অলোকপর্ণা’র গল্প : কবুল



পরজন্মে বুদবুদ হতে চেয়েছিলো কুসুমের ছোট মেয়ে। জড়বস্তু হয়ে জন্মানো যায় কি না তখনো জানতো না সনকা, তাই তার মাথায় মিছি মিছি হাত বুলিয়ে তাকে চিরনিদ্রায় পাঠিয়েছিলো সে। শিশুটির অপাপবিদ্ধ গোলাপি ঠোঁট তখনো নড়ছিলো, ছোটোদের ছড়া জপছিলো সে, যেহেতু আর কোনো মন্ত্র তার জানা নেই। কুসুমের ছোট মেয়ে এভাবে মরেছিলো। এরপর বুড়ি মেলায় বা বাজারে বুদবুদ দেখে তার কথা মনে করেছে, কিন্তু একবারের জন্য মনে হয়নি, ওসব কুসুমের ছোটমেয়ে গুঞ্জন। বরং বর্ষার শেষে কুয়োতলায় খানকতক সাদা ছত্রাক দেখে তার গুঞ্জনের কথা আবার মনে পড়েছিলো। পরে সে বুঝেছে, জড় বস্তু হয়ে জন্মানো সম্ভব নয়, জড় বস্তু জন্মায় না, কারণে অকারণে গঠিত হয়—সে বছর বরষায় কুসুমের ছোট মেয়ে ছত্রাক হয়ে ফুটেছিলো সারা পাহাড়ে। দেখে তাকে খুশি মনে হয়েছিলো।

সনকার কাছে যারা আসে, বা সনকাকে যাদের কাছে যেতে হয়, তাদের সবার মধ্যে অলিখিত এক মিল পাওয়া যায়, তারা মৃদুভাষী, তাদের চোখের ভিতর যোজন যোজন দৃষ্টি ভরা আছে, তাদের বুকের মধ্যে নীরবতা ভেঙে খান খান হয়, আর আঙুলের ডগায় দূর পাহাড় থেকে বরফের হদিস বয়ে আনা বাতাসের রেশ। বুড়ির কানে কানে কথাগুলো বলার সময় তারা কেঁপে কেঁপে ওঠে, কথার ভারে, উত্তেজনায়। তাদের বিশ্বাস সনকার কানে বলা কথা এজন্মে না হলেও একদিন ফলবেই। সনকা সেসব কথা শোনামাত্র টপ করে গিলে ফেলে। বয়স ছিলো যখন তখন কিছু কিছু কথার মাছি মনে মাথায় ভনভন করেছে বটে, এখন স্মৃতি আবছা হয়ে আসায় এসব শোনামাত্র ফিকে হয়ে যায়, যেন কেউ দু-ফোঁটা জল উত্তপ্ত বালির বুকে ছুঁড়ে দিয়েছে। তাই বলে কি সে কথা ফলে না?

সনকা দেখেছে সুবু ছেত্রীকে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে থাকতে, তার ঘরের উলটো দিকে রাস্তায়, সবজির দোকানের পাশে। রেলে কাটা পড়া পা সে ফিরে পেয়েছিলো মরার বাইশ বছর পর। সনকা দেখেছে তাকে বিড়িটা শেষ করে মাটিতে ফেলে ফিরে পাওয়া পা দিয়ে সপাটে বিড়ির আগুন নেভাতে। সকালে বাজারে যাওয়ার পথে নিভে ভূত হয়ে যাওয়া সেই বিড়ির পাছা রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখেছে সনকা। আগে এসব কথা অন্যকে জানাবার তাগিদ ছিলো, জিদ ছিলো, তখন মানুষ ছিলো। এখন তারা নেই, শুধু সনকা আর মানুষের ফেলে যাওয়া কথারা বাস করে এখানে। সনকার সয়ে গেছে এসব। তবে তার আগে, অনেক সময় দুহাতে গলা টিপে ধরা কথা তাকে গিলে ফেলতে হয়েছে বহু বার, কথাকে ধারণ করতে হয়েছে বুকে, পিঠে, আত্মায়।

সর্দার সিং যখন দাঁত খোঁচাতে খোঁচাতে তার কানে বলেছিলো দিন দশ আগে খালের ধারে পড়ে থাকা কবন্ধ দেহের মাথাটা সে নিজের কাছে রেখে দিয়েছে স্মারক হিসাবে, সনকা দুদিন কিছু মুখে তুলতে পারেনি। পালিয়ে যাওয়ার আগে শর্মিলা আর নীলম যখন তার কাছে এসে ঘর পালানোর কথা, দূর শহরে নিজেদের একান্ত সংসার বাঁধার আকাঙ্খা জানিয়েছে, সনকার মন বলেছে ওদের বাপেদের আর বরদের ডেকে ডেকে এসব জানাতে। অভাবের তাড়নায় মংরু তার কাছে সদ্যজাত ছেলের মৃত্যকামনা করেছিলো সেই কোন কালে, সে ছেলে বড় হয়ে ঠিকেদারী করে তিনতলা লজ বানিয়ে যখন একদিন দুম করে মরে গেলো, মংরু সনকার কাছে এসে ভয়ানক কাঁদলো, বুড়ি তিনদিন ঘুমোলো না। নাম না জানা এক বউ, চল্লিশ বছর আগের শীতের এক রাতে এসে জানিয়ে গেছে নিজের শ্বশুরের সঙ্গে ভালোবাসাবাসির কথা। পর পর চার বার মেয়ে হবার পর জিমি ঠাকুর পঞ্চম সন্তানের মুখে কাচানুন ভরে তাকে রেখে এসেছিলো ভ্যাটের এক কোণে, মেয়েবাচ্চাটা যেন তিলে তিলে কষ্ট পেয়ে নয়, এক দমকে প্রাণ হারায়। কুকুরে খেয়েছিলো সেই মাংসের দলা। বুড়ি সব শুনেছিলো। একেক সময় তার ইচ্ছে হয়েছে থানা পুলিশ করতে, একেক সময় ইচ্ছে করেছে মরে যেতে, তবু সনকা ক্ষমা করে দিয়েছে সকলকে আর নিজেকে, ফলে কথারা থেকে গেছে বাসা বেঁধে তার কানে, কথারা কিছু কিছু ফলেছে, কথাদের কারো কারো ফলা এখনো বাকি।

শতসহস্র বছর আগে একদিন ঊরু ভরা কালশিটে তাকে সায়া তুলে দেখিয়েছিলো লছমী। সেই হয়েছিলো কাল। লছমীর মরদকে মদে ধরেছিলো, আর ছাড়েনি। সারাদিন জঙ্গলে কাঠ কেটে বাড়ি ফিরেও লোকটার হাত নিশপিশ থামতো না। কালশিটেগুলোর উপর মমতা ভরা হাত বোলাতে বোলাতে লছমী সেদিন কাঁদেনি, বরং সনকাকে বলেছিলো সে চায় তার মরদ যেন গলায় বমি আটকে মরে। কথাগুলো সনকার কানে ধরা পড়ে। কথার পোকা তার কানে গুঁটি বাঁধে, কথার শূককীট সেখানে ঘুমোয়। দিন এলে গুঁটি ভেঙে কথা প্রকাশ্যে আসে, কথা পেখম মেলে। তারপর লছমীর মরদ লছমীকে পিটিয়ে ক্লান্ত হয়ে যখন বিছানায় গিয়ে শোয়, অস্বস্তি বেড়ে বমি হয়ে উঠে আসে তার গলা বেয়ে, নেশা ও শ্রান্তিতে পাশ ফিরে শোয়ারও জো সে পায়না, নেশা তাকে পুঁতে ফেলে বালিশে, তোষকে, আর গলায় জমে ওঠে বমি।

লোকটাকে দম আটকে মরে যেতে দেখছিলো লছমী মেঝেতে পড়ে পড়ে। উঠে এসে তাকে পাশ ফিরিয়ে শুইয়ে দেওয়ার ইচ্ছে তার হয়নি। এরপরই বস্তিতে শোনা যেতে থাকে—সনকার কানে যে কথা এসে বসবে তা সোনা হয়ে ফলবে। লছমীর কথা বস্তি পেরিয়ে দূর দূর গ্রামে বয়ে গেলে, দলে দলে মেয়েরা দূর দূর গ্রাম থেকে সনকার কাছে এসে মনস্কামনা কবুল করে অপেক্ষা করতে শুরু করে—কবে সেসব কথা জ্যান্ত হয়ে হেঁটে চলে বেরাবে তা দেখার জন্য, তারা ওঁত পাতে। কিছু মরদ গলায় বমি আটকে মরে, কারো কারো দীর্ঘদিনের নিকষ অন্ধকার কোল আলো করে সন্তান জন্মায়, কেউ একবেলার পরিবর্তে দুবেলা খেতে পায়। একেক করে কথারা জ্যান্ত হয় আর সনকা কারো কাছে দেবী, কারো কাছে ডাইনি হয়ে ওঠে। সমাজের দেবী ও ডাইনিদের মত সনকা ধীরে ধীরে একঘরে হয়, কারো সাহসে অথবা রুচিতে কুলোয় না সনকার কাছে পৌঁছোতে, সনকা তাই কথাদের সঙ্গে ঘর বাঁধে এক কামরার।

সেই ঘরে সত্তর বছর কাটিয়ে সনকা কথাদের সম্পর্কে এমন কিছু জেনেছে, পেটে বিদ্যা থাকলে যা দিয়ে লোকে বই লেখে, মনে অভিসন্ধি থাকলে যা বেচে লোকে পয়সা কামায়। মাথা ভর্তি অন্য মানুষের কথা নিয়ে সনকা এর কোনোটাই করে উঠতে পারেনি। লাঠি হাতে সনকা দূর দূর গ্রামে যায় মানুষের কথা শুনবে বলে, শোনার পর সে ভুলে যাবে যে—এমন কথাও একদিন হয়েছিলো, তারপর একদিন সকাল সকাল চোখ মেলে দেখবে কথারা ফুটেছে, কথারা ফলেছে, কথা গজিয়েছে। ভক্তি ও ভয়ে ছোটরা সনকাকে প্রণাম করে, সনকার চেয়ে বয়সে বড় মানুষেরা অনেক বছর আগেই গত। এখন একেক সময় সনকার ইচ্ছে করে নীরবতায় চুপ করে বসে থাকতে, যেখানে কোনো কথা নেই, কথার ফলে ওঠা নেই, সেখানে গিয়ে নিদ্রা দিতে।

গ্রামের মানুষের কাছে একথা ব্যক্ত হলে বিপদ বাড়ে, সনকার আয়ু কামনা করে তাদের কেউ কেউ শেরাওয়ালী মায়ের থানে পুজো দেয়, কেউ সুতো বাঁধে দরগায়, অনেকে সনকার ঘরের সামনে হত্যে দিয়ে পড়ে থাকে দিবারাত্র। সনকা একবার কেশে উঠলেও ঘরে ঢুকে তার কুশল জেনে যায়। দূরের গ্রামে তার ডাক পড়লে আজকাল আর লাঠি হাতে তাকে চলতে হয় না, এরাই ডুলির ব্যবস্থা করে। গ্রামের প্রধানের মতো সনকা ডুলি করে সর্বত্র যাতায়াত করে। তার ডুলির আগে পিছে শিশুরা ছুটে বেরায়, তাদের দেখে ডুলির মধ্যে বসে সনকার হিংসে হয়। তার ইচ্ছে করে লম্বা লম্বা পা ফেলে এইসব কথার ছলচাতুরীর থেকে দূরে আরো দূরে চলে যেতে। ডুলিওয়ালাদের সে হেঁকে বলে ধীরে চলতে। ডুলিওয়ালারা তার কথা শোনে না। বস্তুত কেউই তার কোনো কথা শোনে না, কেউ তার কথা শোনেনি কোনোদিন। সকলেই বলে গেছে। তার নিজের কথারা গুম মেরে পড়ে থেকেছে মনের এক কোণে, শোনার মানুষ সে খুঁজে পায়নি। তার কাছে যারাই এসেছে কথা বলার অভিপ্রায় নিয়ে এসেছে, শোনার বাসনা তাদের কারো ছিলো না। এমনই তাদের আকাঙ্খা যে, যারা আসতে পারে না, তারা নিজের গরজে সনকাকে তাদের কাছে নিয়ে যায়, প্রয়োজনে অর্থও ব্যয় করে। সনকার ডুলি চলে সেই সব কথা শুনতে। সনকার চেয়ে তার ডুলি মুখ্য হয়ে ওঠে।

মনস্কামনা জ্ঞাপন করার সময় মানুষেরা প্রত্যেকেই আড়াল খোঁজে, ঘরের ভিতর সনকা বাদে আর কাউকে তারা রাখতে চায় না। ফিসফিস করে সব কথা বলা হলে তারা সনকার চোখে চোখ রাখতে পারে না। মনস্কামনা জ্ঞাপন করা হলে প্রত্যেকেই সনকার কাছে এসব কথা গোপন রাখার আবেদন জানায়। সনকার কাছে এমন কথা গোপন আছে যা প্রকাশ্যে এলে বিস্ফোরন ঘটতে পারে, সনকার কাছে এমন সব কথা রাখা থাকে যা মানুষের গভীরতম বিষাদকে টেনে তুলে আনতে পারে খোলা আকাশের নীচে আর পৃথিবীতে তৈরি হতে পারে বিষাদের মহামারী। সনকা ঘোলা চোখে এইসব কথাদের দিকে তাকিয়ে থাকে আর দিন গোনে—কবে সে এদের হাত থেকে মুক্তি পাবে।

সনকার ডুলি সনকাকে একদিন নিয়ে আসে শামুকজলা, নতুন বিডিও সাহেবের অফিসে। বিডিও সাহেব সেখানে ঠান্ডা ঘরে ঠান্ডা মেরে বসে আছেন। সনকা সেই ঘরে এসে পৌঁছলে ডুলি বাহকদের বাইরে পাঠানো হয়। কাচের দরজা ঘেরা সে ঘরে বসে বিডিও সাহেব সনকাকে যা বলেন তার বিন্দুবিসর্গ সে বোঝে না। জীবনে প্রথম এমন হয় তার। মুখে প্রশ্নচিহ্ন নিয়ে সনকাকে ঘরে ফেরায় ডুলিওয়ালারা। গোটা রাস্তা সনকা চুপ করে বিডিও সাহেবের কথার কথা ভাবতে থাকে। সনকার ভাবনায় কথারা দুর্বোধ্য থেকে দুর্বোধ্যতর হয়ে ওঠে। কঠিন অংকের মতো কথারা প্যাঁচে ফেলে সনকাকে। ঘরে ফিরেও সে কথার মর্মোদ্ধার হয় না। দিন যায়, মাস যায় দুর্বোধ্য কথা সনকার কানে বিঁধে থাকে। এদিকে বিডিও সাহেব অধীর হন, যে কথা সনকার মাথায় প্রবেশ করেনি, সে কথা ফলেও ওঠে না। তাই ফের সনকার তলব পড়ে বিডিও অফিসে। ডুলিওয়ালারা সনকাকে ঘরের মধ্যে বসিয়ে বাইরে গেলে বিডিও সাহেব দরজা বন্ধ করে সনকার দু হাত নিজের হাতের মধ্যে ধরে তার কানে কানে ফিসফিস করে নিজের মনের কথা বলেন। কিন্তু এবারও সনকা তার বিন্দুবিসর্গ বুঝতে পারে না, মনে হয় যেন বিডিও সাহেব বিদেশী ভাষায় কথা কইছেন। কপালে চিন্তার ভাঁজ নিয়ে সনকা ঘরে ফেরে। মাসের পর মাস যায়, বিডিও সাহেবের মনের কথা ফলে না। বিডিওসাহেব উতলা হয়ে নিজে সনকার ঘরে এসে পড়েন একদিন। সেদিনও ঘরের দরজা বন্ধ করে সনকার কানে কানে তিনি নিজের মনের কথা ব্যক্ত করেন। সনকা ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে তাঁর দিকে। বিডিও সাহেব বোঝেন সনকা তাঁর কথার অর্থ ধরতে পারছে না। তিনি আরও সহজ ভাষায়, উপমা সহ নিজের মনস্কামনা জানান তাকে। তবু সে কথা তার হৃদয়ে পশে না। সনকা হাঁ করে বিডিও সাহেবের মোটা চশমার আড়াল থেকে উঁকি দেওয়া চিন্তাক্লিষ্ট চোখদুটো দেখতে থাকে। এই প্রথম বুঝি কারো প্রতি সনকার মায়া হয়, সে মন দিয়ে বোঝার চেষ্টা করে মানুষটা কী বলতে চাইছে, তবু ব্যর্থ হয়। সে মনেপ্রাণে চায় মানুষটার কথা ফলুক, তবু কথা যে কী তা অনুধাবন করে উঠতে পারে না। বিফল মনোরথ বিডিও সাহেব নিজের ডেরায় ফিরে যান। দুর্বোধ্য কথা কানে নিয়ে সনকা চুপ করে বসে থাকে পথপানে চেয়ে।

অন্য মানুষের অন্য কথা সনকা টপ করে গিলে ফেলে, কিন্তু বিডিও সাহেবের কথারা তার গলায় কাঁটার মতো বিঁধে থাকে, তার ঢোক গিলতে কষ্ট হয়, ঘুমের মধ্যে খচখচ করে হজম না হওয়া সেই কথাগুলো। সনকা মাঝরাতে খাটের উপর দলা পাকিয়ে বসে থাকে। বস্তির মানুষেরা দেখে দিনকে দিন সনকা বুড়ি শুকিয়ে যাচ্ছে। কেউ ফল খাওয়ায় তাকে, কেউ দিয়ে যায় পথ্য, কেউ মন্ত্র পড়া ফুল গুঁজে দেয় তার হাতে, গলায় বেঁধে দেয় তাবিজ, তবু সনকার কান থেকে বিডিও সাহেবের কথাদের ঝেড়ে ফেলতে পারে না কেউ। বিডিও সাহেবের কথারা সকল কথার চেয়ে পৃথক ও বৃহৎ হয়ে জাঁকিয়ে বসে তার দেহেমনে। সনকার নাভিশ্বাস ওঠে, সনকার প্রাণ নিয়ে নির্মম সেসব কথারা ছিনিমিনি খেলে। বস্তির লোকেরা দেখে বিডিও সাহেবের কথারা কেমন ভর করেছে সনকার উপর। ঝিমোতে ঝিমোতে ডুলি করে সেই কথার ঘোরে সে এদিক ওদিক চলেছে। সেই কথার ঘোরে ঢুলতে ঢুলতে সে অন্য কথাদের শুনেছে। বস্তির মানুষেরা দেখে সনকা কেবল বিডিও সাফেবের কথার ভারে নুইয়ে পড়ছে। কথাগুলো যেন তাকে ধীরে ধীরে গ্রাস করছে। সকলে প্রমাদ গোনে। নরম মনের যারা, তারা কেঁদেও ওঠে। একশো বছর মানুষের কথা শোনার পর, সনকা বুড়ি শুধুমাত্র বিডিও সাহেবের কথার দোষে একদিন সকালে আর ঘুম থেকে জেগে ওঠে না। এলাকার মানুষে বিডিওকে দোষ দেয়, শাপ দেয়। সনকাকে মাথায় করে তারা নিয়ে যায় শ্মশানে। দাহ শেষে তারা গ্রামের বাজারে এসে মাটি খুঁড়ে পুঁতে দেয় সনকার নাভি অস্থি।

সনকা নেই, তবু তাকে বলে রাখা পুরনো কথারা ধীরে ধীরে ফলে, গ্রামের মানুষ তুষ্ট হয় ও কালের নিয়মে তারা তাকে ধীরে ধীরে ভুলে যেতে থাকে। ভোলেনা কেবল শামুকজলার বিডিও বিপিনবিহারী। অন্য জেলায় বদলি হয়ে যাওয়ার কিছুদিন আগে গভীর রাতে সে সনকার গ্রামে এসে পড়ে। বাজারে যেখানে সনকার অস্থি রোপন করা হয়েছিলো, সেখানে গিয়ে সে চুপ করে দাঁড়ায়, আর দেখে সনকার অস্থি হতে এক জামগাছ উঠে বিরাট দেহ নিয়ে বাজারের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে।

বিডিওসাহেব মোটা কাচের চশমার ওপার হতে তাঁর মাথার উপর ফলে থাকা সেই জামগাছের দিকে তাকান। উঁচু থেকে টুপ টুপ করে জাম এসে পড়ে তার সাদা জামায় আর বেগুনি বেগুনি ছোপ তৈরি হয়। সনকাকে বলা কথাগুলো মনে পড়ে তাঁর, চোখে জল জমে ওঠে। নিচু হয়ে মাটি থেকে কিছু জাম কুড়িয়ে খেতে যান তিনি, তাঁর চোখের জল টপ টপ করে ঝরে পড়ে জামগাছতলায়। সনকাকে বলা কথা তাঁর ফলেনি কখনো, একথা মনে করে কাঁদতে কাঁদতে বিডিও সাহেব গাছের তলা ঘুরে ঘুরে জাম কুড়িয়ে কুড়িয়ে খেতে থাকেন আর তাঁর জিভ বেগুনি হয়ে যায়। খাওয়ার উপযুক্ত সব জাম খাওয়া হয়ে গেলে ফিরে যান বিডিওসাহেব। কদিন পর তৈজসপত্র সমেত অন্য জেলায় চলে যান। এক সময় তিনি সনকা এবং সনকাকে বলা কথাগুলো ভুলে যান, শুধু তাঁর জিভ আজীবন বেগুনি হয়ে থাকে। ·


লেখক পরিচিতি : অলোকপর্ণা। ঔপন্যাসিক, গল্পকার। তার প্রকাশিত গ্রন্থের ভেতর উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো, ঝিঁঝিরা, যাহা বলিব সত্য বলিব, দাস্তানগো, রণ বিশ্ববাস করো নাম নয়, সবুজ অন্ধ করেছে, হাওয়া শহরের উপকথা, ইত্যাদি। লেখক বর্তমানে বেঙ্গালুরুে থাকেন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ