দীপ শেখর চক্রবর্তীর গল্প : অবগাহনকারী


অদিতিকে নিয়ে পালাবার চেষ্টা করে যাচ্ছি বেশ কিছুদিন হল। স্কুল সময়ের সুযোগ নিয়ে অথবা পড়ার ব্যাচ থেকে পালিয়ে অনেকটা সময় অদিতি আমাকে দিতে পারে। কারণ অদিতিকে অনেকটা সময় ধরে পাওয়া দরকার। এই ভীষণ পাওয়ার ইচ্ছেটা ওকে বোঝাতে পেরেছি কি না জানি না। বারবার আমাকে না করে দিচ্ছে অদিতি। কোনওভাবেই স্কুল অথবা পড়ার জায়গা ফাঁকি দেওয়া ওর পক্ষে সম্ভব নয়। এই অদ্ভুত নিয়ম মেনে চলা মনকে, অসহ্য লাগে আমার। মনে হয়, একটা নিয়মের বাইরে এরা কিছুতেই আসতে পারে না। ভাবি, হঠাৎ এই সম্পর্কটা তৈরি করাই ভুল হয়েছে। সম্পর্ক না তৈরি হলে তো এই চাওয়া-পাওয়া তৈরি হত না। যদিও অদিতিই আমার জীবনের প্রথম সম্পর্ক। এর আগে দুয়েকজনের সঙ্গে গা ঘষাঘষি হয়েছে যদিও তবে সেগুলো গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়। প্রথমদিন ইতিহাস পড়তে গিয়েই ওকে ভালো লেগেছিল। ধীরে ধীরে বিষয়টিতে দু’জনেই প্রবেশ করি। এই দু’জনের প্রবেশ করার সময়টা সত্যিই অদ্ভুত। গোটাটা কীভাবে যে হয়ে যায়, বুঝতে পারি না। তবে অদিতির সঙ্গে পড়ার একদিন ছাড়া আমার পক্ষে দেখা করা কঠিন। আর কোনও জায়গাতে আমরা একসঙ্গে পড়ি না। ওদের নিজস্ব কোনও টেলিফোন না থাকায়, যোগাযোগ করাও সমস্যা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এসবের মাঝে কিছু চিঠি আদানপ্রদান। মাঝে মাঝে, স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে আড়চোখে দেখা। এটুকুর মধ্যেই আমার প্রেম এঁটে উঠছে না কিছুতেই। অদিতিকে আমার চাই ঘন্টার পর ঘন্টা। ওকে অনেক কথা বলার মধ্যে দিয়ে ছুঁয়ে নিতে চাই। শক্ত করে জড়িয়ে ধরে চুমু খেতে চাই। অদিতিকে জড়িয়ে ধরতে কেমন লাগবে? কেমন হবে ওর গায়ের গন্ধ, এসব কথা ভাবতে ভাবতে অনেক রাত অবধি পড়াশুনোয় মন বসে না আমার। মনে হয়, অদিতিকে অনেকক্ষণ ধরে চাই আমার। ওকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে চাই। ভালোবাসতে চাই। মুগ্ধ হতে চাই।

অদিতিকে নিয়ে সরে পড়ার নানা পথ বের করেছিলাম। শুধু ও রাজি হয়নি। প্রেমে পড়ার পরই কিছু নতুন ক্ষমতা আমার মধ্যে তৈরি হয়ে গেছিল। যেমন, অদৃশ্য হয়ে ওদের ছাদে আমি চলে যেতে পারতাম। পারতাম, ওদের স্কুল লাইব্রেরির কোণার ঘরটায় যেতে। এমনকী, একটু বেশি চেষ্টা করলেই ওর আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে সকলের চোখ এড়িয়ে চলে যেতে পারতাম। আমাদের এখানে যে কোনও কিশোর প্রেমে পড়ার পর এই জাদু-ক্ষমতার অধিকারী হয়। ইচ্ছেমতো যে কোনও কিছুর রূপ নিয়ে অথবা অদৃশ্য হয়ে তারা চলে যেতে পারে যে-কোনও জায়গায়। কিন্তু অদিতির প্রতিবার এই না বলা আমাকে হতাশ করে তুলেছিল। নিজের বৃত্তটার বাইরে ও যেন পা ফেলতেই চায় না। কোনও ভয়? নাকি একপ্রকার সংস্কার? ওর সঙ্গে মা ঘুমোয় বলে, শোওয়ার ঘরে যেতে পারি না রাত করে। নইলে সেখানেই অনেকক্ষণ অদিতিকে পেতে পারি। যদিও চেষ্টার কোনও বিকল্প নেই, মনে করি আমি।বারবার, চেষ্টা করে যেতে যেতে একদিন দরজাটা ঠিক খুলে যায়। আমার ক্ষেত্রেও বিষয়টা একই দাঁড়াল, তবে কিছুদিন পর। টিউশন পড়ার শেষে, বেরোতে বেরোতে যেটুকু কথা হয়, অদিতি জানাল, একদিন ও স্কুল পালাতে রাজি। যদিও ঠিক সময়ে তাকে স্কুলের পাশের গলিতে ফিরিয়ে দিতে হবে। নইলে, মরে যাওয়া ছাড়া আর কোনও পথ থাকবে না। ভেতরে ভেতরে যে একটু ভয় পেলাম না, এমন নয়। তবে, বুঝতে দিলাম না। হয়ত, এই সম্মতির আনন্দই সমস্ত বিপদ ভুলিয়ে দিল। এতদিন পর পাথর টলল যেন। অদিতি সম্মতি দিয়েছে। ও রাজি।

কোথায় যাব, কোথায় যাওয়া নিরাপদ এসব ভাবতেই বেশ কয়েকদিন কাটল। ভেবে দেখলাম, সবথেকে বেশি সুবিধা, ব্যারাকপুর যাওয়া। বারাসাত থেকে যে বাস যায়, তাতে ব্যারাকপুর চল্লিশ মিনিট-এক ঘন্টার রাস্তা। গঙ্গার ধারে এমন কয়েকটি পার্ক আছে যেখানে সহজেই ঘনিষ্ঠ হওয়া যায়, কেউ কিছু মনে করে না। সময়ের মধ্যে ফিরে আসার ক্ষেত্রেও কোনও অসুবিধে হওয়ার কথা নয়। সবথেকে বড় কথা, অদিতিকে এই প্রথম অনেকক্ষণ ধরে পেতে চলেছি। জাদুবলে একদিন সন্ধেতে ওর ছাদে গিয়ে নির্দিষ্ট টবের তলায় রেখে এলাম জায়গার নাম। পরে, ওর দেওয়া চিরকূট খুলে দেখি, সম্মতি দিয়েছে। জানিয়েছে পরশু, বেলা এগারোটায়, হেলাবটতলায়। জীবনটা একটা ‘না’ এর তরঙ্গ থেকে হয়ে দাঁড়িয়েছে সম্মতির মালা। মনে মনে খুশি হই। উত্তেজনায় ঘুম আসে না দুই দিন। মনে মনে একটা আশঙ্কাও যে হয় না- একথা বলতে পারি না। নির্দিষ্ট দিনে হেলাবটতলায় দাঁড়িয়ে উত্তেজনায় পা কাঁপছিল। এই প্রথম কোনও মেয়েকে নিয়ে চলেছি শহরটা থেকে অনেক দূরে। এপ্রিল মাসের প্রচণ্ড গরমের মধ্যে ঘামতে ঘামতে যখন পায়চারি করছি বটতলার নীচে, অদিতি এল। আমাকে দেখে চোখ নামিয়ে নিল ও। লজ্জা নাকি অপরাধবোধ? কাছে এসে কানের সামনে ফিসফিস করে বলল- একটু দাঁড়াও, পোশাকটা বদলে আসি। এই বলে হঠাৎ কোথায় যে গেল, কিছুক্ষণ পর এল গাঢ় সবুজ রঙের সালোয়ারটি পরে। ওকে কিছুটা বয়স্ক দেখাচ্ছে আগের থেকে। পিঠে স্কুলের ব্যাগটাও আর নেই। সেই নিয়ে প্রশ্ন করা হল না। এতক্ষণ যে বটতলার নীচে দাঁড়িয়ে ছিলাম একটু ছায়ার জন্য, দেখলাম সেটি আর নেই। গাছটি গেল কোথায় ? সামনে একটি ফাঁকা বাস দাঁড়িয়ে আছে, ব্যারাকপুর যাবে। উঠে দেখি, চালক নেই, কন্ডাক্টার নেই। এমনকী বাসটিতে যাত্রী নেই, একজনও। অদিতি, এই প্রথম আমার হাত ধরল। টেনে নিয়ে বসল, বাসের একেবারে শেষ সিটে, জানালার ধারে। যখনই বসলাম, সেই বাস কোনও চালক, যাত্রী অথবা কন্ডাক্টার ছাড়াই দিব্যি চলতে শুরু করল। যথাসম্ভব অদিতির গা ঘেঁষে বসেছি। বাম হাত রেখেছি ওর পিঠের নীচে। সবুজ সালোয়ারের পিঠ ভিজে গেছে ঘামে। হাতে সেই ঠাণ্ডা পিঠের স্পর্শ লেগে বড় আরাম লাগলো। ওর অন্তর্বাসের ফিতেটা উঁচু হয়ে আছে কাঁধের দু’দিকে। দুষ্টুমি করে, একটি টেনে ধরে, ছেড়ে দিলাম। ব্যথায় আঃ করে উঠল অদিতি। তারপর এদিক ওদিক তাকিয়ে দাঁত চেপে কপট রাগ দেখিয়ে বলল—কী হচ্ছে!

বাসটি ধীরে চলছে। সামনে কাউকে অতিক্রম করে যাচ্ছে না। কেউ-ই উঠছে না বাসে, হাত দেখিয়ে থামাচ্ছেও না। এমন একটি বাসে আমি ও অদিতি অনেক ঘনিষ্ঠ হতে পারি। এমনকী ওর গলার কাছে ঠোঁট এনে বেশ কয়েকবার চুমু খাওয়ার চেষ্টা করে গেছি। ঝাঁকুনি দিয়ে সরিয়ে নিয়েছে কাঁধ। হাত দিয়ে টেনে নিয়েছে আরও বেশি বুকের কাছে। ও সরে গেছে জানালার দিকে। এমন করতে করতে বুঝি, বাসটা পার হয়ে যাচ্ছে আরিফ বাড়ি। জানালা দিয়ে দেখি, কেমন অপরিচিত লাগছে আশেপাশের দৃশ্যপট। রাস্তার দুপাশে বড় বড় গাছগুলো আর নেই। রাস্তাটা বড় হয়ে গেছে আরও। মরুভূমির মতো ধূ ধূ করছে। কাটা যাওয়া গাছের গুঁড়িগুলো রাস্তার পাশে হাঁটু গেড়ে বসে আছে উদ্বাস্তু মানুষের মতো। মাঝে মাঝে পাখিদের মৃতদেহের পাশেই পড়ে আছে তাদের যত্নে নির্মিত বাসা। অদিতি জিজ্ঞেস করল—গাছগুলো সব কেটে ফেলল কবে? মাথা নাড়ালাম, নিজেই জানি না। ওর মুখ এক অজানা ব্যথায় মলিন হয়ে এল।

মানুষকে তীব্র ঘৃণা করি আমি—অদিতি কঁকিয়ে ওঠে।

আমার অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে ওর এই কথায়। আমিও তো মানুষ। তাহলে কি অদিতি একদিন ঘৃণা করবে আমাকেও? ভয় হয়। ওকে আরও জাপটে ধরতে যাই, জোর পাই না। হাতের নাগাল থেকে কীভাবে যেন হঠাৎ বেশ কিছুটা দূরে সরে গেছে অদিতি। ওর শরীর যেন চলে গেছে জানালার বাইরে অনেকদূর। গরম হাওয়ার হলকা পুড়িয়ে দিচ্ছে মুখ। অদিতি খুব শান্ত গলায় বলে—সব শেষ হয়ে গেছে দীপ। ভালোবাসার সেই পৃথিবীটা ওরা নষ্ট করে ফেলেছে। কী বলছে অদিতি। এই তো আমাদের প্রেম সবে শুরু হল। যদি এই পৃথিবী কম পড়ে, তবে নতুন এক পৃথিবী গড়ে নেব আমরা। অদিতি যেন পড়ে ফেলতে পারে আমার মনের কথা। জানালা থেকে মুখ ঘুরিয়ে ম্লান হাসি হেসে বলে- তা কি হয়? এতটা কথার মধ্যে মনে হল, আমার শরীরের ওজন যেন বেশ খানিকটা বেড়ে গেছে। সেই ছিপছিপে শরীরটা আর নেই। স্কুলের পোশাকটা ছিঁড়ে বেরিয়ে পড়তে চাইছে আমার এই দেহটি। প্রসঙ্গ অন্যদিকে ঘোরানোর চেষ্টা করতে গিয়ে অদিতিকে জিজ্ঞেস করে ফেলি—আমার আগে কেউ তোমাকে ভালোবেসেছে অদিতি? অনেকক্ষণ যেন কথাটি শুনতে পায় না ও। তারপর হঠাৎ কিছুটা গায়ের কাছে সরে এসে বলল, হঠাৎ এই প্রশ্ন মনে এল কেন?

এই প্রশ্ন কেন মনে এল, নিজেও জানি না। তবে এই কথাটি আমার ভেতরে ঘুরেছে বহুদিন হল। যত একে চাপা দিয়ে রাখার চেষ্টা করি না কেন, ঠিক বেরিয়ে আসে। আজ অসময়ে বেরিয়ে এসে চূড়ান্ত অস্বস্তিতে ফেলল আমাকে। যদিও শুধুই অস্বস্তি নয়, ওর ইতিহাস আমার জানতে ইচ্ছে হয়। কোনওকিছু জানা তার ইতিহাস ছাড়া অসম্পূর্ণ। বিশেষত যখন হৃদয়ের কাছে এক সন্দেহের ছুরি তাক করা আছে। অদিতিকে কি আমার আগেও কেউ স্পর্শ করেছিল, এভাবে? প্রশ্নটি করিনি যদিও কিন্তু অদিতি বুঝে যায় মনের সমস্ত কথাই। হয়ত ওকে এত শক্ত করে জড়িয়ে রাখার ফলেই আমার কথাগুলো ওর ভেতর প্রবাহিত হচ্ছে। অদিতি জানালার দিকে তাকিয়ে থাক বলল—

প্রথম যাকে পছন্দ হয়েছিল সে আমার থেকে অনেকটা বড় ছিল। শহরের বড় মূর্তিটার পাশে যে মাঠটা আছে সেখানে ওর জাদু দেখতে গেছিলাম কয়েকজন বন্ধু মিলে। যারা জাদু দেখায় তাদের প্রতি আমার এক আলাদা দুর্বলতা আছে। ওর ভালো লেগেছিল আমাকে, বিশেষভাবে। তুমি তো জানো আমাদের শহরের ছেলেরা প্রেমে পড়লে তাদের বিশেষ ক্ষমতা তৈরি হয়। সেভাবেই আমাদের দেখা-সাক্ষাৎ হত। ধীরে ধীরে খবরটা বাড়িতেও জানাজানি হয়ে গেল। একজন জাদুকরকে কোনওভাবেই মাথায় তুলতে চায় না বাবা। মায়ের আপত্তিও ছিল, আবার প্রচ্ছন্ন সমর্থনও ছিল। শহরের কোথাও জাদু দেখানো হলে, নিজেই টিকিট নিয়ে আসত মা। এই নিয়ে অনেক ঝামেলা হয়েছে বাবা এবং মায়ের মধ্যে। যাই হোক, ছেলেটির একটি অদ্ভুত অসুখ ছিল। কাক মারার অসুখ। যেখানে কাক বসে থাকতে দেখত, হাতের সামনে যা পেত তাই ছুঁড়ে মারত কাকেদের লক্ষ করে। কাকেরাও ওকে ছাড়ত না। দুই পক্ষের এই তুমুল লড়াইয়ের মধ্যে অনেকসময় পণ্ড হয়েছে জাদু দেখানোর অনুষ্ঠান। ফলে, ছেলেটিকে সবসময় মাথায় একটা বালতি চেপে ঘুরতে হত। এমনকী আমাদের বাড়ির কাকেরাও ওকে একদম পছন্দ করত না। ওর ধারণা ছিল আলো নিভে যাওয়ার পর কাকেরা আর আক্রমণ করবে না ওকে। যেই না বালতি মাথায় না চাপিয়ে আমাদের ছাদে এসেছে অমনি কোথা থেকে একটা কাক ফুটো করে দিল ওর মাথা। সেই থেকে বালতি না পরে আসার ভুল ও কখনও করত না।

এতক্ষণ ধরে গল্পটা শোনার ভেতর বুকের ভেতর কেমন চিনচিন করছিল, বুঝতে দিইনি অদিতিকে। এই প্রশ্নটি করেই আসলে ভুল করেছি। বোঝা উচিৎ ছিল, অদিতির পূর্ব-সম্পর্কের কোনও ঘটনাই আমি সহজ মনে শুনতে পারব না। অদিতির গল্প শেষ হয়নি যদিও। মাঝে অনেকটা অংশ অন্যমনস্ক হয়ে পড়ার ফলে আর শুনতে পাইনি। বুঝলাম, অদিতি এসেছে গল্পের সেই পর্বে যেখানে জাদুকরের সঙ্গে ওর বিচ্ছেদ হয়ে যাবে। অদিতি বলে যায়—

ততদিনে আশেপাশের অনেকেই আমাদের সম্পর্কের কথা জেনে ফেলেছে।

জাদুকর ছেলেটির সুখ্যাতিও ছড়িয়েছে এদিক ওদিক। তবে কাকেদের সঙ্গে ওর যুদ্ধটা হয়ে উঠেছে আরও বেশি রক্তক্ষয়ী। একদিন ছেলেটি আমাকে বলে, ওর একটি জাদুতে আমার অংশ নিতে হবে। প্রস্তাবটি একেবারেই পছন্দ হয় না আমার। দর্শক হয়েই এই খেলাগুলো দেখতে ভালো লাগত। এর ভেতরে কোনওদিনই প্রবেশ করতে চাইনি। কিন্তু কোনওভাবেই ছেলেটিকে বুঝিয়ে ওঠা যাচ্ছে না। ওর জেদের কাছে পরাস্ত হয়ে রাজি হলাম। কিন্তু ভেতরে ভেতরে বুঝে গেছিলাম, এই আমাদের সম্পর্কের শেষ। সেদিন অনুষ্ঠানে ও বেশ ক’য়েকটি খেলা দেখানোর পর আমাকে নিয়ে খেলা দেখাতে যায়। খেলাটি খুবই জনপ্রিয়। করাত দিয়ে একটি মানুষ কেটে ফেলার খেলা। তারপর আবার জুড়ে দিয়ে দর্শকদের হাততালি কুড়নো। খেলাটি শুরু হয়। জাদুকর যা যা করার করে। মন্ত্র পড়ে, আলোর রকমফের ঘটায়, তারপর করাত চালিয়ে দেয় আমার শরীরের ওপরে। তারপর যেই না দুটি ভাগ আলাদা করতে যাবে। দেখা যায়, কিছুই হয়নি। কিছুতেই আমাকে দু’ভাগ করতে পারেনি জাদুকর। ওর খেলাটি ব্যর্থ হয়। দর্শকরাও প্রবল হতাশ হয়ে দুয়ো দিতে থাকে। এই আমাদের সম্পর্কের শেষদিন। এরপর ওকে দেখিনি আর। এই শহরে কখনও খেলাও দেখায়নি ও। শুনেছি অন্য কোনও শহরে পাগল হয়ে পথে পথে ঘুরে বেড়ায় ও আর বিড়বিড় করে বলে—কালনাগিনী, কালনাগিনী এক। খেয়ে ফেলল আমাকে।

অদিতির গল্পটি শেষ হয় যখন, আমাদের বাসটি ততক্ষণে পৌঁছে গেছে সংবাদপত্র অফিসের সামনে। এটি কি অফিস নাকি শুধুই সংবাদপত্র জমা থাকে? অদিতি বলে, বাতিল সমস্ত সংবাদপত্রের জন্য এটি একটি গুদামঘর। বাতিল সংবাদপত্র? প্রতিদিন প্রতি মুহূর্তে বাতিল হয়ে যাচ্ছে এই পৃথিবীটাই। বিরাট গুদামঘরটা দেখে বুক ছমছম করে। অদিতি এতকিছু কী ভাবে জানে, জানি না। এর আগেও কি ও এসেছে এই পথে? বুঝি, অদিতির পৃথিবীটা যত ছোট মনে হয়েছিল আমার ততটা নয়। ইতিমধ্যে তীব্র গরম কেটে গিয়ে আকাশে মেঘ জমতে শুরু করেছে। কিছুক্ষণ বাদেই একফোঁটা-দুই ফোঁটা করে বৃষ্টি পড়তে শুরু করল। জানালাটা বন্ধ করতে গেলে অদিতি বারন করল। বুঝলাম, এখন ওর গায়ে আর সবুজ সালোয়ার কামিজটা নেই। ও পরে আছে একটি শাদা রঙের শাড়ি। বয়স্ক দেখাচ্ছে ওকে। অন্তত বাইশ-তেইশ বছর বয়স তো হবেই। চোখের তলায় কালি পড়েছে ওর যা এই কিছুক্ষণ আগে ছিল না। বুক ভারী হয়ে উঠেছে আরও। অদিতির বামহাতের ব্লাউজ ভিজে যাচ্ছে বৃষ্টির ভেতর। তবুও ও জানালাটা বন্ধ করতে চাইছে না। জলের ভেতর যেন মিশে যাচ্ছে ওর জানালার বাইরে বের করে রাখা হাতখানি। ইতিমধ্যে অদিতির গল্পটি আমার মধ্যে যে বেদনামিশ্রিত ঈর্ষা তৈরি করেছিল তার ভার অনেকটাই কমে গেছে। বরং অদিতির ইতিহাস জানার জন্যও আরও আগ্রহী হয়ে উঠি। মনে হয়, যে অদিতির প্রেমে পড়েছি আমি ইতিহাস ব্যাচে, সে এ নয়। বরং অন্য কেউ। পাশের রাস্তার দৃশ্য বদলে যাচ্ছে আরও। দেখলাম, রাস্তাটির সীমা এখন আর দেখাই যায় না। যেদিকে দেখা যায় শুধু কংক্রিটের রাস্তা। কোনও গাছ নেই, বসতি নেই, বাজার নেই। মানুষের কোনও চিহ্ন নেই। কংক্রিটের মরুভূমির মধ্যে দিয়ে ছুটে চলেছে আমাদের বাসটা। কীভাবে দিক বুঝে চলেছে এটি? চালক কোথায়? কোথায় কন্ডাক্টার? একজন যাত্রীও কি আর উঠবে না? বৃষ্টি বেড়ে চলছে আরও। ঝাপসা লাগছে আশপাশ। অদিতির বুক ভিজে গেছে। ভিজে গেছে শাড়ির অনেকটা। তবুও জানালা বন্ধ করতে দেবে না। ভাবলাম, এরকম চুপচাপ বসে থেকে কী লাভ? প্রশ্ন করলাম—অদিতি, তুমি কোনওদিন কাউকে ভালোবেসেছিলে? পছন্দ নয়, প্রেম নয়, স্বচ্ছ্ ভালোবাসা?

গভীর চোখে তাকাল অদিতি। সে চোখ কি কেবলই বেদনার? বিরক্তির নয়? কী আছে এই চোখদুটিতে। যেন বহুদিনের চেনা। কিন্তু এমনটি হওয়ার তো কথা নয়। কতদিনই চোখে চোখ রেখেছি অদিতির। তবু কেন মনে হচ্ছে, বহু বহু বছর। অদিতি কথা বলা শুরু করে। আশ্চর্য হয়ে শুনি, ওর গলা আগের থেকে অনেক বেশি গম্ভীর, পরিণত।

কেন বারবার এই গল্পগুলো জানতে চাও দীপ? কী সুখ হয় জেনে? নাকি এও একপ্রকার আত্মনিগ্রহ?

উত্তর নেই আমার কাছে কোনও। চুপ করে থাকি। অবাক হই। এমন প্রশ্ন আগে করেছি আমি? এই দীপ? কবে? কোথায়? মনে করতে পারি না। নিজের হাত দেখে মনে হয়, কত পাপ ধুয়ে ফেলা আশ্চর্য ফ্যাকাশে দুটি হাত।

যাকে ভালোবেসেছিলাম সে ছিল আমার সাঁতারের সঙ্গী।

মনে পড়ে, একসময় দু’জন সাঁতার কাটতে যেতাম শালবাগানের পুকুরটায়। জলের ওপর ভেসে থাকা বিকেলবেলার আলো মেখে যখন সামনে দাঁড়াত রুমা, মায়াবী লাগত ওকে। আমাদের ছিল জলের সম্পর্ক। এক পাড় থেকে অন্য পাড়, আমাদের সম্পর্কের পৃথিবী ছিল। এর মধ্যেই রুমার শরীর ছুঁয়ে যেত আমার শরীর। আমিও, জলে ভেসে ভেসে ছুঁয়ে নিতে পারতাম ওর পিঠ। রুমা দক্ষ সাঁতারু ছিল। ততটাই আগ্রাসী। কিন্তু জল থেকে তুললেই বদলে যেত। মনে হত, নিঃশ্বাস নিতে পারছে না ভালো করে। ওর আগ্রাসন সম্পূর্ণ মুছে গিয়ে কাঁপা কাঁপা পায়ে বাড়ি ফিরে যেত। বেশি কথা বলত না। জলে নামার আগে অথবা পথেঘাটে দেখা হলে, রুমা সবসময় বলত নিজেকে শেষ করে দেওয়ার কথা। জিজ্ঞেস করলে কিছুই স্পষ্টভাবে বলতে পারত না। দিন দিন বেড়ে যাচ্ছিল ওর সাঁতারের সময়। প্রায় সারাদিন ও জলেই কাটাত। আমি সাধারণত বিকেলবেলাই সাঁতারের সময় বের করতে পারতাম। এসে দেখি, রুমা জলে। ফিরে যাওয়ার সময়ে ও জল থেকে উঠত না। এমন করে ধীরে ধীরে জলের প্রাণী হয়ে গেছিল রুমা। ডাঙার পৃথিবীকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছিল ও। রুমাকে ভালোবেসেছিলাম, একথা কখনও স্পষ্ট করে বলা হয়নি। তবে, যে বোঝে তাকে কি এভাবে স্পষ্ট করে বলতে হয় কখনও? রুমা বুঝেছিল, তাই জলের ভেতরে আমার শরীরের কাছাকাছি ও সাঁতার দিত। দূরে যেত না কখনও। একদিন যখন সাঁতারের প্রতি সমস্ত আগ্রহ ফুরিয়ে গেল আমার, জল থেকে উঠে গেলাম। রুমা চাইত না আমি জল থেকে উঠি। আজীবন জলের পৃথিবীর মানুষই হয়ে থাকি—এই ওর ইচ্ছে ছিল। ওর বিশ্বাস ছিল জলের পৃথিবী, ডাঙার তুলনায় অনেক সুন্দর, গভীর। এমন মেনে নিতে পারিনি আমি। জল থেকে উঠে এলাম, তবু কি রুমাকে ভালোবাসিনি? বারবার ফিরে গেছি পুকুরের কাছে। ওকে দেখার জন্য দাঁড়িয়ে থেকেছি জলের ধারে। ওর নাম ধরে ডেকেছি। রুমা দেখা দেয়নি। দেখতে পাইনি আর। খুঁজে দেখার জন্য আমিও ফিরে যাইনি আর জলে। শুনেছি ওর পরিবারও ওকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারেনি আর। রুমা, জলের মেয়ে জলেই থেকে গেছে।

এতদূর বলে থামল অদিতি। দেখলাম ওর চোখ দুটি মুক্তোর মতো ঝকঝক করছে। ভিজে যাওয়া শরীরের শাদা শাড়িটা আর নেই। ওর গায়ে এখন রুপোলি এক পোশাক। পায়ের অংশটা সরু হয়ে একটা পাখনা হয়েছে। পোশাকের ওপরে অনাবৃত শরীরটা হালকা গোলাপি রঙের। মনে হচ্ছে, অদিতি নেই। যেন ওর গল্পের সেই রুমা।। জলের এক পরি এসে বসেছে ঠিক আমার পাশে। জানালার দিকে তাকিয়ে বুঝি আশপাশও বদলে গেছে অনেকটাই। ইতিমধ্যে কল্যাণী হাইওয়ের রাস্তায় চলে এসেছি আমরা। দেখলাম, ফ্লাইওভারের ওপরে আরেকটি ফ্লাইওভার। তার ওপরে আরেকটি, এমন করে যে কতদূর গেছে, দেখা যায় না। মেঘের ভেতর হারিয়ে গেছে আরও উঁচু ফ্লাইওভারটা। অথচ, যানবাহন কিছুই চলছে না। ফ্লাইওভারের গায়ে গোত্তা খাচ্ছে পাখিগুলো। উঁচু দিয়ে যাওয়া মেঘগুলো যাতায়াত করতে পারছে না। অনুভব করি, এই সামান্য বাসযাত্রার মধ্যেই পৃথিবীটা বদলে গেছে অনেক। নিজেকে অনেক বেশি ভারী এবং বয়স্ক মনে হচ্ছে আমার। অনেক শান্ত হয়ে এসেছে ভেতরটা। দেখি, আমার পোশাক বলতে একখানি কালো কাপড়। কোনওক্রমে শরীরের লজ্জা নিবারণ করেছে সেটি। অদিতি বাসের জানালাটা বন্ধ করে কিছুটা এগিয়ে আসে আমার দিকে। ঠোঁটের কাছে ঠোঁট এনে চুমু খায় গালে, গলায় ঠোঁটে। বুকের কাছ থেকে নামতে নামতে সরিয়ে নেয় কোমরের কাছে কাপড়টা। হাত বুলিয়ে দেয়, মুখ দিয়ে আদর করে। তারপর এসে বসে আমার কোলের ওপরে। ধীরে ধীরে ওপর নীচ করে। আশ্চর্য তৃপ্তি অনুভব করে অদিতির শরীর, বুঝতে পারি। কিছুক্ষণ পর, নিজেকে সম্পূর্ণ তৃপ্ত করে নেমে গিয়ে বসে নিজের জায়গায়। এই গোটা প্রক্রিয়ায় আমাকে গুরুত্ব দিতেই চায় না অদিতি। শুধু উন্মুক্ত অসহায় হয়ে থাকে আমার পুরুষাঙ্গটি। কল্যাণী হাইওয়ের মোড় পেরিয়ে এই প্রথম থামল বাসটি। দেখলাম, উঠে এল একটি চার-পাঁচ বছরের শিশু। আর কেউ-ই উঠল না পেছনে। উঠে টলতে টলতে গিয়ে বসল বাসের প্রথম দিকের একটি সিটে। আমাদের লক্ষ করল না। ওর জামার রঙটি শাদা। কালো রঙের একটি প্যান্ট দেখে মনে হয় স্কুলের পোশাক। সঙ্গে আর কেউ নেই, কিছুই নেই।

বাসটি আবার চলতে শুরু করল।

বাসের জানালাটি বন্ধ করে দিই। এতক্ষণে শীত করতে শুরু করেছে বেশ। জানালা দিয়ে হুহু করে আসছিল শীতের হাওয়া। অদিতিকে জড়িয়ে ধরি দু’হাত দিয়ে। ঠাণ্ডায় কাঁপছে দুজনের শরীর। বুঝি আমাদের দু’জনের বয়স একত্রিশ-বত্রিশের কম নয়। ভারী শরীরে দুজনে তাকিয়ে থাকি জানালার দিকে। দেখি, পথের ধারে বাড়িঘর কিছুই প্রায় নেই। শুধু বড় বড় বিজ্ঞাপনের হোডিং ঝুলে আছে। বিজ্ঞাপনের পর বিজ্ঞাপন দিয়ে ঢেকে ফেলা হয়েছে গোটা পথ। স্টেশন আসার আগে যে মোড় মনে পড়ে, মনের ডাক্তার দেখাতে আসতাম। আসতাম, কিন্তু কবে, কোন বয়সে সে সব কিছুই মনে পড়ে না। শুধু সেই ডাক্তারে মুখ আবছা মনে আছে। সেই ডাক্তারের প্রেমে পড়লাম তৃতীয় বার দেখাতেই। যেহেতু মনের ডাক্তার, কিছুই গোপন করতে বারণ করেছিল, এই প্রেমে পড়ার কথাও লুকোলাম না। তারপর একসঙ্গে বেশ কিছুদিন চলল, প্রেম এবং ডাক্তার দেখানো। যদিও প্রতিবার প্রেমের দিনের জন্য আমার থেকে নেওয়া হত টাকা। বিষয়টা বেশ গুলিয়ে গেছিল। বুঝতে পারছিলাম না, এই মাঝে মাঝে আসা কি প্রেমের টানে নাকি নিজেকে সুস্থ করে তোলার চেষ্টায়। আজ একথা মনে পড়ার এক আশ্চর্য কারণ রয়েছে। স্মৃতি খুবই আবছা তবু যতদূর মনে পড়ে, সেই মনের ডাক্তার খুবই দুর্বল মুহূর্তে আমাকে দু’জন রুগির কথা জানায়। একজন, জাদুকরের কথা মনে আছে। যে জাদুকর, কোনও এক বড় আঘাত পেয়ে প্রায় উন্মাদ হয়ে যায়। এমনকী সে আঘাত এতই গাঢ় ছিল যে, সে জাদু দেখানোই ছেড়ে দেয় পুরোপুরি। সর্বদা কাকেরা ওকে আক্রমণ করত বলে, মাথায় বালতি চাপিয়ে রাখত ওই জাদুকর। মনের ডাক্তারের কাছেই শুনি, দিনের পর দিন ভেবেও তার কোনও সাহায্য করে ওঠা যায়নি। একদিন আর আসে না জাদুকর, তবে ফেলে যায় তার মাথার বালতিটি। বালতি ছাড়া কীভাবে যে কাকের দলটার সঙ্গে ও লড়াই করে, সেকথা ভেবে খুবই চিন্তিত ছিল মনের ডাক্তার।

আরেকজনের কথা, একদিন খুবই ঝড়জলের দিন বলেছিল মনের ডাক্তার। বলেছিল একটি মেয়ে, ধীরে ধীরে ডাঙার জীবনের সবকিছু থেকেই সরিয়ে নিচ্ছিল নিজেকে। জলের ভেতরেই সে খুঁজে পেয়েছিল তার শান্তির জীবন। আরও বেশি সময় ধরে সে যখন জলেই কাটাচ্ছিল, ওর বাড়ির লোক একদিন নিয়ে আসে তার কাছে। সেই মেয়েটি মনের ডাক্তারকে বলেছিল অদ্ভুত কথা। বলেছিল, আসলে সে এক মৎস্যকন্যা। ভুল করে স্থলের জীবন লাভ করে পস্তেছে সে। স্থলজীবনের কোথাও নিজেকে সে আঁটিয়ে তুলতে পারেনি। জলই তাকে টানে, তাই সেই জীবনেই ফিরে যেতে চায়। বলেছিল, একটি মেয়েকে সে চেয়েছে জীবনে। যদিও সে নিশ্চিত নয়, মেয়েটির জলের জীবন ভালো লাগবে কি না। তবে, মেয়েটির পাশাপাশি সাঁতার দিতে তার বেশ লাগে। ভালো লাগে জলের ভেতর ঘুরে ঘুরে তার পিঠ ছুঁয়ে নিতে। মনের ডাক্তার এই দু’জনের কথা বলেছিল আমাকে। তারপর, যেদিন একথা জানিয়েছিলাম যে প্রেমের জন্য ওকে কোনও ফি দিতে আমি পারব না সেদিনই আমাদের বিচ্ছেদ ঘটে। এরপরও অনেকবার আমাকে টেলিফোন করেছিল সেই ডাক্তার। ধরিনি।

ব্যারাকপুর স্টেশনের রাস্তায় চলে এসেছি। সেই বিখ্যাত দোকানের বাইরে লম্বা লাইন। বাইরে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে বিরাট এক পশুর দেহ। লাইনের সবার হাতে একটা করে ছুরি। প্রত্যেকে অল্প করে মাংস কেটে নিয়ে যাচ্ছে পশুটির দেহ থেকে। সেই রক্ত নেমেছে রাস্তায়। বাসটির চাকা তা অনায়াসে মাড়িয়ে চলে গেল। ব্যারাকপুর স্টেশনটি আর নেই। নেই, বাইরের সেই বিখ্যাত পাগল। মোড়ের মাথা থেকে লাইন দিয়ে শুধুই খাবারের দোকান। স্টেশনের পুরোনো কাঠামোটা যেন উবে গিয়ে মস্ত একটা ফাঁকা বেরিয়ে পড়েছে। লাইনগুলো নগ্ন, বিচ্যুত হয়ে পড়ে আছে সেখানে। ঠাণ্ডা কমে আসায়, বাসের জানালাটি খুলে দিই। সুন্দর ফুলের গন্ধ পাই। বাসটি দাঁড়ায়নি কোথাও। উঁকি দিয়ে দেখি যে শিশুটি ছিল, সেও আর নেই। কখন নেমে গেছে। অদিতির পোশাক বদলে গেছে আবারও। ওর গায়ে সূর্যমুখী রঙের একটি জামা। ওকে দেখাচ্ছে বেশ হাসিখুশি। জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে এক আনন্দের পৃথিবী যেন ছুঁয়ে নিতে চাইছে অদিতি। ওর আনন্দে, আমিও আনন্দ পাই। ওর হাত শক্ত করে ধরলে, লজ্জা পায়। কাঁধে মাথা রাখে আমার।

স্কুল পালিয়ে বেশ লেগেছে আজ। খুব সুন্দর দিন বলো?

মাথা নাড়ালাম আমি। সত্যিই আজ এভাবে না পেলে অদিতিকে কি জানা হত আমার? আমি কি পেয়েছি ওকে, সেভাবে? বহুক্ষণ ধরে ওকে আমি চেয়েছি, ঠিক এভাবেই। অদিতির এই আশ্চর্য রূপ আমাকে মুগ্ধ করে দিচ্ছে। অদিতি ফিরে গেছে ওর স্কুলজীবনের বয়সে। নিজেদের হালকা লাগছে আমাদের, এই সুন্দর রৌদ্রজ্জ্বল দিনের মতোই। অদিতি হঠাৎ হাত শক্ত করে চেপে ধরে বলে, খুব সাধারণ একটি কথা। সাধারণ কিন্তু সামান্য নয়।

দীপ, কখনও আমাকে ছেড়ে যাবে না তো।
আমি হাসি। অদিতির চোখে চোখ রেখে বলি—যাব না।

অদিতি জড়িয়ে ধরতে যায়। তারপর কীসের এক সংকোচে পারে না। এদিক ওদিক তাকিয়ে লজ্জায় হেসে ফেলে। বাস চলছে আগের থেকে দ্রুত। এগিয়ে যাচ্ছে ব্যারাকপুর ক্যান্টনমেন্টের দিকে। এই জায়গাটি আমার সবথেকে প্রিয়। জানালা দিয়ে দেখি, সবুজে সবুজে ভরে আছে আশপাশ। এত গাছ কি আগেও ছিল? নাকি প্রকৃতি ফিরিয়ে দিচ্ছে সবকিছু? ক্যাম্পের চারিদিকে যেদিকে চোখ পড়ে শুধু গাছ দেখি।

অদিতি জানো? একসময় এখানে একটা চিড়িয়াখানা ছিল।
তাই? এখনও আছে?
না। এখন আর নেই।
কী হল সেই চিড়িয়াখানার?
পশুরা সব বাড়ি ফিরে গেছে অদিতি। ওরা বলেছে, সভ্যতার সামনে ওরা আর নাচবে না।

তাই? এমন হয়েছে? অদিতির সমস্ত প্রাণ যেন জেগে ওঠে। উঠে পড়ে অদিতি। টেনে তোলে আমাকে। তারপর গেটের সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই বাসটি থেমে গেল। নেমে পড়লাম দুজনে। এই পথ আমার চেনা। সোজা গেলেই গঙ্গা। তার ধারে সেই পার্ক, যেখানে ঘনিষ্ঠ হলেও কেউ কিছু মনে করে না। বেশ দ্রুত হাঁটছে অদিতি। ওর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ওঠা আমার পক্ষে কঠিন হয়ে যাচ্ছে। রাস্তাটা দিয়ে সোজা হেঁটে যখন পার্কের সামনে গেলাম, দেখলাম হাজার হাজার নগ্ন নারী পুরুষ রমণে মত্ত। এঁকে অপরকে তীব্র ভোগের সেই দৃশ্যের মধ্যেই জন্ম নিচ্ছে শিশুরা। বড় হচ্ছে, আমাদের চোখের সামনেই। তারপর এগিয়ে যাচ্ছে নদীর দিকে। এভাবে জলের ভেতর ঝাঁপিয়ে পড়ছে একের পর এক শিশু। রমণে মত্ত নারী পুরুষের সে দিকে খেয়াল নেই। একে অপরকে আরও ভোগ করে নেওয়াতেই তাদের সমস্ত মনোযোগ। আমরা, সেই পার্কে আর ঢুকি না। ইচ্ছে করে না। সোজা এসে দাঁড়াই গঙ্গার সামনে। সিঁড়ি ধরে নীচে নামি। জলের ধারে, শেষ সিঁড়ির সামনে আমার হাত শক্ত করে ধরে রাখে অদিতি। পবিত্র নদী। কত পাপ ধুয়ে যায় এই জলে, ভাবি। জলের পাশে রাখা আছে কয়েকটি নৌকো। মাঝিরা ঘুমোচ্ছে তার ভেতর। দেখি, সেই জলে ভেসে যাচ্ছে কত কত পুরোনো বাড়ি। ভেসে যাচ্ছে, কত মানুষের দেহ। কারু কারু মুখ খুবই চেনা মনে হয়। দেখি, ভেসে যাচ্ছে কত মাস, সপ্তাহ, দিন। ভেসে যাচ্ছে, স্মৃতি, পাপ, কত কত বেদনাসমূহ। স্রোতে ভেসে যাচ্ছে সব। অদিতির মুখে সেই জলের আলো এসে পড়ে। ওকে ভালো লাগে। মনে হয়, সমস্ত উজাড় করে ভালোবাসি। আমার মনের কথা ওর মন অবধি পৌঁছে যায় ঠিক। মুখের দিকে তাকিয়ে মায়াবিনী হাসি হাসে।

দুজনেই আমরা ধীরে ধীরে খুলে ফেলি সমস্ত পোশাক। দেখি, ভেতরে ভেতরে অনেক পোশাক জমেছে এতদিনে। খুলতে খুলতে ক্লান্ত হয়ে পড়ি। একধারে সেই পোশাকের ছোট টিলা হয়ে যায়। আমার নগ্নতায় একবার চোখ বুলিয়ে নেয় ও। ওকে দেখি, সম্পূর্ণ করে। তারপর ধীরে ধীরে জলে নেমে যাই। দুজন দুজনকে জড়িয়ে ডুব দিই পরপর অনেকবার। স্নান হয় আমাদের। ধুয়ে যায় সবকিছু। অনেকক্ষণ কেটে যায় এভাবে। নদীর জলের ভেতরে রূপোলি স্রোতেরা এসে মেশে সোনালির সঙ্গে। মাছেরা সাঁতার কেটে চলে যায় বহুদূর। দুয়েকটা গাছের ডাল ভেসে যায়। অদূরে কোনও মন্দিরে বেজে ওঠে ঘন্টাধ্বনি। পৃথিবী অলৌকিক রূপে সেজে ওঠে যেন। অদিতিকে আর সঠিক সময়ে স্কুলের রাস্তায় ফিরিয়ে দেওয়া হয় না আমার।

অদিতিকে কোথাও আর ফিরিয়ে দেওয়া হয় না সেভাবে।

**********

লেখক পরিচিতি : দীপ শেখর চক্রবর্তীর জন্ম ও বেড়ে ওঠা বারাসাতে। প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। কলেজ জীবন থেকে কবিতা লেখা। লিখেছেন প্রায় সব বাণিজ্যিক পত্রিকা এবং লিটিল ম্যাগাজিনে। কবিতা ছাড়াও গদ্য লেখেন, গল্প লেখেন, ছবি আঁকেন। 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ