ইয়াসুনারি কাওয়াবাতা'র গল্প : রুপার পঞ্চাশ-সেনের মুদ্রা


অনুবাদ : আনন্দ রোজারিও

প্রতি মাসের শুরুতে যোশিকো দুই ইয়েন হাতখরচ পেত। মা নিজে হাতে চারটি রুপার পঞ্চাশ-সেনের মুদ্রা তার মানিব্যাগে রেখে দিতেন—এটাই ছিল তাদের নিয়ম।

সেই সময় বাজারে এই মুদ্রাগুলো কমে আসছিল। দেখতে হালকা মনে হলেও হাতে নিলে বেশ ভারী লাগত। যোশিকোর মনে হত, মুদ্রাগুলো তার লাল চামড়ার মানিব্যাগটাকে একটা ভারিক্কী মর্যাদায় ভরিয়ে দেয়। সে হাতখরচ নষ্ট করতে চাইত না। তাই মাসের শেষ পর্যন্ত প্রায়ই মুদ্রাগুলো মানিব্যাগেই পড়ে থাকত। অফিসের বন্ধুরা মিলে সিনেমা দেখা বা কফি খেতে যাওয়া—এসব মেয়েলি আনন্দ সে সরাসরি এড়িয়ে চলত না, কিন্তু মনে করত এগুলো তার জীবনের বাইরের ব্যাপার। কখনও করেনি বলে কখনও টানও অনুভব করেনি।

সপ্তাহে একদিন অফিস ফেরার পথে সে একটা ডিপার্টমেন্ট স্টোরে থামত। সেখানে দশ সেনে একটা নোনতা ফরাসি রুটি কিনত—সেটা তার খুব পছন্দের ছিল। এর বাইরে নিজের জন্য আর তেমন কিছু চাওয়ার ছিল না তার।

তবে একদিন মিতসুকোশির স্টেশনারি বিভাগে একটা কাচের পেপারওয়েট তার চোখ টেনে ধরল। ষড়ভুজাকার সেই পেপারওয়েটের গায়ে খোদাই করা একটা কুকুর। কুকুরটা দেখে মুগ্ধ হয়ে যোশিকো সেটা হাতে তুলে নিল। শীতল স্পর্শ আর অপ্রত্যাশিত ভার—এই দুটো মিলে তার মনে হঠাৎ এক আনন্দের ঢেউ জাগল। এই ধরনের সূক্ষ্ম কাজ সে সবসময় ভালোবাসত এবং এটা তাকে মুগ্ধ করে ফেলল। সে হাতের তালুতে ওজন মাপল, সব দিক থেকে দেখল, তারপর অনিচ্ছায় বাক্সে ভরে রেখে দিল। দাম চল্লিশ সেন।

পরের দিন ফিরে এল, আবার একইভাবে দেখল। তার পরের দিনও এল। এভাবে দশদিন কাটল। তারপর সে মনস্থির করল।

"এটা নেব," সে দোকানদারকে বলল। বুকটা তখন দুরুদুরু করছে।
বাড়ি ফিরলে মা আর বড় দিদি হাসতে লাগলেন।
"এই খেলনার পেছনে টাকা খরচ করলি?"
কিন্তু নিজেরা হাতে নিয়ে দেখার পর বললেন, "আরে, সত্যিই বেশ সুন্দর তো। আর কী চমৎকার কাজ।"

আলোতে তুলে ধরলেন। পালিশ করা স্বচ্ছ কাচ আর খোদাইয়ের ঘোলাটে অংশ সূক্ষ্মভাবে একে অপরকে মেলে ধরেছে। দুটো মিলে একটা সুন্দর সামঞ্জস্য তৈরি করেছে। আর ষড়ভুজের প্রতিটা কোণ নিখুঁত। যোশিকোর কাছে এটা ছিল একটা সুন্দর শিল্পকর্ম।

সে সাত-আট দিনেরও বেশি সময় নিয়ে নিশ্চিত হয়েছিল যে পেপারওয়েটটা তার করে নেওয়ার যোগ্য। তাই অন্য কেউ কী ভাবল সেটা তার কাছে বড় কথা ছিল না। তবু মা আর দিদির কাছ থেকে এই স্বীকৃতি পেয়ে নিজের রুচির উপর একটু গর্ব অনুভব করল সে।

মাত্র চল্লিশ সেনের একটা জিনিস কিনতে দশদিন লাগানো—এই বাড়াবাড়ি সতর্কতার জন্য কেউ হাসলেও যোশিকো অন্যভাবে করতে পারত না। হুট করে কিনে পস্তাতে হবে—এটা তার পক্ষে সম্ভব ছিল না। সতেরো বছরের যোশিকো এমনিতে এতটা খুঁত খুঁতে ছিল না যে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে এতদিন সে লাগাবে।। আসলে সে ভয় পেত—রুপার পঞ্চাশ-সেনের মুদ্রাগুলো যেন অযত্নে খরচ না হয়ে যায়। সেগুলো তার মনে গভীরভাবে গেঁথে গিয়েছিল।

তিন বছর পর পেপারওয়েটের গল্পটা উঠলে সবাই হেসে গড়িয়ে পড়ল। মা তখন সত্যিকারের আবেগে বললেন, "ওই সময় তোকে এত আদরের লাগছিল।"
যোশিকোর প্রতিটা জিনিসের সঙ্গে এরকম একটা করে মজার গল্প জড়িয়ে ছিল।

.
উপর থেকে নামতে নামতে কেনাকাটা করাটা সহজ—তাই তারা আগে লিফটে উঠে মিতসুকোশির পঞ্চম তলায় গেল। সেদিন একটু মন বদলাতে যোশিকো মায়ের সাথে রবিবারের কেনাকাটায় বেরিয়েছিল।

নিচতলায় পৌঁছালে কেনাকাটা শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু মা স্বাভাবিকভাবেই বার্গেন বেসমেন্টের দিকে নামতে লাগলেন।

"এত ভিড় এখানে, মা। আমার এই জায়গাটা ভালো লাগে না," যোশিকো বিরক্ত হয়ে বলল। কিন্তু মা ততক্ষণে বেসমেন্টের উত্তেজনায় ডুবে গেছেন, মনে হল কথাটা কানেই গেল না।

এই বার্গেন বেসমেন্ট আসলে মানুষের টাকা নষ্ট করানোর জন্যই বানানো। তবু মা হয়তো কিছু একটা পাবেন। যোশিকো একটু দূরে দূরে থেকে মায়ের উপর নজর রাখল। শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ছিল বলে গুমোট লাগছিল না।

প্রথমে মা পঁচিশ সেনে তিন প্যাকেট কাগজ কিনলেন। তারপর যোশিকোর দিকে তাকালেন। দুজনেই মুচকি হাসল। ইদানীং মা তার কাগজ ব্যবহার করছিলেন। এটা যোশিকোর বিরক্ত লাগত। এখন আর সেই সমস্যা নেই—দুজনের চোখেই সেই কথা ফুটে উঠল।

রান্নাঘরের সরঞ্জাম আর অন্তর্বাসের কাউন্টারে ভিড় দেখে মা সেখানে ঢুকতে সাহস পেলেন না। পায়ের আঙুলে ভর দিয়ে মাথা উঁচু করে উঁকি মারলেন, কারো হাতার ফাঁক দিয়ে হাত বাড়ালেন, কিন্তু কিছু কিনলেন না। বেরিয়ে যাওয়ার পথে হাঁটলেন, মনে হল ছেড়ে যেতে মন মানছে না।

"ওহ, এগুলো মাত্র পঁচাত্তর সেন? আরে বাবা..." বেরোনোর পথে সাজানো ছাতাগুলোর একটা তুললেন মা। স্তূপ থেকে যতগুলো ছাতাই বের করলেন, একইদামের ট্যাগ দেখলেন। তখন হঠাৎ চাঙা হয়ে উঠে বললেন, "এত সস্তা না, যোশিকো? সস্তা না বল?"—মনে হল বেরিয়ে না যাওয়ার অজুহাত খুঁজে পেলেন। "তোরও কি সস্তা মনে হচ্ছে না?"

"সত্যিই সস্তা।" যোশিকোও একটা তুলে দেখল। মা সেটা নিয়ে নিজেরটার পাশে মেলে ধরলেন।
"শুধু কাঠামোটার দামই এর চেয়ে বেশি হওয়ার কথা," মা বললেন। "কাপড়টা—রেয়ন বটে, তবে ভালোই বোনা, না?"

এত কম দামে এত ভালো জিনিস কীভাবে দেওয়া সম্ভব—এই প্রশ্নটা মাথায় আসতেই যোশিকোর মনে একটা অদ্ভুত বিরক্তি জাগল। মনে হল খারাপ জিনিস গছিয়ে ঠকানো হচ্ছে। মা স্তূপ থেকে একটার পর একটা ছাতা বের করে মেলছেন, নিজের বয়সের উপযুক্ত একটা খুঁজছেন একমনে। কয়েক মিনিট অপেক্ষা করে যোশিকো বলল, "মা, বাড়িতে কি রোজকারের একটা ছাতা নেই?"

"আছে একটা, কিন্তু সেটা..." মা যোশিকোর দিকে তাকালেন। "দশ বছর হল, না, আরও বেশি। পনেরো বছর হয়ে গেছে। পুরনো হয়ে গেছে, ধরনটাও এখন আর চলে না। আর এটা কাউকে দিলে কত খুশি হবে ভাব।"
"তা ঠিক। উপহার দেওয়ার জন্য কিনলে আলাদা কথা।"
"যে কেউ পেলেই খুশি হবে, নিশ্চয়ই।"

যোশিকো হাসল, কিন্তু মনে মনে ভাবল—মা কি সত্যিই কারো কথা ভেবে ছাতা বাছছেন? নিশ্চয়ই কাছের কেউ নয়। কাছের কেউ হলে মা "যে কেউ" বলতেন না।
"এটা কেমন হয়, যোশিকো?"
"হুম, জানি না।"

যোশিকোর তেমন উৎসাহ হচ্ছিল না, তবু সে এগিয়ে গেল। মায়ের জন্য মানানসই একটা ছাতা খুঁজে দেওয়াই ভালো।

পাতলা গ্রীষ্মকালীন রেয়নের পোশাক পরা অন্য ক্রেতারা পাশ দিয়ে যাচ্ছিল, সস্তার কথা বলতে বলতে তারা চটপট ছাতা তুলে নিচ্ছিল। মায়ের মুখ লাল হয়ে উঠেছে, টেনশনে ভরা চেহারা—এতক্ষণ সাহায্য করতে দেরি করায় যোশিকোর নিজের জন্যই একটু লজ্জা লাগল, সাথে রাগও।

সে মায়ের দিকে ঘুরল, বলতে যাচ্ছিল, "যেকোনো একটা কিনে ফেলো না, তাড়াতাড়ি?"
"থাক, যোশিকো।"
"কী?"

মা মৃদু হাসলেন। যোশিকোর কাঁধে হাত রাখলেন, যেন কিছু একটা ঝেড়ে দিচ্ছেন, তারপর কাউন্টার ছেড়ে সরে গেলেন। এবার যোশিকোরই মন চাইছিল থাকতে, কিন্তু পাঁচ-ছয় পা হাঁটতেই স্বস্তি লাগল।

মায়ের হাতটা কাঁধ থেকে নামিয়ে শক্ত করে চেপে ধরল সে। একটা বড় দুলুনি দিল। দুজন কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দরজার দিকে পা চালাল।

এটা সাত বছর আগের কথা, ১৯৩৯ সালে।

.
বৃষ্টি যখন তার পোড়া টিনের ছাপরার ছাদে আছড়ে পড়ে, যোশিকোর মনে হয়—সেদিন যদি একটা ছাতা কিনতেন মা! এখন একটা ছাতার দাম একশো-দুইশো ইয়েন—এই নিয়ে মায়ের সাথে হাসাহাসি করা যেত। কিন্তু মা আর নেই। টোকিওর কান্ডা এলাকায় আগুনের বোমায় তিনি মারা গেছেন।

ছাতা কিনলেও হয়তো আগুনেই পুড়ে যেত।

কাচের পেপারওয়েটটা কোনোমতে বেঁচে গিয়েছিল। ইয়োকোহামায় শ্বশুরবাড়ি পুড়ে যাওয়ার সময় সে দৌড়ে দৌড়ে থলের মধ্যে যা ঢুকিয়েছিল, তার মধ্যে এটাও ছিল। এখন এটাই তার বাপের বাড়ির একমাত্র স্মৃতি।

সন্ধ্যা হলেই গলির মধ্যে পাড়ার মেয়েদের অদ্ভুত চিৎকার ভেসে আসে। শোনা যায়, এক রাতেই নাকি হাজার ইয়েন রোজগার হয় তাদের। মাঝে মাঝে যোশিকো হাতে তুলে নেয় সেই চল্লিশ সেনের পেপারওয়েটটা—যেটা সে কিনেছিল দশদিন ভেবে, এই মেয়েগুলোরই বয়সে। খোদাইয়ের মিষ্টি ছোট্ট কুকুরটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ মনে পড়ে যায়—এই পোড়া পাড়ায় এখন একটাও কুকুর নেই।

**********

লেখক পরিচিতি : ১৯৬৮ সালে সাহিত্যে নােবেল বিজয়ী প্রথম জাপানী লেখক ইয়াসুনারি কাওয়াবাতার জন্ম ১৮৯৯ সালে জাপানের ওসাকায়। তার প্রথম গল্প যখন প্রকাশিত হয় তখন তিনি হাইস্কুলের ছাত্র। ১৯২৪ সালে টোকিও ইম্পেরিয়াল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯২৫ সালে প্রকাশিত হয় তার প্রথম গ্রন্থ ‘দ্য ইজো ড্যান্সার।’ অধিকাংশ উপন্যাসেই মানুষের জীবন এবং সৎ জীবন এবং সংস্কৃতিতে যৌনতার বিষয়টিকে তিনি শৈল্পিক দক্ষতায় ফুটিয়ে তুলেছেন। তার রচনায় জাপানের প্রাচীন ঐতিহ্য এবং আধুনিক ভাবধারার, বাস্তবতা এবং কল্পনার অদ্ভুত মিশেল লক্ষ্য করা যায়। ১৯৭২ সালে কাউয়াবাতা আত্মহত্যা করেন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ