১. লাজার ফ্রিডমান
দিন আর রাত্রি, আমাদের শ্বাস, শরীরের ঘাম আর বর্জ্য, আমাদের সমস্ত স্মৃতি ও নিরাশা এক হয়ে, একটা অভেদ্য লোহার পিণ্ড হয়ে আমাদেরকে পিষে ফেলতে থাকে। ধাতব পাত আর লম্বা কাঠের তক্তার মধ্যে দিয়ে এক ইঞ্চি ফাঁক—তার বাইরে একটা পৃথিবী আছে যেখানে মনে হয় অক্সিজেন আছে, আছে গাছের পাতায় ক্লোরোফিল, হয়তো এমন মানুষও আছে যারা অন্যের ব্যথায় কাঁদে। কিন্তু এই মালগাড়ির ভেত্ররে এখন আর কেউ কাঁদে না—কাঁদতে হলে শক্তি লাগে। আর কিছু মানুষ যারা কখনই কাঁদবে না তাদের দেহগুলি আমাদের পা বাঁচিয়ে বদ্ধ কামরার এক কোনে স্তূপ করে রাখা হয়েছে।
বুখেনভাল্ড ক্যাম্পে ছিলাম, সেখান থেকে টেনে হিঁচড়ে ওরা আমাদের এই ট্রেনে উঠিয়েছিল, এক কামরায় সত্তরজন। রক্ষীদের চোখে ছিল আতঙ্ক, অনুমান করলাম ওদের সাম্রাজ্য ভেঙে পড়ছে, অনুমান করলাম পুব থেকে আসছে সোভিয়েত লাল ফৌজ, পশ্চিম থেকে মার্কিন আর ব্রিটিশ সেনারা।
প্রথম দিন আলো ছিল। বাইরের আকাশে মেঘ ছিল না, তক্তার ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছিল শীত শেষ হয়েছে, গাছে নতুন কুঁড়ি, ছোটো পাহাড়ে সবুজের আভা। মরিৎস জিজ্ঞেস করছিল, “আমরা কোথায় যাচ্ছি?” কেউ জানত না। কিন্তু সবাই আশা করেছিল—বুখেনভাল্ডের চেয়ে খারাপ হবে না।
প্রথম দিন মনে হয়েছিল হয়তো বাঁচব। প্রথম দিন কিছু খাবার দিয়েছিল, দ্বিতীয় দিনও, তারপর সেটা কমতে কমতে বন্ধ হয়ে গেল। এতোগুলো মানুষ—শুধু দাঁড়ানোর জায়গা ছিল, তারপর আর দাঁড়ানোর শক্তি ছিল না। বেশিরভাগ সময়ই ট্রেন কোথাও না কোথাও ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকত, অসহনীয় সময়ের লোহার পিণ্ডটা সমস্ত মাংসপেশীকে অবশ করে দিয়ে আমাদেরকে একে অপরের ওপর ফেলে দিত। এরপর হয়তো দরজা খুলত—মৃতদেহ ফেলার জন্য। আমরা চিৎকার করতাম : “জল দাও! জল!” এসএস গার্ড হাসত, দরজা বন্ধ করে দিত। প্রথম দিন আলো ছিল, এখন বাইরে মেঘ আর বৃষ্টি।
লাজার ফ্রিডমান—‘শান্তির মানুষ’—বাবা আমাকে এই নাম দিয়েছিলেন আশা নিয়ে, কিন্তু শান্তি কখনও দেখিনি।
কোনো এক শহরে পৌঁছলাম। মরিৎসের তখন কথা বলার শক্তি ছিল না, ফিসফিস করল, “নুরেমবার্গ।” তক্তার ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছিল—পোড়া দালান, ধসে পড়া দেয়াল, ধোঁয়া। নাৎসিদের পবিত্র শহর, হিটলারের প্রথম সমাবেশের শহর, এখন ছাই। বদ্ধ মালগাড়ির ওয়াগনে আমাদের দেহগুলো যদি একবারে ছাই হয়ে যেত!
এসএস রক্ষীদের কথা শুনে মনে হলো আমরা যাচ্ছি দাখাউয়ে। দাখাউ নামটা শুনেছি—নাৎসিদের প্রথম বন্দিশিবির, মিউনিখের কাছে। কিন্তু সেটা তো খুব দূরে নয়, এক বা দু দিনেই যাওয়া সম্ভব, অথচ বুখেনভাল্ড ছেড়েছি দিন পনেরো হয়ে গেল নিশ্চয়, নাকি কুড়ি? মরে যাবার আগে মরিৎসের ক্ষীণ কন্ঠের কথা ছিল, “ওরা কোনো সাক্ষী রাখবে না, আমাদের এই ট্রেনেই মেরে ফেলবে।” পরদিন সকালে আরো পাঁচজনের সঙ্গে মরিৎসের দেহ ওরা ফেলে দিয়েছিল। ছুঁড়ে ফেলার সময় ওর মুখটা দেখছিলাম—যন্ত্রণামুক্ত, শান্ত। কিশোর মুখ, এখনও নির্দোষ। ভূগোলে তুখোড়, পৃথিবীর সব দেশ জানা ছিল তার, শুধু জানত না তার মা বাবা বোন কোথায় হারিয়ে গেছে। সারার কথা মনে পড়ছিল। তিন বছর হয়ে গেল, ওয়ারশ গেটোতে ছিলাম আমরা, তখনও খাবার ছিল না। সারার মৃত্যুর পরেও বাঁচতে চেয়েছিলাম, ভেবেছিলাম আমার জীবনে এর থেকে খারাপ আর কী হতে পারে। আমার একমাত্র সান্ত্বনা—দাখাউগামী এই মৃত্যুশকটে সারাকে চড়তে হয়নি।
সেদিন মরিৎসদের নামিয়ে নেবার পরে ওয়াগানটা অনেকখানিই খালি হয়ে গেল। সারাদিন ট্রেনটা দাঁড়িয়ে থাকার পরে, অন্ধকার যখন নামছিল তখন চলা শুরু করল। আমি দরজার পাশেই বসে ছিলাম, খেয়াল করলাম—বৃষ্টিতে ভিজে ফুলে যাওয়া দরজার কাঠের তক্তাটা একটু নড়ছে। হাত দিয়ে ঠেলে দেখলাম, তক্তা নড়ল। আরেকটু ঠেললাম, তক্তাটা খুলে বাইরে পড়ে গেল। এক মানুষ শরীর সমান একটা ফাঁকা জায়গা, কিছু না ভেবেই তাতে নিজেকে গলিয়ে দিতে চাইলাম। ভেতর থেকে ওরা চিৎকার করল, “গুলি করবে!” ততক্ষণে আমার মুখে মুক্ত বাতাস, অর্ধেক শরীর বাইরে, বাভারিয়ার বন ছুটে যাচ্ছে উল্টোদিকে। এবার আমি পড়ে যাচ্ছি মাটিতে, বহু দূর থেকে একটা ‘ক্র্যাক’ মতন শব্দ শুনলাম।
২. লাজপত রাজকুমার আগারওয়াল
আমার বাবা মা কেন দেশভাগের পরে পাকিস্তানে রয়ে গেলেন তা আমি আর এখন বোঝার চেষ্টা করি না, তাঁদেরকে তো সেই প্রশ্নটি আর করা যাবে না। বাবা আমার নাম দিয়েছিলেন লাজপত রাজকুমার আগারওয়াল, সবাই আমাকে রাজু বলে ডাকত। লাজপত মানে নাকি সম্মানের রক্ষক, আমি আমার বংশ মর্যাদা রক্ষা করব।
আমাদের মারওয়াড়ি পরিবার কলকাতা থেকে সৈয়দপুরে এসেছিল, রেলওয়ে কর্মীদের জন্য মুদিখানা ও কাপড়ের দোকান ছিল আমাদের। দাদু মারা গেলে বাবাই ব্যবসার দায়িত্ব নিলেন, বাবার ভাই বোনেরা দেশভাগের পরে ভারতে চলে গেল। ১৯৫০, আর তারপরে ১৯৬৪’র দাঙ্গার পরও বাবা মা দেশ ছাড়লেন না!
১৯৭১-এর ২৫শে মার্চ রাত থেকেই আমরা আটকা পড়ে গেলাম। একদিকে পাকিস্তানি সেনা, অন্যদিকে আমাদেরই প্রতিবেশী বিহারি মানুষদের নজরদারিতে শহর থেকে বের হবার কোনো উপায়ই ছিল না। ওই রাতেই ওরা যমুনাপ্রসাদ কাকা আর আমাদের পারিবারিক চিকিৎসক জিকরুল কাকাসহ প্রায় দেড় শ মানুষকে রংপুর ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যায়। শুনেছি এর দু সপ্তাহ বাদে এনাদের সবাইকে নিসবেতগঞ্জ নামে এক জায়গায় গুলি করে মেরে ফেলা হয়, তাদের ওপর ওই ক’দিন নাকি অনেক অত্যাচার করা হয়েছিল। ওদের জন্য প্রতি রাতে মা গুমড়ে কাঁদতেন, বাবাকে অভিযোগ করতেন, কেন আমরা বহু আগেই ওই দেশ ছেড়ে চলে যাইনি।
এর কয়েকদিন পরে আমাদের দোকান লুট হয়ে গেল, গোডাউন পুড়িয়ে দেওয়া হলো। আমাদের বাড়িতে ঢুকে সব স্বর্ণালঙ্কার, দামি আসবাবপত্র নিয়ে গেল। শুধু আমাদের নয়, আমাদের পরিচিত হিন্দু মুসলমান অনেক বাঙালি বাড়ি, সমস্ত মারোয়াড়ি প্রতিষ্ঠান ও বাড়ির ভাগ্যও এরকম হলো। তবু এ শহর থেকে পালানোর উপায় নেই।
জুনের প্রথম দিক, রাস্তায় রিক্সা করে মাইকে কেউ ঘোষণা দিচ্ছিল। মা দৌড়ে এসে বাবাকে বললেন, “কী বলছে ওরা?” বাবা জানালার পর্দা সরিয়ে দেখতে চাইলেন বাইরে কী হচ্ছে তারপর বললেন, “মনে হয় বলছে, মারোয়াড়িদের ভারতে পৌঁছে দেওয়ার জন্য একটা ট্রেন সৈয়দপুর স্টেশন থেকে ছাড়বে।” “কী বলছ?” বাবা আবার মনোযোগ দিয়ে শুনলো—“এই রবিবার বলছে।” আর কয়েকটি দিন মাত্র।
“আমার বিশ্বাস হয় না ওরা আমাদের এভাবে ছেড়ে দেবে,” মা বলেছিলেন। “না, আমারও মনে হয় না।” আসলে আমাদের কোনো উপায় ছিল না। শনিবার রাতে দশ-বারোজন বিহারি ছেলে এসে পরদিন সকাল দশটায় স্টেশনে থাকতে বলল, না থাকলে যে এর পরিণতি ভাল হবে না সেটাও বলে গেল। লুটের পরে যা কিছু মূল্যবান বাকি ছিল সেগুলো গুছিয়ে আমরা সকালে স্টেশনে উপস্থিত হয়েছিলাম। সেখানে কয়েক শ মানুষ। মনে হলো ওরা আমাদের আসলেই যেতে দেবে।
ট্রেন ছাড়ল, আমি মায়ের পাশে জানালার ধারে বসলাম, বাবা মা’র পাশে। আমার উল্টোদিকে বাবার এক জ্ঞাতি বোন কমলা পিসী বসেছিলেন, তিনি আবার উঠে গিয়ে কার সঙ্গে কথা বলছিলেন। ধীরে ধীরে ট্রেনের গতি বাড়ছিল, এবার সত্যি মনে হলো আমরা মুক্তি পেতে যাচ্ছি। কয়েকজন তরুণ ছেলে গান ধরল।
গরম ছিল দিনটা, কিন্তু মনে পড়ে হঠাৎ একটা ঠাণ্ডা বাতাস আমার ওপর দিয়ে বয়ে গিয়েছিল, মনে হলো কেউ আমার দিকে তাকিয়ে আছে। সামনের সিটে যেখানে কমলা পিসী বসেছিলেন সেখানে মনে হলো অন্য কেউ এসে বসেছে। লোকটা খুব ফর্সা, একটা বেশ ময়লা কালো ওভারকোট পরা, গালটা বসে গেছে, চোখ গভীর কোটরে বসা। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম—সবাই হয় গান গাইছে, নয় আনন্দে পাশের মানুষের সাথে কথায় মগ্ন। তারা কি এই মানুষটাকে খেয়াল করছে না?
হঠাৎ ট্রেনটা থেমে গেল। পেছনে উর্দূতে একজনের চিৎকার শুনলাম, মনে হলো বলছে, বাইরে বেরিয়ে আসতে। সাথে সাথে এক ভয়ঙ্কর নিস্তব্ধতা নেমে এল। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম এক পাকিস্তানি সেনা নেমে গেল, আর তরুণেরা তাদের জামা খুলে তাতে আগুন ধরাতে চাইছে, কিন্তু তারা আর সময় পেল না। কামরায় একে একে সাধারণ পোশাক পরা মানুষেরা ঢুকে সামনে যাকে পেল তাকেই তাদের রামদা দিয়ে আঘাত করা শুরু করল। মা’কে ধরে চিৎকার করতে থাকলাম, তারপর দেখলাম মা’র সারা শরীর রক্তে ভাসছে।
এরপর ট্রেনের মধ্যে কী হলো আমার আর মনে নেই, সামনের সিটে যে লম্বা শীর্ণ লোকটিকে দেখেছিলেম সেই কি আমাকে জানালা দিয়ে ঠেলে দিল? নিজেকে আবিষ্কার করলাম ট্রেনের বাইরের মাটিতে। শুধু মনে আছে জীতু দাদা আমার হাত ধরে মাটি থেকে তুলছে, চিৎকার করছে, “রাজু, আমার সাথে আয়—দৌড়া, রাজু দৌড় দে।” জীতু দাদার সাথে আরো চারজন ছিল মনে হয়, আমরা দৌড়াচ্ছিলাম দূরের গ্রামটার দিকে, পেছনের আর্তনাদ আমাদের কানে পৌঁছাচ্ছিল না।
৩. লাজার ফ্রিডমান
‘ক্র্যাক’ শব্দটা শোনার পরে হঠাৎ আলোতে চোখ ধাঁধিয়ে গেল, খোলা জানালা দিয়ে গরম বাতাস বইছে। ভরা কামরা, তাতে বৃদ্ধ থেকে শিশু, অনেক বয়সের মানুষ। কিন্তু... এরা জার্মান নয়, ইহুদি নয়, ইউরোপীয় নয়। এদের চামড়ার রঙ বাদামি, কালো। এদের চুল কালো। মহিলারা রঙিন কাপড় পরেছে—শাড়ি, মনে হয়। পুরুষরা সাদা জামা। এরা কি ভারতীয়? ওরা আমাকে দেখতে পাচ্ছে না। মনে হয় কোনো কারণে তারা উল্লসিত, ওদের তরুণরা গান গাইছে, গানের ভাষা আমি বুঝতে পারছি না। কিন্তু দাখাউগামী মৃত্যুপুরীর পরে এরকম আনন্দঘেরা পরিবেশে আমি স্বস্তি পেলাম। কেউ আমাকে খেয়াল করছে না, শুধু একটি বালক ছাড়া। ওকে দেখে মরিৎসের কথা মনে পড়ল। জানালার বাইরে তাকালাম, এটি জার্মানি নয়। এও কি সম্ভব?
বাইরে সবুজ ক্ষেত, এগুলো কি ধান? ট্রেন চলছে, দেখলাম ওরা সবাই খুব খুশি, এত আনন্দের জন্যই কি ওদের নজরে আমি পড়ছি না? কিন্তু সামনের কিশোর ছেলেটি একদৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে, ও বুঝতে পারছে কোনো একটা অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটেছে।
এগুলো ভাবতে ভাবতেই ট্রেনটা শ্লথ হতে গেল। হঠাৎ আনন্দের বদলে নেমে এলো নিস্তব্ধতা। এত তাড়াতাড়ি যে পরিবেশটা বদলে যাবে সেটা অনুমান করিনি। তরুণদের গানও থেমে গেল, ওদের মুখে ভয়ার্তভাব।
ট্রেনটি ভীষণ শব্দ করে থেমে গেল। বাইরে দেখলাম, ধানক্ষেতের মধ্যেই ট্রেনটি থেমেছে, অন্য পাশে হয়তো প্ল্যাটফর্ম আছে একটা। ট্রেনের সবাই সেদিকটার খোলা দরজার দিকে তাকাল, সেখানে সেনাবাহিনির পোশাক পরা একটি লোক ঢুকল, সে খুব জোরে কী যেন বলল, আর সাথে সাথে ট্রেনের সবাই চিৎকার করে উঠল। চিৎকার নয়, সেটি ছিল আর্তনাদ। কয়েকজন তাদের জামা খুলে তাতে আগুন ধরানোর চেষ্টা করল, কিন্তু আগুন ধরল না। সেনা লোকটি নেমে যাবার পরে আমাদের বগির দু দিক থেকে পাঁছ ছ’জন ঢুকল, তাদের হাতে বড় বড় ছোরা, চাপাতি। এরা সেনা নয়, মনে হলো কসাই। তারা উন্মত্ত চিৎকারে সামনে যাকে পেল তাকেই তাদের ধারাল অস্ত্র দিয়ে আঘাত করতে থাকল – শিশু, বৃদ্ধা, তরুণ, প্রৌঢ়া কেউ বাদ গেল না—ফিনকি দিয়ে রক্ত বইতে লাগল। আমার সামনে বসা বালকটি তার পাশে বসা তরুণীকে ধরে চিৎকার করতে থাকল, “মা, মা!” সেই তরুণী তার ছেলেকে জড়িয়ে ধরারও সময় পেল না, মুহূর্তে পেছন থেকে তার মাথায় একটি চাপাতি নেমে এল। সেই মুহূর্তে আমার অনাহারী দুর্বল পেশীতে জোর ফিরে এলো, বালকটিকে তার মা’র বুক থেকে তুলে নিয়ে জানালা দিয়ে প্রায় ছুঁড়ে বাইরে ফেলে দিলাম, আর তখনই বুঝলাম পিঠ দিয়ে একটি ধারাল লম্বা ছোরা আমার শরীরে ঢুকছে।
যন্ত্রণায় পেছন ফিরে আমার হত্যাকারীকে দেখতে গেলাম, কিন্তু নিজেকে আবিষ্কার করলাম আবার অন্ধকারে—রেল লাইনের ওপর শোয়া অবস্থায়। একটু দূরে দাখাউয়ের ট্রেনের শেষ বগিটা চলে যাচ্ছে দৃষ্টির বাইরে, মনে হল সেই বগির ওপর এক জার্মান সেনা, তার হাতে রাইফেল। বুকে হাত দিয়ে বুঝলাম তার গুলিটি যথার্থ লক্ষ্যভেদ করেছে, মনে পড়ল সেই ‘ক্র্যাক’।
ধান ক্ষেতের পাশে একটি বালক ছুটে যাচ্ছে—নাকি বাভারিয়ার বনের পাশে? মরিৎস নয়, একটি শ্যামলা রঙা ছেলে দৌড়াচ্ছে। অন্ধকার আরো গাঢ় হয়ে আসে। দাখাউয়ের ট্রেনটা ধীরে ধীরে দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে যায়। আর সেই ছেলে—ধান ক্ষেত পার হয়ে, একটি সবুজ গ্রামে হারিয়ে যায়।
৪. পরিশিষ্ট
জীতুদার হাত ধরে রাজু সীমান্ত পাড়ি দিয়েছিল। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পরে সে আর স্থায়ীভাবে ফিরে যায়নি, সেখানে তার আর স্বজন বলতে কেউ ছিল না। কলকাতায় তার আত্মীয়দের কাছে বড় হয়ে প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী হয় সে। বহু বছর পরে মা বাবার স্মৃতি তর্পণ করতে একবার সে সৈয়দপুর আর গোলাহাট গিয়েছিল।
আমাদের মনে হয় প্রৌঢ় বয়সে তার ইউরোপে হিটলারের বন্দিশিবিরগুলো দেখার ইচ্ছে হয়। দাখাউতে সে অনেক মানুষের ছবির ভিড়ে লাজার ফ্রিডমান আর মরিৎসের ছবি দেখে। এটা হতে পারে সেই ছবি দেখে তার স্মৃতিতে তার ট্রেনে একজন বিদেশি মানুষের আবির্ভাবের কথা মনে পড়ে—যে তাকে বাঁচিয়েছিল।
কিন্তু মহাবিশ্ব যেখানে আমাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা-নৃশংসতার প্রতি একেবারেই উদাসীন, সেখানে এটা কেমন করে সম্ভব? মানুষের বেদনা কি স্থান-কালের পর্দা বিদীর্ণ করে একটা অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারে? দাখাউয়ের অভিশপ্ত ট্রেনে যে মরিৎসকে বাঁচাতে পারেনি, সে কি ২৬ বছর পরে বাংলাদেশের গোলাহাটে আরেকটি মৃত্যুট্রেনের এক কিশোরকে বাঁচাতে পারবে?
স্থান-কালের বিশাল ব্যাপ্তিতে একটি ট্রেন চলছিল দাখাউর দিকে ১৯৪৫-এ, আর অপরটি দাঁড়িয়ে ছিল গোলাহাটে ১৯৭১-এ। দুটি ট্রেন, দুটি মৃত্যুপুরী—এগুলো হয়তো আসলে দুটি নয়। হতে পারে এক একটা হত্যাযজ্ঞ আরেকটার সাথে জড়িয়ে আছে, সময়ের পর্দার ওপারে। হয়তো যে হাত একবার বাঁচাতে চেয়েছিল কিন্তু পারেনি, সেই হাত অন্য কোথাও পৌঁছে যায়—অন্য কোনো ট্রেনে, অন্য কোনো কিশোরের কাছে।
অথবা এটা এমন একটা ব্যাপার যেখানে আমরা এমন গল্প বানাই, এরকম গল্প শুনতে চাই—যেখানে মৃত্যু পরাজিত হয়, যেখানে মানুষ মানুষকে বাঁচায়, এমনকি মৃত্যুর পরেও। কারণ এইসব গল্প ছাড়া আমরা বাঁচতে পারি না। ·
লেখক পরিচিতি : দীপেন ভট্টাচার্য, জ্যোতির্বিদ, অধ্যাপক ও লেখক।


0 মন্তব্যসমূহ