সোমবার, ১ আগস্ট, ২০১৬

মেল্টিং-পট, ফিশ-কারি ও মিথিক্যাল অ্যান্সেস্টরস


অনামিকা বন্দ্যোপাধ্যায়

আমার ছেলের বন্ধু ভিক্টোরিয়া। পিঠময় লম্বা কালো চুল আর গভীর দুই চোখ। সেই চুলে সে মাথাময় ছোট ছোট বেণী বেঁধে রাখে। তারা বার্কলি থেকে ফ্লোরিডা এসেছে বছর কয়েক হোল। স্প্রিং ব্রেকের ছুটিতে একদিন সে তার বড় দিদির সঙ্গে এসে বলে, তারা মাছ ধরতে যাবে সবাই মিলে, সে চায় বালুও তাদের সঙ্গে যায়। আমি 'হ্যাঁ' বলতেই তাদের দিদি জোরাজুরি করল, আমার মা তো জানো তোমার হাতের কারি বলতে অজ্ঞান, তুমিও চল আমাদের সঙ্গে, মাছ পুড়িয়ে খাওয়া হবে, আর তুমি তার তদারকি করবে। নেহাতই উইকেন্ড। ওজর-আপত্তি খাটল না।


বড় এক ভ্যানে চড়ে যাওয়া হচ্ছে ঘণ্টা দু'এক দূরের এক লেকে। সেখানে খাওয়ার উপযোগী মাছ মেলে। তাদের মোটর বোট আছে। গাড়ির মাথায় বোট বেঁধে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সেই বোটে করে গিয়ে ওপারে বসে, চুপচাপ লেক-ধারে মাছ ধরা হবে। সঙ্গে যাচ্ছে বারবিকিউ এর যাকিছু সরঞ্জাম। আমি জিরে, ধনে, শুকনো লঙ্কা'র কৌটো গুছিয়ে ভ্যানে গিয়ে উঠলুম।

ভিক্টোরিয়ার বাবা, গ্যাব্রিয়েল, একজন সফটওয়্যার এঞ্জিনিয়ার। মা, জাডা, লাইব্রেরিয়ান। ভিক্টোরিয়ারা তিন বোন, এক ভাই। ভাইটি এখন কর্নেলে ডাক্তারি পড়ছে। গাড়ি চলতেই গান চালু হোল। খুবই স্বাভাবিক আফ্রিকান-আমেরিকান কায়দায়। আমি ব্লুজ গাইতে পারি শুনে তো তিন তালি দিয়ে গাড়ি থেকে তারা নেমে পড়ে প্রায়। প্রাথমিক পরিচিতি ও প্রত্যাশা থেকে টিনা টারনার ধরা হোল। যেমন ভারতীয় অন্তাক্ষরী তে বলিউডি-লতা-কিশোর ধরা হয়। আমি শর্ত দিলুম-- বিয়ার খেতে খেতে কিন্তু ড্রাইভ করা চলবে না। নিমরাজি হতে হতেও গ্যাব্রিয়েল শেষমেশ রাজিই হয়ে গেল।

অতএব গন্তব্য। মাছ ধরা ও পুড়িয়ে খাওয়া। সঙ্গে আনা হয়েছিল আরও রুটি, সবজি ও মাংস। লেকের পারে, গাছের ছায়ায়, মাছে মসলা মাখাতে মাখাতে গল্প জমে।

জাডা মজা করে বলে, - 'এরপর অফিসে গিয়ে শুনতে হবে, তুমি ব্ল্যাকদের সঙ্গে বেশি মেলামেশা করছ আজকাল। খুবি রেগে যাবে তোমার কম্যুনিটি '।

-না না, কম্যুনিটির লোকরা রাগবে কেন ?

-আমি তো জানতাম তুমি বুদ্ধিমতী । তোমার এসব প্রেটেন্সানস সাজে না। ভারতীরা আমাদের মোটেই পছন্দ করেনা। আমি অনেক খবর রাখি। ভারতে আমার চেনা দু'জন কালো ছাত্র পড়তে গিয়েছিল, তাদের সঙ্গে কেউ মিশত না। তারা বাচ্চাদের বিস্কিট দিলে, নিত না। তারা কিন্তু এমনকি সিগারেটও খেত না, অথচ লোকে ভাবত তারা ড্রাগ ডিলার। নো গুড প্লেস ফর আস । আমার দিদির ছেলের একটা কনফারেন্সে দিল্লি যাওয়ার কথা ছিল, সে তো শুনেই না করে দিয়েছে।

এমন সময় জাডার বড় মেয়ে, কিয়ারা, যে গেইন্সভিলে জেন্ডার স্টাডিজে আন্ডারগ্রাড করছে, সে এসে বলে-- সেটা কিন্তু খুবি স্টেরেওটাইপিং করা হবে মামা, এই নর্থ আমেরিকাতে এই যে মিশ্র আইডেন্টিটির গোঁড়ামি, সেখানেও সবাই কিন্তু এক না। আমিরি বারাকার সমর্থনে এগিয়ে এসেছিলেন কারা ?

বলে সে তাকায় আমার দিকে।

কথা বাড়াব কিনা ভাবতে গিয়ে বুঝি, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়াবে বারাকার ভূমিকা। তার কর্ম পরিচয়।

কবি, প্রাবন্ধিক, সঙ্গীত সমালোচক, উপন্যাসিক, এবং ছোট গল্পের লেখক বারাকা। জন্মনাম ছিল - লেরয় জোন্স। আর অর্ধ-শতাব্দী জুড়ে তিনি কবিতার উত্তর কে বেছে নিয়েছিলেন, তার রাজনৈতিক বক্তব্যের ব্যাবহারে।

জাডা বলে-- জেন্ডার স্টাডিজে যাই শেখো না কেন, গোটা নর্থের কাজই হোল আমাদেরকে আলাদা করে রাখা।

আমি মনে মনে বলি, শুধু ব্ল্যাক কেন, সব ইম্মিগ্র্যান্টই কি এভাবে ভাবে না। আর পলিটিকালি কারেক্ট আমেরিকা কেবলই মেল্টিং-পটের গল্প শোনায়।

গ্যাব্রিয়েল আমাদের কথার খেই ধরে শুরু করে--

'যখন আমি লুইসিয়ানায় বড় হচ্ছিলাম, তা তখন ছিল ব্ল্যাক মানুষদের জবরদস্ত ঘাঁটি। গ্যাব্রিয়েল বলে চলে - তখন আমরা ভাইবোনরা প্রায়ই একটা খেলা খেলতাম। সেটার নাম ছিল-- How Many Times Will We Get Pulled Over When Daddy Picks Us Up from School This Week । আমি হলুদ মাখাতে গিয়ে অল্প থামি। জাডা আমার চোখের ভাষা পড়ে ফেলে। গ্যাব্রিয়েল প্রায় না তাকিয়েই বলে চলে-- আর প্রত্যেক সপ্তাতেই পুলিশের গাড়ি এসে আমাদের গাড়ি থামাত। সদ্য-ধরা মাছটাকে বঁড়শি থেকে হিঁচড়ে নামায় গ্যাব্রিয়েল। একটু দম নিয়ে বলে-- আর প্রায় প্রত্যেক বারই, প্রতিটি বারই একই অজুহাতে, যার বয়ান কখনো পাল্টায় নি-- 'একটা রবারি হয়েছে, আর গাড়িটা তোমাদের সঙ্গে হুবহু মিলে যাচ্ছে।'

হোহো শব্দে লেক কাঁপিয়ে হেসে ওঠে গ্যাব্রিয়েল। জাডা, মাছ গুলো কেটে কুটে রাখছে। তার মুখ ভাঁজবিহীন।

"বাবা আমাদের হেনরি 'বক্স' ব্রাউনের গল্প বলতেন, যিনি আস্ত নিজেকে একটা বাক্সে মেইল করে পাঠিয়ে ছিলেন অন্য শহরে, স্লেভারি থেকে বাঁচতে। বলতেন বাস রিভসের কথা। "

কিয়ারা থামিয়ে দেয় বাবাকে, বলে -- আর অন্যদের কথা? আরও কিছু গল্প ?... কালো মানুষের সংগ্রামে শুধু কি করে যে মেয়েদের কথাগুলো বাদ পড়ে যায় কে জানে ?

আমি আবার মনে মনে আউড়াই, সে'তো আমিরি বারাকা ও তার বীট বন্ধুদেরও একই সমস্যা। কিন্তু সে প্রসঙ্গে যাই না এখন।

শোনার মন নেই গ্যাব্রিয়েলের কিছু। সে মনোলগের মত বলে চলে-- আমিতো প্রস্তুত থাকি, কখন না জানি পুলিশের গুলি এসে থামায় আমাকে। কালো মানুষরা সেই নেশা করে মরবে, আর পুলিশের গুলিতে।

ফ্লোরিডার ট্রপিকাল আকাশে মেঘ করে । মন কেমনের বিকেল বেলার মত আলো। বৃষ্টি পড়ার আগেই ডিনার সারতে হবে।


****


আজ সাত'ই জুলাই, নিউইয়র্ক--

ফিলান্ডো কাস্তিল নামে এক কালো মানুষকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। গুলি করেছে পুলিশ ফোরস।

এযাবৎ কেবলমাত্র ২০১৬ সালে জুলাই'সাত পর্যন্ত, ১৩৬ জন কালো মানুষকে গুলি করে হত্যা করেছে পুলিশ। ( তথ্য ও সার্ভে : দ্য গার্জিয়ান )

এই মুহূর্তে যখন পুলিশি খুনের বিরুদ্ধে দেশ জুড়ে ঘৃণা আর রাগ-বমি হচ্ছে মানুষের, ধরা যাক বেশির ভাগ মানুষের; তখন, আজ ৯ই জুলাই হিউস্টনে 'ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার' আন্দোলনের ক্ষোভ সমাবেশে, পালটা গুলি চালিয়ে ৩ পুলিশ অফিসারকে খুন করেছে এক ক্ষোভ প্রদর্শনকারী।

ক্ষোভ সমাবেশের ছবিতে, ব্যাল্ডুইনএর কোটেশানে লেখা স্লোগান চোখে পড়ল। আমার লিবেরাল কোলীগদের ধারণা, এরকম চলতে থাকলে সিভিল রাইটস লেগে যাবে শিগগিরি। কিয়ারার কথা মনে পড়ে আমার। বাড়ী ফিরে খুলে বসি আমিরি বারাকার অটোবায়োগ্রাফি।

'Then another cop stepped forward, I think he was saying the same thing.
What was really out is that this cop I recognized, we had gone to
Highschool together! His name was Salvatore Mellillo. The classic Italian
American face. “Hey, I know you,”

"আমি বুঝতে পারছিলাম, আমাকে খুন করা হচ্ছে। কি দারুণ ব্যাপার যে আমি ব্যথা অনুভব
করছিলাম না, কারণ তার অনেক আগেই আমরা অর্ধেক সচেতনতা চলে গিয়েছে। আমার সহপাঠীর
ব্যারেল আমার মাথায় আঘাত করে, আমার ব্যথা-চেতনাকে লুপ্ত করছে।"

বারাকা, তাকে খুন করতে আসা শাদা সহপাঠীটিকে 'সহ-পাঠী' বলে চিহ্নিত করতে পারছেন। আর এরপরই তিনি স্মৃতি হারাচ্ছেন। চেতনা'র অতলে যাচ্ছেন। যার থেকে জেগে উঠে তিনি উদ্ধার করতে পারবেন কালো মানুষের অস্তিত্বের চিহ্ন গুলিকে, বলবেন -- হেই, আই নো ইয়ু ।

১৯৬৮ 'র উত্তাল সময়। যখন 'নিগ্রো', এই অবমাননাকর শব্দটি সবে বিদায় নিচ্ছে ও পলিটিকালি কারেক্ট " আফ্রিকান-আমেরিকান " জায়গা করে নিচ্ছে, তেমন এক সময়ে এই পুলিশি নিগ্রহ বারাকার ওপর। আমিরি'র সমর্থনে এগিয়ে এলেন, আমেরিকার সেই সময়ের সবচে' র‍্যাডিকাল কণ্ঠগুলি। সেই ঐতিহাসিক খোলা চিঠিটির ড্রাফট তৈরি হোল। গঠন হোল কমিটি- Committee on Poetry” — সংক্ষেপে COP ! পান টি লক্ষ্য করুন। কি উদ্দেশ্যমুলক! সই করলেন -- অ্যালেন গিন্সবারগ, ডেনিস লেভেরতভ সহ ষোল জন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কবি। উল্লেখ প্রয়োজন - সবাই ছিলেন শাদা মানুষ। এবং এটিও উদ্দেশ্যমূলক।


*****

ব্যাল্ডউইনের কথায় এলাম আবার। সঙ্গে আনছি মারগারেট মীডকে ।

উনিশশ সত্তর এর সামারের সন্ধ্যে । এই নিউইয়র্ক শহরের একটি মঞ্চে ধীর, গভীর পায়ে উঠে এলেন দুই আলোচক, মারগারেট মীড ও জেমস ব্যাল্ডউইন। প্রায় সাড়ে সাত ঘণ্টার এক জোরালো ঐতিহাসিক কথা আর উপকথন এর সাক্ষী হয়ে থাকল এই নিউইয়র্ক শহর।

তখন ব্যাল্ডউইন ছেচল্লিশ। বাস করছেন প্যারিসে। আর তর্কাতীত ভাবেই এই গ্রহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কবি- ভাষ্যকারদের একজন এবং আমেরিকার সিভিল রাইটসের দম-মেজাজি প্রভাবশালী কণ্ঠ। মীড, সবে সত্তর ছুঁয়েছেন। গ্রাউন্ডব্রেকিং অ্যানথ্রপলজিস্ট। সারা পৃথিবী জুড়ে বক্তৃতা করে চলেছেন।

সাড়ে সাত ঘণ্টার এই কথা-চারিতায় আমায় এখন সবচে ভাবাচ্ছে যা, তা হোল-- তাদের মেল্টিং পট ও মিথিক্যাল অ্যান্সেস্টরস এর তত্বাদি।

' পূর্বসূরি শুধু জিনিওলজি অনুযায়ী কেন হবে ? হ্যাঁ, আমারা আমাদের জেনেটিক পূর্বসূরি নির্বাচন করেতে পারিনা ঠিকই, কিন্তু আমাদের আত্মিক, মননের চাহিদা অনুযায়ী পূর্বসূরি অবশ্যই নির্বাচন করতে পারি। এতে বাধাটা কোথায় ? ' - বলছেন ব্যাল্ডউইন।

মীড : আমাদের অ্যানথ্রপলজিতে একটা শব্দ আছে-- mythical ancestors। তারা হলেন আত্মিক বা মানস পূর্বজ / জা। বায়োলজিকাল না। কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই শব্দ চয়ন ও তদুপরি পূর্বসূরি নির্বাচন। কোন রক্ত-সম্পর্ক ছাড়া । এখানে জিনিওলজি কে মানা হবেনা।

ব্যাল্ডউইন : ঠিক তাই। এই মিথিক্যাল অ্যান্সেস্টরস' রা হলেন আমদের মননের পূর্ব-মানুষ-মানুষী'রা। আমাদের বায়োলজিক্যাল পূর্ব-মানুষ-মানুষী নয়। তাদের আমরা চয়ন করতে পারব। তাদের ভাবাদর্শের সঙ্গে নিজেকে মিলিয়ে নিতে পারব।

মীড : এটা একটা মেল্টিং পট বলব কি ?

ব্যাল্ডউইন: না বলব না। মেল্টিং-পট একটি অসভ্য মেটাফর, কেউই গলিত হয়ে মিশে যেতে চায়না ।

মীড : এটা একটা বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী ধারণা। এবং খারাপ ধারণা। সবাইকে এক পাত্রে গলিয়ে ফেলা।

ব্যাল্ডউইন : মানুষ এর বিরোধিতা করে।

মীড : নিশ্চয়ই, কেই বা নিজস্বতা হারাতে চায় ? দুঃখজনক ।

মীড আরও লিখছেন -- 'The more complex a society becomes, the more fully the law must take into account the diversity of the people who live in it."


আমি ভেবে চলছি, এই মেল্টিং পটের ধারণায় ইম্মিগ্র্যান্ট রা সর্বদাই বেভুল। 'কত তাড়াতাড়ি আমেরিকান হয়ে ওঠা যাবে-- এই 'রোড-ট্রিপের' সবচে খেলদার ভুলভুলাইয়া হোল- আমেরিকান হতে গেলে কি কি গ্রহণ ও কি কি বর্জন করতে হবে। এই " আমেরিকান" মেল্টিং পটের থেকে উঠে পাওয়া যাবে কোন সেই প্ল্যাটার, যাতে তুমি এঁটে যাবে। তোমাকে আর ইম্মিগ্র্যান্ট বলে চেনা যাবেনা। আর কড়াইতে যাওয়ার আগে কি কি তোমার চামড়া থেকে ছাড়িয়ে নেওয়া হবে। ইতিহাস, ভূগোল, জেনেটিক মনস্তত্ত্ব ভেদে এই সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত কি বা কারা নিয়ন্ত্রণ করে ? জাতীয়তাবাদী ইতিহাস, উপনিবেশের ইতিহাস, নিজভূমে পরবাসীর ইতিহাস, ভাষা- জমি ছিনিয়ে নেয়ার ইতিহাস ও রক্ত সম্পর্কের জিন- কৌটোয় রাখা আমাদের পারিবারিক অশিক্ষা আর মুর্খামির অ-ইতিহাস। কফি গ্রাইন্ডারের ঘহ্ররর শব্দ ফিরিয়ে আনে আমায়। নিউইয়র্কের স্কাইলাইন ধরে সন্ধ্যে নামতে থাকে দ্রুত । নীচে ম্যানহাটানের রাস্তায় সবকটি আলো জ্বলে উঠেছে। আমি ব্যাগ গুছিয়ে বাড়ির দিকে পা বাড়াই। রূপবতী এই শহরের সাইডওয়াকে আমি অন্য শহরের মত বহিরাগত অনুভব করিনা। উঁচু বাড়ীর নিউইয়র্ক, গৃহহীনের নিউইয়র্ক, অভিবাসীর নিউইয়র্ক। প্রিয় শহর, সে আমাকে হাত পেতে নেয়। তার আদরে আমি অনেক পথ একা চলতে পারি। আর হাঁটতে হাঁটতে ভাবি-- একটা গোটা সমাজ দায়ী থাকে। দায়ী থাকে অশিক্ষা-মুর্খামির দায় বদ্ধতা নিয়ে, সেই সমাজ তাকে মিথিক্যাল বা জেনেওলজিকাল কোন পূর্বসূরি কেই চিনে উঠতে দেয়না। শেষ পর্যন্ত। যতক্ষণ না তুমি উঠে দাঁড়িয়ে বলছ, প্রতিষ্ঠা করছ, ঠিক কি ব্যবহার তুমি প্রত্যাশা কর।

এসব কথা আমার মেয়েবেলায় আমার অজানা ছিল। আমার মনে পড়ে গেল। বীরভূমের আমাদের খামার বাড়ীর সেইসব কথা। মুনিষ, মান্দার, বাগালদের শ্রম-ঘেরা চাষআবাদের কথা, গ্রামীণ ব্রাহ্মণ্য চাষীজীবীদের মূর্খ-ঔদ্ধত্য আর সুপ্রেমেসির কথা। আর 'ভিখু'দের কথা।

আমাদের খামার-বাড়ীর মান্দার ছিলেন ভিখুমামা। কাজ- মুনিষ খাটা। দুপুরে ভাত ফুটত দুটি ভিন্ন রান্নাশালায়। মুনিষ, মান্দার যারা, তাদের জন্যে খাওয়ার আলাদা সস্তার থালাবাটি ছাড়া ছিল আলাদা মাটির হাঁড়ি, হাতা-খুন্তি এইসব। বাড়ীর অন্য গৃহ-কাজের কর্মীরা তাকে 'যেন আলকাতরা' র ভুসি', 'ভাম বেড়াল' , 'মাগো যেন একটা হাফসি, আবার টেরি বাগানো হয়েছে' ইত্যাদি বলে প্রকাশ্যে "রঙ্গ" করতেন। আর বাড়ীর দিদা-কাকীরা অন্দরে। ভিখুমামাও তাদের সঙ্গে নিজেকে নিয়ে মজা করতেন। আর আমরা তার গায়ের কাছ দিয়ে গেলে রেগে যেতেন- ' হ হ, দিখ কাণ্ড বটেক, দিল্যান তো আমায় ছুঁইয়ে, দেখখ ইবার বাড়ীর মার খাও গিয়া ক্যানে । '

- তোমরা সবাই এত কালো কেন ?

ভিখু মামা সাদা ধবধবে দাঁত বের করে বলেন- - আমরা শিবের ভুত, গাজন গাই।


- শিব, আবার গাজন, তরা কিসের পুজো করিস বল দেখি ? খালি খাওয়া আর মদ, মেয়ে মদ্দ মিলে। পুজো নাই, ঠাকুর নাই , শিবের গাজন গাওয়ার শখ, তরা কি হিন্দু না কি ? চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে ঝগড়া বানাতেন গবা'র মা। তিনি ছিলেন বাড়ীর গৃহ-কর্মীদের হেড।

-ও ভিখুমামা, তোমাদের ভগবান নেই ?

-কেই জানে, তমাদের ভগবান কেই তো আমরা মনাতে চাই, পূজা চড়াই। মা মনসা জাইনবেক বটে।


তার ছোট ছেলেটি, ভকত, একদিন বাগাল হয়ে কাজ করতে এলো। বাগালদের কাজ গরুদের ছানি ( খড় ) কাটা, জাব খাওয়ানো আর পুকুরে গিয়ে তাদের গা ধোয়ানো। তার বয়েস কোনমতে তখন দশ। তার সঙ্গে আমাদের বেশ একটা ভাব-মত হয়ে গেল। সে আমাদের রঙ্গিন মার্বেলে গুলি খেলা শেখাত। আমরা লজেন্স দিলে লজ্জা-লজ্জা মুখ করে নিত।

ভকত চান করার সময় তেল চাইত। গায়ে মাখবে বলে। আমরা সবাই তাকে তেল দিতে এক পায়ে খাড়া। দেয়ার পদ্ধতিতে ছিল আমাদের যাবতীয় আগ্রহ। সে তার বাবার সঙ্গে একটা সরু-মুখ বোতল এনে পাথরের দাওয়ার নীচে দাঁড়াত, বোতলের সরু মুখ ঘিরে থাকত তাদের হাত, যাতে হাত বেয়ে সেই সরু মুখ দিয়ে তেল বোতলে জমা হতে পারে। আর আমরা, দাওয়ার ওপর প্রায় চার-হাত মাপ উঁচু থেকে তাদের হাতে সোনালী রঙের সর্ষের তেল ঢেলে দিতুম। সেই কাজে উৎসাহ খুব, কিন্তু কড়া নিষেধ ছিল- দাওয়ার ওপর থেকে তেল ফেলতে হবে, কোনরকম " ছোঁয়া-ছানি " চলবেনা। বাউড়ি আর বাগদীদের ছোঁয়া কেন বারণ, একথার উত্তর কেউ আমাদের পুরোপুরি বুঝিয়ে দেয়ার আগেই ধমক মেরে কাজ সারতেন। আমাদেরও আর ব্যাখ্যা জেনে ওঠা হয়নি কখনো।

ভকত একদিন ছানি কাটতে গিয়ে হাত কেটে ফেলল। ওইটুকু হাতে অত বড় বঁটি সামলাতে পারেনি। হাত কেটে রক্তা-রক্তি। আমরা ভাইবোনরা গিয়ে ডেটল, নেওস্পরিন নিয়ে ব্যান্ডেজ করতে লেগে গেলাম। ভকত ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। ভকতের মা ও। সোনা কাকাকে খবর দেওয়া হোল। সোনাকাকা এসে ভকতকে সাইকেলে বসিয়ে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলেন।

রক্ত-টক্ত সাফ করে, হাত ধুয়ে ঘরে ঢুকতে যাব, ছোড়দিদা, বড়দিদা এসে হাঁই হাঁই করে কলতলায় টেনে নিয়ে গেলেন। তখনও বাথরুমে তোলা জলে চান করতে হত। উঠোনের কুয়ো আর টিউবওয়েলের জল ধরে বাথরুমে রেখে আসত বামুন বা বড়জোর কায়স্থ জাতের কেউ, কলকাতার বাড়ীতে যাদের আমরা কাজের মাসি বলতুম। বামুন বা কায়স্থ ছাড়া কাউকে স্নান বা খাওয়ার জল দিতে দেখিনি। আর দুর্গাপুজোর সময়, বামুন না হলে সব কর্মীদেরই রান্নাঘর, জলতোলা ইত্যাদি থেকে ডিমোশন হত। তাদের হাতে থাকত শুধু বিছানা করা, ঘর ঝাড়-পোঁছ আর এঁটো তোলার কাজ। তো, কলতলায় গিয়ে হুর-হুর করে জল ঢেলে দেওয়া হোল মাথায়। বাউড়ি জাতের ছোটলোক কে আমরা ছুঁয়ে দিয়েছি। আমাদের মা-পিসি দের কোন ওজর-আপত্তি খাটল না। উল্টে, দিদারা সোনার ভারি-ভারি চুরি পরা হাত ঘুরিয়ে ঝনন ঝনন আওয়াজ তুলে বলতে লাগলেন - কি ভাবে সেজ ( ডাক্তার দাদু ) ও মেজ ঠাকুরপো ( আমার ঠাকুরদা ) আমাদের বিলিতি শিক্ষা দিয়ে সব ভুলিয়ে দিচ্ছেন। আর সেজ-দাদু'র তো দুর্গা-পুজোর পাটই উঠে গেছে, কবে নাকি তিনি এফ আর সি এস পড়তে গিয়ে নিষিদ্ধ মাংস খেয়ে এসেছেন, তাকে হাজার বলেও প্রায়শ্চিত্ত করানো যায়নি, উল্টে দাদু দুর্গাপুজোয় আসা বন্ধ করে দিয়েছেন সেই কোন কালে । তাবলে মা ও অন্য ভাইদের প্রতি কর্তব্য বোধ থেকে এক চুল সরেননি। মোটামুটি এই ছিল তার ইমেজ-ঝলক, আমাদের কাছে। এহেন ডাক্তার দাদুর সঙ্গে আমরা প্রায়ই বিফ-ভক্ষণে বেরুতুম পার্ক স্ট্রীটে, যা খামার বাড়ীতে থাকাকালীন আমাদের ভাইবোনদের কে.জি.বি'র ফাইলের মত বেমালুম হজম করে ঘুরে বেড়াতে হত ।

তো সেই বাড়ীতে একবার হুলুস্থুল। গরমের সকাল। আমরা সব ইশকুলের ছুটিতে। পরীক্ষা শেষ হোল কি না হোল মামাতো, মাসতুতো, খুড়তুতো, পিসতুতো ভাইবোনদের রাতের ঘুম নেই। কতক্ষণে খামার-বাড়ী পৌঁছনো যাবে। তো একবার মিডসামারে, আমরা ভাইবোনরা উঠোনে দাগ কেটে খেলছি, বিডিও সাহেবের বাংলো থেকে লোক এসে খবর দিল, পরের দিন দুই আমেরিকান সাহেব আসবেন আম আর মাছ খেতে, তারা কি জানি কি কাজে রাঢ় বাংলায় ঘুরছেন এক মাস বাবদ। আম আর মাছের কারি খাওয়ার তাদের খুব শখ। এমন আম বাগান আর পুকুর যেহেতু চাটুজ্জে বাড়ীরই সেরা তাই বিডিও সাহেব চান এই গ্রামের হয়ে চাটুজ্জেরা এই অতিথি সৎকারের কাজটি করেন। গ্রামীণ

পরিবেশে অতিথি সৎকার তখনও এমন পরিবার কেন্দ্রিক হয়ে যায়নি। কারুর বাড়ী অতিথি এলে, পাশের বাড়ীর মুলোটা, কলাটা, পুকুরের মাছটা পাঠিয়ে দেওয়াটা ছিল দস্তুর। বটম লাইন হল -- যা কিছু ভাল এ অঞ্চলের তা যেন বহিরাগত অতিথিটির পাতে অবশ্যই পরে। এমনই এক কালেক্টিভ ভাবনা। তো সাহেব আসবেন জেনে তো দুর্গাপুজোর তোড়-জোড় চালু হয়ে গেলো। পাশের বাড়ির খুড়ি, কাকী, জ্যেঠি, রাঙ্গা ঠাম্মারা এসে ঢাউস সব লাউ-কুমড়ো কাটতে বসলেন। কার মাচায় ভাল পুঁই গজিয়েছে, চলে এলো তাও। পুকুরে বড় বড় জাল পড়ছে। মাছ উঠছে। সাইজ পছন্দ না হলে বড়দাদু-ছোড়দাদু আবার পুকুরে জাল ফেলাচ্ছেন।

কাঁসার বাসন তুলে কাঁচের বাসন নামানো হচ্ছে। সাহেব, বলে কথা। বড়দিদা বললেন -- 'মেজ ঠাকুরপো যদি থাকত সাহেবদের সঙ্গে খেতে বসে মানাত। কি রং, ফেটে পড়ছে। সাহেবদেরও হার মানায়। " কাকী, পিসিদের উৎসাহ- সাহেবেদের মেমরা আসবেন কিনা এনিয়ে। ফুলপিসি বলল, মেমরা এলে তাদের খোঁপাটা দেখে একবার ভাল করে

বুঝে নেবে। সোনা-কাকী বলল- 'আর খোঁপা, চুলই আছে কিনা দেখো, আর থাকলেও তো 'কটা' রঙের। কালো চুল ছাড়া খোঁপা মানায় নাকি কখনো ?' 'কটা' কেমন রং আমরা জানতে চাইলে, লেডি ব্রাবরনে পরা ফুল-পিসি তার ক্যাট-আই চশমা নাচিয়ে বলল -- 'ব্লন্ড। আবার লাল চুলকেও বোঝায় । '

তো জোগাড়-যন্তর সারা। এবার সাহেবরা এলেই হয়। দূর থেকে একটা শাদা আম্বাসাডোর গাড়ীকে ধুলো উড়িয়ে আসতে দেখা গেল। পেছনে খালি-গা ছেলেপুলেরা হই হই করে গাড়ির পেছন পেছন ছুটছে। গাড়ি এসে থামল।

বিডিও সাহেব চালক। পেছনের সীটে বসা হাফপ্যান্ট, হ্যাট পরিহিত, জংলা ছাপ জামা গায়ে দুই সাহেব। দাদুদের মুখে ভাবান্তর হোল। কাকী-দিদাদের মুখ এক হাত সমান হাঁ। ভিখুমামার মত পেটানো পেশীর ঘোর কৃষ্ণ-বর্ণ দুই সাহেব। এসি বিহীন গাড়িতে ঘেমে-নেয়ে মুখের ত্বক চকচকে হয়ে উঠেছে। ফুলপিসী সুপার শকড। মেম পর্যন্ত নেই! হইহই, হুরুম-দুড়ুম মুহূর্তে জল । দাদুরা সম্ভাষণ জানিয়ে বৈঠকখানায় নিয়ে গেলেন। নিস্তেজ শরীরে কাকী-দিদারা পথ করে দিলেন। পাথরের টেবিলে বসে খাওয়াদাওয়া হোল মন্থর তালে। পরিবেশনে কোন ত্রুটি থাকল না । সাহেবরা আহা-উহু করতে করতে হাত দিয়ে ভাত মেখে খেলেন । সোনা কাকা, দাদুরা বাতলে দিলেন কি পদ কি কি দিয়ে তৈরি। সাহেবরা

আমের খোসা সুদ্ধু মুখে পুড়ে আমোদে চিবোচ্ছেন, রান্নাঘরে সে খবর যেতেই, ছোড়দিদা কনুই বাঁকিয়ে বললেন -- "জংলী আর কাকে বলে, আমেরিকা না হাতি, বিলিতি সাহেব হোত তো এমন হা-ঘরে পনা করত নাকো। "

রান্নাঘরের মাসী ও অন্য গৃহ-কর্মীরা চুপসে চ।

- তো বউদি, সাহেব কালো হয় ? এ আবার কেমন ধারা ...

সোনাকাকী বললেন -- না জেনে বোলো না তো, ওরা হোল নিগ্রো সাহেব। আমেরিকার সাহেবরা আফ্রিকা থেকে নিগ্রোদের ধরে নিয়ে গিয়ে দাস-দাসী করে রাখত। এখন দাস-দাসী করা উঠে গেছে, তবে ওরা থেকে গেছে।

- অমা, তাই বল। আমরাও তো দাসদাসী , কই অমন ভিখুর মত গা কি আমাদের। ভিখুকে ওর জামা কাপড় পরিয়ে দেখো, একই লাগবে। এই বাউড়িগুলো কি নিগ্রো ছিল নাকি গো ?

সোনাকাকা রান্নাঘরে কি জন্যে যেন এসেছিলেন, এহেন কথা তার কানে গিয়ে থাকবে। তিনি সোনাকাকীকে আড়ালে ডেকে হাত নেড়ে রেগেমেগে কি একটা বললেন। সোনাকাকী এসে আলোচনা থামিয়ে দিলেন।

সাহেবরা আমাদের অনেক চকলেট আর মোটর গাড়ি'র খেলনা-টেলনা উপহার দিয়ে, উপরি উপরি ধন্যবাদ জানিয়ে চলে গেলেন। যাওয়ার সময় আমার দিদা-কাকী দের প্রশংসা করলেন। তারা কি সুন্দর, কি দারুণ কালো চুল, এইসব। ফুলপিসি' র প্রশংসা করতেই দিদারা ফুলপিসিকে পান সাজতে পাঠিয়ে দিলেন। আমাদের ইংরেজি শুনে সাহেবরা বললেন; তারা দারুণ impressed। আমার খুড়তুতো ভাই গেনু, লা- মারটসে পড়ত, সে এলভিসের মত কোমর বাঁকাতে পারত, বনিএমের গান জানত। তাকে তো সাহেবরা বলে দিল--' তোমার সঙ্গে আবার দেখা হচ্ছে। তবে তখন তোমায় আমাদের জ্যাজ গান শোনাব। '

সাহেবরা বিদায় হতেই, সেই রেশ ধরে দিদারা বলল--  'ওরা আবার পিছু না নেয়, ওই জ্যাজ না ল্যাজ, ওই সব একদম শিখবে না । তুমি ভাল ইশকুলে পড়। '

বলতে দেরী করে ফেললুম। সেই কালো সাহেব দর্শনে যদি কেউ সবচে হতাশ হয়ে থাকে, সে হয়েছিল ভিখু মামা। সে সবার বক্তব্য শুনে টুনে অনেকক্ষণ মাথায় হাত দিয়ে বসে শুধু তিনবার বলেছিল -- এত কালো, এত কালো, এত কালো।

তারপর দীর্ঘদিন সে নাকি একথা ভুলতে পারেনি। মাঠেঘাটে বীজ বুনত, গরুদের জাব দিত, মাটি কোপাত আর থেকে থেকে আপন মনে হিজবিজ করে বলে উঠত -- এত কালো !

****

এর অনেক বছর বাদ, আমার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ বেরুবে। জয়দা, জয় গোস্বামীকে একবার প্রুফ দেখিয়ে নিচ্ছি । জয়দা একটি লাইন, দেখিয়ে আমায় জানতে চাইলেন, 'ভারী অদ্ভুত তো, ভাবলে কি করে?' । আমি বললুম- ' ভাবি নিতো। জানি। '

" কথা বলা পাখী তার নিজের জাতকে ঘেন্না করে। "

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন