সোমবার, ১৩ আগস্ট, ২০১৮

অনামিকাস জার্নাল -- চাই ল্যাটে : ঘৃণার অ্যানাটমি ও হত্যার জড়োয়া উৎসবঃ গোলাপি বিপ্লব ও ওয়ার্ক ইন প্রগ্রেস

অনামিকা বন্দ্যোপাধ্যায়


Fascism is not defined by the number of its victims, but by the way it kills them.
......................................................................................................
~ Jean-Paul Sartre, 22 June, 1953.



জ্যৈষ্ঠের ফেসবুক খুলে দেখলাম বাংলাস্তানে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় আবার ঋত্বিক কুমার ঘটকের পিছনে লাগিয়াছেন।

মানে অ্যাবিউজকে ভ্যালিডেট করিয়াছেন। ( সূত্রঃ ঋত্বিককে আরও মারতাম- সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়)

অপরদিকে 'নিউইয়র্ক টাইমস' লিখিয়াছে- মার্কিন দেশের এই প্রথম লিঞ্চিং মিউজিয়াম গড়ে তোলার খবর।
আর হিন্দুস্তান টাইমস এর খবর হইল- দাদরির জান মহম্মদ এই ঈদে গভীর আশঙ্কায় ও অ-সুরক্ষিত আছেন। ( সূত্রঃ দাদরি'র জান মহম্মদ, মহম্মদ আখলাকের ভাই । বাড়িতে গরুর মাংস রাখায় ২০১৫ সালে পাথর ছুঁড়ে, পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছিল )

*******

আজকাল সুনীলের সেই চেহারাকে আমি প্রায়ই স্বপ্নে দেখি। দিল্লীর সুনীল প্রভাকার।

২০০৭ সালে নন্দীগ্রাম গণহত্যা ও গণ আন্দোলনের ভয়ঙ্কর সময়ে আমাকে তৈরি করতে হয়েছিল 'রেড' চলচিত্রটি। 'রেড' ছবিটি যারা দেখেছেন- তারা মনে করতে পারবেন মৃত্যুর তাড়া খাওয়া সুনীলের মুখের চেহারা। ২০০৭ এর নন্দীগ্রাম গণহত্যা ও রাজনৈতিক সংঘর্ষে উত্তাল। ভয়াবহ যুদ্ধের পরিস্থিতিতে ঘুরে বেড়াচ্ছি। কখনো মুখে বোরখা এঁটে, ক্যামেরা ঢেকে। কখনো এতিম-খানার বেসমেন্টে রাত কাটাচ্ছি। চারিদিকে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি। অসাবধান মুহুর্তে পাশ দিয়ে গুলি ছুটে যাবার ঘটনাও ঘটে গেছে। মহাশ্বেতাদি (দেবী) এসে এই এতিম-খানাতেই দুদিন আগে থেকে গেছেন। কয়েকদিন আগে লেখিকা অরুন্ধতি রায়কে সঙ্গে করে গেছিলাম খেজুরির এপার।

সাংবাদিক সুকুমার মিত্র সাহায্য করছেন অকুণ্ঠ। তিনি মারফৎ লোক্যাল কিছু বিশ্বস্ত মানুষের সাহায্য পাচ্ছি তথ্য সংগ্রহে। কেউই প্রায় মুখ খুলছেননা। চেনা মানুষ দেখা হলেও এড়িয়ে যাচ্ছেন। এর মধ্যে সাতেঙ্গাবাড়িতে গুলি চলল। শুনতে পেলাম আগুন লাগানো হয়েছে ঘরবাড়িতে। ধর্ষণ চলেছে লাগাতার। শিশু নিয়ে নারীরা ত্রানশিবিরে।

এ পরিস্থিতিতে সাতেঙ্গাবাড়ির মানুষের বয়ান রেকর্ড করতে যেতেই হবে। এদিকে আমায় যেতে বাধা দিয়ে দু-দিন ধরে আটকে রেখেছেন সি-আর-পি-এফ এর ডি-আই-জি অলোক রাজ। বাইরে থেকে কাউকে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছেনা। ফোর্স এর সাথে না গেলে আমায় ঢুকতে দেবেন না। পরিচিত লোক্যাল লোকজন আছেন ইত্যাদি নানা কিছু বলেও কাজ হয়না। একদিন সকালে ডেকে পাঠালেন তার বেস ক্যাম্পে- একটি ছেলেকে আপনাকে দায়িত্ব নিয়ে আপনাদের গাড়িতে কলকাতা হয়ে দিল্লী ফেরত পাঠাতে হবে। ফেরার সময় চিন্তা নেই। পেছন পেছন গাড়ি যাবে, সে উলুবেড়িয়া অবধি সঙ্গে থাকবে। আর এই আমার

হট-মেইল নাম্বার। পৌঁছে আমায় একটা খবর দিয়ে দেবেন।

এক পাঞ্জাবী যুবক। লম্বা, সুদর্শন, বলিষ্ঠ চেহারা। চোখদুটো সটান দেওয়ালের দিকে স্থির হয়ে আটকে আছে। অস্বাভাবিক। মমিগ্রস্ত। মনে করতে পারলাম, মেধা পাটেকারের সাথে ওকে কাজ করতে দেখেছি। জানলাম, এখন রয়েছেন নন্দীগ্রামে। একটি সংস্থার তরফে হত্যার পরিসঙ্খ্যান জোগাড় করতে। এই বিপদসংকুল ভিন ভাষার দেশে, যুদ্ধ পরিস্থিতির গ্রামে গ্রামে ঢুকে প্রাণ ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন তিনি।

গতকাল মৃত্যুমুখ থেকে বেঁচে ফিরেছেন সুনীল। তখনো প্রাণভয়ে ধকধক করছেন।তার চোখ মুখ জুড়ে অসীম ত্রাস। দেখে মনে হচ্ছিল সাহসী যুবকটি এখনো মৃত্যুকে কোলে করে বসে আছেন। টানা একঘণ্টা মৃত্যুর তাড়া খেয়ে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন শ্বাস নিয়ে কোনমতে ক্যাম্পে পালিয়ে এসেছেন। মৃত্যুর এমন ছায়া আমি কোন মৃত্যু পথযাত্রী মানুষের মুখে দেখিনি। সোনাচূড়া'র কাছে এক গ্রামে ধর্ষিতা গৃহবধূ ও অসুস্থ, আহত শিশুদের পরিসঙ্খ্যান জোগাড় করতে গিয়েছিলেন। হঠাৎ পেছন থকে জোর আওয়াজ আসতে থাকে। কেউ খবর দ্যায়- তার পেছনে বিশ থেকে তিরিশজন মানুষ খোলা তরবারি নিয়ে ছুটে আসছেন সুনীলকে হত্যা করবেন বলে। সুনীল প্রাণ নিয়ে দৌড়তে শুরু করেন। তাকে এর-ওর বাড়ীর ভেতর দিয়ে সামরিক ক্যাম্পের দিকে নির্দেশ করে রাস্তা দেখাচ্ছে দুটি অল্পবয়েসী ছেলে। ত্রাস সৃষ্টি করার জন্যে তারা আশে পাশের বাড়িতে আগুন লাগাতে লাগাতে আসছে। আসার পথে শত্রুদলের বাড়ির গোয়ালের একটি গরুর পা কেটে নিল একজন।

তাদের মারহাব্বা দৌড় ও জান-খানখান করা চিৎকারে বাচ্চা বুকে করে ঘরে আগল দিল মেয়েরা। অন্যপক্ষের লোকরা আত্মরক্ষায় পুকুরে নিঃশ্বাস চেপে রেখে ডুবে বসে আছে কেউকেউ। স্বপক্ষের লোকেরা ঘর থকে বঁটি-কাটারি নিয়ে বেরিয়ে এসে মিছিল বাড়িয়ে তুলছে।

ক্যাম্পে তার এ বর্ননা শুনতে শুনতে আলোক রাজ চিৎকার করে উঠছেন- সিভিল ওয়্যার কি জানেন? দেখেছেন? রণক্ষেত্র । রণক্ষেত্রে আছি আমরা। এখানে কি গর্বাচেভ হতে এসেছেন?

আমি এসবে কান করিনা। সাতেঙ্গাবাড়ি আমায় ঢুকতেই হবে।

পরেরদিন আধা-সামরিক বাহিনীর কনভয়ের সাথে সাতেঙ্গাবাড়ি ঢুকলাম। চারিদিকে থিক থিক করছে ব্ল্যাক ক্যাট কম্যান্ডো। আর নৈঃশব্দ্য।ভয়ঙ্কর নৈঃশব্দ্য। শ্মশানের নিস্তব্ধতা। চারিদিকে মহিলা সি আর পি এফও প্রচুর। সঙ্গে এসেছেন সুনীলকেও। আর আছেন লেঃ কম্যান্ডার অরবিন্দ উপাধ্যায়। চারদিকে জ্বলে যাওয়া বাড়িঘর। ভয়ার্ত বোবা শিশু, ধর্ষিতা নারী'র গোঙ্গানি। সারা দিনের মধ্যে যা রেকর্ড করার করে সন্ধ্যের মুখে তাদের সাথেই ফিরতে হবে আবার। সন্ধ্যের পর থাকা যাবেনা। যে দুএকজন আছেন গ্রামে, তারাও সন্ধ্যের পর আর থাকবেননা। ফেরার সময় অলোক রাজকে গভীর ধন্যবাদ দেওয়া ছাড়া আর কিছুই বলার ছিলনা। সঙ্গে পেলাম তার একটি দুর্লভ ইন্টার্ভিউ। সুনীল আর আমি মনে মনে তাকে স্যালুট জানাই। আমরা জানতাম তিনি সেদিন শুধুই ডিউটি করছিলেননা। 

এরপরও বহুবার এই পরিস্থিতি ঘটেছে। এর দু'বছর পর লালগড়ে সেই সি আর পি এফই ঘেরাও করে, গাড়ি থামিয়ে আমার ফুটেজ কেড়ে নিয়েছে। নাকের গোড়ায় বন্দুক ঠেকিয়ে। তখন একবার অলোক রাজকে যোগাযোগ করতে চেয়েছি। বুঝেছি তার নম্বর তখন পরিবর্তিত হয়ে গেছে। যেভাবে বুঝেছি দ্রুত পরিবর্তিত হতে চলেছে জঙ্গলমহল ও তার আন্দোলনের ভবিষ্যৎ।

ফেরার পথে স্বাভাবিক হতে চেয়ে কবিতা পড়তে শুরু করলাম। অস্বাভাবিক গুমোট সবার মাথায়। কেউই কোন কথা বলছেনা।

সুনীল পড়তে চেষ্টা করল। আসতে আসতে গলা খুলছে এবার--

পুলিশ কি পিটাই সবসে খতরনাক নেহি হোতি
খতরনাক হোতি হাই
জিতে জি আপনো স্বপ্নো-কা মর জানা



আমি লিখেছিলাম--
এইতো সবচে নিরাপদ
যতক্ষণ পারি জেগে আছি তাই । 

ঘুমের থেকে জেগে থাকা শ্রেয়।। 


এরকমই একটা কিছু। আর মনে নেই।


সুনীলকে নিয়ে মধ্যরাতে আমার বাড়ি ফিরলাম। এর মধ্যে হাইওয়ের ধারে ধাবায় বসে রেকর্ড করে রেখেছি ওর বয়ান। আমাদের আশেপাশে শাদা পোশাকের সেনারাও নেমেছেন। চা খেতে। তাদের গাড়িটিও আমাদের সাথে রওনা দিয়েছে। মধ্যরাতের ধাবায় ঢিকি ঢিকি জ্বলছে তন্দুরের আঁচ। আমার ক্যামেরা ও সহকারী জ্যোতি ও সৌরভ সন্তর্পনে গ্রহণ করছেন দৃশ্য এবং তৎসহ শব্দ। 

সকাল হতেই নিউজ চ্যানেল গুলোর হুড়োহুড়ি পরে গেল। ফোনে অতিষ্ঠ হয়ে গেলাম। কোন চ্যানেলে আমি সুনীলকে আগে হাজির করব তাই নিয়ে প্রতিযোগিতা। যেন ট্রফি জেতা হয়েছে। ধর্মতলায় অপেক্ষা করে রয়েছে এক মঞ্চ- তাতে নানা নন-প্রফিট আয়োজকদের ভিড়। তারা সামনাসামনি পেতে চায় আমাদের। শেষ পর্যন্ত সুনীল আর আমি ঠিক করি কোন চ্যানেলকেই ইন্টার্ভিউ দেবনা।

সে অন্য আরেক কাহিনী, অন্য খাতে কখনো বলা যাবে।

যেকথা বলতে শুরু করেছিলাম। সুনীলকে আমার আজকাল খুব মনে পড়ে। মনে পড়ে যখন প্রতিদিনের খাবারে মেশানো সুস্বাদু বিষের মত দেশ থেকে এক একটি হত্যার খবর আসে। রাজনৈতিক খুন, হিংসা। লিঞ্চিং। মনে পড়ে- যখন দেশ থেকে দশ হাজার মাইল দূরে এই মার্কিন দেশে আমার বাড়ির সামনের কৃষ্ণাঙ্গ পরিবারে রাতে পুলিশ আসে অকারণ হেনস্থা করতে। মনে পড়ে যখন রাস্তায় গাড়ি চালাতে গিয়ে মেহিকান ও কৃষ্ণাঙ্গ মানুষদের প্রতি অকারণ রোড-রেজ এর আড়ালে জাতিবিদ্বেষের বিষাক্ত কিছু চোখজোড়া আবিষ্কার করে ফেলি। দেখে ফেলি উগড়ে আসা অন্তর্লীন ঘৃণা। মনে পড়ে- যখন উদ্বাস্তু শাখায় কাজ করতে গিয়ে প্রতিদিন মিলিত হই মধ্যপ্রাচ্যে খুন হতে হতে বেঁচে যাওয়া অমল কিছু মুখের। এইসব মুহুর্তেই অনেক সারেগামা পেরিয়ে আমার কাছে সঙ্গীতহীন সেসব মানুষের সেইসব চোখজোড়া সুনীলের মত হয়ে ওঠে। সেখানে মৃত্যুর ঝুলন্ত ছায়া- গলগোথার মত পুরনো গন্ধ ছড়াচ্ছে।

যীশুকে সর্বসমক্ষে হত্যার পর আরও দুহাজার কাল কেটে গেছে। সভ্যতার প্রগতিতে শরীরকে আঘাত করে পাব্লিক উৎসবে হত্যার করার বাসনা, লিঞ্চিং এর ভাইরাস এক অম্লান গভীর বনসাই হয়ে টিকে আছে।



মানুষ নিকটে এলে প্রকৃত সারস উড়ে যায়


এ লেখার শুরুতেই এসে পড়েছিলেন- সৌমিত্র মহাশয়। আর তার সম্প্রতি সংবাদপত্রের বয়ান। সেখান থেকে জানতে পারছি- তিনি ঋত্বিক ঘটককে নিগ্রহ করিয়া আজও এই অশীতিপর বয়সেও অত্যন্ত আত্মার আরাম অনুভব করেন। অন্তত আরও মারিতে পারেন নাই বলিয়া আফসোস অনুভব করেন। তার ভাষায়ঃ 'ঋত্বিককে আরও মারতাম'। ঋত্বিক কুমার ঘটকের প্রতি তার যে শারীরিক নিগ্রহ, তা তার কাছে অতি গর্বের বিষয়। তিনি দাবী করেছেন ঋত্বিক তাকে গালিগালাজ করায় তিনি প্রতিশোধ নেন শারীরিক নিগ্রহ করে। বিস্ময়ের কথা হল- তিনি চাইলে তার নামে অভিযোগ দায়ের করতে পারতেন। মানহানি'র অভিযোগ করার সুযোগও তার ছিল। কিন্তু তিনি আইনের আশ্রয় না নিয়ে, তার বদলে শারীরিক আক্রমণকে শিল্প ও সভ্যতা-সম্মত মনে করেছেন ও ঘটনার পঞ্চাশ বছর পার করে কাগজে বিবৃতি দিয়ে তাহাকে সেলিব্রেট করিয়াছেন ।

মানুষ শারীরিক অ্যাবিউজ কেন করেন তাহা প্রায়ই মিথগ্রস্ত কিছু ধারণার জন্ম দ্যায়। যেমন- ইহা এক ভ্রান্ত ধারণা যে মানুষ ক্রোধের সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে অ্যাবিউজ করেন। ক্ষণিকের অন্তর্জনিত রাগ থেকে করেন।আসলে না। তা তারা করেননা। রাগের বহিঃপ্রকাশ এখানে আসলে এক অছিলা হিসেবে খেলা করে। স্বতস্ফুর্ত, গভীর বর্বরতার একরূপ সাফাই। তারা যে বর্বর, মানবিক আচরণের বিরোধী এক মনকে তাদের ভেতরে পুষে রাখেন, রাগের পরিস্থিতিতে তার প্রকাশ সেই বর্বরতাকে খুশী করে দিতে চাওয়ার একটি প্রকারান্তর মাত্র। বর্বরতা দেখানোর জন্যে একটি সুযোগের অপেক্ষায় থাকেন।

সৌমিত্রও ঠিক তাইই করেছেন। ঋত্বিকের দিক থেকে যা বাক্যপ্রয়োগে আবদ্ধ ছিল। তিনি তার মোকাবিলা পালটা বাক্যপ্রয়োগে না করে তাকে শারীরিক ভাবে নিগ্রহ করেছেন। মানবাধিকারের সীমা লঙ্ঘন করেছেন। এবং তা জাস্টিফাই করেছেন।

মানবিক বা নীতিগতভাবেই একান্ত দুর্বলদের পক্ষে তাই ধর্ম, বর্ণ, জাত ইত্যাদির বৈষম্য থেকে উৎসারিত রাগ আসলে একটা জলের ওপর ভাসা তেলের মত উপর-স্তরীয় অছিলা। বা নিছক বদলা নেওয়ার বাসনায় তারা শারীরিক নিগ্রহের অভিলাষী। খুন ও শারীরিক নিগ্রহ এক্ষেত্রে আক্রমণকারীকে শান্তি ও স্বস্তি প্রদান করে।

লিঞ্চিং তারই কালেক্টিভ এক্সটেনশন। কিন্তু আরও মনোগ্রাহী। কারণ সেখানে দর্শক লাগে।

মারব, টেনে হিঁচড়ে ভয় দেখাব, উলঙ্গ করব আর দর্শক বা পাঠক হাততালি দেবে এই কল্পনা থেকে লিঞ্চিং এর প্রস্তুতি ও পরিকল্পনা সহজতর হয়। 




রোদ্দুর ছিলনা কখনো বেদানা রঙের


লিঞ্চিং প্রাচীন অসুখ। হয়ত গুহাকালের সমবয়েসী। কিন্তু তার শব্দকোষ বলছে 'লিঞ্চ' শব্দের উৎপত্তি আমেরিকান সিভিল ওয়্যারের সময়কালে। কর্নেল চার্লস লিঞ্চ ও তার ভার্জিনিয়ার সহকর্মীরা আইনের বাইরে যে অতিরিক্ত শাস্তিব্যবস্থার চালু করেছিলেন তাকে তখন ডাকা হচ্ছিল- 'লিঞ্চের আইন' বলে। মানে যা আইনি নয়, তাকেই 'আইন' আখ্যা। ইতিহাস আয়রনি-ময়। ক্রমে সেই লিঞ্চ-আইন থেকেই লিঞ্চিং। তথ্য এরকমই।

১৭৩৬ সালে ভার্জিনিয়ার জেমস নদীর ধারে চেস্টনাট হিলসে জন্ম কর্নেল লিঞ্চের। আমেরিকান বিপ্লবের সময় তিনি দক্ষিণ-পশ্চিম ভার্জিনিয়ায় এক অস্থায়ী আনঅফিসিয়াল কোর্ট চালু করেন। সেখানে ব্রিটিশের ধামাধারীদের ইচ্ছেমত শাস্তি দেওয়ার ব্যাবস্থা হত। শাস্তির লিস্টের মধ্যে মূল ছিল- চাবুকাঘাত, বলপুর্বক সম্পত্তি অধিগ্রহণ এবং জোরপুর্বক তাদের দলের মিলিটারিতে নাম লেখানো।

'আনটাচেবল' গ্রন্থে আলোচনার সময় আম্বেদকার বলেছিলেন- “Roman law declared the slave was not a person”। ঠিক যেভাবে হিন্দুরা অস্পৃশ্যকে মানুষের মর্যাদা দেয়নি। রোমের ধর্ম-প্রতিষ্ঠান তা খারিজ করেছিল। কিন্তু ভারতে তার উল্টো ক্রম দেখা গেছে। হিন্দুধর্ম অস্পৃশ্যকে মানুষের মর্যাদা দেয়নি। তাই হিন্দুত্ব, হিন্দু মানুষও তাদের মান্যতা দেয়নি।

এই ব্যক্তি মানুষের প্রত্যাখ্যান লিঞ্চিং এর গোড়ার কথা।

তাই লিঞ্চিং নিছক কোন খুন নয়। খুনের মাত্রাতিরিক্ত স্তরে এর অবস্থান। ইহা এক প্রদর্শনী। পাব্লিক স্পেক্ট্যাকেল। গণ-অংশগ্রহণ। যা দর্শক এর উপস্থিতি প্রত্যাশা করে।লিঞ্চিং হল বিচারব্যবস্থার বাইরের এক শাস্তি ব্যবস্থা। পপুলার জাস্টিসের একটি ফর্ম। যা দীর্ঘদিন ধরে মানুষকে ভাবতে শিখিয়েছে এই ধরণের বিচারপদ্ধতি আসলে স্বাভাবিক। নর্ম্যাল।

এক উপস্থাপনা। পার্ফর্মেন্স। তাই তার চাই হাততালি ও একইসাথে নীরবতা। এই নীরবতা লিঞ্চিংএর অতি অ্যাক্টিভ উপাদান। হিংস্রতার ইউফোরিয়া শেষে সমস্ত দর্শক নীরবে গৃহে ফিরবেন এই ভেবে যে প্রান্তিক মানুষটিকে, যাক, নিকেশ করা গেছে। এ আয়োজনের প্রয়োজন ছিল। প্রয়োজন ছিল অনেক প্রস্তুতির। দর্শক হিসেবে সে প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে। এ নীরবতা রাষ্ট্রের ও তার অ্যাপারেটাস এর অনুমোদন আকাঙ্ক্ষা করে।


'এ নীরবতা চিরায়ত চলে আসা উন্মাদনা।
বেদনার মত আনারের রঙ কখনো ছিলনা তাতে'


আমিন মালুফ এর "ট্রিটিজ অফ পার্সনহুড " পড়ছিলাম -

'' মানুষের আইডেন্টিন্টি এক প্যাটার্ন, একটি টানটান পার্চমেন্ট কাগজে খুব টেনেটুনে অঙ্কন করা এক প্যাটার্ন। কোন একটি অংশে স্পর্শ কোরো, অন্যটাও কেঁপে উঠবে। সব ড্রাম গুলো একসাথে বেজে উঠবে।"

ড্রামের কোরাস। তাতে উৎসবের বাজনা বাজে। সেজে ওঠে হত্যার জড়োয়া উৎসব।



কেবলই উৎসবের জন্ম হয়


জেমস এলেনের Without Sanctuary: Lynching Photography in America (২০০০ ) বইটি হাতে এল। দেখছি কৃষ্ণাঙ্গ মানুষদেরকে খুন করার ছবি। ১৮৮২ থেকে ১৯৫০ পর্যন্ত। ৩৪৩৬টী খুন এর রিপোর্ট আছে। বাকী ঘটনা আর থাকলেও প্রমাণের অভাবে নথিবদ্ধ করা হয়নি । ফোটোগ্রাফ গুলিতে আক্রমণকারী ও বাইস্ট্যান্ডার্সদের সুনিপুণ অভিব্যক্তি ধরা আছে।দর্শক ও উপভোক্তার ভূমিকায়। এই ছবিগুলি একসময় পোস্টকার্ডে ছেপে বিক্রী হত। সামারের অনুপম সন্ধ্যেবেলা গুলো নারীদের সঙ্গে নিয়ে লিঞ্চিং ফেস্টিভ্যালে কাটালে বেশ ভালোই কাটে। 

বেশী না। মাত্র একশ বছর আগের কথা। তারপর এই মার্কিন দেশেই এর একশ বছর পর এক কৃষ্ণাঙ্গ মানুষ রাষ্ট্রপ্রধান হবেন।

প্রায় তিনহাজার ও আরও বেশী সংখ্যক কালো মানুষ ও আফ্রিকান আমেরিকান এবং প্রায় ১৩০০ শাদা মানুষ প্রকাশ্য খুন হয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের আমিষ লিঞ্চিং-আগ্রাসনে।বর্ণ, ধর্ম, জাতি ভিত্তিক এক ক্যাপিটাল পানিশমেন্টের এক আখ্যান।

১৮৮২ থেকে ১৯৬৮ এর মধ্যবর্তী সময়ে। আর তার বেশীটাই ঘটে গেছে ১৮৮২ থেকে ১৯২০'র সময়টার মধ্যে।

বেশীরভাগ ঘটনা-গুলি ঘটেছে কোন সামাজিক বা দেশদ্রোহিতার মত ক্রাইমের শাস্তি দেওয়া হবে এমন কোন মানসিকতা থেকে নয়। বরং সেগুলি ঘটেছে রেসিয়াল হায়ারার্কি'কে অতিক্রম করতে চাওয়ার অপরাধে। ধরা যাক- একজন শাদা মানুষের গায়ে অনিচ্ছাকৃত ধাক্কা লাগার 'অপরাধে। অথবা শাদাদের জন্যে নির্দিষ্ট মিলিটারি ইউনিফর্ম গায়ে চাপাবার দায়ে। আসল পাখনাটি হল আপাতত এই- লিঞ্চিং মারফৎ মেজরিটির তরফ থেকে মাইনরিটি কে পাঠানো এক সন্দেশ- এই যে, ক্ষমতা আমাদের হাতে। আমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ, আইন আমাদের কিছুই করতে পারবেনা। আর তোমাদেরও রক্ষা করতে পারবেনা ।

তাই লিঞ্চিং গরিষ্ঠ, ক্ষমতা-কায়েমী স্রোতের মানুষের কাছে এতো গুরুত্বপুর্ন। এর মাধ্যমে মাইনরিটি, প্রান্তিকের কাছে সরাসরি রবিনহুডীয় ভারী বার্তা দেওয়া যায়- আইন তোমাদের রক্ষা করতে পারবেনা। এর উদাহরণে আছে আঠের শতকে। আইনের পঙ্গুত্বকে মধ্য অঙ্গুলি দেখিয়ে আঠের শতকে জেল থেকে টেনে বের করে পর্যন্ত মানুষকে লটকানো হয়েছিল ফাঁসির ফান্দায়। জনসম্মুখে। দর্শক সাক্ষী করে । এক্সট্রা জুডিশিয়াল। মেইন্সট্রিম হিন্দি ছবিতে যাকে বলে- কানুন কো আপনে হাথ লে লেনা। বহু মেইনস্ট্রীম ছবি, হলিউডের ওয়েস্টার্ন সহ এই ধরণের এক্সট্রা জুডিশিয়াল কে সাপোর্ট করে আখ্যান তৈরি করেছে।

এর মধ্যে কৃষ্ণাঙ্গ মানুষকে রাষ্ট্রপ্রধান হতে দেখে নিয়েছে এ দেশ।এখন ২০১৮ সাল। লিঞ্চিং মেমোরিয়াল মিউজিয়াম তৈরি হচ্ছে অ্যালাব্যামার বধ্য-মাটিতে। ৮০০ টি কালো আয়তাকার ইস্পাতের কলাম ঝুলিয়ে রাখা আছে সেখানে। ৮০০ টি কাউন্টির প্রতীক। যেখানে যেখানে বধ্যভূমি গড়ে উঠেছিল। বধ্যভূমি গুলি খুঁজে খুঁজে সংগ্রহ করা হয়েছে মাটি। কালো বয়ামে রাখা হচ্ছে সে কলঙ্কিত মাটি।

মিউসিয়াম যে নথিপত্র সংগ্রহ করেছেন তা দেখতে দেখতে গা হিম হয়ে সরীসৃপ বোধ করছি। কিছু খুন এরকমঃ- 

১৮৮৯ সাল। শহরের একেবারে দক্ষিণে ট্রিনিটি নদীর ধারে একজন কালো মানুষ W.R টেলর কে ঝুলিয়ে দেওয়া হল।

২৫ বছরের জর্জ গেকে গাছ থেকে ঝুলিয়ে দিলেন উন্মত্ত জনতা। হ্যাঁ, তার আগে কয়েকশ বার গুলি চালিয়ে নেওয়া হয়েছিল তার শরীরে। ১৯২২ সাল।

আর কার্ভিনের সেই ঘটনা। এও ১৯২২।

এক শাদা রমণী কে হত্যার' মিথ্যা অজুহাতে তিনটি কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষকে নগ্ন করা হল। শুরু হল ছুরিকাঘাত। এলোপাথাড়ি। তাদের প্রতিটি প্রত্যঙ্গে। তারপর খুঁটিতে বাঁধা হল। আগুন ধরিয়ে দেওয়া হল সবশেষে।

শতাধিকেরও বেশী জনতা তা দেখলেন। তাদের হাতে ছিল বার্গার ও সোডা। সিনেমার জন্ম হয়ে গেছে এর পঁচিশ বছরেরও বেশী আগে। ভডেভিল, নিকেলেডিওন ছেড়ে সিনেমা তার নিজস্ব দর্শক তৈরি করছে।হলিউডে বসে সে বছর চার্লস চ্যাপলিন তৈরি করছেন, দ্য কিড , পে ডে । সিনেমার দর্শক পরিবর্তিত হচ্ছেন। বোতল বোতল সোডা নিয়ে মুশকো বার্গার হাতে নিকেলেডিওনে যাওয়ার যে দর্শক তার বদলে কথা শুরু হয়েছে ফ্রিৎজ ল্যাং ও মুরনাউ কে নিয়ে নিউ ইয়উর্কের পাড়ার মোড়ে, ক্যাফেতে।

কেবলই দৃশ্যের জন্ম হয় । তবুও দৃশ্যের জন্ম হয়।

এলেন লিখছেন- ঘোড়াগাড়ি চড়ে শরীরে জড়োয়া দুলিয়ে এলেন কেউকেউ। মশালের আলোয় ঝলসে ওঠে হীরার কর্ণফুল। তারা প্রকাশ্য হত্যা দেখতে উপস্থিত হয়েছেন। অভিজাতদের প্রবেশ অনভিজাত ভডেভিলকে অতিক্রম করছে।

আমেরিকার বুকে প্রথম হত্যাকাণ্ডটি ঘটে পারিস টেক্সাসে। হাজার হাজর দর্শক জড় হলেন প্রকাশ্য এই হত্যাকাণ্ড দেখতে। হেনরি স্মিথ নামে এক কৃষ্ণাঙ্গ যুবক।হত্যা করা হবে তাকে। পুলিশ অফিসারের মেয়েকে খুনের মিথ্যা অভিযোগে তার প্রাণদণ্ড হয়। স্মিথ পালাতে গিয়ে ধরা পড়েন। প্রাণ ভিক্ষা চেয়ে বলেন - হত্যা যদি করতেই হয় তবে যেন তাকে গুলি করে মারা হয়। সারা শহরকে হত্যার নির্ঘন্ট ও ভেন্যু জানিয়ে দেওয়া হয়। সুচারু ভাবে সফল এক ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট। ঘোষণা করা হয় আগে চাবুক মেরে, তারপর এক এক করে অঙ্গ প্রত্যঙ্গ কেটে, তারপর তাকে খুঁটির সাথে বেঁধে আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে মারা হব। এই বিস্তৃত হত্যাকাণ্ড শুনে লোকজনের মধ্যে দারুণ সাড়া পড়ে যায়। এমনকি শেষমেশ রেল কর্তৃপক্ষকে বাইরের দর্শকদের জন্যে স্পেশ্যাল ট্রেনের ব্যবস্থাও করতে হয়েছিলো। পরিসংখ্যান পাওয়া যাচ্ছে প্রায় দশ হাজার মানুষ এই হত্যাকাণ্ড দেখতে জড় হয়েছিলেন। উঁচু মাচা বাঁধা হয়েছিল। যাতে দূর থেকেও দর্শকরা দেখতে পান।

১৮৯৩। মানে রবীন্দ্রনাথের বয়স ত্রিশোর্ধ। ভারতে সতীদাহ বন্ধ হয়েছে ১৮২৯ সালে। আইন করে।

এর কয়েকবছর বাদে ১৯০১ সালে বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে তার বক্তৃতায় মার্ক টোয়েন সমগ্র যুক্তরাষ্ট্রকে বর্ননা করবেন- “The United States of Lyncherdom” বলে। এর একশ বছর এর মধ্যে আমেরিকার রাষ্ট্রনায়ক হবেন কৃষ্ণাঙ্গ মানুষ। অপরদিকে সাংবিধানিক তকমায় সেক্যুলার রাষ্ট্র হিসেবে জন্ম নেওয়া ভারত যুক্তরাষ্ট্র একই মহামারীর দোরগোড়ায় নতুন করে আসর সাজাবে এর একশ বছরেরও অধিককাল পর। সারা ভারত জুড়ে চলছে হত্যার উৎসব। মহামারী। সে মহামারীর এক নাম দেওয়া হচ্ছে। আমাদের শব্দকোষে যোগ হচ্ছে- পিঙ্ক রেভল্যুশন বা গোলাপি বিপ্লব। সতীদাহ উচ্ছেদের প্রায় ২০০ বছর পর।



গোলাপি বিপ্লব 


ভারতে, প্রধানমন্ত্রী শ্রীযুক্ত মোদী ক্ষমতায় আসার পর নতুন শব্দাঞ্চল চাষ করে 'গোলাপি বিপ্লব' এর চারা রোপণ করেছেন। গোমাংস ও গবাদী পশুর ব্যবসাকে অবৈধ করতে হিন্দুত্বের এক নয়া মায়া-অঞ্জন বাজরে এনেছেন। এ কাজল চোখে লাগিয়ে মুহুর্তেই পরধর্ম বিদ্বেষী হয়ে যাওয়া যায়। হিন্দুত্বে আপনার মনকে উদ্দীপিত করে ফেলা যায়। হয়ে ওঠা যায় ঘৃণা উগড়ে দেওয়ার অপূর্ব যন্ত্র সহায়ক। ২০১৪'র নির্বাচনী ক্যাম্পেইনের সময় মোদী বক্তৃতা করেছিলেন- "Do you want to support people who want to bring about a Pink Revolution?” গোমাংসের গোলাপি রঞ্জনের রেফারেন্সে এই 'পিংক'। এই মাংসের ভক্ষণ রোধ করার নাম- পিঙ্ক বিপ্লব। গোমাংসের প্রতি হিন্দুদের বিবমিষা ও ট্যাবু ভাঙ্গিয়ে হিন্দু-রাষ্ট্র গড়ার সুড়সুড়ি মোদী শুরু থেকেই জারী রাখবেন তা অভাবিত নয়।

মোদী ক্ষমতায় আসার পর এ পর্যন্ত ২১ টি রিপোর্টেড লিঞ্চিং এর খবর পাওয়া গেছে। রিসার্চ করতে গিয়ে এক দুর্মূল্য স্প্রেডশিট হাতে এলো। এতে ২০১০ থেকে ২০১৭'র মধ্যে ঘটে যাওয়া (রিপোর্টেড) ৩৮ টি ঘটনার সন্ধান পাচ্ছি। তথ্যকারী হিসেবে পেয়েছি - বিবিসি, টাইমস অফ ইন্ডিয়া, এন ডি টি ভি, হিন্দুস্থান টাইমস, স্ক্রোল ও ওয়ার ইন। রেসিজম, হনার কিলিং, ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স, জেন্ডার-ক্রাইম, সবথেকে বেশী সংখ্যক ধর্ম জনিত হেট-ক্রাইম। শাস্তি দেওয়ার ইচ্ছা। সরবরাহ করা হচ্ছেজেনোফোবিয়া থেকে ক্ষরণ হওয়া হিন্দু জাতীয়তাবাদী ঘৃণা।

এই স্টাডি করতে গিয়ে পেয়ে যাচ্ছি অভিযোগের ও অভিযোগকারীর এক চমকপ্রদ শব্দ-কোলাজ। তাকে সাজালে মোটামুটি এই হচ্ছে-

কাউ ভিজিল্যান্ট, ক্যাটল থীফ, গো-রক্ষক, বীফ, লিঞ্চিং, বীফ-স্মাগলার ইত্যাদি।

তৈরি হচ্ছে হিংসার পাব্লিক স্পেক্ট্যাকল।

অভিযোগেকারীদের ভূমিকায় মূলত রয়েছেন বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, বজরং দল এবং আঞ্চলিক গো-রক্ষক সমিতি।

বিশ্ব হিন্দু পরিষদের নেত্রী সাধ্বী সরস্বতী বলেছেন- গোহত্যা রুখতে কেন্দ্রের বিশেষ আইন আনা উচিত যাতে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া যায়৷

যে দেশে মানুষকে হত্যা করা হচ্ছে গোরক্ষার নামে– গোরক্ষা সেখানে একটি অধিবেশনের কাজ করছে। নিম্নবর্গীয় ও মুসলমানদের মধ্যে ত্রাস তৈরি করার অধিবেশন। প্রকাশ্যে দর্শক তৈরি করে গড়ে তোলা হচ্ছে হিংসার পাব্লিক স্পেক্ট্যাকল।

একথা বোঝাতে যে পাব্লিক ঢোঁড়া সাপ। আয়োজক খুনিদের সাথে তারা তামাশা দেখবে। চাইলে ঢিল ছুঁড়ে অংশগ্রহণ করবে।

অজ্ঞতা ও ক্রূরতার ইনফিনিটি হয়না কোনো।

ঈদ অতিক্রান্ত একদিন আজ। আর সে প্রথমেই যে জান মহম্মদের কথা বলেছিলাম। বলেছিলাম সুনীল এর ভয়াবহ মৃত্যুগ্রস্ত চোখদুটির কথা। জান মহম্মদের মৃত্যুভয় আমাকে সুনীলের কথা মনে পড়াচ্ছে। মৃত্যুর ভয়ের এত তাজা ছায়া আমরা বহুদিন দেখিনি। খবরে পড়লাম- ভয় ও ত্রাসে কোণঠাসা হয়ে আছেন জান মহম্মদ। দু'বছর আগে তার ভাই মহম্মদ আখলাককে হত্যা করা হয়েছে। ১৮ জন যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল তাকে হত্যার অভিযোগে, তারা সবাই বেইল এর টাকা দিয়ে ফিরে এসেছে সমাজে। জান মহম্মদ তাই সন্ত্রস্ত। তারা যেকোন সময়ে হামলা করতে পারে প্রতিশোধ নিতে। ২০১৫'র ২৮ সেপ্টেম্বর দাদরিতে তার ভাই মহম্মদ আখলাককে লিঞ্চ করা হয়। অপরাধ ছিল- তিনি 'বেআইনি' গোমাংস ফ্রীজে লুকিয়ে রেখেছিলেন। ‘জয় হনুমান’, ‘গোমাতা কি জয়’ ধ্বনি দিয়ে দিনের আলোয় পিটিয়ে হত্যা করা হয়। আধমরা করে ফেলা হয় তার ছেলে দানিশকে।

প্রথমে মহম্মদ আখলাককে পিটিয়ে মারা হয়। কিন্তু অভিযুক্তদের না গ্রেপ্তার করে ঘরের ফ্রিজে গরুর মাংস ছিলো কি না তার পরীক্ষা আগে চালানো হল । এরকম আরও। যেমন পেহেলু খানের ঘটনা । এখানেও অভিযুক্তদের ছাড় দিয়ে গরু রাখার বৈধ কাগজ ছিলো কি ছিলো না তা নিয়ে আগে তদন্ত শুরু হল। দিল্লীর লোকাল ট্রেনে গরুর মাংস খাওয়ার অপরাধে বলে পিটিয়ে খুন করা হলো জুনেইদকে। এই সবের উৎস হিন্দু মৌলবাদীদেড় প্রচার। মিথ্যা প্রচার । খুব সক্রিয়ভাবে হোয়াটসআপ বা সোশ্যাল সাইট গুলো থেকে এই রিউমরগুলি ছড়াতে শুরু করছে।

একুশ শতকের দ্বিতীয় দশকেও ভারতে গোমাংস রাখিবার রটনা একটি মানুষের মৃত্যুর কারণ হইতে পারে।

তাই যেকথা বলছিলাম, জান মহম্মদ এই ঈদে সুরক্ষিত নেই। প্রতিমুহুর্তে হামলার আশঙ্কায় তার দিন কাটে। তার পরিস্থিতির কথা ভেবে একজন সর্বক্ষণের গানম্যান নিয়োগ করা হয়েছে।

গ্রীষ্মের ঊষর পীচরাস্তার দিকে তাকিয়ে তার মনে হয়- এই একজন বন্দুকধারী মানুষ কি করে তাকে রক্ষা করবেন উন্মত্ত ধেয়ে আসা আক্রমণকারীদের থেকে।

পড়তে পড়তে আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে মৃত্যুর তাড়া খাওয়া সুনীল প্রভাকরের মুখ।



ওয়ার্ক ইন প্রগ্রেস


Hate, in the long run, is about as nourishing as cyanide,” Kurt Vonnegut


যীশুকে লিঞ্চিং করে মেরে ফেলার থেকে আরও দু'হাজার কাল কেটে গেল।

আমরা লালন করেছি সযত্নে পুষে রাখা ঘৃণার সায়ানাইড। গিলে খাওয়ার চেয়ে খাইয়ে দিয়েছি বেশী।

হার্ভার্ডের সাইকলজিস্ট ড্যানিয়েল গিলবার্ট একে বলেন- ' এন্ড অফ হিস্ট্রি সিন্ড্রোম' । মানে এই যে ঘৃণার অ্যানাটমি ধাওয়া করে ফিরছি, আর মনে হতে থাকছে মনুষ্য সভ্যতার এতোগুলো কাল কেটে গেল, এতো কিছু মল ,নালা, ফ্র্যাঙ্কেন্সটাইন পেরিয়ে এই গ্রহের ক্রম বিকাশ হবে কালই, দেরী মাত্র নেই । কারণ এই গ্রহ লক্ষ অন্ধকার কাটিয়ে এসেছে। কিন্তু বাস্তব আসলে অনেকটা গোদোর অপেক্ষায় থাকার মত।

গিলবার্ট একেই একটি প্যারাডক্সের ফর্মে এনে বলবেন-

'হিউম্যান বিইংস আর ওয়র্কস ইন প্রগ্রেস দ্যাট মিস্টেকেনলি থিংক দ্যে আর ফিনিশড'।

কোন ঘৃণাটি আমি?
আপনার আজকের ঘৃণাটি কি কালকের আপনি ?
আমাদের পঞ্চাশ বছর বাদের ঘৃণাটি কি সেই এক ?

এই আমাদের হেট অরজি। অরগ্যাস্মের মত ফেঁপে ওঠা সুখ। আমরা ভুলে থাকব ভবিষ্যতের অলীক মুগ্ধতায়। আর কার্ল সাগান আমাদের মনে করিয়ে দেবেনঃ 

“the universe will always be much richer than our ability to understand it.”




২২ শে জুন, ২০১৮



পরিচিতি
অনামিকা বন্দ্যোপাধ্যায়- 
লেখক, চলচ্চিত্রকার, শিক্ষা-জীবী, সমাজ-কর্মী।

প্রকাশিত গ্রন্থঃ টালমাটাল, উসিমুশি করে বুক, সিনেমার স্পেন, সিনেমার আর্জেন্টিনা, রাউল জুরিতা'র কবিতা,

প্রকাশিতব্যঃ সিনেমার কিউবা (প্রেস), ব্যুগেনভিলিয়ায় ভ্যাজাইনা উৎসব, চাই-ল্যাটে

চলচ্চিত্রঃ রেড, ১৭০০ কেলভিন, টেক কেয়ার, টেইলর মেইড, ব্ল্যাক রোজ, দ্য থার্ড ব্রেস্ট।

জন্ম ভারতে। উচ্চশিক্ষার জন্যে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে আসেন।

অল্প বয়েসে মিকেলেঞ্জেলো আন্তনিওনি'র সংস্পর্শে আসার সুযোগ পেয়ে যান ও সিনেমায় দীক্ষিত হ'ন।

চলচিত্র-ফেস্টিভ্যাল ও মূল-বাজার সিনেমা ও সাহিত্যের ঘেটো ভাঙ্গার প্রতি ডেডিকেটেড।

সিনেমা বানানোর অর্থ প্রাপ্ত না হওয়ায় যে সময় পান তা দিয়ে দিন শুরু করেন তাই-চি দিয়ে। অবসর পেলে তৈলচিত্র ও ভারতীয় মার্গ সঙ্গীত চর্চা। এবং গ্রীষ্মে স্ট্রবেরী চাষ করেন।

ছেলেকে ইতিহাস ও অঙ্ক পড়ানোর গুরুত্বপুর্ণ দায়িত্বে আছেন। সপ্তাহান্তে রিফিউজি সংগঠন ও আদি জনগোষ্ঠীর সাথে স্বেচ্ছাসেবকের কাজ করেন। এছাড়া বাকী সময় ভ্রমণে ব্যয় করেন।

ইংরেজী লেখালেখি, 'দ্য র‍্যাভেন উওম্যান' কলম-নামে।


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন