সোমবার, ১৩ আগস্ট, ২০১৮

সাত্যকি হালদারের গল্প ঃঃ ভারতবর্ষ

‘‘এই গ্রামে প্রধানমন্ত্রী এসেছিলেন।’’

ঘন জঙ্গলের মাঝে গাড়ি যাওয়ার সরু যে পথ, তার এক পাশে লাগানো বোর্ডটা। সিমেন্টের পিলারের গায়ে, মাটি থেকে হাত দশেক উঁচুতে। নীলের ওপর সাদা অক্ষর। প্রথম লাইন ইংরিজিতে, পরে একই বার্তা অসমিয়ায়, সামান্য ছোট হরফে। বোর্ডের নীল রঙটা ফ্যাকাসে হতে হতে জঙ্গলের রঙে মিলে গেছে। চোখে পড়ছে শুধু সাদা অক্ষরগুলোর জন্য।

বোর্ডটার খানিকটা আগে ফাঁকা একটু জায়গা পেয়ে দাঁড়িয়েছিলাম আমরা। অনেকখানি চলার পর ওইখানে একটি মাত্র দোকান।

দোকানের ধরণটাও অদ্ভুত। এখানের এই দক্ষিণ মেঘালয়ের ঘৱবাড়ির মতো। উঁচু বাঁশের মাচা, তার ওপর বাঁশ বিছিয়ে দোকান। জিনিস কিনতে হলে কয়েক ধাপ বেয়ে ওপরে উঠে যেতে হয়। সেখানে দাঁড়িয়ে কথা হয় দোকানির সঙ্গে। দোকানি লোকটার খালি গা, চওড়া মুখে ছোট চোখ, ছোট কপাল, বয়স পঞ্চাশ ছাড়িয়ে। লাল-কালো পুরানো একটা চেক-লুঙ্গি পরে সে দোকান করে যাচ্ছে।

সিগারেটের খোঁজে দাঁড়ানো ঠিকই, কিন্ত শইকিয়া গলা তুলে বলেছিল, রাতের রেশনিং কি সেরে নেব এখান থেকে? সামনে দোকান পড়বে কিনা ঠিক নেই।

বিকেল তিনটে পার হয়ে গেছে। দিনের কাজ শেষ। পর দিন রবিবার। ফলে চক্রবর্তী পেছনের সিটেই টাল খেয়ে রয়েছে। শেষ বিকেলে কোথাও একটা পাখি ডাকছিল ভেতরের বন থেকে। চারপাশ ঘন সবুজ। আমি শইকিয়াকে বললাম, আমাদের মতামতের তো কিছু নেই। এসব জায়গায় আপনিই শেষ কথা।

তবু জেনে নেওয়া একবার। শইকিয়া বলল।

ওকে বললাম, যা যা ভালো মনে হয় নিয়ে নিন।

এদিকের কাজ ও চলাফেরায় খগেন্দ্র শইকিয়া সত্যিই শেষ কথা। নাহারকাটিয়ার ছেলে, পড়াশুনা গুয়াহাটিতে। জিওলজিক্যাল সার্ভেতে ঢোকার পর কিছু দিন ওড়িষার কেওনঝোরে পোস্টিং হয়েছিল। বছর তিনেক পর নিজের রাজ্যে। বাবার ট্রান্সফারের চাকরির সুবাদে নর্থ-ইস্টের অনেকখানি চেনা। নর্থ-ইস্টকে পছন্দও করে ও। প্রায় সব কটা স্টেট নিজের টানে ঘোরা। গত বছর মণিপুর বর্ডার দিয়ে দৈনিক পারমিট জুটিয়ে পরপর দুদিন বার্মা ঘুরে এসেছে।

ও বলল, চক্রবর্তীর সঙ্গে কথা বলে তো লাভ নেই। কিছু বলার অবস্থাতেই নেই উনি। রাতে আপনি কোথায় থাকতে চান?

কেন, সার্কিট হাউসে। সেখানে তো খবর করাই আছে।

শইকিয়া ভাবল কিছু একটা। হাতঘড়ি দেখল। তারপর বলল, এখনও সত্তর কিলোমিটার। তাড়াতাড়ি চললেও বেশ খানিকটা রাত হয়ে যাবে। কিছু না হোক আর্মির গাড়িও যে কোনো জায়গায় হল্ট করিয়ে রেখে দিতে পারে।

তাহলে!

শইকিয়া এবার একটু রিল্যাক্সড্। বলল, দেখব কথা বলে কাছাকাছি কোনো বাড়িতে থাকা যায় কিনা? রেশনিং পুরোটা দিয়ে দেব, যেমন আমরা আগেও করেছি।

আবারও ওকে যা ভালো বোঝে করতে বললাম। 

দোকান থেকে আরও কীসব কিনল ও। একেবারেই স্থানীয় ভাষায় কথা বলছিল দোকানির সঙ্গে। ঘন্টা খানেক আগে ছোট নৌকোয় পাহাড়ি নদী পার হয়েছি যখন সেই সময় নৌকোর লোকগুলোর সঙ্গে এমনই কোনো স্থানীয় ভাষাতে কথা বলেছে। আমি কোনোটাই বুঝিনি। তবে এটুকু বুঝেছি দুবারের দুটো ভাষা আলাদা। পথে অন্যদের সঙ্গেও কথা চালিয়েছে ও।

মেঘালয়ের এই এলাকায় সিলিমেনাইটের খোঁজে আসা আমাদের। বছর দশেক আগেই এলাকার আশেপাশে মাটিতে ধুলো হয়ে মিশে থাকা এই আকরিকের খোঁজ পায় তুহিন বাগচি নামে আমাদের প্রাক্তন সহকর্মী। তারপর থেকেই আমাদের আসা, আরো অনেক সহকর্মীর পড়ে থাকা। ধাতু গলানোর চুল্লি তৈরিতে সিলিমেনাইটের ইট লাগে। সাড়ে ছ-হাজার ডিগ্রিতেও গলে না বা পোড়ে না। সম্প্রতি মেঘালয়ের বনাঞ্চল জুড়ে মাটির নীচে বিপুল খনি খুঁজে পাওয়া গেছে। খোঁড়াখুঁড়ির কাজ শুরু হবে। তার সার্ভেতেই বারবার আসতে হচ্ছে আমাদের।

চালডাল আনাজপাতির ব্যাগটা হাতে ঝুলিয়ে হেঁটে এল শইকিয়া। আমি তখনও অ্যামবাসাডারের মধ্যে ড্রাইভারের পাশে বসা। শইকিয়া হাতের ইশারায় ড্রাইভারকে গাড়ি ঘুরিয়ে নিতে বলল। দু-পাশে ঘন জঙ্গল। আকাশে মাথা তোলা বড় গাছ। নীচে নানা রকম বাঁশ আর বেত। দোকানের একটু আগে উল্টোদিকের ঝোপঝাড়ের মধ্যে পথ আছে আমি তা খেয়াল করিনি। শইকিয়ার নির্দেশে সেদিকেই গাড়ি ঢুকে এল। ও পেছনে উঠে বসে গেল দলা হয়ে থাকা চক্রবর্তীর পাশে। 

সাঁয়ত্রিশ-আটত্রিশ বয়স হবে খগেন্দ্র শইকিয়ার। মেদহীন চেহারা। নাক-চোখে নর্থ-ইস্টের ছাপ। কোঁকড়ানো চুলের নীচে সরু কপাল, তার নীচে সরু ফ্রেমের চশমা। ইংরিজিটা মাতৃভাষার মতো বলে যেতে পারে ও। হাতের তালুর মতো চেনা এই সব এলাকা।

গাড়ি এগোতে থাকে জঙ্গলের পথে। বুনো ঝিঁঝিঁ ডাকছিল তীব্র শব্দে। মাটির পথে চলায় গাড়িটা দুলছিল। মাঝেমাঝে সরু বাঁক। আমার কথার খানিক পরে শইকিয়া বলল, এদিকের অনেক গ্রামে আমি আগেও থেকে গেছি। এমনকি এটাতেও।

কেন থেকেছেন? প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে নাকি!

শইকিয়া বলল, বোর্ডটা চোখে পড়েছে তাহলে! অবশ্য পড়বে নাই বা কেন?

মাঝখানে ঝাঁকানিতে বা অন্য কোনো কারণে হবে, চক্রবর্তী চোখমুখ কচলে উঠে বসল একবার। পেঁচিয়ে বোতল খুলে জল খেল। ঘোলাটে চোখে চেয়ে থাকল গাড়ির সামনের কাঁচের ভেতর দিয়ে। মাঝেমাঝে বিজ্ঞের মতো আধ-টেকো মাথাটা ওপর-নীচ করছিল। বিড়বিড় করে বলল, বুঝতে পেরেছি, তার মানেই অন্য ধান্দা। আমিও গায়েগায়ে থাকছি। 

পেছনের দিকে মাথা ছুঁইয়ে এলিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল আবার।

দুপাশের গাঢ় কালচে সবুজ ঠেলে এগিয়ে যাচ্ছি আমরা। পৃথিবীর এই প্রান্তে বর্ষাকাল কখনো ফুরোয় না। এখানের যে সবুজ তার সঙ্গে মিশে থাকে কালচে রঙ। এই মার্চ মাসেও মাটিতে আর গাছপালায় জোলো ভাব। ভাঙা মাটির গর্তে জায়গায় জায়গায় জমা জল, ধীরে গড়াচ্ছিল গাড়ি। শেষের দিকে অবশ্য একপাল গরুতে পথ আটকে গেল। গরু আছে, রাখাল নেই। প্রায় সব কটা গরুর গলায় ঘন্টা। একসঙ্গে টংটং শব্দ। টানা হর্নেও সাইড দেওয়ার নাম নেই। শইকিয়া বলল, অত তাড়াহুড়ার কী আছে! কাজ তো কিছু নেই। তাছাড়া ওদের আর আমাদের যাওয়া একই গ্রামে। এখনও প্রায় দেড় কিলোমিটার।

শইকিয়ার কথা মতো সেই দেড় কিলোমিটার গরুর পালের পেছনে ঘষটে যেতে হল আমাদের।

যেখানটায় এসে যাত্রা শেষ সেটা একটা ফাঁকা জায়গা। ছোট ঘাসের মাঠ, বর্ষায় সবুজ। মাঠের মাঝে ঝাঁকড়া মাথা নিমগাছ। চার পাশ ঘিরে বনের গায়েগায়ে টঙ-ঘর।

গাড়ির সঙ্গে আসা গরুগুলো এক-দুটো ঘরের পেছনে জঙ্গলে ঢুকে যায়। হয়ত খোঁয়াড় কিংবা জঙ্গলে থাকা অভ্যাস। শইকিয়া আনাজের ব্যাগটা ঝুলিয়ে নিয়ে এসে একদিকের ঘরে ঢোকে।

ওর নির্দেশ মতো গাড়ির ড্রাইভার পেছন সিট থেকে চক্রবর্তীকে ধরাধরি করে বার করে আনে।





সেই প্রধানমন্ত্রীর কথা মনে আছে আপনাদের সেই যিনি সাতাত্তর সালে ক্ষমতায় এলেন...! শইকিয়া বলছিল।

তার মানে তো সেই ভদ্রলোক যিনি রোজ সকালে উঠে... টেকো চক্রবর্তী নেশা কেটে যাওয়ার পর তাকে মনে আনতে পারছে।

শইকিয়া হাসল। বলল, তাছাড়াও অনেক ডেভেলপমেন্টের কাজ আছে ওনার। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার ছ-মাসের মধ্যে তিনি নর্থ-ইস্টে এসেছিলেন। তখনই এই গ্রামেও।

বারো ঘর এক উঠোন বলতে যা বোঝায় খানিকটা সে রকম। চারপাশের টঙ-ঘরের মধ্যে অনেকখানি যে ফাঁকা জায়গা সেখানেই বসে রয়েছি আমরা। জায়গাটা ছোট খেলার মাঠের মতো। সন্ধে পার হয়ে গেছে অনেকক্ষণ। ঝিঁঝিঁর ডাক থেমেছে। হাউক-হাউক শব্দে কী একটা প্রাণী ডেকে উঠছে দূরে বনের ভেতর। অল্প আলোর একটা হারিকেন একপাশে রেখে কাঠের ভারী খুঁটোর ওপর শইকিয়া, চক্রবর্তী, আমি, সঙ্গে গাঁয়ের প্রধান —প্রায় সত্তর বছর বয়স হবে লোকটার। প্রধানের পোশাক ও চেহারা অনেকটা বিকেলের দোকানদারের মতো। ফতুয়া আর লাল চেক-লুঙ্গি। গ্রামের অন্যরা দাঁড়িয়ে দূরেদূরে, ঘরের গা ঘেঁষে। শইকিয়া কথা বলছে, আমরা শুনছি। যখন গাঁও-প্রধানের সঙ্গে কথা হচ্ছে ওর, আমরা তার কিছু বুঝতে পারছি না।

শইকিয়া বলল, শেষ বিকেলে প্রধানমন্ত্রী সেনা বাহিনীর হেলিকপ্টারে গুয়াহাটি ফিরছিলেন। পর দিন দিল্লি ফিরে যাবেন। এই গ্রামের কাছে এসে আকাশে খারাপ হয়ে যায় কপ্টার। জরুরি অবতরণ করে কাছাকাছি কোথাও। প্রধানমন্ত্রী, তার বডিগার্ড আর চালক বেরিয়ে আসার পরই কপ্টারে আগুন ধরে যায়। সন্ধের মুখে জঙ্গলে এক সিকিউরিটি আর ভারতবর্ষের প্রধানমন্ত্রী। কী করবেন, কোথায় যাবেন জানা নেই। এবং সেটা মোবাইল যুগেরও কয়েক দশক আগে...।

লম্বা গল্পের গোড়াটা শুরু করে শইকিয়া দু-চুমুক চা খেল। খানিক আগে আমাদের সামনেই কাঠ কয়লা জ্বালিয়ে তার ওপর কেটলি বসিয়ে শুরু হয়েছিল চা বানানো। গাঁয়েরই দুজন পুরুষ সেটা বানাচ্ছে। জমাট-বাঁধা চা পাতার একটা ড্যালা গরম জলে ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছে। দুধ নেই, চিনি নেই। স্বাদ আমাদের র চায়ের চাইতেও অনেকখানি দূরে। টিনের বাটিতে আমাদের এক-একজনের সামনে দেওয়া সেই চা। 

হারিকেনের লালচে আগুনে খগেন্দ্র শইকিয়ার সঙ্গে গাঁ-প্রধানের আবার গলায় গলায় খানিকটা কথা হল। জঙ্গলে প্রাণীর ডাক কখনো দূরে যায়, কখনো কাছে আসে। শইকিয়া লম্বা করে একবার চায়ে চুমুক দিয়ে বলল, এই বাড়ির দুই ছেলে মাঠে খেলছিল তখন। আরু আর সামু। দশ আর ছয় বছর। তারাই ধুতি-পাঞ্জাবি পরা প্রধানমন্ত্রীকে দ্যাখে প্রথম। দু-পক্ষের কেউ কারো ভাষা বোঝে না। আরু আর সামুই সেদিন অজানা অতিথিকে গ্রামে নিয়ে এসেছিল। 

এই সময় গাঁও-প্রধান কিছুক্ষণের জন্য উঠে গেল। এই মার্চ মাসে তার খালি গা। বয়স হওয়া লোকটা খানিকটা মোটা গোছের হওয়ায় চলাটা ধীরেধীরে। আমরা ভাবলাম প্রাকৃতিক কোনো কাজে সাড়া দিতে গেল হয়ত। কিন্তু ফিরে এল গ্লাসের মতো একটা গোল বড় কাঠের পাত্র হাতে নিয়ে।

আবার নিজের খুঁটোয় বসল লোকটা। কথা হল শইকিয়ার সঙ্গে। শইকিয়া ভারী পাত্রটা আমাদের দেখিয়ে বলল, কাঠের এই গ্লাস এদের ট্রাডিশানাল। প্রধানমন্ত্রীকে এটায় করে সেদিন দুধ দেওয়া হয়েছিল। তারপর থেকে পাত্রটা সাজানো আছে ঘরে। বুড়ো কাউকে ছুঁতে পর্যন্ত দেয় না। বাইরের লোক পেয়ে আমাদের দেখাল।

চা শেষ হলে মুড়ি। শুধু মুড়ি। আবারও এনামেলের বাটিতে। শইকিয়া আগেও এই গ্রামে রাত্রিবাস করে গেছে। চা বানিয়ে দেওয়া লোকদুটোও দেখছি ওর চেনা। শইকিয়া বলল, ঘন্টা দুয়েকের এক অদ্ভুত ব্যাপার। ভারতবর্ষের প্রধানমন্ত্রী গারোদের ভাষা বোঝেন না। গারোরাও হিন্দি-ইংরিজি জানে না। কেউ কাউকে বুঝতে পারে না। যদিও গারো প্রথা-মাফিক অজানা অতিথির আপ্যায়ন শুরু হয়ে গেল। দুধ এল, কলা এল, আলাদা একটি বসার কাঠ। অতিথিও অভিভূত। এও তার দেশ!

তারপর?

এই অবস্থাটা শেষ হল তারপর। যখন সাত মাইল দূর থেকে সাইকেল চেপে থাংগন এল। চার্চের ইস্কুলে টু-থ্রির বাচ্চাদের অংক শেখাতে যায় থাংগন। এক মাত্র শিক্ষিত ছেলে গাঁয়ের। সে এসে ইংরিজি বোঝায় গাঁ সুদ্ধু লোক আকাশ থেকে পড়ল। অবিশ্বাস আর ভয়। এরপর কী আছে কে জানে! রাত সাড়ে আটটা নাগাদ অবশ্য মিলিটারি-প্যারামিলিটারিতে পাহাড় আর জঙ্গল ঘিরে ফেলেছিল...।

কিন্তু প্রধানমন্ত্রী সেদিন ফিরে যাননি। গুয়াহাটিতে রাতে থাকার কথা। কিন্তু তিনি বলেন যে অন্তত একটি রাত গারোদের গ্রামে এদের মাঝে তিনি থেকে যেতে চান। আরু আর সামুকে মাথায় হাত ছুঁয়ে আশীর্বাদ করেন বারবার। বলেন যে, আগামীতে ওদের পড়ালেখার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। গারোদের সমস্ত পথ পাকা করা হবে। কাছাকাছি একটা বড় হাসপাতাল।

প্রধানের সঙ্গে অল্পঅল্প কথা বলছে শইকিয়া। পরে আমাদের কাছে অনুবাদ। হারিকেনের এক পাশে কালি পড়ছিল। হাউক-হাউক ডাকটা তখনো হচ্ছিল, তবে জঙ্গলের অনেক গভীরে। দূরে ঘরের গায়েগায়ে লোকের যাতায়াত চলছিল। 

শইকিয়া বলল, যেখানে আমরা বসে আছি পর দিন সকালে সেখানে সভা হয়েছিল একটা। সারা গ্রাম ভরা মিলিটারি জওয়ান। ভারতবর্ষের প্রধানমন্ত্রী গারোদের নিয়ে কথা বলছেন। তাদের আপ্যায়নের কথা। ভলোবাসার কথা। একটিও মিডিয়া নেই, ক্যামেরা নেই, কোট-আনকোটের খপ্পর নেই। আরু আর সামু দাঁড়ানো প্রধানমন্ত্রীর দুপাশে। অতিথি চলে যাবেন। ওদের মুখ গম্ভীর। প্রধানমন্ত্রী বলছেন, এই ভারতবর্ষকে তিনি চিনতেন না।

তারপর কত বছর হল! খুঁটোয় বসে ঝিমোতে থাকা চক্রবর্তী খানিকটা কৌতুক করে ছুঁড়ে দিল প্রশ্নটা। —ক-টা প্রধানমন্ত্রী এল আর গেল!

চক্রবর্তীর কৌতুক আর প্রশ্নে বিরক্ত হই আমরা। তখনই কথা বলল শইকিয়া। এত কাছে যেন শইকিয়ার গলায় কথা বলল গাঁও-প্রধান। —এই দু হাজার এগারোয় তেত্রিশ বছর...।

রাস্তা কি পাকা হয়েছে! ইস্কুল হল! আমার বিড়বিড় প্রশ্ন।

প্রধানকে শইকিয়া সেটা জানাতে বয়স্ক লোকটা অদ্ভুত ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়াল খুঁটোর সামনে। তারপর প্রধানমন্ত্রীর ব্যবহারের শূন্য পাত্রটা তুলে ধরল মাথার ওপর। দু হাতে দোলাতে লাগল সেটা। 

হারিকেনের আলো ক্রমস ঝাপসা হয়ে গেল। বনে এবার কিছু একটা পাখি ডাকছিল। এদের কি রাতচরা বলে! চারপাশে টঙ-ঘরগুলো ঝাপসা পাহারাদারের মতো। পেছনের লোকগুলো দোলাতে দোলাতে আমাদের জন্য রাতের খাবার নিয়ে এল। এই রাতেও অতিথিদের জন্য আপ্যায়নের ত্রুটি নেই কোনো। 

পর দিন রবিবার। তাড়া নেই। তবু চলে তো যেতে হবে আমাদের। সব কিছুর মধ্যে সেদিনের গল্পের দুই বালককে খুঁজলাম। আরু আর সামু। ভারতের প্রধানমন্ত্রীর আশীর্বাদ মাথায় নিয়ে কী করছে তারা!

শইকিয়া তখনো একটু কথা বলল গাঁ-প্রধানের সঙ্গে। তারপর বলল, তারা নেই। তারা অনেক বছর ঘর-ছাড়া।

ঘর-ছাড়া! ঘর ছেড়ে কী করছে এখন?

শইকিয়া চুপ। একটু দেরি করে উত্তর দেয়। বলে, যুদ্ধ। অস্ত্র হাতে যুদ্ধ...

যুদ্ধ! আঁতকে উঠি আমি। কার সঙ্গে?

মুচকি হাসে শইকিয়া। তারপর বলে, রাষ্ট্রের সঙ্গে। সে রাষ্ট্রের নামও ভারতবর্ষ। 

আমাদের দুধ-সাদা অ্যামবাসাডার স্টার্ট নেয়। শহরের দিকে রওনা হই আমরা।












কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন