মিলান কুন্দেরার আধুনিক উপন্যাস-ভাবনা : মোজাফ্ফর হোসেন


মানুষের নীতিনৈতিকতাবোধ শেখার ক্ষেত্রে উপন্যাসের ভূমিকা কী হতে পারে, নৈরাজ্যবাদও কি উপন্যাসের কাঙ্ক্ষিত বিষয় হয়ে উঠতে পারে? এই সব তর্ক অনেক দিনের, এবং নিশ্চিত করেই অমীমাংসিত। উপন্যাসের উন্মেষকালে নৈতিকতাবোধ দ্বারা চালিত সাহিত্য সমালোচকদের কাছে উপন্যাসের প্রধান কাজ ছিল প্রশ্ন করা নয়, উত্তর খোঁজা। তাঁদের অনেকের বক্তব্য ছিল, ঔপন্যাসিকের জ্ঞান সব সময়ই আদর্শগতভাবে শর্তযুক্ত, কারণ উপন্যাস গণমূল্যবোধ তৈরিতে কাজ করে। হ্যারল্ড ব্লুমের মতো আধুনিক সাহিত্য সমালোচকও মনে করতেন, ‘পাঠের গভীরতম উদ্দেশ্য হলো (জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয়) জ্ঞানের অনুসন্ধান।’ 

উপন্যাসের এই ক্ল্যাসিক ধারণার কিছুটা একাত্ম হয়ে এবং অনেকখানি সরে এসে উপন্যাসের জ্ঞান ও ঔপন্যাসিকের কর্তব্যকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করেন আধুনিক কথাসাহিত্যে অন্যতম প্রধান লেখকদের একজন মিলান কুন্দেরা (১৯২৯-২০২৩)। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এই চেকোস্লোভাকিয়ান লেখক কেবল ঔপন্যাসিক হিসেবেই নয়, উপন্যাসের তাত্ত্বিক হিসেবেও সুপরিচিত হয়ে ওঠেন। কুন্দেরা মনে করেন যে উপন্যাসে মানবজীবনের প্রাসঙ্গিক অন্তর্দৃষ্টি থাকতে হবে, তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন যে উপন্যাসের কাজ কোনো কিছু নির্ণয় করে দেওয়া নয়। উপন্যাস জ্ঞানের এমন একটি অনুঘটক, যার শেষে প্রতিটি পাঠকের অন্তর্দৃষ্টি প্রায়ই আলাদা হয়ে ওঠে। 

উপন্যাস সম্পর্কে কুন্দেরার কিছু মৌলিক প্রশ্নের কারণে তাঁর ‘দি আর্ট অব নভেল’ (১৯৮৫) বইটি প্রকাশের পরপরই একাডেমিক নন-একাডেমিক সব ধরনের পাঠকের কাছে প্রিয় বই হয়ে ওঠে। বইটিতে প্রবন্ধ, নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার ও ভাষণ—এই চার ফর্মে উপন্যাস সম্পর্কে কুন্দেরার ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গির সাক্ষাৎ মেলে। উপন্যাস আধুনিক সাহিত্যের সবচেয়ে জনপ্রিয় ফর্ম। কাজেই এটি নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে। তবে কুন্দেরা তথাকথিত পথে হাঁটেননি। তিনি কোনো তত্ত্বীয় আলোচনার ভেতরেও প্রবেশ করেননি। খালি আধুনিক ইউরোপীয় উপন্যাসের বিষয়বস্তু নিয়ে কথা বলেছেন। আঙ্গিক নিয়ে কিঞ্চিৎ আলোচনা হয়েছে, তবে সেটাও করা হয়েছে একাডেমিক আলোচনার বাইরে থেকে। একজন উপন্যাস-বোদ্ধা হিসেবে তিনি তাঁর পাঠ থেকে আধুনিক উপন্যাসকে ব্যাখ্যা করছেন। তিনি বলছেন, ‘প্রত্যেক উপন্যাস আসলে সত্তাময়। আপনি যে মুহূর্তে একটি কাল্পনিক চরিত্র সৃষ্টি করবেন, তখনই আপনাকে মুখোমুখি হতে হবে এই প্রশ্নের—সত্তা কী? এটাকে কীভাবে বোঝা যাবে?’ [তর্জমা : বর্তমান আলোচক]

অর্থাৎ উপন্যাস সৃষ্টি মানে একটা সত্তা সৃষ্টি করা। সেই সত্তাটি হবে স্বতন্ত্র। নতুন এক জীবনের আজ্ঞাবহ। কেননা, জীবনকে তিনি দেখছেন এইভাবে—‘আমরা একবারই জন্মাই। আমরা কখনো পূর্বজন্মের অভিজ্ঞতা দিয়ে জীবন শুরু করতে পারি না। আমরা যৌবন কেমন না জেনেই শিশুকাল ত্যাগ করি। বিবাহিত জীবন কেমন না জেনেই বিয়ে করি।...কাজেই মানুষের জগৎটাই হলো অনভিজ্ঞতাময়।’ [তর্জমা: ঐ] 

কুন্দেরা মনে করছেন, একজন মানুষের অস্তিত্ব তার ভেতরেই লীন। মানুষের সমষ্টির অভিজ্ঞতার সঙ্গে ব্যক্তির ব্যষ্টিক অভিজ্ঞতার বিস্তর ফারাক। উপন্যাসের চরিত্রগুলো সমষ্টির অংশ হয়েও সম্পূর্ণ আলাদা। আত্মচেতনার মগ্নতায় ভর করে নিজস্ব সত্তান্বেষণ করাই তাদের মূল লক্ষ্য। যে কারণে তিনি উপন্যাসকে মানব অস্তিত্ব সন্ধানের অন্যতম বলিষ্ঠ মাধ্যম বলে মনে করছেন। উপন্যাসের কাজই হলো কল্পিত চরিত্রগুলোর মধ্য দিয়ে বিচ্ছুরিত অস্তিত্ববাদের ওপর ধ্যানারোপ করা। মানুষ যেহেতু তার অতীতকে বদলাতে পারে না, সেহেতু সে সব সময় চায় তা পুনর্সৃষ্টি করতে। এই পুনর্সৃষ্টি আসে নতুন নতুন সম্ভাবনা নিয়ে। এই চাওয়াটাই তাকে উপন্যাস লেখার দিকে চালনা করে থাকে। জ্ঞানই হলো উপন্যাসের একমাত্র নৈতিকতা। এ জ্ঞান মর্ত্যরে জ্ঞান নয় মোটেও; এ জ্ঞান হলো মানুষের মননের জ্ঞান। অনাবিষ্কৃত কিছুকে আবিষ্কার করাও উপন্যাসের নৈতিকতার মধ্যে পড়ে। বিস্তারিত অর্থে, উপন্যাস হলো এক মহৎ গদ্য সৃষ্টি করা, যার ভেতর দিয়ে একজন ঔপন্যাসিক অস্তিত্বের আদি থেকে অন্ত অনুসন্ধান করে চলেন। যেসব উপন্যাসের ভেতর এই অনুসন্ধানের সন্ধান মেলে না, কুন্দেরা তাকে বলছেন ‘অনৈতিক’ উপন্যাস।

মানুষ ভাবে আর ঈশ্বর হাসেন। হাসেন কারণ মানুষ যত ভাবে সত্য ততই দূরে সরে যায়। কুন্দেরা বলছেন, ঈশ্বরের এই হাসি থেকেই জন্ম নেয় ইউরোপের উপন্যাস। আধুনিক যুগের বস্তুবাদী চিন্তাকে নিন্দাবাদের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে বইটির দ্বিতীয় পর্যায়ের আলোচনা। এখানে তিনি উল্লেখ করেন যে আধুনিক যুগের প্রতিষ্ঠাতা শুধু দেকার্তে নন, সার্ভান্তেসও। কেননা, ঔপন্যাসিক হিসেবে তাঁরা ইউরোপের একই সমস্যার সাক্ষী। কুন্দেরার মতে, ‘যদি শিল্পের কাজই হয় বিস্মৃত অতীতকে ঘেঁটে দেখা, তাহলে সার্ভান্তসের হাত দিয়েই ইউরোপীয় শিল্পের অবয়ব দাঁড়িয়েছে।’ [তর্জমা: দুলাল আল মনসুর, দি আর্ট অব নভেল, কাগজ প্রকাশন, ২০০৭] ইউরোপীয় আধুনিক উপন্যাস নিজস্ব ধারায় অস্তিত্বের নানান দিক উন্মোচন করেছে। কুন্দেরা এ পর্যায়ে ইউরোপীয় উপন্যাসের ঐতিহ্যের ওপর বিশদভাবে আলোকপাত করেছেন—বালজাক মানুষের ঐতিহাসিক অস্তিত্বকে আবিষ্কার করেছেন, ফ্লবেয়ার মানুষের দৃষ্টির সামনের অদেখা জগৎকে উঠিয়ে এনেছেন। তলস্তয় মানুষের আচরণগত দিক ফুটিয়ে তুলেছেন, প্রুস্তের মাধ্যমে ক্ষয়ে যাওয়া অতীত আর জয়েসের মাধ্যমে অন্তর্মুখী বর্তমানে প্রবেশ করেছে উপন্যাস। টমাস মানের মাধ্যমে উপন্যাস অতীত-পুরাণকে বর্তমানের চালিকাশক্তি হিসেবে গণ্য করেছে। রিচার্ডসন মানুষের অন্তর্জালের ঘটনা উন্মোচনের দিকে মনোনিবেশ করেছেন। এভাবে কুন্দেরা সামগ্রিক ইউরোপের উপন্যাসের ঐতিহ্যের ওপর আলোকপাত করেছেন।

উপন্যাসের ইতিহাস নিয়ে কথা বলতে গিয়ে কুন্দেরা বলছেন যে উপন্যাসের শুরু ইউরোপে। চূড়ান্ত ভাঙা-গড়াটাও সেখানে। বিশ্বাস যেদিন হালকা হয়ে গেল, সেদিনই দন কিহোতে নিজের চেনাজানা জগৎ ছেড়ে অচেনায় পা বাড়াল—এভাবেই জন্ম নিতে থাকল চূড়ান্ত সত্য ভেঙে অনেকগুলো আপেক্ষিক সত্যের। জন্ম হলো আধুনিক যুগের, জন্ম নিল উপন্যাস। উপন্যাস অনেকগুলো আপেক্ষিক সত্যের মাঝে যে অস্পষ্টতার প্রজ্ঞা, তা থেকেই নিজের প্রজ্ঞাকে বের করে আনে। তাই তো সার্ভান্তাসের কাছে কাজটি বীরত্বখোচিত বলে মনে হয়। কিন্তু কুন্দেরা বলছেন, ‘পাঠক যেহেতু সর্বোচ্চ স্বর্গীয় বিচারের রায় ছাড়া নিজের চোখে কিছুই দেখতে পায় না। এই অক্ষমতার কারণে উপন্যাসের অনিশ্চয়তার প্রজ্ঞা তাদের কাছে অধরাই থেকে যায়।’ [তর্জমা: ঐ]

উপন্যাসের মনোজাগতিক পরিচয় দিতে গিয়ে কুন্দেরা বলছেন যে উপন্যাস ব্যক্তির আত্মপরিচয়ের সঙ্গে জড়িত। মানুষ যেহেতু জগতের ঘটনার মধ্যে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখতে পায় না, তাই তাকে ফিরে আসতে হয় অন্তর্জগতে। আধুনিক উপন্যাস সেই কাজটিই করতে লাগল। কুন্দেরা তাঁর উপন্যাসের চরিত্রগুলোর আত্মপরিচয়, আত্মসত্তাকে বুঝতে পারা না পারা, এসব নিয়ে খোলাখুলি কথা বলেছেন। বেশির ভাগ আলোচনা জুড়ে আছে কুন্দেরার বিখ্যাত উপন্যাস ‘দ্য আন্বিয়ারেবল লাইট্নেস অব বিং’-এর কথা; কথা প্রসঙ্গে এসেছে ‘লাইফ ইজ এলস্হোয়ার’, ‘দ্য জোক’, ‘দ্য বুক অব লাফটার অ্যান্ড ফরগেটিং’, ‘লাফেবল লাফ’ উপন্যাসের কথা। কুন্দেরা তাঁর উপন্যাসের ভিত্তি হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন ‘চিন্তাপ্রবণ প্রশ্ন’কে। যেসব দার্শনিক শিল্পকে দার্শনিক ও তাত্ত্বিক ধারার পরবর্তী রূপ বলে মনে করেন, তাদের সঙ্গে দ্বিমত কুন্দেরার। কেননা তিনি বলছেন, ‘উপন্যাস ফ্রয়েডের পূর্বেই অচেতনতা নিয়ে কথা বলেছে, মার্ক্সের পূর্বে শ্রেণিসংগ্রামের কথা বলেছে, ইন্দ্রিয়তাত্ত্বিকদের পূর্বে ইন্দ্রিয়তাত্ত্বিক বিষয়ে কথা বলেছে।’ [তর্জমা: ঐ]

চরিত্রের অতি বর্ণনা কমিয়ে কুন্দেরা জোর দিয়েছেন পরিস্থিতি বর্ণনাতে। কাজেই চরিত্রগুলো দেখতে কেমন, তাদের অতীত কী, এগুলো খুব কমই জানা যায় তাঁর উপন্যাসে। একই কাজ করেছেন কাফকা ও মুসিল। তাঁদের তৈরি চরিত্ররা তলস্তয় কিংবা দস্তয়ভস্কির চরিত্রদের মতো বিন্যস্ত না। এ ক্ষেত্রে অনেকের ধারণা, বর্ণনার ঘাটতি থাকলে চরিত্রের জীবন ঘনিষ্ঠতা কমে। উপন্যাসের ক্ষেত্রে কুন্দেরা সেটা অপরিহার্য বলে মনে করছেন না। তিনি বলছেন, ‘উপন্যাসের চরিত্র বাস্তবের মানুষের ছদ্মরূপ হতে পারে না। চরিত্র কাল্পনিক এবং পর্যবেক্ষণমূলক আত্মপ্রতিমা।’ [তর্জমা: ঐ]

সব বলে না দিলে পাঠকদের সুবিধা থাকে নিজের মতো করে চরিত্রের অবয়ব নির্মাণ করার। চরিত্র হয়ে ওঠে আংশিক লেখক ও আংশিক পাঠকের কল্পনার যৌথ ফসল।

অস্তিত্বনির্ভর উপন্যাসের সামাজিক-ঐতিহাসিক গুরুত্ব নিয়ে কথা বলতে গিয়ে কুন্দেরা বলছেন যে তিনিও হেইদেগারের মতো বিশ্বাস করেন মানুষের সঙ্গে পৃথিবীর যে সম্পর্ক, সেটা অভিনেতার সঙ্গে মঞ্চের যেমন সম্পর্ক তেমন নয়। সম্পর্কটা কাছিমের সঙ্গে তার খোলসের মতো। মানে বিশ্ব হলো মানুষেরই অংশবিশেষ। এ জন্য বিশ্ব বদলালে মানুষের অস্তিত্ব বদলাবে। তবে ঐতিহাসিক দিক পর্যবেক্ষণ করা আর ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিতের বিশদ বয়ান এক কথা নয়। কুন্দেরা ইতিহাসের যতটা সম্ভব কম উপাদান নিয়ে উপন্যাস নির্মাণের পক্ষপাতী। ঐতিহাসিক উপন্যাস লেখাটাকে তিনি খুব গুরুত্বপূর্ণ কাজ বলে মনে করছেন না। কারণটা তিনি ব্যাখ্যা করছেন এই বলে—‘ঐতিহাসিক পরিস্থিতি চরিত্রের জন্য শুধু নতুন অস্তিত্ব তৈরি করে না। বরং অস্তিত্বের প্রেক্ষাপটে ইতিহাসকে বুঝতে হয়, বিশ্লেষণ করতে হয়।’ [তর্জমা: ঐ] যা ঘটে গেছে তা ইতিহাস। সেখান থেকে যে সম্ভাবনার আলো বিচ্ছুরিত হয়, সেটাই অস্তিত্ব। উপন্যাসের কাজ সেই বিচ্ছুরিত সম্ভাবনাকেই পর্যবেক্ষণ করে দেখা।

উপন্যাসের শিল্প নিয়ে কথা বলতে গিয়ে কুন্দেরা বলছেন, ‘উপন্যাসকেও কৌশল দ্বারা ওজন করে নিতে হবে। যেসব রীতি-প্রথা ঔপন্যাসিকের কাজে লাগবে সেগুলো মেনে চলা যেতে পারে।’ [তর্জমা: ঐ] তবে তিনি উপন্যাসকে কলাকৌশলের হাত থেকে মুক্তি দিয়ে বাচনিক উপাদান কমিয়ে দেওয়ার পক্ষপাতী। তাতে উপন্যাসের ঘনত্ব বাড়বে। এরপর কুন্দেরা যুক্তি দিয়ে তাঁর উপন্যাসের নানান দিক প্রতিষ্ঠা করছেন। সংগীতের সঙ্গে কুন্দেরার উপন্যাসের গভীর একটা সম্পর্ক আছে। কুন্দেরা সেটা জেনে-বুঝেই করেছেন। 

তিনি বলছেন, ‘একেকটা অধ্যায় একেকটা গতিতরঙ্গ এবং একেকটা পরিচ্ছেদ একেকটা লয়-তাল। এই তালগুলো দীর্ঘ হতে পারে, সংক্ষিপ্ত হতে পারে। এতে লয় আসার পথ সুগম হয়।’ সংগীতের মতো উপন্যাসেও স্বরের সমতা বজায় রাখা জরুরি। এই অর্থে প্রতিটা ভালো উপন্যাসের সঙ্গে সংগীতের অপরিহার্য এই দিকটা মিলে যায়। কুন্দেরার মতে, ‘উপন্যাসে সঠিক মাত্রায় ভিন্নস্বরের মিশ্রণের শর্ত হলো প্রথমত, বিভিন্ন ধারার সমতা এবং দ্বিতীয়ত সামগ্রিকতার অখণ্ডতা।’ [তর্জমা: ঐ] সংগীতের সঙ্গে উপন্যাসের তুলনাটা ঐক্যের, ছন্দের এবং সেটা সম্পূর্ণই প্রাসঙ্গিক। কুন্দেরা সংগীত আবহে বড় হয়েছেন। পড়াশোনাও করেছেন সংগীত বিষয়ে। তাই তো তার এই পর্যবেক্ষণের আলাদা একটা গুরুত্ব আছে। প্রসঙ্গক্রমে সালমান রুশদির কথা না বলে পারছি না। রুশদি একই অনুপ্রেরণা অর্জন করেছেন চলচ্চিত্র থেকে। তাঁর ভাষ্যে, `The classic form of film montage is long shot, medium shot, close-up, medium shot, long shot, medium shot, close-up, medium shot, long shot-like a kind of dance./ That great period of filmmaking has a lot to teach novelists. I always thought I got my education in the cinema. [Interview: Paris Review.'

বইটির একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশজুড়ে আলোচনা করা হয়েছে কাফকার উপন্যাস নিয়ে। কাফকা যে উপন্যাসের ঐতিহ্য নির্মাণ করেছেন, কুন্দেরা সেই ঐতিহ্যেরই ধারক। কাফকার সাহিত্যকে তিনি আধুনিক আমলাতান্ত্রিক জীবনযাত্রার প্রতীকী উপস্থাপন বলে মনে করছেন। কাফকা দেখিয়ে দিয়েছেন যে একজন ব্যক্তির ফাইল বা নথিপত্র ওই ব্যক্তির জায়গা জুড়ে নিয়েছেÑফাইলটাই হলো আসল, ব্যক্তি তার ছায়াবিশেষ। কাফকার সাহিত্যের অন্য একটা অপরিহার্য দিক হলো অপরাধীর অপরাধ খুঁজে নেওয়া। আপনাকে জেলে বন্দি রেখে অত্যাচার করা হচ্ছে, কাজেই আপনাকে অবশ্যই স্বীকার করতে হবে যে আপনি অপরাধী। কাফকার সাহিত্য এমনটিই বলছে। সমস্যাটা শুধু সামাজিক বা রাজনৈতিক না, মনস্তাত্ত্বিকও বটে। অভিযুক্ত একসময় সত্যি সত্যি মেনে নেয় যে সে অপরাধী। সে নিজেই তার শাস্তির যথার্থতা আবিষ্কার করে। কাফকায় এই সব পরিস্থিতি মনে হবে যেন উপহাস, শুধু উপহাসের ওই চরিত্রগুলোর কাছে মনে হবে এটা একটা দুঃস্বপ্নের মতো। (এই উপহাসকে কুন্দেরা দেখছেন এইভাবে, ‘আমাদেরকে মানুষের মহত্ত্বের সুন্দর ইল্যুশন দেখিয়ে দুঃখবোধ সান্ত্বনা জানায়। কমিক বড়ই নিষ্ঠুর, এটা নির্মমভাবে আমাদের বেঁচে থাকার অর্থহীনতার ওপরই অর্থারোপ করে।’) 

কাফকা যে জগৎটা চিহ্নিত করছেন, সেই জগৎটা অফিস-আদালত ও আমলা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। কুন্দেরা বলছেন যে কাফকা ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ভেবে লেখেননি। তাঁর কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যও ছিল না। প্রকৃতির নিয়মেই যেন কাফকার গল্পগুলো আজ সত্য হয়ে দেখা দিয়েছে। পুঁজিবাদ থেকে সমাজতন্ত্রÑসবখানেই আজ তা তেমনই প্রাসঙ্গিক। অন্যত্র বলছেন, ‘কাফকা আমলাতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থাকে উঠিয়ে এনেছেন তাঁর উপন্যাসের কাব্যে। তিনি যেভাবে খুব সাধারণ একজন মানুষের অতি সাধারণ একটা গল্পকে মিথে, এপিকে রূপান্তরিত করেন, তা পূর্বে দেখা যায়নি।’ [তর্জমা : বর্তমান আলোচক]

উঁচু মানের উপন্যাস ঔপন্যাসিকের চেয়ে বেশি বুদ্ধিদীপ্ততার স্বাক্ষর বহন করে। এ জন্যই ঔপন্যাসিক দার্শনিক নন। ঔপন্যাসিক সব সময় তার উপন্যাসের আড়ালে থাকবেন। জনগণের প্রতিনিধিত্ব করা তার কাজ না। ঔপন্যাসিক সুসান সোনটাগ তাঁর একটি সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘একজন সিরিয়াস লেখক নিজের ছাড়া অন্য কারও মুখপাত্র নন। এখানেই সাহিত্যের মহত্ত্ব।’ [অনুবাদ : বর্তমান আলোচক, প্যারিস রিভিউ] 

কুন্দেরা এখানে বলছেন, ‘ঔপন্যাসিক কারই মুখপাত্র নন। এমনকি নিজের ভাবনারও মুখপাত্র নন।’ [তর্জমা: দুলাল আল মনসুর, ঐ] কাজেই এখানে বিরোধ আসতে পারে। যেমন, আচেবে তাঁর একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘আমি বুঝতে পারলাম আমাকে লেখক হতে হবে। আমাকে ইতিহাসবিদ হতে হবে।’ [তর্জমা: বিদ্যুৎ খোশনবীশ, দৈনিক অর্থনীতি প্রতিদিন] তার মানে তিনি নিজেকে তাঁর জাতির মুখপাত্র হিসেবে গণ্য করছেন। তিনি লিখেছেন তাঁর জনগোষ্ঠীর প্রকৃত ইতিহাস লিখতে। আচেবে এমন এক জনগোষ্ঠীর লেখক, যাদের ইতিহাস লেখা হয়েছে ইউরোপীয়দের দৃষ্টি দিয়ে। অর্থাৎ শোষক শ্রেণির হাত দিয়ে তা রচিত। কাজেই ইগবু জাতির প্রকৃত ইতিহাস সেখানে নেই। থাকবার কথাও না, সেই কথায় বলছেন চিপিউয়া এলডাল—‘যখনই অন্যরা তোমার গল্প বলতে যাবে, দেখা যাবে যে সেটা বেঁকে গেছে।’ [তর্জমা: বর্তমান আলোচক] 

এখানে ইতিহাস মানে শুধু রাজনৈতিক ব্যাপার না, সঙ্গে শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি জড়িত। আচেবে সাবল্টার্নের পক্ষ থেকে সাহিত্য রচনার কথা বলছেন। তিনি সেই কাজটিই করেছেন ‘থিংস ফল অ্যাপার্ট’-এ। এই উপন্যাসটি পড়ে ইগবু জাতিকে যেভাবে জানা যাবে, অনেক ইতিহাসের আকর গ্রন্থ পড়েও হয়তো সেভাবে জানা যাবে না। এখানে ইতিহাস ও রাজনীতি যেভাবে এসেছে, সেটা এসেছে গল্পের প্রয়োজনেই। 

একই কথা বলা যায় ‘আঙ্কেল টমস কেবিন’-এর বেলায়। এই উপন্যাসটি বিশ্বে এন্টি স্লেভারিকে যেভাবে নিরুৎসাহিত করেছে, তা ইতিহাসের অনেক গ্রন্থও পারেনি। কাজেই কুন্দেরার ‘ঔপন্যাসিক কারোরই মুখপাত্র নন’ কথাটা সব ক্ষেত্রে সত্য বলে খাটে না। রুশদি যেমন বলছেন, ‘পৃথিবীর একটা ব্যাপক অংশ আমার গল্পে চলে আসে। এর কারণ এই না যে আমি রাজনীতি নিয়ে লিখতে চাই। এর কারণ হলো, আমি জনগণ নিয়ে লিখতে চাই। (তর্জমা: বর্তমান আলোচক, প্যারিস রিভিউ) আবার সব সময় যে উপন্যাস জনগণের প্রতিনিধিত্ব করবে, তা-ও না। অনেক সময় উপন্যাসকে একজন লেখকেরও প্রতিনিধিত্ব করতে দেখা যায়; সেই কথায় বলছেন আচেবে তাঁর ‘দ্য ট্রুথ অব ফিকশন’-এ: ‘প্রত্যেকে গল্প বোনে তার নিজের জন্য—নিজের বেঁচে থাকাকে উপভোগ্য করে তুলতে। গল্পগুলো সত্য হোক মিথ্যা হোক, ভালো হোক মন্দ হোক—তার চোখ দিয়ে জগৎকে দেখবার অসম্ভব এক শক্তি নিয়ে হাজির হয়।’ [অনুবাদ: বর্তমান আলোচক]


কাজেই এদিক থেকে ঔপন্যাসিককে কুন্দেরা যতটা নৈর্ব্যক্তিক থাকতে বলছেন, সেটা নিয়ে ভিন্ন কথা বলার অবকাশ থেকেই যাচ্ছে। এমনি করে আলোচ্য গ্রন্থে অনেক বিষয় নিয়ে পাঠকদের সঙ্গে কুন্দেরার দ্বিমত ঘটার নানান ক্ষেত্র হয়তো আছে, কিন্তু বইটির বিশেষত্ব এখানে যে কুন্দেরা জোর করে পাঠকদের ঘাড়ে তার ভাবনাকে চাপিয়ে দিচ্ছেন না। তিনি শুধু ভাবনার জগৎটা উসকে দিচ্ছেন। উপন্যাসের গঠনপ্রণালি নিয়ে কুন্দেরার বিশ্লেষণাত্মক আলোচনার কারণে পৃথিবীর যেকোনো ভাষার লেখকদের জন্য বইটি উপকারী-পাঠ্য। এখানে কোনো সাহিত্য তত্ত্ব নেই, কোনো নির্দিষ্ট সাহিত্য-দর্শনও নেই, আছে শুধু একজন পণ্ডিত লেখকের সচেতন ভাবনা—explication of the authors principle.

অনেক পাঠক ইন্টারনেটে জানিয়েছেন যে কুন্দেরার এই বইটি তাদের কাফকা, প্রুস্ত, বালজাক, ফ্লবেয়ার, ভলতেয়ার, মান, মুসিল প্রভৃতি লেখকের পুনর্পাঠে অনুপ্রাণিত করেছে। এবং তাদের সামগ্রিক পাঠকেও ভাবিয়ে তুলেছে। কাজেই দেখা যাচ্ছে, যারা উপন্যাস পড়তে পছন্দ করেন, তাদের কাছেও বইটির গুরুত্ব তেমনি অপরিসীম।

**********

লেখক  পরিচিতি : কথাশিল্পী-প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক মোজাফ্ফর হোসেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে সাংবাদিকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। বর্তমানে বাংলা একাডেমির অনুবাদ উপবিভাগে কর্মরত। প্রধানত কথাসাহিত্যিক। দুই বাংলার অন্যতম পাঠকপ্রিয় ছোটগল্পকার। পাশাপাশি সাহিত্য সমালোচক ও অনুবাদক হিসেবেও তাঁর পরিচিতি আছে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ