মঙ্গলবার, ১২ জানুয়ারী, ২০২১

উইলিয়াম ফকনার'এর গল্প: এমিলির জন্য ভালোবাসা



অনুবাদ : বেগম জাহান আরা


[এক] 

মিস এমিলি গ্রিয়ারসনের অন্তেষ্টিক্রিয়ায় আমাদের সারা শহরের লোক ভেঙে পড়েছিলো। শহরের পুরুষেরা এই যশস্বী মহিলার প্রতি যথাযথ সম্মান জানাতেই এসেছিলেন। আর অধিকাংশ মহিলা এসেছিলেন মিস এমিলির বাড়ির ভেতরটা দেখার কৌতূহল নিয়ে। গত দশ বছরে এই বাড়িতে একজন বয়সি কাজের পুরুষ 'লোক-কাম মালি- কাম রাঁধুনি' ছাড়া আর কাউকে দেখা যায়নি। সেই বাড়ির সব কিছু দেখা শোনা করতো।

বাড়িটা চৌকোনা ধরনের এবং বেশ বড়ো। একসময় সাদা রঙেরই ছিলো। সত্তর দশকে ভারি চুনাপাথরে নির্মিত বিশেষ স্টাইলের বাড়ি এটা। এর স্থাপত্যে ডোম এবং আঁকা বাঁকা সর্পিল অলংকরণসহ পেঁচানো ব্যালকনি থাকে। কোনও এক সময় আমাদের এই অভিজাত রাস্তায় বাড়িটা নির্মাণ করা হয়েছিলো। কিন্তু গ্যারাজ এবং বিচি থেকে তুলা আলাদা করার মেশিন ক্রমশ বাড়ির দিকে ছড়িয়ে এগিয়ে গিয়ে ঢেকে ফেলেছিলো বিশিষ্ট ব্যক্তিদের লেখা নামগুলো। মিস এমিলির বাড়িটাই শুধু দেখা যেতো। ফলে মেশিন পত্র, সব জঞ্জাল এবং গ্যাস পাম্প ছাড়িয়ে প্রকট হয়ে থাকতো এই বাড়িটার বীভৎস কুশ্রি চেহারা। শুধু কুশ্রি বললে ঠিক হয় না, কুশ্রিগুলোর মধ্যে কুশ্রি এই বাড়িটা। চক্ষু পীড়াদায়ক যাকে বলে। যাক, মিস এমিলির পালা এবার শেষ। সুগন্ধি ঝাউগাছের উদাস করা পরিবেশের কবরস্থানে তিনি এখন চলে গেছেন। সেখানে বহু নামি দামি এবং নাম না জানা লোকের কবর আছে। এবং জেফারসনের যুদ্ধে মারা যাওয়া ইউনিয়ন ও কনফেডারেট সৈন্যদেরও কবর আছে। মিস এমিলি এখন সামিল হয়েছেন সেখানেই।

জীবিত মিস এমিলি ছিলেন নিজেই একটা ঐতিহ্যের আইকন। সেই ১৮৯৪ থেকে উত্তরাধিকার সুত্রে এই শহরের ভালো মন্দের সাথে বাধ্যগতভাবে জড়িয়ে ছিলেন তিনি। সেই সময় মেয়র কর্ণেল সাতোরিস একটা দাপ্তরিক আদেশপত্র জারি করেছিলেন এই মর্মে যে, এপ্রোন ছাড়া কোনও কৃষ্ণাঙ্গ মহিলা এই রাস্তায় আসতে পারবে না। তিনিই মিস এমিলির বাবার মৃত্যুর সময় থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য তাঁর কর মওকুফ করে দিয়েছিলেন। এটা নয় যে মিস এমিলি এমন দয়ার দান এমনি এমনি গ্রহণ করতেন। পেছনের কারণ হলো, কর্ণেল সাতোরিস একটা গল্প ফেঁদেছিলেন এই মর্মে যে, মিস এমিলির বাবা টাকা ধার দিয়েছিলেন শহর উন্নয়নের জন্য। ব্যবসা বাণিজ্যের সুবাদে সেই টাকা শোধ দেয়া হবে ক্রমে ক্রমে। কর্ণেল সাতোরিসের বংশের কেউ একজন এই গল্প আবিষ্কার করেছিলেন এবং একজন মাত্র মহিলা তা বিশ্বাস করতেন। 

আধুনিক ধ্যান ধারণা সম্পন্ন পরের প্রজন্ম যখন মেয়র এবং কমিশনার পদে এলেন, তখন এই ব্যবস্থাকে সন্তুষ্ট মনে ঠিক মেনে নিতে পারলেন না তাঁরা। বছরের প্রথমেই তাঁরা কর পরিশোধের জন্য একটা নোটিস পাঠালেন মিস এমিলিকে। ফেব্রুয়ারি মাস এসে গেলেও কোনও উত্তর এলো না চিঠির। তাঁরা একটা আনুষ্ঠানিক চিঠি দিয়ে মহিলাকে তাঁর সুবিধে মতো সময়ে শেরিফের অফিসে দেখা করার জন্য ডাকলেন। এর একসপ্তা পর মেয়র স্বয়ং তাঁকে চিঠি লেখে জানালেন, অফিসে আসার জন্য গাড়ি পাঠানো হবে তাঁকে। এর উত্তরে পুরনো পাতলা কাগজে হালকা কালি দিয়ে লেখে মিস এমিলি জানালেন, তিনি এখন আর বাইরে যান না। এবং কোনও মন্তব্য ছাড়া করের নোটিসটা তাঁর চিঠির সাথে পাঠিয়ে দিলেন।

শহরের কমিশনারেরা একটা বিশেষ সভার আয়োজন করলেন এবং প্রতিনিধি পাঠালেন মিস এমিলির কাছে। তাঁরা এসে দরজায় নক করলেন। চিনা পেইন্টিং-এর ক্লাস বন্ধ করে দেয়ার পর থেকে সে দরজা বন্ধ রাখা হয়েছিলো। তারপর আট দশ বছর হয় কোনো লোক বা আগন্তুক কেউ কোনোদিন সেই দরজা দিয়ে আসা যাওয়া করেননি। বুড়ো কৃষ্ণাঙ্গ পরিচারক তাঁদেরকে একটা ম্লান আলো সম্পন্ন হল ঘরের ভেতরে আসতে দিলো। সেখান থেকে সিঁড়ি উঠে গেছে আরও ছায়া ছায়া অন্ধকারের দিকে। ধুলো এবং পতিত জায়গার বদ্ধ ভ্যাপসা একটা গন্ধ পাওয়া গেলো। পরিচারক পার্লারে নিয়ে গেলো তাঁদেরকে। ঘরটা চামড়ায় মোড়া ভারি আসবাবপত্রে সজ্জিত ছিলো। পরিচারক একটা জানালা খোলার পর তাঁরা দেখলেন, চামড়াগুলো ফেটে ফেটে গেছে। যখন তাঁরা সেখানে বসলেন, হালকা ধুলো খুব আলগোছে উড়ে এলো তাঁদের জানুর চারপাশে। খোলা জানালা দিয়ে আসা আলোয় স্পষ্ট দেখা গেলো সেগুলো। ঘরে ফায়ার প্লেসের সামনে মলিন ইজেলের ওপর ক্রেয়নে আঁকা মিস এমিলির বাবার একটা ছবি রাখা ছিলো।

কালো পোশাক পরা ছোটো খাটো মহিলা যখন ঘরে এলেন, তখন উঠে দাঁড়ালেন সবাই। তাঁর গলায় পাতলা একটা সোনার চেইন কোমর পর্যন্ত নেমে এসে বেল্টের মধ্যে ঢুকে গেছে। ওপরে বিবর্ণ সোনালি মাথার কালো বেঁতের আসবাবের গায়ে হেলান দিয়ে তিনি দাঁড়ালেন। তাঁর কাঠামো ছোটো এবং খুব ক্ষীণ। মোটা বা থলথলে নয়। তাঁকে মনে হচ্ছিলো, অনেক দিন বদ্ধ পানিতে ডুবে থাকা ফোলা কিছুর মতো ফ্যাকাসে। চোখ দুটো ডুবে আছে মুখের মাংসের ভেতর। যেনো একতাল কাদার মধ্যে দুটো কয়লার টুকরো চেপে বসিয়ে দেয়া হয়েছে। আর সেই চোখ দুটো প্রতিনিধিদের মুখের ওপর পর্যায়ক্রমে ঘুরছিলো যখন তাঁরা কথা বলছিলেন।

তাঁদের কাউকে তিনি বসতে বলেন নি। দরজায় দাঁড়িয়ে শান্তভাবে শুনছিলেন যতক্ষণ না প্রতিনিধির কথা হঠাৎ থেমে গেলো। তারপর স্তব্ধতা। সোনার চেইনের প্রান্তে থাকা অদৃশ্য ঘড়ির টিক টিক শব্দ শোনা গেলো শুধু।

মিস এমিলি শুকনো এবং ঠান্ডা গলায় বললেন, ‘ কর্ণেল সাতোরিস পরিষ্কার বলেছেন, জেফারসনের কাছে আমার কোনও কর দেয়ার নেই। সম্ভবত আপনাদের কেউ একজন 'শহর নথি' দেখলে বিষয়টা পরিষ্কার হয়ে যাবে।'

- “কিন্তু আপনার কর বাকি আছে। আমরা নগর কর্তৃপক্ষের লোক, মিস এমিলি। শেরিফের সই করা একটা চিঠি কি পাননি?”

- “আমি একটা কাগজ পেয়েছি। তিনি হয়ত নিজেকে শেরিফ মনে করছেন … কিন্তু আমার কোনও কর বাকি নেই জেফারসনে।"

- “বইয়ে এই ব্যাপারে কিছু লেখা নেই যে আপনাকে দেখাবো। তবে আমরা অবশ্যই নিয়ম মেনে---”

- “দেখেন কর্ণেল সাতোরিস, আমার কোনও কর বাকি নেই জেফারসনে।"

- “কিন্তু, মিস এমিলি--”

- “দেখেন কর্ণেল সাতোরিস ( প্রায় দশ বছর হয় কর্ণেল সাতোরিস মারা গেছেন), আমার কোনও কর বাকি নেই জেফারসনে।" লম্বা ঢিলে কাপড়টা কাঁধের ওপর দিয়ে পেঁচিয়ে নিলেন। এমন সময় কৃষ্ণাঙ্গ পরিচারক আসলো সেখানে। মিস এমিলি তাকে বললেন, "যাওয়ার রাস্তাটা দেখিয়ে দাও তো এই ভদ্রলোকদের।"


[ দুই ]


কঠিন রূঢ় আচরণে তাঁদেরকে দুর দুর করে বিদায় দিলেন মিস এমিলি। তিরিশ বছর আগে গন্ধের ব্যাপারে কথা বলতে এলে তাদের পুর্ব পুরুষদেরও ঠিক এমনি করেই তিনি দুর করে দিয়েছিলেন।

তাঁর বাবার মৃত্যুর দুই বছরের কিছু পর তাঁর প্রেমিক চলে গেলো। আমরা বিশ্বাস করেছিলাম তিনি এমিলিকে বিয়ে করবেন। কিন্তু কপাল মন্দ। বাবার মৃত্যুর পর মিস এমিলি খুব কম বাইরে বেরোতেন। প্রেমিক চলে গেলে তাঁকে দেখাই যেতো না বাইরে। মহিলাদের মধ্যে কেউ কেউ দুঃসাহস করে তাঁকে ফোন করেছিলেন। কোনও উত্তর পাওয়া যায়নি তার। সেই বাড়িতে জীবনের চিহ্ন বলতে এক কৃষ্ণাঙ্গকে দেখা যেতো। সে তখন যুবা ছিলো। বাজারের বাস্কেট হাতে নিয়ে একমাত্র সেই আসা যাওয়া করতো বাড়ির মধ্যে।

মহিলারা বলাবলি করতেন, কোনও পুরুষ মানুষ কি আর সুন্দর ভাবে রান্নাঘর সামলাতে পারে! ফলে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই যে, সেখান থেকেই গন্ধ তৈরি হচ্ছে। তাছাড়াও কথা আছে, এই বিচিত্র পৃথিবীতে গ্রিয়ারসন পরিবারের মতো বনেদি এবং প্রভাবশালী মহিলাদের সব কাজ বা আচরণ ঠিক বোঝাও যায় না।

প্রতিবেশি এক মহিলা , আশি বছর বয়সি মেয়র, জাজ স্টিভেনস-এর কাছে নালিশ দিলেন।

মেয়র বললেন, ”আমাকে কি করতে বলেন আপনি ম্যাডাম?”

মহিলা বললেন, “ কেনো? এইসব বন্ধ করার জন্য তাঁকে চিঠি দেয়া হোক। দেশে কি আইন কানুন কিছুই নেই?

জাজ স্টিভেনসন বললেন, “না না, আমি নিশ্চিত, এর কোনও প্রয়োজন নেই। সম্ভবত লোকটা বাড়ির অঙ্গনে সাপ বা ইঁদুর মেরে রেখেছে। তারই গন্ধ পাওয়া যায়। ব্যাপারটা জানার জন্য লোকটার সাথেই কথা বলে নেবো আমি নিজে।"

পরদিন আরও দুটো নালিশ পেলেন মেয়র। একজন অনেক রকম বিরুদ্ধমত জানিয়ে বললেন, “আমাদের অতি অবশ্যই কিছু করা উচিত জাজ। পৃথিবীতে আমিই শেষ ব্যক্তি, যে কিনা মিস এমিলির এইসব বরদাস্ত করবো। অবশ্যই কিছু করতে হবে আমাদের।"

সেই রাতে তিনজন ধুসর-দাড়ি বিশিষ্ট কমিশনার এবং একজন উঠতি প্রজন্মের যুবক এক সভায় মিলিত হলেন।

নালিশকারক বললেন, “ এটা খুব সহজ কথা, মিস এমিলিকে বলা হোক নিজের এলাকা পরিষ্কার করতে। তাঁকে সময় বেঁধে দেয়া হোক। আর যদি তিনি কথা না---”

“ আহ, থামেন তো আপনারা," বিরক্ত হয়ে জাজ স্টিভেনস বলেন, “ মুখের ওপর কোনও মহিলাকে গন্ধের কথা বলে অভিযোগ দেয়া যায়?

পরদিন মধ্য রাতের পর, চারজন মানুষ মিস এমিলির লন অতিক্রম করে সিঁদেল চোরের মতো চুপি চুপি তাঁর বাড়ির দিকে এগোলেন। তারপর ইঁটের গন্ধ শুঁকে শুঁকে শ্বাস টেনে এগিয়ে গেলেন মাটির নিচে ভাঁড়ার ঘরের দরজা পর্যন্ত। একজন ঘাড়ে ঝোলানো ব্যাগে হাত দিয়ে, সেখান কিছু নিয়ে ঘুরতে লাগলেন বীজ বোনা মেশিনের মতো। তাঁরা ভাঁড়ার ঘরের দরজা ভেঙে সেখানে এবং বাড়ির বাইরে চুন ছিঁটিয়ে দিলেন। তারপর লন পার হয়ে ফিরে আসার সময় দেখলেন অন্ধকার জানালায় আলো জ্বলছে। মিস এমিলি সেখানে বসে আছেন। আলোটা পেছনে থাকায় তাঁর শরীরের ওপরের অংশ দেখা যাচ্ছিলো নিশ্চল মূর্তির মতো। যেনো পুজোর দেবী বসে আছেন। খুব চুপি চুপি নিঃশব্দে লন অতিক্রম করে, রাস্তার দিকে লাইন দিয়ে বসে থাকা বিশাল বিশাল ফড়িঙের ছায়া পার হয়ে চলে গেলেন তাঁরা। এক বা দুই সপ্তার মধ্যে উধাও হয়ে গেলো গন্ধটা।

তারপর থেকে লোকজনের খুব মায়া হলো মিস এমিলির প্রতি। আমাদের শহরের লোকেরা তাঁর দাদির মা, মানে লেডি উইয়াটের কথা মনে করলেন। সেই মহিলা শেষ বয়সে সম্পূর্ণ অপ্রকৃতিস্থ হয়ে গিয়েছিলেন। শহরের লোকেরা বিশ্বাস করতেন, গ্রিয়ারসনরা যতোটা উচ্চ বংশীয় ছিলেন, তার চেয়ে আরও বেশি উঁচু মর্যাদার মনে করতেন নিজেদের। তরুণ বয়সের কাউকেই মিস এমিলির তেমন ভালো লাগতো না। অনেক দিন থেকেই আমাদের মনে হতো মিস এমিলি এবং তাঁর বাবা অনুভুতিহীন নিশ্চল পুতুলের মতো মানুষ। সামনে দরজার পেছনে মিস এমিলি এবং তাঁর বাবার একটা ছবি, এক ফ্রেমে টাঙানো ছিলো। ছবিতে সাদা পোশাকে ক্ষীণাঙ্গী মিস এমিলির সামনে তার বাবা কালো পোশাকে হাতে একটা ঘোড়ার চাবুক নিয়ে দাঁড়ানো। তিরিশের কাছাকাছি বয়সের পরও মিস এমিলি যখন অবিবাহিত থেকে গেলেন, তখন খুব একটা ভালো লাগতো না আমাদেরও। তবে আমাদের ধারণা ঠিক ছিলো। পাগলের বংশের মানুষ হলেও বিয়ের কোনও সম্বন্ধ পাকপাকি হলে সেই সুযোগকে তিনি নষ্ট করতেন না।

যখন তাঁর বাবা মারা যান, তখন শুধু বাড়িটা ছাড়া তাঁর আর কিছু ছিলো না। শহরের লোকজনেরা এতে খুশিই হয়েছিলো। এরপর থেকে মিস এমিলিকে লোকেরা করুণা করতে শুরু করেছিলো। তারা মানবিক আচরণ করতেও শুরু করেছিলো এই ভেবে যে, তিনি নিঃসঙ্গ এবং দরিদ্র। লোকজন মনে করেছিলো, বাবার মৃত্যুর পর মিস এমিলি টাকার মর্ম টের পাবেন হাড়ে হাড়ে।

মিস এমিলির বাবার মৃত্যুর পরদিন স্থানীয় রীতি অনুসারে মহিলারা তাঁর বাসায় এক শোক যাপনের আয়োজন করেছিলেন। তাঁকে সাহায্য সহযোগিতার কথা ভেবেছিলেন। দরজায় দাঁড়িয়ে মিস এমিলি তাঁদের সাথে দেখা করলেন। তাঁর পরনে ছিলো সাধারণ পোশাক। মুখে ছিলো না কোনও শোকের চিহ্ন। মহিলাদের তিনি জানালেন যে, তাঁর বাবা মারা যাননি। তিনদিন এই রকম করলেন তিনি। পরে মন্ত্রি, ডাক্তার ডেকে তাঁকে বোঝানো হলো যে মৃতদেহ ঘরে রাখা ঠিক নয়। এই দেহ সরাতে হবে এবং সৎকার করতে হবে। অবশেষে আইন শৃঙ্খলার সাহায্য নেয়ার মতো অবস্থা হয়েছিল। শোকে দুঃখে তখন একেবারে ভেঙে পড়েছিলেন মিস এমিলি। তারপর তাড়াতাড়ি সৎকার করা হয়েছিলো তাঁর বাবার।

আমরা বলিনি যে, মিস এমিলি তখন অপ্রকৃতিস্থ ছিলেন। বরং আমরা ভেবেছিলাম , এরকম করাটাই স্বাভাবিক ছিলো তাঁর জন্য। আমাদের মনে পড়ে, সমস্ত যুবকদের তাড়িয়ে দিয়েছিলেন তাঁর বাবা। এটাও জানতাম, আর কেউ অবশিষ্ট ছিলো না। দুর্ভাগ্য এই, যে বাবা তাঁর জীবন গড়ার সুযোগগুলো নষ্ট করেছিলেন, মৃত্যুর পর, সেই বাবার স্মৃতিটুকু আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকা ছাড়া আর কোনও উপায় ছিলো না মিস এমিলির।


 [ তিন ]


দীর্ঘ দিন মিস এমিলি অসুস্থ ছিলেন। যখন তাঁকে আমরা আবার দেখলাম, তখন তাঁর অন্য চেহারা। ছোটো করে চুল কাটার ফলে তাঁকে দেখতে বালিকার মতো লাগছিলো। সেই চেহারার সাথে কোথায় যেনো একটা অস্পষ্ট মিল ছিলো গির্জার রঙিন কাঁচে আঁকা দেবদূতের মুখের সাথে। যেমন বিষাদময় তেমন শান্ত পবিত্র।

পায়ে হাঁটা পথ নির্মাণের জন্য শহর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ চুক্তি করেছিলো। তাঁর বাবার মৃত্যুর পরের গরমকালে শুরু হয়েছিলো সেই পথের কাজ। নির্মাণ কোম্পানি রাস্তা তৈরির জন্য নির্মাণ শ্রমিক, খচ্চর এবং আনুসঙ্গিক যন্ত্রপাতি নিয়ে উপস্থিত হলো। বিরাটকায় ইয়াংকি মার্কা, কৃষ্ণকায়, শক্ত পোক্ত, গমগমে ভারি গলার একজন ফোরম্যান এলেন। তাঁর নাম হোমার ব্যারোন। মস্ত মুখাবয়বের মধ্যে তার চোখ দুটো ছিলো হাল্কা রঙের। ছোটো ছোটো ছেলেরা দল বেঁধে তার কান্ড কারখানা দেখতে আসতো। কাজের সময় তিনি শ্রমিকদের অশালীন ভাষায় শাপ শাপান্ত করতেন, এবং শ্রমিকেরা জিনিসপত্র ওঠানো নামানোর সময় গান গাইতো, সেই সব শুনে মজা পেতো ছোটোরা। বেশ অল্প সময়ের মধ্যেই চিনে ফেললেন তিনি শহরের লোকজনদের। যখনই আপনি শুনবেন স্কয়ারের আশে পাশে হাসি তামাসা হৈ হল্লা হচ্ছে, তখনি বুঝতে হবে হোমার ব্যারোন আছেন সেই দলের মধ্যমণি হয়ে। সম্প্রতি তাঁকে এবং মিস এমিলিকে রবিবার বিকেলে দেখা যেতে লাগলো হলুদ চাকার খোলা ছোটো ঘোড়ার গাড়িতে বেড়াতে। এই গাড়ির জন্য আস্তাবল থেকে একই রকমের আকার প্রকার এবং সাজ সজ্জার ঘোড়া ভাড়া করে আনতেন তিনি।

আমরা প্রথমে খুশি হলাম এই ভেবে যে, এখনও মিস এমিলির জীবিনবোধ আছে। মহিলারা বলতেন, “ গ্রিয়ারসন পরিবারের কেউ অবশ্যই উত্তরাঞ্চলের একজন দিন মজুরের সাথে বন্ধুত্বের কথা ভাববেন না।" অন্য বয়সিরা বলতেন, দুঃখ বিষাদ একজন সত্যিকার বনেদি মহিলার সম্ভ্রান্ত আচরণকে বদলে দিতে পারে না। তাঁরা বলতেন, “ বেচারা এমিলি।" তাঁর রক্ত-সম্পর্কের আত্মীয় স্বজনদের উচিত, তাঁর কাছে এসে থাকা।" এমিলির কিছু আত্মীয় ছিলো আলাবামাতে। কিন্তু অনেক আগেই লেডি উইয়াটের সম্পত্তি নিয়ে বিবাদ বিসম্বাদের ফলে তাঁদের সাথে সম্পর্ক ভেঙ্গে গিয়েছিলো। আর কোনও যোগাযোগ ছিলো না তাঁদের মধ্যে। অন্তেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠানেও তাঁদের পক্ষ থেকে আসেননি কেউ।

বয়সি লোকেরা "বেচারা এমিলি" বলার পর থেকেই একটা ফিসফিসানি শুরু হয়েছিলো। পরস্পরের মধ্যে বলাবলি হতে থাকলো, "কি মনে হয়, এটা কি সত্যি মনে করেন? “ “অবশ্যই, এটা সত্যি। তাছাড়া আর কি হতে পারে ---" । রবিবার বিকেলে সুসজ্জিত ঘোড়ার গাড়িতে ক্লপ ক্লপ ক্লপ শব্দে যাওয়ার সময় অভিজাত পোশাকে সজ্জিত মহিলারা পর্দার আড়ালে বসে মাথা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে মিস এমিলির সজ্জিত গাড়ির দিকে দেখতেন আর বলতেন, “বেচারা এমিলি।" 

যখন আমরা ভেবেছিলাম মিস এমিলি এবার বসে গেছেন, মানে তাঁর দিন শেষ। তখনও তিনি যথেষ্ট মাথা উঁচু করে চলতেন। শেষ গ্রিয়ারসন হিসেবে আরও বেশি মর্যাদার স্বীকৃতি চাইতেন তিনি। তিনি চাইতেন, তাঁর মর্যাদার উঁচু দেয়াল যেনো কিছুতেই ভেঙে না যায়। সেই ঘটনার মতো খানিকটা, যখন তিনি ইঁদুর মারার জন্য আর্সেনিক কিনেছিলেন। লোকজনেরা যখন "বেচারা এমিলি" বলা শুরু করেছিলেন, তার বছর খানেক পরের ঘটনা এটা। সেই সময় দুজন মহিলা আত্মীয় এসেছিলেন তাঁর সাথে দেখা করতে।

ওষুধের দোকানে গিয়ে মিস এমিলি মালিককে বলেছিলেন, “আমি কিছু বিষ চাই।" তখন তাঁর বয়স ছিলো তিরিশ। স্বাভাবিকের চেয়ে পাতলা গড়নের মহিলা ছিলেন। উদ্ধত কালো চোখ। মুখে ক্লান্তির ছাপ। বসা চোখ দুটো দেখতে বাতিঘর রক্ষকের চোখের মতো মনে হচ্ছিলো। তিনি বলেছিলেন, " আমি কিছু বিষ চাই।"


- “ কি ধরনের বিষ মিস এমিলি? ইঁদুর বা ঐ ধরনের কিছু মারার জন্য? আমি-- আমি--” 

- “ আপনার কাছে সবচেয়ে ভালো যেটা আছে, সেটা চাই। কি ধরনের বিষ, সেটা কথা নয়।"

- “ওষুধের বিক্রেতা কয়েক রকমের নাম বললেন। " এগুলো হাতি পর্যন্ত মারতে পারবে। কিন্তু আপনি যা চান, তা---”

- মিস এমিলি বললেন, “ আর্সেনিক , এটা ভালো বিষ তো? "

- “ আর্সেনিক? মানে আর্সেনিক? হ্যাঁ, ম্যাডাম ভালো। কিন্তু আপনি কোনটা চান?”

- “ আমি আর্সেনিক চাই।"

শুধু বিক্রেতা দৃষ্টি নামিয়ে তাঁর দিকে তাকালেন। মিস এমিলিও টান টান মুখে মাথা উঁচু করে তাকালেন তাঁর দিকে। বিক্রেতা বললেন, “কেনো? হ্যাঁ অবশ্যই দেবো। কিন্তু এখানে একটু আইনের ব্যাপার আছে। যদি আর্সেনিক চান, তাহলে আপনাকে বলতে হবে এটা দিয়ে আপনি কি করবেন?”

মিস এমিলি চোখ বড়ো বড়ো করে তাকালেন তাঁর দিকে। চোখে চোখে তাকানোর জন্য মাথাটা একটু পেছনের দিকে হেলিয়ে চেয়েই থাকলেন দোকানদারের দিকে যতক্ষণ না তিনি গিয়ে আর্সেনিক এনে কাগজে মোড়ালেন। দোকানের সামগ্রী হাতে তুলে দেয়ার জন্য যে কৃষ্ণাঙ্গ ছেলেটা ছিলো, সে মিস এমিলির হাতে এনে দিলো মোড়কটা। ওষুধ বিক্রেতা আর এলেন না তাঁর সামনে। বাড়িতে এসে মোড়ক খুলে তিনি দেখলেন, বাক্সের ওপর লেখা আছে, মাথার খুলি এবং হাড়ের নিচেঃ "ইঁদুরের জন্য।"


[ চার ]

পরদিন আমরা বলাবলি করলাম, “ তিনি আত্মহত্যা করবেন।" আরও বলেছিলাম, এটাই সবচেয়ে ভালো কাজ। হোমার ব্যারোনের সাথে যখন তাঁকে প্রথমে দেখেছিলাম, তখন আমরা বলতাম, “ মিস মিলি ওঁকে বিয়ে করবেন।" তারপর আমরা বলতে শুরু করলাম, “ তাঁকে বিয়েতে রাজি করানোর চেষ্টা করবেন তিনি।" কারণ হোমার পুরুষদের সঙ্গ পছন্দ করতেন এবং সবাই জানতেন যে, তিনি 'এলকস - ক্লাবে’ অপেক্ষাকৃত তরুণদের সাথে বসে মদ খান। বিয়ে করার লোক তিনি নন। পরে আমরাও বলতাম, “বেচারা এমিলি!” বিশেষ করে রবিবার বিকেলে যখন তাঁরা আলোকিত ছোটো গাড়িতে করে বেড়াতে যেতেন, তখন আড়াল থেকে বলা হতো এই সব কথা। মিস এমিলি মাথা উঁচু করে বসে থাকতেন। হোমার ব্যারোন মোরগ ঝুঁটির মতো হ্যাট মাথায় পরে, দাঁতে একটা চুরুট চেপে, হলুদ দস্তানা পরে, চাবুক হাঁকিয়ে গাড়ি চালাতেন।

কিছু মহিলা বলা শুরু করলেন, ঘটনাটা শহরের জন্য অসম্মানের এবং তরুণদের জন্য এটা খারাপ উদাহরণ। পুরুষেরা এতে নাক গলাতে চাননি। কিন্তু মহিলারা অবশেষে ব্যাপ্টিস্ট মিনিস্টারকে জোরাজুরি করলেন মিস এমিলিকে ডাকার জন্য। সেই ব্যাপ্টিস্ট মিনিস্টার ছিলেন মিস এমিলির আত্মীয় এবং এপিস্কোপাল চার্চ ধর্মাবলম্বী। সেই সাক্ষাতকারে কি ঘটেছিলো এবং কি কি কথাবার্তা হয়েছিলো, তা কখনও ফাঁস করেননি তিনি। আর কখনই তিনি মিস এমিলির কাছে যেতেও রাজি হননি। পরের রবিবারে মিস এমিলি এবং ব্যারোন আবার ঘোড়ার গাড়ি করে রাস্তায় বেরোলেন। এর পরদিন মন্ত্রির স্ত্রী, আলাবামায় মিস এমিলির আত্মীয়ের কাছে ঘটনা জানিয়ে চিঠি লেখলেন একটা।

এইবার তাঁর রক্ত-সম্পর্কের আত্মীয় এলেন এক ছাদের তলায় বাস করতে। আমরা বসে বসে ঘটনা কোনদিকে যায়, তা লক্ষ করতে লাগলাম। প্রথমে কিছুই বোঝা গেলো না। আমরা নিশ্চিত হলাম যে, তাঁরা বিয়ে করবেন। আমরা শুনলাম, মিস এমিলি জুয়েলারি দোকানে গিয়ে পুরুষের জন্য রুপোর টয়লেট সেট তৈরির অর্ডার দিয়েছেন। সেই সেটের প্রতি পিসে নাকি "এইচ বি" অক্ষর লেখা থাকবে। দুদিন পর আমরা শুনলাম, মিস এমিলি পুরুষের কমপ্লিট সুট এবং একটা রাতের সার্ট কিনেছেন। আমরা তখন বললাম, “ তাঁরা বিয়ে করেছেন।" সত্যিই খুশি হলাম আমরা। আর আরও খুশি হলাম এটা দেখে যে, গ্রিয়ারসন পরিবারের দুই মহিলা অন্তত মিস এমিলির চেয়ে বনেদি।

পায়ে চলা রাস্তার নির্মাণ কাজ শেষ হয়ে যাওয়ার পর হোমার ব্যারোন যখন চলে গেলেন, তখন আশ্চর্য হলাম না আমরা। বরং একটু হতাশই হলাম এই ভেবে যে, তার বিদায়টা নিয়ে কোনও সোর সার, মানে লোক জানাজানি হলো না। কিন্তু বিশ্বাস করেছিলাম যে, মিস এমিলিকে বিয়ে করার প্রস্তুতি গ্রহণের জন্য তিনি চলে গেছেন। অথবা আত্মীয়দের কাছ থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্য তাঁকে একটা সুযোগ দিয়েছেন। ( এই সময়ের মধ্যে একটা গোপন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হলেন মিস এমিলির আত্মীয়েরা, যাতে তিনি হোমারকে বিয়ে না করেন। অন্যদিকে শহরের লোকজন ছিলেন মিস এমিলির পক্ষে এবং তাঁরা চাইলেন, আত্মীয়দের ষড়যন্ত্র যেনো ভেস্তে যায়।) এক সপ্তা পর সত্যি চলে গিয়েছিলেন আত্মীয়রা। আমাদের অনুমান ঠিক হলো, তিন দিনের মধ্যে শহরে ফিরে এলেন হোমার ব্যারোন। এক প্রতিবেশি , কৃষ্ণাঙ্গ এক মানুষকে একদিন সন্ধের প্রাক্কালে মিস এমিলির রান্না ঘরের দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকতে দেখেছিলেন।

সেটাই আমাদের শেষ দেখা হোমার ব্যারোনকে। কিছুদিন মিস এমিলিকেও দেখা যায়নি। শুধু কৃষ্ণাঙ্গ পরিচারকটা বাজারের বাস্কেট নিয়ে বাড়ির ভেতর যাওয়া আসা করতো। বাড়ির সামনের দরজাটা কিন্তু বন্ধই থাকতো। তখনও মাঝে মাঝে জানালার কাছে দেখা যেতো মিস এমিলিকে। সেই রাতে কিছু লোক তাঁর ভাঁড়ার ঘরে যে চুন ছিঁটিয়েছিলো, তারপর ছয় মাস তিনি আর রাস্তায় বের হননি। আমরা জানতাম, এটাই প্রত্যাশিত আচরণ। তাঁর বাবাও এই রকমই ছিলেন। যিনি নিজের স্ত্রীর জীবন বার বার ব্যর্থ করে দিয়েছিলেন। যা অত্যন্ত বিষময় এবং ক্ষতিকারক হয়েছিলো তাঁদের জীবনে।

এরপর আমরা যখন মিস এমিলিকে দেখলাম, তিনি বেশ মোটা হয়ে গেছেন এবং চুলে পাক ধরেছে। পরবর্তী কয়েক বছরের মধ্যে সম্পূর্ণ ধুসর হয়ে গেলো চুলের রঙ। এক সময় সমস্ত চুলের রঙ হয়ে গেলো কালচে ধুসর। চুয়াত্তর বছর বয়সে মৃত্যুর দিন পর্যন্ত তাঁর চুলের রঙ উজ্জ্বল চকচকে কালচে ধুসরই ছিলো। ঠিক যেনো একজন কর্মক্ষম পুরুষের চুল।

সেই সময় থেকে মিস এমিলির বাড়ির সামনের দরজা বন্ধ ছিলো। তা বছর ছয় সাতেক সময় তো হবেই। তখন তাঁর বয়স ছিলো প্রায় চল্লিশ। তখন তিনি চিনা পেইন্টিং এর শিক্ষা দিতেন। নিচ তলার একটা ঘরকে ষ্টুডিও বানিয়েছিলেন। সেখানে কর্ণেল সাতোরিসের মেয়ে, নাতি নাতনি এবং তাদের সমবয়সিদের পাঠানো হতো তাঁর কাছে অঙ্কন শিখতে। সেই ক্লাস রবিবারে চার্চে যাওয়ার মতো খুব নিয়মিত ছিলো। যেনো চার্চের দান বাক্সে পঁচিশ সেন্ট দানের মন নিয়ে উন্মুখ হয়ে শিশুরা সেখানে যেতো। ঐ সময়টায় মওকুফ করা হয়েছিলো মিস এমিলির কর।

তারপর তো নতুন প্রজন্ম এলো। তারাই তখন শহরের মেরুদন্ড এবং শক্তি। যারা আঁকা শিখতো, তারা বড়ো হয়ে গেলো। ক্লাস ছেড়ে চলেও গেলো। রঙের বাক্স এবং মলিন তুলিসহ মহিলা ম্যাগাজিনের কাটা ছবি হাতে দিয়ে কেউ তাদের ছেলেমেয়েদের আর পাঠায়নি মিস এমিলির কাছে। সেই থেকে সামনের দরজা বন্ধ হলো। চিরদিনের জন্য বন্ধ হলো। শহরে যখন বিনে পয়সায় ডাকের বিলি ব্যাবস্থা চালু হলো, মিস এমিলি একাই তখন সেই সুবিধে নিতে অস্বীকার করলেন। তাঁর দরজায় ধাতব সংখ্যা এবং ডাকবাক্স লাগাতে দিলেন না। কোনও কথাই তিনি শুনলেন না তাদের ।

দিন যায়, মাস যায়, বছর যায়, আমরা দেখতে থাকি কৃষ্ণাঙ্গ পরিচারকটার চুল ধুসর হচ্ছে। বার্ধক্যের কারণে দেহ বাঁকা হচ্ছে। সে যাচ্ছে আসছে বাজারের বাস্কেট হাতে। প্রতি ডিসেম্বরে আমরা মিস এমিলিকে করের নোটিস পাঠাতাম। কোনও দাবিদার নেই বলে ডাকযোগেই সেটা ফেরত আসতো একসপ্তা পর। তখনও তাঁকে দেখা যেতো নিচ তলার একটা জানালায়।

দেখে মনে হতো কুলুঙ্গিতে হস্তপদাদি বিহীন একটা মূর্তি দাঁড়িয়ে আছে। তিনি আমাদের দেখেন, কি না দেখেন, কেউ বুঝতে পারতো না। বাড়ির ওপর তলাটা সম্পর্ণ বন্ধ করে দিয়েছিলেন মিস এমিলি। এই ভাবে তিনি কাটিয়েছেন প্রজন্মের পর প্রজন্ম। সবটুকুই ছিলো তাঁর পছন্দের কাজ। যেনো এমনটা না করে তিনি থাকতেই পারতেন না। কেমন একগুঁয়েমিতে ভরা কাজগুলো। নিঃশব্দেই করতেন সব। এবং তা ছিলো শতোভাগ স্বেচ্ছাচারিতায় পরিপূর্ণ।

ধুলোময় ছায়াঘেরা বাড়িতে মিস এমিলি মারা গেছেন। সেখানে একমাত্র বুড়ো দুর্বল কৃষ্ণাঙ্গ লোকটাই ছিলো তাঁর কাছে। আমরা জানতামও না যে, তিনি অসুস্থ। বহুদিন আগে থেকেই আমরা সেই কৃষ্ণাঙ্গ লোকটার মাধ্যমে তাঁর খবরাদি নেয়ার চেষ্টা ছেড়ে দিয়েছিলাম। সে কারও সাথেই কথা বলতো না। সম্ভবত মিস এমিলির সাথেও না। ফলে কথা না বলার জন্য, মানে স্বরযন্ত্রের অব্যবহারে তার গলার স্বর কর্কশ এবং ঘসঘসে হয়ে গিয়েছিলো।

নিচ তলার কোনও একটা ঘরে চাদর পাতা আখরোট কাঠের বিছানায় মিস এমিলি মারা গিয়েছিলেন। হলুদ পুরনো, সূর্যালোক বঞ্চিত ছাতাপড়া একটা বালিশে রাখা ছিলো তাঁর ধুসর মাথাটা।


[ পাঁচ ]

কৃষ্ণাঙ্গ মানুষটা সামনের দরজায় মহিলাদের দেখতে পেয়ে ভেতরে আসতে দিলো তাঁদের। তাঁরা ফিস ফাস করে কথা বলছিলেন। কৌতূহলের দৃষ্টিতে দেখছিলেন এদিক ওদিক। ওঁদেরকে ভেতরে আসতে দিয়ে সে উধাও হয়ে গেলো। বাড়ির মধ্য দিয়ে সোজা চলে গেলো পেছনের দরজা পেরিয়ে। আর কখনও দেখা গেলোনা তাকে।

মহিলা আত্মীয় দুজন এসে পড়লেন। তাঁরা অন্তেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠান করলেন মৃত্যুর দ্বিতীয় দিনে। কেনা অজস্র ফুলসম্ভারে সজ্জিত মিস এমিলির মুখ দেখতে এলেন শহরের লোকজন। তাঁরা দেখলেন, স্ট্যান্ডের ওপরে রাখা কফিনে শায়িত মিস মিলির মৃত মুখের সাথে ক্রেয়নে আঁকা তাঁর বাবার ছবির মুখের বেশ মিল আছে। মহিলারা ফিস ফিস করে মৃত্যুভয় সম্পর্কিত কথাবার্তা বলছিলেন। ঝকঝকে কনফেডারেট ইউনিফর্ম পরা কিছু বুড়ো মানুষ, লনে এবং গাড়ি বারান্দায় মিস এমিলি সম্পর্কে কথা বলছিলেন এমন ভাবে, যেনো তিনি বুড়োদের সমসাময়িক। তাঁদের বিশ্বাস, মিস এমিলির সাথে তাঁরা একসাথে নেচেছিলেন এবং রোমান্টিক সম্পর্ক সৃষ্টির চেষ্টাও করেছিলেন। সময়ের হিসেব ভুলে গিয়েছিলেন বুড়োরা, যেটা তাঁদের জন্য স্বাভাবিক। তাঁদের কাছে অতীতটা মুছে যাওয়ার বিষয় বা অসার কিছু নয়, সেটা স্মৃতির বিশাল চিরহরিত বাগান। সেখানে শৈত্য প্রবাহ বয় না কখনও। বর্তমান শুধু তাকে কিছুটা আড়ালে রাখতে পারে, এই যা।

আমরা আগেই জেনেছি, সিঁড়ির ওপর একটা ঘর আছে, যেটা গতো চল্লিশ বছরে কেউ দেখেননি। সেই ঘরটা দেখতেই হবে। মিস এমিলিকে সুন্দরভাবে নিচে না নামানো পর্যন্ত ঘরের দরজা না খুলে তাঁরা অপেক্ষা করেছিলেন।

জোর করে দরজা ভাঙার পর মনে হলো, যেনো ঝাঁ করে ঘরের সর্বত্র ধুলো ছড়িয়ে পড়লো। কবরের ওপর পড়ে থাকা একটা পাতলা বিশ্রি কাপড়ের আবরণের মতো দেখালো ধুলোর আস্তরণকে। ধুলো ছড়িয়ে পড়লো ঘরের সর্বত্র এবং ঘর সংলগ্ন ব্যালকনির সব জায়গায়, যেনো যত্ন করে বাসর ঘর সাজানোর আয়োজন হয়েছে। শুধু তাই নয়, ধুলো ছড়িয়ে পড়লো রঙচটা গোলাপি বিছানার চাদরের ওপর, গোলাপি লাইট শেডের ওপর, ড্রেসিং টেবিলের ওপর, অতি সুদৃশ্য ক্রিস্টালের শো-পিসগুলোর ওপর, এবং পুরুষদের জন্য বাথরুমে ব্যবহারযোগ্য রুপোর জিনিস পত্রের ওপর। ধুলোয় ঢাকা রুপোর জিনিসগুলোকে খুব মলিন দেখাচ্ছিলো। সেগুলোর ওপর লেখা মনোগ্রাম আর প্রায় দেখাই যাচ্ছিলো না। এই সবের মধ্যে পড়ে ছিলো একটা কলার এবং একটা টাই। মনে হচ্ছিলো এখনই কেউ খুলে রেখেছে। সযত্নে ভাঁজ করা সুট ঝুলছিলো চেয়ারের ওপর। তার নিচে একজোড়া জুতো এবং খুলে রাখা একজোড়া বাতিল মোজা।

মানুষটা বিছানায় শুয়ে ছিলো।

অনেকক্ষণ সেখানে আমরা দাঁড়িয়েছিলাম। নিচে তাকিয়ে স্পষ্ট একটা কঙ্কাল দেখা গেলো। দেখে মনে হলো, একটা দেহ কাউকে জড়িয়ে ধরে এখানে একদা শুয়েছিলো। দীর্ঘ সেই ঘুম তথা মৃত্যু জয় করেছে বিকৃত ভালোবাসার বিরক্তিকর অভিব্যক্তিকে। জয় করেছে প্রেমহীন জীবনের লজ্জাকর গ্লানিকে। তার জন্য যা বাকি ছিলো, তা রাত্রিবাসের ঐ পচা সার্ট। সেটা বিছানার সাথে এমন ভাবে লেপ্টে সেঁটে আছে যে, সেখান থেকে তোলার উপায় নেই। ঐ সার্ট পরে সে শুয়েছিলো। তার ওপর, এবং তার পাশের বালিশের ওপর পড়ে ছিলো বিষাদের বিদায়ী একরাশ ধুলো।

তারপর আমরা লক্ষ করলাম, দ্বিতীয় বালিশে মাথা রাখার ছাপ। আমাদের মধ্য থেকে একজন ঝুঁকে পড়ে কিছু একটা তুললো। অদৃশ্যপ্রায় শুকনো সূক্ষ্ম এবং বিশ্রি ধুলো ঢুকে গেলো নাকের ফুটোর মধ্যে। দেখলাম, সেটা গাঢ় ধুসর রঙের লম্বা শক্ত একগাছা চুল।


-------------------------------------------
লেখক পরিচিতি:
উইলিয়ম কাথবার্ট ফকনার ২৫ সেপ্টেম্বর, ১৮৯৭, নিউ আলব্যানি, মিসিসিপি, যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম গ্রহণ করেন। মিসিসিপি বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেছেন। স্কুল জীবনে পড়ার চেয়ে বেশি মনোযোগী ছিলেন খেলাধুলোর প্রতি। পাঠের বইয়ের চেয়ে বাইরের বই পড়তেই বেশি পছন্দ করতেন।

সাহিত্যের সকল শাখা যেমন,উপন্যাস,কবিতা, নাটক এবং ছোটোগল্পকে নতুনত্বের দিক থেকে বিপুলভাবে সম্বৃদ্ধ করেছেন এই তুখোড় লেখক। 'দ্য সাউন্ড এন্ড ফিউরি ' তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস। বিশ শতকে আধুনিক আমেরিকার উপন্যাস সাহিত্যে অনন্য শক্তিশালী শিল্পশৈলীর জন্য নোবেল পুরস্কার পান ১৯৪৯ সালে। দুইবার 'পুলিৎজার' পুরস্কার পান কথা সাহিত্যে। আমেরিকান একাডেমি অব আর্টস এন্ড লেটারস' থেকেও স্বর্ণপদক পান দুইবার। জুলাই ৬, ১৯৬২ সালে এই রবেণ্যে সাহিত্যিক মৃত্যুবরণ করেন।



অনুবাদক পরিচিতি: 
বেগম জাহান আরা।
গল্পকার। অনুবাদক। ভাষাবিদ।
জার্মানিতে থাকেন। 



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন