বৃহস্পতিবার, ১৮ জানুয়ারী, ২০১৮

সালেহা চৌধুরী'র গল্প : কুয়াকাটায় দুই নারী

মমতা আর মিমি ঠিক করলো কুয়াকাটায় পাঁচদিন থাকবে। ওরা দুজন মা ও মেয়ে। মমতা পঞ্চান্ন আর মিমি পঁচিশ। মমতার স্বামী মানে মিনির বাবা বিদেশে গিয়ে আর ফিরে আসেন নি। পাঁচ বছর হলো বিদেশে। গিয়েছিলেন তিন বছরের জন্য।
সকলে বলে-- তিনি ওখানে একজন অপূর্ব সুন্দরী নারীর সঙ্গে বসবাস করছেন। ইংরাজিতে যাকে বলে-- লিভ টুগেদার। যখন ওরা বুঝতে পারে ঘটনা সত্যি, ইংরাজিতে এম এ পাশ মিমি বলে--মা ইউ ডু দ্য সেম থিং। ফাইন্ড সামবডি এ্যান্ড লিভ টুগেদার। মমতা বলে-- আমি কী তোর আব্বুর মত সিলি?

মিমি বলে--এই পৃথিবীতে ভালো মানুষের দাম নেই।

সেটা আমার ভাবনা।

ঠিক আছে। ডু হোয়াট ইয়োর হার্ট ফান্সি।

ওরা দুজন যখন ঠিক করে কুয়াকাটায় পাঁচদিন থাকবে। মমতা বলে মেয়েকে--পাঁচদিন তুমি ইংরাজি বলতে পারবে না। সবসময় বাংলা বলতে হবে। কথায় কথায় ইংরাজি।

কেন অসুবিধা কী?

আমার আর কী অসুবিধা। অসুবিধা তোমার। একটা ব্যাক্য বাংলায় বলতে গেলে ইংরাজির সাহায্য নেওয়া।

ঠিক আছে মাদার। সরি মা।

ঢাকা থেকে ৩২০ কিলোমিটার দূরে যে জায়গা সেটা এমন কিছু দূরে নয়, কিন্তু কুয়াকাটা এক্সপ্রেস বাসটা দুবার বিগড়ে, বলে জায়গাটা মোটেই কাছে নয়। অনেক আগে একবার এসেছিল ওরা। ওরা তিনজন। তখন অনেক ফেরি ছিল। এখন অনেক গুলো ব্রিজ হয়ে গেছে। মোটামুটি ভালো। ওরা প্রথমে লঞ্চে বরিশাল আসতে চেয়েছিল তারপর সেখান থেকে বাসে কুয়াকাটায়। তারপর কী ভেবে ওরা কুয়াকাটা এক্সপ্রেসে কুয়াকাটায় আসে। মমতা একটা ব্যাংকে ভালো কাজ করে। ডেডিকেটেড ওয়ার্কার। সরকারী আর সাপ্তাহিক ছুটি ছাড়া ছুটি নেয় না। এখন মেয়ের জন্মদিনে একটা কিছু দিতে চাইলে মেয়ে বলে-- চল দুজনে মিলে কোথাও যাই। সেটাই হবে আমার জন্মদিনের গিফ্ট।

সামনে মাঘী পূর্নিমা। অতএব একটা চাঁদভরা রাত সমুদ্রের ধারে কাটানো যাবে সেটাই বা কম কী? ঢাকায় চাঁদ ওঠে কিন্তু সে চাঁদ নিয়ে কেউ কোন বাড়াবাড়ি করে না। দু একজন রোমান্টিক হৃদয় ব্যতিক্রম।

ওরা ঠিক করলো ‘বিচ হাভেন’ হোটেলে উঠবে। প্রথম কথা হোটেলটা বেশ পরিস্কার পরিচ্ছন্ন। একটা রুমের জন্য প্রতি রাতে দুই আড়াই হাজার টাকা দিতে হবে। আর এখান থেকে সমুদ্র মাত্র পাঁচ মিনিটের পথ। মাঘী পূর্নিমায় ইচ্ছা করলে অনেক রাত পর্যন্ত বিচে থাকতে কোন অসুবিধা হবে না। হোটেলের ভেতরে ঝকঝকে পানির পুকুর আছে। যেখানে লাল শাপলা ফোটে ফোটে আরো নানা ফুল। সেখানে চেয়ার টেনে বসে চা খেতেও বেশ। ঘরে পাশাপাশি দুটো বেড মা ও মেয়ের জন্য। সাইড টেবিল। ফোন। টেলিভিশন। এইসব। সবচেয়ে ভালো লাগল ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে সমুদ্র। মনে মনে ভাবে মমতা বেশ কয়েক বছর আগে যখন এসেছিল ও বয়স ছিল কম। প্রায় দশ বছর আগে বোধহয়। ওরা তিনজন। ও, আশেকুর রাহমান আর মেয়ে মিমি। আশেকুর এখন অন্য আশিকে মগ্ন। খুব কী কষ্ট পেয়েছিল মমতা? কেমন একটা ভোঁতা অনুভূতি। এখনো তাই। মিমি চিৎকার করে ডাকছে-- মা মা চল পুকুর পারে গিয়ে বসি। কী চমৎকার টলটলে পানি।

একজন সেখান থেকে আগেই বসেছিলেন। ওরা ও বসলো। ভদ্রলোক ওদের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসলেন। ওদের মনে হলো এই ভদ্রলোক বোধকরি বিদেশে থাকেন। এখানে কেউ কারো দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসে না। মুখ গম্ভির করে রাখে। ভাবে হাসাটা বাচালতা।

লোকটার বয়স কত? তিরিশ আর চল্লিশের মাঝামাঝি। দেখতে ভালো। স্মার্ট। চোখের সানগ্লাশটা বেশ চমৎকার। ভদ্রলোক শাপলার দিকে তাকিয়ে চা পান করছেন। ছোট টেবিলে কতগুলো বিস্কুট। তিনি ওদের দিকে তাকান। তারপর যেন আপনমনে কথা বলছেন এইভাবে বলেন-- এই বাংলাদেশ যে এত সুন্দর বিদেশে থাকতে সেটা বুঝতে পারিনি। এই যে সামনের পদ্মা-শাপলা ফোটা পুকুর এত সুন্দর দৃশ্যও হয়?

মমতা বলেন-- আপনি বিদেশে থাকেন? কোথায়?

লসএ্যাঞ্জিলিসে।

ও। বলেন সেই ভদ্রলোক আবার-- মা বাবার সঙ্গে ছোটবেলায় গিয়েছিলাম। ওরা ফিরে এসেছেন। এখন এখানে থাকেন। আমি ছুটি শেষ হলে ফিরে যাব।

এত ভালো লাগছে তাহলে থেকে যান। ফট করে বলে মিমি।

সেটা সম্ভব নয়। চাকরি এবং আরো নানা অসুবিধা।

ঠিকমত বাংলা না জানলে এখন কিন্তু বাংলাদেশে চাকরি হয় না।

সেটা তাহলে সবচেয়ে বড় অসুবিধা।

ওরা সকলে একসঙ্গে হেসে ওঠে।

আমি অয়ন কাজল।

আমি মিমি আর উনি আমার মা মমতা।

মা? ভদ্রলোক বলেন--আমি ভেবেছিলাম আপনারা দুই বোন।

অনেকেই ভাবেন। মিমি বলে। মা একটু লজ্জিত হন। মিমি বাবার মত ধবধবে ফর্সা। মায়ের রং এত বেশি সাদা নয়। গাছপালার ছোঁওয়া লাগা সবুজ-শ্যামল। তবে মিল আছে চোহারায়। মায়ের মুখে বয়সের রেখা পড়েনি। আর মিমি তো পঁচিশ বছরের সাইকেল চড়া, টেনিস খেলা, জগিং ফেনসিংএর মেয়ে। এখন একটা কলেজে ইংরাজি পড়াতে শুরু করেছে তবে সুযোগ যে কোনদিন এসে যাবে বাইরে যাবার। ওর ইচ্ছা অস্ট্রেলিয়াতে যাবার। ইউ কে বা ইউ এস এ নয়। আরো ইচ্ছা অস্ট্রেলিয়াতে গেলে ওর মাকেও নিয়ে যাবে। সবই ইচ্ছা, সবই ভাবনা এখনো এসব সত্যি হতে প্রচুর হার্ডল রেস, কাঠখড় পোড়ানো। তবে মিমির ধারণা ছয়মাসের ভেতরে সবকিছু হয়ে যাবে।

কতদিন থাকবেন? মিমি প্রশ্ন করে।

কোথায়? এখানে না বাংলাদেশে?

এখানে, এই হোটেলে?

আরো সাতদিন। কালই এলাম।

আপনারা?

পাঁচদিন।

ভদ্রলোক বলেন--তাহলে তো আপনাদের সঙ্গে দেখা হবে। খুব ভালো লাগছে। ভদ্রলোক ওঠেন-- আমি একটু ভেতরে গেলাম। একটু কাজ আছে।

দুইদিন পর মাঘী পূর্নিমা। মিমি বলে।

চাঁদ, পূর্নিমা এসব নিয়ে কোন ধারণা আছে আপনার। মানে এসব ভালোবাসেন? আইমিন এনি আইডিয়া হাউ এ ফুল মুন ইন সি লুকস লাইক? তারপর মায়ের দিকে তাকিয়ে বলে-- সরি মা। মা বলেছেন কথায় কথায় ইংরাজি না বলতে।

ভদ্রলোক হাসছেন। বলেন-- আমার মা ও একই কথা বলেন। বলেন পুরো ব্যাক্য ইংরাজিতে না হলে পুরো ব্যাক্য বাংলায়। খিচুড়ি করে কথা বলবে না।

অয়ন কাজল উঠে গেলে মিমি বলে-- মনে হয় বেশ মিশুক আর বেশ সোফিসটিকেটেড ভদ্রলোক।

মা সোফিসটিকেশনের বাংলা কী?

একটু ভেবে মমতা বলেন--পরিশীলিত।

ওরা ভেবেছিল ওদের আগে আর কেউ সমুদ্রে যায়নি সূর্যোদয় দেখতে। ওদের ধারণা ভুল। অনেক লোক এসে গেছে। আর ওদের মধ্যে একটা সুন্দর নীল সোয়েটার আর ট্রাউজারে দাঁড়িয়ে আকাশ দেখছেন অয়ন কাজল।

সুপ্রভাত! মিমিই বলে প্রথমে।

অয়ন কাজল হাসতে হাসতে বলে-- সুপ্রভাত।

এ কথা সে কথা। কখনো চুপ করে থাকা। সুর্যটা উঠে আলো ছড়ায়। ওরা ঠিক করে এবার ফিরে ব্রেকফাস্ট বা নাশতা সেরে নিতে হবে। তারপর? অয়ন কাজল মোটর সাইকেল ধার করেছেন বা ভাড়া নিয়েছেন সে নিয়ে তিনি ছুটবেন। মিমি বা মমতা যদি চান ওদের সঙ্গে নেবেন। ওরা কিছু বলে না চুপ করে কী ভাবছে। বলেন অয়ন কাজল-- এক সময় মিমিকে ঘুরিয়ে তারপর আপনাকে নিয়ে যাব। যাবেন?

ওরা হাসছে। কেন নয়? অন্য এক অপরিচিত মোটর সাইকেল চালকের চাইতে আপনি কী বেশি ভালো নন। ওরা বুঝতে পেরেছে লোকটা গুন্ডাটুন্ডা তো নয়ই এবং বেশ সহজ একজন।

সেটা কী করে বলি আমি দক্ষ মোটর বাইক চালকের চাইতে ভালো কী মন্দ? ওরা তো অনেকদিন থেকে এ কাজ করছেন। আমি দুদিন হলো শিখেছি। বাবার জায়গাটা পছন্দ বলে উনিই টিকিট, থাকা সব ঠিক করে রেখেছিলেন। এরপর আরো নানা জায়গায় যেতে হবে। কুয়াকাটা ইজ এ গ্রেট প্লেস। একটি অসাধারণ জায়গা। বাবা চান তাঁর ছেলে দেশটাকে খুব গভীর করে ভালোবেসে ফেলুক।

মিমিই প্রথমে মোটর সাইকেলে ওঠে। মমতা একটা চেয়ার ভাড়া করে সমুদ্র দেখছে। আর কী সব ভাবছে। বেশ তাড়াতাড়ি অয়ন কাজল আপন হয়ে গেছে।

বাতাসে মিমির গলার স্কার্ফ পাখা মেলে উড়ছে। আর অয়ন গান করছে। -- লিন অন মি ইফ ইউ আর নট স্ট্রং---। বেশ গলা। মিমি বলে-- আপনি বেশ গান করেন অয়ন কাজল।

গান আমার ধর্ম। ঈশ্বর বলে যদি কেউ থাকে তার কাছে যাবার পথ বা মাধ্যম। আপনি না ঠিক আছে তুমি বলছি -- তোমার গান ভালো লাগে।

ভালো লাগে। তবে আমার মা গান পাগল। শোবার ঘরে, রান্নাঘরে, বসার ঘরে, ইস্ত্রি করবার ঘরে, কমপিউটার ঘরে, সবখানে তার গান।

সাগরের উচ্ছ্বাস বা শব্দ্ কি সব পাখিদের আসা যাওয়া। মোটর সাইকেল ছুটছে সেই সবের ভেতর দিয়ে। আর মিমির মনে হলো-- গতির ভেতরে যে জীবন তেমন জীবন আর কোনখানে থাকে না। গতি বন্ধ মানে জীবন স্তব্ধ।

আমার মা বাংলা গান ভালোবাসেন। আর পুরণো হিন্দি গান।

তুমি?

আপনি যা যা গাইছেন সবই আমার প্রিয়।

গানের সুরটা চারপাশ ভরিয়ে ওদের নিয়ে চলেছে কোন এক মন্দিরের দিকে।

থামারই বা দরকার কী? যা দেখবার তার চেয়ে ভালো এই চলা। মন্দিরের চাইতে ভালো সাগর ধরে ছুটে চলা। বলে মিমি।

একটু বিশ্রাম হবে।

তা ঠিক।

ওখানে চা আর ডিম সেদ্ধ বিক্রি হয়। দুজনেই দুটো ডিম খেয়ে চা খেয়ে নেয়। বেশ লাগে। বলেন অয়ন কাজল--তোমার হবি কী মিমি?

বই পড়া, ছবি আঁকা আর সিনেমা দেখা।

তোমার হবিতে গান শোনা নেই।

ওটা হবি নয়। ভালো লাগলে শুনি।

আচ্ছা আপনি কী গান কোন ওস্তাদের কাছে শিখেছেন?

একজন শিখিয়েছিলেন। তারপর এখন নিজেই গাই। বিদেশে গান গাইবার ডাক পড়ে নানা পরবে।

আপনি কিছু বাজাতে পারেন?

ভালোলিন আর গিটার। আর সুর তুলতে পারি কী বোর্ডে।

আপনি তো অসাধারণ?

অয়ন কাজল হাসছে।

খুবই সাধারণ। এতদিন ওদেশে থেকেও মাছ-ভাতের জন্য মন হাহাকার করে।

মিমির খুব জানতে ইচ্ছে করে ভদ্রলোক কী বিবাহিত? তাঁর কী ছেলেমেয়ে আছে? কিন্তু ফট করে এমন একটা প্রশ্ন করতে বাধে ওর। বলে কেবল--পূর্নিমা রাতে সাগর থেকে ফিরে আমাদের ঘরে তিন জনার একটা পার্টি হতে পারে। আপনি বাজনা বাজাবেন। মা কবিতা পড়বেন। আপনি বললে একটা গান শুনিয়ে দেব। বলেই মিমি হাসে। ভদ্রলোক বেশ একটু মিষ্টি চোখে মিমির দিকে তাকিয়ে আছেন। কাজল টানা চোখ। কপাল ব্যান্ড অনুশাসিত চুলের ভেতরে সুন্দর হয়ে জেগে আছে। কিছু কুচো চুল এখানে সেখানে।

ফিরতি পথে মিমি ভদ্রলোকের কোমর জড়িয়ে চুপচাপ গান শুনছে। ভদ্রলোক কিন্তু কখনো হুল্লোড়ে গান করেন না। সবগুলোই মায়ের পছন্দের। মিমিরও খারাপ লাগছে না। মিমি মোটর সাইকেল থেকে নামতে নামতে বলে--কী চমৎকার সময় গেল।

মমতা এগিয়ে আসেন। কিছু বলার আগেই ভদ্রলোক বলেন --একা একা কী করছিলেন।

সমুদ্র দেখছিলাম। আপনাদের সময় ভালো কেটেছে তো?

কী মিমি কেমন কেটেছে সময়?

চমৎকার!

একটু রেস্ট নিয়ে আবার বেরিযে পড়া যাবে। ওরা কেবল বড় বুদ্ধ মূর্তিটা দেখে ফিরে এসেছে। বলেন-- অয়ন কাজল। এখানে আরো অনেক কিছু আছে।

বলে আমার বাবা একটা লিস্টি বানিয়ে দিয়েছেন। এই বলে পকেট থেকে বাবার হাতে লেখা লিস্টিটা বের করে। মিমি আর মমতা ঝুঁকে পড়ে লিস্টির উপরে। মমতা বিচের খাবার খেয়েছে। ওরা চা আর ডিম। এই অসাধারণ সৌন্দর্যের ভেতর খাওয়া নিয়ে কেউ এখনো কিছু ভাবছে না। চারিদিকে কোলাহল। নৌকা এখানে সেখানে। কিছু কিছু নারকেল গাছ ঝুঁকে আছে সমুদ্রে। ছায়া পড়েছে। দিনটা সুন্দর। আগামী কাল পূর্নিমা। এখন সূর্য অকৃপন।

বলে অয়ন কাজল--আজ আমরা লেবুর চরে যাইনি। কাল যেতে হবে। ওখান থেকে সূর্যোদয় খুব ভালো দেখা যায়। আর সন্ধ্যায় কাউয়ার চরে--সেখান থেকে সূর্যান্ত। অসুবিধা নেই, আমি তো এই মোটর সাইকেলটা একেবারে ভাড়া করে নিয়েছি। দুই চরেই বন আছে। এ ছাড়া ১৫/২০ কিলোমিটার ড্রাইভটাই তো অসাধারণ। আর সূন্দরবনের সৌন্দর্য দেখতে আমরা ফাতরার চরে যেতে পারি। সেখানে ঝাউবন। লেক। পাখি আর প্রজাপতি। না দেখলে বোঝানো যাবে না। দুইদিন আগে এসে আমি একটু একক্সপ্লোর করেছি, তাই মোটামুটি অনেক কিছু জেনে ফেলেছি। আর বুদ্ধদেবের মন্দির। তোমাকে যেখানে নিয়ে গিয়েছিলাম মিমি সেটাই সবচেয়ে বড় বুদ্ধ মুন্দর। এই বুদ্ধমূর্তি সাউথ এশিয়ার ভেতরে সবচেয়ে বড় বুদ্ধ মূর্তি।

ওরা অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। কথা শুনে মনে হয় যে কোনো গাইডের চেয়ে বড় গাইড এই অয়ন কাজল।

এ ছাড়া আরো কিছু আছে?

লেবুর চরের ভেতরে জলবিহার নৌকায়। ফাতরার চরে গেলে মনে হবে আমরা সুন্দর বনে। আর আছে জেলেপল্লি। শুটকি ও তাজা মাছের জন্য অনেকেই ওখানে যায়। আর আছে নারকেল আর ডাব। কথা বলতে না বলতেই ডাব ওয়ালা তিনটে ডাবে স্ট্র বসিয়ে ওদের দিয়ে যায়।

মমতা বলে-- অয়ন কাজল আমি বলছি কী আজ আর কোথাও যাবার দরকার নাই। কাল তিনজন একসঙ্গে বেরিয়ে পড়া যাবে। দেখতে পাচ্ছেন কেউ আমরা তেমন ওজনদার নই। অনায়াসে তিনজন মোটর বাইকে উঠতে পারি। চারপাশে তাকিয়ে মিমি বলে-- তাইতো ওরা তো তিনজন তিনজন করে ঘুরছে। মানে মোটর সাইকেলওয়ালা বাদে আরো দুইজন।

কিন্তু তার আগে আপনার যেটা ডিউ সেটা করতে হবে। উঠুন মমতা। এখন তুমি বসে থাকো মিমি। ফিরে এসে আমরা লেবুরচরে বার্বাকিউ ভোজনে যাব। মাছ বার্বাকিউ।

মোটর সাইকেল যেই না চলতে শুরু করেছে একটা পুরণো হিন্দিগানের সুরে চমকে ওঠেন মমতা। ‘ইয়ে রাত ইয়ে চাঁদনি’ অমিয় কাজলের কাছে শুনবেন ভাবেন নি।

এইসব গান?

মায়ের জমানো সি ডি। ভালোকথা আমার মা গানপাগল ছিলেন। যেটা আমি পেয়েছি। ওঁর সিডি থেকে শেখা এইসব গান। বিদেশে খুব ডাক পড়ে এইসব গাইবার জন্য। এরপর অয়ন কাজল গান ভালোলাগা, শেখা, সংগ্রহের কথা বলে।

অপূর্ব এই চলা। মমতা কোমরে ওড়না ভালো করে জড়িয়ে নিয়েছেন। মিমির মত টি সার্ট আর জিনস নয়। তাঁর বড় খোঁপার বেনিতে বড় ক্লিপ। যেন অনেকদিন পর কোন এক অভূতপূর্ব সময় ঝিনুকের মুক্তোর মত নিজেকে মেলে দিয়েছে। মন্দির দেখে, পাশাপাশি বসেও মমতা প্রশ্ন করতে পারেন না অয়ন কাজল কী বিবাহিত না অবিবাহিত, ডিভোর্সী না সেপারেটেড। দরকার কী এইসব প্রশ্নের। গানের রেশ, চলার রেশ, গতির রেশ, সাগরের পাশ দিয়ে চলার আনন্দ। এইসব থাক। বলেন তিনি--কী ভাগ্য আমাদের অয়ন কাজল আপনার মত এমন একজনকে পেয়ে গেলাম আমরা। একটু বসে ওর গান নিয়েই কথা হলো। অয়ন কাজল কেবল ওর মায়ের কথা বলছিল। আর মমতা ওর নিজের কথা। কত বয়স হবে মমতার মনে মনে ভেবেছিল।

তারপর? যেন অর্নিবান পাখির পালক থেকে ঝরে পড়লো কয়েকটা দিন। সোনার জলে ধোওয়া। আনন্দ, আনন্দ। অয়ন কাজল বলে--বাবার দেওয়া নাম অয়ন মায়ের দেওয়া কাজল। একটা নাম বেছে নিয়ে ডাকতে হবে। তিনজন অয়নের মোটর বাইকে ঘুরে বেড়ালো নানা জায়গা। ফাতরা দ্বীপে এস এর রূপে মুগ্ধ হলো তিনজন। বারবার মুগ্ধতা ওদের ছেয়ে ফেললো।

ঘরের ভেতরের ছোট পার্টিতে অয়নের গিটার সুর তুললো সেই পুরণো গানের--নাহি চাঁদ হোতা/ না তারে রাহেঙ্গে। তারপর কান কাটা ভ্যান গফের গান-- স্টারি স্টারি নাইট। একটা হুল্লোড়ে গান কোনমতে গেয়ে ফেললো মিমি। অয়নের গিটারে। মিমির গলা ভালো। আর মমতা জীবনানন্দের ‘আবার আসিব ফিরে।’

লেবুর চরের বার্বাকিউতে মাছের স্বাদ উপভোগ করতে করতে বললো অয়ন এইসব দিনগুলো ভোলা যাবে না।

আমিও না। মিমি চড়ুই পাখির মত কিচ কিচ করে বলে। -- ভুলবার দরকার কী? বললো মমতা।

বিচের ছল ছল বালুতে উপুড় হয়ে থাকা নৌকা আর সবুজ নারকেল গাছের দিকে তাকিয়ে অয়ন বলে--মায়ের বড় ভয় ছিল হয়তো একদিন আমি বিদেশী হয়ে যাব। এখন যদি মা আমাকে দেখেন বড় খুশী হবেন। আমি বিদেশী হয়ে যাইনি মা। এখন তুমি আমাকে দেখ।

মমতা ছল ছল চোখে বলে-- মা কোথায়?

মা নেই। এক গাদা বাংলা বই আর এক গাদা ক্যাসেট, সিডি, গানের বই রেখে গেছেন আমার জন্য। আমি মায়ের যেমন পছন্দ তেমন হয়ে উঠবার চেষ্টা করেছি।

এবং আপনি সাকসেসফুল। বলে মিমি।

রাতে মিমি নিজের খাটে শুয়ে আঁধারে বলে মাকে-- মা জাভেদ আমার ব্যাপারে বড় সিরিয়াস।

কী বলেছে ও? মা জাভেদকে জানেন। ওরা দুজন একসঙ্গে পড়াশুনা শেষ করেছে।

একসঙ্গে বিদেশে যাব। তার আগে-----। মিমি শেষ করে না।

বুঝলাম। মমতা বলেন। তোর যদি কোন আপত্তি না থাকে আমার নেই। জাভেদ চমৎকার ছেলে।

অন্য বিছানা থেকে বোধহয় অন্ধকারে কতগুলো শব্দ ঝুঁড়ে দেয় মমতা। --আমি বলিনি। আসবার আগের দিন পেলাম। তোর বাবা লিখেছেন-- মমতা তুমি কী আমাকে ক্ষমা করতে পারবে? আমি একটা মস্ত বড় ট্রান্সের ভেতর ছিলাম।

মা! তুমি বলনি তো?

বলিনি। কারণ এখনো বুঝতে পারছি না কী জবাব দেব।

মা। বাবাকে ক্ষমা করে দাও।

মমতা পাশ ফিরতে ফিরতে বলে-- একটু ভাবতে দে রে মিমি। সকালে যাত্রা। একটু ঘুমিয়ে নিলে হয় না।

নিজের ঘরে বাবার সঙ্গে কথা বলছে অয়ন।-- বাবা কেমন আছো?

ভালো। তুই কেমন রে অয়ন?

খুব ভালো বাবা। বাবা পারিজাত নামে যে মেয়েটাকে কায়দা করে দেখিয়েছিলে তখন কিছু বলতে পারিনি। এখন বলছি ওকে পছন্দ হয়েছে।

আলহামদোলিল্লাহ অয়ন। সাত বছর একটা বিদেশী মেয়েকে নিয়ে ঘর করলি। মেয়েটা বুকে চাকু চালিয়ে চলে গেল। এখন আমার পারিজাতকে পছন্দ কর। বন্ধু রাশেদের মেয়ে। দৃপ্ত, সহজ, সুন্দর, অনাবিল। বাবা একসময় বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা পড়াতেন।

ঠিক আছে বাবা।

কী করে হঠাৎ মত বদলে গেল তোর? আহা তোর মা থাকলে ---। বলছিলি বড় হয়েছিস ওদেশে। বাংলাদেশী মেয়ে কী তোর সঙ্গে নিজের জীবন মেলাতে পারবে। তোর মত সহজ হবে?

ঠিক আছে বাবা এই তো আর দুইদিন পর আসছি। জানো তো বাবা আমার মনে হয়েছিল বাংলাদেশের মেয়েদের ‘সেন্স অফ হিউমার’ নেই। সব ব্যাপারে খুব সিরিয়াস।

বাবা হাসেন। হঠাৎ কেমন করে মনে হলো--পারিজাতের আছে? তোকে বলছি পারিজাত রামগরুড়ের ছানা নয়। তবে পড়াশুনার ব্যাপারে-- ডেড সিরিয়াস। ঠিক তুই যেমন।

বাবা ফোন রাখেন।

এই পাঁচদিন দুটো প্রাণ তাকে যে ভাবে সঙ্গ দিল তাতে অয়ন বুঝতে পেরেছে অনেক কিছু। কোনজন বেশি মনের মত? একজন গভীর নদী আর একজন ঝর্না। একজন মাতাল হাওয়া আর একজন সুমন্দ বাতাস। মনে মনে বলে অয়ন-- পারিজাত ওদের দুজনের একজনের মত হলেই হবে। আর যদি না হয়? তখন দেখা যাবে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন