ধারাবাহিক উপন্যাস : একা কুর্নিয়াওয়ানের ‘বিউটি ইজ আ উন্ড’


অনুবাদ : ঝরা সৈয়দ
অধ্যায়- ১

মার্চ মাসের এক সপ্তাহান্তের এক দুপুরে দেবী আয়ু একুশ বছর মৃত থাকার পর নিজের কবর থেকে উঠে দাঁড়াল।
একটি ফ্রাংগিপানি গাছের নিচে দুপুরের ঘুম ভেঙে যাওয়া এক রাখাল ছেলে ভয় পেয়ে প্যান্টেই প্রস্রাব করে ফেলল। আর চিৎকার করে উঠল। তার চারটি ভেড়া এলোমেলোভাবে ছুটে পালাল—পাথর আর কাঠের কবরচিহ্নের ফাঁক দিয়ে এমনভাবে দৌড়াল, যেন তাদের মধ্যে একটি বাঘ ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

সবকিছুর শুরু হয়েছিল একটি শব্দ দিয়ে। সেই শব্দটি আসছিল একটি পুরোনো কবর থেকে, যার কোনো নামফলক ছিল না এবং যার ওপর হাঁটুসমান উঁচু ঘাস জন্মে ছিল। তবু সবাই জানত, সেটি দেবী আয়ুর কবর।
দেবী আয়ু বায়ান্ন বছর বয়সে মারা গিয়েছিল। একুশ বছর মৃত থাকার পর সে আবার উঠে দাঁড়াল। সেই মুহূর্তের পর থেকে তার বয়স কীভাবে হিসাব করা হবে, তা আর কেউ ঠিক করে বলতে পারল না।

রাখাল ছেলেটি ঘটনাটি জানালে আশপাশের পাড়া থেকে লোকজন কবরের কাছে এসে জড়ো হলো।
তারা কেউ শাড়ির কোঁচা গুটিয়ে, কেউ কোলে শিশু নিয়ে, কেউ ঝাঁটা হাতে, কেউ বা মাঠের কাদা মাখা শরীর নিয়ে এলো। তারা চেরি গাছ, জাট্রোফা ঝোপ আর কাছের কলাবাগানের আড়ালে দাঁড়িয়ে রইল।

কেউই সামনে এগোতে সাহস পেল না। সবাই শুধু পুরোনো কবর থেকে আসা হইচই শুনতে থাকল—যেন তারা সোমবার সকালের হাটে দাঁড়িয়ে ওষুধ বিক্রেতার হাঁক শুনছে। লোকজন এই ভীতিকর দৃশ্যটি বেশ উপভোগ করছিল। তারা ভাবল না যে একা থাকলে এই ভয় তাদের আতঙ্কিত করে তুলত।

তারা আসলে কোনো অলৌকিক ঘটনা দেখার অপেক্ষা করছিল, শুধু শব্দ করা একটি কবর নয়। কারণ ওই কবরের ভেতরের নারীটি যুদ্ধের সময় জাপানিদের জন্য দেহব্যবসা করেছিল। ইমাম কিয়াই সবসময় বলতেন, পাপে কলুষিত মানুষ কবরের ভেতর শাস্তি পায়।
লোকেরা ভাবল, এই শব্দ নিশ্চয়ই কোনো নির্যাতনকারী ফেরেশতার চাবুকের আওয়াজ। কিন্তু কিছুক্ষণ পর তারা বিরক্ত হয়ে পড়ল। তারা আরও কোনো ছোটখাটো অলৌকিক ঘটনার আশা করতে লাগল।

অবশেষে যখন সেই ঘটনা ঘটল, তখন তা ঘটল একেবারে কল্পনাতীতভাবে।
কবরটি কেঁপে উঠল। ফেটে গেল। নিচ থেকে মাটি বিস্ফোরণের মতো উড়ে গেল। ছোট একটি ভূমিকম্প হলো। ঝড় উঠল। ঘাস আর কবরের ফলক উড়ে যেতে লাগল।
মাটির পর্দার মতো ঝরে পড়া ধুলোর আড়ালে এক বৃদ্ধা নারী দাঁড়িয়ে রইল। তার মুখে বিরক্তি-- তার শরীর শক্ত। সে এখনো কাফনে মোড়ানো, যেন আগের রাতেই তাকে কবর দেওয়া হয়েছে।

লোকেরা উন্মত্ত হয়ে উঠল এবং ভেড়াগুলোর থেকেও বেশি বিশৃঙ্খলভাবে দৌড়ে পালাল। তাদের একসাথে চিৎকার দূরের পাহাড়ের গায়ে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল।
এক নারী নিজের শিশুকে ঝোপে ছুড়ে ফেলল। শিশুটির বাবা একটি কলাগাছকে চুপ করাতে গেল। দুজন মানুষ খালে ঝাঁপ দিল। কেউ রাস্তার পাশে অজ্ঞান হয়ে পড়ল। কেউ কেউ একবারও না থেমে একটানা পনেরো কিলোমিটার দৌড়াল।

এই সব দেখে দেবী আয়ু শুধু হালকা কাশি দিল। আর দিল গলা খাঁকারি। সে বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করল-- সে একটি কবরস্থানের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে।
সে নিজের কাফনের ওপরের দিকের দুটি গিঁট আগেই খুলে ফেলেছিল। এবার সে নিচের দিকের দুটি গিঁট খুলতে লাগল যাতে পা মুক্ত করে হাঁটতে পারে।

অদ্ভুতভাবে তার চুল বড় হয়ে গিয়েছিল। সে যখন ক্যালিকো কাপড় থেকে চুল ঝেড়ে ফেলল, তখন বিকেলের বাতাসে তা উড়তে লাগল। তার চুল মাটিতে ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছিল এবং নদীর তলদেশের কালো শৈবালের মতো চুলগুলো ঝলমল করছিল। তার ত্বক কুঁচকে গিয়েছিল। কিন্তু তার মুখ ছিল ঝকঝকে সাদা। তার চোখ কোটরের ভেতর প্রাণ ফিরে পেয়েছিল। সে ঝোপের আড়াল থেকে বেরিয়ে পালানো মানুষদের দিকে তাকাল। তাদের অর্ধেক পালিয়ে গেল, আর অর্ধেক অজ্ঞান হয়ে পড়ল।

দেবী আয়ু উদ্দেশ্যহীনভাবে অভিযোগ করল-- মানুষ বড়ই নিষ্ঠুর। তারা তাকে জীবিত কবর দিয়েছিল।

তার প্রথম চিন্তা গেল তার সন্তানের দিকে—সে আর শিশু ছিল না।
একুশ বছর আগে সে এক বিকৃত কন্যাশিশুর জন্ম দেওয়ার বারো দিন পর মারা গিয়েছিল। শিশুটি এতটাই বিকৃত ছিল যে ধাত্রী নিশ্চিত হতে পারেনি এটি সত্যিই শিশু কিনা। সে ভেবেছিল, হয়তো এটি মল, কারণ যে জায়গা দিয়ে শিশু বের হয় আর যে জায়গা দিয়ে মল বের হয়—এই দুটির দূরত্ব মাত্র দুই সেন্টিমিটার।

কিন্তু শিশুটি নড়াচড়া করল। হাসল। শেষ পর্যন্ত ধাত্রী বিশ্বাস করল, এটি সত্যিই একটি মানুষ- মল নয়।

সদ্য প্রসূতি মা দুর্বল শরীর নিয়ে বিছানায় শুয়েছিল এবং নিজের সন্তানের দিকে তাকানোর কোনো আগ্রহ দেখাচ্ছিল ন। ধাত্রী সেই মাকে বলল- -শিশুটি জন্ম নিয়েছে-- সে সুস্থ আছে, এবং দেখতে বেশ বন্ধুসুলভ।

“এটা মেয়ে, তাই তো?” দেবী আয়ু জিজ্ঞেস করল।
“হ্যাঁ,” ধাত্রী বলল, “আগের তিনটির মতোই।”
“চারটি মেয়ে,” দেবী আয়ু সম্পূর্ণ বিরক্ত স্বরে বলল। “সবাই সুন্দর। আমার নিজের একটা পতিতালয় খুলে ফেলা উচিত। বলো তো, এই মেয়েটা কতটা সুন্দর?”

শিশুটিকে শক্ত করে কাপড়ে জড়িয়ে ধাত্রী কোলে নিলে সে নড়াচড়া করতে লাগল এবং শিশুটি কাঁদতে শুরু করল।
একজন নারী ঘরের ভেতরে বাইরে যাতায়াত করছিল। সে রক্তে ভেজা নোংরা কাপড় সরিয়ে নিচ্ছিল এবং গর্ভফুল ফেলে দিচ্ছিল। সেই সময় ধাত্রী কিছুক্ষণ কোনো উত্তর দিল না। কারণ যে শিশুটি দেখতে কালো মলের স্তূপের মতো। তাকে সুন্দর বলা তার পক্ষে সম্ভব ছিল না।

প্রশ্নটি এড়িয়ে গিয়ে সে বলল,
“আপনি তো এখন বেশ বয়স্ক নারী। আমার মনে হয় না আপনি দুধ খাওয়াতে পারবেন।”

“সেটা ঠিক,” দেবী আয়ু বলল। “আগের তিনটি সন্তানের কারণেই আমি পুরোপুরি নিঃশেষ হয়ে গেছি।”

“আর শত শত পুরুষের কারণেও,” ধাত্রী বলল।

“একশ বাহাত্তর জন পুরুষ,” দেবী আয়ু বলল। “সবচেয়ে বয়স্ক ছিল নব্বই বছরের। সবচেয়ে ছোট ছিল বারো বছরের ছেলে। সে এসেছিল তার খৎনার এক সপ্তাহ পরেই। আমি তাদের সবাইকে খুব ভালো করে মনে রেখেছি।”

শিশুটি আবার কাঁদল।
ধাত্রী বলল, তাকে শিশুটির জন্য দুধ জোগাড় করতে হবে। যদি মায়ের দুধ না পাওয়া যায়, তাহলে গরুর দুধ খুঁজতে হবে। নইলে কুকুরের দুধ। এমনকি দরকার হলে ইঁদুরের দুধও।
“হ্যাঁ, যাও,” দেবী আয়ু বলল।

“বেচারা দুর্ভাগা ছোট্ট মেয়ে,” ধাত্রী শিশুটির বিভীষিকাময় মুখের দিকে তাকিয়ে বলল।
সে মুখটির বর্ণনা দিতেও পারছিল না। তার মনে হচ্ছিল--এটি যেন নরকের কোনো অভিশপ্ত দানব। শিশুটির পুরো শরীর ছিল গাঢ় কালো যেন তাকে জীবন্ত পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তার গড়ন ছিল অদ্ভুত এবং চিনে নেওয়ার মতো নয়।

শিশুটির নাক আসলে নাক কিনা সেটা ধাত্রী নিশ্চিত হতে পারছিল না, । কারণ সেটি তার জীবনে দেখা সব নাকের চেয়ে বেশি বিদ্যুতের সকেটের মতো লাগছিল। শিশুটির মুখ তাকে মাটির ভাঁড়ে পয়সা ঢোকানোর একটু লম্বাটে ছিদ্রের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিল। আর তার কান দেখতে ছিল হাঁড়ির হাতলের মতো।
ধাত্রী নিশ্চিত ছিল, পৃথিবীতে এই হতভাগা ছোট্টটির চেয়ে কুৎসিত আর কোনো প্রাণী নেই। সে যদি ঈশ্বর হতো, তাহলে শিশুটিকে বাঁচতে না দিয়ে সঙ্গে সঙ্গেই মেরে ফেলত। কারণ পৃথিবী তাকে কোনো দয়া ছাড়াই নির্যাতন করত।

“বেচারা শিশুটি,” ধাত্রী আবার বলল। তারপর সে দুধ খাওয়ানোর জন্য কাউকে খুঁজতে বেরিয়ে গেল।

“হ্যাঁ, বেচারা শিশুটি,” দেবী আয়ু বিছানায় এপাশ-ওপাশ করতে করতে বলল।
“তোমাকে মারার জন্য আমি যা যা করার সবই করেছি। আমার উচিত ছিল একটা গ্রেনেড গিলে নিয়ে পেটের ভেতর ফাটিয়ে দেওয়া। আহ, হতভাগা ছোট্টটি—দুষ্টদের মতো হতভাগারা সহজে মরে না।”

প্রথমে ধাত্রী প্রতিবেশী নারীদের কাছ থেকে শিশুটির মুখ লুকিয়ে রাখতে চেয়েছিল।
কিন্তু যখন সে বলল যে শিশুটির জন্য দুধ দরকার, তখন তারা একে অপরকে ঠেলে সামনে এগিয়ে এল। কারণ যারা দেবী আয়ুকে চিনত, তাদের কাছে তার ছোট্ট সুন্দর মেয়েদের দেখা সবসময়ই আনন্দের ছিল।

ধাত্রী আর ভিড় সামলাতে পারল না। লোকজন কাপড় সরিয়ে শিশুটির মুখ দেখে ফেলল।
এরপর তারা এমন এক ভয়াবহ আতঙ্কে চিৎকার করল-- যা তারা জীবনে কখনো অনুভব করেনি।
ধাত্রী তখন মুচকি হেসে তাদের মনে করিয়ে দিল-- তারা এই নরকসম মুখ না দেখে সেজন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিল সে ।

এই বিস্ফোরণের মতো প্রতিক্রিয়ার পর ধাত্রী তাড়াহুড়ো করে চলে গেল। লোকেরা কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল এমন চেহারা নিয়ে যেন তাদের স্মৃতি হঠাৎ মুছে গেছে।

“এটাকে মেরে ফেলা উচিত,” এক নারী বলল। সে-ই প্রথম এই হঠাৎ স্মৃতিভ্রংশ থেকে মুক্ত হলো।

“আমি আগেই চেষ্টা করেছি,” দেবী আয়ু বলল।
শুধু একটি কুঁচকে যাওয়া ঘরের পোশাক আর কোমরে বাঁধা কাপড় পরে সে তখন সেখানে দাঁড়িয়ে ছিল। তার চুল ছিল সম্পূর্ণ এলোমেলো, যেন ষাঁড়ের লড়াই দেখে টলতে টলতে কেউ সরে এসেছে।

লোকেরা তার দিকে করুণার চোখে তাকাল।

“ও সুন্দর, তাই না?” দেবী আয়ু জিজ্ঞেস করল।

“উম… হ্যাঁ,” কেউ একজন বলল।

“কুকুরের মতো কামুক পুরুষে ভরা এই পৃথিবীতে সুন্দর মেয়ে জন্ম দেওয়ার চেয়ে ভয়ংকর কোনো অভিশাপ নেই।”

কেউ কোনো উত্তর দিল না। সবাই শুধু তার দিকে সহানুভূতির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। তারা জানত, তারা মিথ্যা বলছে।

রোসিনা নামের এক পাহাড়ি সেই বোবা মেয়ে বহু বছর ধরে দেবী আয়ুর সেবা করছিল—সে তাকে বাথরুমে নিয়ে গেল। সেখানে সে আগেই গরম পানির ব্যবস্থা করেছিল। দেবী আয়ু সুগন্ধি সালফারযুক্ত সাবানে স্নান করল। বোবা মেয়েটি ঘৃতকুমারী তেল দিয়ে তার চুল ধুয়ে দিল।

এই সব কিছুর মধ্যেও বোবা মেয়েটি নির্বিকার ছিল। সে নিশ্চয়ই কুৎসিত শিশুটির কথা আগেই জানত। কারণ ধাত্রী কাজ করার সময় রোসিনা ছাড়া আর কেউ সেখানে ছিল না।
সে পিউমিস পাথর দিয়ে তার মালকিনের পিঠ ঘষে দিল। তোয়ালে জড়িয়ে দিল। দেবী আয়ু বেরিয়ে এলে সে বাথরুম গুছিয়ে নিল।

কেউ একজন বিষণ্ণ পরিবেশ হালকা করতে চেয়ে বলল,
“ওকে একটা ভালো নাম দিতে হবে।”

“হ্যাঁ,” দেবী আয়ু বলল। “ওর নাম হবে বিউটি।”

“ওহ!” লোকেরা অস্বস্তিতে চিৎকার করে উঠল এবং তাকে নিরস্ত করতে চাইল।
“ইনজুরি নাম কেমন?”
“নাকি ওউন্ড?”
“ঈশ্বরের দোহাই, ও নাম দিও না।”

“ঠিক আছে,” দেবী আয়ু বলল। “তাহলে ওর নাম বিউটি।”

লোকেরা তখন অসহায়ের মতো তাকিয়ে রইল। দেবী আয়ু কাপড় পরতে নিজের ঘরে ফিরে গেল।
তারা একে অপরের দিকে তাকিয়ে শুধু কল্পনা করল—কালো কয়লার মতো একটি মেয়ে, যার মুখের মাঝখানে বিদ্যুতের সকেটের মতো কিছু, তার নাম হবে বিউটি।
এটি ছিল এক লজ্জাজনক কেলেঙ্কারি।

তবে সত্যি কথা হলো, দেবী আয়ু গর্ভবতী হওয়ার কথা জানার পরই শিশুটিকে মারতে চেয়েছিল। সে তখন বুঝেছিল—সে অর্ধশতাব্দী পার করুক আর না-ই করুক, সে আবার গর্ভবতী হয়েছে। অন্য সন্তানদের মতোই সে জানত না-- এই শিশুটির বাবা কে। কিন্তু অন্যদের মতো এই শিশুটিকে বাঁচতে দেওয়ার কোনো ইচ্ছা তার ছিল না।

সে গ্রাম্য ডাক্তারের কাছ থেকে পাওয়া অতিশক্তিশালী পাঁচটি প্যারাসিটামল বড়ি খেয়েছিল। আর আধা লিটার সোডা গিলেছিল। এতে প্রায় তার নিজেরই মৃত্যু হচ্ছিল, কিন্তু শিশুটির কিছুই হলো না।
সে আরেকটি উপায় তখন ভেবেছিল। সে এমন এক ধাত্রীকে ডেকেছিল যে শিশুটিকে মেরে ফেলতে রাজি ছিল। ধাত্রী তার পেটে একটি ছোট কাঠের টুকরো ঢুকিয়ে দিল। দুই দিন দুই রাত সে প্রচণ্ড রক্তক্ষরণে ভুগল। কাঠের টুকরোটি ভেঙে ভেঙে বেরিয়ে এল। কিন্তু শিশুটি তবুও বড় হতে থাকল।

সে আরও ছয়টি উপায় চেষ্টা করেছিল। সবই ব্যর্থ হলো। শেষে সে হাল ছেড়ে দিয়ে অভিযোগ করল, “এই মেয়েটা সত্যিকারের লড়াকু। এই লড়াইয়ে সে স্পষ্টই তার মাকে হারাবে।”

এরপর সে পেট বড় হতে দিল। সাত মাসে সেলামেতন অনুষ্ঠান করল। শিশুটির জন্ম হতে দিল। কিন্তু সে শিশুটির দিকে তাকাতেও রাজি হয়নি। এর আগে সে তিনটি মেয়ের জন্ম দিয়েছিল। তারা সবাই ছিল অপূর্ব সুন্দর—প্রায় যেন একটার পর একটা জন্মানো যমজ।

এই ধরনের শিশুদের সে আর সহ্য করতে পারছিল না। তার কাছে তারা ছিল দোকানের জানালার সাজানো পুতুলের মতো। তাই সে সবচেয়ে ছোটটিকে দেখতে চায়নি। তার বিশ্বাস ছিল, সে বড় বোনদের থেকে আলাদা হবে না। সে ভুল করেছিল। তার সবচেয়ে ছোট মেয়েটি কতটা অনাকর্ষণীয় সেটা তখনো সে জানত না।

প্রতিবেশী নারীরা যখন ফিসফিস করে বলছিল যে শিশুটি যেন বানর, ব্যাঙ আর গিরগিটির এলোমেলো সংমিশ্রণের ফল, তখনও সে ভাবেনি তারা তার সন্তানকে নিয়ে কথা বলছে। আর যখন তারা বলেছিল যে আগের রাতে জঙ্গলে বুনো কুকুর ডাকছিল এবং পেঁচারা এসে বসেছিল, তখনও সে সেগুলোকে কোনো অশুভ লক্ষণ মনে করেনি।

কাপড় পরার পর সে আবার শুয়ে পড়ল। হঠাৎ তার মনে হলো—চারটি সন্তানের জন্ম দেওয়া আর অর্ধশতাব্দীর বেশি বেঁচে থাকা কতটা ক্লান্তিকর। তারপর তার মনে এক বিষণ্ণ ভাবনা এল। যদি শিশুটি মরতেই না চায়, তাহলে হয়তো মাকেই চলে যাওয়া উচিত। তাহলে তাকে বড় হয়ে উঠতে দেখতে হবে না।

সে উঠে টলতে টলতে দরজার কাছে গেল। সে দেখল, প্রতিবেশী নারীরা এখনো দল বেঁধে শিশুটিকে নিয়ে গল্পগুজব করছে। রোসিনা বাথরুম থেকে বেরিয়ে এসে দেবী আয়ুর পাশে দাঁড়াল। সে বুঝতে পেরেছিল, তার মালকিন এখন তাকে কোনো নির্দেশ দিতে যাচ্ছে।

“আমার জন্য একটি কাফনের কাপড় কিনে আনো,” দেবী আয়ু বলল। “এই অভিশপ্ত পৃথিবীকে আমি ইতিমধ্যে চারটি মেয়ে-সন্তান দিয়েছি। এবার আমার জানাজা হওয়ার সময় এসে গেছে।”

শুনে নারীরা চিৎকার করে উঠল। আরবোকার মতো মুখ করে দেবী আয়ুর দিকে তাকিয়ে রইল। কুৎসিত একটি শিশুর জন্ম দেওয়া ছিল এক ধরনের লজ্জাজনক কাণ্ড, কিন্তু তাকে এভাবে ফেলে দিয়ে মরতে চাওয়া ছিল তার থেকেও বেশি ভয়াবহ। তবু তারা সরাসরি কিছু বলল না। তারা শুধু তাকে এত বোকামি করে মরতে না যেতে বোঝাতে লাগল। তারা বলল, অনেক মানুষ একশ বছরেরও বেশি বাঁচে। তারা বলল, দেবী আয়ু এখনো মরার জন্য অনেক বেশি তরুণ।

“আমি যদি একশ বছর পর্যন্ত বাঁচি,” দেবী আয়ু মেপে মেপে শান্ত গলায় বলল, “তাহলে আমাকে আটটি সন্তানের জন্ম দিতে হবে। সেটা খুব বেশি।”

রোসিনা দেবী আয়ুর জন্য একটি পরিষ্কার সাদা ক্যালিকো কাপড় কিনে আনল। দেবী আয়ু সঙ্গে সঙ্গেই সেটি গায়ে জড়িয়ে নিল। তবে তাতে তার সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যু হলো না।

এই সময় ধাত্রী পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে এমন কোনো নারী খুঁজছিল যার বুকের দুধ আছে। শেষ পর্যন্ত সে ব্যর্থ হলো । তখন শিশুটিকে ভাত ধোয়া পানি খাওয়াতে হলো।
এই ফাঁকে দেবী আয়ু শান্তভাবে নিজের বিছানার ওপর শুয়ে রইল। সে কাফনে মোড়া ছিল। সে অদ্ভুত এক ধৈর্য নিয়ে মৃত্যুদূতের জন্য অপেক্ষা করছিল—সে এসে তাকে নিয়ে যাবে।

ভাত ধোয়া পানির সময় শেষ হলে রোসিনা শিশুটিকে গরুর দুধ খাওয়াতে লাগল। সেই দুধ দোকানে “ভালুকের দুধ” নামে বিক্রি হতো। তবুও দেবী আয়ু বিছানায় শুয়েই রইল। সে কাউকেই বিউটি নামের শিশুটিকে তার ঘরে আনতে দিল না।

কিন্তু কুৎসিত শিশুটি আর কাফনে মোড়া তার মায়ের গল্প খুব দ্রুত মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়ল। লোকজন শুধু আশপাশের পাড়া থেকেই নয়, জেলার একেবারে দূরের গ্রাম থেকেও ছুটে আসতে লাগল। তারা দেখতে এল এমন এক ঘটনার সাক্ষী হতে, যেটিকে তারা নবীর জন্মের সঙ্গে তুলনা করছিল।
যিশুর জন্মের সময় জ্যোতিষীরা তারা দেখেছিল। কেউ কেউ বুনো কুকুরের ডাককে সেই তারার সঙ্গে তুলনা করল। আর কাফনে মোড়া মাকে তারা ক্লান্ত মেরির সঙ্গে তুলনা করল। এটা ছিল খুবই অতিরঞ্জিত।

চিড়িয়াখানায় বাঘশাবক ছুঁতে গিয়ে যেমন ভীত মুখ হয়, ঠিক তেমন মুখ করে দর্শনার্থীরা কুৎসিত শিশুটির সঙ্গে ছবি তুলল। এর আগে তারা দেবী আয়ুর সঙ্গেও একই কাজ করেছিল। দেবী আয়ু তখনো রহস্যময় শান্তিতে শুয়ে ছিল। নির্দয় কোলাহলে তার কোনো বিরক্তি ছিল না।

কয়েকজন গুরুতর ও আরোগ্যহীন রোগে ভোগা মানুষ এল শিশুটিকে ছুঁতে। রোসিনা সঙ্গে সঙ্গে তা নিষেধ করল। শিশুটি জীবাণুতে সংক্রমিত হয়ে যাবে--এমন তার ভয় ছিল । এর বদলে বালতিতে সে বিউটির জন্য গোসলের পানি ভরে দিল।

আরও অনেকে এল জুয়ায় ভাগ্য ফেরাতে বা ব্যবসায় লাভের কোনো ইশারা পেতে। বোবা রোসিনা দ্রুত শিশুটির দেখভালের দায়িত্ব নিয়ে নিয়েছিল। সে এই সব কিছুর জন্য দানের বাক্স বসাল। খুব তাড়াতাড়ি সেগুলো দর্শনার্থীদের রুপির নোটে ভরে গেল।

রোসিনা বুদ্ধি করে আগেই ভেবে নিয়েছিল—দেবী আয়ু যদি সত্যিই মারা যায়, তাহলে এই বিরল সুযোগ থেকে কিছু টাকা জোগাড় করা দরকার। তাহলে ভবিষ্যতে ভালুকের দুধ কেনা বা ঘরে একা বিউটিকে নিয়ে বেঁচে থাকা নিয়ে তাকে চিন্তা করতে হবে না। কারণ বিউটির তিন বড় বোনের কখনোই এই ঘরে ফিরে আসার সম্ভাবনা ছিল না।

তখন পুলিশ একজন ইমাম কিয়াইকে সঙ্গে নিয়ে এল। তখন এই হইচই হঠাৎ থেমে গেল।
কিয়াই পুরো ঘটনাটিকে ধর্মবিরোধী মনে করল। সে রেগে গিয়ে দেবী আয়ুকে তার লজ্জাজনক আচরণ বন্ধ করার আদেশ দিল। সে এমনকি তাকে কাফন খুলে ফেলতে বলল।

“আপনি একজন পতিতাকে তার কাপড় খুলতে বলছেন,” দেবী আয়ু তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বলল “তাহলে আমাকে দেওয়ার মতো আপনার কাছে কিছু টাকা থাকাই ভালো।”

কিয়াই তাড়াতাড়ি ক্ষমা চেয়ে প্রার্থনা করল। সেখান থেকে সরে গেল--আর কখনো ফিরে এল না।

আবারও কেবল রইল রোসিনা। দেবী আয়ুর পাগলামি যাই হোক না কেন, রোসিনা কখনোই তাতে বিচলিত হতো না। ক্রমে আরও স্পষ্ট হলো—এই মেয়েটিই একমাত্র দেবী আয়ুকে সত্যিকারের বুঝত।

দেবী আয়ু যখন গর্ভের শিশুটিকে মারার চেষ্টা শুরু করারও আগে বলেছিল--সে সন্তান জন্ম দিতে দিতে ক্লান্ত, তখন থেকেই রোসিনা বুঝেছিল—সে আবার গর্ভবতী। এই কথা যদি দেবী আয়ু পাড়ার নারীদের বলত, যারা কুকুরের ডাকের থেকেও বেশি গুজবপ্রিয়, তাহলে তারা ঠাট্টার হাসি হাসত। তারা বলত, বেশ্যাবৃত্তি বন্ধ করো, তাহলেই আর গর্ভবতী হওয়ার ভয় থাকবে না।

কিন্তু সত্যি কথা হলো—এই কথা আরেক বেশ্যাকে বলা যায়-- দেবী আয়ুকে নয়। সে কখনোই তার তিনটি—এবং এখন চারটি—সন্তানকে বেশ্যাবৃত্তির অভিশাপ বলে মনে করেনি। সে বলত, মেয়েদের বাবা নেই—এর মানে এই নয় যে সে জানত না তাদের বাবা কে। তার কারণ এই নয় যে সে কোনো গ্রামপ্রধানের সামনে কোনো পুরুষের পাশে দাঁড়ায়নি। তার মতে, তারা সত্যিই বাবাহীন। সে বিশ্বাস করত-- তারা ছিল দানবদের সন্তান।

“শয়তানও ঈশ্বর বা দেবতাদের মতোই আনন্দ উপভোগ করতে ভালোবাসে,” সে বলত।
“যেমন মেরি ঈশ্বরের পুত্রকে জন্ম দিয়েছিল, আর পাণ্ডুর দুই স্ত্রী দেবসন্তান জন্ম দিয়েছিল, তেমনি আমার গর্ভ হলো এমন এক জায়গা, যেখানে দানবেরা তাদের বীজ রেখে যায়। তাই আমি দানবসন্তান জন্ম দিই। আর আমি এতে ক্লান্ত, রোসিনা।”

রোসিনা প্রায় সব সময়ের মতোই শুধু হাসল। সে কথা বলতে পারত না। অস্পষ্ট গোঁ গোঁ শব্দ ছাড়া তার মুখ দিয়ে কিছু বের হতো না। কিন্তু সে হাসতে পারত। আর হাসতে সে ভালোবাসত।

বিশেষ করে সেই হাসির জন্য দেবী আয়ু তাকে খুব ভালোবাসত। একবার সে তাকে “হাতির বাচ্চা” বলে ডাকেছিল। হাতিরা যতই রাগ করুক, সার্কাসের হাতিদের মতো তাদের মুখে হাসি থাকে। প্রতি বছর এই সার্কাসের হাতিরা শহরে আসে।

রোসিনা বোবাদের স্কুলের ইশারা ভাষা শেখেনি; সে নিজের চেষ্টায় নিজের ইশারা ভাষা শিখে নিয়েছিল। এই ইশারা ভাষাতেই সে দেবী আয়ুকে বোঝাল-- তার এত বিরক্ত হওয়ার কিছু নেই। সে বলল, তার তো এখনো বিশটি সন্তানও হয়নি। অথচ গান্ধারী একশ কৌরবের জন্ম দিয়েছিল।

এই কথা শুনে দেবী আয়ু জোরে হেসে উঠল। সে রোসিনার শিশুসুলভ রসবোধ পছন্দ করত। হাসতে হাসতেই সে বলল, গান্ধারী একশ বার সন্তান জন্ম দেয়নি। সে একবারই একটি বিশাল মাংসের দলা জন্ম দিয়েছিল। সেই দলাটি পরে একশটি সন্তান হয়ে গিয়েছিল।

এইভাবেই রোসিনা হাসিখুশি মনে কাজ করে যেতে লাগল। সে শিশুটির দেখভাল করত। সে দিনে দুবার রান্নাঘরে যেত। সে প্রতিদিন সকালে কাপড় ধুত। আর দেবী আয়ু প্রায় না নড়েই শুয়ে থাকত। তাকে সত্যিই এমন দেখাচ্ছিল, যেন সে একটি লাশ। মানুষ তার কবর খোঁড়া শেষ করুক—এর জন্য সে কেবল অপেক্ষা করছে।

অবশ্য সে ক্ষুধা পেলে উঠে খেত। সে প্রতিদিন সকাল আর বিকেলে বাথরুমে যেত। কিন্তু তারপর সে আবার কাফনে নিজেকে মুড়ে নিত। সে শক্ত করে সোজা হয়ে শুয়ে থাকত। তার দুই হাত থাকত পেটের ওপর।
তার চোখ বন্ধ থাকত। তার ঠোঁটে থাকত হালকা এক চিলতে হাসি।

কিছু প্রতিবেশী খোলা জানালা দিয়ে তাকে উঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করত। রোসিনা বারবার তাদের তাড়াতে চেয়েছে। কিন্তু সে কখনো সফল হয়নি। সে কেন নিজেই আত্মহত্যা করছে না—লোকেরা এই প্রশ্নটি করল। এইবার দেবী আয়ু তার চিরাচরিত ব্যঙ্গ না করে চুপ করে রইল। সে সম্পূর্ণ স্থির হয়ে পড়ে রইল।

অবশেষে বহু প্রতীক্ষিত মৃত্যু এলো—অন্তত সবাই তাই বিশ্বাস করল। কুৎসিত বিউটির জন্মের বারো দিন পর এক বিকেলে এই ঘটনা ঘটল।

মৃত্যুর আগমনের লক্ষণ সেই সকালেই দেখা দিয়েছিল। দেবী আয়ু রোসিনাকে বলেছিল—সে চায় না তার কবরফলকে তার নাম লেখা থাকুক। সে চেয়েছিল, সেখানে শুধু একটি বাক্য লেখা থাকুক:
“আমি চারটি সন্তানের জন্ম দিয়েছি, আর আমি মারা গেছি।”

রোসিনার শ্রবণশক্তি ছিল অসাধারণ। সে পড়তে ও লিখতে পারত। সে পুরো কথাটি লিখে রাখল।

কিন্তু জানাজার নামাজ পরিচালনাকারী ইমাম এই অনুরোধ সঙ্গে সঙ্গেই বাতিল করল। তার মতে, এই উন্মাদ অনুরোধ পুরো পরিস্থিতিকে আরও বেশি পাপময় করে তুলছিল। সে নিজেই সিদ্ধান্ত নিল—ওই নারীর কবরফলকে কিছুই লেখা হবে না।

এক বিকেলে এক প্রতিবেশী খোলা জানালা দিয়ে উঁকি দিতে গিয়ে দেবী আয়ুকে খুঁজে পেল। সে এমন এক শান্ত ঘুমে ছিল যা সাধারণত মানুষের জীবনের শেষ দিকে দেখা যায়। কিন্তু আরও একটি বিষয় ছিল। হাওয়ায় বোরাক্সের গন্ধ ভাসছিল।

রোসিনা বেকারি থেকে বোরাক্স কিনে এনেছিল। দেবী আয়ু নিজের শরীরে সেই লাশ সংরক্ষণের রাসায়নিক ছিটিয়ে দিয়েছিল। লোকেরা মাঝে মাঝে ‘মি বাসো’ মাংসপিণ্ডের সঙ্গে এই রাসায়নিক মেশাত।

মৃত্যু নিয়ে দেবী আয়ুর এই বাতিকের সামনে রোসিনা তাকে যা ইচ্ছে করতে দিয়েছিল।এমনকি দেবী আয়ু যদি তাকে কবর খুঁড়ে জীবিত কবর দিতে বলত, তবুও সে তাই করত। সে সবকিছুকেই তার মালকিনের অদ্ভুত রসবোধ বলে ধরে নিত।

কিন্তু সেই অজ্ঞ উঁকিঝুঁকি দেওয়া নারী তা মেনে নিতে পারেনি। সে জানালা দিয়ে লাফিয়ে ঘরে ঢুকে পড়ল।
তার বিশ্বাস ছিল, দেবী আয়ু এবার সীমা ছাড়িয়ে গেছে।

“শোনো, তুমি সেই বেশ্যা যে আমাদের সবার পুরুষদের সঙ্গে শুয়েছ!” সে ক্ষোভের সঙ্গে বলল। “তুমি মরতে চাইলে মরো। কিন্তু নিজের শরীর সংরক্ষণ করো না। কারণ তোমার পচা লাশ কাউকে ঈর্ষান্বিত করবে না।”

সে দেবী আয়ুকে ধাক্কা দিল। কিন্তু দেবী আয়ুর শরীর শুধু গড়িয়ে পাশ ফিরল। তার ঘুম ভাঙল না। সে সম্ভবত আগেই মারা গেছে বলে রোসিনা ঘরে ঢুকে ইশারা করল।

“ওই বেশ্যাটা মরে গেছে?” নারীটি জিজ্ঞেস করল।

রোসিনা মাথা নেড়ে সম্মতি দিল।

“মরে গেছে?”
তখন সেই ছিচকাঁদুনে নারীর আসল চেহারা বেরিয়ে পড়ল। সে এমনভাবে কাঁদতে লাগল, যেন তার নিজের মা মারা গেছে। গলা ধরে আসা কান্নার ফাঁকে সে বলল, “গত বছরের আট জানুয়ারি ছিল আমাদের পরিবারের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর দিন। সেদিন আমার পুরুষ সেতুর নিচে কিছু টাকা পেয়েছিল। সে সেই টাকা নিয়ে মামা কালংয়ের পতিতালয়ে গিয়েছিল। সে এই বেশ্যার সঙ্গেই শুয়েছিল। সে এখন আমার সামনে মৃত হয়ে পড়ে আছে।
সেদিন পরে বাড়ি ফিরেছিল। সেদিনই একমাত্র দিন ছিল যেদিন সে পরিবারের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করেছিল।
সে আমাদের কাউকেই মারেনি।”

রোসিনা তার দিকে অবজ্ঞার চোখে তাকালো। তার চাহনি এমন ছিল যেন সে বলতে চাইছে—এত ঘ্যানঘ্যান করা কোনো মানুষকে কেউ মারতে চাইলে তাকে মোটেও দোষ দেওয়া যায় না। তারপর সে সেই ঘ্যানঘ্যানে মহিলাকে দেবী আয়ুর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে দিতে বলে বিদায় করল। দেবী আয়ুর জন্য কাফনের কাপড়ের কোনো প্রয়োজন ছিল না, কারণ তিনি বারো দিন আগেই তা কিনে রেখেছিলেন। তাকে গোসল করানোরও কোনো দরকার ছিল না, কারণ তিনি আগেই নিজে নিজে গোসল সেরে নিয়েছিলেন। এমনকি তিনি নিজের মৃতদেহ নিজেই সংরক্ষণ করে গিয়েছিলেন। রোসিনা কাছের মসজিদের ইমামকে ইশারায় জানাল, "যদি দেবী আয়ুর ক্ষমতা থাকত, তবে তিনি নিজের জানাজার দোয়া নিজেই পড়তেন।" ইমাম সাহেব সেই বোবা মেয়েটির দিকে ঘৃণাভরে তাকালেন। তিনি বললেন যে, এক বেশ্যার লাশের স্তূপের জন্য দোয়া পড়তে বা তাকে কবর দিতে তাঁর কোনো আগ্রহ নেই। রোসিনা আবারও ইশারায় বলল, "যেহেতু তিনি মারা গেছেন, তাই তিনি আর বেশ্যা নন।" শেষ পর্যন্ত মসজিদের ইমাম কিয়াই জাহরো হার মানলেন। তারপর দেবী আয়ুর জানাজার নেতৃত্ব দিলেন।

মৃত্যুর আগ পর্যন্ত দেবী আয়ু সত্যিই তার নবজাতক শিশুটিকে দেখেননি। খুব কম মানুষই বিশ্বাস করেছিল যে তার মৃত্যু এত তাড়াতাড়ি আসবে। লোকে বলত দেবী বড় ভাগ্যবান। কারণ কোনো সন্তানকে এমন কুৎসিত রূপে জন্মাতে দেখলে যে কোন মা-ই অকল্পনীয় কষ্ট পেতেন। অনেকে মনে করত দেবীর মৃত্যু শান্তিপূর্ণ হবে না। আর তিনি কবরে শান্তিতে থাকতে পারবেন না। কিন্তু একমাত্র রোসিনাই এ বিষয়ে নিশ্চিত ছিল না। দেবী আয়ু এই পৃথিবীতে সুন্দর ছোট মেয়ে শিশুদের সবচেয়ে বেশি ঘৃণা করতেন—এটা রোসিনা জানত । দেবী যদি জানতেন যে তার ছোট মেয়েটি তার বড় বোনদের চেয়ে একদম আলাদা ও কুৎসিত, তবে তিনি হয়তো অনেক খুশি হতেন। কিন্তু তিনি তা জানতে পারেননি। এই বোবা মেয়েটি তার কর্ত্রীর প্রতি সবসময় অনুগত ছিল। তাই দেবীর মৃত্যুর আগের দিনগুলোতে সে জোর করে শিশুটিকে তার মায়ের কাছে নিয়ে যায়নি। অথচ তার শিশুটি দেখতে কেমন হয়েছে সেটা দেবী যদি জানতে পারতেন, তবে তিনি হয়তো আরও কয়েক বছর তার মৃত্যুকে পিছিয়ে দিতেন। কিয়াই জাহরো বললেন, "এসব বাজে কথা। মৃত্যুর সময় আল্লাহ নির্ধারণ করেন।" রোসিনা তার কর্ত্রীর মতোই জেদি ছিল। সে ইশারায় বলল, "তিনি বারো দিন ধরে মরার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। আর তারপরই তিনি মারা গেলেন।"

মৃতার ইচ্ছা অনুযায়ী রোসিনা এখন সেই দুর্ভাগা শিশুটির অভিভাবক হলো। সে দেবী আয়ুর তিন সন্তানকে টেলিগ্রাম পাঠাল। তাতে লেখা ছিল-- তাদের মা মারা গেছেন এবং তাকে বুদি ধর্ম সরকারি কবরস্থানে দাফন করা হবে। তাদের মধ্যে একজনও এল না। তবে পরের দিন খুব জাঁকজমকপূর্ণভাবে দেবীর শেষকৃত্য সম্পন্ন হলো। এই শহরে বহু বছর ধরে এমন আয়োজন দেখা যায়নি এবং সামনের অনেক বছর হয়তো দেখা যাবে না। যেসব পুরুষ কোনো না কোনো সময় এই বেশ্যার সাথে রাত কাটিয়েছে প্রায় সবাই তাকে বিদায় জানাতে এল। তারা জুঁই ফুলের তোড়ায় কোমল চুম্বন দিয়ে কফিনের রাস্তায় সেগুলো ছিটিয়ে দিচ্ছিল। তাদের স্ত্রী এবং প্রেমিকারাও রাস্তার ধারে ভিড় করেছিল। তারা তাদের পুরুষদের পেছনে দাঁড়িয়ে হিংসার চোখে সব দেখছিল। তারা নিশ্চিত ছিল যে, এই কামাতুর পুরুষগুলো একটা মৃতদেহের সাথে শোয়ার সুযোগ পাওয়ার জন্যও একে অপরের সাথে মারামারি করবে।

চারজন প্রতিবেশী পুরুষ কফিনটি বয়ে নিচ্ছিল। রোসিনা কফিনের পেছনে পেছনে হাঁটছিল। তার কোলের মধ্যে শিশুটি গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিল। রোসিনা তার কালো ওড়না দিয়ে শিশুটিকে আড়াল করে রেখেছিল। সেই ঘ্যানঘ্যানে মহিলাটি এক ঝুড়ি ফুলের পাপড়ি নিয়ে তার পাশে পাশে হাঁটছিল। রোসিনা ফুলগুলো মুঠো ভরে নিয়ে বাতাসে ছুড়ে দিচ্ছিল। সে ফুলের সাথে কিছু পয়সাও ছুড়ছিল। ছোট বাচ্চারা সেই পয়সা কুড়ানোর জন্য কফিনের নিচে দৌড়াদৌড়ি করছিল। তারা নালায় পড়ে যাওয়ার বা দোয়া পড়া শোকার্ত মানুষের পায়ের নিচে পিষ্ট হওয়ার ঝুঁকি নিচ্ছিল।

কবরস্থানের একদম কোণায় অন্যান্য দুর্ভাগা মানুষের কবরের মাঝে দেবী আয়ুকে দাফন করা হলো। ইমাম কিয়াই জাহরো এবং গোরখোদক মিলে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। সেখানে ঔপনিবেশিক আমলের এক কুখ্যাত চোর, একজন পাগল খুনি এবং বেশ কয়েকজন কমিউনিস্টের কবর ছিল। এখন সেখানে এক বেশ্যাকেও সমাহিত করা হলো। লোকে বিশ্বাস করত এই পাপী আত্মাগুলো কবরের আজাব ও পরীক্ষায় কষ্ট পাবে। তাই তাদের পুণ্যবান ব্যক্তিদের কবর থেকে দূরে রাখা ছিল বুদ্ধিমানের কাজ। যার ফলে পুণ্যবানরা যেন শান্তিতে পচতে পারেন এবং কোনো ঝামেলা ছাড়াই স্বর্গের হুরদের সাথে সময় কাটাতে পারেন।

উৎসবমুখর অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার সাথে সাথে মানুষ দ্রুত দেবী আয়ুকে ভুলে গেল। সেই দিন থেকে আর কেউ কবরে আসেনি। এমনকি রোসিনা বা বিউটিও না। তারা কবরটিকে অযত্নে ফেলে রাখল। সেটি সমুদ্রের ঝড়ে লণ্ডভণ্ড হলো। ঝরা পাতায় ঢেকে গেল এবং বুনো ঘাসে ছেয়ে গেল। একমাত্র রোসিনার কাছেই দেবী আয়ুর কবরের যত্ন না নেওয়ার একটি জোরালো কারণ ছিল। সে সেই কুৎসিত শিশুটিকে ইশারায় বলল, "আমরা শুধু মৃতদের কবরের যত্ন নিই।" শিশুটি অবশ্য সেই ইশারা কিছুই বুঝতে পারেনি।

হয়তো রোসিনার ভবিষ্যৎ দেখার ক্ষমতা ছিল। এই ক্ষমতা সে তার পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে পেয়েছিল। পাঁচ বছর আগে চৌদ্দ বছর বয়সে সে তার বাবার সাথে প্রথম এই শহরে এসেছিল। তার বাবা ছিলেন পাহাড়ের বালি খননকারী এবং বাতের ব্যথায় ভোগা এক বৃদ্ধ। তারা মামা কালং-এর বেশ্যালয়ে দেবী আয়ুর ঘরে হাজির হয়েছিল। দেবী আয়ু প্রথমে এই ছোট মেয়েটি বা তার বাবার প্রতি কোনো আগ্রহ দেখাননি। বৃদ্ধ লোকটির নাক ছিল টিয়া পাখির মতো, চুলে পাক ধরেছিল এবং চামড়া ছিল তামাটে ও কুঁচকানো। সে খুব সাবধানে হাঁটছিল যেন সামান্য ধাক্কা দিলেই তার হাড়গোড় ভেঙে পড়বে। দেবী আয়ু তাকে তখনই চিনতে পারলেন। তিনি বললেন, "বুড়ো মিয়া, তোমার তো নেশা লেগে গেছে। দুদিন আগেই আমরা এক সঙ্গে রাত কাটিয়েছি।" বৃদ্ধটি লাজুক হেসে মাথা নাড়ল। সে বলল, "আমি তোমার বুকেই মরতে চাই। আমি তোমাকে টাকা দিতে পারব না, তবে এই বোবা মেয়েটিকে দিতে পারি। সে আমার মেয়ে।"

দেবী আয়ু বিভ্রান্ত হয়ে মেয়েটির দিকে তাকালেন। রোসিনা শান্তভাবে হাসছিল। সে তখন খুব রোগা ছিল এবং তার গায়ে বড় মাপের একটি জামা ছিল। তার পা ছিল খালি। তার ত্বক ছিল পাহাড়ের মেয়েদের মতো মসৃণ এবং মুখমণ্ডল ছিল গোলগাল। দেবী আয়ু বুঝতে পারছিলেন না এই মেয়েকে নিয়ে তিনি কী করবেন। তিনি বৃদ্ধকে জিজ্ঞেস করলেন, "আমার নিজেরই তিনটে মেয়ে আছে। এই মেয়েকে নিয়ে আমি কী করব?"

মেয়েটির বাবা বললেন, "সে কথা বলতে পারে না ঠিকই, কিন্তু লিখতে-পড়তে জানে।"

দেবী হেসে বললেন, "আমার সব সন্তানই কথা বলতে আর লিখতে-পড়তে পারে।"

কিন্তু বৃদ্ধ নাছোড়বান্দা। সে দেবীর বুকেই মরতে চায়। আর তার বিনিময়ে মেয়েটিকে দিয়ে যেতে চায়। সে বলল, "তুমি তাকে দিয়ে বেশ্যাবৃত্তি করাতে পারো --তার উপার্জিত টাকা নিতে পারো। অথবা কেউ তাকে না চাইলে তাকে টুকরো টুকরো করে কেটে বাজারে মাংস হিসেবে বিক্রি করতে পারো।"

দেবী আয়ু বললেন, "আমার মনে হয় না কেউ তার মাংস খেতে চাইবে।"
বৃদ্ধ হাল ছাড়তে রাজি হলো না। যেমন ছোট্ট শিশুরা প্রস্রাব আটকে রাখতে পারে না-- কিছুক্ষণ পর ঠিক তাদের মতোই হয়ে গেল বৃদ্ধ লোকটি। এমন নয় যে দেবী আয়ু দয়া করতে চাইছিলেন না। ওই বৃদ্ধকে তার বিছানায় কয়েকটা সুন্দর ঘণ্টা উপহার দিতে তিনি অনিচ্ছুক ছিলেন না। কিন্তু তিনি সত্যিই এই অদ্ভুত লেনদেনে বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছিলেন। বারবার তিনি বৃদ্ধ ও বোবা শিশুটির দিকে তাকাচ্ছিলেন।

অবশেষে মেয়েটি একটি কাগজ ও পেন্সিল চাইল। সে লিখল: "এগিয়ে যাও এবং তার সাথে শোও। যেকোনো মুহূর্তে সে মারা যেতে যাচ্ছে।" তাই তিনি বৃদ্ধের সাথে শুলেন। কোনো চুক্তিতে রাজি হয়ে নয়--বরং শিশুটির পরামর্শ শুনে যে ওই লোকের আয়ু শেষ হতে চলেছে ভেবে শুলেন।

তারা বিছানায় মল্লযুদ্ধ করল। বোবা মেয়েটি শোবার ঘরের দরজার বাইরে একটি চেয়ারে বসে ছিল। সে তার কাপড় ভর্তি একটি ছোট ব্যাগ ধরে ছিল। ব্যাগটি একটু আগে তার বাবা বহন করছিল। সে অপেক্ষা করছিল। দেখা গেল, দেবী আয়ুর খুব বেশি সময়ের প্রয়োজন হলো না। তিনি স্বীকার করলেন যে সত্যিই তিনি খুব একটা কিছু অনুভব করেননি; শুধু তার কুঁচকির মাঝখানে একটু সুড়সুড়ি লেগেছিল। এই বেশ্যা বললেন, " ব্যাপারটা এমন ছিল যেন একটা ফড়িং আমার নাভিতে আঁচড় কাটছিল।"

লোকটি তার ওপর প্রচণ্ডভাবে আক্রমণ করল। প্রায় কোনো ছোটখাটো কথাবার্তা ছাড়াই সে এমনভাবে এগোচ্ছিল যেন ডাচ সৈন্যদের একটি ব্যাটালিয়ন ধ্বংসের মিশন নিয়ে ধেয়ে আসছে। সে অবাধে চলল, নিজের বাতের ব্যথার কথা ভুলেই গেল। তার এই তাড়াহুড়ো দ্রুত ফল দিল। সে একটি সংক্ষিপ্ত আর্তনাদ ছাড়ল। তার শরীর খিঁচুনি দিয়ে উঠল। প্রথমে দেবী আয়ু ভেবেছিলেন--এটা একজন পুরুষের বীর্যপাতের সাধারণ খিঁচুনি। কিন্তু দেখা গেল এটা তার চেয়েও বেশি কিছু। বৃদ্ধ তার আত্মাও ঢেলে দিল। সে দেবীর আলিঙ্গনেই মারা গেল; তার পুরুষাঙ্গ তখনও ভেজা এবং প্রসারিত ছিল।

তারা তাকে চুপচাপ কবরস্থানের সেই একই কোণে দাফন করল, যেখানে পরে দেবী আয়ুকেও দাফন করা হবে। যদিও রোসিনা কখনো তার মালকিনের কবরের যত্ন নেয়নি, সে সবসময় প্রতি রোজা মাসের শেষে তার বাবার কবর দেখার সুযোগ করে নিত। সে কবরের ঘাস পরিষ্কার করত এবং অন্তরের বিশ্বাস ছাড়াই প্রার্থনা করত।

দেবী আয়ু বোবা তরুণীটিকে নিজের বাড়িতে নিয়ে এলেন। সেই দুঃখজনক সন্ধ্যার পারিশ্রমিক হিসেবে নয়, বরং এই কারণে যে বোবা মেয়েটির আর কোনো বাবা বা মা ছিল না। অন্য কেউ ছিল না যাকে সে পরিবার বলতে পারত। দেবী আয়ু তখন ভেবেছিলেন, মেয়েটি অন্তত বাড়িতে তাকে সঙ্গ দিতে পারবে। প্রতি বিকেলে তার চুলে উকুন খুঁজে দেবে এবং তিনি যখন পতিতালয়ে যাবেন তখন বাড়িটি পাহারা দেবে।

রোসিনা আশা করেছিল একটি প্রাণবন্ত বাড়িতে সে যাবে। কিন্তু সেখানে পৌঁছে মোটেও সেই প্রাণবন্ত বাড়িটি খুঁজে পেল না। বরং এটি ছিল একটি সাদামাটা বাড়ি--সেটা ছিল শান্ত এবং স্তব্ধ। বাড়িটির দেয়াল ছিল ক্রিম রঙের-- দেখে মনে হতো বছরের পর বছর রঙ করা হয়নি। আয়নাগুলো ধুলাবালিতে ঢাকা এবং পর্দায় ছাতা পড়ে গিয়েছিল। এমনকি রান্নাঘরটিও দেখে মনে হতো মাঝেমধ্যে কফির একটি পাত্র তৈরি করা ছাড়া কখনো ব্যবহার করা হয় না। শুধুমাত্র বাথরুম ও বাড়ির মালকিনের শোবার ঘর—এই দুটি ঘর ভালোভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা ছিল। জাপানি কায়দার বড় একটা বাথটাব ছিল বাথরুমে।

বাড়িতে নিজের প্রথম কয়েকদিনেই রোসিনা নিজেকে প্রমাণ করল। সে রাখার মতো একজন যোগ্য তরুণী-- সেটা সে বুঝিয়ে দিল। দেবী আয়ু যখন বিকেলে ঘুমাতেন, রোসিনা তখন কাজ করত। সে দেয়াল রঙ করল-- মেঝে পরিষ্কার করল। কাঠমিস্ত্রির কাছ থেকে পাওয়া করাত গুঁড়ো দিয়ে সে জানালার কাচ ঘষল। সে পর্দাগুলো বদলে ফেলল। আঙিনা গোছানো শুরু করল। শীঘ্রই সব ধরনের ফুলে ভরে গেল আঙিনা। বিকেল হলে দেবী আয়ু জেগে উঠলেন। দীর্ঘদিনের মধ্যে প্রথমবারের মতো তিনি রান্নাঘর থেকে আসা ভেষজ ও মশলার সুবাস পেলেন। দেবী আয়ু বাইরে কাজে যাওয়ার আগে তারা একসাথে রাতের খাবার খেলেন।

সেই জরাজীর্ণ বাড়িটির অনেক যত্নের প্রয়োজন ছিল। তা নিয়ে মোটেও বিরক্ত ছিল না রোসিনা। কিন্তু সে একটা বিষয়ে কৌতূহলী ছিল—সেখানে কেন শুধুমাত্র তারা দুজনেই থাকত? তখন দেবী আয়ু এখনো বোবা মেয়েটির ইশারা ভাষা শিখতে পারেননি, তাই রোসিনা আবার লিখল: "তুমি বলেছিলে তোমার তিনটি সন্তান আছে?" দেবী আয়ু বললেন, "ঠিক তাই। তারা চলে গেছে। যে মুহূর্তে তারা একজন পুরুষের প্যান্টের বোতাম খোলা শিখেছে, তখনই তারা পালিয়েছে।"

রোসিনা সেই মন্তব্যটি মনে রাখল। কয়েক বছর পর দেবী আয়ু যখন বললেন যে তিনি আর গর্ভবতী হতে চান না (যদিও তিনি ইতিমধ্যে গর্ভবতী ছিলেন) এবং তিনি সন্তান হওয়া নিয়ে বিরক্ত, তখন রোসিনা সেই কথাটি মনে করিয়ে দিল। তারা প্রায়ই বিকেলে রান্নাঘরের দরজায় বসে গল্প করতেন। রোসিনা কিছু মুরগি পালন শুরু করেছিল-- সেগুলো মাটিতে নখর দিয়ে আঁচড় কাটতো। তারা দুজনে দেখতেন।

শেহরাজাদের মতো দেবী আয়ু অনেক কল্পনাপ্রবণ গল্প বলতেন। তার বেশিরভাগই ছিল তার সুন্দর মেয়েদের সম্পর্কে। এভাবেই তাদের মধ্যে একটি গভীর বোঝাপড়া ও বন্ধুত্ব গড়ে উঠল। তাই যখন দেবী আয়ু তার পেটের শিশুকে মারার চেষ্টা করলেন রোসিনা তখন তাকে থামাতে গেল না। দেবী আয়ু সব রকম উপায়ে চেষ্টা করেছিলেন। এমনকি দেবী যখন হতাশ হতে শুরু করলেন, রোসিনা আবারও নিজেকে একজন বুদ্ধিমান তরুণী হিসেবে প্রমাণ করল। সে বেশ্যাকে ইশারায় বলল: "প্রার্থনা করো যাতে শিশুটি কুরূপ হয়।"

দেবী আয়ু তার দিকে ফিরে উত্তর দিলেন, "বহু বছর হয়ে গেছে, আমি আর প্রার্থনায় বিশ্বাস করি না।"

রোসিনা হেসে বলল, "ঠিক আছে। এটা নির্ভর করে তুমি কার কাছে প্রার্থনা করছ তার ওপর। প্রকৃতপক্ষে কিছু দেবতা বেশ কৃপণ বলে প্রমাণিত হয়েছেন।"

দ্বিধাগ্রস্তভাবেই দেবী আয়ু প্রার্থনা করা শুরু করলেন। যখনই মনে পড়ত তখনই তিনি প্রার্থনা করতেন। বাথরুমে, রান্নাঘরে, রাস্তায়, এমনকি যদি কোনো মোটা পুরুষ তার শরীরের ওপর উঠে সঙ্গম করত এবং সেই সব মুহূর্তে তার প্রার্থনার কথা মনে পড়ত, তিনি সাথে সাথে মনে মনে বলতেন: "যে কেউ আমার প্রার্থনা শুনছে—সেই দেবতা বা দানব, ফেরেশতা বা জিন—তোমরা আমার সন্তানকে কুরূপ করো।"

তিনি এমনকি সব ধরনের কুৎসিত জিনিস কল্পনা করতে শুরু করলেন। তিনি একটি শিংওয়ালা শয়তানের কথা ভাবলেন যার দাঁত বুনো শুয়োরের মতো বেরিয়ে আছে। এমন একটি শিশু পাওয়া কতটা আনন্দদায়ক হবে তিনি তা ভাবলেন। একদিন তিনি একটি বৈদ্যুতিক সকেট দেখে সেটিকে শিশুটির নাক হিসেবে কল্পনা করলেন। তিনি বাটির হাতলের মতো কান এবং মাটির ব্যাংকের (পিগি-ব্যাঙ্ক) ফুটোর মতো মুখ কল্পনা করলেন। তার চুল হবে ঝাড়ুর খড়ের মতো।

এমনকি তিনি টয়লেটে বসে থাকা সত্যিই একটি ঘৃণ্য মল দেখে আনন্দে লাফিয়ে উঠলেন। তিনি মনে মনে চাইলেন—তিনি কি অনুগ্রহ করে এমন একটি শিশু পেতে পারেন না যার চামড়া হবে কোমোডো ড্রাগনের মতো এবং পা হবে কচ্ছপের মতো? দেবী আয়ু তার কল্পনা নিয়ে মেতে রইলেন এবং দিন দিন তা আরও বন্য হয়ে উঠতে লাগল। আর এদিকে তার গর্ভে শিশুটি বড় হতে থাকল।

তার গর্ভধারণের সপ্তম পূর্ণিমার রাতে এই প্রার্থনার বিষয়টি চূড়ান্ত রূপ নিল। সেই রাতে রোসিনার সাথে তিনি সুগন্ধি ফুল-জলে গোসল করলেন। এটি এমন এক রাত যে রাতে হবু মা তার সন্তান কেমন হবে সেই বাসনা প্রকাশ করেন এবং একটি নারকেলের মালার ওপর শিশুর মুখচ্ছবি আঁকেন। বেশিরভাগ মা সেখানে দ্রৌপদী, সীতা কিংবা কুন্তীর মুখ আঁকতেন, অথবা পৌরাণিক কাহিনীর সবচেয়ে সুন্দরী কোনো চরিত্রের ছবি আঁকতেন। আর যদি তারা ছেলে সন্তান চাইতেন, তবে তারা যুধিষ্ঠির, অর্জুন কিংবা ভীমের ছবি আঁকতেন। কিন্তু দেবী আয়ু একটি কাজ করল। সে কালো কয়লার একটি টুকরো নিল। একটি কুৎসিত শিশু আঁকল। হয়তো মা হিসেবে পৃথিবীতে সে-ই প্রথম এটা করল। এই কারণে সে মৃত্যুর দিন পর্যন্ত নিশ্চিত হতে পারেনি তার এই কাজের ফল কী হবে। তিনি আশা করছিলেন --তার শিশুটি তার দেখা কোনো মানুষ বা অন্য কিছুর মতো হবে না; হয়তো বড়জোর একটি বুনো শুয়োর কিংবা বানরের মতো হবে। তাই তিনি এমন এক ভয়ংকর দানবের অবয়ব আঁকলেন, যা তিনি আগে কখনো দেখেননি এবং তাকে কবরে শোয়ানোর আগে পর্যন্ত আর কখনো দেখবেনও না।

কিন্তু দীর্ঘ একুশ বছর পর, যেদিন তিনি পুনরায় জীবিত হয়ে কবর থেকে উঠে এলেন, সেদিন শেষ পর্যন্ত তিনি তাকে দেখতে পেলেন।

সেই সময় দিন শেষ হয়ে সন্ধ্যা নামছিল। ঋতু পরিবর্তনের সংকেত নিয়ে ঘূর্ণিঝড়ের সাথে প্রচণ্ড বৃষ্টি পড়ছিল। পাহাড়ের বুনো কুকুরগুলো তীক্ষ্ণ স্বরে ডাকছিল। তাদের সেই চিৎকার মসজিদের মুয়াজ্জিনের মাগরিবের আজানকেও ছাপিয়ে যাচ্ছিল। মুয়াজ্জিন স্পষ্টতই মানুষকে মসজিদে ডাকতে ব্যর্থ হচ্ছিলেন, কারণ গোধূলি বেলায় এই প্রবল বৃষ্টি আর কুকুরের ডাকের মধ্যে মানুষ বাইরে বেরোতে চাইছিল না। বিশেষ করে যখন রাস্তার ওপর কফিনের কাপড় জড়ানো এক প্রেতাত্মা ভেজা শরীরে ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে হেঁটে যাচ্ছিল, তখন তো বেরোনোর প্রশ্নই আসে না।

সরকারি কবরস্থান থেকে তার বাড়ির দূরত্ব খুব একটা কম ছিল না। কিন্তু ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল চালকরা (ওজেক ড্রাইভার) দেবী আয়ুকে তুলে নেওয়ার চেয়ে বরং নিজেদের গাড়ি ড্রেনে আছাড় মেরে যত দ্রুত সম্ভব পালিয়ে যাওয়াকেই ভালো মনে করল। কোনো মিনিবাস থামল না। এমনকি রাস্তার ধারের দোকান আর খাবারের হোটেলগুলোও সেদিনের মতো তাদের দরজা-জানালা শক্ত করে বন্ধ করে দিল। রাস্তায় কোনো মানুষ ছিল না, এমনকি কোনো গৃহহীন বা পাগলও ছিল না। মৃত্যু থেকে জেগে ওঠা এই বৃদ্ধা ছাড়া সেখানে আর কেউ ছিল না। আকাশে ছিল কেবল কিছু বাদুড়। তারা ঝড়ের ঝাপটা সয়ে সর্বশক্তি দিয়ে উড়ছিল। আর ছিল জানালার পর্দার ফাঁক দিয়ে উঁকি দেওয়া কিছু ফ্যাকাশে ও ভীত মুখ।

তিনি ঠান্ডায় কাঁপছিলেন এবং তার ক্ষুধাও লেগেছিল। কয়েকবার তিনি এমন কিছু পরিচিত মানুষের দরজায় কড়া নাড়ার চেষ্টা করলেন যারা হয়তো তাকে মনে রেখেছে। এই বাসিন্দাদের মধ্যে কেউ কেউ ভয়ে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল। আর যারা তা হয়নি তারা চুপ করে থাকাই পছন্দ করল।

তাই দূর থেকে যখন তিনি নিজের বাড়িটি চিনতে পারলেন, তখন তিনি খুব খুশি হলেন। যেমনটা লোকে তাকে কবরে শোয়ানোর আগে সে দেখে গিয়েছিল-- বাড়িটি দেখতে ঠিক সেরকমই ছিল। সীমানাপ্রাচীর জুড়ে বাগানবিলাস ফুল আর চন্দ্রমল্লিকাগুলো বৃষ্টির ধারায় শান্ত দেখাচ্ছিল। বারান্দার বাতি থেকে এক চিলতে উষ্ণ আলো আসছিল। তিনি রোসিনাকে ভীষণ মিস করছিলেন। আর সে তার জন্য এক প্লেট রাতের খাবার হয়তো অপেক্ষা করছে-- মনে মনে আশা করছিলেন তিনি।

এই কথা ভেবে তিনি স্টেশনের যাত্রীদের মতো একটু দ্রুত পা চালালেন। এর ফলে ঝড়ের ঝাপটায় তার গায়ে জড়ানো আলগা কাফনের কাপড়টি খুলে গেল এবং তার নগ্ন শরীর বেরিয়ে পড়ল। কিন্তু তিনি দ্রুত হাত দিয়ে সেই সাদা কাপড়টি ধরে ফেললেন এবং গোসল শেষে তোয়ালে দিয়ে শরীর ঢাকার মতো করে পুনরায় নিজেকে জড়িয়ে নিলেন। তিনি তার চতুর্থ সন্তানটিকে খুব দেখতে চাচ্ছিলেন। মানুষ যা বলে তা সত্যিই—একটি দীর্ঘ এবং গভীর ঘুম মানুষের মন বদলে দিতে পারে। বিশেষ করে যদি সেই ঘুম একুশ বছর স্থায়ী হয় তবে তো বদলে যাবেই।

বারান্দার বাতির ভৌতিক আলোর নিচে একা একটি চেয়ারে এক তরুণী বসে ছিল। ঠিক সেই জায়গায় যেখানে আগে দেবী আয়ু এবং রোসিনা বিকেলে বসে একে অপরের চুলের উকুন খুঁজতেন। মেয়েটি এমনভাবে বসে ছিল যেন সে কারও অপেক্ষা করছে। প্রথমে দেবী আয়ু ভেবেছিলেন ওটি হয়তো রোসিনা। কিন্তু সামনে দাঁড়ানোর পর তিনি বুঝতে পারলেন মেয়েটি অপরিচিত। সেই ভয়ংকর চেহারাটি দেখে দেবী প্রায় চিৎকার করে উঠছিলেন। মেয়েটিকে দেখে মনে হচ্ছিল সে মারাত্মকভাবে পুড়ে গেছে। দেবীর মাথার ভেতরে এক অশুভ কণ্ঠস্বর বলে উঠল-- তিনি পৃথিবীতে ফিরে আসেননি বরং নরকের ভেতরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।এই কুৎসিত দানবটি আসলে এক হতভাগ্য তরুণী ছাড়া আর কিছুই নয়—সেটা কিন্তু শীঘ্রই তিনি বুঝতে পারলেন । শেষ পর্যন্ত তিনি এমন একজনকে পেলেন যে বৃষ্টির রাতে কাফন জড়ানো এক বৃদ্ধাকে দেখে পালিয়ে যায়নি—এটা দেখে তিনি বরং শুকরিয়া আদায় করলেন। মেয়েটি তার নিজের কন্যা সেটা অবশ্যই দেবী তখনো বুঝতে পারেননি। কারণ ইতিমধ্যে একুশটি বছর পার হয়ে গেছে সেটা তিনি তখনো বুঝতে পারেননি। তাই সমস্ত বিভ্রান্তি দূর করতে দেবী আয়ু মেয়েটিকে সম্ভাষণ জানালেন।

তিনি ব্যাখ্যা করার ভঙ্গিতে বললেন, “এটি আমার বাড়ি। তোমার নাম কী?”

"বিউটি।"

দেবী আয়ু একচোট অসভ্যের মতো হেসে উঠলেন, কিন্তু পরক্ষণেই নিজেকে থামিয়ে নিলেন এবং সবকিছু বুঝতে পারলেন। তিনি অন্য একটি চেয়ারে বসলেন। মাঝখানে হলুদ টেবিলক্লথ ঢাকা একটি টেবিল এবং তাতে মেয়েটির কফির কাপ রাখা ছিল।

তিনি অবাক হয়ে বললেন, "ঠিক যেন এক গাভী দেখছে যে তার জেল্লাদার বাছুরটি ইতিমধ্যেই দৌড়াতে শিখে গেছে।" তারপর তিনি ভদ্রভাবে টেবিলের ওপর রাখা কফিটি চাইলেন এবং সেটি পান করলেন। গর্বের সাথে তিনি যোগ করলেন, "আমি তোমার মা।"

নিজের মেয়েকে ঠিক যেমনটা চেয়েছিলেন তেমন হতে দেখে তিনি গর্বে বুক ফুলিয়ে নিলেন। যদি তখন বৃষ্টি না পড়ত, তিনি যদি ক্ষুধার্ত না হতেন এবং আকাশে যদি চাঁদ থাকত, তবে তিনি আনন্দে দৌড়ে ছাদের ওপর উঠে নাচতেন।

মেয়েটি তার দিকে তাকাল না। এমনকি কোনো কথাও বলল না।

দেবী আয়ু তাকে জিজ্ঞেস করলেন, "এত মাঝরাতে তুমি এখানে বারান্দায় কী করছ?"

মেয়েটি তখনও মাথা ঘোরাল না। শেষ পর্যন্ত বলল, "আমি আমার রাজপুত্রের অপেক্ষায় আছি। সে এসে আমাকে এই কুৎসিত চেহারার অভিশাপ থেকে মুক্ত করবে।"

সে অন্য মানুষরা তার মতো এত কুৎসিত নয় এটা যখন থেকে সে বুঝতে পেরেছিল, তখন থেকেই সেই রূপবান রাজপুত্রের প্রতি তার এক ধরণের ঘোর তৈরি হয়েছিল। যখন সে কোলের শিশু ছিল, তখন রোসিনা তাকে প্রতিবেশীদের বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু কেউ তাদের গ্রহণ করেনি। কারণ তাকে দেখলে প্রতিবেশীদের ছেলেমেয়েরা সারা দুপুর চিৎকার করে কাঁদত এবং বয়স্করা সাথে সাথে জ্বরে পড়ে দুদিন পরেই মারা যেত। সবখানেই তাকে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিল। এমনকি স্কুলে যাওয়ার সময় হলেও কোনো স্কুলই বিউটিকে ভর্তি করল না। রোসিনা একবার একজন প্রধান শিক্ষকের কাছে গিয়ে অনেক অনুনয়-বিনয় করেছিল। কিন্তু সেই প্রধান শিক্ষক কুৎসিত মেয়েটির চেয়ে বোবা তরুণীটির প্রতিই বেশি আগ্রহী ছিলেন এবং দরজা বন্ধ করে অফিসের ভেতরেই তাকে অসভ্যভাবে স্পর্শ করেছিলেন। বুদ্ধিমতী রোসিনা ভাবল, ইচ্ছা থাকলে উপায় হয়; বিউটিকে স্কুলে ভর্তি করার জন্য যদি তাকে কুমারীত্বও হারাতে হয়, তবে সে যেকোনোভাবেই তা বিসর্জন দিতে রাজি। তাই পরদিন সকালে সে নিজেকে প্রধান শিক্ষকের অফিসের চেয়ারে নগ্ন অবস্থায় আবিষ্কার করল এবং সিলিং ফ্যানের শব্দের নিচে তারা তেইশ মিনিট ধরে মিলন করল। কিন্তু এরপরও দেখা গেল যে বিউটির ভর্তি নিষিদ্ধই রয়ে গেছে; কারণ সে স্কুলে এলে অন্য শিশুরা ভর্তি হতে চাইবে না।

হার না মেনে রোসিনা শেষ পর্যন্ত ঠিক করল যে সে নিজেই তাকে বাড়িতে অন্তত অক্ষর আর সংখ্যা শেখাবে। কিন্তু তাকে কিছু শেখানোর সুযোগ পাওয়ার আগেই রোসিনা অবাক হয়ে দেখল যে মেয়েটি ইতিমধ্যেই টিকটিকির ডাক সঠিকভাবে গুনতে পারে। সে আরও বেশি অবাক হলো যখন একদিন বিকেলে দেখল-- বিউটি তার মায়ের রেখে যাওয়া এক গাদা বই বের করে খুব জোরে জোরে পড়ছে। অথচ কেউ তাকে বর্ণমালা পর্যন্ত শেখায়নি। এই বিস্ময়কর ঘটনাগুলোর মধ্যে কোনো একটি রহস্য ছিল। রোসিনার বিস্ময় বাড়িয়ে দিয়ে মেয়েটি কয়েক বছর আগেই কথা বলতে শিখে গিয়েছিল। যদিও কে তাকে কথা বলা শিখিয়েছিল তা কেউ জানত না। রোসিনা ছোট মেয়েটির ওপর নজর রাখার চেষ্টা করল। কিন্তু সে কখনও সীমানাপ্রাচীরের বাইরে যেত না এবং কোনো মানুষও সেখানে আসত না। হাত দিয়ে কথা বলা সেই বোবা পরিচারিকা ছাড়া সে আর কারোর দেখা পায়নি। তবুও সে দৃশ্যমান এবং অদৃশ্য সবকিছুর নাম জানত—বিড়াল, টিকটিকি, মুরগি কিংবা বাড়ির চারপাশে ঘুরে বেড়ানো হাঁস, সবার নামই তার জানা ছিল।

এসব অলৌকিক ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও সে ছিল এক দুর্ভাগা, কুৎসিত এবং করুণ এক বালিকা। রোসিনা প্রায়ই তাকে জানালার পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে রাস্তার মানুষের দিকে উঁকি দিতে দেখত। কিংবা রোসিনা যখন কিছু কিনতে বাইরে যেত, সে তার দিকে এমনভাবে তাকিয়ে থাকত যেন সেও সাথে যাওয়ার জন্য মিনতি করছে। রোসিনা অবশ্যই তাকে সাথে নিতে পারলে খুশি হতো, কিন্তু ছোট মেয়েটি নিজেই করুণ স্বরে প্রতিবাদ করে বলত, "না, আমার না যাওয়াই ভালো, কারণ আমাকে দেখলে মানুষের সারা জীবনের জন্য খাওয়ার রুচি চলে যাবে।"

খুব ভোরে যখন মানুষজন ঘুম থেকে জাগত না, তখন সে বাইরে বের হতো। কেবল সবজি বিক্রেতারা তখন বাজারে যাওয়ার জন্য তাড়াহুড়ো করত, কৃষকরা মাঠে যেত কিংবা জেলেরা বাড়ি ফিরত। তারা সাইকেলে করে বা হেঁটে পাশ দিয়ে চলে যেত, কিন্তু ভোরের সেই আবছা আলোয় তারা তাকে দেখতে পেত না। সেই সময়েই সে বাইরের জগতের সাথে পরিচিত হতে পারত। সে দেখতে পেত বাদুড়রা তাদের বাসায় ফিরছে, চড়ুই পাখিরা বাদাম গাছের কুঁড়িতে এসে বসছে, মোরগগুলো জোরে ডাকছে, আর শুঁয়োপোকা থেকে প্রজাপতি হয়ে তারা জবা ফুলের পাপড়িতে গিয়ে বসছে। সে পাটিতে গা এলিয়ে দেওয়া বিড়ালের ছানাগুলো দেখত। প্রতিবেশীদের রান্নাঘর থেকে ভেসে আসা সুবাস উপভোগ করত। দূর থেকে আসা ইঞ্জিনের শব্দ আর রেডিওর ধর্মোপদেশ শুনত। আর সবকিছুর উপরে ছিল পূর্ব আকাশে জ্বলজ্বল করা শুক্র গ্রহ। কামরাঙা গাছের ডালে ঝোলানো দোলনায় বসে সে এসবই উপভোগ করত। রোসিনা জানত না যে সেই উজ্জ্বল জ্যোতিষ্কটিকে শুক্র গ্রহ বলা হয়, কিন্তু বিউটি তা খুব ভালোভাবেই জানত। এমনকি সে আকাশের সমস্ত নক্ষত্রপুঞ্জের জ্যোতিষশাস্ত্রীয় সংকেতগুলো সম্পর্কেও খুব ভালোভাবে পরিচিত হয়ে উঠেছিল।

ভোর হওয়ার সাথে সাথেই সে কচ্ছপের মাথার মতো নিজেকে ঘরের ভেতরে লুকিয়ে ফেলত। সে ছিল অনেকটা ওই কচ্ছপের মতোই যে বিরক্ত হওয়ার ভয়ে গুটিয়ে থাকে। কারণ স্কুলগামী শিশুরা সবসময় সীমানাপ্রাচীরের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে পড়ত। তারা কৌতূহলী হয়ে দরজা আর জানালার দিকে তাকিয়ে থাকত এই আশায় যে যদি তাকে একবার দেখা যায়। বড়রা তাদের সেই ভয়ঙ্কর বিউটি সম্পর্কে অনেক ভূতুড়ে গল্প শুনিয়েছিলেন, যে ওই বাড়িতে থাকে। তাদের বলা হয়েছিল যে সামান্য অবাধ্য হলেই সে তাদের মাথা কেটে ফেলবে কিংবা একটু ঘ্যানঘ্যান করলেই সে তাদের জ্যান্ত গিলে ফেলবে। এই সব গল্প যেমন তাদের আতঙ্কিত করত, ঠিক তেমনি তাদের মনে তাকে দেখার ইচ্ছাও জাগিয়ে তুলত। এমন কোনো ভয়ানক প্রেতাত্মা সত্যিই আছে কি না তারা সেটা বুঝতে চাইত। কিন্তু তারা কখনই তার দেখা পেত না। কারণ রোসিনা হাতে একটি ঝাড়ুর ডাণ্ডা উঁচিয়ে দ্রুত সেখানে হাজির হতো। আর তখন তারা সেই বোবা তরুণীকে গালিগালাজ করতে করতে দৌড়ে পালাত। সত্যি বলতে, শুধু শিশুরাই যে বিউটিকে দেখার আশায় গেটের সামনে থামত তা নয়; রিকশায় যাওয়া মহিলারাও এক মুহূর্তের জন্য মাথা ঘুরিয়ে উঁকি দিত, এমনকি কর্মস্থলে যাওয়া মানুষ বা মেষপালকরাও তাই করত।

কিন্তু রাত হলে বিউটি বাইরে বের হতো। সেই সময়ে শিশুদের বাইরে বেরোনো নিষিদ্ধ ছিল এবং বাবা-মায়েরা তাদের সন্তানদের সামলাতে ব্যস্ত থাকতেন। তখন রাস্তায় কেবল জেলেরা থাকত-- তারা কাঁধে বৈঠা আর জাল নিয়ে সমুদ্রের দিকে যেত। বিউটি এক কাপ কফি নিয়ে বারান্দার চেয়ারে বসে থাকত। রোসিনা যখন তাকে জিজ্ঞেস করত যে এত রাতে সে বারান্দায় কী করছে, তখন বিউটি ঠিক সেই উত্তরটিই দিত যা সে তার মাকে দিয়েছিল— "আমি আমার রাজপুত্রের অপেক্ষায় আছি। সে এসে আমাকে এই কুৎসিত চেহারার অভিশাপ থেকে মুক্ত করবে।"

"আহা, বেচারি মেয়ে আমার," তার মা সেই রাতে বললেন—যেটি ছিল তাদের প্রথম দেখার রাত। "এমন সৌভাগ্যের জন্য তোমার আসলে আনন্দে নাচা উচিত। চলো, ভেতরে যাই।"
---

দেবী আয়ু আবারও রোসিনার সেই পরিচিত আতিথেয়তা অনুভব করলেন। বোবা মেয়েটি প্রায় সাথে সাথেই তার পুরনো বাথটাবটিতে গরম পানি প্রস্তুত করে ফেলল। সেই পানিতে গন্ধক, ঝামা পাথর, চন্দনের টুকরো আর পান পাতা মেশানো ছিল ডিনার টেবিলে বসার আগে এই স্নান তাকে সতেজ করে তুলল। রোসিনা এবং বিউটি দেবীর রাক্ষুসে ক্ষুধা দেখে হাঁ করে তাকিয়ে রইল। তিনি এমনভাবে খাচ্ছিলেন যেন না খেয়ে পার করে দেওয়া সেই দীর্ঘ বছরগুলোর অভাব তিনি একবেলাতেই পুষিয়ে নিতে চাইছেন। তিনি কাঁটা আর হাড়সহ আস্ত দুটি টুনা মাছ, এক বাটি স্যুপ এবং দুই প্লেট ভাত সাবাড় করলেন। তার পানীয় ছিল পাখির বাসার টুকরো ভাসানো স্বচ্ছ ঝোল। তিনি তার সাথের দুই নারীর চেয়ে অনেক দ্রুত খাওয়া শেষ করলেন। খাওয়া শেষ হওয়ার পর তার পেট থেকে ক্রমাগত গুড়গুড় শব্দ হতে লাগল। অবশেষে তার মলদ্বার দিয়ে একটি জোরালো বায়ু নির্গত হলো, যা আটকে রাখা অসম্ভব ছিল। এরপর ন্যাপকিন দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে তিনি জিজ্ঞেস করলেন:

তা, আমি কতদিন মরে ছিলাম?

একুশ বছর, বিউটি উত্তর দিল

দুঃখিত, অনেক বেশি দেরি হয়ে গেল, তিনি অনুশোচনা নিয়ে বললেন, কিন্তু কবরের ভেতর কোনো অ্যালার্ম ঘড়ি থাকে না।

পরেরবার যখন যাবে, সাথে একটা ঘড়ি নিতে ভুলো না, বিউটি বেশ যত্ন সহকারে বলল এবং যোগ করল, আর একটা মশারি নিতেও ভুলো না।

দেবী আয়ু বিউটির চিকন ও চড়া সুরের কথাগুলো উপেক্ষা করলেন এবং বলতে থাকলেন, একুশ বছর পর আমার আবার জেগে ওঠাটা নিশ্চয়ই খুব বিভ্রান্তিকর; কারণ ক্রুশবিদ্ধ হয়ে মারা যাওয়া সেই লম্বা চুলের লোকটিও মাত্র তিন দিন পর আবার জীবিত হয়েছিলেন।

এটি সত্যিই খুব বিভ্রান্তিকর, বিউটি বলল। পরের বার আসার আগে অন্তত একটা টেলিগ্রাম পাঠিয়ে দিও।

যাই হোক না কেন, দেবী আয়ু যেন ওই কণ্ঠস্বরটিকে অবজ্ঞা করতে পারছিলেন না। কিছুক্ষণ চিন্তা করার পর তিনি মেয়েটির মন্তব্যের মধ্যে এক ধরণের শত্রুতার সুর টের পেতে লাগলেন। তিনি বিউটির দিকে তাকালেন, কিন্তু সেই কুৎসিত মেয়েটি তাকে কেবল একটি হাসি দিল। তার হাসির ভঙ্গি এমন ছিল যেন সে তাকে কেবল অসাবধান না হওয়ার কথাই মনে করিয়ে দিচ্ছে। হয়তো কোনো সূত্রের আশায় দেবী আয়ু রোসিনার দিকে তাকালেনকিন্তু সেই বোবা নারীটিও কোনো দ্ব্যর্থবোধক ইঙ্গিত ছাড়াই হাসছিল

দেখতে দেখতেই রোসিনা তোমার বয়স এখন চল্লিশ। আর কিছুকাল পরই তুমি বুড়িয়ে যাবে এবং তোমার চামড়া কুঁচকে যাবে। এই কথা বলে দেবী আয়ু হালকাভাবে হাসলেন যাতে ডিনার টেবিলের থমথমে ভাবটা কিছুটা কমে

ব্যাঙের মতো, রোসিনা ইশারায় বলল

কোমোডো ড্রাগনের মতো, দেবী আয়ু মজা করলেন

সে কিছু বলে কি না দেখার অপেক্ষায় তারা দুজনেই বিউটির দিকে তাকালেন । তাদের বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না

আমার মতো, বিউটি বলল। সংক্ষিপ্ত এবং ভয়ানক এক উত্তর

কয়েকদিন ধরে দেবী আয়ু পুরনো বন্ধুদের আসা-যাওয়া নিয়ে বেশ ব্যস্ত সময় কাটালেন। তারা সবাই পরলোক বা মৃতদের জগৎ সম্পর্কে গল্প শুনতে চেয়েছিলেন। সেই ব্যস্ততার ভিড়ে তিনি তার নিজের বাড়িতে থাকা ওই বিরক্তিকর দানবটির উপস্থিতি এড়িয়ে চলতে পারলেন

 

তারা অর্ধেক গ্লাস তেতো চা গিলে তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়াত এবং বাড়ি যাওয়ার অনুমতি চেয়ে বিদায় নিত। বাড়ি ফিরে তারা তাদের অভিজ্ঞতার গল্প শোনাত। দেবী আয়ু মৃত্যু থেকে জেগে উঠেছেনএই নিয়ে যাদের মনে প্রচণ্ড কৌতূহল ছিল, তাদের উদ্দেশ্যে আতঙ্কিত দর্শনার্থীরা বলত, "আমি তোমাদের ওই বাড়িতে না যাওয়ার পরামর্শ দেব।"

"কেন?"

"কারণ তুমি ভয়ে আধমরা হয়ে যাবে।"

যখন লোকজন আর আগের মতো বাড়িতে আসত না, তখন দেবী আয়ু বিউটির কিছু অদ্ভুত স্বভাব লক্ষ্য করতে শুরু করলেন। বারান্দায় বসে রাজপুত্রের জন্য অপেক্ষা করা এবং নক্ষত্র দেখে ভাগ্য গণনা করা ছাড়াও বিউটির আরও কিছু বিচিত্র দিক ছিল। মাঝরাতে দেবী বিউটির শোবার ঘর থেকে ধস্তাধস্তির শব্দ শুনতে পেলেন। তিনি নিজের বিছানা থেকে নেমে অন্ধকারে হেঁটে গিয়ে মেয়েটির দরজার সামনে শঙ্কিত মনে দাঁড়ালেন। সেই কুৎসিত তরুণীর ঘর থেকে আসা শব্দগুলো তাকে ক্রমেই বিভ্রান্ত করে তুলল। তিনি তখনও সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন, এমন সময় রোসিনা টর্চ হাতে সেখানে হাজির হলো এবং তার মালকিনের মুখের ওপর আলো ফেলল

দেবী আয়ু রোসিনার কানে কানে ফিসফিস করে বললেন, "আমি এই শব্দগুলো চিনি। পতিতালয়ের ঘরগুলো থেকে এমন শব্দ আসত।"

রোসিনা সায় দিয়ে মাথা নাড়ল

দেবী আয়ু বলে চললেন, "এগুলো মানুষের মিলনের শব্দ।"

রোসিনা আবারও মাথা নাড়ল

"প্রশ্ন হলো, সে কার সাথে মিলন করছে? বা কারই বা এমন রুচি হবে যে তার সাথে মিলন করতে চাইবে?"

রোসিনা মাথা নাড়ল। সে আসলে কারোর সাথে মিলন করছিল না। অথবা সে হয়তো কারোর সাথেই মিলন করছিলকিন্তু আপনি কখনই জানতে পারবেন না সে কেকারণ আপনি কাউকে দেখতে পাবেন না

রোসিনার এই অবিচলিত শান্ত ভাব দেখে দেবী আয়ু অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন। এটি তাকে তার নিজের সেই উন্মাদনার সময়ের কথা মনে করিয়ে দিলখন কেবল এই মেয়েটিই তাকে বুঝতে পারত। সেদিন রাতে তারা রান্নাঘরে পুরনো উনুনটির সামনে একসাথে বসলেন। তারা এক কাপ কফির জন্য পানি গরম হতে দিলেন। শুকনো কোকো ডাল, তালগাছের ডাল আর নারকেলের ছিবড়া পোড়ানো আগুনের শিখার আলোয় তারা আগের মতো গল্প শুরু করলেন

দেবী আয়ু জিজ্ঞেস করলেন, "তুমি কি তাকে শিখিয়েছ?"

"কী শিখিয়েছি?" রোসিনা শব্দ না করে কেবল ঠোঁট নেড়ে জিজ্ঞেস করল

"হস্তমৈথুন।"

রোসিনা মাথা নাড়ল। বিউটি হস্তমৈথুন করছে নাসে কারো সাথে মিলন করছে-- কিন্তু আপনি জানতে পারবেন না সে কে

"কেন জানব না?"

"কারণ আমিও জানি না," রোসিনা মাথা নাড়ল

সে দেবী আয়ুকে সমস্ত অলৌকিক ঘটনার কথা জানাল। সে বলল, বিউটি যখন খুব ছোট ছিল তখন কেউ না শেখালেও সে কথা বলতে পারত। ছয় বছর বয়সে সে পড়তে ও লিখতে শুরু করে। শেষ পর্যন্ত রোসিনা তাকে কিছুই শেখায়নি, কারণ রোসিনা নিজে যা পারত না, মেয়েটি তার চেয়েও বেশি কিছু করতে পারত। নয় বছর বয়সে সে নকশা করা সেলাই (এমব্রয়ডারি) শিখেছে, এগারো বছর বয়সে দর্জিগিরি শিখেছে এবং খাবারের কথা তো বাদই দিনসে যেকোনো খাবার রান্না করতে পারত

দেবী আয়ু বিভ্রান্ত হয়ে বললেন, "নিশ্চয়ই কেউ তাকে শিখিয়েছে।"

রোসিনা ইশারায় জানাল, "কিন্তু এই বাড়িতে তো কেউ আসে না।"

"সে কীভাবে এল বা তোমার-আমার অগোচরে কীভাবে এল তা নিয়ে আমি মাথা ঘামাচ্ছি না। কিন্তু নিশ্চয়ই কেউ একজন এসে তাকে সবকিছু শিখিয়েছে-- এমনকি মিলন করতেও শিখিয়েছে।"

"হ্যাঁ, এটা সত্যি। সে আসে এবং তারা মিলন করে।"

"এই বাড়িতে ভূত আছে।"

রোসিনা কখনোই বিশ্বাস করত না যে বাড়িতে ভূত আছে, কিন্তু দেবী আয়ুর নিজস্ব কিছু যুক্তি ছিল। যাই হোক, সেটি অন্য বিষয় ছিল এবং দেবী সেই রাতে রোসিনাকে সেসব নিয়ে কিছু বলতে চাইলেন না। তিনি উঠে দাঁড়ালেন এবং ফুটন্ত পানি আর কফির কথা ভুলে গিয়ে দ্রুত নিজের বিছানায় ফিরে গেলেন

পরের দিনগুলোতে বৃদ্ধা সেই কুৎসিত মেয়েটির ওপর নজর রাখার চেষ্টা করলেন। তিনি এই সব অলৌকিক ঘটনার একটি যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা খুঁজছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতে চাইছিলেন না যে কোনো ভূত এর জন্য দায়ী, যদিও বাড়িতে একটি ভূতের অস্তিত্ব সত্যিই ছিল

একদিন সকালে তিনি এবং রোসিনা দেখলেন যে এক প্রাচীন বৃদ্ধ জ্বলন্ত উনুনের সামনে বসে আছেন। ভোরের হিমেল বাতাসে তিনি কাঁপছিলেন। তাকে দেখতে একজন গেরিলা যোদ্ধার মতো লাগছিল। তার অবিন্যস্ত চুলগুলো একটি শুকনা হলুদ পাতা দিয়ে পেছন দিকে বাঁধা ছিল। তার মুখমণ্ডল ছিল বসা--যেন তিনি বহু বছর ধরে অভুক্ত। তার কালচে পোশাকে কাদা আর শুকনা রক্ত লেগে ছিল। তার চামড়ার বেল্টে একটি ছোট খঞ্জর ঝুলছিল। তিনি যুদ্ধের সময় গোর্খা বাহিনীর ব্যবহৃত জুতার মতো জুতা পরেছিলেনতা তার পায়ের তুলনায় অনেক বড় ছিল

দেবী আয়ু জিজ্ঞেস করলেন, "আপনি কে?"

"আমাকে শোদানচো বলে ডাকো," বৃদ্ধ লোকটি বললেন। "আমি শীতে জমে যাচ্ছি, আমাকে তোমাদের উনুনের সামনে কিছুক্ষণ বসতে দাও।"

রোসিনা যৌক্তিকভাবে তাকে বিচার করার চেষ্টা করল। হয়তো অতীতে তিনি সত্যিই কোনো 'শোদান' বা সেনাদলের নেতৃত্ব দিয়েছিলেনহয়তো তিনি হালিমুন্দার কোনো ব্যাটালিয়নে ছিলেন এবং জাপানিদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে বনে পালিয়ে গিয়েছিলেন। হয়তো তিনি সেখানে বছরের পর বছর আটকা পড়েছিলেন এবং জানতেনই না যে ওলন্দাজ আর জাপানিরা অনেক আগেই চলে গেছে। তিনি জানতেন না যে এখন আমাদের একটি নিজস্ব প্রজাতন্ত্র, নিজস্ব পতাকা এবং জাতীয় সংগীত আছে। রোসিনা গভীর মমতা আর কিছুটা অতিরিক্ত সম্মান দেখিয়ে তাকে নাস্তা খেতে দিল

কিন্তু দেবী আয়ু তাকে সন্দেহের চোখে দেখছিলেন। তিনি ভাবছিলেন, এই লোকটাই কি সেই রাজপুত্র যার জন্য তার মেয়ে প্রতি সন্ধ্যায় অপেক্ষা করে? এই লোকটাই কি তাকে মিলন করা শিখিয়েছে? কিন্তু লোকটিকে দেখে মনে হচ্ছিল তার বয়স সত্তর ছাড়িয়েছে এবং বহু বছর আগেই তার যৌনক্ষমতা হারিয়ে ফেলার কথা। এই ভেবে দেবী আয়ুর মনের অপ্রীতিকর চিন্তাগুলো দূর হয়ে গেল। তিনি এমনকি তাকে এই বাড়িতে থাকার আমন্ত্রণ জানালেনকারণ সেখানে একটি ঘর খালি ছিল এবং লোকটির সাথে বাইরের জগতের কোনো যোগাযোগ ছিল বলে মনে হলো না

শোদানচো সত্যিই বিভ্রান্ত এবং করুণ অবস্থায় ছিলেন, তাই তিনি রাজি হলেন। সেটা ছিল মঙ্গলবার, দেবী আয়ু কবর থেকে জেগে ওঠার তিন মাস পরের কথা। সেই দিনই তারা বিউটিকে তার শোবার ঘরের মেঝেতে অত্যন্ত শোচনীয় অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখলেন। তার মা তাকে টেনে তোলার চেষ্টা করলেন এবং রোসিনার সাহায্য নিয়ে তাকে বিছানায় শুইয়ে দিলেন। শোদানচো হঠাৎ তাদের পেছনে হাজির হলেন এবং বললেন:

"ওর পেটের দিকে তাকাও, ও গর্ভবতী; প্রায় তিন মাস চলছে।"

অবিশ্বাস নিয়ে দেবী আয়ু বিউটির দিকে তাকালেন। তার চোখে তখন আর কোনো বিভ্রান্তি ছিল না, বরং ছিল প্রচণ্ড রাগ। তিনি চিৎকার করে জানতে চাইলেন, "তুমি গর্ভবতী হলে কীভাবে?!"

"তুমি যেভাবে চারবার গর্ভবতী হয়েছিলে সেভাবেই," বিউটি উত্তর দিল। "আমি আমার কাপড় খুলে একজন পুরুষের সাথে মিলন করেছি।"

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ