বুধবার, ৩ জুন, ২০২০

সাদিয়া সুলতানা'র গল্প : গোলাইচাঁদের খাবনামা


১.
শরাফত মন্ডল তার কাঠি কাঠি আঙুল তুলে বসা মসজিদের দিকে ইঙ্গিত করে। শ্রোতা-দর্শকের মনোযোগ একযোগে তার শীর্ণকায় আঙুল ছেড়ে টিনশেড মসজিদের মরচে ধরা চালের দিকে চলে যায়। মসজিদের টিনের চালে সিমগাছের লতানো ডগা সাদা-বেগুনি ফুলে ছেয়ে গেছে। একটা ফুর্তিবাজ শালিক ফুলে ঠোকর দিচ্ছে। মাথার ওপরের নারিকেল গাছের দোদুল্যমান পাতার জালির আড়াল ভেদ করে সবে রোদ উঁকি দিয়েছে। রোদের আলো খেতে লাউ-সিম গাছের ছাইমাখা পাতাগুলো চনমন করে উঠছে। এদিক থেকে চোখ ফিরিয়ে উত্তর-পূর্বাংশে তাকালেই ঝোপড়ানো মাথার টমেটো আর বেগুন গাছের সারি চোখে পড়ে। পয়মন্ত হাত পড়েছে গাছগুলোতে, ঝাঁপিয়ে ফুল এসেছে।


এসব গোলাইচাঁদের কাজ। মসজিদে খাদেমদারি পেয়ে সে আল্লাহর ঘরে একেবারে ঘর-গেরস্তি সাজিয়ে বসেছে। বাড়বাড়ন্ত সবজিবাগান দেখে কমিশনার মেহেদী বিরক্ত বোধ করে। মৃদুমন্দ বাতাসে সিমফুলের গুচ্ছের মতো তিরতিরিয়ে কাঁপতে থাকা শরাফত মন্ডলের আঙুলের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে সে শান্ত গলায় বলে, ‘বসা মসজিদের কাহিনীটা খুলি কন চাচা। এই স্যারেরা নির্বাচনের ডিউটি দিবার আইসছে। ঘুরি ঘুরি হামার গ্রাম দ্যাকোছে, সুন্দর করি কাহিনীটা কন যাতে হামার বলদিবাথানের ইজ্জত বাড়ে।’

শরাফত মন্ডলের নিজের ইজ্জতের খুব বেহাল অবস্থা। মোট এগারো সন্তানের জনক শরাফত সুন্নতি কাজের বাহানায় চারজন বিবি ঘরে তুললেও ছোট বিবি বেগানা পুরুষের হাত ধরে পালিয়েছিল। পরে পঞ্চম বিয়ে করতে গিয়ে বুড়ো বয়সে ছেলেমেয়ের ধাওয়া খাওয়ায় তার আর নওশা সাজা হয়নি। এখন তিনি নিজের ভিটের এককোণে পরিত্যক্ত বাসনের মতো পড়ে থাকেন।

গ্রামের মানসম্মান বাড়াতে সময়ে-অসময়ে কেবল শরাফত মন্ডলকে এই মসজিদের বুৎপত্তির কাহিনী বলতে হয়। বুকে চেপে থাকা ঘুংরিকাশির নিরবচ্ছিন্নতায় শরাফত মন্ডলের মুখ নিঃসৃত বাক্যেরা ছত্রখান হয়ে যায়। অতর্কিতে বুকের গভীর থেকে কাশির শ্লেষ্মা উঠে এসে জিভে জড়িয়ে গেলে বৃদ্ধ মানুষটি বিব্রত হয়ে কী বলতে কী বলে তা কেউ পরিষ্কার শুনতে পায় না। নাকে ফুস ফুস শব্দ করে সর্দির ঝুল বেরিয়ে এসে শরাফত মন্ডলের সফেদ দাড়িতে জড়িয়ে যায়। তাকে থামিয়ে দিয়ে কমিশনার মেহেদী অতিথিদের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘একদিন সকালে বলদিবাথানের সবায় আসি দেখে এটেকোনা অই মসজিদ ঘর। একজন সুফী সিজদা শ্যাষ করি সালাম ফিরাওছে।’

এই মসজিদের কোনো নাম নেই। বলদিবাথান সাকিনের ছেলে-বুড়ো, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই বলে ‘বসা মসজিদ।’ কেউ জানে না, এই মসজিদ কে তৈরি করেছে। এই সাকিনের সবাই ভক্তিভরে বিশ্বাস করে মসজিদটি মাটির নিচ থেকে আপনাআপনি উঠে এসেছে। আগন্তুক কেউ এসব বুজরুকি কাণ্ড বলে উড়িয়ে দিতে চাইলে বলদিবাথানের মানুষ ঘটনার সাক্ষী হিসাবে তার সামনে শরাফত মন্ডলকে দাঁড় করিয়ে দেয়। শরাফত মন্ডলকে বলদিবাথানের সবাই সবচেয়ে প্রাচীন মানুষ বলে ধরে নেয়। তাই ‘বসা মসজিদের’ বুৎপত্তির ঘটনাটি কেউ হেসে উড়িয়ে দেওয়ার আগেই তারা অবিশ্বাসীর সামনে তার মতো নিরপেক্ষ সাক্ষীসাবুদ উপস্থাপন করে। সেই সঙ্গে ঘটনার পুনঃপুন বিবরণ শুনে তারাও তাদের বিশ্বাসের ভিত আরো মজবুত করে তোলে।

শরাফত মন্ডলের বয়স কত কেউ জানে না। সে নিজেও জানে না। কেউ কেউ বলে তার বয়স ছয় কুড়ির কম না। কেউ বলে পাঁচ কুড়িই ঢের। তার হাত পা কড়ই গাছের শেকড়ের মতো। গায়ের চামড়ার পরত এই শীতে একবার খসেছে। গত শীতে হাঁপানির টান উঠে শরাফত মন্ডল মরতে মরতে বেঁচে ফিরেছে। শরীরের শক্তি নিঃশেষ করে শরাফত মন্ডল এবার অপেক্ষাকৃত স্পষ্ট করে বলে, ‘কায়ো এই মসজিদের ইট গাইথবার দেখে নাই, কায়ো না। মাটির তলা থাকি উঠি আইসছে এই মসজিদ।’

শরাফতের কথা পরিষ্কার শুনতে না পেলে কী হবে যতটুকু গল্প শোনা যায় ততটুকু অতিথিদের মনে কৌতূহলের আগুন উসকে দেয়। কাশিজনিত বিড়ম্বনায় শরাফত মন্ডলকে কোনো প্রশ্ন না করে অতিথিবৃন্দ কমিশনার মেহেদীর কাছ থেকে গল্পের অবশিষ্টাংশ শোনায় মন দেয়। গায়েবি শক্তির অসীমতার আভাস পেয়ে মানুষের মুখে মুহুর্মুহু ‘সুবহানাল্লাহ’ শব্দটি ধ্বনিত হতে থাকে। অদূরে দাঁড়ানো গোলাইচাঁদের দৃষ্টি তখন মসজিদের টিনের চালে লতানো সিমগাছের সাদা-বেগুনি ফুলের দিকে। প্রসন্ন দৃষ্টিতে মহান সৃষ্টিকর্তার অপরূপ সৃষ্টি দেখতে দেখতে সেও গুনগুন করে, ‘সুবহানাল্লাহ।’



২.

এশার নামাজ শেষে মসজিদের বারান্দায় ঘাপটি মেরে বসে আছে গোলাইচাঁদ। দূর থেকে ওকে দেখলে মনে হবে একটা ভরা বস্তা কেউ দেয়ালের গায়ে ঠেস দিয়ে রেখেছে। শীতের কারণে গোলাইচাঁদের শরীরে এক গাদি কাপড়। চোখ দুটো বের করে ও নিজেকে আপাদমস্তক কম্বলে মুড়িয়ে রেখেছে। লুঙ্গির নিচে একটা পায়জামাও পরেছে। কম্বলের নিচে থাকা পরনের দুই দুটি সোয়েটার, মাফলারেও শরীরে ওম হচ্ছে না। ঠান্ডায় গোলাইচাঁদের শরীর কাঁপছে। মনে হচ্ছে কেউ ওর জামাকাপড়ে এক মগ পানি ঢেলে দিয়ে গেছে।

এইবছর জাড়ে জাড়ে প্রাণিকূল একেবারে জর্জরিত হয়ে আছে। অবশ্য প্রতি বছর এই গ্রামে শীত আসে তাড়াতাড়ি, যায়ও দেরিতে। চার-পাঁচ জন মুরুব্বি বা কোলের শিশুর প্রাণও নিয়ে যায় সঙ্গে করে। এ বছর এখনো কারো মৃত্যুর খবর আসেনি। শীতের ভাব বলছে অচিরেই সকলকে কারো জানাজার নামাজ পড়তে দৌড়াতে হবে।

আজ কুয়াশা দেখে মনে হচ্ছে চারপাশে ধূলিঝড় হচ্ছে। মাঝে মাঝে উত্তুরে বাতাস কুয়াশাকে ছিঁড়েখুঁড়ে ফেলছে। নাক-মুখ বেয়ে শীতল হাওয়া গড়িয়ে পড়ছে বরফচূর্ণের মতো। মুসল্লিরা নামাজ সেরে চলে গেছে। এই তীব্র শীতের রাতে মসজিদে মুসল্লিদের আনাগোনা কম। ফজর আর এশার ওয়াক্তে হাতেগোনা আট-দশ জন ধর্মপ্রাণ মানুষকে কেবল এই মসজিদে আসতে দেখা যায়। আজ শীতের বাড়াবাড়ির কারণে এই সংখ্যা একেবারে নগণ্যতে নেমেছে। মসজিদের ভেতরে বসলে শীত একটু কম লাগার কথা। কিন্তু গোলাইচাঁদের ভেতরে ঢুকতে ইচ্ছা করছে না। সেই কখন থেকে কিছু একটা ঘটবার অপেক্ষায় বসে আছে গোলাইচাঁদ। অলৌকিক কিছু।

এই মসজিদে খাদেমদারি শুরু করার পর থেকে প্রতি রাতে ওর মন বলেছে, আজই সেই রাত। আশায় আশায় থেকে ব্যর্থ গোলাইচাঁদ সুরা জিন মুখস্ত করার চেষ্টাও করেছে। পারেনি। ওর মগজের ওজন কম, সেটা ও ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছে। যদিও গোলাইচাঁদের পূর্ব ইতিহাস বলদিবাথানের মানুষের অজানা। সে নিজেও বা এর কতটুকু জানে।

গোলাইচাঁদকে এই গ্রামে নিয়ে এসেছিল বড় মসজিদের ইমাম সাহেব। বছর পাঁচ হয়ে এলো। ইমাম সাহেবকে বলদিবাথানের সকলে সমীহ করে। তাই গ্রামের গণ্যমান্য লোকের কাছে তার দেওয়া প্রস্তাব সবাই জোর আপত্তি ছাড়া মেনে নিয়েছে।

যেদিন এই গ্রামে আসে গোলাইচাঁদ সেদিন ওর মাথায় ছিল বাবরি চুল। দেখে মনে সন্দেহ জেগেছে এই লোক যাত্রা-পালা করে বেড়ানো লোক। গোলাইচাঁদকে দেখে মুখ টিপে হাসতে থাকা মানুষগুলো তাই ইমাম সাহেবের প্রস্তাব শুনে প্রথমে হতবাক হয়ে গিয়েছিল। ঐ সময়ে কালবৈশাখী ঝড়ে বসা মসজিদের বেহাল অবস্থা হয়ে গিয়েছিল। একা মুয়াজ্জিন ইয়াছিন মসজিদের দেখাশুনা করতে পারছিল না। তাই ঢাকায় আলেমদের সম্মেলনে অংশগ্রহণ শেষে গ্রামে পা দিয়ে বড় মসজিদের ইমাম সাহেব সকলের সামনে প্রস্তাবটি রাখেন।

কে কে যেন কানাঘুষা করেছিল, গোলাইচাঁদকে রাস্তা থেকে তুলে এনেছে। বাপ-মায়ের ঠিক নাই। এমন আগন্তুককে মসজিদ পরিচ্ছন্ন রাখার দায়িত্ব দেয়াতে প্রথম প্রথম তাই সবারই আপত্তি ছিল। উত্তরপাড়ার ধলু খবর দিয়েছিল, গোলাইচাঁদ ডাকাতদলে ছিল। জামিন নিয়ে ফেরার হয়েছে। এই সংবাদ চাউর হবার পর গোলাইচাঁদের আমলনামা খতিয়ে দেখার জোর দাবী উঠলেও বড় মসজিদের ইমাম সাহেবের এক কথায় তা স্তিমিত হয়ে গেছে। রাশভারী ইমাম সাহেব নূরমাখা হাসি দিয়ে বলেছিলেন, ‘খোদার ঘরোত কী আছে চুরি কইরবার?’

বড় মসজিদের ইমাম সাহেব মস্ত আলেম। অন্ধকারে তার মুখে দিব্যচ্ছটা দেখতে পাওয়া যায়। তাকে কেউ ঘাটায় না। তিনি অলৌকিক ক্ষমতাধর বলে লোকজন বিশ্বাস করে। তিনি জিনে ধরা রোগীর শেফাও জানেন। গোলাইচাঁদ নিজের চোখে তার কেরামতি দেখেছে। ইমাম সাহেব রোগীর সামনে দাঁড়িয়ে পবিত্র কুরআনের তেত্রিশটি আয়াত পাঠ করেন আর বদ জিন রোগীকে ছেড়ে চলে যায়। তবে তিনি কোনো তাবিজ-কবজ, পানি, লোহা, তেল পড়া দেন না। শেফার বিনিময়ে তিনি রোগীর অভিভাবকের কাছ থেকে ঘি, ছানা, খেজুর ইত্যাদি নেন। বলেন, ‘খুশি মনে কায়ো হাদিয়া দিলে সেইটা নেওয়া সুন্নত।’

গোলাইচাঁদ রোজ আছর ওয়াক্তের পর বড় মসজিদে গিয়ে ইমাম সাহেবের সঙ্গে দেখা করে আসে। তার কাছে কাছে বসে উসখুস করে। নিজের স্বপ্নের কথা ভেঙে বলতে গিয়েও গোলাইচাঁদের জিভ আটকে আসে; বলতে পারে না, রোজ রাতে পরীকে নিয়ে স্বপ্ন দেখে সে। স্বপ্ন দর্শনের পর মাঝরাত থেকে ঘুমভাঙা গোলাইচাঁদ পরী দেখার আকাশ-কুসুম কল্পনায় বিভোর হয়ে বসা মসজিদের বারান্দায় ঘাপটি মেরে বসে থাকে।

মন খুলে কথা বলতে না পেরে গোলাইচাঁদ বড় মসজিদের বইয়ের আলমারির নিচের তাকে রাখা ছোট-বড় বোতলগুলোর দিকে তৃষ্ণার্তের মতো তাকায়। সে জানে এই বোতলগুলোতে জিন ধরা আছে। নানান খাসলতের নানান বয়সী জিন। জিনের মধ্যে ভাল জিন আছে, মন্দ জিনও আছে। কিন্তু নারী জিন আছে কিনা ওর জানা নেই। গোলাইচাঁদের পাতানো মা বলেছে, আরব সাগরের যে স্থানে তিন সাগর এসে মিলেছে সেখান থেকে অনেক পথ পাড়ি দিয়ে জিনের দেশ কোহেকাফে যাওয়া যায়। সেই দূর দেশ থেকে বাতাসে ভেসে ভেসে জিন-পরী এদেশে আসে। জিনের মধ্যে মানুষের মতো নারী-পুরুষও আছে। নারী জিনই পরী।

ইমাম সাহেব জিন নামাতে পারেন। জিনের বাদশা নাকি তার গোলাম। গোলাইচাঁদ জানে জিন নামানোর প্রথম শর্ত হলো সুরা জিন আত্মস্থ করা। গভীর রাতে সাতবার সুরা জিন পাঠ করে ঘুমালে পরের দিন জিন দেখা যায়। এভাবে পড়েও যখন জিন-পরীর দেখা মেলেনি তখন গোলাইচাঁদ নিশ্চিত হয়েছে সুরা জিন মুখস্থ করা ছাড়া ওর মনোবাসনা পূরণ হবে না। কিন্তু শত সহস্রবার চেষ্টা করেও গোলাইচাঁদ জিন সুরা মুখস্থ করতে পারেনি। মাঝেমাঝে তাই ওর মনে একটা গোপন বাসনা উঁকি দেয়। আলমারির চাবি কোথায় সেই ভাবনাতে ও ইমাম সাহেবের অগোচরে ওর ভারি মাথা তুলে এদিক-সেদিক তাকায়। এতদিন হয়ে গেল এখনও ও কোনো কায়দা করতে পারেনি। যদিও গোলাইচাঁদ বিশ্বাস করে একদিন ঠিকই ওর স্বপ্নপূরণ হবে।

একটা অদ্ভুত ইশারায় আজও গোলাইচাঁদ এশার নামাজ শেষে ঘরে না গিয়ে মসজিদের বারান্দায় এসে বসেছে। মসজিদের পেছনের দিকে ছোট একটা ঘর আছে। এখানে একটা চৌকি পেতে গোলাইচাঁদের ঘুমানোর ব্যবস্থা করা আছে। গোলাইচাঁদের চোখে ঘুম নেই। চারদিক মাঝরাত্রির মতো থমথম করছে। মুয়াজ্জিন ইয়াছিন বাড়ি চলে গেছে। ইয়াছিনের শরীর কুয়াশার ঘনত্বে মিলাতে না মিলাতেই কান্নার শব্দটা শুনতে পায় গোলাইচাঁদ।

কে যেন কেঁদে চলছে, গুনগুন শব্দে। গান বলে ভ্রম হয়। গোলাইচাঁদ ছটফট করে। আজ কি সেই ক্ষণ এলো! গোলাইচাঁদের শুষ্ক চোখমুখ অভাবিত আর্দ্রতায় প্লাবিত হয়। কান্নার শব্দ তীক্ষ্ম থেকে তীক্ষ্মতর হয়। কার বুকে যেন এক কারবালা দুঃখ। গোলাইচাঁদ গলায় দরদ মেখে ডাক দেয়, ‘কায় কান্দে, কায় কায়?’

পরী নামছে মাটিতে! আনন্দে গোলাইচাঁদের মিশমিশে কালো মুখ চাঁদের মতো ঝলমল করে। কিন্তু এ কী! আকাশ উথলে আনন্দসুখ নামার বদলে কুলকুল কুলকুল শব্দস্রোতে ও কী নামছে? দুঃখ কি? মনমরা একটা সুর বইছে চারদিকে। বাতাস স্থবির হয়ে গেছে। গোলাইচাঁদের কান্না পায়। শিশুকালের সেই পরীর স্পর্শ মনে পড়ে শরীরজুড়ে দুঃখের মাতম লাগে। ওর মা পরীর মতো সুন্দরী ছিল। শিশু গোলাইচাঁদকে জঙ্গলে ছুঁড়ে ফেলে সেই পরী মাকে ডাকাতেরা ধরে নিয়ে গেছে। এরপর মাকে আর কোনোদিন দেখেনি গোলাইচাঁদ।

গোলাইচাঁদ কাঁদে, কাঁদতে কাঁদতে ভেঙে পড়ে মাটিতে। মায়ের দুঃখ, পরীর দুঃখ নাকি আশৈশব বনে-বাদাড়ে ঘোরার দুঃখে কাঁদে-অমীমাংসিত সেই রহস্য রাতের আঁধারে লীন হয়ে যায়।

আজ রাতের আঁধার বড় রহস্যময়। রহস্য ভেদ করার বাসনায় গোলাইচাঁদ দুহাতে চোখ মোছে। কিছু একটা হচ্ছে সামনে। গোলাইচাঁদ বিস্ফোরিত চোখে দেখে মসজিদের সামনের ফাঁকা অংশে একটা প্রশস্ত সুড়ঙ্গমুখ তৈরি হচ্ছে। গোলাইচাঁদ চমকে উঠে আলোর সুড়ঙ্গের দিকে দৌড়ে যায়। জিনে ধরা মানুষের মতো এলোমেলো পায়ে সুড়ঙ্গ পথে হেঁটে চলে। পথের শেষে সরু নদীর মতো বড় সড়ক দেখা যায়। সড়কের সম্মুখভাগে একটা দৈত্যাকৃতির আমগাছ। আশ্বিনী আমগাছের ঘন কালো পাতায় পাতায় ঘষা লাগে। বছর খানেক আগে দিনমজুর জিয়ারুল দেশান্তরী হবার পর তার স্ত্রী কইতরী পেটচাঁছা সন্তানকে পেটের দায়ে বিক্রি করে এই গাছে ঝুলে পড়েছিল। পরীর মতোন সুন্দরী সেই কইতরীই কি পরী হয়ে ফিরে এসেছে?

এমনই শীতের রাত ছিল সেদিন। গোলাইচাঁদ কইতরীর ঝুলন্ত লাশ নিজের হাতে দড়ি কেটে নামিয়েছিল। কইতরীর দুই বাহুতে লাল রঙের গভীর দাগ ছিল, যেন ওর দুই ডানা কেটে নিয়েছে কেউ। এই লাশ নিয়ে পরের দিন সকালে থানায় গোলাইচাঁদ পুলিশের কাছে বেদম জেরার সম্মুখীন হয়েছিল। থানা থেকে ছাড়া পাবার পর রাতে ভীষণ জ্বর এসেছিল ওর, কিন্তু একটুও কষ্ট হয়নি তাতে। জ্বরের ঘোরে সারারাত পরীর সঙ্গে কথা হয়েছে।

অন্ধকার বাতাসে অলৌকিক এক তরঙ্গ খেলে যায়। তারপর যা দেখে গোলাইচাঁদ, তা ওর স্বপ্নেরও অতীত। উত্তেজনায় ওর নাকের ডগায় ঘাম জমে, শরীর উষ্ণ হয়, নিশ্বাসে ফড়ফড় আওয়াজ ওঠে। পরী আসছে!

গোলাইচাঁদের খোয়াব মিথ্যা করে পরীর বদলে ভোর আসে। ভোরের আধফোটা আলোয় ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’ বলতে বলতে মসজিদে খাটিয়া নিতে আসে একদল গ্রামবাসী। এবারের শীতে শরাফত মন্ডলের প্রাণটা আর টিকতে পারেনি।



৩.

গোলাইচাঁদ ওর রোজকার স্বপ্ন কিংবা স্বপ্নের মতো সত্যি কিছু ঘটে যাওয়ার বিষয়টা সবার কাছে গোপন রাখে। এমনিতে তার নিজের কথা শোনানোর মানুষের বড় আকাল। আর কেউ মতিচ্ছন্ন না হলে কি আর ঘনঘন পরী বিষয়ক স্বপ্ন দেখার কথা কারো সঙ্গে ভাগাভাগি করে? যদিও গতকাল বাদ আছর বড় মসজিদের ইমাম সাহেবের কাছে মুখ ফসকে একবার নিজের কৌতূহলের কথা বলে ফেলেছিল। জিন আর পরী নামানোর কায়দা এক কিনা তা জিজ্ঞাসা করে ঘাড় মাটিতে ঝুঁকে গোলাইচাঁদ বসেছিল। ইমাম সাহেব সজ্জন। প্রশ্নকর্তার পরী বিষয়ক কৌতূহলে দরাজ একটা হাসি দিয়ে বলেছিলেন, ‘এই বছরোতে তোর ফরজ কামখান সারি ফ্যালের নাইগবে গোলাইচাঁদ।’

ফরজ কামের কথা শুনে গোলাইয়ের পরীর কথা মনে পড়েছিল। নির্লজ্জের মতো বলতে মন চেয়েছে, ‘তোমরায় মোর সউক। মোর জইন্যে একটা পরীর মতোন বউ দেখেন।’

পাতানো মায়ের কাছে শুনেছিল গোলাইচাঁদ, নাবালক বয়সে একবার ওকে পরী ধরে নিয়ে গিয়েছিল। বস্তির পেছনের জংলার ধারের কদম গাছের সমান্তরালে শূন্যে ভেসেছিল গোলাইচাঁদ। ছেলেকে লেজঝোলা পাখির মতো ঝুলতে দেখে ওর পাতানো মা অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল। সেই শৈশবস্মৃতি কি আজও পাখি হয়ে বালেগ গোলাইচাঁদের স্বপ্নে হানা দেয়! একা একা বসে গোলাইচাঁদ একা একা হাসে। গোলাইচাঁদের মুখে প্রশান্তির হাসির রেখা দেখে মুয়াজ্জিন ইয়াছিন তাকে ভর্ৎসনা করে, জোহরের ওয়াক্ত যায়।

গোলাইচাঁদ শক্ত হাতে মাথার টুপি আঁকড়ে ধরে। ওর ঢ্যাঙা শরীরের উর্ধাংশে বেঢপ একটা মাথা। যেন আলগা করে বসানো। বাতাস পেলেই মাথার টুপি নড়বড় নড়বড় করে। মিনিট পাঁচেক পরপর গোলাইচাঁদ টুপি চেপে ধরে মাথার আব্রু রক্ষা করে। ওর চাকরি হবার প্রথম শর্ত ছিল এটাই। মসজিদ কমিটির সভাপতির জুড়ে দেওয়া শর্ত ছিল, লেবাসে ও মনে সত্যিকারের মুসলমান হওয়া চাই। গোলাইচাঁদ তাই হয়েছে, বাবরি চুল কেটেছে, জোব্বা-টুপি ধরেছে, নামাজ-কালাম পড়ায় মন দিয়েছে।

মৃদুভাষী, অনুগত গোলাইচাঁদ সবাইকে মান্য করে। পাঁচ-দশ বাড়ি থেকে তোলা তুলে ওর আর মুয়াজ্জিন ইয়াছিনের বেতন হয়। তিন সন্তানের জনক ইয়াছিনের বাড়ি মসজিদ থেকে সাত-আট বাড়ি পরে। ইয়াছিনের নিজের খাওয়ার চিন্তা নেই। গোলাইচাঁদের তিনবেলার খাবার আসে এবাড়ি-ওবাড়ি থেকে। এছাড়া আল্লাহর ঘরে প্রায় বিনা ওজরেই ওর থাকার জায়গা হয়ে গেছে।আজ শুক্রবার। বসা মসজিদ ওয়াক্তিয়া মসজিদ, এখানে জুম্মার নামাজ হয় না। আজ এই মসজিদে ভিড় নেই। পথচারী চার-পাঁচজন নামাজে এসেছে। নামাজ শেষে সারা বিশ্বের মুসলিম উম্মাহর কল্যাণ কামনায় ইমাম সাহেব আজ দীর্ঘ মোনাজাত ধরেছেন। এই মসজিদের ইমামের কান্নাপ্রবণ মন। আল্লাহর দরবারে হাত তুলেই তিনি কাঁদতে শুরু করেন। আজও তিনি ডুকরে ডুকরে কাঁদছেন। কান্নার চিকনরেখা তার সাদা জোব্বায় ছড়িয়ে পড়ছে।

গোলাইচাঁদ কান পাতে। মুসলমানদের হত্যার উদ্দেশ্যে পারস্য উপসাগরে যুদ্ধজাহাজ নেমেছে। ইহুদি-নাসারাদের ষড়যন্ত্রে মুসলমানদের মৃত্যুর সংবাদ শুনে গোলাইচাঁদেরও চোখ ভিজে আসে। ভেজা চোখের সামনে হঠাৎ পরী সদৃশ কোনো নারীর আঁচল উড়ে এসে সযতনে ওর মুখ মুছিয়ে দেয়। গোলাইচাঁদ প্রাণান্ত চেষ্টা করে নিজেকে সামলায়, নিজেকে শাসন করে মোনাজাতের হাত দিয়ে মুখমন্ডল মুছতে মুছতে বলে, ‘আসতাগফিরুল্লাহ।’

সেই রাতেও গোলাইচাঁদ মসজিদের বারান্দায় ঘাপটি মেরে বসে থাকে।



৪.

ফাল্গুনের এক কাঁচস্বচ্ছ ভোরে দিনমজুর জিয়ারুল গ্রামে ফিরে আসে। জিয়ারুলের চকচকে জামা, পেটের ওপরে জমা মেদ আর নেকাবে ঢাকা নতুন বিবি দেখে বলদিবাথানের মানুষেরা বুঝে যায়, শহর ফেরত জিয়ারুল আর দিনমজুর নেই।

মেসওয়াক দিয়ে দাঁত মাজতে মাজতে মসজিদের সামনে নির্মিতব্য গেটের সামনের বালুর ঢিবির ওপর দাঁড়িয়ে গোলাইচাঁদ জিয়ারুলের আগমনের দৃশ্যটি দেখতে পায়। জিয়ারুলের পেছনে পেছনে দৌড়ের গতিতে হাঁটতে থাকা কালো বোরকায় আবৃত নারী শরীরটি যে তার দ্বিতীয় স্ত্রী তা তখনও বুঝতে পারেনি গোলাইচাঁদ। আশ্বিনী আমগাছের নিচে বিবিকে দাঁড় করিয়ে জিয়ারুল ফজরের নামাজ পড়তে এলে বিষয়টা মুয়াজ্জিন ইয়াছিনের কাছে পরিষ্কার হয়। সেই সুবাদে গোলাইচাঁদও কইতরীর স্বামীকে চিনে নেয়।

দিন তিনেক পরে জিয়ারুল এসে মুয়াজ্জিন আর গোলাইচাঁদকে রাতের খাবারের দাওয়াত দিয়ে যায়। অনেকদিন পর ভালোমন্দ খাবে ভেবে গোলাইচাঁদের মন আর্দ্র হয়। ‘ছেড়ে দে নৌকা আমি যাবো মদিনায়’-গুনগুন করতে করতে সে নিজের হাতে লাগানো গাছ থেকে কচি কচি ঢেঁড়স, মাচা থেকে হৃষ্টপুষ্ট ধুন্দল তোলে। এশার আজান দিতে মুয়াজ্জিন ইয়াছিনও তাড়াতাড়ি ওজু করে প্রস্তুতি নেয়। গোলাইচাঁদ ইয়াছিন আর তার মেসওয়াকের জন্য নিমের ডাল নিখুঁত করে কাটে।

এশার ওয়াক্তে চোঙ্গা মাইকের ছিদ্রপথ দিয়ে আজানের ধ্বনি অনুরণিত হতে থাকে। গোলাইচাঁদ মাথার টুপিটা চেপে ধরে আশ্বিনী আমগাছের ভৌতিক অবয়বের দিকে তাকায়। সেখানে আজ পরীর নিশানা নেই। অনেক চেষ্টার পর গোলাইচাঁদ সুরা জিনের দশ আয়াত মুখস্থ করেছে। ইমাম সাহেবের কথামতো প্রতিদিন স্মৃতিশক্তি বাড়ানোর দুআ পড়ার পরও কোনো কাজ হচ্ছিল না, হঠাৎ করে সেদিনের পরীর নেমে আসার পূর্বাভাসের পর থেকে গোলাইচাঁদ নিজের মধ্যে কিছু একটা পরিবর্তনের আভাস পাচ্ছে।

নামাজ শেষে সবজির থলে হাতে গোলাইচাঁদ ইয়াছিনের পিছু পিছু জিয়ারুলের বাড়ি যায়। খেতে বসে গোলাইচাঁদ বারবার বিষম খায়। ব্রয়লার মুরগির কষা মাংসের ঝাঁঝ বারবার ওর তালুতে ওঠে। প্রতিবারই একটা গমরঙা হাত একটা কাঁচের গ্লাস বাড়িয়ে ধরে দরজার আড়াল থেকে। দস্তরখানে বসা গোলাইচাঁদ হাত বাড়িয়ে অমৃত নেয় আর বিষম খায়। জিয়ারুল হঠাৎ বিরক্ত হয়ে বিবিকে বলে, ‘পায়রাবিবি, তরকারিত মেলা ঝাল দিছেন। মেহমানের কষ্ট হওছে।’ গোলাইচাঁদ জিভে কামড় দিয়ে বলে, ‘না না। এত স্বাদের তরকারি কতদিন খাও না। মার কথা মনে পড়োছে। সেই জইন্যে খাবার গলাত নাগে।’

ধোঁয়াওঠা ফুলকো ফুলকো ভাতে আঙুল গুঁজতে গুঁজতে গোলাইচাঁদের মায়ের কথা মনে পড়ে। আদৌ ওর কোনো মা ছিল কিনা তা সে জানে না। পিত্তিপড়া পেটে সেই শৈশবে যখন সে পথের ধারে শুয়ে থাকতো তখন মায়ের বদলে পরী আসতো। পরী নরম নরম হাতে ওর চামড়া লেপটানো পেটে হাত বুলাতো আর গোলাইচাঁদের পেট ভরপুর হয়ে উঠতো সাদা সাদা চাঁদের কণায়। ক্ষুধা-তৃষ্ণা সব একেবারে গায়েব হয়ে যেত তখন। স্বপ্নদেখার দোষ লাগতেই ক্ষুধার মতো পরীও গায়েব হয়ে গিয়েছিল ওর জীবন থেকে। এত বছর বাদে আবার পরীর খোঁজ পাওয়ার সম্ভাবনা দেখা গেছে।

গোলাইচাঁদের বুকে পায়রা ওড়ে। গা ফুলায়, বাকবাকুম করে। যতো ধীরেসুস্থে ভাত মাখায় আর খায়, সময় ততো দ্রুত ফুরিয়ে আসে। শেষ পাতে পানি ঢেলে চুমুক দিতে দিতে তৃপ্তির হাসি হাসে। দরজা এখন বন্ধ। দরজার ওপারে কারো নিশ্বাসের গভীরতা টের পাওয়া যায়।

এরপরের তিনদিন বড় মসজিদের বইয়ের আলমারির সামনে গোলাইচাঁদকে ঘুরঘুর করতে দেখা যায়। ইমাম সাহেব সুরমা টানা চোখে গোলাইচাঁদকে দেখেন আর হাসেন।



৫.

বলদিবাথানে আবার এক আজগুবি ঘটনা ঘটেছে।

প্রতিদিন ফজরের আজান দিতে সুবহে সাদেকের আগেই ইয়াছিন বাড়ি থেকে মসজিদে চলে আসে। এক হাতে কল চাপতে চাপতে ইয়াছিন নিমের ডাল দিয়ে দাঁত মেসওয়াক করে। আজো এর ব্যতিক্রম হয়নি। অজু করে মাথা ঘুরাতেই সে দেখে বাকহীন গোলাইচাঁদ হাঁ করে সামনের দিকে তাকিয়ে আছে। ভ্রুকুঞ্চিত চোখে-মুখে গোলাইচাঁদকে দেখতে দেখতে ইয়াছিন সামনের দিকে তাকায়। সে নিজেও এবার জিনে ধরা গোলাইচাঁদের মতো নির্বাক হয়ে যায়। এ কী কাণ্ড!

সকাল হলে সেই কাণ্ড দেখে বলদিবাথানের সব মানুষ ভড়কে যায়। সত্যিই তো, এ কী কাণ্ড! বসা মসজিদ মাটিতে বসে গেছে। কেউ তার নিশানা খুঁজে পাচ্ছে না। সমতল নিষ্প্রাণ মাটি দেখে বোঝার উপায় নেই এখানে গতকাল রাতেও মুসল্লিরা এশার নামাজ পড়ে গেছে। টিনশেড মসজিদকে ভেঙে মিনারসহ পাকা দালান করার উদ্দেশ্যে বসানো পিতলের দান-বাকসোটি পর্যন্ত গায়েব!

ঘটনাস্থলে বলদিবাথানের মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়ে। যে বউ-ঝিদের মসজিদে প্রবেশের সুযোগ ছিল না, গুটিগুটি পায়ে মসজিদ সীমানার নারিকেল, খোকসা ডুমুর, জামরুল গাছের কাণ্ডের আড়ালে দাঁড়ায়। সূর্য মাথার ওপর চড়তে শুরু করতে করতে উৎসুক নারী-পুরুষের স্রোতে বাড়ে। মসজিদ কমিটির সভাপতি ‘ইন্নালিলাহ’ বলতে বলতে জরুরি মিটিং তলব করেন। ভূমিকম্প না ভূমিধসে এত বছরের ঐতিহ্য লীন হয়ে গেল তার সুরাহা হওয়ার আগেই কমিটির সাধারণ সম্পাদক আড়তদার নাছের সমস্যার সমাধান করে ফেলে। তার মনে অনেকদিনের আশংকা ছিল, যে খাদেমের আমলনামা রহস্যময় তার হাতে মসজিদ নিরাপদ নয়। গোলাইচাঁদের বদখত আমলনামাই মসজিদকে ডুবিয়েছে।

এতক্ষণে গোলাইচাঁদের আমলনামা হাতড়ে দেখার ফুরসৎ মেলে সবার। একবাক্যে জিয়ারুলও সাক্ষ্য দেয়, গোলাইচাঁদ বড় নারীসঙ্গ কাতর। তার পর্দানশীন বিবির দিকে আড়েআড়ে ঠারেঠারে তাকায় সে, বাড়ির আশেপাশে ঘুরঘুর করে। দেখা হলেই বলে, গাছপালা আর গোবর সারের খোঁজে এসেছে। আগে সে বিষয়টাতে মনোযোগ দেয়নি। আজ তার কাছে সবকিছু স্রোতস্বিনী তিস্তার পানির মতোই পরিষ্কার।

ইয়াছিন প্রথমে ঘাবড়ে গেলেও এবার মুখ খোলে। এতদিন ধরে গোপনে গোপনে জিন নামানোর নামে পরী ধরার কারবার করতো গোলাইচাঁদ। পরী ধরার ফাঁদ পাততো। দুএকটা পরীও আটকেছে সেই ফাঁদে। সে ভোরবেলা মসজিদের মেঝেতে ঝরা পালক পেয়েছে। অচেনা সেই পালকের রং দুধসাদা।

ইয়াছিনের কথা শুনে কেউ কেউ এবার নির্ভয়ে স্বীকার করে মাঝরাতে সড়ক পাড় হবার সময় পরীর হাসি-কান্নার শব্দ শুনেছে তারা। একজন বলে, এই হাটবার রাত করে ফেরার সময় মসজিদের চোঙ্গা মাইকের মুখে আগুনলাল আলো দেখেছে। দেখে সে ফিট খেয়েছে। শুনে জিয়ারুল খিকখিকিয়ে হাসে, ‘আবু বকর ভাই, ছোটবেলা থাকি তোমার মিরগি রোগ নোয়ায়? কয়দিন পরপরই ফিট খান, স্যান্ডেল শোংগাইলে জ্ঞান ফিরি আইসে তোমার।’ জিয়ারুলের কণ্ঠের ব্যঙ্গ টের পেয়ে আবু বক্কর সরে দাঁড়ায়।

ভিড় করে দাঁড়ানো মানুষের উল্লেখযোগ্য একটা অংশ চাপা ক্ষোভে ফোঁসফোঁস করে। খুনে চোখে হিন্দু অধ্যুষিত রামপাড়ার দিকে তাকায়। এদেরই একজন আগুন উত্তাপে গর্জে ওঠে, ‘বিধর্মীরা ষড়যন্ত্র করি মসজিদ উড়ি দিছে। আইজ থাকি জিহাদ শুরু। দেখি ক্যামোন করি ওমরা রেহাই পায়। আল্লাহু আকবার...।’

কমিশনার মেহেদী ঠাটা পড়া মানুষের মতো নির্বাক। বোমা মারার চিহ্ন খুঁজতে খুঁজতে জিয়ারুল মেহেদীর দিকে এগিয়ে আসে, ‘কোনো বোম মারামারির ঘটনাও ঘটে নাই কমিশনার সাব।’

জোহরের ওয়াক্ত হয়ে এসেছে। বড় মসজিদের ইমাম সাহেব এবার ভিড় ভেঙে দেন, ‘সউগ আল্লাহপাকের ইচ্ছা, তার জিনিস তায় উঠি নিয়া গেইছে।’ সকলকে বড় মসজিদে নামাজ পড়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি শ্লথ পায়ে স্থান ত্যাগ করেন। কমিশনার মেহেদী এত সহজে ছেড়ে দেবার মানুষ না, তাছাড়া এই এলাকা দেখভালের ঘোষিত-অঘোষিত দায়িত্ব তার ওপরেই বর্তায়। বিমূঢ়তা ঝেড়ে কমিশনার মেহেদী ঘোষণা দেয়, ‘চেয়ারম্যান সাবের সাথে কথা হইছে, কাল বাদ জুম্মা গোলাইচাঁদের বিচার হইবে।’ সমস্বরে অনুগতরা চেঁচিয়ে ওঠে, ‘সেইটাই হউক।’

গোলাইচাঁদ মাথা নত করে দাঁড়িয়ে তাকে। এমনিতেই আকার আকৃতির ভারে ওর মাথাটা সামনের দিকে ঝুঁকে থাকে। আজ ওকে কুঁজো মানুষের মতো দেখায়। ওর মুখ-চোখের প্রাণের নির্যাস কেউ যেন শুষে নিয়েছে। ভিড় পাতলা হলে গোলাইচাঁদ মাথা তোলে। ওর অক্ষিকোটর থেকে চোখের মণি বেরিয়ে আসে। সামনে ধু ধু প্রান্তর, যেন তিস্তার চর।রাতে আশ্বিনী আমগাছের নিচে বসে গোলাইচাঁদ পুনরায় সেই অবধারিত স্বপ্নের সামনে দাঁড়ায়।

কোথা থেকে হাসনাহেনার গন্ধ ভেসে আসে। কাছেপিঠে কোনো ফুলের গাছ নেই। হয়তো আমের মুকুলের ঘ্রাণে ম ম করে চারপাশ। ঘ্রাণে ডুবতে ডুবতে গোলাইচাঁদের শরীর শিরশির করে। পরী আসবে! রাজহাঁসের মতো সাদা ডানায় চেপে। ডানা ঝাপটানির শব্দ শোনা যায়। দুচোখ আঠার মতো লেগে এলে গোলাইচাঁদ স্বপ্ন দেখে। দেখে আকাশ ভেঙে আবার পরী নেমেছে, যার শরীর কইতরীর মতো সুডৌল আর ত্বক পায়রাবিবির মতো পাকা গমরঙা। দূরে কোথাও চোঙ্গা মাইকে বিয়ের বাজনা বাজছে। সানাইয়ের রেকর্ডকরা সুর।

স্বপ্নালু গোলাইচাঁদের ঠোঁটে হাসি ফোটে। দেখা হলেই এবার ও বড় ইমাম সাহেবকে বলবে, ‘তোমরায় মোর সউক। মোর জইন্যে একটা পরীর মতোন বউ দেখেন।’পরের দিন সকালে বলদিবাথানের কোথাও গোলাইচাঁদকে দেখা যায় না। কমিশনার মেহেদী শোরগোল তুলে অভিযুক্তকে ধরে আনতে দিকে দিকে লোক পাঠায়। কিন্তু বসা মসজিদের মতো গোলাইচাঁদও যেন গায়েব হয়ে গেছে। তাকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ওদিকে রামপাড়ার শ্রী শ্রী দয়াময়ী দেবী মন্দিরের সুসজ্জিত দেবী মূর্তিকে ভূলুন্ঠিত অবস্থায় পাওয়া যায়। মন্দিরটি যথাস্থানে থাকলেও মন্দিরের ভেতরের কোনো জিনিসই অক্ষত অবস্থায় দেখা যায় না।
লেখক পরিচিতি:
সাদিয়া সুলতানা
গল্পকার। প্রাবন্ধিক।
ঢাকায় থাকেন।




কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন