কথাসাহিত্যিক নাসিমা আনিসের দীর্ঘ সাক্ষাৎকার


কথাসাহিত্যিক নাসিমা আনিসের জন্ম বাংলাদেশের চাঁদপুর জেলায়, ১৬ নভেম্বর ১৯৬২ সালে। বাবা মোঃ নূরুল ইসলাম, মা বেগম আশরাফুননেসা। তিনি আজিমপুর গার্লস স্কুল থেকে এসএসসি, ইডেন কলেজ থেকে এইচএসসি, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অনার্স ও মার্স্টাস যথাক্রমে চট্টগ্রাম কলেজ ও চট্টগাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাঁর শিক্ষাপর্ব শেষ করেন।

দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত রয়েছেন লেখালিখিতে। ছোটগল্প দিয়েই তাঁর সাহিত্যে প্রবেশ, তবে প্রকাশিত প্রথম গ্রন্থ ছিল উপন্যাস। স্বীকৃতি স্বরূপ পেয়েছেন অনেক সম্মাননা ও পুরস্কার। তৃতীয় লিঙ্গ নিয়ে লেখা প্রথম উপন্যাস ‘মোহিনীর থান’ ২০০৬ সালে দৈনিক আজকের কাগজ (বর্তমানে জেমকন) তরুণ কথাসাহিত্য পুরস্কার, উপন্যাস ‘চন্দ্রভানুর পিনিস’ দৈনিক সমকাল নবীন কথাসাহিত্য পুরস্কার ২০০৯, কথাসাহিত্যের জন্য চাঁদপুর সাহিত্য মঞ্চ আয়োজিত মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন সাহিত্য পুরস্কার ২০২০, কথাসাহিত্যের জন্য রণজিৎ বিশ্বাস-অভিষেক স্মৃতি সম্মাননা ২০২১ এবং বাংলা একাডেমি আয়োজিত আবু রুশদ সাহিত্য পুরস্কার ২০২৪ ও কথাসাহিত্যে বাংলা একাডেমি পুরস্কার ২০২৫।

পাঁচটি গল্পগ্রন্থ, ছয়টি উপন্যাস ও ছয়টি শিশুতোষ, নির্বাচিত গল্প, মিলিয়ে নাসিমা আনিসের গ্রন্থসংখ্যা ১৮। ত্রিশ বছরের শিক্ষকতা শেষে বর্তমানে তিনি পড়ালেখা আর গাছগাছালি নিয়ে ব্যস্ত জীবন কাটাচ্ছেন। গল্পপাঠের পক্ষ থেকে লিখিতভাবে কিছু প্রশ্ন পাঠানো হয়। তিনি সেগুলোর উত্তর লিখে পাঠান। তাঁর লেখালিখির সঙ্গে যাঁদের তেমন পরিচয় নেই, গল্পপাঠের এই আয়োজনে তাঁরা কিছুটা হলেও তাঁর সৃষ্টিকর্ম সম্পর্কে জানার সুযোগ পাবেন। সাক্ষাৎকারের পাশাপাশি পাঠকের জন্য রইল নাসিমা আনিসের তিনটি ছোটোগল্প। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন নাহার তৃণা


নাহার তৃণা : 
সাহিত্য জগতের একজন হওয়ার চিন্তা কী বরাবরই ছিল, নাকি হঠাৎই লেখালিখির ভুবনে প্রবেশ করেন?

নাসিমা আনিস : 
ছোটবেলা অল্পস্বল্প লেখালেখি করলেও বড়ো হয়ে লেখালেখিতে পুরোপুরি জড়িয়ে যাওয়ার কোনো আশা কি পরিকল্পনা ছিল না। বড়ো হয়ে, মূলত সাহিত্য পড়তে পড়তে এবং শ্রেণিকক্ষে পড়াতে পড়াতে লেখার আগ্রহ হয়। খুব প্রিয় বিষয় ছোটগল্প, ছোটগল্পের প্রেমেই বলা চলে লেখালেখিতে জড়ানো। তবে এমনও না যে লিখতে ইচ্ছে করল বলে তখনই শুরু করে অব্যাহত রাখতে পেরেছিলাম। ছাব্বিশ/সাতাশে বছর বয়সে শুরু করি কিন্তু সন্তানরা ছোট থাকায় অচিরেই তা বন্ধ করি। তারপর চল্লিশে গিয়ে দ্বিতীয় শুরু, এটা আমার জন্য খারাপ হয়নি। চল্লিশে গিয়ে হয়ত কিছুটা বুদ্ধি হয়েছে, কিছুটা স্বাধীনতা নিজের করে নেয়ার সাহস পেয়েছিলাম। স্বাধীন সত্তা ছাড়া লেখক হওয়া যায় না।

নাহার তৃণা : 
আপনার প্রথম লেখাটি নিয়ে কিছু বলুন। লেখাজোখার পেছনে কোনো লেখকের প্রভাব ছিল কি?

নাসিমা আনিস : 
প্রথম লেখার স্পষ্ট স্মৃতি মনে নেই, খুব সম্ভব বাহাত্তর সালে ফোরে পড়তে পঁচিশে মার্চের স্মৃতি লিখেছিলাম, এটা অবসম্ভাবী ছিল, কেননা পঁচিশে মার্চ থেকে সাতাশ মার্চ এই তিন দিন আমাদের ট্রমা। তারপর নয় মাস, সব মিলিয়ে ভয়াবহ স্মৃতি! আমার মা আমাদের সাথে সে সব স্মৃতিচারণ করতে পছন্দ করতেন, ফলে সেগুলো চিরকাল টাটকা থাকার সুযোগ পেয়েছে। সচেতনভাবে শহিদ দিবসে পাড়ার দেয়াল পত্রিকার জন্য লেখা প্রবন্ধ নবম শ্রেণিতে পড়তে, বাসায় প্রচুর রচনা বই ছিল, সে সব থেকে লেখা খুব কঠিন কিছু ছিল না। আর প্রথম বর্ষ অনার্সে একজন বিএড শিক্ষার্থীকে গল্প লিখে দিয়েছিলাম, তিনি বলেছিলেন গল্প ভালো হয়েছে। আরো লেখার অনুরোধ ছিল কিন্তু লিখিনি। ছাব্বিশ বছর বয়সে শুরু করেছিলাম, মানে সত্যি সত্যি লিখব বলে মনস্থির করি, দুই একটা গল্প লিখি। কিন্তু দুটো সন্তান ছোট থাকায় চাকরি সামলে আর পারিনি। বিরত থাকার আরো একটা বড়ো কারণ আমার স্বামী কথাসাহিত্যিক হাবিব আনিসুর রহমান তখন জিবিএস রোগে আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘদিন শয্যাশায়ী ছিলেন।

চল্লিশে গিয়ে আবার চেষ্টা, প্রথম যে লেখাটি লিখেছিলাম সেটা প্রকাশিত হয়েছিল ২০০২ এ লিটল ম্যাগাজিন অরুন্ধতিতে, সম্পাদক সালাম সালেহউদ্দিন, গল্পের নাম ত্রাতা। আমার নির্বাচিত গল্পে সেটা স্থান পেয়েছে। আমার তুলনায় সেটি পরিণত লেখা বলা চলে।

শুরুর দিকে, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, বিমল কর, স্বপ্নময় চক্রবর্তী, আন্তম চেখভ, গার্সিয়া মার্কেজ, নাদিন গার্ডিমার, টমাস মান এদের লেখা খুব মনোযোগ দিয়ে পড়েছি। বিভূতি, মানিক, তারাশঙ্কর এঁদেরও খুব পড়েছি। এঁদের পড়েছি রবীন্দ্রনাথ যেমন পড়ি, লেখা শেখার জন্য নয়। প্রভাবের কথা আমি বলতে পারব না। ২০০৬ এ মার্কেজের শত বছরের নিঃসঙ্গতা পড়ে অভিভূত হয়েছিলাম, তার বছর দুই পর চন্দ্রভানুর পিনিস লিখেছিলাম, প্রভাব থাকতে পারে। কিংবা বলতে পারি আমাদের সমতট জলাভূমিকে আবিষ্কার করতে সাহায্য করেছে ঐ বই।

নাহার তৃণা : 
জানা মতে আপনি চল্লিশ বছর বয়স থেকে সিরিয়াস লেখালিখি শুরু করেন। বর্তমানে আপনার বয়স তেষট্টি। সন্দেহ নেই এই দীর্ঘ পদযাত্রায় মানুষ হিসেবে আপনি যথেষ্ট পরিণত হয়েছেন। লেখক হিসেবে তার প্রভাব আপনার লেখালিখিতে যথেষ্ট ছাপ ফেলেছে বলে মনে করেন?

নাসিমা আনিস : 
সেটা বলা খুব দুরূহ, এমন হতে পারে যে প্রথম দিকের লেখাই শক্তিশালী, মস্তিষ্কের শক্তিটা ঠিকঠাক কাজ করেছে তখন। সাহিত্য জিনিসটা খুব গোলমেলে, কখন ভালো লেখাটা হবে বলা মুষ্কিল, অভিজ্ঞতার জন্য বসে থাকে না।

নাহার তৃণা :
‘পিদিমের হবিষ্যি’ আপনার একটি উল্লেখযোগ্য গল্প। আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে নিয়ে এরকম একটি গল্পের বীজ খুঁজে পাওয়ার উৎস সম্পর্কে জানার কৌতূহল হচ্ছে। এ গল্পে ভাষার চলন ভিন্ন, এটি আপনি কীভাবে রপ্ত করলেন?

নাসিমা আনিস : 
আমার কর্মস্থল তখন ভেড়ামারা শহরে। থাকি কুষ্টিয়ায়। রাস্তা আধ ঘণ্টার, চোদ্দ মাইল। ইতিমধ্যে ভেড়ামারা শহরে আমি আট বছর এক নাগাড়ে বাস করে এসেছি, শহরটা আমার চেনা এবং আপন। শহরের চৈতন্য মোড় একটা গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। এই মোড় দিয়ে বাঁয়ে মধ্যবাজার। এখানে ঢুকলে বোঝা যায় শহরটা একদা এখানেই ছিল জমজমাট, পরে পুবে বেড়ে উঠেছে রেল স্টেশন বাস স্ট্যান্ড মাঝখানে রেখে। যা হোক, এই মধ্যবাজারে নানা কাজে যাই, মুদি, সোনার দোকান, বর্ষিয়ান হোমিওপ্যাথ ডাক্তার আলফাজ। তো কলেজ শেষ করে আমি গেছি সোনার দোকানে, দোকান খোলেনি। আমি ঘুরতে ঘুরতে একটা এলাকায় গিয়ে পড়ি, সেটাই বুনোপাড়া। আমি যে খুব বেশি হেঁটেছি মোটেই তা নয়। ঐ এলাকার খুব কাছেই কিন্তু অভিজাত কিছু বড়ো বড়ো বাড়ি। এই বুনো পাড়ায় ঢুকে আমি আঁটকে যাই। আমি যে খুবই অনাহুত একজন মানুষ ওদের কাছে, তা মনে হলো না, আবার ওদের যে কেউ নই, সেটাও আমি বুঝতে পারি। অবাক করার যেটা আমি একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিলাম আধ ঘণ্টা কিংবা এক ঘণ্টা কিংবা তারও চেয়ে বেশি সময় তারা একজন একজন করে কাছ দিয়ে চলে যায় আর কিছু বলে যায় স্বগতোক্তির মতো। যেন একজন বাইরের মানুষ এসেছে তাকে কিছু সমস্যার কথা বলা তাদের খুব উচিত। সময়টা সকাল এগারটা/বারটা হবে, শীতকাল। আবহাওয়াটা কেমন ছায়া ছায়া। ২০০৬ এর জানুয়ারি মাস। আমি তখন জানতাম এই শহরে আমি খুব বেশি হলে মাস তিনেক আসব তারপর আর হয়ত কোনোদিনই আসব না। মানে এপ্রিলে আমার গাট্টি গোল করে ঢাকায় চলে যেতে হবে চাকরি ফেলে। তো অন্তিমকালে মানুষ যেমন সবটা চেয়ে চেয়ে দেখে নিতে চায় তেমনই আমার মনের অবস্থা। ওরা যে ভাষায় কথা বলে সেটা আমি খুব যে রপ্ত করতে পেরেছি তাও না। বুনোদের ভাষাভঙ্গির সঙ্গে ধাঙরদের ভাষার খানেক মিল আছে মনে হয়। ধাঙর ছেলেমেয়েরা উপজেলায় খেলতে আসত, কখনও শুকর চড়াতে সেটাও খানেক মনে কানে গেঁথে ছিল। বাংলার সাথে মিশে এক ধরনের মিশ্র ভাষা। ভেড়ামারা শহরে এদের চলাচল অবারিত, যত্রতত্র ওদের দেখা মেলে। দল বেঁধে বুনো মহিলারা খড়ি সংগ্রহ করে। বিশাল গাছের মরা ডাল ভাঙে লম্বা বাঁশের মাথায় বাঁধা আঁকশি দিয়ে। গাছের গোড়ায় বসে বসে সে সব আঁটি বাঁধে প্রচুর সময় নিয়ে। চূড়া খোঁপার মহিলাদের দেহে এক দুর্বিনীত ভাষা, চেয়ে দেখার মতো। আঁচলের গিঁট খুলে কিছু মুখে দিয়ে চিবায়, আয়েশি একটা ভাব। মনে হবে পৃথিবী খুব আরামের একটা জায়গা, এমনকি এই গাছতলাটাও। কলেজের পুকুর পাড়ে বিশাল কৃষ্ণচূড়ার ঢেউ খেলা মোটা গুড়িতে বসে দীর্ঘ সময় ধরে মরা ডালের আঁটি বাঁধার দৃশ্য এত জীবন্ত এবং প্রাচীন! মনে হবে সামনে পিছনে কোনো কিছু নাই!

বুনোপাড়ায় আমি একদিনই গেছি, বাসে বসে একটা ভালো নোট রেখেছিলাম। গল্পটা লিখেছি ঢাকায় এসে বেশ কয়েক মাস পর, পুরো আবেগ জল হয়ে যাবার পর।

নাহার তৃণা : 
গল্পে আপনি সরাসরি কোনো ধরনের উপদেশ বা দার্শনিক অপ্তবাক্য আওড়াতে অভ্যস্ত নন, এই শৈলীটি কি খুব সচেতনভাবেই আপনি ব্যবহার করে থাকেন না কি স্বতঃস্ফূর্তভাবেই সেটি উপস্থিত হয়?

নাসিমা আনিস : 
কথাসাহিত্যে বিশেষত গল্প কি উপন্যাসে খুব কম লেখকই এ কাজটা করে থাকেন এ কালে, মানে উপদেশ কি দার্শনিক বয়ান। তাই বলে লেখকের যে মোটিভ থাকে সেটা কি তিনি বলেন না! বলেন। সেটা পাঠককের চোখকে, মনোযোগকে ফাঁকি দিয়ে মস্তিষ্কে ঢুকাতে পারাই তো লেখকের বাহাদুরি। সচেতন থাকা লাগে না এটা স্বাভাবিকভাবেই হয়।

নাহার তৃণা : 
ভাষার ব্যাপারে আপনি কতটা সচেতন থাকার চেষ্টা করেন? ভাষা কি আপনার কাছে কেবল মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হয়?

নাসিমা আনিস :
সচেতন থাকি কেননা ভাষার একটা সৌন্দর্য আছে যা আমাদের প্রাত্যহিকতায় প্রায় অনুপস্থিত। আমাদের প্রাত্যহিকতায় জীর্ণ হয়ে আসা ভাষাকে মুক্তি দেয় সাহিত্য। স্বল্প প্রচল শব্দ লাগসই ব্যবহার করে যদি বাক্যটাকে মেলে ধরা যায় সেটা দারুণ না! কিংবা ক্রিয়া পদ এদিক সেদিক করে। বিষয়কে ওজস্বিতা দেয়াও ভাষার একটা কাজ, দিতে পারলে পাঠও সুখকর হয় বৈকি। ফলে ভাষা শুধু ভাব আদান-প্রদানের মাধ্যম না হয়ে আরো বেশি কিছু হয়ে উঠতে পারে।

নাহার তৃণা :
কাব্যগুণযুক্ত গদ্যকে অনেকেই নেতিবাচক মাধ্যম হিসেবে গণ্য করে থাকেন এ প্রসঙ্গে আপনার মতামত কি?

নাসিমা আনিস : 
কাব্যগুণসম্পন্ন গদ্যকে আমি নেতিবাচক বলি না কারণ তারও তো একটা হৃদয়গ্রাহ্য মূল্য আছে! অনেকে পছন্দও করে। আমি বলি, যে পথ অবলম্বন করি না কেন সেটা যেন আরোপিত কি কৃত্রিম না লাগে, পড়তে গিয়ে যেন আনন্দ জাগে, কাব্যগুণ অদেখাকে দেখা যায় নতুন মাধুরীতে, অন্তত নতুন অভিনব উপায়ে। রবীন্দ্রনাথের শেষের কবিতা পড়তে আমার ভালো লাগে। এমন রোমান্টিক একটা প্রেমের গল্প, রবীন্দ্রনাথের মনে হয়েছে তিনি একটু কাব্যিক ভাষায় উপস্থাপন করবেন। নরনারীর মনস্তত্ত্ব কত সুক্ষ্মভাবে ফুটে উঠেছে এই ভাষায়! কঙ্কাল কি ক্ষুধিত পাষাণ কাব্যিক হয়ে আরো হৃদয়গ্রাহী হয়েছে। বাংলায় বুদ্ধদেব বসু, আবদুল মান্নান সৈয়দ কাব্যিক ভাষা ব্যবহার করেছেন, আমরা পছন্দও করেছি। বিশ্বসাহিত্যে কাব্যিক ভাষায় গদ্য লেখার প্রচুর নজির আছে। টনি মরিসনের লেখায় hauntingly beautiful ধরনের কাব্যিক ভাষার বহু উদাহরণ পাওয়া যায়। হালে নোবেল পাওয়া হান কাং এর ভাষাও কাব্যিক, অন্যান্য কারণের সাথে তাঁর কাব্যিক ভাষাও নোবেল কমিটির হৃদয় জয় করতে সাহায্য করেছে।


নাহার তৃণা :
সাহিত্যের অনেক বোদ্ধা মনে করেন বিশ্ব সাহিত্য পাঠ না করলে সাহিত্যচর্চায় এক ধরনের শূন্যতা তৈরির সম্ভাবনা থাকে। এ প্রসঙ্গে আপনার মতামত কি?

নাসিমা আনিস :
বিশ্বকে যেমন জানা জরুরি তেমনি বিশ্বসাহিত্য জানাও জরুরি। পৃথিবীতে এত এত জাতিগোষ্ঠি, তাদের সংস্কৃতিকে জানতে হলে তাদের ইতিহাস ও সাহিত্য দুই জানা দরকার। ইতিহাস হয়ত ক্ষমতাশীলদের জীবনটা জানায়, প্রান্তিক মানুষ সেখানে খুব একটা স্থান পায় না। সাহিত্য সেই কাজটা করে দেয়। আর লোকসাহিত্য কি রুপকথা যদি পড়ি তো সেখানে আরো মজা, দেখা যায় যে কোন সুদূর এক দেশের লোকসাহিত্যের সাথে আমাদের লোকসাহিত্যের কি দারুণ মিল, সাহিত্য অতীত ও বর্তমানের মেলবন্ধনের কাজটাও করে কিন্তু। ল্যাটিন আমেরিকার সাহিত্যের সাথে আমাদের সাহিত্যের মিল রয়েছে এই কারণে যে ইতিহাসেও কি সাংঘাতিক মিল, ঔপনিবেশিক অভিজ্ঞতা, শোষণ, নির্যাতন, রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা একই। বিপ্লব, প্রতিবাদ, ভূতপ্রেত, লোকগাথা, জাদুবাস্তবতা, ধর্মীয় ও সামাজিক সংস্কার, না পড়লে জানব কীভাবে!

নাহার তৃণা :
আপনার গল্প-উপন্যাসে ‘সময়’কে একটা গুরত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হিসেবে উপস্থিত হতে দেখা যায়। সাহিত্যের শেষ কথা মানুষ অন্বেষণ। সেই অন্বেষণে আপনার পছন্দের অনুষঙ্গটি কি কখনও প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে?

নাসিমা আনিস : 
হ্যাঁ আমি যখন লিখি, আমার মাথায় পোকার মতো একটা বিষয় ঘুরতে থাকে, মানে বলার জন্য অস্থির হয়ে ওঠে আঙুল সময় আর স্থান। মানে আমি চাই পাঠক দ্রুত আমার লেখায় ঢুকে পড়ুক।

মানুষ অন্বেষণ, ঠিকই বলেছেন। এই জিনিস অন্বেষণ এক দুই জীবনের কাজ না, বহু জনমের প্রয়োজন এই ভয়াবহ বিপুল সম্ভবনাময় প্রাণিকে অন্বেষণের জন্য। পছন্দের বিষয় মানুষ, ফলে অন্য কোনো অনুসঙ্গ বিরোধ কি ব্যাঘাত করে না। বরং বলা চলে এ এক অশেষ অন্বেষণ, আর অশেষ বলেই এই মিস্ট্রির পিছনে ঘুরতে এত্ত মজা!

নাহার তৃণা :
বলা হয়ে থাকে মানুষ মাত্রই রাজনৈতিক সত্তা (Political Entity/Subject), সাহিত্যের জগৎ সেই বৃত্তের বাইরের নয়। এরকম বাতাবরণে থাকা একজন মানুষ, যিনি সাহিত্যচর্চায় জড়িত, তার পক্ষে কতটা নিরপেক্ষ থাকা সম্ভব বলে মনে করেন?

নাসিমা আনিস :
নিরপেক্ষ আবার কীভাবে থাকবেন! কেনই বা থাকবেন! সচেতন সত্তা মাত্রই তার মত ও পথ পরিষ্কার থাকবে। তাঁর পক্ষে আত্মগোপন রাখা খুব দুরুহ কাজ।

নাহার তৃণা : 
একটি সমাজ বা রাষ্ট্রের কাঁধে যখন অরাজক পরিস্থিতি ভর করে, সেই সময় জাতির বিবেক হিসেবে লেখক-সাহিত্যিকের দায়িত্ব কেমন হওয়া দরকার মনে করেন? নিরপেক্ষতার নামে নীরব দর্শকের ভূমিকায় থাকা লেখক-সাহিত্যিকের কর্তব্য এমন মনোভাব সমর্থন করেন কি?

নাসিমা আনিস :
একজন লেখক ন্যায়ের, মানবিকতার, শোষিতের পক্ষে থাকবেন। রাষ্ট্র বা সমাজ আক্রান্ত হলে তিনি আক্রান্ত বোধ করবেন। আক্রান্ত হলে তিনি যেভাবে দায়িত্ব পালন কর্তব্য মনে করবেন সেভাবেই করবেন। সকলের প্রতিবাদের ভাষা, দায়িত্বের ধরণ এক নাও হতে পারে। পেশাদার রাজনীতিকের ( রাজনীতি পেশা কিনা!) মতো তো একজন লেখকের প্রতিবাদের জায়গা রাজপথ কি পল্টন নয় বলেই জানি। তবে প্রয়োজনে রাজপথে কি পল্টনে উপস্থিত হতে অসুবিধা নাই। অশিক্ষিতের মধ্যে নিকৃষ্ট জীব নিশ্চয়ই লেখক কি কবিকুল নন! ২০১৩ সালে বহু লেখক শাহবাগে উপস্থিত হয়েছেন যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসির দাবীতে। আবার শাহবাগে ফাঁসির দাবী নিয়ে রাতদিন অবস্থান করাদের নিয়ে যে আখ্যান তৈরি করে কোনো লেখক, সেটাও তার রাজনৈতিক পরিচয়। লেখক আসলে নিজেকে খুব আড়াল রাখতে পারেন না। লেখকের কাজই তো আত্মপ্রকাশের, ফলে তিনি প্রকাশিত হবেনই!

নাহার তৃণা : 
বর্তমান সাহিত্য কি রাষ্ট্র ও ক্ষমতার প্রশ্নকে দৃশ্যমানভাবে তুলে ধরতে সক্ষম, আপনার মূল্যায়ন কী?

নাসিমা আনিস :
অবশ্যই সক্ষম, সত্যিকার একজন লেখক একজন উঁচুমানের রাজনীতিক, ক্ষমতার বাইরে থাকায় তাঁর কিছু হারাবার ভয়ও নেই, ফলে এই সুযোগ তিনি ইচ্ছে করলেই নিতে পারেন। ভুল বয়ানের ইতিহাসকে তিনি চ্যালেঞ্জ করতে পারেন, স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে কথা বলতে পারেন, মানবিকতার স্খলনে সচ্চার হতে পারেন, প্রান্তিক, ঊন মানুষ তার উপজীব্য হতে পারে, তাদের হয়ে কথা বলা তার কাজ। সমস্যা হলো, সরিষায় ভূত থাকলে তিনি কিছুই করে উঠতে পারবেন না।

নাহার তৃণা : 
সাহিত্য সমালোচনাকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করেন? বর্তমান সময়ে যখন সত্যিকারের নির্মোহ সমালোচনার অভাব দেখা যাচ্ছে, তখন আপনি কি মনে করেন যে গঠনমূলক সমালোচনা পাঠকের সাহিত্য-অনুধাবনকে গভীরতর করার একটি কার্যকর পদ্ধতি হতে পারে?

নাসিমা আনিস : 
সমালোচনাও যে উন্নত সাহিত্য, মননশীল সাহিত্য তা আমরা আমসাহিত্যিকরা জানিই না। খুব ভালো সমালোচনা, চুলচেরা বিশ্লেষণ একমাত্র পাঠ্যবইয়ের যে গাইড, তাতে পাবেন। পয়সার বিনিময়ে। তাহলে ব্যাপারটা দাঁড়ালো যা কিছু পণ্যের বাইরে রাখবেন তা-ই অপুষ্ট ও অবিকশিত হয়েই থাকবে! সমালোচক সাহিত্যিক মর্যাদা যেমন পাননি এ দেশে তেমনি সমালোচনাও বেশিরভাগ সময় মানসম্পন্ন হয় না। লেখক সম্পাদক অনুবাদক আহমাদ মাযহারের ‘বইয়ের জগৎ’ নামে একটা পুস্তক সমালোচনার পত্রিকা বের হতো এক যুগ আগে, খুবই মানসম্পন্ন। বেশ কয়েকটা সংখ্যা বের হওয়ার পর সেটা বন্ধ হয়ে যায়। দৈনিক পত্রিকা বা অন্যান্য ম্যাগাজিনে সমালোচনার নামে যা বের হয় তা খুবই দায়সারা, শব্দসংখ্যার উপর কর্তৃত্ব থাকে বলেও হয়ত। ফলে পুরো ব্যাপারটা এ্যমেচার লেবেলেই রয়ে গেছে, প্রফেশনাল হলে একটা জায়গায় পৌঁছাত, প্রকৃত লেখক পাঠক প্রকাশক সকলেই উপকৃত হতো। উন্নত বিশ্বে গ্রন্থ প্রকাশের আগে একাধিক রিভিউ প্রকাশিত হয়ে যায়। শিক্ষিত সমাজের অনেক কিছুই আমরা রপ্ত করে উঠতে পারিনি, দুর্ভাগ্য।

নাহার তৃণা : 
লেখক হিসেবে আপনার উপন্যাস ছোটোগল্পের তুলনায় অনেকটা এগিয়ে, পাঠকের এমন মতামতকে আপনি কীভাবে নেবেন?

নাসিমা আনিস : 
ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া আমার। আমি লেখি, পাঠকের ভালো লাগা মন্দ লাগায় আমার তো হাত নেই! আমার ছোটোগল্প লিখতে ভালো লাগে। দু’চারদিন কি সপ্তাহ খানেক গল্পটা মাথায় নিয়ে ঘুরে মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলা যায়। চ্যালেঞ্জও আছে, কবিতার মতো শব্দ বাক্য বিষয়, সব কিছুতে খুব যত্ন নিতে হয়। উপন্যাস লিখতে অনেক সময় লাগে, ছাপাখানায় চলে যাবার পরও খুব হতাশ লাগে, মনে হয় ঠিকঠিক শেষ করতে পারিনি, উপন্যাসের বেলায় এটা খুব হয়। পাঠক উপন্যাস পছন্দ করলে এটা আমার সৌভাগ্যই।

নাহার তৃণা : 
‘পুরস্কার আসলে লেখককের এক ক্ষণস্থায়ী, ভুল সামাজিক বৃত্ত তৈরি করে। তার বদলে লেখকের আসলে উপেক্ষাকে সহ্য করার একটা বিক্রম থাকা উচিত’— শঙ্খ ঘোষের এমন ভাবনার বিপরীতেই আমাদের অধিকাংশের অবস্থান। আমরা পুরস্কারকে দেখি, যে কোনো সৃষ্টিশীল কাজের স্বীকৃতি হিসেবে। আপনি নিজেকে কোন দলে ফেলবেন? এই জাতীয় স্বীকৃতিকে কীভাবে দেখেন?

নাসিমা আনিস : 
শঙ্খ ঘোষ দ্বিতীয় লাইনে লেখকের দমের কথা বলতে চেয়েছেন। উপেক্ষা থেকে আরো ভালো কিছু হতে পারে। শুধু টিকে থাকা তো লেখকের কাজ না তাকে আরো কিছু পথ চলতে হয়! সত্যি যে অন্তরে যদি রক্তক্ষরণ না হয় তো কী দিয়ে লিখবেন! মহাশ্বেতা দেবীর জীবনকে আমি খুব চিন্তা করে দেখেছি, পারফেক্ট লেখক জীবন, লিখেই জীবিকা, এমনকি অধ্যাপনাটাও ছেড়ে দিয়েছেন লিখেই জীবনটা যাপন করবেন বলে! ক্ষণস্থায়ী হলেও এর অভিঘাত দীর্ঘমেয়াদী যা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অস্বস্তিকর সামাজিক বলয় তৈরি করে। মজা হলো, এ সব জেনেও লেখক পুরস্কার আশা করেন, গ্রহণ করেন এবং গর্বিত ও লজ্জিত হন। আমি একই সঙ্গে গর্বিত এবং লজ্জিত। লজ্জিত এ কারণে যে পুরস্কার পাওয়ার পর আমার চারপাশটা বদলে যাচ্ছে, বদলটা আমি নিতে পারছি না।

নাহার তৃণা : 
আপনি কি মনে করেন সাহিত্যে স্বীকৃতি/পুরস্কার অর্জনের ক্ষেত্রে পুরুষের তুলনায় নারীরা বিশ্বব্যাপী পিছিয়ে আছেন? এটি কি নারীদের তুলনায় পুরুষের মেধা বেশি তাই তারা এগিয়ে, না কি পুরুষতান্ত্রিক কাঠামো নারীকে পিছনের সারিতে দেখতে অভ্যস্থ, সেকারণে এমন ঘটে বলে মনে করেন?

নাসিমা আনিস :
এই পর্যন্ত নোবেল ১২৫ বছরে আটবার বাদে সব বছরই পুরস্কার দিয়েছে, নারী সাহিত্যিক পেয়েছেন ১৮ বার, পুরুষ ৯৯বার। মজার ব্যাপার, ২০১৮,২০২০,২০২২,২০২৪ নারী সাহিত্যিক পেয়েছেন, সংখ্যাতত্ত্ব বলছে, এবার নারী সাহিত্যিক পেলেও পেতে পারেন! বুকারে বরং কিঞ্চিত ভালো, ৫৬ বছরে ১৮/১৯ জন নারী।

মেধায় পিছিয়ে নেই নারী এটা ঐতিহাসিক ভাবে প্রমাণিত। নারী যত মাল্টি টাস্কিং করতে পারে তার কোনো তুলনা নেই। মাল্টি টাস্কিং মেধার অনন্য উদাহরণ। এই উপমহাদেশই যদি দেখি, নারীকে শুধু গৃহকোণে আটকে রাখার ষড়যন্ত্র, এই জাল ছিন্ন করতে ( ছিন্ন হয়নি মোটেই) কেটে গেল এক শতাব্দী। এবার তুমি বাইরে গেলে ঘর সামলে যাও। এই যে বন্ধন, এ গুলো কি নারী নিজের জন্য নিজে তৈরি করেছে! করেনি, হাজার বছরের ধারাবাহিকতা, পুরুষতন্ত্রের নিয়ম।

সাহিত্য মূল্যায়নের প্রতিষ্ঠিত মানদণ্ড ও রুচি কী, কারা এই মানদণ্ড তৈরি করে, এই প্রশ্ন আশির দশকেই খুব জোরালো ভাবে উঠেছে। মানদণ্ড তৈরি করেছে সুবিধাভোগী শ্রেণি অর্থাৎ পুরুষ। আমার জানা নেই নোবেল কমিটিতে নারী কতজন আছেন বর্তমানে বা তাদের বিচারকার্যে কী ভূমিকা। আমার বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয়, গত এক দশক নারী সাহিত্যিকদের যেভাবে মূল্যায়ন হয়েছে তা অব্যাহত থাকবে। একটা দেশ কেমন বুঝতে হলে যেমন সে দেশের নারী শিশুর অবস্থান দেখে বুঝা যায় তেমনি পৃথিবীকেও বুঝে নেয়া যায় একটা দেশ ভেবে।

নাহার তৃণা : 
নারী লেখকের লেখাজোখা পাঠে পুরুষ পাঠকের একধরনের অনীহা কাজ করে। এখানে একটা জরিপের কিছুটা তুলে ধরলে বিষয়টা স্পষ্ট হবে। ২০২১ সালে সর্বোচ্চ বিক্রি হওয়া ১০টি নারী লেখকের বই এর জরিপে দেখা গেছে(যেখানে জেন অস্টিন থেকে শুরু করে মার্গারেট অ্যাটউড রয়েছেন) পুরুষ পাঠক ১৯% এবং নারী পাঠক ৮১%। অন্যদিকে পুরুষ লেখকদের ১০টি শীর্ষ বইয়ের জরিপে(যেখানে চার্লস ডিকেন্স, জেআরআর টলকিয়েন, লি চাইল্ড এবং স্টিফেন কিং রয়েছেন) পুরুষ পাঠক ৫৫% এবং নারী পাঠক ৪৫%-- এরকম বাস্তবতায়, একজন নারী লেখক হিসেবে আপনি কি কখনো এই জাতীয় 'অদৃশ্য দেয়াল' অনুভব করেছেন?

নাসিমা আনিস : 
অদৃশ্য বলছেন কেন, এটা দৃশ্য। আমি ফেসবুক ব্যবহার করি। নানা বিষয়ে কথা বলি। আমার এবং আমার সতীর্থ নারী লেখকদের স্টেটাস কিংবা সাহিত্যে কমেন্ট করেন ৮৫ ভাগ নারী। ব্যাপারটা নিয়ে আমরা কিন্তু কথা বলি। বলি এই কারণে যে আমরা এখনও সেই পৃথিবীতে আছি যেখানে সামান্য একটি কমেন্ট করতেও নারী-পুরুষ ভেদাভেদ করি কিংবা বুঝিয়ে দিতে চাই, নারী তুমি তত উন্নত কিছু নও। আর নিরেট সাহিত্য তো আরো উন্নত বস্তু, সেখানে তাদের অহমবোধ কী পরিমান তীব্র ও তীক্ষ্ণ সেটা না অনুধাবন করার কারণ নাই! এই উন্নাসিকতার দিন শেষ হয়ে আসছে বলে বিশ্বাস করতে চাই।

নাহার তৃণা : 
এ বছর আপনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার পেয়েছেন। গল্পপাঠের পক্ষ থেকে আপনাকে অভিনন্দন। এই প্রেক্ষিতে একটি সাক্ষাৎকারে আপনি জানিয়েছেন ‘আমার চেয়ে যোগ্য অগ্রজ কয়েকজন কথাসাহিত্যিক আছেন। তাদের কেউ এই পুরস্কার পেলেও আমার আনন্দ হতো।’ এমন হার্দিক মনোভাবের চর্চা আমাদের সাহিত্যজগতে শুধু নয়, বর্তমান সমাজেও প্রায় বিরল। এমন দীনতার পেছনে কী কারণ থাকতে পারে বলে ভাবেন?

নাসিমা আনিস : 
আপনাকে ধন্যবাদ। দেখেন কেউ তো মাথায় দিব্যি দেয়নি যে আমাকে লিখতেই হবে, আবার কেউ দায়িত্বও নেয়নি যে আমি লিখলেই পুরস্কার দিবে। আবার কেউ পুরস্কার পাবে বলেই লিখতে আসেন না। লেখাটা একটা তাড়না, কিছু বলার আছে, তার কাছে মনে হয়েছে এটা তাকে বলতেই হবে, না বলাটা অনুচিত হবে। পুরস্কার কয়টা? কয়জনকে দিবে? কী মাপকাঠিতে দিবে? সুতরাং আমি কখনও পুরস্কার আশা করি নাই। আমি কোন মানদণ্ডে নিজেকে বিচার করে বলব আমি খুব ভালো কাজ করে ফেলেছি আমায় পুরস্কার দাও! পৃথিবীর বহু কালজয়ী লেখক ছিলেন যারা পুরস্কৃত হননি, তাতে তাদের কিচ্ছু ক্ষতি হয়নি। যুগ যুগ তাঁরা বেঁচে আছেন লেখার ভিতর দিয়ে। সত্যি বলছি আমি এক মুহূর্তের জন্য এই পুরস্কারের আশা করিনি।

আর দীনতার কথা যদি বলি, সমাজে কোথায় আর সুস্থ জিনিস অবশিষ্ট আছে! ঠেলাঠেলি, গুঁতোগুতিতে সবাই দীর্ণ। বসার জায়গা অল্প, মানুষ অজস্র, আবার কেউ যে দাঁড়িয়ে থাকা মেনে নিবে একটু ধৈর্য ধরবে সেই সবুরও নাই। কারণ সবাই জানি, কারণ অসততা, কেউ আর কাউকে বিশ্বাস করতে পারি না, রাজিও নই। ভালো কাজটা সমাদর পাবে আপনা থেকে, নিজের তদবির ছাড়া, এই বিশ্বাস আমাদের অনেক আগেই উঠে গেছে।

নাহার তৃণা :
‘মোহিনীর থান’ আপনার প্রথম উপন্যাস, এটি লেখার অনুপ্রেরণা কীভাবে পেয়েছিলেন? উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র মোহিনীর ট্রান্সজেন্ডার পরিচয় সমাজের প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করতে কতটা সফল হয়েছে মনে করেন?

নাসিমা আনিস : 
কলেজে যেতে ভেড়ামারা বাসস্ট্যান্ডে নামতেই ওদের সাথে দেখা হতো, সময়টা সকাল নয়টার একটু আগে। ওরা থাকে ভ্যানে, সঙ্গে ঢোল। ওদের রঙিন সাজ, খোঁপায় প্লাস্টিকের ফুল, গাঢ় লিপিস্টিক, রঙিন শাড়ি, পুরো ব্যাপারটা বেশ চোখ ধাঁধানো। স্থায়ী দোকানে ফলওয়ালাদের সাথে তর্কবির্তক ছিল প্রাত্যহিক ব্যাপার। আপাত সূত্র হয়ত এখান থেকেই যার বীজ ছিল আমার ছেলেবেলায় ৬৯/৭০ সালে ঢাকায় নীলক্ষেতে রেললাইনের ধারে ওদের চলাচল দেখে, আমার স্কুল থেকে ফেরার সময় আর ওদের বস্তির বেড়ার ঘর থেকে কাজে বের হওয়ার সময় মিলে যেত প্রায়ই, তখন জৌলস ছিল না। হ্যাঁ কী কারণে যেন তখন ভয় পেতাম, ভয় থেকেই মাঝ বয়সে আকর্ষণ। কিছুটা তো সফল হয়েছেই, সাহিত্য খুব স্লো আইটেম। রাতারাতি কিছু হয় না।

নাহার তৃণা : 
সাধারণত আপনার উপন্যাসে নারীর অভিজ্ঞতা ও লিঙ্গ-পরিচয়ের রাজনীতি দৃষ্টিগোচর হয়। এ জাতীয় আখ্যান তৈরির জন্য আপনি কী ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে থাকেন?

নাসিমা আনিস :
মোহিনীর থানের কথা যদি বলি, বছরের পর বছর আমি ওদের দূর থেকে দেখেছি, তারপর মনে হলো ওদের সাথে ওদের বাড়ি গিয়ে একটু কথা বলি, ব্যাপারটা খুব সহজ ছিল না। নিজে নিশ্চিত ছিলাম না কী ঘটবে, আমার সহকর্মীরা বিপুল নিরুৎসাহিত করেছিলেন, বলতে গেলে ভয় দেখিয়েছিলেন। প্রথম দিন ঘণ্টা খানেক ছিলাম, তাঁর চোখেমুখে ছিল উপেক্ষা ও গোয়েন্দা। আমার সাকিন নিবাস, কর্ম-মর্ম জানার পর সামান্য স্থান দিলেন। তারপর এক বছর সপ্তাহে দুই-তিন দিন, ছুটির মাসগুলো বাদে। এইভাবে মোহিনীর থান। উপন্যাস পাঁচটা, কোনো কোনোটা লিখতে দেড় থেকে দু’বছর করে লেগেছে। বৃহন্নলা বৃত্তান্ত লিখতে তিন মাস লেগেছে কারণ মোহিনীর থানের প্রস্তুতি সহজ করেছে।

নাহার তৃণা : 
আন্তর্জালিক প্রসারে অনলাইনে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার দাবি করা হয়। এ নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী? 

নাসিমা আনিস : 
পর্যবেক্ষণ ভালো। চোখে জোর থাকলে একটা উপন্যাস ডাউন লোড করে পড়ে ফেলতে পারি, যে কোনো বিষয়ে খুঁজলে কিছু প্রবন্ধ কি তথ্য পাওয়া যায়। প্রয়োজনীয় বইটার তথ্যও এখানেই পেতে পারি, আগে ফোন করে একে ওকে ধরে জানতে হতো। ভালো সহায়ক নিঃসন্দেহে। পড়তে চাইলে কত কিছু যে আছে!

নাহার তৃণা : 
‘বৃহন্নলা বৃত্তান্ত’ উপন্যাসে প্রান্তিক মানুষের জীবনসংগ্রামকে বিশেষ কোনো বর্ণনাশৈলীতে তুলে ধরা দরকার, লেখার আগেভাগে এমন ভাবনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন কি?

নাসিমা আনিস : 
জহিরের সাথে নতুন বাজারে লুঙ্গির দোকানে পরিচয়ের সময় ও যে ভাষায় কথা বলছিল আমি সেটাকে রেখেছি আর ওদের দৈহিক ভাষার একটা যোগ তো থাকেই। আমজনতার সঙ্গে এখানেই পার্থক্য ওদের। ঠিক, লেখার আগে এই ভাবনা ছিল, তবে মোহিনীর থানে আমি ডুবে গেছিলাম, বৃহন্নলা বৃত্তান্তর সময় আমি কিছুটা নিশ্চিত ছিলাম আমার বাহন নিয়ে।

নাহার তৃণা : 
প্রান্তিকতার অভিজ্ঞতা আপনার গল্পে শুধুই কি সামাজিক বৈষম্যের প্রতিনিধিত্ব করে, না কি চরিত্রদের মানসিক স্তরেও তা গভীরভাবে উপস্থিত করতে সচেষ্ট থাকেন?

নাসিমা আনিস : 
গল্পটা যথাযথ বলতে চরিত্রের তো খুব ভূমিকা থাকেই। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে চরিত্রই সব উপস্থাপন করে। আমি খুব ডিটেইল বলতে পছন্দ করি না, ফলে খুব সংহত বাক্যে বর্ণনা সারতে গিয়ে কিছু গ্যাপ থাকতেই পারে। আমার সব সময় মনে হয়, পাঠক খুব শিক্ষিত ও সব জান্তা, মনে হয় আমি যা ভাবি কি দেখি পাঠকও প্রায় তাই দেখে থাকবে।

নাহার তৃণা : 
‘চন্দ্রভানুর পিনিস’ উপন্যাসে ক্ষমতা, সহিংসতা ও নৈতিকতার প্রশ্ন যেভাবে পরস্পর জড়িয়ে থাকে, তার উপস্থাপনায় কোন বিশেষ কৌশল প্রয়োগ করে বিষয়গুলোকে পাঠকের সামনে তুলে ধরতে সক্ষম হলেন?

নাসিমা আনিস : 
এই উপন্যাস লেখার সময় আমি খুবই বিভ্রান্ত ছিলাম কোথা থেকে শুরু করব ভেবে। আমি জানতাম পুরো গল্পটা, যুগের পর যুগ আমি এই গল্প লালন করেছি খুব মনোযোগ দিয়ে। শুরু, ক্রিয়া পদ, কাল এই সব নিয়ে আমাকে ভাবতে হয়েছে। প্রায় অর্ধ শতাব্দি এর ব্যাপ্তিকাল, প্রচুর কাহিনী ও চরিত্র এবং বেশ বিচিত্র কখনও দুর্ধর্ষ। বিশেষ কোনো কৌশল অবলম্বন করিনি, একটা ভালো শুরু খুঁজছিলাম আর গল্পটার ডালপালা, ভূতজ্বিন জানার জন্য মাঝে মাঝে আজিমপুর এক নানির ( মায়ের চাচি) কাছে সাত তলা সিঁড়ি ভেঙে উঠতাম। কেননা ততদিন আমার মা গত হয়েছেন, যিনি সব সময় এই গল্পগুলোর ভিতর বাস করতেন। পুরাতন দালানের আধো অন্ধকার সেই সিঁড়ি আমাকে শক্তি যুগিয়েছে কীভাবে গুছিয়ে উঠতে হয়।

নাহার তৃণা : 
আপনার লেখায় রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক ক্ষমতার কাঠামো বিশেষ কোন প্রতীকের মাধ্যমে প্রকাশ পায়?

নাসিমা আনিস : 
অনেক গল্পে পাওয়া যাবে।

নাহার তৃণা : 
কাহিনির আখ্যানে মানুষের অন্তর্দ্বন্দ্ব ও অপরাধবোধকে কোন মনস্তাত্ত্বিক কৌশলে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা থাকে?

নাসিমা আনিস :
চেতনাপ্রবাহ, অন্তর্মুখী সংলাপ, স্মৃতিচারণ, বাস্তব ও স্বপ্নের রেখা মুছে, কখনও প্রতীকেও।

নাহার তৃণা : 
‘কলোনি’ বইটিকে আপনি কোন শ্রেণিভুক্ত করতে চাইবেন? বইটি সম্পর্কে কিছু বলুন।

নাসিমা আনিস : 
বলা কঠিন। আত্মজৈবনিক উপন্যাস হলেও তাতে কলোনির শত মানুষ উপস্থিত আছে। মানে কলোনির যত মানুষ। ষাটের দশকে চাকরিসূত্রে সপরিবারে গ্রাম থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলোনিতে অভিবাসন পাওয়াদের গল্প। ফুলতোলা ট্রাঙ্ক কি কাপড়ের বোস্কা নিয়ে ফুলবাড়িয়া কি সদরঘাট থেকে রিকশা যোগে বিশ্ববিদ্যালয়ের কলোনিতে এসে হাজির হওয়াদের গল্প। কলোনিতে জন্ম নেয়া, বেড়ে ওঠা মধ্যবিত্তের গল্পগাছা, দেশ স্বাধীনের পথে, দেশ স্বাধীনের পরে যারা রাজনৈতিক কোনো উত্তাপ থেকেই রেহাই পায়নি।

নাহার তৃণা : 
বাংলাভাষায় লেখা বিশ্বসাহিত্যের দরবারে পৌঁছানোর জন্য উন্নতমানের অনুবাদের বিকল্প নেই। এ পর্যন্ত আপনার কয়টি বই অন্যভাষায় অনূদিত হয়েছে?

নাসিমা আনিস : 
ইংরেজিতে অনুবাদ হয়ে প্রকাশিত হয়েছে উপন্যাস ‘মোহিনীর থান’ কলকাতা থেকে ২০২৪ এ, ‘বৃহন্নলা বৃত্তান্ত’ ইংরেজি অনুবাদ শুরু করেছেন একজন ট্রান্সজেন্ডার, বইটা অনুবাদের জন্য কলকাতার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুদান পেয়েছেন। এগুলো বেশ কিছুদিন আগের ঘটনা। অতি সম্প্রতি চন্দ্রভানুর পিনিস উপন্যাস অনুবাদের জন্য অনুমতি দিয়েছি কলকাতার একজনকে। আর কিছু গল্প ইংরেজিতে অনুবাদ হয়ে অনেকের সঙ্গে গ্রন্থাকারে বেরিয়েছে বছর কয়েক আগে।

নাহার তৃণা : 
বড়দের জন্য গল্প-উপন্যাস লেখার পাশাপাশি আপনি শিশুদের জন্যও প্রচুর লিখেছেন। কোন শ্রেণির জন্য লিখে বেশি তৃপ্তি পান?

নাসিমা আনিস : 
লেখাটা ঠিকঠাক লিখতে পারলে সব লেখায় আনন্দ হয়। ছোটোদের জন্য খুব লিখতে চাই কিন্তু ক্ষমতা সীমিত বলে লেখা হয় না। মানে লেখাটা প্রসেস করতে পারি না বলে লেখাটাও কম হয়। বড়োদের জন্য লিখতে গেলে এই অসুবিধা হয় না, ঠিক একটা পথ বের হয়।

নাহার তৃণা : 
লেখার বীজ বা আইডিয়া মাথায় এলে ভুলে যাওয়ার আগে সেটি কি তৎক্ষণাৎ লিখে রাখেন? ভাবনা টুকে রাখার জন্য আপনি কি নোটবুক ব্যবহার করেন?

নাসিমা আনিস : 
আগে খুব নোটবুক ব্যবহার করতাম, নোটবুক কাছে না থাকলে চিরকুট, প্রত্যেকদিন কুষ্টিয়া টু ভেড়ামারা বাস জার্নির আধ ঘণ্টা খুব ফলবান সময় ছিল। এখন নিজের ম্যাসেঞ্জারে লিখে রাখি, হারিয়েও যায় অনেক, লিখতে দেরি হলে।

নাহার তৃণা : 
এই মুহূর্তে কোন ধরনের বই পড়ছেন? ঘুমনোর আগে বই পড়ার অভ্যাস আছে?

নাসিমা আনিস : 
অনেক বছর আগে হুয়ান রুলফোর উপন্যাস পেদ্রো পারামো পড়েছিলাম মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুবাদে, বুঝতে কষ্ট হয়েছিল কিন্তু পড়েছিলাম। আবারও পড়তে গিয়ে বাদ দিয়ে তাঁর গল্প সমগ্র পড়ছি, মাত্র ১৭ টা গল্পের সংকলন। একটি উপন্যাস পেদ্রো পারামো আর মাত্র ১৭টি গল্প হুয়ানকে অমর করে রেখেছে। গল্প শেষ হলে উপন্যাসটা আবার পড়ব। আশা করি তখন ভালো হবে। শাহীন আখতারের তালাশ পড়া হয়নি, অবাক কাণ্ড! মাত্র শুরু করেছি।

না, এখন আর ঘুমাতে যাবার আগে বই পড়ি না, সারাদিন কিছু না কিছু পড়ি বা পড়তে হয়। ঘুমাতে যাবার আগে ল্যাপটপ সাটডাউন করি, মোবাইলে নটিফিকেশন দেখি তারপর বাতি নিভিয়ে সাত বছরের নাতনিকে বানিয়ে বানিয়ে গল্প বলি কিংবা সে বলে আমি শুনি।

নাহার তৃণা : 
বর্তমানে গল্প না কি উপন্যাস, কোনটি লেখার পরিকল্পনা চলছে?

নাসিমা আনিস : 
মুক্তিযুদ্ধের একটা উপন্যাস লেখার ইচ্ছা করছি, বহুদিনের ইচ্ছা। স্বাধীনতার পঞ্চান্ন বছর পরও স্বাধীনতাকে নিয়ে, মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে বিতর্ক হয় এমনই অভাগা জাতি। যদিও জানি এসব খড়কুটোর মতো ভেসে যাবে অচিরেই। উপন্যাস লিখতে আমার কষ্ট লাগে তাই অনেক বিরতি দিয়ে দিয়ে চেষ্টা করি। গল্প লিখি, গল্প লিখতে ভালো লাগে।

নাহার তৃণা : 
তরুণ লেখক/পাঠককের উদ্দেশ্যে আপনি যদি কোনো পরামর্শ/উপদেশ দিতে চান।

নাসিমা আনিস :
বিশেষ কোনো পরামর্শ নেই। তারা শিক্ষিত গোষ্ঠি, তাঁরা জানেন কী করতে হবে। সকলের প্রতি অনুরোধ বাড়ির শিশুদের হাতে যে কোনো উপলক্ষে বই তুলে দিন, একটি পাঠ বিমুখ জাতিকে পাঠ উন্মুখ জাতি হিসেবে গড়ে তুলি সবাই মিলে।

নাহার তৃণা : 
সময় নিয়ে উত্তরগুলো লিখে পাঠানোর জন্য গল্পপাঠের পক্ষ থেকে আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। ভালো থাকুন, আরো অনেক লিখুন। আপনার সার্বিক সমৃদ্ধি কামনা করছি।

নাসিমা আনিস : 
গল্পপাঠকে আমার আন্তরিক ধন্যবাদ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ