মঙ্গলবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২১

আব্দুলরাজাক গুরনাহ : আফ্রিকার শিকড়ছিন্ন মানুষের কণ্ঠস্বর

এলহাম হোসেন

আব্দুল রাজাক গুরনাহর উপন্যাস প্যারাডাইস আমি আগে পড়েছিলাম। তাঁর একটি ছোটগল্পেরও অনুবাদ করেছি। এটি আমার আফ্রিকার ছোটগল্প ও সাহিত্যচিন্তা নামক বইতে ছাপা হয় 

২০২০ সালে। এই কাজগুলো করার সময়ই আমি লেখক হিসেবে আব্দুল রাজাক গুরনাহর শক্তিমত্তার পরিচয় পাই। তবে তিনি নোবেল পাবেন বলে আমার ধারণা ছিল না। আফ্রিকার লেখকদের মধ্যে নোবেল পেতে পারেন বলে নগুগি ওয়া থিয়োং’ওর নাম আমার মাথায় প্রায়ই ঘুরপাক খায়। সম্ভবত তাঁর প্রতি পক্ষপাতিত্বের কারণেই হয়ত অন্য কোন আফ্রিকী লেখকের নাম আমার মাথায় আসেনি। যাই হোক, গত কয়েক বছরের মতো এবারও সুইডিশ নোবেল কমিটি সব সাহিত্য বোদ্ধাদের ধারণা, অনুমান ও ভবিষ্যতবাণী উড়িয়ে দিয়ে তানজানিয়ার সাহিত্যিক ও সমালোচক, বর্তমানে যুক্তরাজ্যে বসবাসকারী আব্দুল রাজাক গুরনাহর নাম ঘোষণা করেছে। খবরটি শুনেই আমার মনে হয়েছে, নোবেল কমিটির এই মনোনয়ন যথার্থই হয়েছে। ১৯৯০ এর দশকে পূর্ব-আফ্রিকার দেশসমূহের সাহিত্যিকদের মধ্যে আন্তর্জাতিক পাঠকমহলে বহুল পঠিত লেখক হলেন আব্দুল রাজাক গুরনাহ। তাঁর জন্ম ১৯৪৮ সালে জানজিবারে। এটি তানজানিয়ার অন্তর্ভূক্ত একটি দ্বীপ। ব্যবসায়-বাণিজ্যের জন্য এর ব্যপক পরিচিতি আছে। তানজানিয়া ১৯৬৩ সালে ব্রিটিশ উপনিবেশমুক্ত হয় এবং ১৯৬৪ সালে এখানে বিপ্লব ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় বিপ্লবীরা জানজিবারের সুলতানকে ক্ষমতাচ্যুত করে। রাজনৈতিক ডামাডোলে এসময় অনেক মানুষ উদ্বাস্তুতে পরিণত হয়। এ সময় গুরনাহও উদ্বাস্তু হিসেবে যুক্তরাজ্যে এসে হাজির হন। এখন পর্যন্ত এখানেই বসবাস করছেন। বর্তমানে তিনি ইংল্যাান্ডের কেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি ও উত্তর-ঔপনিবেশিক সাহিত্যের এমিরিটাস অধ্যাপক। নোবেল কমিটি তাঁর সাহিত্যকর্মের মূল্যায়ন করে বলেন, ঔপনিবেশিকতার অভিঘাতে নানান সংস্কৃতি ও মহাদেশের অসংখ্য উদ্বাস্তুর ছিটকে পড়ার কথা নিয়ে তিনি আপোষহীন ও দরদী কলমে তাঁর সাহিত্যকর্মে শক্তিশালী আখ্যান নির্মাণ করেছেন।

গুরনাহ হয়ত নিজেও ভাবেননি, তিনি নোবেল পুরস্কার পাবেন। তাঁর নোবেল প্রাপ্তির ঘটনার কেউ কেউ সমালোচনা করেছেন। আবার অনেকেই তাঁকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। এঁদের তালিকায় সালমান রুশদিও আছেন। গুরনাহ নিজেও সালমান রুশদির একজন ভক্ত পাঠক। তাঁকে নিয়ে একটি সংকলনগ্রন্থও করেছেন গুরনাহ। তবে যাই হোক, সাহিত্যে গুরনাহর নোবেল প্রাপ্তির ঘটনা তাঁর নিজ জন্মস্থান তানজানিয়ার জানজিবারে ব্যাপক উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে যদিও দেশটির প্রেসিডেন্ট গুরনাহকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। নোবেল প্রাপ্তির পূর্বে গুরনাহ তাঁর নিজ দেশ তানজানিয়ায় খুব একটা পঠিত হননি। এর কারণ এখানে সাহিত্যে আগ্রহী পাঠকের সংখ্যা ততোটা বেশি নয়। আবার গুরনাহকে নিয়ে কিছু সমালোচনাও রয়েছে তাঁর নিজ দেশে। অনেকেই গুরনাহকে তানজানিয়ার লেখক বলা যাবে কি-না, তা নিয়ে সংশয়ও প্রকাশ করেছেন। ১৯৬৭ সালে, অর্থাৎ বিপ্লবের মাত্র তিন বছরের মাথায় অনেক তানজানীয় অভিবাসীর মতো গুরনাহও দেশত্যাগ করেন এবং যুক্তরাজ্যে থিতু হন। তিনি যুক্তরাজ্যের পাসপোর্টধারী নাগরিক। লেখাপড়া করেছেন সেখানেই। কেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করে অবসর গ্রহণ করেছেন। জন্মদেশ তানজানিয়ার সঙ্গে তাঁর সরাসরি যোগাযোগ নেই। দ্বৈত নাগরিকত্ব তাঁর নেই। কেউ কেউ আবার মনে করেন, দেশের সরকারই তাকে দ্বৈত নাগরিকত্ব দেয়নি। নাগরিকত্ব পেলে দেশে থাকা বেদখল হয়ে যাওয়া তাঁর পৈত্রিক সম্পত্তি তিনি দাবি করতে পারেন- এই ভয়ে। তবে গুরনাহ নিজেকে মনে-প্রাণে তানজানিয়ার মানুষ হিসেবেই পরিচয় দিতেই গর্ববোধ করেন। এখনও তাঁর অনেক আত্মীয়স্বজন তানজানিয়ায় বসবাস করছেন। গুরনাহর তাঁদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগও রয়েছে।


গুরনাহ লিখেছন দশটি উপন্যাস, মেমোরি অব ডিপারচার (১৯৮৭), পিলগ্রীম’স ওয়ে (১৯৮৮), ডোটি (১৯৯০), প্যারাডাইজ (১৯৯৪), অ্যাডম্যাইরিং সাইলেন্স (১৯৯৬), বাই’ দ্য সী (২০০১) এবং গ্রাভেল হার্ট তাঁর উল্লেখযোগ্য উপন্যাস। তাঁর সম্পাদিত সাহিত্য সমালোচনাগ্রন্থ হলো- এসেজ অন আফ্রিকান রাইটিং: আ রি-ইভ্যালুয়েশন (১৯৯৩) এবং এসেজ অব আফ্রিকান রাইটিং: কনটেম্পরারি লিটেরেচার (১৯৯৫)। এছাড়া তিনি ছোটগল্পকার হিসেবেও সাহিত্যামোদীদের মাঝে ব্যাপক জনপ্রিয়।

আব্দুল রাজাক গুরনাহর সাহিত্যের পরতে পরতে দেশ থেকে বিতাড়িত, শিকড়ছিন্ন নির্বাসিত মানুষের নীরব কান্না, দীর্ঘশ্বাস ও গভীর বেদনার সুর ধ্বনিত হয়। এই মানুষগুলো নিজেদের ইতিহাস ও সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ভিনদেশে ডায়াসপোরা হিসেবে বসবাস করে। শিকড়ে ফেরার ব্যাকুলতা যেমন এদের বিচলিত করে তোলে, তেমনি ফিরতে না পারার গভীর বেদনাও এদের মনকে ভারাক্রান্ত করে তোলে। এরা হোমি ভাবার থার্ড স্পেসের বাসিন্দা। ইনবিটুইন্নেস এদের মনস্তত্ত্বের অমোঘ উপষঙ্গ। এই মানুষগুলো নিজ দেশেও হয় প্রতারিত। আবার দেশ ছেড়ে অধীকতর সুখকর জীবনের স্বপ্নে তাড়িত হয়ে ভিন দেশে এসেও এদের হয় স্বপ্নভঙ্গ। এমনই মানুষদের জীবনাভিজ্ঞতা ও অনুভবের আখ্যান তৈরি হয়েছে তাঁর প্রথম উপন্যাস মেমোরি অব ডিপারচার (১৯৮৭)- এ। উল্লিখিত উপন্যাসের প্রধান চরিত্র একজন মুসলিম যুবক। তার নাম হাসান ওমর। সে পূর্ব-আফ্রিকার কোন এক অখ্যাত উপকূলীয় শহরে চরম দারিদ্র ও বঞ্চনার মধ্যে বেড়ে ওঠে। শীঘ্রই বুঝতে পারে, সে যে সম্প্রদায়ের লোক, সেই সম্প্রদায় তার আশা-আকাঙ্ক্ষা পুরণে সক্ষম নয়। তাই অধিকতর আরামদায়ক ও সমৃদ্ধশালী জীবনের খোঁজে সে নিজ শহর ছেড়ে পালাতে চায়। কিন্তু পালিয়ে যাবে কোথায়? কিসের স্বাধীনতা, আর কিসের স্বাধীনতা-পূর্ব পরিস্থিতি- সবসময়, সব স্থানেই সে হয় বঞ্চনার শিকার। এক পর্যায়ে সে কেনিয়ায় এসে হাজির হয়েছে। কিন্তু যে স্বপ্নকে সে ছোঁবে বলে সে তাঁর শিকড় ছেড়ে এসেছে, তা তাঁর কাছে অধরাই রয়ে যায়। এই উপন্যাসটি গুরনাহর পরবর্তী উপন্যাসগুলোর মূল সুর ধ্বনিত করে। কারণ, গুরনাহর পরবর্তী উপন্যাসগুলোর প্রধান বিষয়বস্তু হলো- দেশত্যাগ, ভ্রমণ ও ডায়াসপোরা জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক, ভাষিক ও মনস্তাত্ত্বিক সংকট। তাঁর পিলগ্রীম্স ওয়ে উপন্যাসেও শিকড়ছিন্ন মানুষের মনস্তাত্ত্বিক সাংস্কৃতিক সংকটের আখ্যান নির্মিত হয়েছে। দাউদ নামে একজন মুসলমান আফ্রিকী যুবক নিজ দেশের আচার, সংস্কৃতির ব্যাপারে অসন্তুষ্ট হয়ে স্বপ্নের খোঁজে আসে ইংল্যান্ডে। কিন্তু এখানেও সে আবিস্কার করে যে, এই ভিনদেশের সংস্কৃতি তাকে গ্রহণ করছে না। তখন সে আশ্রয় নেয় তাঁর পেছনে ফেলে আসা দেশের স্মৃতিচারণে । স্মৃতি রোমন্থন করে সে চিঠি লিখতে থাকে। এই চিঠি লেখার মধ্যে শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি থেকে মুক্তির আনন্দ খোঁজে।


গুরনাহর প্যারাডাইজ উপন্যাসটি সবচেয়ে বেশি পঠিত এবং ১৯৯৪ সালে একটি বুকার পুরস্কারের জন্য ছোট তালিকাভুক্ত হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ঠিক প্রাক্কালের বাস্তবতায় রচিত উপন্যাস এটি। কেউ কেউ উপন্যাসটিকে জোসেফ কনরাডের হার্ট অব ডার্কনেস এর সঙ্গে তুলনা করেন। উপন্যাসের আখ্যান নির্মিত হয়েছে ইউসুফ নামের এক বালকের গল্পকে আশ্রয় করে। তার বাবা তাকে তার চাচা আজিজের কাছে বিক্রি করে দেয়। এই আজিজের সঙ্গে সে আফ্রিকার অভ্যন্তরে অনেক বিপদসংকূল পথ পাড়ি দেয়। ছেলেটি জানে না, দারিদ্রের কষাঘাতে জর্জরিত বাবা তাকে দাস হিসেবে বিক্রি করে দিয়েছে। এই উপন্যাসের আখ্যান বর্ণনার মধ্য দিয়ে গুরনাহ ঔপনিবেশিকতার নির্মম অভিঘাতে ছিন্নভিন্ন স্থানীয় আফ্রিকী সমাজ ও অর্থনৈতিক জীবনের একটি বিশ্বস্ত চিত্র অংকন করেছেন। তাঁর ডটি উপন্যাসটি আফ্রিকার অভিবাসীদের চরম দুর্ভোগ ও স্বপ্নভঙ্গের কাহিনীর বর্ণনা উপস্থাপন করেছে। ডটি নামের বালিকা সবসময় চোখে গোলাপি রংয়ের চশমা পরে থাকে। অভিবাসী হিসেবে ইংল্যান্ডে বসবাসের সময় তার বাবা-মা বা তার পরিবার কী সংকটের মোকাবেলা করছে, সে-ব্যাপারে তার কোন বিকার নেই। গোলাপি চশমা তাকে ইউরোপের বিলাসবহুল জীবন আর চরম সংকটময় বাস্তবতার মধ্যে পর্দা ঝুলিয়ে দিয়েছে। এই পর্দা ছিন্ন করার সামর্থ্য তার নেই। এটি ছিন্ন করার সামর্থ্য তো তৈরি হয় নিজস্ব সংস্কৃতির গভীরে প্রোথিত শিকড় থেকে। এই শিকড় যত গভীর ও মজবুত হয়, এই সামর্থ্যরে প্রাবল্য তত তীব্র হয়। টবে লালিত গাছ যতই দৃষ্টিনন্দন দেখাক, তা সামান্য ঝড়ো বাতাসে ঢলে পড়ে। গোলাপী চশমা পরা ডটি জীবনকে দেখতে চেয়েছে ধার করা চোখ দিয়ে, ইউরোপের চোখ দিয়ে। তাই স্বপ্নাতুর ডটি বাস্তবতার বিশ্বস্ত অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছে।

স্বপ্নের খোঁজে দেশত্যাগী আফ্রিকার অভিবাসীদের হতাশা ও দুঃসহ অভিজ্ঞতার বয়ান গুরনাহর অ্যাডমাইরিং সাইলেন্স উপন্যাসেও হাজির হয়েছে। উপন্যাসের কাহিনীতে দেখা যায়, জানজিবারের এক ব্যক্তি রাজনৈতিক অভ্যুত্থানের সময় স্বপ্নের খোঁজে ইংল্যান্ডে পাড়ি জমায়। নিজের শৈশবের রঙ্গীন গল্প বোনে। এই গল্পগুলো সে একজন ইংরেজ মহিলাকে শোনায়, তাকে প্রণয় নিবেদন করে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের পক্ষে নানান ইতিবাচক গল্প তৈরি করে সে এবং সেগুলো শুনিয়ে তার প্রেমিকার বাবার কাছেও আদরনীয় হয়ে ওঠার চেষ্টা করে। কিন্তু দীর্ঘ বিশ বছর পর সে আবিষ্কার করে যে, এই ভীন দেশ এবং ভিন্ন সংস্কৃতি তাকে আপন করে নেয়নি। সে প্রান্তিক, মার্জিনালাইজ্ড। অগত্যা হতাশা নিয়ে নিজ দেশ জানজিবারে ফিরে আসে। কিন্তু সেটিও আর এত দিনে তার নেই, তাকে স্বাগতম জানানোর স্বতস্ফূর্ততা বা উঞ্চতার কোনকিছুই নেই এখানে। শেষে সে মর্মান্তিকভাবে উপলব্ধি করে, আশার ছলনে ভুলে সে এতদিন শুধু নিজেকে প্রতারিতই করেছে। নিজেকে ঘিরে যে মিথ্যে গল্প ও বয়ান সে নির্মাণ করেছিল সেগুলো তাকে ঘরেরও করেনি, বাহিরেরও করেনি। সে এই দুইয়ের মাঝখানে তৃতীয় একটি জায়গায় নিক্ষিপ্ত হয়েছে। পরিচয় সংকটের পীড়নে সে বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছে। 

আত্মপরিচয় হারিয়ে আফ্রিকার অভিবাসীদের মহাসংকটে নিপতিত হওয়ার বয়ান গুরনাহ তার বাই দ্য সী উপন্যাসেও রূপকালঙ্কারিকভাবে উপস্থাপন করেছেন। প্রাগুক্ত উপন্যাসে দেখা যায়-- এর মূল চরিত্র আফ্রিকা থেকে আশ্রয়ের খোঁজে লন্ডনের গেটউইক বিমানবন্দরে পৌঁছে ইমিগ্রেশন সংক্রান্ত জটিলতায় পড়ে। তার বিষয় যে ইংরেজ অফিসার দেখভাল করছিলেন, সেই অফিসারই আফ্রিকা থেকে সঙ্গে করে আনা তার সুগন্ধি মেহগুনি কাঠের তৈরি বা· চুরি করেন। এই বা· সে আর উদ্ধার করতে পারে না। রাডারবিহীন জাহাজের মতো সে ইংল্যান্ডে এসে হাজির হয়। তার স্মৃতির ভাণ্ডার এই বা· হারিয়ে সে শিকড়হীন, আত্মপরিচয়হীন এক দিকভ্রান্ত পথিকের মতো ভীনদেশে কোনমতে টিকে থাকার সংগ্রামে লিপ্ত হয়। গুরনাহর ডেজারশন উপন্যাসেও সাংস্কৃতিক সংকরায়নের সঙ্গে আত্মপরিচয়ের সংকটও বিধৃত হয়েছে। বিশ্বায়নের যুগে মাল্টিকালচারালিজম এবং হাইব্রিডাইজেশন একটি সাধারণ ঘটনা। এই ঘটনার একটি রূপকালঙ্কারিক উপস্থাপনা উল্লিখিত উপন্যাসের আখ্যানে উপস্থাপিত হয়েছে। হাসান আলী এবং প্রাচ্যবাদী মার্র্টিন পিয়ার্সের মধ্যে বন্ধুত্বের সূত্র ধরে হাসান আলীর বোনের সঙ্গে পিয়ার্সের প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। কিন্তু এটি প্রচলিত সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে নিষিদ্ধ। এমনই সংকটময় পরিস্থিতিতেই ভিন্ন সংস্কৃতির প্রতিনিধিদের মধ্যকার সম্পর্কের টানাপোড়েন চলতে থাকে। উপন্যাসটি ২০০৬ সালে কমনওয়েল্থ রাইটার্স প্রাইজের সম্ভাব্য বিজয়ীদের ছোট তালিকায় স্থান পায়। ঠিক একই রকম উত্তর-ঔপনিবেশিক আত্মপরিচয় সংকটের বয়ান নির্মিত হয়েছে গুরনাহর দ্য লাস্ট গিফ্ট উপন্যাসে। তেষট্টি বছর বয়স্ক আব্বাস স্ট্রোকে আক্রান্ত হন। তাঁর সেবা-সুশ্রুষা করে তাঁর স্ত্রী মরিয়ম। মরিয়মেরও অনেক স্বপ্ন ছিল। কিন্তু সব স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে সে আব্বাসের সঙ্গে সংসার করছে। এদের দুই সন্তান-- হান্না এবং জামাল। সবাই বসবাস করছে ইংল্যান্ডের ছোট্ট একটি শহরে। অনেক বছর আগে নিজ দেশ জানজিবার ছেড়ে এখানে এসে আব্বাস থিতু হয়েছিল। এখন অসুস্থ জামাল তাঁর অতীত স্মৃতি হাতড়ে অনেক কথা বলতে চান তাঁর স্ত্রী ও সন্তানদের। মানুষ তো বাঁচেই তার স্মৃতিতে আর তাই সে অন্যের মধ্যে এটি ছড়িয়ে দিয়ে নিজেকে বিস্তৃত করতে চায়। জামালও চান তার স্ত্রী এবং সন্তানরা তাঁর স্মৃতির উত্তরাধিকার বহন করুক। এটিই তাঁর শেষ উপহার।

এই যে ডায়াসপোরাদের পরিচয় সংকট-- নানান কারণে ছেড়ে আসা নিজ দেশটা আশ্রয় নেয় স্মৃতিতে ঝাপসা ছায়ার আকারে, আর আশ্রয়দানকারী দেশ ও দেশের সংস্কৃতিও এদের আপন করে নেয় না-- এটি তো উত্তর-ঔপনিবেশিক পরিস্থিতিরই উপজাত। এই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গুরনাহ নিজেও গেছেন এবং যাচ্ছেন। ফলে, এই উপন্যাসসহ তাঁর বাকি আরও নয়টি উপন্যাসের মূল সুর প্রায় একই রকম, অর্থ্যাৎ আত্মপরিচয় অন্বেষণে মরিয়া হয়ে ওঠা ডায়াসপোরা জনগোষ্ঠীর মনস্তাত্ত্বিক সংকট। গুরনাহ তাঁর উপন্যাস গ্রাভেল হার্ট- এও মূল চরিত্র সেলিমের জবানীতে তার শিকড়চ্যুতির অভিজ্ঞতার বয়ান হাজির করেছেন।

বোদ্ধা পাঠক-সমালোচকের মতে, গুরনাহর উপন্যাসের কাহিনীর প্রবাহ ধীর হলেও আখ্যানের গাঁথুনি মজবুত। এ কথা সত্য, গুরনাহর উপন্যাসের বিষয়বস্তু উত্তর-ঔপনিবেশিক অন্যান্য লেখক, যেমন- সালমান রুশদি, ভি. এস. নাইপল প্রমুখের উপন্যাসের বিষয়বস্তুর মতই, অর্থাৎ শিকড়চ্যুত মানুষের মনস্তাত্ত্বিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট। কিন্তু বিষয়বস্তুর উপস্থাপনায় গুরনাহ যে গল্প, চরিত্র ও তাঁদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি নির্মাণ করেছেন, সেগুলো তাঁকে স্বাতন্ত্র্য ও মৌলিকত্ব দিয়েছে। তাঁর উপন্যাস ও ছোটগল্পের আখ্যানে যে মানুষগুলো বিচরণ করে তারা সবাই শিকড়ছিন্ন। ঔপনিবেশিকতা, নয়া-ঔপনিবেশিকতা ও বিশ্বায়নের অভিঘাতে এরা ছিটকে পড়েছে; সমাজের মার্জিনে আশ্রয় পেয়েছে, কিন্তু আত্মপরিচয় নির্মাণের জন্য নিজের সংস্কৃতি, ভাষা ও ঐতিহ্যের সঙ্গে যে ঘনিষ্ঠতা ও সংশ্লিষ্টতার প্রয়োজন, তা এদের নেই। কিন্তু এদের গল্প আছে। একেবারে নিজেদের গল্প। এই গল্পগুলোই এরা গুরনাহর রচনায় বলে।

প্রবন্ধের শুরুর দিকে বলেছি যে, গুরনাহকে আদৌ জানজিবারের লোক বলা যায় কি-না, তা নিয়ে তাঁর জন্মস্থানেই জোর বিতর্ক আছে। এই বিতর্কের অন্যতম কারণ- লেখার মাধ্যম হিসেবে তাঁর ইংরেজি ভাষার ব্যবহার। অনেকেই অভিযোগ করেন, গুরনাহ যদি আফ্রিকা মহাদেশেরই লেখক হবেন, তবে তিনি তাঁর মাতৃভাষা সোয়াহিলিতে কেন লেখেন না, কেন এই ভাষায় কথা বলেন না। চিনুয়া আচেবেও তো ইংরেজি ভাষাকে সাহিত্য রচনার মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। তার মতে, ইংরেজি ভাষা তাঁর অভিজ্ঞতার ভার বইতে পারে বলেই তিনি এই ভাষাকে লেখার মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছেন। ইংরেজি ভাষায় লিখলেই তো ইংরেজি সাহিত্য হয় না। ভাষা নয়, বরং বিষয়বস্তু সাহিত্যের পরিচয় নির্ধারণ করে। আচেবে ইংরেজি ভাষায় যে সাহিত্য রচনা করেছেন, তা আফ্রিকার সাহিত্য। গুরনাহরও লেখার মাধ্যম হিসেবে ইংরেজি ভাষা বেছে নেওয়ার মধ্যে দোষের কিছু নেই। মোদ্দা কথা হলো- তাঁর ভাষা ইংরেজি হলেও তাঁর সাহিত্যের মালমসলা এসেছে নিজ দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, ঐতিহাসিক, মনস্তাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক পরিস্থিতির মধ্য থেকেই। আফ্রিকা তাঁর প্রধান পাঠের বিষয়। তিনি পাঠ করেন এবং লেখেন। তাঁর আফ্রিকা-পাঠের গভীরতার উৎস আফ্রিকার সঙ্গে তাঁর একনিষ্ঠ সম্পর্ক, আফ্রিকার জন্য অকৃত্রিম মমত্ববোধ। এই বিষয়গুলোই তাঁকে আফ্রিকার শিকড়ছিন্ন মানুষের অন্যতম প্রতিনিধিত্বকারী কন্ঠস্বর হিসেবে আন্তর্জাতিক পাঠকমহলে হাজির করেছে।



অনুবাদক পরিচিতি
এলহাম হোসেন
ইংরেজি সাহিত্যে পিএইচডি।
অধ্যাপক।
অনুবাদক। প্রাবন্ধিক।
ঢাকায় থাকায়। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন