মঈনুস সুলতানের গল্প : ফুলতেরা বিবির সন্ধানে


জোহরের পাঞ্জেগানা জামাতের পর পুটিতেলি বাজারের জামে মসজিদটি নির্জন হয়ে আছে। তবে মাইকে জোরেশোরে বাজছে আরব মুলুকের কোনো কারির কেরাত। আন্তাজ উদ্দীন তার সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে কী যেন এক ভাবনায় দুছুমুছু করেন। তার স্যান্ডেলের সৌল লুজ হয়ে পড়েছে, তাই প্রতিটি পদক্ষেপে মাছের কানকার মতো তা ছলবল করে। তিনি কপালে চন্নার কাছে হাত রেখে ওপরের দিকে তাকান। অনেক বছর হতে চলল, কারাগারে যাওয়ার আগে মসজিদটির ডৌল-তসবির তো এ রকম ছিল না!

যাবজ্জীবনের সশ্রম কয়েদি হয়ে আন্তাজ উদ্দীন জেলখানায় হরেক রকমের কাজকামে লিপ্ত ছিলেন। কিছুদিন তাকে ওয়েলডিংয়ের আগুন ঝলসানো কাজে মেহনত করতে হয়েছিল। সে আমলে কারাবন্দিদের কালো কাচের গগলস দেওয়া হতো না। তখন আন্তাজ উদ্দীনের চোখের ওপর বড় জুলুম যায়। তারপর থেকে দুচোখের কোণ দিয়ে খামাখা পানি গড়ায়। দূরের সবকিছু তিনি ঝাপসা দেখেন। তবে কিছুক্ষণ ধুন ধরে তাকিয়ে থাকলে আকার স্পষ্ট হয়ে আসে। কিন্তু গাঢ় নজরে তাকানোর পর মসজিদের দোতলা কাঠামোটি পরিষ্কার হয়ে এলে তিনি বেজায় ধন্দে পড়েন! জেলে যাওয়ার আগে আন্তাজ উদ্দীন নামাজ-কালাম যে খুব একটা করতেন, তা-ও না। তবে কখনোসখনো জুমাবারের জামাতে শামিল হতেন। নোনাধরা চুনসুরকির পুরোনো একতলা মসজিদঘরটি আকারে ছিল অনেক ছোট, তার ছাদে ছিল তিনটি গম্বুজ। ঢোকার মুখে এ রকম সারি সারি দোকানপাটও ছিল না। মাইকের ব্যবহারও ছিল তামাম বছরে কেবল একবার, শবেবরাতের নিশিরাতে সফিনা খতমের সময়।

আন্তাজ উদ্দীনের ঘোলাটে দৃষ্টি মসজিদের জয়েলে তৈরি খুপরি দোকানগুলোতে ঝোলানো জামাকাপড়, টুপি-তহবন্দ, ছাতি, ব্যাডমিন্টনের র‌্যাকেট, নাশপাতি, ডুমো মাছিতে ভনভনানো আঙুরের ছড়া ও ফালি করে কাটা তরমুজের ওপর দিয়ে ঘুরে যায়। যে বড়সড় দোকান থেকে ঝুলছে ফুটবল ও ব্যাডমিন্টনের সাজ-সরঞ্জাম, ওখানে নজর পড়তেই কাদাজলে পাকাল মাছটির ঘাইয়ের মতো পুলিশের হাতে প্রহৃত হওয়ার ঘটনা ইয়াদ হয়।

মুক্তিযোদ্ধা মুকিত মৃধার লাশ ময়নাতদন্ত ইত্যাদির পর কেবল দাফন হয়েছে। জানাজায় আন্তাজ উদ্দীন হাজির ছিলেন। মানুষ হিসেবে মৃধা ছিলেন দিলদরিয়া কিসিমের। ঠেকাবেঠেকায় সাহায্য করতেন, ফুলতেরা বিবির সঙ্গে তার বিয়ের সময় তাকে দুই শ টাকার দুখানা কড়কড়ে নোট দান করেছিলেন। তিনি খুন হওয়ার দিন আন্তাজ উদ্দীন বসে ছিলেন তার বসতবাড়ির কাছারিঘরের বারান্দার। জানাজা থেকে চোখ মুছতে মুছতে পুটিতেলির বাজারে ফেরার পথে তিনি গ্রেপ্তার হন। পুরোনো মসজিদের পাশে এখন যেখানে খেলাধুলার সরঞ্জামের দোকানটি, ঠিক ওইখানে তখন ছিল পানবিড়ি-সিগ্রেটের টং দোকান। দারোগা জিপ থামিয়ে ছিলেন টং থেকে সিগ্রেট কিনতে। হাতকড়া পরা আন্তাজ আকুল হয়ে কেঁদে ইশারায় মসজিদটি দেখিয়ে কসম খেয়ে তার খুনের সঙ্গে সম্পর্কহীনতার কথা বলেছিলেন। পুলিশের এক কনস্টেবল আল্লাহর পবিত্র ঘর নিয়ে কিরা কাটার অপরাধে রুলার দিয়ে তাকে পিটিয়ে ছিল। তাতে নাক ফেটে বেরিয়ে এসেছিল রক্ত।

পুরোনো দিনের কথা ভাবতে ভাবতে আন্তাজ নাকে হাত দেন। গড়িয়ে নামা রক্ত মুছতে মুছতে শ্বাসপ্রশ্বাসের ঘড়ঘড়ানো শব্দের সঙ্গে হাঁপানির টানও অনুভব করেন। পুলিশি মারের পর থেকে বছরে তিন-চারবার হাঁপানির টান উঠলে তার নাক দিয়ে গড়িয়ে নামে সামান্য একটু রক্ত। তবে হাঁপানির সমস্যাটা পুলিশি জুলুমে হেনস্তা হওয়ার অনেক আগেকার। বিয়ের পর বার তিনেক হাঁপানি উঠে বাড়াবাড়িও হয়েছিল, তখন তার স্ত্রী ফুলতেরা বিবি সরিষার তেলে রসুন ভেজে বুক মালিশ করে দিত।

মসজিদের সিঁড়ি থেকে নেমে পুটিতেলি বাজারের সড়ক ধরে হাঁটতে হাঁটতে আন্তাজ কবে তার সঙ্গে ফুলতেরার বিয়ে হয়েছিল, আর কোন সালে তিনি কারারুদ্ধ হন, তা নিয়ে ভাবেন। কিন্তু সন-তারিখ সঠিকভাবে মনে আসে না। তবে বিয়ের দিন শেখ সাহেবের জ্যেষ্ঠ কন্যা দিল্লি থেকে ঢাকায় ফিরে এসেছিলেন। মুক্তিযোদ্ধা মুকিত মৃধা মুজিবকন্যাকে দেখতে ঢাকা বিমানবন্দরে গিয়েছিলেন, যে কারণে তিনি আন্তাজ উদ্দীনের বিয়েতে হাজির থাকতে পারেননি। তাদের বিবাহিত জীবন ছিল মাত্র চৌদ্দ মাসের। তারপর খুনের মামলায় তিনি কারাগারে কয়েদ হন।

হাঁটতে হাঁটতে পথের পাশে একটি জটলা দেখে চোখ তুলে তাকান আন্তাজ। বিজলি বাতির খুঁটিতে মই ঠেকিয়ে, হাতে রাবারের দস্তানা পরে কাজ করছেন একজন বিদ্যুৎ-শ্রমিক। জেল থেকে খালাস পেয়ে নিজ এলাকায় ফিরে আন্তাজ পুটিতেলির বাজারে বিজলি বাতির ব্যাপারটি খেয়াল করেন। তার কারাগারে অন্তরীণ হওয়ার আগে বাজারের মুদি-মনোহারির দোকান ও চা-স্টলগুলোতে জ্বলত হ্যাজাক বাতি। আর যে পিচডালা সড়ক ধরে এ মুহূর্তে তিনি হাঁটছেন, তা-ও ছিল নুড়িপাথর ছড়ানো কাঁচা, আষাঢ়-শ্রাবণে কাদাপ্যাঁকে এমন প্যাচপ্যাচে হয়ে থাকত যে জুতা-স্যান্ডেল পরে হাঁটা-চলাই হতো মুশকিল।

এসে পড়েন নবরত্ন রেস্টুরেন্টের সামনে। বাতাসে রংচঙে পর্দাটি একটু সরলে ভেতর থেকে চঞ্চল চড়ুইয়ের মতো উড়ে আসে স্টিরিওতে বাজানো রমরমা হিন্দি মিউজিক। রেস্টুরেন্টের ওপর তলায় ভিডিও পার্লার। ওখানকার কালো পর্দা ফেলা অন্ধকার কামরাটিতে বসে নগদ পয়সা দিয়ে অমিতাভ বচ্চনের মুভি ইত্যাদি দেখা যায়। কারাগারে কয়েদ হওয়ার আগে সিনেমা হলে সশরীর না গিয়ে যে বৈঠকখানায় বসে আরামসে ভিডিওযোগে ফিল্ম দেখা যায়, বিষয়টা আন্তাজ শুনেছিলেন। কিন্তু তখনো ভিডিও বিষয়টা পুটিতেলিতে এসে পৌঁছেনি। টেলিভিশনেরও চল হয়নি। এখান থেকে সাড়ে চার মাইল দূরে থানা শহরে তৎকালীন সংসদ সদস্যের বাড়িতে একটি টিভি ছিল বটে। তবে তার তিনতলা দালানের ছাদে লম্বা বাঁশের খুঁটির ওপর অ্যান্টেনা লাগিয়ে তমেশগিররা ঝিরিঝিরি স্ক্রিনে ওয়ার্ল্ড কাপের ফুটবল খেলা দেখত। নবরত্ন রেস্টুরেন্টের জায়গায় সে আমলে ঠিক এই জায়গায় ছিল নরেন আলাইয়ের মিষ্টির দোকান। আলকাতরা মাখানো কেরোসিন টিনের চালঅলা ঘরটিতে ভাজা হতো গরমাগরম জিলাপি, আর টেপরেকর্ডে হামেশা বাজত কারি আমিরুদ্দীনের মারফতি গান।

বাদামি-হলুদাভ একটি একতলা দালানের সামনে এসে আন্তাজের আরেক দফা তাজ্জব হওয়ার পালা! পুরোনো রাধাচূড়াগাছটি দেখে পোস্টাপিসের পরিসরটি তিনি শনাক্ত করতে পারেন। জংধরা ঢেউটিনের চারচালা ঘরটি ভেঙে দালান উঠল কবে? এখানে তার বাবা মন্তাজ উদ্দীন ডাকপিয়ন হিসেবে কাজ করতেন। মাঝেসাঝে বালক আন্তাজ পোস্টাপিসের শিক দেওয়া জানালার সামনে এসে দাঁড়ালে দেখতে পেতেনÑতার বাবা একমনে লেফাফা ও পোস্টকার্ডে সিলছাপ্পড় মেরে চলছেন। পোস্টমাস্টারের পেছন দিককার টেবিলে ছিল টেলিগ্রাফের যন্ত্র, যা হামেশা বেজে চলত ‘টরে টক্কা..টক্কা টক্কা টরে..’ শব্দে।

ডাকপিয়ন হলেও মন্তাজ উদ্দীন ইংরেজি জানতেন বেশ খানিকটা। ব্রিটিশ আমলে ক্লাস এইটে ছাত্রবৃত্তি পাওয়া মানুষ তিনি। মন্তাজ পাকিস্তান অবজারভার পত্রিকায় ‘গেট অ্যা ওয়ার্ড’ খেলে এক শ টাকা পুরস্কার পেয়েছিলেন। ওই টাকা দিয়ে কিনেছিলেন একটি রেলি বাইসাইকেল। সাইকেলটি কারারুদ্ধ হওয়ার আগ অব্দি আন্তাজ উদ্দীন চালাতেন। বাবার সঙ্গে খায়খাতির ছিল হাসপাতালের এলএমএফ ডাক্তার শুকুর আহমদের। তিনিও পরেরবার ‘গেট অ্যা ওয়ার্ড’ জিতেছিলেন, এবং পুরস্কারের টাকায় কিনেছিলেন রুপালি ডায়ালের একটি কেমি ঘড়ি। ঘড়ির স্মৃতিটি মনে ফিরে এলে তার আরেকটি বিষয়ে খেয়াল হয়। আজকাল যেন ঘড়ির ডায়েলের চেহারা-সুরত একেবারে বদলে গেছে। আগের দিনের ঝকঝকে রুপালি বা সোনালি ডায়েলের ব্যাপার মনে হয় সম্পূর্ণ উবে গেছে। তার বদলে মানুষজন কবজিতে যা পরছে, তাকে নাকি বলা হয় ডিজিটাল ওয়াচ। সময় দেখার দরকার পড়লে টিপ দিলে সবুজাভ আলোয় ফুটে ওঠে সেকেন্ড, মিনিটসহ কয়টা বাজল তার তামাম তথ্য।

গেটের দুপাশে কাচের আলমারিতে শিশি-বোতল রাখা গোটা দুই ফার্মেসি দেখে আন্তাজ হাসপাতালের কম্পাউন্ডটি শনাক্ত করেন। তবে এখন যেখানে ফার্মেসি হয়েছে, ওখানে ছিল আধবুড়ো দুটি কদমগাছ। হাসপাতালের পুকুরটিও ভরাট করে বানানো হয়েছে মাতৃমঙ্গল কেন্দ্রের দালান। শুকুর ডাক্তারের চেম্বারে উঠেছে পেল্লায় রেডক্রস আঁকা একটি গাড়িবারান্দা। ১৯৬৫ সালে যখন পাকিস্তান ও হিন্দুস্তানের মধ্যে যুদ্ধ বাধল, ওই বছর মাঝরাতে ওলাওঠায় মারা গেলেন তার পিতা মন্তাজ উদ্দীন। ভোরবিহানে লাশ দেখে শুকুর ডাক্তার বড় আপসোস করলেন তাকে নিশিরাতে খবর না দেওয়ার জন্য। জানলে তিনি স্যালাইন ফুঁড়ে অন্তত চেষ্টা করতেন।

অভাবের সঙ্গে আন্তাজ উদ্দীনের পয়লা পরিচয় হয় বাবার মৃত্যুর মাসখানেকের ভেতর। সংসারের খরচ সংকুলান করতে মায়ের ভারি সমস্যা হচ্ছিল। শুকুর ডাক্তার তাকে ডেকে নিয়ে হাসপাতালে চাকরি দেন। হাসপাতালে বছর দেড়েক কিশোর আন্তাজের খারাপ কাটেনি। জাবেদা খাতায় রোগীদের নাম ও সাকিন লেখা ছাড়া তিনি মিক্সারের শিশিতে কাঁচি দিয়ে সাদা কাগজ কেটে বরফির মতো নকশা করা দাগ লাগাতেন। কিছুদিনের মধ্যে ইনজেকশনের জন্য জল গরম করা থেকে সুই স্পিরিট দিয়ে মোছা ইত্যাদিও তিনি শিখে ফেলেন।

শুকুর ডাক্তার বদলি হলে পরের বছর দুয়েক তার বেকারি হালতে কাটে। তবে ডাক্তার তার গরিবি অবস্থা জানতে পেরে অতঃপর তত্ত্বতালাবি করে তাকে ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন ভ্যাকসিনেশন প্রোগ্রামে। আন্তাজের কাজ ছিল, গ্রামে গ্রামে ঘুরে পাঠশালার ছাত্রছাত্রীদের কলেরা ও বসন্তের টিকা-ইনজেকশন দেওয়া। মুক্তিযুদ্ধের তুলতবিলের সময় ভ্যাকসিনেশন প্রোগ্রামের তামাদি হয়। কিন্তু তত দিনে টিকার ডাক্তার হিসেবে আন্তাজের কিছু নামযশ হয়েছে। গাঁওগেরামে কারও ইনজেকশনের প্রয়োজন হলে তারা তাকে খবর দিত। বাবার আমলের রেলি সাইকেলখানা তখন বড় কাজে লাগে। তার ক্যারিয়ারে করে তিনি বহন করতেন ছোটখাটো একটি ওষুধের বাক্স। প্যারাসিটামল, বরালজিন, নভেলজিন ও এন্টাসিড ইত্যাদি চার-ছয় আনা মুনাফার বিনিময়ে তিনি বিক্রি করতেন। কেউ নগদ পয়সা দিতে না পারলে অসুবিধা কিছু হতো না, তিনি ওষুধপত্রের দাম বাবদ পেঁপে বা ঝুনা নারিকেলও গ্রহণ করতেন।

সড়কের দুপাশে এ রকম সারি সারি দোকানপাট বা লম্বা লাখারি ঘরের দোতলা মার্কেট ইত্যাদি ছিল না। এ এলাকা ছিল পুটিতেলি বাজারের বাইরে। সবুজ ধানের ধূ-ধূ ক্ষেতকে মানুষ বলত ‘চোরমারির বন্দ’। বন্দের হাশিয়া ঘেঁষে মুক্তিযোদ্ধা মুকিত মৃধা পুকুর কাটিয়ে জমি ভরাট করে রাইসমিল দিয়েছিলেন। মিলের দোচালা অফিসঘরে আয়নার ফ্রেমে বাঁধিয়ে তিনি ঝুলিয়ে ছিলেন শেখ সাহেবের গলায় মালা পরা বিরাট ছবি ও ‘সোনার বাংলা শ্মশান কেন’ শিরোনামের একটি পোস্টার। সাদা দিলের মানুষ মৃধা ছিলেন মুক্তিফৌজের উইং কমান্ডার। শেখ মুজিবুর রহমান সাহেবকে তিনি নিজের বাবার চেয়েও বেশি ইজ্জত করতেন। শেখ সাহেবকে কেউ তাঁর নামের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু যোগ না করে শুধু মুজিব বললে চটে উঠে তুছতাছ করতেন। যুদ্ধে তার শরীরে বিঁধেছিল অনেকগুলো স্প্লিন্টার। অপারেশন করিয়েও সব স্প্লিন্টার বের করা যায়নি। সন্ধ্যার দিকে এগুলো ব্যথায় টাটিয়ে উঠত। তখন তিনি পুকুরপাড়ে বাতাবিলেবুর গাছটির তলায় একা বসে বসে পান করতেন মৃত সঞ্জীবনী সুরা। নেশা হলে ব্রিস্টল সিগ্রেটে আগুন দিয়ে সুর করে গেয়ে উঠতেন ‘জয় বাংলা বাংলার জয়...হবে হবে নিশ্চয়।’

সে আমলের রাইসমিলের পরিসরটির সামনে দাঁড়িয়ে আন্তাজ এমন তাজ্জব বনেন যে, তার মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসে ‘ইয়াল্লা মাবুদ’! চালকুটানি কলের জায়গাটিতে গড়ে উঠেছে বাসস্ট্যান্ড। তখনকার দিনে কোথাও যেতে হলে সাড়ে চার মাইল পয়দলে উজিয়ে থানা শহর থেকে বাস ধরতে হতো। বাসগুলোর চেহারা ছিল মুচমুচে মুড়ির টিনটির মতো। হালফিল মনে হয় এগুলোর সুরতও বদলেছে বিঘতভাবে। অনেকটা অ্যাম্বুুলেন্সের মতো দেখতে একটি মাইক্রোবাস প্যাসেঞ্জার নিয়ে ছেড়ে যাচ্ছে। যাত্রীদের কথাবার্তা থেকে জানতে পারেন, এ কিসিমের যানবাহনের নাম কোস্টার। তার বড় বিভ্রান্ত লাগে। কোনো কিছু যে চেনার আর কোনো কুদরত থাকল না!

যেখানে রাইসমিলের অত্যন্ত ভারী মেশিনটি বসানো ছিল, ঠিক ওই জায়গায় দালান তুলে চলছে বাস কোম্পানির অফিস। ক্লান্ত আন্তাজ বসে পড়েন টিকিট কাউন্টারের কাছে পাতা একখানা বেঞ্চে। অনেকক্ষণ হয় তার গতরের সর্বত্র চুলবুলাচ্ছে। আশপাশে কেউ নেই দেখে তিনি শার্টের ভেতরে ও লুঙ্গি খানিকটা তুলে চুলকান। তার শরীরের বিখাউজের সংক্রমণ ঘটে কারারুদ্ধ হওয়ার পয়লা দিকে। কারাগারের নির্জন সেলে চুলকানোর জন্য অবসর ছিল প্রচুর। নখের ঘষায় উঠে আসা সাদাটে-ধূসর মামড়ি ছড়িয়ে যেত সেলের সর্বত্র। তবে কারামুক্ত হয়ে বাড়ি ফেরা অব্দি রোগজনিত অভ্যাসটি সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কয়েদ হওয়ার মাস ছয়েকের ভেতর মৃত্যু হয় তার মায়ের। বর্তমানে আন্তাজ চাচাতো ভাই মবশ্বিরের সংসারে আছেন। পৈতৃক ভিটাটির জায়গায় সবজিক্ষেত দেখেÑকী হয়েছে সে সম্পর্কে প্রশ্ন করলে মবশ্বির নাখোশ হয়ে তাকে জানিয়েছেন যে আন্তাজের মা শরিকানা বসতবাড়ির তার অংশটি মবশ্বিরের কাছে বিক্রি করে এ টাকায় আন্তাজকে জেল থেকে ছাড়ানোর জন্য উকিল ধরেছিলেন। গৃহহীন আন্তাজকে মবশ্বিরের পরিবার ধানচাল রাখার ভাড়ার ঘরে চাটাই বিছিয়ে থাকতে দিয়েছেন।

ভাড়ার ঘরের লাগোয়া এক-চালায় রাত কাটায় দুটি হাড়ঝিরঝিরে বলদ। ওখান থেকে উড়ে এসে প্রচুর মশা রাত্রিবেলা ছেঁকে ধরে আন্তাজকে। তাতে বিখাউজের চুলকানি বেদমভাবে বাড়ে। সাদাটে-ধূসর মামড়ি ভাড়ার ঘরের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়লে তা মবশ্বিরের বউয়ের নজরে পড়ে। তার ছেলেমেয়ে আছে। সে চায় না, সংক্রামক চর্মরোগটি তার সংসারে ছড়িয়ে পড়ুক। সুতরাং সে আন্তাজকে অন্যত্র আশ্রয় খুঁজতে বলেছে। কিন্তু তিনি যাবেনই-বা কোথায়? কারাগারে তিনি খুব কি খারাপ হালতে ছিলেন? সশ্রম কারাদণ্ডের নিয়মানুযায়ী তাকে খাটতে হতো সারা দিন। বিষয়টা তার অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল। অনেক বছর জেল খাটার ফলে চেনাজানা কারারক্ষীরা তাকে খামাখা জ্বালাতন করত না। উপরন্তু নিয়ম করে তিন বেলা খাবার জুটত, সেলের বাসস্থান নিয়েও জেলে তার কোনো সংকট হয়নি।

পুটিতেলির বাজারে বেহুদা ঘোরাঘুরি করতে তার ভালো লাগে না। তাই চিন্তিত মনে আন্দাজ উঠে পড়েন বাসস্ট্যান্ড থেকে। হাঁটতে হাঁটতে মুক্তিযোদ্ধা মুকিত মৃধার স্মৃতি ফিরে আসে মনে। মানুষটি জবর ভালো ছিলেন। রাইসমিল ছাড়াও আরও নানা দিকে ছড়ানো ছিল তার ব্যবসাপাতি। আন্তাজকে বলেছিলেন, হাতে পয়সাকড়ি জমলে তিনি তাকে ফার্মেসি করার পুঁজি দেবেন। জেলা শহরের এক ডাক্তারের প্ররোচনায় মুকিত দ্বিতীয়বার অপারেশন করান। তাতে স্প্লিন্টার সমস্যার কোনো সুরাহা হয় না, বরং ব্যথা ফিরে আসে মারাত্মকভাবে। মুকিত তীব্র পেইন সামলানোর জন্য মরফিন ইনজেকশন নিতে শুরু করেন।

সন্ধ্যার পর আন্তাজ মরফিন ফুঁড়তে আসতেন মুকিত মৃধার বাড়িতে। ইনজেকশন নেওয়ার পর মৃধা বাড়ির ভেতর একটি কামরায় চুপচাপ তব্দিল হয়ে ইজিচেয়ারে আধশোয়া হালতে পড়ে থাকতেন। তখন তিনি কারও সঙ্গে কথাবার্তা বলা পছন্দ করতেন না। তো ওই সময়টুকু আন্তাজ বাইরে কাছারিঘরের বারান্দায় বসে বসে অপেক্ষা করতেন। মরফিনের ঘোর কেটে গেলে মৃধা কাছারিতে বেরিয়ে এসে তার সঙ্গে বসে চায়ে মেরি বিস্কুট ভিজিয়ে খেতেন। ট্রানজিস্টার রেডিওটি বাজিয়ে তখন শুনতেন আকাশবাণীর গান। কখনো তার দিকে বাড়িয়ে দিতেন এক শলা ব্রিস্টল সিগ্রেট।

ওই রাত ছিল অমাবস্যার গুটগুটে অন্ধকারে নিকষ। মরফিন ফুঁড়ে দিয়ে কাছারির বারান্দায় চুপচাপ বসেছিলেন আন্তাজ। ভেতরে ইজিচেয়ারে পড়ে পড়ে ঝিমাচ্ছেন মুকিত। মোটরসাইকেলে চড়ে আসে দুটি অচেনা তরুণ। তারা মৃধা আছেন কি না, জানতে চেয়ে সরাসরি ঢুকে যায় ভেতর বাড়িতে। এরা কারা, কেন এসেছে—এ নিয়ে ভাবিত হন না আন্তাজ। কারণ, মুকিত মৃধার কাছে হামেশা নানা কাজে নানা ধরনের মানুষজন আসত। একটু পর এরা বেরিয়ে এসে তার সঙ্গে কোনো কথাবার্তা না বলে মোটরসাইকেলে স্টার্ট দিয়ে মিলিয়ে যায় অন্ধকারে। তখনো তার মনে জাগেনি কোনো সন্দেহ। খানিক পর কামকাজের বেটি ময়নার মা পাকঘর থেকে চা নিয়ে এসে মৃধার কামরায় ঢুকে চিৎকার দিয়ে ওঠে। বিপত্নীক মুকিত মৃধা তার বাড়িতে একাকী বসবাস করতেন। রান্নাঘরে ব্যস্ত থাকার কারণে ময়নার মা বুঝতে পারেনিÑকখন যে মুকিতের নাকমুখ গামছা দিয়ে পেঁচিয়ে মাথাটি বস্তার ভেতর ঢুকিয়ে অচেনা আততায়ীরা বাইকে করে পালিয়ে গেছে। শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মৃত্যু ঘটে মুকিত মৃধার। তবে ময়নাতদন্তে তার শরীরে মরফিন ফোঁড়ার বিষয়টিও বেরিয়ে আসে। বস্তা ও গামছায় আন্তাজের হাতের ছাপ পাওয়া যায়। আন্দাজ যে বস্তা খুলে মৃধার পালস পরীক্ষা করেছিলেন, বিষয়টি কেউ আমলে আনে না। তো তিনি ফেঁসে যান খুনের মামলায়।

পড়তি বেলায় আন্তাজ এসে পৌঁছান বরইতলি গ্রামে। হাকিম সাহেবের বাড়িটি কাদামাটির দেওয়ালে অনেকগুলো গাছপালার শ্যামল ছায়ায় সুনসান হয়ে আছে। আন্তাজ পরিবারিক গোরস্তানে বর্তমান হাকিমের পিতা প্রয়াত হাকিম আরজুমান্দ চাকলাদারের সিমেন্টে বাঁধানো কবরের পাশে হেলান দিয়ে বসেন। থানা শহরে আছে হাকিম পরিবারের হামদর্দি দাওয়াখানা। তিনি কারারুদ্ধ হওয়ার আগে আরজুমান্দ সাহেবের পুত্র বর্তমান হাকিম মহব্বত চাকলাদার ফিফটি সিসি একটি হোন্ডা মোটরসাইকেল চালিয়ে যাতায়াত করতেন। আজ থেকে তিন দিন আগে আন্তাজের হাঁপানির বেদম টান উঠলে তার ফুলতেরা বিবির কথা দারুণভাবে মনে পড়েছিল। তখন তিনি এসে দাঁড়িয়েছিলেন এ গোরস্তানে। হাকিম মহব্বত চাকলাদার একটি ঝকঝকে হান্ড্রেড সিসি কাওয়াসিকি বাইক চালিয়ে ধুলো উড়িয়ে গিয়ে ঢুকেছিলেন তার বাড়িতে। যেতে যেতে ঘাড় ফিরিয়ে তাকিয়ে ছিলেন আন্তাজের দিকে। কিন্তু চুল-দাড়ি-ভুরু পেকে ধবধবে সাদা হয়ে যাওয়া আন্তাজকে তিনি চিনতে পারেননি। হয়তো ভিখারি ভেবে বাইক থামানোরও কোনো প্রয়োজন বোধ করেননি। আজও তার হাঁপানির টান উঠেছে বেদমভাবে।

ঘামে ও গরমে পেরেশান আন্তাজ কবরের গায়ে হেলান দিয়ে বসে পড়েন। বাড়ি ফেরার পর গ্রামের এক জ্ঞাতি বৃদ্ধার কাছ থেকে শুনেছেন ফুলতেরা বিবির দ্বিতীয়বার বিবাহের বিষয়াদি। কারাগারে তার ব্রঙ্কো-নিউমোনিয়া হয়েছিল। তখন মুখ দিয়ে রক্ত ওঠার কারণে তাকে কয়েক দিনের জন্য জেল হাসপাতালে পাঠানো হয়। ওই সময় আন্তাজ মোল্লা নামের অন্য এক কয়েদি হাসপাতালে যক্ষ্মায় ভুগে মারা যান। তার এলাকার ছিঁচকে চোর লুলাউল্লা জেল থেকে ছাড়া পেলে পুটিতেলিতে রটে যায় যে—আন্তাজ উদ্দীন যক্ষ্মায় মুখে রক্ত উঠে মারা গেছেন। শাশুড়ির মৃত্যুর পর ফুলতেরা বিবি তার মা-বাবার সংসারে ফিরে যায়। আন্তাজের মৃত্যু সংবাদ চাউর হলে পর সে রেওয়াজ অনুযায়ী চার মাস দশ দিন পালন করে। তারপর পরিবারের উদ্যোগে হাকিম মহব্বত চাকলাদারের সঙ্গে সে বিবাহিত হয় তার তিসরা বিবি হিসেবে।

আন্তাজ বসে বসে ফুলতেরাকে ভাবতে চেষ্টা করেন। কিন্তু এত বছরের ব্যবধানে এক যুগে যে ছিল তার নিজস্ব নারী তার মুখটি ভালো করে মনে পড়ে না। তবে হালকা-পাতলা শরীরটি বাতাস লাগা বেতসের মতো ফিরে আসে স্মৃতিতে। বাঁ পা-টা খাটো হওয়ার ফলে খুঁড়িয়ে হাঁটত সে। আর তাতে মেয়েটির শরীরে যৌবন বিচ্ছুরিত হতো তরঙ্গ বিভঙ্গে। আন্তাজের গরিব পরিবারে বিকেলে জলখাবারের কোনো চল ছিল না। ফুলতেরা সরিষার তেলে মুড়িমাখা করত। তার হাঁপানির টান উঠলে মাঝে মাঝে সে খেসারির ডাল পিষে পেঁয়াজ ও কাঁচা মরিচ মিশিয়ে তৈরি করত বড়া। কত বছর তিনি এ ধরনের কিছু খেতে পান না। আর আজ এখানে তিনি ফের আসলেনই-বা কেন? ফুলতেরার ওপর স্বামীত্বের দাবির ব্যাপারে তিনি নিজেও তেমন একটা নিশ্চিত নন। কিন্তু আন্তাজ যাবেনই-বা কোথায়? চাচাতো ভাই মবশ্বিরের ব্যবহারে তাকে আপন ভাবা মুশকিল। মায়েরও ইন্তেকাল হয়েছে অনেক বছর আগে। ফুলতেরা ছাড়া আপনজন বলতে তার আছেই-বা কে?

বটগাছের ছায়ায় তার বসে থাকতে খারাপ লাগে না। পানাপুকুরের ওপর দিয়ে ভেসে আসা হাওয়ায় আন্তাজের শরীর শীতল হয়। একটু ঝিমানির মতো আসে। তখনই অলৌকিক ব্যাপারটা ঘটে। নাকে শিকনি গড়ানো একটি বাচ্চা মেয়ে এসে তার হাতে তুলে দেয় একটি পলিথিনের ব্যাগ। ক্ষুধার্ত আন্তাজ ব্যাগের গিট্টি খুলে তা থেকে বের করে মুখে দেন মুড়িমাখা। সাদাটে মুড়ির দলা থেকে বেরিয়ে আসে একটি মুচমুচে করে ভাজা ডালের বড়া। চোখ তুলে তিনি মেয়েটির দিকে তাকালে—সে হাকিমবাড়ির গাছপালায় ঘেরা দেওয়ালের দিকে ইশারা দিয়ে ছুটে পালায়। আন্তাজ উদ্দীন ডালের বড়াটি চিবাতে চিবাতে তাকিয়ে দেখেন, একটি ভইশানিমগাছের তলায় দাঁড়িয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে বেজায় পৃথুলা এক নারী মূর্তি। এ অবয়বের সঙ্গে এক জামানায় তার সঙ্গে বিবাহিত নারীটির ছিপছিপে দেহলতাকে তিনি ঠিক মেলাতে পারেন না।

**********

লেখক পরিচিতি : মূলত ভ্রমণগদ্যের জন্য মঈনুস সুলতানের খ্যাতি। পাশাপাশি লেখেন ছোটগল্প। জন্ম ১৯৫৬ সালে, সিলেট জেলার ফুলবাড়ী গ্রামে। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটস থেকে আন্তর্জাতিক শিক্ষা বিষয়ে পিএইচডি। খণ্ডকালীন অধ্যাপক ছিলেন ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটস এবং স্কুল অব হিউম্যান সার্ভিসেস-এর। ইউনিভার্সিটি অব সাউথ আফ্রিকার ভিজিটিং স্কলার ছিলেন। শিক্ষকতা, গবেষণা ও কনসালট্যান্সির কাজে বহু দেশ ভ্ৰমণ করেছেন। বর্তমানে সিয়েরা লিওনে বাস করছেন। ভ্রমণ-সাহিত্যের জন্য ভূষিত হয়েছেন বাংলা একাডেমি পুরস্কারে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ