মঙ্গলবার, ১২ জানুয়ারী, ২০২১

ঈভলিন ওয়াহ্‌'র গল্প : পার্টি দিলেন বেলা ফ্লিস


অনুবাদ : অমিতাভ চক্রবর্ত্তী 

লেখক পরিচিতি : ঈভলিন ওয়াহ্  ১৯০৩ খ্রিস্টাব্দে লন্ডলে ওয়েস্ট হ্যামস্টেডে জন্ম গ্রহণ করেন। তিনি উপন্যাস, জীবনী ও ভ্রমণ কাহিনী লেখালেখির পাশাপাশি সাংবাদিক হিসেবেও প্রসিদ্ধ ছিলেন। তাঁর বইগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-- বিদ্রুপ-আখ্যান  Decline and Fall, A Handful of Dust, উপন্যাস Brideshead Revisited, and বিশ্বযুদ্ধের ট্রিলজির Sword of Honour. তাঁর কাহিনী নিয়ে বেশ কিছু সিনেমা নির্মিত হয়েছে। ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দে মারা যান।


ব্রডস্টোন স্টেশান থেকে খুব ভোরের ট্রেনটা ধরতে পারলে ডাবলিন থেকে ব্যালিঞ্জার সাড়ে চার ঘণ্টার পথ আর বিকেল করে ফেললে সেটাই সওয়া পাঁচ ঘণ্টা নিয়ে নেবে। জায়গাটা আসলে তুলনামূলকভাবে ঘন বসতির একটা বড় জেলার বানিজ্য শহর। শহরের মাঝখানে চকের এক দিকে ১৮২০ সালের গথিক শৈলীর এক সুদৃশ্য প্রোটেষ্ট্যান্ট গীর্জা। উল্টোদিকে দাঁড়িয়ে অসমাপ্ত কাঠামোর বিশাল এক ক্যাথলিক গীর্জা, পাহাড়ি পায়েটিস্ট খ্রিষ্টানদের মধ্যে জনপ্রিয় পাঁচমেশালী বেহিসাবি স্থাপত্যশৈলীর একটি চমৎকার উদাহরণ। চকের সামনের দিকের যে দোকানগুলো জায়গাটাকে ভরাট করে রেখেছে, সেগুলোর লেখালেখিতে ল্যাটিন অক্ষরের বদলে সেল্টিক ধরণের হরফের প্রচলন শুরু হয়েছে। সবকটা দোকানে একই রকমের মালপত্র বিক্রী হয়, বৈচিত্র্য শুধু তাদের জরাজীর্ণতার তারতম্যে। মুলিগানের দোকান, ফ্ল্যানিগানের দোকান, রাইলির দোকান, সব্বাই বিক্রী করে পুরু কালো জুতো, গুচ্ছ করে ঝোলানো আছে সব, সাবান-সাবান কলোনীয়াল চীজ, লোহালক্কড় আর সস্তা প্রসাধনী, তেল আর ঘোড়ার পিঠে চাপাবার জিন ইত্যাদি, আর প্রত্যেক দোকানেই সরকারী অনুমতিপত্র টাঙানো আছে - বিয়ার বিক্রীর, এল হোক বা পোর্টার, দোকানে বসে খাও কি বাইরে নিয়ে যাও। শূন্য জানালার কাঠামো আর ধূসর হয়ে যাওয়া অভ্যন্তর বুকে করে ব্যারাকবাড়ির খোলসগুলো দাঁড়িয়ে আছে সার সার, যেন বন্ধনমুক্তির স্মৃতিস্তম্ভ সব। সবুজ ডাকবাক্সটার গায়ে কে বা কারা আলকাতরা দিয়ে লিখে রেখেছে, পোপ একটা বিশ্বাসঘাতক। একেবারে মার্কামারা একটি আইরিশ শহর। 

আইরিশ গাঁ-গেরামের মধ্য দিয়ে সিধে এবড়ো খেবড়ো রাস্তা ধরে গেলে ব্যালিঞ্জার থেকে ফ্লীসটাউন নামের বাড়িটির দূরত্ব পনের মাইল। বহু দূরে বেগুনী রংয়ের ছোঁয়ায় পাহাড়ের আবছা আভাষ। ভাসমান সাদা কুয়াশার স্তরের মধ্য দিয়ে দেখা যায় - রাস্তার এক পাশ ধরে পাহাড়ের দিকে মাইলের পর মাইল একটানা চলে গেছে বিস্তৃত জলাজমি, মাঝে মাঝে ফুটকির মত জেগে আছে স্তূপ করে কেটে রাখা আগাছার ডাঁই। রাস্তার অন্য পাশে পাহাড়ের ঢাল উত্তর দিকে সটান উপরে উঠে গেছে। সেখানে এলোমেলো বিন্যাসে মাঝে মাঝে ছড়িয়ে আছে চওড়া ফাঁকা সমতল আর খাড়া পাথুরে দেয়াল। ব্যালিঞ্জারের শিকারি কুকুরদের নানা ঘটনাবহুল শিকারের সাক্ষী তারা। সমস্ত কিছুর উপর মসের আস্তর। পাহাড়ের ঢাল আর পাথরের প্রাচীরে পুরু সবুজের খসখসে গালিচা, গাছের গায়ে তা কোমল সবুজ মখমল – রূপান্তর এমন মসৃণ, কোথায় যে জমির শেষ আর গাছ কি গাঁথুনির শুরু বোঝে কার সাধ্য। সেই ব্যালিঞ্জার থেকে শুরু হয়ে গোটা এলাকা জুড়ে পর্যায়ক্রমে ছড়িয়ে আছে সারি সারি চুনকাম করা কেবিন আর ডজনখানেক প্রমাণমাপের খামারবাড়ি; কিন্তু ভদ্রলোকদের থাকার মত কোন ঘরবাড়ির অস্তিত্ব নেই, কারণ জমি কমিশনের আগে পুরো এলাকাটাই ফ্লীসদের সম্পত্তি ছিল। আর এখন, ফ্লীসদের খাসজমিটুকুই শুধু তাদের হাতে আছে। বাকি এলাকাটা আশপাশের পশুপালকদের পশুচারণের কাজেই ব্যবহার হচ্ছে। শুধু অল্প কয়েকটি জমিতে পাঁচিল ঘিরে কিছু তরিতরকারির চাষ হয়। বাকি জমিগুলো ফেলে রেখে রেখে পতিত হয়ে গেছে, খাওয়ার উপযোগী কোন গাছগাছালি নয়, আগাছার ফুলে ভরা প্রান্তর জুড়ে সর্বত্র কাঁটাঝোপ গজিয়ে উঠে জমিগুলোকে তাদের আদিরূপে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে উঠেপড়ে লেগেছে। এলাকার যৌনকর্মীদের বাড়িগুলি অন্তত বছর দশেক হয়ে গেল হাওয়ার ঝাপটে নড়বড় করা কংকালে পরিণত হয়েছে। বাড়িগুলির জর্জিয় খিলানওয়ালা দরজাগুলিতে বরাবরের জন্য তালা পড়ে গেছে। নৈশাবাসগুলি পরিত্যক্ত, চলাচলের পথের চিহ্ন মেঠো জমির মাঝে খুঁজে পাওয়া দায়। ফ্লীসটাউনে ঢুকতে হলে গরু-ভেড়ার চলাচলে ক্ষতবিক্ষত একটা পথ ধরে খামারের দরজা পেরিয়ে আরো আধ মাইল যেতে লাগবে। 

তবে আমরা এখন যেই দিনটির কথা বলছি, সে দিনটির হিসেবে, সারিয়ে-সুরিয়ে নিয়ে বাড়িটার অবস্থা নিঃসন্দেহে চমৎকার ছিল, অন্ততঃ, কি বলা যায়, ব্যালিঞ্জার ভবন কি ক্যাসল বয়কট কিংবা নোড হল-এর প্রেক্ষিতে ত বটেই। তা বলে গর্ডনটাউনের সাথে নিশ্চয় তুলনা টানা যাবে না। আমেরিকান লেডী গর্ডন সে বাড়িতে বৈদ্যুতিক বাতি বসিয়েছেন, সেন্ট্রাল হীটিং, আর লিফ্‌টও আছে। কিংবা মক হাউস অথবা নিউহিল, যেগুলি হুল্লোড়বাজ ইংরেজ লোকজনদের ভাড়া দেওয়া হত, অথবা ক্যাসল মকস্টক, সেই যবে থেকে লর্ড মকস্টক নিজের থেকে নিচু জাতে বিয়ে করে গুছিয়ে নিয়েছিলেন। এই চারটি বাড়ি – যত্ন করে সমান করা নুড়ি বেছানো প্রবেশপথ, স্নানের ঘর, নিজস্ব বিদ্যুৎ তৈরীর ডায়নামো, এই সব নিয়ে সারা দেশ জুড়ে একই সাথে বিস্ময় আর কৌতুকের বিষয় ছিল। কিন্তু ফ্লীসটাউন, খোলা মনে বিচার করলে, ফ্রী স্টেট-এর অন্য যে কোন যথার্থ আইরিশ বাড়ীর তুলনায় অনেক ভালো ভাবে থাকার উপযুক্ত ছিল। 

ছাদ অক্ষত, আর আইরিশ গ্রামের বাড়িগুলোর ক্ষেত্রে এই ছাদের দশাই একটা দ্বিতীয় কি তৃতীয় শ্রেণীর বাড়ির মধ্যে তফাৎ গড়ে দেয়। ছাদ খোয়া যাওয়া মানেই শোওয়ার ঘরে মস, সিঁড়িতে ফার্ন গজিয়েছে, বইয়ের ঘরে গরু চরছে, এবং আর কয়েকটা বছর গেলেই তোমার ঠাঁই হবে ঐ গোয়ালঘরে কি কাজের লোকদের থাকবার আস্তানাগুলোর কোন একটাতে। কিন্তু, আক্ষরিক ভাবেই, মাথার উপরে ছাদটা যতদিন আছে, একজন আইরিশ ভদ্রলোকের কাছে বাড়িটাই তার নিজস্ব দুর্গ। ফ্লীসটাউনের কমতি ছিল, কিন্তু প্রচলিত মতের হিসাব অনুসারে আরো কুড়ি বছর দিব্যি চলে যাবে এবং বর্তমান মালিকের জীবৎকাল ত অবশ্যই উৎরে যাবে। 

মিস অ্যানাবেল রসফোর-ডয়েল-ফ্লীস, খাতায়-কলমে পুরো নামটি এই রকমই পাওয়া যাবে, যদিও পুরো এলাকা জুড়ে সবাই তাকে মিস বেলা ফ্লীস নামেই চিনত, ছিলেন তার বংশের শেষ উত্তরাধিকারী। ব্যালিঞ্জারে ফ্লীসদের এবং ফ্লেসারদের বসবাস সেই স্ট্রংবোদের সময় থেকেই। খামারবাড়িগুলো দেখলে এখনও সেই জায়গাটা চেনা যায় যেখানে বয়কট কি গর্ডন কি মকস্টকদেরও দুশ বছর আগে তারা প্রতিরোধের দুর্গ গড়ে তুলেছিল। তাদের বিলিয়ার্ড খেলার ঘরে ঝোলানো একটি বংশলতিকায় উনিশ শতকের এক বংশগতি বিশেষজ্ঞর প্রতিভার দ্যুতি আপনাকে দেখিয়ে দেবে কিভাবে আদি বংশধারা একসময় একই রকম প্রাচীন রসফোরদের সাথে এবং পরে তুলনায় অর্বাচীন কিন্তু মানে সম্মানে এগিয়ে থাকা ডয়েলদের সাথে মিশে গেছে। বর্তমান বাড়িটি বানানো হয়েছিল আঠারো শতকের মাঝামাঝি সময়ে মহা জাঁকজমকে; অবস্থা যদিও তখন অনেকটাই পড়ে গেছে, তবু পরিবারের সম্পত্তি এবং প্রভাব যথেষ্টই ছিল। সৌভাগ্যের চূড়া থেকে এদের ক্রমাবনতির হিসাব করতে বসলে সেটা নিতান্তই ক্লান্তিকর হয়ে উঠবে। এইটুকু বলা যেতে পারে, কোন দুঃসাহসী বেলেল্লাপনার কারণে সেটা ঘটেনি। যেইসব পরিবার নিজেদের বাঁচানোর জন্য কখনো কোনরকম উদ্যোগ নেয় না, সেইরকম আর দশটা পরিবারের মত ফ্লীসরাও বিনা বাধায় ক্রমাগত গরীব হয়ে গেল। সর্বশেষ প্রজন্মেও খামখেয়ালীপনা কিছু কম নেই। বেলা ফ্লীসের মা – নিউহিলের একজন ও’হারা তিনি – বিয়ের দিনটি থেকে মৃত্যু পর্যন্ত এই বিভ্রমে ভুগে গেলেন যে তিনি একজন নেগ্রেস। তার ভাই, যার কাছ থেকে তিনি নিজের উত্তরাধিকার পেয়েছেন, তৈলচিত্র আঁকায় নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন; গুপ্তহত্যার মত একটা মামুলী বিষয়ে তার মন এমন আচ্ছন্ন ছিল যে মরবার আগে, জুলিয়াস সিজার থেকে জেনারেল উইলসন পর্যন্ত সব কটি এমন ঐতিহাসিক ঘটনার ছবি এঁকে গিয়েছেন তিনি। গণ্ডগোলের দিনগুলোয় একটা ছবি নিয়ে কাজ করার সময়, তার নিজেরই হত্যাকাণ্ডের চিত্র সেটি, বস্তুতঃ নিজের বাড়ির ড্রাইভওয়েতে আততায়ীর ছররা-বন্দুকের গুলিতে নিহত হন তিনি। 

নভেম্বরের এক বিবর্ণ সকালে এই ভাইয়ের আঁকা একটা ছবির – থিয়েটারে নিজের বক্সে আব্রাহাম লিঙ্কন – পাশে বসে থাকার সময় বেলা ফ্লীসের প্রথম মাথায় এল যে তিনি একটা ক্রিসমাস পার্টি দেবেন। ওনাকে দেখতে কেমন সেই নিয়ে খুব অনুপুঙ্খ বর্ণনা দেয়ার কোন মানে হয় না, খানিকটা ভুল বোঝারও সম্ভাবনা থাকবে তা’তে, কারন এই রকম ভাবনা আদপে ওনার স্বভাবের সম্পূর্ণ বিপরীত। বয়স আশি ছাড়িয়েছে, অগোছালো, রীতিমত গোলাপি চেহারা; কাঁচা-পাকা ডোরার ধূসর চুলগুলো পাকিয়ে মাথার পিছনে ঘোড়ার চুলের মত টান করে বাঁধা, কয়েকটা গুছি মুখমণ্ডল ঘিরে গালের উপরে এসে ঝুলছে, নজর-কাড়া নাকে নীল শিরাগুলি ফুটে আছে, হাল্কা নীল চোখ, দৃষ্টি অর্থহীন এবং ক্ষিপ্ত; মুখে হাসিটি লেগে থাকত প্রাণবন্ত আর কথা বলতেন বিশেষ একটা আইরিশ টানে। লাঠিতে ভর দিয়ে হাঁটতেন, বহুকাল আগে একটা লম্বা দিনের শেষ প্রহরে ব্যালিঞ্জারের শিকারি কুকুরদের সাথে সময় কাটানোর সময় ওনার ঘোড়াটি তাকে উল্টে ফেলে খোঁড়া করে দিয়েছিল, এক মাতাল আমোদবিলাসী ডাক্তার দুষ্কর্মটি সুসম্পন্ন করেছিলেন, ভদ্রমহিলার পক্ষে কোনদিন আর ঘোড়ায় চড়া সম্ভব হয়নি। ফ্লীসটাউনের লুকিয়ে থাকা জন্তু-জানোয়ারগুলোকে শিকারি কুকুররা যখন তাড়িয়ে বার করত, বেলা তখন পায়ে হেঁটে হাজির হতেন আর শিকার পরিচালকদের কাজ নিয়ে সমালোচনা করতেন; কিন্তু প্রতিবছর-ই এই কাজে তার পুরনো বন্ধুদের অংশগ্রহণ কমে আসছিল, অচেনা অজানা মুখের দেখা মিলছিল। 

তারা বেলাকে চিনত, বেলা তাদের চিনতেন না যদিও। বেলা তার আশপাশের এলাকায় প্রায় উপকথায় পরিণত হয়েছিলেন, রীতিমত ঠাট্টা-তামাশা করত লোকে। 

“দিনটাই নষ্ট হল”, অভিযোগ করত তারা। “আমরা শিয়ালটাকে পেয়েই গিয়েছিলাম, কিন্তু তার পরই সেটা আবার হাওয়া হয়ে গেল। তবে হ্যাঁ, বেলা ঠিক হাজির। আরো কদ্দিন যে বুড়ি টানবে কে জানে! অন্তত নব্বই ত হবেনই। আমার বাবা সেইসব দিনের গল্প করে এ মহিলা যখন নিয়মিত শিকারে যেতেন, - হাওয়ায় উবে গেছে সেইসব দিনগুলো।” 

ঠিক-ই, বেলা নিজেও ক্রমাগত বেশি করে মৃত্যু নিয়ে চিন্তায় ডুবে থাকছিলেন। যেই সময়ের কথা বলছি তার আগের শীতে সাঙ্ঘাতিক অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন তিনি। সেরে উঠেছিলেন এপ্রিল নাগাদ, সেই আগের মত গোলাপি গাল, কিন্তু চলাফেরা কি ভাবনা-চিন্তায় মন্থর হয়ে গেছেন। নির্দেশ জারী করলেন ওনার বাবার আর ভাইয়ের কবর-এর আরো যত্ন নেয়ার জন্য। জুন মাসে, আগে যা কখনো করেননি, ওনার উত্তরাধিকারীকে ডেকে পাঠালেন ওনার সাথে দেখা করার জন্য। এর আগে পর্যন্ত এই তরুণ যুবকটিকে উনি সবসময় এড়িয়েই গিয়েছেন। ছেলেটি একটি ইংরেজ, ওনার খুব দূরসম্পর্কের জ্ঞাতিভাই, নাম – ব্যাংক্স। দক্ষিণ কিংস্টনের বাসিন্দা, মিউজিয়ম নিয়ে থাকে। অগাস্ট মাসে এসে হাজির হল সে, এবং নিজের সমস্ত বন্ধুবান্ধবদের তার এই ঘুরতে আসা নিয়ে মজার মজার চিঠি লিখল আর শেষে সেই সব অভিজ্ঞতা থেকে স্পেক্টেটর পত্রিকার জন্য একটা ছোট গল্প নামিয়ে ফেলল। তার হাজির হওয়ার মুহুর্ত থেকেই বেলার তাকে ভীষণ অপছন্দ। চোখে তার শিংয়ের ফ্রেমের চশমা, গলার স্বর বিবিসির (সংবাদ পাঠকের মত)। সে তার বেশীটা সময় কাটাত ফ্লীসটাউনের চিমনিগুলোর আর দরজার গড়নের ছবি তুলে, একদিন সে গ্রন্থাগার থেকে এক পাঁজা চামড়া-বাঁধানো বই হাতে নিয়ে বেলার কাছে এসে হাজির হল। 

“বলছিলাম কি, আপনি জানতেন এগুলো আছে আপনার কাছে?” জিজ্ঞেস করল সে। 

“জানতাম” বলল বেলা। 

“প্রত্যেক কটাই প্রথম সংস্করণ। এখন এগুলো নিশ্চয়ই অত্যন্ত মূল্যবান।” 

“যেখান থেকে পেয়েছ, সেইখানেই রেখে এস ওগুলো।” 

পরে যখন সে ওনাকে বেড়ানোর জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে চিঠি লেখে – তার সাথে নিজের তোলা কিছু ছবিও জুড়ে দিয়েছিল – এই বইগুলোর কথা সে আবারও উল্লেখ করেছিল। এতে বেলা ব্যাপারটা নিয়ে ভাবতে শুরু করেন। কেন ঐ পুঁচকে ছোঁড়া সারা বাড়ি ঢুঁড়ে সমস্ত কিছুর দাম ঠিক করে বেড়াবে? উনি ত এখনও মরে যান নি, ভাবলেন বেলা। যত তিনি এই নিয়ে ভাবতে থাকলেন, ততই এই চিন্তাগুলো তার কাছে বিরিক্তিকর হয়ে উঠল যে, আর্চি ব্যাংক্স তার বইগুলো নিয়ে দক্ষিণ কেনসিংটনে যাবে, এবং চিমনির টুকরোগুলোকে খসিয়ে দেবে, এবং সেই যে ভয়টা সে দেখিয়েছে, আর্কিটেকচারাল রিভিউয়ের জন্য বাড়িটাকে নিয়ে একটা লেখা লিখে বসবে। উনি অনেক সময়ই শুনেছেন যে বইগুলো খুবই মূল্যবান। ভাল কথা, গ্রন্থাগারে অনেক বই আছে, এবং তিনি ভেবে পাচ্ছেন না যে আর্চি ব্যাংক্স কেন সেগুলো থেকে লাভ কুড়োবে। তাই তিনি ডাবলিনের এক বই বিক্রেতার দোকানে একটি চিঠি লিখলেন। সে ভদ্রলোক এসে গ্রন্থাগারের সব বই দেখেশুনে সমস্ত বইয়ের জন্য বারোশ’ পাউন্ড দিতে রাজী হলেন, তা না হলে যে ছ’টি বই বিশেষ ভাবে আর্চি ব্যাংক্স-এর নজর কেড়েছে সেইগুলোর জন্য এক হাজার পাউন্ড। বেলা নিশ্চিত ছিলেন না যে বাড়ির জিনিষপত্র বিক্রী করে দেয়ার অধিকার ওনার আছে কি নেই, সব এক লপ্তে বিক্রী করে দিলে লোকজনের নজরে পড়ে যাবে। তাই উনি উপদেশাবলি আর ফৌজি ইতিহাসের বইগুলো রেখে দিলেন, ওগুলোই সংখ্যায় বেশী। ডাবলিনের বই বিক্রেতা ঐ প্রথম সংস্করণগুলো নিয়ে চলে গেলেন, ওগুলো থেকে শেষ পর্যন্ত অবশ্য যতটা খরচ তিনি করেছিলেন দাম ততটা পাননি। আর বেলার হাতে রইল আসন্ন শীত এবং এক হাজার পাউন্ড। 

এই হচ্ছে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ যখন বেলার মনে হল যে একটা ভোজের আয়োজন করতে হবে, পার্টি দিতে হবে। ক্রিসমাসের দিনগুলোয় ব্যালিঞ্জারে সবসময় প্রচুর পার্টি চলতে থাকত, কিন্তু আজকাল অনেক বছরই বেলাকে আর কেউ সে সবে ডাকত না। কিছুটা এই কারণে যে বেলার এখনকার প্রতিবেশীদের অনেকেই তার সাথে কখনো কথাবার্তা বলেনি, কিছুটা এই কারণে যে তারা মনে করত না বেলা তাদের এইসব পার্টিতে আসতে চাইবেন, আর তা ছাড়া তারা এটাও জানত না যে যদিই বেলা তাদের পার্টিতে এসে হাজির হন, তারা বেলাকে নিয়ে করবেটা কি। অথচ, সত্যি বলতে কি, বেলা পার্টিতে যেতে খুবই ভালোবাসতেন। চারপাশের হৈ-হুল্লোড়ের মাঝখানে ভোজের আসরে বসে থাকতে ভালো লাগত তার, পছন্দ করতেন নাচের গান, এবং, ভালোবাসতেন মেয়েদের মধ্যে সুন্দরী কারা কারা আর তাদের কার কার সাথে কে কে প্রেমে পড়েছে সেই নিয়ে রসিয়ে গল্প করতে। পানীয়ে তার ভালোই আকর্ষণ ছিল, এবং চাইতেন যে গোলাপী সান্ধ্য কোটে সুসজ্জিত পুরুষেরা সেসব পানীয় নিয়ে আসুক তার কাছে। যদিও নিমন্ত্রণকারিণীদের বংশপরিচয় নিয়ে নানা অবজ্ঞাসূচক কল্পনা থেকে নিজেকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করতেন তিনি, তবু যখন শুনতেন যে প্রতিবেশীদের কারো বাড়িতে কোন পার্টি দেওয়া হয়েছে আর সেখানে তাঁকে ডাকা হয়নি, অত্যন্ত বিরক্তি লাগত তার। 

আর এইভাবেই ঘটনাটা ঘটল, আইরিশ টাইমস হাতে নিয়ে অ্যাব্রাহাম লিঙ্কনের ছবির নীচে বসে পার্কের পাহাড়ের নিষ্পত্র গাছগুলোর উপর দিয়ে দূরের পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে বেলার মাথায় চিন্তাটা এল যে একটা পার্টি দেওয়া দরকার। বেলা তৎক্ষণাৎ উঠে পড়লেন এবং নড়বড় নড়বড় করতে করতে ঘরের অপর প্রান্তে গিয়ে ঘণ্টি বাজালেন। ঘণ্টি শুনে খানসামা এসে হাজির হল ওনার এই সকাল কাটানোর ঘরে, পরনে তার সবুজ মোটা কাপড়ের অ্যাপ্রন, বাসনকোসন পরিষ্কার করার সময় যেটা পরে, থালা মোছার ঝাড়নটা হাতে নিয়েই চলে এসেছে সে, ফাইফরমাশের যে কোন ঠিকঠিকানা নেই সেইটা ভাল করে বুঝিয়ে দিল আর কি। 

“আপনিই কি ঘণ্টি বাজালেন?” জিজ্ঞাসা করল সে। 

“হ্যাঁ, বাজালাম, আমি ছাড়া কে বাজাবে শুনি?” 

“আমি ত বাসন পরিষ্কার করছিলাম।” 

“রাইলি,” বেলা খানিকটা গাম্ভীর্য্য নিয়ে জানালেন, “আমি ঠিক করেছি, ক্রিসমাসে একটা বলনাচের পার্টি দেব।” 

“নিশ্চয়ই দেবেন!” বলল খানসামা। “আর, ঠিক কোন কারণে আপনার এই বয়সে আপনি এখন নাচতে মনস্থ করলেন?” কিন্তু বেলা যখন তার পরিকল্পনার বিস্তারিত ব্যাখ্যা করছিলেন, রাইলির চোখে সহানুভূতির আলো ঝিলিক দিতে শুরু করল। 

“গত পঁচিশ বছরের মধ্যে গোটা দেশে এই রকম বলনাচ আর একটাও হয়নি। ভালোই খরচা পড়বে কিন্তু।” 

“এক হাজার পাউন্ড ত লাগবেই,” গর্বের সঙ্গে জানালেন বেলা। 

আয়োজনের প্রস্তুতি স্বাভাবিকভাবেই মাথা খারাপ করে দেওয়ার মত। গ্রাম থেকে সাতজন নূতন লোক নিয়োগ করে কাজে লাগিয়ে দেওয়া হল, ঝাড়-পোঁছ করা, পরিষ্কার করা, পালিশ করা, আসবাবপত্র গুছিয়ে রাখা আর গালচেগুলোকে ঠিকমত পেতে দেওয়া। তাদের সম্মিলিত কাজকর্মের ফলে প্রচুর নূতন কিছুর দরকার হয়ে পড়ল, প্লাস্টার ঢালাই লাগবে, নানা জায়গায় পচে হেজে গেছে কোন কালে, পালকের ঝাড়নের নীচে গুটিয়ে একসা, মেঝের পোকায় কাটা মেহগনি কাঠে এখানে ওখানে টিনের তাপ্পি, বড় ড্রয়িং রুমে ক্যাবিনেটের পিছনে খোলা ইঁট, বেরিয়ে পড়ল সব। দ্বিতীয় দফার অভিযানে এল রং মিস্ত্রির দল, দেয়ালের কাগজ পাল্টানোর লোক, জল-কলের মিস্ত্রি, এবং কোন এক উত্তেজনার মুহূর্তে বেলার নির্দেশে দালানের সমস্ত স্তম্ভগুলোর মাথা আর কার্নিস ঘষে মেজে ঝকঝকে করে তোলা হল, জানালাগুলোর জেল্লা ফিরল, রেলিংয়ের আলগা হয়ে যাওয়া খুঁটিগুলোকে পোক্ত করা হল, সিঁড়ির কার্পেটগুলো খানিক এদিক ওদিক করে দেওয়া হল যাতে ছেঁড়া-ফাটা অংশগুলো চোখে না পড়ে। এই পুরো কাজকর্মের সময়টা জুড়ে বেলাকে কখনোই ক্লান্ত হতে দেখা যায়নি। তিনি ঘুরে বেড়িয়েছেন ড্রয়িংরুম থেকে নাচঘর, লম্বা গ্যালারীর এ মাথা থেকে ও মাথা, সিঁড়ি বেয়ে উঠছেন, ভাড়া করা কাজের লোকদের উপদেশ-নির্দেশ দিচ্ছেন, হাল্কা আসবাবপত্রে কি গড়ানো-দরজায় নিজেই হাত লাগাচ্ছেন। আবার যখন সময় এলো, ড্রয়িং রুমের মেহগনি মেঝের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত ফ্রেঞ্চ চকের কাজে নিজেও জুড়ে গেলেন। অ্যাটিক থেকে ছুরি-কাঁটা-চামচের সিন্দুকগুলো নামিয়ে আনলেন, কতকাল আগে ভুলে যাওয়া সব চায়নার বাসনকোসন খুঁজে পেতে বার করলেন, রাইলির সাথে সেলারে গিয়ে ঝাঁঝ চলে যাওয়া টোকো শ্যাম্পেনের এখনও কটা বোতল অবশিষ্ট আছে তার হিসাব নিলেন। এবং সন্ধ্যায় যখন গতর-খাটানো মজুরেরা ক্লান্ত হয়ে তাদের সাদামাটা আমোদ-আহ্লাদে আনন্দ খুঁজছে, বেলা গভীর রাত পর্যন্ত জেগে থেকে রান্নার বইয়ের পাতা উল্টে গেলেন, বিভিন্ন প্রতিদ্বন্দ্বী খাদ্য সরবরাহকারীদের দেওয়া হিসাবের মধ্যে তুলনা করলেন, লম্বা অনুপুঙ্খ চিঠি লিখলেন নাচের দলের এজেন্টদের কাছে, এবং সব চেয়ে বেশী গুরুত্বপূর্ণ যে কাজ, অতিথিদের তালিকা তৈরী করলেন আর লেখার ডেস্কের উপর দুই সারিতে উঁচু হয়ে থাকা এনগ্রেভ করা কার্ডের খামের উপর ঠিকানা লিখলেন। 

আয়ার্ল্যান্ডে দূরত্বের কোন দাম নেই। স্রেফ বিকেল বেলায় আড্ডা দিতে হবে বলে লোকেরা অনায়াসে তিন ঘণ্টা ড্রাইভ করে চলে আসবে। আর এই রকম একটা গুরুত্বপূর্ণ বলনাচের জন্য ত কোন সফর-ই তেমন বড় কিছু ব্যাপার নয়। সামাজিক ব্যাপারস্যাপার নিয়ে রাইলির জ্ঞানগম্যি রীতিমত আধুনিক। এদিকে বেলার নিজের স্মৃতিশক্তিও হঠাৎ করে খুবই জেগে উঠেছিল। আরো যেখান থেকে যা যা খোঁজখবর পাওয়া গেছে সেই সমস্ত কিছু কাজে লাগিয়ে অনেক খেটেখুটে বেলা তার লিস্টটা বানিয়েছিলেন। পরম উৎসাহে, কোন রকম জড়তা ছাড়া, শিশুর মত গোটা গোটা হস্তাক্ষরে তিনি লিস্ট থেকে নামগুলো কার্ডে আর ঠিকানাগুলো খামে তুলতে লাগলেন। কাজটা সারতে বেশ কয়েকবার লম্বা সময় নিয়ে বসতে হয়েছিল। যাদের যাদের নাম তোলা হয়েছিল তাদের অনেকেই হয় ইতিমধ্যে মারা গেছেন নয় শয্যাশায়ী। কাউকে কাউকে আবছা মনে পড়ে, যখন দেখেছেন তাদের, ছোট বাচ্চা তারা, এখন তারা দুনিয়ার নানা প্রান্তে অবসর নেওয়ার বয়সে পৌঁছে গেছে। যেসব বাড়ির ঠিকানা লিখেছিলেন তাদের মধ্যে এমন অনেক বাড়ি ছিল যেগুলো এখন কালো কঙ্কাল, গণ্ডগোলের সময় পুড়িয়ে দিয়েছিল, আর ফিরে বানানো হয়নি। কিছু ছিল, “এখন ওগুলোয় কেউ থাকে না, শুধু জন্তুজানোয়ার পালে যারা তারা আছে”। কিন্তু এইটুকু বলা যায়, খুব তাড়াহুড়ো না করেও, সব কটা ঠিকানাই লেখা হয়েছিল। ডাকটিকিট লাগানোর শেষ পর্বটা মিটিয়ে, অন্য সময়ের তুলনায় একটু দেরী করেই ডেস্ক ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন তিনি। হাতদুটোয় রীতিমত টনটনানি, চোখ চকচক করছে, ফ্রী স্টেট পোস্ট অফিসের গঁদের আঠায় জিভ একেবারে অরুচি হয়ে আছে, মাথাটা একটু টলছে, সন্ধ্যে নাগাদ বেলা অবশেষে নিশ্চিন্ত হয়ে ডেস্কে তালা আটকালেন, পার্টির জন্য সবচেয়ে কঠিন কাজটা করা হয়ে গেছে। কিছু কিছু বিশেষ নাম ইচ্ছে করেই লিস্ট থেকে বাদ দিতে হয়েছে। 

“কি সব শুনছি, বেলা নাকি পার্টি দিচ্ছেন?” লেডি মক্সটককে বললেন লেডি গর্ডন। “আমি কোন কার্ড পাইনি।” “আমিও পাইনি, অন্ততঃ এখন পর্যন্ত। আশা করি বুড়ি আমায় ভুলে যায়নি। আমি কিন্তু অবশ্যই যেতে চাই। ঐ বাড়ির ভিতরে আমার কোনদিন ঢোকা হয়নি। আমার মনে হয়, দারুণ দারুণ কিছু জিনিষ জোগাড় করে রেখেছেন উনি।” 

ইংরেজ গাম্ভীর্য্যের যথাযথ মর্যাদা দিয়ে এই ভদ্রমহিলা, যাঁর স্বামী ‘মক হিল’-টা ভাড়া দিয়ে দিয়েছেন, ফ্লীসটাউনে আদৌ কোন পার্টি দেওয়া হচ্ছে কি না সেই নিয়ে আর কোন কথায় গেলেন না। 

সময় যত এগিয়ে এল, বেলা নিজেকে কেমন দেখাচ্ছে তাই নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। হাল ফ্যাশানের পোশাক সামান্যই কেনা ছিল তার, আর ডাবলিনের যে পোশাকের দোকান থেকে কেনাকাটা করতেন তিনি সেটা ইতিমধ্যে উঠে গিয়েছিল। মাথা খারাপ হয়ে যাওয়ার মত অবস্থায় তিনি প্রায় ঠিক করেই ফেলেছিলেন যে সোজা লন্ডন চলে যাবেন, চাই কি প্যারীতেও, নিতান্ত সময়ের টানাটানিতেই সেই পরিকল্পনা বাতিল করতে বাধ্য হলেন। শেষ পর্যন্ত ঠিকঠাক একটা দোকান যোগাড় হল, এবং ক্রিমসন সাটিনের একটা দুর্দান্ত গাউন কিনে ফেললেন তিনি, তার সাথে জুড়ে নিলেন লম্বা সাদা দস্তানা আর সাটিনের জুতো। তার গয়নাগাটির মধ্যে কোন টায়রা ছিলনা, এটাই যা দুঃখের! কিন্তু তিনি গাদা করে বিরল সব উজ্জ্বল ভিক্টোরিয়ান আংটি, হার, লকেট, মুক্তোর ব্রুচ, টারকয়েজ কানের দুল, আর একটা তামড়ি-খচিত গলবন্ধ বার করে আনলেন। এ ছাড়া চুল সাজানোর জন্য ডাবলিন থেকে একজন কেশ-প্রসাধককেও ঠিক করে ফেললেন। 

নাচের পার্টির দিন সকাল সকাল ঘুম ভেঙ্গে গেল, স্নায়ুর উত্তেজনায় শরীরটা একটু জ্বর মতন লাগছে, যতক্ষণ না কেউ ডাকতে এল, বিছানায় মোচড়া-মুচড়ি করতে থাকলেন তিনি, অস্থিরভাবে সমস্ত খুঁটিনাটি বারে বারে মনের মধ্যে ঝালিয়ে নিলেন। দুপুরের আগেই নাচঘর এবং খাবারঘরের সমস্ত আলোকসজ্জার তদারকি করলেন, অজস্র বাতিদানে শতশত মোমবাতি আর ওয়াটারফোর্ডের পলকাটা কাঁচের তিনখানা বিশাল ঝাড়বাতি; ছুরি-কাঁটা-চামচ আর কাঁচের বাসনে খাবার টেবিল ঠিকমত সাজানো হয়েছে কিনা দেখলেন, মদ ঠাণ্ডা রাখার মস্ত পাত্রগুলো বাফের পাশে দাঁড় করানো হল, সিঁড়ি আর নাচঘর ক্রিসেন্থিমাম দিয়ে মুড়ে দেয়া হল। রাইলি যদিও খাবার পরিবেশক সংস্থার থেকে ইতিমধ্যে যে সব বিশেষ পদগুলি এসে গেছে সেগুলির একটু নমুনা চেখে দেখে নিতে অনুরোধ করেছিল, তিনি সেদিন দুপুরে কোন খাবারই মুখে তুললেন না। তাঁর অল্প অল্প মাথা ঘুরছিল, শুয়ে রইলেন একটুক্ষণ, কিন্তু তাড়াতাড়িই আবার উঠে পড়ে, ভাড়া করা কাজের লোকদের চাপরাশে নকশাদার বোতামগুলো নিজে হাতে সেলাই করে বসিয়ে দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। 

নিমন্ত্রণপত্রে সময় ধরা হয়েছিল আট-টা। বেলার চিন্তা হচ্ছিল যে সময়টা কিছুটা আগে আগে হয়ে গেল কি না – তিনি গল্প শুনেছেন যে অনেক পার্টি বেশ রাত করেই শুরু হয় – কিন্তু বিকেলটা যত অসহ্যভাবে লম্বা হতে রইল, এবং গোধূলির গাঢ় আলো যখন বাড়িটা ছেয়ে ফেলল, বেলা এই ভেবে খুশী হলেন যে এই ক্লান্তিকর অপেক্ষার সময়টা কম রেখে তিনি ভালোই করেছেন। , 

ছ’টার সময় তিনি সাজতে গেলেন। চুল ঠিক করার লোক এর মধ্যেই তার ব্যাগভর্তি চিমটে আর চিরুনি নিয়ে হাজির হয়ে গেছে। সে লোক তার চুলগুলো চিরুনি চালিয়ে, কুণ্ডলী পাকিয়ে, ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে তারপর যেমন যেমন দরকার কায়দা কসরৎ লাগিয়ে এমন করল যে চুলের সাজ বেশ গোছানো, আনুষ্ঠানিক হয়ে উঠল, অন্তত আগের থেকে ভরাট ত দেখাচ্ছিলই। একে একে সমস্ত গয়না পরা শেষ করে যখন তিনি তার পূর্ণাবয়ব আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন বিস্ময়ে দম আটকে আসার মত একটা ছোট্ট অনুভূতি চাপতে পারলেন না তিনি। তারপর তিনি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে নীচে নেমে এলেন। 

মোমবাতির আলোয় বাড়িটা অপূর্ব দেখাচ্ছিল। বাজনদারেরা হাজির, বারোজন ভাড়া করে আনা চাপরাসি, হাঁটু পর্যন্ত লম্বা চুড়িদার পায়জামা আর কালো রেশমি মোজায় সজ্জিত রাইলি। 

আটটা বাজল। বেলা অপেক্ষা করে আছেন। কেউ আসেনি। 

সিঁড়ির মাথায় একটা গিলটি করা চেয়ারে বসে আছেন তিনি, নীল চোখের স্থির শূন্য দৃষ্টি সামনে ছড়ানো। নাচঘরে, কোট রাখার ঘরে, খাবার ঘরে, সর্বত্র ভাড়া করা চাপরাসিরা একে অপরের দিকে তাকিয়ে আছে, অভিজ্ঞ ইশারায়। “কি আশা করে আছে বুড়ি? দশটার আগে কেউ রাতের খাওয়া শেষ করবে না।” 

যোগানদারেরা জোরে জোরে পা ফেলে আর হাতে হাত ঘষে গা গরম রাখছে। রাত সাড়ে বারোটায় বেলা তার চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। মুখ দেখে বোঝা গেল না কি ভাবছেন। 

“রাইলি, আমার মনে হয় আমি কিছু খাব এখন। খুব একটা ভাল লাগছে না আমার।” 

আস্তে আস্তে নড়বড় করতে করতে খাওয়ার ঘরের দিকে এগোলেন তিনি। 

“আমাকে একটা পুর-ঠাসা কোয়েল দাও আর এক গ্লাস মদ। বাজনদারদের বাজনা শুরু করতে বলো।” 

ব্লু ডানিয়ুব ওয়াল্টজের সুর নাচঘর ভাসিয়ে নিল। বেলা অনুমোদনের হাসি দিলেন এবং সুরের তালে তালে মৃদু মাথা দোলালেন। 

“রাইলি, আমার বেশ ভালোই ক্ষিধে পেয়েছে। সারাদিন কিচ্ছু খাইনি। আমায় আর একটা কোয়েল দাও। এবং আরো খানিকটা শ্যাম্পেন।” 

মোমবাতির আলোকসজ্জা আর ভাড়া করা চাপরাশিদের মাঝখানে তার একলা মনিবানিকে রাইলি যত্ন করে চমৎকার নৈশভোজ খাওয়াল। তিনি প্রতিটি গ্রাস উপভোগ করলেন। 

এবার তিনি উঠে দাঁড়ালেন। “আমার আশঙ্কা হচ্ছে, কোথাও নিশ্চয়ই কিছু ভুল হয়েছে। মনে হয় না আজ আর কেউ নাচের অনুষ্ঠানে আসছে। এত মেহনতের এই ফল খুবই হতাশার। বাজনদারদের তুমি এখন বাড়ি চলে যেতে বলে দিতে পারো।” 

কিন্তু ঠিক যখন তিনি খাবার ঘর ছেড়ে বের হচ্ছেন নাচঘরে একটা গুঞ্জন শোনা গেল। অতিথিরা আসছেন। পড়িমরি করে বেলা সিঁড়ি বেয়ে ছুটলেন, অতিথিদের নাম ঘোষণার আগে তাকে সিঁড়ির সর্বোচ্চ প্রান্তে পৌঁছতেই হবে। এক হাত রেলিংয়ে, আরেক হাত লাঠিতে ভর দিয়ে, বুক ধ্বক ধ্বক করতে করতে, একেক লাফে দুটো করে সিঁড়ি টপকে এগোলেন তিনি। অবশেষে সিঁড়ির মাথায় পৌঁছে ঘুরে দাঁড়িয়ে অভ্যাগতদের মুখোমুখি হলেন। চোখর সামনেটা বাষ্পে ঝাপসা, কানে ঝিঁঝিঁ ধরে গেছে। অনেক চেষ্টা করে শ্বাস নিলেন তিনি। অস্পষ্ট ভাবে দেখতে পেলেন চারটি অবয়ব এগিয়ে আসছে, রাইলি তাদের কাছে এগিয়ে গেল এবং নাম ঘোষণা করলঃ 

“লর্ড এবং লেডি মকস্টক, স্যার স্যামুয়েল এবং লেডি গর্ডন।” 

হঠাৎ-ই যে ঘোরের মধ্য দিয়ে বেলা চলছিলেন, সেটা কেটে গেল। সিঁড়িতে এখন যে দুজন মহিলা দাঁড়িয়ে আছেন তাদের কাউকেই তিনি ডাকেননি – লেডি মকস্টক, কাপড়ের ব্যপারীর মেয়ে, লেডি গর্ডন, সেই আমেরিকান। 

সোজা হয়ে দাঁড়ালেন তিনি এবং তার শূন্য নীল চোখের দৃষ্টি দিয়ে থামালেন তাদের। 

“এই সম্মান আশা করিনি আমি।” বললেন তিনি। “আপনাদের আপ্যায়ন করতে না পারার জন্য আমায় ক্ষমা করবেন।” 

মকস্টক এবং গর্ডনরা হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। তাদের নিমন্ত্রণকর্ত্রীর উন্মাদ নীল চোখদুটি দেখলেন, তার ক্রিমসন পোষাক, পিছনে নাচঘর, খা খা শূন্যতায় যা বিশাল দেখাচ্ছে, শুনতে পেলেন নাচের বাজনা খালি বাড়িতে প্রতিধ্বনি তুলে বেজে যাচ্ছে। ক্রিসেন্থিমামের গন্ধে ঘরের বাতাস মাতাল। এবং তখন এই দৃশ্যের নাটকীয়তা আর অবাস্তবতাটা কেটে গেল। মিস ফ্লীস হঠাৎ বসে পড়লেন, এবং খানসামার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললেন “বুঝতে পারছি না কি হচ্ছে।” 

খানসামা আর ভাড়া করা চাপরাসিদের দু’জন ধরাধরি করে বৃদ্ধাকে সোফায় নিয়ে গেল। তিন আর একবারই মাত্র কথা বললেন। তার মন তখনও ঐ একটা বিষয়েই আটকে আছে। “নিমন্ত্রণ ছাড়াই চলে এসেছে এরা, এই দুই ... আর কেউ আসে নি।” 

এর একদিন বাদে তিনি মারা গেলেন। 

মিস্টার ব্যাঙ্কস অন্ত্যেষ্টিতে এলেন এবং একটি পুরো সপ্তাহ ব্যয় করলেন বেলার কাগজপত্র ঝাড়াই বাছাই করে গুছিয়ে রাখতে। গোছাতে গিয়ে লেখার ডেস্কে দেখতে পেলেন, পড়ে আছে, ডাকটিকিট লাগানো, ঠিকানা লেখা, ডাকে না পাঠানো, নাচের নিমন্ত্রণপত্রগুলি।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন