শনিবার, ১৫ মে, ২০২১

বেগম জাহান আরা'র গল্প: অনার কিলিং




ছোট্টো একটা খবর। পরিবারের সম্মান রক্ষা করার জন্য কোনো এক আপন ভাই তার

ছোটো বোনকে গুলি করে হত্যা করেছে। ঘটনাটা ঘটেছে পাকিস্তানের কোনো এক ছোটো শহরে। দৈনিক পত্রিকার মাঝের পাতায় বিজ্ঞপ্তির মতো এক কোনায় প্রকাশিত হয়েছে। যেনো কিছুই নয় এমনি একটা খবর।
 
কেউ দেখলে দেখবে, না দেখলে না। কিন্তু যাদের কাছে এটা খবর, তাঁরা ঠিকই দেখেছেন এবং প্রচার দিয়েছেন। ফলে প্রবাসে দুরবাসে সচেতন নারিবাদি কর্মিরা উচ্চকিত হয়েছেন প্রতিবাদে। জেনেছে সাহেলিরাও।
 
সুন্দরি জেরিনার দোষ, সে তার নিজের সৌন্দর্য সম্বন্ধে সচেতন ছিলো। সাজ গোজ করতে ভালো্বাসতো। নাটক আবৃত্তিতে অংশ নিতো কিশোর বেলা থেকেই। ইচ্ছে ছিলো সিনেমাতে কাজ করার। কিংবা রানি তাজের মতো ঢোল বাদক হওয়ার। কিন্তু পরিবারের আপত্তির কারণে সেটা হয়নি। তা বলে তার বেড়ে ওঠা থামেনি। ক্রমে সে ফুটে উঠেছে সুবাসিত কুসুমের মতো। জুটেছে অনেক অলি। কেউ সিনেমাতে সুযোগ করে দেয়ার নামে কাছাকাছি এসেছে। কেউ বা ভালোবাসার নামে এসেছিলো কাছে। সেটাই ছিলো স্বাভাবিক। 
 
জেরিনাকে দেখে মুগ্ধ হবে না কেনো যুবকেরা? মনকাড়া সৌন্দর্যকে আরো কিভাবে ললিত করে তুলতে হয়, তা জানতো জেরিনা। হয়তো সব সুন্দর ছেলে মেয়েরাই তা জানে। অতি আধুনিক এবং অল্পপোশাকে নিজেকে মেলে ধরতে শিখেছিলো। শরীরি সৌন্দর্য আর চাল চলনে আধুনিক। রুপকথার গল্পের মতো হাসলে মুক্তো ঝরে। সাথে ঝর্নাধারার মতো মিষ্টি গলার স্বর। ছেলে মেয়ে সবাইকে আকৃষ্ট করে। কোনোটাই তার অর্জন করা নয়। সহজাত।
 
নওজোয়ান মুশতাক একজন ফৌজ। লম্বা, সুন্দর, প্রাণবন্ত। ছুটি নিয়ে নিজের শহরে এসেছে। ছোটো বোনের বিয়ে। শহরে ধনবানদের মধ্যে মুশতাকের পরিবার অন্যতম। একমাত্র বোনের বিয়েতে ধুমধামের আয়োজন হয়েছে। অনেক মেহমান আমন্ত্রিত বিয়ের অনুষ্ঠানে। সেই অনুষ্ঠানে এসেছিলো জেরিনা, বাবা মা ভাইয়ের সাথে।
 
বাড়ি ভরা লোকজন। আলো ঝলমলো আঙিনা। হই চই খাওয়া দাওয়া। ভাংড়া নাচ গান আর বাদ্য বাজছে। দিল খোলা আনন্দে কেউ নাচে কেউ গায়, কেউ বা মজা করার জন্য ঢোলে গিয়ে চাটি মারে। জেরিনাও বাদ যায় না। কনে তার বন্ধু। তাই খুশিতে সে উছলে উঠেছে। এক সময় ভাংড়া নাচে অংশ নেয়। কোমরে বেঁধে নেয় গোলাপি দোপাট্টা। পরনে গোলাপি সালোয়ার কামিজ। হাতে গলায় কানে গোলাপি নকল মুক্তার অলংকার। হালকা লালচে চুল চুড়ো করে বাঁধা। ঠোঁটে গোলাপি লিপস্টিক। যেনো আকাশ থেকে গোলাপি পরী নেমে এসেছে। অপুর্ব দেখাচ্ছিলো তাকে।
 
যুবকেরা পাগল হয়ে গেলো ওর সাথে নাচার জন্য। জেরিনার সেদিকে খেয়াল নেই। হঠাৎ মুশতাক এসে জেরিনার একটা হাত ধরে নাচতে শুরু করে। সোরগোল পড়ে যায় যুবকদের মধ্যে। আহা, এমন জুটি দেখা যায় না। দুজনেই নাচে ভালো। উপযুক্ত অংশীদার পেলে শিল্পীদের প্রতিভা খোলে। ঢোল বাদকদের চাটি আর আর শব্দ উচ্চগ্রামে উঠেছে। নাচ তো নয়, আগুনের ফুলঝুরি উড়ে উড়ে ছিটিয়ে পড়ছে। চোখ ধাঁধানো দৃশ্য। আঙিনায় যেনো স্বর্গ নেমে এলো। ঘেমে নেয়ে এক সময় ওরা থামলো। হই চই আর হাততালিও থামলো ধিরে ধিরে।
 
এতক্ষণে জেরিনার হুঁশ হলো, কার সাথে সে নেচেছে? একে তো সে চেনে না?

ভ্রুভঙ্গি করে চোখে চোখ রেখে বললো, কে তুমি?

- আমি মুশতাক।

- এখানে কেনো?

- এটা আমাদের বাড়ি।

- দেখিনি তো আগে?

- বোনের বিয়েতে এসেছি।

- নাগমা তোমার বোন?

- একমাত্র বোন।

- ও আমার বন্ধু।

- তাই তো এসেছো এই বাড়িতে।

- চেনা নেই, জানা নেই, হঠাত আমার হাত ধরে নাচলে কেনো?

- ভালো লাগলো তাই।

- সাহস আছে তোমার।

- তা আছে। আমি সৈনিক। হেসে ফেলে দুজনেই।
 
হন হন করে সরফরাজ এসে বললো, বাড়ি চলো জেরিন।

- এই যুবক কে? জেরিনাকে প্রশ্ন করে সৈনিক।

- আমি ওর ভাই সরফরাজ। চটপট উত্তর দেয়, বলে, জেরিনা আমার বোন।
 
সবার অলক্ষে প্রজাপতি কি করলো, কে জানে? সেই যে দেখা হলো, গেরো লেগে গেলো দুটি হৃদয়ের আট অলিন্দে। এক মহল্লায় বাড়ি। দেখা হয়, মানে দেখা করে দুজনে। পার্কে যায়। গল্প করে। কদিনের মধ্যেই সরফরাজ রেগে যায়। ওদের মেলামেশা পছন্দ হয় না তার। এক সময় ভাই বোনে কথা কাটা কাটিও হয়। জেরিনা বলে, তোমারও তো বন্ধু আছে। সে বেলা কথা নেই? নিজের দিকে তাকাও ভাইজান।
 
- তুমি আমাদের খান্দানের মেয়ে।

- কেনো, হাবিবা কি খারাপ খান্দানের মেয়ে? সে তো মেশে তোমার সাথে?

- ওটা আমার ব্যাপার জেরিন।

- হাবিবার যদি বন্ধু থাকতে পারে, তাহলে আমার নয় কেনো?
 
ছুটি শেষ হলো। প্রশিক্ষণে চলে গেলো মুশতাক। কিন্তু ফোনে কথা হয়। দেখতে দেখতে ছয় মাস কেটে যায়। আবার বাড়ি আসে মুশতাক। উড়ে আসে সহস্র প্রজাপতি ওদের কাছে। আনন্দে ফুল্ল হয়ে ওঠে দুজনের মন প্রাণ।
 
সরফরাজ এসে দাঁড়ায় দুজনের মধ্যে। এবার সরাসরি বলে, ভালো হবে না জেরিন, বলে দিচ্ছি। সাবধান হয়ে যাও। আর মুশতাককে বলে, সরে যাও জেরিনের কাছ থেকে।

- যদি না যাই? শির উঁচু করে বলে মুশতাক।

- ফল ভালো হবে না। চোখ লাল করে বলে সরফরাজ।

- আমি জেরিনকে ভালোবাসি।

- গুল্লি মারি তোমার ভালোবাসাকে।

- আমরা বিয়ে করবো।

- সে সুযোগ পাবে না তুমি।

- চ্যালেঞ্জ দিচ্ছো?

- দিচ্ছি।

- আমি সৈনিক। তোমার চ্যালেঞ্জ নিলাম।
 
আধুনিক মেয়ে জেরিন। পৃথিবীকে দেখেছে সে মনের সমস্ত রঙ দিয়ে। ভাইয়ের কথায় কান দেয় না। চলতে থাকে মেলামেশা। একদিন দুজনের ঘনিষ্ঠ মুহুর্তের ছবি আপলোড করে ফেইস বুকে। যেনো রাজা আর রানি আলতোভাবে জড়িয়ে ধরে আছে পরস্পরকে।
 
আগুন ধরে যায় সরফরাজের মাথায়। যেদিন ছবিটা দেখেছে সেদিনই সিদ্ধান্ত নেয়। মনে মনে বলে, আর বাড়তে দেয়া যায় না। এই কলঙ্কিনী বোনকে বাঁচতে দেয়া যায় না আর। খান্দানের মান ইজ্জত শেষ করে দেবে। সন্ধে বেলা বোনের ঘরে ঢোকে সে। ফোনে কার সাথে হাসিতে বিগলিত হয়ে কথা বলছে সে? হয়তো সে আর একবার সাবধান করতো জেরিনকে। হলো না। আউলে গেলো মাথা।

ঠুস ঠুস। পরপর দুটো শব্দ হলো। লুটিয়ে পড়লো রক্তাক্ত জেরিন।
 
বিকেলে উত্তেজিত সাহেলির ফোন পেয়ে নাজিফা বলে, দেখেছিস খবরটা।

- দেখেছি। তুই ফোন করিসনি কেনো?

- করতাম। মনে মনে ঘটনার পটভুমি চিন্তা করলাম।

- মানে? কোথায় পেলি?

- পাই নি। তৈরি করলাম।

- বুঝলাম না তোর কথা নাজি।

- মানে হঠাৎ তো কেউ কাউকে গুলি করে না। পেছনে প্রস্তুতি থাকে। বিশেষ করে ভাই বোনের সম্পর্ক একদিনে তেতো হয় না। একদিনের প্রস্তুতিতে বোনকে খুন করা যায় না।

-তোদের লেখকদের নিয়ে এই এক ঝামেলা। সবখানে গল্প খুঁজিস।

- গল্প তো থাকেই কিছু। শুনিস তো বলি।
 
গল্প তো ছোটোই। ছেলে প্রেম করে, কিন্তু মেয়ে প্রেম করতে পারবে না। খান্দানের মান সম্মান সব যাবে। কেনো ছেলেটাকেও মেরে ফেললো না সরফরাজ, এই নিয়ে কথা হলো দুজনের মধ্যে। কিন্তু জবাব নেই কারো কাছেই।
 
সাহেলি আর নাজিফা দুজনেই রাজধানীর বিশিষ্ট নারীবাদি সংগঠনের কট্টর কর্মি। এমন ঘটনা, তা সে পৃথিবীর যেখানেই ঘটুক, তারা মিটিং মিছিল করে, প্রতিবাদ জানায়, কাগজে কিছু লেখালেখিও করে। যদিও নাজিফা জানে, এই সব করে কোনো লাভ নেই।
 
সাহেলি তো বলেই, অনার কিলিং তাদের দেশের সমস্যা নয়। কিন্তু বিশ্ব নারি সমাজের প্রতি সংহতি জানাবার জন্য এমন ধরনের অন্যায়ের প্রতিবাদ জানাতেই হয়। আফ্রিকায় মেয়ে শিশুর খতনা করার প্রতিবাদও তার মধ্যে পড়ে। আমাদের সমস্যা হলো, নারীর নানা রকম নির্যাতন। যৌতুক তার মধ্যে অন্যতম প্রধান। আর আছে বাল্যবিবাহ।
 
নাজিফা একমত নয়। তার মতে অনার কিলিং শুধু আরব দেশের ঐতিহ্য নয়।বাঙলাদেশেও আছে। এটা তো শুধু একরকম নয়। কুমারি বা বিধবা মা তার সম্মান বাঁচানোর জন্য সদ্যজাত শিশুকে ডাস্টবিনে ফেলে দেয়। কখনও নবজাতকের মুখে লবন ঠুঁসে মেরে ফেলে। এই শিশু হত্যাও একধরনের অনার কিলিং। ধনীগৃহে অনাকাঙ্খিত সন্তানের ভ্রুণ ফেলে দেয়া হয় ‘এম আর’ করে। এই ভ্রুণ হত্যাও অনার কিলিং। গ্রামীণ সমাজে অবৈধ সন্তান নষ্ট করতে গিয়ে কতো মেয়ের মৃত্যুও হয়। এমন মৃত্যুকে পরিবারের মা বাবা সম্মানজনক মনে করে। কিসের যে সম্মান, আর কিসের জন্য বাড়ির মেয়েকে যে মরতে হয়, সেটাই প্রশ্ন আজও।
 
সংগঠনের সভাপতি সেলিনা খানও বলেন, অনার কিলিং আসলে আরব দেশের এক জঘন্য প্রথা। ভবিষ্যতে মেয়েটা বহুভোগ্য হতে পারে, সেই ভবিষ্যত অসম্মানের ভয়ে নিজের মেয়েকে জ্যান্ত কবর দিতো। বেদুইন সমাজে সেটা স্বাভাবিক ছিলো সেকালে। কিং বা ছিলো তাদের সমাজ, আর কি বা ছিলো তাদের খানদান? তবু মেয়ে বহুভোগ্য হলে পরিবারের মান সম্মান যায়, এই ছিলো তাদের ধারণা। হাস্যকর! নিজেরাই এই প্রথা সৃষ্টি করে, নিজেরাই তা নিয়ে মৌজ করে। কিন্তু নিজের মেয়ের জন্য এই ভবিষ্যত চায় না। এই একবিংশ শতাব্দিতে জ্ঞান বিজ্ঞান আর প্রযুক্তির আলোতে মানুষ এখনও কেনো অনার কিলিং নির্মুল করতে পারবে না? কিন্তু সেলিনা তার আর পরের কথা জানেন না। এ কেমন অসমাপ্ত ধারণা? পথের ঠিকানা চাই এখন।
 
নাজিফা বলেছিলো, ম্যাডাম, রাজশক্তির সাহায্য ছাড়া সমাজ্ সংস্কার করা যায় না। সতীদাহ প্রথাও দূর হতো না যদি না লর্ড বেন্টিং এসে দাঁড়াতেন রাজা রামমোহনের পাশে।

- তার মানে তুমি বলতে চাও, আমাদের নারীবাদি আন্দোলনের কোনো মুল্য নেই? নাখোশ হয়ে প্রশ্ন করেছিলেন ম্যাডাম।

- আমি তা বলতে চাইনি ম্যাডাম। আমরা তো শহর নগর বন্দরের নারী সমাজের কাছে নারীর অধিকারের কথা পৌঁছে দিচ্ছি। প্রতিবাদের কথা বলছি। প্রতিকার চাইছি।কিন্তু গ্রামে সেকথা যায় না।

- আমাদের অশিক্ষা সেজন্য দায়ি নাজিফা।

- সেটা তো একটা বড়ো ব্যাপার মানতেই হবে। তাছাড়া আমাদের দেশে যে আইন আছে তার প্রয়োগও তো নেই। যার যা খুশি করে পার পেয়ে যাচ্ছে।

- সেটা ঠিক। দুঃখজনকও। আমরা তো সে ব্যাপারেও সচেতনতা সৃষ্টি করছি, তাই না?

- আমি সেটাই বলতে চাইছি ম্যাডাম। আমরা কাজ করবো কি ভাবে? দেশে যে কোনো নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে কাজ করতে চাই, আইনের সাহায্য পাই না তেমন ভাবে।

- আইনের প্রয়োগ তো আমাদের হাতে নেই নাজিফা।

- সেটা যতক্ষণ না পাওয়া যায়, ততক্ষণ সমাজ সংস্কারের কাজ হবে না ম্যাডাম।

- তুমি খুব উচ্চাকাঙ্খী। কতদুর যেতে চাও এই দেশে?

- দুঃখিত ম্যাডাম। আসলে এতো কথা বলতে চাই নি আমি।

- ঠিক আছে। আগামি কাল খাগড়াছড়ি যেতে হবে, মনে আছে তো? মনে হচ্ছে এবার ধর্ষককে জেলে ঢোকাতে পারবো আমরা। সাহেলি আর তুমি যাচ্ছো এবার। কদিন থাকতে হবে? তিন চার দিন?

- না ম্যাডাম, দুদিনের বেশি লাগবে না মনে হয়।

- তবু আমি চারদিনের বাজেট পাঠিয়ে দেবো। ধরো যদি থাকতেই হয়? আমাদের দাতা সংস্থা আবার বেশ কড়া। দৈনিক দশ হাজার টাকা দেবে, তার আবার পাই পাই করে হিসেব দিতে হয়।
 
কি বলবে নাজিফা। শত শতবার সভা সমিতিতে বলেছে, কাগজে লেখেছে, ধর্ষণের শাস্তি জেল জরিমানা বা প্রানদন্ড নয়। ধর্শকের শাস্তি হলো, তাকে খোজা করে দেয়া। যেনো জীবনে ঐ একটা কাজ আর সে করতে না পারে। বেশি নয়, দশ বিশটাকে এই শাস্তি দিতে পারলেই থমকে যাবে বেয়াদবগুলো। আশ্চর্যের কথা এই যে, তার কথাকে মেয়েরাও সমর্থন তো করেই নি, বরং তা নিয়ে হাসাহাসি করেছে। যেনো এটা একটা অশালীন কথা। একটা অবাস্তব কাজ। হতেই পারে না এমন। যেনো ধর্ষণ কাজটা হালাল।
 
নাজিফা সাহিত্যের ছাত্রি। কাজী নজরুল ইসলামের ‘রাক্ষুসি’ গল্পটার কথা মনে পড়ে। স্বামী বিপথগামি জেনে তাকে ফেরানোর অনেক চেষ্টা করে বাগদি বউটা। প্রাণ দিয়ে ভালোবাসে সে তার স্বামীকে। রোজ দুপুর রাত পর্যন্ত বসে স্বামীর ভাত আগলে রাখে। পাঁড় মাতাল হয়ে বাড়ি এলে হাত মুখ ধুইয়ে সামনে এনে ধরে খাবার। অসুখ হলে কেঁদে ভাসায়।
 
শুধু তাড়ি খেলে কথা ছিলো না। ক্রমে অন্য নারীর সাথে সম্পর্ক করে। এক কান দু কান হতে হতে বাগদি পাড়ায় ছড়িয়ে পড়ে তার স্বামীর নিন্দার কথা। বউটার মনে হলো, স্বামী পাপ করছে। আর স্বামীর পাপ মানে তারও পাপ। সে তার স্বামীকে প্রাণের চেয়ে বেশি ভালোবাসে। কেমন করে সে স্বামীকে পাপ করতে দিতে পারে? কিন্তু কোনো কথাই যে সে শোনে না। পৃথিবীতে মান সম্মান তো গেছেই, ওপারে গিয়েও সম্মান পাবে না। তাকে নরকে ফেলবে ভগবান। স্বামী নরকে গেলে তার বড়ই কষ্ট হবে। তাই স্বামীকে ওপারের নরক যন্ত্রনা থেকে বাঁচানোর জন্য চরম পথ বেছে নিতে হবে তাকেই।
 
একদিন মধ্যরাতে মাতাল স্বামী বাড়িতে ঢোকার সাথে সাথে বড়ো বটি দিয়ে তার ঘাড়ে মরণ কোপ বসায় বৌটা। তারপর নিজেই নিজের দোষ স্বীকার করে বলে যে, স্বামীকে নরকের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য সে এই কাজ করেছে। সমাজের ধিক্কার লজ্জা আর পরকালে শাস্তির হাত থেকে তার ভালোবাসার মানুষকে রক্ষা করা যে তার দায়িত্ব। বউটা একবারও মনে করে না যে, রাগের বশে সে স্বামীকে হত্যা করেছে। তার দৃঢ় ধারণা, স্বামীর মঙ্গলের জন্যই সে বাধ্য হয়েছে কাজটা করতে। তার ইহকাল পরকাল দুটোই বাঁচলো। সম্মানও বাঁচলো। তার যা হবে হোক। এও যে অনার কিলিং তা সে জানেও না।
 
নিজেকে নিজে প্রশ্ন করে নাজিফা, এটাও কি অনার কিলিং নয়? শুধু পক্ষটা উলটো। এখানে মেয়ে হয়েছে অনার কিলার। নিম্নবর্ণের সমাজে কি এমন তেজি মেয়ে থাকে? নজরুল নিশ্চয় পেট বানানো গল্প লেখেন নি। দরিদ্র সমাজের অলি গলির সাথে তাঁর পরিচয় ছিলো। নিশ্চয় এমন ঘটনার কথা তিনি শুনেছেন। শুধু নিম্ন বর্ণের সমাজে কেনো, এখন তো সরফরাজের মতো ঘাতককে হত্যা করার জন্য রিতিমতো আন্দোলন গড়ে তোলা যায় বাগদি বউটার দৃষ্টান্ত দেখে। অনার কিলিং একপাক্ষিক হবে কেনো?
 
রবীন্দনাথের কবিতায়ও আছে, মাসি তীর্থ করতে যাবে শুনে তার ন্যাওটা এক বোনপো জিদ ধরে মাসির সাথে যাবার জন্য। রেগে মাসি বলে, চল তোরে দিয়ে আসি সাগরের জলে। তীর্থ শেষে বাড়ি ফেরার পথে নদীতে প্রবল ঝড় উঠলো। যাত্রিরা ভয়ে দিশেহারা। টালমাটাল নৌকোটা এই বুঝি উলটে যায়। কে একজন বলে উঠলো, বাবাকে ফাঁকি দিয়ে কেউ সম্পদ নিয়ে যাচ্ছে। আর একজন বলে উঠলো, এই সেই মাসি। বোনপোকে সাগরের জলে দিতে চেয়েছিলো। অমনি সকলে বলে উঠলো, দাও ওকে সাগরের জলে ফেলে। সঙ্গে সঙ্গে উতসাহি লোকেরা মাসির বুক থেকে ভয়ার্ত শিশুকে ছিনিয়ে নিয়ে ফেলে দিলো সাগরে। এও তো অনার কিলিং। কল্পিত দেবতার সম্মান রাখার জন্য, প্রতিশ্রুতির সত্য রাখার জন্য এবং এতোগুলো মানুষের প্রান মান রক্ষা করার জন্য সলিল সমাধি হলো শিশুটির।
 
হয়তো এমন ঘটনা ঘটতো দেশে পুরা কালে। সেই কাহিনির সূত্র যাই থাক, রবীন্দ্রনাথ সেটাই তুলে ধরেছেন কবিতার মাধ্যমে। দেশাচার আর সংস্কারকে ধর্মের সুধাময় বাণী কোনোদিনই পরাজিত করতে পারে নি। আগে নাজিফা বলতো, মানুষ চারটা জিনিস পায় জন্মসুত্রে, যেমন; মা, মাতৃভাষা, মাতৃভুমি আর ধর্ম। এখন মনে হয় বহমান জীবনের ধারায় গড়ে ওঠা সংস্কৃতিও পায়। তা সে ভালো হোক আর মন্দ হোক। যাকে আমরা সংস্কার বলি। যা এক ধরনের অন্ধ গূঢ় গভীর বিশ্বাস।
 
এই বিশ্বাস এতোই শক্ত যে, স্বর্গ নরকের ভয়ও কাজ করে না। তাছাড়া শুধু অশিক্ষা নয়, দারিদ্র মানুষের সুকুমার বৃত্তিগুলোকে বাড়তে দেয় না। ভালো কিছু ভাবতে দেয় না পোড়া পেট। সারাক্ষণ কাড়াকাড়ি আর খামচা খামচি লেগেই থাকে নিজেদের মধ্যে। পড়শিদের মধ্যে। অসুয়া বিষে দৃষ্টি আচ্ছন্ন হয়ে থাকে। ফুলে ফলে রূপ রস রঙে ভরা এতো সুন্দর পৃথিবীটাকে দেখতেই পায় না দরিদ্র মানুষ। বিষয়গুলো কি দুঃসহ বাস্তব!
 
এতোদিন পর নাজিফার মনে হচ্ছে, সংগঠনের নামে তারা বেইমানি করে টাকা কামাচ্ছে। আন্দোলন টান্দোলন যে ভড়ং, সেটা বড়ো বেশি করে তার মনে খোঁচা দেয়। খাগড়াছড়িতে যে কিশোরি মারা গেছে, সে তো স্রেফ অনার কিলিং-এর শিকার। ধরা পড়ার ভয়ে ধর্ষক তাকে হত্যা করেছে। পুলিশ বলছে শয়তানটা পলাতক। স্থানীয়রা বলছে, সে দিব্যি বাজারে হাটে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এলাকার নেতার সাথে তার দহরম মহরম আছে। এবং সেটা জানে ঢাকার মাথা নেতা পর্যন্ত।
 
নাজিফা বা সাহেলি এমন পরিস্থিতিতে কি করতে পারবে? আইন যেখানে দোষীর পক্ষে, সেখানে যতো সাক্ষী প্রমাণই তারা যোগাড় করে আনুক, কোনো কাজে লাগবে না। কি অবাক কথা? ম্যাডামের ধারণা, আমাদের দেশে অনার কিলিং নেই। অথচ ধর্ষণের পরে কথা লুকিয়ে রাখার জন্য এবং নিজের সম্মান বাঁচানোর জন্য নির্যাতিত মেয়েকে হত্যা করাকে অবশ্যই অনার কিলিং বলা যায়। সত্যি কথার সত্যি টার্ম অবশ্যই চাই। কেনো বলা হবে যে, দেশে অনার কিলিং নেই? আগে তো চিহ্নিত করতে হবে অপরাধটা। তারপর একে নির্মূল করতে হবে আইনের শাসনেই। কিন্তু কিছুই করতে পারবে না তারা। কি অসহায় একটা অবস্থায় তারা আন্দোলনের নখরা দেখায়! কে তোয়াক্কা করে নারীবাদি কর্মীদের কথার? তাহলে তনু হত্যার খবরগুলো, মানে সত্য ঘটনাটা অন্তত জানা যেতো।

কারণ তনু হত্যাও অনার কিলিং।
 
মনে মনে সিদ্ধান্ত নেয় নাজিফা, আর এই চাকরি নয়। আত্মবঞ্চনা খুব বেশি হয়ে উঠেছে। তবে চাকরি ছেড়ে বসে থাকা তো যাবে না। কিছু একটা করতে হবে। কিন্তু কি সেটা? সার্বক্ষণিক লেখালাখি? পয়সা পাওয়া যায় না। পাঠক পাওয়া যায় না। তাতে কি? লেখে রাখলে কোনো দিন কেউ না কেউ পড়বেই। সমাজ সংস্কার নিয়ে লেখেই যাবে সে। দরকার হলে প্রকাশনায় নেমে পড়বে। ব্যাবসা হবে কিনা জানে না নাজিফা, তবে আত্মবঞ্চনা থাকবে না। নিজের লেখা নিজেই ছাপাবে। অনেক বড়ো বড়ো লেখকও নিজের লেখা নিজে ছাপান। মান রাখার জন্য লুকিয়ে রাখেন সে কথাটা। রবীন্দ্রনাথও নিজের বই নিজেই ছাপাতেন। সে প্রকাশ্যেই করবে নিজের কাজ।
 
নিজের অনারকে আর কিল করা যায় না। প্রাণের বন্ধু সাহেলিকেও বললো না কিছু। আর বলাবলির কি আছে? কালই জানতে পারবে তার ইস্তফা দেয়ার খবর। কারো কাছে জবাবদিহি করার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই তার। ফাঁকি দেয়া বহু কাজের নাটকের চেয়ে, সভা গরম করা অনেক কেতাবি কথার চেয়ে, সততার সাথে একটা সামান্য কাজ করাও অনেক বড়ো মনে হয় তার। 
 
পরদিন সকালে আর খাগড়াছড়ি যাওয়া হলোনা নাজিফার। পদত্যাগ পত্রে একটা বাক্যই লেখলো সে, শারীরিক কারণে সে চাকরিতে ইস্তফা দিলো। পাঠিয়ে দিলেই হলো চিঠি। ব্যাস, আর কোনও দায় নেই। তবু শেষবারের মতো চিঠিটা আবার পড়ে নাজিফা। আর একবার ভাবে, একক অভিভাবক হিসেবে দুটো সন্তানকে মানুষ করতে হবে তাকে। মাঝবয়সে বেকার জীবনের ঝুঁকি নিতে পারবে তো?
 
চিঠিটাকে বেকার জীবনের কালো ছায়ার মতো মনে হলো তার। কি আশ্চর্য, এমন একটা শক্ত সিদ্ধান্তের গা থেকে ঝুর ঝুর করে মাটি খসে যাচ্ছে কেনো?
----------

হেলিয়স রেহাক্লিনিক, ১৬-০৯-২০১৬


লেখক পরিচিতি:

বেগম জাহান আরা

ভাষাবিদ। অনুবাদক। গল্পকার












কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন