হল প্রশ্নটা উনি বুঝতে পারেননি। যাই হোক, উনি চুপ করেই রইলেন। ওঁর ছেলে আবার উঠে দাঁড়িয়েছে, একটু হয়ত বিব্রতও হয়েছে, বলতে লাগল যে ও ঠিকই আছে। কথাবার্তাও স্বাভাবিক। দাঁতে ‘ব্রেস’২ লাগানো রয়েছে। কারোর কাছ থেকে একটা স্যান্ডউইচ নিয়েছে, খাচ্ছে।

“আমি খেলতে যেতে পারি তো?” ডাক্তারবাবুকে জিগ্যেস করল। মায়ের মত নয়, আমাদের ভাষায় নিখুঁতভাবে বলল, এমনকি কথায় আমাদের শহুরে উচ্চারণভঙ্গির ছাপটাও রয়েছে।

“অবশ্যই পার। তবে বেশি চাপ নিও না।”

ব্যাপারটা ওখানেই মিটে গেল। পার্টি চলতে থাকল। আমরা ভেতরে চলে গেলাম। ওরা কেকটা বের করল, সবাই মিলে “হ্যাপি বার্থডে” গেয়ে উঠলাম, পি-র স্বাস্থ্যকামনা করে পানপাত্র তুলে নিলাম। ওর বাচ্চারা ওকে একটা পুরু সোনার বালা উপহার দিল। আর তারপরেই আসল চমকটা এল – একটা চেয়ারের ওপর দাঁড়িয়ে ওর বর মিষ্টি, ছোট্ট একটা প্রেমের গান গাইল, বেসুরে, আর পি ছলো ছলো চোখে হেসে গড়িয়ে পড়ল। তারপর সকলের সামনেই চোখ বন্ধ করে বরকে অনেকক্ষণ ধরে চুম্বন করল।

এবার ভিড় ধীরে ধীরে পাতলা হয়ে আসতে শুরু করল, অতিথিরা বিদায় নিতে লাগলেন। বউয়ের কাছে গেলাম আমি, জানাল যে বাড়ি যাবার জন্য ও নিজেও তৈরি। পি আর ওর বরকে ধন্যবাদ জানালাম এমন একটা সুন্দর সন্ধ্যা উপহার দেবার জন্য, তারপর বিদায় জানিয়ে নিজেদের গাড়ির কাছে ফিরে এলাম। সামনে গাড়ির লম্বা লাইন, বেরোনোর জন্য আমাদের খানিকক্ষণ অপেক্ষা করতে হল।

“দেরি হয়ে গেল। ভাল লেগেছে তো?” বউ জানতে চাইল।

“সময়টা ভালই কেটে গেল। আর তোমার?”

“মদ খেয়েছিলে?”

“খুব বেশি নয়।”

আমাকে আপাদমস্তক দেখে নিল।

“গাড়িটা আমাকেই চালাতে দাও।”

বেশ ক্লান্ত লাগছিল, তাই বিনা প্রতিবাদে চাবিটা ওকে দিয়ে দিলাম। বসার জায়গা বদলে নিলাম। ও সীট, আয়না নিজের সুবিধে মত করে ঠিক করে নিল। সীট-বেল্ট পরল, স্বস্তিদায়ক ফ্ল্যাট জুতোটা পরে নিল, ওই জুতো পরেই গাড়ি চালাতে ভালবাসে। গাড়িতে স্টার্ট দিতেই যাচ্ছিল, তখন ওর খেয়াল হল শালটা বাড়িতেই ফেলে এসেছে।

“আমার আর নামতে ইচ্ছে করছে না। তুমি একটু যাবে?”

“কোথায় রেখেছিলে মনে আছে?”

“বাইরের বারান্দায় একটু দেখো – মনে হয় একটা চেয়ারের পিঠে ঝুলিয়ে রেখেছিলাম।”

বাড়িটা ফাঁকা, নিস্তব্ধ, চারপাশে পরিত্যক্ত গ্লাস আর কাগজের দোমড়ানো ময়লা ন্যাপকিন পড়ে আছে। পি বোধহয় ওর পরিবারের সঙ্গে একটা না একটা ঘরে গিয়ে বিশ্রাম নিচ্ছে। আমার স্ত্রী ঠিকই বলেছিল, শালটা ওখানেই ছিল, বহির্প্রাঙ্গণের একটা চেয়ারের পিঠ থেকে একটা টাটকা পাস্তার মোড়কের মত ঝুলছে – সেই যেখানে দাঁড়িয়ে আমি পি’কে নিজের দ্বীপের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হতে শুনছিলাম, ছেলেটি অসুস্থ হয়ে পড়ার ঠিক আগে – সেখান থেকে বেশি দূরে নয়।

ছেলেটির মা আমার সামনেই দাঁড়িয়ে ছিলেন – পেছন করে, কিন্তু দেখেই চিনতে পেরে গেলাম, খোঁপা করা কেশ, ঋজু গ্রীবা। একলাই দাঁড়িয়ে ছিলেন, উঠোনের দিকে তাকিয়ে, যেখানে কয়েকজন বাচ্চার সঙ্গে ওঁর ছেলে তখনও খেলাধুলো করছিল। একটা সিগারেট খাচ্ছিলেন। পেছনে কে দাঁড়িয়ে দেখতে গিয়ে যখন ঘুরলেন, মনে হল, উনিও আমাকে সঙ্গে সঙ্গেই চিনতে পারলেন। ওঁর পাণ্ডুর মুখ দেখে বোঝাই যাচ্ছে যে উনি এখনও নিজেকে সামলে নিতে পারেননি।

“’মৃদু শক’ বলতে ঠিক কী বোঝায়?” আমাকে দেখতে পেয়েই জিগ্যেস করলেন।

“এই একটু বিহ্বল হয়ে যাওয়া আর কি। কিছুক্ষণের জন্য শারীরিক মানসিক অবসাদ বোধ করা।”

“আমি তো ভয়ই পেয়ে গেছিলাম, ও বুঝি মরেই গেল। একটা পার্টি চলছে, এত লোকজন যাঁদের আমি ভাল করে চিনিই না – সেইসবের মধ্যে।”

“দুশ্চিন্তা করবেন না। ডাক্তারবাবু কী বললেন, আমি শুনেছি, এখন সব ঠিকই আছে,” আমি ‘আপনি’ করেই সম্বোধন করলাম।

“আমি কত গুছিয়ে সংসার করতাম। ভালভাবে জীবন কীভাবে কাটাতে হয়, আমি জানতাম। কিন্তু আজকাল, এই বিদেশে বিভুঁইয়ে একেবারে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছি।”

“এই দেশে এসে পড়লেন কীভাবে?”

“আমার স্বামী সাংবাদিকতা করেন। উনি রোম শহরটা ভালবাসেন। বলেন কি আমার থেকেও উনি নাকি এই শহরকে বেশি ভালবাসেন।”

“আর আপনি – আপনার কেমন লাগে?”

“আমি খুশি নই, আবার অখুশিও নই। আমরা ‘তুমি’ করে বললে আপনার আপত্তি আছে?”

“একটুও না।”

“তুমি সারাটা সময় আমার আর আমার ছেলের পাশ থেকে নড়লে না কেন?”

“ঠিক কী বলতে চাইছেন?”

“ঘাসের ওপর। তুমি অন্যদের মত চলে গেলে না।”

“আমারও দুশ্চিন্তা হয়েছিল, আপনারই মত। সেজন্যই।”

“তোমারও ছেলে আছে তাই না?”

“হ্যাঁ। ও বিদেশে থাকে।”

সেই জন্যেই তুমি বুঝতে পারবে।”

“কী বুঝতে পারব?”

“আমি আজ সবচাইতে খারাপ যা হতে পারত তার জন্যই মনকে তৈরি করে নিয়েছিলাম।”

এর পরের কয়েকটা দিন এই অপ্রত্যাশিত কথোপকথন আমার মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকল। কে ওই মহিলা? আমার সঙ্গে রাখঢাক না করে এমন মন খুলে কথা বললেন যে কি অনায়াসে দুটি অপরিচিত হৃদয়ের সেতুবন্ধ করে দিল। উনি যে সঙ্কটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন সেটা এমন আকস্মিকভাবে আমার কাছে প্রকাশ করে দিলেন কেন? কী নাম ওঁর? পি’র সঙ্গে কবে কোথায় ওঁর আলাপ হয়েছিল? ওঁর এই স্বামীটি, যিনি নাকি রোম শহরকে ওঁর চাইতেও বেশি ভালবাসেন – উনিই বা কোথায়?

একদিন সন্ধ্যায়, কিছুটা ইতস্তত করার পর, আমার স্ত্রীকে জিগ্যেস করলাম, “পি’র ওখানে এবছর, তুমি কি নজরে পড়ার মত কাউকে দেখেছ?”

“নাহ্‌, তেমন কারুকেই নয়। মাঝে মাঝে নতুন কোনো মানুষের সঙ্গে আলাপ করার ধৈর্য রাখতে পারি না।”

“কত বিদেশি মানুষ ছিলেন, প্রতি বছরই সংখ্যাটা বেড়ে যায়।”

“ওর বাচ্চাদের বন্ধুদের মা বাবারা হবেন। একই আন্তর্জাতিক বিদ্যালয়ে যায় নিশ্চয়ই।”

“স্কুলটা ভাল?”

“খরচসাপেক্ষ, আর যদি আমার মতামত চাও, একটু বাড়িয়েই বলা হয়। আমাদের নিজস্ব বিদ্যালয়ব্যবস্থার ওপরেই আমার বেশি আস্থা।”

তারপর আমাদেরই এক বন্ধুর কথা বলল – পি’র সালিয়ানা পার্টিতে নিয়মিত যাওয়া আসা – সে নাকি শহরতলির একটা ছোট বিশ্ববিদ্যালয়ের ডীনের চাকরি ছেড়ে বিদেশের এক রাজধানীতে ওয়াইন স্টোর খুলবে বলে ভাবছে।

পি’র কাছে এই ব্যাপারে জানতে চাওয়াটা বোধহয় উচিত কাজ হবে না। মনে হয় আমার স্ত্রী ঠিকই বলছে, যে মহিলার সঙ্গে আমার কথাবার্তা হয়েছিল তিনি খুব সম্ভব পি’র বাচ্চাদের কোনো সহপাঠীর মা-ই হবেন। সেদিন বহির্প্রাঙ্গণে আমাদের কথোপকথন নিয়ে যতই ভাবি, ততই ব্যাপারটা আমার কাছে কাকতালীয় মনে হয়, যেন উনি আমারই প্রতীক্ষা করছিলেন, যেন আগে থেকেই জানতেন, যে আমার বউ শালটা ফেলে যাবে আর আমাকে সেটি নিয়ে আসার জন্য ফেরত পাঠাবে। বলতে গেলে পার্টিতে অনেক রকম কথাবার্তার মধ্যে ঐ একটি কথাবার্তার মধ্যেই কিছু বিষয়বস্তু ছিল। আমাদের চোখাচোখি হয়েছিল, আমরা একলাই ছিলাম, কাছাকাছি বসেছিলাম, তবুও নিজের পরিচয়টুকু দিয়ে উঠতে পারিনি। বউয়ের শালটা তুলে নিয়ে, বিড়বিড় করে বেখাপ্পা কিছু বলে আমি বেরিয়ে এসেছিলাম।

ক্রমে স্মৃতি মলিন হয়ে উঠল। যে বাড়িটিতে ছেলেকে বড় করে তুলেছি, সেই বাড়িতেই বউয়ের সঙ্গে আমার একটার পর একটা দিন কেটে যেতে লাগল। ওর ছিপছিপে শরীরের সঙ্গে আমার শারীরিক মিলনে ছেদ পড়ে না। ডিনারের একই বৃত্তের বন্ধুদের আমন্ত্রণ জানাই, একই নির্ভরযোগ্য প্রণালীতে তৈরি খাবারের আয়োজন করে থাকি। আমার স্ত্রী যখন গ্যালারিতে যায় কিংবা পেশাগত সফরে যায়, আমি বাড়িতে আমাদের শয়নকক্ষের এক কোণে বসে নিজের কাজ করি – আমার পঞ্চম উপন্যাসের ধীর প্রগতি, আমার প্রবন্ধ রচনা, সাম্প্রতিকতম সাহিত্য নিয়ে পর্যালোচনা – চলতে থাকে। সন্ধেবেলা ঘরে ফেরার পর ও সমস্ত দিনের অসমতল জীবনচর্যার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দিতে থাকবে আর আমি পানপাত্রে ওয়াইন ঢেলে ওর সেই সব কথা মনোযোগ দিয়ে শোনবার ভান করতে থাকব। মাসের একটা শনিবার আমরা ধ্রুপদী সংগীত শুনতে যেতাম, তারপর সেখান থেকে কোনো রেস্তোরাঁয় বা নতুন কোনো শিল্পকৃতি প্রদর্শনের উদ্বোধনে। আমি লাইব্রেরিতেও যেতাম। আর বছরে একবার, ওর জন্মদিনের সময় পাহাড়ে ছুটি কাটাতে যেতাম, আর কর্মব্যস্ততায় যখন একটু ঢিলে থাকত – আমার জন্মদিন উপলক্ষ্যে, সমুদ্রের ধারে।

বড়দিনের সময় দেশের বাইরে গেলাম ছেলেকে দেখার জন্য। ওর স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্টটা আমাদের ঘুরিয়ে দেখাল, নিতান্তই সাধারণ, কিন্তু ও খুশি মনেই থাকে, ওর প্রথম বান্ধবীর সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিল। অল্পবয়সী, আকর্ষণীয় মেয়ে যার বাবা আর মা দুই ভিন্ন মহাদেশের মানুষ। বিশ্ববিদ্যালয়ে ওদের পরিচয়। ওরা দুজনে মিলে আমাদের ওদের পছন্দের এক রেস্তোরাঁয় নিয়ে গেল, বেশ এলোমেলো আর কোলাহলমুখর। লক্ষ্য করলাম আমার পুত্র – যে এখন আমার চেয়েও লম্বা – আজকাল নিরামিষাশী হয়ে গেলেও, শরীরটা একটু ভারীর দিকে মোড় নিয়েছে। ওয়াইনের বদলে বিয়ারই ওর পছন্দের পানীয়। সেলফোনটা হাতে নিলেই যে চঞ্চল ছেলেটির ছবি দেখতে পাই – গত বছর গরমের সময় মাছ ধরার নৌকায় তোলা – সেই চেহারার সঙ্গে এখন আর কোনো মিল নেই।

ওর বান্ধবীটি থাকায়, আমরা একে অপরের সঙ্গে একবারের জন্যেও ইতালীয় ভাষায় কথা বললাম না। শহরের যে বহুজাতিক উপকণ্ঠে ওরা বাস করে, সপ্তাহের প্রতিটি রাতে সাতটি বিভিন্ন দেশের খাবার খাওয়ার জন্য বের হয়, সেই এলাকা নিয়ে আমার পুত্র উচ্ছ্বসিত স্বরে অনেক কথাই বলে ফেলল। আমার সব প্রশ্নের জবাবই খুব নম্রভাবে কিন্তু সংক্ষেপে দিল। সাবলীলতা বৃদ্ধির জন্য আগ্রহ সহকারে পি’র বাড়িতে যে ভাষায় কথা বলার চেষ্টা করতাম, আজ নিজের ছেলের সঙ্গে সেই ভাষাতেই কথা বলতে হচ্ছে বলে হতাশ বোধ করছি, কৃত্রিম লাগছে। ও বলল যে ইস্টারের সময় বান্ধবীকে নিয়ে রাজপ্রাসাদ আর ভেড়া দেখতে যাওয়ার কথা ভাবছে। দু’একদিনের মধ্যেই উপলব্ধি করলাম যে কেবল রোম শহরই নয়, আমাদের জীবনচর্যা, যে আদর্শে ওকে গড়ে তোলবার প্রচেষ্টা এতদিন আমরা করে এসেছি, সেই সব কিছুই ও নীরবে বর্জন করেছে।

এই নতুন শহর ওকে সমৃদ্ধতর করেছে – তা সত্ত্বেও ওর এই অতি সাধারণ একটি অ্যাপার্টমেন্টে থাকা, ওর ওই ব্যয়বহুল বিজাতীয় খাবার খাওয়া আর সর্বক্ষণ ওর ওই পলকা চেহারার বান্ধবীর সহাস্যবদনে ওর পাশ আগলে থাকা – আমি কেন যেন মেনে নিতে পারছিলাম না। মেনে নিতে পারছিলাম না ভিড় ঠেলে ওর মেট্রোতে যাতায়াত, কিংবা রাত তিনটের সময় সামান্য মত্ত অবস্থায় একা একা রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়া, অথবা রবিবারে ব্রেকফাস্ট না করে খালি পেটেই ফুটবল খেলতে পার্কে চলে যাওয়া। মনে মনে ভাবনা হচ্ছিল যে ওর বুদ্ধি এখনও যথেষ্ট পরিপক্ক হয়নি, হয়ত ভেতরে ভেতরে ও খুব অসুখী, হয়ত কোনও উটকো ঝামেলায় জড়িয়ে পড়বে। কিন্তু এই সাদাসিধে, দুর্বল ছেলেটা আমার পুত্র নয় – ও আসলে আমারই স্বরূপ। কিংবা বলা যেতে আমার সেই স্বরূপ যা আমি নিজের মধ্যে বিকশিত হতে দিইনি, যে স্বরূপকে আমি অবহেলা করেছি, দূরে সরিয়ে রেখেছি – আমার সেই স্বরূপ যা আমার মধ্যে রূপ পরিগ্রহ করতে না পেরেও আমাকে পরাস্ত করেছে। এই সব এলোমেলো ভাবনা মাথায় নিয়ে আমি আমার পুত্রের নতুন শহর পরিক্রমা করে চললাম – ধৈর্য ধরে নিরানন্দ অনুচ্চ আকাশের নিচে সেতু, বাগান আর স্মৃতিস্তম্ভগুলির সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে।

বিমান ছাড়বার আগে, স্ত্রীকে দেখলাম ফোনে ই-মেলগুলো একবার চেক করে নিচ্ছে, বুঝে ফেললাম যে আবার আমরা কেবল আমরা দুজনই হয়ে গেলাম, তবে এবার সন্তানলাভের অভিপ্রায় – যে অভিপ্রায় এতকাল আমাদের দুজনকে এক সুতোয় বেঁধে রেখেছিল – সেটা ছাড়াই। কী এত পড়ে চলেছে ও? কারা এত লিখেছে ওকে? রহস্যময় প্রেরকদের কাছ থেকে প্রতিদিন শত শত বার্তা আসতে থাকে। ঘন বসতিপূর্ণ অতি সক্রিয় এক দুনিয়া, যেখানে কেবল ওরই প্রবেশাধিকার। তার মধ্যেই একবার মাথা তুলে আমাকে পি’র পরবর্তী পার্টির দিনটা স্মরণ করিয়ে দিল।

পি’র বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার জন্য গাড়িতে বসার পরেই আমার সেই আতঙ্কগ্রস্ত মায়ের কথা মনে পড়ে গেল, মনে পড়ে গেল বহির্প্রাঙ্গণে ওঁর অপ্রত্যাশিত স্বীকারোক্তির কথা। প্রায় এক বছর হতে চলল, ওঁর কথা মনেই আসেনি। আমার কৌতুহল আমি পি’র ওখানেই ফেলে এসেছিলাম, ঠিক যেমন একটি ছাতা কিংবা আমার বউয়ের ফেলে আসা শালটি (যেটি ও আমাকে নিয়ে আসতে বলেছিল) – কয়েকদিন মনে মনে অভাব বোধ করলেও অনায়াসেই ভুলে যাওয়া যায়। তবে আজ ওখানে ফিরে যাবার সময় সেই ভদ্রমহিলা আর মধ্যে একটি অনাবিষ্কৃত সংযোগ অনুভব করতে লাগলাম।

ভারাক্রান্ত মনে গাড়ি চালাতে চালাতে একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলাম। ডানদিকের ধারালো বাঁকটা খেয়াল করতে না পেরে ভুল রাস্তা ধরলাম, ব্যাক গিয়ার লাগিয়ে গাড়ি পেছনে নিতে হল, আর আমার বউয়ের বিরক্তি উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেতে লাগল। মনে মনে ভাবছিলাম – অন্য একটা শার্ট পরা উচিত ছিল, যেটা পরে আছি সেটা আমাকে তেমন মানায় না। বহির্প্রাঙ্গণে কথোপকথনের সময় যে মানসিক উৎকণ্ঠা বোধ করেছিলাম সেটি আবার ফিরে এল। মনশ্চক্ষে সেই ছবি স্পষ্ট দেখতে পেলাম – সুন্দর কিন্তু বেমরশুমি পোশাক, জটিল একটি কণ্ঠহার, নেল-পালিশের রঙ। বছরটা যেন ঘুরে যায়নি, সময়টা এক জায়গায় দাঁড়িয়ে গেছে। আমরা করমর্দনও করিনি, কেবল মুহূর্তের একটা বোঝাপড়া হয়েছিল। তাহলে নিজেকে একটু অপরাধী মনে হচ্ছে কেন?

একটা পুরনো হাস্যকর কথা মনে পড়ে গেল, আমার স্ত্রীর সঙ্গে পরিচয় হবার আগের একটি স্মৃতি। সেই সময় আমি একটি জিমে যেতাম, সেখানে একটি স্যুইমিং পুলও ছিল। প্রতি সপ্তাহে সেই পুলের ধারেই একজন মেয়ে আমার দিকে তাকিয়ে হাসত আর আমাকে হ্যালো বলত। যে লেন ধরে আমি সাঁতার কাটতাম, মেয়েটিও সেই লেনটিই ধরত। বেশ কয়েক মাস ধরে আমার পুরো সপ্তাহটা ওই সংক্ষিপ্ত সাক্ষাতটিকে ঘিরেই আবর্তিত হত, ব্যাপারটা এমনই দাঁড়িয়েছিল যে মেয়েটির সঙ্গে সাক্ষাৎ যাতে কোনোমতেই ব্যর্থ না হয় তার জন্য আমি লকার-রুম পর্যন্ত ধাওয়া করতাম। কোনোকিছু নিয়েই আমাদের কথাবার্তা হয়নি। ও কেবল আপনার সাঁতার কাটা আনন্দময় হোক বা ওই ধরণের আরও কিছু বলত। কিন্তু প্রতিবারই সরাসরি আমার দিকে তাকিয়েই কথাগুলো বলত, মনে হত যেন আমিই হলাম ওর দুনিয়ার কেন্দ্রস্থল। আমাদের এরকম দেখাসাক্ষাৎ মাস কয়েক চলেছিল, তারপর আর ওর দেখা পাইনি। এর মাস দুয়েক পরে, বউয়ের সঙ্গে দেখা হল – কিন্তু বিছানায়, প্রথম প্রথম, ওই সাঁতারু মেয়েটির চোখ, ওর হাসিই আমার কল্পনায় ভেসে উঠত। ব্যাস, ওইটুকুই।

গাড়ি পার্ক করতে করতে সেই আতঙ্কতাড়িত মহিলার কথা মনে পড়ে গেল – হয়ত উনি এখানে থাকবেনই না, ওঁকে হয়ত আমন্ত্রণই জানানো হয়নি, কিংবা হয়ত অন্যত্র কোথাও যাবেন বলে আগে থেকেই ঠিক হয়ে আছে। এখানে ওঁর উপস্থিতিকে অনিবার্য বলে মনে করার কোনও কারণ নেই। ঘরে ঢোকা মাত্রই পি আর ওর স্বামী আমাদের অভ্যর্থনা করতে এগিয়ে এল। তারপর আমার বউ আমাকে ফেলেই পাশের ঘরে আড্ডা দিতে চলে গেল। ঠিক তখনই ওঁকে দেখতে পেলাম।

ডাইনিং রুমে একটি জানলার নিচে বসে আছেন, অতিথিদের চলাফেরার সুবিধের জন্য দেওয়ালের ধার ঘেঁষে সার বেঁধে রাখা যে চেয়ারগুলি, তার একটিতে। পাশেই ওঁর স্বামী বসে আছেন – সুদীর্ঘ সুদর্শন মানুষ, মাথায় উজ্জ্বল শুভ্র কেশ, তারুণ্যে ভরপুর মুখমণ্ডল, এই জানুয়ারি মাসেও বেশ তামাটে। ওঁর স্বামীই হবেন নিশ্চয়, কারণ ওঁরা একই প্লেট থেকে খাবার মুখে তুলছেন; যাতে দুজনেই অন্য হাতে একটি করে ওয়াইনের গ্লাস ধরতে পারেন। বরের সঙ্গে ওঁর কোনো কথাবার্তা হচ্ছিল না। ভদ্রমহিলার মুখ ওঁর ডান পাশে বসা অন্য দুজন মহিলার দিকে ঘোরানো। চারপাশে এত শোরগোল, তাই আলাদা করে ওঁর কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম না। ।

বেমালুম বদলে গেছেন উনি। হাসছেন, নিজেকে নিয়ে মজার মজার কথা বলছেন, আর প্লেট হাতে ধরে ওঁর স্বামী সেগুলো শুনছেন। খুবই মনোযোগী শ্রোতা, অমায়িক, কিন্তু একটু যেন চাপে আছেন। অনর্গল কথা বলছিলেন ভদ্রমহিলা, কথায় বক্রোক্তি মিশে ছিল। সঙ্কটে পড়েছেন বলে মনেই হচ্ছে না।

পার্টিতে উপস্থিত প্রায় সব ভদ্রমহিলার মতই ওঁর পরনেও কালো রঙের পোশাক। কোনো কণ্ঠহার নেই, কেবল অনাবৃত ত্বকের সেই ত্রিভুজ। একটা আঁটসাঁট প্যান্ট পরেছেন আর পায়ে নরম চামড়ার বুটজুতো, ঋতুর সঙ্গে মানানসই। ওঁর কেশরাশি – বেশ দীর্ঘ লাগছে – একটি সরু রুপোলি গুচ্ছ সেখান থেকে নেমে এসেছে। সেটা নিয়ে অবশ্য ওঁর কোনো মাথাব্যথা আছে বলে মনে হল না। আগের চাইতে রোগা হয়েছেন, আরও সুন্দরী – পরিণত সৌন্দর্য – চোখ ফেরানো যায় না। তত এক বছরে উনি অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছেন, আমার পুত্রের মতই। একই শহরে আমাদের বাস, শহরও এমন কিছু বড় নয়, কিন্তু মুখোমুখি এসে পড়ার কোনও ঘটনা ঘটেনি – রেস্তোরাঁয় নয়, ওষুধের দোকানে নয়, রাস্তায় নয়, এমনকি জিমেও নয়। আমাদের সাক্ষাৎ কেবল এই বাড়িতেই হয়, পি’র এই পার্টিতেই।

“এই যে, আমরা বাইরের বারান্দায় আছি, ওখানটা বেশ ভাল,” একজন পুরনো বন্ধু ছুটে এসে খবর দিল।

“এখুনি আসছি।”

আমি টেবিলটার চারপাশে ধীরেসুস্থে একটা চক্কর লাগিয়ে একটু চিজ়, খানিকটা সবজি, আর কয়েক টুকরো সালামি তুলে নিলাম। আমার উপস্থিতিটা জানান দিতে চাইছিলাম। ওঁর কণ্ঠস্বর শুনতে পাচ্ছিলাম না, কেবল আমার বউয়ের ফ্যাঁসফ্যাঁসে গলাটাই শুনছিলাম, এত লোকের মাঝখানেও সেই কণ্ঠস্বর আমার কানে ঠিক আসছিল।

ওঁর স্বামী যখন উঠে দাঁড়িয়ে প্লেটটা ফেলবার জন্য একটা ট্র্যাশ ক্যান খুঁজছিলেন, আমি ভদ্রমহিলার দিকে তাকালাম, অপেক্ষা করছিলাম কখন উনিও আমার দিকে ঘুরে তাকাবেন। কিসের আশায়, আমি জানি না – স্যুইমিং পুলের সেই মেয়েটির মত উনি আমার দিকে হেসে তাকাবেন বলে? কিন্তু উনি ওঁর রসালাপেই মগ্ন।

আমি তাকিয়েই রইলাম, আর উনিও গল্প করেই চললেন। ওঁর স্বামী চলে গেছেন, আমার স্ত্রী পাশের ঘরে। আমি যতই তাকিয়ে রইলাম, উনি নির্লিপ্ততার সঙ্গে ততই আমাকে এড়িয়ে গেলেন। ঘটনাচক্রে সহসা একবার চোখ তুলে তাকাতেই এবং মুহূর্তের জন্য সেই দৃষ্টি আমার ওপর পড়তেই ওঁর চোখের ভাষা আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল – (আমার মনে হল) সেই চোখে বিদ্বেষ আর উত্তেজনা, আবিষ্ট দ্যুতিমান চাহনি (হয়ত) আমারই জন্য।

ভাবনাটা মনে ধরল আমার – একটি সবিরাম বন্ধন; নির্ধারিত একটি দিনে দেখা পাওয়া, কেবল আমরা দুজনে, ঠিক যখন একটি পার্টি চলছে। আনুগত্য ভঙ্গের একটি গ্রহণযোগ্য রূপ, সম্পূর্ণভাবে ক্ষমার যোগ্য, ঠিক যেমন স্ত্রী সঙ্গে থাকলেও মাঝে মাঝে স্যুইমিং পুলের ধারের মেয়েটির কথা মনে পড়ে যায়। সত্যি বলতে কী, আমি কোনো ফ্যাসাদে জড়াতে চাই না। কেবল কয়েক ঘন্টার সঙ্গলাভের মাধূর্য, তারপর আবার দীর্ঘ এক বছরের বিচ্ছেদ।

সত্যি বলতে কী, আমি কোনোদিনই আমার স্ত্রীর বিশ্বাসভঙ্গ করিনি, অথচ যে শহরে আমরা থাকি, সেখানে প্রত্যেকেই প্রত্যেকের সঙ্গে প্রতারণা করে চলেছে। স্যুইমিং পুলের সেই মেয়েটির প্রতি সামান্য দুর্বলতা, এছাড়া আমার আনুগত্যে কোনো চিড় ধরেনি। বরং আমিই প্রতারিত হয়েছি, প্রত্যাখ্যাত হয়েছি – স্ত্রীর সঙ্গে পরিচয় হবার আগে থেকেই – উল্টোটা নয়। মনে হয় কাউকে প্রতারণা করার মানসিকতাটাই আমার মধ্যে নেই। স্ত্রীর সক্রিয় জীবনযাত্রা, ওর বাধ্যবাধকতা – ফোনে ওর অবিরাম মেসেজ আসতে থাকা, আমাকে ছাড়াই ডিনার সেরে নেওয়া, কর্মসূত্রে বিদেশভ্রমণ, ঝটিকা সফরে অন্য শহর থেকে ঘুরে আসা – আমি তো মেনেই নিয়েছি। এর পরিণাম কী হতে পারে সেটা আন্দাজ করেও – হোটেলের নির্জনতায় একলা একটি মেয়ে, অপরিচিত মানুষের সঙ্গে একসাথে লাঞ্চ করা, ঘুরে বেড়ানো। আমি ঈর্ষাকাতর নই, তাই এইসব অনুমানকে আমি গুরত্বই দিইনি। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে না বলা অনেক কথাই জমে উঠতে থাকে, কিন্তু তাতে পরস্পরের প্রতি টানটাও বেড়েই চলতে থাকে। বাধাবিঘ্ন এড়িয়ে, বিশাল কোনও ভূমিকম্প না ঘটিয়ে, এভাবেই আমরা তেইশ বছরের বিবাহিত জীবন অতিবাহিত করেছি।

আবারও বলি এইসব অকিঞ্চিৎকর ত্রুটিবিচ্যুতি নিয়ে অযথা মাথা গরম না করে দিনগুলো বেশ কেটে যাচ্ছিল। কিন্তু কয়েক মাস যেতে না যেতেই বউ জানাল যে পি নাকি আরও একটা পার্টি দিচ্ছে।

“এত তাড়াতাড়ি? কিসের জন্য?”

“বলল যে বড় ছেলেকে নাকি নাচ শেখাচ্ছে, তাই ওর মনে হল, একটু অন্য ধরণের একটা পার্টি দেওয়া উচিত। এবারে সন্ধেবেলায়। বাচ্চারা থাকবে না।”

“আমাদের ছেলেকে কি কখনো নাচ শিখিয়েছি?”

“হয়ত।”

“কারা কারা আসছেন, জানো কিছু?”

“আমার ধারণা – ওই যাঁরা যাঁরা এসে থাকেন – তাঁরাই হবেন।”

সেদিন সন্ধেবেলা প্রচণ্ড দুর্যোগ। খুব বিশ্রী কেটেছে সারাটা দিন। কিছু মুখে তুলতে পারিনি, নিজের টেবিলে বসে মনোযোগ দিয়ে একটা কাজও করতে পারিনি।

“সপ্তাহটা বড়ই ক্লান্তিকর ছিল, মাথা ধরাটা কিছুতেই যাচ্ছে না,” বউকে বললাম।

“তো … ?”

“না বলছিলাম কী, রাতটা যদি বাড়িতেই কাটানো যায়?”

আগেই জানতাম আমার পরামর্শ কোনো কাজেই লাগবে না। বেরোবার জনই তৈরি হচ্ছে, একটা খাটো পোশাক পরেছে , বহুবছর সেটা বেরই করেনি।

“আজ রাতে আমরা নাচানাচি করব,একেবারে লাগামছাড়া হয়ে। নাও, আর দেরি কোরো না।”

অন্ধকারে পি’র বাড়ি দেখে মনে হল অন্য কোথাও চলে এসেছি – অচেনা রাস্তা ধরে, অচেনা কোনো জায়গায়। গাড়ি চালাতে কষ্ট হচ্ছিল, বৃষ্টিতে নজরকাড়া রাস্তাটা বৃষ্টি ভিজে পেছল হয়ে রয়েছে। স্যাঁতস্যাঁতে হাওয়াটাও গায়ে বিঁধছিল। মন থেকে সাড়া পাচ্ছিলাম না।

“জানো, কয়েকদিন আগেই ওদের বাড়িতে ডাকাতি হয়ে গেছে?” গাড়ির লম্বা লাইনের পেছনে গাড়িটা যখন পার্ক করাচ্ছি, তখন বউ কথাটা বলল।

“কাদের কথা বলছ?”

পি’দের কথা। তিনদিনের জন্য বেরিয়েছিল, সমস্ত গয়নাগাটি নিয়ে চলে গেছে।”

“ওগুলো লকারে রাখেনি?”

“দুর্ভাগ্যবশত না – পি সব সময়ই একটু অগোছালো।”

বাড়িটাও বেশ অন্ধকার, অচেনা। জায়গা বের করার জন্য ওরা অনেক আসবাবপত্র সরিয়ে দিয়েছে। পি’র মেয়ে দরজায় আমাদের অভ্যর্থনা করতে এল, আমাদের কোট কোথায় ছুঁড়ে ফেলল কে জানে। আমি বউয়ের পাশে ঘেঁষেই রইলাম। প্রোসেকোর প্রথম গ্লাসটা নেবার জন্য দুজনে একসঙ্গেই গেলাম, প্লাস্টিকের প্লেটে কয়েক টুকরো পাউরুটি, চিজ়ের ফালি আর মধু নিলাম। সদ্য বিবাহিত লাজুক যুগলের মত আমরা দুজনে সেঁটে সেঁটে রইলাম।

পি’র ওখানে যাঁরা যাঁরা এসে থাকেন, সেই সব চেনা অচেনা সব মুখই দেখতে পেলাম। আয়োজনটা একটু নতুন ধরণের, কিছু কক্ষ ফাঁকাই পড়ে আছে, তাছাড়া দৃশ্যটা মোটামুটি একই রকম, তা সত্ত্বেও সচরাচর যেভাবে অনায়াসে আমি কথাবার্তার মধ্যে ঢুকে পড়ি, এবারে সেটা পেরে উঠলাম না; সেই ভদ্রমহিলার সন্ধান করতে গিয়ে আমি বেশ বিভ্রান্ত হয়ে পড়লাম। কক্ষের অপর প্রান্তে উনি ওঁর স্বামীর ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে আছেন। এবার আমার দৃষ্টি উনি এড়িয়ে গেলেন না। ভিড়ের ভেতর দিয়ে উনি সরাসরি আমার চোখের দিকে তাকিয়ে রইলেন, না হেসে, না স্থানচ্যুত হয়ে, না ইশারায় কোনো বার্তা দিয়ে, উনি কেবল আমার অস্তিত্বে অবহিত হয়ে রইলেন।

ডিনারের পর নাচের আসর বসল। পি’র বড় ছেলে কোন গান বাজানো হবে সেটা বাছাই করে দিল, আমাদের যুবাবয়সের কিছু অন্তঃসারশূন্য গান। আমি আমার স্ত্রীর সঙ্গে নাচলাম, সেই ভদ্রমহিলা ওঁর বরের সঙ্গে। পি’র বাকি ছেলেমেয়েরা বিরতির সময় পি আর ওর বরের সঙ্গে নাচল। পি প্রথমে আমার বউয়ের সঙ্গে নাচল, তারপর আমার সঙ্গে। ওর নেশার মাত্রাটা একটু বেশি হয়ে গেছে, খালি পা, সম্পূর্ণ অলঙ্কারবিহীন হয়েও আবেগ আর উদ্দীপনায় ঝলমল করছে। তোমাদের দুজনকে আমি খুবই ভালবাসি – আমাকে আর আমার বউকে বলল – তখন আমরা তিনজনে একসঙ্গে নাচছিলাম।

গান মনের সব বাধাবন্ধ দূরে সরিয়ে দিল, মাঝে মাঝে হৃদয় মুচড়ে উঠছিল। মন্ত্রবলে আমরা আবদ্ধ, বন্ধুর বর্তমানের বাঁধন ছিঁড়ে ফেলে শূন্যে ভাসমান হয়ে গেলাম, নতুন করে মনে আশা জেগে উঠল। আমরা – আমরা সকলেই – আমাদের পেছনে ফেলে আসা সময়কে নতুন করে ফিরে পেলাম – যে জীবনধারা এখনও বহমান, অপরিণামদর্শী, ক্ষণস্থায়ী, জমকালো জীবনধারা। পার্শ্ববর্তী মহিলাদের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, তাঁরা যাঁরা প্রবীণাদের দলে নাম না লেখানোর জন্য বদ্ধপরিকর, যাঁরা এখনও নিজেদের সৌন্দর্য ধরে রাখতে পেরেছেন। অথচ দিনে দিনে আমরা আবার তরুণ হয়ে উঠছি না, আমাদের শরীরে বলিরেখা সুস্পষ্ট হয়ে উঠছে, স্বাস্থ্য ভেঙ্গে পড়েছে, হতাশা জমে উঠেছে। সংগীত আমাদের অতীতে ফিরিয়ে নিয়ে গেল – প্রথম চুম্বনের স্মৃতি, প্রথম প্রেম, বিস্মৃত আবেগ, প্রথম মর্মবেদনার অনুভব, নিষ্পত্তি না হওয়া কিন্তু মনে রেশ রেখে যাওয়া কিছু ছোটখাটো ক্ষোভ দূরে সরিয়ে এগিয়ে যাওয়া।

উনি আর আমিও একসাথে নাচলাম, আমরা আমরাই। যন্ত্রণাদায়ক, কিন্তু একই সঙ্গে সাফল্যও বটে। এক মুহূর্তের জন্য হয়ত আমরা চোখে চোখ রেখে তাকিয়েছি, শরীরে শরীরে ঘষা লেগেছে – বিভিন্ন স্থানে – কাঁধে, পেছনে। দুজনেই আমরা নিজের নিজের সংসারে এখনও বাঁধা পড়ে আছি, তবুও অনুভব করতে পারি, তলায় তলায় আমরা দুঃসাহসী হয়ে পড়েছি, চক্রী হয়ে উঠেছি।

বাইরে তখনও ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি হচ্ছিল, কিন্তু বাড়ির ভেতরটা বেশ গুমট, অসহ্য গরম। ঘেমে নেয়ে গেছি। বউকে বললাম যে গায়ে দুয়েক মগ জল জল ঢালতে পারলে বেশ হত। বাথরুমে গিয়ে চোখেমুখে জলের ঝাপটা দিলাম। তারপর রান্নাঘরে একটা গ্লাসের খোঁজে গেলাম। সেখানে দেখলাম একটি জটিল নজরদারি ব্যবস্থাপনা প্রণালী দেওয়ালে লাগানো, যাতে বাড়ির প্রবেশ পথগুলোর ওপর নজর রাখা যায়। ওতে অনেকগুলো ছোট ছোট স্ক্রীন, প্রত্যেকটির দৃষ্টিকোণ ভিন্ন – সম্মুখের প্রবেশদ্বার, উঠোন, বহির্প্রাঙ্গণ। রাতের অন্ধকারে, মুষলধার বৃষ্টিপাতের মধ্যে প্রত্যেকটির ছবিই আমার কাছে অমঙ্গলসূচক আল্ট্রাসাউন্ড তরঙ্গের মত মনে হল, যেন অশুভ কোনো সঙ্কেত দিচ্ছে অথচ পাঠোদ্ধার সম্ভব হচ্ছে না।

ফেরার পর দেখলাম ঘরে আলো জ্বলছে। খালি ঘর, মনে হল একটু আগেই খালি হয়েছে, দেখে কীভাবে যেন ছেলের অ্যাপার্টমেন্টের কথা মনে পড়িয়ে দিল। কেউ আর নাচছে না, সংগীত বন্ধ হয়ে গেছে। আগেকার দিন হলে আমরা হয়ত একটা সংক্ষিপ্ত বিরতি নেবার কথাই ভাবতাম, কিন্তু ইতিমধ্যেই আমাদের দম ফুরিয়ে গেছে।

আমার বউ টেবিলের সামনে বসে। ডেসার্ট খাচ্ছে। আর ওঁর সঙ্গে গল্প করছে। আমাকে ওঁরা দেখতে পাননি। বউ বলছে, “আমরা যখন নাচছিলাম, মনে মনে আপনার নেকলেসটার তারিফ করছিলাম, অসাধারণ নেকলেস। কোথা থেকে কিনলেন, জানতে পারি কি?”

“সুন্দর ছোট্ট একটা দোকানে, আমরা থাকি যেখানে, তার থেকে বেশি দূরে নয়।”

“রোমে আপনাদের দুজনের কতদিন হল?”

“এই বছর তিনেক হল।”

“কর্মসূত্রে এসেছেন?”

“হ্যা, আমার স্বামীর। ও তো আজীবন এখানেই থেকে যেতে চায়।”

“আর আপনি কী চান?”

ভদ্রমহিলা কাঁধ ঝাঁকালেন। “’আজীবন’ কথাটা একটু ভারিই লাগে।”

দুজনে নিজের নিজের পার্স খুলে ফোন বের করে নিলেন। ওখানে সেই মুহূর্তেই ওঁরা পরস্পরের ফোন নম্বর বিনিময় করে দেখা করার জন্য একটি দিন ঠিক করে নিলেন।

আর এখানেই আমার কাহিনি একটি অভাবনীয় মোড় নিল। এই অপরিচিত ব্যক্তিটি, যাঁর সঙ্গে আমার একবারই মাত্র কথোপকথন হয়েছে, দুশ্চিন্তাগ্রস্ত, টুকরো টুকরো কথাবার্তা, এবং যাঁর সঙ্গে সেদিন থেকেই আমি ব্যাখ্যার অতীত একটি বন্ধন অনুভব করে এসেছি, অথচ তাঁর নামটিও জানতে পারেনি, সেই তিনিই আমার স্ত্রীর বন্ধু হয়ে গেলেন। মাসে একবার করে ওঁরা লাঞ্চের জন্য মিলিত হতেন, তারপর একসাথে পোশাক আর জুতো কেনবার ছুতোয় বেরিয়ে পড়তেন। আমার স্ত্রীর সঙ্গে ওঁর একটি সাময়িক এবং অনিয়মিত বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে উঠল। এমন একজন বন্ধু যাঁকে আমার স্ত্রী হয়ত বাড়িতে আমন্ত্রণ জানাবে না, কিংবা আমাদের জীবনচর্যার অঙ্গ করে নেবে না, কিন্তু যাঁর সঙ্গে কখনো-সখনো নিজের ইচ্ছেমত কিছুটা সময় কাটিয়ে নেবে।

এই সখ্যতার খাতিরে আমি কয়েকটা জিনিস জানতে পেরেছিলাম – ওঁর নাম – এল – আর যে অঞ্চলে উনি থাকেন (স্যান জিওভান্নি)। ওঁর স্বামীকে কত ঘন ঘন সফরে যেতে হয়ে – এক শহর থেকে অন্য শহরে যাওয়া আসা – একদিন কথায় কথায় বউ আমাকে বলল। ওঁদের একটি মাত্র পুত্রসন্তান – উঠোনে অসুস্থ হয়ে পড়া সেই ছেলেটি। বউয়ের ধারণা মতই, ছেলেটি পি’র ছেলেদের সঙ্গে একই স্কুলে পড়ে। আগে এল একটি চাকরি করতেন, একটি পত্রিকার সম্পাদনার কাজ, কিন্তু আজকাল উনি অত্যন্ত অধ্যবসায় সহকারে আমাদের ভাষা নিয়ে পড়াশোনা করছেন। একটি বিদেশী মহিলাদের দলে উনি আছেন যাঁরা নিরলসভাবে শহরের অগণ্য স্মৃতিসৌধ, আকর্ষণ আর ধ্বংসাবশেষ দেখার জন্য ঘুরে বেড়ান। এই সব খুঁটিনাটি কথা ছাড়া, আমার স্ত্রী ওর নবলব্ধ বন্ধুত্ব নিয়ে আর একটিও কথা বলেনি।

আমি জানি যে বিবাহবহির্ভূত বন্ধুত্ব কোনো অস্বাভাবিক ব্যাপার নয়, বরং এই ধরণের বন্ধুত্ব গড়ে তোলাকে স্বাস্থ্যের লক্ষণ বলেই মনে করা হয়। এই নয় যে এর মধ্যে কোনো শারীরিক সম্পর্ক থাকতে হবে। তবুও এই বন্ধুত্বের জন্য আমার মন হাহাকার করে। আমার লেখালেখির ওপর এর প্রভাব পড়ে। সময়মত লেখা শেষ করে উঠতে পারি না। ঈর্ষা করতে থাকি আমার স্ত্রীকে।

বউকে হিংসে করলেও আমি ওর প্রতি কৃতজ্ঞবোধও করি। ওঁরা যখন একসাথে কোথাও যান – বেড়াতে কিংবা কোনো শিল্প প্রদর্শনীতে – তখন আমার কথা এল-এর মনেই পড়বে না, এটা হতেই পারে না। আমার কথা, আমাদের সুদীর্ঘ বিবাহিত জীবনে সম্পর্কের নৈমিত্তিক ওঠানামার কথা, বিভিন্ন পুরুষমানুষের সঙ্গে ওর ক্ষণস্থায়ী সম্পর্কের কথা, পুত্রের সঙ্গে আমাদের দুজনের সম্পর্কের টানাপোড়েনের কথা আমার বউ ওঁর কাছে উল্লেখ করেনি, সেটা হতেই পারে না। এর জন্য আমারও যে কিছুটা দায় আছে সেটাও অস্বীকার করা যায় না। বিশ বছরের ওপর বিবাহিত জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে জানি দুজন নারী একত্র হলে কী ধরণের কথা বলেন। হয়ত জুতো কিনতে কিনতে বা স্যালাড খেতে খেতে বা কোনো পেন্টিং-এর তারিফ করতে করতে বন্ধুত্বের জোয়ারে ভেসে গিয়ে ওঁদের মনের মহাফেজ়খানা অর্গলমুক্ত হয়ে সঞ্চিত সমস্ত অনুভূতি বাতাসে ভাসমান হয়ে পড়ে।

কিন্তু আমি মনে মনে কী প্রত্যাশা করছি? এল-এর সঙ্গে বাস্তবেই প্রণয়ের সম্পর্ক স্থাপন? একবার একান্তে সাক্ষাৎ, হোটেলে কয়েক ঘন্টার জন্য বিছানা ভাগাভাগি করা? মনে হয় না। ওঁর সঙ্গে কিছুক্ষণ নাচবার পরেও ওঁর শরীর, ওঁর হাতদুটি নিয়ে কোনও কল্পনা আমার মনে আসেনি। যা আমাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে সেটা হল ওঁর সঙ্গে বাইরের উঠোনে আমার সেই কথোপকথন, যখন উনি উদ্ভ্রান্ত ছিলেন, ছেলের জন্য দুশ্চিন্তায় অসুস্থ বোধ করছিলেন, যখন আমার কাছে ওঁর মন খুলে দিয়েছিলেন। কোনোরকম কামোত্তেজনাকে ছাপিয়ে গিয়ে সেই বিশেষ মুহূর্তটিই আমাকে উত্তেজিত করে তুলেছে। আমরা কী এমন জিনিস ভাগাভাগি করে নিয়েছি? একটি আবেগাপ্লুত নিবিড় ব্যতিহার, বুদ্ধিতে যার ব্যাখ্যা মেলে না। আর এই মুহূর্তে আমার স্ত্রীকে আমরা ভাগাভাগি করে নিচ্ছি।

বসন্তকাল খুব তাড়াতাড়ি বিদায় নিল, কোনো রেশ না রেখেই। আমি নিষ্পৃহ হয়েই রইলাম, সতর্কও, নতুন কোনো অগ্রগতির প্রতীক্ষায় রইলাম – ডিনারে যাওয়া, বা সন্ধেবেলা নাটক দেখতে যাওয়ার পরিকল্পনা – এল এবং ওঁর স্বামীর সঙ্গে একসাথে। তবে আসলে আমি শীতের অপেক্ষায় ছিলাম, আর পি’র পরের পার্টির অপেক্ষায়, যদিও সেই সব উচ্ছল উপলক্ষ, সেই সব বন্ধুত্বপূর্ণ বিকেলগুলো, যা আমার এত প্রিয় ছিল – আমি এখন স্পষ্ট বুঝতে পেরে গেছি – বিকৃত হয়ে উঠেছে।

কিন্তু সেই বছর গ্রীষ্মের শেষের দিকে পি সহসা আবার প্রচলিত চিত্রনাট্যে বদল ঘটাল। আমার স্ত্রী আর আমি সবে ছুটি কাটিয়ে ফিরেছি, আমাদের সাঁতারের পোশাক, তোয়ালে, চপ্পল তুলে রেখে দিয়েছি। নিজের কথা বলি। আমি একটি সুস্থির ভরসা জাগানো ঝলমলে হেমন্তের প্রতীক্ষায় ছিলাম – ট্রাটোরিতে৩ গিয়ে পন্টারেল৪-এর আস্বাদ নেওয়া, স্টারলিং পাখির ঝাঁকের আকাশে ভাসতে ভাসতে এসে ঘূর্ণিবায়ুর মত, ফিতের মত কিংবা ছাইরঙা বিশাল ব্যাঙাচির মত মুহূর্তে মিলিয়ে যাওয়া। ঠিক সেই সময়েই পি শেষ মুহূর্তে ওদের সঙ্গে সেই দ্বীপে – যেখানে ওরা মাস দুয়েকের জন্য প্রতি বছর ছুটি কাটাতে যায় – বেড়াতে যাবার আহ্বান জানিয়ে বসল। সাগরমুখী একটা ফাঁকা বাংলো ওর হাতে এসেছে – যাঁরা সচরাচর আসেন, তাঁরা আসছেন না – আমার লেখালেখির জন্য নাকি আদর্শ পরিবেশ। বউয়ের কাছে ও জানতে পেরেছে যে আমার লেখালেখিতে ইদানিং একটা মন্দা চলছে।

“জানো তো, আমারও যেতে কোনো আপত্তি নেই, ছোটবেলার সেই ভয়টা এতদিনে কাটিয়ে উঠতে পেরেছি,” যে হতভাগ্য এক দশক আগে পুলের জলে ডুবে মৃত্যুবরণ করেছিলেন, তাঁর প্রসঙ্গ টেনে এনে আমার স্ত্রী ঘোষণা করল।

এবারের গরমটাও খুবই ভ্যাপসা আকার ধারণ করেছে। তাছাড়া বউ বা আমার এখানে থেকে নিজের অ্যাপার্টমেন্টেই চক্কর লাগানো ছাড়া কিছু করার নেই, তাই আবার আমরা স্যুটকেস গুছিয়ে নিয়ে জাহাজঘাটে গিয়ে একটা জাহাজে চড়ে বসলাম। দ্বীপটা সমুদ্রের দিকশূন্যপুরের মাঝামাঝি কোনো জায়গায় বড় একটা পাথরের চাঁই, অনেকটা পি’র বাড়ির মতই।

প্রথমে বেশ কয়েকদিন আমরা সকালে বেলার দিকে অনেকক্ষণ ধরে সাঁতার কাটা, হালকা এবং সুস্বাদু লাঞ্চ খাওয়া আর লাইটহাউসের ধার ঘেঁষে সূর্যাস্তের সময় পদচারণা করা ছাড়া আর কিছুই করলাম না। কাচের মত স্বচ্ছ জল, গাঢ় রঙের সামুদ্রিক আর্চিনে ভরা। দ্বীপের দু’প্রান্ত সুন্দর একটা সড়ক দিয়ে জোড়া, তবে কোনো কোনো জায়গায় পাথরে ফাটল রয়েছে, সেই সব জায়গায় সাবাধান থাকা দরকার। পি বলছিল, বরের ছবি নিতে গিয়ে একবার নাকি একজন ভদ্রমহিলার পড়ে গিয়ে পঞ্চত্ব প্রাপ্তি ঘটেছিল। একটা রবারের নৌকায় বসে আমরা সেই দ্বীপের আশেপাশে ভেসে বেড়াতে লাগলাম, ছাদে বসে বেক করা মাছ খেতাম আর মশা তাড়ানোর জন্য প্যাঁচানো ধূপ আর সিট্রোনেলার মোমবাতি জ্বালিয়ে রাখতাম।

মুদিখানার জিনিস কেনবার জন্য পি আর আমার বউ প্রতিদিনই নৌকা নিয়ে বের হত, লাঞ্চের আগে কিংবা পরে। পরনে থাকত জমকালো লিনেনের পোশাক, প্রতিদিনই কিছু না কিছু বাড়তি জিনিসপত্র নিয়ে ফিরত – পটু হাতে বানানো কর্কের ব্রেসলেট, লবণগন্ধী সুগন্ধী, সিলিকোনের তৈরি বিভিন্ন রঙের বাসনকোসন। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দুজনে রান্নাবান্না করত, বিয়ে, সন্তানাদি হওয়ার আগে, অ্যাপার্টমেন্ট ভাগাভাগি করে থাকার মধুর দিনের স্মৃতিচারণ করতে করতে। সপ্তাহান্তে পি’র স্বামী চলে আসতেন, তারপর আবার কর্মক্ষেত্রে ফিরে যেতেন। বাচ্চারা সারাদিন ধরে পিং-পং খেলত বা বীচের ধারে ছোটাছুটি করত। মাঝে মাঝে স্যুইমিং পুলের জলে দুঃসাহসী ঝাঁপ দেবার চেষ্টা করত কিংবা একা একাই কোনও গোপন জায়গার উদ্দেশ্যে পাড়ি লাগাত।

আমাদের বাংলোটা খুবই সুন্দর, একেবারে ছবির মত, ভেতরে আলো একটু কম, কিন্তু বেশ হাওয়াদার। পি’র একজন কাকার ওই বাংলোটা, উনিও একজন লেখক, ওখানে আমি বেশ কিছু পুরনো, সর্বজনপ্রিয় বইয়ের সন্ধান পেলাম, পেন্সিল দিয়ে দাগানো। জায়গাটা বেশ আরামদায়ক, বেশ পুরুষালি একটা অনুভব, বাস্তবিকই একটি মাত্র কক্ষ, রান্নাঘরের বালাই নেই আর একটা চৌকো সমুদ্রমুখী জানলা, পাল্লাগুলো কাবার্ডের দরজার মত খুলে যায়। আসবাবপত্র কোনোদিনই বদলানো হয়নি – নরম রঙচটা আরাম কেদারা, গাঢ় রঙের চকচকে কাঠের, ছাতাপড়া গন্ধ, সময়ের প্রবাহ স্থির হয়ে আছে।

ভেতরে পা দেওয়া মাত্রই আমার ভাল লেগেছে; চওড়া জায়গা দেখে মন চনমনে হয়ে উঠল, পি’র বাড়িতে গেলে যেরকম অনুভূতি হয়, ঠিক সেরকম, তবে এখানে পার্টির ব্যাপারটা নেই। জায়গাটা এমনই যে এখানে সেঁধিয়ে গিয়ে আমি একাগ্র হতে পারব। আমি ভাবতে লাগলাম, একটু বিরক্ত মনেই – এরকম একটা জায়গা আমাদের থাকলে বেশ হত, লেখালেখির চমৎকার পরিবেশ, বউ যদি এই দ্বীপে ঘুরতে আসাটা এড়িয়ে না যেত, যদি আগে আমাকে এখানে নিয়ে আসত। আগে হলে, আমাদের পুত্রেরও এই জায়গা ভাল লাগত, এখন অবশ্য ও আর ওর বান্ধবী এখানে থাকতে পারত না, দুটিই মাত্র সোফা, মুখোমুখি, পালঙ্ক বানিয়ে নেওয়া যায় – দুটি আলাদা একক, একটি আমার আর অন্যটি আমার বউয়ের জন্য।

আমরা একটু গুছিয়ে নেবার পরেই, আমার লেখালেখির গতি বেড়ে গেল, দেওয়ালের সামনের ছোট্ট ডেস্কে মাথা গুঁজে কিংবা সোফা-পালঙ্কে চিত হয়ে শুয়ে। পি আর বউয়ের সঙ্গে লাঞ্চ করতে গেলাম না, তার বদলে তিনটে নাগাদ কাছের একটা স্ন্যাকের দোকান থেকে একটা স্যান্ডউইচ নিয়ে নিলাম, মন তৎপর হয়ে উঠেছে। গ্রীষ্মে আমাদের এই দ্বিতীয় অবকাশটা আমার খুব মনে ধরেছে, এই দ্বীপ আমাকে যেভাবে অনুপ্রাণিত করছে, ছিমছাম আর আরামদায়ক বাংলো – সব কিছু মিলিয়ে।

ঘূর্ণিঝড় এসে আছড়ে পড়ল, যেমন আশঙ্কা করা হয়েছিল – তিনদিন ধরে লাগাতার ঝড়, কানে তালা লেগে যাবার মত ঝাপটা। ঝড় যেদিন প্রথম এল, আমি এল’কে নিয়ে একটা ছোটগল্প শুরু করলাম, পি’র বাড়ির প্রেক্ষাপটে। নিজের উদ্ভাবিত সংস্করণে ঘটনাবলী অপেক্ষাকৃত প্রত্যাশিত পথ ধরেই এগোলো – এখানে ওর আর আমার মধ্যে বাস্তবেই একটি পরকীয়া প্রেম গড়ে উঠল। সাদা ফেনার মত সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ তটে এসে আছড়ে পড়ছে, সেদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে বহির্প্রাঙ্গণে আমাদের মধ্যে যে কথাবার্তা হয়েছিল, সেগুলো মনে করলাম – আমার নকল বর্ণনায় আমরা অবিলম্বে পরস্পরকে চুম্বন করে ফেললাম – গল্পটাকে ফেনিয়ে তোলার জন্য নানারকম ফন্দি হাতড়াতে লাগলাম। আমরা যেখানে একসঙ্গে নাচলাম সেই দৃশ্যটাও কাহিনিতে ঢুকিয়ে দিলাম, এবং আমাদের যুগল নৃত্যের দৃশ্যটাও – তারপর মনে হল কাহিনির প্লট একটা সঙ্কটজনক মুহূর্তে এসে দাঁড়িয়েছে – আর এল-এর সঙ্গে আমার বউয়ের বন্ধুত্বের কথাটা বাদই দিয়ে দিলাম, এই অদ্ভুত সংযোগের ফলে ব্যাপারটা আমার হাতের বাইরে যেতে বসেছিল। ঘটনাগুলোকে আমি এমনভাবে ঘষামাজা করে নিলাম যাতে একটি মর্মস্পর্শী কাহিনীর হালকা আদল থাকে, সাহিত্য পত্রিকারা যে ধরণের গল্প নিয়ে থাকে। এখন আমার প্রয়োজন একটি সমাপ্তি, একটি মহান পরিসমাপ্তি।

এক সকালে ঠিক করলাম সাঁতার কাটতে যাব – লিখতে বসার আগে মাথাটা একটু সাফ করে নেওয়া দরকার। ঘূর্ণিঝড় সদ্য সরে গেছে, জল আবার আগের মতই কাচের চাদর। একটি ছোট সুরক্ষিত খাঁড়ি থেকে জলে নেমে প্রথমে জেলিফিশের সন্ধান করলাম। আমার গন্তব্য লাল রঙের একটি বয়া, সমুদ্রের সুন্দর একফালি সবুজ ধরে সেদিকে সাঁতরে গেলাম, এক ঝাঁক মাছের পাশ কাটিয়ে। সবুজের ঐ ফালির মাঝামাঝি পৌঁছে দেখতে পেলাম একটা মোটরবোট আমার দিকেই ছুটে আসছে। থেমে গিয়ে আমি হাত নাড়লাম, কিন্তু নৌকাটা এগিয়ে আসতে লাগল। চেঁচালাম না, কারণ চেঁচানোটা বৃথা হবে। এত দূরে সব রকম আওয়াজই সমুদ্রের নীরবতার মধ্যেই তলিয়ে যাবে। আমার গতি মন্থর হয়ে গেল, দুর্বল মনে হচ্ছিল নিজেকে, ভয়ও পেয়েছিলাম, কোনোরকমে ওটার আগমন পথ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে পাড়ে ফিরে এলাম।

ঘরে ফিরলাম, ক্লান্ত, শুকনো মুখে, বিস্ময়ের ভাবটা কাটিয়ে উঠতে পারিনি তখনো। স্ত্রীকে ওখানে পেলাম না, পি’র বাড়িও ফাঁকা। টেবিলের ওপর একটা চিরকুট – মুদিখানার জিনিস আনতে বেরিয়েছি, পরে দেখা হবে। মাথা ঘুরছিল। মনে হল এক গ্লাস তাজা কমলার রস খাওয়া দরকার। স্ন্যাক-বারে গিয়ে পি’র এক পুত্রের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল, ওর তেরো বছর বয়সি পুত্রের সঙ্গে।

“কেমন লাগছে, সব ঠিকঠাক আছে তো?” ও জিগ্যেস করল।

“একটা নৌকো, আর একটু হলেই আমাকে ধাক্কা মেরে দিত।”

“একা একা সাঁতার কাটছিলেন নাকি?”

“হুঁ, একাই কাটছিলাম।”

“পাড়ের কাছাকাছি থাকাটাই বোধহয় ভাল।”

“তোমাদের কী খবর? খুব ফুর্তি করছ?”

“একটু একঘেয়ে হয়ে গেছে। পরের বছর আমার ইচ্ছে অন্য কোথাও যাবার, কিন্তু মা যে কেবল এখানেই আসতে চায়।”

“হাল ছেড়ে দিও না কিন্তু।”

“আজ অন্তত আমার একজন বন্ধু আসছে, সন্ধেবেলা।”

“তাই বুঝি? কোন বন্ধু?”

“ওই যে বিদেশি ছেলেটা, আমরা একসাথে স্কুলে যাই। বাবা-মায়ের সঙ্গে ও নৌকো করে ঘুরতে বেরিয়েছে, ওর বাবা সত্যিই খুব ভাল নাও বাইতে পারেন। আজ এই দ্বীপে নামবে ওরা, আমাদের সঙ্গে ডিনার করার জন্য থাকবে।”

সূর্য ডোবার সময় হাঁটতে হাঁটতে আমরা জেটিতে গেলাম ওদের অভ্যর্থনা করে আনতে। মোটরবোটটা খুবই সুন্দর। ওরা নৌকার ফেন্ডার৫ নামাচ্ছিল। ওঁর স্বামী হাল ধরে আছেন, ওঁর ছেলে ভিজে কাপড়গুলো টাঙিয়ে দিচ্ছিল, আর এল নৌকার চারপাশে ঘুরে দেখছিলেন। বেশ দ্রুতগতিতেই উনি চলাফেরা করছিলেন আর নোঙর ফেলার কী কী করণীয় সেই ব্যাপারে স্বামীকে নির্দেশ দিচ্ছিলেন। নোঙরের শেকল ধরার জন্য একজোড়া বিশেষ ধরণের দস্তানা পরেছিলেন। কী দক্ষতার সঙ্গে উনি নোঙরের দড়ি খুলছিলেন আর বাঁধছিলেন দেখে আমার তাক লেগে যাচ্ছিল। স্বামী স্ত্রীর মধ্যে বাক্যালাপের আয়াসহীন ভঙ্গি আর সংযমটা লক্ষ্য করলাম।

কাজটা শেষ হতেই, মোটরটা বন্ধ করে ওঁরা আমাদের সম্ভাষণ জানালেন। আমার ত্বকে একটু তামাটে ভাব ধরেছে, ওঁর স্বামীরও তাই। ওঁদের ছেলে বাবা মা দুজনকেই মাথায় ছাড়িয়ে গেছে। এল-এর গাঢ় বর্ণের পেশিবহুল পা দুখানা আর উরুর জড়ুলটা লক্ষ্য করলাম। খালি পা, ঘেমে গেছিলেন, হাওয়ার ঝাপটায় চুল রীতিমত অবিন্যস্ত। উনি চট করে একটা বীচ র‍্যাপার জড়িয়ে নিলেন, আর একজোড়া সুন্দর কিন্তু বহু ব্যবহারে জীর্ণ চপ্পল পরলেন।

আমার খুব ইচ্ছে করছিল তখুনি ওঁকে নিয়ে চুপি চুপি ওই বোটের ক্যাবিনের ভেতর সেঁধিয়ে যেতে। ঘূর্ণীঝড়ের একমুখী জলতরঙ্গের মতই আমার ইচ্ছে করছিল ওঁকে একটি চুম্বন করার, ওঁর লবণাক্ত ত্বকের স্বাদ গ্রহণ করার, অন্য কারোর সঙ্গে ভাগাভাগি না করে আমাদের অন্তরঙ্গতাকে দৃঢ়তর করে ফেলার। কাল্পনিক নির্মাণে ওঁর সঙ্গে আমার একটি পরকীয়া সম্পর্ক গড়ে উঠেছে, যার ফলশ্রুতি হিসেবে আমার এই কামনার অনুভূতি প্রবল আকার নিল। নৌকা থেকে নামার সময় করমর্দন করে আমরা একে অপরকে সম্ভাষণ করলাম, আর উনি যে একটি মাত্র কথা আমার উদ্দেশ্যে বললেন, সেটি হল “সিয়্যাও।”৬

পি’র ছাদে আমরা আসর বসালাম। আমরা পাঁচজন মিলে – পি’র বর পরের দিন ফিরবেন, আর এল-এর ছেলে ওর বন্ধুর সঙ্গে দেখা করার জন্য ছোট্ট বারান্দাটায় দৌড়ল। আমরা ইতালীয় ভাষাতেই কথা বলছিলাম। সযত্ন আয়াসে শিখে এখন এল আর ওঁর স্বামী মোটামুটি স্বচ্ছন্দভাবেই কথা বলতে পারেন। ঝড়ের দাপট মশককূলকে দেশান্তরী করে দিয়েছে। বাতাসে চনমনে আর সতেজ ভাব। আমি বসেছি এল-এর পাশে, টেবিলের মাথার দিকে, পি আর আমার বউ টেবিলের একদিকে, এল আর ওঁর স্বামী ঠিক ওদের মুখোমুখি।

সেদিন রাত্রে আমরা একটু বেশি মাত্রায় মদ্যপান করলাম, এল আমাদের থেকে কমই পান করলেন, কারণ উনি ডাঙ্গাপীড়া অনুভব করছিলেন। ওঁর স্বামী সাম্প্রতিক নির্বাচন নিয়ে বেশ জোরের সঙ্গেই নিজের মতামত ব্যক্ত করলেন, ওঁদের নৌকা অভিযানের গল্প করলেন, ওঁদের পছন্দের দ্বীপ আর খাঁড়ির গল্প করলেন। বললেন, সমুদ্রসফরে অনেক কিছুই ছেড়ে থাকতে হয়, কিন্তু যেটুকু পাওয়া যায় তার পূর্ণ সদ্ব্যবহার হয়।

রাইস স্যালাড দিয়ে শুরু করে আমরা মাছ খেলাম, আর কয়েক ফালি তরমুজ। এল্‌ ফলের প্লেট আর এক বোতল মির্তো আমার দিকে এগিয়ে দিলেন। ভোজন করতে করতে, আকাশের তারা দেখতে দেখতে, সমুদ্রের গর্জন শুনতে শুনতে আমার চোখ বার বার ওঁর ত্বকের নিরাবরণ ত্রিভুজটির ওপর চলে যাচ্ছিল, কণ্ঠার হাড় আর স্কন্ধের সন্ধিস্থলে উদ্ভুত অসামান্য নিটোল মেদগুচ্ছটি। সেই সময়েই আমি একটি খবর পেলাম। মাসখানেকের মধ্যেই ওঁরা নিজেদের দেশে ফিরে যাচ্ছেন, ওঁদের ইতালির মেয়াদ সম্পূর্ণ হয়েছে। খুবই যুক্তিসঙ্গত কারণ দেখালেন – লাগাতার ভ্রমণ করতে করতে ওঁর স্বামী ক্লান্তিবোধ করছেন, ওঁদের পুত্র উচ্চতর বিদ্যালয়ের পড়াশোনা আরম্ভ করার মুখে, আর এল-ও নাকি নিজের কর্মজীবনটির অভাব বোধ করছেন – এখানে এসে থাকার জন্য যে জীবন ওঁকে পরিত্যাগ করে আসতে হয়েছে। চলে যাবার কথা ভেবে ওঁদের মন খারাপ হয়ে যাচ্ছে, কিছু কিছু জিনিস ছেড়ে যেতে হবে, তাই কিছুটা উদাস, কিন্তু আগেকার জীবনে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্তে ওঁদের পারিবারিক ভারসাম্যটা আবার ফিরে পেয়েছেন, ত্রিশঙ্কু হয়ে ঝুলে থাকার যে ভয়াবহ অনুভূতি তার থেকেও রেহাই মিলেছে।

“খুব সম্ভব নতুন বছরের আশেপাশে আমরা একবার ফিরব। জানুয়ারির শীতের নরম রোদ পোয়ানো হবে, প্যানেটোনি৭ আর প্যান্ডোরোর৮ স্বাদ নেওয়া যাবে, আর বাইরে কোথাও লাঞ্চ করা যাবে।”

“খুব ভাল হবে। তার মানে আমার পার্টিতে তোমাদের পাচ্ছি,” পি বলল।

ওঁদের বিদায় জানাবার জন্য আমরা সবাই একসাথে জেটিতে গেলাম। ডকে পৌঁছে আমরা বিদায় জানালাম। “সিয়্যাও,” আমাকে এল ওই কথাটিরই পুনরুক্তি করলেন – কেবল ওটুকুই – আর সেই বিহ্বলতার মুহূর্তেই আমি এল-কে চুম্বন করলাম, প্রথমে ওঁর গণ্ডদেশে, তারপর আমার মুখ আস্তে আস্তে ওঁর কন্ধার অস্থির কাছের লবণাক্ত ত্বকে নেমে ত্রিভুজাকৃতি পরিসরটিতে এসে থামল। কয়েক সেকেন্ডের জন্য আমি ওখানেই স্থির হয়ে রইলাম, তারপর অত্যন্ত বিব্রত হয়ে মাথা ওঠালাম, বিড়বিড় করে বললাম, “মাফ করবেন।”

উনি অবিলম্বে দু’পা পিছিয়ে গেলেন। হয়ত সেই আগের মতই বিদ্বেষ মেশানো দ্যুতিমান চোখে আমার পানে চেয়েছিলেন, কিন্তু অন্ধকারে ঠিক ঠাহর করতে পারিনি।

প্রত্যেককে আলিঙ্গন করে ধন্যবাদ জানিয়ে, পি আর আমার স্ত্রীর কাছে বিদায় নেবার পর, পরিবারসহ উনি নৌকায় উঠলেন, নির্জন একটি গুহার কাছে ছোট একটা ক্যাবিনে বরের সঙ্গে সারা রাত কাটাবেন। ওই উন্মত্ত চুম্বন আমার বউয়ের নজর এড়িয়ে যায়নি, তাই বাংলোয় প্রবেশ করা মাত্রই গলা চড়িয়ে ভাষণ দিতে শুরু করল, একেবারে ভোরবেলায় গিয়ে থামল।

“তোমাদের দুজনের মধ্যে কোনো ব্যাপার চলছে নাকি?”

“কী ব্যাপার চলবে? আমি ওঁকে ভাল করে চিনিই না!”

“ওরে মূর্খ, ও আমার বন্ধু ছিল।”

“ছিল কেন, এখনও আছেন।”

“সে ব্যাপারে আমার সন্দেহ আছে। এখানে আসার একটাই মাত্র কারণ ছিল, পুরনো একটা মানসিক চাপ থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া, তোমার অসীম কৃপায় নতুন একটা চাপ নিয়ে ফিরতে হবে।”

“আমি দুঃখিত।”

কিন্তু অত সহজে শান্ত হওয়ার পাত্রী আমার বউ নয়। আমাকে লক্ষ্য করে একের পর এক তিক্ষ্ণ বাক্যবাণ হেনে, শেষে কেঁদেই ফেলল, আমার এই সৃজনক্ষম নিভৃতাবাসকে নরকে পরিণত করে।

পরের দিন, নির্দিষ্ট সময়ের আগেই, আমরাও তাড়াহুড়ো করে দ্বীপ ছাড়লাম। পি’কে আমাদের চলে যাওয়া নিয়ে বিশেষ কৈফিয়ত দেবার দরকারও পড়ল না, ওর, এমনকি ওর বাচ্চাদের সামনেই, এল-কে আমি চুম্বন করেছি। ওরা প্রত্যেকেই এই দৃশ্যের সাক্ষী – তাছাড়া, হাওয়ার শনশন আর ঢেউয়ের আছড়ে পড়ার শব্দ ছাপিয়ে রাতভর আমাদের ঝগড়াঝাঁটিও ওরা নিশ্চয়ই শুনতে পেয়েছে। শহরে ফিরে গিয়ে, নিজের বোকামির জন্য নিজেকেই বারংবার ধিক্কার দিয়েছি, লজ্জায় মাটিতে মিশে গিয়েছি, কিন্তু বউ আর কখনোই কথাটা তোলেনি। অল্প দিনের ভেতরেই এই অপ্রীতিকর অনুভূতি ফিকে হয়ে এল।

আমাদের গতানুগতি জীবনযাত্রায় আমরা আবার ফিরে এলাম, যদিও বেশ কয়েক মাস কক্ষচ্যুত হয়েছিলাম। ছোটগল্পটা বাতিল করে দিলাম – উপলব্ধি করলাম ওই পৃষ্ঠাগুলো লোভ দেখিয়ে আমাকে তটের কিনারায় ঠেলে দিচ্ছে। এল-এর সঙ্গে আমার যা হয়েছিল তাকে ক্ষণিকের একটা মোহ বলা যেতে পারে, এর বেশি কিছু নয়। কিন্তু ক্ষণেকের জন্য হলেও আমার অলঙ্কৃত কল্পনা বাস্তবের সঙ্গে একাকার হয়ে গেছিল – ফলে আমার স্ত্রীকে এমন আঘাত দিয়েছিলাম, অপমান করেছিলাম যা আমার স্ত্রী দীর্ঘ বিবাহিত জীবনে, ওর অনেক অনুক্ত আচরণ সত্ত্বেও আমাকে কখনও করেনি।

বড়দিনের আগেই ঠিকই করে নিয়েছিলাম, সেই শীতে পি’র পার্টিতে আমি যাব না। ঘটনাচক্রে হয়ত এল আর ওঁর পরিবার শহরেই থাকতে পারেন, তাই আমি আমার কৈফিয়ত তৈরি করেই রাখলাম। কিন্তু বড়দিনের ঠিক আগেই, পি আবার অসুস্থ হয়ে পড়ল। খুব দ্রুত ওর স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটছিল। যে ডাক্তার একবার ওঁর প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন, তিনিই জানালেন যে কিছুই আর করার নেই।

এর অল্প দিনের মধ্যেই আমাকে ওর শেষকৃত্যে হাজির হতে হল, তারপর ওর বাড়িতে গেলাম, যেখানে বহুবার আমরা পি’র স্বাস্থ্যকামনা করতে এসেছি। আবারো এসেছি, দিনটা উজ্জ্বল আর স্নিগ্ধ। শনিবারের একটা বিকেল, পি’র জন্মদিনের কয়েক সপ্তাহ আগেই, আগেকার সেই সব পার্টির অতিথিরাই এসেছেন, পি’র সমস্ত ঘনিষ্ঠতম বন্ধুবান্ধবরা।

আমার স্ত্রী একেবারে ভেঙ্গে পড়েছে, বলতে গেলে ও ওর বোনকেই হারাল। বাড়িতে ঢোকার মুখে আমরা হাত ধরাধরি করে নিলাম। প্রত্যেক মহিলার পরনেই কালো পোশাক, শোকে পাথর হয়ে গেছেন। পি’র ছেলেমেয়েরা – এই গরমে দ্বীপে ওদের কত হাসিখুশি দেখেছি – সার বেঁধে একটা ঘরে দাঁড়িয়ে। আমার বউ জড়িয়ে ধরতেই একেবারে ছোটটা কাঁদতে আরম্ভ করল।

“পার্টিটা ওর প্রাণ ছিল,” পি’র বর আমাকে বললেন, “বছরে এই দিনটার জন্য উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করে থাকত।

“আমিও তো তাই থাকতাম,” বললাম।

আমাদের কথা পি’কে ঘিরেই চলতে লাগল। ব্যক্তি হিসেবে, একজন মহিলা হিসেবে পি কত স্বতন্ত্র ছিল, কত দীপ্তিমতি ছিল, আমাদের সবাইকে একসাথে ধরে রাখবার ক্ষমতা রাখত। হাজার বার নিজে উঠে গিয়ে দরজা খুলত, যাতে ওর ঘর ভরে যায়, সকলে মিলে হৈচৈ করা যায়।

পি’র আর ওর আতিথেয়তার অভাববোধটা ছাড়া বাকি ব্যাপারটা একই রকম রয়েছে। শেষকৃত্যের আয়োজনকেও এক ধরণের পার্টিই বলা যায়। একটু পরেই বাচ্চারা উঠোনে গিয়ে খেলাধুলোয় মেতে গেল। প্রচুর জানলা দেওয়া ঘরের বিশাল উপবৃত্তাকার টেবিলে খাবার ঢাকা দেওয়া আছে, চেয়ারগুলো দেওয়ালের দিকে সরিয়ে সারি বেঁধে রাখা, যাতে অতিথিদের চলাফেরায় অসুবিধে না হয়।

খাবার খেলাম, গল্প করলাম। কিন্তু একটি মৃত্যুর পরিপ্রেক্ষিতে শ্বাস নিতে বা নিজের ছায়ার দিকে তাকাতেও মনকে বিকল হয়ে যায়। সব কিছুই কিছুদিনের জন্য অসঙ্গত লাগে, অশোভন লাগে।

এই বাড়িতে এটাই আমাদের শেষবারের মত আসা। এই বাড়ি বিক্রির বন্দোবস্ত করা হয়ে গেছে। পি’র স্বামী, ওর বাচ্চারা এই বাড়িতে আর থাকবার কথা ভাবতেই পারছে না।

এল ওখানে আসেননি। আমি অবাক হইনি। একজন প্রান্তিক চরিত্র হিসেবে, অনিয়মিত অতিথি হিসেবে, শেষকৃত্যে ওঁকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। ওঁর শ্রেণীর খুব অল্প কয়েকজনকেই দেখতে পেলাম, যাঁরা অন্য ভাষায় কথা বলেন, যাঁরা আমাদের জীবনে অল্প কিছুদিনের জন্য এসেই আবার মিলিয়ে যান। ঠিক পি’র মতই – আমাদের মধ্যে যা কিছুই ঘটে থাকুক না কেন – সেই অচলাবস্থা, সেই অসফল প্রয়াস, আমারই নির্বুদ্ধিতার জন্য – সেটির অস্তিত্ব লোপ পেয়ে গেল।

অভিযোগ করা আমার সাজে না। পি’কে – যার কাছে এই লেখনীর জন্য আমি ঋণী – এই কাহিনির পরিসর ছেড়ে আমার মত ওকে আর অন্য কোথাও যেতে হবে না। ছেলেমেয়েদের সঙ্গে দেখা করতে ওকে কখনোই অন্য দেশে পাড়ি জমাতে হবে না, দূরত্ব বা দিন কেটে যাওয়া নিয়ে হাহাকার করতে হবে না – সেই সব নির্মম স্বয়ংক্রিয় চক্রান্তের উপকরণ যা আমাদের এগিয়ে নিয়ে যায় এবং পুরোপুরি বিহ্বল করে ফেলে। কিন্তু ওর দেওয়া পার্টিগুলো চিরকালের জন্য আমার মনে গেঁথে গেছে, সেই সব পার্টির কথা ভেবে এখনও আমি উত্তেজনা বোধ করি – নির্জন প্রান্তে একটি বাড়ি, লোকারণ্য, সূর্যালোকে উজ্জ্বল লন, সেই কয়েক ঘন্টার জন্য নিরুপদ্রব নির্লিপ্ততা। এমন একটি পরিবেশ যেটি আমি সযত্নে লালন করে এসেছি, একটি সম্ভাবনাময় সূচনা যাকে পরিণতির দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছি, যেখানে খুব স্বল্প সময়ের জন্য আমি একজন বিপথগামী স্বামী, একজন প্রত্যাদিষ্ট লেখক এবং একজন সুখী মানুষ হয়ে উঠেছিলাম ।

টীকা

১ প্রোসেকা – উত্তর-পূর্ব ইতালির ভেনেতো অঞ্চলের স্পার্কলিং হোয়াইট ওয়াইন।

২ ব্রেস – হাসি কিংবা দাঁতের সারিবদ্ধতা ঠিক করার জন্য এক ধরণের বন্ধনী।

৩ ট্র্যাটোরি – এক ধরণের ইতালীয় রেস্তোরাঁ

৪ পন্টারেল – তিক্তস্বাদযুক্ত এক ধরণের উদ্ভিদ; ইতালিতে স্যালাডে কিংবা সবজি হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

৫ ফেন্ডার – আঘাত থেকে বাঁচানোর জন্য হাওয়া ভর্তি বল বা ওই ধরণের কোনো জিনিস।

৬ সিয়্যাও – ইতালীয় ভাষায় ‘ওহে” সম্বোধন অনেকটা ইংরেজির ‘হাই’ কিংবা ‘হ্যালোর’ মত।

৭ প্যানেটোনি – এক ধরণের ইতালীয় ফ্রুট ব্রেড। বড়দিনের মরশুমে পাওয়া যায়।

৮ প্যান্ডোরা – প্যানেটোনির মতই এক ধরণের ইতালীয় ব্রেড যা বড়দিনের মরশুমে পাওয়া যায়।


লেখক পরিচিতি:

নীলাঞ্জনা সুদেষ্ণা “ঝুম্পা” লাহিড়ী (জন্ম – ১১ জুলাই ১৯৬৭) ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন লেখিকা। ওঁর ছোটগল্পের প্রথম সংকলন “Interpreter of Maladies” (১৯৯৯)’র জন্য পুলিৎজ়ার প্রাইজ় পান। ওঁর প্রথম উপন্যাস “The Namesake” (২০০৩) ওই নামেই একটি চলচিত্রে রূপায়িত হয়। ২০০৮ সালে প্রকাশিত “Unaccustomed Earth” Frank O’Connor International Short Story Award লাভ করে। ওঁর দ্বিতীয় উপন্যাস “The Lowland” (2013) Man Booker Prize এবং National Book Award For Fiction – এর চূড়ান্ত তালিকায় স্থান পায়। ২০১৫ সালে শ্রীমতি লাহিড়ী এই বইটির জন্য DSC Prize for Literature লাভ করেন।

২০১১ সাল থেকে শ্রীমতি লাহিড়ী ইতালির রোম শহরে বসবাস করতে শুরু করেন। এখানে আসার পর তাঁর দুটি প্রবন্ধের বই প্রকাশিত হয় এবং ২০১৮ সালে তাঁর ইতালিয়ান ভাষায় লেখা প্রথম উপন্যাস “Dove mi Trovo” প্রকাশিত হয়।

২০১৪ সালে তিনি National Humanities পদক লাভ করেন। বর্তমানে তিনি ইংরেজি সাহিত্যের মিলিসেন্ট সি ম্যাকিন্টশ অধ্যাপক এবং কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্নার্ড কলেজের সৃজনশীল সাহিত্য বিভাগের ডিরেক্টর।

উপরের ছোটগল্পটি ইতালিয়ান ভাষায় লেখা। ইতালিয়ান থেকে ইংরেজি অনুবাদ করেছেন টড পোর্টনউইটজ়।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

2 মন্তব্যসমূহ

  1. 'Ciao' উচ্চারণ 'চাও'। গল্পটিতে ভুল লেখা হয়েছে, 'সিয়্যাও' হবে না। গুগুল ট্রান্সলেট বা সিম্পলি গুগলে গিয়ে যে কোনও শব্দ টাইপ করে উচ্চারণ জানতে চাইলে পেয়ে যাবেন। আমি বেশ কিছুদিন ইতালিতে থাকার সুবাদে ভাষাটা কিছুটা শিখেছিলাম।

    গল্পটির ভাষান্তর ভাল লাগলো, বেশ ঝরঝরে। ধন্যবাদ।

    উত্তরমুছুন
  2. অনেক ধন্যবাদ। পাণ্ডুলিপিতে সংশোধন করে নেব। আপনার নামটি জানতে পারলে আনন্দ পেতাম।

    উত্তরমুছুন