তিথি তখন এসে বসেছে তার ডেস্কের সামনে; সেই তিথি, কষ্ট পাওয়ার ভয়ে যে কি না কারও প্রেমে পড়ে না, শোকার্ত মনে হতে পারে বলে কখনো কালোরঙা কিছু পরে না; বার বার মানিক তাকাচ্ছে তার দিকে আর উপলব্ধি করতে পারছে যে, সীমাহীন দুরাশাও কখনও কখনও সত্যি হতে পারে। যেমন এখন তিথি তার অফিসে এসেছে তার সঙ্গে দেখা করতে। সে যখন ভাবছে, তিথিকে এবার চা কিংবা কফির কথা বলবে, অফিস থেকে ছুটি নিয়ে আজ একটু আগেভাগেই বেরিয়ে পড়বে, তখনই অ্যাডমিনের ফয়সল এসে তার দিকে একটি চিঠি এগিয়ে দিয়েছিল। অফিসের খামে ভরা চিঠি, সিলগালা করা। এরকম চিঠি নেয়ার সময় অফিসের রেজিস্ট্রি খাতায় সই দিতে হয়। মানিক তাই ফয়সালের এগিয়ে দেয়া খাতাটা নিয়ে সহাস্যেই সই করেছিল। মনে মনে, কখনও বা প্রকাশ্যে এরকম একটি চিঠি সে প্রত্যাশা করছে অনেক অনেকদিন। চার-চারটা বছর হয়ে গেল, একই চেয়ারে বসে আছে সে। কতদিন আর থাকা যায় এইভাবে! সই করে চিঠিটা নিতে নিতে বেশ ভালো লাগে তার একইসঙ্গে দুইটা বড় ঘটনা ঘটল আজ। তিথি এই প্রথম তার অফিসে এলো, আর ঠিক ওই সময়েই সে কি না প্রমোশন আর বেতন বাড়ার চিঠিটা পেল!
‘স্যরি, আমি একটু সময় নিচ্ছি বলতে বলতে মানিক চিঠিটার মুখ খুলল। কিন্তু তার নিজের মুখটা কেমন লালচে-কালচে রঙে ভরে উঠল। অবশ্য অনেক কষ্টে হাসিটা সে ধরে রাখল, ধরে রাখতে হলো। চিঠিটা প্রমোশনের নয়, বেতন বাড়ানোরও নয়। বরং দায়িত্ব পালনে অবহেলা, সহকর্মীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার ও জনসমক্ষে প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি নষ্টের কারণে তাকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে।
মানিক চিঠিটা ফের খামে পুরেছিল। ভেবেছিল, আরও আগেই তার অনুমান করা উচিত ছিল, এরকম করা হবে। দায়িত্ব পালনে অবহেলা তো তারাই করতে পারে, ডিরেক্টর, ম্যানেজার কিংবা এইচআরডি’র চিফের রুমে গিয়ে সারাক্ষণ যাদের বসে থাকার সুযোগ ও ধৈর্য্য আছে। তার সে সময় কোথায়। তার তো চায়ের দোকানে না গেলে ভালো লাগে না, পাঁচটার পর লোকজে গিয়ে আড্ডা না দিলে ভালো লাগে না। চিঠিটা পকেটে রাখতে রাখতে তিথিকে বলেছিল সে, ‘চলো, বাইরে একটা কফিশপ আছে, সেখানে বসি।’
তিথি কথা বাড়ায়নি। তবে একটু বিরক্ত নিশ্চয়ই হয়েছিল। নিচে রিসিপশনে গিয়ে মানিক তাকে নিয়ে এসেছে, তখনই তো তার চিন্তা করা উচিত ছিল, চা কিংবা কফি যা-ই হোক না কেন, সে জন্যে বাইরে যেতে হবে। খালি-খালি নয় তলায় নিয়ে এসে নিজের ডেস্কে ৪/৫ মিনিট বসিয়ে এখন কি না বলছে যে, কফিশপে বসবে! এমন নয়, কফিশপে তার খারাপ লাগে বরং এই ঝিম মেরে থাকা অফিসের চেয়ে কফিশপে বসে থাকা অনেক ভালো। আর সেখানে মনে হচ্ছে প্রাইভেসিও একটু বেশি হবে। মানুষজনের গলার আওয়াজ পাওয়া যাবে বইকি, কিন্তু মনযোগ দিয়ে কেউই অন্য কারও কথা শুনতে যাবে না। তা মানিক তো রিসিপশন থেকেই তাকে ওখানে নিয়ে যেতে পারত, খালি খালি নিজের টেবিল চেয়ার দেখানোর জন্যে অফিসের মধ্যে নিয়ে আসার কোনও মানে হয়!
এই সময়, এই বেলা ১১ টার কফিশপ খানিকক্ষণের জন্যে ঝিমায়। এককোণে বসার পর মানিকও ঝিমুনিতোলা গলায় বলে, ‘তুমি এসেছো... আমার খুব ভালো লাগছে।’ বলতে বলতে তার কণ্ঠস্বরের ঝিমুনিটুকু থির হয় মাথার মধ্যিখানে। ভালো লাগছে না ঘোড়ার ডিম, অর্থহীন একটা দৌড় দিতে দিতে অজ্ঞান হয়ে পড়তে পারলে এখন বোধহয় তার ভালো লাগত। চলে গেল, বলা নেই কওয়া নেই চাকরিটা তার একদম হাওয়া হয়ে গেল! অথচ কথাটা সে তিথিকে এখন বলতে পারছে না, বলতে পারবে না, ওসবের বদলে তাকে কি না বলতে হচ্ছে যে, তার খুব ভালো লাগছে! অবশ্য এই চিঠিটা খোলার আগেও কথাটা সত্যি ছিল, বিশ্বাসযোগ্য ছিল; তিথিকে দেখেই বোধহয় কী একটা ঘোর তাকে গ্রাস করেছিল, কোনও কিছুই সে ঠিকমতো বুঝতে পারছিল না। না হলে তার কেন মনে হলো, চিঠি এসেছে মানেই প্রমোশনের চিঠি? কেন সে ভুলে গিয়েছিল, অন্য কোনও কারণেও তো তার কাছে একটি চিঠি আসতে পারে? এমন ভুল তো তার হওয়ার কথা নয়, এমন ঘোরেও তার পড়ার কথা নয়। ভালো লাগবার কথা নয়, ভালো তার লাগছেও না, অথচ তাকে এখন বলতে হচ্ছে, তার খুব ভালো লাগছে! এর চেয়ে বিড়ম্বনার ব্যাপার আর কিই-বা হতে পারে।
আর তিথি যে এসেছে, এও তো এখন বিড়ম্বনাই। চোখের সামনে ওর দুল, মালা, টিপ দোল দোল করছে; সুন্দরবনের নদী থেকে ধেয়ে আসছে মিঠা পানির আস্বাদ, তার স্রোতে ভাসতে ভাসতে অনিবার্যভাবেই সে পৌঁছে যাবে আসছে সমুদ্রের নোনতা জলের ঢেউয়ে; মাথাটা এদিক ওদিক একটু-আধটু ঘুরলেই কালো চুলের বন্যা ছড়িয়ে পড়ছে চোখের সবটুকু জুড়ে। এখন মুগ্ধ হতে পারলে, বুনো এক আবেশে ডুবে যেতে পারলে কী ভালোই না লাগত। কিন্তু বার বার মানিক অন্যমনস্ক হয়ে পড়ছে, আর তিথিও কেমন আনমনা হয়ে তাকিয়ে আছে বাইরের দিকে। যদিও বাইরের কোলাহল এখান থেকে একটুও টের পাওয়া যায় না, শপের কাচের ওপাশের সব কিছুকেই কেমন শান্ত, নিথর এমনকি পবিত্রও লাগে। কিন্তু এখন সেই অরবতাকে, শপের ভেতরের এই নির্জনতাকে কেমন ভয়ঙ্কর অত্যাচার মনে হচ্ছে! আচ্ছা, তিথি আর কোনও দিন পেল না তার কাছে আসার? আজকেই আসতে হবে? এটা ঠিক, বলতে গেলে সে প্রতিদিনই বলতো ওকে, ‘এত কাছে তোমার অফিস, দুপুরে চলে আসো না আমার অফিসে! একসঙ্গে লাঞ্চ করব!’ কিন্তু বলতে গেলে পাঁচ-ছয় মাস হয়ে গেছে, তিথিকে সে আর ভদ্রতা করেও ওরকম কিছু বলেনি।
অবশ্য এই পাঁচ-ছয়মাস তাদের দেখাসাক্ষাৎ হয়েছে বলেও মনে পড়ে না। তাদের দেখাসাক্ষাৎ হতো লোকজ নামের ওই গ্যালারিটাতে। কিন্তু সেটা তো বন্ধ এখন; অবশ্য এখন বলাটা ভুল, সেটাও বলতে গেলে ওই চার-পাঁচ মাস হয় তালাবন্ধ। কিন্তু সেসব আর ভেবে কী হবে, এটা তো দিনের আলোর মতো পরিষ্কার, তিথি তার সঙ্গে দেখা করতে এসেছে, দুপুরের একটু আগেই এসেছে আর তার অফিসেই এসেছে। তার দুই চোখে ওর দুল, মালা, টিপ দোল দোল দুলুনি হয়ে নেচেছিল সেই সময়। কিন্তু খুব নিষ্প্রভ-নিষ্প্রভ লাগছে সব কিছু এখন।
‘আরে তুমি তো আমার চিনিটাও নিয়ে নিচ্ছো! এখন এত চিনি খাও তুমি?!’
তিথির বিস্ময় মেশানো চিৎকার শুনে মানিক সম্বিৎ ফিরে পায়। যেন বা ইচ্ছে করেই চিনি মেশানোর ভান করেছে তিথির ওই চিৎকার শুনতে এমন একটু মৃদু হাসি ফুটে ওঠে তার ঠোঁটের কোণে। তার পর চিনির পুরিয়াটা নামিয়ে রাখে পিরিচের ওপরে।
এতদিন দেখা হয়নি এত-এতদিন যে তারা কোনও কথা খুঁজে পায় না। ঠোঁটের কোণে কথার বুদবুদ ভাসতে না ভাসতেই মিলিয়ে যায় মনের ভেতর। কিন্তু তারপরও কথার নাও ভাসাতে চায় তিথি, ‘লোকজের অবস্থা কী? যাও না ওখানে আর?’
‘আরে জানো না তুমি? ওটা তো বন্ধ হয়ে গেছে।’
‘সে জানি। দেখি তো বাইরে থেকে তালা দেয়া! কিন্তু ওদের অবস্থা কী?’
‘কে জানে কী অবস্থা! কারো তো দেখাসাক্ষাৎই পাই না কোথাও। ফোনও ধরে না। জানোই তো ওরা’
মানিক কথা শেষ করার আগেই তিথি তাড়াতাড়ি বলে ওঠে, ‘জানি, আমি জানি।’
তা হলে আজকাল সবখানেই কি একটুআধটু ভয় জমতে শুরু করেছে! জরুরি অবস্থাকে সবাই তা হলে বেশ সিরিয়াসলিই নিচ্ছে মনে হয়। না হলে বাক্যটা সে শেষ করার আগেই তিথি ওররকম তড়িঘড়ি করে কথাটা বলে উঠবে কেন? কিন্তু এসব নিয়ে চিন্তা করতে মানিকের আর ভালোই লাগছে না। তা ছাড়া অফিসেও ফেরা দরকার। চাকরিটা খাওয়ার সিদ্ধান্ত কীভাবে নেয়া হলো, সে সম্পর্কে কোনও কিছুই হয়তো জানা যাবে না; কিন্তু জানার চেষ্টা তো করতে হবে।
মানিক তাই সোজাসাপটাই বলে, ‘স্যরি তিথি, আজকে আমার খুবই তাড়া আছে তোমার সঙ্গে পরে একদিন লাঞ্চ করি?’
‘না না লাঞ্চটাঞ্চ কিছু করা যাবে না, আমারও খুব তাড়া আছে। তাছাড়া আমার কাজটাও দু’এক কথাতেই সারা হয়ে যাবে।’
কী কাজ তিথির, যা দু’-এক কথাতেই সারা হয়ে যাবে, অথচ সেজন্যে কি না আসতে হয়েছে অফিস অব্দি? বেশ কৌতূহল হয় মানিকের, আবার দমেও যায়। চাকরি হারানোর মতো আরও কোনও দুঃসংবাদ নয়তো? সে দ্বিধান্বিত চোখ নিয়ে তিথির দিকে তাকিয়ে থাকে, ‘বলো, কী এমন কাজ যে দু’এক কথাতেই সারা হয়ে যাবে?’
‘আমি কনসিভ করেছি মানিক।’
যে কথাগুলো আগেই লিখতে হতো
কথাটার মানে যে কতদূর গড়াতে পারে, মানিক তা প্রথমে ধরতেই পারেনি। এরকম সংবাদ পেলে আর ১০ জন মানুষ যেমন করে, বন্ধু হোক আর শত্রু হোক, আত্মীয় হোক আর নিরাত্মীয় হোক, বলতে গেলে জড়িয়ে ধরে হইহই করে ওঠে, সেও সেরকমই করতে গিয়েছিল। স্মৃতি থেকে চাকরি হারানোর দুঃসংবাদ তার মুছে গিয়েছিল, চোখদু’টো কফিশপের এককোণে রাখা ফার্নগুলোর মতো সবুজ হয়ে উঠেছিল, আনন্দে উদ্বেল সে ‘কনগ্রাচুলেশনস’ বলে কফির কাপের পাশে থির হয়ে পড়ে থাকা তিথির হাতটা আঁকড়ে ধরে টেনে নিতে গিয়েই থমকে গিয়েছিল। আচ্ছা, কনসিভ করেছে ভালো কথা, কিন্তু তিথি এ সংবাদ তাকে কেন দিচ্ছে? তাদের বন্ধুতার গাঢ়তা একেবারে কম নয়, কিন্তু তাই বলে অত গভীরও নয় যে খবরটা দেয়ার জন্যে ও তার অফিস অব্দি ছুটে আসবে। তাছাড়া তিথির কি বিয়ে হয়েছে? অবশ্য কনসিভ করার জন্যে বিয়ে করার দরকার হয় না, কিন্তু কনসিভ হয়ে গেলে মানুষজনের কাছে খবরটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এই ছয়-সাত মাসের মধ্যে সে রকম কিছু ঘটলে কোনও না কোনও ভাবে মানিকের জানার কথা, অন্তত যতদিন রাসেল বেঁচে আছে। প্রেম হওয়ার, প্রেম ভাঙার, বিয়ে হওয়ার কিংবা ছাড়াছাড়ি ঘটবার খবরটবর বলে বেড়াতে বড় বেশি ভালোবাসে সে। এই পৃথিবীতে এমন একজন রাসেল থাকার পরও তিথির কনসিভ করার খবরটা তার অজান্তেই ঘটে গেল!
কত হতে পারে তিথির বয়স? বড় জোর ২৬, কিন্তু ২৪ হওয়াই ন্যায়সঙ্গত। গত বছর ও যখন প্রথম চাকরি পেল, লোকজে তাদের জন্যে চায়ের অর্ডার দিতে দিতে বলেছিল ও, ‘থ্যাংকস গড বাইশেই পড়াশুনা খতম, তেইশ থেকেই আয় উপার্জন। যাক বাবা, বাপমায়ের কাছে অন্তত হাত আর পাততে হবে না।’ সে হিসাবে বয়স ওর এবার চব্বিশই হওয়া উচিত। অন্যদিকে মানিকের চলছে একত্রিশ। যদিও কেউ জিজ্ঞেস করলে তিরিশ বলেই চালায়। বয়স এক মায়ার হরিণ, একদিন বাড়লেও মনটা কেমন দুমড়ে মুচড়ে যায়। আজকের আগে কখনও সে তিথিকে একা দেখেনি, তিন-চারজন ছেলেমেয়ে তার সঙ্গে থাকবেই থাকবে, কেউ না থাকলেও অন্তত একজন ছেলে কি মেয়ে। তারপরও কী করে যে তিথির সঙ্গে তার একটু-আধটু খাতির হয়ে গেল, বলা মুশকিল। মানিক কফির কাপটা আস্তে আস্তে চক্রাকারে ঘুরায়। ঘুরায় আর চিন্তা করে, কী করে তাদের খাতির হলো এমন খাতির যে জীবনের প্রথম তিথি তার অফিসে এসেছে কনসিভ করার খবর দিতে!
একটু সিগারেট টানার ইচ্ছে জাগে, আর তখনই মনে পড়ে যায় মানিকের সিগারেট, এই সিগারেটের কারণেই তাদের পরিচয় হয়েছিল। হতাশাচ্ছন্ন বৃষ্টি নামছিল, লোকজের দোতলার বারান্দার এক কোণে সে একা-একা দাঁড়িয়েছিল আর সিগারেট টানছিল। একদল ছেলেমেয়ের হল্লা ভেসে আসছিল এক্সিবিশন হলের মধ্যে থেকে। যারা প্রতি বিকেলেই এখানে থাকে, আড্ডা দেয় এবং তাদের টুকরো টুকরো কথাবার্তা থেকে মনে হয়, হয়তো শিল্পবোদ্ধা তারা, ঠিক একই বয়সের না হলেও একই মেজাজের। মাঝে মাঝে ভেসে আসছিল একটি মেয়ের দুলুনিতোলা স্বর, ‘কী রে, একটা সিগারেট না দিতে বললাম তোকে!’
‘কইলাম তো নাই’
‘তোর কাছে থাকে কখন? না থাকে কারো কাছ থেকে ম্যানেজ করে দে।’
‘শুনলিই তো নাই। আমার কাছেও নাই, কারও কাছেই নাই। ক্যান, তোর বাওয়েল ক্লিয়ার হয় নাই?’
সবাই হাসছিল হো হো করে। তবে মেয়েটির কণ্ঠস্বর সে আওয়াজকে ছাপিয়ে উঠেছিল, ‘হ, হয় নাই। হারামজাদা!’ গজ গজ করতে করতে মেয়েটি মানে তিথি বারান্দায় চলে এসেছিল আর মানিককে সিগারেটের ধোঁয়া দিয়ে রিং বানাতে দেখেছিল। মানিকের মনে হয়েছিল, ধীরে ধীরে বৃষ্টি স্নাত উঠোনে পা ফেলছে সম্মোহিত এক কবুতর। আসতে আসতে একেবারে মানিকের পাশে এসে চুপচাপ দাঁড়িয়েছিল সে যেন সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে অনেক আগে থেকেই। তার ঠোঁট দুটো বিড় বিড় করে উঠেছিল, ‘হ্যাভ ইউ এনি স্পেয়ার সিগার?’
না, মানিকের কাছে তখন কোনও সিগারেট ছিল না। সত্যিই ছিল না। মিনিটদুয়েক আগে, এই সিগারেটটা ধরানোর জন্যে হাতে নেয়ার সময় এসে চাইলেও মেয়েটি তার কাছে থাকা শেষ সিগারেটটা নিতে পারত। কিন্তু তার কোনও দোষ নেই জাকিয়ার জন্যে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে শেষ সিগারেটটাও তাকে ধরিয়ে ফেলতে হলো। আর সিগারেটটা ক্ষয় হতে হতে মাঝামাঝি আসতেই তাকে কিনা এরকম একটা অনুরোধের মুখে পড়তে হলো।’
‘স্যরি, আমার কাছে আর একটাও নাই এইমাত্র সিগারেটের খালি প্যাকেটটা ওই যে ওইখানে ফেলে দিয়েছি।’
বলতে বলতেই মানিকের চোখে পড়েছিল, একেবারে হাতের কাছেই একটা ময়লার বিন থাকার পরও সে একেবারে বারান্দা ঘেষা সিড়িটার পাশে প্যাকেটটা ঢিল মেরে ফেলে দিয়েছে। হয়তো প্রচণ্ড রাগে, প্রচণ্ড উত্তেজনায়। এরকম আগে মাঝে মাঝে হতো, কিন্তু এখন ঘন ঘন হচ্ছে আসার সময় দিয়েও দেরি করে জাকিয়া, কোনও কোনও দিন বেমালুম ভুলে যায়, কোনও কোনও দিন একেবারে শেষ মুহূর্তে জানায়, আজ তার শরীর খারাপ। একমাস ধরে মানিকের মনে হচ্ছে, জাকিয়া আসলে চায় না তাদের সম্পর্কটা কোনও ফর্মে দাঁড়াক; চায় না এটা আর সামনের দিকে এগুতে থাক। মনে হওয়ার হাজারটা কারণ আছে, কিন্তু তার পরও সে সেগুলোকে মোটেও পাত্তা দিতে চায় না। কারণগুলোকে সে অবহেলায় ফেলে রাখতে চায় ঝরাপাতার মতো, উড়ে ওঠা ধুলির মতো, উদাসীন পথশিশুর মতো। এতক্ষণে সে নিশ্চিত হয়ে গেছে, জাকিয়ার আজ আর আসার কোনও সম্ভাবনা নেই। তবু তবু সে অপেক্ষা করবে। গ্যালারির মনিদা তার আসাযাওয়ার পথে প্রতিবারই তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসবে, একটুও না থেমে ‘আরে, আসো, অফিসের ভেতরে এসে বসো’ বলতে বলতে অতিক্রম করে যাবে তাকে। এইভাবে সন্ধ্যা আটটা পেরিয়ে যাওয়ার পর সে জাকিয়াকে আবারও ফোন করবে এবং ও এবার ফোন ধরবে আর খুবই সাদামাটা গলায় জানান দেবে, ‘এহ্, আমি তো ঘুমায়ে গেছিলাম’
তখন সে হয়তো বলবে, ‘তোমার না অফিস থেকে সরাসরি এখানে আসার কথা?’
‘তাই বলছিলাম নাকি? স্যরি, সোনা, আই’ম ভেরি স্যরি’
কিংবা শুনতে পাবে, ‘আর বোলো না, অর্ধেক রাস্তা আসার পর সামিনার সাথে দেখা হলো। ওর তো আবার সেপারেশন পিরিয়ড চলতেছে। তাই বাসায় নিয়া আসলাম।’
এইভাবে মানিক বুঝতে পারছে, তার নিজেরও সেপারেশন পিরিয়ড এসে গেছে। তাই সিগারেট টানাও বেড়ে গেছে। কিন্তু এমন সরল চেহারার একটা মেয়ে, এমন সরল কণ্ঠে সিগারেট চাইছে, অথচ সে দিতে পারছে না, তার খুবই খারাপ লাগে। সে ঘটনাটার একটা সুন্দর নিষ্পত্তির পথ খুঁজতে থাকে। দ্রুত দেখে নেয়, সামনের রাস্তায় কোনও টোকাই সিগারেট ফেরি করছে কি না। মনে মনে হিসাব কষে, এখান থেকে রাস্তায় নেমে কোনও টং দোকান থেকে সিগারেট কিনে আনতে কতটুকু সময় লাগতে পারে। কিন্তু সে কোনও যৌক্তিক সমাধান খুঁজে পাওয়ার আগেই মেয়েটি বলে ওঠে, ‘তা হলে ফেলে দেয়ার আগে আমাকে দু’-একটান মারতে দিয়েন ... নাকি অসুবিধা হবে?’
মানিক হেসে ফেলেছিল। তিথিও হেসেছিল, কিন্তু মাপা হাসি; ‘সিগারেট চাইছি বইলা তুই আবার আমি তো ওই রাস্তায়ই যামু বইলা লাফ দিয়া রিকশায় উইঠা বসিস না হারামজাদা’ মার্কা হাসি।
সন্ধ্যা নামছিল, দুর্বোধ্য এক পরিণত সন্ধ্যা। মুনীরের একটা পেইন্টিং লোকজের বারান্দায় টাঙানো ছিল। সে নির্লিপ্ত চোখে একবার সেই দিকে আরেকবার বাইরের রাস্তার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে সন্ধ্যা আটটা দশ মিনিট পার করে দিয়েছিল। অবশ্য এর মধ্যে একবার নিচে গিয়ে পুরো এক প্যাকেট সিগারেটও কিনেছিল। সেদিন আর সন্ধ্যা আটটার পর সে জাকিয়াকে ফোন করেনি। আটটা এগারোতে গ্যালারির সামনের রুমের মধ্যে থেকে তিথির গলা শুনতে পেয়েছিল, তার উদ্দেশেই বলছিল সে, ‘ভাইজান, আপনি সন্ধ্যা থেকে বারান্দায় একা একা দাঁড়িয়ে আছেন আমাদের সাথে এসে বসেন না খানিকক্ষণ!’
মানিক ভেতরে গিয়ে ছেলেমেয়েগুলোর সঙ্গে বসেছিল। জাকিয়ার কাছে তার আর ফোন করা হয়ে ওঠেনি। জাকিয়াও তার কাছে কোনওদিন আর ফোন করেনি। কোনওদিন ওকে এই লোকজে আর দেখা যায়নি। মানিক সিদ্ধান্তে এসেছে, দায়ে পড়েই লোকজে আসতো সে, মানিক আসে অগত্যা তাকেও আসতে হতো। অবশ্য এরপর একদিন রাস্তায় আর দুইদিন এক কফিশপে দেখা হয়েছে তাদের। কিন্তু তারা কেউ কাউকে আর চিনতে পারেনি।
তারপর একদিন দুইদিন করে দিন একেবারে কম হয়নি অন্তত বছরদেড়েক কেটে গেছে। এই বছরদেড়েকে মৃত্যু ঘটেছে তার বাবার, মরে গেছে তাদের ঘরের পাশের দীঘল গন্ধরাজ, বন্যা হয় না বলে বাড়ির পাশের ডোবাটা বলতে গেলে শুকিয়ে গেছে, বিছানায় পড়েছে মা। এইসব টানাপড়েনে সপ্তাহান্তে তার বাড়ি যাওয়া বেড়েছে, কিন্তু বাড়েনি মোবাইল ফোনে তিথির সঙ্গে কথাবার্তা বলা। শেষ কবে তিথির সঙ্গে কথা হয়েছে, তাও তার মনে নেই ভালো করে। মনে নেই, আদৌ তার তিথির সঙ্গে ফোনে কখনও কথাবার্তা হয়েছে কি না। কেবল সিগারেট টানাটানিই ছিল তাদের দু’জনের কমন ইন্টারেস্ট। দেখা হলে সিগারেট টানতে যতক্ষণ, বলতে গেলে কথাবার্তাও চলত ততক্ষণ; পকেটে সিগারেটের টান পড়লে একজনের আরেকজনকে মনে পড়ে যেত, এই লোকজে কিংবা এর আশপাশে থাকলে তারা তখন একজন আরেকজনের খোঁজ করত, পাশাপাশি দাঁড়িয়ে সিগারেট টানত। কখনও কথা বলতে বলতে, কখনও বা কথা ছাড়াই।
মাঝেমধ্যে এর বেশি কিছুও হতো বটে। সপ্তাহের অধিকাংশ দিনই কখনও কখনও তার ঝগড়া হতো টি-শার্ট পরা মণিদার সঙ্গে যাকে বলে মেজাজ খিঁচড়ানো ঝগড়া। মণিদা বলে বটে, কোনও পার্টি করে না সে আর রাজনীতি নিয়েও তার কোনও উৎসাহ নেই, কিন্তু বেশি কিছু না আড্ডায় সরকারের নামে একটা লাইন সামান্য টুপ করে ছাড়তে না ছাড়তেই জেগে ওঠে ঘুমন্ত মণিদা; এই এখনই যে মানুষটিকে দেখা যাচ্ছিল দু’-তিন ডজন সরব মানুষের সামনে বসে মাথা নিচু করে বই পড়ছে কিংবা ফাইলপত্র ঘাটছে, সেই মানুষটিই হঠাৎ সরব হয়ে উঠত মাথাটা তুলে।
সময় তখন উত্তাপ ছড়াচ্ছে পথঘাট হয়ে একেবারের ঘরের মধ্যিখানেও। আসি আসি করছে জরুরি শাসন। বাসার গেইট খুলে বাইরে এলেই দেখা যায়, ব্যারিকেড গড়ে তোলার নানা আয়োজন। নানা রকম ব্যারিয়ার দিয়ে যান চলাচল বন্ধ করে দেয়ার প্রাণান্তকর চেষ্টা। চোখে পড়ে রাস্তাজুড়ে ছড়িয়ে আছে ভাঙা ইট, লাঠি, পাইপ, লোহার রড, টায়ার নানা কিছু। কখনও চোখে পড়ে পুলিশ কিংবা বিজিবির গাড়ি তীব্র আর্তনাদ করে ছুটে আসছে যেন নিমিষে গুড়িয়ে দেবে রাস্তার সব ব্যারিকেড। কিন্তু না কিছুদূর এসেই থেমে যেত সেসব গাড়ি, দু’একজনকে দেখা যেত আস্তে আস্তে একটু করে মাথা বাড়াতে এবং তার পরপরই শামুক কিংবা কচ্ছপের মতো গুটিয়ে নিতে। বাস আর কার-রিকশাও দেখা যেত ব্যাক গিয়ার কষে তীব্র বেগে চলে যাচ্ছে অন্য কোনও দিকে।
কী ভীষণ উত্তেজনা ছড়ানো দিন, বেদনামথিত দিন! কাঁদুনে গ্যাসে ভরে যাচ্ছে আকাশ, কাঁদুনে গ্যাসের সঙ্গে নিচুস্বরে কথা বলছে বাতাস। বলছে, পারবে না মানুষ এখন কাঁদতে ভুলে গেছে, মানুষের কান্নার ওপর এখন ক্রোধের স্তর পড়তে শুরু করেছে আর কে না জানে, ক্রোধের জন্মই হয় মৃত্যুর কথা ভুলে গেলে। রক্তের স্রোত বইছে, বইতে বইতে থেমে গিয়ে প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়ে রাজপথে স্থির হয়ে গেছে। রাজপথ থেকে ধাওয়া খাওয়া জনস্রোত গলির মধ্যে ঢুকতে ঢুকতেও আবারও রাজপথে ফিরে আসছে। তাদের শরীর রক্তাক্ত, ঘর্মাক্ত, চোখের কোণে জমে আছে অনিশ্চিত রোদেলা ভবিষ্যৎ। স্কুল-কলেজ থেকে শুরু করে অফিস বলতে গেলে সবই বন্ধ হয়ে গেছে। তবে লোকজে মানুষের আনাগোণা বেড়ে গেছে। কোনও প্রদর্শনী নেই, তার পরও মানুষ আসছে কেননা মানুষের কোনও যাওয়ার জায়গা নেই। মণিদার চোখমুখ কেমন থমথমে হয়ে গেছে। মানুষজন সরকারকে নিয়ে কথা বললেও সে নড়েচড়ে বসে না; কোনও কথা বলে না। বরং মনে হয় আরও বেশি-বেশি করে ডুবে যায় বইয়ের পাতার ভেতর। এখন আর তিথিকে তেমন একটা চোখে পড়ে না। ভীষণ ব্যস্ত সে রাজপথে। কখনো দেখাসাক্ষাৎ হলে বলার মতো মনে হয় তার একটি কথাই আছে, ‘এই দুই-চার প্যাকেট সিগারেট কিনে দাও তো। ... সারা রাতদিন রাস্তাঘাটে থাকি, কত সিগারেট লাগে, বোঝ না!’
মানিকের অফিস তখন খোলাই ছিল। যদিও খোলা থাকা আর না থাকা তখন সমান। সকালবেলা ঠিকঠাক অফিসে গেলে দুপুরের পর সে বেরিয়ে পড়ত। ঘন্টাখানেকের হাঁটা পথ। রাস্তার পাশে কোথাও কোথাও ছাতিম কিংবা অশোকের অপ্রত্যাশিত ছায়া, আকাশমণির ডালপালার নির্দয় ছন্নছাড়া আগ্রাসন কিংবা দেবদারু ও বকুলের নিঃসঙ্গ বিস্তার এখন আর কারও চোখে পড়ে না। শ্লোগানে শ্লোগানে মুখরিত জটপাঁকানো মানুষ দেখতে দেখতে ঘন্টাখানেকের সেই পথ ঘন্টাদেড়েকের হয়ে যায়। তবু সে প্রতিদিনই লোকজে আসে। রাজপথে থাকুক বা না থাকুন, প্রতিদিন এই লোকজে বসে খানিকক্ষণ সরকারের পিন্ডি না চটকালে তার ভালোই লাগে না। সেই লোকজ বন্ধ হয়ে আছে ভাবতেই এখন কেমন লাগে!
পাছা লাল করল বলেই তো প্রোফাইল লাল হলো।
এরকম আগে কখনও লক্ষ্য করেনি মানিক বার বার নিজের তর্জনীর ওপর বৃদ্ধাঙ্গুলি ঘষছে তিথি; কিংবা এরকমও বলা যায়, বৃদ্ধাঙ্গুলিটাকে স্পর্শ করছে তর্জনী দিয়ে। তখন আঙুলের ত্বকে লালচে আভাস ফুটে উঠেই ফের মিলিয়ে যাচ্ছে কোনও এক অন্তর্দেশে। কোথাও বোধহয় গান বাজছে, মানে এই কফিশপেই। অন্য কোনও সময় হলে শুধু এটুকু দেখেই খানিকটা সময় সে পার করে দিতে পারত। কিন্তু আজকের দিনটা অন্যরকম। আজকে তার চাকরি চলে গেছে। দেশে নিশ্চয়ই ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকট হচ্ছে। তা না হলে তার দশা নদীনালা আর ঝড়বৃষ্টির দেশে জন্ম নেওয়া একটা ক্যাকটাসের মতো হবে কেন? একটা ক্যাকটাসের মতো ছন্নছাড়া হতে যাবে কেন? তার মানে আগামী মাস থেকেই তাকে বাসাভাড়া দেয়া নিয়ে চিন্তা করতে হবে। আর খালি কি বাসাভাড়া? বাড়িতে মা-ও তো আছে। মাকে দেখভাল করার জন্যে কয়েক মাস ধরে একটা কাজের মানুষ রাখতে হয়েছে সেই মহিলাকে প্রতি মাসে খাওয়াদাওয়া বাদেই দিতে হয় ১১ হাজার টাকা। অবশ্য গত দুই মাস ধরে সে আরও এক হাজার টাকা বাড়িয়ে দেয়ার দাবি জানিয়ে আসছে এবং মনে হচ্ছে এর পরের মাসে দাবি জানানোর পরও কোনও সাড়াশব্দ না মিললে সে নিজে থেকেই বিদায় নেবে। মা বিছানায় পড়ার আগে এক অর্থে সে ভালোই ছিল, কেননা এই ১১ হাজার টাকা তো অন্য কাউকে দিতে হতো না, হেসেখেলে টাকাটা তখন খরচ করা যেত।
তা যাক, যা হওয়ার হয়েছে; যা হওয়ার হবে। বাইরে বোধহয় আজ বেশ রোদ উঠেছে, কিন্তু কফিশপের ভেতর থেকে তাঁতানো রোদপড়া রাজপথকেও মনে হচ্ছে সিগ্ধ উষ্ণ কোনও প্রান্তর। কিন্তু এ ব্যাপারটাই মেলানো যাচ্ছে না, কী কারণে চাকরি যাবে। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় হলে, পাবলিক প্রসিকিউটর জাতীয় পোস্ট হলে কিংবা নিদেনপক্ষে টিভি-নিউজপেপার হলেও না হয় বলা যেতো, জরুরি শাসনের কাফফারা দিতে হচ্ছে তাকে। কিন্তু তাদের এটা তো সদাগরি অফিস, মালিকের মনমর্জিতে চলাফেরা করা অফিস, এইখানে ওলোটপালোট ঘটার তেমন কোনও সুযোগ নেই। যতটা ব্যাপার-স্যাপার ছিল বা আছে, তা সরাসরি চেয়ারম্যান আর এমডিকে নিয়ে। তারা আবার পিতাপুত্র। তবে সরকার বদলানোর পর পরিস্থিতি সামলানোর পর জারি করা জরুরি শাসনের মধ্যেও ভোল-বোল পাল্টে গেছে তাদের। বড়ই এলেমদার মানুষ এরা, কী করে যেন সব টের পেয়ে যায়। এবারও টের পেয়েছে আর নিজেদের পাল্টে ফেলেছে। আন্দোলনের দিনগুলোতে অফিসে এসে বসে বসে টিভি দেখা ছাড়া আর কোনও কাজ ছিল না তাদের। কিন্তু একদিন হঠাৎ করেই হন্তদন্ত হয়ে এমডি এলেন, বাণী দিতে লাগলেন ‘কাজ নেই মানে? ট্রেন-বাস-বিমান বন্ধ আছে মানে? ইন্টারনেট বন্ধ আছে মানে? তাতে সমস্যা কী? যাও হোটেল খুঁজে বের কর, এখন থেকে প্রতিদিন সকালে একহাজার সকালের নাস্তার প্যাকেট আর দুপুরবেলা একহাজার দুপুরের খাওয়ার প্যাকেট রেডি করতে হবে। দুই হাজার পানির বোতলও লাগবে। সেসব পাঠাতে হবে রাজপথের মানুষজনের কাছে।’ এইভাবে তাদের সদাগরি কারখানার ভোল পাল্টে যেতে লাগল। ফলাফল এই, এখন নতুন আরেকটা সরকার না আসা পর্যন্ত তাদের ভোল পাল্টাপাল্টির কোনও সুযোগ নেই।
মানিক টেবিলের ওপর মধ্যমা আর তর্জনী ঠুকতে থাকে এলোমেলো ছন্দে। ওঠা দরকার, অফিসে ফেরা দরকার; কিন্তু তার আগে কী বলা যায় তিথিকে! খুব অস্থির লাগে তার। তবে অস্থিরতার মধ্যেও তার মারুফের কথা মনে হয়। ঠাণ্ডা মাথার মানুষ, অনেকেই তার সঙ্গে অনেক কথা বলে নিজের ক্ষোভ, ক্রোধ, ক্রন্দন হালকা করে। ওর হয়তো কিছু জানা থাকতে পারে।
‘মারুফ, আপনি অফিসেই নাকি?’
ওদিক থেকে উত্তর আসতে সামান্য সময় লাগে, কিন্তু যখন আসে তখন মনে হয় তড়িঘড়ি করে কথা বলছে মারুফ, ‘অফিসেই তো। বসেন, আমি আপনার সিটে আসছি।’
‘না না আমি একটু অফিসের বাইরে এসেছি।’
‘ওহ্, তাইলে ব্যাপারটা কেমন হলো! ... আমি ভাবলাম, সিটেই আছেন! একটু আলাপ করি। আমি তো আজ একটা চিঠি পেলাম।’
‘তাই! আমিও তো একটা চিঠি পেয়েছি। এরা তো ভাই আচ্ছালামু আলাইকুমও দিলো না। আজকেই পাওনাদেনা সব বুঝে নিতে বলেছে।’
‘আরে, আমাকেও তো একই চিঠি দিয়েছে। মনে হয়, দাঁড়ি কমা সেমিকোলন সবই মিলবে নাম আর পদটা ছাড়া। ব্যাপার কী বলেন তো? ফেসবুকে আপনার প্রোফাইলও তো লালই দেখছিলাম। তাহলে?’
অন্যদিক থেকে কী উত্তর আসে, তিথির সেটা জানার কথা নয়। কিন্তু তার মুখে স্মিত হাসি ফুটে উঠেই হারিয়ে যায়।
‘আচ্ছা, ঠিক আছে, অপেক্ষা করেন, আসছি। এখন তো আর তাড়াহুড়ার কিছু নাই। আমি কিছুক্ষণের মধ্যেই আসছি।’ ফোনে কথা শেষ করে মানিক এবার পুরো মনযোগ দেয় কফির কাপে। তিথির মুখে আবারও স্মিত হাসি ফুটে ওঠে, ‘কী, চাকরি চলে গেছে? মণিদার কথা মনে আছে তো, কী বলতো? প্রোফাইল লাল কইরা লালের অপব্যবহার করতাছো সেদিন আর বেশি দূরে নাই, দেখবা প্রোফাইলের সাথে সাথে তোমাদের মতো লাল বদরগুলার পাছাটাও লাল হয়্যা গেছে।’
বলতে বলতে তিথি এবার জোরে হেসে ওঠে।
মানিকও হাসতে থাকে, হাসতে হাসতে বলে, ‘ক্যান? উত্তরে আমি কী বলছিলাম, সেটা মনে নাই? পাছাডারে তো আপনেরা প্রোফাইলের আগেই লাল কইরা দিছেন। প্রোফাইল তো লাল করলাম সেই দুঃখে। কিন্তু পাছা লাল করার সুখ নিয়াও আপনেরা ক্যান প্রোফাইল কালা করছিলেন? আপনেরা ক্যান কালা বদর হইছিলেন?’
মাথাটা তিথির ঝিমঝিম করে ওঠে। কী ভয়ঙ্কর দিনগুলো! ভয়ঙ্কর, কিন্তু কী সুন্দর একান্ত আপনার দিন, কী সুন্দর নিজেকে খুঁজে পাওয়ার দিন। কতদিন পর প্রতিবাদ করার শক্তি সে ফিরে পেয়েছিল। কাঁদানে গ্যাসের ধোঁয়া উড়ে আসছিল, চোখ জ্বলছিল, জ্বলন্ত চোখে সে তাকিয়ে দেখেছিল, রাজপথে পড়ে আছে কেউ। কী করে যে প্রাণের মধ্যে ওই সাহস এসেছিল তার, নিয়ে আসতে হবে নিয়ে আসতে হবে আহত কিংবা মৃত ছেলেটাকে। পায়ে পায়ে ছড়িয়ে থাকা মৃত্যুর মধ্যেও কী নির্ভয় দিন ছিল সেইসব। এখন জীবনে যাই ঘটুক, যত কষ্টই আসুক, যত ভয়ই জাগুক, কোনও অনুতাপ নেই তার। জীবনে অন্তত একবার হলেও তো সে সত্যিকারের সাহস কাকে বলে, সেটা অনুভব করেছিল। মাথা ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বলে সে, ‘নাহ্, বাদ দাও ওইসব। শোন, বললাম তো আমি কনসিভ করছি’
‘কনগ্রাচুলেশনস্, এ তো ভালো খবর। চলো, স্মোকিং জোনে যাই। সিগারেট খাই, সেলিব্রেটি করি।’
‘সিগারেট কি আর খাইতে দিবা? যা শুরু করছো তোমরা! ... তা ছাড়া এইটা ভালো খবরও না। ওটা একটা হারামজাদা। ওইসময়ে পরিচয় হয়েছিল। গরম গরম কথাবার্তা বলতো, নানা তত্ত্ব শুনাতো। খুব ভালো লাগত। আসলে একটা হারামজাদা।’
‘বিয়ে’
‘না, ওইসব করি নাই। বললাম তো, একটা হারামজাদা, গুণ একটাই এত সুন্দর করে কথা বলতে পারে! আসলে পরিস্থিতিটাও এমন ছিল, ঠাহর করার সময়ও পাই নাই।’
‘ঠিক আছে, নাম ঠিকানা দাও। দেখি, একটা ব্যবস্থা করা যায় নাকি।’
‘মাথা খারাপ তোমার? বিয়ে করি নাই, ভালো হইছে। তুমি তারচে’ একজন ডাক্তার খুঁজে দাও। এইটার কোনও চিহ্ন আমি রাখতে চাই না।’
মানিক বুঝানোর চেষ্টা করে, তা কেন? যা হওয়ার হয়েছে, তাই বলে এবরশন করতে হবে? কতজন তো যুদ্ধশিশুকেও বাঁচিয়ে রেখেছে রাখে। তিথি না হয় মানিকের সঙ্গেই একটা কাগুজে সম্পর্ক তৈরি বানিয়ে নিক। সন্তান হোক, তারপর না হয় সেটা ছিঁড়ে ফেলে দেবে।
তিথি মায়াবী চোখে তার দিকে তাকিয়ে থাকে; তাকিয়ে তাকিয়ে কথা শোনে। তাকিয়ে থাকতে থাকতে তার চোখ দুটো একসময় কেমন নির্বিকার হয়ে ওঠে। নির্বিকার কিন্তু অপ্রতিরোধ্য হাসিমাখা চোখে বলতে থাকে সে, ‘রাখো তোমার যুদ্ধশিশু! একটুও কাঁদিনি। বাঁধা দেইনি। দিনের পর দিন শুয়েছি। এখন দেখছি একটা আস্ত হারামী। এখন হারামীটার মনে হয়, আমার ঠোঁটে সিগারেটের গন্ধ। এখন হারামীটা একেকদিন একেক ন্যারেশন বানায়। ব্যাটা এখন নতুন নতুন ইতিহাস লেখে। এই হারামীর বীজ আমি রাখব? চিন্তা কোরো না, এখনও ম্যাচিউরড হয়নি। একটা ডাক্তার ঠিক করে দাও। তোমাকে ছাড়া এসব আমি আর কার কাছে বলতে পারি, বলো?’
বলে তিথি মুখটা নিচু করে টেবিলের দিকে তাকিয়ে থাকে।
না, কাঁদছে না। তবে মানিকের মনে হয়, কান্নার শব্দ শুনতে পাচ্ছে সে।
*****
লেখক পরিচিতি: ইমতিয়ার শামীম, জন্ম ১৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৫ সালে, সিরাজগঞ্জ জেলার উল্লাপাড়া উপজেলায়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। আজকের কাগজে সাংবাদিকতার মাধ্যমে কর্মজীবনের শুরু নব্বই দশকের গোড়াতে। তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘ডানাকাটা হিমের ভেতর’ (১৯৯৬)-এর পান্ডুলিপি পড়ে আহমদ ছফা দৈনিক বাংলাবাজারে তাঁর নিয়মিত কলামে লিখেছিলেন, ‘একদম আলাদা, নতুন। আমাদের মতো বুড়োহাবড়া লেখকদের মধ্যে যা কস্মিনকালেও ছিল না।’ ইমতিয়ার শামীম ‘শীতের জ্যোৎস্নাজ্বলা বৃষ্টিরাতে’ গল্পগ্রন্থের জন্য প্রথম আলো বর্ষসেরা বইয়ের পুরস্কার (২০১৪), সাহিত্যে সামগ্রিক অবদানের জন্য ২০২০ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কারসহ দেশের প্রায় সকল প্রধান সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন।


0 মন্তব্যসমূহ