অনন্যা সোমেনের চোখে পলেস্তারা খসা দেয়ালের মতো বিবর্ণ ভাব দেখল। বলল, “আকাশ খুব লাল হয়েছে, বুঝলেন কিনা!”
সোমেন সামান্য হাসল। বলল, “হুম। অন্ধকারের মধ্যে লাল আকাশ। মেঘ আসছে, বৃষ্টি আসবে।”
—“বৃষ্টি এলে আপনি কি করবেন?”
—“কী করি বলুন তো? কাঁদব একটু? হাউহাউ টাইপ কান্না নয়, ওই যে কান্নায় চোখ থেকে অনবরত জল পড়ে, কোনো শব্দ হয় না।”
—“বৃষ্টি হলেই কান্না পায়? রোদ্দুরে পায় না? চাঁদের আলোতে?”
—“চাঁদের আলোতে ভেজা হাসি টাইপ কান্না পায়।”
—“ভেজা হাসি টাইপ কান্নাটা কী বিষয়?”
—“মানে ঠোঁটে আলতো একটা হাসি লেগে আছে, কিন্তু চোখ জলে ভরা, দেখেই বোঝা যাচ্ছে হাসি আসলে হাসি নয়, কান্নার হাসি।”
—“আর রোদ্দুরে?”
—“রোদ্দুরে ঝলসানো টাইপ কান্না। মানে যে কান্নায় বোঝা যায় না সেটা কান্না না ঘাম না গরমে সেদ্ধ হওয়া, বাষ্প টাইপ।”
অনন্যা সোমেনের দিকে তাকাল একবার। তারপর চোখ ফিরিয়ে নিল। সামনের দিকে তাকাল। নদী দেখা যাচ্ছে। নদী দেখলেই কী যে হয় অনন্যার! খুব বেঁচে থাকতে ইচ্ছে করে। বলল, “তো এত কান্নার মাঝে আপনি হাসেন কখন? কবার?”
সোমেন হেসে ফেলল অনন্যার কথা শুনে। বেশ ফুল ফোটা ধরণের হাসি। মানে যে হাসি দেখে ফুলেরও ফুটতে ইচ্ছে হবে। বলল, “আরে আমিতো হেহেহে টাইপ। সবসময়েই হাসছি। মানে খুব গুরুতর মিটিং হচ্ছে ধরুন অফিসে, সবাই বেশ উচ্ছে খাওয়ার মতো মুখ করে আছে আর আমি ফিকফিক করে হাসছি। হাসির যে খুব কিছু কারণ আছে এমনও নয়। তাও হাসছি। বস চুল লাল করে এসেছে। তো তাকে দেখতে লাগছে লালঝুঁটি মোরগের মতো। মোরগ দেখে হাসছি।”
—“আপনাকে নিয়ে একটা গল্প লিখব?”
—“আমাকে নিয়ে গল্প! শালা আমার তো কিছু নাই! লেখার মতো আছেটা কী?”
—“কেন? আপনি অনেকরকমের কান্না কাঁদতে পারেন। এটা বড় ব্যাপার।”
এসব “বড় ব্যাপার”-এর মাঝে ঝমঝম করে বৃষ্টি নামলো। খুব বৃষ্টি। ঝুপ করে আলো চলে গেল। স্ট্যান্ড রোডের এই পুরনো বাড়িটা অন্ধকার হয়ে গেল। অদ্ভুত বাড়ি। পাঁচতলা বাড়ির সবটা জুড়ে শুধু সরকারী অফিস। আর ছাদে পলাশের চায়ের দোকান। পলাশ কাচের গ্লাসে লাল চা দিয়েছে চিনি ছাড়া। সেই চায়ে এখন বৃষ্টি পড়ছে।
অনন্যা নাক টানল। সোমেন বলল, “রুমাল নেই আমার কাছে। আপনার সর্দি হল নাকি? ও পলাশ, শালা তোকে কতবার বলেছি বল, পলিথিনে হাজারটা ফুটো, নতুন পলিথিন লাগা। আমি টাকা দিচ্ছি। শালা তা শুনবি না। এখন এই ম্যাডাম ভিজে গেল, ম্যাডামের কালো শাড়ি ভিজে গেল, হাতি-আঁকা ব্যাগ ভিজে গেল, ব্যাগের ভেতর যা যা আছে তাও ভিজে গেল কিনা কে জানে।”
পলাশ মোমবাতি জ্বালিয়েছে। অফিস ছুটি হয়ে গেছে অনেকক্ষণ। তো সোমেনদা এই ম্যাডামকে নিয়ে চা খাওয়াতে এলেন। তারপর কথার পর কথা। কথায় আকাশ কালো হল, লাল হল, বৃষ্টি এলো, দোকান বন্ধ করা যায়নি। তবে খোলা দোকানের আবার খোলা বন্ধ। দরজাই নেই, বন্ধ করবে কী? ভেবেই খুকখুক করে হেসে ফেলল পলাশ। বেঞ্চি ভিজছে। সোমেনদা আর ম্যাডাম ভিজছে। পলাশ স্টোভ নিভিয়ে ডেকচি মেজে রেখেছে সেই কখন। এদের চা খাওয়া হলে গ্লাসগুলো ধুয়ে বেরবে। ভিজে ভিজে হাওড়া যাবে। তারপর মশাগ্রাম ধরবে।
পলাশ মাথা চুলকোয়। সোমেন ওয়ালেট থেকে দুটো পাঁচশোর নোট বের করে পলাশকে দেয়। বলে, “পলিথিন বদলে নিস।”
—“বলছি আমি বেরোবো সোমেনদা? তোমরা বোসো না, বোসো। আমি গণপতিকে বলে যাচ্ছি, মেন গেট বন্ধ করলেও পেছনের গেট খোলা রাখবে।”
—“যা পালা।”
পলাশ দাঁড়ায় না আর। সোমেনদা কখন আটকে দেবে কে জানে! মাথার তো ঠিক নেই, হয়ত বলল এখন ট্যাংরা চল, চিনে কাঁকড়া দিয়ে বাংলা খাব। অবশ্য ইদানীং মদ খাওয়া কমেছে। কিসের যে জ্বালা সোমেনদার, ছুটে বেড়ায়, নানারকম পাগলামি করে।
বৃষ্টি কিন্তু কমল না। অনন্যার শীত করছে। বলল, “বিল্ডিং পুরো ফাঁকা?”
—“উঁহু, গণপতি মানে কেয়ারটেকার বৌ-বাচ্চা আর তিনটে বেড়াল নিয়ে থাকে একতলায়। কোণার দিকের ঘরে। বড় বেড়ালের নাম পুতু, মেজ বেড়ালের নাম মুম্মু আর ছোটটার নাম ফুচকা।”
—“বেড়ালের নাম ফুচকা?”
—“ছোট বেড়ালটা ফুচকার আলুমাখা খুব চেটেপুটে খায়। গণপতির সাইড বিজনেস আছে ফুচকা বানানোর। ওর বৌ ইন্দুমতী ফুচকা বানানোতে একদম এক্সপার্ট। ছোট বেড়াল সারাক্ষণ ফুচকার গন্ধ শোঁকে।”
—“ধুস, এরকম হয় নাকি?”
—“আরে কতকিছু হয় ম্যাম! গণপতি আমাকে রোজ দশ টাকার ফুচকা ফ্রিতে খাওয়াতে চায়। দশ টাকায় চারটে ফুচকা। তো আমি নিই না। ইন্দুমতী রাগ করে।”
—“কেন, আপনাকে ফ্রিতে ফুচকা খাওয়াতে চায় কেন?”
—“আরে সে আর বলবেন না! কেন খাওয়াতে চায় কে জানে! ভালোবাসে। কেন যে ভালোবাসে!”
—“কিছু করেছিলেন নিশ্চয়ই ওদের জন্য, কোনো উপকার, নিজের মুখে এখন স্বীকার করতে পারছেন না। তাই ভালোবাসে।”
সোমেন খুব ভ্যাবলার মতো তাকায় অনন্যার দিকে। ফিসফিস করে বলে, “মানে আপনি বলতে চাইছেন ভালোবাসার জন্য কারণ লাগে। কারণ না থাকলে কেউ কারোকে ভালোবাসে না? এমনি এমনি ভালবাসা যায় না? ধুরশালা, ভালোবাসার জন্য যদি কারণ লাগে তাহলে সেই ভালোবাসার তো কোনো দাম নেই ম্যাম। পৃথিবীতে বেঁচে থাকার তাহলে রইল কি?” সোমেন অদ্ভুত ভাবে হাসতে থাকে।
অনন্যা কথা ঘোরায়। “তারমানে গণপতির ফ্যামিলি আর আমরা দু”জন, এছাড়া এই বাড়িতে এখন কেউ নেই?”
—“হঠাৎ পাওয়ার কাট হল তো, তাই এখন আর কে অন্ধকারে অফিসে থাকবে বলুন? নাহলে দু-একটা ডিপার্টমেন্টে অনেক রাত পর্যন্ত লোকজন থাকে। কাজ হয়। তবে ম্যাম অনেকদিন পর একটা ভালো শব্দ শুনলাম। মন খুশ হয়ে গেল!”
—“কোন শব্দ?”
—“ওই যে বললেন ‘আমরা’। ‘আমরা’ বলে কিছু জীবনে তৈরি করা খুব কঠিন জানেন তো! ‘আমি’ আবার মায়ের পেট থেকে তৈরি হয়ে বেরোয়। কিন্তু ‘আমরা’! শালা ঠিকঠাক ‘আমরা’ তৈরি করতে জীবন কাবার হয়ে যায়।”
অনন্যার উঠতে ইচ্ছে করছে না, কেমন যেন লোভ হচ্ছে, এই মেঘ-বৃষ্টিতে উলোঝুলো মানুষের গল্প শোনার লোভ। নেশা লাগছে। কিন্তু যা ইচ্ছে করে, ঠিক তার উল্টোটা করার প্র্যাকটিস অনন্যার দীর্ঘদিনের। বলে, “তাহলে আমিও এবার উঠি। এখানে ফোনের সিগনাল নেই। নিচে গেলে নিশ্চয়ই সিগনাল আসবে। ওলা বা উবের কিছু একটা বুক করে নিই।”
—“তারপর?”
—“তারপর বাড়ি যাব।”
—“তারপর?”
—“বাড়ি গিয়েই আগে স্নান সেরে ফেলব। তারপর রান্না বসাবো। মা রুটি করে রাখবে। বাবার শরীর ভালো নেই। একটু চিন্তায় আছি এসব নিয়ে।”
—“আপনার লেখালিখি করবেন কখন? নিয়ম করে গল্প লেখেন? আর কবিতা?”
—“ধুস, কোথায় আর লিখি?”
—“ভাবেন? পড়েন?”
—“হ্যাঁ বইপত্র পড়ার অভ্যাসটা আছে এখনো। আর পড়লে একটু একটু তো ভাবতেও হয়।”
—“আপনার শেষ গল্পটা, মানে যেটা রবিবারের পাতায় বেরোলো, আমার ভাল্লেগেছে।”
— “তাই? বেশ। ভালোলাগা তো ভালো ব্যাপার।”
—“তো রান্না শেষ করে কী করবেন?”
—“ওই নেটফ্লিক্সে সিরিজ বা সিনেমা দেখব। অফিসের কিছু মেল-টেল করার আছে, তাও করে রাখব। আপনি কিন্তু ফাইলটা চেক করে যত তাড়াতাড়ি পারেন ছেড়ে দেবেন কেমন। ফাইলটা আমি নিজে তৈরি করেছি। কিছু গোলমাল থাকার কথা নয়।”
সোমেন মাথা চুলকোলো। বলল, “আরে মনেই হচ্ছে না আজ আপনার সঙ্গে প্রথম দেখা হচ্ছে। আসলে কাজের সূত্রে ফোনে কথা হয় তো, সেইজন্যই। তবে আজ আরেকটু বেশি কথা হল। ভেজা হল। আপনাকে কান্নার কথা বলে ফেললাম।”
—“কিন্তু কেন কাঁদবেন তা তো বললেন না।”
—“কে জানে! শালা কেন কাঁদব! মন শালা বোকাড্যাশ। ইশ, সরি গালিয়ে ফেললাম। মানে আমি বড় চাকরি করি, টাকা আছে, শালার সংসার আছে, তাও কেন যে কাঁদব! মানে মানুষ না খেয়ে মরে, পোকামাকড়ের মতো মরে, আর আমি শালা চার পদ দিয়ে ভাত খাই, মাছ মাংস, শালা বিরিয়ানি।”
—“এইজন্য কাঁদবেন? কিন্তু আমাদের তো এসব অভ্যেস হয়ে গেছে তাই না? এখনো এসবের জন্য মানুষ কাঁদে?”
—“মানে কেমন অপরাধী লাগে নিজেকে। কেমন যেন পোড়া পোড়া গন্ধ ছাড়ে বুঝলেন। ভেতরটা জ্বলে যায়। মানে আমি বিডিও ছিলাম যখন, তখন এত না খাওয়া লোক দেখেছি। আমি খেতে পারি না।”
—“আমার বিশ্বাস হচ্ছে না।”
—“কী?”
—“যে এসবের জন্য কেউ কাঁদতে পারে।”
—“কেন? পারে না কেন?”
—“স্ট্যান্ড রোডের গা ঘেষে ঝুপড়িগুলো দেখেছেন, সারা শহরের ফুটপাথে লটে মাছের ঝুরো রান্না করা কালো কড়াইগুলো, নর্দমা গড়িয়ে যে জল গঙ্গায় পড়ে সেই জল, তারপর যারা হেঁটে হেঁটে অমুক রাজ্য থেকে তমুক রাজ্য, বাড়ি ফিরতে গিয়ে ফিরতে পারল না, মরে গেল, যে ছেলেটা ওই যে মানসিক হাসপাতালে গলায় দুটো ডিম আটকে মরে গেল? কেন, না তার খিদে পেয়েছিল আর দুটো ডিম দেখে সে লোভ সামলাতে পারেনি, একসঙ্গে মুখে পুরে দিয়েছে। তারপর ট্রেন লাইনে যারা ঘুমিয়েছিল, ভাবেনি লকডাউনেও লাইন দিয়ে ট্রেন যাবে, কিন্তু ট্রেন গেল আর তারা তালগোল পাকানো মাংস হয়ে গেল, তারা? এদের সবাইকে দেখেছেন? এরকম আরো কত কত সবাই? কোটি কোটি সবাই? সব্বার গল্প দেখেছেন আপনি? সব্বাইকে দেখলে পাঁজর বুকের থেকে বেরিয়ে আসার কথা। কলজে হাওড়াব্রিজ দিয়ে হেঁটে ফেরা ক্লান্ত মানুষের পায়ের তলায় পিষে যাওয়ার কথা। যায় না, সব্বাইকে দেখা যায় না। কিছুতেই যায় না। মানুষ বাঁচতে পারে এদেশে?”
—“তাইতো। পারে না তো। আমিও শালা বেঁচে নেই।”
—“আপনি বলছেন আপনার মনের মধ্যে এখনো এসবের ছায়া পড়ে? এত প্রবলভাবে?”
—“কিছু তো করতে পারি না সেভাবে। শুধু ছায়াটুকু পড়ে। তাতে কী লাভ বলুন।”
—“তাহলে তো আপনার নিস্তার নেই। সারাজীবন ছুটে মরবেন।”
সোমেন ছুটে মরার ভাবনা থেকে বেরোতে চাইল বোধহয়। বলল, “তাইতো। নেটফ্লিক্স দেখে আপনি রাতের খাওয়া সারবেন?”
—“হু।”
—“তারপর?”
—“তারপর বাবা-মা ঘুমোবে, আমি আমার ঘরে আসব, দরজা বন্ধ করব।”
—“তারপর?”
—“তারপর ঘুম আসবে না। আবার নেটফ্লিক্স দেখব। এক টা হুহু করা ঢেউ আসবে। মনে হবে মানুষের খুব লেগেছে, এত ব্যথা। মনে হবে যার যেখানে যত ব্যথা, আমি সব্বার ব্যথায় উপশম দিই। পারব না। ঘুম আসবে না। নিজের ব্যথার কথা মনে পড়বে।”
—“কিসের ব্যথা”?
—“ওই, আপনারই মতো, কিসের যে ব্যথা ভগবান জানে। মন খারাপ করবে, পৃথিবীর স্বাভাবিকতার মোহ আমাকে টানবে।”
—“স্বাভাবিকতা ধুয়ে আপনি ডাব খাবেন?”
—“হা হা হা, তা ঠিক। তবে ওই, মাঝরাতে এসব মনে থাকে না। তারপর কোনোরকমে একটু ঘুম, সকালে উঠে রান্না, অফিসের কাজ। তারপর আবার একইরকম। মাঝে একটা তারিখ আসবে, বলবে হুড়রে, আজ জন্মদিন, আজ তোমার বিয়াল্লিশ, হুড়রে আজ জন্মদিন, আজ তোমার তেতাল্লিশ, এভাবেই চুয়াল্লিশ, চৌষট্টি, চুয়াত্তর।”
—“তারপর?”
—“তারপর আর কী? এবার আমি উঠি। আপনিও বাড়ি যান।”
—“পাইপ কলোনিতে যাব একবার।”
—“পাইপ কলোনি?”
—“হ্যাঁ। পাইপের মধ্যে আঠেরোটা সংসার থাকে। নারকেলডাঙার কাছে। আজ হিস্যার জন্মদিন। যেতে হবে। আমাকে ভালবাসে।”
সোমেন সিগারেট ধরাল। অনন্যা সিগারেটের গন্ধ সহ্য করতে পারে না। কিন্তু আজ গন্ধটায় কেমন বৃষ্টিভেজা বিষয় লেগে আছে। খারাপ লাগল না। বলল, “হিস্যা কে?”
—“পাইপ কলোনীর সবচেয়ে বুদ্ধিমান বাচ্চা। ক্লাস থ্রিতে পড়ে, কিন্তু ক্লাস ফাইভের অঙ্ক করে দেয়।”
—“অঙ্ক কে শেখায়? আপনি?”
—“আমি আছি। আমার এক বন্ধু আছে ডাক্তার, ইমরান, সেও শেখায়।”
—“আপনি অদ্ভুত। আমি বাংলা, ইতিহাস এসব পড়াতে পারি। পড়াব?”
—“আপনিও অদ্ভুত।”
—“আপনি পাইপ কলোনির রাজা?”
—“ধুস, রাজা আবার কী!”
সোমেন হাসতে থাকে। বৃষ্টি আরো জোরে পড়ে। শহর ভেসে যাবে মনে হচ্ছে। এখনো আলো আসেনি। এখনো সোমেন আর অনন্যা ভিজছে। নিচে নেমে আসলেই মিটে যায়। কিন্তু ছাদ থেকে নামা যাচ্ছে না।
অনন্যা বলে, “আচ্ছা আপনি সাউথ সিটিতে থাকেন? অনেক টাকা ফ্ল্যাটের দাম?”
—“হু, অনেক টাকা। আমার বৌ হেব্বি বড় চাকরী করে। সে ই-এম-আই দেয়। আমি অপদার্থ। আজেবাজে কাজে টাকা খরচ হয়ে যায়।”
—“হিস্যাকে কি দেবেন?”
—“ওই কিনেছি জামাকাপড়, খাবারদাবার। একা হিস্যাকে দিলে হবে? গুচ্ছের বাচ্চা। শালা কন্ট্রাসেপটিভ বোঝে না। বোঝালেও বোঝে না।”
—“পাইপ কলোনী থেকে একুশতলার ফ্ল্যাটে ফিরতে ইচ্ছে করে না, তাই না?”
—“পনেরো তলায় ফ্ল্যাট। না, ইচ্ছে করেনা তো। কিছুতেই ইচ্ছে করে না।”
—“বুঝেছি। আপনাকে আমি বুঝে ফেলেছি। পাগলামি ভাল, কিন্তু পাগলামির ভার যেন অন্যদের না বইতে হয়। বুঝলেন। যাকগিয়ে, আচ্ছা তাহলে আমি উঠি,”
—“বাড়ি যাবেন বললেন তো?”
—“তাই ভেবেছিলাম। এখন ভাবছি ময়দান যাব।”
—“এখন? ময়দান?”
অনন্যা একটু অন্যমনস্ক হয়ে বলে, “হুম। আমার এক বন্ধু ঘোড়া আছে। ইরফান। পায়ে ঘা হয়েছে। তো মালিক ওকে ছেড়ে দিয়েছে। ও একা থাকে, ঘাস খায়, মাঝে মাঝে কাঁদে। ঘোড়ার কান্না দেখেছেন কখনো? যাকগিয়ে, তো ইরফান আমার খুব বন্ধু। আমি কাছে গেলেই মাথা নামিয়ে আদর খেতে চায়। তো আগে অস্থির হলে আমি নদীর কাছে যেতাম, গঙ্গার ঘাটে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকতাম। এখন ময়দানে ইরফানের কাছে যাই। আজ যাব। অস্থির লাগছে। ওকে আপনার কথা বলব। বলব যে এরকম একজন অদ্ভুত মানুষের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে, যে অনেক না খেতে পাওয়া লোক দেখেছে বলে নিজে আর খেতে পারে না। কিন্তু সে ঘোষিত দেশ উদ্ধারকারী নয়। অথচ মানুষের জন্য তার বড্ড মায়া। আপনার অফিসে আসার আগে আমার অফিসের চ্যাটার্জীদা বলেছিল বটে আপনার মাথায় ছিট আছে। জীবনের স্বাভাবিকতা আপনাকে টানে না। আরো এটাসেটা।”
—“কী যে বলেন ম্যাম।”
—“কিন্তু কী জানেন তো, স্বাভাবিকতা থেকে সরে এলে জীবন প্রতিশোধ নেয়।”
—“এটা একদম ঠিক বলেছেন ম্যাম। এই প্রতিশোধের কেসটা আমি মানি।”
—“শোনেন, এখন আমার সন্দেহ হচ্ছে। এই এত বৃষ্টি, মেঘ, আকাশ ভেঙে পড়া, স্ট্যান্ড রোডের অন্ধকার বাড়ি, ছাদ, আপনি, সবকিছুই কি সত্যি? নাকি কিছুটা মিথ্যে? আপনি মিথ্যে? আপনার কথাগুলোও সব কসমোপলিটন ফেয়ারিটেল? আপনি হঠাৎ করে হারিয়ে যাবেন। খুব কষ্ট হবে। কষ্ট সহ্য করা যাবে না। লেখায় কষ্টের কথা লিখব এই ভেবে যে যদি আপনি পড়েন!”
—“আমি আসলে কেউ নই বলছেন? সবটা মিথ্যে? সবটাই আপনার একাকিত্বর কল্পনা?”
—“হতেও তো পারে। নির্ঘাৎ তাই। ফলে আপনাকে বাড়তে দেয়া যাবে না। এবার উঠতেই হবে।”
অনন্যা উঠে পড়ে। সিঁড়ির দিকে যায়। এখন যদি না যেতে পারে, আর কোনোদিন যাওয়া যাবে না।
ছাদে অন্ধকারে সত্যিই কি সোমেন বসে আছে? মানুষের দুঃখে দুঃখিত হতে পারার ক্ষমতাওলা মানুষ? অনন্যার ভয় ভয় করে। তাড়াহুড়ো করে নামা যাবে না, অন্ধকারে যদি পড়ে যায়। পড়ে গেলে উঠতে খুব কষ্ট। মানুষের দুঃখে দুঃখিত মানুষদের কোনো ভয় থাকে, না থাকে না? অনন্যা বুঝতে পারে না। কী যেন একটা ধরে ফেলবে বলে মনে হয়, অথচ ধরা যায় না, পাওয়া যায় না, ছুটিয়ে মারে কিন্তু ঘরে আসে না। ঘরে আসে না, বসে না, ঘুমোয় না, ভাত খায় না, আদর করে না।
সোমেন চেঁচিয়ে বলে, “ম্যাম কিন্তু আপনার পুরো গল্পটা তো আমার জানা হল না। আমার পুরো গল্পটাও আপনাকে বলা হল না।”
খুব বৃষ্টি পড়ছে। অনন্যা ফিরে তাকায় না। সাবধানে, সতর্কভাবে সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে বলে, “হাজিমন ফকিরের মেলা কবে হবে খবর নিন। সেখানে যাব। আপনি গেলে দেখা হবে। মনে থাকবে? দেখা হবে হাজিমন ফকিরের মেলায়।”
সোমেন হাসতে থাকে। তার হাসিতে অনেক হাসি, অল্প হাসি, পৃথিবীর অল্প আলো অল্প তিমির মিশে থাকে।
হাজিমন ফকিরের মেলা আসছে। সেখানে সব গল্প শেষ হয়, সব গল্প শুরু হয়।
**********
লেখক পরিচিতি : সায়ন্তনী ভট্টাচার্যের জন্ম হাওড়ার বালিতে। তার প্রথম গল্পের বই ‘ম্যাজিক ছাতা ও আরও ৯’ প্রকাশ পেয়েছে। উপন্যাসের জন্য শৈবভারতী পুরস্কার পেয়েছেন ২০১৭ সালে।


4 মন্তব্যসমূহ
ভালো গল্প। আধুনিক মনন আর লিখন।
উত্তরমুছুনপড়লাম! বেশ ভালো লাগলো!
উত্তরমুছুনখুব সুন্দর গল্প। চমৎকার গতি। একটানা পড়ে ফেলা গেল।
উত্তরমুছুনভালো লেগেছে।
উত্তরমুছুন