লিডিয়া ডেভিসের গল্প: ইঁদুরটি


অনুবাদ- ফারহানা আনন্দময়ী

গল্পটা একজন কবি লিখছেন একটা ইঁদুরকে নিয়ে। পূর্ণিমা রাতে তুষারের ওপরে একটা ইঁদুরের ছায়া পড়ছে আর সে কীভাবে নিজের ছায়ার ভেতরে লুকাতে চাইছে, কীভাবে হাত বেয়ে উঠছে, কিন্তু কী তার হাতটাকে আঁকড়ে ধরে আছে সেটা জানার আগেই আবার ঝাড়া দিয়ে ফেলতে চাইছে তুষারের মধ্যে; এই হলো গল্প। একটা বিড়ালও আছে তুষারে, ইঁদুরটার পাশেই আছে আর তাকে তাড়া করছে বিড়ালটা। একজন নারী বাথটাবে শুয়ে শুয়ে গল্পটা পড়ছে। তার অর্ধেক চুল শুকনো আর বাকি অর্ধেক চুল ভাসছে বাথটাবের জলে। গল্পটা ও পছন্দ করেছে।

ওই রাতে তার ঘুম আসছিল না। সে রান্নাঘরে গিয়ে কাউন্টারের পাশে একটা টুলে বসে ওই কবিরই আরেকটা গল্প পড়ছে। চারদিকে নির্জনতা, গভীর রাত, তবে একটু পরপরই একটু দূর দিয়ে হুইসেল বাজিয়ে ট্রেন যাচ্ছে। পেঁচার ডাকও শোনা যাচ্ছে হুইসেলের আগে। এটা তার কাছে তেমন আশ্চর্যের কিছু নয়, তিনি জানতেন, এখানে একটা ইঁদুর আছে। চুলার ওখান দিয়ে একটা পাত্রের তলা থেকে সে বেরিয়ে আসে আর বাতাসে গন্ধ শোঁকে। তার পাগুলো ছোট কাঁটার মতো, কানটা হলো অস্বাভাবিক বড় আর একটা চোখ বন্ধ, অন্য চোখ খোলা। চুলার পাশের একটা ট্রেতে কী যেন খুঁটিয়ে খায়! তিনি একটু নড়াচড়া করলেই এক পলকেই ইঁদুরটা ঢুকে যায়, আবার আসে। চুপ করে বসে থাকলেও সে ভেতর-বাহির করতে থাকে চোখের পলকে, ইলাস্টিকের মতো। ভোর চারটা পর্যন্ত নারীটি নির্ঘুম এবং তখনও সে বইটা পড়ছে। আর ওই ইঁদুরের আসা-যাওয়াও দেখছে। একটু পরে সে বইটা বন্ধ করে ঘুমাতে চলে গেল।

সকালবেলায় রান্নাঘরে সেই একই টুলে একটা লোক এসে বসল। তার আদরের বিড়ালটাকে তুলে নিয়ে হাত বুলাল, আবার তার গোলাপি হাতে ওর গলাটা ধরে আঙুল দিয়ে মাথার কাছে ঘষতে থাকল। তখন মেয়েটি এসে দাঁড়ালো পেছনে, লোকটার পিঠে হেলান দিয়ে। তার বুকটা লেপ্টে আছে লোকটার পিঠের সাথে আর দু’হাত দিয়ে লোকটাকে পেছন থেকে জাপটে ধরে আছে সেই নারী। তারা দুজনে মিলে একটু করে পাউরুটির গুড়ো ছড়াচ্ছে যেন ইঁদুরটা গন্ধ পেয়ে বেরিয়ে এলেই বিড়ালটা ওকে ধরতে পারে।

একটুও নড়াচড়া না করে তারা দুজনেই ওরকম জড়িয়ে ধরে চুপ করে বসে আছে দীর্ঘক্ষণ। লোকটা খানিক থেমে থেমে বুড়ো আঙুল দিয়ে বিড়ালটার মাথার খুলিতে বুলিয়ে দিচ্ছে। আর ওই নারী লোকটার নরম চুল ঘেষে নামিয়ে দিচ্ছে ওর গালটা। বিড়ালটাও চুপ করে বসে থেকে শুধু চোখটা এদিকওদিক করছে। ওদিকে মোটর চালু হতেই গ্যাস জ্বলে উঠল জলের হিটারে। নিচে কতগুলো গাড়ি দ্রুত চলে গেল আর রাস্তায় শোনা গেল একটা মানুষের গলার আওয়াজ। ইঁদুরটা কিন্তু বুঝতে পারছে যে তারা সেখানে আছে। তাই সে আর বাইরে বেরোচ্ছে না। ওদিকে বিড়ালটারও ক্ষিদে লেগেছে, এবার সে-ও অধৈর্য হয়ে লোকটার হাতের তালু থেকে বেরিয়ে গেল। এবার সে নিজেই ওই পাউরুটির গুড়ো খাবে।

লোকটার স্ত্রী, ওই নারী যখনই বাসায় ঢুকত, প্রায় সময় সে দেখত কাউন্টারের ওপরে চুলার পাশে বিড়ালটা ঘুমঘুম চোখে শুয়ে আছে। ওর চোখ থাকত চুলার ওদিকটায়, যেখান দিয়ে ইঁদুরটা সাধারণত বের হয়। বিড়ালটাকে এরচেয়ে বেশি আর দেখা যায় না। আধাঘুমন্ত অবস্থায় ও নিজেকে এমনভাবে রাখত যেন নড়াচড়া না করেও সহজে ইঁদুরটা শিকার করা যায়। ইঁদুরটা স্টোভের ভেতরে ঘুমিয়ে থাকে কিংবা কখনো দেখাও যায় বাইরে। তবে বিড়ালটা বাইরেই থাকে। ভেতরে বাচ্চাদের নিয়ে ইঁদুরটা থাকে,বিড়ালেরও বাচ্চা হবে শিগগির, ওর স্তনবৃন্তটা পেটের কাছের লোমের ভেতর দিয়ে স্ফিত হয়ে আছে।

বিড়ালের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে অন্য একটা গল্প মনে পড়ে নারীটির।

এই নারী আর তার স্বামী একটা প্রদেশে অনেক বড় একটা বাড়িতে থাকত। বাড়িটা এত বড়, আর ভেতরে এত ফাঁকা জায়গা যে আসবাবপত্রগুলো মনে হতো ঘরের মধ্যে কোথায় যে ডুবে রয়েছে। কোনো কার্পেট বা পাটি ছিল না সেই ঘরটায় আর পর্দা এত পাতলা যে, জানালার প্যান শীতকালে ঠান্ডা হয়ে থাকত। বাইরের আলো আর ঘরের বৈদ্যুতিক আলোগুলোও ঠান্ডা আর হিম হয়ে থাকত, তাতে দিনে বা রাতে কখনোই ঘরের অন্ধকার ভাব কাটত না।

বাড়িটার দু’পাশে প্রাঙ্গণ পেরিয়ে দীর্ঘ গাছের সারি। একপাশের সারির গাছেরা ঘন হয়ে উপরে পাহাড়ের দিকে চলে গেছে। পাহাড়ের গোড়ায় গাছের নিচে একটা জলাভূমি ছিল, রেলপথের বাঁধা পেয়ে ওখানে জল জমা হতো। পথগুলোও বাঁধে এসে হারিয়ে যেত আর ওখানেই সব চারাগাছেরা ঢিঁবির মতো হয়ে থাকত। অপরপাশের গাছের সারিগুলো ছিল হালকা আর তৃণভূমিতে ঘেরা। হরিণের দল ওই তৃণভূমি পেরিয়ে ওদিকে চলে যেত। হরিণের সেই যাতায়াত দেখতে পেত এই নারী আর তুষার জমলে হরিণেরা রাস্তা থেকে কোথায় ঝাঁপিয়ে পড়ে সেটার চিহ্ণও দেখা যেত। শীতকাল এলে এইসব তৃণভূমি আর বনভূমি থেকে ইঁদুরেরা পালিয়ে আশ্রয় নিত ওদের বাড়িটায়। সারা দেয়াল আর আলমারি ঘিরে দৌড়াদৌড়ি করত ওরা। ইঁদুরের এই আনাগোনায় ওই দম্পতির খুব একটা সমস্যা হতো না, কেবল কালো কালো কিছু ময়লা ফেলে যেত, এটুকু ছাড়া। কিন্তু তারা একসময় খেয়াল করল, দেয়ালের ভেতর থেকে কুটকুট করে তার কাটার আওয়াজ আসছে আর হঠাৎ হঠাৎ আগুনের ফুলকি দেখা যাচ্ছে। তখন তারা সিদ্ধান্ত নিল যে, এদেরকে বাড়ি থেকে তাড়াতে হবে।

এটা ভেবে হার্ডওয়ারের দোকান থেকে পেতলের কিছু ধাতব কয়েল আর মোটা কাঠের উপরে লাল দিয়ে লেখা কয়েকটা ইঁদুরমারা ফাঁদ কিনে আনলো লোকটার স্ত্রী। দোকানদার তাকে শিখিয়ে দিল, কীভাবে এই ফাঁদ ঘরে পাততে হবে এবং সাবধান করে দিল, জিনিসটা কিন্তু ভারী শক্ত। সামান্য অসাবধান হলে আঘাত পেতে পারে। বাড়ি ফিরে সেই নারীই ফাঁদ পাতার কাজটা করল, কারণ এ ধরণের কাজগুলো সে-ই করে সবসময়। খুব সাবধানে কাজটা সে করল, যেন তার আঙুল না ঢুকে যায় ফাঁদে এবং কিচেনের এমন একটা জায়গায় রেখে এল, যেখানে তারা সাধারণত হাঁটে না; যাতে সকালে রান্নাঘরে এলে ভুলে সেখানে পা না চলে যায়!

তারপর তারা দুজনে শুতে চলে এল এবং নারীটা বিছানায় বই হাতে নিয়ে বসল। সে তত রাত পর্যন্তই পড়বে, যতক্ষণ পর্যন্ত না তার স্বামী ঘুম ভেঙে জেগে আলো জ্বালিয়ে রাখার জন্য অভিযোগ করবে। এরকম রাতে আলো জ্বালিয়ে রেখে বই পড়ে বলে, লোকটা প্রায়ই তার স্ত্রীর ওপর রেগে যায়। সেদিন এরপরেও অনেক গভীর রাত পর্যন্ত তার স্ত্রী জেগে ছিল। হঠাৎ শুনতে পেল ওই ফাঁদটায় গুলিবর্ষণের মতো আওয়াজ আসছে। কিন্তু বাইরে অনেক শীত বলে সে আর নিচে নামেনি।

সকালে উঠে সে নিচে গিয়ে রান্নাঘরে ঢুকে দেখলো, ফাঁদটা খোলা পড়ে আছে, একটা রক্তাক্ত ইঁদুর সেখানে আর তার চারপাশে রক্ত ছড়িয়েছে গোলাপি লিনোলিয়ামে ঢাকা মেঝেতে। সে মনে করেছিল ইঁদুরটা মরে গেছে। কিন্তু পা দিয়ে ফাঁদটা ঠেলা দিতেই সে বুঝল, না, ইঁদুরটা মরেনি তখনো। ফাঁদে আটকানো মাথাটা নিয়ে সে ধড়ফড়াচ্ছে লিনোলিয়ামের ওপরে। তার স্বামীও ঠিক সে সময়ে ওখানে এল, কিন্তু তারা দুজনে মিলে ঠিক বুঝতে পারছিল না, এই আধমরা ইঁদুরটাকে নিয়ে কী করবে এখন। কোনো একটা শক্ত হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করে একে মেরা ফেলা দরকার সেটা দুজনেই বুঝছিল, কিন্তু কাজটা করবেটা কে? করলে ওই নারীকেই করতে হবে। কিন্তু করার কোনো আগ্রহ তার হচ্ছিল না। তারপরও উপুড় হয়ে ইঁদুরটাকে আবার মারতে গিয়ে মৃতপ্রায়, বিকৃত প্রাণিটাকে দেখে সে উত্তেজিত হয়ে অসুস্থবোধ করতে লাগল। তারা দুজনেই তখন ওটার দিকে তাকিয়ে আবার পেছন ফিরে হাঁটতে শুরু করলো ঘরের মধ্যে। আকাশটা সেদিন মেঘলা থাকায় ঘরের আলোটাও কেমন সাদাটে আর ঘোলাতে দেখাচ্ছিল। কোনো ছায়া পড়ছিল না এজন্য।

শেষমেশ নারীটি সিদ্ধান্ত নিল,তারা ইঁদুরটাকে বাইরে ছুড়ে ফেলে দিয়ে আসবে, ঠান্ডায় ওটা মরে যাবে তাহলে। যেরকম ভাবা, সেরকমই কাজ, তখুনি একটা ডাস্টপ্যান নিয়ে ওই ফাঁদটার তলায় ঢুকিয়ে দিয়ে ইঁদুরটা সমেত বাইরে বেরিয়ে এল কাঠের দরজা দিয়ে। পোর্চ হয়ে সদর দরজা দিয়ে বেরিয়ে বাইরে যেতে যেতে সে একটু ভয়ই পাচ্ছিল, যে কোনো মুহূর্তে যদি ইঁদুরটা আবার জ্যান্ত হয়ে লাফ দিয়ে ওঠে! কনক্রিটের রাস্তা দিয়ে হেঁটে ড্রাইভওয়ে পেরিয়ে নারীটা বনের কাছে গিয়ে, ডাস্টপ্যান আর ইঁদুরটাকে ছুড়ে মারল বরফের মধ্যে। এরপর সে মনে মনে ভাবল, ইঁদুরটা নিশ্চয়ই তত বেশি একটা ব্যথা পায়নি, যতটা ব্যথা ফাঁদে আটকাপড়া মাথা নিয়ে একজন আধমরা মানুষকে বরফের মধ্যে ছুড়ে মারলে সে পায়। তবে ওই নারী এই বিষয়ে খুব একটা নিশ্চিত হতে পারল না। যাই হোক, সে তখন ভাবল, অন্য কোনো একটা প্রাণি মরা ইঁদুরটাকে আগ্রহ নিয়ে খাবে, মনে করবে বরফে সংরক্ষণ করে রাখা ছিল।

পরে তারা ফাঁদটার কথা আর মনে রাখেনি। কিছুকাল পরে লোকটা বাড়িটা ছেড়ে চলে যায় কিন্তু নারীটি রয়ে যায়। বেশ কিছুকাল পরে একদিন সে একজন স্কুল শিক্ষক আর স্ত্রীর কাছে বাড়িটা ভাড়া দিয়ে শহরে চলে যায়। তারও কিছুদিন পর শহর থেকে আইনজীবী এসে বিক্রি করে দেয় তাদের বাড়িটা। শেষবারের মতো সেই নারী ওই বাড়িতে এসে ঘুরে ঘুরে দেখে যে, ফাঁকা বাড়িটায় সেই আগের মতোই আসবাবগুলো দেয়ালের গায়ে লেগে রয়েছে; শুধু আসবাবগুলো অন্যরকম, শূন্যতার ভারে আগের মতোই প্রাণহীন চেহারায়।

-------

অনুবাদক পরিচিতি: ফারহানা আনন্দময়ী। জন্ম ২১ অক্টোবর, জন্মশহর খুলনা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাজীবন সম্পন্ন করে বর্তমানে চট্টগ্রামের বাসিন্দা। একটি প্রতিষ্ঠানে খণ্ডকালীন কাজ করেন। কবিতায় হাতেখড়ি এবং লেখালেখির জগতে প্রবেশ। ইতোমধ্যে প্রকাশ পেয়েছে চারটি কাব্যগ্রন্থ- ‘মেঘ অরণ্য’, ‘ইচ্ছেসবুজ’, ‘দীর্ঘায়ু চাইনি, আনন্দায়ু দাও’ এবং ‘কবিতাস্নানে যাই’। মুক্তগদ্য এবং অনুবাদ গল্প ছাপা হয়েছে বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকার সাময়িকীতে এবং ওয়েব পত্রিকায়। পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষাভাষী লেখকদের গল্পের অনুবাদ নিয়ে সম্প্রতি ‘একজোড়া সপ্তর্ষি’ শিরোনামে একটি অনূদিত গল্পসংকলন প্রকাশিত হয়েছে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

1 মন্তব্যসমূহ