অনুবাদ : ঝরা সৈয়দ
পর্ব- ২
একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছিল। একরাতে বৃদ্ধ মা গেদিককে বাধ্য করা হয়েছিল কিশোরী দেবী আয়ুকে বিয়ে করতে।
সে তখন গভীর ঘুমে নাক ডাকছিল। সেই সময় একটা কলিব্রি গাড়ি তার বাড়ির সামনে এসে থামল। ঘুটঘুটে অন্ধকার রাতের মাঝে গাড়ির ইঞ্জিনের কাশির শব্দে সে চমকে জেগে উঠল। বৃদ্ধ মা গেদিক সেই ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে পারেনি, এর মধ্যে ঝড়ের মতো আরেক ধাক্কা এল। গাড়ি থেকে একজন দাপুটে লোক নামল। তার কোমরে ঝুলছে একটা দা। সে দরজার সামনে ঘুমিয়ে থাকা বৃদ্ধের পোষা কুকুরটাকে লাথি মারল। কুকুরটা তীক্ষ্ণ ডাক ছেড়ে লড়াইয়ের জন্য লাফিয়ে উঠল। কিন্তু তার চেষ্টা বৃথা গেল। কলিব্রির চালক একটা রাইফেল দিয়ে তাকে গুলি করে দিল। কুকুরটা মরার আগে একটা আর্তচিৎকার দিল।
সেই মুহূর্তে দাপুটে লোকটা বুটের লাথি দিয়ে বৃদ্ধের কুঁড়েঘরের পাতলা পাটাতনের দরজা ভেঙে ফেলল। দরজাটা একটা কব্জায় ঝুলে রইল।
কুঁড়েঘরটা ভীষণ অন্ধকার ছিল। সেটাকে মানুষের বাসস্থানের চেয়ে বাদুড় আর টিকটিকির আস্তানা বলাই ভালো। চাঁদের আলোয় দুটো ছোট ঘর আবছা দেখা যাচ্ছিল। একটা শোবার ঘর, সেখানে বৃদ্ধ তার খাটের কিনারে বিভ্রান্ত হয়ে বসে আছে। আরেকটা রান্নাঘর, সেখানে চুলায় ছাই জমে আছে। শুধু বিছানা থেকে চুলা আর দরজা পর্যন্ত বৃদ্ধের চলাচলের পথটুকু বাদে সর্বত্র মাকড়সার জাল।
শুয়োরের খোঁয়াড়ের চেয়েও তীব্র প্রস্রাবের গন্ধে দাপুটে লোকটার বমি বমি করতে লাগল। সে চুলার পাশ থেকে একমুঠো শুকনো তালপাতা তুলে নিল। সেগুলো ভাঁজ করে আগুন ধরিয়ে দিল। তৈরি হলো একটা মশাল। সঙ্গে সঙ্গে ঘরটা নানা আকারের দুলতে থাকা ছায়ায় ভরে গেল। বাদুড়গুলো ছোটাছুটি শুরু করল। বৃদ্ধ এখনো খাটের কিনারে বসে অতিথির দিকে একই বিভ্রান্ত চোখে তাকিয়ে আছে।
এরপর আরেক চমক। দাপুটে লোকটা একটা চকবোর্ড বের করে দেখাল। তাতে একটা মেয়ের সুন্দর হাতের লেখায় কিছু লেখা। বৃদ্ধ পড়তে পারল না, লোকটাও পারল না। কিন্তু লোকটা জানত কী লেখা আছে।
"দেবী আয়ু তোমাকে বিয়ে করতে চায়," সে বলল।
নিশ্চয়ই কোনো মজা হচ্ছে। সে নিজের অবস্থান জানত। সে একজন বৃদ্ধ, অর্ধেকেরও বেশি জীবন পার করে ফেলেছে। যেসব বিধবা বুড়িদের স্বামী ডেলির মাটিতে মরেছে বা বোভেন-ডিগোয়েলে নিক্ষিপ্ত হয়েছে, তারাও তার মতো একজন গাড়ি-টানা মানুষকে বিয়ে করার চেয়ে পরকালের জন্য পুণ্য সংগ্রহকে ভালো মনে করে। একজন মেয়েকে পোষার কথা তার মনেই নেই বলতে গেলে। বিছানায় একজন নারীর সাথে শুতে হয় সেটাও সে প্রায় ভুলে গেছে। সর্বশেষ সে বেশ্যাপল্লিতে গিয়েছিল অনেক বছর আগে। আর নিজের হাতে নিজে সামলানোর কাজটাও বহু বছর আগে ছেড়ে দিয়েছে। তাই একজন গ্রামের ছেলের সারল্য নিয়ে সে দাপুটে লোকটাকে বলল:
"আমি নিশ্চিত না যে আমি তাকে বিয়ে করতে পারব।"
"সে তোমাকে বিয়ে করতে চায়, তুমি বা একটা কুত্তার ধন দিয়ে তার কুমারিত্ব নাশ হোক, তাতে তার কিছু যায় আসে না," লোকটা গর্জে উঠল। "না হলে লর্ড স্টামলার তোমাকে আজাকদের সকালের নাস্তা বানিয়ে দেবে।"
এতে সে কেঁপে উঠল। অনেক ডাচ মানুষ বুনো শুয়োর শিকারের জন্য হিংস্র কুকুর পোষে। কোনো দেশীয়কে অপছন্দ হলে তাকে সেই আজাকদের সামনে মৃত্যুর লড়াইয়ে নামিয়ে দেওয়া মিথ্যা নয়। কিন্তু এই হুমকি সত্যি হলেও দেবী আয়ুকে বিয়ে করা সহজ কথা নয়। সে বুঝতেই পারছিল না কেন তাকে তাকে বিয়ে করতে হবে। তাছাড়া সে মা ইয়াংয়ের প্রতি চিরন্তন ভালোবাসার কসমে কাউকে বিয়ে না করার শপথ নিয়েছিল। মা ইয়াং একদিন আকাশে উড়ে গিয়ে মিলিয়ে গিয়েছিল।
সেই মেয়ের গল্প আলাদা। সেটা ছিল এমন ভালোবাসা যা বেশিদিন টেকে না।
মা গেদিক আর মা ইয়াং একসাথে জেলে পাড়ায় বড় হয়েছিল। প্রতিদিন দেখা হতো, একই উপসাগরে সাঁতার কাটত, একই মাছ খেতো। শুধু বয়সের কারণেই তারা তখনই বিয়ে করেনি, কারণ তারা তখনও পুরোপুরি যুবক-যুবতী হয়ে ওঠেনি।
তার বয়সী বেশিরভাগ ছেলের মতো নয়, মা গেদিক সবসময় একটা বাঁশের পাত্রে তার মায়ের দুধ নিয়ে ঘুরত। সে হাঁটতে পারে। মায়ের কাছ থেকে দূরে যেতে পারে। তবুও এই দুধ নিয়ে চলা কাজটি বন্ধ করেনি। একদিন মা ইয়াং কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল উনিশ বছর বয়সেও কেন সে সেই দুধ খায় যা বহু আগেই নষ্ট হয়ে গেছে। এতে তার কিছু যায় আসে না কেন।
"কারণ আমার বাবা বুড়ো হওয়া পর্যন্ত সবসময় মায়ের দুধ খেত।"
মা ইয়াং বুঝল। পান্ডান ঝোপের আড়ালে সে তার জামা খুলে ছেলেটাকে তার ছোট্ট টানটান বোঁটায় চুষতে বলল। দুধ বের হলো না। কিন্তু মা গেদিক মায়ের দুধ খাওয়া ছেড়ে দিল আর সেই মেয়ের প্রেমে সারাজীবনের জন্য পড়ে গেল।
এভাবেই চলছিল-- যতদিন না একরাতে একটা ঘোড়ার গাড়ি এসে মা ইয়াংকে তুলে নিল। সে সেজেছিল সিন্ত্রেন নর্তকীর মতো। দেখতে অপূর্ব, কিন্তু বুকে ব্যথা জাগানো। মা গেদিক সবসময় সবকিছু শেষে জানতে পারে। সে সৈকত ধরে ছুটে গেল গাড়ির পিছনে। কোচোয়ানের কাছে পৌঁছে সে গাড়ির পাশে ছুটতে ছুটতে সুন্দরী মেয়েটার দিকে চেঁচিয়ে বলল :
"কোথায় যাচ্ছ?"
"একজন ডাচ প্রভুর বাড়িতে।"
"কেন? ডাচদের বাড়িতে কাজের মেয়ে হতে হবে না তোমাকে।"
"না," মেয়েটা বলল। "আমি তার রক্ষিতা হতে যাচ্ছি। তুমি আমাকে ন্যাই ইয়াং বলতে পারবে।"
"শালা!" মা গেদিক চিৎকার করল। "কেন কারো রক্ষিতা হতে চাও?"
"কারণ না হলে মা-বাবাকে আজাকদের সকালের নাস্তা বানিয়ে দেওয়া হবে।"
"কিন্তু তুমি কি জানো না আমি তোমাকে ভালোবাসি?"
"হ্যাঁ, জানি।"
সে এখনো গাড়ির পাশে ছুটছে। যুবক আর যুবতী তাদের বেদনাদায়ক বিচ্ছেদে কাঁদছে। তাদের চোখের জল শুধু কোচোয়ান দেখল। সে তাদের একটু শান্ত করে ভাবতে বলল : "একে অপরের হতে না পারলেই কি ভালোবাসা যায় না?"
এটা কোনো সান্ত্বনা দিল না। আসলে এতে মা গেদিক রাস্তার পাশের বালিতে পড়ে গিয়ে কান্না করতে করতে নিজের দুর্ভাগ্যে বিলাপ করতে লাগল। মেয়েটা কোচোয়ানকে থামতে বলল। সে নেমে যুবকের সামনে দাঁড়াল। তারপর বৃদ্ধ কোচোয়ান, ঘোড়া, গলাটেপা ব্যাঙ, প্যাঁচা, মশা আর পতঙ্গকে সাক্ষী রেখে মেয়েটা একটা শপথ নিল।
"আজ থেকে ষোল বছর পর সেই ডাচ প্রভু আমাকে নিয়ে বিরক্ত হয়ে যাবে। যদি তুমি এখনো আমাকে ভালোবাসো, যদি কোনো ডাচের ছেড়ে দেওয়া মাল নিতে রাজি থাকো, তাহলে পাথুরে পাহাড়ের চূড়ায় অপেক্ষা করো।"
এরপর আর কোনোদিন তাদের দেখা বা কথা হয়নি। মা গেদিক জানতেও পারেনি সেই ডাচ প্রভু কে, যে এত লালসায় পূর্ণ ছিল যে সে পনেরো বছর বয়সের যৌবনে ফোটা তার প্রিয়তমাকে নিজের করে নিতে চেয়েছিল। মা গেদিক নিজে তখন উনিশ বছরের। সে শপথ করল, মা ইয়াং টুকরো টুকরো হয়ে ফিরে আসলেও সে তাকে ভালোবাসবে।
তবু প্রিয়তমাকে হারানো সহজ কথা নয়। পাগলের চেয়ে বেশি পাগল, বোকার চেয়ে বেশি বোকা, আর শোকার্তদের চেয়ে বেশি বিপর্যস্ত হয়ে অপেক্ষার বছরগুলো শুরু হলো । তার গাড়ি-টানা বন্ধুরা আর বন্দরের কুলিরা তাকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে অন্য কাউকে বিয়ে করতে বলল । কিন্তু সে তার মজুরি আর সময় জুয়ায় উড়িয়ে দিতে লাগল আর আরাক মদে মাতাল হয়ে বাড়ি ফিরতে লাগল। তখন বন্ধুরা তাকে বেশ্যাপল্লিতে যেতে বোঝাতে লাগল। তারা ভাবল, অন্তত আরেকটা মেয়ের শরীর পেলে হয়তো তার কামনার শোক কমাবে। সেই সময় বন্দরের শেষ মাথায় মাত্র একটাই বেশ্যাপল্লি ছিল। আসলে এটা তৈরি হয়েছিল ব্যারাকে থাকা ডাচ সৈনিকদের জন্য। কিন্তু সিফিলিস ছড়িয়ে পড়ার পর তাদের বেশিরভাগ সেখানে যাওয়া ছেড়ে দিল। তারা নিজস্ব রক্ষিতা রাখতে শুরু করল। তারপর বন্দরের শ্রমিকরা সেখানে যাতায়াত শুরু করল।
"বেশ্যাপল্লিতে যাওয়া অন্য কাউকে বিয়ে করার মতোই বিশ্বাসঘাতকতা," মা গেদিক জেদ ধরে বলল। কিন্তু এক সপ্তাহ পরে তার বন্ধুরা তাকে মাতাল আর অর্ধচেতন অবস্থায় সেই বেশ্যাপল্লিতে টেনে নিয়ে গেল। সে একদিনের মজুরি খরচ করল একটা বিছানা আর একজন মোটাসোটা মেয়ের জন্য। তার যোনিটা ছিল ইঁদুরের গর্তের মতো বিশাল। এই সৌন্দর্যে সে সঙ্গে সঙ্গে মুগ্ধ হয়ে গেল আর নিজেকে শুধরে নিয়ে বলল, "বেশ্যার সাথে করা আসলে বিশ্বাসঘাতকতা নয়। কারণ বেশ্যাদের টাকা দেওয়া হয়-- ভালোবাসা নয়।"
এরপর সে বন্দরের শেষ মাথার বেশ্যাপল্লির নিয়মিত খদ্দের হয়ে গেল। সেখানকার মেয়েদের সাথে শুতে শুতে সে মা ইয়াংয়ের নাম ফিসফিস করে বলত। প্রায় প্রতি সপ্তাহান্তে তার সমান ভালো বন্ধুদের দল নিয়ে এই কাজে যেত । হাতে টাকা থাকলে প্রত্যেকে আলাদা মেয়ে নিত। কিন্তু কখনো সাশ্রয়ের দরকার হলে পাঁচজন মিলে একজন মেয়েকে ভাগ করে নিত। যতদিন না একে একে সব বন্ধু বিয়ে করে নিল ততদিন পর্যন্ত এভাবে বছরের পর বছর চলল।
এটা মা গেদিকের জন্য কঠিন হয়ে গেল। বন্ধুদের আর বেশ্যাপল্লিতে যাওয়ার সময় নেই। তাছাড়া তাদের এখন বউ আছে-- টাকা নয় ভালোবাসা দিয়ে শোয়া যায়। কিন্তু একা একা বেশ্যাপল্লিতে যাওয়া পৃথিবীর সবচেয়ে বিষণ্ণ কাজ। মা গেদিক একাকীত্ব অনুভব করলে হাত দিয়ে অভ্যাস করতে শুরু করত। কিন্তু সেটা শীঘ্রই অসহ্য হতাশায় পরিণত হতো। তখন বাধ্য হয়ে সে একা ঘুটঘুটে অন্ধকার রাতে বেশ্যাপল্লিতে বেরিয়ে পড়ত। জেলেরা সমুদ্র থেকে ফেরার আগেই বাড়ি চলে আসত।
কিছুদিন পর সে একটা অদ্ভুত মানুষে পরিণত হলো। বলা চলে মানুষের শত্রু হয়ে উঠল। বারবার প্রতিবেশীর আস্তাবলে হই-চই হতো, আর তাকে পাওয়া যেত গরু ধর্ষণ করতে। এমনকি মুরগিও তার ধর্ষণের শিকার হতো যতক্ষণ না তার নাড়িভুঁড়ি বেরিয়ে আসত। কখনো সে একজন রাখাল ছেলেকে ঘুষি মারত, তারপর একটা ভেড়া ধরে মাঠের মাঝখানে কাজ সারত। একবার একজন মধ্যবয়সী মেয়েলোক কচু পাতার ঝুড়ি নিয়ে যাচ্ছিল। এই মাত্রাহীন কামনার দৃশ্য দেখে হিস্টিরিয়াগ্রস্থ হয়ে চিৎকার করতে করতে পুরো ধানক্ষেত দৌড়ে পার হয়ে গেল।
সবাই তার কাছ থেকে দূরে সরে যেতে শুরু করল। সে গোসল করা বন্ধ করে দিল। ভাত বা অন্য কিছু খাওয়া বন্ধ করল। শুধু নিজের মল আর কলার বাগান থেকে কুড়িয়ে আনা মল খেত। পরিবার আর বন্ধুরা গভীর চিন্তায় পড়ে দূর দেশ থেকে একজন দুকুন ডেকে আনল। সব ধরনের রোগ সারাতে পারেন বলে দুকুন নামের বিখ্যাত এই রহস্যময় চিকিৎসক। সাদা আলখাল্লা আর লম্বা ঝরঝরে দাড়ি নিয়ে তাকে একজন জ্ঞানী প্রেরিতদূতের মতো দেখাচ্ছিল। তিনি একটা ছাগলের খোঁয়াড়ে মা গেদিককে দেখলেন। গত নয় মাস ধরে তাকে সেখানে বেঁধে রাখা হয়েছে। খাঁচার ভেতরের মল খেয়েই সে বেঁচে আছে। দুকুন শান্তভাবে উদ্বিগ্ন দর্শকদের বললেন : "শুধু ভালোবাসাই এই পাগলকে সারাতে পারবে।"
কিন্তু এটা কঠিন ব্যাপার। মানুষ মা ইয়াংকে তার কাছে ফিরিয়ে দিতে পারবে না। তাই শেষ পর্যন্ত সবাই হাল ছেড়ে দিল আর মা গেদিককে শিকলে বেঁধে দীর্ঘ প্রতীক্ষায় রেখে দিল।
"তারা ষোল বছর অপেক্ষা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে," তার মা বিরক্তি নিয়ে বলল, "কিন্তু সেদিন আসার আগেই সে পচে যাবে।" ষষ্ঠ মুরগিটা তার পায়ু থেকে নাড়িভুঁড়ি বের করে যন্ত্রণায় ছটফট করতে দেখে জবাই করার পর তিনিই তাকে বেঁধে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
কিন্তু সে পচল না। বরং বেশ সুস্থ দেখাচ্ছিল। দিনগুলো কেটে যেতে যাচ্ছে দেখে তার গাল লালচে হয়ে উঠছিল, আর সে যে সময়ের জন্য অপেক্ষা করছিল সেটা কাছে আসছিল।
বিকেলে খালি পায়ের স্কুলপড়ুয়ারা তার ছাগলের খোঁয়াড়ের বাইরে জমা হতো গরু চরাতে যাওয়ার আগে। মজা করতে করতে সে তাদের নিজেদের গোপনাঙ্গ নাড়াচাড়া করতে শেখাত, নিজের থুতু ব্যবহার করে ঘষতে শেখাত। তাই স্কুলের শিক্ষকরা তার ধারেকাছে যেতে নিষেধ করলেন। কিন্তু ছেলেরা নিশ্চয়ই সে যা শিখিয়েছিল তা চেষ্টা করেছিল। কয়েকজন গভীর রাতে লুকিয়ে খোঁয়াড়ে এসে ফিসফিস করে বলল যে তারা প্রস্রাবের একটা নতুন উপায় আবিষ্কার করেছে, যা স্বাভাবিক প্রস্রাবের চেয়ে অনেক ভালো লাগে।
"ছোট মেয়েদের গোপনাঙ্গ দিয়ে চেষ্টা করলে আরও বেশি আনন্দ পাবে।"
একদিন বিকেলে একজন কৃষক পান্ডান ঝোপে দুটো নয় বছরের শিশুকে মিলিত হতে দেখল। গ্রামবাসী তখন নিষ্ঠুরভাবে সেই খোঁয়াড় তক্তা দিয়ে বন্ধ করে দিল। মা গেদিক ভেতরে আটকে গেল। কথা বলার কেউ নেই, আলোও নেই।
তবু এই শাস্তি তার মনোবল ভাঙতে পারল না। শরীর শিকলে বাঁধা, বন্ধ খাঁচায় বন্দী অবস্থায় তার মুখ থেকে অশ্লীল গান বের হতে লাগল। এতে ক্বারীদের মুখ লাল হয়ে গেল আর মানুষ রাতের মাঝে তোষকে এপাশ-ওপাশ করতে করতে কষ্টে কাঁপতে লাগল। এই প্রতিশোধ সপ্তাহের পর সপ্তাহ চলল। গ্রামবাসী ঠিক করল তার মুখে একটা কচি নারকেল ঠেসে দেবে। ঠিক তখনই সময়মতো একটা অলৌকিক ঘটনা ঘটল।
সেই সকালে সে আর অশ্লীল গান গাইল না, বরং একেবারে উল্টো, সুন্দর প্রেমের গান গাইল। অনেককে চোখের জল ফেলাল। পাড়ার এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত মানুষ কাজ থামিয়ে দিল। সবাই যেন আকাশ থেকে স্বর্গীয় অপ্সরী নামার অপেক্ষায় মুগ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। শেষে কেউ একজন বুঝে ফেলল। আজকেই মা গেদিকের দীর্ঘ প্রতীক্ষার শেষ দিন। আজকেই সে পাথুরে পাহাড়ের চূড়ায় তার প্রিয়তমার সাথে দেখা করবে।
যারা তাকে চিনত তারা দ্রুত ছুটে এসে তক্তাগুলো ভেঙে ফেলল। আলোর রশ্মি সেই ছাগলের খোঁয়াড়ে পড়ল। তীব্র ইঁদুরের বাসার মতো দুর্গন্ধ। দেখা গেল লোকটা এখনো শিকলে বাঁধা-- কিন্তু এখনো গান গাইছে। তারা তার বাঁধন খুলে একটা নালার কাছে নিয়ে গেল। সবাই মিলে তাকে গোসল করাল, যেন সে একটা নবজাতক শিশু বা একজন সদ্য মৃত একজন বৃদ্ধ। তার শরীরে গোলাপের তেল থেকে ল্যাভেন্ডার পর্যন্ত সুগন্ধি ছিটিয়ে দিল। তাকে সুন্দর উষ্ণ পোশাক পরাল। সেগুলো ছিল একজন ডাচমানের ছেড়ে দেওয়া জ্যাকেট আর পাজামা। তাকে সাজাল যেন কফিনে শোয়ানোর আগে খ্রিষ্টান মৃতদেহ সাজানো হচ্ছে। সব শেষ হলে তার এক পুরোনো বন্ধু অবাক হয়ে বলল, "তুমি এত সুন্দর হয়ে গেছ যে আমার ভয় হচ্ছে আমার বউ তোমার প্রেমে পড়ে যাবে!"
"অবশ্যই পড়বে," মা গেদিক গর্ব করে বলল। "ভেড়া আর কুমিরেরাও আমার প্রেমে পড়ে।"
আর দুকুন যা বলেছিল সেটা সত্যিই হলো। ভালোবাসা তার রোগ সারাতে পারে-- যেকোনো রোগ সারাতে পারে। আর কেউ তাকে নিয়ে চিন্তা করল না। সবাই তার অতীতের খারাপ কাজ ভুলে গেল। এমনকি তরুণ মেয়েরা ভয় ছাড়াই তার খুব কাছে দাঁড়াল, এই ভয় নেই যে তার হাত অভদ্রভাবে ঘুরে বেড়াবে। ধার্মিক মানুষেরা সদয়ভাবে তাকে সালাম দিল-- এই চিন্তা না করে যে কানে অশ্লীল কথা ঢুকে যাবে।
তার মা তার আচমকা সুস্থ হয়ে ওঠা উদযাপন করে একটা ছোট অনুষ্ঠান করলেন। হলুদ শঙ্কু আকারের তুম্পেং ভাত আর সঠিকভাবে জবাই করা মুরগি রান্না করল যে মুরগির পায়ু থেকে নাড়িভুঁড়ি বের হয়নি। একজন ক্বারী দোয়া ও কৃতজ্ঞতার প্রার্থনা পড়তে এলেন।
সেটা ছিল জেলে পাড়ায় এক গৌরবময় সকাল। হালিমুন্ডার দূর এক কোণে তখনো কুয়াশা। সেই সকালের কথা বছরের পর বছর মনে রাখা হলো। মানুষ তাদের ছেলেমেয়ে আর নাতি-নাতনিদের কাছে প্রেমিক-প্রেমিকার আবেগের গল্প বলতে গেলে সেই সকালের কথা বলত। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এটা সত্যিকারের আর চিরস্থায়ী ভালোবাসার গল্প হিসেবে রয়ে গেল।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই দীর্ঘ ষোল বছরের অপেক্ষা ট্র্যাজেডিতে শেষ হলো।
রোদ তীক্ষ্ণ হতে শুরু করার কিছুক্ষণ পরেই মানুষ গাড়ি আর ঘোড়ায় চড়ে ছুটে এল। তারা একজন রক্ষিতাকে তাড়া করছে। রক্ষিতাটি পাথুরে পাহাড়ের দিকে পালিয়ে যাচ্ছে। সে নিশ্চয়ই মা ইয়াং। একটা গাধা ধার করে মা গেদিক ডাচমানদের আর তার প্রিয়তমার পিছনে ছুটল। পাড়ার মানুষরাও তার পেছনে লাইন দিয়ে ছুটল। লাইনটিকে একটা বিশাল সাপের লেজের মতো দেখাচ্ছিল। তারা উপত্যকায় পৌঁছানোর পর ডাচমানরা শেষমেশ থামল। মা গেদিক চিৎকার করতে লাগল। বারবার তার প্রেমিকার নাম ডাকল।
পাথুরে পাহাড়ের চূড়ায় মা ইয়াংকে ক্ষুদ্র দেখাচ্ছিল। গাড়ি, ঘোড়া, গাধা কোনোটাই সেখানে পৌঁছাতে পারবে না। ডাচমানরা রাগে ফুঁসে শপথ করল, ধরতে পারলে তাকে আজাকের খাঁচায় ছুঁড়ে দেবে। মা গেদিক সেই পাথুরে পাহাড়ে উঠতে চেষ্টা করল। কিন্তু এত নির্দয় কঠিন যে মানুষ সেও অবাক হলো মেয়েটা কীভাবে চূড়ায় পৌঁছাল তা দেখে। কঠিন সংগ্রামের পর মা গেদিক তার প্রিয়তমার পাশে দাঁড়াল। তার বুকের মধ্যে দীর্ঘ আকাঙ্ক্ষা টগবগ করছে।
"তুমি কি এখনো আমাকে চাও?" মা ইয়াং জিজ্ঞেস করল। "আমার সারা শরীরে একজন ডাচমানের থুতু লেগে আছে। সে আমার গোপনাঙ্গে এক হাজার একশ বিরানব্বইবার ছুরি মেরেছে।"
"আমি আটাশজন আলাদা মেয়ের গোপনাঙ্গে চারশো বাষট্টিবার ছুরি মেরেছি। আর নিজের হাতে অগণিতবার। পশুর গোপনাঙ্গের কথা বাদই দিলাম। তাহলে আমরা কি আসলেই এতটা আলাদা?"
যেন কোনো অশ্লীল দেবতা তাদের পেয়ে বসল। তারা পরস্পরকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। গ্রীষ্মমণ্ডলীয় সূর্যের তাপের নিচে চুমু খেল। এত দীর্ঘদিনের জমে থাকা কামনা মেটাতে তারা শরীরে লেগে থাকা সব পোশাক খুলে ছুঁড়ে দিল। কাপড়গুলো উপত্যকার উপর দিয়ে ভেসে নামল--বাতাসে মেহগনি ফুলের মতো পাক খেতে খেতে নিচে নামল।
মানুষ প্রায় চোখকে বিশ্বাস করতে পারল না। কেউ কেউ চিৎকার করে উঠল। ডাচমানদের সব মুখ লাল হয়ে গেল। তারপর দ্বিধা না করে দুজন একটা সমতল পাথরে মিলিত হলো। মিলিত হলো সরাসরি উপত্যকা ভরা মানুষের সামনে-- যেন তারা সিনেমা হলে ছবি দেখছে। ধার্মিক মেয়েরা ওড়নার আঁচলে মুখ ঢাকল। সব পুরুষের লিঙ্গ শক্ত হয়ে গেল, কেউ একে অপরের দিকে তাকাতে সাহস পেল না। ডাচমানরা বলল : "আমরা সবসময় বলতাম না, দেশীয়রা বানরের মতো।"
আসল ট্র্যাজেডি ঘটল মিলনের পরে। মা গেদিক তার প্রিয়তমাকে পাথুরে পাহাড় থেকে নেমে তার সাথে ঘরে যেতে বলল, যাতে তারা বিয়ে করতে পারে, একসাথে থাকতে পারে, চিরকাল একে অপরকে ভালোবাসতে পারে। এটা অসম্ভব-- মা ইয়াং বলল । উপত্যকায় এক পা দেওয়ার আগেই ডাচমানরা তাদের আজাকের খাঁচায় ছুঁড়ে দেবে।
"তাই আমি উড়ে যেতে চাই।"
"এটা অসম্ভব," মা গেদিক বলল, "তোমার ডানা নেই।"
"যদি বিশ্বাস করো যে উড়তে পারবে, তাহলে উড়তে পারবে।"
নিজের কথা প্রমাণ করতে মা ইয়াং লাফ দিল। তার নগ্ন শরীরে ঘামের বিন্দু, রোদের আলোয় মুক্তোর দানার মতো চকচক করছে। সে উপত্যকার দিকে উড়ে গেল, নামতে থাকা কুয়াশার আড়ালে মিলিয়ে গেল। মানুষ শুধু মা গেদিকের করুণ চিৎকার শুনতে পেল। সে ঢাল বেয়ে দৌড়ে নামছে তার ভালোবাসাকে খুঁজতে। সবাই খুঁজল, ডাচমানরাও, হিংস্র কুকুরেরাও খুঁজল। উপত্যকার প্রতিটি কোণ তন্নতন্ন করে খোঁজা হলো। কিন্তু মা ইয়াংকে আর পাওয়া গেল না—পাওয়া গেল না মৃত বা জীবিত কোনোভাবেই নয়। শেষমেশ সবাই বিশ্বাস করল মেয়েটা সত্যিই উড়ে গেছে। ডাচমানরাও বিশ্বাস করল-- মা গেদিকও করল। এখন শুধু সেই পাথুরে পাহাড়টাই রইল। মানুষ সেটার নাম রাখল সেই মেয়ের নামে যে আকাশে উড়ে গিয়েছিল: মা ইয়াং পাহাড়।
সেদিনের পর মা গেদিক জলাভূমিতে চলে গেল। বর্ষায় ম্যালেরিয়ার ভয়ে ডাচরা সেখানে টিকতে পারত না। সেখানে একটা কুঁড়েঘর বানাল। দিনের বেলা কফি, কোকো বীজ, আর কখনো কখনো কোপরা আর মিষ্টি আলু ভরা গাড়ি টেনে বন্দরে নিয়ে যেত। অন্য গাড়িচালকদের সাথে সংক্ষিপ্ত কথাবার্তা ছাড়া সে শুধু নিজের সাথে বা আশেপাশের আত্মাদের সাথে কথা বলত। মানুষ ভাবতে শুরু করল তার পাগলামি আবার ফিরে এসেছে। যদিও সে আর গরু-মুরগি ধর্ষণ করছে না বা মল খাচ্ছে না।
কুঁড়েঘর তৈরির প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই জলাভূমিতে আরও মানুষ আসতে শুরু করল। গজিয়ে ওঠা কুঁড়েঘরগুলো জায়গাটাকে নতুন একটা বসতিতে পরিণত করল। ডাচদের মধ্য থেকে একমাত্র যে সেখানে গিয়েছিল সে ছিল একজন আদমশুমারির দায়িত্বপ্রাপ্ত কন্ট্রোলার। এক সপ্তাহ পরে তাকে তার ভাড়া করা ঘরে মৃত পাওয়া গেল। সে ম্যালেরিয়া জ্বরে ভুগে সে মারা গেছে। বহু বছরের মধ্যে মা গেদিকের কাছে আসা শেষ মানুষটিই ছিল সে। সেই রাতে কলিব্রি গাড়ির চালক তার মোকাব্বেল কুকুরকে গুলি করল আর দাপুটে লোকটা তার দরজা লাথি দিয়ে ভাঙল। সাথে চমকের খবর: দেবী আয়ু তাকে বিয়ে করতে চায়।
কেন সে তাকে বিয়ে করতে চায় সে বুঝতে পারছিল না। তাই তার মাথায় একটা অন্ধকার গল্প তৈরি হতে শুরু করল। এখনো কাঁপতে কাঁপতে সে দাপুটে লোকটাকে জিজ্ঞেস করল : "সে কি গর্ভবতী?" সে সম্ভবত ডাচ পরিবারের লজ্জা ঢাকতে তাকে বিয়ে করতে বাধ্য হচ্ছে।
"কে গর্ভবতী?"
"দেবী আয়ু।"
"সে যদি তোমাকে বিয়ে করতে চায়," দাপুটে লোকটা বলল, "তাহলে নিশ্চয়ই এজন্য যে সে গর্ভবতী হতে চায় না।"
দেবী আয়ু তার হবু বরকে আনন্দের সাথে স্বাগত জানাল। সে তাকে গোসল করতে বলল আর ভালো পোশাক দিল পরতে। কারণ, সে বলল, গ্রামের মোড়ল শীঘ্রই আসবে। কিন্তু এতে মা গেদিকের মনে আনন্দ এলো না, বরং উল্টো। তার মনে হলো এটা সম্পূর্ণ বিপর্যয়। বিয়ের সময় যতই কাছে আসতে লাগল, সে ততই বিষণ্ণ হয়ে গেল।
"হাসো, প্রিয়," দেবী আয়ু বলল। "না হলে আজাক তোমাকে খেয়ে নেবে।"
"বলো, কেন তুমি আমাকে বিয়ে করতে চাও?"
"সারা সকাল ধরে একই কথা বলছ," দেবী আয়ু একটু বিরক্ত হয়ে বলল। "তুমি কি মনে করো অন্য মানুষরা বিয়ে করার এত ভালো কারণ খোঁজে?"
"সাধারণত কারণ হয় তারা একে অপরকে ভালোবাসে।"
"আর এটা ঠিক উল্টো, আমরা একে অপরকে একটুও ভালোবাসি না," দেবী আয়ু বলল। "তাহলে এটাই কি ভালো কারণ নয়?"
দেবী আয়ু মাত্র ষোল বছর বয়সী। অনেক মিশ্র রক্তের মেয়ের মতো সে ছিল সুন্দরী। চকচকে কালো চুল আর নীলাভ চোখ। সে পরেছে তুলোর বিয়ের পোশাক, মাথায় ছোট একটা মুকুট। তাকে গল্পের বইয়ের পরীর মতো দেখাচ্ছে। স্টামলার পরিবারের বাড়ির এখন সে একাই কর্ত্রী। বাকি পরিবার ব্যাগ গুছিয়ে অন্য ডাচ পরিবারের সাথে বন্দরে ছুটে গেছে। যতক্ষণ সময় আছে এর মধ্যে অস্ট্রেলিয়ায় পালাতে হবে। জাপানি সেনাবাহিনী সিঙ্গাপুর দখল করেছে। হালিমুন্ডায় এখনো পৌঁছায়নি ঠিকই, কিন্তু সম্ভবত তারা ইতিমধ্যে বাটাভিয়ায় এসে গেছে।
যুদ্ধের কথা আসলে মাসখানেক আগেই এসেছিল। রেডিওতে শোনা গেল ইউরোপে যুদ্ধ শুরু হয়েছে। সেই সময় দেবী আয়ু ফ্রান্সিসকান স্কুলে পড়া শুরু করেছে। বহু বছর পরে এই স্কুলটাই মিডল স্কুলে পরিণত হবে, যেখানে তার নাতনি রেংগানিস দ্য বিউটিফুলকে একটা টয়লেটে কুকুর ধর্ষণ করবে। নার্স হতে চায়নি দেবী আয়ু। শিক্ষিকা হতে চেয়েছিল অত্যন্ত সহজ একটা কারণে। সে তার খালা হান্নেকের সাথে স্কুলে যেত। হান্নেকে কিন্ডারগার্টেনে পড়াতেন। যাতায়াত করতেন সেই একই কলিব্রি গাড়িতে, যেটা শীঘ্রই মা গেদিককে আনতে যাবে। আর সেই একই চালক, যে বৃদ্ধের কুকুরকে গুলি করবে।
হালিমুন্ডার সেরা শিক্ষকরা তাকে পড়াতেন। নানরা তাকে সংগীত, ইতিহাস, ভাষা আর মনোবিজ্ঞান শেখাতেন। মাঝে মাঝে সেমিনারি থেকে জেসুইট পাদ্রিরা আসতেন ধর্মশিক্ষা, চার্চের ইতিহাস আর ধর্মতত্ত্ব পড়াতে। তার স্বাভাবিক মেধায় তারা মুগ্ধ হতেন, কিন্তু তার সৌন্দর্যে চিন্তিত হতেন। কয়েকজন নান তাকে দারিদ্র্য, পবিত্রতা আর ব্রহ্মচর্যের শপথ নিতে রাজি করাতে চেষ্টা করলেন। "কোনোভাবেই না," সে বলল। "সব মেয়ে যদি এরকম শপথ নেয়, তাহলে মানুষ ডায়নোসরের মতো বিলুপ্ত হয়ে যাবে।" তার কথা বলার এই চমকানো ধরন তার সৌন্দর্যের চেয়েও বেশি বিরক্তিকর ছিল। যাই হোক, ধর্মের মধ্যে সে শুধু কল্পনাপ্রবণ গল্পগুলো পছন্দ করত। আর চার্চের মধ্যে পছন্দ ছিল শুধু অ্যাঞ্জেলাস ঘণ্টার মিষ্টি সুর।
ফ্রান্সিসকান স্কুলে তার প্রথম বছরে ইউরোপে যুদ্ধ বেধে গেল। সিস্টার মারিয়া ক্লাসের সামনে যে রেডিও রেখেছিলেন, সেখান থেকে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জানানো হলো জার্মান সৈন্যরা নেদারল্যান্ডস আক্রমণ করেছে। মাত্র চার দিনেই দেশটি দখল করে নিয়েছে। ছেলেমেয়েরা অবাক বিস্ময়ে মেতে উঠল। যুদ্ধ সত্যিই হয়। সেটা শুধু ইতিহাস বইয়ের গালগল্প নয়। তার উপর যুদ্ধ লেগেছে তাদের পূর্বপুরুষের দেশে, আর হল্যান্ড হেরে গেছে।
"প্রথমে ফ্রান্স, এখন জার্মানি দখল করছে!" দেবী আয়ু বলল। "সত্যিই একটা করুণ দেশ।"
"কী বলছ তুমি, দেবী আয়ু?" সিস্টার মারিয়া জিজ্ঞেস করলেন।
"বলছি আমাদের অনেক বণিক আছে, কিন্তু সৈনিক নেই।"
অনুচিত মন্তব্যের শাস্তি হিসেবে তাকে গীতসংহিতা পড়তে বাধ্য করা হলো। তবু সহপাঠীদের মধ্যে দেবী আয়ুই একমাত্র যে যুদ্ধের খবরে আনন্দিত হয়েছিল। সে এমনকি একটা শীতল ভবিষ্যদ্বাণীও করল: যুদ্ধ ইস্ট ইন্ডিজ পর্যন্ত পৌঁছাবে, এমনকি হালিমুন্ডাতেও আসবে। ইউরোপে পরিবারের নিরাপত্তার জন্য নানদের নেতৃত্বে প্রার্থনায় সে যোগ দিল ঠিকই, কিন্তু দেবী আয়ুর মনে তেমন কোনো উদ্বেগ ছিল না।
যুদ্ধের উদ্বেগ অবশ্য তার বাড়িতেও ছড়িয়ে পড়েছিল। বিশেষত কারণ তার দাদা-দাদি টেড আর মারিয়েৎজে স্টামলারের নেদারল্যান্ডসে অনেক পরিজন আছে। তারা ক্রমাগত হল্যান্ড থেকে চিঠির অপেক্ষা করত। চিঠিগুলো কখনো এলই না। সবচেয়ে বেশি তারা চিন্তিত ছিল দেবী আয়ুর বাবা-মা হেনরি আর আনেউ স্টামলারকে নিয়ে। তারা পালিয়ে গিয়েছিল। ষোল বছর আগে এক সকালে হঠাৎ বিদায়ও না নিয়ে চলে গিয়েছিল। শিশু দেবী আয়ুকে রেখে গিয়েছিল। এটা পরিবারকে সত্যিই ক্ষুব্ধ করেছিল। তবু তারা পালিয়ে যাওয়া সন্তানের জন্য এখনো চিন্তিত ছিল।
"তারা যেখানেই থাকুক, আশা করি সুখে আছে," টেড স্টামলার বললেন।
"আর জার্মানরা যদি তাদের মেরে ফেলে, তাহলে তারা যেন স্বর্গে সুখে থাকে," দেবী আয়ু বলল। তারপর নিজেই উত্তর দিল, "আমিন।"
"ষোল বছর পরে আমার আর রাগ নেই," মারিয়েৎজে বললেন। "তুমি বরং প্রার্থনা করো যেন তাদের সাথে দেখা হয়।"
"অবশ্যই চাই, ওমা। তারা আমার কাছে ষোলটা ক্রিসমাসের উপহার আর ষোলটা জন্মদিনের উপহার দেনা রেখেছে। ষোলটা ইস্টার ডিমের কথা তো বাদই দিলাম।"
সে তার বাবা-মা হেনরি আর আনেউ স্টামলারের কথা আগেই জানত। রান্নাঘরের কাজের লোকেরা ফিসফিস করে গল্পটা বলেছিল। কারণ টেড বা মারিয়েৎজে স্টামলার জানলে তাদের চাবুক মারত। কিন্তু কিছুদিন পর টেড আর মারিয়েৎজে বুঝলেন দেবী আয়ু সব শুনে ফেলেছে। সেই অংশটাসহ যে এক সকালে তারা তাকে তাদের দরজায় একটা ঝুড়িতে শুয়ে থাকতে পেয়েছিলেন। কাঁথায় মোড়ানো অবস্থায় সে ছিল গভীর ঘুমে। সাথে একটা ছোট চিরকুটে তার নাম লেখা। লেখা ছিল তার বাবা-মা অরোরা জাহাজে ইউরোপের উদ্দেশ্যে পাড়ি দিয়েছে।
তার বাবা-মা নেই, শুধু দাদা-দাদি আর খালা আছে, এটা সে সবসময় অবাক হয়ে ভাবত। কিন্তু যখন বুঝল তার বাবা-মা এক সকালে উধাও হয়ে গেছে তখন তার রাগ হলো না। বরং একেবারে উল্টো-- সে মুগ্ধ হয়ে গেল।
"তারা সত্যিকারের অ্যাডভেঞ্চারার," সে টেড স্টামলারকে বলল।
"তুমি বেশি গল্পের বই পড়, মেয়ে," তার দাদা জবাব দিলেন।
"তারা নিশ্চয়ই ধার্মিক। বাইবেলে এক মায়ের কথা আছে যিনি সন্তানকে নীল নদের তীরে রেখে গিয়েছিলেন।"
"সেটা আলাদা ব্যাপার ছিল।"
"হ্যাঁ, অবশ্যই। আমাকে রাখা হয়েছিল দরজার সামনে।"
হেনরি আর আনেউ দুজনেই ছিল টেড স্টামলারের সন্তান। শৈশব থেকেই তারা একই বাড়িতে ছিল। কিন্তু কেউ বুঝতে পারেনি যে তারা প্রেমে পড়ে গেছে। এটা ছিল সত্যিই একটা লজ্জাজনক কেলেঙ্কারি। মারিয়েৎজের গর্ভে জন্ম হেনরির। সে আনেউয়ের চেয়ে দুই বছরের বড়। আনেউ ছিল মা ইয়াং নামের এক দেশীয় রক্ষিতার সাথে টেডের সন্তান। মা ইয়াং আলাদা বাড়িতে থাকত। দুজন দাপুটে প্রহরী ছিল তার পাহারায়। তবু আনেউ জন্মের পর টেড তাকে নিজের বাড়িতে রাখার সিদ্ধান্ত নিলেন। প্রথমে মারিয়েৎজে তুমুল আপত্তি করলেন। কিন্তু কী করা, বেশিরভাগ পুরুষেরই তো রক্ষিতা আর অবৈধ সন্তান থাকে। মেয়েটাকে বাড়িতে রাখতে তিনি শেষমেশ মেনে নিলেন । ক্লাবে গসিপ এড়াতে তাকে পারিবারিক পদবিও দিলেন।
তারা একসাথে বড় হলো। তাই প্রেমে পড়ার প্রচুর সময় পেয়েছিল। হেনরি ছিল মিষ্টি স্বভাবের যুবক। রাশিয়া থেকে সরাসরি আনানো বোরজোই কুকুর দিয়ে শুয়োর শিকারে দক্ষ। ফুটবল, সাঁতার আর নাচেও সে ছিল ভালো। আনেউ বড় হয়ে সুন্দরী যুবতী হলো। পিয়ানো বাজাত আর মিষ্টি সোপ্রানো গলায় গান গাইত। টেড আর মারিয়েৎজে তাদের রাতের মেলায় আর নাচঘরে যাওয়ার অনুমতি দিলেন। এখন আনন্দ করার সময়, হয়তো ভালো পাত্র-পাত্রীও মিলতে পারে। কিন্তু এখান থেকেই শুরু হলো সর্বনাশ। মধ্যরাত পর্যন্ত নাচ আর উৎসবের রেস্তোরাঁর লেবুর শরবত পান করার পর তারা আর বাড়ি ফিরল না।
টেড চিন্তিত হলেন। দুজন দাপুটে লোক নিয়ে রাতের মেলায় তাদের খুঁজতে বের হলেন। শুধু পেলেন থেমে যাওয়া অন্ধকার একটা ঘূর্ণিচক্র, শক্ত তালাবন্ধ ভুতের বাড়ি, ফাঁকা নাচঘর, বন্ধ হয়ে যাওয়া খাবারের দোকান, আর কিছু ক্লান্ত কেরানি। কেরানিরা নিজেদের কিওস্কের সামনে ঘুমিয়ে পড়েছে। কিশোর-কিশোরীদের কোনো চিহ্ন নেই। তখন টেড তাদের তরুণ বন্ধুদের জিজ্ঞেস করলেন তারা কোথায়। কেউ একজন বলল : "হেনরি আর আনেউ উপসাগরে গেছে।"
রাতে উপসাগরে কিছু আবাসিক বাড়ি ছাড়া আর কিছু নেই। টেড একটা একটা করে খুঁজলেন। একটা ঘরে নগ্ন অবস্থায় হতভম্ব হয়ে দুজনকে পেলেন। টেড একটা কথাও বললেন না। আর তারাও কোনোদিন বাড়ি ফিরল না।
এরপর তারা কোথায় গেল কেউ জানে না। হয়তো কোনো আবাসিক বাড়িতে ছিল, ছুটকো কাজ করে বা বন্ধুদের কাছ থেকে ধার নিয়ে বা দানে বেঁচে ছিল। হয়তো জঙ্গলে গিয়ে ফল আর শুয়োরের মাংস খেয়ে থাকছিল। কেউ বলল তারা বাটাভিয়ায় ট্রেন কোম্পানিতে কাজ করছে। টেড আর মারিয়েৎজে কোনোদিন তাদের খোঁজখবর পেলেন না। তারপর এক সকালে টেড সামনের দরজায় একটা ঝুড়িতে শিশু পেলেন।
"আর সেই শিশুটাই তুমি," টেড বললেন। "তারা তোমার নাম রেখেছিল দেবী আয়ু।"
"তারপর তারা অরোরায় আরও শিশু বানাল... ইউরোপের সব বাড়ির সামনে হয়তো ঝুড়ি আছে," মেয়েটা বলল।
"যখন জানা গেল তাদের খবর তখন তোমার দাদি হিস্টেরিক হয়ে গেলেন। পাগলের মতো বাড়ি থেকে তিনি দৌড়ে বের হলেন, ঘোড়া বা গাড়িতেও তাকে ধরা যাচ্ছিল না। পাথুরে পাহাড়ের চূড়ায় তাকে পাওয়া গেল, কিন্তু তিনি আর নামলেন না। বরং উড়ে গেলেন।"
"দাদি মারিয়েৎজে উড়লেন?" দেবী আয়ু জিজ্ঞেস করল।
"না, মা ইয়াং।"
মা ইয়াং রক্ষিতা-- তার অন্য দাদি। তার দাদার কথামতো, পিছনের বারান্দায় বসে উত্তরে তাকালে দুটো ছোট পাথুরে পাহাড় দেখা যায়। পশ্চিমের পাহাড় থেকে মা ইয়াং উড়ে আকাশে মিলিয়ে গিয়েছিল। স্থানীয়রা পাহাড়টার নাম তার নামে রেখেছে: মা ইয়াং। নামটা চমকপ্রদ, কিন্তু একটু বিষণ্ণও। দেবী আয়ু প্রায়ই বিকেলে একা বসে সেই পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে থাকত। আশা করত তার দাদিকে এখনো ফড়িংয়ের মতো ভাসতে দেখবে। শুধু যুদ্ধ তার মনোযোগ সরিয়ে দিল। এরপর দেবী আয়ু বেশিরভাগ সময় রেডিওর সামনে বসে যুদ্ধের খবর শুনতে লাগল।
যুদ্ধ তখনো দূরে, তবু তার প্রভাব হালিমুন্ডায় অনুভূত হচ্ছিল। আরও কয়েকজন ডাচমানের সাথে মিলে টেড স্টামলার জেলার সবচেয়ে বড় কোকো বীন আর নারকেল বাগানের মালিক ছিলেন। যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক বাণিজ্য ভেঙে পড়েছে। আয় কমে গেল, ব্যবসা ডুবতে বসল। পরিবারগুলো সাশ্রয়ী হয়ে গেল। মারিয়েৎজে কেবল বাড়ি বাড়ি ঘুরে বেড়ানো ফেরিওয়ালাদের কাছ থেকে খাবার কিনতেন। হান্নেকে সিনেমা দেখা আর রেকর্ড কেনার অভ্যাস কমিয়ে দিলেন। এমনকি মিস্টার উইলি, ইন্দো মানুষটা যে তাদের হয়ে পাহারাদার আর মেকানিকের কাজ করত, তাকেও বন্দুকের গুলি আর কলিব্রির তেলের খরচ কমাতে হলো। আর দেবী আয়ুকে স্কুলের ছাত্রাবাসে চলে যেতে হলো।
ফ্রান্সিসকান নানরা যুদ্ধের সময় এভাবেই সাহায্য করার চেষ্টা করলেন। বিনা খরচে ছাত্রাবাসের দরজা খুলে দিলেন। এখন স্কুলের সব ক্লাস উদ্বিগ্ন যুদ্ধের গল্পে ভরে গেল। যুদ্ধ এখন একেবারে নিজেদের দোরগোড়ায়। দেবী আয়ু অন্তহীন বক্তৃতায় ধৈর্য হারিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে জোরে জিজ্ঞেস করল : "এখানে বসে কথা বলার চেয়ে রাইফেল আর কামান চালানো শিখছি না কেন?"
নানরা তাকে এক সপ্তাহের জন্য বহিষ্কার করল। যুদ্ধ চলছিল বলে তার দাদা তাকে বাড়তি শাস্তি দিলেন না। পার্ল হারবারে বোমা পড়ার ঠিক পরেই সে স্কুলে ফিরল। সিস্টার মারিয়া সাধারণত হাসিমুখে ইতিহাস পড়াতেন। এবার গম্ভীর মুখে বললেন : "আমেরিকার হস্তক্ষেপের সময় এসেছে।"
তারা বুঝল যুদ্ধ এখন অনেক কাছে। ঘাসের মধ্যে টিকটিকির মতো এগিয়ে আসছে। ধীরে কিন্তু নিশ্চিতভাবে পৃথিবীর মুখ রক্ত আর গুলির খোসায় ঢেকে যাচ্ছে। দেবী আয়ুর পরামর্শ এখন ভবিষ্যদ্বাণীর মতো মনে হচ্ছে। তবে জার্মান নয়, জাপানিরা এগিয়ে আসছে। নিজের বিস্তৃত এলাকায় বাঘ যেমন প্রস্রাব করে নিজের সীমানা চিহ্নিত করে, তেমনি উদীয়মান সূর্যের পতাকা প্রথমে ফিলিপাইনে উড়তে শুরু করল। তারপর হঠাৎই সিঙ্গাপুরেও উড়তে লাগল।
বাড়িতে এতে বড় সমস্যা দেখা দিল। টেড স্টামলার তখনো বৃদ্ধ নন। অন্য সব প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের মতো বাধ্যতামূলক সামরিক সেবার নোটিশ পেলেন তিনি। এটা শুধু টাকা বাঁচানোর চেষ্টার চেয়ে অনেক কঠিন পরিস্থিতি। হান্নেকে কাঁদতে কাঁদতে তাকে কিছু রক্ষামূলক তাবিজ দিলেন। দেবী আয়ু ভালো পরামর্শ দিল: "গুলি খেয়ে মরার চেয়ে শত্রুর হাতে বন্দি হওয়া অনেক ভালো।"
টেড চলে গেলেন। কেউ জানে না কোথায় পোস্টিং হবে। তবে সম্ভবত জাপানি বাহিনীকে ঠেকাতে সুমাত্রায় পাঠানো হবে। জাপানি বাহিনী দ্রুত জাভার দিকে এগিয়ে আসছে। হালিমুন্ডা ছেড়ে টেড চলে গেলেন। বাগানের অন্য পরিবারের লোকদের সঙ্গে তার নিজের পরিবারকে রেখে গেলেন। শহরের চত্বরে তার সাথে বিদায় বলতে গিয়ে মারিয়েৎজে কাঁদতে কাঁদতে বললেন: "জীবনের দিব্যি, শুয়োর শিকারেও তার নিশানা এতটাই বাজে যে কখনো মেরে উঠতে পারেননি।" তিনি এখন সংসারের কর্ত্রী হিসেবে স্বামীর জায়গা নিলেন। এতটাই করুণ দেখাচ্ছিল যে মেয়ে আর নাতনি তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করল। মিস্টার উইলি প্রায় প্রতিদিন আসতেন। তাকে যুদ্ধে ডাকা হয়নি কারণ তিনি ইন্দো মানুষ, কখনো ডাচ নাগরিক হিসেবে নাম নথিভুক্ত করেননি। তাছাড়া বুনো শুয়োরের ধাক্কায় তার এক পা খোঁড়া হয়ে গিয়েছিল।
"শান্ত থাকো দাদি, জাপানিদের চোখ এতটাই সরু যে মানচিত্রে হালিমুন্ডা খুঁজে পাবে না," দেবী আয়ু বলল। সে অবশ্য মারিয়েৎজেকে ভালো বোধ করাতে চাইছিল। কিন্তু দাদির মুখে হাসির ছিটেফোঁটাও এলো না।
শহরজুড়ে বিষণ্ণতা ছড়িয়ে পড়ল। রাতের বাজার বন্ধ হয়ে গেল, কেউ ক্লাবে যায় না। নাচ নেই, বাগানের অফিস পাহারা দিচ্ছে গুটিকয়েক দুর্বল বৃদ্ধ। মানুষ শুধু সুইমিং পুলে চুপচাপ ভিজতে আসত। সেই সময় হালিমুন্ডায় বসবাসকারী সব জাপানি মানুষ উধাও হয়ে গেল। কেউ কৃষক ছিল, কেউ বণিক, একজন ফটোগ্রাফার, আরও কয়েকজন সার্কাসের কসরতবাজ। তারা হঠাৎ গায়েব হতেই সবাই বুঝল এতদিন তাদের মাঝে শত্রুর গোয়েন্দারা বাস করছিল।
শুধু দেশীয় মানুষরা এসব নিয়ে মাথা ঘামাল না। তারা যা করত তাই করতে থাকল। গাড়িচালকরা দলে দলে বন্দরের দিকে গেল। কারণ ব্যাবসা বাণিজ্য চলছিল আর চলাচল করছিল মালবাহী জাহাজ। কৃষকরা মাঠে কাজ করল। জেলেরা প্রতি রাতে সমুদ্রে গেল।
নিয়মিত সৈন্যরা হালিমুন্ডার বন্দরে এসে পৌঁছাল। এটা এখন জাভার পুরো দক্ষিণ উপকূলের সবচেয়ে বড় বন্দর। অস্ট্রেলিয়ায় গণউচ্ছেদের সম্ভাব্য প্রবেশদ্বার। শুরুতে এটা ছিল রেংগানিস নদীর বড় মোহনায় একটা সাধারণ মাছ ধরার বন্দর। সমুদ্রযাত্রার কোনো ঐতিহ্য ছিল না। উপকূল আর ভেতরের এলাকার মানুষ এখানে পণ্য বিনিময় করতে আসত। জেলেরা মাছ, লবণ আর চিংড়ির পেস্টের বিনিময়ে চাল, সবজি আর মশলা নিত।
তারও অনেক আগে হালিমুন্ডা ছিল শুধু জলাবদ্ধ জঙ্গল, কুয়াশাচ্ছন্ন একটা এলাকা। কারো মালিকানায় ছিল না। পাজাজারান রাজ্যের শেষ প্রজন্মের এক রাজকন্যা সেখানে পালিয়ে এসেছিল। আর জায়গাটার নাম দিয়েছিল হালিমুন্ডা। তার বংশধররা সেটাকে গ্রাম আর শহরতলিতে পরিণত করেছিল। মাতারাম রাজ্য তাদের বিদ্রোহী রাজকুমারদের সেখানে নির্বাসিত করত। ডাচরা শুরুতে এই জেলায় মোটেই আগ্রহী ছিল না। জলাভূমিতে ম্যালেরিয়ার ভয়, বন্যা অনিয়ন্ত্রণযোগ্য, রাস্তাঘাট বেহাল। আঠারো শতকের মাঝামাঝি প্রথম বড় জাহাজ সেখানে নোঙর করল। ইংরেজ জাহাজ দ্য রয়্যাল জর্জ এসেছিল শুধু মিষ্টি পানি নিতে-- বাণিজ্য করতে নয়। তবু ডাচ প্রশাসন একটু চটে গেল। সন্দেহ হলো ইংরেজরা আসলে কফি আর নীল কিনেছে, হয়তো মুক্তাও, আর হয়তো দিপোনেগোরোর কাছে মজুদ করতে হালিমুন্ডা দিয়ে অস্ত্র পাচার করছে। তাই শেষ পর্যন্ত প্রথম ডাচ অভিযান এলো। তারা এলো জায়গাটা দেখতে আর মানচিত্র আঁকতে।
একজন লেফটেন্যান্ট, দুজন সার্জেন্ট, দুজন কর্পোরাল আর প্রায় ষাটজন সশস্ত্র সৈন্য হলো হালিমুন্ডায় বসবাসকারী প্রথম ডাচ। তাদের ছোট্ট গ্যারিসন হালিমুন্ডায় একটা আনুষ্ঠানিক চৌকি খুলল। দিপোনেগোরো যুদ্ধের পর চাষ ব্যবস্থা শুরু হলে। হালিমুন্ডার ভেতরের এলাকায় প্রচুর কফি আর নীল জন্মাত। সেই ফসল অভ্যন্তরীণ সড়ক দিয়ে জাভা পার হয়ে বাটাভিয়ায় যেত। পরে এই গ্যারিসন তৈরি হয়েছিল। কোকো বাগান করার শুরু করেছিল ডাচরা। এই পথে ঝুঁকি ছিল অনেক। পথে পণ্য নষ্ট হতে পারে। রাস্তায় চোরের উপদ্রব ছিল। হালিমুন্ডার গ্যারিসন আর বন্দর খোলার পর ফসল সরাসরি জাহাজে তুলে ইউরোপে বিক্রি করতে পাঠানো যেত। গাড়ি আর ওয়াগন চলাচলের জন্য চওড়া রাস্তা তৈরি হলো। বন্যা ঠেকাতে খাল খোঁড়া হলো, বন্দরের চারদিকে গুদামঘর উঠল। উত্তরের কোনো বন্দরের তুলনায় কখনো তেমন গুরুত্বপূর্ণ না হলেও ঔপনিবেশিক সরকার হালিমুন্ডাকে চিনতে পারল। অবশেষে বন্দর বেসরকারি ব্যবসার জন্য খুলে দেওয়া হলো।
প্রথম ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ছিল নেদারল্যান্ডস ইন্ডিশ স্টুমভার্তমাৎস্খাপেই। তাদের বেশ কয়েকটা পালতোলা জাহাজ ছিল। বিশেষত রেলপথ খোলার পর কিছু গুদাম ব্যবসাও গড়ে উঠল, । রেললাইন দ্বীপটাকে পূর্ব থেকে পশ্চিমে পার করেছে। তবে ব্যবসা সেখানে কখনো সোনালি যুগে পৌঁছায়নি। বরং প্রথম গ্যারিসন তৈরির পর ঔপনিবেশিক সরকার হালিমুন্ডাকে সামরিক ঘাঁটিতে পরিণত করল। তারা কৌশলগত সুযোগ দেখল। দক্ষিণ উপকূলের একমাত্র বড় বন্দর হিসেবে শহরটা পিছনের দরজার মতো কাজ করতে পারে। যুদ্ধ লাগলে সুন্দা বা বালি প্রণালি পার না হয়ে ডাচরা এই পথে অস্ট্রেলিয়ায় সরে যেতে পারবে।
বন্দর আর শহর রক্ষায় সৈকতে দুর্গ তৈরি আর কামান বসানো শুরু হলো। জঙ্গলের পাহাড়চূড়ায় পর্যবেক্ষণ টাওয়ার উঠল। বহু বছর আগে পাজাজারান রাজ্যের সেই রাজকন্যা যে অন্তরীপে এসেছিলেন সেখানে। একশো কামান সৈন্য আনা হলো। বিশ বছর পরে পঁচিশটা বিশাল আর্মস্ট্রং কামান বসানো হলো। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে আরও সামরিক ব্যারাক তৈরিতে প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা সর্বোচ্চে পৌঁছাল। এখান থেকেই হালিমুন্ডায় অনেক কিছুর শুরু হলো। বেশ্যাপল্লি, বেসরকারি ক্লাব, হাসপাতাল, ম্যালেরিয়া নির্মূলের চেষ্টা। ডাচ ব্যবসায়ীরা শহরে আসতে শুরু করল। কেউ কেউ কোকোর বাগান তৈরি করে বহু বছর থেকে গেল।
যুদ্ধ শুরু হয়ে জার্মানি হল্যান্ড দখল করার পর সব সামরিক সুবিধা উন্নত করা হলো, আরও সৈন্য আনা হলো। তারপর রেডিওতে ঘোষণা হলো-- দুটো ইংরেজ যুদ্ধজাহাজ, প্রিন্স অব ওয়েলস আর রিপালস, জাপান ডুবিয়ে দিয়েছে। মালয় উপদ্বীপ শত্রুর হাতে পড়েছে। জাপানের জয় সেখানেই থামল না। মালয় উপদ্বীপ দখলের কিছুদিন পরেই ইংরেজ প্রতিরক্ষার কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল আর্থার পার্সিভাল সিঙ্গাপুরের আত্মসমর্পণে সই করলেন। দীর্ঘদিন ধরে এটাকে সবচেয়ে শক্তিশালী ব্রিটিশ ঘাঁটি বলা হতো। সব কিছু আরও খারাপ হচ্ছিল। তারপর এক সকালে একজন কন্ট্রোলার হালিমুন্ডার বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে এমন কথা বলল যা হাড় হিম করে দিল : "সুরাবায়ায় জাপান বোমা ফেলেছে।"
দেশীয় শ্রমিকরা কাজ থামিয়ে দিল। সব বাণিজ্য থমকে গেল। "আপনাদের সরে যেতে হবে, মিস," তারা মারিয়েৎজে স্টামলারকে বলল। হান্নেকে আর দেবী আয়ুসহ তিনি কোনো জবাব দিলেন না।
শহর দ্রুত শরণার্থীতে ভরে গেল। ট্রেনে বা ব্যক্তিগত গাড়িতে এসে তারা শহরের সীমা ছাড়িয়ে নালায় অব্দি ছড়িয়ে পড়ল। মালিকরা রাতের পর রাত লাইনে দাঁড়িয়ে জাহাজে উঠার সুযোগের অপেক্ষা করল। উচ্ছেদে সাহায্য করতে বন্দরে এলো প্রায় পঞ্চাশটা সামরিক জাহাজ । সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেল। ইস্ট ইন্ডিজের পরাজয় নিশ্চিত মনে হচ্ছিল।
কখন যেতে পারবে তার নিশ্চয়তা পেয়ে স্টামলার পরিবারের বাকিরা তাড়াহুড়ো করে গোছগাছ শুরু করল। কিন্তু দেবী আয়ুর হঠাৎ ঘোষণায় সবাই থমকে গেল : "আমি যাচ্ছি না।"
"বোকামি করো না মেয়ে," হান্নেকে বললেন। "জাপান তোমাকে ছাড়বে না।"
"যাই হোক, একজন স্টামলারকে এখানে থাকতে হবে," সে জেদ ধরে বলল। "কার জন্য অপেক্ষা করতে হবে তা তুমিও জানো।"
তার একগুঁয়েমিতে কেঁদে মারিয়েৎজে বিলাপ করলেন, "তোমাকে যুদ্ধবন্দি করবে!"
"দাদি, আমার নাম দেবী আয়ু। সবাই জানে এটা একটা দেশীয় নাম।"
জাপান সুরাবায়ায় বোমা বর্ষণের পর তাদের লক্ষ্যস্থল তানজুং প্রিউকের দিকে এগিয়ে চলল। ঔপনিবেশিক সরকারের বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা প্রথমে সরে পড়লেন। শেষ পর্যন্ত মারিয়েৎজে ও হান্নেকে স্টামলার বিশাল বাষ্পীয় জাহাজ ‘জানদামে’ উঠে পড়লেন। যুদ্ধক্ষেত্রে টেডের ভাগ্য কী হলো জানলেন না। দেবী আয়ু জেদ ধরায় তাকে রেখে গেলেন। জাহাজটা বহুবার যাত্রীদের আনা-নেওয়া করেছিল। কিন্তু এটাই ছিল শেষ যাত্রা। জানদাম আর আরেকটা জাহাজ একটা জাপানি ক্রুজারের মুখে পড়ল। লড়াই ছাড়াই দুটো ডুবে গেল। দেবী আয়ু, মিস্টার উইলি, কাজের লোক আর দাপুটে প্রহরীদের জন্য শোকের দিন নেমে এলো।
ফিলিপাইনের বাতানে যুদ্ধের পর আটচল্লিশতম ডিভিশনের একটা জাপানি পদাতিক বাহিনী ক্রাগানে নামল। তাদের অর্ধেক সুরাবায়া হয়ে মালাঙে গেল, বাকি অর্ধেক হালিমুন্ডায় এলো। নিজেদের নাম দিল সাকাগুচি ব্রিগেড। জাপানি বিমান আকাশে উড়ে বাটাফসে পেট্রোলিয়াম মাৎস্খাপেইয়ের মেক্সোলি ওলভাদোর তেল শোধনাগারে বোমা ফেলছে। বোমা ফেলছে শ্রমিকদের আবাসনে আর কোকো-নারকেল বাগানের অফিসে। সাকাগুচি ব্রিগেড শহরের বাইরে শক্ত অবস্থান নেওয়া ডাচ কেএনআইএল বাহিনীর সাথে মাত্র দুদিন লড়াই করেছে। এই সময় জেনারেল পি. মেইয়ার খবর পেলেন হল্যান্ড কালিজাতিতে আত্মসমর্পণ করেছে। পুরো ইস্ট ইন্ডিজ উলটে দখল হয়ে গেছে। জেনারেল পি. মেইয়ার সিটি হলে হালিমুন্ডার নিয়ন্ত্রণ জাপানের হাতে তুলে দিলেন।
দেবী আয়ু এই সব ঘটনা নিজের চোখে দেখল, নিজের কানে শুনল। তবু শোকের দিনগুলোতে কারো সাথে কথা বলল না। শুধু বাড়ির পেছনের বারান্দায় বসে থাকত। যে পাহারটার নাম মা ইয়াংয়ের নামে হয়েছিল বলে জানিয়েছিল টেড সেই পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে থাকত সে। একদিন বিকেলে মিস্টার উইলিকে পেছনের উঠানে দেখল। সাথে একটা বোরজোই কুকুর। এটা নাকি তার বাবা হেনরির ছিল। শোকের পর এই প্রথম সে কথা বলল।
"একজন উড়ে গেল, আরেকজন ডুবে গেল।"
"কী হলো, মিস?" মিস্টার উইলি জিজ্ঞেস করলেন।
"ওহ, শুধু আমার দাদিদের কথা মনে পড়ছে," সে বলল।
"আপনাকে কিছু একটা করতে হবে মিস, কাজের লোকেরা দিশাহারা হয়ে গেছে। আপনি কি এখন এই পরিবারের কর্ত্রী নন?"
সে মাথা নাড়ল। সেই সন্ধ্যায় সূর্য ডোবার সময় সে মিস্টার উইলিকে সব গৃহভৃত্য জড়ো করতে বলল। রাঁধুনি, ঝিয়েরা, বাগানের লোকজন, পাহারাদার সবাই। সে তাদের বলল সে এখন বাড়ির একমাত্র কর্ত্রী। তার সব আদেশ মানতে হবে, কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। সে কাউকে চাবুক মারবে না, কিন্তু টেড স্টামলার বাড়ি ফিরলে সব বিদ্রোহীকে চাবুক মারবেন আর আজাকের খাঁচায় ছুঁড়ে দেবেন। তার প্রথম আদেশ কাউকে বিরক্ত না করলেও সবাইকে অবাক করল আর বিভ্রান্ত করল:
"আজ রাতে কাউকে জলাভূমির বসতি থেকে মা গেদিক নামে এক বৃদ্ধকে তুলে আনতে হবে," সে বলল। "কারণ কাল সকালে আমি তাকে বিয়ে করব।"
"মজা করবেন না মিস," মিস্টার উইলি বললেন।
" যদি মজা মনে হয় হাসতে পারো ।"
"কিন্তু পাদ্রি উধাও হয়ে গেছে আর চার্চ বোমায় টুকরো টুকরো হয়ে গেছে!"
"গ্রামের মোড়ল তো আছে।"
"মিস, আপনি কি মুসলিম হয়ে গেছেন?"
"না, তবে অনেকদিন ধরে ক্যাথলিকও নই।"
এভাবেই শুরু হলো দেবী আয়ুর মা গেদিকের সাথে বিয়ের গল্প। করুণ এক বৃদ্ধের সাথে সুন্দরী তরুণীর বিয়ে। খবর দ্রুত শহরের প্রতিটা কোণে ছড়িয়ে পড়ল। এমনকি এ শহরে আসতে থাকা জাপানিরাও গসিপ শুনল। যেসব ডাচ পালাতে পারেনি তারা কাজের লোকের মাধ্যমে চিঠি পাঠিয়ে খবরটা সত্যি কি না জানোট চাইল। কেউ কেউ তার বাবা-মায়ের লজ্জাজনক কেলেঙ্কারির কথা আবার তুলতে শুরু করল।
"আমাকে বিয়ে না করলে কী হবে?" মোড়ল আসার কিছুক্ষণ পরে মা গেদিক শেষমেশ জিজ্ঞেস করল।
"আজাকের রাতের খাবার হবে।"
"তাহলে তাদেরই খেতে দাও।"
"আর মা ইয়াং পাহাড় সমতল করে দেওয়া হবে।"
এই ভয়ংকর হুমকিতে সে অসহায়ভাবে সেই সকাল নয়টার দিকে দেবী আয়ুকে বিয়ে করল। ঠিক যখন জাপানি সৈন্যরা শহর দখলের অনুষ্ঠান শুরু করল। বিয়ে উদযাপনে কাজের লোকেরা আর পাহারাদার ছাড়া কাউকে ডাকা হয়নি। মিস্টার উইলি সাক্ষী হলেন। পুরোটা সময় মা গেদিক কাঁপতে কাঁপতে মন্ত্র বলতে থাকল। তার কথা গলায় আটকে আটকে যেতে থাকল। ঠিকমতো বিয়ের কথা বলতে পারল না। শেষে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল। মোড়ল তাদের বিয়ে আনুষ্ঠানিক করলেন।
"বেচারা," দেবী আয়ু বলল। "টেড মা ইয়াংকে রক্ষিতা না বানালে সে আমার দাদা হতো।"
সেদিন বিকেলে জ্ঞান ফিরে মা গেদিক নিজেকে দেবী আয়ুর স্বামী হিসেবে আবিষ্কার করল। বুঝতে পারল না কীভাবে হলো। যেন এক রাক্ষসীর দিকে তাকানোর মতো হাঁ করে তার দিকে তাকিয়ে রইল। তাকে ছুঁতে রাজি হলো না। দেবী আয়ু কাছে আসতে চাইলে চিৎকার করে উঠল, হাতের কাছে যা পেল ছুঁড়ে মারল। দেবী আয়ু ছেড়ে দিলে সে ঘরের কোণে কুণ্ডলী পাকিয়ে শিশুর মতো কাঁপতে কাঁপতে কাঁদতে লাগল। দেবী আয়ু ধৈর্য নিয়ে অপেক্ষা করল। তার কাছে বসে রইল। তখনো তার গায়ে বিয়ের পোশাক। মাঝে মাঝে তাকে কাছে আসতে, তাকে আদর করতে, এমনকি তার সাথে শুতে প্রলোভন দেখানোর চেষ্টা করল। সে এখন তার স্ত্রী। কিন্তু মা গেদিক আবার চিৎকার শুরু করলে সে প্রলোভন থামিয়ে চুপচাপ বসে রইল। মাঝে মধ্যে ধৈর্যশীল প্রচেষ্টায় তাকে একটু হাসি দিল।
"আমাকে ভয় পাচ্ছ কেন? আমি চাই তুমি আমাকে ছোঁও, আর অবশ্যই আমার সাথে শোও। কারণ তুমি আমার স্বামী।"
মা গেদিক কোনো জবাব দিল না।
"ভাবো একটু, ধরো আমরা বিয়ে করলাম কিন্তু তুমি আমার সাথে শুলে না," সে বলতে থাকল। "আমি কখনো গর্ভবতী হব না। আর সবাই বলবে তোমার ওটা আর কাজ করে না।"
"তুমি একটা শয়তানি মায়াবিনী," মা গেদিক শেষমেশ আটকে আটকে বলল।
"আমি একটা সুন্দরী প্রলোভনকারী," দেবী আয়ু যোগ করল।
"তুমি কুমারী নও।"
"সেটা সত্যি নয়!" দেবী আয়ু একটু আহত হয়ে বলল। "আমার সাথে শোও, তখন বুঝবে তুমি ভুল।"
"তুমি কুমারী নও, তুমি গর্ভবতী, আর আমাকে কালো ভেড়া বানাতে চাইছ।"
"এটা সত্যি নয়।"
তাদের তর্ক মধ্যরাত পর্যন্ত চলল। তারপর সে তর্ক গড়িয়ে গেল ভোর পর্যন্ত। কেউ মত বদলাল না। নতুন দিন এলো, বাসর ঘরে আলো এলো। দেবী আয়ু লোকটার বিদ্যুৎঝলকানো চিৎকারে ক্লান্ত হয়ে কাছে যাওয়া ছেড়ে দিল। সে তার সব কাপড় খুলে ফেলল, বিয়ের পোশাক আর মুকুট বিছানার উপর ছুঁড়ে দিল। সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে এখনো হিস্টেরিক বৃদ্ধের সামনে দাঁড়াল। তার কানের কাছে জোরে বলল : "করো, তাহলে জানবে আমি কুমারী!"
"শয়তানের দিব্যি, আমি করব না। কারণ আমি জানি তুমি কুমারী নও।"
তখন দেবী আয়ু মা গেদিকের নাকের ডগার সামনে তার মধ্যমা আঙুল নিজের যোনিতে গভীরে ঢোকাল। মেয়েটা ব্যথায় একটু কোঁ করে উঠল। তার পা দুটোর মাঝখানে আঙুল নাড়তে নাড়তে কেঁপে কেঁপে উঠল। তারপর আঙুল বের করে মা গেদিককে দেখাল। আঙুলের ডগায় এক ফোঁটা রক্ত। সেটা মা গেদিকের কাঁপতে থাকা থুতনির কিনার থেকে কপালের ডগা পর্যন্ত সরলরেখায় মেখে দিল।
"তাহলে বোধহয় তুমি ঠিকই বলেছিলে," দেবী আয়ু বলল। "এখন আমি আর কুমারী নই।"
সে গোসল করতে চলে গেল। তারপর বাসর রাতের বিছানায় ঘুমিয়ে পড়ল। ঘরের কোণে এখনো কাঁপতে থাকা বৃদ্ধকে যেন আমলেই নিল না। পুরো একটা দিনরাত বিশ্রাম হয়নি। তাই গভীর ঘুমে ঘুমিয়ে পড়ল। কাজের লোকেরা দুপুরের খাবারের জন্য ডাকতে এলে সাড়া দিল না। বিকেলে উঠে মা গেদিকের দিকে ভ্রুক্ষেপ না করে সরাসরি খাবার টেবিলে গেল। মনের আনন্দে খেল। কাজের লোকেরা তার আদেশের অপেক্ষায় তাকিয়ে রইল, সে কোনো কথা বলল না। ঘরে ফিরে দেখল বৃদ্ধ নেই। বাথরুমে, উঠানে, রান্নাঘরে খুঁজল, কোথাও পেল না। দেবী আয়ু শেষে বাড়ির সামনের একজন পাহারাদারকে জিজ্ঞেস করল।
"সে শয়তান দেখার মতো চিৎকার করতে করতে দৌড়ে পালিয়ে গেছে মিস।"
"তুমি ধরলে না?"
" ষোল বছর আগে মা ইয়াং যেমন দৌড়েছিল ঠিক সে রকম করে সে এত জোরে দৌড়াচ্ছিল, ," পাহারাদার জবাব দিল। "কিন্তু মিস্টার উইলি গাড়ি নিয়ে পিছু নিয়েছেন।"
"ধরা পড়েছে?"
"না।"
সে আস্তাবলে ছুটে গেল। ঘোড়ায় চড়ে তাড়া শুরু করল। দেবী আয়ু আন্দাজ করল যে লোকটা সেই পাথুরে পাহাড়ের চূড়ার দিকে দৌড়েছে যেখান থেকে মা ইয়াং কুয়াশায় মিলিয়ে গিয়েছিল। যদিও তার এই আন্দাজে একটু ভুল ছিল। আসলে মা গেদিক সেই পাহাড়ে যায়নি, পূর্বদিকের আরেকটা পাহাড়ে গেছে। রাস্তার পাশের কয়েকজনকে জিজ্ঞেস করে তারা কলিব্রির টায়ারের দাগ খুঁজে পেল। দাগ তাদের সেই পাহাড়ের পাদদেশে নিয়ে গেল। দেবী আয়ু মিস্টার উইলিকে গাড়ির পিছনের বাম্পারে বসে থাকতে দেখল। মনে হচ্ছে আর উপরে উঠতে পারবেন না।
"সে পাহাড়চূড়ায় গান গাইছে," মিস্টার উইলি বললেন।
দেবী আয়ু উপরে তাকাল। দেখল মা গেদিক একটা পাথরের উপর দাঁড়িয়ে মঞ্চে অপেরা তারকার মতো গান গাইছে। আবছা শোনা যাচ্ছে। সে জানে না এটা সেই একই গান যা বছর আগে মা ইয়াংয়ের জন্য ষোল বছরের অপেক্ষার শেষ দিনে সে গেয়েছিল।
"সে নিশ্চয়ই লাফ দেবে, তার প্রিয়তমার মতো," মিস্টার উইলি বললেন। "আর আকাশে উড়ে কুয়াশার আড়ালে মিলিয়ে যাবে।"
"না," দেবী আয়ু বলল, "সে পাথরে আছড়ে পড়বে। কিমার মতো থেঁতলে যাবে।"
আর সেটাই হলো। গান শেষ করে মা গেদিক খোলা আকাশে লাফ দিল। মনে হলো সে উড়ছে। বহু বছরে কাউকে দেখতে পায়নি এমন আনন্দে ভরপুর। দুটো হাত পাখির ডানার মতো ঝাপটাচ্ছে। কিন্তু সেগুলো তার শরীরকে আর উপরে তুলতে পারল না। সে ক্রমবর্ধমান গতিতে নিচে পড়তে লাগল। শেষটা কী অপেক্ষা করছে জেনেও সে হাসছিল আর উত্তেজনায় ভরপুর হয়ে চিৎকার করছিল। সে পাথরে আছড়ে পড়ল। দেবী আয়ুর ভবিষ্যদ্বাণী মিলে গেল। তার শরীর ভয়াবহভাবে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।
তার যা অবশিষ্ট ছিল তা দেখতে মানুষের লাশের চেয়ে ঝোল বা মণ্ডের মতো। সেটা বাড়ি নিয়ে এলো আর ঠিকমতো দাফন করা হলো। দেবী আয়ু পাহাড়টার নাম দিল মা গেদিক পাহাড়। এটা মা ইয়াং পাহাড়ের পাশে উঠে আছে। সে এক সপ্তাহ শোক পালনের সিদ্ধান্ত নিল। শোকের শেষে খবর এলো টেড স্টামলার হল্যান্ডের আত্মসমর্পণের আগের শেষ যুদ্ধে বাটাভিয়া রক্ষা করতে গিয়ে পড়েছেন। তার লাশ কখনো এলো না। দেবী আয়ু আবার এক সপ্তাহ শোক পালনের সিদ্ধান্ত নিল। দ্বিতীয় শোকের শেষে আর কোনো দুঃখের খবর না পেয়ে সে খুশি হয়ে সব শোকের পোশাক ছেড়ে দিল। আনন্দময় পোশাক পরল, সুন্দর করে সাজল, যেন কিছুই হয়নি এমনভাবে বাজারে চলে গেল। কিন্তু বাড়ি ফিরে আরেকটা মৃত্যুর খবরের চেয়েও চমকানো কিছু শুনল।
মিস্টার উইলি জ্যাকেট আর টাই পরে চকচকে চামড়ার জুতো পায়ে তার কাছে এগিয়ে এলেন। বললেন গুরুত্বপূর্ণ একটা কথা আছে। দেবী আয়ু ভাবল লোকটা বোধহয় চাকরি ছেড়ে বাটাভিয়ায় কাজ খুঁজতে যাবে, বা হয়তো জাপানি বাহিনীতে যোগ দেবে। কোনো অনুমানই কাছাকাছিও গেল না। মিস্টার উইলির মুখ লজ্জায় লাল, তবু বলার আগ পর্যন্ত কিছু বোঝা গেল না। মাত্র কয়েকটা শব্দ বললেন। কিন্তু সেগুলো তার শ্বাস আটকে দিল : "মিস," তিনি বললেন। "আমাকে বিয়ে করুন।"

1 মন্তব্যসমূহ
আমার অত্যন্ত প্রিয় উপন্যাস। সুখপাঠ্য, ঝরঝরে অনুবাদ।
উত্তরমুছুন