ঘোড়াটা দৌড়ে আমাদের নিয়ে চলেছে বাজারের দিকে। আমাদের মানে আমাকে আর বাবাকে। যে গ্রাম থেকে আমরা বেরিয়ে আসছি, সেখানে গত সপ্তাহে ভূমিকম্প হয়। গ্রামটায় আমার কাকার পরিবারও থাকত। কাকা, কাকিমা আর ওদের দুই ছেলে। বড় ছেলেটার বয়স নাকি দশ। আমারও তাই।
বাবার সঙ্গে কাকার দীর্ঘকাল বনিবনা নেই। তাই ভূমিকম্প হওয়ার খবরটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে বাবা কাকাদের দেখতে যায়নি। আমরা থাকি পনেরো মাইল দূরে অন্য একটা গ্রামে। খবরটা বাবা পায় পরদিন ভোরে, একটা লোকের মুখ থেকে। ভূমিকম্পে ওর বাড়িটাও ধূলোয় মিশে গিয়েছে। কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে সে প্রাণে বেঁচে গিয়েছে। কারণ লোকটা জানাল যে বড় ভূমিকম্পটা হওয়ার অনেক 'আগেই ওর ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। তখন মাঝরাত। বিছানা থেকে নেমে সে (লোকটা একাই থাকত নিজের বাড়িতে) বাইরে বেরিয়ে আসে, তারপর রাস্তায় দাঁড়িয়ে বাড়িটার দিকে তাকিয়ে থাকে। বাবাকে সে জানায় সে মুহূর্তে ওর শুধু মনে হচ্ছিল সমস্ত চরাচর জুড়ে এবং হয়ত সমস্ত জগৎ জুড়ে একটা ভয়ঙ্কর কিছু ঘটতে চলেছে, কিন্তু সেটা যে কী স্পষ্ট করে বুঝে উঠতে পারছিল না। আকাশে চাঁদ জ্বলছিল। থমথমে, স্থির। সমস্ত পাড়াটা ফাঁকা। সবাই ঘুমোচ্ছে। এমনকি, কুকুর বা পাখির ডাকের কোনও শব্দও কোথাও ছিল না। কিছুক্ষণ বাইরে দাঁড়িয়ে থাকার পর লোকটার নিজেকে নাকি কেমন অশরীরী বলে মনে হতে থাকে। ভয় পেয়ে সে আবার বাড়ির ভেতর ঢুকবে বলে ভাবছে, ঠিক সেই মুহুর্তে ভূমিকম্প। দুলতে দুলতে ওর বাড়িটা মড়মড় করে নিজেরই ভেতর ভেঙে পড়ল। যেন কোনও বিশালাকার দৈত্য বড় বড় হাড়গোড় দাঁতে চিবিয়ে টুকরো টুকরো করে দিচ্ছে। এরপর বাড়ির পর বাড়ি ধসে পড়তে লাগল। চারপাশে মানুষের আর্তনাদ, চিৎকার ।
বাবা তন্ময় হয়ে লোকটার মুখ থেকে ভূমিকম্পের বিবরণ শুনছিল। কিন্তু কাকার কথা জিজ্ঞেস করেনি। মাও জিজ্ঞেস করেনি। লোকটা মনে হয় তাতে একটু অবাক হল। বলল, ওখানে আপনার ভাই থাকে না?
হ্যাঁ। বাবা বলল। ওদের কী খবর?
আমি তো সঙ্গে সঙ্গে পালিয়ে এসেছি। কারও খবর জানি না ।
সেদিন দুপুরের খাবার খেতে খেতে বাবা মাকে বলল, ওরা নিশ্চয়ই ভাল আছে। নইলে খবর আসত।
ছ-দিন ধরে কোনও খবর আসেনি। সপ্তম দিনে মা বলল বাবার একবার যাওয়া উচিত। গিয়ে কাকাদের সঙ্গে দেখা করা উচিত।
এমনিতে মায়ের কোনও পরামর্শ বাবা সহজে নেয় না। মা বাবাকে ভয় পায় । কিন্তু সেদিন কেন জানি না বাবা রাজি হয়ে গেল। অন্য একটা কারণে অবশ্য একটু দ্বিধা এসেছিল বাবার মনে। ওই গ্রামে প্রচুর নীচ জাতির বাস। ওখানে ঢুকলেই নাকি বাতাসে ভেসে ভেসে নানারকম পচা গন্ধ নাকে আসে। বাবা জানাল ভদ্র মানুষ তো দূরের কথা, ওই গ্রামে কোনও পরিচ্ছন্ন ও আত্মমর্যাদাপূর্ণ পশুকেও সহজে দেখতে পাওয়া যায় না। বাবার মতে ওখানে ধবধবে সাদা বেড়াল বা খুব উজ্জ্বল সবুজ টিয়াপাখি কেউ কখনও দেখেনি।
ঘোড়ায় চেপে ভোরের দিকে আমি ও বাবা রওনা দিলাম। আমাকে যে কেন সঙ্গে নিল বুঝিনি, কারণ বাবা আমাকে কোথাও নিয়ে যায় না। ভোরবেলাটা আমার খুব ভাল লাগে। তখন কোন মাস চলছে, আমি মনে মনে বুঝতে চেষ্টা করলাম। কিন্তু বুঝতে পারলাম না। চারপাশে নীল আকাশ, আর নরম রোদ, যার স্পর্শে শিশিরগুলো আস্তে আস্তে শুকিয়ে যাচ্ছিল। মাঝেমাঝে কালো পাকা রাস্তা, মাঝেমাঝে কাঁচা, কখনও মাঠ। আমাদের ঘোড়া ধীরেসুস্থে এগিয়ে যাচ্ছে। বাবার পিঠে গাল ঠেকিয়ে আমি পেছনে সরতে থাকা দৃশ্যগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকলাম। আমার খুব ভাল লাগছিল। শুধু মনে হচ্ছিল এত বড় আকাশটা আমার বাড়ি, বড় বড় মাঠগুলোও আমার বাড়ি, ওই শিশিরের ফোঁটা, রোদ, ঝিরঝির করে উড়তে থাকা বাতাস এরা সবাই আমার কেউ না কেউ। মনে পড়ে সেদিন ওরকম ভাবতে আমার খুব ভাল লাগছিল। আর সুখবোধে কেমন চাপা কান্না পাচ্ছিল।
গ্রামটার কাছাকাছি আসতেই বাবা পকেট থেকে রুমাল বার করে নাকের ওপর বেঁধে নিল। আর একটা ছোট রুমাল বার করে আমার নাকে বেঁধে দিল । আমার রুমালটা মায়ের। এর আগে আমি কখনও ওভাবে রুমাল বাঁধিনি । নিজেকে অদ্ভুত লাগছিল। নিশ্বাস নিতে অসুবিধে হচ্ছিল না, শুধু ইচ্ছে করেই জোরে জোরে বাতাস টানছিলাম। হয়ত নাকে একটা রুমাল বাঁধা আছে সে সম্পর্কে খুব সচেতন হয়ে পড়েছিলাম বলেই।
গ্রামে ঢুকতে দুপাশে চোখে পড়ল অজস্র ভাঙা বাড়ি। আমাদের ঘোড়াটার কাছেও হয়ত দৃশ্যটা একটু অদ্ভুত মনে হচ্ছে। সে হাঁটতে হাঁটতে মুখ নিচু বা সোজা না রেখে মাঝেমাঝে দুপাশে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখার চেষ্টা করছে। তখন দুপুর হয়ে গিয়েছে। কোথাও মানুষ চোখে পড়ছিল না। বেশ কিছু বাড়ি ভাঙেনি। কিন্তু ওদের আশপাশেও লোকজনের চিহ্ন নেই। হয়ত ভেতৱে আছে, আমি ভাবলাম। হয়ত ঘুমোচ্ছে।
আরও কিছুটা এগিয়ে যাবার পর আমরা দেখি রাস্তার ওপর একটা প্রকাণ্ড বাড়ি ভেঙে পড়ে রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছে। ওটার ওপর দিয়ে যাওয়ার উপায় নেই। ঘোড়াটা থেমে পড়ল। বাবা নামল। তারপর আমাকেও নামাল।
আমরা কিছুক্ষণ ওখানে দাঁড়িয়ে থাকলাম। দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে বাবার রুমাল বাঁধা মুখের দিকে তাকিয়ে আচমকা আমার বুক কেমন কেঁপে উঠল ! বাবাকে হঠাৎ কোনও অচেনা অথচ ভয়ঙ্কর লোক বলে মনে হচ্ছিল। আকাশে চিল ও শকুনেরা উড়ছে।
খাবি? খিদে পেয়েছে? বাবা জিজ্ঞেস করে।
আমি ঘাড় নেড়ে জানালাম যে খাব।
পোঁটলা খুলে বাবা খাবারদাবার বার করল। একটা খবরের কাগজ ছিঁড়ে দু- টুকরো করে একটা আমাকে দিল, একটা নিজে নিল। আমরা যখন খাচ্ছি, তখন হঠাৎ কোথা থেকে একটা ছেলে এসে দাঁড়ায়। গ্রামটায় এসে এই প্রথম একটা মানুষ দেখলাম আমরা। ছেলেটার পেছন পেছন এল একটা বয়স্ক লোক। তারপর আরও কয়েকটা বাচ্চা ছেলেমেয়ে।
বাবার মুখ খুব গম্ভীর হয়ে গেল, কারণ খাওয়ার সময় অপরিচিত কারও দৃষ্টিপাতকে বাবা ভয় পায়। পরে নাকি শরীর খারাপ করে। তাই আমাদের বাড়িতে কেউ খেতে বসলে রান্নাঘরের জানলা ও দরজা ভেজিয়ে দেওয়া হয় এবং আবছা অন্ধকারে বসেই আমরা খাই ।
বয়স্ক লোকটা একটু পরে চলে গেল। ওর চলে যাওয়া দেখে আমার মনে হল খাবারের লোভে সে দাঁড়ায়নি। অপরিচিতদের দেখে কৌতূহলবশত দাঁড়িয়েছিল। তারপর আস্তে আস্তে চলে গেল বাচ্চা ছেলেমেয়েরাও। শুধু প্রথম ছেলেটা দাঁড়িয়ে থাকল। খেতে খেতে বাবা ওর দিকে আড়চোখে তাকাচ্ছে কিন্তু বাবার মুখ দেখে আমার স্পষ্ট মনে হচ্ছিল বাবা খেতে পারছে না। চোখের ইশারায় একবার আমাকে বোঝাল ছেলেটার দিকে না তাকাতে।
এই, এই নে! নিয়ে এখান থেকে চলে যা। ওই দূরে বসে খা। বাবা ছেলেটাকে ডেকে একটা রুটি দিয়ে বলল। রুটি নিয়ে ছেলেটা চলে গেল ।
খাওয়া শেষ হওয়ার পর বাবা নাকের ওপর রুমালটা আবার বেঁধে নিল। বাবাকে আবার অদ্ভুত দেখাতে লাগল। রুমালটা বেঁধে নিতে বলল আমাকেও। আমি তখনও পর্যন্ত কোথাও গন্ধ পাইনি। তবে চারপাশে বাড়ির ভগ্নস্তূপ ও নির্জনতা মাথার ভেতর কেমন ঝিমঝিম ভাব সৃষ্টি করছিল, যেমন হয় অনেকক্ষণ একটানা ঝিঁঝির ডাক শুনলে। বা কোনও বড় ফাঁকা মাঠের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকলে।
জল খাবি? চ, কাকার বাড়ি গিয়ে খাবি। বাবা বলল।
রাস্তা বন্ধ বলে ঘোড়াটা আর এগিয়ে যেতে পারে না। বাবা দাঁড়িয়ে চিন্তা করতে লাগল, তারপর ঘোষণা করল, চল, অন্য রাস্তা দিয়ে ঘুরে যাব। একটু পরে আবার বলল, আচ্ছা, তুই ঘোড়াটাকে ধরে এখানে দাঁড়া, আমি ওপাশটায় গিয়ে দেখে আসি। এক্ষুনি আসছি। ভয় পাসনি আবার ।
ভগ্নস্তূপ ও নির্জনতার ভেতর ঘোড়াটাকে ধরে একা দাঁড়িয়ে থাকতে আমি কোনও ভয় পাচ্ছিলাম না। শুধু ভাঙা বাড়ির উঁচু ঢিবির ওপর পা ফেলে ওপারে যাওয়ার জন্য বাবা যখন উঠে দাঁড়াল, তখন বাবার রুমাল বাঁধা মুখটা দেখে হঠাৎ একটু ভয় হয়েছিল। ঢিবি থেকে নেমে বাবা অদৃশ্য হয়ে গেল। যে বাড়িটা ভেঙে পড়ে রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছে সেটা বেশ বড়ই ছিল বোঝা যায়। বড় বড় ইট। থামের ভগ্নাংশ। কড়িকাঠ। একটা জানলা, যার শিকগুলো বেঁকে গিয়েছে। একটা ভাঙা আয়না, রোদ লাগার ফলে যা জ্বলছিল। এবং প্রতিফলিত আলোর একটা টুকরো কাঁপছিল পড়ে থাকা পলেস্তরার সাদা চাঁইয়ের গায়ে। ভূমিকম্প মনে হয় রঙকেও ভেঙে চুরমার করে দেয়, সব রঙকে করে দেয় ধূসর। ভগ্নস্তূপটার সব কিছুই ধূসর লাগছিল। তবু ওই ধূসরতার ভেতর এক জায়গায় হঠাৎ একটু লাল রঙের আভাস পেলাম। একটু কাছে গিয়ে দেখি বড় বড় ভারি চাঁইয়ের তলায় চাপা পড়ে আছে লাল রঙের একটা চাদর। ওটা চাদরই হবে। ওটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আমার চোখে জল আসতে চাইল। আমার শুধু মনে হচ্ছিল ওকে উদ্ধার করার জন্য ওটা চারপাশের জগতের কাছে নিঃশব্দে আর্তনাদ করে চলেছে।
ফিরে এসে বাবা বলল, নাঃ, ওদিকে যাওয়া যাবে না। জিজ্ঞেস করার মতোও কাউকে পেলাম না। আমার যতদূর মনে পড়ছে তোর কাকার বাড়ি যাওয়ার পথে একটা বড় আমবাগান আসে। এটা ডানহাতে। তারপর একটা পুকুর।
ঘোড়ায় চেপে যেতে যেতে বলল, একবারই এসেছিলাম। সেই চোদ্দ বছর আগে। ভুলে গেছি। কেন যে এই ছোটলোকদের পাড়া সে বেছে নিয়েছিল। মর এবার। আমি আর কী করতে পারি। বাবা বিড়বিড় করে বকে চলল। আমাদের ঘোড়া একটা মাঠ পার করল। তারপর উঁচুনিচু কয়েকটা টিবি পার হওয়ার পর আবার একটা রাস্তা ধরল। দূরে একটা বাড়ি দেখা যাচ্ছিল। এদিকে হয়ত ভূমিকম্পের স্রোত আছড়ায়নি।
কেমন বিশ্রী গন্ধ পাচ্ছিস না?
রুমাল দুজনের নাকেই বাঁধা আছে। আমি জোরে জোরে বাতাস টানলাম কিন্তু কোনও গন্ধ নাকে এল না। ওই বাড়িটার কাছে এসে বাবা ঘোড়াকে দাঁড় করাল! বাড়িটার একপাশে বেড়া দেওয়া বাগানে একটা বুড়ো কোদাল দিয়ে মাটি কোপাচ্ছিল। লোকটার অনেক বয়স। চিবুকের কাছে কাঁচাপাকা দাড়ি, গায়ের চামড়া ঢিলে হয়ে গিয়ে থলথল করছে, ঠোঁটে ক্লান্ত কাকের মতো ফাঁক ।
মুখ থেকে রুমাল না সরিয়েই বাবা বলল, শিবেন মজুমদারের বাড়িটা কোথায়?
লোকটা কুঁজো হয়ে দাঁড়িয়ে বাবার মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে তারপর আমার মুখের দিকে। ওর মুখে ক্লান্তি ও বিস্ময়।
কোন শিবেন? খনখনে গলায় সে জিজ্ঞেস করল।
দোতলা বাড়ি ওর। লম্বা। বাঁ গালে কাটা দাগ। বাবা বিবরণ দিল।
আমি কাকাকে কখনও দেখিনি। বাবার সঙ্গে ঝগড়া হওয়ার পর কাকাও কখনও আমাদের বাড়ি আসেনি। তবে শুনেছি কাকার দুই ছেলে, একজনের বয়স আমার সমান।
বাজারে বড় মিষ্টির দোকান আছে। কাকা সম্পর্কে বাবা আরও একটা তথ্য দিল।
কিছুক্ষণ ভাবার পর বুড়োটার মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে হঠাৎ, তারপর একমুখ হেসে বলে, এইবার বুঝেছি! শিবুর বাড়ি তো? ওর ছোট ছেলে তো গত বছর অসুখে মারা গেল। ভূমিকম্পে ওর বাড়ির পেছনটাও ভেঙেছে। সামনের ভাগটা দাঁড়িয়ে আছে, শুধু পেছনটা। তা ওর বাড়ি তো এখান থেকে এক ক্রোশের মতো হবে। এই রাস্তা দিয়ে চলে যান। তারপর বাঁদিকে মুড়ে মুচিপাড়ার ভেতর দিয়ে গেলে একটা তেঁতুলগাছ পড়বে। ওই গাছ থেকে শিবুর বাড়ি দেখা যায়। ওখানে কাউকে জিজ্ঞেস করলেই বলে দেবে। শিবুকে সবাই চেনে গো!
বুড়োর চোখেমুখে খুব আন্তরিক হাসি। আমাদের ঘোড়া আবার হাঁটা শুরু করে। কাকার ছোট ছেলে মারা গিয়েছে। আমার সমান বয়স ছোট ছেলের না বড় ছেলের আমার ঠিক মনে পড়ল না। বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম না, কারণ এ ধরণের জটিল প্রশ্ন বাবাকে কখনও করিনি। বাবার সঙ্গে আমার সেরকম সহজ সম্পর্কও নয়। মা থাকলে জিজ্ঞেস করা যেত। ততক্ষণে আমার তীব্র জলতেষ্টা পেয়েছে। খাবারগুলো মনে হয় বুকেই আটকে আছে, বুকের ভেতর কেমন জ্বালা করছে। বুড়ো লোকটার কাছে জল চাওয়া যেত, কিন্তু আমি নিশ্চিত জানি বাবা ওর হাতের জল খেতে দিত না।
কিছুক্ষণ যাওয়ার পর বাঁদিকে একটা রাস্তা এল। বাবা ঘোড়াকে ওই রাস্তায় ঘুরিয়ে দিল। রাস্তাটা দিয়ে আমরা অনেকক্ষণ এগিয়ে গেলাম কিন্তু কোনও তেঁতুলগাছ চোখে পড়ল না। বাবা বুড়োটাকে বিড়বিড় করে গালাগাল দিল, তারপর গালাগাল দিল কাকাকে। বাবাকে খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছিল, ক্লান্ত ঘোড়াটাও। ওটাকে ঘাস খাওয়ার সুযোগ দিয়ে এবং আমরা একটু জিরোব বলে বাবা আমাকে নামিয়ে একটা গাছের নিচে এল। নিচে ছায়া। কিছুক্ষণ বসার পর আবার চলা শুরু করলাম। কিছুটা যাওয়ার পর একটা বাগান ও পুকুর চোখে পড়ায় বাবা ঘোড়াকে দাঁড় করাল। কিন্তু কোথাও কোনও তেঁতুলগাছ বা বাড়ি নেই । আরও খানিকটা যাবার পর উঠোনঅলা একটা মাটির বাড়ি চোখে পড়ে। বাড়িটার সামনে দাওয়ায় বসে আছে অনেক লোকজন। ঘোড়াটা যেন আপনিই ওদের দিকে এগিয়ে গেল।
এদিকে শিবেন মজুমদারের বাড়িটা কোথায়? বাবা চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করে ওদের।
লোকগুলো গল্প করছিল। বাচ্চাদের চেঁচামেচি, হইচই। সবাই চুপ করে গেল । দাওয়া থেকে নেমে এসে এক যুবক বলল, কার বাড়ি?
শিবেন মজুমদার। শিবু।
ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা অবাক হয়ে আমাদের মুখের দিকে তাকিয়ে। আমার খুব ইচ্ছে করছিল রুমালটা নামিয়ে দিতে কিন্তু বাবার বকুনির ভয়ে সাহস পেলাম না। হঠাৎ ঘোড়া থেকে নেমে পড়ল বাবা, তারপর দাওয়ার কাছে গিয়ে সবাইকে ভাল করে কাকার বাড়িটা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতে লাগল। আমি ঘোড়ার ওপর।
ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের কিছু বাবার পেছনে পেছনে চলে গেল আর কিছু তাকিয়ে থাকল আমার দিকে।
বসুন না! আসুন আসুন! একটা লোককে দেখলাম টুল এগিয়ে দিয়ে বাবাকে বলছে।
বাবা সেদিকে কান না দিয়ে বলল, তাহলে বলছেন আমি ভুল রাস্তায় চলে এসেছি?
হ্যাঁ। আপনি যেদিক দিয়ে এসেছেন সেদিকেই আবার ফিরে যান। বড় রাস্তায় পড়ার পর আরও খানিকটা সোজা গেলে বাঁ-হাতে যে রাস্তাটা পড়বে সেটা দিয়ে যাবেন। কিছু দূর এগোলে একটা বড় তেঁতুলগাছ। ওটার কাছেই শিবুবাবুর বাড়ি।
অবশ্য এই মাঠটা দিয়েও যাওয়া যায়, একজন প্রৌঢ় এগিয়ে এসে বলে । এদিক দিয়েই সোজা যান, অত ঘুরবেন কেন? এই মাধব, তুই সঙ্গে যা তো, একটু এগিয়ে দে।
বাবা জানাল এগিয়ে দিতে হবে না, নিজেই যেতে পারবে।
একটু জিরিয়ে গেলে হত না? প্রৌঢ় লোকটা বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে বলল। রোদে ঘুরেঘুরে আপনার ছেলেটার মুখ লাল হয়ে গেছে। খানিক বসে যান। একটু জল এনে দেব।
জলের কথা শুনে আমার বুকের ভেতর চাতকের মতো কেঁপে উঠল। একটু জল না খেলে আমি বুঝি অজ্ঞান হয়ে যাব ।
বাবা বলল, না না, কিছু লাগবে না। একটু আগে খেয়েছি। এরপর হয়ত প্রসঙ্গ পালটাবার জন্যই বলল, এদিকে খুব জরুর ভূমিকম্প হয়েছে, না?
হ্যাঁ। প্রৌঢ়টা বলল। বাইশজন মারা গেছে। তিরিশজন জখম। আর বাড়ি ভেঙেছে তেরোটা। শিবুর বাড়ির পেছনটাও ভেঙে পড়েছে। শিবুর কিছু হয়নি, তবে ওর বউ মাথায় আঘাত পেয়েছে। বেশি না, সামান্য। যাদের বাড়িঘর একেবারে ভেঙে গেছে তারা তো কেউ এখানে নেই। রিলিফ পেতে বাজারে গেছে।
মাঠের ওপর দিয়ে আমাদের ঘোড়াটা আবার হাঁটা শুরু করল। বাবার মনে হল এদিক দিয়ে গেলেই বরং কম সময় লাগবে।
কীরে? জলতেষ্টা পেয়েছে? বাবা জিজ্ঞেস করল। এই তো চলে এসেছি। কাকার বাড়ি গিয়ে জল খাবি। এদের হাতে জল খেতে নেই। পাপ হয় । তাছাড়া, চারপাশে পচা দুর্গন্ধ। রুমালটা ঠিক আছে? আরও শক্ত করে বেঁধে দেব?
আমি কোনও কথার উত্তর না দেওয়ায় বাবা বিরক্ত হয়ে উঠে বলল, ঘুমিয়ে পড়িসনি তো? চোখ খুলে রাখ, চোখ খুলে রাখ। ঘুমিয়ে পড়িস না। যত সব ! তোর মা-ই বলল তোকেও নিয়ে আসতে। বলল, কাকাকে কখনও দেখেনি, কাকার ছেলেদের কখনও দেখেনি। যত সব।
সূর্যের আলো নিভে আসছিল। একটু পরেই বিকেল হবে। নীল আকাশে অনেক উঁচুতে একটা চিল ভেসে বেড়াচ্ছে। ঘোড়ায় যেতে যেতে আমি ফাঁকা আকাশের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকলাম, এবং তাকিয়ে থাকতে থাকতে আমার মনে হল, আকাশও আমার দিকে তাকিয়ে আছে। খুব প্রসন্ন মনে। ঘোড়াটা খুরে চাপা শব্দ তুলে মাঠের ওপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল এবং অনেকক্ষণ যাওয়ার পরও মাঠটা ফুরোল না। বাবা একদম চুপ। মুখ না দেখেও বুঝতে পারছিলাম বাবা খুব বিরক্ত হয়ে আছে। এক সময় মাঠটা শেষ হল। ছোট হতে হতে একটা রাস্তায় গিয়ে মিশে গেল। রাস্তার দুপাশে দূরে দূরে খড়ের বাড়ি, কলা ও বাঁশের ঝাড়। দূর থেকে একটা প্রকাণ্ড গাছের মাথা দেখা যাচ্ছিল। ভাবলাম ওটাই হয়ত তেঁতুলগাছটা, যার কাছে কাকার বাড়ি। কাকার একটা ছেলে মারা গিয়েছে, অথচ আমরা কেউই জানতাম না। আমার সমান বয়স কোন ছেলেটার? বড়টার, না ছোটটার? হাঁটতে হাঁটতে ঘোড়াটা যখন গাছটার নিচে এসে দাঁড়াল, আমরা দেখি ওটা তেঁতুলগাছ নয়, বেলগাছ !
বাবা বিরক্ত মুখে কয়েক মুহূর্ত থামল গাছটার নিচে, হয়ত কাউকে খুঁজছিল জিজ্ঞেস করার জন্য। আমার শুধু মনে হচ্ছিল আমাদের আরও খানিকটা এগিয়ে যাওয়া উচিত। সবাই যখন বলছে, তেঁতুলগাছটা পাবই।
হঠাৎ ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে দেয় বাবা, তারপর জোরে একটা চাবুকের বাড়ি মেরে ছুটতে বলে। বুঝলাম ফিরে যাচ্ছে। যেতে যেতে একজন লোক সামনে পড়ল। কিন্তু বাবা ওকে কিছু জিজ্ঞেস করল না।
ঘোড়া ছুটছে। আমার মনে হল ফেরার রাস্তা বাবা জানে, তাই কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করছে না। রাস্তায় মৃদু মৃদু ধুলো উড়ছে। এক সময় রাস্তা ছেড়ে ঘোড়াটা একটা মাঠ ধরল। এই মাঠ একটু আগে পার হয়ে আসা বড় মাঠটা নয়, অন্য একটা মাঠ। মাঠটা বেশ এবড়োথেবড়ো, জায়গায় জায়গায় ছোট ছোট ডোবা। ঘোড়াটা গতি কমালেই বাবা চাবুক মেরে ছোটাচ্ছে। সূর্য ডুবে গিয়েছে। বিকেল গাঢ় হয়ে এল ।
হঠাৎ নাকের পাশে ভেসে আসে তীব্র দুর্গন্ধ। ঘোড়াটা তখন ছুটছে ঘাসের উঁচুনিচু ঢিবির ওপর দিয়ে, যাদের ভেতর মাঝেমাঝে গর্ত, চারপাশ নির্জন। এক জায়গায় দুটো ঢিবির মাঝখানে এসে হঠাৎ ঘোড়াটা থামিয়ে দিল বাবা। এবং আমাদের সামনে দেখি একটা মরা মানুষ হাঁ করে পড়ে আছে। একটা চোখে মণি নেই, শুধু গর্ত। দাঁতগুলো খুব বড় বড়। ওকে ঘিরে কালো মেঘের মতো জমাট মাছিরা ভনভন করছে। কিন্তু কোনও শকুন বা শেয়াল না দেখে আমি একটু অবাক হয়ে গেলাম। ওরা হয়ত এখনও দেখতে পায়নি। মুখে কয়েকটা অদ্ভুত শব্দ তুলে বাবা ঘোড়াটাকে ছুটিয়ে দিল। উঁচুনিচু টিবির ওপর দিয়ে ঘোড়াটা এবার আরও জোরে ছুটতে লাগল। দু-একবার ওর মুখ থুবড়ে পড়ে যাওয়ার মতো অবস্থা হল। বাবা আমাকে চেঁচিয়ে বলল নাকের রুমালটা আরও ভাল করে বেঁধে নিতে।
আজ কেন যে মরতে এলাম এখানে। খুব রাগের সঙ্গে বাবা বলল। তারপর আমাকে খেঁকিয়ে জিজ্ঞেস করল, কীরে হারামজাদা? কিছু বলছিস না যে? নাকে রুমালটা ঠিকমতো বাঁধা আছে তো?
হ্যাঁ। আমি বললাম।
আমার উত্তরটা যেন বাতাসের ধাক্কা খেয়ে সঙ্গে সঙ্গে নিভে গেল, বাবার কানে ওটা হয়ত পৌঁছল না। ভয় হতে লাগল, কারণ বাবা ভাবতে পারে আমি কথার উত্তর দিইনি। কিন্তু বাবা আর জিজ্ঞেস করছে না বলে ভাবলাম উত্তরটা হয়ত শুনতে পেয়েছে।
ঘোড়া ছুটছে। আমার পেট ও কোমরে খুব কষ্ট হচ্ছিল। সেইসঙ্গে সারাদিন জলের অভাবে বুকের মধ্যে খাবারগুলো আটকে থাকার জ্বালা তো ছিলই। আমার হঠাৎ মনে হল রুমালটা আমার নাক দিয়ে নেমে আসছে। তাড়াতাড়ি বাবার কোমর থেকে হাত সরিয়ে রুমালটা তুলে দিতে লাগলাম। ঘোড়াটা হয়ত সেই সময় ছুটতে ছুটতে একটু উঁচুর দিকে উঠছিল। ফলে আমি টাল সামলাতে পারিনি। ঘোড়ার পিঠ থেকে নিচে পড়ে গেলাম।
বাবা জানতেই পারল না আমি পড়ে গিয়েছি। বাবাকে নিয়ে ঘোড়াটা সামনের দিকে ছুটতে লাগল। আমি চিৎকার করে ডাকতে পারতাম কিন্তু মুখ দিয়ে কোনও শব্দ তুলতে আমার হয়ত ইচ্ছে করছিল না। উঠে দাঁড়িয়ে চুপ করে গোধুলি প্রাস্তরের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। রুমালটা খুলে যাওয়ার ফলে নাকে ওই শবদেহ থেকে ভেসে ভেসে গন্ধ ঢুকছিল। আমার খারাপ লাগছিল না। মনে হচ্ছিল গন্ধটা যেন কোনও খোঁড়া মানুষের মতো ল্যাঙড়াতে ল্যাঙড়াতে, হাঁপাতে হাঁপাতে এসে আমাকে কিছু বলতে চায়। চারপাশে অন্ধকার নামছে। এই অন্ধকারকে আমার বাড়ি বলে মনে হচ্ছিল। এই মাঠটাকে আমার বাড়ি বলে মনে হচ্ছিল। ঝিরঝির করে উড়তে থাকা বাতাস, মুখ হাঁ করা শবদেহটা, ক্ষুধার্ত মাছিগুলো এরা সবাই যেন আমার কেউ না কেউ। ইটের নিচে চাপা পড়া লাল চাদরটার কথা আমার মনে পড়তে লাগল। তারপর মনে পড়তে লাগল বাবা আজ ওদের কারও হাত থেকে এক গেলাস জলও খেল না। আমার চোখ দিয়ে জল গড়াচ্ছিল।
খানিক পর দেখি আমাকে খুঁজতে খুঁজতে বাবা আসছে। আমার নাম ধরে ডাকছে। আমার কাছে এসে ধমক দিয়ে জানতে চাইল পড়ে যাওয়ার পরও আমি চেঁচাইনি কেন। আমাকে সান্ত্বনা দিল। তারপর রুমালটাকে আমার নাকে খুব ভাল করে বেঁধে দিয়ে আবার ঘোড়া ছোটাল। ·

1 মন্তব্যসমূহ
অন্যধারার একটা গল্প! অসম্ভব ভালো গল্প!
উত্তরমুছুন