লিডিয়া ডেভিসের গল্প: চিঠি


বাংলা অনুবাদ: অমিতাভ চক্রবর্ত্তী

পাশে শুয়ে থাকা প্রেমিককে নিজের আগের সম্পর্কটার কথা বলতে শুরু করে থেমে যাওয়ায় সে জানতে চাইল সেই পর্বটা শেষ হয়েছে কবে। বছর খানেক আগে সব শেষ হয়ে গেছে, এইটুকু জানানো ছাড়া আর কোন কথা সে বলে উঠতে পারল না। খানিকক্ষণ অপেক্ষা করে থেকে পাশের মানুষটি জানতে চাইল ঠিক কি ভাবে সেই সম্পর্ক শেষ হয়েছিল। সবকিছু একটা ঝড়ের মতো শেষ হয়ে গিয়েছিল, বলল সে। এবার একটু সাবধানে তার প্রেমিক জানাল যে সেই দিনগুলোর সমস্ত গল্প, এমনকি তার গোটা জীবনের সব কথা শুনতে ইচ্ছুক সে। অবশ্য সে যদি বলতে চায় তবেই, কোন জোরের ব্যাপার নেই এতে। উত্তর দিতে গিয়ে মুখটা একটু ঘুরিয়ে নেয় সে, তার বন্ধ চোখের পাতায় বাতির আলো পড়ে জ্বলজ্বল করে। ভেবেছিল, একে সব কথা খুলে বলতেই ভাল লাগবে তার, কিন্তু এখন সমস্ত কথারা আটকে গেছে, চোখ দুটো জলে ভরে আসছে। ভেবে অবাক লাগছে তার যে আজ এই নিয়ে দ্বিতীয় বার কাঁদছে সে অথচ সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে তার চোখে কোন জল নেই।

সে নিজেকে বলতে পারছে না যে সম্পর্কটা সত্যিই শেষ হয়ে গেছে, যদিও অন্য যে কেউ বলবে যে এটা শেষ হয়ে গেছে। কারণ, সেই ব্যক্তিটি অন্য শহরে চলে গেছেন, এক বছরেরও বেশি সময় ধরে তার সাথে কোন যোগাযোগ রাখেননি এবং ইতোমধ্যে অন্য মহিলাকে বিয়েও করে নিয়েছেন। মাঝে মাঝেই নানা খবর কানে আসে তার। কেউ ওনার কাছ থেকে একটা চিঠি পেয়েছে, এবং খবর হ'ল এই যে উনি তার সমস্ত আর্থিক সমস্যা থেকে প্রায় বেরিয়ে এসেছেন এবং এখন একটি পত্রিকা বার করার কথা ভাবছেন। এর আগে, অন্য কারও কাছ থেকে সে খবর পেয়েছিল যে উনি ডাউনটাউনে এক মহিলার সাথে থাকেন আর পরে সেই মহিলাকেই বিয়ে করে নিয়েছেন। ওনাদের কোন টেলিফোন নেই, কারণ ওনারা টেলিফোন কোম্পানির কাছে অনেক টাকা বাকি ফেলেছেন। সে’সব দিনে টেলিফোন কোম্পানি মাঝে মাঝে তাকে ফোন করে খুব বিনয়ের সঙ্গে তার কাছ থেকে জানতে চাইত উনি কোথায় আছেন। এক বন্ধু তাকে বলে যে উনি নাকি সেই সময় সারা রাত ডকে সী আর্চিন প্যাকিংয়ের কাজ করে ভোর চারটেয় বাড়ি ফিরতেন। তারপরে এই একই বন্ধু তাকে জানায় কীভাবে উনি এক নিঃসঙ্গ মহিলাকে প্রচুর পরিমাণে অর্থের বিনিময়ে কিছু দিতে চেয়েছিলেন যাতে ঐ মহিলা খুব অপমানিত এবং অসন্তুষ্ট বোধ করেন।

তার আগে, তখনও উনি কাছাকাছি এক জায়গায় কাজ করতেন, ওনাকে দেখতে এবং গ্যাস স্টেশনে ওনার সাথে তর্ক করতে গাড়ি চালিয়ে ওনার কাছে চলে যেত সে। সেখানে অফিসে ফ্লুরোসেন্ট আলোর নীচে ফকনারের লেখা পড়তে পড়তে তাকে আসতে দেখলে উদ্‌বিগ্ন চোখে তাকাতেন উনি। চারপাশে গ্রাহকরা রয়ছে, তার মধ্যেই তারা তর্ক করত, এবং যখন উনি কোন গাড়িতে জ্বালানি ভরে দিচ্ছেন তখন সে ভাবতে থাকত যে এরপর ওনাকে কি বলা যায়। পরে উনি ঐ গ্যাস স্টেশানে যাওয়া বন্ধ করে দিলে, সারা শহর সে ওনার গাড়ির খোঁজে ঘুরে বেড়াত। একবার বৃষ্টির মধ্যে একটা ভ্যান হঠাৎ তার দিকে ঘুরে গেল এবং সরতে গিয়ে সে বুটে হোঁচট খেয়ে খাদে পড়ে গেল, আর তারপর সে নিজেকে পরিষ্কার ভাবে দেখতে পেল: রাবারের বুট পরা, মাঝবয়সের শুরুর দিকের এক মহিলা অন্ধকারে একটা সাদা গাড়ির খোঁজে গোটা শহর চষে বেড়াচ্ছে আর এখন একটা খাদে পড়ে যাচ্ছে, আর তার পরেও সেই মহিলা আবার দিগ্‌বিদিকে ঘুরে বেড়াবে কখন এক পার্কিং লটে এমন এক লোকের একটা সাদা গাড়ির দেখা পেয়ে তার অন্তরাত্মা শান্তি পাবে, যেই লোক তখন অন্য কোথাও রয়েছেন এবং অন্য এক মহিলার সঙ্গে জীবন কাটাচ্ছেন। সেই রাতে সে অনেকক্ষণ ধরে শহরের এ মাথা ও মাথা ঘুরে বেড়িয়েছিল, একই জায়গাগুলো বারে বারে পরীক্ষা করেছিল, ভেবেছিল শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেতে যে পনেরো মিনিট সময় তার লেগেছে সেই পনেরো মিনিটের মধ্যে উনি ঐ আগের ছেড়ে আসা যায়গায় গাড়িটি নিয়ে গিয়ে হাজির হয়ে থাকতে পারেন। কিন্তু সেদিন সে কোথাও গাড়িটি খুঁজে পায়নি।

গাড়িটি একটি পুরানো সাদা ভলভো; সুন্দর নরম মতন দেখতে। প্রায় রোজই আরো কত পুরনো ভলভোর দেখা পায় সে, কোন কোনটা একটু বাদামি মত বা ঘিয়ে রঙের – ওনার গাড়ির রঙের কাছাকাছি – এবং কোন কোন গাড়ি পুরোপুরিই ঐ গাড়ির রঙের, সাদা, তবে কোথাও কোন খোঁচাখুঁচি কি গর্ত ছাড়া এবং মরচে পড়াও নয়। লাইসেন্স প্লেটগুলিতে কখনই ‘কে’ অক্ষরটি থাকে না, আর ড্রাইভাররা, আবছা অবয়বটুকুই শুধু বোঝা যায়, হয় সে কোন মহিলা অথবা পুরুষ হলে চশমা পরা কিংবা তার মাথার আকৃতি ওনার মাথার মাপের চেয়ে ছোট।

সেই বসন্তে সে একটি বই অনুবাদ করছিল কারণ এটিই ছিল একমাত্র কাজ যা সে করতে পারত। যখনই সে টাইপ করা বন্ধ করে ডিকশনারিটা হাতে নিত, ততবারই তার আর পাতার মাঝখানে ঐ লোকটির মুখ ভেসে উঠত এবং সমস্ত যন্ত্রণা আবার ঝাঁপিয়ে নেমে আসত তার উপর। আবার যেই সে ডিকশনারিটা নামিয়ে রেখে টাইপ করা শুরু করে দিত, ঐ মুখ আর তার সাথে সাথে সমস্ত যন্ত্রণা হাওয়ায় মিলিয়ে যেত, প্রতিবার। শুধু এই যন্ত্রণাকে দূরে সরিয়ে রাখতে অনুবাদের কাজে অনেক পরিশ্রম করে গিয়েছে সে।

এর আগে, মার্চের শেষের দিকে, একটি ভিড়ঠাসা বারে, এক রাতে তিনি তাকে সেই কথাটি বলেছিলেন যেটি শোনার জন্য সে অপেক্ষা করে ছিল আর সেটি শুনতে হবে বলেই ভয়ে সিঁটিয়ে ছিল। শোনার সাথে সাথে তার ক্ষিধে চলে গেল। কিন্তু উনি সমস্ত খাবার গুছিয়ে খেলেন, এমনকি তার খাবারটিও খেয়ে নিয়েছিলেন। খাবারের দাম দেওয়ার মতো টাকা ওনার কাছে ছিল না তাই সে রাতে সে-ই দাম মিটিয়ে দিয়েছিল। খাওয়ার পর্ব মিটে যাওয়ার পর উনি বললেন, হয়তো দশ বছর লেগে যাবে। সে বলল, হয়তো পাঁচ বছরে, কিন্তু তিনি আর কোন উত্তর দেননি।

একটা চেক তোলার জন্য পোস্ট অফিসে থামল সে। যেখানে যাচ্ছে তার জন্য ইতোমধ্যেই কিছুটা দেরি হয়ে গেছে, কিন্তু টাকা লাগবে তার। ডাকবাক্স খুলে একটি খামের উপর ওনার হাতের লেখা দেখতে পেল সে। যদিও এই লেখার ছাঁদটি তার চেনা কিংবা খুব বেশি রকম চেনা বলেই, সে চট করে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না যে ঠিক কার হাতের লেখা এটা। যখন নিঃসন্দেহ হল যে কার লেখা, তখন রীতিমত চিৎকার করে শাপ-শাপান্ত করতে করতে গাড়ির দিকে ফিরে চলল সে। গালাগালি করার সাথে সাথে সে এটাও ধরে নিয়েছিল যে ওনার কাছে তার পাওনা টাকার অন্তত কিছুটার একটা চেক এই খামের মধ্যে থাকবে। ওনার কাছে ৩০০ ডলারের বেশি পাওনা রয়েছে তার। যদি তিনি এই ধার নিয়ে বিব্রত বোধ করে থাকেন তবে সেইটা ওনার এই এক বছর ধরে চুপ করে থাকার একটা ব্যখ্যা হতে পারে। আর এখন যদি ওনার হাতে কিছু টাকা এসে থাকে এবং তা থেকে দেনার কিছুটা হলেও শোধ করার জন্য একটি চেক পাঠিয়ে দিয়ে থাকেন তা হলে তার মানে হচ্ছে এবার তিনি সেই নীরবতা ভাঙ্গতে চাইছেন। সে গাড়িতে ওঠে, চাবিটা ইগনিশনে রাখে এবং খামটা খোলে। খামের ভিতর কোনও চেক নেই, কোন চিঠিও নেই, যা আছে তা হল ফরাসি ভাষায় লেখা একটি কবিতা, উনি যত্ন সহকারে নিজের হাতে অনুলিপি করে দিয়েছেন। কবিতাটির শেষ হচ্ছে ‘নীরবতার সঙ্গী’ বলে। তারপর ওনার নাম। কবিতাটা পুরো পড়া হয় না তার কারণ যাদের সঙ্গে সে এখন দেখা করতে যাচ্ছে খুব একটা ভাল করে সে চেনেনা তাদের কাজেই আর দেরী করা ঠিক হবে না।

হাইওয়েতে না ওঠা পর্যন্ত সে ওনাকে গালি দিতে থাকে। তার রাগ হয়ে গেছে কারণ উনি তাকে একটা চিঠি পাঠিয়েছেন এবং চিঠিটি দেখামাত্র তার মন খুশীতে ভরে গেছে, আর তারপর সেই খুশি তার সমস্ত যন্ত্রণাগুলোকে ফিরিয়ে এনেছে। এবং আরো রাগ হচ্ছে এই কারণে যে কোন কিছুতেই এই যন্ত্রণা কমার কোন উপায় নেই। যদিও অবশ্যই এটিকে একটি চিঠি বলার কোন মানে হয় না কারণ এটি একটি কবিতা ছাড়া আর কিছু নয়, তার উপরে কবিতাটির ভাষা ফরাসি এবং সেটি অন্য কারও লেখা। কবিতার ধরন দেখেও সে ক্ষুব্ধ। আরও যে জন্য তার রাগ হচ্ছে – এটা ঠিক যে পরে আরও ভালভাবে সে এই চিঠির সঠিক উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করবে, কিন্তু সে এখনই পরিষ্কার বুঝতে পারছে যে এ চিঠির কোন উত্তর হয় না। তার মাথা ঘোরাচ্ছে, শরীর খারাপ লাগছে। সে রাস্তার ডানদিক ধরে আস্তে আস্তে গাড়ি চালাতে থাকে, ঘাড়ের চামড়ায় জোরে জোরে চিমটি কাটে যতক্ষণ না অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার অনুভূতিটা পুরোপুরি দূর হয়ে যায়।

সারাদিন অন্যান্য লোকেজনের সাথে কেটে যায় এবং চিঠিটার দিকে তাকানো হয় না। সন্ধ্যায় যখন সে একা হয়েছে, তখন একটি অনুবাদের কাজ নিয়ে বসে, একটি কঠিন গদ্য কবিতার অনুবাদ। তার প্রেমিকের ফোন আসে এবং এই অনুবাদের কাজটা যে কতটা কঠিন হচ্ছে সেটা নিয়ে তার সাথে কথা বলে সে কিন্তু চিঠি নিয়ে একটাও কথা বলে না। কাজ শেষ হলে খুব যত্ন নিয়ে ঘরদোর পরিষ্কার করে। তারপর সে তার পার্স থেকে চিঠিটা বের করে নিয়ে শুতে যায়। এখন সময় হয়েছে এটা নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখার।

প্রথমে সে পোস্টমার্কটি পরীক্ষা করে। দিনের তারিখ এবং সময় এবং শহরের নাম খুব স্পষ্ট। এবার ঠিকানার উপরে নিজের নাম পরীক্ষা করে। তার শেষ নামটি লিখতে উনি মনে হয় ইতস্তত করেছেন, কারণ একটি অক্ষরের বাঁকের উপর একটি ছোট কালির দাগ রয়েছে। ঠিকানা লিখতে কিছুটা ভুল করেছেন এবং জিপ কোডটাও ঠিক লেখেননি। সে ওনার নামটি নজর করে দেখল। পুরো নাম অবশ্য লেখেননি। শুধুই প্রথম নামের প্রথম অক্ষরটি –‘ জি’, খুব গুছিয়ে সুন্দর করে লেখা এবং তার পরেই ওনার শেষ নামটি। তারপর ওনার ঠিকানা, এবং তার এটা ভেবে অবাক লাগে যে উনি চিঠিটাতে ফিরতি ঠিকানা দিয়েছেন কেন? তিনি কি এই চিঠির উত্তর চান? খুব সম্ভবত তিনি নিশ্চিত নন যে সে এখনও এখানে আছে কিনা এবং যদি সে এখন আর এখানে না থাকে তবে তিনি চান যে ওনার চিঠিটি ওনার কাছে ফিরে আসুক যাতে উনি সেটা জানতে পারেন। ওনার ঠিকানার জিপ কোড পোস্টমার্কের জিপ কোড থেকে আলাদা। উনি নিশ্চয়ই এটা ওনার পাড়ার বাইরে কোথাও থেকে ডাকে দিয়েছেন। চিঠিটা লেখার সময়ও কি উনি এলাকার বাইরে কোথাও ছিলেন? কোথায়?

সে খামটি খোলে এবং কাগজটির ভাঁজ খুলে মেলে ধরে, পরিষ্কার এবং টাটকা। এবার সে আরও খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পাতায় কি আছে দেখতে শুরু করে। তারিখ, ১০ মে, পৃষ্ঠার উপরে-ডানদিকের কোণে, অন্যান্য লেখার চেয়ে ছোট হরফে, গাঢ় কালিতে লেখা, চেপে ঠাসাঠাসি করে আঁটানো, যেন তিনি এটি বাকি লেখাগুলোর আগে বা পরে অন্য সময়ে লিখেছিলেন। এমন হতে পারে, তিনি প্রথমে এই তারিখটি লিখলেন, তারপরে থেমে গিয়ে একটু ভাবলেন, ঠোঁট দুটো চেপে বন্ধ করে রাখা, কিংবা যে বই থেকে তিনি কবিতাটি নেবেন সেটি এবার খুঁজতে থাকলেন - যদিও এটি হওয়ার সম্ভাবনা কম, কারণ লিখতে বসার আগেই সম্ভবত তিনি ঐ বই তার সামনে খুলে রেখেছিলেন। অথবা কাজটি শেষ হয়ে যাওয়ার পর ওনার মনে হল এটায় তারিখ দেওয়া দরকার। পুরো লেখাটা একবার পড়লেন তিনি, তারপরে এটায় তারিখ বসালেন। এখন সে খেয়াল করে দেখল যে কবিতা শুরুর আগের লাইনে উনি তার নাম লিখেছেন, তারপর একটা কমা বসিয়েছেন আর শেষে কবিতার নিচে ওনার নিজের নামটা এমনভাবে লিখেছেন যেন তার নামের সাথে ওনার নাম বসানোটার একটা সামঞ্জস্য থাকে। তারিখ, তার নাম, কমা, তারপর কবিতা, তারপর ওনার নাম, আর কিছু নেই, ব্যস। তার মানে - এই কবিতাটাই চিঠি।

এইসব দেখে সে এখন কবিতাটা আরও মনোযোগ দিয়ে পড়ল, বেশ কয়েকবার। কবিতাটায় একটা শব্দ সে পেয়েছে যার অর্থ জানা নেই তার। একটা লাইন শেষ হচ্ছে এই শব্দটা দিয়ে। তাই সে ছড়া মেলানোর হিসাব ধরে ভাবতে চেষ্টা করল। এই শব্দটার সাথে মিল রেখে যে শব্দটা লেখা আছে সেটা হচ্ছে – পিওরেস, পিওর – বিশুদ্ধ (বিশুদ্ধ চিন্তাভাবনা), তার মানে যে শব্দটা সে পড়তে পারছে না সেটা সম্ভবত – অবস্কিওরেস - আবছা (আবছা ফুলেরা)। তারপর আট লাইনের কবিতাটির শেষ লাইনের শুরুতে আরো দুটো শব্দ আছে যাদের পড়া যাচ্ছে না। উনি যেভাবে অন্যান্য বড় হাতের অক্ষরগুলো লিখেছেন সেগুলো খুঁটিয়ে দেখল সে, যা মনে হচ্ছে এই বড় হাতের অক্ষরদু’টি অবশ্যই এল হতে হবে এবং শব্দ দু’টি অবশ্যই লা লুন, চাঁদ, চাঁদ যার মহত্ত্বের শেষ নেই, যে পরম করুণাময়অক্স ইনসেনসেস - পাগল লোকদের প্রতি।

হাইওয়ে ধরে উত্তরের দিকে গাড়ি চালাতে চালাতে প্রথম যা তার নজরে এসেছিল এবং তারপর কেবলমাত্র যেই শব্দগুলি সে মনে করতে পেরেছিল তা হ'ল কমপ্যানন ডি সাইলেন্স, নীরবতার সঙ্গী এবং আর কয়েকটি লাইন - হাত ধরা, সবুজ তৃণভূমি, ফরাসি ভাষায় প্রেইরি, চাঁদ এবং শ্যাওলার বুকে মারা যাওয়া এই সব নিয়ে। তখন সে যা দেখেনি, এখন চোখে পড়ছে, তা হল, যদিও তারা মারা গেছে, মানে, কবিতার এই যে দু'জন মারা গেছে, তারা তারপর আবার মিলিত হয় - নউস নউস রেত্রভিওঁ - আমাদের আবার দেখা হয়েছে, আমরা আবার একে অপরকে খুঁজে পেয়েছি, উপরে, অপরিসীম কিছুতে, কোথাও, যা অবশ্যই স্বর্গ। তারা একে অপরকে কাঁদতে দেখেছে। আর এভাবেই কবিতাটা শেষ হয়, মোটামুটি যা বোঝা গেল – আমরা, নৈঃশব্দ্যের দুনিয়ায় পরস্পরের প্রিয় সঙ্গী দু’জন, একে অপরকে কান্নায় ভেসে যেতে দেখি। হাতের লেখা দেখে নিশ্চিত হওয়ার জন্য সে আস্তে আস্তে, সময় নিয়ে রেত্রভিওঁ শব্দটি পরীক্ষা করে, বানান করে করে অক্ষরগুলি দেখে, ঠিকই আছে - একে অপরকে আবার খুঁজে পাওয়া – এই অর্থেই লেখা হয়েছে। সে এই শব্দগুলোকে এমন আকুল ভাবে আঁকড়ে ধরে যে এক মুহুর্তের জন্য সে তার গোটা অস্তিত্ব, এই ঘরের, চারপাশের জগতের, সমস্ত কিছু অনুভব করতে পারে এবং এখন পর্যন্ত তার জীবনে যা কিছু ঘটেছে সমস্তটা তার দৃষ্টির সীমার মধ্যে এসে জড়ো হয়, যদিও সবটাই যেন নির্ভর করে আছে ঢালু হয়ে নেমে আসা একটি কালির রেখার উপর আর তারপরের আর একটি লাইনের উপর যেটি সে ঠিক যেমনটি আশা করে তেমনই স্বয়ংসম্পূর্ণ। যদি রেত্রভিওঁ, আবার ফিরে পাওয়া কথাটির সম্বন্ধে কোন সন্দেহ না থাকে, এবং কোন সন্দেহ নেই বলেই মনে হচ্ছে, তবে সে বিশ্বাস করতেই পারে যে উনি এখনও ভাবছেন, এখান থেকে আটশো মাইল দূরে থেকেও, যে এটা সম্ভব, হয়ত এখন থেকে দশ বছর বা পাঁচ বছর পরে, অথবা যেহেতু এক বছর ইতোমধ্যে কেটে গেছে, নয় বছর বা চার বছর পরে।

কিন্তু সে এই লেখায় এই মারা যাওয়ার অংশটি নিয়ে উদ্বিগ্ন বোধ করে: এর অর্থ হতে পারে যে তিনি সত্যিই আর তাকে আবার দেখতে পাওয়ার আশা করেন না, যেহেতু তারা মারা গেছে, যেতে ত হবেই; অথবা সময়টা এত দীর্ঘ হবে যে গোটা জীবনটাই পার হয়ে যাবে। অথবা এমনও হতে পারে যে সঙ্গী, নীরবতা, কান্নাকাটি এবং কোনকিছুর শেষ হয়ে যাওয়া এই সব নিয়ে তিনি যা বলতে চান, ওনার পক্ষে যতটা খোঁজাখুঁজি করা সম্ভব হয়েছে, তাতে এই কবিতাটিকেই ওনার নিজের কথার সবচেয়ে কাছাকাছি মনে হয়েছে এবং উনি যা ভাবছিলেন এ কবিতা তার হুবহু প্রতিফলন নয়। অথবা এমনও হতে পারে ফরাসি কবিতার বইটি পড়ার সময় এই কবিতাটি পড়ে এক মুহূর্তের জন্য তার কথা মনে পড়ে গিয়েছিল ওনার, ইচ্ছে হয়েছিল কবিতাটি তাকে পাঠানোর আর খুব একটা নির্দিষ্ট কোন উদ্দেশ্য ছাড়াই দ্রুত পাঠিয়ে দিয়েছেন।

সে চিঠিটা ভাঁজ করে আবার খামে ঢুকিয়ে নিয়ে বুকের ওপর রাখে, তার উপর নিজের হাত দুটি, চোখ বন্ধ করে এবং কিছুক্ষণ পর, তখনও আলো জ্বলছে, ঘুমিয়ে পড়তে শুরু করে। আধা-স্বপ্নের ভিতর তার মনে হয় চিঠির কাগজে এখনও ওনার কিছু গন্ধ লেগে থাকতে পারে এবং জেগে ওঠে সে। খাম থেকে কাগজটা বের করে ভাঁজ খুলে পাতার নিচের দিকের চওড়া সাদা মার্জিনটা থেকে গভীরভাবে শ্বাস নেয়। কিচ্ছু না। এবার কবিতাটা, কিছু একটা গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে এখানে, মনে হয় তার। যদিও সম্ভবত সে যেটা শুঁকছে – নেহাতই কালির গন্ধ।
---------
মূলগল্প: The Letter by_Lydia Davis_

লেখক পরিচিতি: লিডিয়া ডেভিস (৫ জুলাই ১৯৪৭) একজন আমেরিকান লেখিকা যাঁর ছোটগল্পগুলি অনেক সময়েই এক বা দুই পৃষ্ঠার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। ছোটগল্প ছাড়া তিনি উপন্যাসও লিখেছেন এবং ফরাসি এবং অন্য ভাষা থেকে অনুবাদও করেন।
অনুবাদক পরিচিতি: অমিতাভ চক্রবর্ত্তী।অবসরপ্রাপ্ত আণবিক জীববিজ্ঞানী ও রসায়নবিদ। অনিয়মিত লেখালেখি, ডিজিটাল মাধ্যমে – কবিতা, গল্প, অনুবাদ ইত্যাদি। ভাল লাগে ফটো তুলতে, রান্না করতে আর ওয়েবসাইট বানাতে। ঠিকানা – ব্রেন্টউড, টেনেসি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ