অনুবাদ : উৎপল দাশগুপ্ত
সাম্প্রতিক দশকগুলিতে, ক্ষুধার্ত শিল্পীদের প্রতি আগ্রহ অনেক কমে গেছে। একসময় যেখানে শিল্পীর ব্যক্তিগত নির্দেশনায় এই ধরণের বড় বড় অনুষ্ঠান আয়োজন করা লাভজনক ছিল, আজকাল তা একেবারেই সম্ভব নয়। সেই সময়টি ছিল অন্য ধরণের। সেই সব সময়ে, ক্ষুধার শিল্পী সমগ্র শহরের মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারত। একটি ক্ষুধার দিনের থেকে পরবর্তী ক্ষুধার দিনের আকর্ষণ বেড়ে যেত। প্রত্যেকেই ক্ষুধার শিল্পীকে প্রতিদিনি অত্যন্ত একটিবার দেখতে চাইত। শেষের দিনগুলিতে, যারা সদস্যপদ নিয়েছিল তারা, সারাদিন ছোট খাঁচার গরাদের সামনেই বসে থাকত। এমনকি রাত্তিরেও ওকে দেখার জন্য সফরের বন্দোবস্ত করা হতো—মশাল জ্বালিয়ে প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করা হতো। সেই সব দিনে যখন আবহাওয়া ভাল থাকত, খাঁচাটা বাইরে নিয়ে আসা হতো। বিশেষত বাচ্চাদের জন্যই সেই সব দিনে ক্ষুধার শিল্পীকে প্রদর্শন করা হতো। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রাপ্তবয়স্কদের বিনোদনের বস্তু হিসেবেই ওকে গণ্য করা হতো, নেহাতই প্রচলিত রেওয়াজ মনে করেই ওঁরাও প্রদর্শনিতে হাজিরা দিতে আসতেন। লোকটা কীভাবে পাংশু মুখে কালো রঙের একটা ফতুয়া গায়ে চাপিয়ে, পাঁজরসর্বস্ব চেহারা নিয়ে মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা খড়ের ওপর বসে থাকত, এমনকি চেয়ারটাকেও তাচ্ছিল্য করত, শিশুরা অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখত। সাহস পাবার জন্য একে অপরের হাত আঁকড়ে ধরে মুখ ব্যাদান করে দেখত যে নম্রভাবে একবার ঘাড় হেলিয়ে সওয়ালের জবাব দেবার চেষ্টা করছে, আর ও যে কতটা রোগা সেটা বোঝাবার জন্য খাঁচার ফাঁক দিয়ে একটা বাহু বাড়িয়ে ধরেছে। পরের মুহূর্তেই লোকটা আবার নিজের মধ্যেই নিজেকে হারিয়ে ফেলত, মনোযোগ দিয়ে কারোর দিকেই তাকাত না, এমনকি যে দেওয়াল ঘড়িটা ঢং ঢং করে সময়ের হিসেবের জানান দেয়, খাঁচার একমাত্র আসবাব যেটা ওর কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ, সেটার দিকেও তাকাত না। কেবল অর্ধনিমীলিত চোখে সামনের দিকে চেয়ে থাকত আর ঠোঁট ভিজিয়ে নেবার জন্য একটা ছোটা গেলাস থেকে এক-আধ ঢোঁক জল খেয়ে নেয়। দর্শক বদলে যেতে থাকত, তবে জনতার নির্বাচিত স্থায়ী প্রহরীরা থাকত। আশ্চর্য ব্যাপার হল এই যে ওরা সাধারণোত কসাইই হতো। এক সাথে তিনজন করে থাকত। সারা দিন সারা রাত ওদের কাজ ছিল ক্ষুধার শিল্পীকে নজরবন্দী রাখা যাতে কোনও ভাবেই ও পুষ্টিকর কিছু মুখে না তুলতে পারে। এটাকে অবশ্য আনুষ্ঠানিকতা ছাড়া আর কিছুই নয়, কেবল দর্শকদের বিশ্বাস উৎপাদনের একটা রীতি। যারা ওয়াকিবহাল, তারা ভাল করেই জানে যে শত প্রলোভন দেখালেও, বা কোনও প্রকার জোরাজুরি করেও ক্ষুধার শিল্পীকে এক গ্রাস খাবারও খাওয়াতে পারা যাবে না। শিল্পের মর্যাদা রক্ষার জন্যই ওর নিজের ওপর এই নিষেধাজ্ঞা। সব প্রহরীই ব্যাপারটা যে সমানভাবে অনুধাবন করতে পারবে সেটা অবশ্য জরুরি নয়। রাত্রের অনেক প্রহরীই কর্তব্য পালনে কমবেশি আলসেমি করত। বেশ খানিকটা দূরেই একজোট হয়ে বসে তিনপাত্তি খেলতে লেগে যেত। হয়ত ক্ষুধার শিল্পীকে কিছু খেয়ে নেবার সুযোগ দেবার জন্যই। গোপনে খাওয়ার যোগান এসেই যায়—এরকম একটা ধারণা হয়ত ওদের মাথায় খেলত। এই সব প্রহরীরাই ক্ষুধার শিল্পীর কাছে সব চেয়ে বেশি যন্ত্রণাদায়ক হতো। ভেতরে ভেতরে ও বিষণ্ণ বোধ করত। অনশন করে থাকাটা ওর কাছে খুবই কঠিন মনে হতো। শীর্ণ চেহারাকে অগ্রাহ্য করে ওদের প্রহরার সময়টা গান গেয়ে কাটিয়ে দিত। যেন একটানা গুনগুন করে বুঝিয়ে দিত ওদের সন্দেহপরায়ণতা কতটা অন্যায্য। তবে এতে ওর লাভ খুব একটা হত না। খাওয়া আর গান গাওয়া দুটোই ও সমান দক্ষতার সঙ্গে চালিয়ে যাচ্ছে ভেবে বিস্মিত হত। যেসব পাহারাদারেরা খাঁচার কাছেই বসত, হলঘরে রাতে টিমটিম করে আলো জ্বলত বলে বিরক্ত হত, তার বদলে নিজেদের কাছে রাখা বৈদ্যুতিক পকেট-টর্চ জ্বালিয়ে ওর ওপর আলো ফেলত, তারাই ছিল ওর পছন্দের পাহারাদার। চড়া আলোতে ওর একটুও অসুবিধে হতো না। পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, ঘুমোনোটা অসম্ভব। তবে যে কোনও আলোতেই, সময় যাই হোক না কেন আর হলঘরে ভিড় বা কোলাহল থাকলেও, ও একটুআধটু ঝিমিয়েও নিতে পারত। এই পাহারাদাররা থাকলে ও খুশিমনেই সারা রাত না ঘুমিয়েই কাটিয়ে দিতে পারত। ওদের সঙ্গে রসিকতা করত, নিজের ঘোরাঘুরি নিয়ে গল্প করত, তার বদলে ওদের গল্পও শুনত। কেবল ওদের জাগিয়ে রাখার জন্যই এই সব করত। সর্বদা বুঝিয়ে দিতে পারত যে খাঁচার ভেতর খাবার-দাবার কিছুই থাকে না। আর ও এমনভাবে উপবাসে আছে যেটা সম্ভবত ওরা করতেই পারবে না। অবশ্য ওর সবচাইতে আনন্দের মুহূর্তটা হতো সকাল হবার পর, যখন ওর খরচে রাজসিক ব্রেকফাস্টের আয়োজন করা হতো ওদের জন্য আর ওরা রাতভর পাহারা দেওয়ার পর স্বাস্থ্যবান পুরুষদের মত ক্ষুধার তাড়নায় ছুটে চলে আসত। তবে এমন কিছু মানুষও ছিল যারা সন্দেহ করত প্রহরীদের ওপর প্রভাব বিস্তার করার জন্যই এই ব্রেকফাস্টের আয়োজন। এটাকে অবশ্য একটু বাড়াবাড়িই বলা যেতে পারে। যদি জিগ্যেস করা হত সন্দেহ প্রমাণ করার জন্য সকালের ব্রেকফাস্টের আয়োজন না থাকলেও ওরা রাতের পাহারাদারি নিতে রাজি হবে কিনা—ওরা গররাজিই হবে। তবুও সন্দেহটা ওরা জিইয়েই রাখত।
অনশন শিল্পের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে থাকা অনেক সন্দেহের মধ্যে এই বিশেষ সন্দেহটাও একটা। তবে সারাদিন আর সারারাত ক্ষুধার শিল্পীর সঙ্গে কাটানোর অবস্থানে কেউই ছিল না। ফলে ওর অনশন সত্যি সত্যিই অবিরাম আর ত্রুটিহীন হত কিনা সেটা সরাসরি যাচাই করে নিতে পারত না। একমাত্র ক্ষুধার শিল্পীই ওর নিজের অনশন প্রক্রিয়ার সন্তুষ্ট দর্শক হবার অবস্থানে থাকত। কিন্তু আরও একটা কারণ ছিল যে জন্য ও পুরোপুরি সন্তুষ্ট হতে পারত না। খুব সম্ভবত অনশনকে ওর অতিশয় কৃশতা প্রাপ্তির কারণ হিসেবে একেবারেই দায়ী করা যায় না যদিও ওর ক্ষয়া চেহারার দিকে তাকিয়ে থাকাটা সহ্য করতে পারত না বলে অনেককেই ভগ্নহৃদয়ে ওর প্রদর্শন থেকে দূরে সরে থাকত। ওর অতিরিক্ত কৃশতা প্রাপ্তির আসল কারণ হল নিজের ওপরে নিজেই অসন্তুষ্ট হয়ে থাকা। আসলে উপবাস করে থাকার কাজটা কতটা সহজ সেটা একমাত্র ও-ই জানত, শিক্ষানবীশদের জানার কথাই নয়। এটি হচ্ছে পৃথিবীর সহজতম কাজ। কথাটা ও লুকিয়ে রাখার চেষ্টাও করত না, কিন্তু কেউ ওর কথা বিশ্বাসই করত না। বড় জোর এটা ওর বিনয় বলেই ভেবে নিত। তবে অধিকাংশ মানুষই ভাবত ও আসলে প্রচার পাবার জন্যই এসব বলে কিংবা ভাবত ও আসলে একজন জোচ্চোর যে কিনা অনশনকেই প্রচার পাবার সোজা রাস্তা বলে মনে করত কারণ কাজটাকে সহজভাবে করার কায়দাটা ও জেনে গেছিল। তার ওপরে সত্যি মিথ্যে মিশিয়ে মানুষকে বলে দেবার সাহসটাও ছিল। তবে মেনে ওকে নিতেই হয়েছিল। এত বছর কাটিয়ে দেবার পর, খানিক অভ্যস্তও হয়ে পড়েছিল। তবে ভেতরে ভেতরে একটা অসন্তোষ ওকে কুরে কুরে খাচ্ছিল। তাছাড়া, কোনও অনশন পর্বের পর—ওরা সবাই এক বাক্যে স্বীকার করে নেবে যে প্রতিটি অনশন পর্বের পর স্বেচ্ছায় ও খাঁচা থেকে বেরিয়ে আসত। উদ্যোক্তার নির্দিষ্ট করে দেওয়া অনশনের সর্বোচ্চ সময়সীমা চল্লিশ দিনের হতো। অনশন পর্ব কিছুতেই এই সময়সীমা অতিক্রম করতে দিত না, এমনকি বড় বড় শহরেও। আর সেটার যথেষ্ট কারণও ছিল। অভিজ্ঞতা থেকেই ওর জানা ছিল যে ক্রমবর্ধমান বিজ্ঞাপন দিয়ে মোটামুটি দিন চল্লিশেকের মত শহরের মানুষের আগ্রহ বাড়ানো গেলেও তারপরে সেই আগ্রহ আর ধরে রাখা যাবে না। বুকিংগুলো যে আস্তে আস্তে কমে যাচ্ছিল, সে তো দেখাই যেত। শহর আর মফস্বলের মধ্যে অল্পবিস্তর ফারাক যে আছে সেটা মানতে হবে। তবে চল্লিশ দিনটাই হচ্ছে সর্বশেষ সীমা। তারপর চল্লিশ দিনের দিন ফুল দিয়ে সাজানো খাঁচার দরজা খুলে দেওয়া হবে। দর্শকে গিজগিজ করবে আম্ফিথিয়েটার। সামরিক ব্যান্ড বাজতে শুরু করবে। দু’জন চিকিৎসক খাঁচায় ঢুকবেন। ক্ষুধার শিল্পীর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করবেন। মাইকে ঘোষণা করে সেটা হলঘরে জানানো হবে। লটারিতে বেছে নেওয়া দু’জন তরুণী—যারা এই সুযোগ পেয়ে যারপরনাই আহ্লাদিত—এসে ওকে খাঁচা থেকে কয়েকটা ধাপ নামিয়ে আনার চেষ্টা করবে, যেখানে ওর জন্য সযত্নে বাছাই করা হালকা খাবার সাজানো থাকবে। এবং যথারীতি ক্ষুধার শিল্পী ঠিক এই সময়েই আপত্তি করবে। মেয়ে দু’জন ওর হাত ধরবার জন্য নিজেদের হাত বাড়িয়ে দিত। শিল্পীও ওর কঙ্কালসার হাতদুটো ওদের হাতে রাখবে, কিন্তু উঠে দাঁড়াবে না। চল্লিশ দিন হয়ে গেলেই কেন অনশন বন্ধ করে দিতে হবে? এখনও তো কাজটা অনেক দিন চালিয়ে যেত! সময়ের কোনও সীমাপরিসীমাই যেন ওর কাছে নেই। এখনও তো অনশনের চূড়ান্ত সীমায় পৌছয়নি! তাহলে কেন বন্ধ করতে হবে? সর্বকালের সেরা ক্ষুধার শিল্পীর স্বীকৃত পেয়ে গেলেও, নিজেকে অতিক্রম করার সুযোগ থেকে কেন বঞ্চিত হতে হবে? ওর ধারণা অনশন করার ক্ষমতার কোনও সীমাই ওর জন্য প্রযোজ্য নয়। আর এই যে জনতার ভিড়— যারা ওর প্রশংসায় পঞ্ছমুখ বলে দাবী করে—ওরা এত অস্থির হয়ে পড়ে? ও নিজেই যখন অনশন সহ্য করে নিতে পারে, তাহলে ওরা কেন সহ্য করবে না? ও নিজেও তো ক্লান্ত। খড়ের ওপর আরাম করে বসে আছে। আর এখন ওকে উঠে দাঁড়াতে হবে। খাবার খেতে হবে। ভাবলেই গা গুলিয়ে উঠছে। মেয়ে দু’জন যাতে অপমানিত বোধ না করে, তাই এই অনুভূতিটা জানতে দেবে না। তরুণীদের চোখের দিকে তাকাল। আপাতদৃষ্টিতে মায়াবী চাহনি, আসলে নির্মম। শীর্ণ ঘাড়ে লাগানো ভারি মাথাটা নাড়িয়ে দেবে।
ঠিক তারপর, সেটাই ঘটবে যেটা সব সময় ঘটে থাকে। উদ্যোক্তা এসে হাজির হয়ে যাবেন। নীরবে দু’হাত ওঠাবেন। সঙ্গীতের আওয়াজ এতটাই চড়া, কথা শোনা যাবে না। যেন ইশারায় স্বর্গের দেবদেবীদের আহ্বান করে বলবেন, “অপূর্ব দৃশ্য দেখুন! খড়ের ওপর পড়ে আছে একজন করুণ শহীদ!” ক্ষুধার শিল্পী যে করুণ শহীদ তাতে কোনও সন্দেহ নেই, তবে অন্য এক অর্থে। উদ্যোক্তা সন্তর্পণে শিল্পীর শীর্ণ কোমর জড়িয়ে ধরবে। যেন দর্শকদের বোঝাতে চাইছেন কী পরিমাণ দুর্বল এই শিল্পী। সবার অলক্ষ্যে হালকা করে একটা ঝাঁকুনিও দেবেন, যাতে ও টাল খেয়ে যায়, পা আর শরীরের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারায়। তারপর ওকে দুই তরুণীর হাতে তুলে দেবেন। মেয়েগুলোর মুখ ততক্ষণে ফ্যাঁকাসে হয়ে যাবে।
এরপর ক্ষুধার শিল্পী আর কোনও বায়না করবে না। মাথাটা বুকের ওপর ঝলে পড়বে— যেন শরীর থেকে আলাদা হয়ে গেছে। তবু কেমন করে যেন আটকে আছে। শরীর একেবারে ফাঁকা। আত্মরক্ষার তাগিদে পা’দুটো মেঝের ওপর চেপে ধরে রাখবে। তবুও মাটিতে ঘষটে যাচ্ছে, যেন মাটিটা আসল মাটি নয়, সেই আসল মাটিটাই খুঁজে চলেছে। শরীরের অয়রো ওজন—যদিও খুবই হালকা শরীর ওর—একজন তরুণীর ওপর এসে পড়বে।
হাঁপাতে হাঁপাতে মেয়েটা সাহায্য চাইতে থাকবে। যেন ও ভাবেইনি ওর সম্মানের দায়িত্ব এরকম কিছু একটা হবে। যতটা সম্ভব গলা সরিয়ে মুখটা দূরে রাখবার চেষ্টা করবে যাতে ক্ষুধার শিল্পীর ছোঁয়া লেগে যায়। তবে খুব একটা কাজ হবে না। আর তুলনামূলকভাবে অন্য ভাগ্যবতী তরুণীটি দূর থেকে হাতটা কোনোমতে ধরে রাখবে। কাঁপতে থাকবে। এগিয়ে আসার সাহস পাবে না। মেয়েটা কেঁদেই ফেলবে আর দর্শকরাও হেসে ফেলবে। সঙ্গে সঙ্গে আগে থেকে দাঁড়িয়ে থাকা একজন ভৃত্য এসে ওকে সরিয়ে নিয়ে যাবে। তারপর আসবে খাওয়াবার পালা। উদ্যোক্তা নিজেই ক্ষুধার শিল্পীর গলায় অল্প করে খাবার দেবে— শিল্পী তখন আধা বেহুঁশ, আধা ঘুমন্ত। সেই ফাঁকে উদ্যোক্তা হাসিখুশি গলায় বকবক করতে লেগে যাবেন, যাতে সকলের মনোযোগ শিল্পীর করুণ অবস্থার দিক থেকে সরিয়ে দেওয়া যায়। তারপর জনগণের উদ্দেশ্যে স্বাস্থপান উৎসর্গ করা হবে। উদ্যোক্তা দাবি করবেন, শিল্পী নাকি নিজেই চুপিচুপি ওঁকে এটা করবার অনুরোধ করেছেন। আরও জোরে অর্কেস্ট্রা বাজিয়ে ঘোষণাটা জাঁকজমকপূর্ণ করে তোলা হবে। সন্তুষ্ট চিত্তে জনগণ হর্ষধ্বনি করে উঠল। অসন্তুষ্ট হবার অধিকার কারোরই থাকে না, কেবল—একমাত্র ক্ষুধার শিল্পী ছাড়া।
বেশ অনেক বছর ধরেই, এভাবেই ও জীবনযাপন করত, বিশ্রাম নেওয়ার জন্য ছোট ছোট বিরতিটুকু ছাড়া। মহিমান্বিত জীবন, জনগণ সম্মান করত ওকে। কিন্তু বেশিরভাগ সময়েই মেজাজটা তিক্ত হয়ে থাকত। কেউই ওর তিক্ততাকে গুরুত্ব দিত না বলে মেজাজটা আরও তিক্ত হয়ে উঠত। ওরা সান্ত্বনা দেবেই বা কী করে? আর এর থেকে বেশি কীই বা ও চাইতে পারে? যদিই বা সহৃদয় কোনও ব্যক্তি ওর অবস্থা দেখে কষ্ট পেতেন, বোঝানোর চেষ্টা করতেন যে অনশনই ওর মনঃকষ্টের আসল কারণ, এমনও হতে পারত—বিশেষ করে অনশন পর্ব যখন বেশ কিছুদিন এগিয়ে গেছে—ক্ষুধার শিল্পী রীতিমত হিংস্রভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে। খাঁচার গারদ ধরে যখন পাশবিকভাবে ঝাঁকাতে থাকবে, সকলেই ভয়ে কাঁপতে থাকবে। তবে এই রকম পরিস্থিতিতে উদ্যোক্তার একটা চতুর কৌশল ছিল। দর্শকদের সামনে দাঁড়িয়ে প্রথমেই ক্ষুধার শিল্পীর হয়ে দু’একটা সাফাই গাইবেন। বলবেন, অনশনের কারণেই মানুষটা এত খটখিটে হয়ে গেছে। যাদের পেট ভরা, তারা সেটা ঠিক অনুভব করতে পারবে না। এরপর প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে এনে বলবেন, ক্ষুধার শিল্পী নাকি দাবী করে সে নাকি ইচ্ছে করলেই আরও অনেকদিন কিছু না খেয়ে থাকতে পারত। এই কথাটাও নাকি ঠিকমত বুঝে নেওয়া দরকার। প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে বলবেন—ওর কি দারুণ উচ্চাকাঙ্ক্ষা, কি ইচ্ছাশক্তি, কি আত্মসংযম! আর ঠিক তারপরেই কায়দা করে পুরো কথাকেই উলটে দেবেন। কিছু কিছু ছবি নিয়ে আসবেন— ওখানে সেগুলো বিক্রিও হয়ে যাবে—যেখানে দেখা যাবে, চল্লিশ দিনের মাথায় ক্ষুধার শিল্পী খাটে পড়ে আছে, শীর্ণ, দুর্বল, প্রায় মুছে যাবার মত অবস্থা। এভাবে সত্যিটা ঘুরিয়ে দেওয়া নতুন কোনও ব্যাপার নয়, তবে ক্ষুধার শিল্পীর মর্মে গিয়ে বিঁধত। আগেভাগে অনশন ভাঙতে বাধ্য হচ্ছে এটাকেই কারণ বলে দেখানো হচ্ছে। এই বোকামির বিরুদ্ধে, এই মূর্খ দুনিয়ার বিরুদ্ধে লড়াই করার ক্ষমতা ওর নেই। লোহার গরাদ আঁকড়ে ধরে উদ্যোক্তার কথাগুলো মন দিয়ে শুনবে, যেন বিশ্বাস করার চেষ্টা করছে। ছবিগুলো বেরিয়ে আসলেই ওর হাতদুটো শ্লথ হয়ে যেত। দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার খড়ের ওপর লুটিয়ে পড়বে। জনগণ তখন অনেকটাই নিশ্চিন্ত হয়ে এগিয়ে এসে ওকে দেখতে লাগবে।
যারা স্বচক্ষে এই সব দৃশ্য দেখেছিল, কয়েক বছর পর নিজেরাই ভেবে অবাক হতো—সেই সময় ওদের মনোভাবটা আসলে কী ছিল! এর মধ্যে সব কিছুই তো আমূল বদলে গেছে। হঠৎই। এর পেছনে হয়ত গূঢ় কোনও কারণ থাকবে। কিন্তু সেসব খুঁজে দেখার সময় বা ইচ্ছেটা কারোরই ছিল না। প্রশ্রয়ে ভেসে যাওয়া সেই ক্ষুধার শিল্পী হঠাৎ আবিষ্কার করবে সে একেবারে একা হয়ে গেছে। যে ভিড় একসময় ওকে ঘিরে রাখত, সেই সব আমোদপ্রিয় মানুষগুলো দল বেঁধে ছুটবে অন্য সব খেলাধুলোর দিকে। অন্য সব চমকের দিকে। উদ্যোক্তা কিন্তু তখনও হাল ছাড়েননি। ওকে নিয়ে ইউরোপের এদিকে ওদিকে ঘুরে বেড়াতে লাগল। যদি পুরনো আগ্রহটা ফিরে পাওয়া যায়। সব চেষ্টাই ব্যর্থ। যেন অদৃশ্য বোঝাপড়া করে সবাই ঠিক করে ফেলেছে—প্রদর্শনের জন্য অনশন? সেসব চলে নাকি! বিরক্তিকর ব্যাপার! স্পত্য বলতে কি, সব কিছু হঠাৎ হয়ে যায়নি। ইঙ্গিত ছিল, ইশারা ছিল, লক্ষণ ছিল। সাফল্যের মোহে কেউই সেসব লক্ষ্যই করেনি। গুরুত্ব দেয়নি, ভা ঠিকভাবে সামলাতে পারেনি। এখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। কিছুই আর করবার নেই। হয়ত কোনও একদিন এই অনশনের প্রদর্শনীর যুগ ফিরে আসবে। কিন্তু বর্তমানের জন্য কোনও সান্ত্বনা নেই। ক্ষুধার শিল্পী কী করবে এখন? যে শিল্পী হাজার হাজার মানুষের হাততালির মধ্যে বেছে ছিল, সে কি গাঁয়ের মেলার ছোট্ট তাঁবুতে দেখিয়ে খুশি হবে? নতুন কোনও পেশা নেওয়ার বয়সও নেই আর। আর তাছাড়া ক্ষুধার শিল্পের প্রতি ওর নিষ্ঠার অভাব তো নেই! অতঃপর উদ্যোক্তাকে বিদায় দিতেই হল। এক অদ্বিতীয় সফল বৃত্তির সঙ্গীকে। বড় একটা সার্কাসে কাজ নিল। নিজের সংবেদনশীল মনটা বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টাই করল না। চুক্তির শর্তগুলো একবারের জন্যও চোখ বুলিয়ে দেখল না।
একটা বড় সার্কাস—অগণিত মানুষ, পশুপাখি আর সরঞ্জামের ভিড়ে—প্রত্যেককেই যে কোনও সময়েই কাজে লাগাতে পারে, এমনকি ক্ষুধার শিল্পীকেও, যদিও ওর চাহিদা খুবই নগণ্য। তাছাড়া, কেবল মানুষটিকেই নয়, খ্যাতনামা শিল্পী হিসেবে ওর খ্যাতির ঐতিহ্যকেও কাজে লাগানো যায়। আসলে ওর শিল্পের ধরণটাই এমনই যে বয়স বাড়লেও সেই শিল্পের ধার কমে না। এরকম কথাও বলা যাবে না, একজন প্রবীণ শিল্পী একটা নিরিবিলি চাকরি জুটিয়ে নিয়ে সার্কাসে আশ্রয় নিয়েছে। বরং, ক্ষুধার শিল্পী, রীতিমত বিশ্বাসযোগ্যভাবেই ঘোষণা করতে পারত যে ওর অনশন ক্ষমতা আগের মতই ভাল। এমনকি এটাও ঘোষণা করে যে নিজের ইচ্ছে মত চলতে দিলে আর কোনও শর্ত না চাপিয়ে দিলে, সে এমন কিছু দেখাতে পারবে, যা সত্যিই বিশ্বকে নতুন করে বিস্মিত করবে। তবে সময় উনেক বদলে গেছে, তাই ওর কথা শুনে হয়ত পেশাদাররা মুচকি হাসবে।
তবুও মনের গভীরে, ক্ষুধার শিল্পী বাস্তব পরিস্থিতি উপলব্ধি করার বোধটা হারিয়ে ফেলেনি। অবশ্য মনে মনে ধরেই নিয়েছিল যে রিংএর মাঝখানে খাঁচার মধ্যে ওকে তারকা শিল্পী হিসেবে বসিয়ে রাখা হয় না বরং রাখা হয় আস্তাবলের কাছে যেখানে সহজেই পৌঁছনো যায়। খাঁচার চারপাশে বড় বড় রঙিন সাইনবোর্ড লাগানো থাকত। ওখানে কী দেখা যাবে সেটাই লেখা থাকত। প্রদর্শনীর বিরতির সময়, দর্শকরা যখন পশুদের দেখার জন্য আস্তাবলগুলোর দিকে ছুটে যেত, ক্ষুধা শিল্পীর পাশ দিয়ে যাওয়া আর এক ঝলক ওর দেখা না পাওয়াটা একরকম অসম্ভব ছিল। হয়ত ওরা আরও কিছুক্ষণ ওর সঙ্গে কাটিয়ে যেত, কিন্তু অধীর আগ্রহে আস্তাবলে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করে থাকা দর্শকের ভিড় থাকায় নিশ্চিন্ত মনে সেটা করা অসম্ভব হত। আর ঠিক এই কারণেই, দর্শনের সময় এগিয়ে আসলেই— এই দর্শন দেওয়ার প্রতীক্ষা করাটাই ওর জীবনের লক্ষ্য, তা সত্ত্বেও—ক্ষুধার শিল্পী রীতিমত ভয়ে কাঁপতে থাকত। বয়সকালে ও কিন্তু অধী্র হয়ে দর্শন দেওয়ার প্রতীক্ষা করত। জনতা যখন ভিড় করে ওকে দেখতে আসত, পুলকিত বোধ করত। কিন্তু পুলক বেশি দিন টিকল না। এমনকি নিজের সঙ্গে করা সেই জেদি, প্রায় সচেতন আত্মপ্রবঞ্চনাও, যেসব অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হয়েছে, তার কাছে হার মেনে যেত। মোটামুটি নিশ্চিত হয়েই গেছিল যে বেশিরভাগ দর্শক আস্তাবল দেখার জন্যই বারবার আসত। এই দূর থেকে তাকিয়ে দেখাটাই বরাবর সবচেয়ে ভালো ছিল। লোকজন যখন একেবারে খাঁচার সামনে এসে দাঁড়াত, তখনই চারদিক থেকে নানা দলের চিৎকার-চেঁচামেচি, গালাগাল যেন ঝড়ের মতো ওকে ঘিরে ধরত। এদের মধ্যে একটা দল—যাদের উপস্থিতি অন্যদের চেয়ে বেশি অস্বস্তিকর লাগত শিল্পীর—ওরা কোনও সহানুভূতি নিয়ে আসত না, কোনও বোঝাপড়া নিয়েও নয়, শুধু খেয়ালের বশে, একগুঁয়েমি করে, আরাম করে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে থাকত। আরেক দল ছিল, যাদের আসল আগ্রহ ছিল পাশের পশুগুলো—ওদের কাছে সে কেবল পথের একটা বিরক্তিকর বাধা। এই ভিড় কমে আসার পর আসত পিছিয়ে পড়া দর্শকরা। এদের আর কেউ আটকে রাখত না। যতক্ষণ খুশি দাঁড়িয়ে থাকলেও কেউ বাঁধা দিত না। তবে ওরা প্রায় না তাকিয়েই, বড় বড় পা ফেলে, তাড়াহুড়ো করে এগিয়ে যেত, যদি সময় মত আস্তাবলের পশু দেখা না হয়। ক্বচিৎ কখনও কোনও একজন বাবা তাঁর বাচ্চাদের সঙ্গে ওর খাঁচার সামনে এসে দাড়াতেন। আঙুল দিয়ে শিল্পীকে দেখিয়ে বুঝিয়ে বলতেন—ও কে, কী করে এখানে, ওঁর ছেলেবেলায় এই প্রদর্শনী কত জাঁকজমকপূর্ণ হতো, এই সব। তবে বাচ্চারা খুব একটা বুঝতে পারত না। ওদের স্কুল বা জীবনের অভিজ্ঞতা অনাহার ব্যাপারটা ঠিক কী শিখে উঠতে পারেনি। তবুও কখনো কখনো ওদের কৌতুহল হতো, চোখগুলো উজ্জ্বল হয়ে উঠত, একটু বেশি মানবিক, একটু বেশি সহান্নুভূতিশীল ভবিষ্যতের ইঙ্গিত হাতছানি দিত। শিল্পী হয়তো মনে মনে আক্ষেপ করত এই ভেবে যে ওর খাঁচাটা আস্তাবলের এত কাছাকাছি না হলে খুব সম্ভত ব্যপারটা আরও আকর্ষণীয় হতে পারত। জায়গাটা এমনই ছিল যে ইচ্ছে করলে দর্শকরা খুব সহজেই ওকে এড়িয়ে সোজাসুজি পশুদের দেখতে চলে যেতে পারত। তাছাড়া আছে আস্তাবলের গন্ধ, রাতে পশুদের ছটফটানি, সামনে দিয়ে হিংস্র জন্তুদের জন্য কাঁচা মাংস নিয়ে যাওয়া, খাওয়ানোর সময় হুঙ্কার—সব মিলিয়ে ওর মনটা খারাপ হয়ে যেত। তবে এসব নিয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে নালিশ করার কথা ও কল্পনাও করতে পারত না। শেষ পর্যন্ত, দর্শকদের ভিড়টা তো ওই পশুগুলোর জন্যই। ভিড়ের মধ্যেই হয়ত কেউ আছেন যিনি আসলে ওকে দেখতেই এসেছেন। কে জানে, নিজের অস্তিত্ব মনে করিয়ে দিলে ওঁরা হয়ত ওকে অন্য কোথাও সরিয়ে দেবে। আস্তাবলের পথে দাঁড়িয়ে থাকা একটা বাধা বই তো আর কিছুই নয়!
বাধাটা ছোটোই, তবে দিনে দিনে বাধাটা ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর হচ্ছে। বর্তমান সময়টা এমনই যে একজন ক্ষুধার শিল্পীকে নিয়ে আলাদা করে আগ্রহ না থাকাটাই স্বাভাবিক হয়ে গেছে। আর সেই অভ্যস্ত উদাসীনতাই নিঃশব্দে ওর ভাগ্যনির্ধারণ করে দিল। যত খুশি উপোসই করুক না কেন—আর সেটা ও সত্যি সত্যিই করত—তবুও ওকে নিয়ে আগ্রহটা বাচিয়ে রাখা যেত না—সকলেই ওকে পাশ কাটিয়েই চলে যেত। একবার কেবল ক্ষুধার শিল্প নিয়ে কাউকে বোঝানোর চেষ্টা করেই দেখুন! এক সময় সুন্দর সাইনবোর্ডগুলো ঝকঝক করত, কিছুদিনের মধ্যেই ময়লার আস্তরণে ঢেকে যেত, অপাঠ্য হয়ে যেত। সেগুলো বদলে দেবার কথা কেউই ভাবত না। অনশনের কত দিন পূর্ণ হল, একটা ছোট বোর্ডে লেখা হত। প্রথম প্রথম খুব যত্ন নিয়ে প্রতিদিন সংখ্যাটা বদলে দেওয়া হত। বহুদিন ধরে সংখ্যাটা আর বদলানোই হয় না, কারণ প্রথম সপ্তাহ শেষ হওয়ার পর কর্মচারীদের কাছে এই তুচ্ছ কাজটা ছাড়াও অনেক কিছু কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হয়। অতএব ক্ষুধার শিল্পী স্বপ্ন লালিত অনশন সত্যিই চালিয়ে যেত। আগের মতই অনায়াসে পরীক্ষায় উত্তীর্ণও হত। কিন্তু কেউ আর সেই সব দিবসের হিসেব রাখত না। কেউই রাখত না, এমনকি ক্ষুধার শিল্পী নিজেও রাখত না। সাফল্যের মাপকাঠির হিসেবটাও হারিয়ে যেত। মন ভারাক্রান্ত হয়ে উঠত। যদি বা ক্বচিৎ কখনো ঘুরতে ঘুরতে অলস কোনও পথচারী খাঁচার সামনে চলে আসত আর ঠাট্টা করে বলত সবটাই ভাঁওতা, সবটাই প্রতারণা—তাহলে সেটাই ছিল চরম উদাসীনতা আর জন্মগত বিদ্বেষ থেকে উদ্ভুত জঘন্য মিথ্যে। ক্ষুধার শিল্পী নিজের শিল্পে নির্মমভাবে সৎ, কখনও প্রতারণা করেনি। পৃথিবীই প্রতারণা করেছে ওকে। ওর প্রাপ্য স্বীকৃতি কখনও দেয়নি।
তারপর আরও অনেকগুলো দিন কেটে গেল। সেই অধ্যায়েরও সমাপ্তি ঘটল। হঠৎ একদিন এক কর্মকর্তার চোখে পড়ল খাঁচাটা। জানতে চাইলেন, “এত ভাল একটা খাঁচা—ভেতরে পচা খড় পড়ে আছে, কিন্তু ব্যবহার করা হচ্ছে না কেন?” কেউ কিছু বলতে পারল না। পরে বোর্ডে লেখা সংখ্যাগুলো দেখে কারও ক্ষুধার শিল্পীর কথা মনে পড়ে গেল। একটা লাঠি দিয়ে খড়গুলো নাড়াতে গিয়ে ক্ষুধার শিল্পীকে খুঁজে পাওয়া গেল। “কী ব্যাপার! এখনও অনশন চালিয়ে যাচ্ছ?” কর্মকর্তা অবাক হয়ে বললেন। “থামবে কবে?”
“ক্ষমা করুন আমাকে আপনারা…” ফিসফিস করে বলল ক্ষুধার শিল্পী। ওর কথা শুধু কর্মকর্তাই বুঝতে পারছিলেন, কারণ উনি প্রায় খাঁচার ওপর ঝুঁকে পড়ে কান পেতে শোনবার চেষ্টা করছিলেন।
“অবশ্যই,” কর্মকর্তা বললেন। নিজের কপালে আঙ্গুল রেখে ইশারায় পরিচারকদের জানালেন লোকটার মাথা ঠিক নেই। “আমার অনশন শিল্পকে আপনারা শ্রদ্ধার চোখে দেখুন—এটাই আমি চেয়েছিলাম,” ক্ষুধার শিল্পী বলল। “করি তো,” তৎক্ষণাৎ জবাব দিলেন কর্মকর্তা। “না… করা উচিত নয়,” ক্ষুধার শিল্পী বলল।
“ঠিক আছে, তাহলে করব না,” একটু বিরক্ত গলায় বললেন কর্মকর্তা। “কিন্তু কেন করব না?”
“কারণ আমাকে অনশনই করতে হয়… আর কিছুই আমি করতে পারি না।”
“সেরকম কেন?”
ক্ষুধার শিল্পী মাথাটা দুর্বলভাবে সামান্য ওঠাল। শুকনো ঠোঁটদুটো কুঞ্চিত হয়ে কেঁপে উঠল। কর্মকর্তার কানের একেবারে কাছে মুখটা নিয়ে এলো—একটি শব্দও যেন হারিয়ে না যায়—“কারণ... এমন কোনও খাবার খুঁজে পাইনি আমি, যা সত্যিই আমার খেতে ভাল লাগত! যদি পেতাম—বিশ্বাস করুন... এত হট্টগোল করতামই না। আপনাদের সবার মতই পেট পুরে খেতাম।” এতাই ছিল ওর শেষ কথা।
তবুও ওর ক্লান্ত, প্রায় নিভে যাওয়া চোখে তখনও এক অদ্ভুত দৃঢ়তা—কোনও অহঙ্কার নয়—কেবল একটা বিশ্বাস যে ও এখনও অনশন চালিয়ে যাচ্ছে।
কর্মকর্তা বললেন, “নাও, এসব পরিষ্কার কর—জায়গাটা একটু গুছিয়ে নাও।
খড়ের সঙ্গেই কবর দেওয়া হল ক্ষুধার শিল্পীকে। তরুণ একটা চিতাবাঘকে আনা হল ওই খাঁচায়। সব চাইতে অনুভূতিহীন মানুষও বুঝতে পারল যে খাঁচাটা যেন প্রাণ ফিরে পেল। এতদিনের নির্জীব, নিঃসঙ্গ খাঁচার ভেতরে বুনো প্রাণীটা অবিরাম লাফাচ্ছে, ঘুরে বেড়াচ্ছে। দৃশ্যটাই বদলে গেল।
ওটার কোনও কিছুরই অভাব ছিল না। পরিচারকদের কখনও ভেবে দেখতে হয়নি, ওটাকে কী খেতে দেওয়া উচিত। ওটার পছন্দের খাবার সর্বদা মজুত থাকত। দেখে মনেও হত না যে স্বাধীনতা হারিয়ে ওটার মন খারাপ। শক্তিশালী, টানটান শরীর, স্বাধীনতা যেন নিজের সঙ্গেই বয়ে নিয়ে চলছে। স্বাধীনতা যেন দাঁতের ফাঁকেই লুকিয়ে আছে। জীবন নিয়ে পশুটার উন্মত্ত আনন্দ এমন আগুনের নিঃশ্বাসের মত ওর চোয়ালের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে আসত, দর্শকরা চোখ ফিরিয়ে নিতে পারত না। তবুও ওরা খাঁচার চারপাশে ভিড় করে দাঁড়িয়ে থাকত, সরে যেত না। যেন ওই জায়গা ছেড়ে নড়বার ক্ষমতাই ওদের নেই। ·
লেখক পরিচিতি : ফ্রানৎস কাফকা গত শতাব্দীর সবচেয়ে প্রভাবশালী লেখক। তাঁকে বলা হয় সাহিত্যে আধুনিকতাবাদের প্রবর্তক। তাঁর স্থান বিশ্বসাহিত্যে অন্যতম প্রধান চিরায়ত লেখক হিসেবে। জন্মেছিলেন অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান সাম্রাজ্যের প্রাগে, ৩ জুলাই ১৮৮৩ সালে এবং মৃত্যুবরণ করেন ৩ জুন ১৯২৪ সালে। কাফকা ছিলেন একজন জার্মান-ভাষী ইহুদি চেক লেখক।


0 মন্তব্যসমূহ