রাস্তা থেকে সামান্যই আলো জানলার পর্দা চুঁইয়ে ভেতরে আসছিল। সেই আলো-আঁধারি আর রাতের শব্দের আবহে মহিলাটি, শুয়ে শুয়ে ঘুমোনোর চেষ্টার ফাঁকে নানা স্মৃতি আর পরিকল্পনার জাল বুনছিল। চোখ খোলা আর বন্ধের খেলার কথা ভাবছিল সে : আঁখিপল্লব তুললেই এই আলো এবং আঁধারে যে দৃশ্যপট গভীর ভাবে ধরা দেয় – তা এতদিন তার অধরা ছিল। আবার পল্লবটি নামালেই দেখাশোনা মুছে একাকার। এ যেন এক মজার লুকোচুরি খেলা। অথচ প্রায়শঃই নির্ঘুম শুয়ে থাকার সময়, তার চোখ দুটি বন্ধ থাকলেও মন এত সজাগ থাকে যে, যেন চোখ আসলে খোলাই। অবশ্য তাকালেও তো সেই অন্ধকারই।
তার ছেলে এসে তিনটি কড়ি তার পায়ের ওপর রাখে। খাটের পাশে চেয়ারে বসা ব্যক্তিটি মাঝের কড়িটি তুলে তার সাদা ঠোঁটের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
মুহূর্তের সীমা অতিক্রম করলে পড়ে থাকে শুধুই অন্ধকার। অনুভবে প্রতিভাত হয় এর সবই অলীক। অথবা এ যেন একরকমের পাগলামি। বাস্তব পরিস্থিতি যখন এক পাগলকে তার অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে সাহায্য করে না, তখন সে কল্পনার জগতকেই বিশ্বাস করতে শুরু করে, কারণ বাস্তব পরিস্থিতির চাইতে সেটাই তাকে সাহায্য করে বেশি।
তার ছেলেটি ঘরের দাওয়ায় দাঁড়িয়ে একটা প্লাস্টিকের বন্দুকের ওপর একটা ইট ফেলে সেটাকে টুকরো টুকরো করছিল। বন্ধ ঘরের ভিতর একটা টেলিভিশন চলছিল। আর একজন মহিলা, ভিজে চুলে তোয়ালে জড়িয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেই ছেলেটির ওপর চেঁচিয়ে উঠল – ‘হচ্ছেটা কী? থামো বলছি। আমি ধ্যানে বসেছিলাম, আর মনে হচ্ছে বাড়িটাই যেন টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে পড়ছে!’ ছেলেটি ইটটা হাতে নিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। তার চোখে মুখে ভয়ের ছাপ। লাল প্লাস্টিকের টুকরোগুলো তার পায়ের চারপাশে লুটিয়ে থাকে।
এটা কেমন করে কাজ করে বলি: কখনো কখনো একটা চিন্তা স্বপ্নে পরিণত হয় (যেমন ধর, সে একটা লম্বা বাক্য বিছিয়ে দিল বিছানায়, তারপরেই বেরিয়ে গিয়ে চোদ্দ নম্বর রাস্তায় একটা দীর্ঘ কালো চেন ছড়িয়ে দিল); তার মন বলতে থাকে. আরে! এ সত্যি নয়, তুমি স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছ। তখন সে জেগে উঠে চিন্তা ও স্বপ্নদের কথা ভাবতে থাকে। আবার কখনো সে অনেকটা সময় জেগে শুয়ে থাকে। অবশেষে, একসময় তন্দ্রায় তার সারা শরীর এলিয়ে পড়ে। তখন তার মন জেগে উঠে ভাবতে বসে, এমন হঠাৎ করে ঘুম এলো কী করে! আবার কখনো তার মন এতই সজাগ থাকে যে, সে কোনো গরম পানীয় বানিয়ে খায়। এটাতে কোনো উপকার যে হয়, তা নয়, কিন্তু যা হোক কিছু কাজ তো করা হলো!
আবার কোনোদিন ঘুম আসে সহজেই, কিন্তু একটু পরেই (বড়জোর দশ মিনিট ) - হয় একটা জোরালো শব্দ, নয় একঘেয়ে বিরক্তিকর মৃদু আওয়াজে তার ঘুম ভেঙে যায়, বুক ধড়ফড় করে। অনির্দেশ্য রাগে মাথা গরম হয়ে যায়, তারপর তার চিন্তার ঘড়ি আবার কাজে লেগে পড়ে।
***
আরেক রাতে - তিনটে বালিশের ওপর মাথা, পাশে গরম চায়ের কাপ, কপালে জলপটি নিয়েও সে কেশেই যাচ্ছিল।
সমুদ্রতীরে সে তার ছেলের সঙ্গে জলের সমান্তরালে শুয়ে আছেে। জল তাদের চাদরে এসে জড়িয়ে যাচ্ছে, আবার সরে যাচ্ছে। আরো লোকজন এদিক ওদিকে জায়গা খুঁজে নিচ্ছে, কেউ বা তাদের পার হয়ে চলে যাচ্ছে। সমুদ্রের আওয়াজ এক নৈশব্দের আবহ তৈরি করে। তারা মা-ছেলেতে আরামে ঘুমোয়। বিকেলের রোদ ছেলের মুখে খেলা করে, তার ঘাড়ে বালির দানা, গালের ওপর দিয়ে একটা পিঁপড়ে দৌড়ে গেল। ( শিউরে উঠল ছেলে, ঘুমন্ত হাত মুষ্টিবদ্ধ হয়ে আবার খুলে গেল), নরম ধূসর বালির ওপর তার গাল, তার চশমা আর টুপিও বালির ওপরে।
তারপরে হালকা চড়াই ভেঙে বাড়ির পথ। তারও পরে এক বারে তারা রাতের খাবার খেতে গিয়েছিল। তার ছেলে পালিশ করা টেবিলে মাথা নামিয়ে প্রায় ঘুমিয়ে পড়ছে। বারের অন্ধকার আবহ, কোলাহল, গেলাস ভাঙার আওয়াজ যেন খাবারে সঙ্গে তাদের ভিতরেও ঢুকে যাচ্ছিল। রাস্তায় বেরিয়ে আলো আর নিস্তব্ধতায় তারা বিভ্রান্ত হয়ে পড়ছিল।
সে শুয়ে শুয়ে কয়েকটি জটিল গোলকধাঁধার পথ পার হচ্ছিল, যাতে তার ঘুম আসে। ঘুমানো যে কী কঠিন! এমন কি, যে রাতে তার সহজেই ঘুম পায়, সেদিনও সে ভাবে, আজও কঠিন হবে ঘুমানো। সে নিজেকে তৈরি করে লড়াইয়ের জন্য। ফলে সেদিনও ঘুমোনোটা শক্ত কাজ হয়ে দাঁড়ায়।
অনেক দিন আগের সেই রাতে তার করার কিচ্ছু ছিল না। সে ঘরে শুয়ে কাঁদছিল। বাঁ পাশ ফিরে অন্ধকার জানলার দিকে চেয়ে শুয়েছিল সে। নরম বালিশের ওয়াড়ে সে তার বাঁ গাল চেপে রেখেছিল। পুরোনোো লোকের গন্ধ মাখানো সেই বালিশ। তার কাছে, উঁহু, সম্ভবতঃ তার উপরে - ডান হাতের তলায় ধরা ছিল কাপড়ের হাতিটা। বেচারির জরাজীর্ণ চেহারা আর দোমড়ানো একটা শুঁড়। আবার এমনও হতে পারে সেই রাতে সে বালিশ আর হাতি ছুঁড়ে ফেলেছিল এদিক ওদিকে। হয়তো ডানদিক ফিরে শুয়েছিল। দরজার নিচ দিয়ে আসা আলো বিছিয়ে ছিল মেঝের ওপর। মনে মনে আশা করছিল দরজাটা আবার হয়তো খুলে যাবে, হলের আলো সারা ঘরের মেঝেতে ছড়িয়ে পড়বে। আর সেই আলোকে পিছনে রেখে একটি ছায়াময় মানুষ এসে দাঁড়াবে আবার। এক রাতে মা চলে গিয়েছিল অনেক দূরে। মা যখন অন্য দরজা দিয়ে ভিতরে আসে, তখন সে সোজা এসে দাঁড়ায় তার মেয়ের কাছে। তার আধখানা মুখে আলো পড়ে। অনেক উঁচুতে সেই মুখখানি। কিন্তু আজ তো বাচ্চা মেয়েটা দরজার দিকে মুখ করে শোয়নি! তার মুখ অন্ধকার জানলার দিকে ফেরানো। অসহায় কান্নায় সেই মুখ ভেসে যাচ্ছিল। ওরা রেগে গেছে, কারণ সে আজ রাতে এমন অপরাধ করেছে, যার কোনো ক্ষমা নেই। এই ভাবনা তাকে আতঙ্কে অস্থির করে তুলল। তার মনে হচ্ছিল যেন সে মরেই যাবে।
এমন সময়ে সেই ছেলেটি তার ঘরে ঢোকে স্বেচ্ছায়, কিন্তু তার কেমন যেন মনে হয় এও তার কল্পনারই সৃষ্টি। এই প্রথমবার, সে তার ডানদিকে এসে দাঁড়ায়, ছোট্ট নরম চেহারাটি তাকে আশ্বস্ত করে। গভীর, সীমাহীন অন্ধকারে ডুবতে ডুবতে সে অনুভব করে, এবার সব ঠিক হয়ে যাবে।
এইবার মেয়েটি বোধে এলো কেন এটি তার অসমাপ্ত কাজ। এইজন্যেই সে ঘুমোতে পারছিল না। কেউ বলতে পারে না যে, দিনের সব কাজ শেষ হয়ে গেছে। আসলে কোনোকিছুই শেষ হয়ে যায় না। সব ক্রমাণ্বয়ে চলতেই থাকে। তার কাজ যে শুধু সম্পন্ন হয়নি তা নয়, হয়তো ভালোভাবে করে ওঠাই হয়নি।
বাইরে মকিংবার্ড ডেকেই যাচ্ছিল। হরবোলা পাখিটি তার সুর দ্রুত বদলে দিচ্ছিল। যেন ভিন্ন ভিন্ন গানের টুকরো গেয়ে যাচ্ছিল সে। এ গান মেয়েটির প্রতি রাতেই শোনা। এর সঙ্গে মাঝে মাঝে মিশে যায় নাইটিংগেলের শিস।
সমুদ্রের আওয়াজ মকিংবার্ডটির গানের আবহ তৈরি করছিল। কখনো একঘেয়ে গমগমে, কখনো বড় ঢেউ সশব্দে এসে বালুচরে ভাঙার ধ্বনিতে। যদি তার নিদ্রাহীন রাতে জোয়ার আসে, তবেই অবশ্য শেষেরটা শোনা যায়। তার মনে হলো, যদি সে জোর করে মন শান্ত করতে পারে, তাহলে সে ঘুমোতে পারবে। সে তার মনকে গড়িয়ে দিল উদ্দেশ্যবিহীন পথে। আর স্বল্পসময়ের জন্যে তা কাজও করল। সে অনুভব করছিল শান্তির স্নিগ্ধতা তার মেরুদণ্ড বেয়ে উঠে আসছে, কিন্তু সে বেশিক্ষণ এই সুন্দর অনুভূতিটি ধরে রাখতে সক্ষম হয় না।
নিজেকেই সে প্রশ্ন করে এসব করে আর কী লাভ? আর তাকে অবাক করে দিয়ে সেই ছেলেটি তার ডান কাঁধের পাশে এসে দাঁড়ায়। সে আর সেই ছোট্টটি নেই, মোটাও নয়, ততটা নরমও নয় (অনেক বছর পার হয়ে গেছে যে!)। সেই আত্মবিশ্বাসী চেহারাটি তাকে ভরসা জানায়। ছেলের নীরব উপস্থিতি তাকে বলে, সব ঠিক আছে। অন্যেরা যাই বলুক না কেন, সে ভালো কারণ সে সবচেয়ে ভালোটা দেবার যথাসাধ্য চেষ্টা করেছে।
আর সেই অন্য সব লোকেরা তাদের গর্বিত, ক্ষুব্ধ, সাদাটে মুখ নিয়ে এই বাড়ির নিচের হলঘরে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
----------
অনুবাদক পরিচিতি: দোলা সেনের জন্ম ১৯৬২-র ফেব্রুয়ারিতে। বিজ্ঞানের ছাত্রী। দীর্ঘ তিরিশ বছর যুক্ত ছিলেন শিক্ষকতার সঙ্গে। বই পড়তে, বেড়াতে আর পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে ভালোবাসেন। লেখার আকাশে তিনি মুক্তি খুঁজে পান। সোশ্যাল মাধ্যম ও বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় লেখালেখিতে তাঁর আনন্দিত অবসরযাপন। ভ্রমি বিস্ময়ে নামে দুটি খণ্ডে ভ্রমণকাহিনী,পঞ্চকন্যা ও একডজন মেহুলি লেখকের প্রকাশিত গ্রন্থ।


0 মন্তব্যসমূহ