বনমালী মাল-এর গল্প : উবু ১০




"তুই বিন্দা দাসের হ্যা ঘর নু তার বউকে তুলিয়া লেইলু… পিরীত"
"তাকে আবার হাসপাতাল নু ঘর ছাড়িতে যাইলু… পিরীত"
"গোবিন্দর সাথে শাট করিয়া আমাকে লাইন ছাড়লুনি… পিরীত"
"অখন আমার টোটোর পিছনে পিছনে হাঁক দউঠু… এটা কার সাথে পিরীত রে কামাল!”
“সব পিরীত শেষ!”
"তুই মোর সঙ্গে এমনটা করতে পারলু! মোর সঙ্গে!"

গোটা সকাল পালিটা চড়া রোদ। দুপুরের পর থেকে শুরু হয়েছে গেদে বৃষ্টি। এখন এই সন্ধ্যা পর্যন্ত সেই ছাগল তাড়ানো বৃষ্টি চলছেই। খাটাখাটনি কিংবা মেগে পেতে চলা লোকগুলো তখনও বাজারেই। বৃষ্টি ধরলে বাজার ফিরতে পারে। একটা বেঘরা বুড়ি দুপুর-রাত্রি বাসস্ট্যাণ্ড ঝাঁট দিয়ে দোকানিদের কাছ থেকে যাহোক কিছু পয়সাকড়ি পায়। তার অবশ্য কোথাও যাওয়ার নেই, কিন্তু ঝাঁটাটা ধরার অপেক্ষায় সারাটা দিন সে একভাবে বসে আছে। সে জানে, এ শালা ঢ্যামনাখচ্চর লোকগুলা এমনিতে একটি পয়সাউ তার হাতে ঠেকিবেনি। সেজন্য তার হাত মুখ পেট নিশপিশ করছে। ঝাঁপ আড় করে নামিয়ে রাখা দোকানের ভেতরে খদ্দেরহীন দোকানির বিড়ির ধোঁয়া ক্ষীণ আলো থেকে বেরিয়ে ঝোড়ার বাতাসে মিলিয়ে যাচ্ছে।

বৃষ্টি থামল গিয়ে সন্ধ্যার পর লোকজন ঘর থেকে বেরোনোর সময় পেরিয়ে। বৃষ্টি থামার পর থেকে মোসলেম অনর্গল বকে যায়। এটা তার রাগ নয়। অভিমানের সঙ্গে অসহায়তা মিলে গেলে যা হয়।

কামাল তার বন্ধু। একসাথেই এতদিন বাসস্ট্যান্ড থেকে হলদি নদীর খেয়াঘাট অব্দি টোটো চালিয়ে এসেছে। টোটো চালানোর আগে থেকে তারা দুজন দুজনে কথা চালাত। কিন্তু আজ যা হয়ে গেছে, তার পর থেকে কামালের মুখ দেখতে চায় না সে।

—কী লাভ হইল তোর!

যেন কত কত বছরের এক দলা কফ গলার কাছে এসে স্বর ধরিয়ে দিয়েছে। পুরু কাচের চশমার ভেতর মোসলেমের ঘোলাটে চোখগুলো অস্বাভাবিক বড় দেখায়। রাগ আর বিস্ময়ে তার চোখ এখন চশমার ভেতর ভরে গেছে। নিজের টোটোয় বসে বসে যে কথাগুলো মোসলেম শুরু করেছিল, সেই কথায় তার আজকের সারাদিনের ক্ষতির খতিয়ান আছে।

মোসলেম আর কামাল দুজনে একই রুটে টোটো চালায়। বাসস্ট্যান্ড থেকে খেয়াঘাট। ঘাটে গিয়ে খেয়া ধরায়। খেয়া ধরে। এই লাইনের ক্ষেপ ছাড়াও তাদের সবার কিছু কিছু পাড়া ধরা থাকে। অমুক পাড়া থেকে কেউ বাস ধরতে যাবে—অমুকের টোটো। তমুক পাড়া থেকে কেউ হাসপাতালে যাবে—তমুকের টোটো। তাদের নিজের নিজের এইসব ভাগে অন্য কেউ ভাগ বসায় না। যদি কারো নিয়ত না খারাপ হয়ে যায়। হ্যাঁ, আজ কামাল যেটা করেছে সেটা তার চোট্টামি। জেনে বুঝে সে মোসলেমের ধান্দায় ভাগ বসিয়েছে।

দুপুরের পর থেকে বৃষ্টি এসে বিকেলের বাজারটা ধুয়ে দিয়ে গেছে। এরকম দিন আগেও গেছে, যেদিন মোসলেম বা কামালকে ঠনঠন পকেট নিয়ে ঘরে ফিরতে হয়েছে। সে হোক—তেমন তেমন দিনগুলোতে সবাইকেই ক্ষতি স্বীকার করতে হয়। আমার হয়েছে তোমার হয়নি বা তোমার একার হয়েছে আর কারো হয়নি—এমন যদি হয়, তখন সান্ত্বনা দেওয়ার আর কোনো উপায় থাকে না। সব রাগ গিয়ে পড়ে কপালে—

“আমানকের বাঁড়া পাথরচাপা কপাল…”
“লটারি কাটবু, লাগবেনি—মাঝেসাঝে বউয়ের উপর উঠবি—কইবে ঘরে সরষার তেল বাড়ন্ত—যত যা ঢালার বাই ছিল, সব চঁ চঁ করে কড়ায় শুকি যাবে।”

কিন্তু এইসব সার্বজনীন দুঃখ-গাথার ভেতরেও তাদের নিজেদের লাইনগত কিছু নিয়ম ছিল, সেটুকুই আনন্দের—সেটুকুই সুখের।

কিন্তু আজ তো তেমন হয়নি, আজ কামাল ধোঁকা দিয়ে দাঁও মেরেছে। জেনে বুঝে মোসলেমের বাড়া ভাতে ছাই দিয়েছে।
“এত যদি তোর হাতটান, মোসলেমকে কইতে পারতু!”

আগেউ ত দুজনের ভিত্রে টাকার লেনদেন হইছে! তাদের ত জীবনটাই এরকম। কেউ ভাগ্যে চলে, কেউ ভাগে চলে—তবে চলে যায় ঠিক।

এইসব ভাবনা ভাবলে নিজেদের ভেতরের সম্পর্কটা একটা সহজ সরল দিশা পায়। তাদের মত মানুষদের অকিঞ্চিৎকর জীবনে এই টুকটাক করা-ধরার লোক আছে বলেই তো মোসলেম কামাল টিকে আছে। খেতে পরতে পারছে। টকা মাইঝি পালতে পারছে। আজকে মোসলেম কি এইসব চিরায়ত মানবের ভাবনা ভাবেনি! ভেবেছে, সেই দুপুরের পর থেকে অনর্থকারী গ্যাঁট হয়ে বসে থাকা, সামনের ঝাপসা কাচ দিয়ে পিচ রাস্তার উপর কাচড়া বৃষ্টির ভাপ ওঠা, তারপর সন্ধ্যা নামা থেকে পাশের একটা বন্ধ পান গুমটির সামনে জমা জলের দিকে চেয়ে বসে আছে মোসলেম। জমা জলটার উপর টুপ টুপ পড়া জল আর আলো ভেঙে মিলিয়ে যাওয়ার একটার পর একটা শেষ নিঃশেষ তরঙ্গ তাকে বেশিরভাগ সময় নরমই করে রেখেছে কিন্তু ব্যবসা তো! গলার কাছে আটকে থাকা আজকের ঘটে যাওয়াগুলোকে সে কোনমতে গিলতে পারে না। বিতৃষ্ণায় গেদে উঠে মাঝে মাঝে তাকে সবকিছুর প্রতি বিরক্ত করে তুলছে। এই কামাল—এই বৃষ্টি—ঘরে কতগুলা পেট—এমনকি শালা উপরবালাও—যেন সবাই মিলে আজকে তার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছে। বিশাল সংসারের ঘানি টানতে টানতে শীর্ণ হয়ে যাওয়া মোসলেমের দুদিকের চোয়ালের হাড়ে এখন ঢেউ খেলে যাচ্ছে। ঝোড়া বাদলার ঠাণ্ডা বাতাসেও জামার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে গরম ভাপ।

কামাল ঠায় বসে আছে তারই পাশে তার নিজের টোটোতে।

আজ আর কোনো যাত্রী আসবে না। টানা বৃষ্টিতে বাজার যেন হেজে গেছে। দুপুরের আগে অব্দি যা হয়েছে হয়েছে, এবার ঘরে ফেরার পালা।

বিন্দা দাসের বউকে তোলার কথা ছিল মোসলেমের। ওই দিকের পাড়াতে সে-ই ভাড়া খাটে। তুলল কে?—কামাল।

তারপর স্ট্যান্ড থেকে বেরোনোর সময় টোটোটা গড়িয়ে গড়িয়ে সময় খায় কামাল। পরের টোটো মোসলেমের। তখন যাত্রী ছিল বলে কিছু বলেনি মোসলেম। কিন্তু এখন ওই ব্যাপারটাকেও সে কামালের চক্রান্ত বলেই মনে করছে।

নাই নাই করে প্রায় বিশ খানা টোটো চলে ওই রুটেই। খেয়ার নৌকা অতখানি মানুষ উগরায় না বা গেলে না, যত মানুষ ভাগ ভাগ হয়ে এক টোটো থেকে অন্য টোটোতে মিশে যায়। দিনের শেষে তবুও যা হত বা হয়, তা সময়কে বোকা বানিয়েই। স্ট্যান্ড থেকে ধীর গতিতে গড়াতে গড়াতে সবাই সময় খায়। আগের টোটো থেকে নিজের দূরত্ব তৈরি করে। দৈবাৎ এক আধটা যাত্রী জুটে যেতে পারে ভেবে। লাইনে চলা ছাড়া এক একটা পাড়ায় এক একজনের খাতির আছে। লাইন ছেড়ে কখনও একটা ফাটকা ভাড়ায় নিজেদের দিন পুষিয়ে নিতে পারে তারা।

কাছের একজন এমন করে ফাঁকি দিয়ে গেল তাকে! বকুল, সাদ্দাম বা হরিপদ করলেও তবু মানা যেত।

এখন রাগ অভিমান আর হিংসা পালা করে মোসলেমকে নাড়ায়। ভেতরে ভেতরে। বাইরে থেকে তাকে অস্পষ্ট দেখায়। এমনিতে রোগা পাতলা চেহারা নিয়ে সে সেই বিকেল থেকে টোটোর ভেতর সেঁধিয়ে আছে। তার উপর স্ট্যান্ডের আলো পড়ে ভিজে রাস্তা এত চকচক করছে যে কোনো মানুষকেই স্পষ্ট দেখা যায় না। কেউ একজন যদি টোটোর জন্য আসেও হয়ত—এসে দেখবে কোনো একটা ছায়া কিংবা বস্তা রাখা খালি টোটো-টা দাঁড়িয়ে আছে।

পকেটের দিকে তাকায় মোসলেম। কয়েকটা দশ টাকা আর কুড়ি টাকার নেতিয়ে যাওয়া নোটে একশ টাকার একটু উপরে এসেছে। এর থেকে আবার ইউনিয়নকে কুড়ি টাকা দিতে হবে। মাথাটা হঠাৎ করেই কত ভারী হয়ে যায় মোসলেমের। মাত্র এই ক'টা টাকা নিয়ে বাড়ি ফিরতে হবে বলে, না আরো অনেক কিছু ভেবে!

—দেখ্, আমি ত কুনোদিন তোর পিছনে লাগিনি।
—লাগবো কেন! আমানকের কি প্রচুর আছে যে কাড়াকাড়ি করবু!

ওদিকে কামাল তার নিজের টোটো-তে বসে বসে একটা কিছু বলতে যায়। হয়তো ভুল স্বীকার। হয়তো সহানুভূতি! আবার হতে পারে হয়তো যে কাজটা সে করে ফেলেছে, তার পেছনে একটা যুক্তি আছে— আর সেই অকাট্য যুক্তিটাই সে এখন পেশ করতে চায়। কিন্তু শুনবে কে!
মোসলেম!
পেটটান অভাবে পড়লে কে কার যুক্তি শুনবে?

কামাল শুরুর শব্দটা শুরুও করতে পারেনি, তার আগেই গলা বার করে তেড়ে যায় মোসলেম
—তুই একটাও কথা কইবুনি… শালা চামার। বিন্দা দাসের বৌ কি তোর পিরীতের নাঙ হয়? ল্যাওড়া—
পাগলের মত লাগে মোসলেমকে।

কামাল এবার একটু ফোঁস না করে থাকতে পারে না। এই লাইনের উপর তার সংসার চলে যে!
“কুনো কুনোদিন তুই ও ত লেট করু।”
“আচ্ছা নাহালে তুই কালকে আমাকে একটু চেপে বেরাবি!”

স্ট্যান্ডের উজ্জ্বল আলোর তলায় দু' চারটা থেকে দশ বারোটা লোক জমা হয়। তারা একে অন্যকে ঈশারা করে। অনেক উঁচু থেকে হলুদ আলোটা পড়ছিল ব’লে তাদের মুখ আর চোখ স্পষ্ট নয়। এমন দৃশ্য দেখার জন্য এমন আলোই উপযুক্ত। তারই মধ্যে দু' একজন তাদের থামতে বলে।

এরই মধ্যে আবার বৃষ্টি এল গুমরে থাকা রাগের মত করে। যারা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে 'বিন্দা দাসের বৌ' আর 'পিরীতের নাঙ' জাতীয় শব্দগুলোর মধ্যে থেকে গড়িয়ে পড়া রস মাখছিল, তারা ভিজে যাওয়ার ভয়ে আলগা আলগা হয়ে গেল। স্ট্যাণ্ডে আলো আরো আবছায়া হয়ে এল। এমন আলোতেই বেরিয়ে এল কয়েকটা লোম ওঠা কুকুর। হঠাৎ দেখলে যাদের খুব সুন্দর মনে হয়। স্ট্যান্ড ছেড়ে গেল না কেবল কামাল আর মোসলেম। এমনিতে টোটোওয়ালারা থাকে রাত প্রায় দশটা অব্দি। কিন্তু আজ সময়ে জল ঢুকে গেছে। কামাল যেন এখনও একটা লজ্জা কোলে নিয়ে বসে আছে। টোটোর সিট থেকে উঠে দাঁড়ালেই ঝরে পড়বে।

একটা আফসোস আছে। এতগুলো লোকের সামনে হ্যাকেল পাওয়া আছে

সবকিছু মিলে যেন কামাল নয়, কামালের একটা পিণ্ড উদ্দেশ্যহীন টোটো-র এক্সেলেটর ধরে বসে আছে। এই মুহূর্তগুলোতে নিজেকে যথাসাধ্য ছড়িয়ে রাখতে হয়—তাহলে সময়মত গুটিয়ে নেওয়া যেতে পারে।

স্ট্যান্ডের দোকানগুলো সব বন্ধ শুধু একটা পান গুমটি খোলা আছে। বৃষ্টি হচ্ছে বলে তার ঝাঁপ নামানো। জনশূন্য বাস স্ট্যান্ডে দৃশ্যত আর কোনো মানুষ নেই। রাত বাড়লে খেয়াও বন্ধ। আজ আবার এমন বাদলা রাতে মানুষের অভাবে খেয়াও তাড়াতাড়ি বন্ধ হয়ে গেছে হয়ত। যে টোটোগুলো খেয়াঘাট থেকে ফেরার, তারা ফিরে যে যার বাড়ি চলে গেছে। যাওয়ার সময় কেউ মোসলেমকে বোঝায়। কেউ কামালকে। তারা সবাই নিজের নিজের বাজার খারাপের কথা ছোঁড়ে। কেবল কামাল আর মোসলেম এখনও স্থির বসে আছে নিজের নিজের টোটো-তে। আর আছে সেই বুড়িটা। যাওয়ার কোথাও নেই ব’লে।

প্রায় নির্জন স্ট্যান্ডে দুজন লোক একে অপরের দিকে না তাকিয়ে মানুষের কথা ভাবছে। তাদের মধ্যে আর কথা কাটাকাটি নেই। মোসলেমের রাগ থিতিয়ে গেছে। এখন শুধু মানুষের কথা ভেবে কষ্ট হচ্ছে তার। মানুষের কেমন হওয়া উচিৎ সে জানে না, তবে আজ কামাল যা করল মানুষের এমন করা উচিৎ নয়, সে বোঝে। আর বোঝে যে, কামালেরও বোঝা উচিত। কামাল কি জানে না তার ঘরের অবস্থা কেমন! সব জানে।

—সব বুঝে শাল্লা…

কামাল আরো রাত হওয়ার অপেক্ষা করছে। অনেক লোকজনের কাছে বিন্দা দাসের বউয়ের সঙ্গে তাকে এমনভাবে লাগিয়ে দিতে পারল মোসলেম! তার ব্যবসা যদি হোঁচট খায়! কোন্ মুখ নিয়ে সে ওই পাড়ায় ঢুকবে!

দুজন পাশাপাশি দুটো টোটো-য় বসে নিজের নিজের মত করে ভেবে যাচ্ছে। বৃষ্টিটা আজাড়ে এসেছে। হলুদ আলোটা আরো বেশি করে চারদিক ধুয়ে দিচ্ছে। একটা নেড়ি কুত্তা কোথা থেকে বেরিয়ে এল। বৃষ্টি থেকে বাঁচতে কোথাও ছিল—তবুও কিছুটা জল গা থেকে ঝেড়ে দু পা সামনে দু পা পেছনে চারিয়ে নির্বিকার চেয়ে রইল দূর তর রাস্তার অন্ধকারের দিকে।

ধ্যান ভাঙল কামালের। এবার সে বেরোবে। বেরোনো যায়। জড়বৎ আচ্ছন্নতা আর কৃতকর্মের লজ্জায় জড়িয়ে থাকা কামাল হঠাৎ এক্সেলেরেটরে মুঠোটা ঘোরাতে যাবে এমন সময় দুপুরের হঠাৎ বৃষ্টির মত একটা লোক আসে। চটজলদি জানতে চায়—
“নন্দবাড় যাবু?”
—হ…
—এদিকে আইস…

মোসলেম বলে। কামাল বলে।
দুজনেই বলে। একসঙ্গে চুপও করে যায় দুজনেই।

বিমূঢ় স্থির হয়ে থাকে আগন্তুক যাত্রী। টোটো দুটোর মাঝখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গভীর রাতের সঙ্গে মিশে যাওয়ার আগেই যেন একটা তাড়না থেকে লোকটা উঠে পড়ে কামালের গাড়িতে।
—চল্…
এখানে কামালের কিছুই করার নেই। সে দ্বিতীয়বার ডাকেনি। নেমে যেতেও তো বলা যায় না!

মসৃণ একটা শব্দ তুলে আস্তে আস্তে বেরিয়ে যায় কামাল।
—তোকে আমি ছাড়বোনি, দেখ্যা লুবো …মার‍্যা ফেলবো…

অস্তিত্বের গোঙানি এমনই মিলিয়ে যায়। কেঁপে কেঁপে। মোসলেমের নিজের কানেই কথাটা কত জোরালো অথচ অসহায় লাগল। নির্জন স্ট্যাণ্ডে সেই বুড়িটার যাহোক একটা অস্তিত্ব না থাকলে হয়তো এই কথাগুলোর প্রতিধ্বনিতেই পাগল হয়ে যেতে পারত মোসলেম।

স্ট্যান্ডের আলো থেকে কুত্তাটা চেয়ে থাকার অন্ধকারে টোটো-টা মিলিয়ে যাওয়া অব্দি সেইদিকে চেয়ে রইল মোসলেম।
—একটুকু লজ্জাউ নেই! শাল্লা চষমখোর…
—গায়ে কি আদৌ মানুষের চামড়া আছে!

বাতিস্তম্ভের আলো থেকে বৃষ্টির কুয়াশা উবে গেছে। আরো কয়েকটা কুত্তা জমা জল বাঁচিয়ে কীসব শুঁকে শুঁকে এদিক সেদিক হচ্ছে।
—একবার কইতে ত পারত যে, তুই লিয়্যা যা…

মোসলেম এখন বুঝতে পারছে, কামাল সব ইচ্ছা করেই করেছে। সকাল থেকে তার সঙ্গে যেসব অঘটন ঘটে আসছে, সেসব আসলে ঘটানো হয়েছে।

রাগে কাঁপতে থাকে মোসলেম। একটা কুত্তা শুঁকতে শুঁকতে তার পায়ের কাছে চলে আসে। আরো একটু কাছে আসার অপেক্ষা করে মোসলেম। তারপর আলো ভেদ করা একটা চিৎকার… সবকিছু অসহ্য লাগছে তার। ইচ্ছে করছে এখুনি গাড়ির একসেলেরেটরটা জোর করে মুড়ে কামালকে ধরে ফেলে। টুঁটিটা টিপে ধরে তার।

“শাল্লা কুত্তার বাচ্চা, পুরা দিনটাকে শেষ করে দিল…”

এমন সময় কেউ একটা হাত রাখে তার পিঠের উপর। নিজের ভাবনায় ডুবে থাকা মোসলেম চমকে ওঠে।
—একশ টাকা দুবু?

পেছন ফেরে মোসলেম। একটা রোগা ঢ্যাঙা জামাসর্বস্ব লোক দাঁড়িয়ে আছে তার টোটোর পাশেই! সামনের দিকে একটু ধেপে সে টোটোর ভেতরে মুখটা ঢুকিয়ে দিয়েছে। মাথার ছায়ায় লোকটার মুখ আবছা দেখা যায়।

এতদিন এই লাইনে কাজ করছে মোসলেম। বাজারের অনেক লোককে সে চেনে। অনেক লোক তার মুখচেনা অথচ এরকম একটা লোককে কোনোদিন সে দেখেছে বলে মনে করতে পারছে না! লোকটা তখনও রোগা লিকলিকে হাতটা বাড়িয়ে রেখেছে তার দিকে।

এই প্রথম হুঁশ হল মোসলেমের। একহাতে বুক পকেটটা চেপে ধরে সে।
তখনও স্থির অমোঘ গলায় লোকটা বলে যায়,
—একশটা টাকা দে। অক্ষুনি অকে শেষ কর‍্যা দুবো…
সারা গায়ে হিম বয়ে যায় মোসলেমের! কাকে শেষ করার কথা বলছে লোকটা! কামালকে!

কোনো কথা সরে না তার মুখে। অথচ এই মোসলেমই একটু আগে গলা ফাটাচ্ছিল। কথায় কথায় মেরে ফেলার হুমকি আর মরে যাওয়ার শাপ দিচ্ছিল। কিন্তু সে তো রাগের বশে! তাছাড়া এ লোকটাই বা কে!

টোটোর উপর বসে আছে মোসলেম। ডান হাতটা একটু মুড়ে দিলেই এগিয়ে যেতে পারে কিন্তু এই লোকটার নাগাল থেকে বেরিয়ে যেতে পারবে কি! কথাটা ভাবার সঙ্গে সঙ্গেই হতাশ হয় আর চারদিক থেকে অজস্র হাত চেপে ধরে তার মাথার দুপাশটাকে।

এই লোকটা প্রথম থেকেই তাদের সব কাটাকাটি কথা শুনেছে তাহলে! শুধু তাই নয়, বৃষ্টি আসার পর তো একেবারে নির্জন ছিল! কোথায় গা ঢাকা দিয়ে দাঁড়িয়েছিল লোকটা! নিজেকে যে এতখানি আড়াল করে রাখতে পারে, তার কাছ থেকে পালানোর কোনো উপায় আছে কি!

লোকটার বাড়িয়ে রাখা হাতে টোটোর ছাদের ছায়া পড়েছে। কত বড় একটা তালু মোসলেমের মুখের সামনে ভেসে আছে!

তারপর আবার লোকটার ধীর নিম্নগ্রামের কাঁপা কাঁপা গলা,
—আচ্ছা, পঞ্চাশ দে…মিস হবেনি সত্যি কইঠি…

কথাটায় জীবনের প্রতি যেমন নির্বিকার ভাব আছে, তেমন আছে নিজের জীবনকে টেনে চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য একটা করুণার ভিক্ষা। কিন্তু এইসব কথার ভেতরে গিয়ে ভাব বোঝার অবস্থায় ছিল না মোসলেম। আতংক আর ঘোঁত পাকানো কান্না উঠে আসতে চাইছে তার গলা দিয়ে!

খুব সাবধানে বাম হাতে পকেটটা চেপে ধরে মোসলেম। ডান হাতটা একসেলেরেটরে। যেন কেউ নেই! এতক্ষণ কেউ ছিল না! আমাদের এই দুনিয়ায় মাত্র পঞ্চাশ টাকার বিনিময়ে কেউ কাউকে খুন করতে চায়নি! একা মোসলেম একটা নিশ্ছিদ্র অন্ধকারের ভেতর থেকে বেরোনোর চেষ্টা করছে—

**********
লেখক পরিচিতি : বনমালী মাল ১৯৯০ সালে ভারতবর্ষের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের পশ্চিম মেদিনীপুর জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। মূলত গল্প এবং উপন্যাস লেখেন। এযাবৎ প্রকাশিত হয়েছে ‘সোনার বলদ কিংবা সবুজ সুখ’ এবং ‘বিরহান’ নামের দুটি গল্পের বই এবং ‘দুটি উপন্যাস’ নামের দুটি উপন্যাসিকার সংকলন। পাশাপশি তিনি হিন্দি গল্প এবং উপন্যাস অনুবাদের কাজ করেন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ