মঙ্গলবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২১

মো ইয়ান’এর গল্প: শেন গার্ডেন ও পুনর্মিলনের গল্প



বাংলা তরজমা: বিপ্লব বিশ্বাস

রুটি - কারখানার বাইরে শক্ত লোকাস্ট গাছটার মাথায় চটপটিয়ে বাজ পড়ল, গাছের নিচে বাঁধা কেবলকারের তারটি তীব্র আলোয় ছিটকে গেল। গরমকালের এই প্রথম বাজ পড়ার শব্দে লোকজন আচমকাই ঘর ছেড়ে রাস্তায়। সাইকেল - আরোহীরা নিচু হয়ে হ্যান্ডেলের ওপর ঝুঁকে, ফুটপাত ঘেঁষে যতটা সম্ভব প্যাডেল করে এগোতে লাগল। তেরছাভাবে পড়া বৃষ্টিচাদরের গা বেয়ে ঠান্ডা হাওয়া। লোকজন বৃষ্টি থেকে বাঁচতে হুটোপুটি পালানোয় রাস্তায় হইচই। 
 
এরমধ্যে এক পুরুষসঙ্গী ও তার সঙ্গিনী অন্ধকার রুটি- কারখানার একটি টেবিলে সামনাসামনি বসে, সামনে নরম পানীয়, অস্পষ্ট গ্লাসের মধ্যে ঝকঝকে বরফের টুকরো নড়ছে-চড়ছে। টেবিলের ওপর দুটো বাসি কেক জাতীয় খাবার পড়ে যার চারদিকে একটা মাছি উড়ছে। 
 
লোকটা একপাশে ঘাড় বেঁকিয়ে রাস্তার হইচই বুঝতে চাইল। লোকাস্ট গাছটার ডালপালা, পাতাটাতা হাওয়ার তাণ্ডবে তোলপাড় আর ধুলো উড়িয়ে মাঠমাঠ করছিল। দোকানে কাদার গন্ধ ঢুকে রুটি বানানোর মাখনের বিশেষ সুবাসকে পেড়ে ফেলছিল। দূর থেকে আসা কেবলকার পাত ধরে গড়িয়ে গড়িয়ে চলছিল, সামনে চলা কারও পায়ে পা মেলাবে বলে। কেবলকারের ছাদে ভারী বৃষ্টি পড়ে ধূসর কুয়াশার মেঘ তৈরি করছিল। যাত্রীভর্তি গাড়ি, কারও কারও মাথা জানালার বাইরে ঝোঁকানো, বৃষ্টিফোঁটার কামড় খাবে বলে। একজনের লাল পোশাকের কোনা গাড়ির একটা দরজার পাদানিতে আটকে, ভিজে জবজবে, যেন কোনও পরাস্ত পতাকা। 
 
'হোক বৃষ্টি, যত হবে ততই ভালো ', দাঁত চিপে বোকার মতো বলে ফেলেছে সে। ' এখনই তো বৃষ্টি দরকার, গোটা শহর শুকিয়ে কাঠ, গত ছ'মাস বা তারও বেশি একদমই বৃষ্টি হয়নি। এই খরা আরও বেশিদিন থাকলে গাছপালা সব শুকিয়ে উপড়ে পড়ত।' তার কথা শুনে মনে হচ্ছিল কোনও বৈপ্লবিক সিনেমার ভিলেন। 'তুমি যেখানে থাকো সেখানকার খবর কী? সম্ভবত অনেকদিন বৃষ্টিটৃষ্টি হয়নি। রোজ টিভিতে আবহাওয়ার খবর নিই, নিয়মিত সেখানকার অবস্থা জানতে। তোমাদের ওই ছোট্ট শহর সত্যিই আমাকে মুগ্ধ করেছিল। বড় শহর আমার পছন্দ হয় না, আর মেয়ের অসুবিধা না হলে হয়তো অনেক আগেই সেখানে চলে যেতাম। ছোটো ছোটো শহর খুব শান্ত, মনোরম। বড় বড় শহরের মানুষজনের চাইতে তোমার শহরের লোকেরা দশ বছর বেশি বাঁচলে আমি মোটেও অবাক হব না। 
 
'সঙ্গিনী বলল, ' আমি শেন গার্ডেন দেখতে যাব।' 
 
'শেন গার্ডেন? ' লোকটা তার দিকে ঘুরে তাকাল,' শেন গার্ডেন ঝেজিয়াং প্রদেশে নয়? হ্যাংঝাউ? কিংবা জিনহুয়া। জানো তো, মাঝবয়সে এসে মস্তিষ্কের ক্রিয়াকলাপ আগে বিগড়ে যায়। বছর চার পাঁচ আগে আমার দারুণ স্মৃতিশক্তি ছিল, এখন আর নেই। ' ' আমি যখনই বেইজিং-এ আসি, শেন গার্ডেন দেখতে যেতে চাই ; কিন্তু কখনোই সেখানে পৌঁছুতে পারি না ' অন্ধকার চিরে সঙ্গিনীর চোখ ঝলসালো আর তার কৃশ বিবর্ণ মুখ নতুন শক্তিতে জ্বলে উঠল। এই দৃশ্যে ভিতর ভিতর আহত হয়ে সঙ্গী পুরুষটি মেয়েটির তীক্ষ্ণ দৃষ্টি এড়িয়ে যেতে চোখ ঘুরিয়ে নিল। সে যেন কর্কশভাবে নিজেকেই শোনাল : 'এই বেইজিং -এ ইউয়ানমিং গার্ডেন আছে, আছে গ্রীষ্মকালীন রাজপ্রাসাদ, কিন্তু আশপাশে শেন গার্ডেন আছে বলে কখনোই শুনিনি। ' সঙ্গিনী তার চেয়ারের নিচে রাখা জিনিসপত্রের দিকে হাত বাড়াল, কাগজের শপিং ব্যাগের মধ্যে দুটো ছোটো প্লাসটিকের ব্যাগ রাখল, তারপর সে সব তার বিশাল প্লাসটিক হাতব্যাগের ভিতর ঠেসে পুরল। 'এখনই উঠবে নাকি? তোমার ট্রেন তো রাত আটটায়। ' টেবিলের কেকের দিকে ইশারা করে সে হঠাৎই বলল,' তারচে ওটা খেয়ে নাও, ট্রেনে রাতের খাবার কিছু নাও পেতে পারো। ' প্লাসটিকের হাতব্যাগটি বুকে চেপে সে একরোখা দৃষ্টি ফেলে সঙ্গীর দিকে তাকাল, তারপর হতাশ জেদ নিয়ে বলল, ' আমি শেন গার্ডেন ঘুরতে যাব, আজই।' একটা বৃষ্টিভেজা ঠান্ডা বাতাসের ঝাপটা দরজাজুড়ে খেলে গেল। সঙ্গীটি কেঁপে উঠল, হাতের ডানা ঘষতে লাগল। ' যদ্দুর জানি, বেইজিং -এ শেন গার্ডেন বলে কোনও উদ্যান নেই। আচ্ছা, এবার মনে পড়েছে। ' উত্তেজিত হয়ে বলল সে, ' এখন স্পষ্ট মনে পড়ছে। 
 
শেন গার্ডেন দক্ষিণে নিচে শাওজিং-এর পথে, ঝেজিয়াং প্রদেশে। বছর দশেকেরও আগে একবার সেখানে গিয়েছিলাম। জায়গাটি লু শুনের জন্মস্থান থেকে খুব দূরে নয়। সেখানে দক্ষিণী সঙ বংশের দুই বিচ্ছিন্ন কবি লু ইউ আর ত্যাং ওয়ানের মধ্যেকার বিখ্যাত কথোপকথন খোদিত আছে। সেটা এইরকম : ''গোলাপি ক্রিমমাখা হাত, হলুদ লেবেল সাঁটা মদ / বাসন্তিক রঙে শহর ছেয়ে আছে / রাজপ্রাসাদের দেওয়াল জুড়ে উইলো গাছ। '' যদি সত্যটা জানতে চাও, এটা ভেঙে পড়া বিমর্ষ বাগান, গোটা এলাকা আগাছায় ভরা। এটা আমার সঙ্গী বন্ধুটির কথার মতো, " এটা না দেখলে দুঃখ পাবে, দেখলে আরও বেশি দুঃখী হবে...। " এরমধ্যেই সঙ্গিনী উঠে দাঁড়িয়ে পরনের কাপড়চোপড় ঠিকঠাক করতে লাগল। মাথার চুলে হাত বুলিয়ে গুছিয়ে নিয়ে বলল, যেন নিজেকে শুনিয়েই, ' এই বেলা আমি শেন গার্ডেন দেখতে যাচ্ছি, কী হবে না হবে, ভেবে লাভ নেই। ' তাকে থামাতে সঙ্গী হাত তুলে সতর্কভাবে বলল, ' ঠিকাছে, ধরে নেওয়া যাক, বেইজিং-এ শেন গার্ডেন বলে একটি উদ্যান আছে ; তবুও বেরুনোর আগে বৃষ্টি থামার অপেক্ষা করতেই হবে, তাই না? আর তুমি যদি শাওঝিং-এ আসল শেন গার্ডেন দেখতে যেতে চাও, তাহলে কাল অব্দি অপেক্ষা করতে হবে। সারাদিনে একটা ট্রেনই সেখানে যায় আর আজকেরটা ঘন্টাকয়েক আগে ছেড়ে গেছে। এই আবহাওয়ায় প্লেন ছাড়বে না, তা ছাড়া মনে হয় না শাওঝিং-এ যাওয়ার কোনও সরাসরি ফ্লাইট আছে।' 
 
সঙ্গিনী লোকটার প্রসারিত হাতকে এড়িয়ে হাতব্যাগটি আঁকড়ে বৃষ্টির মধ্যেই সোজা দরজার বাইরে পা রাখল। তাড়াতাড়ি দুই শ্যেনদৃষ্টি ওয়েট্রেসের কাছে খাবারের বিল চুকিয়ে লোকটা সঙ্গিনীর পেছপেছ ছুটল। রুটি-কারখানার দরজায় দাঁড়িয়ে সে বাইরে মাথা বাড়াল; ঘরের ধাতব পাতের ছাঁইচ বেয়ে পড়া বৃষ্টির তড়বড়ানি তাকে অস্থির করে তুলল। জলপ্রপাতের ঢঙে পড়ে চলা বৃষ্টি - চাঁদোয়ার মাঝ দিয়ে চোখ ঠিকরে সে দেখল তার সঙ্গিনী হাতব্যাগটি মাথায় দিয়ে দ্রুতবেগে রাস্তার আড়াআড়ি চলেছে। রাস্তার গর্তে জমা জলের ওপর দিয়ে দ্রুতবেগে চলা ট্যাক্সি ওর স্কার্ট জল ছিটিয়ে ভেজাচ্ছিল যাতে ওর কৃশ দেহের সীমারেখা প্রকট হচ্ছিল। কারখানার দরজার ছাঁইচের যেখান থেকে রাস্তা দেখছিল,সেখানে তার নজরে একটি ধূসর রঙের অ্যাপার্টমেন্ট আটকে গেল যেখানে সে বাস করত এবং এখন মনে হল সেখানকার নতুন বসানো সমুদ্র - নীল ব্যালকনির জানলা বেয়ে বিচিত্র রঙের জলধারা নামছে। এমনকি সে এটাও ভাবল সে হয়তো তৈরি চায়ের সুগন্ধ পাবে আর শুনতে পাবে তার মেয়ের সুমিষ্ট ডাক : ' বাবা, এখানে এস।' 
 
ওদিকে সঙ্গিনী বৃষ্টির মাঝে তার থেকে আড়াআড়ি দাঁড়িয়ে পথচলতি ট্যাক্সি বা অন্য কোনও গাড়ি থামাতে চেষ্টা করছে। তার অস্পষ্ট মুখরেখা কুড়ি বছর আগের এক ঠান্ডা বৃষ্টিদিনের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে যখন তুষারফলকগুলো বাতাসে ঘুরপাক খাচ্ছিল : সে মেয়েটির ডর্মিটরির জানলার বাইরে দাঁড়িয়ে তাকে দেখছিল, ঘরের ভিতর একটা চেয়ারে বসে, পরনে একটা শাদা কলারওয়ালা সোয়েটার আর সুন্দর মুখে হাসি ছড়িয়ে সে মনের আনন্দে অ্যাকর্ডিয়ান বাজাচ্ছিল। তার পরেও তার হাতে অনেকটা সময় ছিল যখন সেই রাতের কথা সে মেয়েটিকে বলতে চেয়েছিল ; তখন প্রচণ্ড শীতে সে প্রায় মরোমরো, কিন্তু সে সব সময় আবেগ প্রকাশের ক্ষেত্রে অত্যন্ত চাপা। অ্যাকর্ডিয়ান বাদনরত যুবতী যেন এই অবিরল বৃষ্টির মাঝে জীবন্ত হয়ে দেখা দিল, সঙ্গীর হৃদয়ের গভীরে পড়ে থাকা আবেগের বাকিটুকু ফের উসকে দিয়ে। সে এবার বৃষ্টির মধ্যেই রাস্তা ধরে দৌড়ে গেল সঙ্গিনীর কাছে। কয়েক মুহূর্তে সেও সঙ্গিনীর মতো ভিজে চুবসে গেল এবং ঠান্ডাও লাগতে লাগল। বরফঠান্ডা বৃষ্টি, সঙ্গে ছোটো ছোটো শিল পড়ছে, তার মনে হল গোটা শরীর ফুঁড়ে বিঁধছে। সঙ্গিনীর হাত চেপে ধরে সে তাকে বাণিজ্যিক বাড়িগুলোর একটায় নিয়ে যেতে চাইছিল, বৃষ্টি থেকে বাঁচতে, কিন্তু সে বাধা দিল আর সঙ্গীও হাল ছেড়ে দিল। তার দেহের পেছনটায় মনে হল তারকাঁটা বিঁধছে যেন ; ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে দেখল বাড়িটার ঝুলন্ত অংশ থেকে কিছু চোখ তাকে লুকিয়ে দেখছে। কয়েকজনকে চেনা লাগল। কিন্তু ইতোমধ্যে সে আটকে গেছে। এখন যদি সঙ্গিনীকে একলা ছেড়ে দেয়, সে বিবেকের দংশন অনুভব করবে। 
 
শেষ অব্দি সে তাকে রাস্তাপাশের একটা টেলিফোনে বুথে নিয়ে যেতে পারল যেখানে অন্তত শরীরের ওপরের অংশ বৃষ্টি থেকে রেহাই পাবে কেননা সেখানে মাথার ওপর এক জোড়া অর্ধবৃত্তাকার ছাউনি আছে। সে বলল, ' ওই সামনের সরু রাস্তায় একটি ছোট্ট ভালো তাইওয়ানি চায়ের স্টল আছে। চলো সেখানে গিয়ে গরম চা খেতে খেতে বৃষ্টি ছাড়ার অপেক্ষা করা যাক। তারপর তোমাকে ট্রেন ধরাতে নিয়ে যাব। সঙ্গিনীর শরীরের ওপরের দিকটা ছাউনির নিচে পড়ায় সে তার মুখের প্রতিক্রিয়া দেখতে পাচ্ছে না। যেটুকু চোখে পড়ছে তা হল তার পায়ের অংশে সেঁটে বসা কালো স্কার্ট যেখান থেকে তার অনাকর্ষণীয় বেরিয়ে আসা মালাইচাকি দেখা যাচ্ছে। সে কোনও কথা বলছে না যেন সঙ্গীর প্রস্তাব তার মনে ধরেনি। রাস্তার এদিক ওদিক দিয়ে সামান্য কিছু গাড়ি চলাচল করছে, সঙ্গিনী তাদের থামানোর চেষ্টা করেই চলেছে তা সে ট্যাক্সি বা যে কোনও গাড়ি। সে চাইছে তার জন্য অন্তত একটা কিছু থামুক। বৃষ্টি কিছুটা কমলে তারা শেষ অব্দি একটা লাল জিয়ালি( xiali)ট্যাক্সি পেল। সঙ্গী দরজা খুলে সঙ্গিনীর ঢোকার সুযোগ করে দিল। তারপর সে নিজে ঢুকে ট্যাক্সির দরজা বন্ধ করল। ' কোথায় যাব?' ক্যাব ড্রাইভার নিরাসক্তভাবে জানতে চাইল। ' শেন গার্ডেন। ' সঙ্গী উত্তর দেবার আগেই সঙ্গিনী বলল। ড্রাইভার বলল,' সেটা কোথায়? ' ' শেন গার্ডেনের কথা ভুলে যাও ', সঙ্গী বোকার মতো বলে ফেলল,' আমাদের ইউয়ানমিং গার্ডেনে নিয়ে চলুন। ' ' না, শেন গার্ডেন। ' সঙ্গিনী গলা নামিয়ে একরোখা ঢঙে বলল।

'শেন গার্ডেন কোথায়? ', ক্যাব ড্রাইভার ফের জানতে চাইল। ' বলিনি, শেন গার্ডেনের কথা ভুলে যান', সঙ্গী আবার বলল,' আমাদের ইউয়ানমিং গার্ডেনে নিয়ে চলুন। ' ' আপনারা মনস্থির করে বলবেন? ', ক্যাব ড্রাইভার অধৈর্য হয়ে জানতে চাইল। ' আমি তো বললাম, আমরা ইউয়ানমিং গার্ডেনে যেতে চাই, সেখানেই চলুন। ' সঙ্গীর গলা চড়ছে। ক্যাব ড্রাইভার পিছন ফিরে তার দিকে তাকাল। হতাশ ড্রাইভারকে সে ঘাড় নেড়ে বুঝিয়ে দিল। তিন তিনবার সঙ্গিনী শেন গার্ডেনে যাওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করল, কিন্তু ড্রাইভার কোনও উত্তর না দিয়ে ফাঁকা রাস্তায় গাড়ি জোর চালিয়ে দিল, দু'দিকেই রাস্তার জমা জল ছিটোতে ছিটোতে চলল। গাড়ির মধ্যে বসে থাকতে থাকতে এক অদ্ভুত ট্র‍্যাজিক গাম্ভীর্য সঙ্গীটিকে আচ্ছন্ন করল। চুপিসারে সঙ্গিনীর দিকে তাকিয়ে সে তার ঠোঁটজুড়ে ফোলানো হাসি দেখতে পেল । সে আরও লক্ষ করল দরজার হাতল ধরা সঙ্গিনীর হাতটা কাঁপছে যেন বেপরোয়া কিছু করবে বলে সে মনে মনে প্ল্যান ভাঁজছে। সে যাতে ট্যাক্সির দরজা খুলে ঝাঁপিয়ে পড়তে না পারে সে জন্য সঙ্গী তার ডান হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে আছে। তার হাত মরা মাছের মতো ঠান্ডা আর স্যাঁতসেঁতে।
 
কিন্তু সে যে তার সঙ্গীর হাত থেকে রেহাই পেতে চাইছে তা মনে হল না যেহেতু সেখানে মোচড়ানোর কোনও চেষ্টা ছিল না। যাই হোক, সঙ্গী তার হাত শক্ত করে ধরে থাকল। ট্যাক্সি ঘুরে একটা সরু রাস্তায় পড়ল যার দু'দিকেই রংচটা জঞ্জালে ভর্তি, মধ্যেমাঝে অবশ্য সবুজ তরমুজের চকচকে খোসা পড়ে থাকতে দেখা যাচ্ছিল। রাস্তার ধারের খাবার দোকানগুলোর সামনেটা মাছি মারার আঠাল রঙিন কাগজের সাজানো ছাউনি বৃষ্টি বাতাসে পতপতিয়ে উড়ছিল। মোটা নোংরা মেয়েরা উপচে পড়া স্তন ঢাকা ব্লাউজ দেখিয়ে সব দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়েছিল, মুখের বিরক্তিকর ভাবভঙ্গির ফাঁক দিয়ে জ্বলন্ত সিগারেট ঝুলছিল। এই দৃশ্য অস্পষ্টভাবে সঙ্গীটিকে পিছিয়ে নিয়ে গেল সেই শহরে যেখানে মেয়েটি থাকত। 'ড্রাইভার,' সে উৎকণ্ঠা নিয়ে জানতে চাইল, ' আমরা এখন কোথায়। ' ড্রাইভার কোনও উত্তর দিল না। ট্যাক্সির ভিতরটা ঝাপসা হয়ে পড়ছিল। ড্রাইভারের সামনের কাচের ওপর ওয়াইপারের সশব্দ ওঠানামা কেমন দুর্বল করে দিচ্ছিল। ' আমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন? ' প্রায় চিৎকার করেই বলল সঙ্গীটি। ড্রাইভার রেগে উত্তর দিল, ' চুপচাপ বসুন না। ইউয়ানমিং গার্ডেন যাবেন বললেন না?' ' তাহলে এই পথে নিয়ে যাচ্ছেন কেন? ' আমাকে কোন রাস্তা দিয়ে যেতে বলেন? ' ' তা আমি কী করে জানব? কিন্তু এটা মনে হয় ভুল রাস্তা। ' এরপর নরম গলায় সে বলল, ' আপনি ড্রাইভার, আপনিই আমার চেয়ে ভালো জানবেন। ' ' আপনার কথা শুনে ভালো লাগল', ড্রাইভার অবজ্ঞার সুরে বলল,' এটা শর্টকাট, এ পথে অন্ততপক্ষে তিন কিলোমিটার রাস্তা কম হবে। ' ' ধন্যবাদ ', সঙ্গী বলল। ' আজকের মতো তাড়াতাড়ি কাজ শেষ করে বাড়ি ফিরে খানিক ঘুমোব ভেবেছিলাম ', ড্রাইভার বলল, ' এই আবহাওয়ায় কোন বুদ্ধিমানই বা বের হয়? আপনাদের ওই অবস্থায় দেখে আমার খারাপই লেগেছিল...। ' সঙ্গীটি ঘনঘন ধন্যবাদ দিতে লাগল। ' আমি সওয়ার ঠকানোর জন্য গাড়ি চালাই না ', ড্রাইভার বলল, ' শুধু আমাকে বাড়তি দশ ইউয়ান দেবেন। আপনাদের কপাল ভালো আমার মতো একজন সৎ ড্রাইভার পেয়েছেন। এখন আপনাদের যদি মনে হয় খুব বেশি ভাড়া দিচ্ছেন, এখনই নেমে যান, কোনও ভাড়া লাগবে না। ' জানলার বাইরে ধোঁয়াটে আকাশের দিকে তাকিয়ে সঙ্গীটি বলল, ' আপনি তো বাড়তি মাত্র দশ ইউয়ান চেয়েছেন, তাই তো? ' 
 
ট্যাক্সি ছোটো রাস্তা ছেড়ে যে পথে বাঁক নিল তা আরও শুনশান, নোংরা আর মাঝে মাঝে গভীর কাদাভরা গর্ত। দু পাশের গাছগুলোতে রাস্তার জল ছিটোতে ছিটোতে গাড়ি পাগলের মতো ছুটছে। ড্রাইভার বিড়বিড়িয়ে শাপশাপান্ত করছে, হয় রাস্তাকে নয় পথচারীদের, কাকে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। সঙ্গীটি বসে বসে জিভ কামড়াচ্ছে, মাথায় সব খারাপ চিন্তা ঘুরছে। এবারে ড্রাইভার নোংরা রাস্তা ছেড়ে জোর চালিয়ে একটি ঝকঝকে পিচের রাস্তায় পড়ল। শেষবারের মতো বিড়বিড় করে ড্রাইভার বাঁই করে অন্য এক কোণ ঘুরে ক্যাঁচ করে একটা খোলা গেটের সামনে দাঁড়াল। জানতে চাইল, ' এটাই তো? এটা পাশের ঢোকার মুখ। পশ্চিমের বাগান খানিকটা নিচের দিকে ', সে আরও বলল, ' আমার মনে হয় এটাই আপনারা দেখতে চাইছিলেন। ' এরপর সঙ্গীটি মিটার দেখে নির্ধারিত ভাড়ার সঙ্গে দশ ইউয়ান যোগ করে তারজালের ফাঁক গলিয়ে ড্রাইভারকে দিল। ' আমি কিন্তু রসিদ দিতে পারব না ', সে বলল। সঙ্গী এ কথা পাত্তা না দিয়ে দরজা খুলে বেরোল। তারপর সঙ্গিনীর জন্য খোলা দরজা ধরে থাকল ; কিন্তু সে উলটো দিকের দরজা দিয়ে নামল। ড্রাইভার গাড়ি ঘুরিয়ে চলে গেল। সে ফের আপন মনে মৃদুস্বরে বিড়বিড়াতে লাগল এবং তা থামলে তার সম্পর্কে খারাপ কোনও ভাবনাকে প্রশ্রয় না দিয়ে সঙ্গীটি তার প্রতি কৃতজ্ঞতাই অনুভব করল। বাইরে তখনও বৃষ্টি ঝরে চলেছে। 
 
রাস্তাধারের গাছের পাতাগুলো চকচক করছে, তাদের আবেদন অবিশ্বাস্য। সঙ্গিনী বৃষ্টির মাঝেই দাঁড়িয়ে দূরে যখন ফাঁকা দৃষ্টি ফেলে তাকিয়েছিল তখন তার মুখ বিবর্ণ। তার হাতের ডানা ধরে সঙ্গী বলল, ' চলো, যাওয়া যাক। এই তোমার শেন গার্ডেন। বশ্যভাবে সে সঙ্গীর সঙ্গে গেট পেরিয়ে গার্ডেনে ঢুকল যে পথে ফেরিওয়ালারা তাদের স্টল থেকে চিৎকার করে খদ্দের ডাকছে : ' ছাতা, ছাতা আছে, সুন্দর টেকসই ছাতা...। ' সঙ্গীটি একটা স্টল থেকে দুটো ছাতা কিনল, একটি লাল অন্যটি কালো। এরপর টিকেট কাউন্টার থেকে এক জোড়া টিকেট কিনল। টিকেট বিক্রেতার মুখটা বিশাল, ময়দার তালের মতো নরম আর পাঁশুটে। পেনসিলে আঁকা তার চোখের ভুরু দুটো মোটা সবুজ পোকার মতো দেখাচ্ছিল। ' এই গার্ডেন কটায় বন্ধ হয়? ' বিক্রেতা মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করল সে। ' আমরা কখনোই বন্ধ করি না ', ময়দার তাল উত্তর দিল। এরপর দুজনে দুটি ছাতা মাথায় দিয়ে ইউয়ানমিং গার্ডেনে ঢুকল, সঙ্গীটি কালো ছাতা মাথায় আগে আগে আর লাল ছাতাটি মাথায় সঙ্গিনী পেছন পেছন। ছাতার প্লাস্টিক কাপড়ের ওপর বৃষ্টির তড়বড় আওয়াজ উঠছিল। তাদের সামনে দিয়ে জোড়ায় জোড়ায় বা দল বেঁধে মানুষ যাচ্ছিল। কেউ কেউ চকচকে ছাতা হাতে উদ্দেশ্যহীনভাবে হেঁটে বেড়াচ্ছিল আর যাদের ছাতা ছিল না তারা বৃষ্টি মাথায় ছোটাছুটি করছিল। ' মনে হচ্ছে আমরাই একমাত্র বেচারা...। ' কথাটা মুখ ফসকে বেরিয়ে যেতেই সে আফশোস করল। তাই দ্রুত কথার গতি পালটে বলল, ' কিন্তু আজকের দিনটি বিশেষ দিন। এভাবে জোর বৃষ্টি না হলে এখানটায় মানুষ গিজগিজ করত। এটাই হয়ে থাকে। ' সে যেন এটাই বলতে চাইল, আজ এই ইউয়ানমিং গার্ডেন শুধুই তোমার আর আমার। কিন্তু সে সময়মতো নিজেকে সামলে নিল। বাঁকা পথ ধরে ওরা ধীরেসুস্থে হেঁটে চলল, রাস্তাটি কাচের মতো ঝকঝকে। দূরে একপাশে পুকুরে ভাসছে অর্ধেক বেড়ে ওঠা পদ্মপাতা, বেড়াললেজা ঘাস আর সেই পুকুরপাড়ে ব্যাঙের দল লাফালাফি করছে। ' বাঃ, দারুণ না?' সঙ্গীটি উত্তেজনায় চেঁচিয়ে উঠল, ' এখন যদি পুকুরে একটা জলহস্তী চরে বেড়াত আর জল ছুঁয়ে একঝাঁক শাদা রাজহাঁস আস্তে আস্তে ভেসে যেত তাহলেই ছবিটি পূর্ণ হত। 'ভালোবেসে সঙ্গী তার সঙ্গিনীর পাংশু মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, আবেগী কণ্ঠে, 'তুমি সব সময় সবচেয়ে ভালোটা বুঝতে পারো। যদি তোমার জন্যেই আসা না হত, আমি এমন সুন্দর ইউয়ানমিং গার্ডেন দেখার সুযোগ কখনোই পেতাম না। ' দীর্ঘশ্বাস ফেলে সঙ্গিনী বলল, ' এটা আমার শেন গার্ডেন নয়। ' ' তুমি ভুল করছ, এটাই তোমার শেন গার্ডেন। ' সঙ্গী মঞ্চাভিনেতার মতো বোধ করছিল। নানা উদ্দেশ্যে ঠাসা স্বরে সে আরও বলল, ' অবশ্য এই শেন গার্ডেন আমারও। এটি আমাদের শেন গার্ডেন। ' ' শেন গার্ডেন তোমার কী করে হয়? ' সঙ্গিনীর দৃষ্টির হঠাৎ তীব্রতায় সে মুখ লুকনোর জায়গা খুঁজে পেল না। সঙ্গিনী মাথা নেড়ে বলল, ' শেন গার্ডেন আমার, শুধুই আমার। একে আমার কাছ থেকে কেড়ে নেবার সাহস কী করে হয় তোমার? ' সঙ্গীর খানিক আগের উত্তেজনা পুড়ে ছাই হয়ে গেল। তার চারপাশের দৃশ্যাবলি ম্যাটমেটে হয়ে পড়ল। ' তুমি ওদের মাড়িয়ে দিচ্ছ। ' সঙ্গিনী ভয়ে চেঁচিয়ে উঠল। সহজাত প্রবৃত্তিগতভাবে সঙ্গী একপাশে লাফ দিল যখন সঙ্গিনী আরও জোর চিৎকার করে উঠল, ' তুমি ওদের পা দিয়ে পিষে দিচ্ছ! ' এবার সে চোখ নামিয়ে দেখল ক্ষুদ্রাকার লাফানো ব্যাঙাচির দল। সোয়াবিন দানার চেয়ে বড় নয়, ছোটো ছোটো পকেট - মাপের উভচর জীব। অসংখ্য এই জীবের দল রাস্তায় থেঁতলে পড়ে আছে, তার পায়ের ছাপের গড়নে। সঙ্গিনী থেবড়ে বসে ছোট্ট মড়া ব্যাঙাচিগুলো আঙুল দিয়ে নাড়তে লাগল, একেবারেই রক্তশূন্য তারা, ধূসর নখ আর নোংরায় ভরা। কাদাভরা নোংরার মতো একরাশ বিরক্তি নিয়ে সঙ্গী হৃদয়ের গভীর থেকে কঁকিয়ে উঠল। 'আহারে ছোট্ট সোনা', সে বিদ্রুপের সুরে বলল, ' তুমি যা মাড়িয়েছ তারচে বেশি আমি মাড়াইনি। নিশ্চয়ই আমার পায়ের পাতা তোমার চেয়ে বড়, কিন্তু তুমি তো বেশিবার পা ফেলেছ ; তাই হিসেবমতো আমি যতগুলো মাড়িয়েছি তুমিও অন্তত তাই মাড়িয়েছ। ' সঙ্গিনী উঠে দাঁড়িয়ে বিড়বিড় করে বলল, ' তা ঠিক, আমি অন্তত তুমি যতগুলো মাড়িয়েছ ততগুলোই মাড়িয়েছি। ' এই বলে সে হাতের উলটো পিঠ দিয়ে চোখ মুছে বলল, ' ওরে ব্যাঙাচির দল, তোরা এত ছোটো হলি কেন? ' এই বলে সে কান্নায় ভেঙে পড়ল। ' অনেক হয়েছে, ছোট্ট সোনা ', বিরক্তি লুকোতে প্রায় ঠাট্টার ছলে সঙ্গী বলল,' তুমি কি জানো, এই পৃথিবীর দুই তৃতীয়াংশ মানুষ বানবন্যা আর আগ্রাসী আগুনের বিরুদ্ধে রোজ লড়ে যাচ্ছে? ' চোখে জল নিয়ে সে সঙ্গীটির দিকে তাকাল। ' এরা এত ছোটো ', সে বলল, ' কিন্তু এদের দেহের গড়নে কোনও অপূর্ণতা নেই। ' ' থাক বা না থাক, ওরা তো ব্যাঙাচিই! ' সে সঙ্গিনীর হাতের ডানা আঁকড়ে সামনের দিকে এগোতে থাকল। কিন্তু সঙ্গিনী তার ছাতাটা মাটিতে ছুঁড়ে ফেলে খালি হাতে সঙ্গীর কবজা থেকে নিজেকে মুক্ত করতে চেষ্টা করে বলল,' এই কয়েকটি ব্যাঙের কারণে এখানে আমরা রাত কাটাতে পারব না। ' সঙ্গী তার চোখ দেখে বুঝল তাকে আর এক পাও হাঁটাতে পারবে না কেননা তার ভয় আবার হাঁটতে গিয়ে যদি আরও ব্যাঙাচি মাড়িয়ে দেয়! তাই সঙ্গীটি তার ছাতাটা তুলে নিয়ে, নিজের জামা খুলে তাকে ঝাঁটার মতো ব্যবহার করে সামনের রাস্তা থেকে বিরক্তিকর ব্যাঙাচিগুলো ঝেঁটিয়ে সরাতে লাগল।
 
ঘটনাচক্রে ছোট্ট সেই জীবগুলো পাগলের মতো ছড়িয়ে গিয়ে তাদের জন্য সরু পথ করে দিল। এক ঝটকায় সঙ্গিনীকে টেনে সে বলল, ' তাড়াতাড়ি এগিয়ে চলো। ' শেষ অব্দি তারা একটা পাথরকুচি ছড়ানো জায়গার সামনে এসে থামল। ততক্ষণে বৃষ্টি মরে এসেছে প্রায় আর আকাশও পরিষ্কার হতে লেগেছে। ছাতাদুটো ভাঁজ করে তারা একটা বড় পাথরের মাথায় চড়ল যা অতীতে পাথরকুটিয়েরা যত্নসহকারে খোদাই করেছিল। সঙ্গীটি তার শার্টের জল চিপে, ঝাড়া মেরে গায়ে চড়াল। সে হাঁচতে লাগল কখনও খানিকটা জোর করেই শুধু সঙ্গিনীর সহানুভূতি পেতে ; কিন্তু তাতে কাজ হল না। নিজেকেই বিদ্রুপ করে মাথা ঝাঁকিয়ে সে পাথরটার মাথায় চাপল, আর পাহাড় চড়িয়েদের ঢঙে, যেমন তারা চূড়ায় পৌঁছে করে, বুক চিতিয়ে শুদ্ধ বাতাস গিলে নিল। তার মেজাজ এখন রোদ- ঝলমলে, নীল আকাশের মতো। এখানে বাতাস এত স্বচ্ছ ও সতেজ যে সে সঙ্গিনীর উদ্দেশে কিছু বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু থেমে গেল। যেন ওই বিশাল গার্ডেনের সর্বত্র তারাই একমাত্র দর্শক এবং এই বিষয়টি তার কাছে প্রায় অলৌকিক মনে হল। আর এখন যেহেতু তার মেজাজ তুঙ্গে সে আবার তার চারদিকে পাথরকুচি বিছানো মাঠের দিকে তাকাল। এই খোদাই করা বিশাল পাথরগুলো এত বিখ্যাত, এত স্মৃতিবিধুর যা এক সময় বহু ক্যামেরায়, বহু কবিতায় ধরা ছিল ; আর এখন এগুলো সাধারণ পাথর মাত্র। তারা চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকল তবু্ও কোনও কারণে মনে হচ্ছিল তাদের মাঝ থেকে হাজার হাজার শব্দের পাহাড় নেমে যাচ্ছে। শেষ অব্দি তারাই নীরব দৈত্যাকার পাথর হয়ে গেল। সেই ধ্বংসস্তুপের সামনে একটা পুকুর ছিল যার ওপর দুশো বছর আগে ঝরনার জল ছিটিয়ে পড়ত এবং যা ফলত জলজ আগাছা আর নলখাগড়ায় মজে গেছে। তার কাছে অনামা জংলা ঘাস পাথরের ভাঁজে ভাঁজে বেড়ে উঠেছে। একটা পাথর থেকে নেমে তারা অন্য এক উঁচু বড় পাথরে চড়ল। তাদের গা বেয়ে ঠান্ডা বাতাস বয়ে গেল, শরীরে লেপটে থাকা পোশাক আস্তে আস্তে শুকিয়ে এল। সেই মৃদু হাওয়াতে সঙ্গিনী মেয়েটির কালো স্কার্টের আঁচল উড়তে লাগল। সঙ্গী বৃষ্টিধোয়া পরিষ্কার পাথরে হাত ঘষাতে সেখান থেকে এক সুগন্ধ উঠে তাকে অভ্যর্থনা জানাল। যেন কোন গভীর বিষন্ন গোপন তার কাছে প্রকট হল। সে বলল, ' এটা শোঁকো, এই পাথরের গন্ধ। ' মেয়েটি একদৃষ্টে একটা পাথুরে স্তম্ভের দিকে তাকিয়ে ছিল যা এক সময় এক বিশাল অট্টালিকা ধরে রেখেছিল ; সে এমন মগ্নভাবে দেখছিল যেন সঙ্গীর কথা সে শুনতেই পায়নি। মনে হচ্ছিল তার দৃষ্টির তীক্ষ্ণতা দিয়ে স্তম্ভটি ফুঁড়ে তার ভিতর কী ছিল তা আবিষ্কার করবে। সেই মুহূর্তে সঙ্গী তার কপালজুড়ে পাকা চুলের গোছা লক্ষ করল। তার হৃদয়ের অন্তস্তল থেকে দীর্ঘশ্বাস উঠে এল। হাত বাড়িয়ে সে মেয়েটির কাঁধের ওপর পড়ে থাকা একটা পাকা চুল তুলে নিল। হৃদয়খোঁড়া আবেগে সে বলল, ' সময় পেরিয়ে যায় আর আমরা বুড়ো হতে হতে একই জায়গায় থেকে যাই। ' মেয়েটি তার মন খুলে সাড়া দিল: ' এই পাথরের গায়ে খোদাই করা কথাসব কিন্তু কখনোই পালটাবে না, পালটাবে কি? ' সঙ্গী বলল, ' পাথর বদলে যায় ', ' সেই ক্লিশে বচন যে সাগর শুকিয়ে যায়, পাথরও যায় ক্ষয়ে কিন্তু হৃদয় কখনও বদলায় না - এ মনোরম কল্পনা ছাড়া আর কিছু নয়। ' ' কিন্তু শেন গার্ডেনে কিছুই কখনও পালটায় না।' 
 
মেয়েটি তখনও পাথরখণ্ডের দিকে একভাবে তাকিয়ে ছিল যেন কথা বলছিল তাদের সঙ্গে যখন তার সঙ্গীটি তুচ্ছ শ্রোতায় পরিণত হল মাত্র। কিন্তু সে মেয়েটির কথার উত্তর দিতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হল। গলা চড়িয়ে বলল, ' এ পৃথিবীতে কোনও কিছুই চিরস্থায়ী নয়। এই বিখ্যাত গার্ডেনের কথাই ধরো না কেন। দুশো বছর আগে যখন কিং( Qing) সম্রাট এটি বানিয়েছিলেন কেউ হয়তো ভাবতেই পারেনি এই স্বল্প সময়ে তা ধ্বংস হয়ে যাবে। সেই অতীতে মার্বল পাথরের বিরাট হলঘরে সম্রাট ও সম্রাজ্ঞীরা যেখানে আনন্দের জোয়ারে ভেসে যেত, কে জানত, তা এমন পাথরখণ্ডে পরিণত হবে যেখানে সাধারণ মানুষের দল শুয়োরের খোঁয়াড় বানিয়ে ফেলবে! ' সে বুঝতে পারছিল তার কথাসব কেমন কাঠকাঠ আর ফাঁপা শোনাচ্ছিল, অনেকটা নির্বোধের মতো। সে জানত মেয়েটি তার একটি কথাও শোনেনি তাই সে আর কথা বাড়াল না। পকেটে থাকা ভেজা সিগারেটের প্যাকেট বের করে সেখান থেকে একটা আধভেজা সিগারেট নিয়ে লাইটার জ্বেলে ধরাল। একজোড়া ছাতার জাতীয় পাখি তাদের মাথার ওপর দিয়ে উড়ে দূরে একটা গাছের মাথায় বসল আর সেখানে কিচিরমিচির জুড়ে দিল। সঙ্গীটির বলতে মন হল, ' দেখো, পাখিরা কতো মুক্ত! ' কিন্তু স্বভাবসিদ্ধ ঢঙে এ কথাটাও ফসকে যাবার আগে সে গিলে নিল। ঠিক তখনই মেয়েটির মুখ ফুঁড়ে এক উল্লসিত আর্তনাদ বেরিয়ে এল এবং আলোর ঝলক তার চোখের অন্ধকার দূর করে ফুটে উঠল। সঙ্গী অবাক চোখে তাকে দেখল তারপর মেয়েটি যে দিকে ইশারা করছিল সে দিকে তাকাল। ধূসর নীল আকাশে তখন এক জাঁকালো রামধনু ফুটে উঠেছে। ছোট্ট বালিকার ঢঙে লাফাতে লাফাতে সে বুক ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠল, ' দেখো দেখো! ' তার এই আনন্দের উচ্ছ্বাস সংক্রামক। রামধনুর সেই সাতরঙা সেতু তার মাথা থেকে বাস্তব হতাশা সব দূর করে দিল আর সেও তৎক্ষনাৎ শিশুসুলভ আনন্দে ডুবে গেল। বেখেয়ালে তারা একে অপরের ঘনিষ্ঠ হল, একান্তভাবে একে অপরের চোখে চোখ রাখল। কোনওরূপ এড়িয়ে যাওয়া বা পাশ কাটিয়ে পা ফেলা নয়, নয় কোনও দ্বিধা বা বিচলন ; প্রথমেই তাদের হাতদুটি স্বাভাবিকভাবেই একত্রিত হল, তারপর একই স্বাভাবিক ভঙ্গিমায় একে অপরের বাহুলগ্ন হল। একে অপরকে চুমু খেল। সঙ্গী যতক্ষণ মেয়েটির ঠোঁটে কাদার হালকা বাস পাচ্ছিল ততক্ষণে চমৎকার রামধনু মিলিয়ে গেছে। তাদের চারদিকে ছড়িয়ে বিপুল ধ্বংসাবশেষ, এক গভীর রক্তবর্ণ আলো পাথরে ঠিকরে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল আর তা থেকে এক রাজকীয় দৃশ্য গড়ে উঠল। জলজ আগাছায় লুকিয়ে থাকা পোকামাকড় চিকচিক, টিকটিক আওয়াজে ডাকতে লাগল আর দূরে কোথা থেকে বনহংসীর কাঁপাকাঁপা ভেঁপুডাক ভেসে আসছিল। সঙ্গীটি অসতর্কভাবেই সঙ্গিনী মেয়েটির হাতঘড়ির দিকে তাকাল। সাতটা বাজে। ' ধুত্তোর!', উদ্বেগে বোকার মতো বলে ফেলে সে, ' তোমার ট্রেন আটটায় তো?'
 
-----------------
মূলগল্প: Shen Garden by Mo Yan, Translated by Howard Goldblatt
 
লেখক পরিচিতি: পিতৃদত্ত নাম গুয়ান মোয়ে হলেও পুরো বিশ্বজুড়ে মো ইয়ান পরিচিত তার লেখক নামেই৷ বিখ্যাত এই চীনা ঔপন্যাসিক এবং ছোটগল্পকারের জন্ম ১৯৫৫ সালে, চীনের শানডঙের গাওমি শহরতলিতে। রেড সোরগাম ক্লান, দ্যা রিপাবলিক অফ ওয়াইন, লাইফ এন্ড ডেথ আর ওয়ারিং মি আউট ইত্যাদি তার উল্লেখযোগ্য রচনা। ২০১২ সালে তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। সুইডিশ অ্যাকাডেমির মতে, লোককথা, ইতিহাস ও বর্তমান কালের মধ্যে মেলবন্ধন ঘটিয়ে এক ‘আবছায়ার বাস্তব জগত’ তৈরি করেছেন মো ইয়ান৷ খ্যাতনামা সাহিত্যিক গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের ‘ম্যাজিক রিয়ালিজম'-এর সঙ্গে মো ইয়ানের ‘হ্যালুসিনেটোরিক রিয়ালিজম'-এর তুলনা করা হয়৷
 


অনুবাদক পরিচিতি:

বিপ্লব বিশ্বাস

গল্পকার। অনুবাদক। প্রাবন্ধিক

কলকাতায় থাকেন।

 

 
 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন