হামীম কামরুল হকের গল্প : দেখেন আপনারা যা ভালো মনে করেন


Fame is a bee
It has a song—
It has a sting— 
Ah, too, it has a wing.
--Emily Dickinson*

                   

--কদিক থেকে ভালোই।
--মানে?
--সবকিছু অনিশ্চিত। এখন কোনো ডাকাডাকি নেই। এভাবে চললে লোকে ভুলেই যাবে। যদি সব কিছু ঠিক থাকে, তাহলে তোমার সঙ্গে কানাডায়ই চলে যাবো, কী বলো? ভাইয়া তো বার বার বলছে, চলে আয়!

ফোনে স্টেলা বলেছিল।

--সব কিছুরই ভালো-মন্দ দিক আছে। এটারও থাকবে না কেন? আর অনিশ্চয়তাই তো জীবন।

এই তো সেদিন, ঢাকা থেকে ফেরার আগের দিনও এসব কথা হয়েছে। স্টেলা যদিও ফোনে কথা বলতে পছন্দ করে না। আবার মাঝে মাঝে নিজে থেকেই ফোন করবে, অনেকক্ষণ কথা বলবে। মাঝে মাঝে দিনের পর দিন, আমার যখন সময় হয়, একটু ইচ্ছা করে কথা বলি, ওকে কোনোভাবেই পাওয়া যায় না। নাতাশা, ওর ছোটবোনের ফোনে ফোন করলে শুনতে হয়: আপু বলেছে, এখন তার মৌনব্রত চলছে। কদিন ধরে বলছে, সাইলেন্স ইজ সো লাক্সারিয়াস। স্টেলার নিজের ফেসবুকও মাঝে মাঝে ডিঅ্যাক্টিভেট করা থাকে। একবার যেমন ডিঅ্যাক্টিভেট করার আগে স্ট্যাটাসে লিখেছিল: অফ লাইনে যাচ্ছি। অফ লাইন ইজ দ্যা নিউ লাক্সারি।

অনেক দিন হলো ওর স্টেজ প্রোগ্রাম বন্ধ। রেডিও থেকেও ডাক আসে না। তখন আবার অ্যাক্টিভ হলো কদিন। লিখল: সবচেয়ে খারাপের বিকল্প কম-খারাপ নয়। সবচেয়ে ভালোই সবচেয়ে খারাপের বিকল্প। আমরা কি আদৌ সবচেয়ে ভালোকে কোনোদিন পাব? তাহলে কেন? কাদের আপনারা ফেলবেন ও রাখবেন, বলেন? কম খারাপ দিয়ে কদিন চলবে? দেখেন আপনারা যা ভালো মনে করেন।

আলফাজ রশিদ ছেলেমেয়েদের নাম রেখেছেন: লেনিন, স্ট্যালিন, ইভান, স্টেলা, নাতাশা। বাড়িতে ছোটবেলায় উদয়ন আসত। রাজ্যের বইপত্র আসত। সোভিয়েত নারী আরও কী কী। এসব তার জন্মের বহু আগের ঘটনা। পরে পুরানো বইয়ের স্তূপ পরিস্কার করতে গিয়ে দেখেছে।

আমি স্টেলার দিকে তাকাই। নাতাশা এসে ট্রেতে দুকাপ চা আর মম রেখে রেখে যায়। বলে, আম্মা বানিয়েছে কিন্তু আজকেরটা অনেক মজা হয়েছে। গরম গরম খাবেন কিন্তু এরফান ভাই। বলেই আমার দিকে কেমন করে একটা চাহুনি হানে। এটাকে কি কটাক্ষ বলে! সবকিছু গরম গরম খাওয়াই ভালো! বলে খিল খিল করে হেসে ওঠে। স্টেলা বলে, ফাজিল কোথাকার! যা ভাগ!

নাতাশা গড়নে গঠনে নরম স্নিগ্ধ মেয়েদেরইমতো। স্টেলার বোন বলেই মনে হয় না। স্টেলার মুখে কেমন একটা পুরুষালি ভাব আছে। সে যেমন হৃষ্টপুষ্ট, তেমনই শক্তপোক্ত। আর সব কিছুর ভেতরে উদ্ধত-উদ্যতভাবে। কেউ কেউ উগ্রও বলে। অথচ গলার স্বর এত সুরেলা। ছোটবেলায় মাঝে মাঝে মনে হতো, স্টেলা কথা বলে না গান গায় বুঝতে পারি না। আর পরে তো দেখলাম, স্টেলার গান ছাড়া এশহরে কোনো অনুষ্ঠান হতো না। স্টেলাকে এক নামে সবাই চিনত। আসল নাম সামান্তা রশিদ হলোও স্টেলা নামে সবাই চেনে।

পুরোনো দিনের বাংলা ছবির গান, সে কলকাতার কি ঢাকাই ছবির গান, যেটাই হোক, মঞ্চে উঠে এত ভালো আর কেউ গাইতে পারে না। আবার বেতারে সে রবীন্দ্রসংগীত গায়।

লোকে বলত, রাজশাহী নয়, স্টেলার ঢাকায় যাওয়া দরকার। আসলে তো ওর বিদেশেও যাওয়া দরকার। বিভাগীয় শহরে রীতিমতো বিখ্যাত গায়িকা বলতে যতটা যা বোঝায়, স্টেলা ঠিক তাই। এক নামে সবাই চেনে। ডাকনাম স্টেলা, নামডাকে স্টেলা সামান্তা রশিদ। ফলে দিনের বেলায় স্টেলাকে নিয়ে আমার বেরোনো খুব কঠিন হতো। নিজেই বলত, বিখ্যাত হওয়ার ম্যালা জ্বালা!

তিন বছর ধরেই এ বাসায় একটু বেশি আসা-যাওয়া চলছে। যদিও ছোটবেলা থেকে স্টেলাদের আমরা চিনি। আমরা পাশাপাশি বাসায় থাকতাম। এখন তো আমি ঢাকায়, কিন্তু রাজশাহী এলেই আমি স্টেলাদের বাসায় যাই। নিজেদের বাসা আর ওদের বাসা ছাড়া তেমন কোথাও যাওয়া হয় না।

স্টেলার বাবামা আমাদের দেখাসাক্ষাৎ নিয়ে কখনোই কিছু বলেন না। ওর বাবা একদম স্কুলে পড়ার সময় থেকে বামপন্থী রাজনীতি করেছেন। মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছেন। পঁচাত্তরের পর একদম পার্টি করা ছেড়ে দেন। ততদিনে এম.এ শেষ। তারপর পরই চাকরি হয়ে যায়। চট্টগ্রাম কলেজ দিয়ে শুরু। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ে। এই বছর দশক আগে অবসরে যাওয়া পর পরই লোকজন জোগাড় করে রাজশাহীতে একটা বেসরকারি কলেজ শুরু করেন।

--কাজ ছাড়া আব্বা একদম থাকতে পারেন না। পাক্কা ওয়র্কোহোলিক বলতে যা বোঝায়। এত্ত এনার্জি আমাদের কারো নেই। আর ছাত্রছাড়া তার জীবনে আর কিছু ছিল না। এখনও নেই। যেন আমরা তার কেউ না। বলতেন, ছাত্রছাড়া আমি হলাম ছন্নছাড়া। আমাদের নিয়ে তার কোনো মাথাব্যথা নেই! আম্মা ছিলেন বলে আমাদের কিছু পড়ালেখা হচ্ছে। নইলে আমরা ওই আলেমের ঘরে জালেম ছাড়া আর কিছু হতাম না। ইভান তো আরেকটু হলে বখেই যাচ্ছিল। ভাগ্যিস বড় ভাইয়ার সঙ্গে রাঙ্গামাটিতে পাঠানো হয়েছিল। ভাইয়া ওকে মনে হয় তার মতোই ইঞ্জিনিয়ারই বানিয়ে ছাড়বে। স্ট্যালিন ভাইয়া তো গত পনের বছর ধরে বৌবাচ্চাসহ কানাডায়। কোনোভাবেই দেশে ফেরার ইচ্ছা নেই। দেশে নাকি অনেক ধুলা।

স্টেলা রাজশাহী ভার্সিটিতে পড়ছে। জুলাই মাসে মাঝমাঝি ঢাকায় এসেছিল। পরে আটকা পড়ে। অনেক চেষ্টা করেও ঢাকা থেকে রাজশাহী ফেরার জন্য না মামাকে, না বাবাকে কাউকেই রাজি করাতে পারেনি। তারপরের দিনরাত্রি কেটেছে ভয়াবহ: মিছিল গুলি ধড়পাকড় আতঙ্ক! মামার তো প্রায় পাগল হওয়ার দশা। একদিন রাতের বেলা খেতে বসেছেন। টিভি প্রতিদিনের মতো ছাড়া। একটার পর একটা হত্যা ও মৃত্যুর খবর আসছে। হঠাৎ মামা খাওয়া ছেড়ে চিকিৎকার করে উঠলেন, বন্ধ করো টিভি। দয়া করে বন্ধ করো। অন্তত আমি খাওয়ার সময় দয়া করে আর একদিনও আর টিভি ছেড়ো না। আর একটা হত্যা, একটা মৃত্যুও আমি নিতে পারছি না। দয়া করো। প্লিজ।

খাবার টেবিলে সবার একেবারে হতভম্ব দশা। মামি, মামাত ভাই ইরাজ ও বোন শেহনাজও মুখে তুলতে যাওয়া এক লোকমা ভাত হাতে ধরে বাজ পড়া মানুষের মতো কিছুক্ষণ বসেছিল। মামার খাওয়া কেবল শেষ হয়েছিল। বলে তিনি আর এক মুহূর্ত দেরি না করে, নিজের থাকার ঘরে ঢুকেই দরজা বন্ধ করে দেন। ঘরের ভেতর থেকেই তার চিৎকার ভেসে আসতে থাকে: আমি কত্তবার বলেছি, দয়া করে এ কদিন রাতের বেলা টিভিটা ছেড়ো না। তাও তাদের খবর শুনতেই হবে। গোল্লায় যাক সব। তোমার আমার কী! এত বার, এত বার, এত্ত বার বলেছি.... এসব কথা ঘুরে ফিরে মামা বলেই যাচ্ছেন।

পরেরদিন দুপুর দুটা থেকে মামাকেই আবার টিভির সামনে থেকে সরানো যায় না। মামি আগের রাতে মামার চিল্লাচিল্লি নিয়ে নানান টিটকারি দিলেও মামা চুপ করে অপেক্ষা করছেন সেনাপ্রধানের কথা শোনার জন্য। এদিকে পাশের বাসার মালিহা ও তালহা এসে ইরাজ ও শেহনাজকে হৈ হৈ করে নিয়ে গেল। সবাই বলে গণভবনে যাচ্ছে। ওই দিন সন্ধ্যায় তালহা একট টিশার্ট আর বাতি নিয়ে ফিরেছিল। এসেই ছবিটা পোস্ট দিয়েছে। প্রথম মন্তব্যের ঘরে নামে একজন লিখেছে: গণভবনের বাত্তি তো তুই-ই নিভাইয়্যা দিলি!-- এই নিয়ে খুব হাসাহাসি।-- স্টেলার এসব ভালো লাগছিল না। বাবার জন্য খুব চিন্তা হচ্ছিল। তিনি এলাকার সব মানুষদের নিয়ে কলেজটা শুরু করেছেন। বাবা সম্পর্কে মামা সবসময় খোঁচা দিয়ে বলেন: আমার পোগগতি-দুলাভাই। মামার কাছে প্রগতিট্রগতি ধাপ্পাবাজি মনে হয়। একদিন মামা ঠাট্টায় ঠাট্টায় বলেছিলেন, মার্কসের মতে: রিলিজিয়ন জনগণের আফিম, আর মার্কসিজম বুদ্ধিজীবীদের আফিম।-- শুনে যদিও আমরা খুব হেসেছিলাম। মামা থেমে বলেন, দুলাভাই, কথাটা আমার না, এত জ্ঞানী আমি কোনোদিনই ছিলাম না। এডমুন্ড উইলসন উবাচ। আব্বাও হাসির নাও ভাসিয়ে বলেছিলেন: মতলববাজি কথা।... আমার এই মামা ভাগ্নেভাগ্নীদের খুব ভালোবাসেন। স্টেলার কাছে জেনেছিলাম, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ওই মামা স্টেলাদের বাসায়ই টানা সাত বছরের মতো ছিলেন। তার চোখের সামনেই সবাই জন্মালো, বড় হলো।

মামাকে দুদিন আগে এক বন্ধু ইনবক্সে মেসেজ করে জানিয়েছে আগামী দুদিন থেকে সামনের পাঁচ বছর কী কী হতে পারে। মামা সেটা সবাইকে পড়ে শুনিয়ে বলেছেন, পাগল আর কাকে বলে! নাস্ত্রাদামুসকেও ফেল মারাবে এরা। যত্তসব বোগাস কথাবার্তা!

এক সপ্তাহের জন্য বেড়াতে এসে একমাসের জন্য স্টেলা আটকা পড়ে। আগস্টের মাঝামাঝি এসে বাড়ি ফেরার জন্য অস্থির হয়ে ওঠে। তখনও মামা এদিকে-- না, ওদিক থেকে আব্বারও-- না। কিন্তু আমাকে বলার পর আমি রাজি হই। স্টেলাকে এতটা ক্ষেপে উঠতে আগে কখনো দেখিনি। বলেই বসে, তুমি যদি আগামী তিনদিনের ভেতরে আমাকে রাজশাহী রেখে আসতে না পারো। তাহলে তোমার সঙ্গে আমার সব শেষ।

ঢাকা থেকে রাজশাহী আসতে যতটা ঝামেলায় পড়ব ভেবেছিলাম তেমন কিছু হয়নি। আমার বন্ধু সিরাজগঞ্জ থেকে ঢাকা এসে ফোন ক’রে উপায়টা যদিও আগেই বাতলে দিয়েছিল। না দিলেও আমি পথ বের করে নিতাম। স্টেলার জন্য কোনো না কোনো পথ বের করেই নিতাম।

স্টেলার প্রথম বর্ষের পরীক্ষা শেষ হয়েছিল কয়েকমাস আগে। এরপর শুরু হলো শিক্ষকদের কর্মবিরতি, পরে পূর্ণধর্মঘট, তারপর তো কোটাবিরোধী আন্দোলন। তিন তারিখ রাতে আব্বা মামাকে একবার শুধু লিখেছেন: লীগের আচ্ছা মতো শিক্ষা হচ্ছে। তারপর আমাদের সবার শিক্ষা হয়ে যাবে।-- মামা কথাটা আমাদের সবাইকে শুনিয়ে বলেছিলেন, দুলাভাইয়ের এই কথার কোনো মানে আমি পেলাম না। তার এককাট্টা ধারণা: চরম ডানেদের পাল্লায় পড়তে যাচ্ছে দেশ। মামার কথায়: উগ্রবামেরা মুক্তিযুদ্ধের সময়ও দেশের দশাটা ধরতে পারলেও জনগণ ঠিক কী চায় সেটা বোঝেনি। এখনও বুঝতে পারছে না। পোজ্ঞতিশীল।

তুমি এত্ত অ্যাপলিটিক্যাল কেন!--স্টেলা এসব আমাকে বললে, আমার খুব বিব্রত লাগে। রাজনীতির কূটচালের মতিগতি আমি কোনোকালেই বুঝিনি। ফার্মেসি থেকে পাশ করে বছর দুয়েক হলো চাকরি করছি। স্টেলার লেখাপড়া শেষ হলে আমাদের বিয়ে হওয়ার কথা। তারপর ঢাকায় পুরোপুরিভাবে সংসার শুরু করব-- এছাড়া আমার আর কোনো ইচ্ছা-লক্ষ্য-গন্তব্য আপাতত নেই। পরের স্টেশানের কথা পরে ভাবা যাবে। বর্তমানে টানা বা বিরতি দিয়ে যাওয়া-আসা, দেখাসাক্ষাৎ-কথা বলা চলছিল। এর ভেতরে আমার ভাই কদিন আগে, দলবল নিয়ে স্টেলার বাবাকে জোর করে পদত্যাগপত্রে সই করিয়েছে। পরে কলেজের অন্য প্রায় সব শিক্ষক আর অভিভাবকদের বড় একটা দল মিলে আবার তাকে ফিরিয়ে এনেছে।-- এটা স্টেলা একেবারেই মানতে পারেনি যেন কাজটা স্টেলার সঙ্গে হয়েছে!

স্টেলার বাবা সব একদম মাথা ঠান্ডা করে সব সামাল দিয়েছেন। এ নিয়ে টুঁ শব্দটি করেননি। নাতাশার কাছে শুনেছি, বাসায় এ নিয়ে স্টেলার তুলকালাম কাণ্ড চিৎকার চেঁচামেচি করে।

স্টেলার কথা হলো, আমার বাবা ও ভাইকে প্রকাশ্যে এসে স্টেলার বাবার কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। ক্ষমা না চাইলে আমার সঙ্গে ও সব কিছুর ইতি টানবে।-- এটা অবশ্য নতুন নয়, কিছু হলেই আমাকে ও এই হুমকি দেয়। আবার শান্ত হতেও সময় লাগে না। আমি এজন্য ওকে বলি: লাদাখ, মানে চরমভাবাপন্ন।

আমি ঠিক জানি না, আমি স্টেলার ঠিক কোনটা ভালোবাসি: ওর রূপ নাকি ওর গুণ, নাকি ওর শরীর? স্টেলা খুব সহজ মেয়ে নয়। প্রায়ই মনে হয়: ওকে বুঝতে পারি না; আর বুঝতে পারি না বলেই ওকে ভালোবাসি। আসলে কোনটা যে ভালো, বুঝে ভালোবাসা নাকি না-বুঝে-- তাও তো বুঝতে পারি না। আগে কথার ভেতরে সুযোগ পেলেই স্টেলা ফোঁড়ন কাটত: দেখো তুমি আমাকে কী মনে করো না কারো-- সে তুমি জানো। তুমি স্রেফ আমার বয় ফ্রেন্ডমাত্র। আমাদের মধ্যে ওসব একদম ভালো হবে না।

--ওসব মানে?

--এই যে ভালোবাসা প্রেমট্রেম।

--কারণ?

--মানুষ খুব পজেসিভ হয়ে যায়। সংসারে ওনারশিপ বা পার্টনারশিপ চলে কিন্তু প্রেমে এসব চলে না। প্রেম এটা খুব জটিল বিপজ্জনক ব্যাপার। এর চেয়ে বিয়ে ভালো। এমনকি সিচুয়েশানশিপও ভালো।

--আমি তো এত প্যাঁচ ঘোচ বুঝি না।

স্টেলা খুব ভালোমতোই জানে, ওর জন্য আমি ফিদা। এবার সে আবার নতুন জিদ ধরল। ক্ষমা না চাইলে ইতি!

আব্বাকে বিষয়টা কীভাবে বলব, তাও বুঝতে পারি না। কেবল মনে হয় আমাকে এর ভেতর থেকেই উপায়টা বের করে আনতে হবে। জীবন সব সময়ই এমন। বাধাবিপত্তি ছাড়া কোনো জীবন হয় না। বাধাবিপত্তি সামাল দেওয়াই জীবন। চ্যালেঞ্জ অ্যান্ড রেসপন্স-- এটাই হলো সামনে এগুনোর পথ। আমি এছাড়া খুব বেশি নিয়ম জানি না। বন্ধু আশিক মনোয়ারের কথা, যত যাই কিছু ঘটুক আমিও রবার্ট ফ্রস্টের মতো মনে করি, মাত্র তিনটি শব্দেই জীবনের সংজ্ঞা দেওয়া যায়-- লাইফ: ইটস গৌজ অন।

আমি ঠিক করি: আব্বা-আম্মা, বড় ভাই ও ফারহানকে নিয়ে বসব। নিজের কোনো সিদ্ধান্ত জানাব না। পরে চুপচাপ নিজের মতো কাজটা করব, যেমনটা করেছি সারাজীবন। যদি স্টেলার কথা মতো আব্বা ও ফারহান স্টেলার বাবার কাছে মাফ চাইতে রাজি হন তো ভালো; নইলে যত যাই ঘটুক, আমি স্টেলাকে নিয়ে ঢাকা থাকা শুরু করব। আর সময়মতো হয় অস্ট্রেলিয়া নয়ত কানাডায় যাওয়ার ব্যবস্থা করব। আব্বা ও ফারহান কী করবে, আম্মা কী বলবে না বলবে বা বড় ভাই তা তো জানি না। আমি একটা কথাই বলব: দেখেন আপনারা যা ভালো মনে করেন। কিন্তু আসলে কি এই বসাবসির দরকার আছে? স্টেলার বড় ভাই লেনিন ভাইকে নাকি একটা কথাই ওর আব্বা বলতেন: শোনো, আমার জীবন আমি করে নিয়েছি, তোমার জীবন একান্ত তোমার। তা তুমি ভাঙবে না গড়বে, নাকি ভেঙে গড়বে, বা গড়ে ভাঙবে, তা তুমি জানো।-- স্ট্যালিন ভাইকে লেনিন ভাই নাকি এই কথাটাই বলেছেন। স্ট্যালিন ভাইয়ের কথা হলো, সারাজীবন আব্বা ছাত্র ছাত্র করে গেল! কী কাজে লেগেছে ছাত্ররা! -- এখন দেশে থাকলে বুঝতে পারত, আব্বা পুরানো ছাত্রদের কারণেই আব্বা আজকে কলেজেটা তৈরি করতে পেরেছেন। এলাকার এম.পিকে গত জানুয়ারির নির্বাচনের পর একটা অনুষ্ঠানে আনাটাই আব্বার দোষ হয়ে গেল!

এসব ভাবতে ভাবতে খুব ক্লান্ত লাগছিল। কখন যে পদ্মার পারে চলে এসেছি খেয়ালও করিনি। আমি ও স্টেলা এলে যে বেঞ্চিটাতে বসতাম সেটা ভাগ্যিস খালি। অন্য সবগুলিতে কেউ না কেউ বসে আছে-- কোনোটায় একজন, কোনোটায় দুজন।

বেঞ্চিটা খালি দেখে হঠাৎ মনে হলো, আমি আর এক মুহূর্তও দাঁড়িয়ে থাকতে পারব না। বেঞ্চিটার সামনে গিয়ে আমার শরীর যেন ঝুপ করে ধসে যায়। কিছুক্ষণ পেছনের দিকে হেলে দুহাত দুদিকে ছড়িয়ে ক্রুশবিদ্ধ মানুষের মতো বসে থাকি। তারপর কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম জানি না। ঘুমের ভেতর মনে হয় আমি কোনো অতল খাদে তলিয়ে যাচ্ছিলাম, ঠিক তখন কেউ আমার বাহু ধরে। আর চোখ খুলে দেখি, সন্ধ্যার আবছা অন্ধকারে একটা ছায়ামূর্তি পেছনে দাঁড়িয়ে। চিনতে ভুল হয় না। তবু ঠিক বিশ্বাস করতে পারি না। হঠাৎ বহু পুরানো একটা কথা ধাঁ করে মাথায় শানিয়ে ওঠে: আলোতে মানুষ চিনতে অনেকের অনেক কষ্ট হয়, কিন্তু অন্ধকার অচেনা মানুষকেও চিনিয়ে দেয়।#

১৯ নভেম্বর ২০২৪

 

*The Complete Poems(1970), Faber and Faber, No:1763

 


 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ