শনিবার, ১৮ জানুয়ারী, ২০২০

দি আর্ট অফ ফিকশন : সাগুফতা শারমীন তানিয়া'র সাক্ষাৎকার

সাক্ষাৎকার গ্রহণে : এমদাদ রহমান

লেখকদের কাছে আমার কিছু বিষয়ে খুব জানতে ইচ্ছে করে। লেখক কখন লেখেন, নোট নেন কি না। একটানে গল্পটি লেখেন কি না। কাগজে লেখেন না কি টাইপরাইটারে না কম্পিউটারে... তারপর গভীর রাতে হঠাৎ স্বপ্নাচ্ছন্নের মতো তিনি তার অসমাপ্ত লেখাটি লিখতে বসেন কি না; কিংবা তিনি কেন লেখেন? লিখলে কী ঘটে এইসব।

এসব কথা আবারও পড়ছিলাম প্লেবয় ম্যাগাজিনের একটি সাক্ষাৎকারে, ভ্লাদিমির নবোকভের আর্ট অফ ফিকশন সাক্ষাৎকার, দীর্ঘ সাক্ষাৎকারটি ছাপা হয় '৬৫ সালে; ম্যান অফ লেটার্স সাক্ষাৎকার সিরিজের অংশ হিসেবে, সেটা পড়তে পড়তে যখন অনুবাদ করতে শুরু করেছি, তখন, গত বছরের নভেম্বরের কোনও একটি দিনে হঠাৎ খুব ঝুম বৃষ্টি নেমে আসে, পল এলুয়ার মিউজিয়াম যাওয়ার রাস্তা কেমন জানি ধূসর বর্ণ ধারণ করে আর মুহূর্তে আমার মনে পড়ে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের 'নিরুদ্দেশ যাত্রা' গল্পের কথা- 'এই মনোরম মনোটোনাস শহরে অনেকদিন পর আজ সুন্দর বৃষ্টি হলো'! 

ঠিক তেমনি, হঠাৎই, সিদ্ধান্ত নিই এবার আমি কথাসাহিত্যিক সাগুফতা শারমীন তানিয়ার সাক্ষাৎকার নেব। তখন পড়তে শুরু করেছিলাম নবোকভের লোলিতা, অনুবাদে, এবং মূল লোলিতাও খুলছিলাম মাঝে মাঝে, পাঠের অন্যরকম এক আনন্দ সেটা, তারই ফাঁকে কখন যে ঢুকে পড়ল 'পাখি সব' নামে তিন নভেলার এক সংকলন, শারমীন তানিয়ার। সাক্ষাৎকারের কথা তাকে জানালাম, লন্ডনের প্লাস্টোয় বসবাসরত কথাসাহিত্যিক সম্মত হলেন। কিন্তু আমার পক্ষে প্লাস্টো যাওয়া অসম্ভব, ঠিক এই মুহূর্তে, প্যারিস থেকে; কিন্তু আজকের যুগে কিছুই যে অসম্ভব নয়। প্রযুক্তি দূরত্বের সংজ্ঞা বদলে দিয়েছে। পৃথিবীর কোনও প্রান্তই আর দূরে নয় আমাদের। সে কারণে, বিপুলা এক সাক্ষাৎকার গ্রহণ সম্ভব হলো। প্যারিসে, বুলেভার ম্যাক্সিম গোর্কীর এক কুঠরিতে বসে তখন আরেকবার পড়তে হলো 'লুনার কাছে চিঠি', তার সেই অদ্ভুত গল্পটিকে। 

তার জন্ম ১৯৭৬ সালের ৮ ডিসেম্বর, ঢাকায়। শৈশব কেটেছে ঢাকার বাসাবোয়। স্থাপত্যবিদ্যায় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক। উচ্চতর পড়াশোনা করেছেন যুক্তরাজ্যে। তিনি পেশায় একজন শিক্ষক। ২০১০ সালে প্রকাশিত হয় তার প্রথম নভেলা সংকলন- 'কনফেশন বক্সের ভিতর। অটাম-দিনের গান। ২০১১'য় বের হয় গল্পের বই- ভরযুবতী, বেড়াল ও বাকিরা; ২০১২'য় বের হয় উপন্যাস 'অলস দিন-খয়েরিপাতা-বাওকুড়ানি'; ২০১৪'য় লুনা রুশদীর সঙ্গে যৌথভাবে বের হয় গল্পের বই 'আনবাড়ি'; ২০১৫'য় তিনি অনুবাদ করেন সুজান ফ্লেচারের হুইটব্রেড ফার্স্ট নভেল প্রাইজ ও বেটি ট্রাস্ক পুরস্কারজয়িী উপন্যাস 'ইভ গ্রীন'। ২০১৮'য় বের হয় 'উত্তর-দক্ষিণা', যে বইতে তিনি দক্ষিণারঞ্জন মিত্রের রচনাবলী নিয়ে কাজ করেন, রূপকথার বাস্তবকে সামাজিক বাস্তবতা এবং ভবিষ্যতের সম্ভাব্যতা মিশিয়ে আবার নতুন করে লেখেন। তার তিন নভেলার সংকলন 'পাখি সব' বের হয় ২০১৯ সালে। ২০২০ সালে, একুশে বইমেলা উপলক্ষ্যে প্রকাশপ্রস্তুতিপর্বে আছে ১৯ গল্পের এক সংকলন 'দ্বিতীয় ভ্রান্তিপাশ'; এবং তার অনূদিত ইল পস্তিনো'র প্রেমের উপন্যাস 'ডাকপিয়ন'।

সাক্ষাৎকারগ্রহণকালে দারুণ এক ঘটনাও ঘটল। ঘোষিত হলো বাংলা একাডেমি প্রদত্ত সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্‌ সাহিত্য পুরস্কার ২০১৯; যৌথভাবে পেলেন সাগুফতা শারমীন তানিয়া এবং সালমা বাণী। তাদেরকে গল্পপাঠের অভিনন্দন। 

লেখকের লেখার শৈলী বিষয়ক সাক্ষাৎকারটি দীর্ঘ হয়েছে, এবং যত বিস্তার পেয়েছে, ততোই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পাঠক তার প্রিয় লেখককে কথাবার্তার মধ্য দিয়ে যেমন আবিষ্কার করতে পারবেন, তেমনি সাক্ষাৎকার পাঠের যে একটি অন্তর্লীন আনন্দ আছে, তা থেকেও বঞ্চিত হবে না; একজন লেখকের 'হয়ে ওঠা'র যে-যাত্রাপথের দেখা পাবেন পাঠক, সেটা তার নিজস্ব যাপনের জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠবে। একজন প্রাজ্ঞ, দেখা ও পাঠে প্রস্তুতি নেওয়া একজন লেখকের কথা থেকে আমাদের গ্রহণের যে কতকিছু আছে, কিংবা বর্জনেরও, আমাদের এই সাক্ষাৎকারটি তার একটি মাইলফলক-

এমদাদ রহমান : 
আপনার পাঠের পদ্ধতিটা কীরকম? কীভাবে কোন একজন লেখককে পড়ে ওঠেন, একটি লেখা ভাল লাগার পর আরেকটি, না কি সেই লেখকের নির্বাচিত কিছু লেখা পড়েন? কোন একজন লেখককে বুঝতে চাইলে আপনার পাঠ পদ্ধতিটা কী রকম হয়? 

সাগুফতা শারমীন তানিয়া : 
আমার পাঠের পদ্ধতি হাভাতের মতো, অসংস্কৃত। যদি কোনো লেখকের লেখা ভাল লাগে, তাঁর লেখা খুঁজে খুঁজে পড়ি, হ্যাংলার মতো বারবার পড়ি, স্মৃতিশক্তি আগে বেশি ভাল ছিল...তখন এমনও হয়েছে প্রিয় কিছু পড়তে পড়তে লাইনকে লাইন মুখস্ত হয়ে গেছে। যদি নিজের এই প্রবণতাকে ব্যবচ্ছেদ করে দেখি তাহলে মনে হবে, আমি আসলে ততক্ষণ ভাললাগার বিষয়ের কাছে বারবার ফিরে যাই যতক্ষণ সেটা আমার অংশ না হয়ে যাচ্ছে। একই গান লুপে শুনছি, একটা আত্তীকরণ ঘটে যাওয়ার আগ অব্দি আমি যেতেই থাকি, পরেও যাই। ভাললাগার বিষয় সেটা সাহিত্য- সঙ্গীত কিংবা মানুষ, ছিবড়ে হয়ে যাবার আগ অব্দি আমি থামতে পারি না। পরেও অবশ্য থামি না। নির্বাচনের ক্ষেত্রেও আমি প্রাকৃতিক, পড়া শুরু করলে যে আমাকে আঁকড়ে ধরে, আমি সেই লেখা পড়ি। হোঁচট খেলে পড়তে পারি না, অত্যন্ত মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে বসলেও পারি না, তখন বুঝতে চেয়ে অনেকসময় স্কিম-থ্রু করি, কিন্তু আমার তাতে ধৈর্য কম। একটি ভাষায় রচিত বাক্যের- এক্সপ্রেশনের- ভঙ্গির কিছু ভাব আছে, যেমন প্রথম দেখায় মানুষের চোখে-মুখে একরকমের ভাব দেখি, সেটা আমাকে অনায়াসে আকৃষ্ট করলেই বাকিটা এগোই। তারপর মনের পাইকারি দিকটা জেগে ওঠে, যে লেখকের লেখা ভাললাগে, তাঁর সব লেখা আমার চাই। 

লেখক যথাক্রমে চিত্রশিল্পী, চিত্রনির্মাতা, কথক... আমি সেই নির্মিতিতে তিনি কী দেখাচ্ছেন আর কীভাবে দেখাচ্ছেন সেটা দেখতে চেষ্টা করি, এটা অবচেতনেই ঘটে, চেষ্টাকৃত নয়। যখন সেই দেখাবার প্রণালীতে আকৃষ্ট হই, চিরতরে জুটে যাই। মার্গারিট অ্যাটউড একবার একটা উদাহরণ দিয়েছিলেন, স্মৃতি থেকে লিখছি, 'ধরা যাক গল্পটা 'রেড রাইডিং হুড'-এর, আমরা সবাই জানি মেয়েটা লাল হুড পরে বনের পথ ধরে দিদিমার কাছে যাচ্ছিল, পথে নেকড়ের সাথে দেখা, নেকড়ে পরে দিদিমাকেও খেল, মেয়েটাকেও খেল ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু লিখবার সময় এমন করে লিখতে হবে যেন প্রথম লাইনেই চমক থাকে, যেমন শুরু করলে 'নেকড়ের পেটের ভেতর তখন নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে কীসব গুরগুর করছে'। প্রথম প্রকাশেই অবাক করে দিলে! একটা ঔৎসুক্য তৈরি করে দিলে!' আমাদের মানিকবাবুর 'পুতুলনাচের ইতিকথা'য় যেভাবে আকাশের দেবতা প্রথমেই কটাক্ষ করলেন, অর্থাৎ বাজ পড়ে একজনের মৃত্যু হয়েছে তাই দিয়ে উপন্যাসের শুরু, কিংবা বুদ্ধদেব বসু 'রাত ভ'রে বৃষ্টি' শুরুই করলেন 'ওটা হয়ে গেছে' টাইপের কথা বলে। ডিকেন্সিয়ান নভেল 'আ টেল অভ টু সিটিজ' শুরু হচ্ছে এই বলে 'ইট ওয়াজ দ্য বেস্ট অভ টাইমস, ইট ওয়াজ দ্য ওর্স্ট অভ টাইমস', কিংবা কে ভুলতে পারে জেন অস্টেনের 'প্রাইড অ্যান্ড প্রেজুডিস'-এর প্রথম লাইন? এইসব নাটকীয়তা ক্রিয়েটিভ রাইটিংএর ব্যাকরণে আছে ঠিকই। কিন্তু সবই যে এমন বজ্রাঘাতে শুরু হতে হবে এমন কথা তো নেই, লালনগীতি শুরু করবার আগে 'ভোলা মওওওওওন' বলে এক হাঁক দিয়ে শুরু করলে আর কার কী হয় জানি না, আমার মনে একরকমের ব্যাঘাত উপস্থিত হয়, আমি তারে পারি না এড়াতে। বিমল মিত্রের 'সাহেব বিবি গোলাম' শুরু হয়েছে চার পৃষ্ঠায় একটি গলির বিবরণ দিয়ে, এই অপূর্ব বিবরণ দিয়েই বিমলবাবু তৈরি করে দিচ্ছেন উপন্যাসের স্থান এবং কাল, চালচিত্র এখানে ভীষণ জরুরি। শুরুর ব্যাঙতড়কার চেয়ে বোধহয় এ ভাল হয়, ব্যাঙ বহুক্ষণ পর টের পাচ্ছে সে একটি জলভরা কটাহে রয়েছে এবং সে জল ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। 

এমদাদ রহমান : 
আপনিও কি নিজের লেখার প্রথম বাক্যটিকে গুরুত্ব দেন? মার্কেস এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন- তাঁর ক্ষেত্রে এমনও হয়েছে যে শুরুর বাক্যটি লিখতে লিখতে দীর্ঘ সময় চলে গেছে, সে সময়ের মধ্যে পুরো লেখাটিই হয়তো লিখে ফেলতে পারতেন! মার্কেস বলেন— আমার কাছে লেখার প্রথম বাক্যটি পুরদস্তুর একটি গবেষণাগারের মতো, যেখান থেকে লেখার শৈলী, লেখার আঙ্গিক এমনকি লেখাটির বিস্তৃতি পর্যন্ত নির্ধারিত হয়ে থাকে। 

সাগুফতা শারমীন তানিয়া : 
হ্যাঁ, প্রথম বাক্যের গুরুত্ব আছে বৈকি, আমার কাছে শুধু বাক্যটা নয় শুরুটা জরুরি। 'নীলকন্ঠ পাখির খোঁজে', কিংবা 'অক্ষয় মালবেরি'র শুরুটা খুব যাদুকরি। যদি কেউ পুরো গল্পটা ভেবে ফেলেন, তখন শুরুটা নিয়ে গবেষণার দরকার হয়, যুতসই শুরুয়াত জরুরি তো অবশ্যই। একটু আগেই যেমন বল্লাম, ঢিমে আঁচেও শুরু হতে পারে। গর্ডিমারের একটি উপন্যাসের প্রারম্ভেই পাতার পর পাতা কয়েকটা ডিমের কথা আছে, বিবরণ, খুব চমকপ্রদ কিছু নয়, কিন্তু পাঠককে তিনি প্রস্তুত করে দিচ্ছেন উপন্যাসের ভাব-ভাষা-ভঙ্গির সাথে, ঐটাই সিংহদরজা... ভেবে দেখুন এমিলি ব্রন্টির 'উদারিং হাইটস' শুরু হয়েছে ঝড়ের রাতে একটি অচেনা বাড়িতে শরণ নিতে আসা একটি উঞ্ছ মানুষের জবানিতে, পরে ইলেন ডীন নামের নার্সের জবানিতে, কেন? কারণ উপন্যাসের চরিত্ররা বিশেষ করে হিথক্লীফ এমনি মনুমেন্টাল যে তাকে অপরের চোখ থেকে দেখা চাই, যে কারণে মহাকাব্যে সাধারণত কথক থাকে অন্যে... বাতাবরণ তৈরি করে দিচ্ছেন এমিলি ব্রন্টি। আর আমাকে যদি জিজ্ঞেস করেন, আমি বলবো, আমি কখনো কখনো শুরু করে পরে বদলেছি, মানে শুরুর এক প্যারাগ্রাফ বা এক অধ্যায় জুড়ে দিয়েছি এমন হয়েছে, শেষ অধ্যায় বা অনুচ্ছেদ লিখে ফেলে পরে শুরু করেছি এবং পরে শুরু আর শেষ উভয়ই বদলেছি এমনও হয়েছে। আর পুরো গল্প ভেবে ফেলে শুরু করেছি কমই, সেই মূলসূত্র অপরিবর্তিত রেখেছি আরো কম। কেউ কেউ বলেন, প্রথম বাক্য দৈবী, সেটা আমার কাছে অর্ধসত্য। 


এমদাদ রহমান : 
কোন লেখক আপনাকে প্রভাবিত করেছেন এবং কীভাবে প্রভাবিত করেছেন? 

সাগুফতা শারমীন তানিয়া : 
লেখায় প্রভাববিস্তারের প্রসঙ্গ এলে হেন লেখা নেই যা আমাকে প্রভাবিত করেনি, বাসে যে বনাজী ওষুধের বিজ্ঞাপনের কাগজ পেয়েছি সেটাও কোথাও গিয়ে জমা হয়ে আছে, জমতে জমতে বিক্রিয়াও ঘটিয়েছে। ছোটবেলায় বিভূতিভূষণ খুব প্রিয় ছিলেন, প্রিয় ছিলেন তারাশঙ্কর। তখনকার দিনের বাড়িতে বিয়ে-বৌভাতে উপহার পাওয়া সঞ্চিতা- সঞ্চয়িতা- গল্পগুচ্ছ থাকতো, থাকতো ঠাকুরমার ঝুলি এবং নানান সময়ে কেনা কিরীটি-ব্যোমকেশ কিংবা ফাল্গুনী-আশুতোষের প্রেমের উপন্যাস, এতটা ন্যাড়া হয়ে যায়নি বাসাবাড়িগুলো। ফলে বাড়িতেই ভাগ্যক্রমে কিছু বই পেয়ে গেছিলাম আমি। সেই বয়েসে আমি যা পড়েছি তাতে বৃহত্তর জীবনের দিকে একটা আহ্বান ছিল, মহত্তর আদর্শের দিকে টান, কারণ এইসবের মাধ্যমে পরাধীন জাতিকে একত্র করবার একটা প্রয়াস তো ছিলই, বিশেষতঃ তারাশঙ্করে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ে এসে আমি হকচকিয়ে গেলাম, এ কেমন সাহিত্যিক যার নায়িকাদের গায়ে স্পিরিট ঘষলে ময়লা ওঠে, গায়ে বেলাউজ নাই। তবে 'সরীসৃপ'-এ সেই যে শরতের ফাজিল মেঘের সাথে প্রধান চরিত্রের মনের বিরাগের তুলনা...সে সাঙ্ঘাতিক, সাঙ্ঘাতিক ভিখুর পিঠে করে পাঁচীর কিংবা কুবেরের সাথে কপিলার অনায়াসে চলে যাওয়া, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ে আমি বহুকাল আটকে ছিলাম, আটক আছি এখনো। শুনেছি ওঁকে এখন গরীবের সাহিত্যিক- বামপন্থী গল্পকার ইত্যাদি আকারে দেখছেন পূঁজিপতিরা আর সাহিত্যিকরা সেটা চাটুবৃত্তি করে মানছেন, এটা আমাদের জন্য দুর্ভাগ্যজনক। পাঠক এত বোকা নয় যে 'প্রাগৈতিহাসিক' আর 'ছিনিয়ে খায়নি কেন'র শিল্পগুণের তফাত করতে পারবে না, অথবা আমি পাঠকের বিষয়ে এখনো আশাবাদী। 

গল্পলেখক হিসেবে জহির রায়হান আমার খুব প্রিয়, প্রিয় সোমেন চন্দ, ইলিয়াস, খুবই প্রিয় চেখভ এবং নবোকভ। মুরাকামি আর হা জিন আমার খুব প্রিয় গল্পকার। নাটক পড়তে আমি ভালবাসি, পুরনো কাজকে ভেঙে নতুন করে করা কাজ নিয়ে আমার অধৈর্য্য আছে, তবে কিছু কিছু কাজ আমার অসম্ভব ভাললেগেছিল, পলি টীলের 'আফটার মিসেস রচেস্টার'-এর কথা মনে পড়ছে। লে'ম্যান হিসেবেই বলবো, বিষয়ভিত্তিতে- উপমায়-ভাবভাষায় সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্‌র সবক'টি উপন্যাসের ভেতর 'লালসালু'ই আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয়, ওঁর ছোটগল্পগুলো সে তুলনায় অপ্রাপ্তবয়স্ক; যেমন করে আমার কাছে ইলিয়াসের ছোটগল্প অমিত শক্তিধর, কিন্তু ওঁর নন্দিত উপন্যাসগুলোর একটিও আমাকে টানেনি। 

প্রভাবের কথা যদি বলি, তবে বিমল করের নাম না নিয়ে উপায় নেই। বাংলায় লিখলে তিনি অলঙ্ঘ্য নাম (অন্ততঃ আমার কাছে), রবীন্দ্রনাথের পরেই এত বিচিত্র এত মনোলোকের কাটাকুটিসমেত লেখা গল্প আর কারো আছে বলে জানি না। ওঁর লেখায় একটা স্থায়ী শীতকাল আছে, একটা আপাত-স্থবিরতার ভাব, সেটাকে ধীরে ধীরে কাটিয়ে দিতে থাকে চরিত্রগুলোর সামান্যতম নড়াচড়া, তেহাইয়ের মতো করে তিনটে বিশেষ্য বা বিশেষণের প্রয়োগ...এমন একটা সুগোল সম্পূর্ণতা আছে ওঁর লেখায়, এমন পরিমিতি। অথচ অনেক কথাই ইঙ্গিতে বলা, এমনকি বিবরণেও উল্লেখ নেই, কিন্তু বলা। খুব স্বাভাবিক একটি জীবনচিত্র থেকে ছিপের টান দিয়ে দেখানো অতীতের ভয়ানক কোনো গোপন কথা, কিংবা ভবিষ্যতের বিষাক্ত সম্ভাবনা। ভেবে দেখলে মানিকবাবুর প্রথম গল্প সম্ভবতঃ 'অতসী মামী' আর বিমল করের প্রথম গল্প সম্ভবতঃ 'পিয়ারীলাল বার্জ', অতসী মামীর মেলোড্রামাটিক হাই টোনকে কতটা ছাড়িয়ে গেছেন তিনি ঐ একটি গল্পে। আমি এখনো ওঁর লেখা শিক্ষানবিশ হিসেবেই পড়ি। 


এমদাদ রহমান : 
খোয়াবনামা, চিলেকোঠার সেপাই আপনাকে টানে নি, এর কারণটি কী ভাষা, না কি আঙ্গিক? 

সাগুফতা শারমীন তানিয়া : 
এই নিয়ে পরে কখনো বিস্তারিত লিখব। মহৎ সাহিত্যে ভাষা এবং আঙ্গিক দু'টি বিশ্লিষ্ট এবং বিবাদী বিষয় হয়ে থাকতে পারে না। ইলিয়াসে ভাষা আর আঙ্গিক বিভক্ত নয়, ভাষাই আঙ্গিক অনেকক্ষেত্রে। তিনি কাল্টে পরিণত হয়েছেন বহুদিন আগেই, গল্পকার হিসেবে উনি যেখানে দাঁড়িয়ে সেখানে উনি আমার নমস্য, প্রণম্য। সেখানেই এই প্রসঙ্গের আপাতত ইতি হোক। 

এমদাদ রহমান : 
আপনি কিন্তু হাসান আজিজুল হকের গল্পের উল্লেখ করছেন না! 

সাগুফতা শারমীন তানিয়া : 
দুঃখিত, আপনার এই প্রশ্নটা আমি বুঝতে অপারগ। আমি আরো বহু লেখকের নাম এই পরিসরে উল্লেখ করতে পারিনি যাঁরা আমাকে পাঠক হিসেবে নবীশ হিসেবে অনুপ্রাণিত করেছেন, সাবকনশাসে এসে স্থায়ী খেলা খেলে গেছেন। অনেকে আছেন যাঁদের লেখা আমি আনন্দ করে পড়েছি অথচ আমার লেখায় বা লেখালেখি নিয়ে ভাবনায় ওঁদের কোনো ছাপ নেই। 


এমদাদ রহমান : 
এখন কোন বইগুলো পড়ছেন, খাটের পাশের টেবিলে কোন বইগুলো এনে রেখেছেন পড়বার জন্য? 

সাগুফতা শারমীন তানিয়া : 
খাটের পাশের টেবিলে হাত দিতেই আমি ভয় পাই, বইয়ের আড়ালে রীতিমতো বায়োম তৈরি হয়ে আছে। এখন আছে মার্গারিট অ্যাটউডের 'অন রাইটার্স অ্যান্ড রাইটিং', নাইপলের 'ইন আ ফ্রি স্টেট', আব্দুল মজিদ খানের 'ট্র্যানজিশন অভ বেঙ্গল', মহারানী গায়ত্রী দেবীর 'আ প্রিন্সেস রিমেমবারস', আর পূর্ণেন্দু ভট্টাচার্যের 'সিলেটী রামায়ণ'। আমি খুব গোছানো নই, লেখায় হাত দিই একসাথে তিন-চারটা, পড়াও শুরু করি কয়েকটি একসাথে, অনেকক্ষেত্রেই যেগুলোর বিষয়বস্তু একেবারে আলাদা। জানি এটা ঠিক নয়, কিন্তু আমি এরকমই, বদলাতে পারিনি। কম্পিউটারে ডাউনলোড করে পড়তে সুবিধে আমার জন্য, যেহেতু বাংলা বই কেনাবেচার হাট থেকে বহুদূরে বাস করি। ফলে আজকাল আমার কম্পিউটার হয়ে উঠছে বইয়ের আঢ্য। অল্পবয়সে ফিকশনই পড়তাম, এখন ননফিকশন পড়া হয় বেশি। আর ক্লাসিক পড়ার পিপাসা আমার ভেতর স্থায়ী। 

এমদাদ রহমান : 
এই বইগুলো পড়ার পর কোন বইগুলো পড়বেন বলে ভেবেছেন? 

সাগুফতা শারমীন তানিয়া : 
একসময় বাড়ির সব বই পড়া থাকতে হবে, এমনি ছিল আমার অলিখিত নীতিমালা। সেটার ব্যত্যয় ঘটে গেছে যতবার ফুলটাইম চাকরি করেছি। বাড়ির বই অপঠিত থাকবে এ আমি স্বপ্নেও ভাবতে পারতাম না, এখন বিস্তর বই তেমনি পড়ে আছে ঘরে, নিজের এবং লাইব্রেরি থেকে আনা। সেগুলো শেষ করতে হবে। যে-দেশে আমি থাকি, ভাগ্যিস সেদেশের পাড়ার লাইব্রেরিতেও থরে-বিথরে বই, ইংরেজ জাতটাই নথি-প্রিয় জাত। এজন্য এদের লাইব্রেরি এবং মিউজিয়াম এত ঋদ্ধ। হাতের বইগুলো পড়া হয়ে গেলে সতের শতকের ওপর কিছু বই এনে রেখেছি, সেগুলো পড়ব। 


এমদাদ রহমান : 
সর্বশেষ কোন শ্রেষ্ঠ বইটি আপনি পড়েছেন? 

সাগুফতা শারমীন তানিয়া : 
‘সর্বশেষ'কে মনে পড়া মুশকিল, আর 'শ্রেষ্ঠ' শব্দটা সাহিত্যে এবং আমার মনে বালিয়াড়ির ধ্বসে পড়ার মতো। ক'দিন আগে মনীন্দ্র গুপ্ত'র 'অক্ষয় মালবেরি' শেষ করলাম, শুরু থেকে একেবারে আঠায় সেঁটে রাখছিলেন উনি, ফৌজে যোগ দেবার আগ অব্দি লেখাটির ভাষা- চাহনি- মুখের ভাব একেবারে আলাদা, ফৌজি হবার পরে যেন গা থেকে গহনা তো বটেই কাপড়চোপড় ছালবাকল সব উঠে গেল, ভাবছিলাম সেটাই স্বাভাবিক কী না। এ-রকম একটা ফিলিং আমার অতীনবাবুর 'নীলকন্ঠ পাখির খোঁজে' পড়বার সময়ও হয়েছিল, শুরুর ঐশ্বরিক দৃষ্টিকোণ পরের দিকে একেবারে হারিয়ে গেল, লেখক ব্যক্তি হয়ে উঠলেন এবং জাতপরিচয়ে সব ডুবে গেল। স্টিভেন ফ্রাইয়ের 'হিরোজ' এবং 'মিথস' খুব ভাললেগেছে, ওঁর সময়ে আমরা বেঁচে আছি সেটাই কত না! শেইমাস হিনির কবিতা পড়ছিলাম ক'দিন আগে, বুঁদ হয়ে ছিলাম। শিবনাথ শাস্ত্রীর আত্মকথা পড়েছি খুব ভালবেসে। আমি বইয়ের বেলায় পলিথিস্টিক, আমার অনেক পূজ্য দেবদেবী। 

এমদাদ রহমান : 
আপনার প্রতিদিনকার পাঠের অভিজ্ঞতার কথা বলুন, কখন কোথায়, কী এবং কীভাবে পড়েন? 

সাগুফতা শারমীন তানিয়া : 
আমি সুযোগ পেলেই পড়ি, সুযোগ না পেলে হাতের কাজ ফেলে দিয়ে পড়ি এবং ভুগি। অল্পবয়েসে কোন আরব মহাত্মার জীবনীতে পড়েছিলাম, তিনি বিয়ের রাতে আর পিতার মৃত্যুর রাতে বই-হীন ছিলেন, খুব পছন্দ হয়েছিল সেই কথা। পরীক্ষার আগে আমার এই ‘আউটবই’ পড়া বেড়ে যেত। লেখালেখিও বেড়ে যেত। আম্মার বকাবকি এমনকি বইপত্র ছুঁড়ে ফেলা বা তালা দিয়ে রাখা...এইসব অনেক হয়েছে। আমার নানা এইসব শাসন দেখতো আর আইজ্যাক ওয়াটসের রাইম বলতো, 'ও ফাদার ফাদার, পিটি টেইক/ অ্যান্ড আই উইল নো মোর ভার্সেস মেইক', ছোট্ট আইজ্যাক ওয়াটস ছড়া বাঁধবার জন্য মার খেতে খেতে এই ছড়া বলছেন...অর্থাৎ যার যা প্রবৃত্তি সে তা করবেই। পরে অবশ্য আম্মা বুঝে নিয়েছিল যে পাঠ্যবইয়ের সাথে ঐ বইগুলোই সুষম আহার নিশ্চিত করবে, এমনকী পরীক্ষার আগেও। 

বই পড়বার এবং বই কিনবার অফুরান সময় ও অর্থের যোগান দেয়া যাবে, তেমন জীবন স্বপ্নের। অন্ততঃ মধ্যবিত্তের সন্তানের জন্য। একটা পর্যায়ে আমার লেখা-পড়ার জীবনকে পাশে রেখে জীবিকা-নির্বাহের দিকে ঝুঁকে পড়তে হয়েছে, কিন্তু সেই বিচ্ছেদ আমি বেশিদিন সইতে পারিনি। চাকরি ছেড়ে দিয়েছি লেখাপড়ার সময় নেই বলে, অথচ লেখালেখি থেকে অর্থসমাগম হচ্ছে তাও নয়...এমন হয়েছে। অন্তরালে আমি নিজেকে স্তোক দিয়েছি, গিনিপিগকে যেমন রাত্রিবেলা নিজের বাহ্য আহার করতে না দিলে সে মরে যায়, আমার পড়ালেখার ইচ্ছাটা তেমন। অতএব, বহু আর্থসামাজিক ক্লেশ স্বীকার করে, বহু উচ্চবাচ্যে কর্ণপাত না করে আমি এটা চালিয়ে গেছি। 

সন্তানজন্মের পরে রাতে বাচ্চা ঘুমোলে আমি মলাটে ক্লিপ-অন লাইট জ্বালিয়ে পড়তাম, সেটাই ছিল সবচেয়ে বৈরী সময়ে বই পড়া। চাকরি করার সময়টাতে বইয়ে মগ্ন হবার সময় অপ্রতুল, তখন ট্রেনে যাতায়াতের সময়টাতে পড়ি। চাকরি না থাকলে আরো ভাল, দিনরাত পড়ি। যে সুরারোপ করবে তাকে সঙ্গীত শুনতেই হবে, বুভুক্ষুর মতো করে গিলতে হবে গান...সাহিত্যের বেলায়ও তাই। পড়তেই হয়। কখনো বিশেষ চরিত্র নির্মাণ করতে হলে নির্দিষ্ট বিষয়েও পড়াশোনার দরকার পড়ে। এমনিসব কারণে ম্যাটেরিয়া মেডিকা পড়েছি, চরকসংহিতা পড়েছি, কাসাসুল আম্বিয়া পড়েছি... এখন পড়ছি রিচার্ড বেন্টা লে'র 'ম্যাডনেস এক্সপ্লেইন্ড', কারণ মনোরোগী নিয়ে লিখছি। এই প্রস্তুত হয়ে লেখার প্রক্রিয়াটা আমাকে আনন্দ দেয়, তবে অ্যাটউড একবার বলেছিলেন, এতে তথ্যে চাপা পড়ে যাবার ভয়ও আছে, প্রচুর- অগণিত তথ্য কালেক্ট করতে নেই। তেমন চাপাও পড়েছি দুএকবার। কাজটা এগোয়নি, কিন্তু প্রচুর পথখরচা জমেছে হাতে। রাত জাগতে এমনিতে আমার কষ্ট হয়, পরে নির্ঘুম থাকতে হয় এবং পরের দিনটা ব্যর্থ হয়। ফলে আমি পড়ি ভোরে, আজীবন ভোরে পড়াশোনা করেছি। লিখিও ভোরে সাধারণত। 


এমদাদ রহমান : 
কোন বইটি আপনার খুব প্রিয় কিন্তু অনেকেই তার কথা জানে না ।

সাগুফতা শারমীন তানিয়া : 
ম্যারিলিন হেওয়ার্ড মিলজের 'ক্লথ গার্ল'। নামে যা আছে তাই, যারা কাটা কাপড়ের জামা বানিয়ে পরে তাদের গল্প, এই ছাপা কাপড় বা ছিট কাপড় কেন ওরা পরে, এর সাথে কী করে তৈরি পোশাক কিনে পরবার সঙ্গতি জড়ানো সেই গল্পে লেখক আসেন ধীরে ধীরে। উপনিবেশের মানুষদের নিয়ে গল্প, তারা তাদের প্রভুদের জীবনে কী রূপ নিয়ে আসে, কেমন করে সমাজে একের পর এক ঔপনিবেশিকতার পরত থাকে আর তার সর্বনিম্নে থাকে দুনিয়ার সর্বত্র যে প্রকৃতই মাইনরিটি, সত্যিকারের শোষিত, নারী। বার বছর আগে পড়েছিলাম, এখনো স্মৃতিতে উজ্জ্বল। প্রায় কাছাকাছি সময়ে পড়েছিলাম সুজান ফ্লেচারের 'ইভ গ্রিন', এত ভাল লেগেছিল যে আমি সেই বইটির অনুবাদও করেছি বাংলায়, মনে হয়েছে এই উপন্যাস আমার ভাষায় থেকে যাওয়া উচিত। ইভ গ্রিন স্মৃতির আড়ালে চাপা পড়া ভয়ানক দুর্ঘটনার গল্প, কিন্তু আসলে ভালবাসার গল্প। আলেস্যান্দর বেরিকোর 'সিল্ক', তারপর লুকম্যানের একটি বই আছে যতিচিহ্নের ওপর, সেটা আমার খুব প্রিয় বই। গদ্যে যতিচিহ্ন যে খেলাকে উপস্থিত করে, তা নিয়ে আমরা ভাবি কম, অথচ সেটা নেপথ্য সঙ্গীতের মতো, তাতে কত জাদুই লুকিয়ে আছে। শিক্ষাবিদ গাই ক্ল্যাক্সটনের একখানা বই তন্নতন্ন করে পড়েছি, তার নাম 'হোয়াটজ দ্য পয়েন্ট অভ স্কুল', খুব ভাল লেগেছে। কিছু কেজো বই আছে, সেগুলি গবেষণায় জরুরি অথচ রীতিমতো সাহিত্য। 


এমদাদ রহমান : 
কোন বইটি জীবনে একবার হলেও প্রত্যেকের পড়া উচিত? 

সাগুফতা শারমীন তানিয়া : 
ঔচিত্যবোধ থেকে আসলে কিছুই পড়া উচিত নয় বলে আমি মনে করি। মনের আনন্দে, আন্তরিক কৌতূহলে পড়া উচিত। গৌরকিশোর ঘোষকে, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসকে কিংবা জয়া মিত্রকে অবশ্যই পড়া উচিৎ, কিন্তু এমন তো আরো অজস্র- অসংখ্য নাম রয়েছে, নামের সাথে কীর্তি রয়েছে ...আসলে এভাবে আমি বলতে পারি না। শৈশবে পড়া গালিনা দেমিকিনার 'বনের গান'ও পড়া উচিৎ বলে মনে হয়েছে কতবার। আর যা এমন অলঙ্ঘ্য সুন্দর, তা বারবার পড়া উচিত, একবার নয়। 

যেখানে ঔচিত্য নিয়ে কথা হতে পারে, সেখানকার কথা নিয়ে বরং বলা যেতে পারে। আমি মনে করি সুসাহিত্য আমাদের অবশ্যপাঠ্য হওয়া উচিৎ শিক্ষাবোর্ডের বইগুলোতে। বাংলা এবং ইংরেজি পাঠ্যপুস্তকে বিশ্বের এই অবিরল আনন্দের খোঁজ দিয়ে দিতে হবে, আমরা যদি মননশীল সংবেদনশীল সুস্থ মানুষের সমাজ চাই, যে সমাজ জীবন এবং প্রকৃতির প্রতি দয়ালু, যদি চাই আমরা একে অপরের কাছে আমাদের বৈচিত্র নিয়েই গ্রহণযোগ্য হবো, তাহলে ছাত্রদের সাহিত্যপাঠের কোনো বিকল্প নেই। নেই যে সেটা বাকি বিশ্বে সমাদৃত সত্য, একারণেই বিজ্ঞানের ছাত্রকেও অবশ্যই একটা পর্যায় অব্দি সাহিত্য পড়তে হয়। সুন্দরের আরাধনার অভাব বড় সাংঘাতিক। 

আমরা ছেলেমেয়েদের সাহিত্যের আনন্দ নিতে শেখাই না, কারণ আমাদের শিক্ষকরাও সেই আনন্দ নিয়ে বড় হননি। বিজ্ঞানের শিক্ষক বিজ্ঞান ভাল জানেন, অথচ সাহিত্যের শিক্ষক সাহিত্যকে পাগলের মতো ভালবাসেন না, এও সম্ভব! শিক্ষক সাহিত্যের অমূল্য ধন উপন্যাসগুলো হাতে করে- বগলে করে আনেন না ক্লাসে, ছাত্রদের মনে সাহিত্যপাঠের আনন্দ চারিয়ে দেবার জন্য যে বীজতলা ওঁর তৈরি করা উচিত, সেটা ওঁর নিজের ভেতরেই নেই। সাহিত্য সবাই পড়াতে জানে না, অথচ দেখা যায় যে আর কিছুই পড়াতে পারবে না সে গিয়ে সাহিত্য পড়ায়, কারণ সে সাধারণভাবে ভাষাটা জানে আর পড়ে-লেখে, মুদিদোকানে গিয়ে দরদাম করে, কোনো এককালে প্রেমপত্রে কবিতাও লেখে, নিদেনপক্ষে কোনোদিন ইস্কুলে বিতর্কও করেছিল, তাই সে পড়ায়! এর দীর্ঘস্থায়ী কুপ্রভাব তো সমাজে পড়বেই। সাহিত্যে মন বদলায়, নিয়মিত শরীরচর্চায় যেমন শরীর বদলায়, সমর্থ হয়, তেমনি। মনের দিক থেকে শক্তসমর্থ মানুষ চিন্তাশীল মানুষ সমাজে কম থাকলে প্রপাগান্ডা ছড়ানো সহজ হবে, সমাজে অন্যায় আচরণ স্বাভাবিক এবং শোভন অভিব্যক্তি হাস্যকর হবে, অশিক্ষিতের আস্ফালন বাড়বে, সর্বত্র দুষ্টের জয় হবে। 


এমদাদ রহমান : 
ঔপন্যাসিক, গল্পকার, নাট্যকার, সমালোচক এবং কবিদের মধ্যে এখনও লিখছেন এমন কাকে আপনি সবচেয়ে বেশি শ্রদ্ধা করেন? 

সাগুফতা শারমীন তানিয়া : 
জয়া মিত্র এবং বাণী বসুর উপন্যাস, অবন বসু এবং স্বপ্নময় চক্রবর্তীর গল্প, কেতকী কুশারি ডাইসন এবং নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ির সমালোচনামূলক প্রবন্ধ আমার অত্যন্ত প্রিয়। এঁদের লেখা যাঁরা পড়েছেন, তাঁরা অনায়াসে জানেন- কেন প্রিয়। মুরাকামির 'নরওয়েজিয়ান উড'-এ একটি চরিত্র বলতো, 'ত্রিশ বছর আগে মরে হেজে যায়নি এমন লেখকের লেখা আমি পড়ি না', মনে মনে হয়তো আমিও তেমনি। মুখে স্বীকার করবো না। মুখে হয়তো বলবো, ক্ল্যাসিক পড়েই শেষ করতে পারলাম না, কনটেম্পরারিতে আসবো কবে, ইত্যাদি...যদিও তা মিথ্যে নয়। প্যাট বার্কার এবং মার্গারিট অ্যাটউডের কথা আমি বারবার বলি, এড়াতে পারি না এত ভাললাগার ওঁরা। 

মূল্যবোধের দিক থেকে অনেকের সাথে ব্যবধান থাকবার পরেও, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় আমাদের ভাষায় অসম্ভব শক্তিমান সর্বজনপূজ্যতে স্টোরিটেলার, এমনকি সামান্য প্লট বা প্লট না থাকলেও যাঁর লেখা টেনে নিয়ে যাবে, হারুকি মুরাকামিও তাই। 

নবনীতা দেবসেন আর লিখবেন না, সেটা মন এখনো মানতে পারে না। গবেষক আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়ার কাজের কথাও বলতে চাই, যদিও তিনি আর বেঁচে নেই। বেঁচে নেই আমার প্রিয় ওয়ার্ডস্মিথ সৈয়দ শামসুল হক। শাহীন আখতার আপার 'ময়ূর সিংহাসন' পড়ছি, খুব খাটুনির খুব ভালবেসে করা কাজ। রাশিদার (রাশিদা সুলতানা) 'শাদা বেড়ালেরা'-তে একটা অদ্ভূত নিঃসীম সময়শূন্যতার বোধ আছে, সেটা আমার খুব ভাল লেগেছিল। কিছু কিছু গল্পে আমি আটকে যাই, অপার সৌন্দর্য সেগুলোর নির্মাণে, শাহাদুজ্জামানের 'লবঙ্গের বঙ্গ ফেলিয়া', সুমন রহমানের 'ডুমরি' কিংবা 'নিরপরাধ ঘুম', অদিতি ফাল্গুনীর একটি গল্প ছিল বামনদের ঘরে বিয়ে হওয়া এবং জন্মানো মেয়ে নিয়ে। এই মুহূর্তে নামটা মনে করতে পারছি না অথচ গল্পটা আমার সারাজীবনে পড়া প্রিয় গল্পগুলোর একটি, এত সুন্দর সব গল্প বাংলায় আরো অনেক হওয়া উচিৎ। 

এমদাদ রহমান : 
লেখক হিসেবে তৈরি হতে কোন বইগুলো আপনাকে শিল্পের পথ চিনিয়েছে, কীভাবে চিনিয়েছে? 

সাগুফতা শারমীন তানিয়া : 
 বই ছেনির আঘাত দিয়ে একটি মন তৈরি করে কি না আমার জানা নেই, আমার মন তেমন নয় বলেই জানি। সামান্য-অসামান্য অজস্র বইয়ের আঘাতে উড়ে যেতে যেতে খরখরে হয়ে আছে মন। কোথা থেকে শুরু করি। শুরুর কথা যদি বলি, রবীন্দ্রনাথের 'গল্পগুচ্ছ'র কোনো তুলনা নেই, লেখা শেখানো- জগত দেখানো- ভাবানো- শোক করানো- আনন্দে উদ্বেল করা এর সবই করেছেন তিনি, এমন করে যে সেটা ডিঙিয়ে আর কিছু সহসা চোখে পড়ে না। অল্পবয়সে পড়া অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'বুড়ো আংলা' আর 'ক্ষীরের পুতুল', বিভূতিভূষণের ছোটগল্প 'এরিকা পাম' আর 'পুঁইমাচা', উপন্যাস 'উর্মিমুখর', গজেন্দ্র মিত্রর ট্রিলজি এবং 'পাঞ্চজন্য', তারাশঙ্করের 'ডাইনি' বা 'তারিণী মাঝি'-এসবের কথা বলতেই হবে। বুদ্ধদেব বসু করেছেন বারবার, ওঁর প্রভাব এড়ানোর উপায় নেই, দরকারও আছে কী? শৈশবের একখানা সেদ্ধ ডিমকেও তিনি যেভাবে উপমিত করেছেন, যেভাবে শব্দের অন্তরালের হঠাৎ আলোর ঝলকানি বের করে এনেছেন, সেটা থেকে বারবার শিখি। কবিদের গদ্য আমাকে অত্যন্ত আলোড়িত করেছে, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী করেছেন, শঙ্খ ঘোষ, উৎপলকুমার বসু, জয় গোস্বামী করেছেন... জ্যামিতির মজা আছে কবিদের গদ্যে, অসম্ভব পরিমিতি, নির্ভুল লক্ষ্য, শব্দগুলো যেন অর্জুনের পাখি। 

আমার ভাষার লেখক নন কিন্তু ভাষার ব্যবধান হটিয়ে দিয়েছেন চিন্তার ঐক্যে আমার কাছে এমন লেখক মার্গারিট মিচেল, অরহান পামুক, মাইকেল অনডাৎজে। স্টিভেন ফ্রাইয়ের লেখা ওঁর অপরিমেয় জ্ঞানের মতোই বিস্তীর্ণ, সরস, উজ্জ্বল। মারিনা লেভিচকা, প্যাট বার্কার... এই কাতারের মেয়েদের শক্তি অসামান্য রম্যরস, যে রস না থাকলে গদ্য এমন এক অপ্রবেশ্যতা পায়, যা ঠেলে পাঠকে-লেখকে মিশ খাওয়া মুশকিল। এঁদের একটি সাধারণ গুণ যদি সরল করে বলতে চাই, তা হচ্ছে গভীরভাবে স্বাধীন কলমের অধিকার, প্রাকৃতিক গতিতে তরতরিয়ে চলে, যেদিক দিয়ে চলে পুরাতন কালির মতো কাগজ পুড়িয়ে উল্কি এঁকে যায় যেন। 

এমদাদ রহমান : 
কীভাবে আপনি আপনার বইগুলোকে গুছিয়ে রাখেন? 

সাগুফতা শারমীন তানিয়া : 
আগেই বলে রেখেছি আমি গোছানো নই, বই এবং কাগজ এত অগোছালোভাবে থাকে আমার ঘরে যে লোকে পা ফেলতে দ্বিধা করে, নির্দ্বিধ হবার পরেও পা ফেলবার যথেষ্ট জায়গা পায় না, আমিও লজ্জায় পড়ি। অল্প বয়সে আমি সমস্ত টেক্সট বুক বোর্ডের বই জমিয়ে রাখতাম, একদিন টেক্সটবুক নিয়ে কাজ করবো, স্বপ্ন দেখতাম। অগোছালো হবার কারণে সবই হারিয়েছি। 

এমনিতে বই গোছাই লেখকের নাম ধরে পরপর, একই জনরার লেখক হিসেবে গোছাই কখনো কিন্তু গুলিয়ে ফেলি। আর সবকিছুর মতোই এক্ষেত্রে আমি অনুসরণের অযোগ্য। যাঁরা গুছিয়ে সাহিত্যযাপন করেন, বুদ্ধদেব বসুর ভাষায় যাঁদের প্রতিভার 'ঘরনীপনা' আছে, তাঁদের প্রতি আমার ঈর্ষা আছে। মাঝে মাঝে ভাবতে চাই, আয়নার মতো ফটফটে পরিষ্কার কোনো ঘরে বসে লিখছি, কিন্তু ওরকম পরিবেশে আমি স্বচ্ছন্দবোধ করবো না বলেই আমার ধারণা। 

এমদাদ রহমান : 
সাম্প্রতিক কোন ক্ল্যাসিক উপন্যাসটি আপনি পড়েছেন? 

সাগুফতা শারমীন তানিয়া : 
সম্প্রতি কোন ক্ল্যাসিক পড়েছি? নাকি সাম্প্রতিক কোন লেখাকে ক্ল্যাসিক মনে হয়েছে? প্রশ্নটা ধরতে পারলাম না। সম্প্রতি আরেকবার পড়ছি ধনগোপাল মুখোপাধ্যায়ের 'চিত্রগ্রীব'। 


এমদাদ রহমান : 
না, পড়ে সাম্প্রতিক কোন বইকে ক্ল্যাসিক মনে হয়েছে, আমাদের প্রশ্ন সেটা নয়, বিশ্বসাহিত্যে ইতিমধ্যে ক্ল্যাসিকের মর্যাদা পেয়েছে, এমন কোনও বই পড়া হয়েছে কি না... 


সাগুফতা শারমীন তানিয়া : 
প্যাট বার্কারের 'দ্য সাইলেন্স অভ দ্য গার্লস', মিথের ওপর দাঁড়িয়ে চেনা গল্পকেই এমন অচেনা দৃষ্টিকোণ থেকে লেখা... আমার মনে হয়েছে এটি পাঠকপ্রিয় তো হয়েছেই, ক্ল্যাসিকের মর্যাদা এর পাওয়ার কথা। পড়তে পড়তে আমার মনে হলো, একলব্য যদি তার কিশোর চোখে দেখা মহাভারতের বিবরণ দেয় আর সেখান থেকে রাক্ষসসমাজ আর মানুষের ইতিহাস অব্দি চলে যাওয়া যায়, কিংবা ময়মুনা যদি বলে বিষাদসিন্ধুর গল্প, আরেকভাবে আর সেখান থেকে তাকানো যায় সেকালের সমাজে নারীর দিকে, ভাবা যায়! 


এমদাদ রহমান : 
আপনি যখন একটি বইয়ের কাজ করছেন, লিখছেন, সম্পাদনা করছেন, কাটাকাটি করছেন, সেই সময়টায় আপনি কোন ধরণের লেখাপত্র পড়েন? আবার ঠিক এরকম পরিস্থিতিতে কী ধরণের লেখা এড়িয়ে চলেন? 

সাগুফতা শারমীন তানিয়া : 
যখন আমি বিশেষ একটি বিষয়ে লিখি, তখন সেটা নিয়ে অনেকটা পড়বার চেষ্টা করি। যেহেতু প্রবাসে থাকি, পিডিএফ আর বইই ভরসা, স্মৃতি ভরসা, নৈলে আর্কাইভ খুঁজে দেখা যেত, যাওয়া যেত সেইসব জনপদে তেমন তেমন মানুষের কাছে। যখন বাংলাদেশে যাই, সে কাজগুলির কিছুটা করে আসি, তবে সেটা সাগুয়্যারো ক্যাকটাসের পানি জমানোর মতো কাজ, খরা পাড়ি দেবার রসদ। 

তবে যখন যা লিখি, তার বাইরেও অন্যান্য বিষয় পড়ি, কখন কোথায় কী জুটবে কে জানে, কোন চিন্তা মাথায় আসবে তাই বা কে জানে। যা এড়িয়ে চলা উচিত তা হচ্ছে অতিরিক্ত ইনফরমেশন বা ডাটা, সেটা লেখার গতিকে ভারাতুর করে দেয়, কিন্তু সেটা আমার হয়ই। উচিত আর কবে মেনেছি! এড়িয়ে চলতে চেষ্টা করি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট। বিমর্ষতার কালে এড়িয়ে চলি সিলভিয়া প্লাথকে, ডোরা ক্যারিংটনকে। 


এমদাদ রহমান : 
সম্প্রতি পঠিত বইগুলো থেকে এমন কোনও বিস্ময়কর ব্যাপার কি জেনেছেন যা আপনার লেখক-জীবনকে ঋদ্ধ করেছে? 

সাগুফতা শারমীন তানিয়া : 
অনেকদিনের সাহস জড়ো করে অবশেষে ড. নীলিমা ইব্রাহীমের 'আমি বীরাঙ্গনা বলছি' পড়েছি, শেষে ওঁর একটি সাক্ষাৎকার রয়েছে যেখানে উনি বলছেন যে ক'জন বীরাঙ্গনার হদিশ ওঁরা পেয়েছিলেন তাঁরা প্রত্যেকে প্রথম নিজের গ্রামের লোকের হাতে ধর্ষিত হয়েছে, পরে গ্রামের লোকজনই ওঁদের আর্মির হাতে তুলে দিয়েছে। এই মর্মান্তিক তথ্যে আমার লেখক-জীবন ঋদ্ধ হয়েছে কি না জানি না, আমার জীবন এবং বাঙালি হিসেবে আমার জীবন প্রবলভাবে বিচলিত হয়েছে, শোকে- ঘৃণায় ম্যুহমান হয়েছে। 

আর আমি ঘুরেফিরে বিভূতিভূষণে ফেরত আসি, সেটা আগেও বলেছি, 'উর্মিমুখর' পড়ছিলাম। একটা লেখা লিখছি, নাম আপাততঃ দিয়ে রেখেছি 'শুধু পটে লিখা', সেখানে যা লিখেছি তাতে এখানে এই প্রশ্নের উত্তর হতে পারে। 'সেই প্রায়ান্ধকার বাড়িতে আমি সিংভূমের জ্যোৎস্না রাত দেখেছি, বস্তারের জঙ্গলে চাঁদডোবা অন্ধকার দেখেছি, তামাপাহাড়ের অধিত্যকায় গনগনে জোনাকির জ্বলা-নেভা দেখেছি। বা ভেবেছি দেখেছি। বিভূতিবাবুর হাত ধরে। ভেবেছি সারা বাড়িতে একখানা ছেঁড়া মাদুর থাকলেও 'পথের পাঁচালি' লেখার ঐশ্বর্য থাকে মানুষের। শিখেছি সাঁইবাবলার বন- তিতপল্লার ঝোপ উজাড় করে পটোল ক্ষেত তৈরি করতে করতে যারা ভাবে চারখানা পটোলে একখানা গেরস্তের তরকারি হয়, তারা ডেস্ট্রয়ারজ অভ বিউটি, সৌন্দর্য্যের হন্তারক। ঐসব তাবত হাবিজাবি কথা আমাদের বইই শেখায়। শূন্যগর্ভ সব বিশ্বাস, পৃথিবীতে, মানুষের 'পরে। 


এমদাদ রহমান : 
আপনি কোন ধরণের লেখা পড়তে আগ্রহ বোধ করেন, আর কোন ধরণটি এড়িয়ে চলেন? 

সাগুফতা শারমীন তানিয়া : 
লেখায় বুদ্ধির খেলা আমি ভালবাসি, প্লট তো বটেই ভাষাও বুদ্ধির একটি নিদর্শন, তা এইসব আমাকে টানে। বুদ্ধির ভান আমাকে বিরক্ত করে। ভাষায় ব্যাকরণে আমি যেখানে খামতি দেখি, সেখানে আর আমি এগোতে পারি না। নিজের ভুল দেখলেও বিরক্তিতে-বিতৃষ্ণায় বুক ভরে ওঠে। আমি বিশ্বাস করি, সাহিত্যিককে বৈয়াকরণের চেয়ে ভাল ব্যাকরণ জানতে হবে, কারণ তিনি জেনে ভাঙবেন, তাঁকে ভালবাসতে হবে ভাষাকে, 'আর্ষপ্রয়োগ' বলে বা 'ওয়ার্ডস্মিথিয়িং' বলে ভুলটাকে চালিয়ে দেয়ার চালিয়াতি আমার সয় না। 

আমি সজ্ঞানে কোনো ধরণ এড়িয়ে চলি না, শৈশবে ভূতের গল্প এড়িয়ে চলতাম। তবে কোনো লেখা আমাকে না টানলে অবচেতনেই একটা বিকর্ষণ কাজ করে। একটু আগেই বল্লাম, বিষাদাক্রান্ত সময়ে বিষণ্ন লেখকদের শিল্পীদের এড়িয়ে চলি, যদিও এটা মোটাদাগে নেয়া চলবে না, সাহিত্যে অনেক বিলাপ বা ল্যামেন্টেশনও আছে যা বিশুদ্ধ আনন্দ দেয়। যেমন কিং লীয়রের বিলাপ। 

আমাদের কিছু অভ্যাস রয়েছে জাত হিসেবে, আমরা ব্যক্তিগত জীবনে এবং সাহিত্যে 'নস্যাৎ করে দেবার সংস্কৃতি' লালন করি, সুইপিং কমেন্টস করি, আমাদের ক্ল্যাসিকে-শিক্ষিত এবং গর্বিত না হয়ে সামনের দিকে যাওয়ার স্বপ্ন দেখি। এমন প্রবণতা যেখানে দেখি, সেখানে এগোতে পারি না। পপুলার সাহিত্য পড়ে আমরা ভাবি রবীন্দ্রনাথ হচ্ছে 'সখী গেল গেল ধরো ধরো', রবীন্দ্রনাথের জীবন নিয়ে 'বৌদি-সাহিত্য' পড়ে ভাবি 'বাহ, ইতিহাস জানা গেল, রবীন্দ্রচর্চাও হলো।' এমন অবিমৃষ্যকারিতা দিয়ে আমাদের পঠন-ইতিহাস ঠাসা। শেক্সপীয়রকে নিয়ে- ভেঙে এখানে এখনো বহু কাজ হয়, হয়েছে, হবে; কিন্তু কেউ দাঁড়িয়ে বলুক দেখি শেক্সপীয়রকে নস্যাৎ করে এমন অর্বাচীনের মতো কথা, লোকের কাছে সে শুধু হাস্যাস্পদই হবে। নিজের ক্ল্যাসিককে কাঁচকলা ভেবে কেউ বড় হতে পারে না, লেখক-পাঠক পরম্পরা গড়তে পারে না। 

এমদাদ রহমান : 
আপনার জীবনে উপহার হিসেবে পাওয়া শ্রেষ্ঠ বই কোনটি, যা লেখক হতে কোনও না কোনও ভাবে আপনাকে প্রস্তুত করেছে? 

সাগুফতা শারমীন তানিয়া : 
আম্মা এনে দিয়েছিল ছোট্টবেলায় 'দ্য রেলওয়ে চিলড্রেন' আর 'লিটল উইমেন'; 'গ্রেট স্টোরিজ ইন ইজি ইংলিশ' সিরিজের সচিত্র বইগুলোর কথা মনে পড়ছে, পাতায় পাতায় অসামান্য ফিগার ড্রয়িং। লীলা মজুমদারের 'নতুন ছেলে নটবর', বিভূতিবাবুর 'বাঘের মন্তর', সত্যজিৎ রায়ের 'তারিণীখুড়োর কীর্তিকলাপ'- এইসব, শুধু পড়তাম তাই নয়, ড্রয়িং যত থাকতো সবই মকশো করতাম। প্রতিটা আনন্দমেলা পূজাবার্ষিকীর জন্য আমি অপেক্ষা করতাম বিপুল আগ্রহে, আম্মা নিউমার্কেট গিয়ে নিয়ে আসতো, আমার যন্ত্রণায় পরীক্ষার আগ অব্দি আলমারিতে তালা দিয়ে রাখতো। ইস্কুলের একজনের কথা না বললে আমার এ-প্রশ্নের উত্তর অসম্পূর্ণ থাকবে। তিনি সিস্টার মেরী, যাকে বলতাম 'স্লান্টিং হ্যান্ডরাইটিং' আর এখানে যেটাকে বলে 'জয়েন্ড হ্যান্ডরাইটিং', সেটা আমি ওঁর চেয়ে সুন্দর হাতের লেখায় কোত্থাও দেখিনি, ক্যালিগ্রাফিতেও নয়। খুব কড়া শ্বেতাঙ্গ সন্ন্যাসিনী, এমনিতে হাসিখুশি। প্রাইমারির শেষ ধাপে এসে আমার ভিতর কিছু উদ্বেগের কিছু অশান্তির লক্ষণ দেখা দিল, শৈশবে অত কড়াকড়ির বাজে ফলাফল... একদিন সিস্টার মেরী আমাকে ডেকে নিয়ে গেলেন আমাদের স্কুল লাইব্রেরিতে। আমাকে উপহার দিলেন একটি নেপালি রূপকথার বই, জোয়ানা স্পাইরির 'হাইডি' আর একটা নোটবুক, নোটবুকে আমি প্রতিদিন প্রিয় পঠনের খানিকটা লিখে রাখব। 

পরিণত বয়সে সিংহভাগ বই আমি নিজেই নিজেকে উপহার দিয়েছি, তাই সেসব বইয়ের কথা এখানে এলো না। রুডইয়ার্ড কিপলিঙের বাবা জন লকউড কিপলিংকে নিয়ে লেখা একটি সচিত্র বই উপহার পেয়েছিলাম, সেই বইটা আমার খুব প্রিয়। গমব্রিখের আর্ট হিস্ট্রি আমাদের পাঠ্য ছিল, তা বাদে উনি হিস্ট্রিও লিখেছেন, অপূর্ব সেই ঝরঝর মুখর গদ্য। অত সবেগে উচ্ছলভাবে ইতিহাস লেখা যায়, কে জানতো! 

এমদাদ রহমান : 
ছোটবেলায় কেমন বই পড়তেন? সেই সময়ে পড়া কোন কোন বই, তাদের লেখক আজও মুগ্ধ করে রেখেছে? 

সাগুফতা শারমীন তানিয়া : 
আমাদের বাড়িটা আমার ছোটবেলার চোখে ছিল একটা রুখু সেন্ট হেলেনা দ্বীপ, লোকে এতে দ্বীপান্তর দিতে পারে। সেখানে একমাত্র নিস্তার ছিল বই। ভাগ্যিস ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত কিছু বই ছিল সে বাড়িতে, এবং নানাবাড়িতে। ঐ যা যা থাকে, নবকল্লোল পত্রিকায় সিনেমার তারকাদের খবর, আকবর হোসেনের 'ঢেউ জাগে' বা 'কী পাইনি', ফাল্গুনী'র 'চিতা বহ্নিমান', কৃষণ চন্দরের 'গাদ্দার', তারাশঙ্করের 'মনের মুকুরে', সৈয়দ হকের অনূদিত 'শ্রাবণ রাজা'। সেখানে মেঝেয় গড়িয়ে আমি পড়েছি বা-থিন আর মা-শোয়ের প্রেমগাঁথা, 'দেবদাস' পড়ে কী কান্নাই না কেঁদেছি, ব্রন্টি সিস্টারস পড়ে ভেবেছি 'একদিন আমিও'। নির্ভেজাল আনন্দে পড়েছি তারাশঙ্কর-মানিক-বিভূতি-আশাপূর্ণা আর পড়েছি আর্থার কোনান ডয়েল, উডহাউজ, থ্যাকারে কিংবা ডি এইচ লরেন্স... বলতে দ্বিধা নেই সানন্দে পড়েছি ঔষধালয়ের বিজ্ঞাপন- ক্যানভাসারের হ্যান্ডবিল- ঠোঙা খুলে ভাঁজ খুলে পড়েছি ঠোঙা একেবারে কুম্ভকর্ণের খিদেয়। যা ছোটবেলায় পড়েছি তা নিয়ে একরকম স্থায়ী মুগ্ধতা তো রয়েছেই। 

আমরা পিঠাপিঠি দুই ভাইবোন বইয়ের ভাষায় কথা বলতাম, এই ধরুন মালপোয়া ভাজা হয়েছে বাড়িতে, তখন 'তালনবমী'র কী 'অশনি-সংকেত'-এর ল্যাঙ্গুয়েজের ঢঙে। কিংবা হাইস্কুলে পড়াকালীন একবার বারবিকিউ সস কিনে এনে মুরগির ঝোল রেঁধেছি, কে জানতো ওটা দিয়ে ঝোল রাঁধতে নেই...ভাই একমুঠি ভাত মেখে খেয়েই বলে বসলো- 'হতভাগী, তামাকু দিয়া রামপাখি রান্ধিয়াছিস!' বঙ্কিমবাবুর কমলাকান্ত খুব লাগসই ছিল, পরে ভাই হুমায়ুন আহমেদের চরিত্রের ভাষায় কথা বলতো প্রায়ই, 'কাক, তোমাকে কি কখনো বলেছি তুমি পৃথিবীর সবচেয়ে কালো পাখি?' ভাষার ফাজলামি অন্তবিহীন, স্টিভেন ফ্রাই এবং হিউ লরী একটি কমেডি ক্লিপে ননসেন্স ভাষা বলেছিলেন আদালতে, এমন সব শব্দ যা ইংরেজিতে নেই অথচ শুনতে অশ্লীল শোনায়। 

আমরা বাংলায় অনুবাদ করা সোভিয়েত সাহিত্যের আরকে ডোবা সোনালি শৈশব কাটিয়েছি। আমার কাছে এখনো পৃথিবীর সেরা বই নিকোলাই নোসভের 'ক্ষুদে গুলবাজ', পাভেল বাঝোভের 'মালাকাইটের ঝাঁপি' এবং আলেক্সান্দর বেলায়েভের 'উভচর মানুষ'। স্কুলে মিসেস ডায়াজ আমাদের পড়ে শোনাতেন 'আলো দিয়ে গেল যারা', বইটা আমি আর কোথাও দেখিনি, ইতিহাসের গল্পের বই, খুব চমৎকার... ক্লাস টু'র বাচ্চাদের শোনাচ্ছেন পৃথ্বীরাজ-সংযুক্তার গল্প, শোনাচ্ছেন দরিয়া-ই-নুরের গল্প। আর স্থাপত্যবিদ্যা শিখবার সময় ভালবেসেছি ফ্লেচারের বইটিকে, ভালবেসেছি গমব্রিখকে। ইদানিং পড়তে শুরু করেছি রিলকের 'লেটারস টু সেজান', রিলকে লিখছেন- 'মুসানবীর পরে (সেজানের মতো) অত ঘোর নিয়ে কেউ পাহাড়ের দিকে তাকায়নি। কী চমৎকার বয়ান। 


এমদাদ রহমান : 
এ পর্যন্ত কতগুলো বই অর্ধেক কিংবা পড়া শুরু করে শেষ না করেই ফেলে রেখেছেন? 

সাগুফতা শারমীন তানিয়া : 
এই প্রশ্নের উত্তর দেয়া সমীচীন হবে না। অনেক বই অর্ধেক পড়ে ফেলে রেখেছি। সেই তালিকায় মার্ক টোয়াইনের আত্মজীবনীও আছে। ওটা টোয়াইন সাহেবের খামতি নয়, আমার। কিংবা তাদের যারা মানুষের সপ্তাহকে পাঁচানা দু'আনায় ভাগ করে অবকাশ দিয়েছে কম, জীবিকা নির্বাহের সময় বরাদ্দ রেখেছে বেশি। অবশ্য পড়া শুরু করে আত্মহারা হয়ে ফেলে রেখেছি, পরে হরমোনের দোলাচল কমলে বাকিটা পড়বো, খুব গুরুপাচ্য রোচক গদ্য, এমনও হয়েছে। তবে এভাবে বই ফেলে রাখা আমার স্বভাবে আগে ছিল না, কিছুতেই শেষ না করে থামতে পারতাম না। 

এমদাদ রহমান : 
কোন বইগুলোয় আপনি নিজেকে খুঁজে পেয়েছেন? 

সাগুফতা শারমীন তানিয়া : 
অল্পবয়েসে যখন ঘোর ঘনঘটায় একদিন প্রেম এসে মাথায় বাজ ফেলবে ভাবতাম তখন এমিলি ব্রন্টির 'উদারিং হাইটস'এ পেয়েছিলাম, ক্যাথিতে নয়, হিথক্লিফে। 'গন উইথ দ্য উইন্ড'এর স্কার্লেটের সাথে অনেক মেয়েরই আন্তরিক যোগ ঘটে, আমারও ঘটেছিল। পামুকের 'দ্য মিউজিয়াম অভ ইনোসেন্স'-এর লোকটা যে একে একে হারিয়ে যাওয়া মেয়েটির ব্যবহৃত টুথপিক- দেয়াশলাই- সিগ্রেটের বাট ইত্যাদি জমাতে শুরু করেছিল, আর পরে প্রেমে পড়ে গেছিল আসলে একটি সময়ের, শুধু ব্যক্তিতে স্থির থাকতে পারেনি, সেই লোকটা ভীষণভাবে আমি। নবোকভের 'স্পিক, মেমরি', মিলান কুন্দেরার 'দ্য আনবেয়ারেবল লাইটনেস অভ বিয়িং', হা জিনের 'ওয়েটিং', মার্ক হ্যাডনের 'দ্য কিউরিয়াস ইনসিডেন্ট অভ দ্য ডগ ইন দ্য নাইট-টাইম' এইসবে খুঁজে পেয়েছি এমন কলমে না লিখতে পারার সুতীব্র ঈর্ষা। যা বলতে নেই তা হচ্ছে প্লাথের 'বেলজার' এবং স্যু কফম্যানের 'ডায়রি অভ আ ম্যাড হাউজওয়াইফ'-এর মনোবিকলনের ভিতরেও আমি কখনো নিজেকে খুঁজে পেয়েছি। আমার এক অগ্রজ সাহিত্যিক পরিহাস করে বলতেন আমার জীবনীর নাম হবে 'অফ হিউম্যান বন্ডেজ'। 


এমদাদ রহমান : 
কোন বইগুলো জীবনে বারবার পড়েছেন এবং আরও বহুবার পড়বেন? 

সাগুফতা শারমীন তানিয়া : 
প্রথমতঃ রবীন্দ্রনাথের গল্পগুচ্ছ, এবং গীতবিতান। তারপরে বঙ্কিমচন্দ্র। জীবনে একটা পর্যায়ে বারবার পড়েছিলাম মৈত্রেয়ী দেবীর 'ন হন্যতে' এবং কাকতালীয়ভাবে পরবর্তীতে জয়া মিত্রর 'হন্যমান'। অল্পবয়সে ব্রন্টি সিস্টার্স। সারাজীবন পড়েছি এবং ভবিষ্যতেও পড়বো আর্থার কোনান ডয়েল। আর অবশ্যই বিমল কর। ওঁর 'খড়কুটো' কিংবা 'বালিকা বধু'র বাইরে আমার চেনালোকে বড়জোর পড়েছে 'জননী' কিংবা 'বরফসাহেবের মেয়ে', অথচ লোকটা কী অনায়াসে ভয়ানক সব প্লট চালনা করতেন, যে খেলুড়ি বেশ্যার হাটে স্ত্রীকে বেঁচে দিয়েছে সে মরে পড়ে আছে সেই মেয়েটির খাটের নিচে এবং বিগতযৌবনা মেয়েটি বৃষ্টির সন্ধ্যায় বেরিয়েছে শরীর বেচতে এই লোকটির শবদাহ করতে পয়সা লাগবে বলে। স্ত্রৈণ স্বামী তার স্ত্রীর কোমরে মন্ত্রপূত ঘুনসি বাঁধা দেখে স্ত্রীর গায়ে হাত তুলছে, তার সর্বময় ভালবাসাকে ব্যবহার করে কবেকার এই মৃতবৎসা নারী আরেকটি সন্তানের আশা করছে... যেন সে প্রেম নয়, কাঁচামাল, তার ভালবাসার প্রতি এই হঠকারিতা সে সইতে পারছে না, সন্তানকামনা যেন তার প্রেমের প্রতিদ্বন্দ্বী। সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ আমার ভীষণ প্রিয়। গোঘ্ন, বাদশা, রাণীরঘাটের বৃত্তান্ত, কুর্শিনামা... ওঁর ছোটগল্প বহুবার আরো পড়বো। অবন বসু আমার অসম্ভব রকমের প্রিয় লেখক আগেই বলেছি, ওঁর গল্প কোথাও পেলে পড়তে পড়তে মুখস্ত করে ফেলি আমি, দীর্ঘদিনের অদেখা প্রিয়জনকে দেখতে পেলে যেমন অবিরল চুম্বন করা উচিত তেমন করে। 


এমদাদ রহমান : 
কে সেই লেখক যাকে আপনি পাঠ করেন গভীর আনন্দের সঙ্গে, যিনি আপনার ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেন? 

সাগুফতা শারমীন তানিয়া : 
এ প্রশ্নের উত্তর তো দিয়ে ফেলেছি। তাঁর থেকে অত্যন্ত আনন্দ নিয়েছি, অথচ আমার ওপর কোনো প্রভাবই নেই, যেমন ত্রৈলোক্যনাথ, এমনও আছেন। আমার ভাললাগায় কোনো দ্রাঘিমাংশের কোটা নেই, ফলে সেই বিভাজনকে দূরে রেখেই আমার স্বীকারোক্তি নিতে হবে। কে সেই লেখক না জিজ্ঞেস করে, কোন কোন লেখা বললে হয়তো বলাটা সহজ। 


এমদাদ রহমান : 
গল্প লিখতে শুরু করেন কীভাবে? একজন রিপোর্টারের মতোই কি আপনি চারপাশটাকে অবিরাম পর্যবেক্ষণে রাখেন? আপনি কি নোট নেন? 

সাগুফতা শারমীন তানিয়া : 
আমি খুব সামান্য ইন্ধন থেকে শুরু করি। সেটা দুঃস্বপ্ন থেকে হতে পারে। চলতি পথে ট্রেনের জানালা দিয়ে তাকিয়ে কোনো উপমা মাথায় এলো, তা থেকে হতে পারে। । দেখুন আমরা কখনো সর্বপ্লাবী কৌতূহলে চারপাশ দেখতে দেখতে যাই, কখনো কিছুই না দেখে 'অনিলের প্রায়' বয়ে যাই, দুইরকম যাত্রাই আমার লেখায় আসে, দুইই আমাকে গভীর আরাম দেয়। হ্যাঁ, পর্যবেক্ষণ তো শিল্পীমাত্রেই করে, রিপোর্টার শুধু সংঘটিত বা ঘটমানকে দেখে, শিল্পী দ্যাখে এই দৃশ্যমানের তলানিতে যা আছে, এই অধঃক্ষেপ দেখতে তাকে অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যত সবই আকাশযানে পরিক্রমা করে আসতে হয়। 

একসময় যা মনে আসতো, তা কাগজ-কলমে বসার আগ অব্দি অক্ষরে অক্ষরে মনে থাকতো। ছোটবড় ব্যক্তিগত ট্রমায় সেই ক্ষমতা কমে গেছে, তাই এখন কাগজ-কলমে তখুনি লিখে ফেলি অথবা গুগল কিপে। শিয়রের কাছে নোটবুকটা থাকেই। 

এমদাদ রহমান : 
লেখালেখির সবচেয়ে কঠিন দিক হিসেবে কোনটিকে চিহ্নিত করবেন? 

সাগুফতা শারমীন তানিয়া : 
সবচেয়ে কঠিন দিক লেখকের এই আমিময়তা থেকে পাঠককে আপনার করে নিয়ে 'আমরা'তে পৌঁছনো, যেখানে পাঠক সবিস্ময়ে আপনাকে বিশ্বাস করবে, যষ্টির মতো আঁকড়ে ধরবে আপনার কলম আর আপনি যেদিকে নেবেন সেদিকেই নির্বিবাদে যাবে। তাকে শুধু তার কথা শোনাবেন তা তো নয়, যা শোনাবেন তাই তার আপনার মনে হবে তেমন। মানুষের কাছে যাওয়াটাই সবচেয়ে কঠিন, কারণ প্রথম নিজেকে দ্রবীভূত করে নিতে হয়। হয় নিজের গোত্রান্তর ঘটাতে হয়, অথবা পাঠকের ধর্মান্তর... যাঁরা পারেন তাঁরা আমার নমস্য। 

আরেকটি জিনিস খুব কঠিন। ভাল লেখার একটি নিজস্ব অন্তরঙ্গ ভূবন থাকে, ভাল সিনেমার যেমন। পাঠক লেখকের নাম না দেখলেও ঢুকেই টের পাবে এই ঘর-দরবার এই তোষাখানা তার চেনা। যেটাকে আমরা নাম দিয়েছি 'স্টাইল'। প্রকৃত শিল্পীর একটি নিজস্ব ভাষা থাকে, একটি ভঙ্গি, তা 'স্টাইল'। এই স্টাইল বজায় রাখা অথচ প্রতিবার নতুনতর কোনো সৃষ্টি উপহার দেয়া, এই দুই ব্যাপার সেতারে দু'হাতে দু-রকমের বাজনার মতন ব্যাপার, দুইই জরুরি, দুইয়ের ভারসাম্য ছাড়া সুর জমবে না। 


এমদাদ রহমান : 
মার্কেস করলেন কী, তিনি যখন 'গোত্রপিতার হেমন্ত' উপন্যাসটি লিখতে শুরু করলেন তখন লিখতে থাকা 'নিঃসঙ্গতার একশ বছর' লেখা বন্ধ করে দিলেন! একটি লেখা লিখতে থাকা অবস্থায় অন্য একটি লেখা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ার অভিজ্ঞতা আপনার হয়েছে? 

সাগুফতা শারমীন তানিয়া : 
বহুবার। যেহেতু আমি একসাথে কয়েকটি লেখা শুরু করি এবং কয়েকটা বইও পড়তে শুরু করি, ফলে এমন অবস্থা অনেকবার হয়েছে। কিন্তু মার্কেজকে বাটখারার মতো ব্যবহার করে বারবার অন্য কাউকে মাপবার কারণ কী? এমন নিশ্চয়ই আরো অনেক লেখকেরই লিখতে গিয়ে করতে হতে পারে। 
এমদাদ রহমান : 
এখানে মার্কেজ আসছেন এই বিশেষ অবস্থার চাপে, তাকে এই মুহূর্তে মনেও পড়ছে; আর লেখকরা তো একটা পরম্পরা মেনে চলেন। সে কারণে, 'গোত্রপিতার হেমন্ত' (El otoño del patriarca) এবং 'নিঃসঙ্গতার একশ বছর' (Cien años de soledad) লেখাকালীন একটা বিশেষ পরিস্থিতিকে ধরে আপনার কাছ থেকে আপনার কথা জেনে নেয়া... 

সাগুফতা শারমীন তানিয়া : 
পরম্পরা বলতে কী বোঝালেন আমি জানি না... 


এমদাদ রহমান : 
পৃথিবীর সমস্ত লেখক যে লেখাটি লিখে চলেছেন, সার্ভেন্তেস লিখেছেন, কাফকা লিখেছেন, টমাস মান লিখেছেন, রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, আপনিও লিখে চলেছেন... এটা পরম্পরাই তো! 

সাগুফতা শারমীন তানিয়া : 
আমি একটা শেষ করে আরেকটা লেখা কখনো শুরু করেছি বলে মনে পড়ে না। কখনো একইসাথে লিখে গেছি। কখনো একটা সাইডিং-এ রেখে। আমি বহু ব্যাপারে আগ্রহী, প্রায় সমানভাবে আগ্রহী, ফলে বিচিত্র দিকে আমার টান। 

এমদাদ রহমান : 
আপনি কি এখন কোনও বড় লেখায় হাত দিয়েছেন, সেটা হতে পারে এপিক-ধর্মী কোনও উপন্যাস...এমন কিছু লিখছেন? 

সাগুফতা শারমীন তানিয়া :  
আগেই বলে নিয়েছি, আমি গোছানো স্বভাবের নই। কোন লেখা বড় হবে, কোনটি খর্বকায়, তা লিখবার সময়ও বুঝতে পারা আমার দুঃসাধ্য। একটা অরগ্যানিক প্রক্রিয়ায় চলতে দিই। আর সবিনয়ে জানাই, আমি এখনো এপিকের পাঠকমাত্র, জাহাজঘাটা থেকে দূরের হাটে আদার ব্যাপারি। এপিকের অনেক ছাঁট নিয়ে কাজ করা সম্ভব, কিন্তু তাতে এপিক-কোয়ালিটি- একটা মনুমেন্টালিটি একটা অতিকায়ত্ব বজায় রাখা কঠিন। সেখানে আনন্দকে হতে হবে বিপুল, শোক তীব্র এবং গভীর। 

এমদাদ রহমান : 
এখন তাহলে এমন কিছু মহাকাব্যিক লেখার কথা বলুন যা আপনাকে প্রবল আচ্ছন্ন করেছে, যার একটিকে আপনার মনে হয়েছিল যে যদি নিজে লিখতে পারতেন! 

সাগুফতা শারমীন তানিয়া : 
‘মহাভারত' আমার খুব প্রিয়। হোমারের এপিক 'ইলিয়াড' আর 'অডিসি' উভয়েতেই আমি আচ্ছন্ন ছিলাম আকৈশোর। বুদ্ধদেব বসু সীতা এবং মেঘদূত নিয়ে যা কিছু কাজ করেছেন, ভারী সুন্দর। প্যাট বার্কারের যে-উপন্যাসটির কথা বলছিলাম, সেটা এপিককে ভিত্তি করেই লেখা, এবং তাতে এপিকের কিছুটা কোয়ালিটি আছে, সেই স্বাদ আছে, সেই মনুমেন্টালিটি আছে। 

এমদাদ রহমান : 
আপনার আখ্যান ঠিক কতটুকু বাস্তবকে অনুসরণ করে লিখিত হয়? 

সাগুফতা শারমীন তানিয়া : 
যতটা আমি বাস্তবকে জানি, ততটা। আমি দক্ষিণারঞ্জনের রচনাবলী নিয়ে কাজ করেছি একটি বইয়ে, নাম 'উত্তর দক্ষিণা', রূপকথার বাস্তবকে সামাজিক বাস্তবতা এবং ভবিষ্যতের সম্ভাব্যতা মিশিয়ে আবার নতুন করে লেখা। বাস্তবকে অনুসরণ করতে গিয়ে কখনো আমার হাতের ক্ষীণ আলোয় সামনের ল্যাবিরিন্থের অন্ধকার পরিষ্কার হয় না, ভয়ও লাগে। তখন অন্যের দেখাকে দেখি, অন্যের যাপনকে দেখি। 

যাঁরা কেবলি ঘটমান বাস্তবের কারবারি, তাঁরা জার্নালিস্ট; লেখককে কিছুটা কল্পনা করে নিতেই হয়, পুরাঘটিতকেও খতিয়ে নিতে হয়। এই বিষয়ে আমার খুব প্রিয় উদাহরণ রবীন্দ্রনাথ। আমরা গল্পগুচ্ছ পড়বার সময় ভুলে যাই, যে পংক্তিগুলোর মানুষ এতে আছে, তার অনেকগুলো পংক্তিই জমিদারবাড়ির সন্তান হবার সুবাদে ওঁর জন্য অগম্য। কিন্তু অসম্ভব কল্পনাশক্তি আর সামান্য ভেসে আসা লোকগান-কথা-ঘাটের হাসাহাসি-কন্যাবিদায় এইসব দিয়েই কী অসামান্য সব কাহিনী উঠে এসেছে। 
এমদাদ রহমান : 
কোন বিশেষ ভাব কিংবা পরিবেশ কিংবা পরিস্থিতি আপনাকে লিখতে বাধ্য করে? 


সাগুফতা শারমীন তানিয়া : 
স্কট ফিটজেরাল্ড লেখালেখি করছিলেন কারণ সুন্দর চেহারা আর লেখালেখির ক্ষমতাই ছিল ওঁর সমাজের সিঁড়ি বেয়ে উঠবার দু’খানা মোটে অস্ত্র, একটি মেয়েকে (জেল্ডা) পটাতে লেখা শুরু করেছিলেন তিনি। কে যে কোন ইন্ধন থেকে শুরু করে! কাউকে জয় করতে লিখতে গেলেন, পরিণামে অজস্র মানুষ আর তাদের আনন্দবিদ্ধ হৃদয় আপনি জয় করে ফেললেন! 

অল্পবয়সে পরীক্ষার সময় আমার লেখার বেগ বেড়ে যেত। পরে দেখেছি, বিপদের মৌসুমে আমার লেখালেখি বাড়ে। কেন জানি না। ডারউইন পড়াতে গিয়ে আমাদের শেখানো হয়েছিল শব্দবন্ধ ‘স্ট্রাগল ফর একজিস্টেন্স’, যে এই যুদ্ধে জয়ী হবে সে টিকবে, অন্যরা নির্মূল হবে... হয়তো লেখাই আমার যুদ্ধকালীন সারভাইভ্যাল স্কিল। সলিল চৌধুরী লিখেছিলেন— “তখন আমার হয়ে শ্বাস ফেলে আমার কলম”! ফলে নিরুপদ্রব জীবনে পড়ি, জরুরি অবস্থায় লিখি...এমন ভাবা যেতে পারে, কিন্তু সেই ভাবনাটা ঠিক হবে না। এটা আমার জন্য ‘আপৎকালীন’ ব্যবস্থা নয়, এটাই আমার জীবনের কেন্দ্র। 

আমি যখন মানুষের মাঝে থাকি, কিংবা কোথাও যাচ্ছি এমন, তখন অনর্গল কথা মনে আসে, মানুষ দেখি। স্বয়ংক্রিয়ভাবেই এসব চলে, একটিমাত্র উপমা থেকেও কখনো লেখা শুরু করেছি এমন হয়েছে অনেকবার, কখনো একটি জায়গা ঘুরে এসেই লিখতে বসেছি এমন হয়েছে। 


এমদাদ রহমান : 
লেখালেখির প্রক্রিয়াটিকে কি আপনি আনন্দময় ঘটনা বলবেন, না কি লেখালেখিকে নিজের ভিতরে প্রতিনিয়ত বয়ে চলা এক গভীর দুঃখ বলবেন! আপনার কাছে কোনটি সত্য? 

সাগুফতা শারমীন তানিয়া : 
সবচেয়ে প্রিয়জনের রূপ আমাদের দৃষ্টিশক্তির ফোকাসের বাইরের জিনিস। এতই কাছের, সে কেমন দেখতে তা বলা যায় না, সেই প্রশ্নও অবান্তর ঠেকে। মানুষ কেন যেচে প্রিয়র দাসত্ব করে, কেন অবিরাম ভুগেও চলে যেতে পারে না কারণ যেতে চায় না...এইসব ভেদ বুঝবার নয়। ফলে লেখালেখির প্রক্রিয়া আমার কাছে আনন্দময় নাকি বেদনাপ্রজ নাকি ভেতরকার কোনো হাহাকার এইসব আমি ভাবি না; গভীর দুঃখ কিংবা বিপুল আনন্দ যাই হোক, সেই প্রশ্নই আমি করি না। 

আর এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত না থাকলে হয়তো জীবনের অত্যন্ত আনন্দের বহু ঘটনাই ঘটতো না, বা অন্যভাবে ঘটতো। যারা হাতে গড়তে ভালবাসে, সেটা লেখালেখি হোক, ক্রাফট হোক, তারা অনেককিছু জমিয়ে রাখে, কবে কখন লাগবে কে জানে- এমনটা ভেবে। আমিও তেমনি ছিলাম। অত হাবিজাবির ভিতর থেকে কখন কোন চেনা সুর উঠে আসে, ছেঁড়া তারের মতো তাতে কত অপরিচিত পাঠকের পা পড়ে যায়, প্রযুক্তির কারণে সেটা আবার আমি ছ'হাজার মাইল দূরে বসে জানতেও পারি, এগুলো লেখালেখির কারণেই পেয়েছি। তা অমূল্য। 

এমদাদ রহমান : 
লেখকের অভিজ্ঞতা যত বাড়ে লেখালেখিও কি ঠিক ততোটাই সহজ হয়ে আসে? 

সাগুফতা শারমীন তানিয়া : 
লেখার ধরণ চর্চায় বদলায়, এতটুকু জানি। ফলে অভিজ্ঞতার একটা যোগ তো আছেই। লেখকের লিখবার অভিজ্ঞতার কথা বলছেন নাকি জীবন দেখবার? জীবন দেখবার বিস্তর আঘাত লেখককে শিল্পীকে ঋদ্ধ করে ঠিকই, কিন্তু খুব বড় ট্রমা সুরে সাধা বেহালাকে ভেঙেও দেয়। লেখাই বলুন, আঁকাই বলুন, সবই করতে করতে আয়ত্তে আসে, সক্ষমতা বাড়ে। পুরনো যন্ত্র থেকে শুধু গলগল করে কালিই বের হয় এমনও হতে পারে, যদি মন সজীব থেকে কলমকে সতেজ না রাখে। 

এমদাদ রহমান : 
লেখকরা কি অন্যদের চেয়ে আলাদা? লেখকের চোখে কি অনন্যসাধারণ কোনও ব্যাপার লুকিয়ে থাকে? 
সাগুফতা শারমীন তানিয়া : 
জানি না। লেখকদের সম্পর্কে আমার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা কম এবং আমি এই অর্বাচীনতাটিকে টিকিয়ে রাখতে চাই। আলাদা কি না, তা ভেবে দেখিনি, খতিয়ে দেখলে হয়তো সাধারণ মানুষের সাথে পাল্লা দিয়েই তাঁরা অসাধু-অখন্ড সরল-কৃত্রিম-লোভী ইত্যাদি। কিন্তু শিল্পীর দেখায় আর সাধারণের দেখায় তফাত তো থাকেই। যেখানে সৌন্দর্য নেই, সেখানে সে সৌন্দর্য বিনির্মাণ করে, যেখানে প্রেম নেই সেখানে বিনাকারণে প্রেমের চাষবাস করে, যেখানে সমতল সরলতা আছে, সেখানে সে কপট চিন্তার জট পাকায়। শিল্পীর মাথা জটিলতর ভাবনা করতে সক্ষম, ফলে তার দেখা জটিল। 

এমদাদ রহমান : 
আপনি কি কখনও লিখতে গিয়ে ভাষার সীমাবদ্ধতায় ভোগেন? মার্গারেট এটউড বলেছেন- পৃথিবীর প্রায় সমস্ত লেখক ভাষার সীমাবদ্ধতায় স্তম্ভিত হয়ে পড়েন! 

সাগুফতা শারমীন তানিয়া : 
হ্যাঁ পড়ি। একেবারে লাগসই শব্দটি না হলে আমি কিছুতেই এগোতে পারি না, যদি বা তখনকার মতো লিখেও রাখি, একতাল ময়দা-ডালডা এইসব মেখে রেখে এসেছি এমন ক্লেদাক্ত লাগে। সৈয়দ মুজতবা আলী'র 'দেশে বিদেশে'-তে একটি অপূর্ব বিবরণ আছে, সারারাত্রি গান শুনবার, গানের কথার সাথে প্রত্যয় এবং স্বপ্ন একাকার হতে হতে রাত্রির প্রহর অতিক্রান্ত হবার বিবরণ, সুখশীর্ষে যাবার বিবরণ... সেতারের বাজনার সাথে বুড়ো ওস্তাদের গলার আওয়াজ মিলে যেন সন্ধ্যার ফিরোজা আকাশকে লাল আবির মাখিয়ে বেগুনীর দিকে টেনে নিয়ে চলেছে, 'যদি একরাত্রের তরে, একবারের তরে প্রিয়ার অধর হতে একটিমাত্র চুমু পাই, তবে লুপ্ত যৌবন ফিরে পাব, এ জীবন তবে দ্বিতীয়বার যাপন করতে রাজি আছি'- এই হচ্ছে গানের বাণী, যিনি শুনছেন তিনি দেখছেন কত ঘটনার লহরী, তাজমহলের দরজা দিয়ে শাজাহান বের হয়ে এলেন মমতাজের হাত ধরে, সগররাজের সহস্র সন্তান উল্লাস করছে প্রাণ ফিরে পেয়ে। কে বলে ভাষা সীমাবদ্ধ! তবে হ্যাঁ, সেই মার্গে সবাই তো আমরা পৌঁছতে পারি না, ফলে ময়দা মাখাই সারা হয়। 

এমদাদ রহমান : 
এই যে আপনার একদিন লেখক হতে ইচ্ছে হলো, এই যে আত্ম-প্রকাশ, একটা আকাঙ্ক্ষার জন্ম, এটা কেন? 


সাগুফতা শারমীন তানিয়া : 
আমি মনে করতে পারি না কখনো আমি ভেবেছি, 'একদিন লেখক হবো'। বাক্য লিখবার জ্ঞান হবার পর থেকেই আমি লিখেছি, হেন সময় নেই যে সময়টাতে লেখার খাতায় কিছুই লিখিনি। স্কুল-কলেজ জীবনে আমি আমার প্রতিদ্বন্দ্বীদের সাহিত্যের প্রশ্নের নোট করে দিতাম, একেক জনেরটা একেক রকম, এবং তাতে অত্যন্ত আনন্দ পেতাম। এটা একটা খেলা, প্রাকৃতিক সক্ষমতাকে বাজিয়ে দেখার খেলা। একটু আগে আইজ্যাক ওয়াটসের কথা যে বলছিলাম, শৈশবে স্কুলের পড়ালেখা ছেড়ে অন্য পড়ালেখা করবার জন্য যখন শাস্তি পেতাম, তখন ওঁর সেই রাইমটা বলতো আমার নানা। যে যা করবে, সে তা করবেই। আমার মনে আছে, ভিক্টোরিয়ান কবরখানায় ঘুরতে ঘুরতে একদিন দেখি আমার ঘরের কাছেই সেই আইজ্যাক ওয়াটসের কবর... মনে হয় না একটা সংযোগের মতন? একরকমের অনিবার্যতা ছিল এই পথে আসবার। আমি এভাবেই এইপথেই গড়ে উঠছিলাম, কিছুটা সজ্ঞানে গুবরে পোকার তৈরি স্ফিয়ারের মতো, বাকিটা অবচেতনে- পায়ে পায়ে ছিটকে চলা নুড়ির মতো। 

আর আত্মপ্রকাশের ইচ্ছা তো আদিম, নৈলে মোষ ঝলসে খেলেই যার পেট ভরে, গোত্রের যেকোনো নারী-পুরুষের সাথে সঙ্গমেই যার মন ভরে, সেই মানুষ গুহার গায়ে আঁকবে কেন? জন্মমাত্রেই কেঁদে চেঁচিয়ে নিজের আগমণ ঘোষণাই বা করবে কেন? জন্মমুহূর্ত থেকেই তার অডিয়েন্স চাই। আর্থার কোনান ডয়েল একে বলেছিলেন 'মানুষের ক্ষমতার খামতি', তার প্রলুব্ধ হৃদয় দর্শকশ্রোতা চায়। 

এমদাদ রহমান : 
যখন একটি গল্প লিখতে থাকেন মানে লেখাটা চলছে তখন কি স্বপ্নে দেখেন গল্পটিকে? 

সাগুফতা শারমীন তানিয়া : 
না, স্বপ্নে-পাওয়া গল্প আছে আমার, লোকে শুনলে হাসবে। কয়েকটা। স্বপ্ন দেখে জেগে উঠে ফ্যালফ্যাল করে লিখতে বসেছি এমন, 'প্রমাদ' নামের একটা গল্প ছিল আমার সেরকম। কেউ কেউ বলে স্বপ্নে রঙ দ্যাখে না, আমি তো রঙ, স্পর্শের চেতনা, স্বাদ সবসহ দেখি। 

এমদাদ রহমান : 
এমন কখনো হয়েছে, গভীর রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেছে, সঙ্গে সঙ্গে লিখতে বসে গেছেন? 

সাগুফতা শারমীন তানিয়া : 
যখনই যা মনে পড়ে লিখে রাখি। আগে না লিখে রাখলেও অবিকল মনে রাখতে পারতাম। স্মৃতিরজ্জু শিথিল হয়ে যাচ্ছে, ব্যাপারটা বিশ্রী কিন্তু বায়োলজিক্যালি অপ্রতিরোধ্য। ফলে লিখে না রাখলে হারিয়ে যাবেই। আম্মা আমার মশারির নিচে একটা খাতা আর কলম দিয়ে রাখতো। লেখার কথা ভাবতে ভাবতে ঘুমোতে পারিনি, ফলে উঠে বসেছি লিখব বলে, যত রাতই হোক, এমন হয়েছে বহুবার। লেখার বাক্যগুলো একবার ভাবনায় আকার পেতে থাকলে আর ঘুম আসে না, একের পর এক বাক্য তৈরি হতে থাকে, উঠে বসতেই হয়, লিখে রাখতেই হয়। 

এমদাদ রহমান : 
আপনি কীভাবে কাজ করেন? কীভাবে লেখার প্রথম খসড়াটি লেখেন? 

সাগুফতা শারমীন তানিয়া : 
আমার লেখার প্রক্রিয়া অ-ব্যাকরণসম্ভূতা। লেখার প্রথম খসড়া বা সিনপসিস আমি কয়েক লাইনে লিখে রাখি, কিন্তু পরে লিখতে বসে আমূল বদলে যায়। যে স্থান নিয়ে লিখছি, সেখানে একটু সময়ের জন্য ভ্রমণে যেতে পারলেও অনেকটা এগিয়ে যেতে পারি, কিন্তু তাও সম্ভব হয়না অনেক সময়... যে/যারা গেছে তাদের চোখ দিয়ে দেখি, অগত্যা। একটা কথা বলি, স্থাপত্যশিক্ষার শুরুতে নানান শেপের (গোল, ডিম্বাকার, বেলনাকার) বল জুড়ে দিয়ে সামগ্রিকভাবে মানবদেহের দৈর্ঘ্যের অনুপাত বজায় রেখে ফিগারড্রয়িং শেখানো হতো, আর পিত্তি জ্বলে যেত আমার। আমি কাঠামোর জ্যামিতি তৈরি করে তারপর তুলি-পেন্সিল বা কলম কিছুই ধরতে পারি না। জ্যামিতিটা মাপজোকটা ভেতর থেকে আসতে হবে... ফলে পুরো একটা লেখার কাঠামো ধরে নিয়ে আমি কোনোদিন লিখিনি। লিখতে লিখতে বদলেছি, কুঁদে ফেলে দিয়েছি, র‍্যাঁদা বুলিয়েছি, জুড়েছি। 

এমদাদ রহমান : 
গল্প সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের কথাগুলো এখন মিথে পরিণত হয়েছে। ছোট প্রাণ, ছোট ব্যথা... কিংবা 'শেষ হইয়াও হইল না শেষ'। গল্প কী- এ সম্পর্কে আপনি কোন কথাটি বলবেন? র

সাগুফতা শারমীন তানিয়া : 
গল্প সম্পর্কে আমার কোনো ব্যাকরণ নেই, আমি মনে করি হেন গল্প নেই যা বলা হয়নি, যা যাপিত হয়নি। কে কেমন করে বলছে সেটাই বিবেচ্য। কুন্দেরা ওঁর 'এনকাউন্টার' রচনাবলীতে লিখছেন, এমন একটা সময়ে আমরা দাঁড়িয়ে আছি যেখানে কোনো রাখঢাক নেই। এই রাখঢাকের কথা বলতে গিয়ে তিনি আনা কারেনিনার প্রেমের শারীরিক বিবরণের অভাবের কথা তুলে ধরছেন, হুমায়ূন আজাদ এইভাবে একবার 'গৃহদাহ'তে অচলার শারীরিক সম্পর্কের অব্যক্ত ইঙ্গিত নিয়ে লিখেছিলেন, যে উপন্যাসে সেগুলো গেল কোথায়? এখনকার গল্প সেদিক থেকে অবাধ, এই বাধাহীনতা সময়ের দান। ফলে এখনকার একটা গল্প একশো-দেড়শো বছর আগের কোনো গল্পের চেয়ে অবশ্যই আলাদা। কিন্তু অবাধে সবকিছুর নাম ধরে লিখতে পারবার স্বাধীনতাই সাহিত্য নয়, দুরূহ কোনো ইঙ্গিত যা একবারও লেখক লিখে প্রকাশ করেননি অথচ পাঠকের বুকে সেই সম্ভাবনার আভাস ঠাস-ঠাস করছে- এমনও হতেই পারে, এবং প্রাঞ্জল করে না লিখেও তা কালোত্তীর্ণ হতে পারে। পামুক উপন্যাস নিয়ে লিখতে গিয়ে বলেছিলেন যে, আমরা উপন্যাসে একরকমের কেন্দ্র সন্ধান করি, যা এপিকে করি না, আমরা ধরেই নিই যে উপন্যাসে উপরিতলে যা দেখা যাচ্ছে তাই শেষ নয়, এটা একটা কেন্দ্রের দিকে যাত্রা, ফর্স্টারের প্রসঙ্গ টেনে বলেছিলেন, 'উপন্যাসের আসল পরীক্ষা হচ্ছে পাঠকের মনে এর প্রতি টানের পরিমাণটুকু'। এইদিক থেকে গল্প একটু আলাদা, সে গোলীয়বস্তু না হয়ে একটা প্যারাবোলার মতো হতেই পারে, এমনকি একটা বিন্দুবৎ হতে পারে, কেন্দ্র নাও থাকতে পারে; শুধুই একটা অনুভূতি একটা আলোড়ন সৃষ্টি করে গল্প হাওয়ায় মিলিয়ে যেতে পারে। কিন্তু ঐ যে ফর্স্টার বলছেন একটি আততির কথা, সেটি থাকবে, সেই টান উপন্যাসের সমানও হতে পারে। 'মানভঞ্জন'-এর 'গিরিবালা'কে নিয়ে রবীন্দ্রনাথ লিখছেন সামান্য একটি শেষ লাইন, 'সমস্ত কলিকাতা শহরের দর্শক দুই চক্ষু ভরিয়া গিরিবালার অভিনয় দেখিতে লাগিল, কেবল গোপীনাথ সেখানে স্থান পাইল না'। ষোলবছরের উপেক্ষিতা স্ত্রী কোলকাতার বাবুবিলাসের স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে থিয়েটারে স্বয়ং এসে স্থান করে নিয়েছে, সেখানে প্রতিশোধ আছে, পোয়েটিক জাস্টিস আছে, শিল্পসাধনার ভেতরের কালিমা আছে, সেকালের ইতিহাস আছে, ফেমিনিজমের ইন্ধন আছে। শুধু ছোট প্রাণ আর ছোট ব্যথাতে কি রবীন্দ্রনাথ নিজেই থেমেছেন? শেষে এসে ঐ গল্পে পাঠকের মনে যে আদর তৈরি হয়, পরিমাপে তা রবীন্দ্রনাথের কোনো উপন্যাসের চেয়ে কম নয়। 

এমদাদ রহমান : 
এই সময়ের ছোটগল্প আসলে কোন কথাটি বলছে? এই যে বিপুল বৈষম্যের শিকার হচ্ছে মানুষ, নারী এখনও হিংসা ও নিপীড়নের শিকার, ধর্ষণ উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় বেড়ে গেছে, তারপর মানুষের ওপর চাপিয়ে বসিয়ে দেওয়া ধর্মিয় অনুশাসন, সমাজের কেবল রক্ষনশীলতার দিকে যাত্রা, ধর্ম নিয়ে কূপমণ্ডূক উন্মাদনা, গণতন্ত্রহীনতায় প্রতিদিন জীবন যাপন, পাশাপাশি প্রযুক্তি সাধন করছে ব্যাপক মাত্রার পরিবর্তন; রাষ্ট্র দিনের পর দিন আরও বেশি শোষক, উৎপীড়ক ও স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠছে, সামরিক আগ্রাসন, নিধন, গণহত্যা, ছিন্নমূল মানুষের দির্ঘ লাইন... সেখানে একজন গল্পকার কী করবেন? কোন পথে হাটবেন? গল্প লেখা কি তাঁর জন্যে জটিল হয়ে পড়ছে? 

সাগুফতা শারমীন তানিয়া : 
রবীন্দ্রনাথের কথা তুলেছিলেন একটু আগে, গীতবিতানে ওঁর প্রথম গানটিতেই আপনার এ প্রশ্নের জবাব রয়েছে, 'অশান্তি যে আঘাত করে তাই তো বীণা বাজে'। বৈষম্য, নিপীড়ন, অনুশাসনের পীড়া, রক্ষণশীলতার উন্মাদনা, ছিন্নমূল মানুষের মিছিল এইসব আগে ছিল না? প্রবলভাবে ছিল। মানুষের সংখ্যা বেড়েছে, সাংখ্যমানের সাথে সাথে তার বয়ে চলা ক্লেদও বেড়েছে। তাই কলুষের ডিগ্রি- তার ম্যাগনিচিউড অনেক বেশি মনে হয়। গল্পকার শুধু নয়, শিল্পীর যাত্রা তো ঐ পথেই, সে দর্শক-শ্রোতা এবং নির্মাতা। মনে করে দেখুন, পীড়িত মানুষের সাক্ষাৎ পেতে পেতে ভ্যান খফ একপর্যায়ে বিমর্ষ হতে হতে প্রথমবারের মতো পাগল হলেন। আপনি ভ্যান খফকে দেখুন, কি ডোরা ক্যারিংটনকে দেখুন, কি বেগম আখতার, তীব্র বেদনা ছাড়া সংবেদন ছাড়া গভীরতম নির্মিতি সম্ভব নয়। শিল্পী যখন সেই বেদনার সম্মুখীন হয়, তখন সে জেনেবুঝেই হয় যে- সে যা হৃদয়ঙ্গম করবে, শুষে নেবে, প্রাণে ধারণ করবে, তা তাকে ভেঙে ফেলতেও সক্ষম। প্রকৃত শিল্পী আর জীবনের বাস্তবতা প্রায়ই দেখবেন ডেভিড আর গলায়্যাথের মতো যুযুধান, একদিকে দুরাশা আরেকদিকে পরাক্রম। দু'দিকই প্রবল। 

এমদাদ রহমান : 
দুই বাংলার লেখালেখি সম্পর্কে যদি কিছু বলতে বলি, আপনি কীভাবে বিচার করছেন? দুই বাংলার কথাসাহিত্যে বিশেষ কোনও বৈশিষ্ট্য চোখে পড়ছে কি? লক্ষ্যণীয় কোনও কিছু কি আলাদাভাবে ধরা পড়েছে, দুই বাংলার কথাসাহিত্যে- গল্পে, উপন্যাসে? 

সাগুফতা শারমীন তানিয়া : 
এপার-ওপারে বিষয়বস্তুতে-প্রকাশে-ক্লিশের ব্যবহারে অনেক তফাত। আমাকে যদি জিজ্ঞেস করেন, তবে বলবো- তফাতটা প্রস্তুতির। যার নাগরিক সভ্যতার ইতিহাস যত দীর্ঘ, তার লেখ্য ইতিহাসের উত্তরাধিকার তত ঋদ্ধ, সে তত আর্টিকুলেট, তার প্রকাশভঙ্গির আড়ালে তত দীর্ঘ প্রস্তুতি থাকে। আমরা যখন স্কুল শেষ করেছি তখন শহরে বোমার মতো পড়লেন কবীর সুমন, দুই বাংলায় সাড়া পড়ে গেল, ওঁর গানে যত না সুরের খেলা তার চেয়ে অনেক বেশি লিরিকের যাদু, এখানেই সাহিত্যের ক্ষমতা। ভাষা মানুষকে টানবেই। 

আবার সেই ভাষা নিয়েও অনেক রাজনীতি রয়েছে, মানভাষায় কেউ কথা বলে না এই ধুয়ো তুলে তা নস্যাৎ করে দেবার মুর্খতাও রয়েছে, অথচ ইংরেজিতেও 'মানভাষা'য় কি আসলেই কেউ কথা বলে? তবু, বলে দেখুন তো কাউকে সেটা অপ্রয়োজনীয়! আমরা ভাষা নিয়ে কাজ করি 'ব্যাকরণ' ফেলে (ওস্তাগরের কাজ জানি না, ভাস্কর্য নিয়ে কথা বলি), ভাষাজ্ঞান কম অথচ আওয়াজ খুব বেশি এমন লোককে অগ্রদূত ভেবে ফেলি, এখানেই আমাদের সাহিত্যচর্চার বিপদ। 

উভয় বাংলায়ই অনেকদিন ধরে অনেকরকম ভাল কাজ হচ্ছে, হবে আরো, উভয় বাংলায়ই অন্য ভাষার আগ্রাসনে ডুবে যাচ্ছে নিজ সংস্কৃতি, ফলে ভাষার ভরাডুবিও দূরে নয়, বেশিকিছু বলতে চাই না আর। আমাদের অন্তরের র‍্যাডক্লিফ লাইন এখনো বড় বেশি দগদগে, কথা বলাই মুশকিল। 

এমদাদ রহমান : 
লিখতে গিয়ে কি লেখক কখনও তার জীবন নিয়ে বিপন্নতায় ভোগেন, আর যদি না ভোগেন তাহলে তিনি আসলে কী লিখছেন, যেখানে লিখে প্রকাশ করবার পরও তিনি বিপন্ন হচ্ছেন না, তার শত্রু তৈরি হচ্ছে না, শাসকের ক্রোধের শিকার হতে হচ্ছে না? পাঠকের চোখের সামনে একটা তাৎপর্যপূর্ণ ছবি ফুটিয়ে তুলতে পারাটাই তো সাহিত্যিকের কাজ। তাহলে আমরা, বাংলাভাষাভাষী অঞ্চলের লেখকরা কি তা করতে পারছি, নাকি কিছুটা আত্মতৃপ্তিতে ভুগছি!? 

সাগুফতা শারমীন তানিয়া : 
জোসেফ ব্রডস্কি ওঁর 'লেস দ্যান ওয়ান' রচনাবলীতে লিখেছিলেন, 'কবির জীবন' বললে যত না বোঝায়, 'কবির মৃত্যু' কথাটা'র ভার তার চেয়ে বেশি। জীবন ঝাপসা- অস্পষ্ট- সুনির্দিষ্ট আকারহীন, খানিকটা কবির মতোই; মৃত্যু সেই তুলনায় অনেক বেশি 'চূড়ান্ত', যেন কবির জীবৎকালের কীর্তির মতো, যা এমন এক পর্যায়ে এসেছে যেখানে নির্বাণলাভ সম্ভব, যেখানে পুনর্জন্ম প্রয়োজনীয় নয়। সেদিক থেকে দেখলে যে কোনো সাহিত্যকীর্তি আসলে একটি যতিচিহ্ন, সমাপ্তিই একটি মৃত্যু। 

তা সেই কীর্তি অব্দি পৌঁছতেই পারেননি... লেখালিখি করে জীবন বিপন্ন করেছেন এমন মানুষ তো অনেক, অদূর অতীতে ব্লগাররা যেভাবে মারা গেলেন এবং যেভাবে বাকিরাও প্রচ্ছন্ন মৃত্যুভয় বুকে নিয়েই লিখবার কাজ চালিয়ে গেলেন... আমাদের সমাজ স্বাধীনচিন্তার সমাজ নয়, আমাদের দেশ এবং রাজনীতিও তাই চিন্তার স্বাধীনতাকে ভাল চোখে দেখে না। ফলে স্বাধীনচিন্তার মানুষদের সবদিক থেকে বিপদ। গণধর্ষণ, গণপিটুনি এইসব আমাদের স্বভাবে পরিণত হয়েছে, গণবিদ্বেষ তৈরি করতেও আমরা সহজেই সক্ষম হচ্ছি। এসব বিপদের সম্ভাবনাকে বুকে পুষে কতটা স্বাধীনতা নিয়ে সাহিত্যের কাজ করা যায়, তা সময়ই বলবে। মৃতের সংখ্যাও বলবে। কূপমন্ডূক সমাজে জন্মাবার মাশুল তো দিতেই হবে। 
আর যারা মরতে চায় না, ক্লিশে নেড়েচেড়ে আর খানিকটা পানি- না- ছুঁয়ে- মাছ- ধরে বেঁচে বর্তে থাকতে চায়, একরকমের ওপরচালাকি দিয়ে সৃষ্টির খোকলা দিকটা ঢেকে রাখতে চায়, তারাও তো থাকবেই, চিরকালই ছিল। 

এমদাদ রহমান : 
আমাদের বাংলাদেশের উপন্যাস কোথায় অবস্থান করছে, বিশ্বসাহিত্যের প্রেক্ষিত থেকে দেখলে, আপনি আমাদের উপন্যাসকে কীভাবে বিচার করবেন, মানে আমি বলতে চাচ্ছি মানের দিক থেকে বাংলা উপন্যাস কোথায় দাঁড়িয়ে আছে? এই তো সেদিন সালমান রুশদির উপন্যস বের হলো- কি-শট। উপন্যাসটি যদিও তিনি আত্মজীবনকে উপজীব্য করেছেন, কিন্তু সেটাও বিশ্বসাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ রচনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আমরা কথাসাহিত্যে তেমন চোখে পড়বার মতো কিছু লিখতে পারছি না কেন? না কি লেখা হচ্ছে কিন্তু সে লেখা বিশ্বসভায় পৌঁছাতে ব্যর্থ হচ্ছে? 

সাগুফতা শারমীন তানিয়া : 
আত্মজীবনকে উপজীব্য করে লেখা উপন্যাস এই প্রথম বিশ্বসাহিত্যে গুরুত্ব পাচ্ছে তা তো নয়। আমাদের শিল্প-সাহিত্য-স্থাপত্য যাই নিয়ে বলেন না কেন, একটা শব্দকে বোধহয় আমরা ভুলে যাই, সেটা 'মৌলিকতা'। আমরা শিক্ষিত হই নকল করে, আমরা যে সিনেমা দেখে বড় হই সেগুলির সিংহভাগই শাদাকালো যুগের সিনেমার নকল (বাংলাটা হিন্দির এবং হিন্দিটা ইংরেজির নকল), যে গান আমরা গাই তাতেও প্রচুর নকল, স্থাপত্যে পড়বার সময় দেখেছি বাইরের দুনিয়ার স্থপতির কাজকে হুবহু নকল করে ক্লাসে বাজিমাত করতে। একরকমের মিডিওক্রিটি আমাদের গন্তব্য। মিডিওকার লোকজন বোদ্ধার সমুদ্রে যেতে ডরায়, আপন আপন ডোবাতে একে অন্যকে ডাকাডাকি করে টিকে থাকে যেখানে নকল ধরা পড়ে না, পড়লেও লজ্জা নেই। শিল্পে নকল চলে না। ও দিয়ে শিল্পের নির্দয় নিকষে দাগ কাটা যায় না। এখানে এলিয়ট পুরস্কারের জন্য শর্টলিস্টেড হওয়া সাহিত্যিকদের কবিতাপাঠের অনুষ্ঠান করা হয় খুব বড় করে, আমি গেছি এবং একটা অদ্ভূত ব্যাপার লক্ষ্য করেছি; বিশ্বাস করবেন না পাঁড় পাঠক যায় সেখানে, চোখ মুদে শোনে এবং কবির পাঠ শেষে নিজেদের মধ্যেকার আলোচনায় বলে ফেলে কোন মেটাফর কোথাকার ছায়া। এই যে পাঠকের সচেতনতা, এ তো সাংঘাতিক। অনেকদিনের পাঠ-পরম্পরায় তৈরি। এখানে নকলনবিশি খুবই লজ্জার বিষয়। জুলিয়ান বার্নস এবং পিটার ক্যারীর একটি আলোচনাসভায় গেছিলাম, দেখলাম সেখানে ওঁরা একে অপরের লেখা থেকে 'ভাব-চুরি'র কথা প্রকাশ্যে স্বীকার করছেন, রগড় করে হাসছেন। ইন্সপিরেশন চলতে চলতে একটি সীমা থেকে 'চুরি' হতে থাকে, সেই চুরির সীমা আমরা মানি না বলেই আমার মনে হয়েছে। 

‘বিশ্বসাহিত্য' শব্দটা আমরা যখন বলি, তখন অবচেতনে বা সচেতনভাবেই আমরা বাংলা সাহিত্যকে সেই দলে ফেলি না। কেন? বাংলাদেশ বিশ্বে নেই? 'বিশ্বসভা' যখন বলি তখন সেখানে নিজেকে সভাসদ ভাবতে পারি না কেন? একটা বড় কারণ হচ্ছে প্রচুর মৌলিক কাজ কখনো অনূদিত হয়ে সেই সর্বজাতিসভায় পৌঁছতে পারেনি। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় নোবেল পাবার যোগ্য লেখক, অথচ ঐ যে আলোকমাতাল সভা, সেখানে কেউ জানেই না তাঁর নাম। শেইমাস হিনির কত কবিতার লাইন পড়ে আমার রীতিমতো যাতনার সাথে মনে পড়েছে বিভূতিভূষণের কথা। এখানে লন্ডনের সিক্রেট গার্ডেনস্পেস নিয়ে, বয়ে চলা খাল আর খালকে ঘিরে জীবদের জীবনের ওঠাপড়া নিয়ে একরকমের গন্তব্যহীন গল্পহীন সাহিত্যচর্চা হয়, 'আরণ্যক'কে আপনার মনে পড়বেই। কেউ জানে না। আমাদের যারা জায়েন্ট, তাদের মেটাফরের কাছেও অনেক পশ্চিমা লেখক উড়ে যাবে। আমাদের দেশে ইংরেজি কম লোকে শুদ্ধভাবে লিখতে জানে, আরো কম লোকে সাহিত্যের রসকে আঘাত না করে ইংরেজিতে অনুবাদ করতে জানে। ইংরেজি না জানা লোককে ইংরেজি জানা সাহিত্যিকরা নকল সাহিত্যের ভেলকি দেখিয়ে চলে। এইসবই হয়েছে আর হচ্ছে। 

এমদাদ রহমান : 
আমাদের কথাসাহিত্য কি যে কোনও অর্থে বিশ্বপাঠকের কাছে পৌঁছাতে পারছে, অথবা এসব রচনা কি আদৌ তেমন গুরুত্ব পাওয়ার যোগ্য? এখন মনে পড়ল বলে উল্লেখ করছি, ব্রিটিশ-টার্কিস নারী লেখক এলিফ শেফ্যাক কয়েকটি বই লিখেছেন, উপন্যাস, বইগুলির নাম এখানে নেওয়া যায়- দ্য বাস্টার্ড অফ ইস্তানবুল, দ্য ফর্টি রুলস অফ লাভ, টেন মিনিটস থার্টি এইট সেকেন্ডস ইন দিস স্ট্রঞ্জ ওয়ার্ড। সমালোচকরা তার এসব বইকে অত্যন্ত উঁচুদরের সাহিত্য কর্ম হিসেবে মন্তব্য করেছেন, এবং আশ্চর্য হয়েছেন যে উঁচুদরের সাহিত্যও বেস্ট-সেলার হতে পারে, হারুকি মুরাকামির বেলাতেও এ কথা সত্য, এলিফ শেফ্যাক বুকার পুরস্কারের জন্য লং লিস্টেড হয়েছেন, যেখানে সালমান রুশদির নামও আছে, তার আত্মজৈবনিক 'কি-শট' উপন্যাসের জন্য। রুশদির উপন্যাসটিকে সমালোচকরা মনে করছেন এক তীব্র সামাজিক স্যাটায়ার হিসেবে, যেখানে মানুষের ক্রমশ নিঃসঙ্গ হয়ে পড়বার বেদনার কথা আছে। বিশ্বজুড়ে ক্লাইমেট চেঞ্জ এবং উদ্বাস্তুদের নিয়ে উপন্যাস লিখেছেন ভারতীয় ডায়াসপোরা লেখক অমিতাভ ঘোষ। উপন্যাসের নাম গান-আইল্যান্ড। যে উপন্যাসে তিনি ব্যক্তির তার নিজের স্বাধীনতা হারিয়ে ফেলে নিঃস্ব হয়ে যাওয়ার কথা বলেছেন। ... এবং আরও সব বিস্ময়কর উন্মোচন বিশ্বসাহিত্যে প্রতিদিন ঘটে চলেছে। এই প্রেক্ষাপটে সমকালের বাংলা উপন্যাস কিংবা মোটাদাগে কথাসাহিত্য নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী? 

সাগুফতা শারমীন তানিয়া : 
ভাষার ব্যবধান হয় লেখককে ঘোচাতে হবে, অথবা অনুবাদককে। শেফাকের 'টেন মিনিটস থার্টি এইট সেকেন্ডস ইন দিস স্ট্রেঞ্জ ওয়ার্ল্ড' পড়ছি আমি, কী মিষ্টি গদ্য। গদ্যের মিষ্টতা আর বাস্তবের তেতো আমাদের বাঙালিদের কাছে যেন দুই ভূবনের জিনিস, যথেষ্ট থুথু-পিচুটি-শ্লেষ্মা না থাকলে আমরা যথেষ্ট 'বাস্তব' ভাবতে পারি না, অথচ তাই কি? ভয়ানক কোনো বিবরণের গদ্যও অত্যন্ত সুন্দর হতে পারে, পামুক মেহেদিরঞ্জিত ভেড়ার কুরবানি হবার বিবরণ দিচ্ছেন, মানিকবাবুর ভিখু আরেক ভিখারিকে হত্যা করছে (বীভৎস প্রাণীহত্যা ছাড়া আর কিছুই না) আর তারপর মৃত ভিখারির সঙ্গিনীকে পিঠে তুলে নিচ্ছে, কী তার শক্তি! 

এমদাদ রহমান : 
অমিতাভ ঘোষ সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে তার 'গান-আইল্যান্ড' উপন্যাস সম্পর্কে বলতে গিয়ে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের তরুণদের সাম্প্রতিক প্রবণতা অর্থাৎ এক অদ্ভুত মাইগ্রেশইনের কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন- আমরা সারা জীবনই পাসপোর্টের সঙ্গে জড়িত। পাসপোর্ট। ভিসা নিয়ে আমরা সবাই মাথা ঘামাই। কিন্তু দূর থেকে পাড়ি দেওয়া তরুণরা শুরুতেই, পুরো জার্নিটা শুরু করবার আগেই তাদের পাসপোর্টটি ছুঁড়ে ফেলে দেয়। এখন ওদের কোনও পাসপোর্ট নেই, তাদের সেটা লাগেও না। যদি কোথাও পাসপোর্ট দরকার হয়, কিছু টাকা দিলে দিলেই দিব্যি একটা পাসপোর্ট চলে আসে। এটা আমরা ভাবতেও পারি না কিন্তু এটাই বাস্তব... তিনি এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের তরুণদের কথা বলেছেন। তিনি এই বিষয়ে উপন্যাস লিখে ফেললেন। আমাদের সেই ঔপন্যাসিক কোথায়? 
সাগুফতা শারমীন তানিয়া : 
এই পাসপোর্ট ফেলে দেবার ব্যাপারটা আমি খুব কাজ থেকে জেলখানায় কাজ করার সুবাদে দেখেছি। ফরেন ন্যাশনাল প্রিজন, প্রচুর লোকের হাতে কোনো বৈধ কাগজপত্র নেই, ওঁদের ছক কষা ছিল, কখন পাসপোর্ট ধ্বংস করে দিতে হয়, একেক ছকে একেক মেয়াদের কারাবাস, তবে এর শেষে আশা আছে যে কারাভোগের পর যেই দেশে নামতে পারলেন সেই দেশে মিলেমিশে যাবেন। 

আপনার প্রশ্নের উত্তরে যাচ্ছি। মাইগ্রেশন নিয়ে, প্রবাস নিয়ে, দেশত্যাগ নিয়ে বাংলাভাষায় প্রচুর লেখালেখি হয়েছে এবং হচ্ছে। তবে আখ্যানের তৃষ্ণা আমাদের প্রবল, 'গল্পটা কী? গল্পটা শেষ হলো কীভাবে?', কিন্তু আখ্যানই শেষ কথা নয়, চমকপ্রদ হতে হবে এই আখ্যানকে আপনি পাঠকের কাছে কী করে পরিবেশন করলেন সেটা। কয়েক বিলিয়ন মানুষের পৃথিবীতে মানুষের ইতিহাস হোমো ইরেকটাসদের থেকেই যদি শুরু করেন, তাহলে ধরে নিতে হবে অজস্র গল্প যাপিত হয়েছে, যদি লিপি লিখবার ইতিহাস থেকে ধরেন তবুও অসংখ্য গল্প বলা হয়েছে। নতুন কিছু নেই। দেখাটা নতুন, দেখার সমন্বয়টা অভিনব। অমিতাভ ঘোষ পেরেছেন। অন্যরাও পারবেন বলে আশা করা যায়। 


এমদাদ রহমান : 
এই যে আপনি প্রবাসী বাঙালি লেখক হিসেবে বাংলা একাডেমি প্রদত্ত সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্‌ সাহিত্য পুরস্কার ২০১৯ পেলেন, এ সম্পর্কে আপনার অনুভূতি বা প্রতিক্রিয়া কী? 


সাগুফতা শারমীন তানিয়া : 
প্রথম প্রতিক্রিয়া অবশ্যই, "যদি নির্বাসন দাও, আমি ওষ্ঠে অঙ্গুরি ছোঁয়াবো, আমি বিষপান করে মরে যাবো।" এই পুরস্কারকে প্রবাসী বাংলা একাডেমী পুরস্কার ধরা হয় বলে জানি, বাংলাভাষার কাছে আমি প্রবাসী হলে বাংলার আপনভাষী আপনবাসী কে? লেখক বিচার করতে গেলে সে কোথায় বাস করছে সেটা অতটা গুরুত্বপূর্ণ হয় কী করে? 

কিন্তু এরপরেও কথা থাকে। এই পুরস্কারের সাথে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর অসাম্প্রদায়িক-মুক্তমনা-দেশপ্রেমিক নাম জড়িয়ে আছে, জড়িয়ে আছে বাংলা একাডেমীর নাম। উভয়ই আমার কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। 'আমি পুরস্কার পাবার জন্য লিখি না' কথাটা অনেকেই বলেন। কথাটা আমি এভাবে ভাবি না, আমি বলবো- আমি পুরস্কার না-পাবার জন্য কোনোদিন লিখি না। আমি আমার লেখার ব্যাপারে নিষ্ঠাবান, খুঁতখুঁতে এবং অত্যন্ত প্রতিযোগী মনোভাবসম্পন্ন। এ প্রতিযোগিতা প্রতিবার আগের বারের চেয়ে ভাল লিখবার, জীবনে যত ভাল লেখা আমি পড়েছি তাদের লেখকদের সাথে যুঝবার। সেখানে দাঁড়িয়ে পুরস্কার অবশ্যই একটা 'আবহাওয়া-সংবাদ', একটা সম্মানজনক ইঙ্গিত, একটি প্রনোদনাও। অতএব একটা খুশি, একটা প্রবল আনন্দ তো রয়েছেই। তবে মনে মনে এই পুরস্কারের আনন্দ 'প্রবাসী আইরিশ' সাহিত্যিক অস্কার ওয়াইল্ডকে তর্পণ করেছি। 

অল্প বয়েসে আমি একটা উপন্যাস পড়েছিলাম, নাম বোধ করি 'সেই অলৌকিক ইমন', এক সাঙ্ঘাতিক নামী ক্লাসিক্যাল গাইয়ে পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে এক রাজসভায় গান শোনাতে চলেছেন। পথ হারিয়ে ওঁরা হিমালয়ের কোলে এক সাধুর কাছে আশ্রয় নেন এবং সাধুর গলায় ইমন শোনেন। 'দেশে বিদেশে'তে সারারাত গান শুনবার যেমন অলৌকিক অভিজ্ঞতার কথা আছে, খানিকটা তেমন অভিজ্ঞতা হয় গাইয়ের, সকালে সাধুর সাথে আলাপচারিতায় তিনি বুঝতে পারেন সঙ্গীতে আত্মহারা হয়ে তিনি যাঁকে দেখেছিলেন তিনি রাগ ইমনের আত্মাপুরুষ, সঙ্গীতসাধনা করে সাধু রাগপুরুষকে প্রাণ দিতে পেরেছেন, শুধু তাঁর বাঁ হাতখানা আবছা, আবছা কারণ সাধুর সাধনা তখনো সম্পূর্ণ হয়নি। এই অভিজ্ঞতার পর সারা জীবনে আর সেই গাইয়ে ক্লাসিক্যাল গাইলেন না, এই গল্পটা আমি ভুলতে পারি না। এই যে সঙ্গীতে আত্মাপুরুষের শরীর অসম্পূর্ণ হয়ে থাকা...আর সেটাকে সম্পূর্ণ করে আনার সাধনা... আমার কাছে কিছু কিছু শব্দ খুব মূল্যবান, 'সাধনা' তার একটি। পুরস্কারে সলজ্জ আনন্দ আছে, শিহরণ আছে, নগদ প্রাপ্তি আছে, পাঠকের বিস্ময়কর অভিবাদন আছে। এর সবই সাধনায়ও আছে, তীব্র মাত্রায় আছে। 

আর পুরস্কারের সাথে সাথে অনেক সুইপিং কমেন্ট' শুনেছি, অগ্রজ-অনুজ অনেকের কাছেই শুনেছি। সেগুলো ব্যক্তিগত বেদনা হিসেবে জমা করে রাখতেও আমি অপারগ। সময় আর স্পৃহার অপচয় হয়। আমার অনেক কাজ আছে। 

এমদাদ রহমান : 
'সেই অলৌকিক ইমন' কার লেখা? 

সাগুফতা শারমীন তানিয়া : 
সুদীপ্ত মুখোপাধ্যায়ের লেখা। 

এমদাদ রহমান : 
সমালোচনাকে কীভাবে দেখেন? লিখতে গেলে কি তখন সমালোচকদের গুরুত্ব দেন না কি তাদের জন্যই লেখেন? আমি জানতে চাইছি, লেখার সময়, আপনার সামনে পাঠকরা থাকেন না কি আপনার সমালোচকরা? 
সাগুফতা শারমীন তানিয়া :  
আমি যদি কারো সমালোচনা করতে চাই, আমাকে বলতে হবে কীসের নিরিখে বলছি। কেউ ভুল করে 'মুসাফাহা' শব্দটাকে 'মোসাহাবা' লিখেছেন এবং আমি ব্যক্তিগতভাবেই তাঁকে জানিয়েছি যে এটা ভুল, তিনি সেটা জেনে আমার সাথে কথা বন্ধ করে দিয়েছেন এমন হয়েছে। আমার মনে হয় বাংলাদেশে সমালোচনার চর্চাই নেই। সমালোচনা হয় নস্যাৎ করার খেলা, নয় পিঠ চুলকাচুলকি। দুইই অগ্রহণযোগ্য। সমালোচনায় আমরা ব্যক্তিগত ক্রোধ আর অসূয়া ঢেলে দিই, অজ্ঞানতাও। আর যিনি ব্যক্তিগতভাবে আমার জন্য 'অর্থকরী', তাঁর গদ্য আমার কাছে 'অর্থবহ'...এমন একটা চল তো এসেছেই। সেখানে দাঁড়িয়ে সমালোচনা নিয়ে ইতিবাচক কিছু ভাবা যায় না। অতএব বাইরে যে সমালোচনা হয়, তা আমি গায়ে মাখি না। 

আমার খুব কাছের এবং পাঠক হিসেবে খুবই নির্ভরযোগ্য কিছু মানুষ আছেন, লেখা শেষ হলে কখনো ওঁদের পড়তে দিই, মতামত নিই, নিজেও কিছুদিন পর আগের লেখার কাছে ফিরে আসি, আরেকটু এডিট করি, কোথাও খোলাসা হয়নি মনে হলে সেটা প্রাঞ্জল করি। ঐ প্রক্রিয়াটুকুই আমার জন্য পাঠকের আয়না বা সমালোচনার আয়না। আমার ব্যক্তিগত সংশয় এবং আত্মসমালোচনার প্রবণতা আছে। 

পাঠকের কথা ভেবে যে লেখক লেখে সে 'পাগল' হতে পারে না, বোধহয় সন্দীপন বলেছিলেন তাই না? আমি সেটা মানি। পাঠক-সমালোচক কারো কথা মাথায় রেখে আমি লিখতে পারি না। তাতে হাত খুলে মন খুলে লেখা যায় না। 

এমদাদ রহমান : 
লেখালেখির নিরন্তর প্রক্রিয়ার সঙ্গে কীভাবে একাত্ম থাকেন? 

সাগুফতা শারমীন তানিয়া : 
আমি জানি না। সব ছেড়েছুঁড়ে হয়তো। পুরনো সিনেমার গানের মতন 'বলো, স্বজন কি আর হয় দু'জন, সে বিনে আর জানে না এ মন'। আমি আর কোনো প্রক্রিয়া জানি না যাতে আমি কারো কাছে পৌঁছতে পারি। আরো আরো মানুষের সাথে মোলাকাতের বাহানা, স্পর্শের বাসনা আর কোনোভাবে পূরণ হবে না তো! 

আমি বিশ্বাস করি, একটি শব্দের পরের শব্দ হতে হবে মোক্ষম, একটি বাক্যের পরে যে বাক্য এসে বসবে তাদের উভয়ের ভেতর অন্বয় থাকতে হবে, এতটাই যেন ইন-এভিটেবলিটি আছে মনে হয়। সেই কাজ প্রচুর সময় নেয়। 

এমদাদ রহমান : 
সঙ্গে কি সব সময় নোটবুক, পেন্সিল এসব রাখেন? 

সাগুফতা শারমীন তানিয়া : 
হ্যাঁ, সবসময় কলম থাকে, খসড়ার জন্য ক্যাশমেমোর কাগজের পেছনটা হলেও চলে, পরে বাড়ি ফিরে সেটা নোটবুকে টুকে নিই। গুগল কিপও ব্যবহার করি। 


এমদাদ রহমান :
নির্জন জায়গায় বসে লেখেন? 

সাগুফতা শারমীন তানিয়া : 
না। নির্জনতার দাবী বড় বিলাসী দাবী। আমার ছোটবেলায় একান্নবর্তী পরিবার খুব ভাললাগতো, ঘরদোর জমজম করবে লোকে। যেটাকে 'হটস' বলে, 'হাউজ অন টপ অভ শপস', নীচতলায় মুদিদোকান-লন্ড্রি আর ওপরতলায় বাসা-বাড়ি এইসব, সেই কোলাহলও আমার প্রিয় ছিল। একই কারণে প্রিয় পুরান ঢাকা এবং মালদহপট্টি, ভূতের ভয় প্রবল বলে 'বৈরাগ্যসাধনে মুক্তি' আমার জন্য প্রায় অসম্ভব। আর মাতৃত্ব ফুলটাইম জব, নির্জনতা চাওয়া যায় না তখন, লিখতে বসি বাচ্চাকে কাজ বুঝিয়ে দিয়ে...তারপর আবার ফিরে আসি আবার যাই। আমার সন্তান খুব সংবেদনশীল সহমর্মী শিশু, সে জন্মাবধি দেখে এসেছে মা লেখে আর আঁকে। ফলে আমি যখন লিখি ও আমার পাশে বসে পড়ে অথবা নীরবে অন্য কাজ করে, যখন আঁকি ও-ও পাশে বসে আঁকে। সিনক্রনাইজ করে নিয়েছি আমরা। 

এমদাদ রহমান : 
লেখক মায়ের পাশে সন্তানের বসে থাকার এই দৃশ্যটিও অসামান্য! 

সাগুফতা শারমীন তানিয়া : 
এইসব দৃশ্যের জন্ম হয়, সেটা খুবই ভাগ্যের। আমার মাও তো বসে থাকতো আমার পাশে, এমনকি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তাম, তখনও। 

এমদাদ রহমান : 
লেখালেখির জন্য দিনের কোন সময়টাকে আপনি বেছে নেন? 


সাগুফতা শারমীন তানিয়া : 
সকাল। প্রধানত, সকাল। একেবারে ভোরবেলা। 

এমদাদ রহমান : 
লেখালেখির জন্য আপনার ঘরে কোনও নির্দিষ্ট জায়গা আছে? 

সাগুফতা শারমীন তানিয়া : 
আছে। উজ্জ্বল ডে-লাইট আসা একটা ঘর, সেখানে আমার বইখাতা সবই থাকে। এটা বসার ঘর ছিল। সামাজিক জীবন সংকুচিত করে নেবার পরে এটাই আমার লেখার ঘর। 

এমদাদ রহমান : 
একদম নৈঃশব্দ্যে বসে লিখেন না কি আশেপাশে লোকজন থাকলেও লিখতে পারেন? 

সাগুফতা শারমীন তানিয়া : 
না, আশপাশে লোকজন থাকলেও লিখতে পারি, ওভাবেই লিখেছি আমি বরাবর। বুদ্ধদেব বসু প্রতিভা বসুর লেখা নিয়ে একজায়গায় লিখেছিলেন, সেখানে কোথায় বসার জায়গা আর কোথায় ঠাঁই নির্জনতার...কিন্তু লেখা চলছে। রাবেয়া খালা (রাবেয়া খাতুন) সম্পর্কে আমাদের বাড়িতে গল্প প্রচলিত ছিল যে উনি একহাতে লুচি বেলতেন, আরেকহাতে বই ধরে পড়তেন... এই গল্প আমার নানা অর্থাৎ রাবেয়া খাতুনের চাচা করতেন। জীবন খুব প্রশস্ত করে সুযোগ দেয় না সবসময়, কিন্তু কাজ চালিয়ে যেতে তো হয়ই। 

এমদাদ রহমান : 
প্রতিদিনই লেখেন? 

সাগুফতা শারমীন তানিয়া : 
হ্যাঁ। প্রতিদিনই কিছু না কিছু তো লিখিই, বা পুরনো লেখা এডিট করি। কাজে ছুটি মিলতে পারে, কাজ ছেড়েও দেয়া যায়। প্যাশনে ছুটি মেলে না, অবসেশন ছেড়ে দেয়া যায় না। প্রতিদিন না লিখলে আমার ভাল লাগে না। 

এমদাদ রহমান : 
যখন এক লেখা থেকে অন্য লেখায় যান, গল্প বা উপন্যাস, তখন কি ফর্ম ভাঙার চেষ্টাটা থাকে? 

সাগুফতা শারমীন তানিয়া : 
ফর্ম ভাঙার চেষ্টাটা আমি স্বজ্ঞানে খুব করি না, সেটা হয়ে যায় লেখার চরিত্র অনুসারে। ফর্ম ভাঙার চেষ্টা যতটা জরুরি, আমার কাছে স্টাইলও ততোটা জরুরি। গদ্য পড়ে নাম না দেখেই আপনি তখন বুঝে গেলেন কে লিখছে। 
এমদাদ রহমান : 
আপনি কেন লিখেন? 

সাগুফতা শারমীন তানিয়া : 
আই রাইট দেয়ারফর আই অ্যাম। 

এমদাদ রহমান : 
আই রাইট দেয়ারফর আই অ্যাম! 

সাগুফতা শারমীন তানিয়া :  
যে দেশের কোনও নাম নেই, যেখানে পোশাক নেই, যেখানে আমার হাতে কররেখা অব্দি নেই, সেইরকম কোনও শূন্যস্থানে গেলেও আমার একটা অস্তিত্ব চাই, সেই অস্তিত্বই লেখা। 

যে-বাড়িতে নোবেলজয়ী আইরিশ কবি শেমাস হিনি শৈশব কাটিয়েছিলেন, সে বাড়ির পাশ দিয়ে রেললাইন গেছে, রেলপথ বরাবর গেছে টেলিগ্রাফের তার। বৃষ্টির দিনে সেই টেলিগ্রাফের তার ধরে জলের ফোঁটা বয়ে যেত, আর ছোট্ট হিনি ভাবতেন টেলিগ্রামগুলো আসে আসলে বৃষ্টির ফোঁটায় বাহিত হয়ে... এভাবেই হয়তো জীবনে দেখা প্রতিটি বৃষ্টির ফোঁটা আমাদের কাছে আলাদা মানে হয়ে আসে, দেয়ালের প্রথম বৃষ্টির ঝাপটায় সৃষ্টি হয় অজস্র আশ্চর্যবোধক চিহ্ন। একরকমের কৌতূহল আর বিস্ময় থেকেই আমার লিখতে আসা, বিস্ময় চারপাশকে নিয়ে- যা কিছু ঘটমান প্রাকৃতিক আর সামাজিক পরিবেশে তাই নিয়ে। 'কেন লিখি' এই প্রশ্নের উত্তর আমি কখনো খুঁজি না যদিও। কেউ জিজ্ঞেস করলে হেসে বলি, 'আই রাইট দেয়ারফর আই অ্যাম'। 

এমদাদ রহমান : 
হ্যাঁ। আপনি নির্বাসনে গেলে কোন গল্পগুলো সঙ্গে নিয়ে যাবেন? 

সাগুফতা শারমীন তানিয়া : 
নির্বাসনে গেলে প্রিয়তম মানুষকে নিয়ে যাব, জীবনের প্রকৃত গল্প রচনার উপলক্ষ্যে। গল্পের বই নিয়ে কে যায়! 

এমদাদ রহমান : 
লেখার গন্তব্য অসংখ্য অজস্র মানুষ... 

সাগুফতা শারমীন তানিয়া : 
শুধু লেখালেখি নয়, আঁকাআঁকিও একাকীর যাত্রা। ভাস্কর্যও তাই। 

এমদাদ রহমান : 
সমস্ত সৌন্দর্যই...

সাগুফতা শারমীন তানিয়া : 
না। চলচ্চিত্র একার মাধ্যম নয়। স্থাপত্যকে যদি শিল্প বলেন, সেটা একার নয়। 


এমদাদ রহমান : 
নাটক, চলচ্চিত্র, আঁকাআঁকি, ভাস্কর্য সব কিছুই তো শেষ পর্যন্ত সাহিত্য। 

সাগুফতা শারমীন তানিয়া : 
হ্যাঁ। সবকিছুই আরেকটি মানুষের সঙ্গে মোলাকাতের বাহানা। স্পর্শের বাসনা। 


এমদাদ রহমান : 
লিখবার পোকা কখন মাথায় ঢুকেছিল? 

সাগুফতা শারমীন তানিয়া : 
লেখালেখি শিখবার আগেই। আমার পুতুল ছিল না। মা ফেলে দিত। মা ভাবতো পুতুল খেললে খালি বিয়ের চিন্তা মাথায় ঢুকবে। তো আমি আঙুল দিয়ে খেলতাম, ক্রমাগত গল্প বানিয়ে বানিয়ে। 


এমদাদ রহমান : 
কাদেরকে আপনি আপনার প্রকৃত পাঠক বলেবেন? 

সাগুফতা শারমীন তানিয়া : 
প্রকৃত পাঠকের সংজ্ঞা? প্রচুর পড়েছে যে, যে চট করে লেখকের চাতুরি ধরে ফ্যালে, জালিয়াতিও ধরে ফ্যালে (যদি থাকে), যে অখ্যাত-অনামা লেখকের বই পড়েও চমৎকার কিছু পেলে চমৎকৃত হয়, যে বেচা-কেনার সাহিত্যে বিক্রয়যোগ্য নয়। 


এমদাদ রহমান : 
লিখতে আপনার বেশি আনন্দ না কি পাঠে? 

সাগুফতা শারমীন তানিয়া : 
লিখবার আনন্দ নির্মিতির আনন্দ, পাঠের আনন্দ সমবেত সঙ্গীতের। দুটোই প্রিমিটিভ। দুটোই প্রবল। তবে প্রেম করার আনন্দ সিনেমায় প্রেমের দৃশ্য দেখবার চেয়ে অবশ্যই বেশি। আবার প্রেমের সিনেমা দেখাটা প্রেম করার চেয়ে কম ক্লেশকর। 

এমদাদ রহমান : 
এই যে বললেন- লিখবার আনন্দ নির্মিতির আনন্দ, পাঠের আনন্দ সমবেত সঙ্গীতের। অসামান্য কথা। 


সাগুফতা শারমীন তানিয়া : 
আমার তো এমনই লাগে। পাঠের আনন্দ তো লেখকের জন্য সঙ্গীতের মতো, সঙ্গতের মতো। 


এমদাদ রহমান : 
লিখবার সময় কি ডেস্কে প্রচুর বই রাখেন? 

সাগুফতা শারমীন তানিয়া : 
যে ঘরে আমি লিখি, আমার বেশিরভাগ বই সে-ঘরেই রাখা। আমার ডেস্ক নেই লিখবার, খাটে বসে লিখি, খুবই বাজে অভ্যাস, মা দেখলে বকতো। 

এমদাদ রহমান : 
কেন বকতেন? 

সাগুফতা শারমীন তানিয়া : 
মা বলতো, বিছানায় বসে কাজ করলে শরীর নষ্ট হয়, আলস্য বাসা করে, সৌষ্ঠব নষ্ট হয়... এইসব। 


এমদাদ রহমান : 
চেয়ারে বসে লেখেন না কেন? 

সাগুফতা শারমীন তানিয়া : 
লিখি না কারণ ডেস্কই নেই। খাবার টেবিল আছে একটা ছোট্ট কিন্তু সে ঘরটায় এত মোল্ড, আমার শ্বাসকষ্ট হয় থাকতে। 

এমদাদ রহমান : 
লিখলে কী ঘটে বলে মনে করেন?

সাগুফতা শারমীন তানিয়া : 
কী ঘটে? সবই ঘটা সম্ভব। লিখে বদল ঘটানো সম্ভব, অনেককিছুর বদল, সেটা বিস্ময়কর। 

এমদাদ রহমান : 
গদ্য-লেখাকে কি ক্লান্তিকর মনে হয় কখনও? 

সাগুফতা শারমীন তানিয়া : 
না, কখনো ক্লান্তিকর লাগেনি। ক্লান্তি লাগলে গদ্য লিখবার মতন এমন সময়সাপেক্ষ কাজ করা যায় না। স্থাপত্যের ছাত্রী ছিলাম যখন, তখন খুব মিনিমালিজমের জয়জয়কার ছিল, খুব করে বলা হতো 'লেস ইজ মোর', আর আমি প্রায়ই ঠাট্টা করে বলতাম আমি ম্যাক্সিম্যালিস্ট। অজস্র অনর্থকের অন্বিত সমন্বয় আমার ভাল লাগে। পরীক্ষায় প্রশ্নে 'ইলাবরেট' বা 'সম্প্রসারণ করো' বললে আমার মন নেচে উঠতো, ভাব-সংকোচ করতে দিলে কিছুতেই নির্দিষ্ট শব্দসংখ্যায় রাখতে পারতাম না। ফলে গদ্য লেখাটা আমার জন্য আনন্দের। 

এমদাদ রহমান : 
পছন্দের কোনও সঙ্গীত শুনতে শুনতে লিখে চলেন? 

সাগুফতা শারমীন তানিয়া : 
না। সঙ্গীত শুনতে শুনতে আমি অংক করতাম। কিন্তু লিখবার বেলায় কিছু শুনি না, উৎকর্ণ হয়ে লেখার ভিতরের দুনিয়ার রেডিওর শব্দ- বালার বাজনা- পাখার ঘটাং ঘটাং এইসব শুনি। একটা লেখা লিখবার সময় প্রজেক্টরের কিরকির শব্দ খুব শুনতে পেতাম মনে আছে। জুলিয়ান বার্নসের যে আলাপচারিতা আমি সামনাসামনি দেখেছি, সেখানে উনি বলেছিলেন উনি টাইপরাইটারে লেখেন, টাইপরাইটার একটা সরু গোঁ গোঁ শব্দ করে বেশিক্ষণ বন্ধ থাকলে, যেন তাড়া দিচ্ছে পরবর্তী লাইনের জন্য। শুনে খুব ভাল লেগেছিল। 
এমদাদ রহমান : 
আপনার কখনও টাইপরাইটারে লিখতে ইচ্ছে করেনি? 

সাগুফতা শারমীন তানিয়া : 
না। পেন্সিল আর কলম। তারপর, ল্যাপটপ। 

এমদাদ রহমান : 
শব্দকে আপনি কীভাবে অনুভব করেন? আপনি কি কখনও শব্দের গন্ধ পেয়েছেন? 

সাগুফতা শারমীন তানিয়া : 
শব্দই ব্রহ্ম, শব্দই আমার আরাধ্য। 'কঞ্চির তীরঘর ঐ চর জাগছে, বুনো হাঁস ডিম তার শ্যাওলায় ঢাকছে', শব্দই তো। 'পাতাবাহার চিরনি দিয়া তুলিয়া বান্ধ চুল' শব্দ। পামুকের নায়ক নায়িকার খোলা পিঠে মাথা রেখে টের পাচ্ছে অজস্র দুলন্ত সূর্যমুখীর হলুদ ক্ষেতে সে অন্ধ হয়ে আছে, শব্দ। সমারসেট মমের 'অফ হিউম্যান বন্ডেজ'-এ ডাক্তারখানার বিমর্ষ দেয়ালঘেরা কামরার কী অসামান্য বিবরণ, শব্দের পরে সাজানো শব্দই। মাহমুদুল হকের 'কালো বরফ', রশীদ করীমের 'প্রসন্ন পাষাণ', আহমদ ছফার 'পুষ্প বৃক্ষ এবং বিহঙ্গপুরাণ', আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের 'অন্য ঘরে অন্য স্বর'...এইসব আমাদের ভাষার শব্দসৌধ। শব্দের জন্যই ফিলিপ লারকিন অত বিতর্কিত, 'দে ফাক ইউ আপ, ইওর মাম অ্যান্ড ড্যাড।' একেবারে সেই লোকরঞ্জক 'ভোলা মওওওন' হাঁক, কিন্তু ভেবে দেখুন, তিনি এরপরপরই লিখছেন 'ম্যান হ্যান্ডজ অন মিজেরি টু ম্যান। ইট ডীপেনস লাইক আ কোস্টাল শেলফ', কী অদ্ভূত উপমা, কী বেদনা। শব্দের গন্ধ আমাদের শুঁকিয়েছিলেন বিভূতিভূষণ, আকাশের গায়ের টকটক গন্ধটাও সুকুমার রায়ের শব্দেরই কারসাজি। সৈয়দ মুজতবা আলী 'পঞ্চতন্ত্র'-তে একটি প্রতিবেশিনী মেয়ের প্রেম ভেঙে যাবার কথা জানলেন, 'হি ওয়াকড আউট অন হার', শুনে ওঁর মনে হলো কে যেন মেয়েটির কচি হৃদয় পায়ে হেঁটে মাড়িয়ে চলে গেল, এই যে অনুভূতির উদ্রেক, এই তো সাহিত্যের অভিপ্রায়, এই তো শব্দ। শুধু গন্ধ কেন, সাহিত্যিকের বুনে যাওয়া যুতসই শব্দ আমাকে রঙ দেখিয়েছে, উত্তাপ চিনিয়েছে, স্বাদে জড়িয়ে গেছে আমার জিভ, শিউরেও উঠেছি কতবার। 

এমদাদ রহমান : 
লিখবার মুহূর্তে আপনি কোথায় আছেন- এই বিষয়টি কি কখনও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে? 

সাগুফতা শারমীন তানিয়া : 
হ্যাঁ অনেকসময় সেটা হয়, হয়েছে। ভ্রমণ খুব গুরুত্বপূর্ণ, যে এলাকা বা জনপদ নিয়ে কাজ সেই এলাকায় একবার অন্তত ঘুরে এলে বেশ কাজে দেয় বলে আমার মনে হয়েছে। কিন্তু ঐ যে বল্লাম, যা অগম্য, যা কিছুতেই ধরা দেবে না, সেইসব স্থান-কাল-পাত্র লেখায় আসবে কল্পনাকে ভর করে। যে-যুদ্ধকে টলস্টয় অমর করে গেছেন, সে-যুদ্ধ যদ্দূর মনে পড়ে ওঁর জন্মেরও অনেক আগে সংঘটিত যুদ্ধ। যে জনপদকে রবীন্দ্রনাথ গল্পগুচ্ছে বারবার এনেছেন, সেই গ্রামজীবনকে জমিদারনন্দনের সেভাবে জানবার উপায় ছিল না, এটা তো আগেই বল্লাম। অনেকে সমরেশ বসুর 'গঙ্গা' আর মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'পদ্মা-নদীর মাঝি'র ভিতর একটা তুলনা আনেন, মানিকের দেখাটা একেবারেই ওপর-ওপর তবু উপন্যাসটি কী শক্তিশালী! 

এমদাদ রহমান : 
এতদিন তার আলো হাওয়ায় বেঁচে আছেন, আমিও আছি, এই পৃথিবী সম্পর্কে আপনার কী ধারণা হলো? 

সাগুফতা শারমীন তানিয়া :  
পৃথিবীতে সুস্থতার চেয়ে বড় কাঙ্খিত আমার কাছে আর কিছু নেই। সেটা আমার। প্রিয়জনদের। অচেনা জনেরও। মানুষে-মানুষে স্বস্তি ফিরবার স্বপ্ন হয়তো স্বপ্নই থেকে যাবে, তবুও। ভাষার আনন্দ নিতে আপামর বাঙালি পারঙ্গম হবে, পরের মুখের ঝাল খেয়ে হুসহাস করবে না, সেই স্বপ্ন আমার আছে। 

আয়ু নাকি সবচেয়ে বড় উপহার, অল্পবয়েসে ভাবতাম আঠার বছর বয়েসে মরতে হবে, কারণ সেটা কাব্যিক। আঠার পেরিয়ে গেলাম, কিন্তু মরলাম না। তখন ভাবলাম তেইশ, রবীন্দ্রনাথের কবিতার মুমুর্ষু মেয়েদের বয়েস। তাও পার হয়ে গেলাম, মরলাম না। অনেকবারই আমি মরতে চেয়েছি। কিন্তু জীবন মৃত্যুর চেয়ে তীক্ষ্ণতর, বেঁচে থাকতেই চাই এখন। ধরুন ভ্যালি অভ দ্য কিংসের কোনো সম্রাট যদি দেখেন, এত জাগতিক বৈভব সাথে নিয়ে- চাকরবাকর বেড়াল চিতাসহ মমিফাইড হয়ে তিনি আসলে একটা অন্ধকার স্থাবর সময়ের ভেতর স্থির হয়ে আছেন শুধু, সঙ্গে আনা মৃত চিতা তাঁকে আর কোনো জগতে তীব্র বেগে পৌঁছে দিচ্ছে না, আলোঝলমলে আর কিছুই তাঁর জন্য অপেক্ষমান নেই, যেমন ছিল মরজগতে? সেই প্রকান্ড স্থিতি আমি কল্পনাও করতে পারি না। তার চেয়ে বেঁচে থাকা সহজ। এমনকি এও কল্পনা করা আনন্দের যে, মৃত্যুর পরে শঙ্খচূর্ণির বেশে শ্যাওড়াগাছটাতেই ফিরে আসব। ঘুঙুর রহিবে লাল পায়।

এমদাদ রহনান ঃ
আপনাকে ধন্যবাদ।

সাগুফতা শারমীন তানিয়া : 
আপনাকেও ধন্যবাদ।।

৯টি মন্তব্য:

  1. বাহ! অসাধারণ! তানিয়ার পক্ষেই এমনভাবে বলা সম্ভব!

    উত্তর দিনমুছুন
    উত্তরগুলি
    1. রমাদি, তোমার ভালবাসা আর স্নেহ আমার যাত্রাকে বেগবান করেছে, সহনীয় করেছে, বরাবরই।

      মুছুন
  2. এই মন্তব্যটি লেখক সরিয়েছেন।

    উত্তর দিনমুছুন
  3. Oh my god! What an interview! I feel like I can see through what's going on inside the writer's mind from every words she utters, from every question she answers! She knows it, she feels it! So mesmerizing!

    উত্তর দিনমুছুন
  4. শ্রদ্ধেয় ম্যাম, বাহ! চমৎকার।
    অনবদ্য হয়েছে।

    উত্তর দিনমুছুন
  5. কি চমৎকার। ঝরঝরে একটি সাক্ষাৎকার। কোথাও কোথাও মনে হলো যেনো আমারও কথা আছে এখানে। কিন্তু আমি আপনার মত করে এমন বলতে পারতাম না। সাগুফতা আপা ও এমদাদ আপনাদের দুজনের প্রতি ভালোবাসা।

    উত্তর দিনমুছুন