ক. মস্তিষ্কের বিকাশ
চিরায়ত উৎসবে মেতে উঠেছে প্রাচীন নগরী মিকোজ। বর্ণিল পত্রপুষ্পে মুখর প্রাঙ্গণ। বাতাসে চন্দনগন্ধ, আমোদিত পত্রপল্লব, শরীরে ও প্রাণে মিলনের আকাঙ্ক্ষা, হোমগন্ধ, যজ্ঞকাল, প্রাচুর্য। দেবগণ দেহ-প্রদর্শনে, জৌলুস-প্রদর্শনে, সৌন্দর্য-প্রদর্শনে সদাহাস্যময়; বিচিত্র বর্ণের বেশ, মূল্যবান আভরণে একেকজন হয়ে উঠেছেন অমূল্য।
মঞ্চের সর্ব দক্ষিণে অবহেলিত পট্টপত্রের ধার ধরে দাঁড়িয়ে নশ্বর মানবপুত্রসকল। মঞ্চে বিবেকবান পুরোহিত স্বয়ং প্রমিথিউস। প্রমিথিউসের আমন্ত্রণেই মানবকুলের আগমন। উৎসবের কেন্দ্র থেকে অবহেলিত দূরত্বে মানবকুলের অবস্থান। তবে কি মরণশীল মানবপুত্রদের লাঞ্ছিত করার ইচ্ছায় দেবসকল রচনা করেছেন এই আমোদ-উদ্যান?
দেবতা প্রমিথিউস নিজের হাতে বিশাল মহিষ বলি দিয়েছেন। মঞ্চের ওপর বলিকৃত মহিষ দুই ভাগে পৃথক করে রক্তিম বর্ণের মখমলে ঢেকে রাখা হয়েছে পৃথক পাত্রে। এখনই আমন্ত্রণ জানানো হবে দেবতাদের প্রধান স্বয়ং জিউসকে। অতঃপর আহ্বান জানানো হবে মানবজাতিকে। শ্রেষ্ঠ অংশ বেছে নিতে হবে। এই মহাযজ্ঞের আয়োজনে বুদ্ধির প্রখরতায় যিনি শ্রেষ্ঠ অংশ বেছে নিতে পারবেন তিনি-ই হবেন বিজয়ী। বিজয়ীকে উপযুক্ত সম্মানে ও পুরস্কারে অভিষিক্ত করা হবে।
বুদ্ধির প্রখরতায়, সময়ের ইতিহাসে এগিয়ে থাকবে কে? মানব-সন্তান নাকি অহঙ্কারী অমর ঐশ্বর্যশালী দেবতা? আসুন প্রিয় দর্শক, দেখা যাক কী ঘটতে যাচ্ছে স্বর্গীয় সময়ের মহামঞ্চে।
মঞ্চ থেকে ভেসে এলো দেবতা প্রমিথিউসের আকর্ষণীয় কণ্ঠস্বর, হে মহান, চিরশক্তির আধার মহামান্য দেবশ্রেষ্ঠ জিউস, আপনিই সেই শক্তির আধার যিনি কিনা এই সৃষ্টিজগৎ মহাশৃঙ্খলার তেজে ভাসিয়ে রেখেছেন মহাশূন্যতার বৃত্তে। দেবকুল এবং মানবকুলের ভেতর আপনিই শ্রেষ্ঠ, আপনার আনুগত্যে এই মহাজগৎ আপনার পদধূলি পেতে উদগ্রীব, সদা-সতর্ক অবস্থায় দিবানিশি আপনার সৃজিত জগৎ যেহেতু আপনারই গুণমুগ্ধ, সেহেতু হে উত্তম শক্তির আধার আপনাকেই সর্বাগ্রে মঞ্চে আহ্বান জানাচ্ছি, যজ্ঞের নিয়ম অনুসারে বলিকৃত বৃষমাংসের উত্তম অংশ নির্বাচনের অগ্রাধিকার আপনার।
ঘণ্টাধ্বনির ভয়ানক আওয়াজে মঞ্চের সিংহদ্বার উন্মোচিত হলো। মঞ্চে উঠে আসছেন দেবরাজ জিউস। অহংকারী দেবরাজ প্রচ- আত্মবিশ্বাস নিয়ে আলো ও আভিজাত্যের ঐশ্বর্যে হেলেদুলে উঠে আসছেন মঞ্চে। মহামূল্যবান দুটো পাত্রে নক্ষত্র-খচিত মখমলের চাদরে ঢেকে দেয়া হয়েছে বৃষযজ্ঞের মাংসমজ্জা। একটি পাত্র বিশাল, অপরটি ক্ষুদ্র।
ক্রমশ দর্শকদের সারি থেকে, দেবতাদের সারি থেকে, যৌনবিলাসী দেবীকুলের সারি থেকে আনন্দধ্বনি ভেসে আসছে। নিকটদূরে পেছনে পট্টপত্রের পাশে খালি পায়ে খালি গায়ে উলঙ্গ আদিম অসভ্য মরণশীল মানবপরিবার ক্ষুধার্ত অসহায়। সবলের জয় সর্বত্র। দেবকুল ঐশ্বর্যশালী, অমিত শক্তিশালী, সেই অমিত শক্তির আধার দেবকুলকে প্রথমে আহ্বান জানানো হয়েছে মঞ্চে। সুতরাং শ্রেষ্ঠ পাত্রটি বেছে নেয়ার সুযোগ তাদেরকে দেয়া হয়েছে। এ কেমন প্রতিযোগিতা? মানবজাতির প্রতি এ এক ভয়ানক অবিচার।
তারপরও মানবকুল বিশ্বাস হারায় না। মানবজাতি আশায় বুক বাঁধে, মানবপিতা প্রমিথিউস নিশ্চয় ন্যায় বিচারক, নিরপেক্ষ। পেশিশক্তি নয় বরং মেধাশক্তি দিয়ে হতে হবে জয়ী। ক্ষুধার্ত মানবকুলের চোখে আশা ও উত্তেজনা, ক্ষীণ, অবহেলিত।
মহাজাগতিক হাস্যে দেবপ্রধান আসন পরিত্যাগ পূর্বক ধীর অথচ অহংকারী যৌবনপুষ্ট পেশিসৌন্দর্যে মঞ্চে উঠে আসছেন। ভীতসন্ত্রস্ত মঞ্চ কেঁপে উঠল। হর্ষধ্বনি। দেবরাজ ক্ষণিকের জন্য দর্শকের দিকে তাকালেন যেনবা, ওহে দেবকুল আমার ওপর ভরসা রাখো আমিই সেই উত্তম যিনি তোমাদের জন্য উত্তম পাত্র নির্বাচন করব।
দেবরাজের দুচোখের ইশারা থেকে আত্মম্ভরি অহংকারের দ্যুতি বিচ্ছুরিত। ম্রিয়মাণ হতভাগা মানবকুলের দিকে তাকিয়ে প্রমিথিউস হাসলেন। রহস্যময় সেই হাসি চাপা পড়ে গেল দেবরাজ জিউসের দাম্ভিক পদচারণায়। আবারও ভয়ানক আন্দোলনে নড়ে উঠল নক্ষত্র-খচিত মঞ্চ।
মুহূর্তে স্তব্ধ আমোদিত আন্দোলন। দেবরাজ জিউস সুযোগের পূর্ণ সদ্ব্যবহার করতে দৃঢ় প্রত্যয়ে এগিয়ে গেলেন নক্ষত্র-খচিত রক্তিম মখমলে আচ্ছাদিত বৃহৎ পাত্রটির দিকে। উত্তেজনায় দেবসমাজ কাঁপছে। দেবরাজ বৃহৎ পাত্রটি বেছে নিতে যাচ্ছেন। হর্ষ ধ্বনির পরিবর্তে উদ্যানময় ছড়িয়ে পড়ল হতবাক হতাশা মিশ্রিত দীর্ঘশ্বাস, ক্রোধমিশ্রিত ক্ষোভ।
দেবরাজ বৃহৎ পাত্র থেকে নক্ষত্র-খচিত রক্তিম মখমলের চাদর সদম্ভে সরিয়ে মহাক্রোধে চিৎকার করে উঠলেন। সেই ক্রোধমিশ্রিত চিৎকারে মেঘেরা একে একে ঝরে পড়তে থাকল ভূমিতে। পাত্রটি পূর্ণ হয়ে রয়েছে বলিকৃত মহিষের হাড়হাড্ডি তেলচর্বি অখাদ্য বৃষচামড়ায়। তাহলে বলিকৃত মহিষের শ্রেষ্ঠ অংশসমূহ মজুদ রয়েছে ক্ষুদ্র পাত্রে; যেটি বেছে নেবার সুযোগ তিনি হারিয়েছেন নিজ দাম্ভিকতায়।
প্রমিথিউস ক্ষুদ্র পাত্রের কাছে দাঁড়িয়ে আছেন। ভরাট কণ্ঠে হৃষ্টচিত্তে ঘোষণা করলেন, হে অন্তরীক্ষ বিচরণশীল দেবকুল আর ওহে মরণশীল পৃথিবীচারী মানবসমাজ, দেবরাজ দেবসমাজের জন্য অগ্রহণীয় পরিত্যক্ত-দ্রব্যের বৃহৎ পাত্র নির্বাচন করেছেন; তিনি আরও একবার প্রমাণ করলেন একমাত্র বৃহৎ পাত্রই উত্তম বস্তুর আধার হতে পারে না; এতে দেবকুলের লোভ ও লালসারই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। দেবশ্রেষ্ঠ জিউস লোভ ও অহংকারের বশবর্তী হয়ে ভুলে গিয়েছিলেন উত্তম অংশ যা প্রজ্ঞা ও জ্ঞান নামে অভিহিত হয়ে থাকে তা থাকে ক্ষুদ্র পাত্রে আমাদের মস্তিষ্কে; বলিকৃত বৃষমাংসের উত্তম অংশ মজুদ রাখা হয়েছিল ক্ষুদ্র পাত্রে অথচ দেবরাজ জিউসকে সর্বাগ্রে সুযোগ দেওয়া সত্ত্বেও তিনি উত্তম পাত্র নির্বাচনে ব্যর্থ হয়েছেন। দেবরাজ, মানবকুলের কাছে আপনার পরাজয় ঘটেছে; দেবশ্রেষ্ঠ হিসেবে নিজেকে জাহির করতে চাইলেও আপনার এখনও বুদ্ধির বিকাশ ঘটেনি। আমি আহ্বান জানাচ্ছি মানব-সমাজকে তাদের নির্ধারিত পাত্রটি গ্রহণ করার জন্য। ওহে মরণশীল মানব, তোমরাই পাচ্ছ সারবস্তু সমৃদ্ধ পুষ্টিকর আহারের শ্রেষ্ঠ অংশ।
নগ্নপদে মানবগোষ্ঠীর ভেতর থেকে চিন্তাশীল মুখম-ল নিয়ে অচঞ্চল আদিপিতা আদম উলঙ্গ দেহে ধীর পদক্ষেপে মঞ্চের নিকটে অগ্রসর হলেন। আর তখন ক্ষিতি অপ তেজ মরুৎ ব্যোমব্যাপীয়া কক্ষপথ কম্পমান। দেবলোকের ক্রোধে শুরু হলো প্রলয়।
খ. বরফযুগ
জিউস ইতোমধ্যেই বুঝতে পেরেছেন ক্ষুদ্রদেহী মানবকুল একদা বুদ্ধিতে, বৃত্তিতে শ্রেষ্ঠ হয়ে উঠবে; অস্বীকার করবে দেবকুলকে। দেবগণ একদিন মানুষের দৃষ্টির অন্তরালে চলে যাবেন; ক্রমশ হয়ে উঠবেন অলৌকিক লোককথা মাত্র। মেনে নেয়া যায় না এ অবস্থা। সুতরাং বিষবৃক্ষতুল্য মানবকুলকে এখনই নির্মূল করা উচিত।
এদিকে প্রমিথিউস বুঝতে পারলেন অপমানিত জিউস তার যাবতীয় শক্তি নিক্ষেপ করবেন মানবজাতির বিরুদ্ধে। সুতরাং বসে থাকলেন না সত্যদ্রষ্টা প্রমিথিউস। জ্ঞানই শক্তি। অহংকারী নির্বোধ চাকচিক্যে মূর্খ দেবকুল আজও বাস করছে অন্ধকারে। দেবকুল জানে না জ্ঞানের আলো যেখানে পৌঁছায় না, শুধু অলৌকিক মায়ার আতিশয্যে যারা উন্মাদ তাদের বিনাশ অনিবার্য।
মানব জাতির পরম সত্তা প্রমিথিউস নেমে এলেন মাটিতে। প্রজ্ঞা ও জ্ঞানের আধার প্রমিথিউস মানুষকে শেখালেন বুদ্ধিবৃত্তিক যুক্তিবোধ। যে মানব ক্ষুৎপিপাসা আর পশুর মতো রমণকার্যের অধিক কিছু ভাবতে পারত না তারাই প্রমিথিউসের শিক্ষায় ক্রমশ বুঝতে পারল ভোগই জীবনের শেষ কথা নয়। সত্যিকারের মানুষ হয়ে উঠতে হলে এর বাইরেও মানুষের করণীয় প্রচুর; স্থুলতা নয় বরং সূক্ষ্মতার গভীরে প্রবেশই জীবনের উদ্দেশ্য; নান্দনিক চেতনাই হতে পারে মুক্তির পথ; বেঁচে থাকার মূল উদ্দেশ্য জীবনকে জানা; মানুষকে অবশ্যই মানুষ হয়ে উঠতে হবে।
ক্রমশ জেগে উঠল জিজ্ঞাসা, অমানুষের সমাজকে কীভাবে মানুষের সমাজে রূপান্তর করা সম্ভব? মানুষ কি প্রকৃতিগতভাবেই রক্তপিপাসু, ঈর্ষাকাতর, সন্দেহ পরায়ণ? মানুষের জ্ঞানই পারে জীবনের মর্মার্থ উদ্ধার করতে। নশ্বর মানবজীবন! মানুষ জানে না, মানুষের কখনো মৃত্যু হয় না। মানুষকে বোঝার, জীবনকে বোঝার সবচেয়ে বড় উপায় জীবনকে বাঁচিয়ে রাখা; জ্ঞানে ও প্রজ্ঞায় গোষ্ঠীগত জীবনের ভেতর বেঁচে থাকা।
প্রমিথিউস মানুষকে ভাষা শিক্ষা দিলেন; দিলেন চেতনার সূক্ষ্মতর অনুভব; সংগীত ও প্রজ্ঞা; দর্শন ও বিজ্ঞান; আলো ও অন্ধকারের যথার্থ পার্থক্য। প্রমিথিউস শিক্ষা দিলেন আদি থেকে অনন্ত অবধি। উলঙ্গ বর্বরতা থেকে মানুষকে টেনে তুললেন সভ্যতার দীপ্তিতে। মানুষ বুঝতে শিখলো অস্ত্র ও বস্ত্রের প্রয়োজনীয়তা; গৃহ ও অগ্নির ব্যবহার। অগ্নির যথার্থ ব্যবহারই জীবন, উত্তাপই শক্তি যা সভ্যতাকে দেয় শক্তি ও পরম আয়ু। ষড়ঋতুর পার্থক্য মানুষের জানা ছিল না। প্রমিথিউসই প্রথম বৌদ্ধিক প্রজ্ঞা যিনি মানবজাতিকে সৌরজ্ঞানে জ্ঞানী করে তুলেছিলেন; বুঝিয়ে দিয়েছিলেন শীত-গ্রীষ্ম প্রকৃতির আকস্মিক কোনো আক্রমণ নয়; ঋতু পরম্পরায় আবহাওয়ার বৈচিত্র্য মানুষের জীবনে আসে এবং যায়। প্রমিথিউসই প্রথম প্রাণ যিনি মানুষকে শুনিয়েছিলেন কাব্য এবং সংগীত, শুনিয়েছিলেন শৃঙ্খলাবদ্ধ শ্রমিকের গান, শুনিয়েছিলেন ভালোবাসার মন্ত্র। মানুষকে মানুষই ভালোবাসে, মানুষই দাঁড়ায় মানুষের পাশে। মানুষই যূথবদ্ধ হয়ে ওঠার যথার্থ যোগ্যতা রাখে, যোগ্যতা রাখে অন্যায় অথবা স্বৈরাচারীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার, মানুষই কাঁদে এবং কাঁদায়, মানুষই রচনা করে লড়াইয়ের শ্রেষ্ঠতম সংগীত।
তবুও শেষ রক্ষা হলো না। হবে না তাও প্রমিথিউস জানতেন। জানতেন মহাস্বৈরাচারী জিউস মানুষের উন্নতি সহ্য করতে পারবেন না। মানুষকে তিনি চাইবেন নিমূর্ল করতে; জগৎ থেকে মানুষের অস্তিত্ব বিলুপ্ত করতে। আর জিউস এটুকু জেনেছিলেন অগ্নিই একমাত্র শক্তি যার দ্বারা মানুষ একদিন আপন স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখতে সক্ষম হবে।
প্রমিথিউসের প্রতি ক্রোধ এবং মানুষের তিল তিল উন্নতি খর্ব করার জন্য দেবশ্রেষ্ঠ জিউস অগ্নিকে হরণ করলেন। মাটির পৃথিবীতে জেগে উঠল হাহাকার, জরা, মৃত্যু, শীতলতার নিরবধি স্থিরতা; অগ্নিহীন দুর্বিষহ জীবন। অন্ধকার পশুর মতো শৈত্যপ্রবাহ এসে ক্রমশ নিস্তেজ করে তুলল মানুষের বাসস্থান; সুদীর্ঘ হিমবাহ, বরফযুগ। এর কোনো শেষ নেই, বিরামহীন। বিরামহীন যূথবদ্ধ মানুষের টিকে থাকার লড়াই।
গ. পৃথিবী আমাদের মা
প্রমিথিউস ছুটে গেলেন দেবরাজ জিউসের কাছে। সরাসরি প্রশ্ন করলেন, মরণশীল মানবজাতিকে আপনি কেন বঞ্চিত করেছেন আগুন থেকে? কেন এই বিরামহীন বরফযুগ?
অলিম্পাস পর্বতশীর্ষে দেবসিংহাসনে উপবিষ্ট জিউস মানবদরদি প্রমিথিউসের উদ্বিগ্নতা দেখে আহ্লাদিত হলেন। সহাস্যে উচ্চারণ করলেন, প্রিয় ইপেটাস-পুত্র দেবশ্রেষ্ঠ মহাপ্রজ্ঞাবান ভবিষ্যৎবক্তা মানবদরদি প্রমিথিউস, আপনাকে উদ্বিগ্ন মনে হচ্ছে, বলুন আপনার প্রশান্তির জন্য দেবকুলের কী করণীয়?
প্রমিথিউস পূর্ববৎ ধীর ও প্রলম্বিত বাক্যে আবারও উচ্চারণ করলেন, কোন অপরাধে মাটির মানুষকে আপনি আগুন থেকে বঞ্চিত করেছেন?
: ইপেটাস-নন্দন আপনি ভুলে যাচ্ছেন আপনি দেবরাজ জিউসের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছেন।
: আমার জ্ঞান এখনও রহিত হয়নি, আমার সম্যক জানা আছে আমি কার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছি, আপনি আমার কথার জবাব দিন দেবরাজ জিউস।
: কৈফিয়ত তলব করছেন? আপনার জানা উচিত দেবরাজ জিউস জবাবদিহির জন্য বাধ্য নন? মহাজ্ঞানী প্রমিথিউস আপনি সীমালঙ্ঘন করছেন; তার আগে আপনি আমার মাত্র একটি প্রশ্নের জবাব দিন, দেবকুল অপেক্ষা মরণশীল তুচ্ছ মানবকুলকে কোন অধিকারে আপনি পক্ষপাতিত্ব করছেন?
: পক্ষপাতিত্ব নয় প্রভু, বরং মানবজাতির মাধ্যমে আমি দেবসমাজকে ভালোবাসা, ন্যায় আর সাম্যের সমাজ গঠনের শিক্ষায় আলোকিত করে তুলতে চাইছি; আর সেই স্বপ্ন থেকেই মানসপুত্র মানবকুলকে আমি সৃষ্টি করেছি। দেবরাজ জিউস, আপনি অযথা মানবজাতির সঙ্গে বৈরিতা করছেন, প্রভু আপনি মানুষকে আগুন ফিরিয়ে দিন। মানুষেরা আমার সন্তান। দেবতাদের স্বর্গ অগণতান্ত্রিক, স্বৈরশাসনে আর অজ্ঞানতার আতিশয্যে অর্থহীন; আর এ কারণেই ন্যায়ভিত্তিক জ্ঞানের রাজ্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্নে মানুষের সমাজ গঠনে বাধ্য হয়েছি আমি; প্রকৃত জ্ঞান-অনুসারী জীবন প্রতিষ্ঠার জন্য এই স্বপ্ন কি অন্যায়? বলুন দেবরাজ?
: কিন্তু আপনার কি জানা নেই মরণশীল মানুষের কাছ থেকে দেবকুলের শিক্ষণীয় কিছুই নেই; প্রমিথিউস জেনে রাখুন মনুষ্যপ্রীতি আমার পক্ষে মেনে নেওয়া অসম্ভব।
: প্রভু আমি বলতে বাধ্য হচ্ছি, আপনার এই স্বৈরাচারী মনোবৃত্তি, দাম্ভিকতা ও একগুঁয়েমি পক্ষান্তরে মানব-পরিবারে আপনার পতনকেই ত্বরান্বিত করবে। আপনি বুঝতে চেষ্টা করুন, মানুষকে ভালোবাসতে শিখুন।
: থামুন, যথেষ্ট হয়েছে প্রমিথিউস, আপনাকে আমি শেষবারের মতো সুযোগ দিচ্ছি, ভেবে দেখুন, তা না হলে সীমা লঙ্ঘনের জন্য আপনাকে পেতে হবে বিরামহীন শাস্তি।
: দেবরাজ জিউস, প্রমিথিউসকে আপনি অযথা ভয় দেখাচ্ছেন; আপনার জানা আছে প্রমিথিউস কখনো অন্যায় শাস্তির ভয়ে অন্যায়ের কাছে মাথা নত করে না; আর জেনে রাখুন জিউস, আমার এই স্বভাবের কিয়দংশ আমি মানবকুলকেও দিয়েছি; একদিন তারাও আপনার কাছে মাথা নত করবে না। এখন বলুন কী সেই শেষ সুযোগ, তবে মনে করবেন না যে আমি শাস্তির ভয়ে সুযোগ চাচ্ছি; কোনো সুযোগ নেবার ইচ্ছা আমার আদৌ নেই; যা ন্যায়সংগত আমি সে সিদ্ধান্তই নেব মহামান্য জিউস; তারপরও আমিই বরং আপনাকে অনুরোধ করছি, বলুন আপনার সদিচ্ছার কথা যাতে দেবকুলের সাথে মানুবকুলের বিরোধের চিরমীমাংসা সম্ভব।
: ইপেটাস-তনয় সম্ভবত আপনার শুভবুদ্ধির উদয় হয়েছে; শুনে রাখুন মানব জাতিকে আমি শেষ সুযোগ দিতে চাইছি একমাত্র মহাজ্ঞানী প্রমিথিউস আপনার সম্মানে; একটিমাত্র শর্তে পৃথিবীর বুকে আমি আগুন ফিরিয়ে দিতে পারি, যদি মানবকুল অনন্তকাল আমার আজ্ঞাবহ কৃতদাস হয়ে থাকে।
: আহ প্রভু থামুন আপনি; আমার সৃষ্টির উদ্দেশ্যই তাহলে মিথ্যে হয়ে যাবে; শুনে রাখুন অহংকারী জিউস, কৃতদাস হয়ে থাকার জন্য, গোলামি করার জন্য মানুষের সৃষ্টি হয়নি; এ অসম্ভব।
: তাহলে আপনি আমার দেয়া সুযোগ ফিরিয়ে দিচ্ছেন?
: না প্রভু এ সুযোগ নয়, এ শৃঙ্খল, এ অসম্ভব।
: আপনি আমার কৃপাকে অস্বীকার করছেন, জানেন এর পরিণাম কী হতে পারে?
: জানি দেবরাজ জিউস, আমাকে অযথা ভয় দেখাবেন না; আপনার সাথে বাক্যালাপ অর্থহীন; আমি চেয়েছিলাম আপনাকে অন্যায় থেকে বিরত করতে; আপনার ভেতর মানবোচিত বিবেক জাগিয়ে তুলতে। অথচ
প্রমিথিউসের কথা শেষ না হতেই চিৎকার করে উঠলেন জিউস, মানবোচিত? এতদূর স্পর্ধা? আপনিকি জিউসের ক্রোধ ভুলে গিয়েছেন?
: দেবরাজ জিউস আপনার ক্রোধ নির্বোধের আস্ফালন; আমার প্রতি আক্রোশবশত আপনি মানুষকে শাস্তি দিচ্ছেন। মনুষ্য শক্তির কাছে পরাজিত হবার আক্রোশে আপনি ভীত; আর সেই জন্যই আপনি মানব জাতির বিনাশ চাইছেন।
: থামুন প্রমিথিউস, আর একটি বাক্যও আমি শুনতে ইচ্ছুক নই, এই মুহূর্তে আমার সম্মুখ হতে দূর হয়ে যান, কদাচিৎ আপনার মুখ আমি দর্শন করতে ইচ্ছুক নই।
কেঁপে উঠল অলিম্পাস পর্বত। সেই মহাকম্পনের ভেতর জলদগম্ভীর কণ্ঠে শোনা গেল প্রমিথিউসের সুদীর্ঘ বাক্য, সর্বশক্তিমান অথচ মহামূর্খ জিউস ভুলে যাচ্ছেন ইপাটাস আমার পিতা, জলদেবী থেটিস আমার মা; ভুলে যাচ্ছেন ন্যায়ের প্রবক্তা প্রমিথিউস কখনো ন্যায় কর্ম থেকে পিছপা হয় না; মানুষের অধিকার আগুন আমি আমার জীবনের বিনিময়ে হলেও ফিরিয়ে দেব মানুষকে; সেইদিন বেশি দূরে নয়, দেবসমাজের বিনাশ অনিবার্য; আর শুনে রাখুন অহংকারী জিউস, মরণশীল মাটির মানুষ একদিন হয়ে উঠবে অমর। শুনে রাখুন জিউস, আমি প্রমিথিউস, আমি নিজেই প্রজ্ঞা জ্ঞান আর আলো হয়ে মানুষের মস্তিষ্কে প্রবাহিত হব; মানুষই হবে প্রকৃতির শ্রেষ্ঠ সম্পদ।
আরও জেনে রাখুন স্বৈরশাসক জিউস, জল বাতাস মাটি আগুন আর মহাশূন্য এরা কারো ব্যক্তিগত নয়; প্রকৃতির ওপর যেমন আছে বাতাসের চিরায়ত অধিকার তেমনই প্রকৃতির প্রতিটি সন্তানের আছে এদের ওপর অনিবার্য অধিকার। এই পৃথিবীর প্রত্যেক ধূলিকণা মানুষের পরম পবিত্র; গাছের পাতা, প্রতিটি শস্য আর মানুষের শৈশব, বালুভূমি, গভীর ঘন অন্ধকার, শিশির বিন্দু, মাঠ, মুখরিত পতঙ্গ, সব, সবকিছু মানুষের স্মৃতি আর অভিজ্ঞতায় জমে আছে পরম পূজনীয় পবিত্র সম্পদে। মাটির বুক থেকে গাছ চুষে নেয় দুধ, গোপনে; যেমন গোপনে আমাদের ধমনিতে বয়ে চলে মাটি থেকে পাওয়া স্বেদ ও রক্ত; দুগ্ধ ও মধু। অগ্নি এই পৃথিবীর সন্তান; মানুষ আগুনেরই অংশ। আপনি হে মূর্খ জিউস আরও শুনে রাখুন, আগুন আপনার একার নয় বরং আগুন নিজেই জ্ঞানের, আগুন নিজেই আলো; যার অর্থ প্রজ্ঞা ও জ্ঞান, যা একমাত্র মানুষের জন্যই হতে পারে উপযুক্ত। আর মানুষের মতো আমিও বাধ্য হচ্ছি বলতে, অলৌকিক কোনো প্রভু নয় বরং এই পৃথিবীই আমাদের মা।
ঘ. অনিবার্য জীবনের নিশানা
গভীর শান্ত সেই রাত। কোথাও কোনো তারকা নেই। জীবকুল ঘুমিয়ে। বটবৃক্ষ ভুলে গিয়েছে নাম-পরিচয় ভিটেমাটি সাকিন। পাখিসকল গভীর অন্ধকারে স্বপ্নকাতর। ইঁদুরসকল স্বপ্ন দেখছে। ঘুমদেবতার অলৌকিক মায়ায় দেবজগৎ ভুলে গিয়েছে যৌনতার মোহ। সূর্যদেবতা গভীর বিশ্রামে। অবিরাম বনরাশি গভীর প্রত্যয়ে সূর্যদেবতার অপেক্ষায় ভুলে গিয়েছে জীবনের উচ্ছৃঙ্খলতা। বনজ বৃক্ষ ঘুমের ভেতরই গভীর প্রত্যয়ে ত্যাগ করছে অক্সিজেন, জীবনের রসদ।
সৌরজগতে একজন মাত্র যিনি প্রজ্ঞাবান প্রমিথিউস যার কাছ থেকে ঘুমের দেবতা বহু আগেই সরে গিয়েছেন দূরে। আলো চাই, জ্ঞান চাই, অনন্তের রহস্য উন্মোচনে চাই আগুন, প্রজ্ঞা ও মেধা। চাই উত্তাপ, ভালোবাসা, বন্ধন। চাই মায়া ও মোহ। চাই বেঁচে থাকার তাড়না, জেগে ওঠার শক্তি। চাই প্রকৃতিকে বশে আনার শক্তি ও মেধা। চাই আগুন। বরফ যুগের শীতল গহ্বর থেকে যূথবদ্ধ মানব পরিবারকে নিয়ে প্রকাশ পেতে চাই আলোতে।
আর কিছুক্ষণ পর সূর্যদেব অ্যাপোলো রথ পরিভ্রমণে প্রকাশ পাবেন। নিদ্রা থেকে জাগ্রত হবেন দেবী ঊষা। আর তখন দেবতা অ্যাপোলোর রথচক্রের ঘর্ষণে নির্গত হবে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ। প্রখর তেজদীপ্ত সেই অগ্নিরশ্মি। সূর্যরশ্মির ভেতর ঘুমিয়ে আছে বিদ্যুৎ। ঊষাদেবীর আরাধনায় জেগে উঠবে সেই বিদ্যুৎ। চাই বিদ্যুৎ। বিদ্যুতের অন্তত একটি কণা বহন করে নিয়ে যেতে হবে পৃথিবীবাসীর কাছে, মরণশীল মানুষের কাছে, অবসান ঘটাতে হবে বরফ যুগের।
ঘুম থেকে জেগে উঠেছেন দেবী ঊষা। ফিরে আসছে প্রভাত। ক্ষণকালের ভেতর আলোর প্রতিভায় হেসে উঠতে শুরু করেছে চারধার। এখনই সূর্যদেব অ্যাপোলো প্রাসাদ পরিত্যাগ করবেন। খুব ধীরে গভীর দূরত্বের গিরিখাদ থেকে দাম্ভিক সৌন্দর্য বিচ্ছুরিত করে এগিয়ে আসছে অ্যাপোলোর রথ। স্বর্ণনির্মিত উজ্জ্বল রথ দেবশ্রেষ্ঠ অ্যাপোলোর প্রাসাদের বাইরে বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে।
পাহাড়ের আড়ালে দেবতা প্রমিথিউস; হাতে শুকনো পট্টলতিকা। সূর্যদেব অ্যাপোলো উদ্ভাসিত মুখে তাকিয়ে রয়েছেন অনন্তের দিকে। রথচক্রের ঘর্ষণে ছিটকে উঠছে বিদ্যুৎ। প্রমিথিউস মুহূর্তে পট্টলতিকা ছুঁইয়ে নিলেন উদ্ভাসিত বিদ্যুৎকণিকার দেহে। পরমুহূর্তে কেঁপে উঠলেন উত্তেজনা আর শঙ্কায়; দেবশ্রেষ্ঠ অ্যাপোলো যদি বুঝতে পারেন তাহলে সমস্ত স্বপ্ন মুখ থুবড়ে পড়বে বরফপৃথিবীর পৃষ্ঠে। ক্রমশ প্রশান্ত মুখে এগিয়ে চলেছেন অ্যাপোলো, বিকারহীন। প্রমিথিউসের মুখে একঝলক নির্বিকার হাসি; না অ্যাপোলো তাকে দেখতে পাননি। সুতরাং এখনই সময়।
ফিরে এলেন জ্ঞানের দেবতা মানবপিতা প্রমিথিউস মানুষের কাছে, বরফ-পৃথিবীতে। হাতে পট্টলতিকা; অনন্ত শক্তির আধার। অনন্ত জ্ঞান ও প্রজ্ঞার উৎস; আলো, আগুন, বিদ্যুৎ। মানুষ মুক্তি পাবে বরফযুগ থেকে, অন্ধকার আর অজ্ঞানতা থেকে। সামনেই অপেক্ষারত মানুষের মেধাদীপ্ত সভ্যতা। ক্রমশ অমানুষের সমাজ রূপান্তরিত হবে মানুষের সমাজে। সহযোগিতার হাত, সাম্যের হাত, ভালোবাসার হাত একান্ত নিষ্ঠায় প্রতিটি মানুষ বাড়িয়ে দেবে প্রতিটি মানুষের দিকে। মানুষ বুঝতে শিখবে প্রতিনিয়ত মানুষ হয়ে ওঠার তাড়নায় অনিবার্য লড়াইয়ে সক্রিয় অংশ গ্রহণের নাম জীবন। পশুজীবন থেকে ন্যায়ভিত্তিক সমাজের দিকে এগিয়ে যাওয়ার নাম জীবন। যে জীবন দেবজীবন অপেক্ষা সহস্র ভাগ মূল্যবান।
ঙ. প্যানডোরা : অনন্ত রহস্যের প্রতিমা
স্বর্গ থেকে লক্ষ করলেন জিউস পৃথিবীর সমারোহ। কোথায় বরফযুগ? চারিদিকে জীবনের উদ্ভাস। চমকে উঠলেন জিউস। ভয় পেলেন। আলো বিদ্যা বুদ্ধি প্রজ্ঞা আর জ্ঞানকে ভয়। প্রকাশযোগ্য আগুনের অনন্ত শক্তির প্রতি ভয়। বিকাশহীন মস্তিষ্কের ধারক স্বৈরশাসক জিউস হতবুদ্ধি, নির্বাক। সেই অন্ধকারতুল্য ভয়ের গভীরতায় ক্রমশ জেগে উঠতে থাকল ক্রোধ।
চিরঘৃণ্য দুর্বল মানুষের কাছে আজ প্রমিথিউসের বিশ্বাসঘাতকতায় আগুন সুলভ্য। এমন কি জিউস এও বুঝেছেন প্রমিথিউসের শিক্ষায় মানুষ আজ আলোকপ্রাপ্ত। অজ্ঞানতার অন্ধকার সরে গেছে দূরে। জ্ঞানের আলোয় মানুষ আজ পরিশ্রমী এবং সংযমী। এখন আর সম্ভব নয় এত সহজে মানুষের কাছ থেকে আগুন ছিনিয়ে নেওয়া। ইতোমধ্যেই মানুষ একটিমাত্র বিদ্যুৎকণা থেকে সৃষ্টি করেছে অনন্তের বিদ্যুৎ; ছড়িয়ে দিয়েছে সেই বিদ্যুৎ বিশ্বব্যাপী; বিদ্যা ও কর্মমুখর জীবনের অগ্নিশিখা।
ক্রোধদীপ্ত জিউস ডেকে আনলেন পুত্র বিশ্বকর্মা হেপাস্টাসকে। বিশ্বকর্মা হেপাস্টাস অবনত এবং প্রতীক্ষারত। উদ্বিগ্ন ও ক্রোধদীপ্ত জিউস। সহসা শোনা গেল জিউসের মেঘগম্ভীর কণ্ঠ, পুত্র হেপাস্টাস, তুমি কি ভুলতে বসেছো তুমিই সেই শ্রেষ্ঠ শিল্পী যার সমতুল্য কেউ নেই?
: পিতা, বুঝতে পারছি না কী আমার অপরাধ? তবে বিনীত প্রার্থনা করছি আমি আমার শিল্পবিদ্যা হতে বিচ্যুত হইনি; সুযোগ দিন প্রভু চেষ্টা করে দেখব; তবে আমি কখনোই শ্রেষ্ঠ নই, যতক্ষণ না পর্যন্ত আপনি তা বলছেন।
: পুত্র তোমার বিনয়ে অপার আনন্দ, তুমিই সেই উপযুক্ত পুত্র যে কিনা সৃজন করতে সক্ষম পৃথিবী ও স্বর্গের শ্রেষ্ঠতমা রমণী; যাও দ্রুত প্রস্তুত করো সৌন্দর্যের চূড়ান্ত বিন্যাস; আর আমার চাই এমন একজোড়া লৌহশৃঙ্খল যার বন্ধনকে মুক্ত করার ক্ষমতা কোনো দেবতার থাকবে না; আরও শুনে রাখো পুত্র, অধিক কৌতূহল কখনোই কাম্য নয়; কোনো প্রশ্ন নয়, জানতে চেও না কী আমার উদ্দেশ্য; শুধু জেনে রাখো আমার প্রয়োজন লৌহশৃঙ্খল এবং এমন এক শ্রেষ্ঠা রমণী যে কিনা মনুষ্য-আকৃতির হলেও দেবীশ্রেষ্ঠা আফ্রোদিতিতুল্য মোহনীয় সৌন্দর্যে পূজনীয়া।
হেপাস্টাস কয়েক দিনের মধ্যেই তৈরি করলেন এক অপরূপা নারী। দেবীতুল্য স্থির মূর্তি। স্বর্গসভায় উপস্থিত করা হলো অপরূপা নারীমূর্তি। মুহূর্তে স্তব্ধ স্বর্গসভা। তারপর শোনা গেল গুঞ্জরণ। এমন নারীমূর্তি কেউ ইতিপূর্বে দেখেনি। জিউসের কল্পনাতে ছিল না হেপাস্টাস এমন অপরূপা রমণী সৃজন করতে সক্ষম। দীর্ঘ সময় হতবাক থাকার পর সহসা চিৎকার করে উঠলেন উদ্দেশ্য প্রণোদিত জিউস, হে দেবকুল তোমরা তোমাদের শ্রেষ্ঠতম গুণ দিয়ে সাজিয়ে তোলো এই নারীমূর্তি। পুত্র হেপাস্টাস আমি অভিভূত, শীঘ্রই তুমি পাবে তোমার চূড়ান্ত শিল্পকর্মের সর্বোচ্চ পুরস্কার; নিকটে আসো পুত্র, উপবেশন করো আমার পাশে।
কেউ বুঝতে পারছেন না দেবরাজ জিউসের মনোভাব। বিস্মিত সকলে। একসময় অতি ধীর পদক্ষেপে মোহনীয় বাতাসের শরীরে ভর দিয়ে নির্বাক এগিয়ে এলেন প্রেমের দেবী আফ্রোদিতি। মোহিনী মূর্তির সমস্ত দেহে ছড়িয়ে দিলেন সম্মোহনী রঙের চমক। নারীমূর্তির আশ্চর্য নিবির চোখ দুটোতে প্রবেশ করালেন নারী-হৃদয়ের প্রেম। চোখ ভরতি অনুরাগ। কটাক্ষ-মদির সেই অনুরাগ প্রকাশ পেল কণ্ঠরেখায়, যেনবা এখনি প্রকাশ পাবে রাগ-অনুরাগের প্রলম্বিত সুর।
আর তখন এগিয়ে এলেন দেবী এথেনা। শেখালেন শ্রেষ্ঠতমা প্রেষ্ঠার করণীয়, নারীজীবনের গোপনীয় ঐশ্বর্য। এগিয়ে এলেন হারমেস, কারিটেজ আর হেরা। তারা তাদের চূড়ান্ত যোগ্যতায় অপরূপাকে অসামান্যা নারীতে পরিপূর্ণ করে তুললেন। সেই নিষ্পাপ রমণীর হৃদয়ে আফ্রোদিতি প্রবেশ করালেন প্রণয়ের আকাক্সক্ষা। হারমেস শেখালেন প্রেম ও প্রতারণা; ছলনা ও রহস্য। কারিটেজ সাজালেন তাকে সূক্ষ্ম মিহি বুননের উদ্দীপক পোশাকে। হেরা নিয়ে এলেন স্বর্গীয় পুষ্পদল; অপরূপার দেহের ভাঁজে ভাঁজে ভেসে উঠল পুষ্পসৌরভ; কেশসজ্জার উপরিভাগে স্থাপিত হলো স্বর্ণমুকুট।
অবশেষে সিংহাসন থেকে উঠে এলেন দেবরাজ জিউস। সরাসরি দাঁড়ালেন অপরূপা মূর্তির সামনে। এক লহমায় অমৃত মন্ত্রের ফুৎকারে জাগিয়ে দিলেন অপরূপার পাষাণ শরীর। দেবতা জিউস স্বয়ং দান করলেন প্রাণ; নাম রাখলেন, প্যানডোরা। তারপর, প্যানডোরার হাতে ধরিয়ে দিলেন স্বর্ণখচিত এক গহনার বাক্স।
দেবসমাজে দেখা দিলো প্রচণ্ড রেষারেষি; কে হবে অপরূপা প্যানডোরার একচ্ছত্র অধিপতি। আর তখন শোনা গেল দেবরাজ জিউসের কণ্ঠস্বর, দেবপ্রিয়া হেরা আদেশ করছি তোমাকে, যতটা যতেœর সাথে সাজিয়ে তুলেছ প্যানডোরাকে তার চেয়েও অধিক যত্নের সাথে পৌঁছে দাও তাকে প্রমিথিউসের ভাই এপিমিথিউসের নিকট; আর জেনে রাখো সবাই, একমাত্র প্রমিথিউসের ভ্রাতা এপিমিথিউসের জন্যই সৃষ্টি করা হয়েছে এই অপরূপাকে।
মুহূর্তে সংবাদ পৌঁছে গেল মহাজ্ঞানী প্রমিথিউসের কাছে। ভবিষ্যদ্বক্তা প্রমিথিউস বুঝতে পারলেন সব। আর যে মুহূর্তে তিনি প্রস্তুত হলেন এপিমিথিউসের কাছে ছুটে যেতে ঠিক সে মুহূর্তে শৃঙ্খলিত হলেন দেবরাজ জিউসের আদেশে বিশ্বকর্মা হেপাস্টাসের হাতে তৈরি লৌহশৃঙ্খল দ্বারা। যে শৃঙ্খলের বন্ধন ছিন্ন করার ক্ষমতা দেবকুলে কারো নেই। জ্ঞানসাধক মানবপিতা প্রমিথিউস বন্দি হলেন জিউসের অনুচর ক্রাতোস এবং বিয়ার হস্তে।
দেবরাজ জিউসের আদেশে নিয়ে যাওয়া হলো তাকে ককেশাসের গিরিকন্দরে। তারপরও সেই জনপ্রাণিহীন গিরিগুহা থেকে কৌশলে প্রমিথিউস ভাই এপিমিথিউসের কাছে পাঠিয়ে দিলেন বার্তা, দেবরাজ জিউসের কোনো উপহার কোনোক্রমেই কখনো সে যেন গ্রহণ না করে।
তাও কি সম্ভব? অপরূপা প্যানডোরা, যে প্যানডোরাকে পাবার জন্য প্রত্যেক দেবপুরুষ ঈর্ষায় জর্জরিত। কে পারে ফেরাতে প্রিয়তমা রমণী প্যানডোরাকে? প্যানডোরা, দেবকুলের বিস্ময়। প্যানডোরা, অনন্ত রহস্যের প্রতিমা!
চ. প্রণয় ও পরিণাম
ককেশাসের গিরিগুহায় ফিরে গেছে সন্ধ্যা। আকাশে পূর্ণচন্দ্রের মায়া। একাকী বসে আছেন এপিমিথিউস। চিন্তিত এপিমিথিউস। হঠাৎ কেন এমন সতর্কবার্তা? মহাজ্ঞানী প্রমিথিউসের নিষেধাজ্ঞা অবজ্ঞা করার মতো শিক্ষা অথবা সাহস তার নেই। সুতরাং গভীর চিন্তায় রাত্রিকালকে দীর্ঘ ভারবাহী করে তুলতে থাকলে অনতিদূরে সহসা আলোকশিখা বিচ্ছুরণে ক্রমশ এগিয়ে আসতে থাকে নারীমূর্তি; যেনবা স্বর্গবিচ্যুত হুরের আলোকোজ্জ্বল বিহার। এপিমিথিউসের ধ্যানমগ্নতা বিঘ্নিত হলো।
স্বচ্ছতোয়া স্বর্গীয় নদী। চন্দ্রকিরণ, উত্তাল অথচ আশ্চর্য নিবির সেই নদীবক্ষ; রুপোলি মদের চাঞ্চল্য। অনতিদূরে অরণ্যবৃক্ষের শ্বাসগ্রহণের স্পন্দন; আর সেই স্বর্গীয় নদের ওপার থেকে যখন রাতপাখিদের সুদীর্ঘ কণ্ঠস্বর কেবলই ছড়িয়ে পড়তে শুরু করল তখন শোনা গেল মায়াবিনী জাদুকণ্ঠ, আমি কি দাঁড়িয়ে রয়েছি দেব-তনয় এপিমিথিউসের সম্মুখে?
বিস্ময় রূপান্তরিত হলো চমকে। চন্দ্রালোকে দাঁড়িয়ে দেবশ্রেষ্ঠা নারী! মায়া? মোহ? জাদু? তবে কি জাগ্রত অবস্থায় তাকে স্বপ্নে পেয়েছে? অপরূপার স্বর্গীয় আঙুল থেকে ক্রমাগত এপিমিথিউসের শরীরে যখন ঝরে পড়তে থাকল পুষ্পদল তখন এপিমিথিউস যেনবা সজ্ঞা ফিরে পেলেন, শুনতে পেলেন, আপনি কি সেই পুরুষশ্রেষ্ঠ যার সন্ধানে আমাকে আসতে হয়েছে অপার রহস্য ভেদ করে অবশেষে এই গভীর নির্জন বনভূমির ভেতর? কথা বলুন অচিন পুরুষ।
সম্মোহিত দেবপুরুষ এপিমিথিউস ব্যর্থ হলেন পূর্ণ সজ্ঞা ফিরে পেতে, যেনবা গভীর ঘুমের ভেতর থেকে স্বপ্নাবিষ্ট, উচ্চারণ করলেন, দেবী আমিই চিরকুমার এপিমিথিউস।
স্বপ্নাবিষ্ট এপিমিথিউসের চোখের গভীরে চোখ রেখে অপরূপা ফিসফিসিয়ে ওঠে, কি ভাবছেন দেব-তনয়? আমি প্যানডোরা, ঈশ্বরের উপহার!
কেঁপে উঠলেন এপিমিথিউস। মনে পড়ে গেল ভ্রাতা প্রমিথিউসের নিষেধাজ্ঞা। স্তব্ধ বধির এপিমিথিউস। আর তখন প্যানডোরা হালকা পালক পায়ে এগিয়ে এসে এপিমিথিউসের দক্ষিণ হস্ত ধরে বাতাসের গতিতে এগিয়ে যেতে থাকলেন স্বর্গীয় হ্রদের দিকে। চন্দ্রালোকে এপিমিথিউসকে সঙ্গে নিয়ে মিশে গেলেন জলপরিদের ভিড়ে; আশ্রয় নিলেন ছলনার, যেনবা অশান্ত স্রাতের অপঘাতে মৃত্যু হতে যাচ্ছে প্যানডোরার, চিৎকার করে জাগিয়ে দিলেন এপিমিথিউসের অন্তর, বাঁচাও প্রিয় এপিমিথিউস, ভেসে যাচ্ছি আমি জলের স্রােতে, বাঁচাও। আর তখন এপিমিথিউস অনিন্দ্য সুন্দরী প্যানডোরার গলা জড়িয়ে কানের কাছে ঠোঁট নিয়ে চুপিসারে বলতে থাকেন, প্যানডোরা প্রিয়তমা আমার, তোমাকে হারাতে চাই না আমি কোনোদিন আমার জীবন থেকে।
প্যানডোরা শব্দের অর্থ, যে রমণীকে দেবগণ ঐশ্বর্যের সম্পদ দিয়ে সাজিয়ে তোলেন। দেবরাজ অলিম্পাস থেকে প্যানডোরার অভিনয়দক্ষতা অবলোকনে কুটিল হাসলেন; মনে মনে বললেন, ঐশ্বর্যের যাবতীয় বিষাক্ত সম্পদ গয়নার বাক্সে পুরে ধরিয়ে দিয়েছি প্যানডোরা তোমার হাতে। প্যানডোরা, তুমিই হবে সেই নারী যে হবে যাবতীয় ধ্বংসের উৎস; চিরসৌন্দর্যের আধার পৃথিবীবাসীর জন্য তুমি মোহ ও মায়া; পৃথিবীতে তোমার মতো জন্ম নেবে অজস্র নারী।
পক্ষাধিক চন্দ্রদিবস শেষে ফিরে আসে নতুন ঋতু। কাম পিপাসায় কাতর উভয়ে। ক্রমশ দিনের পর দিন, রাতের পর রাত অনুরাগে রক্তিম প্যানডোরা প্রেমপুরুষ এপিমিথিউসকে নিজের করে পাবার জন্য প্রস্তুত করে তোলে নিজেকে। দেবরাজ স্বয়ং জিউসের কাছ থেকে প্রাপ্ত উপহার-বাক্স সযতেœ রাখে; মিলনের প্রথম রাতে দেব-উপহার দিয়ে সাজিয়ে তুলবে নিজেকে; তারপর দেব-তনয় এপিমিথিউসের বুকে সমর্পণ করবে দেহ ও প্রেম। এগিয়ে আসে সেই কাক্সিক্ষত রাত। বাম হাতে গয়নার বাক্স আর ডান হাতে এপিমিথিউসের ঠোঁটে আঙুল ছুঁইয়ে প্যানডোরার চোখে কটাক্ষ। কেঁপে ওঠে এপিমিথিউস। আসক্তি মাখা কণ্ঠে এপিমিথিউসকে অনুরোধ জানায় প্যানডোরা, প্রিয় পুরুষ আমার, আজ আমাদের জীবনের শ্রেষ্ঠতম রাত; আমাকে সাজিয়ে তুলবে তুমি দেবরাজ জিউসের উপহারকৃত এই স্বর্গীয় অলংকারে।
স্বপ্নাবিষ্ট এপিমিথিউস তাকিয়ে থাকেন গহনার বাক্সের দিকে। প্রেম ও যৌবনের কাছে পরাজিত হয় প্রজ্ঞা; নারীর কাছে পরাজিত হয় নিষেধাজ্ঞা; প্রিয়তমাকে একান্ত করে পাবার উত্তেজনায় মুহূর্তে হাত থেকে পড়ে যায় গহনার বাক্স; খুলে যায় মুখ। কেঁপে ওঠে মহাজগৎ। শুরু হয় প্রলয়। মুহূর্তে এপিমিথিউস ফিরে পান বোধ ও বিবেক। কিন্তু সর্বনাশ যা হবার হয়ে গিয়েছে। দ্রুত বাক্সের মুখ বন্ধ করে ফেললেন। ইতোমধ্যেই বাক্স থেকে মুক্তি পেয়েছে অশুভের প্রলয়; ধাবিত হয়েছে পৃথিবীর দিকে।
প্রমিথিউস যে সত্য জানতেন সেই সত্য জানা ছিল না প্রমিথিউস ভ্রাতা এপিমিথিউসের। যৌবনের উত্তাপে অজ্ঞতার বিষতাপে জর্জরিত এপিমিথিউসের নির্বোধ প্রেমের মোহে পৃথিবীতে নেমে এলো ধ্বংস। সুন্দরী প্যানডোরা জানত না কুচক্রী জিউসের প্রতিশোধ প্যানডোরা নিজেই। প্যানডোরা জানে না তার রূপের পেছনে লুকিয়ে রয়েছে প্রতিশোধস্পৃহা, ক্রোধ ও মোহ। মুহূর্তের অসতর্কতায় অলংকারের স্বর্ণকৌটা থেকে মুক্তি পেয়েছে সর্বনাশা মহামারি, রোগ, শোক, দুঃখ, দারিদ্র্য, জরা, হিংসা, দ্বেষ, কুটিলতা, ঘৃণা আর ক্রোধ। পৃথিবীবাসীর জন্য ধ্বংসের ইন্ধন।
স্বর্ণকৌটার একেবারে তলদেশে দেবরাজ জিউস কৌশলে রেখেছিলেন ‘আশা’। সেই ধীরগতির আশা এত অল্প সময়ে প্রকাশের সুযোগ না পেয়ে আবারও বন্দি হয়ে রইল গহনার বাক্সে।
বাক্স হাতে চিৎকার করে উঠলেন এপিমিথিউস। সেই চিৎকারে পৃথিবী কেঁপে উঠল। মহাপ্রলয়ে পৃথিবী ওলট-পালট হলে মহা-অন্ধকারের তলদেশ থেকে প্রতিহিংসা পরায়ণ জিউস অবিরাম অট্টহাসিতে গোটা সৌরজগতের ওপর জাগিয়ে তুললেন বিদ্যুৎ; মুহুর্মুহু বিদ্যুৎপাত। বাক্সবন্দি প্রেম ও প্রজ্ঞা; আশা ও ভবিষ্যৎ। অথচ সদম্ভে মুক্ত রোগ, শোক, দুঃখ, দারিদ্র্য, জরা, হিংসা, দ্বেষ, কুটিলতা, ঘৃণা ও ক্রোধ।
ছ. শৃঙ্খল : অনন্তের লড়াই
দেবপুরুষ অ্যাপোলোর আভা ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে আকাশে। ককেশাসের গিরিগুহায় ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে আলো ও আবির। আবারও নিখুঁত হয়ে উঠেছে প্রমিথিউসের দেহকাঠামো। ঘুম থেকে জেগে উঠতে শুরু করেছে বন্যপ্রাণি, বনাঞ্চল। এখনই ডানা মেলবে পাখি।
নির্জন শৈলদেহে জিউসের অনুগত অনুচর ক্রাতোস আর বিয়া শৃঙ্খলিত করে রেখেছে মানবপিতা প্রমিথিউসকে। বিশ্বকর্মা হেপাস্টাসের তৈরিকৃত লৌহশৃঙ্খলের বন্ধন মুক্ত করার ক্ষমতা মহাজ্ঞানী প্রমিথিউসের সাধ্যের বাইরে। প্রমিথিউসের সুদীর্ঘ দেহে কোনো বস্ত্র নেই। হিমশীতল গিরিগুহা, হিমগিরির কন্দরে একাকী প্রমিথিউস লৌহশৃঙ্খলে শৃঙ্খলাবদ্ধ। দেবরাজ জিউসের আদেশে এখানে অনন্তকাল বন্দি থাকবেন প্রমিথিউস। মরজগতের প্রাণির জন্য অসম্ভব এই শাস্তি। কঠিন লৌহবন্ধন, প্রকৃতির সীমাহীন বিপর্যয়; অথচ প্রমিথিউসের মৃত্যু নেই; বিরামহীন শাস্তি।
ভেসে আসে না কোনো প্রাণি অথবা মানবের কণ্ঠস্বর। সূর্য তার উত্তপ্ত তাপে প্রতিদিন পুড়িয়ে দেয় প্রমিথিউসের দেহ। তারপর রাতভর বরফশীতল শৈতপ্রবাহ প্রমিথিউসের ক্ষতবিক্ষত দেহের ওপর অত্যাচারের বিরামহীন প্রহর অতিক্রম করে। যন্ত্রণার রাত্রি শেষে সূর্যের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ফিরে আসে এক তীক্ষ্ণ চঞ্চু ঈগল; যে কিনা প্রতিদিন দিনভর প্রমিথিউসের যকৃৎ ছিঁড়ে ছিঁড়ে খায় সুদীর্ঘ তীক্ষ্ণ ঠোঁটের আক্রমণে। সূর্যদেব বিদায় নিলে ফিরে যায় ঈগল। আর তখন সমস্ত রাত ধরে প্রমিথিউসের দেহ হিমশীতল যন্ত্রণায় ক্রমশ ফিরে পেতে থাকে পূর্বাবস্থা; পুনর্গঠিত হয় বক্ষ-যকৃৎ।
দিনের আলোর শুরুতে আবারও ফিরে আসে তীক্ষ্ণ চঞ্চু ঈগল। একইভাবে দিনভর ক্ষতবিক্ষত করতে থাকে যকৃৎ; দংশন শেষে প্রমিথিউসের শরীর ঝুলে থাকে হাড়-হাড্ডির খাঁচায়। অথচ আবারও সমস্ত রাত ধরে দেহ পুনর্গঠিত হলে দিনের প্রথম প্রভায় ফিরে আসে ঈগল; এইভাবে বিরামহীন অনন্ত শাস্তির সীমানা।
অতঃপর একদিন, দেবরাজ জিউসের অহংকারী অনুচর হার্মিস এলেন শৃঙ্খলিত প্রমিথিউসের কাছে। সদম্ভে উচ্চারণ করলেন, ওহে মানবদরদি মূর্খ নিজেকে শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী বলে জানো অথচ আজ তোমার এ কী অবস্থা? এখনও সময় আছে মহাপ্রভুর কাছে ক্ষমা চেয়ে নাও।
বিরামহীন ঘৃণা ও যন্ত্রণায় প্রমিথিউস নীরব থাকলেন। নীরবতা হার্মিসকে উত্তেজিত করে তুলল। ভয়ংকর চিৎকারে তিনি বলে উঠলেন, মানবদরদি মূর্খ, মহাপ্রভুর হুকুম মহাপ্রভুর কাছে তোমাকে ক্ষমা চাইতে হবে; না হলে মানব-জাতির মতো তুমিও জ্বলবে অনন্ত অশান্তির আগুনে। এখনও সময় আছে, মনে রেখো দ্বিতীয়বার আমাকে পাঠানো হবে না তোমার কাছে; মহাপ্রভুর কৃপা নিয়ে তোমার কাছে আর কখনো আসবে না কেউ; এখনও যদি তোমার বোধোদয় না ঘটে তাহলে বুঝতেই পারছ মহাপ্রভুর ক্রোধ সৌরজগৎকেও অতিক্রম করবে।
প্রমিথিউস ভয়ানক চিৎকারে চোখের সম্মুখ হতে হার্মিসকে দূর হয়ে যেতে বলতেই প্রমিথিউসের বুক থেকে থকথকে রক্ত ঝরে পড়তে শুরু করল। প্রমিথিউস আস্থার সঙ্গে ধীরে কষ্টকাতর কণ্ঠে অথচ মর্যাদা সহযোগে উচ্চারণ করলেন, হার্মিস তুমি সত্যিকার অর্থেই নির্বোধ, প্রমিথিউসের প্রজ্ঞার সন্ধান তুমি পাওনি, অথচ মরণশীল মানুষ সেই বোধ ও প্রজ্ঞার সন্ধানে আজ গতিশীল; সুতরাং মহাপ্রভুর দাসত্ব করা অর্থহীন। অলৌকিক প্রভুর দিন শেষ, তোমাদের প্রভুর কোনো শর্তই আমার পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়; ন্যায় সত্য ও জ্ঞানের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা প্রমিথিউসের পক্ষে সম্ভব নয়; আর বলে দিও তোমাদের প্রভুকে, অলৌকিক দাম্ভিকতার দিন একদিন শেষ হবেই যেদিন মানুষ তার প্রজ্ঞা দিয়ে আমাকে শৃঙ্খলমুক্ত করবে। সেই প্রজ্ঞানির্মিত স্বাধীন দিনের অপেক্ষায় আমি অপেক্ষারত।
ফিরে গেলেন হার্মিস। জিউসের ক্রোধে দুলে উঠল পৃথিবী। মহাক্রোধের বজ্রাঘাতে চারিদিক প্রকম্পিত। যেনবা মহাসমুদ্রের উদ্ধত জলরাশির শৃঙ্খলহীন আক্রমণ। বিরামহীন প্রান্তর, অসীম আকাশ আর সীমাহীন সমুদ্রের সঙ্গে একাকার পৃথিবী। ককেশাসের গিরিগুহায় নেমে এসেছে অন্ধকার। ক্রমশ বিরামহীন যন্ত্রণায় ক্ষতবিক্ষত প্রমিথিউসের যকৃৎ। প্রমিথিউসের বক্ষকন্দর পূর্বাবস্থায় ফিরে আসতে শুরু করেছে। চোখ বন্ধ করে থাকার চেষ্টা করছেন প্রমিথিউস। নিকষ কালো অন্ধকার। কোনো কালেই কোনো জনপ্রাণি এমন কি মানুষও সন্ধান পাবে না শৃঙ্খলিত প্রমিথিউসের।
পৃথিবীবাসীর উদ্দেশে জলদগম্ভীর কণ্ঠে চিৎকার করে উঠলেন প্রমিথিউস, হে আমার মানস-সন্তান আশা হারিও না, মনে রেখো জিউস নামের কোনো প্রভু নেই, অলৌকিক ঈশ্বর বলে কিছু নেই, বরং আমাকে শৃঙ্খলমুক্ত করো, অর্থাৎ বিদ্যাকে শৃঙ্খলমুক্ত করো। যতক্ষণ পর্যন্ত আমাকে খুঁজে না পাও ততক্ষণ জ্ঞানের সন্ধান অব্যাহত রাখো। মনে রেখো অবিদ্যার অপর নাম দাসত্বে বিশ্বাস, প্রভুতে বিশ্বাস। সুতরাং প্রভু থেকে দূরে থাকো। আশা হারিও না, খুঁজতে থাকো প্যানডোরার বাক্স, যার ভেতর লুকিয়ে রয়েছে আশা।
**********
লেখক পরিচিতি : শিমুল মাহমুদ কথাসাহিত্যিক। আশির দশকের শেষভাগ থেকে শুরু করে তিন দশক যাবৎ সম্পাদনা করেছেন সাহিত্যের কাগজ ‘কারুজ’। এ পর্যন্ত তাঁর গ্রন্থসংখ্যা : ২৫। জন্ম ১৯৬৭ সালের ৩ মে। পেশা এবং নেশা : অধ্যাপনা। কর্মস্থল : বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ।

0 মন্তব্যসমূহ