শনিবার, ১৮ জানুয়ারী, ২০২০

সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের গল্প: খড়ম

একটা বয়স পর্যন্ত বাবা বলতে অজ্ঞান ছিল রাসেল, তারপর, জগৎ সংসারের অবধারিত নিয়মে, বাবা সম্পর্কে প্রকৃত জ্ঞানে ফিরল, অথবা প্রবেশ করল। এখন বাবাকে নিয়ে অনেক সমস্যা তার, অনেক কমপ্লেক্স। পারলে তাকে অগ্রাহ্য করে, অস্বীকার করে, অথবা ত্যাজ্যপিতা ঘোষণা করে।
পারলে বাড়ি ছেড়ে চলে যায় রাসেল, অথবা বিদেশে, যেখানে বাবা শুধু একটা ছায়া হয়েই থাকবেন, কায়া হয়ে নয়। পারলে... যাকগে, পারাপারির বয়সটা এখনো হয় নি রাসেলের, অথবা বয়স হলেও সাধ্যটা জন্মায় নি। যতই লুকিয়ে চুরিয়ে দু'-এক টিউশনি করুক সে, শেষ পর্যন্ত খরপোশের জন্য বাবার ওপরই তো নির্ভরশীল, নাকি ?

সিলেট মেডিকেল কলেজে দ্বিতীয় বর্ষে পড়ে রাসেল। মেধাবী ছাত্র, আদর্শবাদীও। আদর্শটা বাম ঘেঁষা, সেজন্য, তার ধারণা, বাবার সঙ্গে দূরত্ব। বাবা বিত্তবান, প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। অথচ রাসেল চেয়েছিল, বাবা বিত্তবান নয়, চিত্তবান হবেন। টাকাপয়সা বিলিয়ে দেবেন গরিব-দুঃখী মানুষকে, উত্তরের মঙ্গা-পীড়িত খেতমজুরদের, পুলিশের নির্যাতনে পঙ্গু তার ছাত্র সংগঠনের দু'-এক বন্ধুকে, যারা ব্যাংকক না হোক মাদ্রাজ-ভেলোরে চিকিৎসা করাতে পারলেও জীবন ফিরে পায়। বাবাকে এসব বলার সাহস পায় না রাসেল : সে জানে বাবা কী-প্রতিক্রিয়া দেখাবেন।মা'কে বলেছে, মা মৃদু কণ্ঠে বাবাকে বলেছেন কি বলেন নি। ফলাফল হয়েছে শূন্য।

সিলেট মেডিকেলে তার পড়াটাও বাবার স্বেচ্ছাচারিতার কারণে । ঢাকা মেডিকেলে সুযোগ পেয়েছিল রাসেল, কিন্তু বাবা যেতে দেন নি। এইটুকুন ছেলে, ঘরেই থাকুক, এখানেই পড়ক, বলেছেন বাবা। রাসেলকে নয়, তার মাকে। মা, রাসেলের আপত্তিটা তার নিজের ক্ষীণকণ্ঠে তুলে নিয়ে বলেছেন কি বলেন নি, ছেলেটা যখন ঢাকা যেতে চায়, যাক না। বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে মাটির দিকে তাকিয়ে থেকে বলেছেন, ছেলেটাকে এখনই চোখের আড়ালে পাঠাতে চাই না। ও চলে গেলে বাড়িটা খালি হয়ে যাবে, আমার...।

বাবা অনেক সময় কথা শেষ করেন না। এটি তার পুরোনো অভ্যাস।

বাবাকে নিয়ে রাসেলের এটিও একটি সমস্যা। ভালো যোগাযোগ বলতে যা বোঝায়, বাবার সঙ্গে, শিশুকালের সেই অজ্ঞানতার সামান্য সময় বাদ দিলে, কোনোদিন তেমনভাবে তৈরি হয় নি। বাবা শত রাগলেও বাইরে তার প্রকাশ দেখান না। বড় জোর কথা বন্ধ করে দেন। কথা বন্ধ হওয়া মানে তার চারদিকে একটা দেয়াল উঠে যাওয়া। সেই দেয়াল ভাঙার সামর্থ অথবা আগ্রহ, কোনোটাই রাসেলের নেই।

বাবার সঙ্গে যোগাযোগের যে স্বর্ণসময় রাসেল পার করেছিল, তার ব্যাপ্তি ছিল চার বছর। পর পর দুই মেয়ের পর পাঁচ বছরের ব্যবধানে জন্মেছিল রাসেল। না, ঠিক সে কারণে যে রাসেলকে মাথায় তুলে রাখতেন বাবা, তা নয়। ছোটবেলা থেকেই রাসেল ছিল জেদি। আর কাঁদত খুবই কম। আঘাত পেলে অথবা এরকম কোনো কারণ দেখা দিলে একটু আধটু যা কাঁদত; বাকি সময় হাসিখুশি, অথবা জেদি। এরকম চরিত্র বাবার খুব পছন্দ ছিল। কেউ কোলে তুলে নিলে অবশ্য জেদ চলে যেত রাসেলের, বিশেষ করে বাবা। বাবার কোলেই থাকত, তার চুল নিয়ে খেলত, চশমা নিয়ে খেলত, তার বুকে ঘুমিয়ে পড়ত, আর লোল ফেলে ফেলে ভিজিয়ে দিত পাঞ্জাবি গেঞ্জি। বাবাকে বাসার বাইরে বেরুতে দেখলে চিৎকার শুরু করত। এমনও দিন গেছে, বাবা তাকে নিয়ে আড়তে, নয় ফ্যাক্টরিতে, চলে গেছেন, আর ঘরে বসে দুশ্চিন্তায় নীল হচ্ছেন মা। ফ্যাক্টরিতে একটা বিরাট গনগনে চুল্লি ছিল--মা'র ভয়টাসেই চুল্লি নিয়ে।

চার বছর বয়সে মা'কে পুনরাবিষ্কার করল রাসেল, বোনদেরও। মা ও বোনেরা পুনরাবিষ্কারের ঘটনায় চিত্তহারা হলেন। এর মধ্যে দু'বোনের সঙ্গে স্কুলে যাওয়া শুরু করল রাসেল। বাবার সঙ্গে দূরত্বটা একটু একটু বাড়তে থাকল।

একটা সময় রাসেলের মনে হলো, বাবা মানুষটা আসলেই জটিল। পাড়ার ক্রিকেট টিমে ঢুকেছিল সে, তাকে বলা হলো বাবার কাছ থেকে চাঁদা নিয়ে আসতে। ব্যাট বল প্যাড এসব কিনতে টাকার দরকার। রাসেল বাবাকে বলেছিল টাকার কথা, বাবা বলেছিলেন, তাকে তিনি একটা ব্যাট কিনে দিবেন, কিন্তু পুরো দলকে নয়।
কেন বাবা, তোমার তো অনেক টাকা।

হ্যাঁ, টাকা অনেক বটে, কিন্তু এ টাকা উপার্জন করেছি ভালো কাজের জন্য, অন্যের ছেলেকে ক্রিকেট ব্যাট কিনে দেওয়ার জন্য নয়, বাবা উত্তর দিয়েছিলেন।

সত্যি সত্যি রাসেলের জন্য সুন্দর একটা ব্যাট কিনে এনেছিলেন বাবা। মার্কার কলম দিয়ে তাতে লিখেও দিয়েছিলেন, পরিশ্রমটাই বড়, ফলের আশা করাটা নয়, ইতি বাবা, যেমন লিখে দিতেন তার জন্মদিনে দেওয়া বইয়ের পাতায়। কিন্তু রাসেল সে ব্যাট ছুঁয়েও দেখে নি, দল বেঁধে বন্দরবাজার আর মহাজন পট্টির ব্যবসায়ীদের থেকে চাঁদা তুলে রাসেল ও তার বন্ধুরা ক্রিকেট সামগ্রী কিনেছিল। বাবাকে অবশ্য তা বলা হয় নি। হয়তো উচিত ছিল বলা। কে জানে।


কলেজে পড়ার সময় রাজনীতিতে ঢুকে পড়ে রাসেল। ঠিক হুজুগে নয়; মনের ভেতরে জমতে থাকা নানা চিন্তা-ভাবনা-দর্শনের চাপেই কাজটি করেছিল সে। বাম রাজনীতি, সক্রিয় রাজনীতি। মিটিং-মিছিল তো ছিলই, রাত জেগে চিকা লেখা অথবা পোস্টার সাঁটানোর কাজও করতে হতো তাকে। বাবা একদিন তাকে ডেকে বলেছিলেন, বাবা, রাজনীতি করার সময় এখন নয়। তাছাড়া...।
রাসেল খুব স্পষ্টভাবে তার চিন্তাগুলি জানিয়ে দিয়েছে। বলেছে, বাবা, আমি যা করছি, বিবেকের তাড়নায় করছি।

রাজনীতি করতে চাইলে করবে, কিন্তু বাবা, তার আগে পড়াশোনাটা শেষ করো। পড়াশোনা না করলে...

বাবা বাক্য সমাপ্ত করার চাইতে দীর্ঘশ্বাসে মনাযোগী হয়ে পড়লে রাসেল তার সামনা থেকে চলে গেছে। মাকে বলেছে, তোমাকে যদি বাবা জিজ্ঞেস করেন, বলবে, রাজনীতি আমার শিক্ষারই একটি অংশ।

মা বলেছেন, বুঝতে পারলাম না, বাবা।

বই-পুস্তক পড়ে যা শেখা যায় মা, রাজনীতি তার থেকে বেশি শেখায়। জীবন-ঘনিষ্ঠভাবে শেখায়। এরপর মাকেও চুপ করে থাকতে হয়েছে।

২.

বাবার সঙ্গে আরও দূরত্ব বেড়েছে বাবার জীবনযাপনের পদ্ধতির জন্য। বাম ছাত্র-রাজনীতি করলেও, গরিবের রুটি-রুজি অধিকারের জন্য সংগ্রামী জীবন বেছে নিলেও, কিছু ব্যাপারে রাসেলের রুচি রয়ে গেছে নিতান্তই বুর্জোয়াসুলভ। বড়বোন ফারহানা অথবা ছোটবোন ইমরানা এ নিয়ে অনেক ঠাট্টা করে, কিন্তু রাসেল এসব আমলে আনে না। বাবার পরিধেয় হচ্ছে ঘরে লুঙ্গি-গেঞ্জি-পাঞ্জাবি, বাইরে সাদা লুঙ্গি ও লম্বা শার্ট। রাসেলের গা জ্বালা করে এই বেশভূষা দেখে। ইমরানা বলে, ভাইয়া, তুই না লুঙ্গি গামছার জন্য বিপ্লব করছিস, লুঙ্গি সহ্য করতে পারিস না কেন ? রাসেল বলে, গরিব মানুষ যাতে লুঙ্গি পরেই থাকে সারাজীবন, আর কোনো ভালো বেশবাশ তাদের না জোটে, বুড়োয়া সমাজ তো তা-ই চায়। আমি লুঙ্গির বিরুদ্ধে। বাবার সাদা লুঙ্গি তার কাছে একটা রুচিহীন বস্ত্র মনে হয়। সাদা লুঙ্গিকে সে গ্রাম্য ক্ষমতা, মোড়ল সংস্কৃতি এবং ক্ষয়িষ্ণুতার প্রতীক হিসেবেও দেখে। বাবাকে এ কথাগুলো বলতে ইচ্ছে হয় নি, মাকে বরং বলেছে। মা হেসেছেন, কিন্তু বাবাকে বলেওছেন। বাবা একদিন রাসেলের চুলে হাত চালিয়ে বলেছেন, তুই যেদিন নিজের টাকায় শার্ট-প্যান্ট কিনে দিবি বাবা, সেদিন ওসব পরব। তারপর হা হা করে হেসেছেন।


ছেলেবেলায়, সেই অজ্ঞানতার সময়, বাবা এভাবে চুল নেড়ে আদর করতেন। সেদিনও চুল নেড়েছেন। ফলে রাসেলের রাগের কথাগুলো গলাতেই আটকে গেছে।


​ফারহানা-ইমরানা দুজনেরই বিয়ে হয়ে গেছে। নিজেদের জীবন নিয়ে তারা ব্যস্ত। তারপরও, মাঝে মাঝে যখন বেড়াতে বা থাকতে আসে বাবা-মায়ের সঙ্গে, রাসেলকে নিয়ে তাদের উদ্বেগের কথাগুলো জানাতে ভোলে না। রাজনীতি কদর্য জিনিস--এরকমই তাদের বিশ্বাস। রাজনীতি করে নষ্ট হয়ে গেছে, জীবনে পিছিয়ে পড়েছে--এরকম অনেক ছেলের উদাহরণ তারা টানে। রাজনীতি করতে গিয়ে মারামারিতে পঙ্গু হয়েছে, অথবা মারা পর্যন্ত গেছে, এরকম ছেলের উল্লেখও তারা করে, তবে এই উল্লেখে একটা চাপা শঙ্কা থেকে যায় : 'খোদা না করুক...' এরকম শর্ত দিয়ে শুরু হয় তাদের বক্তব্য।


রাসেল তিতিবিরক্ত হয়। তার ধারণা, বাবার প্রভাবে দুই বোনের এই রাজনীতি বিরোধিতা। তোমরা দুজনই বাবার মতো প্রতিক্রিয়াশীল, সে বলে । বাবার মতো জীবনের সব নষ্ট, কীটদষ্ট চিন্তা, বিষয় সম্পত্তি আর শ্রেণি অবস্থান ধরে রাখতে চাও।


​রাসেলের জেদ সম্পর্কে দুই বোনের আছে প্রত্যক্ষ ধারণা। তারা জানে, তাকে খুঁচিয়ে কোনো লাভ নেই। শুধু ফারহানা, বাবার জন্য নিঃশর্ত এবং নিরঙ্কুশ ভালোবাসা থাকার কারণে, তাকে নিয়ে রাসেলের মন্তব্যের বিরোধিতা করে। আর যাই বল, বাবাকে প্রতিক্রিয়াশীল বলবি না, খবরদার।


​রাসেল বলে, বাবা শুধু সম্পদ বাড়াচ্ছেন। প্রভাব প্রতিপত্তি বাড়াচ্ছেন। বাবা কি নির্বাচনে দাঁড়াবেন? মনে হচ্ছে জাতীয়তাবাদী নয়তো মৌলবাদী ঝাণ্ডা নিয়ে নামবেন শিগগিরই।


​ফারহানা রেগে যায়। রেগে গেলে বাবার মতোই সে কথা বন্ধ করে দেয়। তারপর উঠে যায় কথাবার্তা ছেড়ে। 


​রাসেল বুঝল একটু বেশি বলা হয়ে গেছে, কিন্তু জদি বলি কথা। সে বলল, বাবা চোখে সুরমা দিচ্ছেন আজকাল, দেখেছ?


​রাসেলের কথা শোনার জন্য ফারহানা বসে নেই। ইমরানা আছে, সে বলল, তাতে কী হয়েছে ?


​কী হয়েছে মানে ? সাদা লুঙ্গি, সাদা শার্ট, চোখে সুরমা। বুঝতে পারছ না, কোনদিকে যাচ্ছেন বাবা ?


​তোর মাথাটা একদম নষ্ট করে দিয়েছে ওই বীজনীতি, বাঁদর কোথাকার। বাবা সাদা লুঙ্গি পরেন তার জন্মের আগে থেকে। 


​কিন্তু সুরমা ? 


​সুরমা চোখে দিলে চোখটা আরাম পায়, তাতে তার কী সমস্যা ? তুই বরং এক কাজ কর ভাইয়া, ইমরানা বলে, বাবাকে কেন দেখতে পারিস না, তার কারণগুলো একটা কাগজে লিখে দে। আর বাবা কী কী করলে তোর কাছে গ্রহণযোগ্য হবেন, তারও একটা তালিকা কর। দুটো তালিকাই আমি বাবাকে পৌঁছে দেব।


​ইমরানা রাগলে কথা বেশি বলে। কথা শেষও করে। বাবার সঙ্গে তার মিল সামান্যই। তার পরও বাবার জন্য এখনো সে অজ্ঞানতার পর্যায়ে রয়ে গেছে।


বাবার যেসব বিষয় রাসেলের অপছন্দ, তার তালিকা করতে বল আসলেই বেশ লম্বা হয়ে যাবে। কিন্তু এ মুহূর্তে এ তালিকায় একটি বস্তুর নাম--একজোড়া বস্তুর নাম, যদি সঠিকভাবে বলতে হয়--সবার উপরে বসিয়ে দিতে ইচ্ছে হয় রাসেলের, এবং তা হচ্ছে বাবার দুটি কাঠের খড়ম। ইমরানা রাগ করে চলে যাওয়ার পর কাঠের খড়মে খটর খটর আওয়াজ তুলে বাবা এসে ঢুকলেন। কী হয়েছে বাবা, রানা রেগছে কেন?


​এই আরেক সমস্যা, ছেলেমেয়ের সামান্য কিছু হলেই একেবারে অস্থির হয়ে পড়েন। রাসেল একদিন বলেছিল বাবাকে, উই আর অল গ্রোন আপ, বাবা। কেন এত ভাব ? কেন সামান্য কারণে এত হু-হা করো?


​বাবা হেসে বলেছিলেন, ছেলেমেয়েরা কখনো বড় হয় না, বাবা।


​আজ বাবার সঙ্গে কথা বলার কোনো ইচ্ছা ছিল না রাসেলের, কিন্তু বলতে বাধ্য করল বাবার খড়ম। এই হরিব্‌ল জিনিসটা পায়ে না দিলেই নয়, বাবা?


​কাকে হরিব্‌ল বলছিস ? এই খড়ম জোড়া আমার বাবার। তা ছাড়া...।


​বাবার অসমাপ্ত চিন্তা কখন জোড়া লেগে সমাপ্ত হয়, তা দেখার সময় রাসেলের নেই।



দাদার খড়মজোড়া বাবা মাঝে মধ্যে পরতেন, কিন্তু এটি এখন কেন তার সার্বক্ষণিক সঙ্গী হয়ে গেছে, রাসেলের মাথায় তা আসে না। এখন বাবা এই খড়ম পায়ে বাইরে বেরোচ্ছেন। বন্ধু-বান্ধবেরা হাসাহাসি করে। কেউ কেউ নাক সিটকায়। ঠিক আছে, খড়ম যদি পরতেই হয়, ঘরে পরো, এবং স্ট্র্যাপ লাগানো এক জোড়া যথাযথ খড়ম। এখন যেটি আছে সেটি খ্রিষ্টপূর্ব মডেলের। পায়ের আকৃতির এক ইঞ্চি পুরু কাঠ, তাতে পায়ের বুড়ো আঙুল আর প্রথমা যেখানে থাকার কথা, ঠিক তার মাঝখানে কাঠের একটা উঁচু পেগ অথবা কিলক। ব্যস, এই খড়ম পরে দাঁড়িয়ে থাকাটাই কঠিন, কীভাবে যে এটি পায়ে দিয়ে মানুষ হাঁটে! মানুষ মানে বাবা একাই। আর কে পরে এই বীভৎস খড়ম? কী নাম এর ? পেগ খড়ম? দু'আঙুলে খড়ম? কিলক খড়ম? ডারউইন খড়ম? দুটি আঙুলে কাঠের ওই কিলককে চেপে হাঁটার মধ্যে ডারউইনের সেই বাঁদর তত্ত্বের একটা প্রতিফলনই দেখে রাসেল। 


​খড়মের ব্যাপারে অনেক কিছু করেছে রাসেল, কোনো কাজ হয় নি। মা'কে বলেছে, ছোটচাচাকে বলেছে, এমনকি যা সে জীবনে করে নি কোনোদিন, সেই বড় আপুর স্বামীকে, অর্থাৎ বড় দুলাভাইকে, অনুরোধ করেছে কিছু একটা করতে। বড় দুলাভাই সরকারি কর্মকর্তা। শ্বশুরকে সমীহ করেন। তবুও তিনি কথা রেখেছেন। কিন্তু শ্বশুর তাকে বলেছেন, এটি ঐতিহ্যে ফিরে যাওয়ার মতো একটা ব্যাপার। কথাটা তারও মনঃপূত হয়েছে। তিনি বলেছেন, রাসেল, ঐতিহ্যকে সম্মান দেখাও। তাতে তোমার রাজনীতি উন্নত হবে।


​এরপর রাসেল নিজের লুকানো টিউশনির পয়সায় বাবার জন্য বাটার এক জোড়া দামি স্যান্ডেল কিনে এনেছে। বাবা একটা ছোটখাটো উৎসব করে ওই স্যান্ডেল জোড়া পরেছেন। পাড়ার সবাইকে দেখিয়েছেন, মেয়ে-জামাইদের সঙ্গে স্যান্ডেল পায়ে ছবি তুলেছেন। দ্যাখো, আমার ছেলে দিয়েছে আমাকে স্যান্ডেল কিনে, তিনি বলেছেন। কিন্তু ওই পর্যন্তই। খড়ম ছাড়েন নি। যদিও ঘরে তেমন আর পরেন না। 


​এক দুপুরে বাবা ঘুমিয়ে পড়লে রাসেল খড়ম জোড়া ফেলে দিতে গিয়ে দেখল, মহা যত্নে ওই খড়ম আর তার দেওয়া বাটার স্যান্ডেল পাশাপাশি রেখেছেন বাবা। একটা কাপড় বিছানো সেগুলোর ওপর, যেন একটু ধুলাও না পড়ে মহামূল্যবান বস্তুগুলোর ওপর।


​নিতান্ত বিরক্ত হয়ে বেরিয়ে গেল রাসেল। ধ্যাৎ। 


মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এক রোগী মারা গেছে, বলা হচ্ছে ডাক্তারের অবহেলায়। রোগীর আত্মীয় স্বজন হামলা করেছে ডাক্তারের ওপর।


​এই ডাক্তার কোনো ছাপোষা ডাক্তার নয়। সরকারি দলের ডাক্তার সংগঠনের হোমরা চোমরা। হাসপাতালের পরিচালক অথবা কলেজের প্রিন্সিপ্যাল, সবাই তাকে তোয়াজ করেন। তার পক্ষে আছে সরকারি দল, সরকারি দলের ছাত্র সংগঠন। এরকম প্রভাবশালীর গায়ে হাত ?


​ফলে, যা হবার তাই হলো। গরিব আত্মীয়স্বজনকে পুলিশ পাকড়াল, পেটাল, হাতে পায়ে দড়ি দিয়ে থানায় নিয়ে গেল। সরকারি নেতা হওয়ার জন্য ডাক্তার সাহেবকে অবশ্য ডাক্তারি করতে হতো না, তার পেশা ছিল নেতাগিরি। রোগী যে মরল, তার আসল কারণ ওই অবহেলাই। কিন্তু সত্য কথাটা বলার সাহস কার আছে? ক্রিটিক্যাল রোগীকে একবার দেখে একজন অধস্তনের ওপর তার দায়িত্ব দিয়ে তিনি হাওয়া হয়ে গিয়েছিলেন। ঠিক হাওয়া নয়, তিনি গিয়েছিলেন এক প্রভাবশালী মন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে, সার্কিট হাউসে। মন্ত্রীর স্ত্রীর নামে মেয়েদের একটি হলের নাম রাখার প্রস্তাব নিয়ে।


​রাসেলের ছাত্র সংগঠন রোগীদের পক্ষে অবস্থান নিল। তারা গরিবদের বন্ধু; তাছাড়া সরকারি ডাক্তার-নেতার নানা অনাচার অত্যাচারে তারা ছিল মহা বিরক্ত। তারা তার অপসারণ ও মৃত রোগীর গরিব আত্বীয় স্বজনের মুক্তির দাবিতে ধর্মঘট ডাকল।


​সরকারি ছাত্র সংগঠন এবার মাঠে নামল। এরা মাঠে নামলে যা হয়, তাই হলো। তাদের সঙ্গে যোগ দিল পুলিশ, সরকারি ঠিকাদার, সরকারি ডাক্তার ও নার্স সংগঠন, সরকারি শিক্ষক সংগঠন...।


​রাসেলকে কলেজে যেতে বারবার নিষেধ করেছিলেন মা। বাবা ঢাকা গেছেন ব্যবসার কাজে। তিনি থাকলে হয়তো রাসেল অত সহজে যেতে পারত না, অনেক লুকোচুরি করে তবেই যেতে হতো। যত যাই হোক, এখনো বাবাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ দেওয়ার মতো অবস্থানে আসতে পারে নি সে। কিন্তু বাবা ফিরবেন চারদিন পর। একটা ছোটখাটো স্বর্ণযুগ রাসেলের জন্য। কাজেই তাকে মিছিলের সামনে দেখতে পেলে আমরা অবাক হব কেন ?


​মূর্খ রাসেল, মূর্খ রাসেলের বন্ধুরা, আমরা বলব। কিন্তু একটি কালো ছায়া যদি সাদা দিন ঢেকে দিতে থাকে, এবং ওই কালোর বিরুদ্ধে কিছু মূর্খ তরুণ দাঁড়িয়ে যায়, তাহলে তাদের কি শাপান্ত করব আমরা, নাকি চোখের জল মুছে আশা ভরসা নিয়ে তাকিয়ে থাকব, এবং বলব, তোরা আছিস বলেই আমরা এখনো আছি, বাছারা। কিন্তু প্লিজ, বাড়ি ফিরে আয় । মা'রা যেন না কাঁদে।


​মূর্খ যেহেতু, মাকে না কাঁদিয়ে পারল না রাসেলের এক বন্ধু। হয়তো কিছুটা কম মূর্খ রাসেল, না হলে সে শুধু সরকারি ছাত্র ক্যাডারদের আর পুলিশের লাঠিপেটা আর বুটের আঘাত খেয়ে, পুলিশের হাতে চ্যাংদোলা হয়ে পুলিশের ভ্যানে সমর্পিত হয়ে থানায় এসে আশ্রয় পাবে কেন ?


​তবে একে আশ্রয় না বলে ভাগাড়াশ্রয় বলাই ভালো হয়। ভাগাড়ে যেরকম মড়া কুকুর বা বেড়াল ছুঁড়ে ফেলে কেউ, সেরকম রাসেলকেও ছুঁড়ে ফেলল দুই পুলিশ । ভাগাড় থেকে মিউনিসিপ্যালিটির ময়লা গাড়ি যেরকম নিয়ে যায় মড়া কুকুর বা বেড়ালকে, কোনো গার্বেজ ডাম্পে পুঁতে ফেলা বা পুড়িয়ে ফেলার জন্য, থানার হাজত থেকে পরদিন সকালে নিয়ে যাওয়া হবে তাকে আদালতে। আদালতে গেলে, মুর্ছা যাওয়ার মতো অবস্থায় পৌঁছেও রাসেল জানে, তাকে পুড়িয়ে বা পুঁতেই ফেলা হবে।


​শেষ বিকেলে ঘটনাটা ঘটেছে, অর্থাৎ মিছিলে আক্রমণ, মারামারি, গ্রেপ্তার; এখন সন্ধ্যা ঘন হয়ে বিছিয়ে আছে বাইরে। হাজত ঘরের উঁচুতে একটা ঘুলঘুলি, অন্ধকার ঢুকছে সেই ঘুলঘুলি দিয়ে। একটা কম পাওয়ারের বাতি জ্বলছে । রাসেল শুয়ে আছে মেঝেতে, তার আশেপাশে তার দু'-এক সহযোদ্ধা, কিছু চোর-বদমাশ এবং প্রচুর মশা। কিন্তু সেসব খেয়াল করার মতো অবস্থায় রাসেল নেই।

​প্রথম যখন মার খেয়েছিল, এক সরকারি ক্যাডারের লাঠির বাড়ি, যা পড়েছিল পিঠে আর পায়ের ঊরুতে, সে মাটিতে পড়ে গিয়েছিল । তারপর উঠে দৌড়াতে গিয়ে দ্বিতীয়বার মার খেয়েছে পুলিশের। লাঠির বাড়ি। এবার পড়ে গেলে খেয়েছে বুটের লাথি। তলপেটে লাথি পড়ায় সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলেছিল রাসেল । তাতে রক্ষা পেয়েছে সে। মাটিতে নিস্তেজ পড়ে থাকার জন্য তাকে আরও দু'-এক বাড়ি মেরে অন্য শিকারের পেছনে ছুটে গেছে পুলিশ ও ক্যাডার। রাসেলকে মৃত ভেবেই ফেলে গেছে হয়তো--যদিও গাড়িতে তোলার সময় সংজ্ঞা ফিরেছে তার। তারপর এই হাজতে ছুঁড়ে ফেলার পর সংজ্ঞাটা উঠে দাঁড়ানোর মতো কিছুটা শক্তি পেয়েছে, কিন্তু সে শুধু তার শরীরের প্রকৃত অবস্থা বুঝতে পারার জন্য। প্রকৃত অবস্থা যে শোচনীয়, সেটি নিজেকে বলে দিতে হয় নি। পিঠ থেঁতলে গেছে, পেট থেঁতলে গেছে--অথবা সেরকমই মনে হচ্ছে তার। দুই হাতে প্রচণ্ড ব্যথা, ঊরুতে মাংস ফেটে রক্ত বেরুচ্ছে। মাথা ফেটেছে কি না, বলতে পারে না।

​একটা প্রবল আচ্ছন্নতার মধ্যে সে পড়ে থাকল মেঝেতে। সে কিছুতেই বুঝতে পারছে না কী হয়েছে, কেন হয়েছে। জীবনে কখনো তার গায়ে কেউ হাত তোলে নি--বাবাও না, কখনো না। আজ যখন সে মার খাচ্ছিল ক্রমাগত, একটা বোধই তাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছিল, এই যে লাঠি পড়ছে, শরীরে বুটের আঘাত পড়ছে, একী তার গায়ে ? খালেদুর রহমান রাসেলের গায়ে ? কেন ? কেন ?

​অস্তিত্ব এবং অনস্তিত্বের মাঝখানে ঘোর লাগা একটা সময়ে সে শুনল, কেউ যেন বলছে, 'জ্যান্ত বেরুতে দিবা না', আরেকজন যেন প্রতিধ্বনি করল, 'একটু রাত হোক, স্যার।'একজন বলল, 'মার্ডার কেস', আরেকজন বলল, 'জীবনেও যেন আর হাঁটতে না পারে।' রাসেল অবাক হলো, এত স্পষ্ট শুনছে সে কথাগুলি, বিন্তু কিছুতেই বুঝতে পারল না, কারা বলছে, কার কথা বলছে, কেন বলছে।


​রাসেল বুঝল, তার শরীর তার নিয়ন্ত্রণে নেই। তার খুব অভিমান হলো, তাকে কেন এরা মারল। লাঠি দিয়ে, বুট দিয়ে। অভিমান নিয়েই সে মুখ ফিরিয়ে শুয়ে থাকল।


​কার ওপর অভিমান, আমরা বলতে পারব না।


অনেক রাতে চেতনার প্রান্তে জেগে উঠল রাসেল। কত রাত, এ প্রশ্ন তার মনে জাগলেও উত্তর মিলল না। হাতের ঘড়িটা, গত জন্মদিনে বড় আপু যা কিনে দিয়েছিল তাকে, কেউ নিয়ে গেছে। মশা উড়ছে মহামারীর মতো। রক্ত চুষে গায়ে লেপ্টে আছে। আশপাশে কিছু গোঙানির শব্দ। একবার চেতনা ফিরেছিল এক তীব্র চিৎকারের শব্দে। তারই কোনো সহযোদ্ধা হয়তো, অথবা অন্য কেউ। রাসেল জানার চেষ্টা করে নি, কে, কেন এই অমানুষিক চিৎকার। তার কেবলই মনে হয়েছে, সে নেই, অথবা সে অন্য কেউ। সে যদি থাকে, তবে আছে অন্যের জীবন ধার করে। আসল রাসেল এখন শুয়ে আছে নিজের ঘরে, নিজের বিছানায় । রাতে সে টিভিতে খেলা দেখতে দেখতে ভাত খেয়েছে, তারপর মাই সঙ্গে দিনের নানা গল্প করেছে, তারপর ঘুমিয়ে পড়েছে। মা আস্তে তার গায়ে একটা চাদর টেনে দিয়েছেন।


​সহযোদ্ধার চিৎকারে সেই ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। তারপর আবার বেশ তলিয়ে গেছে এক আচ্ছন্নতায়, অথবা আধা ঘুমে। ঊরুর মাংস থেকে রক্ত ঝরেছে, পিঠ থেকেও অনেকটা। এখন একটা ধন আছন্নতায় ডুবে গেলে তার ডাক্তারি নাম কী হবে, সে ভেবে পেল না।


​অনেক রাত নিশ্চয়। হাজতঘরের ঘুলঘুলি দিয়ে যে গন্ধ আসছে রাতের, সেটি বেশ ঘন। রাসেল আবার ভাবতে বসল, কী, কখন, কেন--এসব নিয়ে। কিন্তু ভাবতে বসে দেখল, সে আসলেই অন্য কেউ। রাসেলের মতো ভাবতে পারছে না সে। যে জীবন এই হাজতঘরের, তা নিশ্চিতভাবেই অন্য কারও, তার নয়। তার বোধের ওপর একটি ক্রোধ জন্মাচ্ছে, একটি কালো অনিশ্চয়তা ছায়া ফেলছে। সে বুঝতে পারছে, তার শরীরের কোষগুলো এখন হরতাল ডেকেছে। এখন তার নিয়ন্ত্রণে তারা নেই।

​তার ভয় হলো, প্রচণ্ড ভয় । ভয়টা এই প্রথম। এর আগে ভয় পাওয়ার মতো অবস্থাতে সে ছিল না। ভয়টা প্রবল হতে থাকলে তার স্নায়ুতে আবার টান পড়ল। এবং সারা শরীরে অসংখ্য সুচের মতো ব্যথা জাগল। এবং ব্যথাগুলো যত বাড়তে থাকল, তত একটি গা-গোলানোঅবসাদ জমতে শুরু করল তার মধ্যে।


​রাসেলের এই অবস্থাকে চিকিৎসাবিদ্যায় কী বলে, আমরা জানি না।



রাসেল শুনল, অথবা সে ভাবল সে শুনল, একটা খটখট শব্দ হচ্ছে, খড়ম পায়ে কেউ হাঁটলে যেমন শব্দ হয়।

​একটি মুহূর্ত : তার স্নায়ুগুলো হঠাৎ খুব তীক্ষ্ণ হয়ে দম দেওয়া পুতুলের মতো লাফিয়ে উঠল। কে ? কে ? কিসের শব্দ ? কিন্তু শব্দ মিলিয়ে গেল। কিছুক্ষণ গা এলিয়ে পড়ে থেকে নিজের ওপর রাগ হলো তার। মনে হল, নিজেকে শাস্তি দেওয়া উচিত। এই থানায় অনেক শব্দ হয়--অনেক মানবিক, জৈবিক, পাশবিক, ধাতব শব্দ। অথচ একটি এরকম শব্দে সে কেন অযথা উদ্বেল হয়ে পড়ল ? নিজেকে, নিজের অবস্থাকে, সম্পূর্ণ ভুলে গিয়ে নিরালম্ব এক শূন্যতায় নিজেকে সমর্পণ করল ? এবং আরও মারাত্মক যা, একটা কিছু ভাবতে শুরু করল, যা তার অবস্থার সঙ্গে কোনোমতেই মানানসই নয় ?


​নিজেকে শাস্তি দিতে চেয়েছিল রাসেল, কিন্তু কীভাবে ? সে জানে না, আন্দাজও করতে পারে না। তার রাগ তরল হয়, তরল হতে হতে অভিমানে রূপ নেয়। এবং এই রাগ-অভিমানের আক্রমণে সে আবার নিস্তেজ হয়ে মেঝেতে আশ্রয় নেয়। 


​এবং রাসেল অনুভব করে, অনেকদিন পর--কতদিন, সে মনে করতে পারে না-সে কাঁদছে। সত্যিই কাঁদছে।

​কেন সে কান্না, আমাদের জিজ্ঞেস করবেন না। আমরা সামান্য মানুষ, এসব বিচার আমাদের সাধ্যে নেই।


খট খট খট খট। আবার সেই শব্দ। এর অনেক জোরালো, অনেক পরিষ্কার। এবং ক্রমেই সেই শব্দ বাড়ে। যেন কেউ খড়ম পায়ে দ্রুত ছুটে আসছে হাজতঘরের দিকে। খড়মপরা পা দুটো কাঁপছে কোনো আশঙ্কায়, অথবা ক্রোধে, অথবা আশঙ্কা এবং ক্রোধে। 

​এবার এই শব্দকে অস্বীকার করতে পারে না রাসেল। না, এ শব্দ তার মাথায় তৈরি হচ্ছে না, তার ভেতরে কোনো আশাবাদী গোপন অলিন্দে এটি উৎপাদিত হচ্ছে না, এটি তৈরি হচ্ছে হাজরের বাইরের লম্বা টানা বারান্দায়।

​হাজতঘরের অর্ধেকটা জুড়ে দেয়ালের পরিবর্তে লম্বালম্বি লোহার রড। হাজতঘর থেকে বাইরেটা সহজেই দেখা যায়, বাইরে থেকে ভেতরটাও। সেই বাইরের অর্থাৎ বারান্দার দিকে মুখ করে মেঝেতে শুয়েছিল রাসেল।


​খট খট খট খট শব্দটা শুনল সে কিছুক্ষণ। এবার তার সময় লাগল না জানতে, অথবা বুঝতে, এই শব্দের উৎস কোথায়। এর উৎস এক পাটি খড়মে।

​রাসেল যা দেখল : দু' পায়ের বুড়ো আঙুল এবং প্রথমা দিয়ে প্রচণ্ড ক্রোধে কেউ যেন চেপে ধরেছে খড়মের পেগ অথবা কিলক, এবং অসম্ভব ক্ষমতায় এবং তীব্রতায় খড়ম দুটি উঠছে, নামছে, উঠছে, নামছে, এগিয়ে আসছে, যেন এখুনি তারা ভেঙে পড়বে জগৎ সংসারের ওপর, পিটিয়ে তক্তা করে দেবে বন্দুক আর সঙ্গিনওলা হাতগুলিকে, ক্ষমতার তেল লেপা মাথাগুলোকে, লাঠি হাতে ভয়ানক দৈত্যগুলোকে। রাসেল আরও দেখল, খড়মপরা পায়ের ওপর তীব্র আক্রোশে নাচছে একটি সাদা লুঙ্গির পাড়, সফেদ একটা ঘূর্ণি উঠছে সেখান থেকে, যার শক্তির নিচে অসহায় হয়ে পড়েছে খাকি প্যান্ট আর ভারি বুটগুলো। রাসেলের অতিমান বাষ্প হয়ে চোখ ঢেকে দেওয়ার আগে সে দেখল, পিতামহের পায়ের ছাপ লাগানো দুটি খড়ম যেন টিপু সুলতানের দুই কামানের মহিমায় গুঁড়িয়ে দিচ্ছে চারপাশের সব দেয়াল গরাদ; আর যারাই দাঁড়াচ্ছে তাদের সামনে, তাদের দিকে দেগে যাচ্ছে অবিশ্রাম গোলা : খট খট খট খট খট খট।

1 টি মন্তব্য:

  1. ধনীর দুলাল, সে সহজেই ছাড়া পেয়ে যাবে| তাই চিন্তা নেই| কিন্তু যেসকল বাবাদের অর্থের সেই জোর নেই, তাদের কথা শুনতে চাই এবার| গল্প হয়ে উঠুক অসহায় মানুষের না-বলতে পারা আখ্যান| তাদের অবদমিত স্বরকে জাগিয়ে তুলুন লেখক| তবেই তো সেই অসহায়ত্বের বিপরীতে পিতাপুত্রের স্নেহ জোরালো হয়ে ফুটে উঠবে, পাঠকের মনে বাজবে|

    উত্তর দিনমুছুন