৫.
আমরা সাধারণত মনে করি ইতিহাসজুড়ে চিকিৎসা বিজ্ঞান নিয়ে যাকিছু বলা হয়েছে, সব একই সুতোয় গাঁথা। কিন্তু ফুকো এটা মানতে নারাজ। তিনি বলছেন, আমি পুরোনো সব ধারণা ভেঙে দেখব আসলে এদের মধ্যে কোনো মিল আছে কি না, নাকি সব আলাদা। তিনি চারটি অনুমানকে পরীক্ষা করেছেন এটা বুঝবার জন্য যে, অনেকগুলি আলাদা আলাদা বাক্য বা তথ্য মিলে কীভাবে একটা ‘ভাষ্য’ (Discours) তৈরি করে।
ফুকো একে একে চারটি অনুমানে ঐক্য বা মিল খুঁজবার চেষ্টা করেছেন এবং দেখিয়েছেন কেন সেগুলি কাজ করে না।
১. একই বিষয় নিয়ে কথা বলা। আমরা ভাবি, ১৭০০ সালের মানসিক রোগ নিয়ে লেখা বই আর ১৯০০ সালের বই, দুটোই তো পাগলামি নিয়ে কথা বলছে। তাই এরা একই ‘ভাষ্য’। ফুকো বলছেন, পাগলামি আসলে ইতিহাসে স্থির থাকেনি। ১৭ শতকে যাকে পাগল বলা হত, তাকে হয়তো শুধু সমাজ থেকে আলাদা করে রাখা হত পাগলাগারদে। আর ১৯ শতকে এসে সেটা হয়ে গেল মানসিক রোগ, যার চিকিৎসা দরকার, তখন তাদের রাখা হয় মানসিক হাসপাতালে, অর্থাৎ ‘ভাষ্য’ নিজেই তার বিষয়কে তৈরি করে এবং পালটে দেয়। বিষয় স্থির নয়, তাই এর ভিত্তিতে ঐক্য খোঁজা ভুল।
২. কথা বলবার ধরন। আমরা ভাবতে পারি, হয়তো ডাক্তারদের কথা বলবার ধরন বা লেখার ধরন সব যুগে এক, তাই এটা একটা একক বিষয়। চিকিৎসাবিজ্ঞান মানেই কি শুধু বর্ণনা দেওয়া? ফুকো বলছেন, না, চিকিৎসাবিজ্ঞানে শুধু রোগের বর্ণনা থাকে না, সেখানে পরিসংখ্যান থাকে, ল্যাবরেটরির হিসাব থাকে, প্রশাসনিক নিয়মকানুন থাকে, নৈতিক উপদেশ থাকে। আবার আগে ডাক্তাররা শুধু চোখে দেখে বা কানে শুনে রোগ নির্ণয় করতেন, পরে অনুবীক্ষণ যন্ত্র এল, ল্যাব টেস্ট এল, অর্থাৎ কথা বলবার ধরন বা দেখার ভঙ্গিও বারবার বদলে গেছে। তাই ধরনের ভিত্তিতেও এদের এক করা যায় না।
৩. ধারণা। আমরা ভাবতে পারি, হয়তো ব্যাকরণ বা অর্থনীতিতে কিছু মৌলিক ধারণা আছে যা কখনোই বদলায় না। যেমন ব্যাকরণে বিশেষ্য, ক্রিয়া, বানানরীতি ইত্যাদি ধারণা। ফুকো বলছেন, পুরোনো ব্যাকরণের ধারণা আর আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানের ধারণা এক নয়। নতুন ধারণা এসে পুরোনো ধারণাকে বাতিল করে দেয়। অনেক সময় একটা বিষয়ের ভেতরেই পরস্পরবিরোধী ধারণা থাকে। তাই ধারণার মিল দিয়েও ঐক্য তৈরি করা যায় না।
৪. একই বিষয়বস্তু। আমরা ভাবতে পারি, হয়তো একটা নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু বহুদিন ধরে টিকে থাকে, তাই সেটা একটা ‘ভাষ্য’। ফুকো বলছেন, একই বিষয়বস্তু ভিন্ন ভিন্ন যুগে ভিন্ন ভিন্ন অর্থ বহন করে। আবার একই যুগে একই তথ্যের ওপর ভিত্তি করে দুজন অর্থনীতিবিদ সম্পূর্ণ উলটো বিষয়বস্তু দাঁড় করাতে পারেন। তাই বিষয়বস্তু দিয়েও ‘ভাষ্য’কে সংজ্ঞায়িত করা যায় না।
চারটি অনুমান পরীক্ষার পর ফুকো একটা নতুন সিদ্ধান্তে আসেন। তিনি বলেন, আমরা জোর করে মিল খুঁজবার চেষ্টা করছি, এটাই ভুল। মিল বা ঐক্য নয়, বরং পার্থক্যগুলির মধ্যে কোনো নিয়ম আছে কি না সেটা দেখতে হবে। তার মতে, যদি আমরা দেখি যে, বিষয়, ধরন, ধারণা ও বিষয়বস্তু একে অপরের থেকে আলাদা, কিন্তু তাদের এই আলাদা হবার বা ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকবার পেছনে একটা নির্দিষ্ট নিয়ম কাজ করছে, তবে সেই নিয়মটাকেই বলব ‘Formation discursive’ বা ‘ভাষ্যগত গঠন’। এটা এমন এক ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে কোনো একটা নির্দিষ্ট সময়ে কোনো বিষয় নিয়ে কথা বলা হয়, এবং সেই কথাগুলি জ্ঞান হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়।
আপনি একটা খেলার মাঠে অনেকগুলি ইট ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকতে দেখলেন। যদি আপনি জোর করে বলেন, ‘এগুলি দিয়ে একটা দেয়াল বানানো ছিল’, তবে তা ভুল হতে পারে। ফুকোর চিন্তানুসারে, আগে দেখতে হবে ইটগুলি কেন ওখানে, এদের ছড়িয়ে থাকার মধ্যে কোনো গাণিতিক নিয়ম আছে কি না।
যদি দেখা যায় যে, একটা নির্দিষ্ট সময়ে পাগলামি ডাক্তারের দেখার ধরন আর চিকিৎসার ধারণা, এই সবকিছুর পরিবর্তনের পেছনে একটা নির্দিষ্ট নিয়ম কাজ করছে, তবে সেই পুরো ব্যবস্থাটাই হল ওই সময়ের ওষুধ বা চিকিৎসা শাস্ত্রের ‘ভাষ্যগত গঠন’।
ফুকোর মতে, ইতিহাস বা জ্ঞান কোনো সোজা লাইনে চলে না। কোনো বিষয় শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এক থাকে না। আমরা যা নিয়ে কথা বলি, তা আমাদের কথার মাধ্যমেই তৈরি হয় এবং যুগে যুগে বদলায়। ‘ভাষ্যগত গঠন’ মানে সব কিছুর মধ্যে মিল থাকা নয়, বরং জিনিসগুলি কেমন করে সময়ের সঙ্গে বদলাচ্ছে, ভাঙছে এবং নতুন করে গড়ছে, তার পেছনের নিয়মটাই হল আসল।
আমরা ভাবতে অভ্যস্ত যে ইতিহাসের একজন লেখক বা নায়ক থাকে, বা ইতিহাস উন্নতির দিকে ধাবিত হয়। কিন্তু ফুকোর এই পদ্ধতিতে কোনো কেন্দ্রীয় নায়ক নেই, কোনো সোজা উন্নতির রেখা নেই। আছে শুধু পরিবর্তনের নিয়ম। এটা আমাদের চেনা জগৎকে ভেঙে দেয় এবং আমাদের এক অজানা, অনিশ্চিত জায়গায় নিয়ে যায়।
‘ভাষ্যগত গঠন’ হল এমন একটা ব্যবস্থা বা নিয়ম, যা নির্ধারণ করে কোনো নির্দিষ্ট সময়ে ও সমাজে কী নিয়ে কথা বলা যাবে, কীভাবে বলা যাবে এবং সেই কথাগুলি কীভাবে সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হবে, এতে কোনো শাশ্বত সত্য বা ধারাবাহিকতা নেই, আছে কেবল পরিবর্তনের শৃঙ্খলা।
৬.
আমরা যখন কোনো বিষয় নিয়ে কথা বলি বা গবেষণা করি, তখন এই বিষয় আসলে কোথা থেকে আসে? এটা কি আগে থেকেই প্রকৃতিতে ছিল? নাকি আমরা শুধু নাম দিয়েছি? ফুকো বলছেন, বিষয়টি এত সহজ নয়। ‘ভাষ্য’ নিজেই তার আলোচ্য বিষয়কে তৈরি করে।
উনিশ শতকের আগে পাগল বলতে ঢালাওভাবে আপাতচোখে অস্বাভাবিক আচরণ করে এমন সবাইকে বোঝানো হত। কিন্তু উনিশ শতকের পর থেকে হুট করে আমরা নতুন নতুন সব মানসিক রোগের নাম দেখতে পেলাম, যেমন প্যারানয়া, সিজোফ্রেনিয়া, মনোম্যানিয়া ইত্যাদি।
এখন প্রশ্ন হল, এই রোগগুলি কি আগে ছিল না? হঠাৎ করে এগুলি বৈজ্ঞানিক সত্য হিসেবে কেমন করে হাজির হল? ফুকো বলছেন, ডাক্তাররা হঠাৎ করে এগুলি আবিষ্কার করে ফেলেননি। বরং সমাজের বিভিন্ন নিয়ম, প্রতিষ্ঠান ও ক্ষমতার সম্পর্কের জালের মধ্য দিয়ে এইসব বিষয় তৈরি হয়েছে।
কোনো একটা বিষয় আলোচ্য হতে হলে তিনটি শর্ত পার হতে হয়। প্রথমে এমন একটা জায়গা থাকতে হবে যেখানে কোনো একটা আচরণকে সমস্যা বা আলাদা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ধরুন, একজন লোক খুব রেগে গিয়ে পরিবারের কাউকে মেরে ফেলল। আগে হয়তো বলা হত, সে পাপ করেছে বা তার ওপর জিন বা শয়তান ভর করেছে। কিন্তু উনিশ শতকে পরিবার, কর্মক্ষেত্র, বা আদালত ইত্যাকার জায়গা হয়ে উঠল বিষয় আবির্ভাবের ক্ষেত্র। পরিবার বলল, ‘সে আমাদের নিয়ম মানছে না, সে অসুস্থ।’ আদালত বলল, ‘সে অপরাধী, কিন্তু তার আচরণ স্বাভাবিক অপরাধীর মতো নয়।’ এইসব ক্ষেত্রে দাঁড়িয়েই প্রথমবারের মতো আচরণটি 'পাগলামি' বা 'রোগ' হিসেবে দৃশ্যমান হল। সমস্যা তো দেখা দিল, কিন্তু কে ঠিক করবে এটা কী? সমাজ কাকে সেই ক্ষমতা দিয়েছে? উনিশ শতকে ডাক্তাররা এবং আইনজ্ঞরা এই ক্ষমতা পেলেন। আগে হয়তো ধর্মযাজকরা বলতেন এটা পাপ। কিন্তু এখন ডাক্তার সার্টিফিকেট দিয়ে বলছেন, এটা একটা রোগ। আইন এবং বিচার ব্যবস্থা ঠিক করল, কোন অপরাধী জেলে যাবে আর কোন অপরাধী পাগলা গারদে যাবে।
এই যে ডাক্তার বা বিচারক, তারাই হলেন সেই কর্তৃপক্ষ, যারা একটা আচরণকে বেড়া দিয়ে ঘিরে নাম দিলেন মানসিক রোগ।
কর্তৃপক্ষ যখন ঠিক করল এটা রোগ, তখন তারা এটাকে কীভাবে ভাগ করবে বা বিশ্লেষণ করবে? তাদের হাতে তো কিছু ছক বা স্কেল থাকতে হবে। ডাক্তাররা তখন মানুষের মনকে ভাগ করতে শুরু করলেন, এটা কি আত্মার সমস্যা? নাকি শরীরের স্নায়ুর সমস্যা? নাকি বংশগত সমস্যা?
এই যে শরীর, মন, বংশগতি, এই ছকগুলির মধ্যে ফেলে পাগলকে বিচার করা হল। এই ছকগুলিই ঠিক করে দিল 'পাগলামি' আসলে কী।
ফুকোর মতে, ওপরের তিনটি ধাপ আলাদা আলাদাভাবে কাজ করে না। এদের মধ্যে একটা জটিল সম্পর্ক বা জালের সৃষ্টি হয়, যেমন আইন-আদালত এবং ডাক্তারের চিকিৎসার মধ্যে একটা সম্পর্ক তৈরি হল। আদালত ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করছে, ‘এই আসামী কি পাগল?’ ডাক্তার বলছেন, ‘হয়।’ তখন তৈরি হল নতুন বিষয় ‘অপরাধী পাগল’।
ফুকো বলছেন, এই সম্পর্কগুলিই আসল। কোনো একটা পাথর বা গাছ যেমন প্রকৃতিতে একা একা থাকে, সান্দর্ভিক বিষয়গুলি, যেমন: মানসিক রোগ, অপরাধপ্রবণতা তেমন একা থাকে না। এগুলি সমাজের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, যেমন জেলখানা, হাসপাতাল, স্কুল, পরিবার ইত্যাদির পারস্পরিক সম্পর্কের মাধ্যমে তৈরি হয়।
ফুকো বলছেন, আমরা যখন কোনো কিছুর ইতিহাস লিখি, আমরা সাধারণত দুই ধরনের ভুল করি। আমরা ভাবি, 'পাগলামি' ব্যাপারটা প্রকৃতিতে সত্যিকারের কোনো বস্তু হিসেবে লুকিয়ে ছিল, ডাক্তাররা শুধু পর্দা সরিয়ে সেটা আবিষ্কার করেছেন। ফুকো বলছেন, না! বস্তুটা আগে থেকে ছিল না, ‘ভাষ্য’-এর নিয়মগুলিই তাকে অস্তিত্ব দিয়েছে।
আমরা ভাবি, এটা শুধু শব্দের খেলা। আগে যাকে পাপ বলা হত, এখন তাকেই রোগ বলা হচ্ছে, শুধু শব্দ বদলেছে। ফুকো বলছেন, এটাও ভুল। কারণ শুধু শব্দ বদলায়নি, পুরো ব্যবস্থা বদলে গেছে।
‘ভাষ্য’ মানে শুধু একগাদা কথা বা লেখা নয়। ‘ভাষ্য’ এমন এক চর্চা, যার নিজস্ব কিছু নিয়ম আছে। এই নিয়মগুলিই ঠিক করে দেয় কোনটি সত্য, কোনটি মিথ্যা, এবং কোনটি আলোচনার যোগ্য বিষয়।
আমরা যখন কোনো বিষয় নিয়ে কথা বলি, আমরা আসলে শূন্য থেকে কথা বলি না বা আগে থেকে থাকা কোনো সত্য আবিষ্কার করি না। আমরা কতগুলি নিয়মের জালে আটকা পড়ে সেই জালের তৈরি করা বিষয় নিয়েই কথা বলি।
পাগল বা মানসিক রোগী এইসব আগে থেকে তৈরি হয়ে বসে থাকা কোনো প্রাকৃতিক সত্য নয়। সমাজ, আইন, চিকিৎসা ব্যবস্থা এবং পারিবারিক কাঠামোর জটিল সম্পর্কের ফলে এই পরিচয়গুলি তৈরি হয়েছে। আর এই তৈরির প্রক্রিয়াটিই হল ‘বিষয়ের গঠন’।
৭.
ফুকো দেখিয়েছেন যে কীভাবে একটা নির্দিষ্ট জ্ঞানক্ষেত্র, যেমন উনিশ শতকের চিকিৎসা বিজ্ঞান, কেবল কিছু আবিষ্কার বা ধারণার সমষ্টি নয়, বরং একটা সুনির্দিষ্ট ও নিয়মিত বিবৃতিমূলক ব্যবস্থার ফল।
তিনি দেখান যে, সেই সময়ের ডাক্তাররা তাদের আলোচনায় বহু ভিন্ন ভিন্ন ধরনের বক্তব্য ব্যবহার করছেন। কেউ হয়তো রোগীর অবস্থা নিয়ে গুণের ভিত্তিতে বর্ণনা দিচ্ছেন, যেমন রোগী দুর্বল ও ফ্যাকাশে। কেউ হয়তো রোগীর জীবন-বৃত্তান্ত বলছেন। কেউ চিহ্ন বা লক্ষণগুলি খুঁজে সেগুলির ব্যাখ্যা করছেন। কেউ উপমা টেনে বা যুক্তি-তর্ক করে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। আবার কেউ পরিসংখ্যান ব্যবহার করছেন, অথবা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে যাচাই করছেন।
এত কথা কেন একসঙ্গে জুড়ে আছে? এই সবগুলি বক্তব্যকে একত্রে একটা চিকিৎসা বিজ্ঞান নামক ‘ভাষ্য’ হিসেবে মেনে নেবার পেছনে কোন অপরিহার্য কারণ কাজ করছে? কেন ডাক্তাররা এই নির্দিষ্ট ধরনের কথাই বলছেন? অন্য কোনো ধরনের কথা বলছেন না কেন? এর সমাধান খুঁজতে ফুকো সেই আইন ও উৎস খুঁজে বের করতে চান, যা নির্ধারণ করে দেয় কে কথা বলতে পারবে, কোথা থেকে কথা বলতে হবে এবং কী অবস্থানে থেকে কথা বলতে হবে। এই তিন ক্ষেত্রকে তিনি একত্রে বিবৃতিমূলক প্রণালীগুলির বিন্যাস হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
চিকিৎসা-সংক্রান্ত ‘বিবৃতি’ যে কেউ দিতে পারেন না। কারণ ডাক্তারদের মর্যাদা একটা জটিল ব্যবস্থা দ্বারা সংজ্ঞায়িত। ডাক্তার হতে গেলে কিছু নির্দিষ্ট জ্ঞান ও দক্ষতার মানদণ্ড অর্জন করতে হয়। ডাক্তার একটা নির্দিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পদ্ধতি এবং নিয়মের মধ্য দিয়ে তৈরি হন। ডাক্তারি অনুশীলন ও জ্ঞান বৃদ্ধির জন্য আইনের মাধ্যমে নির্ধারিত কিছু শর্ত মানতে হয়, যা তাদের কাজ করবার অধিকার দেয়। ডাক্তারের মর্যাদা কেবল ব্যক্তিগত যোগ্যতায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং অন্যদের সঙ্গে তার সম্পর্কের মাধ্যমেও নির্ধারিত হয়। অন্যান্য পেশাজীবী বা গোষ্ঠীর সঙ্গে ডাক্তারের দায়িত্ব ও ক্ষমতার বিভাজন কেমন? বিচার বিভাগ, অন্যান্য পেশাদার সংস্থা, ধর্মীয় গোষ্ঠী বা রাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের সঙ্গে তাঁর ঊর্ধ্বতন/অধস্তন সম্পর্ক এবং কাজের সম্পূরক ভূমিকা কেমন? যেমন রাষ্ট্র ডাক্তারকে জনস্বাস্থ্যের দায়িত্ব দিতে পারে। ডাক্তারের কাজ সমাজে কীভাবে সংজ্ঞায়িত হয়, তা-ও তার মর্যাদার অংশ। তিনি কি কেবল একজন ব্যক্তিগত পেশাদার হিসেবে কাজ করছেন, নাকি সমাজের পক্ষ থেকে কোনো দায়িত্ব পালন করছেন? অসুস্থতা বা জনস্বাস্থ্যের প্রয়োজনে তিনি কতটা হস্তক্ষেপ বা সিদ্ধান্ত নেবার অধিকার পান? তিনি সমাজ বা ব্যক্তির কাছ থেকে কীভাবে পারিশ্রমিক পান? রোগী, কর্তৃপক্ষ বা সমাজের সঙ্গে তাঁর লিখিত বা অলিখিত চুক্তি কেমন?
ফুকো বলছেন, এই মর্যাদা সমাজের সবখানেই বিশেষ, ডাক্তার কোনো সাধারণ বা সহজে পরিবর্তনযোগ্য ব্যক্তি নন। তার বিবৃতির কার্যকারিতা এবং এমনকি নিরাময় ক্ষমতাও তার আইনগতভাবে সংজ্ঞায়িত মর্যাদা থেকে আলাদা করা যায় না।
১৮ শতকে এই মর্যাদা একটা ঐতিহাসিক মোড়ে এসে বড়ো ধরনের পরিবর্তনের মুখোমুখি হয়। যখন জনগণের স্বাস্থ্য আর ব্যক্তিগত বিষয় থাকল না, বরং শিল্প সমাজগুলির জন্য প্রয়োজনীয় একটা অর্থনৈতিক মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হল, তখন ডাক্তারের ভূমিকায় মৌলিক পরিবর্তন আসে। ডাক্তার কোন জায়গা থেকে কথা বলছেন, সেই জায়গাই তার বক্তব্যের বৈধ উৎস, প্রয়োগের লক্ষ্যবস্তু ও যাচাইকরণের উপকরণ সরবরাহ করে। ১৯ শতকে চিকিৎসার এই স্থানগুলি গভীরভাবে পরিবর্তিত হয়েছিল।
১৮ শতকে হাসপাতালকে রোগ সংক্রান্ত আলোচনার দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসেবে দেখা হত। ব্যক্তিগত চেম্বার বা ব্যক্তিগত অনুশীলনকে বেশি মূল্যবান মনে করা হত, কারণ মনে করা হত সেখানে রোগ তার স্বাভাবিক পরিবেশে নিজেকে প্রকাশ করে। ১৯ শতকে হাসপাতাল একটা সম্পূর্ণ ভিন্ন ভূমিকায় আসে। এটা হয়ে ওঠে পদ্ধতিগত পর্যবেক্ষণের স্থান, যেখানে নিয়মতান্ত্রিকভাবে, নিয়ম মেনে পর্যবেক্ষণ করা হয়। এটা হয়ে ওঠে ঘন ঘন ঘটনা এবং সম্ভাব্যতা প্রতিষ্ঠার স্থান। ব্যক্তিগত রোগের পরিবর্তে এখানে রোগের গড় প্রক্রিয়া এবং এর মূল নির্দেশিকাগুলি আবিষ্কৃত হয়। হাসপাতাল আর অসুস্থ মানুষের সেবাকেন্দ্র নয়, বরং রোগের আবির্ভাবের স্থান বা গবেষণাগার হয়ে ওঠে।
ল্যাবরেটরি, যা একসময় হাসপাতাল থেকে আলাদা ছিল, তা ১৯ শতকে দৈনন্দিন চিকিৎসায় অন্তর্ভুক্ত হয়। এর ফলে চিকিৎসা বিজ্ঞান পদার্থবিদ্যা, রসায়ন বা জীববিজ্ঞানের মতো পরীক্ষামূলক মানদণ্ড অর্জন করে। ঐতিহ্যবাহী বইপত্রের কর্তৃত্ব কমে যায়। এর বদলে ডাক্তার বা অন্যদের দ্বারা প্রকাশিত পুরনো রোগীর তথ্য ও পর্যবেক্ষণ এর গুরুত্ব বাড়ে। সামাজিক পরিবেশ, জলবায়ু, মৃত্যুহার, রোগের ঘটনা ইত্যাদি সম্পর্কিত বিশাল পরিমাণ পরিসংখ্যানগত তথ্য ‘চিকিৎসার ভাষ্য’-এর অংশ হয়ে ওঠে।
ডাক্তার বিভিন্ন বস্তু বা তথ্যের সাপেক্ষে কোন অবস্থান গ্রহণ করেন? তার এই অবস্থানও চিকিৎসার বিবৃতিমূলক প্রণালী নির্ধারণ করে। ডাক্তার তার কাজের সময় বিভিন্ন ভূমিকা গ্রহণ করেন। তিনি প্রশ্নকারী এবং তথ্য জানবার জন্য শ্রবণকারী। তিনি লক্ষণের ছক অনুযায়ী দ্রষ্টা এবং বর্ণনা অনুযায়ী পর্যবেক্ষণকারী। তিনি এমন এক সর্বোত্তম উপলব্ধির দূরত্বে অবস্থান করেন, যা প্রাসঙ্গিক তথ্যকে অপ্রাসঙ্গিক তথ্য থেকে আলাদা করে। তিনি যন্ত্রপাতি ব্যবহার করেন যা উপলব্ধির মাত্রাকে পরিবর্তন করে। ডাক্তার যন্ত্রপাতির সাহায্যে শরীরের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেন, লক্ষণ থেকে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, অঙ্গ থেকে টিস্যু, এবং টিস্যু থেকে কোষ পর্যন্ত।
ডাক্তার কেবল রোগীর পাশে থাকেন না, তিনি একটা বৃহত্তর তথ্য নেটওয়ার্কের অংশ। তিনি পড়ালেখায় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর অবস্থানে থাকেন। তিনি মৌখিক বা লিখিত আকারে পর্যবেক্ষণ, পুরনো রোগীর তথ্য, পরিসংখ্যানগত তথ্য এবং সাধারণ তত্ত্বগুলির প্রেরক এবং গ্রাহক হিসেবে কাজ করেন।
১৯ শতকের শুরুতে এই অবস্থানগুলি নতুন করে সংজ্ঞায়িত হয়। গভীর পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্র তৈরি হয়, যেমন অস্ত্রোপচার, ময়নাতদন্ত, নতুন তথ্য লিপিবদ্ধকরণ ব্যবস্থা আসে এবং অন্যান্য তাত্ত্বিক ক্ষেত্র বা প্রতিষ্ঠানের প্রশাসন, রাজনীতির সঙ্গে চিকিৎসা বিজ্ঞানের সম্পর্ক তৈরি হয়।
ফুকো বলছেন, আমাদের আধুনিক চিকিৎসার ভাষ্য হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। এটা তৈরি হয়েছে বিভিন্ন দিকের সম্পর্ক একত্র হবার ফলে। রোগীকে দেখার ও পরীক্ষা করবার স্থানের সঙ্গে মানবদেহকে কীভাবে দেখতে বা বুঝতে হবে, সেই জ্ঞানের নিয়ম। রোগীকে দেখে যা বোঝা গেল, তার সঙ্গে চিকিৎসা বিজ্ঞানের জমা করা সব জ্ঞান, যেমন পুরনো রোগীর তথ্য, গবেষণার ফল ইত্যাদির সংযোগ। ডাক্তার একই সঙ্গে চিকিৎসক, শিক্ষক, জ্ঞান প্রচারক ও জনস্বাস্থ্যের সেবক, এই সব ভূমিকার সংযোগ।
ফুকো বলছেন, এইসব সম্পর্ক আগে স্বাভাবিকভাবে ছিল না, বরং একটা চর্চা তৈরি হয়েছে, যা এই উপাদানগুলিকে একটা নিয়মিত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থার মধ্যে এনেছে। তিনি এই সব কাজের পেছনে কোনো একজন মানুষের একক মন বা একটা স্থির চেতনাকে খুঁজছেন না।
আমরা সাধারণত ভাবি, একজন বুদ্ধিমান ডাক্তারই সব কিছুর কেন্দ্রে আছেন, ফুকো এই ভাবনাকে মানছেন না। তার কাছে ডাক্তার বা মানুষটির অবস্থানটি এক জায়গায় স্থির নেই, বরং বহু ভাগে ছড়িয়ে আছে। ডাক্তার একাই এক জন নন, তিনি একই সঙ্গে ডিগ্রিধারী মানুষ, সরকারি কর্মী, যন্ত্র ব্যবহারকারী, প্রশ্নকর্তা ইত্যাদি।
এই যে ছড়িয়ে থাকা ভূমিকাগুলি একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে, এই সংযোগ কোনো মনের ইচ্ছেয় হচ্ছে না, বরং চিকিৎসা পদ্ধতির নিজস্ব নিয়মেই এটা প্রতিষ্ঠিত।
ফুকো বলছেন, জ্ঞান বা কথা তৈরি হয় এমন একটা বাইরের স্থানে, যেখানে মানুষটির অবস্থানটি ছড়িয়ে থাকে এবং তা পদ্ধতির নিয়মের দ্বারা নির্ধারিত হয়। কোনো অতি-প্রাকৃতিক ক্ষমতা বা মনের শক্তি এই জ্ঞান তৈরি করে না, বরং এই পদ্ধতির নিয়মিত সম্পর্কের কাঠামো তা তৈরি করে। ·
লেখক পরিচিতি : নির্ঝর নৈঃশব্দ্য কবি, চিত্রী ও গল্পকার। প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ২৭টি। ঢাকায় বসবাস করছেন।

0 মন্তব্যসমূহ