রেহানা তার মেয়েটাকে নিয়ে প্রথম যখন এ বাসায় আসে তখন তাকে আলাদা গুরুত্ব দিয়ে দেখার প্রয়োজন অনুভব করেনি খন্দকার। ওপর থেকে মেয়েটাকে যতটুকু দেখা যায় : রোগা অপুষ্ট শরীর, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা, কেমন অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে বসার ঘরে খালি চেয়ারের কোনা ধরে একা দাঁড়িয়ে থাকা এক ঋজু মুখ মেয়ে। সামাজিক সৌজন্যে রেহানাকে দু’কাপ চায়ের কথা বললে সে বিস্মিত হয়েছিল। ‘আরেক কাপ কে খাবে?’ এই প্রশ্নে খন্দকার বলেছিল, ‘খাক না তোমার ছোট মেয়ে। সঙ্গে বিস্কুটও দিও।’
এই অযাচিত আন্তরিকতায় মেয়েটা আরও জড়সড় হয়ে বসেছিল সেদিন। একথা-সেকথায় খন্দকার বুঝতে পারে মেয়েটাকে যতটা ছোট ভেবেছে ততটুকু ছোট সে নয়। এইচএসসি দিয়ে রেজাল্টের অপেক্ষায়। এতদিন সে তার মামার বাড়ি ছিল, ওখানেই ওর স্কুলিং, কলেজও সেখানে। কী এক সমস্যায় ফিরে এসেছে মায়ের কাছে। পড়তে ভালোবাসে বলেই রেহানা মেয়েকে নিয়ে আসে এখানে। ‘কার কার লেখা ভালো লাগে’—এই প্রশ্নে সে যাদের নাম বলল তাদের কারও লেখাই খন্দকারের মনঃপুত নয়। সস্তা জনপ্রিয় ধারার লেখক ওরা, হাটেবাজারের চেনা মুখ।
যাহোক, মিনিট পাঁচেক সময় দিয়ে খন্দকার আবার লেখার টেবিলে ফিরে গিয়েছিল। কিন্তু ওপাশের পড়ার ঘর থেকে চেনা বাতাস পরিচিত গন্ধ নিয়ে ছুটে আসে এ ঘরে; সুন্দর স্নিগ্ধ। সম্ভবত মেয়েটা সেলফের কোনো বই ধরেছিল! মিম্মা বইয়ে পারফিউম ছিটাত খুব। দু’বছরের বেশি সংসার টেকেনি মিম্মার সঙ্গে। ওর কথা ভাবলে খন্দকারের এখনও কপাল কুঁচকে ওঠে।
ধীরে ধীরে মেয়েটার এ বাড়ি আসার প্রকোপ বাড়ে। কেন আসে কে জানে। তাকে আর পাঁচ-দশ মিনিট সময় দিতে হয় না এতেই খন্দকার স্বস্তি অনুভব করে। মেয়েটা নিজের মতো একলা বসে ঘরে জমিয়ে রাখা পুরনো পেপার, ম্যাগাজিন এসব পড়ে। মাঝে মাঝে তার ঝকঝকে হাতের লেখায় এখানে সেখানে কিছু খুচরো নোট পাওয়া যায়। যা ভালো লাগে তাই লিখে রাখে, কিছু নিয়ে যায় কিছু ফেলে যায়। নিচতলায় রেহানার কোচিং সেন্টারে ক্লাস নেওয়া পর্যন্ত চলে এসব। ওর এই বিশেষত্বহীন আগমন-প্রস্থান অর্থহীন কাটাকুটি খন্দকারের নিস্তরঙ্গ জীবনে কোনো প্রভাব না ফেলার মতোই। মাঝে মাঝে রেহানা আফসোসের স্বরে বলে, ‘ওকে ঘরে একলা রেখে আসা সম্ভব না স্যার। যেখানে থাকি সেখানকার পরিবেশ মেয়ের ভালো লাগে না, সবাই সারাদিন ঝগড়াঝাঁটি নিয়ে পড়ে থাকে। তাছাড়া ওর বাবার আচরণও অস্বাভাবিক। ও নিতে পারে না, রাগ করে।’
‘আচ্ছা আচ্ছা।’
‘প্রতিবার ভাবি আর না, কিন্তু তারপর আর হয়ে ওঠে না ।’
‘আচ্ছা আচ্ছা!’
খন্দকারের অনাগ্রহে রেহানা আর এইসব ব্যক্তিগত কাঁদুনি গাইবার উৎসাহ পায় না। বহুদিন ধরেই শুনে আসছে রেহানার ডিভোর্স হয়ে যাচ্ছে; এখনো কেন ঝুলে আছে ওখানে এটাই খন্দকারের বুঝে আসে না।
‘ওই চোখ শিকারে কাঁদে, বর্ষার নদী, গ্রীষ্মের দুপুর বসন্তের ফুল, বিস্তৃর্ণ চলাচলের থেমে থাকা অন্ধ গাছেদের মত’, ‘অন্ধগাছ’ শব্দটির ব্যাখ্যা নিয়ে রেহানার মেয়েটা হুট করে একদিন খন্দকারের ঘরে আসে। কথা বলতে চায়। খন্দকার অপ্রস্তুত হয়। এই মেয়ে কবিতা পড়ে? বিস্ময়ের সঙ্গে সে এও লক্ষ করে এইটুকু একটা রোগাপটকা কলেজপড়া মেয়ে সরাসরি ওর চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলছে। মেয়েটাকে ইঁচড়েপাকা লাগে তার। ভদ্রতাজ্ঞানও কম মনে হয়, নাহয় এমন একটা আধবুড়ো লোকের শোবার ঘরে এভাবে ঢুকে পড়া যায়? এখনকার জেনারেশনটাই কেমন!
‘প্রেমের কবিতা পড়ায় রাগ করেছেন?’
‘নাহ।’
মুখে ‘না’ বললেও খন্দকারের মেজাজ বেশ খারাপ হয়। তাছাড়া মিম্মার ঘটনার পর খন্দকারের বেশ শিক্ষা হয়েছে, এইসব ছেলেছোকরা মেয়েছেলে মাথায় তুলতে নেই। অবশ্য এই মেয়েটি কেমন তা এখনও জানা হয়ে ওঠেনি। মেয়েটা হঠাৎ নীরবতা ভাঙে—
‘আচ্ছা মা আপনাকে এত ভয় পায় কেন?’
‘কী জানি?’
‘আপনি না জানলেও আমি মনে হয় জানি।’
ওর সঙ্গে মনস্তাত্ত্বিক আলোচনা শুরু করবার মতো যথেষ্ট মানসিক প্রণোদনা পায় না বলেই খন্দকার যেন তেন প্রকারের একটা নন্দনতাত্ত্বিক আলোচনায় মেয়েটার মনোযোগ অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিতে চায়। বলে ‘কবিতায় অমন কত কী হয়, তুমি ছোট মানুষ অত বুঝবে না।’ সে কাঁচুমাচু হয়ে বলে, ‘কিন্তু স্যার, গাছ কি কখনো অন্ধ হয়? পৃথিবীর সব কিছু দেখার বোঝার অনুভব করার দিব্যশক্তি যে গাছের, সে কেমন করে অন্ধ হয়? আর শিকারের ক্ষীপ্রতার সঙ্গে অন্ধগাছের তুলনা তো বিপরীতধর্মী, একদম বেমানান!’
খন্দকার হেসে ফেলে এবার। বলে, ‘আহারে মেয়ে! অমন না হলে কবিতা কী! অন্ধ বোবা কালা দুঃখ-বিরহ প্রসঙ্গগুলো মনে হয় কবিদের পছন্দ। তারা এসব নিয়ে লেখে। দেখো না যেকোনো চিত্রকল্পেই এরা কেমন দুঃখী দুঃখী বিশেষণ জুড়ে দেয়। মালার্মে তো চাঁদকেও দুঃখী দেখেছিলেন। ক্রন্দনশীল দেবশিশুরা যে চাঁদের স্বপ্ন দেখছিল সেই চাঁদ। বোঝো এবার, স্বর্গে শিশু থাকবে হাসিখুশিতে, কিন্তু তা না, কবিরা তাকে কাঁদাবেই! শুধু চাঁদ বা গাছ কেন! নদী-নালা, খাল-বিল, রোদ, পাখি, শিশির সবকিছুকে চিপে চিপে চিড়েচ্যাপ্টা করে এদের শান্তি। শোনোনি জীবনবাবু শিশিরের শব্দকে এতই মহিমান্বিত করে গেছেন যে, ওই শব্দের পাশে বাজ পড়ে কেউ মরে গেলেও এত হইচই হবে না। রবার্ট ফ্রস্টের নাম শুনেছ? উইলিয়াম ব্লেক, ওয়ার্ডসওয়ার্থ? তারা বলেন, Ôas cold earth wanders never knewÕ। শীত-গ্রীষ্ম কেমন তাও নাকি পথের মানুষের জানার কথা না, কেবল কবিরা জানবে। তাদের ভাবভঙ্গিতে মনে হতে পারে পৃথিবীর সকল অনুভবশক্তি, প্রকৃতির লীলাখেলা সব কেবল কবিদের দখলে।’ খন্দকার এ প্রসঙ্গে ভ্লাদিমির মায়াকোভস্কির প্রসঙ্গ টানতে গিয়ে থেমে যায়। কী বলছে সে এসব আবোল-তাবোল! কাকে বলছে? মেয়েটার দিকে তাকিয়ে দেখে ওর চোখে ঔৎসুক্যের হাসি। খন্দকার তার অস্বস্তি কাটাতে অন্য কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। সেলফে জমে থাকা কিছু পুরনো বই ওর দিকে ঠেলে দেয়। মেলা এলে অনেক লেখকই উপযাচক হয়ে তাদের বই পাঠায়। চক্ষুলজ্জায় সামনে পড়ে গেলে সমসাময়িক দু-চারজনের বই নিজের গরজেও কিনতে হয়। কিন্তু কখনোই ওগুলো পড়ার ইচ্ছে হয় না। জানেই তো কী ছাইপাশ লিখবে এরা। কনটেন্ট দুর্বল, ভাষা দুর্বল, নেই কোনো নিজস্ব স্টাইল, শুধু শুধু পৃষ্ঠা ভরানো। মেয়েটাকে ওসব দিয়ে ঘরের ওজন কমানোই বেটার মনে হয় তার। পড়ুক ও যত ইচ্ছে।
এরপর বেশ কিছুদিন পর হুট করে আরেক প্রশ্ন নিয়ে মেয়েটা হাজির হয়—
‘আপনি কবিতা লেখেন না?’
‘নাহ।’
‘কেন লেখেন না?’
‘এমনি লিখি না, ভালো লাগে না।’
‘ও।’
‘ তোমার বুঝি কবিতা পড়তে খুব ভালো লাগে?’
‘হ্যাঁ, বেশ ভালো লাগে।’
‘তা তো লাগবেই, ÔThe crown of literature is poetry।’ এটা আমার কথা না মহান স্টোরিটেলার মমের কথা। উইলিয়াম সমারসেট মম। নাম শুনেছ? এনিওয়ে, তোমাকে যে বইগুলো দিয়েছি সেগুলো আর ফেরত দিতে হবে না।’
মেয়েটাকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে খন্দকার সোজা স্টাডিরুমে চলে যায়। মনটা কেমন খচখচ করতে শুরু করে তার। মেয়েটা কী জিজ্ঞেস করল আর সে কী প্রতিক্রিয়া দেখাল! মেয়েটার হয়তো তার সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করে বলেই আসে। খন্দকার বুঝতে পারে না তার সমস্যা কি মেয়েটা, নাকি মেয়েটার কবিতার প্রতি আগ্রহ। কবিতা যদি এতই অনুভবযোগ্য কিছু হয়ে থাকে তাহলে তাদের মতো ফিকশন রাইটারদের সাহিত্যে প্রয়োজনটা কী? আচ্ছা, সে কি কবিদের নিয়ে কোনো অবসেশনে ভোগে? বা কোনো গোপন-ঈর্ষা? কিন্তু কেন? নিশ্চয়ই না। তা না হলে ওকে যে ওইদিন এতগুলো বই দিল ওখানে তো কবিতার বই-ই বেশি! দু-চারটা গিয়েছে হয়তো ফিকশন, শর্ট স্টোরি। যদিও সেখানে তার নিজের লেখা কোনো বই ছিল না। অপাত্রে দেওয়ার মতো উদ্বৃত্ত সংখ্যা খন্দকার কখনো ঘরে রাখে না। আর এইটুকু বয়সে ও বুঝবেই বা কী! খন্দকার লেখায় মনোযোগ দেয়। অটোমান সাম্রাজ্যের ঘটনা নিয়ে নতুন একটা উপন্যাস ধরবে। ইতিহাস-ফিকশন। ফিকশন-ইতিহাস। লেখার শুরুতেই খাতা খুলে বড় বড় করে লিখে ফেলে চার লাইন কবিতা—
‘গাছের ছায়ার তলে মদ ল’য়ে কোন ভাঁড় বেঁধেছিলো ছড়া!
তার সব কবিতার শেষ পাতা হবে আজ পড়া;
ভুলে গিয়ে রাজ্য-জয়-সাম্রাজ্যের কথা
অনেক মাটির তলে যে মদ ঢাকা ছিলো তুলে নিবো তার শীতলতা;’
অদ্ভুত তো! কেন লিখলো সে এই মুখস্ত লেখা? কেন? মেয়েটার প্রভাব? কলম হাতে নিয়ে তার পিষে দিতে ইচ্ছে করে সব সব সব। কেন তার মনকে কেন্দ্রীভূত করতে পারে না? কী যেনো তার লেখার কথা তার, কোথায় যেনো আটকে আছে সব, কেবল কলমে আসছে না। হঠাৎ খন্দকারের মনে হতে থাকে তার ছোট্ট এই ঘরটার টেবিল চেয়ার খাতা বড় হতে হতে অসীম ক্ষমতার এক ক্ষুদ্র বালিকার অবয়ব হয়ে যাচ্ছে। খন্দকার হয়তো পুড়ে যাবে এক্ষুনি, মরে যাবে তাকে বইবার ব্যথা ও ভারে। খন্দকার ছিটকে সরে আসে লেখার টেবিল থেকে।
কদিন থেকে দেখছে মেয়েটা আর আসছে না। রেহানাকে বলবে বলবে করেও বলা হয় না। ওর চোখ মুখও কেমন শুকনো।
‘তোমার মেয়ে সুস্থ আছে, রেহানা ?’
‘জি স্যার, আছে।’
‘আসে না কেন?
‘বাসায় ঝামেলা চলছে স্যার।’
‘কী নিয়ে, আবার সেই ডিভোর্স?’
‘না স্যার। মেয়ের ভার্সিটিতে চান্স হয়েছে, কিন্তু ওর বাপ ওকে আর পড়তে দিতে চায় না।’
‘কেন পড়তে দেবে না?’
‘ওর দরকার টাকা, মেয়ের উপার্জন, বলে কি গার্মেন্টসে চলে যেতে। নার্সিংয়ে পরীক্ষা দিতে। মোড়ের ডিপার্টমেন্টাল শপের সেলসগার্ল হতে। এইসব আর কি।’
‘কী বলো এসব!’
‘আমাকের স্যার আপনি কোচিং সেন্টারের পাশের ঘরটা ছেড়ে দেন? মেয়েটাকে নিয়ে উঠে যাই।’
খন্দকারের কানে রেহানার কোনো কথা যায় না। কেবল ওর মেয়েটার করুণ মুখ, বুদ্ধিদীপ্ত চোখ মনে পড়ে। কেমন বিষন্ন বোধ হয়। খন্দকার মনে মনে কী এক ভেবে রেহানাকে বলে দেয়, মেয়েটাকে যেন কাল সকাল-সকাল নিয়ে আসে এখানে। রেহানা বুঝতে পারে না খন্দকারের উদ্দেশ্য। কিন্তু তার সকল কিছুতেই রেহানার অসীম নির্ভরতা। রেহানা ভাবে আসলে তার কপালটাই খারাপ। কত ভালো ঘরের মেয়ে হয়েও নেশারু বরের পাল্লায় পড়ে আজ তার এই হাড়-হাভাতে জীবন। প্রতিদিনই মদ খেয়ে জানোয়ারটা গভীর রাতে ঘরে ঢোকে আর কুৎসিত ভাষায় স্যারের সঙ্গে মা-মেয়ের সম্ভাব্য-অসম্ভাব্য কাল্পনিক সম্পর্কের কুৎসা গাইতে থাকে। বদমাশটা বলে কি না, ‘ওইটা আবার স্যার! ওইটা তো বুইড়া ভাম, ছুড়ি আর বুড়িতে কোনো বাছবিচার নাই। কচিবউ তো ভাগছেই এখন তুই-ই চালা, না পারলে তোর এলেমদার মেয়েতো আছেই।’ ওসবে রেহানার আর কথা বাড়ানোর রুচি হয় না।
পরদিন নিচতলায় টুকটাক শব্দ হতেই খন্দকার বুঝতে পারে রেহানা তার কোচিংঘর খুলেছে। রেহানা তার নিজের ছাত্রী না হলেও মেয়েটাকে ভালো করে চেনে বলেই গ্যারেজের ঐ ঘরটা অনেকটা বিনা ভাড়ায় ছেড়ে দিয়েছে সে। ওখানে রেহানা ছোট ছোট বাচ্চা পড়ায়। সঙ্গে খন্দকারের গৃহস্থালির প্রয়োজন-অপ্রয়োজনও দেখে। রেহানা আছে বলেই খন্দকারকে এখনো হোটেলের পচা-বাসি খাবার খেতে হয় না। সকালে জোর বৃষ্টি হওয়ায় জানালার কাঁচ ভিজে আছে। রেহানাকে ডাকতে গিয়েও ডাকে না। জানালা দিয়ে আকাশ দেখে। কী ঝকঝকে সুন্দর একটা দিন। ঘরে ভেজা মাটির গন্ধ আসতেই খন্দকার ভুলে যায়; গতরাতে তার একটুও ঘুম হয়নি। নিঃসঙ্গ লেগেছে, একা লেগেছে, অস্থিরমতি মিম্মার জন্য মধ্যরাতে তার বুকে তৃষ্ণা জেগেছে। মিম্মার সঙ্গে তার বয়সের তফাৎ ছিল সতেরো বছর। বয়সের এই তফাৎ তার সব কর্মকাণ্ডে স্পষ্ট হতো রোজ। দেখা যেত, খন্দকারের কোনো প্রয়োজনীয় বইয়ের মাঝখানে সে ঠেসেঠুসে রেখে দিত তার আধপড়া খোলা কোনো জার্নাল বা পেপারবুক। ওর ডকুমেন্টারি ফাইলপত্রের ভিড়ে প্রায়ই খন্দকারের কোনো এসথেটিক সমলোচনা হাওয়া হয়ে যেত। মিম্মার নিজের লেখার টেবিল তো ছিলই না, মাঝেমধ্যে খন্দকারের ল্যাপটপেও অনেক প্রয়োজনীয় ফাইল সরিয়ে ইনপুট দিয়ে রাখত কী কী সব হাবিজাবি জিনিসপত্র। যেমন হুট করে এসেছিল মিম্মা তেমনি হুট করে চলেও গেছে। কেবল রেখে গেছে অজস্র নরম তুলো-তুলো মায়ার পালক। অথচ এই মিম্মার জন্যই তার বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি চলে গেছে। যদিও চাকরিহীন লেখকজীবনের বিড়ম্বনা তখন টের পায়নি খন্দকার, এখন পাচ্ছে। তার বই বিক্রির আয় সামান্যই। তবুও ব্যক্তিত্বের কাঠিন্য রক্ষা করে চলবার মত অর্থের সংস্থান এতেই হয়ে যায়। কখনও প্রকাশকদের দ্বারস্থ হতে হয় না। বরং বৈষয়িক বিষয়ের প্রতি তার একধরনের ঔদাসীন্যের কারণেই লেখক-প্রকাশকসহ পরিচিত গণ্ডিতে সকলেই তাকে বেশ সমীহের চোখে দেখে।
রেহানা তার মেয়েকে নিয়ে ঘরে ঢুকতেই সচেতন হয়ে পড়ে খন্দকার। বয়সের কারণে মেয়েটাকে দেখাচ্ছে মিম্মার মতো সবুজ, ওর দিকে তাকাতে খন্দকারের কেমন অস্বস্তি হয়। খন্দকার ওকে নিয়ে বের হয় সকাল-সকাল। নতুন একটা পরিবেশে যাবে অভিভাবকতো লাগেই। হুডখোলা রিকশায় ওকে নিয়ে বসতেই তার মনে হলো প্রকৃতির আয়োজনে আজ এমন এক নবীন নারীর উপস্থিতি অসংখ্য রংধনুর বিচিত্রতা তৈরি করছে। অচেনা অধ্যায়ে পা রাখার উত্তেজনায় মেয়েটাকে দেখাচ্ছে সিকি পয়সার মতো চকচকে। ওর দিকে তাকালেই মনে পড়ে যাচ্ছে—
‘বহুবর্ষ হতে, পেয়ে বহু বর্ষাধারা
সতেজ সরস ঘন, এখনো তাহারা
লগ্ন হয়ে আছে, তব নগ্ন গৌর দেহে
মাতৃদত্ত বস্ত্রখানি সুকোমল স্নেহে।’
‘অহল্যার প্রতি’ শব্দটা বলেই মেয়েটা অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। হায় কখন হতে আমি এসব ছাইপাশ মুখে আওড়ে যাচ্ছি কে জানে!
‘তুমি পড়েছ?’
‘হু রবীন্দ্রজয়ন্তীতে স্কুল ফাংশানে আবৃত্তি করেছিলাম।’
‘অহল্যা কে জানো?’
‘হু।’
‘আশ্চর্য!’
‘আশ্চর্য কেন হবেন? আমার মামার বাসায় বড় একটা লাইব্রেরি ছিল। আপনার বাসায়ও ঘুরঘুর করি এই কারণেই। আরও একটা কারণ আছে অবশ্য!’
‘আর কী কারণ?’
‘সেটা অন্যসময় বলব, এখনই না।’
‘সবচে’ কি ভালো লাগে তোমার? কবিতা শুধু?’
‘উহু, মিথলজিও। অর্ফিয়াস আর ইউরিডিসের কাহিনি পড়ে আমার কেমন যেনো লেগেছে। মানুষ এমন হয়! পারে মৃত্যুর দুয়ার থেকে কাউকে ফেরাতে?’
‘কেন পারবে না, তুমি বেহুলা-লক্ষ্মীন্দর পড়োনি?’
‘হু পড়েছি, শুধু ওদের কেন শিখণ্ডিকথা, শকুন্তলাও পড়েছি।’
‘ও।’
খন্দকারের মুখ তেতো হয়ে ওঠে আবার, কিছুটা যেন অসহিষ্ণুও। এই মেয়ের কাছ থেকে যেন আরও কি শোনার কথা তার, কিন্তু সে কিছুই বলছে না। থাক কী হবে এত ভেবে।
মেয়েটা আবার বলে,‘আপনি রাগ করবেন জেনেও আমি কত কিছুর পাতা ওল্টাই। ওই দিন দেখলাম একটা মোটা বাঁধানো খাতায় আপনি জমিয়ে রেখেছেন কতগুলো টুকরো টুকরো ছবি। বোঝা যায় ওটা আপনার প্রিয় খুব। হিজিবিজি একটা ছবির গায়ে লিখে রেখেছেন ‘সে ঋণ করিতে শোধ দ্রৌপদীর সবগুলি শাড়ি খুলিয়া ফেলিতে হবে।’
‘ওহ, ওটা পিকাসো। গোয়ার্নিকা। ওটা দেখলেই আমার কঙ্কাবতীকে মনে পড়ে। কেন পড়ে জানি না। কোথায় হতভাগ্য মানুষের কান্না, অসহায় অবয়ব আর কোথায় সুপ্তবাসনার প্রেয়সী।’
মেয়েটা ঠোঁট টিপে হাসে, ‘হু জানি, বুদ্ধদেব; সেও আপনার ভীষণ প্রিয়।’
‘নাহ আমি কবিতা একদমই পছন্দ করি না।’
মেয়েটা আর কোনো কথা বলে না। খন্দকার কী এক বিস্ময়ে তাকে দেখে আর অবাক হয়। কে এই মেয়ে! খন্দকার এমন বিস্ময়ে মিম্মাকেও দেখেনি কোনোদিন। কোন জগত থেকে এসেছে এ? কই মেয়েটাকে এখন তো আর তার কুৎসিত কদাকার রোগেভোগা পুঁচকে লাগছে না। কোনো মদ্যপ মাতাল বাবার ঔরসজাত সন্তান এমন হতে পারে? কী জানি হয়তো পারে! খন্দকার জানে না।
পুরো রাস্তায় তাদের আর কথা হয় না। মেয়েটার ভর্তিকার্যক্রমে একটু সময় লাগে পাসপোর্ট সাইজ ছবি ছিল না বলে। সেখানেও ঘণ্টাখানেক ব্যয় হয়। ওর জন্য ভালো কয়েকটা জামা, ব্যাগ, জুতো আরো কিছু টুকটাক জিনিস কেনার কথা ভাবে। মিম্মা থাকতেও সংসারের সব সে-ই কিনত। মিম্মা ছিল ব্যাটাছেলেদের মতো, একটা কিছু হলেই হতো। হলে উঠতে গেলে মেয়েদের আর কী কী লাগে, ভেবে আরো কিছু যোগ করে লিস্টে! ধুর এসব কী ভাবছে সে! নিজের ওপর বিরক্ত হয়। দু’দিন পর হয়তো দেখা যাবে মেয়েটা সব ছেড়ে বাবার পছন্দমাফিক কোনো সেলস ডিপার্টমেন্টে ঢুকে পড়েছে অথবা নিজের পছন্দেই কোনো অল্প বেতনে চাকরি করা কারো বউ হয়ে শুরু করছে সংসার! খন্দকারের সংশয়বাদী মনে মেয়েটাকে নিয়ে এছাড়া আর কোনো ইতিবাচক চিন্তা আসে না। অথচ সে জানে এ মেয়ের থাকা উচিৎ এমন কারো সঙ্গে, যে তাকে রাত জেগে কবিতা শোনাবে অথবা তার খসড়া খাতা থেকে ছোট ছোট কিছু অংশ লেখার সঙ্গে সঙ্গেই তুলে দেবে আর মেয়েটা পড়ে ঘোরলাগা গলায় বলে উঠবে, ‘বাহ!’
আশ্চর্য, খন্দকার কী মেয়েটাকে অবচেতনে মিম্মার সঙ্গে তুলনা করতে শুরু করেছে? অদ্ভুত, এটা কেমন করে হয়! মিম্মার সঙ্গে খন্দকারের মেলেনি এটা সত্য, তাই বলে এই নয় রেহানার মেয়েকে নিয়েও সে এমন ভাববে!
শাহবাগের কাছে আসতেই সারি সারি ফুলের দোকান। এত ফুল একসঙ্গে দেখে মেয়েটার চোখ চকচক করে ওঠে। খন্দকারের খুব ইচ্ছে হয় ওকে একগোছা ফুল কিনে দিতে।
‘ফুল নেবে? মাথায় পরবে?’
‘উহু, ফুলফল মাথায় নিয়ে ঘোরাঘুরি আমার একদম ন্যাকামো লাগে।’
‘কেন?’
‘আমার সম্মিলিত ফুলের সুন্দর দেখতে ভালো লাগে। একটা ফুলের আবেদন আর হাজার হাজার ফুলের আবেদন তো এক না।’
‘তাই?’
‘হু, আসলে ফুল বা মানুষ কাউকেই একা দেখতে আমার ভালো লাগে না।’
খন্দকার চুপ করে যায়। মেয়েটার অনুভূতির কাছে নিজেকে তার তুচ্ছ আর বিপন্ন লাগতে শুরু করে। অথচ সে লেখক, তবে কি তার বোধ তার সঙ্গে প্রতারণা করে সময় সময়!
‘আচ্ছা আপনি একা থাকেন কেন?’
কী দেবে উত্তর? মিম্মাকে তো সে ভালোই বেসেছিল, তবু সংসার টেকেনি! কেন টেকেনি? হঠাৎ করে মেয়েটার উপর খন্দকারের খুব রাগ লাগতে শুরু করে। কেন সে এই প্রশ্নগুলো করবে তাকে? মেয়েটা কি জানে না তার হাত-পা-মন বাঁধা আছে কোনো এক অদৃশ্য শেকলে! সে হাঁটতে গেলে, খেতে গেলে, ঘুমোতে গেলে শোনে ধাতব শেকলের ঝন ঝন শব্দ। তার জীবন থেমে আছে সাহিত্য নামক এক মনগড়া ফানুসের দুষ্টচক্করে। এখন তাকে রাতের পর রাত জেগে চেখভের মত সাজাতে হবে প্লট, মোপাসাঁর মত দেখাতে হবে চমক, এ্যালেন পো-র মতো খুঁজতে হবে জীবনের গভীর গভীর কোনো দার্শনিক সত্য। অভিধান ঘেঁটে আনা দুর্বোধ্য শব্দের ঝংকারে সস্তা আবেগের চটুল কাব্যসৌধে ছুড়তে হবে অগ্নি শলাকা। শরীর বিদ্রোহ করলে নিজের সঙ্গেই করতে হবে যুদ্ধ। খেতে হলে বাজার ঘেটে কিনে আনতে হবে শিং, কই অথবা মাগুর! নিজের মনঃপুত সাহিত্য না হলেও, সরস্বতীর করুণাময় নরম রঙিন পায়ে কান্নার বিনয় তার নেই। খন্দকার কিছুতেই বলতে পারবে না মেয়েটাকে কেন সে সেই ওল্ড জিপসিম্যানের মতো ক্যারাভ্যান নিয়ে অবিরাম ছুটে চলে এদিক সেদিক; গতরাত রোমে তার কিছু পরে ব্যাবিলন। আচ্ছা সময়বুড়োর এই ছুটে বেড়ানো যাযাবরের গল্প কোন কবির লেখা? মনে পড়ছে না কেন। খন্দকারের ইদানীং কিচ্ছু মনে থাকে না।
গলির পর গলি। তার ওপরের তস্য গলির জমজমাট বাজার ঠেলে মেয়েটাকে নিয়ে খন্দকার ঢোকে ছোট্ট একটা চায়ের দোকানে। রাত নেমে গেছে শহরে। এখান থেকে দেখা যায় সুয়ারেজ লাইনের ওপারে ওদের ঘর। দুজন পাশাপাশি বসে কাঠের বেঞ্চে। দীর্ঘ সময় পর মেয়েটার দিকে তাকায় খন্দকার। সারাদিনের ক্লান্তিতে মুখ ছোট হয়ে আছে একদম। চা নেয় দু’কাপ। চুকচুক করে খায় সে। খাওয়া শেষে হঠাৎই মেয়েটা বলে ওঠে, ‘স্যার’। মেয়েটার ডাকে তার কেমন অপ্রস্তুত লাগে। মেয়েটা তার পায়ে হাত দিয়ে সালাম করলে খন্দকার আরো অপ্রস্তুত হয় ।
‘আমার জন্য দোয়া করবেন স্যার। আমার মাকে দেখবেন। আমার মা খুব একা।’
‘কেন, তুমি কোথায় যাচ্ছ?’
‘আমি আবার মামার বাড়ি ফিরে যাচ্ছি, হলে সিট পাবার আগ পর্যন্ত ওখান থেকেই ক্লাস করব।’
‘তুমি আর আসবে না?’
‘আসাটা কি প্রয়োজন?’
খন্দকার চোখ নামিয়ে নেয়। মেয়েটাকে হঠাৎ আর তার ঈশ্বরী বলে মনে হয় না। যেন সে ধরেই নিয়েছিল, এই অবোধ ক্ষুদে বালিকার সঙ্গে প্রগলভ কথনে সে খুলে দিতে পারবে তার অন্তর্জাগতিক বিপন্ন সত্তা। অথচ এ চোখ এখন এত কঠিন পাথুরে যে মেয়েটার এখানে আসার প্রয়োজন কিংবা অপ্রয়োজন কোনো প্রসঙ্গই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে না। এরপরও সকল ইতস্তত লজ্জা-সংকোচ সরিয়ে খন্দকার বলে ওঠে, ‘আচ্ছা, আমার বাসায় ঘন ঘন আসার আরেকটা কারণ আছে বলছিলে, বলবে কেন?’
‘বলেছিলাম নাকি!’ রহস্য করে মেয়েটা। খন্দকার মুখে অসহিষ্ণু ভাবটা যথাসম্ভব অপ্রকাশিত রাখে, অথচ পারে না।
মেয়েটা বলে, ‘মনে আছে বেশ কিছুদিন আগে আপনি আমাকের কতগুলো বই দিয়েছিলেন পড়তে? অফেরতযোগ্য?’
‘হ্যাঁ।’
‘সেখানে কিন্তু আপনার নিজের লেখা কোনো বই ছিল না। কেন ছিল না?’
খন্দকার এবার আর মুখের অপ্রস্তুত ভাবটা লুকোতে পারে না। মেয়েটা না থেমে বলতে থাকে, ‘কারণ পাঠক হিসেবে আপনি আমাকের যোগ্য ভাবেননি। অথচ আপনি জানেন না লেখক হিসেবে আপনি আমার কাছে কতটা অযোগ্য। আপনার প্রতিটি বাক্য-শব্দ-ধ্বনি কত অজস্রবার করে আমি পড়েছি। আপনার কোনো লেখা আমায় টানেনি, তবুও পড়েছি। কেন টানেনি? কারণ আপনার লেখার পথ আপনার জানা নেই। অর্থহীন পাণ্ডিত্যের অসরল বক্তব্যে আপনি কাহিনি সাজান। আপনি হয়তো কদিন পরই একাডেমি পুরস্কারও পেয়ে যেতে পারেন। আপনার নাম প্রায়ই দেখি পত্রিকার পাতায়, ভালো ভালো কথা থাকে সেখানে। আচ্ছা কেউ কি আপনাকে বলেনি আপনি চেখভ হওয়ার জন্য জন্মাননি, জন্মেছেন খন্দকার হওয়ার জন্যই? আপনার এই লেখক জীবন পুরোটাই ভানের, আপনার ভেতরে বাস করে এক নরম গৃহী কবি মানুষ; কেবল কবিতাই যার আরাধ্য হওয়া উচিত। অথচ আপনি কিনা লিখে যাচ্ছেন অদেখা মানুষের মুখস্ত জীবন।’ দম নেয় মেয়েটা।
এই অবসরে খন্দকার ফুঁসে ওঠে, ‘এইটুকু একটা মেয়ে তুমি সব জেনে বসে আছ?’
‘হ্যাঁ। সব জেনেই বসে আছি। এও জানি, আপনি ভেবেই নিয়েছেন আমি অপরিপক্ক, প্রগলভ। আমার মূল্যায়নে আপনার কিছুই যাবে আসবে না। অথচ আপনি এটা জানেন না মহৎ সাহিত্যের আবেদন বয়স মেনে বাড়েও না কমেও না।’
খন্দকারের আর মেয়েটার দিকে তাকানোর সাহস হয় না। মেয়েটা কথায় ছেদ না দিয়ে বলতেই থাকে, ‘জানেন, সেই প্রথম দিন থেকেই আপনার ভেতরের মুমূর্ষু আত্মাকে দেখে আমার কত মায়া হয়েছে? মনে হয়েছে আপনার ভুল পথের ভুল লেখার সব ক’টা পাতা কুচি কুচি করে ছিঁড়ে দিয়ে বলি—অনেক হয়েছে আর না। কতবার বলতে ইচ্ছে হয়েছে, ‘চলুন সব বাদ দিয়ে আবার নতুন করে শুরু করা যাক। দোতলার ঘরটা নতুন করে সাজানো যাক কবিতার উজ্জ্বল রঙিন আলোয়। আচ্ছা, আপনি কি পারেন না সব উল্টে দিতে?’
‘না পারি না।’
‘আপনার মূল সমস্যা কি জানেন? আপনার সমস্যা আপনার অহংকার, অন্য সবাইকে অযোগ্য ভাবার প্রবণতা। অথচ আপনি ভালো করেই জানেন অযোগ্যতা কার, ‘আমি’ পাঠকের না ‘আপনি’ লেখকের। আত্ম-প্রতারণায় কখনও মহৎ সাহিত্য হয় না।’
মেয়েটা ঘুরে দাঁড়ায়। পেছনে ফিরে আবার বলে, ‘আপনার হাতে এখনো কিছু সময় আছে। চাইলে আপনি আমার কাছে আর একবার যোগ্যতার কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবার সুযোগ নিতে পারেন, না চাইলে এক ক্ষুদ্র পাঠকের কাছে সারাজীবন অযোগ্য লেখক হয়ে কাটিয়ে দিতে পারেন ভ্রান্তির জীবন। পছন্দ আপনার।’
মেয়েটা আর থামে না। চলে যাচ্ছে। খন্দকারের মনে হচ্ছে, যেন ভাঁজ করা কোনো বিষাদ চিঠি পড়ে ফেলার পর গুটি গুটি হাতের লেখায় কিছু মায়াময় রক্তচিহ্ন লেপ্টে যাচ্ছে অন্ধকার আকাশে। ল্যাম্পপোস্টের আলোয় ওর উদ্ধত মুখ আর দেখা যাচ্ছে না। ওকে কি ডাকবে একবার? ডেকে বললেই হয়, আমি আমার বই তোমাকে পড়তে দেইনি অভিমান থেকে, অযোগ্য ভেবে নয়। আমার নিঃসঙ্গ আত্মার গোপন আর্তির চিৎকার কবিতার অবয়বে তোমাকে পড়াতে পারিনি এই লজ্জা একান্তই আমার। আমার কেবলি মনে হতো তুমিই হয়তো আগ্রহ ভরে কোনো একদিন বলবে, ‘স্যার আমি খুব ভালো পাঠক, আপনাকে পড়তে চাই, আপনার অক্ষরগুলো চিনতে চাই। চেনাবেন?’
এসব সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে খন্দকার ক্লান্ত হয়ে ওঠে, তবু ভাবে নাহ, মেয়েটা বরং মুখ না ফিরিয়ে চলেই যাক। অজস্র প্রাণহীন অক্ষরস্তুপের নিচে চাপা পড়ে আছে যে জীবন সেখানে এই মূল্যবান রত্ন রাখার জায়গা কোথায়। আর সে ঘুমানোর আগ পর্যন্ত এভাবেই দৌড়ে যাবে মাইলের পর মাইল। কেউ যদি এসেই পড়ে পথে, এমন বিপ্রতীপ সুন্দর, তাকে প্রেয়সী ভেবে আর বিব্রত না হলেই হলো। ·
লেখক পরিচিতি : নাহিদা নাহিদ গল্পকার ও গবেষক। জন্ম ৫ জুলাই, চাঁদপুরে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতকোত্তর। প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ : অলকার ফুল, যূথচারী আঁধারের গল্প, পুরুষপাঠ, বহু বসন্তের দাগ। ভূষিত হয়েছেন কালি ও কলম তরুণ কবি ও লেখক পুরস্কার, এক্সিম ব্যাংক অন্যদিন হুমায়ূন আমাহমেদ সাহিত্য পুরস্কারে। বর্তমানে তিনি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত।


0 মন্তব্যসমূহ