সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০১৫

প্যারিস রিভিউ-কে দেওয়া গ্যুন্টার গ্রাসের সাক্ষাৎকার : লেখালেখিতে আসলে হয় কী, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশ মিলে একটি সমগ্র তৈরি হয় ঠিক যেন খোদাই করে করে একটি ভাস্কর্য সম্পূর্ণ করে তোলা।

দ্য প্যারিস রিভিউ-কে গ্রাস (১৬ অক্টোবর ১৯২৭-১৩ এপ্রিল ২০১৫) এই সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন ১৯৯১ সালের গ্রীষ্মে। 'গ্যুন্টার গ্রাসের সঙ্গে একটি আর্ট অব ফিকশন সাক্ষাৎকার' হিসেবে এটা প্রকাশিতও হয়েছিল সে বছর। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন এলিজাবেথ গ্যাফনি।

গ্যুন্টার গ্রাসের শ্রেষ্ঠ কাজ : দ্য টিন ড্রাম (১৯৫৯), ক্যাট অ্যান্ড মাউস (১৯৬৯) এবং ডগ ইয়ার্স (১৯৬৩), যা তাঁর ড্যানজিগ ট্রিলজি নামে পরিচিত। তবে, তাঁর বিখ্যাত সাহিত্যকর্ম হলো 'টিন ড্রাম' উপন্যাসটি, যাকে বিবেচনা করা হয় ইউরোপের সাহিত্যে ম্যাজিক রিয়ালিজমের মূল টেক্সট হিসেবে। নোবেল পান ১৯৯৯ সালে। মূলত দ্য টিন ড্রাম-এর জন্য।
এই উপন্যাস অবলম্বনে চলচ্চিত্রও নির্মিত হয়েছে। গ্যুন্টার গ্রাস একাধারে কবি, উপন্যাসিক, চিত্রকর এবং ভাস্কর। তাঁর প্রথম বই কবিতা ও রেখাচিত্রের মিশ্রণ। তাঁর অন্যান্য বইগুলি : পিলিং দ্য ওনিয়ন (২০০৬), দ্য বক্স (২০০৮), দ্য ফ্লাউন্ডার (১৯৭৮), ফ্রম দ্য ডায়েরি অব অ্যা স্নেইল (১৯৭৩), দ্য র‌্যাট (১৯৮৬)। গ্রাসের সবচেয়ে মূল্যবান সাক্ষাৎকার হিসেবে বিবেচিত প্যারিস রিভিউয়ের এই দ্য আর্ট অভ ফিকশন সাক্ষাৎকারটির সম্পূর্ণ অনুবাদ এখানে দেয়া হল। অনুবাদ করেছেন এমদাদ রহমান।


সাক্ষাৎকারী : 
কীভাবে আপনি একজন লেখক হয়ে উঠেছিলেন? 


গ্রাস : 
আমার মনে হয় এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে পারিপার্শ্বিক অবস্থাটিও সম্পর্কিত থাকে। এই প্রক্রিয়া আমাকে দিয়ে কিছু করিয়ে নিয়েছে, যেখানে আমি বেড়ে উঠেছিলাম। এক নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান আমি, আমাদের ছিল খুব ছোট দুই কামরার এপার্টমেন্ট। আমি ও আমার বোনের নিজেদের কোনও ঘর ছিল না, কিংবা নিজেদের একান্ত একটু জায়গাও না। লিভিং রুমের একজোড়া জানালার পাশের কোণায় আমার বইগুলি সব রাখা থাকত- বই, অন্যান্য কিছু জিনিস, আমার জলরঙ এবং খুঁটিনাটি আরও কিছু জিনিস- কল্পনার বিস্তারের জন্য যেসব জিনিসের দরকার থাকে। ভিড়ের মাঝখানে পড়বার মত বিষয়টাও আমি বেশ আগেই শিখে ফেলেছিলাম আর খুব অল্প বয়স থেকেই আমি লিখতে এবং আঁকতে শুরু করেছিলাম। ভিড়ের মাঝখানে থাকবার আরেক ফল হল- আমি এখন আমার পাঠের জায়গা বিস্তৃত করতে পেরেছি। চার চারটি ভিন্ন জায়গা আমি পড়বার আর লেখবার জন্য তৈরি করে রেখেছি। আমি পুনরায় আমার শৈশবের সেই পরিস্থিতিতে ফিরে যেতে ভয়-ই পাই, সেই ছোট্ট ঘরের একটি কোণায়।

সাক্ষাৎকারী : 
তো এই অবস্থায় আপনি খেলাধুলা বা অন্য কিছু না করে বই পড়তে শুরু করলেন। কী সেই গোপন ব্যাপার যা আপনাকে দিয়ে পড়িয়ে নিয়েছে, লিখিয়ে নিয়েছে? 

গ্রাস: 
ছেলেবেলায় আমি চরম মিথ্যুক ছিলাম আর সৌভাগ্যক্রমে মা আমার মিথ্যাগুলিকে পছন্দ করতেন। আমি নানাভাবে তাকে বিস্মিত করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলাম। আমার যখন মাত্র দশ বছর বয়স, মা আমাকে তখন 'পিয়ের গায়েস্ত' নামে ডাকতেন। মা ডেকে বলতেন- পিয়ের গায়েস্ত, এখন তুমি আমাকে বিস্ময়কর সব গল্প বলতে থাকো নেপলস ভ্রমণের সময় আমরা যা দেখতে পাব। সেই বয়সেই আমি আমার মিথ্যাগুলিকে লিখতে শুরু করেছিলাম, এবং বিরামহীনভাবে সেই কাজটি এখনও চলছে। মাত্র বারো বছর বয়সেই আমি উপন্যাস লিখতে শুরু করি। পোলিশভাষী স্লোভাক 'কাশুবিয়্য'-দের নিয়ে, বহু বছর পরে যা টিন ড্রাম-এ রূপান্তরিত হবে, যেখানে অস্কারের দাদিমা 'আনা' হবেন স্লোভাক 'কাশুবিয়্য'-দের একজন। কিন্তু প্রথম উপন্যাস লিখতে গিয়েই বড় রকমের ভুল করে ফেললাম- চরিত্রগুলি উপন্যাসের প্রথম অধ্যায়ের শেষেই মারা যেতে লাগল। সামনে আর আগাতেই পারছি না। এটাই ছিল লেখালেখিকে ঘিরে আমার প্রথম শিক্ষা- চরিত্রগুলির ব্যাপারে সাবধান থেকো।

সাক্ষাৎকারী : 
কোন মিথ্যাগুলি আপনাকে মহত্তম আনন্দ দিয়েছে? 


গ্রাস: 
সেই মিথ্যাগুলি, যারা আঘাত করে না- নিজেকে রক্ষা করেও অন্যকে কষ্ট দেয়া থেকে যা রক্ষা করে, এই অর্থে মিথ্যাগুলির ধরণ আলাদা। তবে মিথ্যা বলাটা আসলেই আমার কাজ নয়। কিন্তু সত্য সবসময়ই খুব বিরক্তিকর আর একঘেয়ে, তাই সত্যের সঙ্গে বলেমনে হয় না। আমি একটা ব্যাপার শিখেছি যে আমার ভয়ানক সব মিথ্যা বাইরের ঘটনাবলীর উপর তেমন একটা প্রতিক্রিয়া তৈরি করছে না। যদিও, কয়েক বছর আগে, আমি এমন কিছু লিখেছিলাম, যা জার্মানির সাম্প্রতিক রাজনৈতিক উন্নয়নে ভবিষ্যৎ বাণীর মত ছিল... মানুষ জানলে হয়ত বলত- কী দারুণ মিথ্যুক।


সাক্ষাৎকারী : 
সেই ব্যর্থ উপন্যাসের পর আপনার পরবর্তী প্রচেষ্টা কী ছিল? 

গ্রাস :
আমার প্রথম বই ছিল কবিতা আর রেখাচিত্রের। আমার বইয়ে অবধারিতভাবেই কবিতাগুলির প্রথম খসড়ায় রেখাচিত্র আর পঙক্তিগুলির একটা সমন্বয় বা মিশ্রণ ছিল। খসড়ায় দেখা যেত- কোনও একটি ইমেইজ থেকে লেখা বের হয়ে আসছে, ভাবনা প্রকাশিত হচ্ছে, মাঝেমাঝে শব্দ-রাশি থেকেও। তারপর আমার যখন পচিশ বছর বয়স, সেই বয়সে আমি একটা টাইপরাইটার জোগাড় করতে সমর্থ হই। সেই তখন থেকেই দুই-আঙুল ব্যবহার করে লিখতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ি। ব্যাপারটা আমার কাছে বেশ ভাল লাগে। টিন ড্রাম প্রথমে টাইপরাইটারেই লিখেছিলাম, প্রথম খসড়াটা। এখন আমি বয়স্ক মানুষ আর শুনেছি আমার সহকর্মীরা সকলেই কম্পিউটারে লেখালেখি করেন। আমি প্রতিটি লেখার প্রথম খসড়াটি লিখি নিজের হাতে- এখনও যেন পিছনেই পড়ে আছি! দ্য র‍্যাট-এর প্রথমে লিখেছিলাম খাতায়, পাতাগুলি রুলটানা ছিল না আর তারা আমার প্রিন্টার থেকে বের হয়ে আসছিল। যখনই আমার কোনও বই প্রকাশের পথে থাকে বা বের হয়ে যায়, আমি প্রকাশককে বলে রাখি যেন তিনি আমাকে পরবর্তী বইটি লেখবার জন্য শাদা পাতাওলা একটি বই দেন যেখানে একটিও শব্দ ছাপা নেই। অর্থাৎ, সেইসব দিনগুলিতে বইয়ের প্রথম খসড়াটি লিখিত হত হাতে আর সঙ্গে জুড়ে দেয়া হত আমার ড্রয়িং। দ্বিতীয় এবং তৃতীয় পর্যায়ে কাজ হত টাইপরাইটারে। একটি পাণ্ডুলিপি মোট তিনবার না লেখে আমি কোনওভাবেই একটি বই শেষ করতে পারি না। তবে, সংশোধন আর কাটাকাটি করতে করতে আসলে চার'বার-ই লেখা হয়ে যায়!


সাক্ষাৎকারী : 
প্রতিটি খসড়াই কি আলাদা আলাদা অবস্থা থেকে শুরু হয়ে অমেগা স্তরে গিয়ে অর্থাৎ সর্বশেষ স্তরে গিয়ে পৌঁছোয়? 


গ্রাস: 
না। প্রথম খসড়াটি যথাসম্ভব দ্রুতই লিখে ফেলি। সেক্ষেত্রে কিছু ঘাটতি কি অপূর্ণতা থেকেই যায়। দ্বিতীয় পর্যায়ে এসে সাধারণত লেখাটা হয়ে যায় অনেক দীর্ঘ, সেখানে অনেক ডিটেইলিং এবং একটা সম্পূর্ণতা এসে যায়। দ্বিতীয়বারে তাতে কোনও ফাঁকি থাকে না অস্পষ্টতা থাকে না, তবে প্রাণের অভাব থাকে, মমতাহীন, রুক্ষ, শুষ্ক হয়ে থাকে। তৃতীয় খসড়ায়- আমি আমার অন্তঃস্থ দহন, পরিবর্তন, যা করতে চাই বলতে চাই, তা করে ফেলতে তৎপর থাকি। তবে দ্বিতীয় খসড়ার অপরিহার্য অংশগুলিকে তৃতীয় পর্যায়েও প্রবাহিত রেখে দিই। আর এই ব্যাপারটাই সবচেয়ে কঠিন আমার কাছে।

সাক্ষাৎকারী : 
আপনার প্রতিদিনকার কাজের ধরনটি কী রকম? 


গ্রাস: 
আমি যখন একটি লেখার প্রথম খসড়া করতে ব্যস্ত তখন হয় কী প্রতিদিন পাঁচ থেকে সাত পাতার মত লিখে থাকি। তৃতীয় খসড়ায় এসে সেটা দাঁড়ায় তিন পৃষ্ঠা। এই পর্যায়ে এসে লেখার গতি ধীর হয়ে যায়। 


সাক্ষাৎকারী : 
এসব কি সকালের দিকে করেন, না কি দুপুরে বা রাতের বেলা? 


গ্রাস: 
অসম্ভব, রাতে তো কখনই নয়! রাতের লেখালেখিতে আমার একটুও বিশ্বাস নেই কারণ এই সময়টা যেন খুব বেশি সরল অর্থাৎ জটিলতাহীন। লেখাও খুব সহজ হয়ে যায়। আমি দিবালোক পছন্দ করি, কোনও কিছু লিখতে শুরু করার জন্য। সকালে, নয়'টা থেকে দশটা'র মাঝখানে আমি নাস্তা করি- গান শুনে আর কিছু একটা পড়তে পড়তে। নাস্তার পর পরই আমার কাজ শুরু হয় এবং সেটা একটানা চলতে থাকে। তারপর কফির জন্য বিকালের দিকে কাজে একটু বিরতি দিই, তারপর আবার লিখতে শুরু করি, শেষ হয় সন্ধ্যা সাত'টায়।


সাক্ষাৎকারী : 
কীভাবে আপনি বুঝতে পারেন যে একটি বই লেখা শেষ হচ্ছে, আর লেখার দরকার নেই? 


গ্রাস: 
আমি যখন কোনও মহাকাব্যিক বিস্তারের বই নিয়ে কাজ করি লেখার কাজটা তখন খুব পরিস্কারভাবেই দীর্ঘ হয়ে থাকে। বেশ দীর্ঘ। চার থেকে পাঁচ বছর লেগে যায় পুরো লেখাটা পুঙ্খানুপঙ্খ লিখে উঠতে। যখন আমি নিজেকে সম্পূর্ণরূপে নিঃশেষিত করে ফেলেছি মনে হয় তখনই বইটি লিখিত হয়ে যায়। 


সাক্ষাৎকারী :
 ব্রেখট তাঁর লেখাগুলিকে অনবরত পরিবর্তন করতেন, এমনকি প্রকাশিত লেখাগুলিকেও তিনি কখনও লিখে শেষ হয়ে গেছে বলে মনে করতেন না! 


গ্রাস: 
আমি কখনও এমনটা করব- তা মনে করি না। 'দ্য টিন ড্রাম' এবং 'ফ্রম দ্য ডাইরি অব অ্যা স্নেইল'- এই ধরনের বইগুলি আমি আমার জীবনের বিশেষ তাৎপর্যময় সময়ে কেবল লিখতে পেরেছি বা লিখেছি। বইগুলি আমার হাত দিয়ে বেরিয়ে এসেছে কারণ সেই বিশেষ সময়পর্বে আমি তা অনুভব করেছিলাম এবং ভাবনাটা ভেবেছিলাম। আমি নিশ্চিত যে যদি এখন আবার টিন ড্রাম কিংবা ফ্রম দ্য ডাইরি অব অ্যা স্নেইল- আবার লিখতে বসি- লেখাগুলিকে আমি ধ্বংস করেই ফেলব।

সাক্ষাৎকারী : 
কীভাবে আপনি ফিকশন থেকে নন-ফিকশনগুলিকে আলাদা করেন? 


গ্রাস: 
এই ফিকশন বনাম নন-ফিকশন আসলে একটি ননসেন্স বিজনেজ। এটা সম্ভবত বই বিক্রেতাদের জন্য বইয়ের ধরণ অনুযায়ী আলাদা করার একটা বিশেষ কৌশল। কিন্তু আমি আমার কোনও বইয়ের এমন শ্রেণিকরণ পছন্দ করি না। আমি এমনটাই ভেবে থাকি যে- বই বিক্রেতারা একসঙ্গে মিলিত হয়েছে আর কোন বই ফিকশন কোন বই নন-ফিকশন- সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। আমি বলতে চাই বই বিক্রেতারা আসলে যা করছেন- ফিকশন আসলে তা-ই।


সাক্ষাৎকারী : 
আচ্ছা, তো ধরেন, যে-পদ্ধতিতে আপনি গদ্য লেখেন বা বক্তৃতা দেন, যখন গল্প লেখেন তখন কি লেখার পদ্ধতিটা ভিন্ন রকমের হয়? 


গ্রাস: 
এটা আসলেই ভিন্ন হয়ে থাকে, কেননা- আমি যে-সব সমস্যার মুখোমুখি হই আমার সাধ্য নেই সেগুলিকের বদলে ফেলবার। আর আসলে সব সময় আমি ডাইরি লিখি তা-ও মনে হয় না। তবে, 'দ্য ডাইরি অভ অ্যা স্নেইল' লেখার আগে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। ১৯৬৯ খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি বছর হবে- আমার এরকম ভাবনা ছিল। ভাবনা ছিল এই সময়টায় সত্যিকার রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটবে একটি নতুন সরকারের হাতে। সেই কারণেই আমি রাস্তায় নেমেছিলাম, প্রচারের কাজ করেছিলাম ১৯৬৯ সালের মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর- এই সময় জুড়ে- তখন ডাইরি লিখছিলাম। কলকাতায় থাকাকালীনও এই ব্যাপারটা ঘটেছিলো। 'শো ইয়োর টাং' বইটা ডাইরি লেখারই ফল।


সাক্ষাৎকারী : 
আপনার ভিজ্যুয়াল আর্ট এবং লেখালেখির সঙ্গে পলিটিক্যাল একটিভিজমকে কীভাবে কোন কৌশলে প্রকাশ করেন? 


গ্রাস: 
লেখকরা শুধুমাত্র তাদের অন্তর্গত জগত তাদের বুদ্ধিজীবীতা ইত্যাদির সঙ্গেই বেঁচে থাকেন না, তারা জীবনের দৈনন্দিনতার প্রক্রিয়ার সঙ্গেও সম্পর্কিত থাকেন। আর আমার বেলাতেও আমার আঁকাআঁকি, লেখা আর পলিটিক্যাল একটিভিজম এই তিনটি একেবারেই স্বতন্ত্র কাজ। প্রতিটির রয়েছে গভীর এক নিজস্ব অনুভবের গাঢ়তা। তীব্রতা। প্রচণ্ডতা। আমি আসলে সুর মেলাতে চাই, ঐক্যবিধান করতে চাই আর সেই সমাজের সঙ্গে সংযুক্ত থাকতে চাই- যেখানে আমার নিত্যদিনের বসবাস। আমার লেখা, আমার রেখাচিত্র আসলে রাজনীতির সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে থাকে, সে আমি চাই বা না চাই। প্রকৃতপক্ষে, লেখায় আমি আসলে খুব ভেবেচিন্তে রাজনীতিকে নিয়ে আসতে চাই না। একটা লেখার তৃতীয় বা চতুর্থবারের সংস্কারের সময় আঁচড়াতে আঁচড়াতে বিষয়টাকে আমি দূর করে ফেলি। আমি সেইসব ব্যাপারকেই লেখায় নিয়ে আসি, সেইসব কথাই বলতে চাই- ইতিহাস দ্বারা যা অবহেলিত। আমি কখনই হয়ত একটি লেখা লিখতে বসব না যা খুব স্পষ্টতই এবং বিশেষভাবেই কিছু রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিরাজমান নেই। আমি দেখি যে রাজনীতিকে বাদ দেবার কোনো কারণই নেই, তার আছে কিছু মহান আর সুনিশ্চিত ক্ষমতা- আমাদের বেঁচে থাকবার উপর। রাজনীতি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রকেই নিজের সঙ্গে জড়িয়ে নেয় ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে।

সাক্ষাৎকারী : 
আপনার লেখায় ভিন্নধর্মী কিছু বিষয় একীভূত হয়ে থাকে- ইতিহাস, রেসিপি, লিরিক। 


গ্রাস: 
এবং ড্রয়িং, কবিতা, সংলাপ, কোটেশন, বক্তৃতা, চিঠিপত্র। আপনি দেখবেন- আমি যখন মহাকাব্যিক কনসেপ্ট নিয়ে কাজ করছি তখন কিন্তু ভাষার যতগুলি রূপ, অভিমুখ, অবয়ব ইতাদি আছে সেগুলি ব্যবহার করার প্রয়োজনীয়তাটুকু আমি খুঁজে বের করি, খুঁজে বের করি ভাষাভিত্তিক যোগাযোগের সবচেয়ে কার্যকর এবং একাধিক ব্যবহার কাঠামো। খেয়াল করলেই দেখবেন- ফর্মের দিক দিয়ে আমার কিছু বই একেবারে নিখাদ নভেলা- 'ক্যাট এন্ড মাউস' 'দ্য মিটিং অ্যাট তেলগেই'। 


সাক্ষাৎকারী : 
আপনার শব্দ এবং ড্রয়িঙের পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে যাওয়াটা কিন্তু ইউনিক।


গ্রাস: 
রেখা এবং লেখা- উভয়ই আমার কাজের একেবারে অন্যতম প্রাথমিক উপাদান, কিন্তু কোনভাবেই একমাত্র নয়। আমি তখনই ভাস্কর্য গড়ি যখন হাতে সময় থাকে। আমার ক্ষেত্রে হয় কী, রেখা আর লেখার মধ্যে খুব স্পষ্ট একটা দেওয়া নেওয়ার সম্পর্ক থাকে। কখনও এই সম্পর্ক খুবই শক্ত, আবার অন্য সময়ে সেটা দুর্বল। গত কয়েকটি বছর এই ব্যাপারটা খুবই শক্ত ছিল। 'শো ইয়োর টাং' যা আসলে কলকাতাকে নিয়েই লেখা- এই দেওয়া-নেওয়ার সম্পর্কের একটি উদাহরণ। ড্রয়িং ছাড়া কলকাতার জলজ্যান্ত জীবনটাকে কোনওভাবেই যেন এই বইয়ে আনতে পারতাম না। কিছুই যেন বলতে পারতাম না। কলকাতার এক অকল্পনীয় দারিদ্রতা দর্শনার্থীকে এমন এক পরিস্থিতিতে নিয়ে যাবে যেখানে ভাষা হয়ে পড়ে বোবা। শব্দহীন। আপনি নিজের ভিতর শব্দ খুঁজে পাচ্ছেন না। তখন রেখাচিত্রই আমাকে শব্দ খুঁজে পেতে সাহায্য করেছে- যখন আমি সেখানে ছিলাম।


সাক্ষাৎকারী : 
সেই বইটিতে কবিতাগুলি কিন্তু ছাপা নয়, আপনার ড্রয়িঙের উপর সেগুলিকে বসিয়ে দেওয়া যেন স্বহস্তে লিখিত, এখানে শব্দগুলিকে কি গ্রাফিক অ্যালিমেন্ট হিসাবে বিবেচনা করেছেন বা আপনার ড্রয়িঙের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসাবে বিবেচনা করেছেন?

গ্রাস: 
কবিতাগুলির কিছু বিষয় আসলে রেখাচিত্রের মাধ্যমেই সুস্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়। শব্দরা যখন চূড়ান্তরূপে আমার কাছে আসে তখন আমি যা এঁকেছি তার উপরেই লিখতে শুরু করি। টেক্সট এবং ড্রয়িং- একটি আরেকটির উপর স্থাপিত হয়ে যায়। চেপে বসে। আপনি চাইলেই রেখাদের ভিতর থেকে শব্দগুলিকে আলাদা করতে পারবেন- তাতে ভালই হবে... পড়বার জন্যই তারা এখানে আছে। কিন্তু ড্রয়িঙয়ের বেলায় একেবারে প্রাথমিক খসড়াই স্থান পায় নিজেকে নিয়ে টাইপরাইটারে বসবার আগেই যা আমি এঁকে ফেলেছি। এই বইটি লেখা আসলেই খুব কঠিন একটা ব্যাপার ছিল তবে কেন কঠিন ছিল সে ব্যাপারে আমি কিছু বলতে পারব না। কঠিন সম্ভবত এই কারণে হতে পারে যে এর পটভূমি হল- কলকাতা... কলকাতায় আমি জীবনে দুইবার ছিলাম। প্রথমবার, 'শো ইয়োর টাং' লেখার ১১ বছর আগে। ইন্ডিয়ায় সেটাই আমার প্রথম যাওয়া। তখন মাত্র অল্প কয়েকটি দিন আমি কলকাতায় কাটাই আর সেখানে প্রচণ্ড ধাক্কা খাই। সেখানে আমার বইটি লিখতে শুরু করতে চেয়ে আমার ভিতর জাগে সেখানে আবারও ফিরে আসবার আকাঙ্ক্ষা, আরও দীর্ঘ সময় এখানে থাকবার আকাঙ্ক্ষা, আরও বেশি করে কলকাতাকে দেখা- লিখতে থাকা। আমি অন্যান্য জায়গাতেও দীর্ঘযাত্রাতে গিয়েছি- এশিয়া, আফ্রিকা- কিন্তু যখনই আমি হংকং কিংবা ম্যানিলা জাকার্তার বস্তিগুলি দেখেছি- শোচনীয় কলকাতার কথাই আমার বেশি করে মনে পড়েছে। পৃথিবীতে আর কোথাও এমন স্থান নেই যেখানে প্রথম বিশ্বের সমস্যাগুলি এইসব তৃতীয় বিশ্বের জায়গাগুলিতে একেবারে খোলাখুলিভাবেই মিশে গিয়েছে, দিনের আলোয় তাকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।

তাই আবার কলকাতা গিয়েছিলাম এবং সেখানে গিয়ে আমার ভাষাকেই হারিয়ে ফেলেছিলাম। কিছুতেই একটি শব্দও লিখতে পারছিলাম না। এই মর্মান্তিক অবস্থায় ড্রয়িং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ড্রয়িং তখন কলকাতার জীবন-বাস্তবতা ধরবার অন্য এক উপায়। আসলে তখন ড্রয়িঙের মাধ্যমেই আমি অবশেষে আবার গদ্য লিখতে সক্ষম হই। বইটির প্রথম অংশটাই এরকম, এক রকমের গদ্য। তারপর আমি তৃতীয় অধ্যায়ের কাজ শুরু করি- বারোটি অংশে বিন্যস্ত একটি দীর্ঘ কবিতা।

এটা ছিল নগর- কাব্য, কলকাতা নিয়ে।

আপনি যদি বইয়ের গদ্য, ড্রয়িং আর কবিতার দিকে তাকান, শুনবেন তারা একসঙ্গে কলকাতার কথাই বলছে- পরস্পর সম্পর্কিত হয়ে কিন্তু ভিন্ন পথে। এখানে একটিই সংলাপ আছে- তাদের মধ্যে, যদিও বয়ন বিন্যাস একেবারেই ভিন্ন।


সাক্ষাৎকারী : 
এই যে বিন্যাসের কথা বললেন, তাদের কোনও একটি কি অন্যগুলোর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ? 


গ্রাস: 
উত্তরে বলতে পারি, একমাত্র আমার নিজের জন্য বা, নিজের কাছেই কবিতাগুলি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। একটি উপন্যাসের জন্মের শুরু হয় কবিতার সঙ্গে। তবে আমি এটা বলব না যে এটাই চূড়ান্তরূপে সত্য। তবে, কবিতা ছাড়া আমি কিছুই করতে পারি না। কবিতাকে আমার খুব দরকার। একটা কিছুর সূচনাবিন্দু হিসেবেই তাকে আমার দরকার। 


সাক্ষাৎকারী : 
খুব মহিমান্বিত শিল্পের এক ধরন এবং সম্ভবত অন্যান্য সকল ধরণের থেকেই আলাদা! 


গ্রাস: 
না, না, না! গদ্য, কাব্য এবং রেখাচিত্র- আমার সকল কাজে তারা পাশাপাশি হাত ধরাধরি করেই চলে। সমানাধিকারের মত। গণতান্ত্রিক একটা ব্যাপার।


সাক্ষাৎকারী : 
তা কি লেখালেখির প্রক্রিয়ায় যা অনুপস্থিত থাকে রেখাচিত্রের অন্তর্নিহিতে যে-বলাটুকু তার সংবেদনা নিয়ে সরাসরি উপস্থিত থাকে...


গ্রাস: 
হ্যাঁ। লেখালেখি, প্রকৃত অর্থে খুবই শ্রমসাধ্য, অস্বতঃস্ফূর্ত এবং বিমূর্ত এক প্রক্রিয়া। লেখা যখন পাঠককে হাসায়, আনন্দ দেয়-- তখন রেখাচিত্রের আনন্দের চেয়ে লেখা'র আনন্দ সম্পূর্ণ ভিন্ন হয়ে যায়। আঁকার ক্ষেত্রে আমি- অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে খুবই সাবধানতার সঙ্গে কাগজের বুকে কোনও কিছু সৃষ্টি করার সময় সাবধান থাকি। এটা আসলেই অত্যন্ত সংবেদনশীল মাধ্যম, লেখার মাধ্যমে আপনি যা বলবেন না... আমি আসলে লেখার অপূর্ণতাটুকু ড্রয়িং দিয়ে প্রায় সময়ই পূর্ণতা দেওয়ার চেষ্টা করি।


সাক্ষাৎকারী :
লেখালেখি কি এতই কষ্টদায়ক? 


গ্রাস: 
লেখালেখিতে আসলে হয় কী, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশ মিলে একটি সমগ্র তৈরি হয় ঠিক যেন খোদাই করে করে একটি ভাস্কর্য সম্পূর্ণ করে তোলা। ভাস্কর্যে, এর প্রতিটি দিক থেকেই আপনাকে কাজ করতে হবে, চারপাশ থেকে। আপনি যদি তার এদিকের একটুখানি বদলে দেন তো আপনাকে সেদিকেরও একটুখানি বদলাতে হবে। তো, হঠাৎ আপনি এমন এক পরিবর্তন ঘটালেন এবং মূর্তিটি একটা বিশেষ কিছুতে রূপান্তরিত হল। বিশেষ কিছু হয়ে উঠল! মূর্তির ভেতরে যেন সঙ্গীত, জমাট বাঁধা সঙ্গীত যেন তার গড়নে। একটি বিশেষ লেখাতেও আসলে একই ব্যাপার ঘটে থাকে। দিনের পর দিন আমি একটি লেখার প্রথম, দ্বিতীয় বা তৃতীয় খসড়া নিয়ে পড়ে থাকি, কিংবা সারাদিন হয়ত একটি দীর্ঘ বাক্য নিয়েই বসে আছি কিংবা শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট সময়। আমি আসলে কাজের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট সময়সীমা পছন্দ করি। জানেন, আমি লিখতেই থাকি এবং লিখতেই থাকি এবং এভাবেই লেখাটা দাঁড়িয়ে যায়। লেখায় যেন আমার বলবার সবকিছু ঢুকে পড়ে কিন্তু কী যেন একটা দম-বন্ধ-করা ব্যাপার, ভারি একটা অসহ্য ব্যাপার... তখন আমি বদলাতে থাকি, যেগুলিকে আমি খুব গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছি না এবং যা বদলে যাচ্ছে, বাদ পড়ে যাচ্ছে। আহা, আর এই ব্যাপারটাকেই মনে হয় একটা বিশেষ ব্যাপার, আনন্দময়। কিন্তু এর স্থায়িত্ব মাত্র কয়েক সেকেন্ড। তারপর আমি পরবর্তী সময় প্রবাহের দিকে এগিয়ে যাই, ফলে কাজ এগোতে থাকে। 


সাক্ষাৎকারী : 
কবিতার মুহূর্তে, নিজেকে ফিরে পাওয়ার সময় হয়ত লিখলেন, হয়ত কবিতাটি উপন্যাসের অংশ হিসেবেই রচিত হল- এটা কি স্বতন্ত্র অবস্থাতেই থাকে, বিশেষভাবে লক্ষণীয় হয়ে ওঠে?

গ্রাস: 
একটা নির্দিষ্ট সময় ধরেই, কবিতা লেখবার বেলায় আমি আসলেই পুরনো ধাঁচেরই মানুষ। আমি ব্যাপারটাকে এভাবেই দেখি যে- যখন আপনার কাছে একটি ভাল কবিতা আছে, আপনার তখন বেরিয়ে পড়া উচিত এবং খুঁজে বের করা উচিত একজন প্রকাশককে, জুড়ে দিতে হবে কিছু ড্রয়িং এবং ছাপাতে হবে। 'ফ্রম দ্য ডাইরি অভ অ্যা স্নেইল' লেখা শুরুর সময় আমি আসলে গদ্য এবং কবিতার যৌথ সমবায় করেছিলাম পাতায় পাতায়। কবিতাগুলির স্বর ছিল একেবারেই ভিন্নধারার। গদ্য থেকে কবিতাকে বিচ্ছিন্ন করার কোনও কারণ আমি দেখতেই পাইনি, বিশেষ করে যেখানে জার্মানির সাহিত্যিক ঐতিহ্যের মধ্যেই ব্যাপারটা আছে, যেখানে গদ্য আর কবিতার রয়েছে বিস্ময়কর সন্ধি। আমি দিনে দিনে অত্যন্ত আগ্রহী হয়ে উঠলাম প্রতিটি চ্যাপ্টারের ভিতরে কবিতার ব্যবহার নিয়ে এবং গদ্যের গঠন বিন্যাসকে স্পষ্ট করে তুলবার জন্যই আমি কবিতার ব্যপক ব্যবহার শুরু করলাম। পাশাপাশি আরও একটি সম্ভাবনা তৈরি হল সেইসব গদ্য-পাঠক, যারা 'কবিতা আমার কাছে বড় বেশি জটিল আর ভারি'- মনে করেন তারা দেখতে পান যে মাঝে মাঝে কবিতাও গদ্যের চেয়ে কতটা সরল আর জটিলতাহীন হতে পারে।


সাক্ষাৎকারী : 
ইংরেজ-ভাষী পাঠকরা আপনার বই ইংরেজিতে পড়বার ফলে মূলের কতটুকু হারিয়ে ফেলে? 


গ্রাস: 
এই প্রশ্নের জবাব আমার পক্ষে খুবই জটিল-- আমি ইংরেজ পাঠক নই। কিন্তু আমি অনুবাদের মাধ্যমেই অনেক কিছুকেই নিজের মত করে পড়তে পারি। অনুবাদ দিয়েই সমস্যার সমাধান বের করি।

আমি যখন 'দ্য ফ্লাউন্ডার'-এর পাণ্ডুলিপি জার্মান প্রকাশকের কাছে পাঠাই তখন আমি নতুন এক চুক্তিতে আবদ্ধ হই। চুক্তির শর্ত এমন হয় যে আমি আগে আমার বইয়ের অনুবাদের জন্য পাণ্ডুলিপি তৈরি করে দেব আর অনুবাদক লেখাটিকে ভাল করে পড়ে নেবেন। প্রকাশকই সব ব্যবস্থা করলেন... এভাবেই হল 'দ্য ফ্লাউন্ডার', তারপর হল 'মিটিং অ্যাট তেলগেই', 'দ্য র‍্যাট'-ও হল। এইভবাবে লেখক, প্রকাশক আর অনুবাদের এই যে যৌথ এক ব্যাপার, এটা আসলেই চমৎকার। অনুবাদক আমার বই সম্পর্কে সবকিছু জানতে পারছেন এবং অসাধারণ সব প্রশ্নও করছেন। অনুবাদকরা এক-একটি বই সম্পর্কে এত বেশি জানতে পারছেন ততটুকু হয়ত আমিও জানি না। ব্যাপারটা মাঝে মাঝে অবশ্য আমার কাছে যন্ত্রণাদায়ক। কারণ, তারা বইয়ের মাঝে অনেক দোষ-ত্রুটি খুঁজে পাচ্ছেন আর সেগুলি নিয়েই আমাকে প্রশ্ন করছেন। আমাকে সমস্যাগুলি সম্পর্কে বলছেন। ফরাসি, ইতালিয়ান এবং হিস্পানি অনুবাদকরা অনুবাদ-সহায়ক নোট নিয়েছেন, নিজেরা নিজেরা কথা বলেছেন এবং এক পর্যায়ে দেখা গেল তাদের এই সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল স্বরূপ- বইগুলি তাদের স্ব-স্ব ভাষায় রূপান্তরিত হয়ে গেছে। আমি অবশ্যই অনুবাদকর্মকে অধিকতর শ্রেয় মনে করছি এই কথাটা মন থেকে দূরে সরিয়ে রেখে যে আমি একটি অনুবাদ পড়ছি।

জার্মান ভাষায়, আমরা এতই ভাগ্যবান যে, রুশ সাহিত্যের সমৃদ্ধ অনুবাদ পেয়েছি। তলস্তয় এবং দস্তয়ভস্কির অনুবাদ অসাধারণ এবং সত্যিকার অর্থেই তারা জার্মান সাহিত্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে শেক্সপিয়র এবং অন্যান্য রোম্যান্টিক রচয়িতাদের অনুবাদে ব্যাপক ভুল থেকে গেছে। তবে এই ভুল খুবই সামান্য, এবং- সৌন্দর্যময়। এইসব মহৎ সাহিত্যকর্মের নতুন করে যারা অনুবাদ করছেন সেখানে ভুলভ্রান্তি খুবই কম, বলা যায় নেই, তবে এইগুলিকে কোনভাবেই ফ্রেদ্রিখ ফণ শেগেল-লুদভিগ টেক-এর অনুবাদকর্মের সঙ্গে তুলনা করা যাবে না। একটি সাহিত্যকর্মকে, হোক তা কবিতা কিংবা উপন্যাস- দরকার এমন একজন অনুবাদকের যিনি তার নিজের ভাষায় সেই বইটিকে পুনরায় সৃষ্টি করতে সক্ষম থাকবেন। আমি আমার অনুবাদকদের এই ব্যাপারে সব সময় উৎসাহিত করি।


সাক্ষাৎকারী : 
আপনার কি মনে হয়েছে যে 'দিই রাতিন' ইংরেজিতে কিছুটা ভিন্ন অর্থে অনূদিত হয়েছে? কারণ, টাইটেলটা দাঁড়িয়েছে 'দ্য র‍্যাট', আর সেই কারণে, এটা যে একটা মেয়ে-ইঁদুর তা কিন্তু বোঝাচ্ছে না। 'দ্য শী র‍্যাট' কথাটিও অ্যামেরিকান শ্রবণে সঠিক মনে হচ্ছে না, আর 'র‍্যাটিসা' তো প্রশ্নেরই বাইরে। ব্যাপারটাকে ইঙ্গিতপূর্ণ মনে হওয়ার কারণ হল- নারী ইঁদুর দেখতে মহনীয় বিপরীতে লিঙ্গহীন ইংরেজি শব্দ 'র‍্যাট' যেন ভেলকিবাজির মত আমাদের মনে প্রতিদিনকার চেনা ছবিকেই দেখিয়ে দেয়, এই প্রানিগুলির ছবি, যারা সাবওয়েতে বহুসংখ্যক জড়ো হয়ে উৎপাত শুরু করে।

গ্রাস: 
হ্যাঁ, এমনকি জার্মান ভাষাতেও এরকম শব্দ আমাদের নেই। আমি শব্দকে সৃষ্টি করেছি। আমি আমার অনুবাদকদের আবিষ্কারের ব্যাপারে উৎসাহিত করি। তাদের বলি- যদি এই শব্দটি তোমাদের ভাষায় না থাকে, তো সৃষ্টি কর। আসলে- শী-- র‍্যাট- শব্দটি আমার কাছে ধ্বনি হিসেবে অপূর্ব।

সাক্ষাৎকারী : 
কেন এই বইয়ের ইঁদুরটি একটি মেয়ে ইঁদুর? পেছনের কারণটি কি যৌন-কামনা উদ্রেককারী কিংবা নারীবাদী কিংবা কোনও বিশেষ রাজনৈতিক কারণে?

গ্রাস: 
'দ্য ফ্লাউন্ডার'-এ সে পুরুষ। কিন্তু যতই আমার বয়স বাড়তে লাগল, দেখলাম- সত্যিকার অর্থেই যেন আমি আমাকে প্রকাশ করছি নারীর ভেতর দিয়ে। আমি এটাকে পরিবর্তন করলাম না। মানুষের মধ্যে নারী কিংবা ইঁদুরের মধ্যে একটি মেয়ে-ইঁদুর-- তাতে কোনই সমস্যা দেখলাম না। দেখলেন তো, এভাবেই আমি আইডিয়া পেয়ে গেলাম। তারা আমাকে লাফ দিতে এবং নাচতে বলল। এভাবে লাফিয়ে, নেচে পরবর্তীতে আমি শব্দদের খুঁজে পেলাম, গল্পটাকে খুঁজে পেলাম আর আমি মিথ্যা বলতে শুরু করলাম। মিথ্যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পুরুষের সঙ্গে মিথ্যা বলায় আসলে কোনও বিশেষ তাৎপর্য তৈরি হয় না আমার কাছে, পুরুষের সঙ্গে বসে, পাশাপাশি, মিথ্যা বলা-- কিন্তু একজন নারীর সঙ্গে!

সাক্ষাৎকারী : 
আপনার বেশিরভাগ বই যেমন- দ্য র‍্যাট, দ্য ফ্লাউন্ডার, ফ্রম দ্য ডায়রি অভ অ্যা স্নেইল, কিংবা ডগ ইয়ার্স- এ বইগুলির কেন্দ্রে রয়েছে কোনো না কোনো প্রাণি। এরকম হবার পিছনে কি বিশেষ কোনও কারণ আছে?


গ্রাস: 
সম্ভবত। আমি সব সময়েই অনুভব করেছি যে আমরা মানব প্রজাতি সম্পর্কে অতিরিক্ত কথা বলে ফেলেছি। এই পৃথিবী মানুষের চিৎকারে ভরা কিন্তু মানুষ ছাড়াও সেই পাখিরা, প্রাণিরা, মাছ এবং পোকামাকড়েরাও সেই ভিড়ে সেই চিৎকারে শামিল আছে। আমাদের এখানে থাকবার বহু আগে থেকেই তারা এখানে ছিল এবং তারা নিশ্চিতভাবেই এখানে থাকবে, অবশ্যই সেই দিনটি আসবে যেদিন মানব জাতি থাকবে না। এখানে তাদের সঙ্গে আমাদের একটা পার্থক্য আছে। আমাদের মিউজিয়ামে ডাইনোসরের হাড়গোড় রক্ষিত আছে, অতিকায় প্রাণি যারা কয়েক লক্ষ বছর ধরে বেঁচে ছিল এবং যখনই তারা মারা গেল- তারা যেন একেবারেই পবিত্র, সুন্দর দেহটাই রেখে গেল। মারাত্মক বিষ তাদের শরীরে নেই। তাদের হাড়গোড় খুবই পরিষ্কার। আমরা তাদের দেখতে পাচ্ছি। মানুষের ক্ষেত্রে কিন্তু ব্যাপারটা এরকম নয়। আমরা মারা গেলে চারপাশ ভয়ানক বিষাক্ত বাতাসে ভরে যায়। নিঃশ্বাসে বিষ মিশে থাকে। আমাদের আসলে এই ব্যাপারটি শিখতে হবে যে- কেবলমাত্র যে আমরাই এই পৃথিবীতে আছি তা কিন্তু নয়। বাইবেল আমাদেরকে খুব বাজে শিক্ষা দেয় তখন, যখন সে বলে- মানুষ কর্তৃত্ব করবে মাছের উপর, কর্তৃত্ব করবে বুনো পাখিদের উপর এবং কর্তৃত্ব করবে প্রতিটি পোকামাকড়ের উপর। আমরা এই পৃথিবীকে শুধু জয়-ই করার চেষ্টা করেছি মাত্র, ফলাফল হতাশাজনক।


সাক্ষাৎকারী : 
সমালোচনা থেকে কিছু শিখেছেন? 


গ্রাস: 
যদিও নিজেকে খুব ভাল ছাত্র হিসেবে কল্পনা করেছি আর সমালোচকরাও সাধারণত সব সময় ভাল শিক্ষক নন, তবে হ্যাঁ, এমন একটি সময় ছিল, সেই সময়টাকে আমি এখনও খুঁজে বেড়াই, যখন সত্যিই আমি সমালোচকদের কাছ থেকে শিখেছি। আমি গ্রুপ-৪৭-এর সময়ের কথাই উল্লেখ করছি। আমরা তখন পাণ্ডুলিপি থেকেই উচ্চস্বরে পড়তাম এবং সকলে মিলেই আলোচনা করতাম, নানান কথা বলতাম। কীভাবে একটি বিশেষ লেখাকে নিয়ে বিশ্লেষণ করতে হয় সেই ব্যাপারটা এখানে শিখেছিলাম। শিখেছিলাম আমার অভিমতের পক্ষের কারণগুলিকে তুলে ধরার কৌশল, 'আমি এই লেখাটিকে পছন্দ করি'- এই মামুলি কথাটা বলার চেয়ে যা অনেক ভাল ছিল। সমালোচনামূলক লেখা আসলে বেরিয়ে আসে স্বতঃস্ফূর্তভাবেই। লেখকরা আলোচনা করেন গল্পের শৈলী নিয়ে, শিল্প কৌশল নিয়ে, কীভাবে একটি বই লিখতে হয়- এই ধরনের ব্যাপার নিয়ে। সমালোচকরা যেমন হয়ে থাকেন- তাদের নিজেদের কিছু পছন্দ থাকে, লেখকরা যেন তাদের প্রত্যাশামাফিক লিখে প্রত্যাশা পূরণ করেন। সমালোচক আর লেখকের এই মিথস্ক্রিয়া- উভয়ই আমার জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ এক অভিজ্ঞতা, এক পাঠ। বস্তুত, খুব সাধারণ অর্থে, যুদ্ধোত্তর জার্মানির সাহিত্যে সেই সময়টি সত্যিই খুব তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। যুদ্ধের পর এখানে নানামাত্রিক বিশৃঙ্খলা ও বিভ্রান্তি করছিল বিশেষ করে সাহিত্য-কেন্দ্রিক সার্কেলগুলোতে। কারণ, এই জেনারেশনটি যুদ্ধের মধ্যে বিকশিত হচ্ছিল- আমার জেনারেশন- হয়ত ছিল অশিক্ষিত, না হয় ছিল শিক্ষা থেকে বঞ্চিত। চাষাড়ে। তাদের ভাষা ছিল দূষিত। গুরুত্বপূর্ণ লেখকরা দেশত্যাগ করেছিলেন। তখন জার্মান সাহিত্যের কাছে কেউই কিছু আশা করতেন না। গ্রুপ-৪৭-এর বার্ষিক সভাগুলোয় আমাদেরকে বলা হয়- যেভাবেই হোক জার্মানির সাহিত্যকে পুনর্জীবন দান করতে হবে। আমার জেনারেশনের অনেক জার্মান লেখক গ্রুপ-৪৭-এর দ্বারা বিশেষভাবে চিহ্নিত হয়েছিলেন, যদিও অনেকেই এখানে সম্পৃক্ত হন নি।


সাক্ষাৎকারী : 
সমালোচনামূলক লেখাগুলি সাময়িকপত্র কিংবা সংবাদপত্র না বই- কোথায় প্রকাশ হয়েছিল? আপনার উপর সেগুলির কিছু প্রভাব কি পড়েছিল?

গ্রাস: 
না। অন্যান্য লেখকের কাছ থেকে আমি আসলে শিখছিলাম। অ্যালফ্রেড ডবলিনের কিছু প্রভাব ছিল আমার উপর এবং আমি তাকে নিয়ে 'আমার শিক্ষক ডবলিন' এই নামে গদ্য লিখেছিলাম। দেখুন, আপনি ডবলিনের কাছ থেকে অনেক কিছুই নিতে পারবেন তাকে কোনওরকমের অনুকরণ না করে। আমার কাছে তিনি টমাস মানের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ডবলিনের উপন্যাসগুলি যে কেবল ভারসাম্যপূর্ণই নয়, মান-এর মতই ধ্রুপদী। যে-ঝুঁকি তিনি নিয়েছিলেন তা ছিল মহৎ। তার প্রতিটি বইই ছিল বিচিত্র সব আইডিয়া দিয়ে পূর্ণ এবং অত্যন্ত সমৃদ্ধ। আমার খারাপ লাগছে এই কারণে যে আমেরিকা আর জার্মানিতে তিনি বিশেষভাবে পরিচিত 'বার্লিন আলেকজান্ডারপ্লাজ' উপন্যাস দিয়ে। তবে, আমি এখনও শিখছি এবং এখানে আরও অনেক লেখকই আছেন যারা আমাকে শিক্ষা দিচ্ছেন।



সাক্ষাৎকারী : 
আমেরিকার লেখকদের সম্পর্কে কী বলবেন? 


গ্রাস: 
মেলভিল আমার সব সময়ের প্রিয়। এবং আমি উইলিয়াম ফকনার পড়ে অভিভূত, মুগ্ধ। থমাস উলফ এবং জন দস পাসজ। তবে দন পাসজের মত এখানে আর কেউ নেই, তিনি অদ্বিতীয় হয়ে থাকবেন বিশৃঙ্খলা বর্ণনার অসাধারণ ক্ষমতার কারণে। তিনিই এখন আমেরিকায়, লিখছেন। এক সময় আমেরিকার সাহিত্যে যে মহাকাব্যিক ডায়মেনশন ছিল আমি সেই ব্যাপারতার অনুপস্থিতিটা এখন টের পাচ্ছি। ওখানকার সাহিত্য এখন অতি-বুদ্ধিজীবীতাপূর্ণ হয়ে গেছে।


সাক্ষাৎকারী :
টিন ড্রাম-এর চলচ্চিত্র-সংস্করণ নিয়ে কী ভাবছেন? 


গ্রাস: 
শ্লোনড্রোফ খুব ভাল একটি সিনেমা বানিয়েছেন, এমন কি তিনি বইটির সাহিত্যিক ফর্মটিকেও অনুসরণ করেন নি। সম্ভবত, তা জরুরি ছিল, কারণটা আসলে অস্কারের পয়েন্ট অভ ভিউ, যে তার নিজের গল্পটি বলছে এক কালপর্ব থেকে অন্য আরেক কালপর্বে যেতে যেতে- খুব জটিল এক সিনেমাই বলতে হবে। তবে শ্লোনড্রোফ খুব সরল আর সহজভাবেই কিছু একটা করতে পেরেছেন। তিনি একটি সরলরেখার উপর দাঁড়িয়ে গল্পটি বলে গেছেন। মানে, টিন ড্রাম-এর চলচ্চিত্র-সংস্করণ থেকে শ্লোনড্রোফ অনেক কিছুই কেটে দিয়েছেন। আমি তার অভাব বোধ করেছি আর সিনেমাটার গতিমুখ... আমি আসলে পুরোটা পছন্দ করি নি। ক্যাথলিক চার্চের ছোট ছোট দৃশ্যগুলি যথাযথরূপে কাজ করেনি কারণ শ্লোনড্রোফ চার্চের শিক্ষা বিষয়ে কিছুই তেমন জানেন না মনে হয়েছে। তিনি একজন খাঁটি জার্মান প্রটেস্টান্ট। ছবির ক্যাথলিক চার্চকে মনে হচ্ছে প্রটেস্টান্ট চার্চ যেন সেখানে কেবল স্বীকারোক্তিমূলক ব্যাপারগুলিই ঘটছে। কিন্তু এটা আসলে আংশিক ডিটেইল। সবকিছু মিলিয়ে আর সেই ছোট্ট বালকটিকে যে অস্কারের ভূমিকায় অভিনয় করেছে... আমার মনে হয়েছে- টিন ড্রাম একটা ভাল সিনেমা।

সাক্ষাৎকারী :
অদ্ভুত এবং কিম্ভূতকিমাকার বিষয়ের প্রতি আপনার বিশেষ আগ্রহ লক্ষ্য করেছি। আমি আসলে খুব জনপ্রিয় একটি দৃশ্যের ব্যাপারে ভাবছি যেখানে ঘোড়ার মাথা থেকে একটি পিচ্ছিল মাছ বের হয়ে আসছে অস্বাভাবিক দেহভঙ্গি করে।

গ্রাস: 
এটা আমার ভেতর থেকেই বের হয়েছে। আমি এখনও বুঝতে পারিনি যে কেন এই পরিচ্ছেদটি লিখেছি যা কি না ছয়টি পাতায় বিস্তৃত এবং খুবই বিব্রতকর। এ আসলে এক উদ্ভট কল্পনাপ্রসূত বাস্তবতার বিবরণ, যা আমি লিখেছিলাম অন্যান্য বিষয়ে যেরকম বর্ণনা লিখে থাকি, স্বাভাবিকভাবে। তবে মৃত্যু আর যৌনতা কিছু ইমেইজের দ্বারা আমাদের স্মৃতিতে জেগে থাকে যা মানুষের মনের ভিতর বিবমিষার জন্ম দেয়।


সাক্ষাৎকারী : 
জার্মানির সাংস্কৃতিক জীবনে পুনর্মিলনের কী প্রভাব পড়েছিল? 

গ্রাস: 
সেইসব জার্মান শিল্পী আর লেখকদের কথায় কিন্তু কেউই কান দেয় নি যারা এর বিরোধিতা করেছি। দুর্ভাগ্যবশত- বুদ্ধিজীবীদের বড় অংশটাই এ সংক্রান্ত আলোচনায় আসলেনই না, হয়ত অলসতা কিংবা উদাসীনতা। আমি ঠিক জানি না। গোঁড়ার দিকে, সাবেক চ্যান্সেলর উইলি ব্রান্দিত ব্যাপারটাকে বলবেন- জার্মানির একতাবদ্ধতার ট্রেনখানা স্টেশন থেকে যাত্রা শুরু করেছে কিন্তু কেউ তাকে থামাতে পারছে না। খুব দুর্বলভাবে সংগঠিত জনসাধারণের একটি প্রবল উতসাহব্যাঞ্জক ব্যাপার যেন কোথায় হারিয়ে গেল। যেন একটি অমানবিক নির্বোধ রূপক সত্যের মত চেপে বসল। এই ব্যাপারটা কেউ যেন নিশ্চিত করে দিল যেন কেউ আর এই বিষয়ে ভাবতে না পারে যে কী বিশ্রীভাবেই না এটা পূর্ব জার্মানির সংস্কৃতিকে ধ্বংস করেছে, তাদের অর্থনীতির কথা কিন্তু আসছে না। না, আমি এরকম কোনও ট্রেনে চড়তে রাজি না, যাকে কোনভাবেই সঠিক নির্দেশনা দেয়া যাবে না এবং যে ট্রেন সিগন্যালে প্রয়োজনীয় সাড়াও দেবে না। এরকম অবস্থায় আমি তখন প্ল্যাটফর্মেই দাঁড়িয়ে থাকব। 


সাক্ষাৎকারী : 
পুনর্মিলন সম্পর্কে আপনার দৃষ্টিভঙ্গির কারণে জার্মান প্রেস আপনাকে খুব তীব্রভাবেই সমালোচনা করেছিল। তখন আপনি কীভাবে এর প্রতিবাদে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছিলেন?

গ্রাস: 
আহঃ... আমি এসব ব্যাপারে অভ্যস্ত। এসবের কারণে অবশ্য আমার অবস্থানের উপর কোনও প্রভাব পড়ে নি। পুনর্মিলন ব্যাপারটা এমনভাবে অগ্রসর হচ্ছিল যা আসলে আমাদের মৌলিক আইনকেই অমান্য করছিল। একটি নতুন সংবিধানকে লিখতে শুরু করতে হয়েছিল যখন বিভক্ত জার্মানি আবার এক হতে শুরু করেছিল, এটা হবে এমন এক সংবিধান যা সংযুক্ত জার্মানির সমস্যাবলীর জন্য যথোপযুক্ত। কিন্তু না, আমরা আদৌ নতুন সংবিধান পেলাম না। যা হল- পুরো পূর্ব জার্মানি যেন পশ্চিমের একটি উপভাগে পরিণত হল- যেন, শুধুই সংযুক্ত আছে। ব্যাপারটা করা হল দেওয়ালের মাঝখানে কিছু ছিদ্রপথ রেখে দিয়ে। আর সংবিধানে একটি অনুচ্ছেদ সংযুক্ত হল যার মূল অভিপ্রায় ছিল একক জার্মানি রাষ্ট্র যেন পশ্চিম জার্মানিরই অংশ হয়। যেন পশ্চিম-ই একক ভাবে জার্মান রাষ্ট্র হয়ে ওঠে। এই অনুচ্ছেদ পশ্চিম জার্মানির নাগরিকদের অধিকারকে অনুমোদন করল- এথনিক জার্মানদের জন্য, নৃতাত্ত্বিক দিক থেকেই যারা জার্মান। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়- তারা হল পূর্ব থেকে স্বপক্ষ ত্যাগ করে আসা লোক ছিল তারা। এটাই ছিল আসল সমস্যা। কারণ, পূর্ব জার্মানির সব কিছুই যে দুর্নীতিকবলিত হয়ে পড়ছিল, তা নয় কিন্তু। তাদের শাসকরাই ছিল নষ্ট। আর এখন পূর্ব জার্মানির সব কিছু- তাদের বিদ্যাপীঠ, শিল্প, সংস্কৃতি-- সবকিছুকে ভাগ্যের হাতে ছুঁড়ে মারা হচ্ছে কিংবা সমস্ত বিকাশকেই যেন কঠোর হাতে দমন করা হচ্ছে। সৌন্দর্যকে কলুষিত করা হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে। আর তাতে করে সমগ্র জার্মানির জনসংস্কৃতিটাই যেন ক্রমশ বিলুপ্ত, অন্তর্হিত হয়ে গেছে।


সাক্ষাৎকারী : 
জার্মানির মিলন এক ঐতিহাসিক ঘটনা, যাকে আপনি পুনঃপুনঃ একের পর এক বইয়ে তুলে এনেছেন। যখনই আপনি এইসব পরিস্থিতি বিষয়ে লিখেছেন, আপনি কি তখন 'সত্য' ইতিহাস বর্ণনার দিকে পা দিয়েছেন? 'ফিকশনাল হিস্ট্রি' কীভাবে সংবাদপত্র কিংবা বইপুস্তকে বর্ণিত ইতিহাস থেকে আপনার লেখায় উপস্থিত হয়?

গ্রাস: 
ইতিহাস সংবাদের চেয়েও বেশি কিছু। আমি নিজে খুবই সতর্ক ছিলাম ঐতিহাসিক ঘটনা পরম্পরার অগ্রসরণ নিয়ে, আমার দুটি বইয়ে। 'দ্য মিটিং অ্যাট তেলগেই' এবং 'দ্য ফ্লউন্ডার'-এ। 'দ্য ফ্লউন্ডার'-এর গল্পটি আসলে মানবজাতির উর্বরাশক্তি বৃদ্ধির ঐতিহাসিক ক্রমোন্নতি নিয়ে। বইটি লিখতে গিয়ে গল্পের বিষয়ে, বর্ণনার ক্ষেত্রে বস্তুগত কোনও বিষয় আসলেই ব্যবহৃত হয় নি। খুব সাধারণভাবেই, ইতিহাস আসলে- যুদ্ধ, শান্তি, রাজনৈতিক নিপীড়ন কিংবা দলীয় রাজনীতি ইত্যাদির সঙ্গে মিলে পরম্পরা তৈরি করবেই। মানুষের উর্বরতাশক্তির বৃদ্ধির প্রক্রিয়া এবং মানব জাতির পুষ্টি হল মূল প্রশ্ন, এবং, এটা আজকের দিনের সবচেয়ে দরকারি একটি বিষয়, যখন খাদ্যাভাবজনিত মৃত্যু এবং জনসংখ্যা বিস্ফোরণ তৃতীয় বিশ্বে হাত ধরাধরি করে চলছে। যাই হোক, ইতিহাসের জন্য আমাকে আবিস্কার করতে হয়েছিল এই ডকুমেন্টেশন পদ্ধতির, আর আমাকে ঠিক করে নিতে হয়েছিল ইতিহাসের সঙ্গে জুড়ে দিতে এমন এক রূপকথা যা রূপকের কাজ করবে, পথ দেখাবে। রূপকথা, খুব সাধারণ অর্থে, আসলে সত্যকেই বলে, সত্যকেই প্রকাশ করে। আমাদের অভিজ্ঞতার নির্যাসকে মহিমান্বিত করে। আর, আমাদের অস্তিত্বের ধারণাকে সৌন্দর্যময় করে যা এই পৃথিবীতে হারিয়ে গেছে। এভাবে ভাবতে গেলে দেখা যায়- অনেক অনেক সমস্যার, জটিলতার চেয়েও এই ঘটনাবলী সত্য কথাই প্রকাশ করতে চেয়েছে। 
 

সাক্ষাৎকারী : 
আপনার চরিত্রগুলি সম্পর্কে বলুন।


গ্রাস: 
সাহিত্যিক চরিত্রগুলি এবং বিশেষভাবে সেই মুখ্য-চরিত্র বা নায়ক- যাকে অবশ্যই একটি বইকে বহন করে চলতে হয়, যাকে নিয়ে একটি বই দীর্ঘতর হয়; সম্প্রসারিত হয়,- সে আসলে বহুসংখ্যক ভিন্ন ভিন্ন মানুষের, ধারণার এবং অভিজ্ঞতার এক সমন্বয়। সব যেন একসঙ্গে তোড়ায় বাঁধা থাকে। একজন গদ্যলেখক হিসাবে আপনাকে চরিত্রগুলিকে সৃষ্টি করতে হবে। আবিষ্কার করতে হবে। এর মধ্যে কিছু চরিত্রকে আপনি পছন্দ করবেন এবং অন্যদের পছন্দ করবেন না। আপনি তখনই তাদেরকে সফলভাবে আনতে পারবেন, সৃষ্টি করতে পারবেন- যদি আপনি সেইসব মানুষের ভেতর প্রবেশ করেন। আমি যদি নিজেই আমার নিজস্ব সৃষ্টিকে বুঝতে না পারি নিজের ভেতর থেকে, তবে তো তারা কাগজের মানুষ ছাড়া আর কিছুই নয়।

সাক্ষাৎকারী :
চরিত্রগুলি খুব ঘনঘনই একেকটি আলাদা বিষয়ভিত্তিক বইয়ে দেখা দিয়েছে। আমি আবারও তুল্লা, ইজাবেল, অস্কার; এবং তার দাদিমা আন্না'র কথা বলছি, আসলে উদাহরণ হিসাবেই বলছি।
এক্ষেত্রে আমার এই অনুভূতিগত প্রতিক্রিয়া জেগেছে যে, কল্পনাবিশ্ব থেকে সৃষ্ট কিছু চরিত্রের সমবায় বা পরিবার যাদেরকে আপনি কেবলমাত্র আপনার বইয়ে উপস্থাপন করছেন, তাদের প্রমাণ করছেন; আপনি কি কখনওই এমনটা ভেবেছিলেন যে তাদের স্বাধীন অস্তিত্ব আছে?


গ্রাস: 
যখনই আমি একটি বই লিখতে শুরু করি, আমি কতিপয় ভিন্নধর্মী চরিত্রকে ধীরে ধীরে গড়ে তুলি। একটি বই যখন রচিত হতে শুরু করে সেখানে আমার ভূমিকা হয় এটা খেয়াল করে দেখা যে- কল্পনাবিশ্বের এই চরিত্রগুলি প্রায়শই তাদের নিজস্ব জগতে বিচরণ করতে শুরু করেছে। এখানে উল্লেখ করতে পারি- দ্য রেট-এ একজন ষাট বছর বয়স্ক ব্যক্তি হিসাবে মি. মেখযারেৎ-কে পুনঃউপস্থাপন করার কোনই পরিকল্পনা আমার ছিল না। তিনি কিন্তু নিজেকে আমার কাছে উপস্থাপন করলেন, উপন্যাসে তাকে অন্তর্ভুক্ত করতে বললেন, বলতে থাকলেন- আমি এখনও এখানে আছি। এই গল্পটি আমারও। তিনি এই বইয়ের ভেতরে ঢুকে পড়বার আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করলেন। আর প্রায় সারাটা বছর ধরেই ঘুরেফিরে আমি এই ব্যাপারটা বুঝতে পারলাম যে, এইসব নির্মিত মানুষ তাদের নিজেদের চাহিদা তৈরি করছেন, আমাকে দ্বন্দ্বে ফেলতে চেষ্টা করছেন এবং এমনকি তাদেরকে ব্যবহার করার ব্যাপারেও নিজেরাই হ্যাঁ কিংবা না বলছেন, কেউ আবার অন্যদের ব্যাপারে অধিকতর মনযোগী হতে পরামর্শ দিচ্ছেন, তাদের কথা শুনতে বলছেন কখনও কখনও। তবে, অবশ্যই তারা প্রত্যেকেই প্রত্যেককে আলাদা আলাদা ভাবে শুনছেন। আর ব্যাপারটা এক ধরনের সংলাপে পরিণত হচ্ছে । মাঝে মধ্যে কেউ কেউ উত্তেজিত হয়ে পড়ছেন। ব্যাপারটা পারস্পরিক সমন্বয় এবং সমবায়।


সাক্ষাৎকারী : 
তুল্লা পখরেইফখ আপনার অনেক বইয়েই কেন্দ্রীয় চরিত্র হয়েছে। 


গ্রাস: 
তার চরিত্রটি খুবই জটিল। অসঙ্গতি, বিরোধিতা এবং দ্বন্দ্বে পরিপূর্ণ। আমি আসলেই বইগুলি লেখবার সময় খুব বেশি একাত্ম হয়ে পড়ি। আমি তুতল্লা-কে ব্যাখ্যা করতে পারব না। যদি তা করতে যাই, তাহলেই সেখানে ব্যাখ্যা থাকতে হবে। কিন্তু আমি চরিত্রের ব্যাখ্যা দিতে ঘৃণা বোধ করি। আমি আসলে আপনাকে আহ্বান করব যে চরিত্রটি সম্পর্কে আপনি আপনার নিজের মত করে ভাবুন, মনে তার ছবি আঁকুন। চরিত্র যেন নিজেই নিজের অবয়ব তৈরি করে নেয়। জার্মানির স্কুল-পড়ুয়া শিশুরা স্কুলে আসলে কী পড়তে চায়? খুব ভাল একটি গল্প কিংবা লাল-মাথাওলা একটি বই। কিন্তু এটা তাদের জন্য অনুমোদিত নয়। তাদেরকে যদি কবি কী বলতে চেয়েছেন সে ব্যাপারে ধারণা না দিয়ে প্রতিটি কবিতা, প্রতিটি পৃষ্ঠা সম্পর্কে নাক গলানো শুরু করেন, তাহলে সেটা 'আর্ট' সংক্রান্ত কাজ হিসাবে দাঁড়ায় না। আপনি তাদের কাছে কিছু টেকনিক্যাল বিষয়কে ব্যাখ্যা করছেন, রচনা পদ্ধতি সম্পর্কে জ্ঞান দিচ্ছেন কিন্তু একটি ছবি কিংবা একটি কবিতা বা একটি গল্প কী একটি উপন্যাসের রয়েছে অনেকগুলি নানামুখী সম্ভাবনা, বহুসংখ্যক রূপান্তর। প্রত্যেক পাঠক একটি কবিতাকে পড়তে গিয়ে নতুন করে সৃষ্টি করেন, অর্থ দেন- এক নতুন দিগন্ত যেন বারে বারে পাঠে পাঠে উন্মোচিত হয়। আর এটাই সেই কারণ, যে- কারণে আমি ব্যাখ্যাকে ঘৃণা করি। আজ অবধি, আমি খুবই খুশি যে, আপনি এখনও তুল্লা পখরেইফখ-এর সংস্পর্শেই রয়েছেন।


সাক্ষাৎকারী : 
আপনার বইগুলি প্রায় সময়ই বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে কথা বলেছে। টিনড্রাম-এ, অস্কার যেমন প্রথম পুরুষে কথা বলেছে তেমনি তৃতীয় পুরুষ হয়েও কথা বলেছে। ডগ ইয়ার্স-এ আখ্যান দ্বিতীয় থেকে তৃতীয় পুরুষে বদলে গেছে। এভাবে একজন অন্যজনে বা অন্য রূপে চলে যাচ্ছে। এই বিশেষ কৌশলটি কীভাবে আপনাকে বিশ্ব সম্পর্কে আপনার দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রকাশ করতে সাহায্য করেছে?

গ্রাস :
আমরা সকলে প্রত্যেকেই সব সময়ই খুঁজে চলি নির্ভেজাল এক পরিপ্রেক্ষিত- গভীরতা, অবস্থান, দৃশ্যরূপ, পারম্পর্য। উদাহরণস্বরূপ- অস্কার মেতযারেখ। একটি বামন-শিশু, এমনকি পরিণত বয়সেও সে শিশু। তার আকার এবং তার জড়তা, অক্রিয়তা তাকে বিভিন্ন পরিপ্রেক্ষিত থেকে একটি পরিপূর্ণ মাধ্যম বা বাহন বানিয়ে ফেলে। তার থাকে বিশালত্বের প্রত্যয়ন, বঞ্চনা, বিভ্রম; এবং সেই কারণে, প্রায়ই সে তৃতীয় পুরুষে পরিণত হয়ে নিজের সঙ্গেই সংলাপে মেতে ওঠে, ঠিক যেমন বড় বাচ্চারা মাঝেমাঝে করে থাকে। এটা তার নিজেকে নিজেই মহিমান্বিত কিংবা নিবেদনের একটি অংশ। যেন আমরা সবাই রাজপরিবারের লোক, এবং দে গুইয়েলির সেই চেতনা, যিনি বলছেন- আমিই দে গুইয়েলি ... আর এইসব হল সমস্ত আখ্যানের, বর্ণনার বিশেষ ভঙ্গিসমূহ, যা দূরত্বকে নির্দেশ করে। ডগ ইয়ার্স-এ আছে তিনটি পরিপ্রেক্ষিত। কুকুরের ভূমিকার সঙ্গে প্রত্যেকটিতেই রয়েছে ভিন্নতা। কুকুর এখানে প্রতিসরণের একটি অবস্থা।



সাক্ষাৎকারী :
কীভাবে আপনার আগ্রহের বিষয়গুলি পরিবর্তিত হয়েছে এবং আপনার শৈলী আপনার লেখক-জীবনে নতুন নতুন মাত্রা পেয়েছে?

গ্রাস : 
আমার প্রথম তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বই- 'দ্য টিন ড্রাম', 'ডগ ইয়ার্স' এবং নভেলা- 'ক্যাট অ্যান্ড মাউস' একটি কালপর্বের প্রতিনিধিত্ব করছে- ষাটের সময়টাকে। এই তিনটি বইয়ের কেন্দ্রেই আছে দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সময়ের জার্মানির অভিজ্ঞতা, যা একসঙ্গে মিলে আসলে গড়ে উঠেছে 'দানজিং ট্রিলজি'। সেই সময় আমি বিশেষভাবে অনুভব করেছি যে, আমার লেখালেখিতে নাৎসি শাসনকালকে নিয়ে কাজ করা, বলা, এর অনিবার্যতা, এবং নাৎসিদের শাখা-প্রশাখার বিস্তৃতি ইত্যাদি আমি কাজের মধ্য দিয়ে দেখতে দেয়েছি।

তার মাত্র কয়েক বছর পর আমি লিখলাম- ফ্রম দ্য ডায়রি অভ অ্যা স্নেইল। এখানেও যুদ্ধ নিয়ে কাজ করেছি কিন্তু এই বইয়েই যেন আমার 'গদ্যভঙ্গি এবং ফর্ম' এক সত্যিকার যাত্রাপথ খুঁজে পেল। আমার লেখায় জায়গা পেয়ে গেল ইতিহাসের তিনটি ভিন্ন ভিন্ন অধ্যায়- অতীত (দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ), বর্তমান (১৯৬৯ সালের জার্মানি, যখন আমি বইয়ের কাজ শুরু করে দিয়েছিলাম), এবং ভবিষ্যৎ (যা আমাদের সন্তানদের দ্বারা উপস্থাপিত হবে)। আমার মাথার মধ্যে এবং বইয়ের মধ্যে- এই বিশেষ কালপর্ব যেন একাকার হয়ে গিয়েছিল। আমি সেই তালগোল পাকানো একাকার অবস্থা থেকে তাদের আলাদা করেছিলা। গ্রামার স্কুলে যেমন ক্রিয়ার কাল শেখানো হয়েছিল- অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ। বাস্তব জীবনে এই বিষয়টা মোটেও সহজ সরল নয়। প্রায় প্রতি মুহূর্তে আমি ভবিশ্যতের ভাবনায় অধীর ছিলাম, আমার অতীতকাল সম্পর্কিত জ্ঞান এবং বর্তমান কাল তো এই এখানেই... বর্তমানের অভিঘাতটা এমন যাকে আমি ভবিষ্যৎ বলছি। এবং বাক্যগুলি যা কি না গতকাল যাদেরকে বলা হয়েছিল হয়তো সেগুলো এখনও অতীত হয়ে যায়নি এবং এখনও কাজ করছে, এই আজও, সম্ভবত তারা ভবিষ্যতেও থাকবে। মানসিকভাবে আমরা কাল-নির্ঘণ্টের কারণে বাধা প্রাপ্ত নই। আমরা একই সঙ্গে ভিন্ন ভিন্ন সময়খণ্ডের ব্যাপারে সচেতন যেন কালপর্বগুলি ভিন্ন ভিন্ন পর্যায়ে বিভক্ত নয়। যেন তারা এক, অভিন্ন। ঘটনার একক প্রবাহ। লেখক হিসাবে সময় এবং কালের যুগপৎ সংগঠনকে উপলব্ধি করতে পারি এবং তাকে নিজের মত করে তুলে ধরতে পারি। এইসব সময়কেন্দ্রিক বিষয়গুলি ক্রমান্বয়ে আরও অধিকহারে আমার লেখায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে শুরু করল। 'হেডবার্থস, অর দ্য জার্মানস আর ডাইয়িং আউট'-এ সত্যি সত্যি বর্ণিত হয়েছে এক নতুন উদ্ভাবিত সময় থেকে, যাকে আমি বলছি একটি শব্দে, একটি বিশেষ শব্দে- ভারগেইগেনখাফত। এই শব্দটি অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ- এই তিনটি শব্দের একটি পারদমিশ্রণ। জার্মান ভাষায় আপনি অনেকগুলি শব্দকে একসঙ্গে জুড়ে দিয়ে কাজ চালাতে পারবেন। যৌগিক রূপ দিতে পারবেন। 'ভার' এসেছে 'ভাগাংগেনহিএত' থেকে যার অর্থ দাঁড়ায়- অতীত। 'গেইগেন' এসেছে 'গেগেইয়েনয়ারত' থেকে, শব্দটি বর্তমানকে বোঝাচ্ছে আর 'খাফত' এসেছে 'যুনফত' থেকে। এই শব্দটির মানে- ভবিষ্যৎ। এই নতুন, পরস্পর মিশ্রিত সময়ই হল 'দ্য ফ্লাউন্ডার'-এর কেন্দ্রিয় বিষয়। এই বইটিতে বর্ণনাকারী যেন সময়কে পুনরায় জন্ম দিয়ে চলেছেন। বারবার। ঘুরে ফিরে... এবং তার অনেকগুলি ভিন্ন ভিন্ন জীবনীখণ্ড কিংবা জীবনস্মৃতি নতুন নতুন পরিপ্রেক্ষিতের জন্ম দিচ্ছে। সবাই তার নিজস্ব বর্তমান কালেই গভীরভাবে স্থিত। অনেকগুলি ভিন্ন কালখণ্ডের পরিপ্রেক্ষিত থেকে একটি বই লেখার মানে হল- পেছনের দিকে ফিরে তাকানো এবং সেই গত-হওয়া-কাল থেকে যা আজকের দিনের কাছে সমকালীন হয়েছে তার সংস্পর্শে থাকা। আমি ভাবি যে আমার আসলে নিজস্ব একটি ভঙ্গি দরকার, এই ভঙ্গিটাই ফর্ম। কিন্তু উপন্যাস আসলে একটি মুক্ত বা খোলা ফর্ম; আমি তাই অনবরত খুঁজে চলি- এক রূপ থেকে অন্য রূপে, এক ভঙ্গি থেকে ভিন্ন ভঙ্গিতে যাই। একটি বইয়ের ভেতরেই আমি কবিতা থেকে গদ্যের দিকে যেতে থাকি।


সাক্ষাৎকারী : 
আপনি 'ফ্রম দ্য ডায়রি অভ অ্যা স্নেইল' বইয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন দানজিং-এর ইহুদিদের জীবনে কী ঘটেছিল সেই বিষয়টির সঙ্গে সমসাময়িক রাজনীতির সমন্বয় করে দেখিয়েছেন। এখানে আমি জানতে চাইছি, ১৯৬৯ সালে উইলি ব্র্যান্ড-এর জন্য আপনি যে বক্তৃতাগুলি লিখেছেন এবং নির্বাচনী প্রচারে গেছেন, আপনার কি মনে হয় যে এই ব্যাপারগুলি একটি বইয়ের বিষয়বস্তু হিসাবে পরিণত হয়েছে?

গ্রাস : 
আমার অন্য কোনও পছন্দ ছিল না বলেই নির্বাচনী প্রচারণায় গিয়েছিলাম, ঠিক বই লিখব বলে নয়। ১৯২৭ সালে জার্মানিতে জন্ম নিয়ে, আমার বারো বছর বয়সে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল এবং আমার সতেরো বছর বয়সে সেই যুদ্ধ শেষ হয়। জার্মানির এই অতীতের কারণে আমি ভারাক্রান্ত হয়ে পড়েছিলাম। না, আমিই একমাত্র নই, এখানে আরও অনেক লেখক ছিলেন, তারাও ব্যাপারটাকে অনুভব করেছেন। আমি যদি একজন সুইডিশ কিংবা সুইস লেখক হতাম, তাহলে আমি হয়ত বহু কিছুই করতাম, হয়ত কৌতুক করতাম। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে তা ছিল অসম্ভব। আমার ব্যাকগ্রাউন্ড ছিল বেশ জটিল। অন্য কিছু বেছে নেওয়ারও কোনও উপায় ছিল না। পঞ্চাশ এবং ষাটের দশকে, আদেনারের শাসনকালে, রাজনিতিকরা অতীত নিয়ে কথা বলতে পছন্দ করেন না কিংবা যদি বলেনও তো তারা আমাদের অতীত সম্পর্কে বলেন যে সেই সময় থেকেই আমাদের পরিস্থিতি খারাপের দিকেই যাচ্ছিল এবং সেটাই আমাদের ইতিহাসের দানবীয় সময় যখন অশুভ আত্মারা অসহায় শান্তিপ্রিয় জার্মানদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করছে। তারা জঘন্য মিথ্যাচার করতে থাকেন। এটা আসলেই খুব জরুরি এবং তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় যে তরুণ প্রজন্মকে সেই সময় সম্পর্কে বলা, যে, কীভাবে কী ঘটেছিল। আসলে তা ঘটেছিল দিনের আলোয়, ধীরে খুব ধীরে এবং পদ্ধতিগতভাবে। সেই সময়ে যে কেউ দেখতে ইচ্ছা করলেই দেখতে পেত কী-সব ঘটছে। তবে, সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ বিষয়টা হল ফেডারেল রিপাব্লিকের চল্লিশ বছর পরে সম্ভব হয়েছে- আমরা নাৎসি শাসনকাল সম্পর্কে কথা বলতে পারি। আর, যুদ্ধোত্তর সাহিত্যও এই ব্যাপারটাকে তুলে ধরার ক্ষেত্রে অগ্রণি ভূমিকা পালন করেছে।

সাক্ষাৎকারী : 
'দ্য ডায়েরি অব অ্যা স্নেইল' শুরু হয়েছে- 'প্রিয় সন্তানেরা', এই কথাটি দিয়ে। এ আসলে যুদ্ধোত্তর পুরো একটি প্রজন্মের প্রতি এক আহ্বান, কিন্তু আপনি কেবলমাত্র আপনার সন্তানদেরকে বুঝিয়েছেন।

গ্রাস : 
আমি তাদেরকে বুঝিয়ে বলতে চেয়েছিলাম যে গণহত্যা কীভাবে ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছিল-- সে সম্পর্কে। যুদ্ধের পর জন্ম নিয়ে, আমার সন্তানদের একজন পিতা ছিল যে নির্বাচনী প্রচারাভিযানে নেমে পড়েছিল এবং সোমবার সকালে বক্তৃতা করেছিল, কিন্তু পরের শনিবারটি আসার আগে সে আর আর তার বাড়িতে ফিরে আসেনি। তারা তাকে জিজ্ঞেস করেছিল-- কেন তুমি এমনটা করতে গেলে? কেন তুমি এত সব সময়ই আমাদের কাছ থেকে দূরে সরে আছ? তখন এই ব্যাপারটাকে আমি তাদের কাছে পরিষ্কার করার চেষ্টা করি। মুখে বলে নয়- আমি যা লিখেছি, তার মাধ্যমে। সেই সময়ে চ্যান্সেলর ছিলেন কুর্ত কেইসিঞ্জার আর তিনি সেই যুদ্ধের সময় থেকেই ছিলেন নাৎসি। সুতরাং আমি যে শুধু একজন নয়া জার্মান চ্যান্সেলরের জন্য লড়াই করছিলাম তা-ই নয়, বরং আমি নাৎসি অতীতেরও প্রচণ্ড বিরোধিতা করছিলাম। আমার বইয়ে আমি কোনওভাবেই বিমূর্ত সংখ্যা দিয়ে বলতে চাইনি- 'বহু, বহু সংখ্যক ইহুদি হত্যা করা হয়েছে'। ছয় মিলিয়ন হল একটি বোধের অতীত সংখ্যা। আমি চেয়েছিলাম সংখ্যাটিকে আমার সন্তানদের কাছে এমনভাবে তুলে ধরতে যেন তাদের ভেতর প্রতিক্রিয়ার জন্ম হয়। তাই আমি ঘটনার যোগসূত্র হিসাবে আমার গল্পের জন্য বেছে নিই দানজিং সিনাগগের ইতিহাসকে- যা, এই শহরটিকে বহু শতক ধরে জড়িয়ে আছে- জার্মান নাৎসিদের দ্বারা ধ্বংসপ্রাপ্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত। আমি স্পষ্ট করে দেখাতে চেয়েছিলাম সেই সত্যকে,- আসলেই সেখানে যা যা ঘটেছিল। বইটির চূড়ান্ত দৃশ্যে আমি সেইসব ঘটনার সঙ্গে বর্তমানকে মিলিয়ে দিয়েছিলাম। অ্যালব্রেখৎ দুয়ের-এর তিনশ'তম জন্মদিন উপলক্ষ্যে দেয়া বক্তৃতার প্রস্তুতি সম্পর্কে লিখেছিলাম। শেষ অধ্যায়টা ছিল দুয়ের-এর ওপর পড়া বিষাদের দীর্ঘ এক ছায়া। দুয়ের-এর খোদাইকর্ম বিষণ্ণতা-১, আর এই বিষাদগ্রস্ততার প্রভাব যেন তীব্র হয়ে পড়েছিল মানুষের ইতিহাসের ওপর। আমি কল্পনা করেছিলাম যে একটি সুদূরবিস্তারি সাংস্কৃতিক বিষণ্ণতার কোনও দেশ যেন জার্মানদের জন্য সঠিক মনোভাব প্রকাশ করছে, যা তাদের জন্য সেই হলোকোস্ট থেকে দূরে সরে যাবার কাজটি করছে। অনুতপ্ত এবং শোকাকুল। এটা ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের গোপন কিছু ব্যাপার তাদেরকে জানিয়ে দেবে, আর যা আমাদের সময়েও ঘটতে থাকবে।


সাক্ষাৎকারী : 
আপনার বেশিরভাগ বইয়েরই এটা একটা বৈশিষ্ট- বর্তমান বিশ্বপরিক্রমায় অনাগত দিনের আশঙ্কার ভেতর যে তীব্র ভয়, যে শোচনীয় ব্যাপার লুকিয়ে রয়েছে- তার দিকে ফোকাস করে। এর উদ্দেশ্য কি আপনার পাঠকদের সতর্ক করা কিংবা উস্কানি দেওয়া, যাতে তারাও ঘটনার অভিঘাতে সক্রিয় সাড়া দেন?

গ্রাস : 
খুব সহজ করে যদি বলি, আমি কখনই তাদেরকে বিভ্রান্ত করতে চাই না। আমি চাই তারা যেসব সমস্যার ভেতর পরে রয়েছে, সেই পরিস্থিতিটাকে উপস্থাপন করতে কিংবা সেই তাদের কথা বলতে চাই যারা সামনের দিকে মুখ করে আছে। মানুষ তার নিজেকে হারিয়ে ফেলার শোকে পীড়িত, তার কারণ অবশ্য এটা নয় যে সবকিছুই ভয়ংকর। কারণটা হল মানুষ হিসাবে সবকিছু বদলে দেবার আশ্চর্য ক্ষমতাটি কিন্তু আমাদের হাতেই আছে; কিন্তু তা কখনও হবার নয়। আমরাই আমাদের সংকটের জন্মদাতা; আমরাই সংকটকে নিশ্চিত করেছি, এবং- তার সমাধানের জন্য স্বয়ং সংকট-ই যেন আমাদের কী করা উচিৎ তা বলে দিচ্ছে।


সাক্ষাৎকারী : 
আপনার সক্রিয়তা রয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক ইস্যুতে যেমন, তেমনি পরিবেশ নিয়েও। এবং আপনি আপনার কাজের ভেতর দিয়ে তাদেরকে একীভূত করেছেন।

গ্রাস : 
গত কয়েক বছরে আমি জার্মানি এবং বিশ্বের অন্যান্য স্থানেও প্রচুর ঘুরে বেরিয়েছি। আমি দেখেছি আর বুঝতে পেরেছি এক মরতে থাকা বিষাক্ত পৃথিবীকে। আমি রেখাচিত্র দিয়ে একটি বই প্রকাশ করেছি, যার নাম জঙ্গলের মৃত্যু। তা এমন এক পৃথিবীকে নিয়ে, ফেডারেল রিপাবলিক অভ জার্মানি এবং জার্মান ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিকে এখনও যা টিকে আছে- এসব নিয়েই এই বই। যেখানে 'রাজনৈতিক সম্মিলন' ধারনাটি অগ্রগামী হয়েছে, শুকিয়ে-মরে-যাওয়া-জঙ্গলের ভেতর পুনর্মিলনের আকাঙ্ক্ষা জাগছে। পশ্চিম জার্মানির পর্বতঘেরা সীমান্ত অঞ্চল এবং চেকস্লাভাকিয়ার মধ্যেও ব্যাপারটা সত্যি হতে চলেছে। ব্যাপারটা এমন দেখাচ্ছে যেন কসাইরাই স্থান করে নিচ্ছে সর্বত্র। আমি তা-ই এঁকেছি, যা আমি সেখানে দেখেছি। ছবি গুলোয় আছে অল্পকথার বিবরণী আর তাৎপর্যপূর্ণ শিরোনাম- যাদের অভিপ্রায় বর্ণনার চাইতেও অনেক বেশি বিবরণমূলক কিছু হয়ে ওঠা এবং পরিশেষে একটি উত্তর-ভাষ। এই ধরনের বিষয় আশয় নিয়ে কাজ করতে গেলে রেখাচিত্র হয়ে উঠে লেখার সমান কিংবা কখনও কখনও তার চেয়েও বেশি কিছু।


সাক্ষাৎকারী : 
আপনি কি বিশ্বাস করেন যে একটি দীর্ঘ সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতাগুলিকে সঠিক পথ নির্দেশের ক্ষেত্রে, স্পষ্ট করে ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে সাহিত্যের যথাযথ শক্তি রয়েছে?

গ্রাস : 
আমি এটা বিশ্বাস করি না যে রাজনীতি অবশ্যম্ভাবিরূপে কেবল দলগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। তাহলে ব্যাপারটা ভয়াবহ হতাশার জন্ম দেবে। এখানে অনেক সেমিনার হয়, কনফারেন্স হয় এই বিষয়টির ওপর- 'সাহিত্য কি পৃথিবীকে বদলাতে পারবে'! আমি চিন্তা করি পরিবর্তনকে প্রভাবিত করবার শক্তি সাহিত্যের আছে। এরকম ভাবনা কিন্তু আমার আছে। শিল্পী তা ভাবতেই পারে। আমরা আমাদের দেখবার প্রতিদিনকার অভ্যাসকে যদি পরিবর্তন করতে পারি আধুনিক শিল্পকলার অনিবার্য ফল স্বরূপ- তাহলে এটাই হল সেই বদলে ফেলবার প্রকৃত পন্থা, যার সম্পর্কে আমরা সকলেই সচেতন। কিউবিজম-এর মত একেবারে নতুন এক রীতির প্রচলন 'দেখবার' এক নতুন শক্তি যেন আমাদের সরবরাহ করে। জেমস জয়েসের ইউলিসিসের মধ্যকার অন্তর্বর্তী একালাপ কিংবা স্বগতোক্তির যে সূচনা- আমাদের নিজেদের অস্তিত্বকে বোঝবার ক্ষেত্রে 'যে জটিলতা' থাকে তাকে পর্যন্ত প্রভাবিত করেছে। এটাই সেই পরিবর্তন সাহিত্য যাতে তার প্রভাব বিস্তার করে, যাকে সহজে মাপা যায় না। একটি গ্রন্থ এবং তার পাঠে পাঠকের মধ্যে যে মিথস্ক্রিয়া তৈরি হয়- তা খুব নির্মল, মনোরম, শান্তিপূর্ণ এক অপ্রকাশিত সন্ধি।

বই মানুষকে কতটুকু বদলে দিতে পারে?- আমরা এই ব্যাপারে কিন্তু তেমন কিছুই জানি না। আমি উত্তরে শুধু এটাই বলব যে বইগুলি এখন পর্যন্ত আমার জন্য চূড়ান্ত নিষ্পত্তিকারক। আমি যখন তরুণ, যুদ্ধের পর অনেক অনেক বইয়ের ভেতর থেকে কিছু বই আমার কাছে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। আল বেয়ার কামু'র বইগুলি, দ্য মিথ অভ সিসিফাস। সেই বিখ্যাত মিথের নায়ক যে শাস্তি পেয়েছিল... পর্বতের ওপর একটি পাথরকে তুলতে হবে, পাথরটি চূড়ায় উঠতে না উঠতেই নিচে গড়িয়ে পড়ে অনিবার্যভাবে- ঐতিহ্যগত দিক থেকে একেবারে খাঁটি এক বিয়োগান্তক চরিত্র, যাকে একেবারে নতুন মাত্রায় আমার জন্যই যেন কামু বইয়ে নিয়ে আসলেন। ঋদ্ধ করেলন। সেই অবিরাম, নিষ্ফল আবর্তন, সেই পাথরের গড়িয়ে নামা পর্বতের ওপর থেকে... আসলে, প্রকৃতপক্ষে এটা তার অস্তিত্বের এক তৃপ্তিকর অনুভব। সে হয়ত খুব দুঃখ পাবে যদি কেউ পাথরটি তার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে নেয়। ঘটনাটি আমার ওপর বিশাল এক প্রভাব বিস্তার করে। আমি চূড়ান্ত লক্ষ্যের ওপর কখনওই আস্থা রাখতে পারি না। আমি এমনও ভাবতে পারি না যে পাথরটি চিরদিনের মত পর্বতের ওপরে স্থাপিত হয়ে গেছে। আমরা এই মিথটাকে মানব জাতির অবস্থার এক ইতিবাচক ছবি হিসাবে গড়ে তুলতে পারি। এমনকি মিথটি যদি ভাববাদের প্রতিটি ফর্মের বিরুদ্ধেও দাঁড়িয়ে যায়, যার অন্তর্ভুক্ত জার্মান ভাববাদ, এবং সকল ভাববাদ। পশ্চিমের সকল চিন্তারীতি বা ভাবনাধারাই কিছু চূড়ান্ত লক্ষ্যের দিকে আমাদেরকে নিয়ে যেতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ- একটি সুখি, একটি ন্যায়ানুগ কিংবা একটি শান্তিকামী সমাজ। কিন্তু এসবে আমার বিশ্বাস নেই। আমরা সমস্তকিছুর নিরন্তর পরিবর্তন প্রবাহের মধ্যেই বেঁচে আছি। এটাই হয়ত সেই পাথর, যে-পাথর সব সময়ই আমাদের হাত ফস্কে গড়িয়ে পড়ছে এবং তাকে অবশ্যই আমাদেরকে গড়িয়ে গড়িয়ে চূড়ায় তুলতে হবে; হ্যাঁ, এরকম কিছু আমরা অবশ্যই করব- পাথরটি যে আমাদেরই অংশ। 


সাক্ষাৎকারী : 
তাহলে কীভাবে আপনি মানুষের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে কল্পনা করেন?

গ্রাস : 
যতদিন আমাদের প্রয়োজন হবে, ততদিন আমরা ভবিষ্যতকে নানাভাবে, নানা ভঙ্গিতে প্রত্যাশা করব। কিন্তু আমি আপনাকে একটি শব্দে বেশি কিছু বলতে পারব না। এ সম্পর্কে একটি শব্দে আমি এর কোনও উত্তরও দিতে রাজি নই। একটি বই আমি লিখেছি, ইঁদুর- 'দ্য শী-রেট', 'রাত্তেসা'। আপনি আর কী চান? এই বইটিই আপনার প্রশ্নের একটি দীর্ঘ উত্তর।



অনুবাদক পরিচিতি
এমদাদ রহমান

বাংলাদেশের মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জে জন্ম, ১৯৭৯ সালে। শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। গল্প লেখেন। ২০১৪-তে বের হয়েছে তাঁর প্রথম গল্প-সংকলন 'পাতালভূমি ও অন্যান্য গল্প'। অনুবাদ করেন। কবিতা, স্মৃতিকথা, চিঠি, নোটবুক আর ডাইরি পাঠ ও অনুবাদে আগ্রহী।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন