রবিবার, ৬ জানুয়ারী, ২০১৩

পিঠ যখন ভূমি

আনোয়ার শাহাদাত


অবিন্যস্ত সুপারির ঝাড়, সেই বাগানের ফাঁকে বর্ষায় বেড়ে-ওঠা জঙ্গল, এর মধ্যে কতকিছু বাসা বাঁধে- জোঁক, কাঁকড়া, ব্যাঙ, ডাহুক। এসময় ভীষণ অলস-কন্ঠে ডাহুকের বিষণ্ণ ডাক। জনহীন ক্ষুদ্র-ভূমিতে, নিস্তব্ধ দুপুরের ডাহুকের সে-ডাক ক্লান্ত গতিতে কেঁপে কেঁপে ছড়িয়ে পড়ে যথাসম্ভব। বৃক্ষের পাতা থেকে পাতায় ঘষে সে-শব্দ প্রতিধ্বনিত, দুর্গম বন্ধুর পাহাড়ের বন-শেয়ালের ডাক হুক্কা হুয়ার মতো।

একাকী নিমগ্ন হতাশ দুপুরের এ বিষণ্ণতায় যোগ হয় সেন ভিটায় কাত হয়ে যাওয়া রংধনুর মতো লম্বা নারকেল গাছটি থেকে এখুনি সাদা মেঘের কাছে আকাশে উড়ে যাওয়া বাজপাখির বেহালা-বেদনার সুর-মিশ্রিত ডাক কু-হু, কু-কু.....।

উড়ে উড়ে চলা বাজপাখির বিলাস-কাব্যের সে কান্না মেঘ-মেঘান্তর হয়ে ফিরে আসে মর্ত্যে, খড়ের চালা ভেদ করে হাশেম পিয়াদার পাছ-বারান্দায়। বিপরীত দিকে ঘুরে শোয় হাশেম এ সময় ডান হাত বদলিয়ে বাম হাতে মাথা রেখে। ফাঁকে গামছা দিয়ে বুকের ঘাম মুছে নেয়। একটি দীর্ঘশ্বাস আসা-যাওয়া করে বুকের ভেতর। বাজ পাখির দুঃখের সে কিসসা মনে পড়ায় হাশেমের বুক শূন্য লাগে। তখন সে প্রশ্ন তার মনে আসে- ওয়াক্কা পাখির দুঃখের সে কাহিনী সত্য না কি মিথ্যা।

আগিলা কালে শকুন আর বাজপাখি ছিলো বোন্দে। দু’দোস্তে একে অপরকে ডাকতো ‘হইয়া’। তারা একসঙ্গে থাকতো, চলতো, খেতও। বাজপাখির চোখ ছিল খুব ভালো। সবকিছু দেখতে পেতো সহসা, উনচল্লিশ হাত পানির নিচ পর্যন্ত। আর শকুন তার চোখে দেখতো সবকিছু ঝাপসা। একদিন দু’ বোন্দে সুস্বাদু এক খাবার খাওয়া শুরু করে, কিন্তু ঝাপসা চোখে শকুন ভালো করে খেতে পারছিলো না। সে সত্য-কালের কথা- শকুন তার বোন্দে বাজপাখিকে বলে, ‘দোস্ত, চক্ষেতে বালো কইরা দেখতে পারি না, খাইতে অসুবিদা, তোমার চউখটা একটু ধার দেও, খাওন শেষে দিয়া দিমু।’ কথা মতোন বাজ তার চোখ দেয় প্রাণের বন্ধু শকুনকে। নিরিবিলি সময় তখন, ক্লান্ত বাজপাখি বোন্দের পাশে ঘুমিয়ে পড়ে। ঘুম থেকে জেগে দেখে প্রাণের বোন্দে চলে গেছে দূর পাহাড়ের দেশে। সে আগিলা কালের কথা, আজও ফেরেনি শকুন দোস্তের কাছে, দেয়নি সে ফেরত চোখ। তাই বাজ-পাখি নিরিবিলি সময় পেলে বোন্দে শকুনকে উদ্দেশ্য করে ডেকে ওঠে- কু-হু, কু-কু’ ..., আহ্ আহ্-রে দোস্ত চোউখটা দিয়া গেলা না, আহ্ আহ্-রে দোস্তো।

হাশেম আবারও ঘুরে শোয় অস্বস্তিকর গরমে, শরীরের একদিক মোটা হোগলা-পাতার হোগলার দাগ শুকিয়ে যাওয়া গুটিবসন্তের মতো লেপটে থাকে। মাঠে, পুকুরপাড়ে কি ঘরে সমান গরম। যেনো দুনিয়া সিদ্ধ হচ্ছে বিশাল ডিঙায়। আর মানুষের দেহের ভেতরে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে তুষের তাওয়া কাঠের কয়লার আগুন ঢেলে। তুষের তাওয়ার আগুন জ্বলছে ধর্মীয় বিশ্বস্ততায়। একনিষ্ঠ। পুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছে ভেতর। হাশেমের ভেতর।

মেঘ-দেশে বাজপাখি এখনও কাঁদছে থেমে থেমে। এর আগের কান্না শুনতে হয়েছে হাশেমের। সে কান্না বাজপাখির নয়, মানুষের। ক'দণ্ড আগে মানুষের সে কান্না থেমেছে অপারগতায়। সবশেষে যতটুকু শক্তি সঞ্চিত থাকলে কাঁদা যায় সেটুকু ফুরিয়ে নিঃশেষ হয়ে গেলে পরে মানুষের সে কান্না থেমে গেছে একটু আগে। দিনরাত নয়দিন চলেছে। কান্নার এ মানুষ অন্য কেউ নয়, হাশেমের স্ত্রী সোনারজান।

থমকে দাঁড়িয়ে গেছে বাতাস আজ। চামড়া শুকিয়ে যাওয়ার মতো রোদ। এতে মরে যাওয়া গোরুর মড়কের গন্ধ বেড়ে গেছে। মড়কের অদূরে ধুলোমাখা মলিন নীলাম্বরী শাড়ির আঁচল মাটিতে লুটিয়ে এতক্ষণ কেঁদেছে সোনারজান। সেখান থেকে উঠে আসার শক্তিও তার নিঃশেষ।

এইভাবে নয়দিন।

দু’চালা গোলপাতা ঘরের পেছনে বাড়তি খড়ের চাল আর শুকনো কলাপাতা ঝুলিয়ে বেড়া দিয়ে বানানো হয়েছে গোরুর ঘর। পাশাপাশি দু'প্রাণীর বসবাস এ রকম। রাতে মশারা ভাগাভাগি আনাগোনা করে মানুষ ও গোরুর ঘরে। কখনো গভীর রাতে গোরু দুটোর অস্বাভাবিক নড়াচড়া দেখলেও সোনারজান কাঁথা ছেড়ে গোরু-ঘরে এসে বলে-

‘অই পাগলা হাঁজকালে পানি খাইছিলিনি, ছটফট করত্যাচো ক্যা?’

বলদ-গোরুটিকে ডাকে সোনারজান পাগল আর গাভীটিকে পাগলি বলে।

নয়দিন আগের রাত, ভাদ্রের আকাশ ফুটো হয়ে সারারাত ধুলোর মতো দেয়াই হয়েছে। হাশেম ও সোনারজান মোটা কাঁথা নামিয়ে মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়েছে সে রাতে। কিছুই টের পায়নি। বিহান-কালে সোনারজান যথারীতি গোরু-ঘরে মাথা ঢুকিয়ে ডাক পারে- ‘অই পাগলা পাগলি।’ গলা-ফাঁস হয়ে পাগল মরে আছ। চার পা শক্ত হয়ে উপরের দিকে খাড়া। জিহ্বার সবটুকু মুখ থেকে বাইরে বের করে সোনারজানের কাছে লজ্জিত ভঙ্গিতে দিয়েছে শেষ কামড়। ‘ওরে মোর পোড়া কফাল’ বলে সোনারজান চিৎকার দিয়ে মূর্ছা যায়।

হাশেম শোয়া থেকে উঠে বাইরে এসে ডাকে- ‘ও পরীর মা হোনছে, কই হোনছেনি পরীর মা কইলা।’ এঘরে কোনোদিন পরী নামে কেউ ছিল না, অথচ সোনারজান হাশেমের পরীর মা। সেই পরীর মা হাশেমের ডাক শুনে উঠে আসার চেষ্টা করে। ‘খাড়াও খাড়াও তুমি পইড়রা যাবা মুই আই, আর এহন আলা ক্ষ্যামা দেও, আত মুক ধুইয়া আইজ ঘরে ওডো’ এই বলে হাশেম নুয়ে পড়ে থাকা সোনারজানকে টেনে তুলতে থাকে। সোনারজান কাপড় ঝাড়া দিতে দিতে বলে, ‘এইযেন পাগলডার লাহান হারাদিন কান্দি কইলে এটটু নিষুদ করলে কি পারে না।!’

হাশেম ও সোনারজানের সংসারে চিরস্থায়ী অভাব। বিবাদহীন তিরিশ বছরের বিবাহিত জীবনে যুগ ধরে প্রজন্ম-শূন্যতায় হাহাকার লেগে আছে বিশাল জড়ুলের মতো। হাশেমের কৌলীন্য-হীন বংশে কৈশোরকালে পিয়াদা-নামক যে উপাধি পেয়েছিলো তা ধুয়ে গিয়ে এখন গোদা পা সমান নতুন উপাধি ‘আঁটকুড়া’ পদভার করেছে। এখন হাশেমের বংশীয় উপাধি ‘আঁটকুড়া’ আর বাজা মাগ-ছেলে অপবাদ জুটেছে সোনারজানের।

২৯ বছর আগে শ্রাবণের এক বর্ষা-রাতে সোনারজান কুপি জ্বালিয়ে ভূত দেখার মতো আঁতকে উঠে চিৎকার দিয়েছিলো। পাশের বাড়ির দাই খাতুন বুড়ি লুফা জ্বেলে এসে সোনারজানকে ধমকায়- ‘আরে বেডি, গাবলা-যাওয়া সোন্তান সামনে রাইখ্যা কান্দে না, হেতে পাপ অয়, আল্লায় বেজার অয়’ এই বলে গর্ভপাত হয়ে যাওয়া সন্তানের দিকে খাতুন হাতের মশাল এগিয়ে আক্ষেপ করে- ‘ও মোর মাওলা, উনি দেহি পুরুষ ছেলে আছিলো। শুকুর আল্লা যা করে বালোর জইন্যে করে।’ সোনারজান তখন বুক ভাসিয়ে কাঁদে। হাশেম সান্ত্বনা দেয়- ‘এহন আলা নিচ্চুম থাকো সোনা, আল্লার মাল আল্লায় নেছে, আবার হেই দেবে- মোরা দুইজন তো ঠিক আছি।’

তিরিশ বছর পার হয়ে গেছে, হাশেম সোনারজান দুজন ঠিক ছিলো। আল্লায়ই দেয়নি কি না তা তারা বোঝে না। আর আশাও করেনি একসময়। কেউ জানে না হাশেম ও সোনারজানের পাঁচ মাসের সন্তানের জীবনাবসান হয়েছে গর্ভপাতের মধ্য দিয়ে। সেই রাতেই হাশেমকে গর্ভপাত হয়ে যাওয়া সন্তানের দাফনকার্য সম্পাদন করতে হয়, না হলে আরও অমঙ্গল থাকে কপালে। কোথায় কাপড় পাবে দাফনের এই রাতে! অবশেষে সোনারজানের কচু-পাতা রঙের এগারো-হাতি বহরের শাড়ি-কাপড় থেকে একহাত ছেঁড়া হয়। সে কাপড় সাদা নয় বলে পান-খাওয়া চুনের ফোঁটা লাগানো হয় সাদার প্রতীক হিসেবে। সোনারজানের গগনবিদারী চিৎকার আর বুক থাপড়ানোর তোড়েও হাশেমকে পাঁচ মাসের সেই মরা সন্তান কাপড়ে জড়িয়ে বেরিয়ে পড়তে হয় দাফনের জন্য। এদিকে সোনারজানকে জাপটে ধরে রাখে খাতুন বুড়ি। সেই বুড়িও গত হয়েছে দু'যুগ আগে। অতএব দু'যুগ আগ থেকে হাশেম ও সোনারজান আঁটকুড়া-বাজানারী হয়েছে।

হাশেম কোমরে একটি গামছা জড়িয়ে পরে। ন্যাকড়া দিয়ে বেঁধে নেয় নাক। নয়দিনের পুরনো তাদের ‘পাগলা’ গোরুর মড়ক খালে ভাসিয়ে দিতে যাওয়া শুরু করে। কাক ও কুকুরের ভক্ষণের পর মড়ক এখন আর মড়ক নেই বলা চলে। আছে কিছু হাড্ডি শুকিয়ে যাওয়া মাংসের সঙ্গে জড়িয়ে। যদি শকুন আসতো তা হলে হয়তো আর খালে ভাসিয়ে দেয়ার অবস্থাও থাকতো না। শকুন যে আসবে না তা তার আগেও জানতো। কেননা দেশ থেকে বিচার-আচার উঠে গেছে। হাশেমেরা জানে দেশে বিচার-আচার না থাকলে শকুনেরা সে অঞ্চলের মড়ক ভক্ষণ বর্জন করে। মড়কটি দড়ি দিয়ে টানতে টানতে হাশেমের মনে হয় মানুষের মধ্যে কেনো বিচার-আচার তো তারও উঠে গেছে। বিচার আচারের বিষয় হাশেম আর ভাবতে চায় না কবিরা গুনাহ্ হবে মনে করে। প্রথম দিনই সে চেয়েছিলো মড়কটি খালে ভাসিয়ে দেবে সোনারজান তখন ভাসাতে দেয়নি, বললো- ‘দুইদিন থাউক ওইহানে, এটটু দেহি।’ এখন পচে গন্ধ হয়ে যাওয়া মড়ক টানতে হাশেমের অস্বস্তি লাগছে। দুটো পাতিকাক মড়কের কাছাকাছি উড়ে উড়ে প্রতিবাদ করছে। হাশেম কাকদের সঙ্গে কথা বলে- ‘আরে কয়দিন দেহি খাইলে, এহোনো আশ মেডে নাই! তিনটি কুকুরের পেট ফুলে গেছে মরা গোরু খেয়ে। হাসেমের প্রতি তাদের কোনা অভিযোগ নেই।

গোরুর দড়িসহ মড়ক ভাসিয়ে দিতে হয় সে-সংস্কার হাশেম মানলো। বছর ছয়-সাতেক আগে দাদার আমলের রেনট্রি গাছটি বেচে দিয়ে গোরু দুটো কেনা হয়েছিলো। ছেলেবেলা থেকে হাশেমের আশা ছিলো সেই গাছ দিয়ে সে একদিন একটি সতেরো-বন্দি ঘর তুলবে। চৌচালা সে ঘরের চাল হবে টিনের। দূর থেকে টিনের সে চাল রোদে ঝকঝক করবে। কোনো একদিন সোনারজান যখন মাল-দিঘিতে যাবে তখন হাশেম তাকে রসিকতা করে বলবে- ‘বিবিসায়েব, কাংখে ভরা কলস নিয়া আওনের সময় এটটু সাবদানে হাটিয়েন, রইদে টিনের রোশনাইতে আবার চইক্ষে ধান্দা লাইগগা হোচোট খাইয়া পইড়রা যাইয়েন না।’ সে কপাল হাশেমের হয়নি। সেই গাছ বিক্রি করার টাকায় কেনা গাভীটি তিনশাল তিনটি দামড়ি বাছুর দেয়। আবার বছর না ঘুরতেই ফি-বছর তিনটি বাছুরই মরে যায়। গত তিনসাল গাভীটি বাচ্চা দিচ্ছে না। এর আগে পরপর তিন বাচ্চা দেয়ায় এমনিতেই গাভীটি দুর্বল হয়ে পড়েছিলো। তার উপর রয়েছে অপর্যাপ্ত খাবার। তাতেও হয়তো তেমন অসুবিধা ছিলো না, কিন্তু গাভীটি বছরের বিশেষ সময় যখন প্রজনন-কালের ডাক আসে তখন সে গত তিন সাল ষাঁড়-মিলনে ব্যর্থ হয়। গাভী শুকিয়ে দুর্বল হয়ে গেছে, ষাঁড়ের ভারবহন করার সামর্থ্য তার নেই। ষাঁড়ের পালার সময় হাশেম-সোনারজানদের প্রিয় গাভী ভারবহনে ব্যর্থ বারবার হুমড়ি খেয়ে পড়ে যায়। মটিতে যাতে আর পড়ে যেতে না পারে সেজন্য বাঁশ দিয়ে ঠেকে যাওয়ার কাচকি বানানো হলো। দেখা গেলো সে কাচকিতেও পেঁচিয়ে পড়ে ‘ভারাক্রান্ত’ গাভী। দু’বছরের প্রজনন-কালের ডাক মিছেমিছে চলে যায় ষাঁড়ের মিলন ছাড়া। গেলোবার গাভীর সে ডাক এলে হাশেম আর গাভী নিয়ে ষাঁড়ের কাছে যায়নি। সে জানে তার ‘গাই হাড় লইতে পারবে না।’ এর মধ্যে এবার মেঘহীন আকাশ থেকে বজ্রপাত ঠাণ্ডা রোগে মানিকজোড়ার বলদটি মরে গেলো।

নয়দিন পর আজ গোরু-মরা বাড়ির নিবিড় শোক চলে গিয়ে স্বাভাবিক হয়। ঘরে কুপি জ্বালানোর মতো কেরোসিন নেই, সাঁজবাতি জ্বললো না। বেলা থাকতে হাশেম-সোনারজান রাতের খাবার সেরে ফেলেছে। অন্ধকার নামার সঙ্গে ব্যাঙদের ডাক বাড়ে। আজন্মকালের শেখা হাতেমের দুটো দুখী মারফতি গানে সে চোখ বন্ধ করে সুর তোলে- ‘ডোবলে সেথা পাবি মুক্তা ডুবাইলে মন ডোবে না’।

সন্ধ্যাতারাটা হয়তো ডুবে গেছে তখন। সাঁজের প্রহর রাতের নীরবতা ভাঙে সোনারজান- ‘কই হুনছে, হজাগ আছেনি?’

হাশেম ‘উ’ বলে সাড়া দেয়। ‘একখান কাতা কই হোনে যেনো। কই কি পাগলি গোরুডার যে এহন ডাক চলে হে কতাডা জানেনি। কই যে মুইও লগে যামুনে, কাইল বিয়ানে গাইডারে লইয়া পুব-কান্দার হোসেনের হাড়ডার ধারে লইয়া যাইবেনি। চেষ্টায় কেষ্ট মেলে, আল্লায় একটা গেলে আর একটা দেয়। কফালডা তো আর এই রহমই যাইবে না।’

হাশেম শোয়া থেকে উঠে বসে ক’মুহূর্ত, গোরু-ঘরে যায়, আকাশের তারাগুলো থেকে যে আলো আসছে তাতে চেনা মানুষের কাছে গভীর চোখ দৃশ্যমান। ঘটনা-জানা মানুষেরা দেখতে পায় সঙ্গীহীন গাভী কাঁদছে। এতদিন পর সোনারজানের কান্না থামলেও গাভীর কান্না থামেনি। হাশেম গোরুর গায়ে হাত রাখে। পিঠের ও পাঁজরের হাড্ডিগুলো তার হাতে অনুভূত হয় সার্কাসের লোহার খাঁচার মতো। সোনারজানও উঠে এসে হাশেমের পেছনে দাঁড়ায়, বলে, ‘এই অসোময় তিনডা কদুগাছ অইচে, একটাই তো ঝাঁক পুরা অয়, একটা কদু-চারা আইন্যা অরে দেই, কয়দিন তো কোনো খাওন দেতে পারি নাই। কাইল আবার হাড় লইতে যাইতে অইবে, গায়ে এটটু শক্তি তো দরকার।’ সোনারজান ত্বরিত অন্ধকারে মিশে যায়। কোনো আলো ছাড়াও লাউগাছটি তুলে ফেলতে তার অসুবিধা হয় না। চকিত ফিরে এসে লাউ-চাড়া গাভীর সামনে ফেলে। সেই অন্ধকারে গাভীটি কুটমুট কুচকুচ শব্দে লাউশাক খায়।

পরদিন ফুল-বিহানে হাশেম ও সোনারজান গাভী নিয়ে পুব-কান্দার হোসেনের বাড়ি পৌঁছে। হোসেন তার ষাঁড় দিয়ে বলে, দুইজনই আইছো, গাইডারে এটটু তাগড়া-তোগড়া কইররা আনছোনি, ওতো কাচকিতেও খাড়াইতে পারে না। হাশেমের কোনো উত্তর করতে হয় না। এরই মধ্যে ষাঁড় গাভীর পিঠে উঠতে গেলে যথারীতি আগের বারগুলোর চেয়েও আরও দুর্বল ভঙ্গিতে মাটিতে লুটিয়ে কোৎ-কোৎ ক্লান্তির শব্দ করে। এর চেয়ে অসহায়ত্ব একটি গাভীর জীবনে আর কী হতে পারে! এ সময় সোনারজানের মুখ দেখলে দুনিয়ায় হঠাৎ কালো মেঘ নেমে আসার দৃশ্যের প্রতিফলন হয়।

‘আইচ্ছা এইবার দেহি তুমি আরেকফির ষাঁড় চালাইয়া দেও।’ প্রতিক্রিয়াহীন হাশেম হোসেনকে এই বলে গায়ের গামছাটা ছুড়ে ফেলে দেয়। শক্ত করে কোঁচা বেঁধে গাভীকে তার অনিচ্ছায় টেনে তুলে দাঁড় করায়। চার হাত-পায়ে নুয়ে পড়ে হাশেম মাথা ঢুকিয়ে দেয় গাভীর বুকের নিচে। গাভীর স্তনের বান বরাবর হাশেমের পিঠ ঠেকে, দুই হাঁটু ও দু’হাতের কবজা শক্ত করে মাটি আঁকরে এক ‘পিঠভূমি’ তে গাভীকে দাঁড় করিয়ে বলে- ‘হোসেন বাই, একবার দেহো দেহি!’ সোনারজান অদূরে দাঁড়িয়ে স্বামীর কাণ্ডে অবাক হয় না। আশ্চর্য হয়ে হোসেন হাশেমকে সতর্ক করে দেয়, ‘আরে ব্যাডা এইডা কী হরো, মেইদণ্ডডা ভাঙতে চাও? তয় সাবদান থাহিস কইলাম। হাশেম হুঁম হুঁম শব্দ করে হোসেনকে জানায়।

‘মুই ঠিক আছি তুমি ষাঁড় চালাও।’

ষাঁড় গাভীর উপরে ওঠে। গাভীর নিচে হাশেম পিঠ শক্ত করে আছে। মাটিতে ঠ্যাক দেয়া তার ডান পায়ের উপর বুড়ো আঙুল ভেঙে উলটে যাওয়ার অবস্থা। হাঁটু ঢুকে যাচ্ছে শুকনো মাটির ভেতর। দু’হাতের কবজায় সবটুকু শুক্তি দিয়েও ঠিক থাকতে তার কষ্ট হয়। পিঠের লোম ষাঁড় ভারবাহী গাভীর পেটের ঘর্ষণে চড়চড় করে ছিঁড়ছে। এ সময় ওই পথে যায় ভিক্ষুক ইয়াসিন দূর কোনো গ্রামের দিকে। সে হাশেমকে উদ্দেশ্য করে বলে, ‘ও পেয়াদার ফো, অত দাফ্ফা-দাফ্ফি না হইরা তুমিও তো পারতা কামডা হরতে, হেতে তোমার কষ্ট অনেক কম অইতো।’ ইয়াসিনের এ রসিকতায় পর্যায়ক্রমে ষাঁড় ও গাভীর তলে আটকে থাকা হাশেমের কোনো প্রতিক্রিয়া হয়েছে কি না জানা যায় না। সে পিঠ শক্ত করে আছে গাভীর নিচে। সে প্রসঙ্গ এখন অবান্তর কে ষাঁড় লইছে, হাশেম না গাভী। ষাঁড় বারবার আবার ওঠে, হাশেম আর পারে না, এবার মাটিতে সে ধুপ করে পড়ে যায় যেনো ষাঁড় ও গাভীর চাপে সে মিশে গেলো শক্ত মাটিতে। সোনারজান চিৎকার দিয়ে ওঠে। হোসেন ও সোনারজান গাভী টেনে তোলে হাশেমের ওপর থেকে। হাশেম মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। হোসেন প্রশ্ন করে ‘ও হাশেম, ঠিক আছোনি, বুহে ব্যাতা পাইছো, পাজরার অড্ডিগুলো ঠিক আছে তো”। হাশেম ভূমি থেকে উঠে বসতে বসতে হোসেনের কাছে জানতে চায়, ‘হোসেন বাই, হাড় লইতে পারছে?’

হাশেম গাভী ও ষাঁড়ের নিচে পড়ার পর এখন কেমন আছে, তার বুকে চোট লেগেছে কি না, পাঁজরের হাড্ডি ঠিক আছে কি না হোসেনের কুশলাদি বিষয়ক এইসব প্রশ্ন হাশেমের কানে যেতে পারে না বোঝা যায়। সে হোসেনের প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে আবরও জানতে চায়- ‘হোসেন বাই, হাড় কি লইতে পাড়ছে?’

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন