তখন গাঙ্গুলির ভূমিশয্যায় নিশিযাপন, সে না হয় গড়পড়তা ভারতবাসীর এমনিই শয়ন, বিপুল অর্থের মালিক হয়েও, শুনেছে, বনেদি মাড়োয়ারি ভূমিশয্যায় নাকি নিদ্রা যায়, সেটাই তাদের বৈভব; গাঙ্গুলি সেই বৈভবে শয়নে পদ্মলাভঞ্চ করে বিবাহোত্তর দুটি বছর কাটিয়ে দিলেও গৃহিণী কিন্তু বাঙালি যাপনে ত ছপ্পর থাকবেই সমানে বলে গেল, কর্ণপাত করেনি গাঙ্গুলি, কানমাথাহাতপা পাতপতনপতিত যাই হোক, গাঙ্গুলির টাকা নাই, টাকা না থাকলে গৃহিণীও কিন্তু একটি অতুলন বিলাসিতা মধ্যবিত্ত জনজীবনে; পুত্রজন্মের পর গৃহিণীর অতএব মনোবাসনা, তীব্র থেকে তীব্রতর হয়; পুত্রবতী সব গৃহিণীরই হয়, পুত্রের সঙ্গে ধন ও গাভী প্রার্থনা করতেন বৈদিক ঋষিগণ, ঋষিপত্নীগণ বেদসিদ্ধ কামনায় যজ্ঞস্থলে উপবেশন করতেন কি, মৈত্রেয়ী বসতেন, কিন্তু তিনি ত কিম্ কুর্যামী; কোনো গৃহিণীর অমৃতে কামনা নাই, অতএব গৃহিণীরও নাই কিন্তু গাঙ্গুলি তখনো ত ভাঁড়ে মা ভবানী, তখনই লুলা।
গৃহিণীর যুক্তি, কোনো সু-কু প্রতিযুক্তিতেও খণ্ডন করা যায় না, ভূমিশয্যায় বাচ্চাটাকে শোয়ালে মাটির জল ওর শরীর টানবে, এ বছর বর্ষাও কুলোমুখো, আজীবন শ্লেষ্মা বইতে হবে। শুধুমাত্র পুত্রের ভবিষ্যতব্যহেতু এলআইসি না হোক, খাট তাহলে একটা চাইই; ঊর্ধ্বে বসবাস করতে কার না মনোবাসনা নাই? গাঙ্গুলি ঠিক করলো সর্দি বাঁচাতে মা বেটার জন্য দড়ির একটি খাটিয়া কেনা যাক। খাটিয়া কিনতে চাওয়াটি ইকোনোমিক্সের সংজ্ঞায় চাহিদা বলে বিবেচিত হবে না, কিন্তু, তাহা আকাঙ্ক্ষা, আকাঙ্ক্ষাই ভারতের দারিদ্র্যসূচক। আকাঙ্ক্ষাকে উসকে দিয়েই এতবড় কর্পোরেট সমাজ।
শুধুমাত্র চারটি পায়া আর চারটি বাজু, শ্মশান যাবার খাটতুল্য সাইজ, দাম হাঁকাল চারশ টাকা; তারপর দড়ি, তদুপরি বুনে দেওয়ার মজুরি মিলে আরো শ তিনেক; ঘাম দরদর গাঙ্গুলি, যতটা না রৌদ্রজনিত, ততোধিক হতাশায়; পদব্রজে, গৃহমুখী, একটা খাটিয়া কেনারও মুরাদ তাকে দেয় নাই লালকেল্লা থেকে গড়িয়ে পড়া গরিবী হঠাও থেকে আচ্ছে ভারত! অথচ সে বিএ পাশ, নাইনটিন সেভেন্টি নাইন।
তখনই লুলা, মুখের বিড়িতে শেষ টান মেরে ফেকে দিল যদ্দুর তার তর্জনীর তাগদ, তারপর ইশারায় থামায়, বড়ি উদাস যে সার?
—খাটিয়া কিনতে গেছলাম।
এমন তুচ্ছ ও হাস্যকর হতাশাযুক্ত সংবাদ লুলা ও লুলার তাহাদের কাছেই ব্যক্ত করতে পারে প্রলেতারিয়েত, দেখ কেন্নে, আর কিছু টাকা জুড়ে দিলে ছপ্পর কিনা যায়!
—এমদম শোচ না।
—বাতটা যখন লুলার কানে ঘুসেছে, ছপ্পর তুমার হছেকোই।
গাঙ্গুলি সম্মানীয়, কালিপাহাড়ির হেন সামাজিক ন্যায়-অন্যায় নাই যাতে তার ভয়েস থাকে না। সৎ জেন্টলম্যান অথচ দরিদ্র, দারিদ্র্যের ভুষণে মমতা ব্যানার্জি সততার প্রতীক—টিএমসি ছেড়ে সম্প্রতি বিজেপির লুলা তাঁহাকে অসম্মান করিতে পারে? গাঙ্গুলিও জানে লুলা লুম্পেন তৎসহ প্রলেতারিয়েত। মার্কসীয় তত্ত্ববিশ্বে লুলা তাঁহার দুশমন নহে। পারস্পরিক শ্রেণিচেতনায় মিনিমাম একটা খাটিয়া, তাকে সুনিশ্চিত পালঙ্কে কনভার্ট করে দিতে লুলা হুঙ্কার ছাড়ে, কোন মাদারচোদ চারশ টাকা ডিমান্ড করেছে?
—নামটা বতাও ভোঁসড়ির।
—শালার সব সামানউমান লোথ করে দুব!
—চোরাই মাল আমি নেব না।
বিনীত তাকায় লুলা, ফার্নিচার দোকানের মাল ঘাটিয়া সার।
—তুমাকে এক নম্বর মাল দুব।
শালারা শিশুকাঠ বলে পিওর শিরিশকাঠের মাল ধরিয়ে দেবে, সেগুনকাঠ বলে আসলি সোনাঝুরি ধরিয়ে দেবে, শালারা…
আরো অনেক নকলি কাঠের সঙ্গে আসলি কাঠের ছানবিন এখনই তার মেমরিতে সেভ থাকলেও ওপেন হছে নাই, অগত্যা বলে পালিশ করে দিলে আমড়া লকড়িও সাগুন হয়ে যায় সার,
—এক সালেই লড়কগজড়।
—মনে লাগবেক দোলায় দুলছ…
—ঘরে মিস্ত্রি বুলাই বেনাই লাও, যত লাফাওকুঁদ হিলবেক নাই।
—তুমার লাতিও শুবেক।
—মিস্ত্রির খরচটা জোগাড় করে রাখ।
—আর কাঠ? গাঙ্গুলি একটু বিস্ময়ে সন্দিগ্ধ, কাঠটি আমি কোথায় পাবো?
গাঙ্গুলির আর্তনাদে লুলার উপর কোনো অসর পড়লো না, আর একটি বিড়ি ধরালো, ফুক ফুক ধোঁয়া, তদ্মধ্যেই ত ইন্দ্রজাল, যজ্ঞকুণ্ড মুখ, যেন দৈববাণী দিতে গিয়েও দিল না, সাধনাসিদ্ধ গাঙ্গুলি শুনল, আপকা পাশ কেতনা রুপিয়া হ্যায়, আভি?
—শ তিনেক।
—কাফি।
একশ রুপিয়া ছাড়ুন।
—এ-ক-শ?
টাকাটি ছিনিয়ে কিছু না বলে নীরবে চলে গেল হাহতোস্মী গাঙ্গুলিকে ঝাঁঝাঁ রোদেড়া পথিপর দাঁড় করিয়ে। গাঙ্গুলির ঘরে এলো মিনিট পনেরো পরই, বলল, কাঠ পাই যাবে, চিরাই খরচা রেডি রাখ।
—করাত কল পর্যন্ত নিয়ে যাবার ঠেলাভাড়া তুমার।
—দাঁড়াও, দাঁড়াও, আজ জুম্মা, ঠেলাটাও ফিরি করে দিছি।
ফোন লাগায় কাকেও, আজিমের ঠেলাটা আভি রেস্টে?
—
—বহোত বড়িয়া।
—
—আভি আও।
—একটা কুড়াল লিয়ে আ যাও।
—
—বাপ্পার মিলঘর থেকে একটা আরি ভি লিয়ে আসবি।
—
—খাদান গড়ার গাছটা আভি কাটকে আজই বাপ্পার মিলে ফেকে দিয়ে চলে আসবি।
—
ফোনটা তখনও কাটেনি, ওপাশ থেকের হ্যালো হ্যালোকে পাত্তা না দিয়ে গাঙ্গুলিকে বলে, ধরে লাও সার আজই লকড়ি ঘুসে যাচ্ছে তুমার ঘরে।বিড়ি ধরায়, ধোঁয়ার আবডালে ভেসে থাকে হেজি মুখমণ্ডল, ফির দৈববাণী, আভি স্পটে যানা হোগা। এসব গল্পে এখনো গাঙ্গুলি চরিত্র না, চরিত্র হতে গেলে আরও ঘটনার ঘটমানতা চাই, গাঙ্গুলি ত হরদম ঘটনা হতেই চায়, কিন্তু লুলা, এখনই ঘটমানতার ভেতর গাঙ্গুলিকে যেতে না দিয়ে রণেবনেজঙ্গলেলোকালয়ে, লোকালয় ছাড়িয়ে শ্বাপদ আকীর্ণ পথিসকল অতিক্রমান্তে পরিত্যক্ত খাদান পাড়ে কতকাল আগের মরে শুকনো তবুও তাহাতে ছায়া, তাহার তলায় এনে দাঁড় করায়। দাঁড়িয়ে থাকা মোটা গাছটিকে দেখিয়ে বললো, পসন্দ?
—কি লকড়ি আমার নলেজে নাই।
গাছটির বয়স ও কোলিয়ারি, হয়ত জুড়ুয়া, হয়ত গাছটিই বয়োবৃদ্ধ, তার ঝরে পড়া বাকলে বাঘ-সিংহের গর্জন। শুনতে পাচ্ছ, জখম সাহেবের দাপট? অর্থাৎ অটুট। কোথাও তাহার শুষ্ক পত্রপল্লব পর্যন্ত নাই যাহাতে পতা চলে বৃক্ষের খানদান। চতুর্দিকে চক্ষু চালান করেও গাঙ্গুলি ব্যর্থ। বৃক্ষসকল পত্রপল্লবে পরিচিয়তে, ফল, এহ বাহ্য। হাজার সাল খাড়া হাজার সাল পড়া হাজার সাল সড়া শাল কাঠের নেচার; কোথায় ফল, কোথায় পত্রপল্লব? এত বছর যখন দণ্ডায়মান, অক্ষয় অমর দনদনে, বৃক্ষটি শাল কিম্বা শালতুল্য নিশ্চিত, ফার্নিচার-উপযুক্ত, সন্দেহ নাই।
—কাঠটা ঠিক ত, লুলা?
শ রুপয়া জলে যাচ্ছে না ত?—পালঙডিভানশোকেশ এভরিকুচ হই যাবেক সার একটা পেড়েই…
—ভিতরটা যদি ফপরা না হয়।
এথেন্সের বাজারে রকমারি শৌখিন জিনিস দেখে সক্রেটিস বলেছিলেন, বিশ্বে কত ভাল ভাল বস্তু আছে, তার কিছুই আমার দরকার নেই। এতবড় ত্যেন তক্তেন ভূঞ্জিথার কথা আর বললো না গাঙ্গুলি। গাঙ্গুলি এখনই জেন্টলম্যান, ডিক্লাসড্। কল্পনায়, ঘরঠাসা ফার্নিচার; ফার্নিচারে যত ঠোক্কর খায় তত লুলাকে আদরে গাল পাড়ে গৃহিণী, আর লুলা তত হাসে। সফলতার হাসি কি মনোরম!
—তা হবে…
অর্থাৎ ফার্নিচার।
সফলতা বিফলতাকে গুরুত্ব না দিয়ে লাগাতার লড়াই করে যাওয়াই বৈপ্লবিক কার্যক্রম।
জাঁকমঁরও এমনিই সন্দেহ হচ্ছিল শত শত ফ্রাঙ্ক eau-তে যাচ্ছে না ত?
ক্রমাগত, সিলেক্ট কমিটি, ইন্ডিয়ান কয়লাকে রিজেক্ট করে দিলে, নব নব কয়লাখনি স্থাপন তাহলে ত বেকার, সফলতা বিফলতাকে গুরুত্ব না দিয়ে দামোদর ভ্যালিতে কয়লা উত্তোলনের সম্ভাবনাকে লাগাতার চালিয়ে নিয়ে যাওয়াই কিন্তু শিল্পবিপ্লব।
কয়লা শেষ পর্যন্তও ত কালোহিরে।
লালে-লাল হয়ে যাওয়া সকাল ও সূর্য, যত উপরে উঠছে ততই তার ছায়া মার্গ হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে রানিগঞ্জ থেকে তখনো না- স্থাপিত হওয়া আসানসোল-বরাবর। মানুষ চলতে চলতে, একজন দুজন তিনজন বহুজন নিত্যরোজ ক্রমাগত চলতে চলতে, এভাবেই জঙ্গলের ভেতর রাস্তা হয়; পেছনে দশাধিক সাঁওতাল কুলি, কিছুটা ত মার্গ হবেই, একটু আগেপিছে সেটাই হবে অনতিবিলম্বে গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড, যাকে সাহেবরা বলবে মিলিটারি রোড।
কবে থেকে জিটি রোড বলে অভিহিত হল ওই পায়ে চলা মার্গ? ক্যা পতা!
ইওরোপের হাতে এসেছে পুঁজিবাদের ম্যানিফেস্টো ‘ওয়েলথ অব নেশনস’ স্মিথের বই; ১৭৮০ সালের আগেই মেজর জেমস্ রেনেল বাংলাদেশের সার্ভে শেষ করে হাত বাড়াচ্ছেন বৃহত্তর ভারতের দিকে।
রানিগঞ্জ পর্যন্ত রেলপথ এসেছে, এথোড়ার সঙ্গে জুড়তে দিচ্ছে না সে-রেলপথ। জমি দিচ্ছে না কোম্পানিগুলো, রানিগঞ্জের রাজা। তাঁরা চান, ননিয়ার পশ্চিম দিকের কোম্পানিগুলো কয়লা গরুর গাড়িতে এনে রানিগঞ্জে রেলে তুলুক। প্রতিযোগিতায় হেরে শেষ হোক।
কোম্পানি কোম্পনির শত্রু।
সামন্তও সামন্তর শত্রু।
পঞ্চকোট মহারাজা জমি দিলে রানিগঞ্জ বরাকর রেলপথ সম্প্রসারণ হলো।
ঔরঙ্গজেবের পর ভারতজুড়ে অরাজকতা, কার্যত স্বাধীন হয়ে গেছে বাংলা। লর্ড ক্লাইভ ২১ বছর বয়সী রেনেলকে নিয়ে এলেন সার্ভে করাতে। পলাশি যুদ্ধের পর লর্ড ক্লাইভ বুঝেছিলেন, সাম্রাজ্য বিস্তারের আগে চাই সাম্রাজ্য বিস্তারের রোডম্যাপ।
মেজর জেমস্ রেনেল জানতেন, During the present struggle, what walls have resisted save the wooden walls of Britain? Brilliant victory-র জন্য চাই,
The winds roared and the rain fell,
The poor white man, faint and weary,
Came and sat under our tree.
He has no mother to bring him milk
No wife to grind his corn;
Let us pity the white man:
No mother he has.-এর মতো পরিবেশ।
তারই মধ্যে দ্বারকানাথের খনিতে লাগলো আগুন, ভারতের প্রথম খনিতে অগ্নি দুর্ঘটনা।
তখন বর্ধমানের সঙ্গে মুর্শিদাবাদের যোগযোগের রাস্তা ওই যাকে বলে, জিটি রোড। যাকে পরে বলা হবে “A River of Life".
‘কিম’ উপন্যাসে কিপলিং লিখবেন, Look! Look again! and chumars, bankers and tinkers, barbers and bunnias, pilgrims – and potters – all the world going and coming. It is to me as a river from which I am withdrawn like a log after a flood. And truly the Grand Trunk Road is a wonderful spectacle. It runs straight, bearing without crowding India’s traffic for fifteen hundred miles – such a river of life as nowhere else exists in the world.
জন্তু জানোয়ারে পূর্ণ অরণ্য, দুর্গম নদী, আদিবাসীদের সন্দেহ, নেটিভদের আক্রমণ, মোগল সিপাহিদের ভিজিলেন্স, এতসবের মধ্যেও মেজর জেমস্ রেনেল ভূমির চরিত্র নির্ণয় করে যাচ্ছেন। মাটির চরিত্র দেখে তিনিই বলেছিলেন দামোদর নদের উপনদীগুলির উপত্যকা কয়লা-পরিপূর্ণ।
তাহলে দ্বারকানাথের খনিতে আগুন লাগা নেটিভ পুঁজির সঙ্গে ব্রিটিশ পুঁজির সংঘাত নয় তো?
হয়তো।
কিন্তু জিটি রোড।
যার দুপাশে বড়ো বড়ো গাছের ট্রাঙ্ক?
Grand trank?
এই পথ ধরেই আলেকজান্ডার দি গ্রেট ভারতে আসেন। এই পথটিই ছিল the main artery of the conquest of northern India. Vast edifice. সৈন্য অভিযান চালিয়ে চালিয়ে রাস্তাটির নাম হয়ে গেল New military road. প্রাচীন কালে যাকে বলতো 'উত্তরাপথ', শেরশাহ বলতেন, 'শাহী শড়ক'; ১৮৩৩ থেকে ১৮৬০ ইংরাজ নাম দিলো জিটি রোড। ভারতের না, এশিয়ার সবচেয়ে দীর্ঘ রাস্তা।
জিটি রোড।
উইলকক্স সাহেবের সুপারিশ, বেঙ্গলে রেলপথ সড়কপথ দরকার নেই। বেঙ্গলের প্রকৃত রাস্তা হচ্ছে জলপথ।
আসানসোল তখন গভীর অরণ্য।
রেনেলের সার্ভেতে ছিল সর্বগ্রাসী সাম্রাজ্যবাদের রেখাসমূহ, যা ক্রমে সারা ভারতকে খাবে। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রতিষ্ঠা করবে আধুনিক সামন্ত প্রথার। কত খুনগুম হবে রেনেলের নির্দোষ তুলনারহিত সার্ভের জন্য।
রেনেলের ম্যাপ ধরে ধরে এগতে এগতে, জাঁকমঁর মনে হচ্ছিল, প্রতিটি গাছের গায়ে বাঘের গা-ঘসা লোম, এখুনি বাঘ বেরবে এমন স্তব্ধ পথ। অনাবিষ্কৃত মার্গ ত স্তব্ধবাকই, স্তব্ধতা-উচ্ছেদ শুরু হয়ে গেছে, অথর্ববেদ অরণ্যসূক্তে লিখছে :
কোথাও গাভী চরছে
তার চারপাশে সুরম্য প্রাসাদ, শত শত শকট বেরিয়ে আসছে।
তবে কি কেউ গাভীকে আহ্বান করছে, মৃগীকে?
তবে কি কেউ কাঠ কাটছে?
মরণপণ কিসের চিৎকার?
এ কি তবে কালসন্ধ্যা?
সত্যিকারের পশু না এলে মৃগীদের নিহত হবার আশঙ্কা নেই
সব গাছ সুস্বাদু ফলের, সব বৃক্ষে পুষ্প সমারোহ
মৃগনাভী মেখে অন্ন বেড়ে বসে আছে মা
খেলা ছেড়ে মৃগশিশু চেটেপুটে খেয়ে ফিরে যাচ্ছে অরণ্যক্রীড়ায়।
অরণ্য কাকেও বধ করে না
অরণ্যে কোন কৃষক নেই।।
কয়লাকুঠির মালিক রোপার্ট সাহেবের গালে আটটা লম্বা দাগ, অরণ্যচিহ্ন এঁকে দিয়েছিল বাঘনখ, সেই চেরা দাগের ওপর পা চালিয়ে ভয়ে ভয়ে এগনো কিন্তু শরীরী ভাষায় দুঃসাহস জাঁকমঁর; পেছনে সাঁওতাল কুলিরা, গাছ কেটে চলেছে, তাদেরও ভিতু ভিতু চোখ, শরীরে দুঃসাহস, তারা জানে, সাহেব, এই শালা দিকুর কাছে একটা যন্তর আছে সিঙেল (আগুন) বেরয়, তাকে গান বলে; বাঘের চেয়েও তাকে ভয় করে হড়; বেঙ্গল ইন্ডিয়া, সব্বাই।
লুলাকেও ভয় পায় লোকাল, গাঙ্গুলিও; লুলার কাছে ফায়ার বার-হওয়া একটা যন্তর আছে, তাকে পিস্তল বলে, আর আছে দিদিমোদি অনুপ্রেরণায় আধিপত্য বিস্তারের রোডম্যাপ, গাঙ্গুলি জানে।
টুইট্টু করে বনভূমিকে জীবন্ত করবে একটাও পাখি নেই, সামনে দূরে একটাও বাসি-পালখ পড়ে নেই যা দিয়ে জীব-ইতিহাসে লেখা থাকবে এই বনভূমে একদা উড্ডয়ন-সক্ষম পক্ষীকুল বিরাজিত ছিল। জাঁকমঁই সর্বগ্রাসী মনুষ্য পদশব্দ।
কুড়ুল করাত মাটিতে ফেলে ফুচ্যা বলল, দাদুর মুহে শুনেছি, গাছটির নাম রেন টিরি।
—জখম সাহেব নিজ হাতে পৌধা লাগাইছিল।
—বিলাতি গাছ…
—লে কাট।
—জখম সাহেবের গাঁড়টি মার জলদি।
—বিপদে পড়ব না ত লুলা?
—গাছ কাটা কিন্তু বেআইনি।
—কোলিয়ারির গাছ…
—ন্না! এক কথায় ঝেড়ে দিল যাবতীয় শঙ্কাশঙ্কা।
—আপলোক, সার, গাঙ্গুলিকে বলে, তুমরা জেন্টলম্যানরা, বহোত ঘাটিয়া।
—দুনম্বরিটিও করবে, অনেস্টও থাকবে, দুটা একসাথে হয় বাঁড়া?
—বিপদ হলে হবেক!
— তবে, আমি তুমাকে হরবকত ভক্তি করি তুমার অনেস্টির জন্য…
—নিজের বুকে ধারণ করে লুব সব খতরা…
—যেমন কিষ্ণ করেছিল কুরুচ্ছেত্রে…
সিদ্ধ্যাসিদ্ধ্যোঃ সমাভূত্বা গাঙ্গুলি বিস্মিত হয়, তোর এত ভক্তি!
এক ইস্টুডেন বুড়া আঙুলটা কাটে তুলে দিয়েছিল তার গুরুকে এক ইস্টুডেন সারারাত ধানখেতে শুয়ে জল আঁটকেছিল গুরুর জমিন…
—হামলোগ একটা শুখা বিরিক্ষি দিতে লারব মাস্টারকে?
—তবে সার মাস্টারলোক এখন ঘাটিয়া।
—ঘুস দেই।
—ঘুস দেই।
—তাদের ঘরেও কোটি টাকার বান্ডিল, বিছনার তলে।
—লুজ কারিকটর
—দকলা…
তনিমনি তবুও গাঙ্গুলি, লুলা ঘাড় ঘুরিয়ে নেয়, কোম্পানির মাল পাবলিকের করে দিয়ে গেছে ইন্দিরা গান্ধি।
—বল সহি কিনা?
—মোদি ফির কোম্পানির করে দিছে।
—বল সহি কিনা?
—পাবলিকের পেড় পাবলিক লিছে,
—গলত কুথায়?
—পোরকে পভাটি লাইনের আপ করে দিয়াই ত উন্নয়ন…
ভক্তি ভিন্ন নিকৃষ্ট কখনো উৎকৃষ্টের অনুগামী হয় না; গাঙ্গুলি খুশ। লুপ্ত হতে থাকা বনভূমি বারংবার অতীতে টেনে নিয়ে যাচ্ছে গাঙ্গুলিকে, অতীতই একমাত্র সুসংবদ্ধ আশ্রয় হতে পারে ক্ষয়ুটে পৃথিবীতে। চিলিতে পুনরায় কমিউনিস্টরা পাওয়ারে। শ্রীলঙ্কায় সুশাসন প্রতিষ্ঠা করেছে লেফ্ট। মীনাক্ষী শতরূপরা ভগ্নস্তূপের ওপর বাড়ন্ত বটবৃক্ষ। বৃক্ষ দিয়ে কত স্থাননাম, আসানগাছের নামানুসারে আসানসোল। সে গাছ লুপ্ত। আসান গাছ গাঙ্গুলি দ্যাখে নাই। কিন্তু রেইন ট্রি রয়ে গেছে যত কেটেছে ততই তার বংশবৃদ্ধি। রেইন ট্রির লোকাল নাম শিশু। সায়েবরা চলে গেছে, সাহেবির সবটুকুই রেখে দিয়ে। রুক্ষ শুষ্ক বন্ধ্যা মাটির দিকে তাকিয়ে গাঙ্গুলির মনে হচ্ছে আবার হরেকৃষ্ণ কোঙার জ্যোতি বসু প্রমোদ দাশগুপ্তের আবির্ভাব হবে।
সম্ভবামী যুগে যুগে।
বিবি কলেজের বোটানি বিভাগ আসান গাছের চারা বানিয়ে, চারা বিতরণের সময় একটি ছোট কীটনাশক ধরিয়ে দিয়ে বললেন, নিয়মিত স্প্রে করবেন। আসানসোলের আবহাওয়ার স্বাভাবিক উদ্ভিদ আসান, তাতে কীটনাশক দিতে হবে কেন, প্রফেসর জবাব দিতে পারেন নি।
গাছটা লুপ্ত হয়ে গেল কেন, প্রফেসর জবাব দিতে পারেন নি।
কতকিছুর জবাব হয় না।
— আমি তোদের মাস্টার হলাম কবে থেকে?
—মাস্টার লন? লুলা বিস্ময় সহ বিমূঢ়, বললেই হল?
— সার, আপনি বলেছিলে একটু সৎ হ…
—দারু পিনা ছোড় দো?
—বাওয়ালি মৎ করো?
বড়ো লহুলহু মুসকুরা অধরে অধরে, লুলার। শুকনো গাছের বল্কলহীন কাষ্ঠশব্দ বাতাসে, অব্যাবু গাঙ্গুলির চোখ লুলার সর্বাঙ্গে, ডাউট হছে সার?
—আপনি বল নাই, অনেস্ট হবি না বলিয়া কাহারো দ্রব্য গ্রহণ করিতে নাই কদাচ ঝুট্টা বাত বতাবি নাই সদা সত্য কথা কহিবে গুরুজনদের গোড় লাগাইবে…
আপনিই বলুন, অনেস্ট কোন্ শালা কোন্ শালা হরবকত সচ বাত বতাছে কোন্ শালা কৌন শালার ছিচরণে গোড় লাগানো যায় বলেকয়ে পরের দ্রব্য গ্রহণ করিতেছে কৌন ভোঁসড়িবালা…
—নতুন কিছু ত বল নাই সার?
— আপনাকে হরবকত গোড় লাগাই না সার?
—উদমাই মাথাপেঁচিতে আমি নাই সার।
গাঙ্গুলি মনে করার চেষ্টা করছে, কখন এইসব সূক্তিসমূহ সে বলেছিল; বলে থাকতেও পারে; মাস্টারদের এইসব মাস্টারবেশন করিতে হয়, সারাজীবন মিনিমাম ইচ্ছাপূরণে অক্ষম গাঙ্গুলি পরিপূর্ণ মাস্টারবেশন বাম জমানাতেও করিতে পারে নাই, টিএমসি জমানা পেনিস থাড়ো হতেই বা দিল কোথায়? এই মানবজমিন পরগৃহে মাস্টারি করিয়া ফসল তুলিয়া দিল।
মড়্যা ফুচ্যা ততক্ষণে কুড়ুল চালিয়ে ঝোপঝাড় সাফ করে আরি বসিয়েছে বৃক্ষমূলে, তার ঘসঘসে আওয়াজে বনস্থল চমকিত। আওয়াজ ছাপিয়ে গাঙ্গুলি ঘোষণা করে, আমি কিন্তু, মরা গাছ বলেই নিচ্ছি, জ্যান্ত হলে নিতাম না।
—একটি গাছ একটি প্রাণ…
—জানি ত সার, তুমি ওন্নায় করবার ইনসানই লও।
ভারতে অনেক অনেক জনবসতি জবরদখল এবং কালক্রমে মৌরসীপাট্টা হয়ে গেছে, তদ্রূপ কয়লাঞ্চল। বসতভিটা মকান বিজলি পানি সবকিছু কোলিয়ারির, গাছই কি কম কোলিয়ারির জমিতে? যার দরকার কেটেছে। শুধুই কি হাঁসদেও, কুমারডিহার জংগল উৎখাত করে ওসিপি কত হাজার গাছ কেটে দিল ছোট ছোট আদানিরা তাদের ধরলে হিসাব? কিন্তু তবুও এই রেইন-ট্রি, নাবালক থেকে প্রবীণ হয়ে বার্ধক্যে মৃত হয়ে যাবার পরও তার একটি ডালও লুন্ঠিত হয়নি জখম সাহেব বড় মারকুটে ছিল বলে, তাঁর আত্মা গাছটির ডালে ডালে। গাছটির তলায় কোনো হাতিঘোড়া নেই ত, গাঙ্গুলি তীক্ষ্ণ দৃষ্টি চালায়। গাছের তলায় সিঁদুর লাগানো গুচ্ছের মাটির হাতিঘোড়া, বৃক্ষ-রক্ষাকারী। আদানি কি জাহের থানের শারজোম গাছগুলিকে বাদ দিয়ে হাঁসদেও বনভূমি উজাড় করছে? ক্যা পতা!
—বনে ঘুসলেই মনটা সাধুবাবা হয়ে যায় সার। —মনে লয়, লেঙুটি পিঁধে তিরশূল লিয়ে বিহারীনাথ পব্বতে চলে যাই।
—মানুষের উবগার করতে বড় মন চায়।
গাঙ্গুলি বলে, বেশ ত, সব পাপ ধম্মতে মিটাই লে।
—কন শালা ধাম্মিক?
—একটা নাম বতাও?
—বতাও!
লুলা চিৎকার করে ওঠে।
করাতের ঘসঘসে আওয়াজ অন্য সুরে কাঠ কাটে, মড়্যা হাঁক পাড়ে, ছালট থেকে মাঁজায় আরি ঘুসছে লুলাদ্দা।
—খুব শক্ত লকড়ি।
—জোরে জোরে আরি চালা।
সাহেবদের অতিক্রম করা অত সোজা লয়।
তারজন্য পিওর কারিক্টার চাই।
মোদিজি পাকিস্তান ইন্ডিয়া যুদ্ধ কন্টিনিউ করতে পারল ট্রাম্পকে অতিক্রমিয়া?
একটু চা হলে ভালো হতো; ঘাসের ওপর বসে গাঙ্গুলি, মাথায় রোদ্দুর, ছাতা আনলে ভালো হতো; লুলাও নীরব, গাঙ্গুলিও নীরব। কেবল জেগে আছে কুড়ুল, শিরশির করা করাতের আসাযাওয়া। গাঙ্গুলির হঠাৎ মনে হল করাতটি ইউনাইটেড না হতে দেওয়ার ক্যাপিটালিস্ট ওয়েপন। জিভটা খরখর করে আরো কিছু হিতোপদেশ দিতে কিন্তু সাহস পেলো না। সৎ ও দুর্নীতিপরায়ণ যে কোনো লোকই নীতিকথা সৎ ও দুর্নীতিপরায়ণ থাকতে চাওয়ার জন্যই বলে। মানুষ তার মনীষার সীমান্তে এসে দ্বিখণ্ডিত হবে আর দীর্ঘশ্বাস যোগ করবে। নিঃসঙ্গতার আউটকাম নির্বাণ, একাকীত্ব, নিঃসঙ্গতা; এর থেকেই চিন্তার জন্মকথা। ঋষিমুণিগণ উদমাই বনে জংগলে মেডিটেশনে বসত?
বুঝলি, জংগল কাটা মহাপাপ।
ফরেস্ট ফুসফুস স্বরূপ।
এই গাছটার প্রদেয় অক্সিজেন টাকার মূল্যে…
না, গাঙ্গুলি এসব কিচ্ছু বলে নি। ইন্ডিয়া এখন নাকি ওয়ার্ল্ডের তৃতীয় পাওয়ার। দিদি প্রযত্নে লুলা ত পাওয়ারফুল ছিলই মোদি কেয়ার-অবে সুপার পাওয়ার।
—জানিস, আগের তুলনায় ফরেস্ট ২,২৬১ বর্গ কিমি বেড়েছে, ইন্ডিয়ায়?
সক্রেটিস কে জানিস?
লুলা তৎক্ষণাৎ অনুভব করে, গাঙ্গুলি তাকে অতিক্রম করতে চাচ্ছে মাথার ওপর দিয়ে পাশ হয়ে যাওয়া গুরুগম্ভীর বাতচিতে। লুলা অতএব সাবধানী ও গম্ভীর, ঘটনাসমূহে বিভাজিত জগতে মহত্তম এবং অথবা ঘৃণ্যতম জীবনকাহিনী নিরক্ষর ভাষায় লিখিত হয়ে চলেছে মাস্টার। জীবনকে আরো নিবিড়ে নিতে গিয়ে গাঙ্গুলি তর্জমা করতেও পারছে না, অথচ এন্টায়ার কাহিনী তার জানা। জানা কাহিনীকে অজানা করে দিতে ফরম বদলে নিতে হয় হে? সে ফরম গাঙ্গুলিকে তার পার্টি কক্ষণো জানায় নাই।
লুলাকে কবিতা পাঠের মনোযোগে দেখছে তখন থেকে গাঙ্গুলি, আলোকজ্ঞান অন্ধকারজ্ঞান ভেঙেচুরে এসে বসেছে সে বেঁচে থাকার তেজে, লক্ষ লক্ষ বছর ধরে যখন টিকে আছে, এখনো টিকে যাবে লুলাসহ সবকিছু। গাছ এত উবকারি বলেই গাছ কাটা বেআইনি এবং লিগেল। লুলা বললো, ডর ত সার আছেই।
—থিরাবার কোনো স্পেস নাই আচ্ছে হিন্দুস্তানে।
—বাংলা বললেও আভি ডর,
—হামলোগ ত সার বাংলা বোলনাই ছোড় দিয়া।
ল্যাঙ্গুয়েজের কাজ কি সার, বাতচিত করনাই ত? একদম বচপনাইতে কোই লেঙ্গুয়েজ ছিল?
বেকারত্ব মূল্যবৃদ্ধি মণিপুর। ভোটচুরি। এসবও এক একটি দুর্বোধ্য ল্যাঙ্গুয়েজ। সরকারের দীর্ঘ নীরবতাও ল্যাঙ্গুয়েজ। জবাব চাইতে পার্লামেন্টের টেবিলে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল যে যুবকেরা, যে যুবকেরা পার্লামেন্টের বাইরে ছিল প্রতিবাদে তাহাও ল্যাঙ্গুয়েজ। যে মেয়েটিকে উলঙ্গ করে মনিপুর রাজ্যে রাজপথে দৌড়ানো হয়েছিল তাহাও ত ল্যাঙ্গুয়েজ। শ্রীলঙ্কা বাংলাদেশ নেপাল ফ্রান্স প্যালেস্টাইন গাজায় সংঘটিত ঘটনাবলিও ত ল্যাঙ্গুয়েজ…
কলাপ্ত হলেই মহাপ্রলয় হবে।
সত্যকে চোখ দিয়ে দেখা যায় না।
রাজ্যলাভ বা বনবাস উভয়েই সুখের নিদান।
গাছটা এত বছরের অস্তিত্ব সহ হুড়মুড়িয়ে ভূপতিত হতেই গাঙ্গুলি বুঝলো ডালপালাসহ গাছটা এখন তার। তার দারিদ্র্য, তার ভেতরে ভেতরে লতিয়ে ওঠা কামনা, শুকনো গাছটা জ্যান্ত বৃক্ষের মত ফুলেফলেপত্রপল্লবে আকাশ-ছোঁয়া অধঃপতন। গাছটার ডালপালা এবার ছিন্ন হবে, একটি বডি, তার হাত পা মাথা মুণ্ডহীন একটি ধড় এবার ঠেলায় উঠবে আরো ছিন্ন হতে।
ভূপতিত গাছটার ওপর বসে লুলা বিড়ি ধরায়, সার, এই সোসাইটিতে কেউ অনেস্ট থাকতে পারে না।
কত কত প্রলোভন।
উন্মত্ত লুন্ঠনকে প্রগতি আর জ্ঞানালোক বলে চালাতে হয় সেটাই কি লুলা রিয়েলিটিতে চমকিত করল?
বড়ো বিষণ্ণ হয়ে যায় গাঙ্গুলি। সে কি প্রত্যাখ্যান করতে পারল ফোকটে পাওয়া গাছটাকে? পারত না?
কত শিশু জলেশীতেপ্রখরতাপে বেড়ে উঠছে না? সমাধানযোগ্য সমস্যা নিয়েই সমাজ হিজিবিজি হয়ে ওঠে, তাকে ব্যাখ্যা করে বুঝে নেওয়ার শিক্ষায় কতটুকু তুমি শিক্ষিত গাঙ্গুলি? গাঙ্গুলি কি সত্যিই চেয়েছিল রিয়েলিটি যেন সর্বদাই তাকে উত্তপ্ত রাখে? আপোষহীন সংগ্রামের লক্ষ্য বহুদিন হয় ভ্রষ্ট বলে দলকে সমালোচনা করা সুবিধাবাদী ঝোঁক নয়? চিরকালের সত্যসন্ধানী ফাউস্ট, যে জীবনের সত্য খুঁজে যাচ্ছে, শয়তানের প্রলোভনে প্রলুব্ধ হলে সে আর ফাউস্ট থাকে?
প্রত্যাখ্যানের জন্যও প্রকৃত মার্কসবাদী হতে হয় কমরেড! সার্ত্রে আর চে কিন্তু প্রত্যাখ্যানের ভাষ্য প্রতিষ্ঠা করে গিয়েছিলেন; আমাদের মধ্যে সে শিক্ষা কেন চারিয়ে দিতে পারে নি কোনো শিক্ষক?
লুলার চোখমুখে পরিষ্কার ডিনায়েল, যেন সে জিজ্ঞেস করছে, স্বৈরাচারী তো চেনা যাচ্ছে, প্রগতিপন্থী ঠিক কারা? তুমি? গাঙ্গুলি তোমরা??
সংশয় আছে বলেই গাঙ্গুলিকে এখনো বলতে দিচ্ছে লুলা, স্থানিক ভদ্রতায়। জাতীয় কিম্বা আন্তর্জাতিক হয়ে গেলে লুলা এখনই গাঙ্গুলিকে একজন শত্রু হিসেবেই দেখবে। তার পকেট থেকে বেরিয়ে আসবে পিস্তল, অগ্নি উদ্গীরণ করবে শীতল ধাতব নল। লুলাকে স্থানিক রাখতে হবে, ততক্ষণ, যতক্ষণ গাছটা চেরাই হয়ে ঘরে না ঢুকছে গাঙ্গুলির। লুলাও ভাবছে গাছ কাটার সময়সীমাটিই গাঙ্গুলির দুর্বলতা। গাছটা চেরাই হয়ে গেলে সব অপরাধ লুপ্ত হয়ে যাবে; গাঙ্গুলি স্বরূপে ফিরে যাবে, তত্ত্ববিশ্বে।
পিটিপিটি তাকায় গাঙ্গুলি, ক্রমে ক্রমশ লুলা তপ্ত হচ্ছে, এখনো সে-তাপ চাক্ষুষ নয়। হঠাৎ লুলা বলে ওঠে, আমি জানি, হামলোগ জানতা হ্যায়, আমাদের যেটা মিশন তার বিরুদ্ধে সবসে পহেলে আঙুলি ওঠে-গা আপকা।
—লেকিন আর পারবে না।
—তুম শালা ভি লালচি।
—বাতেলা মারা কমরেড।
কোন্ পথে সাপ ঢোকে জানলে চাঁদবেনে বাঁ হাতে হলেও পূজা দিতে বাধ্য হয় জীবনভর-অপছন্দকে? প্রতিরোধ করতে কিংবা এইসব বুর্জোয়া বজড় থেকে বেরিয়ে যেতে গাঙ্গুলি মরীয়া, শব্দ খোঁজে বাক্য খোঁজে তার পঠিত মার্কস এঙ্গেলস লেনিন মাও কাস্ত্রো থেকে। জগৎটা খুব বেশি এগোয়নি বলে ভোকাবুলারি বহুত কম। অতএব ল্যাঙ্গুয়েজও কম। অতএব গাঙ্গুলিও যাবতীয় ছেদচিহ্ন তুনীরে থাকা সত্ত্বেও বাক্যহারা, একটি নিটোল পূর্ণচ্ছেদ। ইমমরাল লোকের চরিত্র হলো ভয়াবহ অ্যাটাকিং অথবা ভয়ঙ্কর ফিয়ারফুল। এতদিনের বামপন্থা গাঙ্গুলির চরিত্রে ফিয়ারফুল নির্ভীকতা প্রদান করিয়াছে, লোহাকে লোহা দিয়ে কাটিতে হয়।
—তুই পলিটিক্সে নাই?
—না সার, পাটিপলিটি হামলোককা জিন্দা থাকার তারিকা। লুলা তর্জনীর প্রথম পাবে বৃদ্ধাঙ্গুলি ঠেকায়, আমাদের ইতুটুকু লতাপাতা জীবন, জিন্দা থাকার পথে কোই মুসিবত কিন্তু বদার করব না সার।
লুলারা তাহলে কি একটি আকৃতি? জিওম্যাট্রিক্যালি জগৎ খুঁজছে সুচারুরূপে? লুলার উত্থান গাঙ্গুলি জানে, পতনের ইতিবৃত্তও গাঙ্গুলির জানা, তবুও, গাঙ্গুলি, হায়, লুলাকেই সহজ-উদ্ধার জানল! ক্যাপিটালিস্ট সোসাইটিতে মার্ক্সিস্ট হওয়া কত সহজ!
মানুষ কেবলমাত্র বেঁচে থাকার জন্যই কত খাতে বয়ে গেছে নদীরও সাধ্য নাই অত বাঁকাবেঁকির।
একজন পাতিবুর্জোয়ার বিরুদ্ধে একজন আলোকদীপ্ত বুর্জোয়াকে খাড়া করা শেষপর্যন্ত কিন্তু বুর্জোয়া রাজনীতিই। সম্পর্ক আসলে পারস্পরিক হত্যাচেষ্টা। ভালোবাসার ডিসগাইসে চিহ্নিত করতে না পারা মারণ সম্পর্কটি ঘাপটি মেরে বসে থাকে তোমার ভেতরেই কমরেড; সবকিছু ত ডাসক্যাপিটালে লেখা থাকে না।
**********
লেখক পরিচিতি : হিরণ্ময় গঙ্গোপাধ্যায় অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক। গবেষক গল্পকার ঔপন্যাসিক। কমলকুমার মজুমদার বিষয়ে প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক গবেষক। 'আশমানি কথা', 'কয়লামঙ্গল কাব্য' উপন্যাস; 'মূত্র পদাবলী' 'মেটাবলিক রিফ্ট' 'রাষ্ট্রদ্রোহীরা' প্রভৃতি গল্পগ্রন্থ।

0 মন্তব্যসমূহ