‘নিখোঁজ মানুষের ছেলে’ উপন্যাসে যা বলতে চেয়েছি : মাহবুব ময়ূখ রিশাদ

মাহবুব ময়ূখ রিশাদ। আলোকচিত্রী : জাহরা জাহান পার্লিয়া

বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে যে কজন তরুণের নাম বার বার উচ্চারিত হচ্ছে, তাদের মধ্যে মাহবুব ময়ূখ রিশাদ একজন। লেখায় তিনি প্রতিশ্রুতিশীল। আপস করেন না পাঠকরুচির সঙ্গে, ধার ধারেন না জনপ্রিয়তার। তার জন্ম ১৯৮৮ সালের ৩০শে জুন সন্ধ্যাবেলায়। পড়াশোনা করেছেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে। লিখছেন দীর্ঘদিন ধরে, সময়ে হিসেবে আঠারো বছর। প্রকাশিত হয়েছে ৫টি উপন্যাস, ৭টি গল্পবই। ‘রাইরিন্তার শেষ উপহার’ গল্পগ্রন্থের জন্য পেয়েছেন এক্সিম ব্যাংক-অন্যদিন তরুণ কথাসাহিত্যিক পুরস্কার ২০২২। সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে তার উপন্যাস ‘নিখোঁজ মানুষের ছেলে।’ উপন্যাসটি নিয়ে তিনি কথা বলেছেন গল্পপাঠের সঙ্গে।

গল্পপাঠ
এবারের মেলায় প্রকাশিত হলো আপনার উপন্যাস ‘নিখোঁজ মানুষের ছেলে।’কী বিষয়ে এবং কোন পটভূমিতে উপন্যাসটি রচিত, একটু বিস্তারিত বলবেন।

মাহবুব ময়ূখ রিশাদ
 বিষয় এবং পটভুমি দুটোই আসলে খুব ব্যক্তিকেন্দ্রিক। আমি এমন একজন যুবকের গল্প বলতে চেয়েছি, ছোটবেলায় যার বাবা নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিলেন। গুম। অর্থাৎ গুম হওয়া একটা পরিবারের ছেলে, যেখানে তার মা ছাড়া আর কেউ নেই, সে কীভাবে বড় হলো, কী কী জটিলতা অতিক্রম করল জীবনে, এই যে বাবাকে হারানোর ট্রমা, তাকে শক্তিশালী করল, না ব্যর্থ বানালো, দুর্বল বানালো—এসবেরই এক মনস্তাত্বিক চিত্রায়ন। পটভুমিটা চাইলে আরও বিস্তারিত ধরতে পারতাম, কিন্তু আমি মূলত মূল প্রোটাগনিস্টের জীবনেই থাকতে চেয়েছি, তার চোখ দিয়ে সব দেখাতে চেয়েছি। হ্যাঁ, এই সব দেখাতে গিয়ে জুলাই আন্দোলন এসেছে, এসেছে তার পরবর্তী কিছু প্রেক্ষাপট। তবে এটা আন্দোলনের গল্প না। এটা ঐ একজন মানুষেরই গল্প।

গল্পপাঠ :
উপন্যাসটির ভাবনা কবে এবং কীভাবে মাথায় এসেছিল?

মাহবুব ময়ূখ রিশাদ
উপন্যাসটির ভাবনা আসলে এসেছিল অনেকদিন আগে। ঠিক কবে আমার মনে নেই। সম্ভবত সাত-আট বছর আগে। ব্যক্তিগত জীবনে আমি যেহেতু একজন চিকিৎসক, আমার প্রচুর সাধারণ মানুষের সঙ্গে মেশার সুযোগ হয়, কথা বলার সুযোগ হয়। একবার কোনো এক বন্ধের দিনে, ঈদের বন্ধের দিনে একটা ছেলেকে হাসপাতালে পেলাম, খুবই বিষন্ন মনে একা একা কাঁদছে। আমি তার কাছে গেলাম। কী হয়েছে, জানতে চাইলাম। বলল, মা খুব অসুস্থ, ইমার্জেন্সিতে আছে। আমি ইমার্জেন্সিতে গিয়ে দেখলাম মায়ের অবস্থা খুব ক্রিটিক্যাল। আইসিউতে নিতে হবে এমন অবস্থা। আমি বাইরে গিয়ে ছেলেটার কাছে জানতে চাইলাম, তার বাবা কোথায়? খুব স্পষ্ট এবং তারতম্যহীন স্বরে ছেলেটা বলল, আমার আব্বা অনেকদিন আগে গুম হইসেন। কই আছে জানি না। 

যা হোক, সে যাত্রায় কোনোভাবে মায়ের জীবন রক্ষা পেয়েছিল। কিন্তু এই যে ছেলেটা নির্লিপ্ত একটা স্বরে বলল, আব্বা গুম হইসেন, কই আছে জানি না। এটা আমার মাথার ভেতরে একটা আঘাত করল বলা যায়। আমি এরপর থেকে আরও বহু কিছু লিখেছি, কিন্তু এই গল্পটা আর লিখতে পারছিলাম না। অবশেষে লেখা হলো। কতটুকু, কী হলো, সেটা পাঠকের হাতে গেলে হয়তো বুঝতে পারব।

গল্পপাঠ
কতদিন লেগেছিল উপন্যাসটি লিখতে?

মাহবুব ময়ূখ রিশাদ
যেহেতু বেশ বড় কোনো উপন্যাস না, এমনকি চাইলে কেউ এটাকে নভেলাও বলতে পারেন, প্রথম ড্রাফট নামাতে সময় লেগেছে কেবল তিনদিন। গল্পটা দীর্ঘদিন মাথার ভেতরে থাকায় আমার লিখতে সমস্যা হয়নি। পরবর্তী সময়ে সম্পাদনাতেও আমি খুব বেশি একটা সময় নিইনি। কারণ, আমার কাছে মনে হয়েছিল, যা লিখেছি বেশ আঁটসাঁট মনে হয়েছিল এবং মনে হচ্ছিল বেশি কিছু করতে গেলে গল্পটা নষ্ট হয়ে যাবে।

গল্পপাঠ
আপনি উপন্যাসটি একটানা লিখেছেন, নাকি মাঝেমধ্যে বিরতি নিয়েছিলেন?

মাহবুব ময়ূখ রিশাদ
এই প্রশ্নের উত্তর আগের প্রশ্নেই দেওয়া হয়ে গেছে। হ্যাঁ, একবারেই লিখেছি। বিরতি বলতে খাওয়া-দাওয়া, ঘুমে যা বিরতি হয়। আমি ছুটি নিয়েছিলাম কাজ থেকে, বইটি একবারে মাথা থেকে নামানোর জন্য।

গল্পপাঠ
আপনি কি যে কোনো গল্প বা উপন্যাস একবারেই লেখেন, নাকি লেখার পর বার বার এডিট করেন?

মাহবুব ময়ূখ রিশাদ
সচরারচর আমি একবারেই লিখি। বিশেষ করে গল্পের বেলায়। কিন্তু কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে প্রথমে যে গল্পটা লিখে ফেলি, শেষে যখন বইয়ের জন্য জমা দিই, তখন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, শুরুতে যা লিখেছি, তার অনেকটুকুই আসলে বদলে গেছে। উপন্যাস আমি বেশি লিখিনি। একদম কৈশোরে লেখা দুটো আছে। ওগুলোকে আমি আসলে আমার লেখা বলে এখন মানতেই চাই না। পরবর্তীতে যে দুটো উপন্যাস লিখেছি, সেগুলো অবশ্য বেশ সময় নিয়ে লেখা এবং সম্পাদনাও সময় নিয়েই করা।

গল্পপাঠ
আপনার লেখার পদ্ধতি কী? কাগজ-কলমে লেখেন, নাকি কম্পিউটারে?

মাহবুব ময়ূখ রিশাদ
কাগজে কলমে লেখার অভ্যাস একসময় ছিল। সেটাও অনেককাল আগের কথা। এখন আসলে ল্যাপটপ ছাড়া লিখব, এই চিন্তাটাও অসম্ভব লাগে। তবে হ্যাঁ, কাগজে-কলমে অনেক সময় নোট নিয়ে থাকি। সেটার কাজও এখন মোবাইলে সেরে ফেলা যায়।

গল্পপাঠ
আপনি ছোটগল্পকারও। কোনটি লিখতে বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করেন, গল্প না উপন্যাস?

মাহবুব ময়ূখ রিশাদ
আমার মনে হয়, আমার আগের কথাগুলোতে অল্প করে হলেও এটা স্পষ্ট যে আমি আসলে উপন্যাস লিখতে স্বচ্ছন্দ বোধ করি না। বড় ক্যানভাসের, বড় আকারের উপন্যাস আমার এখনো লেখা হয়নি। তবে লিখব, এই বিশ্বাসটা অর্জন করতে চাইছি। আমি গল্প লিখতে স্বচ্ছন্দ বোধ করি। এটার কারণ হিসেবে বলতে গেলে, আমার মনে হয়, একটা কথাই বলব, শুধুমাত্র একটা মুহূর্তের অনুভূতি ধরে একটা গল্প লেখা সম্ভব। আমি ঐ মুহূর্তগুলো ধরতে বা ছোট কোনো চিন্তাকে ধরে নিয়ে গল্প লিখতে আরাম পাই।

গল্পপাঠ
আপনার গল্পের পাঠক বেশি, নাকি উপন্যাসের? আপনার কী মনে হয়?

মাহবুব ময়ূখ রিশাদ
আমার গল্পের বইয়ের সংখ্যা অনেক বেশি। আমাকে অনেকে গল্পকার হিসেবেই চেনে। তবে এক মেলায় আমার সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া বইটি একটি উপন্যাস। তাই গল্পের পাঠক বেশি, নাকি উপন্যাসের এটার উত্তর দেওয়া কঠিন। আমার ধারণা, আমার পাঠক সংখ্যা বেশ নির্দিষ্ট এবং তারা আমি যাই লিখি, সেটাই পড়তে পছন্দ করে।

গল্পপাঠ
গত বছরের বইমেলায় প্রকাশিত হয় আপনার উপন্যাস ‘সায়ানাইড ফুল।’ উপন্যাসটি সম্পর্কে কিছু বলুন।

মাহবুব ময়ূখ রিশাদ
‘সায়ানাইড ফুল’ একটা এক্সপেরিমেন্টাল কাজ ছিল। ইউথ্যানশিয়া বলে একটা টার্ম চিকিৎসা বিজ্ঞানে আছে। ধরুন, কেউ যদি অনিরাময়যোগ্য কোনো রোগে আক্রান্ত হয়, তবে সে চাইলে সরকারের কাছে আপিল করে নিজের জীবন শেষ করতে পারে মেডিকেশন দিয়ে। আমাদের দেশে এই নিয়ম চালু নেই। তো, এই থিমকে মাথায় রেখে, আমি অনেকটা ফ্যান্টাসির আশ্রয় নিয়ে উপন্যাসটি লিখেছিলাম। অনেকে পরে দেখলাম, উপন্যাসটিকে জাদুবাস্তব বলে লেভেল করেছেন, কিন্তু আমার মনে হয় জাদুবাস্তবতার চাইতেও ফ্যান্টাসির এলিমেন্ট উপন্যাসটিতে বেশি ছিল। পাঠক প্রতিক্রিয়া বেশ মিশ্র। কেউ বলেছেন, খুব ভালো। কেউ বলেছেন, কিছু হয় নি। মাঝামাঝি কিছু পাইনি।

গল্পপাঠ
পেশায় আপনি চিকিৎসক। ব্যস্ততম একটি পেশা। লেখার সময় বের করেন কীভাবে?

মাহবুব ময়ূখ রিশাদ
আমি মজা করে বলি, আমি শখের বশে চিকিৎসক আর পেশায় লেখক। যদিও বাস্তব আসলে তেমন নয়। হ্যাঁ, অনেকটা সময় পেশার পেছনে চলে যায়। এতে করে বেশি ক্ষতি হয় আমার পাঠের। আমি খেয়াল করছি, দিন দিন আমার পাঠের সংখ্যা কমে আসছে, যেটা থেকে আমি উত্তরণের জন্য চেষ্টা করছি। লেখার সময় এর ভেতরে বের করে ফেলা যায়। সকালে ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস আছে আমার। রাত একেবারেই জাগি না। মূলত সকালে মানে ভোরে লিখি।

গল্পপাঠ
কোনো কিছু লেখার আগে কি আপনি মাথায় পরিকল্পনা সাজান, নাকি নোট নেন? নাকি কোনো কিছুই না ভেবে লিখতে শুরু করেন?

মাহবুব ময়ূখ রিশাদ :
যে তিনটা কথা বললেন, গল্প সাধারণত এই তিনভাবেই লিখে থাকি। মানে একেক গল্প, একেক রকম। কোনো কিছুই না ভেবে লিখতে শুরু করলে যেটা হয়, সেই গল্পগুলো অধিকাংশ আর শেষ হয় না। তাই একদম না ভেবে আসলে খুব কম গল্পই লিখেছি আমি। যেগুলো ওভাবে লেখা, সেগুলো অধিকাংশ অসমাপ্ত অবস্থায় কাঁদছে, কিন্তু আমি তাদের দিকে আর তাকাতে পারছি না।

গল্পপাঠ
আপনার পেশাগত অভিজ্ঞতা কি আপনার লেখায় প্রবেশ করে? করলে কীভাবে করে?

মাহবুব ময়ূখ রিশাদ
আমি একটু আগেই আমার নিখোঁজ মানুষের ছেলে উপন্যাসের লেখার পেছনের গল্প শেয়ার করেছি। সেটা আমার চিকিৎসা জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া। আমার উপন্যাস সায়ানাইড ফুল, ঐ মেডিকেল সম্পর্কিত ইশ্যু নিয়েই লেখা। আমার একটা গল্পের বই আছে, তর্কশয্যায় মৃত্যু নামে। সেটা ছয়টি গল্পের একটি সংকলন। প্রতিটি গল্প একেকটি রোগ নিয়ে লেখা। সুতরাং, এটা স্পষ্ট যে আমার লেখার অনেক রসদ আমি আমার পেশা থেকেই পাই এবং মানুষের সঙ্গে আলাপ করতে করতে পাই।

গল্পপাঠ
সাম্প্রতিক-কালে পড়েছেন, এমন একটি উপন্যাসের কথা বলুন, যেটি আপনার মনে রেখাপাত করেছে।

মাহবুব ময়ূখ রিশাদ
কার্ট ভনেগাটের ব্রেকফাস্ট অফ চ্যাম্পিয়ন। পড়তে গিয়ে মনে হয় যেন ভাঙা আয়নায় নিজের সমাজকেই দেখছি। বিদ্রূপ, এবসার্ডিটির মিশ্রণে মানুষের বোকামি আর ভেতরের শূন্যতাকে এমনভাবে তুলে ধরেছেন, যা একই সঙ্গে হাসায় ও অস্বস্তিতে ফেলে।

গল্পপাঠ
এখন কী লিখছেন? ভবিষ্যতে কী লেখার ইচ্ছে?

মাহবুব ময়ূখ রিশাদ :
ভবিষ্যত শব্দটা শুনলে আমার অনেক দূরবর্তী ব্যাপার মনে হয়। ভবিষ্যতে আমার স্বপ্ন, আমি এমন একটা কিছু লিখব এবং সেটা অবশ্যই বড় ক্যানভাসের কোনো একটা উপন্যাস, যে একটা উপন্যাস লেখার জন্য আসলে প্রতিটি লেখক অপেক্ষা করে থাকে।

সাক্ষাৎকার গ্রহণের কাল : মার্চ, ২০২৬

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ