মঙ্গলবার, ১৬ মার্চ, ২০২১

আলী নূর'এর ধারাবাহিক স্মৃতিকথা : তুচ্ছদিনের গান--পর্ব: ১-৩



এক

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের শেষের দিকে দুম করে জাপানীরা গোটাকয়েক বোমা ফেলে বসল চট্টগ্রামে। আব্বা তখন চট্টগ্রামের ডিস্ট্রিক্ট ইঞ্জিনিয়ার। কয়েক মাস বাকি অবসরে যাওয়ার। গ্রামে নতুন বাড়ি বাঁধা হচ্ছে। অনেক জায়গা ঘিরে বিরাট বাড়ি, বিশাল পুকুর! আর মাত্র গোটা কয়েক ঘর বাকি। ভেবেছিলেন অবসর জীবনে শহরের কোলাহল ছেড়ে সপরিবারে থাকবেন এই বাড়িতে। তাঁর নিজের গ্রাম। এই গ্রামের সঙ্গে তাঁর নাড়ীর টান। কিন্তু ধীরে সুস্থে সবাইকে নিয়ে গ্রামে পৌঁছানো বুঝি আর হলো না। যুদ্ধ এসে গেল দোর গোড়ায়।

আমাদের ক’জন - আম্মা, মিনুবুবু, শিরীবুবু, জেবনবুবু, বুলু এবং আমাকে পাঠিয়ে দেওয়া হল গ্রামে। আব্বার সঙ্গে থাকলেন মেজভাই, সেজভাই। দু’জনে চট্টগ্রাম মুসলিম হাই ̄স্কুলে ক্লাস ফাইভ,সিক্স-এর ছাত্র।

আমাদের নিজেদের বাড়ির কাজ শেষ হয়নি বলে আমরা প্রথমে উঠলাম মিরপুরে ‘সদাগর ভাইসাব’দের বাড়ি; আমার ফুফাতো বোন মাতুবু’দের বাড়ি। সাধারণ গৃহস্থ বাড়ি। অন্যান্য জ্ঞাতিরা চারদিকে। বাড়ির সামনে একটা পরিচছন্ন উঠোন। লেপে- মেজে খুব পরিষ্কার করে রাখা। মাতুবু’র বড়ো ছেলে মাহতাব ভারী ভালো ছেলে। জীবনের অনেকটা সময় কাটিয়েছে আমাদের পরিবারের সঙ্গে। কিছুদিন আগে ময়মনসিংহে মেয়ে-জামাইয়ের কাছে থাকতে গিয়ে মারা যায়। ওর বাকি দু’ভাই আতাব ও কাপ্তান।এই বাড়ি থেকেই আমার সব স্মৃতির যাত্রা, এর আগে চট্টগ্রামের স্মৃতি সবই ঝাপসা, অস্পষ্ট।

মাতুবু’র খুব রান্নার হাত ছিল। তাঁর রান্নার স্বাদ মুখে লেগে আছে এখনও। কয়েকবছর আগে মাতুবু'কে চামেলীবাগে আনিয়ে তাঁর হাতের রান্না খেয়ে রসনা-তৃপ্তি ও শৈশবের শ্মৃতি রোমন্থন করেছি যুগপৎ।

উত্তর ভিটার ঘরের সিঁড়ির উপর বসে দেখতাম একটা সাদা-কালো-ছিট মুরগি গোটা দশ-বারো বাচ্চা নিয়ে ঘুরছে আর খুঁটে খুঁটে শষ্যকণা খাওয়াচ্ছে । তখনকার দিনে চিলের খুব উৎপাত ছিল গ্রামে। মা' মুরগিটা সব সময় উৎকন্ঠিত থাকত কখন চিল এসে ছোঁ মারে। একদিন সত্যি সত্যি চিল এসে ছোঁ মেরে তুলে নিল একটা বাচ্চা । মা’টা চিলের সঙ্গে অনেক দূর পর্যন্ত উড়ে গেল । কিন্তু পারল না বাচ্চাকে বাঁচাতে । মা’টার সেই অসহায় ক্ষোভ আমার মনে ভারী দাগ কাটল।

মাহতাবদের একটা ষাঁড় ছিল। তাগড়া এবং ভারী বেয়াড়া। ওটা মাহতাবের চাচাত ভাই মাধবের আদরের ষাঁড়। মাধব একে বেঁধে আসত সামনের খালের তলায় যেখানে বর্ষা শেষে কচি ঘাস মাথা তুলত। মাধবপুর স্কুলের জাঁদরেল শিক্ষক ভবেশবাবু ওই পথ দিয়ে সাদা ধুতি পাঞ্জাবি পরে একটা ছাতা মাথায় হনহন করে যেতেন স্কুলের দিকে। একদিন এমনি আনমনা চলছিলেন ভবেশবাবু। হঠাৎ কোথা দিয়ে কী হয়ে গেল! মাধবের সেই বেয়াড়া ষাঁড় ভবেশবাবুর কালো ছাতি দেখে তেড়ে এসে ভবেশবাবুকে খালের নিচে ফেলে দিলো। ভবেশবাবুর সাদা ধুতি পাঞ্জাবি সম্পূর্ণ কাদালিপ্ত। স্কুলে পৌঁছেই সামনের বেড়ার একটা মোটা কঞ্চি উঠিয়ে ক্লাসে ঢুকেই হুংকার দিলেন,- মাধব! মাধব কিছু না বুঝেই কাঁচুমাচু হয়ে সামনে আসতেই আবার হুংকার দিয়ে উঠলেন, তুমি একটা বলদ, পথের ধারে বেঁধে রেখেছিলে আরেকটা বলদ। ওটা আমায় খালের তলায় ফেলে ‘ই’ করেছিল। এই বলেই লাগিয়ে দিলেন বেশ কয়েক ঘা। মাধব কিছু না বুঝেই সব শাস্তি মাথা পেতে নিলো। তখনকার দিনে এমনটাই ছিল। ভবেশবাবুর একটা মুদ্রাদোষ ছিল কোন বিষয় পরিষ্কার করে বেঝাতে না পারলে ‘ই’ প্রত্যয় দিয়ে তা চালিয়ে দিতেন।

মাতুবু’দের বাড়ির সামনে দিয়ে চলে গেছে একটা ছোট খাল। বর্ষার সময় এর উপর দিয়ে অনেক জায়গা থেকে লোকজন নানা পণ্যবোঝাই নৌকা করে যায় কুটির বাজারে। আমি বাড়ির সীমানায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতাম। খুব ভালো লাগত। মাতুবুর কনিষ্ঠতম কাপ্তান ভীষণ পাকা। ন্যাংটা ঘুরতো সারা বাড়ি। হাটের দিনে খালের পাড়ে দাঁড়িয়ে নৌকার যাত্রীদের বড়দের মত গম্ভীরস্বরে জিজ্ঞেস করত, -মিঞা, বাড়ি কই ? একদিন একজন যাত্রী, বেশ বয়ষ্ক ধরনের, বললেন,- মিঞা বাড়ির খোঁজে কাম নাই, ঘরে ফিরা যাও। পানিতে ডুইবা মরবা।

পানিতে ডোবার কথায় মনে পড়ল এই খালেই আমি একদিন ডুবতে বসেছিলাম। সাঁতার জানিনা। খালে গোসল করতে নেমে গেলাম অন্যদের সঙ্গে। সামনেই একটা ‘ভাঙ্গা’ ছিল। ‘ভাঙ্গা’ মানে সড়কের যেসব জায়গায় সাঁকো থাকতো না, সেইসব জায়গায় খাল অনেক গভীর হতো। শুনেছি এই ভাঙ্গার কাছে উপেনদা’র বাবা হাছন সাহাকে কুপিয়ে খুন করা করা হয়েছিল অনেক বছর আগে। উপেনদা তখন বালক। বিচারে গ্রামের চার জনের ফাঁসি হয়েছিল। আব্বা ছিলেন উপেনদার অভিভাবক। যাই হোক খালের পানিতে ঝাপাঝাপিতে কখন যে এই ভাঙ্গার কাছে পৌঁছে গেছি খেয়াল নেই। হঠাৎ আর পানিতে ঠাঁই পাচিছ না! ডুবে যাচিছ! ভেসে থাকার চেষ্টায় কেবলই পানি যাচ্ছে পেটে। আতঙ্কিত হলাম। হঠাৎ কে জানি টেনে ঠাঁই পাওয়ার মত এক জায়গায় এনে দিলেন। এরপর থেকে খালে কিংবা পুকুরে আর গোসল নয়।

নতুন বাড়িতে গিয়েই আব্বা অনেক ধৈর্য নিয়ে আমাদের সাঁতার শেখালেন। সেই থেকে আমি সাঁতারে বেশ পটু। কাছাকাছি পুকুর পেলেই গোসল করতে নামতাম। ঢাকায় চলে এলাম যেদিন, তার পরদিন থেকেই শান্তিনগর এলাকার প্রায় সব পুকুরেই আমি সাঁতরে গোসল করেছি বহুদিন। মনে পড়ে রাজারবাগ পুলিশ লাইনের বড় পুকুরটার কথা। এই সেইদিন যেন মাত্র যেন কাটা হচ্ছিল এটা। গরমের সময় রাতের বেলায় এই পুকুরে অনেকক্ষন সাঁতরে কাটাতাম । সিদ্ধেশ্বরী স্কুলের পাশে এখনকার বেইলী রোডের মুখেই যে পুকুরটা, ওটা ছিল গাঙ্গুলীদের। আমি যতদিন চামেলীবাগে ছিলাম এই পুকুরে গোসল করতাম। এদিকে ছিল শান্তিনগর পুরোনো পোস্ট অফিসের পেছনে একটা পুকুর। এখানেও গোসল করেছি অনেকদিন। পাড়টা খুব ঘন ঝোপঝাড়ে ভর্তি ছিল বলে বেশি দিন যাইনি ওই পুকুরে। এখন হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজ যেখানে ওটা ছিল ‘পালের বাগিচা’, পালদের বাগানবাড়ি। চারদিকে অনেক আম-কাঁঠাল ও অন্যান্য ফলের গাছ। মাঝখানে বিরাট পুকুর। শান বাঁধানো ঘাট। এই পুকুরেও অনেকদিন গোসল করেছি। গোসলখানায় তোলা পানিতে গোসল আমার অভ্যাসেই ছিল না। বরিশালে ব্রাউন কম্পাউন্ডে থাকতে আমি আর মনু নিয়মিত গোসল করেছি পরেশ সাগরে।

মাতুবু’দের বাড়ির উত্তরের অংশে থাকতেন সদুভাইসাবের জ্ঞাতি মজলিশ ভাইসাহেব এবং তার ছোট ভাই আসু ভাইসাব, আসত আলী। মজলিস ভাইসাব তখনও বিয়ে করেননি যদিও তার অনেক ছোট আসু ভাইসাব তখন বেশ বড়সড় ছেলে-মেয়ের বাপ। মজলিস ভাইসাব আম্মার সঙ্গে কক্সবাজারে ছিলেন বেশ কতদিন। ডাক্তারের পরামর্শে আম্মাকে বায়ু পরিবর্তনের প্রয়োজনে ওখানে থাকতে হয়েছিল বেশ কিছুদিন।আম্মাকে নিয়ে সূর্য উঠার আগেই পৌঁছে যেতে হত সমুদ্রতীরের বালুকা-বেলায়। ভোরের বিশুদ্ধ বায়ু সেবনে তাঁর ভগ্ন স্বাস্থের উপকার হবে, এই ছিল আশা। সঙ্গী মজলিশ ভাইসাব। তিনি ছিলেন অলস প্রকৃতির। সকালবেলায় আরামের ঘুম ফেলে মামীর বায়ু সেবনের সঙ্গী হতে তার ছিল নিতান্ত অনিচ্ছা। কিন্তু উপায় নেই। মামীর উপর কথা বলার সাহস তাঁর মামারও ছিল না। একদিন সাগরের বালু-বেলায় পৌঁছুতে তাঁর কিঞ্চিৎ দেরি হয়। মজলিশ ভাইসাব কিছুটা জিদ করেই হেটে চলেছেন। সূর্য উঠে পড়লে বালু তেতে উঠবে, তখন গরম বালুর উপর দিয়ে ফেরা ভারী কষ্ট। আম্মার বারণ সত্বেও মজলিশ ভাই এগিয়েই যাচেছন। সূর্য উঠে গেছে অনেকক্ষন। নিচের বালুরাশি ক্রমেই তেতে উঠছে। মজলিশভাই খালি পায়ে বালির উপর দিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে ফিরতে লাগলেন। তাঁর মেজাজ গেল বিগড়ে। এক সময় নিজের পায়ের সঙ্গে জেদ করে একটি পা চেপে ধরলেন ঐ তাতানো বালির ভেতর। বলতে থাকলেন,

শা--র পা, কেমন বোঝো এখন! পা যাই বুঝুক, তিনি নিজে বুঝতে পারলেন কিনা যাকে তিনি বোঝাচ্ছিলেন অত শাস্তি দিয়ে, সে আর কেউ নয়, তাঁরই নিজের পা!

তখনকার দিনে অসুখ-বিসুখে শিশিতে করে মিক্সচার দেওয়া হতো। এখনকার মতো এত পেটেন্ট ওষুধ ছিল না। এইসব শিশির পেছনে কাগজে দাগ এঁটে দেওয়া হতো। শিশির দাগ ধরে একদাগ দাগ ওষুধ গ্লাসে ঢেলে নিয়ে খাওয়ানো হত। মজলিশ ভাইসাব এতসব ঝামেলায় ভারী বিরক্ত। একবার শিশির বাইরের দাগে তর্জনী চেপে তিনি সরাসরি গলায় ঢেলে দিলেন মিক্সচার। বেশ কয়েক দাগ ঔষধ চলে গেল গলায়। তিনি তর্ক করে কোনো মতেই মীমাংসা করতে পারলেন না কেমন করে দাগে আঙুল চেপে থাকা সত্বেও এক দাগের বেশি ঔষধ বেরিয়ে যেতে পারে!

আসু ভাইসাবের বৃদ্ধা মা, আমাদের ফুফু থাকতেন আসু ভাইসাবের সঙ্গে। এক শীতের সকালে মুড়ির ছাতু নিয়ে বসেছেন। বোধ করি পানির জন্য অপেক্ষা করতে পারছিলেন না। মুখে তুলে দিলেন শুকনো ছাতু। গলায় বিঁধে গেল। বুড়ো মানুষ, দম বন্ধ হবার উপক্রম। কান্নাকাটি, বিলাপ শুনে ছুটে গেল সবাই। আসু ভাইসাবের ছোট মেয়ে আমিনা নির্বিকারে দাদীর ছাতুর পাত্রটি তুলে নিয়ে বলল, দাদীতো মরেই যাচ্ছে, আমি ছাতুগুলো পানি দিয়ে খেয়ে নেই? ও বুঝতে পেরেছিল দাদীর আসন্ন মৃত্যুর কারণ পানি ছাড়া ছাতু মুখে দেওয়া। তাই নিজে ছাতু খাওয়ার দুঃসাহসী সিদ্ধান্ত নেবার বেলায় পানি দিয়ে ওগুলো খাবার সতর্কতাটুকু নিতে ভোলেনি।


দুই

ঠিক কখন যে নতুন বাড়িতে আমাদের গৃহপ্রবেশ মনে নেই। শুধু মনে আছে আম্মা আগেভাগেই একটা ভরা কলসী পাঠালেন ও-বাড়িতে। ভরা কলসী মঙ্গলের চিহ্ন। সন্ধ্যার কিছু পর আমরা পৌঁছলাম নতুন বাড়িতে।

এই নতুন বাড়িতে পালাক্রমে আমরা প্রায় বছর পাঁচেক ছিলাম । মনে হয় ১৯৪৩ থেকে ৪৮ সাল পর্য ̈ন্ত। সময়টা আমার বাল্যকাল। এই সময়ের সব ঘটনা, মকিমপুরে আমার এই বাল্য-স্মৃতি আজ অবধি আমার মনে ছবির মত আঁকা আছে। তখন আমরা গোটা পরিবার ছিলাম এক সঙ্গে হাসি- কান্নায়, আমোদে-আহলাদে, এক গভীর মমতায় বাঁধা। আব্বা ছিলেন এই পরিবারের প্রধান এবং বিশেষ ব্যক্তিত্ব, জ্ঞানে-বুদ্ধিতে, মায়া-মমতায়, হাসি-রসিকতায় এক অপূর্ব চরিত্র। আম্মা ছিলেন এই বিশাল সংসারের কান্ডারী। আর ছিলেন আমাদের পরম প্রিয় যদুচাচা- আম্মার সহকারী, পরামর্শক যার তত্ত্বাবধানে শুরু হয় আম্মার কৃষিকাজের বিশাল কর্মযজ্ঞ।যদু চাচার পরম স্নেহ-প্রশ্রয় বেড়ে উঠছিলাম আমরা ক’টি শিশু। আমার প্রতি ছিল তাঁর বিশেষ দুর্বলতা। আমার কোন বায়না তাঁর প্রশ্রয় থেকে বঞ্চিত হয়নি। আমরা ভাই-বোনরা এক অপূর্ব স্নেহের নিবিড় বন্ধনে পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে ছিলাম, যা চিরদিন অটুট ছিল আমাদের মধ্যে। আনন্দের ঝর্নাধারায় বেশ চলছিল আমাদের এইসব দিন। দীর্ঘ শহুরে জীবনের পর এই পল্লীজীবন যাপনে কোনো নিরানন্দ বা বেসুরো কিছু বাজে নি আমাদের মনে। কিন্তু এত সুখ সইল না। আব্বা পড়লেন কঠিন অসুখে, ম্যালিগনেন্ট ম্যালেরিয়া । গ্রামে কোথায় চিকিৎসা, কোথায় ওষুধ! যুদ্ধের কাল। একমাত্র ওষুধ কুইনাইন দুষ্প্রাপ্য। সব চলে যায় বার্মায় যুদ্ধরত ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর প্রয়োজনে। সাধারণের জন্য রেশন করা। পোস্ট অফিস থেকে আনতে হতো। বড় ভাই কলকাতায় ছিলেন। স্কটিশ চার্চের ছাত্র। গোয়ালন্দ চাঁদপুর হয়ে কুইনাইন ইন্জেকশন আর কিছু ম্যাপাক্রিন ট্যাবলেট নিয়ে পৌঁছুলেন। আব্বার জীবন রক্ষা পেল, কিন্তু কন্ঠস্বর অস্পষ্ট হলো চিরদিনের জন্য।

এদিকে মেজভাই, সেজভাই মেতে উঠেছেন ঘোড়া নিয়ে গ্রামের ছেলেদের সঙ্গে। পড়াশুনা চুলোয় ঢুকেছে। বিবাহযোগ্যা মেয়ে মিনুবু - তাকে আর অনুঢ়া রাখা পল্লীসমাজে নিন্দনীয়। আম্মা শঙ্কিত হয়ে পড়লেন। সারাজীবন তাঁর শহরে কেটেছে। ছেলেমেয়ে নিয়ে গ্রাম্য পরিবেশে ফিরে আসা মানে গোটা পরিবারকে আবার পিছিয়ে দেওয়া। কী করে ছেলেদের মানুষ করবেন! কী করে হবে মেয়েদের লেখাপড়া, কী করে হবে সৎপাত্রে কন্যাদান! আম্মা সর্বক্ষণ তাড়া দিতেন আব্বাকে গ্রামের বাড়ি বিক্রি করে আবার শহরে ফিরে যেতে। এই সময় দেশ বিভাগ হলো। ১৯৪৭ সালের ১৪ ই আগস্ট। আমাদের মকিমপুরের বাড়ি এবং এর সংলগ্ন সব উর্বরা জমি বিক্রি করে দিয়ে একদিন আমরা পাড়ি জমালাম ঢাকার পথে, ১৯৪৮ সালের ৩রা মার্চ। দিনটি আমার খুব মনে গেঁথে আছে। ক’দিন ধরেই জিনিসপত্র বাঁধাছাঁদা চলছিল। আমার কেমন উদাস উদাস লাগছিল সব। গ্রামে আমার কোন সঙ্গী-সাথী ছিল না। বাড়ির চারপাশের বৃক্ষরাজি, বর্ষাকালের টইটম্বুর খাল-বিল নদী-নালা, পালতোলা নৌকা, হেমন্তে ফসলের সম্ভাষণ, শীতের কুয়াশা, পল্লী-গ্রামের ঝতু পরিবর্তনের বিচিত্র ছবি আমাকে মুগ্ধ করত। আমি একদম মিশে গিয়েছিলাম প্রকৃতির মধ্যে, নিসর্গের অপরূপ সৌন্দর্য্য। এই সব ছেড়ে যেতে কষ্ট হচ্ছিল। গ্রামের পশ্চিমের ঈদগাহ ছাড়িয়ে এক বিশাল প্রান্তর। বর্ষাকালে যা রূপ নেয় এক বিশাল বিলের। পড়ন্ত বিকেলে ঘুরে এলাম এর পাশ দিয়ে, যেন বলতে গেলাম, তোমাদের ছেড়ে যাচ্ছি, মনে রেখ। পুকুরের চারপাশটা আনমনা ঘুরলাম কয়েকবার। কী একটা গোপন ব্যথা যেন বাজছিল কোথাও। কিন্তু তা ঠিক বোঝার বয়স আমার তখনো হয় নি।

এল বিদায়ের ক্ষণ। সন্ধ্যার অন্ধকার গাঢ় হতে সবাই চললাম মদন ভাইসাবদের বাড়ি। পিছনে ফেলে যাচ্ছি অপুর নিশ্চিন্দিপুরের মতই আমার মকিমপুর। আর একে ঘিরে আমার বাল্যের সব সোনালি স্মৃতি যা আজও আমার কাছে অম্লান। পরদিন অতি ভোরবেলা কসবা ষ্টেশন থেকে ট্রেন ধরে সন্ধ্যা নাগাদ পৌঁছে যাই ঢাকা শহর, ফুলবাড়িয়া ষ্টেশনে।


তিন

মকিমপুরের বাড়িতে প্রথমদিকে আম্মা, মিনুবু, শিরীবু জেবনবু, বুলু আর আমি- এই ক’জন ছিলাম। বুলু খুব ছোট, হাঁটিহাঁটি বয়স। মিনুবু ছিলেন খাস্তগীর স্কুলের ক্লাস এইটের ছাত্রী, ফাষ্ট গার্ল। গ্রামের হিসাবে বেশ বয়স্কা, অরক্ষণীয়া মেয়ে। এই বয়সে বিয়ে হয়নি বলে অনেকে অবাক হতেন। আম্মা বিব্রত বোধ করতেন। আম্মা কর্ত্রী হলেও সংসারের সব ব্যাপারে মিনুবুরই কর্তৃত্ব। মিনুবু ছিলেন খুব দায়িত্বশীল ও গম্ভীর প্রকৃতির। ওই বয়সের স্বভাবসুলভ ছেলেমানুষী বা হাসি ঠাট্টা কিছুই ছিলনা তাঁর মধ্যে। বেশ কড়া গার্জেন। নিজে ভালো ছাত্রী ছিলেন। লেখাপড়ার ব্যাপারে খুব কড়া ছিল তাঁর শাসন। তাঁর তত্ত্বাবধানে শুরু হল শিরীবু, জেবনবু ও আমার লেখাপড়া। শিরীবু ক্লাস টু এর ছাত্রী। আমার আর জেবনবুর শুরু হলো একেবারে হাতে-খড়ি থেকে। রাম সুন্দর বসাকের বাল্য-শিক্ষা আনা হল। ভিতরে মহারাণী ভিক্টোরিয়ার ছবি এবং প্রশ্বস্তি। শ্লেট কেনা হল। কাঠ কয়লা ঘষে সেটাকে করা হলো আরো মসৃণ, আরো কালো। এই সব সহ একদিন আমাদের নিয়ে যাওয়া হলো গ্রামের পাঠশালায়। ভর্তি করা হলো ফ্রি প্রাইমারী স্কুলের শিশু শ্রেণিতে। বোধ করি, ১৯৪৪ সাল। স্কুলের প্রধান শিক্ষক কৈলাশ পণ্ডিত। ভারী গম্ভীর ও রাগী মানুষ। খালি গায়ে ধুতি হাঁটুর উপর তুলে পরতেন। হাতে সদা জ্বলন্ত গড়গড়া। বলা বাহুল্য, কল্কের রাবণের চিতাকে সর্বক্ষণ জ্বালিয়ে রাখার দায়িত্ব ছিল আমাদের অর্থাৎ ছাত্রদের। এতে কোনো প্রকার গাফিলতি বরদাস্ত করা হতো না। বাংলাদেশে তখনকার সব পাঠশালার বুঝি এই একই চিত্র। কৈলাশ স্যার অংকে সত্যি পণ্ডিত ছিলেন। গ্রামের ছেলেরা অনেকেই যে অংকে ভালো ছিল এই কারণেই।

এই সময়ে ফ্রি প্রাইমারি স্কুলের অন্যান্য শিক্ষকরা ছিলেন মলু মিঞা স্য্যর, ইদ্রিস উল্লাহ স্যার (সুবল-এরশাদের বাবা), এবং পরবর্তী সময়ে সবার প্রিয় ফরু মাষ্টার। স্কুলে একবার ইন্সপেক্টর মহোদয়ের আগমন উপলক্ষে খুব তোড়জোর। পণ্ডিত স্যার নিজেই সব তদারকি করছেন। অভ্যর্থনার জন্য একটি গান শেখালেন আমাদের তাঁর মতো করে। রবীন্দ্রনাথের “তোমারি গেহে পালিছ স্নেহে তুমি ধন্য ধন্য হে।” বোধ করি সঙ্গত কারণেই ইন্সপেক্টর মহোদয়কে পালনকর্তা মনে করা হয়েছিল। শুভদিনে ইন্সপেক্টর বাহাদুর এলেন। পরিপাটি সাহেবী পোশাক। মাথায় হ্যাট । সবক’টা অর্থাৎ দুটো ঘরই ঘুরে দেখলেন। ছাত্র-ছাত্রীদের বসার কোন টুল-বেঞ্চি ছিল না। বাঁশের খুটির উপর সুপারি গাছের ফালি বিছানো বেঞ্চির মত। যথাসময় আমরা সমবেতকণ্ঠে ‘তোমারি গেহে পালিছ স্নেহে’ গাইলাম। ইন্সপেক্টর সাহেব প্রীত হলেন। কৈলাশ স্যারের মুখ প্রসন্ন। আজ তাঁর উত্তমাঙ্গে ফতুয়ার মত একটা কিছু দেখা গেল। শিরীবু ও তাঁর বান্ধবী মিশর ইন্সপেক্টর সাহেবের কাছে তাঁর শুভাগমন উপলক্ষ্যে তিন দিনের ছুটির আরজি পেশ করলেন। দুই দিন মঞ্জুর হলো। আমরা উল্লসিত।

এই স্কুলে আমার সঙ্গে পড়তো নন্দী বাড়ির বাদল, শিরিবুর সঙ্গে মিশর আর মনু। মনু কুটির বাজারে ফটো-স্টুডিও চালায়। মনুর সঙ্গে এখনও আমার গভীর বন্ধুত্ব। আর ছিল চান কাজী মামার ছেলে মিলন, মদন ভাইসাবের ছেলে হামদু, হুমায়ুনের বড় চাচা সাহেব ভাইসাবের ছেলে মন্নান।মেয়েদের মধ্যে ছিল জগবন্ধু সাহা বাড়ির বাণী। শিরিবুবুর সঙ্গে পড়তো মিশর, খুব মেধাবী ছাত্রী। মেয়েদের মধ্যে বাণী ছাড়া আমার সঙ্গে পড়তো ইদন ভাইয়ের বড় বোন লালু, আর মদন ভাইয়ের মেয়ে শরফুল।

বাল্য শিক্ষা থেকে ডাবল প্রমোশনে পরের বছর উঠে গেলাম একেবারে ক্লাস টু’তে। ক্লাস ওয়ান আর পড়তে হলো না। মিনুবুর কঠোর সাধনা আর কড়া শাসনের ফল।এই সময় স্কুলে সমগ্র এলাকা নিয়ে অর্থাৎ সার্কেল নিয়ে বার্ষিক ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার আয়োজন হল। বড়ভাই আমায় নিয়ে পড়লেন। অনেক পরিশ্রম করে গান শেখালেন “অন্তর্যামী, তোমায় ভালোবাসি/ তোমারি নাম লয়ে আমি নয়ন জলে ভাসি।” যথাসময়ে ডাক পড়ল আমার । আমি বেশ স্বাচ্ছন্দ্যেই গাইলাম। ভাল করে তৈরী থাকাতে ভয় লাগেনি মোটেই। অনুষ্ঠান শেষে স্কুলের প্রেসিডেন্ট গ্রামের জমিদার শশধর নন্দীর হাত থেকে পুরস্কার পেলাম একটি মেডেল। আব্বা খুব গৌরব বোধ করলেন। এই মেডেল আমি সযত্নে অনেকদিন রেখেছিলাম আমার কাছে।

একটি ছোট ঘটনা এই পুরস্কার প্রাপ্তির আনন্দকে আরও বাড়িয়ে দিলো। অনুষ্ঠানের কয়েক দিন পর আব্বার সঙ্গে নৌকা করে যাচ্ছি কসবা স্টেশন থেকে ট্রেন ধরব বলে। নৌকার বাইরে মোড়ায় বসে, আব্বা আর আমি। খাল থেকে পানি ভরতে, স্নান সারতে আসছে বাড়ির বৌ-ঝি’রা। একটি বৌ কলসী ভরছিল, সঙ্গে আমার বয়সী কি কিছু বড় একটি মেয়ে। আমাকে দেখে মেয়েটি ওর মা’কে বলল, -মা দেখ, এই ছেলেটা ঐদিন গান গেয়ে মেডেল পেয়েছে। আমার বুক আনন্দে ভরে উঠল। আব্বাও পূত্রগর্বে কিঞ্চিৎ স্ফিত হলেন। আব্বা, ঘটা করে এই কথা সবাইকে বলতেন। (চলবে)



লেখক পরিচিতি:
আলী নূর
পেশায় আইনজীবি।
বই পড়া, গান শোনা, ফুল ফোটানো, নাটক কিংবা ওড়িশি নৃত্য অথবা উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত, যন্ত্রসঙ্গীত এইসব নিয়েই তাঁর আনন্দযাপন। তাঁর নানা শখের মধ্যে দেশভ্রমণ, ছবি আঁকা, ফটোগ্রাফি এবং সিনেমাটোগ্রাফি অন্যতম। তিনি জীবনযাপন নয় জীবন উদযাপনে বিশ্বাসী।

ব্রিটিশ-ভারত, পাকিস্তান এবং স্বাধীন বাংলাদেশ এই তিন কাল তিনি দেখেছেন, দেখছেন। ‘তুচ্ছদিনের গানের পালা’ কেবল তাঁর জীবনের গল্প নয় বরং গল্পচ্ছলে ইতিহাসের পরিভ্রমণ।



1 টি মন্তব্য:

  1. নূর সাহেবের লেখা আমি ক'মাস ধরেই পড়ছি একটাই কারণে - উনি আমায় যত্ন করে পরিচয় করিয়ে দিলেন আমার ছোটবেলার সাথে। আমরা দুজনেই মোটামুটি সমবয়সি - ঠিক যে ভাবে, যে ছন্দে আমার ছোটবেলা evolve করলো সেটা হয়তো হুবহু একই ভাবে নয়, তবু আমার মনে হয় আমাদের অনেকের হয়েই তিনি লিখে গেলেন একটা প্রজন্মের কথা যেখানে অন্তত আমরা বুড়ি ছুঁয়ে এসেছি।

    আমাদের সবার হয়ে ধন্যবাদ জানাই আলী নূর কে। অনুগ্রহ করে লিখে চলুন - থামবেন না যেন।

    উত্তরমুছুন