বেন ওকরি'র গল্প : অশুভ পূর্ণতা


ভাষান্তর : ঋতো আহমেদ

ছোট বেলায় সবসময় সে চেয়েছিল তার একটা পুতুলঘর হবে। তাই একটু বড় হতেই হায়াসিন্থ তার বাবা-মাকে জানালো তার আব্দার। তবে তার মা ছিলেন দ্বিধাগ্রস্থ। ভেবেছিলেন বাস্তব জীবন থেকে তাঁর মেয়ে হয়তো পথভ্রষ্ট হয়ে যাবে। আর তার বাবা ভাবলেন এই ঘর তাঁর মেয়ের জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষামূলক হয়ে উঠতে পারে। এইরকম মনে হওয়ার কারণও ছিল। তিনিও একবার এরকম এক পুতুলঘর করেছিলেন।

তিনি চাইলেন এবার বিশালাকার করে গড়ে তুলবেন, ঠিক তাদের বেকার স্ট্রিটের বাড়িটির মতো। সুনির্দিষ্ট ওই কাজের জন্য একজন পৈশাচিক আর্কিটেক্ট প্রয়োজন হয় তাঁর। কাজ শেষ হওয়ার পর দেখলেন ঘরটি একদম নিখুঁত প্রতিলিপি হিসেবে তৈরি হয়েছে। আর হায়াসিন্থ তো এতোটাই মুগ্ধ হয়েছিল যে প্রায় ঘণ্টাখানেক সময় নিয়ে পুরো ঘর ঘুরে ঘুরে মিলিয়ে নিচ্ছিল তাদের আসল ঘরের সঙ্গে।

পুতুলঘরটি তাদের আসল ঘরের মতো করে সাজাতে সে সমস্ত সময় ব্যয় করছিল। সে তার কল্পনার মতো সাজাচ্ছিল। একটি কামরায় তো সে ঘুমিয়ে জেগে উঠেছিল। অন্য আরেকটি ঘরে ছিল তার মা-বাবা। রান্নাঘর ছিল নিচে আর সারভেন্ট রুম তার পেছনে। ঠিক যেমনটি ছিল তার কল্পনাতে।

তার কাছে মনে হলো পুতুলঘরে যা ঘটছে তার জাদুকরী প্রভাব পড়ছে তাদের আসল বাড়িতেও। যখন সে ভাবলো পুতুলঘরের কেউ অসুস্থ হোক, তখন তার আসল বাড়িতেও সে আসুস্থ হলো।

এইরকম খেলায় সে মেতে থাকলো। একসময় সে কল্পনা করলো তাদের বাড়িতে কেউ বেড়াতে এসেছে। লোকটিকে পাথর আর জাদুর প্রদীপের ব্যবসায়ী ভেবে নিল সে, যেমনটা একটা বইয়ে পড়েছিল। এর ঠিক সপ্তাহখানেক পর সত্যি সত্যি এ’রকম এক লোক এসে হাজির তাদের আসল বাড়ির দরজায়; কড়া নাড়ছে। গ্যাসলাইটের আলোয় দাঁড়িয়েছিল লোকটা, নীল পাথরের ব্যবসায়ী। কাজের লোকেরা তাকে তাড়িয়ে দিচ্ছিল প্রায়, তখন হায়াসিন্থ বাবাকে অনুরোধ করলো লোকটাকে ঢুকতে দিতে। অপরিচিত লোকটি ছিল পাগড়ী পরা, তীক্ষ্ণ দৃষ্টির অধিকারী। সিল্ক রোডে হাঁটতে হাঁটতে, কাজাখস্তান থেকে এসেছিল। লিভিং রুমে ঢুকে পুতুলঘরটিকে দেখতে পেয়ে বললো, ‘ঠিক আমার স্বপ্নের মতো।’

বাবা বললেন, ‘কী বললেন বুঝিনি?’

‘এইরকম একটা ঘরের স্বপ্ন ছিল আমার।’

‘আপনি কি পুতুলঘরের কথা বলছেন?’

‘আপনার মেয়ে আমাকে ডেকে এনেছে এখানে। তাই এসেছি। কি চাও তুমি আমার কাছে বাছা?’

‘আপনি কি ছোট ঘরটিকে জীবন্ত করে দিতে পারেন?’ হায়াসিন্থ বললো।

লোকটি হঠাৎ খর দৃষ্টি হানলো হায়াসিন্থের দিকে। আর

‘ছোট্ট ঘর জীবন্ত হও!’ এই কথা বলতে বলতে সে একটা নীল পাথর রাখলো হায়াসিন্থের হাতে।

কিন্তু বাবা সেটা বাধা দেবার আগেই লোকটি উধাউ হয়ে গেল।

তারপর থেকে পুতুলঘরটিতে অদ্ভুত সব কাণ্ড ঘটতে লাগলো। ছোট ছোট প্রাণীরা এসে সেই ঘরের আলোকিত জানালায় বসতো আর বিরক্ত করতো। হায়াসিন্থ ছোট্ট সেই ঘরে ভৌতিক ফিসফিস শুনতে পেতো আর তার চোখ ক্লান্তিতে লাল হয়ে উঠতো। রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়ার পরও সে নিচে থাকতো অনেকক্ষণ, আর ওখানকার নিঃশব্দ ঘটনাগুলো তীক্ষ্ণ মনোযোগে লক্ষ্য করতো। প্রায় তাকে ঘরটির সামনে ঘুমন্ত অবস্থায় পাওয়া যেত, পরে তাকে সেভাবেই, না-জাগিয়ে, বিছানায় শুইয়ে দেয়া হতো। ধীরে ধীরে সে ঘুমের মধ্যে হাঁটতে লাগলো পুতুল ঘরে, ঘুমের মধ্যেই চুপিচুপি নিচে চলে যেতে লাগলো, যেখানে ছিল সত্যিকার জীবন।

স্বপ্নে সে ছিল ওই ঘরের মালকিন। সে এক গাদা চাকরের উপর হুকুম চালাত। একবার স্বপ্নে দেখলো তার বাবা জেলে। আরেকবার দেখলো তার মা গ্রামে নির্বাসিত। এইসব দেখে আতঙ্কে ঘুম ভাঙত তার। এর কয়েকদিনের মধ্যে অর্থ কেলেঙ্কারি মামলায় গোমস্তারা এসে তার বাবাকে ধরে নিয়ে গেল। গ্রামে গিয়ে তার মা এক রাইডিং ট্রিপে ঘোড়া থেকে পড়ে পায়ের গোড়ালি ভেঙে গেল। সেখানে তাকে বেশ কয়েক সপ্তাহ বিছানায় পড়ে থাকতে হয়।

পুরো বাড়িতে হায়াসিন্থ তখন একা। একবারও মনে হয়নি যে এইসব ঘটনায় পুতুলঘরের কোনও ভূমিকা থাকতে পারে। এখন সত্যি সত্যি এই বাড়ির মালকিন সে একা। এইভাবে সে ওই অদৃশ্য ক্ষমতার কাছে নিজেকে সমর্পণ করে, আর তার চরিত্র বদলে যায়। সে স্ম্রাজ্যবাদী হয়ে ওঠে।

তারপর কোনও এক রাতে ওইসব অদৃশ্য প্রাণীগুলো তাদের আসল বাড়িটাকে দখল করে নেয়। সে দেখতে পায় ছোট্ট ঘরটি ভরে গেছে। ভয়ে সে চিৎকার করে উঠলো। কিন্তু কেউ তার কথা বিশ্বাস করলো না। সে পাগলের মতো হয়ে গেল আর চাকররা তাকে তার ঘরে তালা দিয়ে আবদ্ধ করে রাখলো যতক্ষণ না ডাক্তার এসে তাকে দ্যাখে।

এই সময়ের মধ্যে অদৃশ্য প্রাণীগুলো পুরো বাড়ি দখল করে নেয়। ভাঁড়ার ঘরে ঘুরে বেড়াতে লাগে। লিভিং রুমে উঠে পড়ে। রাতে হায়াসিন্থ শুনতে পেল ওরা ফিসফিস করে অগ্নিকাণ্ডের কথা বলছে।

শুনতে পেল ওদের একজন বলছে, ‘স্বর্গীয় আগুনে আমরা এই বাড়িটিকে পুড়িয়ে দেব।’

‘তিন দিনের মধ্যে এটা আবার তৈরি হবে।’

‘স্থপতির মাধ্যমে।’

‘তার জাদুর অক্ষর রুন্সে।’

‘যা সে শেখে যখন পৃথিবী পোড়ে।’

‘ছাইভস্ম থেকেই মহৎ বাড়িটি তৈরি হবে আবার।’

‘আর ওই ছোট মেয়েটা একটা শিক্ষা পাবে।’

‘হ্যাঁ, পরিপূর্ণতার শিক্ষা।’

মেয়েটি বুঝতে পারলো তাদের পুরো বাড়ি পুতুলের বাড়িতে পরিণত হয়েছে আর তাদের সকলের জীবন সংকটাপন্ন। চাকরদের ডেকে সে সতর্ক করতে চেষ্টা করলো, কিন্তু কেউ তার কথা শুনল না। সে শুনতে পেল ওরা করিডোরে ফিসফিস করছে। সে শপথ করে বলতে পারে ওরা মাতাল ছিল।

সেই রাতে পেন্ট্রিতে কোনও একটা কিছুতে আগুন লেগে যায়। শিখা ছড়িয়ে পড়ে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে পুরো বাড়ি পুড়ে যায়। ধ্বংস হয়ে যায় সব। এটাও বলার অপেক্ষা রাখে না যে সমস্ত বাড়ি পুড়ে ধ্বংস হয়ে গেলেও একমাত্র পুতুলঘরটি তার অশুভ পূর্ণতায় ছিল অলৌকিকভাবে অক্ষত। কীভাবে সম্ভব এটা কেউ জানে না।

কিছু দিনের মধ্যে তার বাবা জেল থেকে ছাড়া পায়। তাঁর বিরুদ্ধে করা অভিযোগ ছিল মিথ্যা। অনেকে মনে করেন তার সাফল্যে ঈর্ষান্বিত হয়ে তার প্রতিদ্বন্দ্বীরাই এই কাজ করেছে।

এরপর তারা গ্রামে, একটা ছোট বাড়িতে চলে যায়। তার মা তাদের সব ঘোড়া বিক্রি করে দেন এবং কখনও আর ঘোড়ায় চড়েন না। তার বাবা রুন্স পড়তে আর ব্যাখ্যা করতে শেখেন। অন্যদিকে হায়াসিন্থ, দিনের পর দিন, অপেক্ষা করে থাকে কবে আবার সেই অপরিচিত লোকটি আসবেন, যেন সে তার নীল পাথরটি ফেরত দিতে পারে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ