অহনা বিশ্বাসের গল্প : কনক বৌদি এবং আমার সংযম


কনক বৌদির সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। ওই ডাকলো। বম্বে হোটেলের নিচে। আমি তো প্রথমে দেখতেই পাইনি। মেয়েটার জন্য বই কিনতে গিয়েছিলাম। বইয়ের দোকানের পাশেই এমন একটা কুৎসিত জায়গা। তারপর থেকে ব্যাপারটা মাথা থেকে নামাতেই পারছি না।

তালা খুলে একা ফ্ল্যাটে বসে আছি সিগারেট ধরিয়ে। রুমার অফিস থেকে আসতে এখনো অনেক দেরি। তার আগে মেয়ে স্কুল থেকে ফিরবে। এই দুপুরের সময়টায় দোকানে লালটুকে বসিয়ে আমি ঘরে আসি। খেয়েদেয়ে খানিক বিশ্রাম নিই। মেয়ের পছন্দ মতো টিফিন রান্না করি। এটা আমার শখ। কিন্তু আজ সব গোলমাল হয়ে গেল। সিগারেট আমি ছেড়ে দিয়েছিলাম। আজ ঘরে ফিরতে ফিরতেই রাস্তাতেই চারটে টেনে ফেললাম।

কথাটা আর কাকে বলবো? নির্মলদার কাছে তো গিয়ে বলা যাবে না যে তোমার বউকে বম্বে হোটেলের নিচে দাঁড়াতে দেখলাম। ও যা লোক, হয়তো শুনে সুখ্যাতি করবে।

সত্যি, খুব বিরক্ত লাগছে। রাগ হচ্ছে। লতায় পাতায় সম্পর্ক হলেও ওরা আমাদের একপ্রকার আত্মীয় তো বটে। মনে হচ্ছিল রুমাকে ফোন করে সব কথা বলি। রুমা আবার অফিসে খুব ব্যস্ত থাকে। অহেতুক ফোন করলে রাগ করে। ওর আসার সময়টুকু যেন আমি অপেক্ষা করতে পারছি না। এরকম একটা ঘটনা।

নির্মলদার মাকে আমি মামিমা বলতাম। আমার মা ও মামিমা যতদিন বেঁচেছিলেন, ওনারা একসঙ্গে তীর্থ করতে যেতেন। নির্মলদার সঙ্গে আমি ফুটবল খেলতাম। সম্বন্ধ করে নির্মলদার বিয়ে হয়েছিল। মামিমা যখন নিজের ছেলের জন্য মেয়ে দেখতে যেতেন, তখন মাকে সঙ্গে নিয়ে যেতেন। এই নির্মলদার বিয়েতে আমি কম খাটাখাটি করিনি। বিয়ের সময় কনক বৌদি বেশ ছোটখাটো পুতুল পুতুল দেখতে ছিল। নির্মলদার সামনেই একমাত্র দেওর হিসেবে আমি কনকের গাল টিপে দিয়েছিলাম। ও মিথ্যে রাগ দেখিয়েছিল। আর নির্মলদা হো হো করে হেসেছিল। তখনো আমার বিয়ে হয়নি। রুমার সঙ্গে আলাপ হয়নি। ওষুধের দোকানটা সদ্য শুরু করেছি।

ওদের বিয়ের প্রায় বছর পনেরো পর থেকে নির্মলদা বদলাতে শুরু করেছিল। তখন বলতে গেলে ওদের ঘর ফাঁকা । মামিমা মারা গেছে। আমার মা অবশ্য তখনো বেঁচে। মা মাঝে মাঝে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলতো। বলতো, ওদের বাড়ি আর যেতে ইচ্ছে করে না। নিত্যদিন অশান্তি। অথচ নির্মলের বউ আমাকে বারবার ডেকে পাঠায়। আমি কী করতে পারি। ছেলেটা অসৎ সঙ্গে পড়ে গেল। আমার দাদা দেবতার মত লোক ছিল। বৌদি ও মাটির মানুষ। তাদের একটাই ছেলে এমন যে কেন বদ স্বভাবের হল।

অথচ নির্মলদা যখন ব্যাংকে চাকরি পেয়েছিল, তখন এই মা আমাকে যে কত কথা শুনিয়েছিল। বলেছিল, এত লেখাপড়া করে তুই বেকার হয়ে বসে আছিস। নির্মলকে দেখ। কত ভালো ছেলে। ছোট থেকে খুব যে লেখাপড়ায় ভালো ছিল এমন তো নয়। অথচ ভালো একটা চাকরি কেমন জোগাড় করে ফেলল। এদিকে ছোট থেকে তুই রেজাল্ট ভালো করতিস। এখন বাবার জমানো টাকা খরচ করে দোকান করতে চাইছিস।

নির্মলদার অধঃপতনের কথা শুনে তাই মাকে বলতাম, খুব তো তখন বলতে আমাকে ওর চাকরির কথা। চাকরি পেলেই লোকে শুদ্ধ হয় না। নামজাদা হয় না। এই ছেলে গোটা বংশের গায়ে কালি লেপে দিল। বেঁচে থাকতে কনক বৌদি হাজার ডাকলেও মা আর ওদের বাড়ি যায়নি।

সত্যি বলতে কি কনকের এমন পরিণতি আমি স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি। ওর ছেলে এখন ভুবনেশ্বরে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে গেছে। পড়াশোনায় ছেলেটা বেশ ভালো। আমার মেয়েকে মাঝে মাঝে ওর কাছে নিয়ে গেছি। দাদাকে দেখে, দাদার সঙ্গে কথা বলে যাতে ও একটু অনুপ্রাণিত হয়। কনক বারবার রুমা কেউ ফোন করে বলতো ওদের বাড়িতে আসার কথা। বাবাকে ছেড়ে ছেলেটা একা হয়ে পড়েছে বলে ওর মন খারাপ হয়-এমন কথা কনক বৌদি জানাত। তাই একটু ছেলেকে সান্তনা দেবার জন্য, একটু ভালো রাখার জন্য আমাদের ডাকাডাকি করত।

ব্যাপারটা খুবই লজ্জাজনক। একজন মানুষের সঙ্গে একজন মানুষের সম্পর্ক হয়ে যেতেই পারে। নারী পুরুষ তো বলতে গেলে ঘি আর আগুন। তেমন কাছাকাছি এলে জ্বলে যেতে দেরি হয় না। নির্মলদা বিয়ের আগে কখনো সেভাবে কোনো মেয়ের নিকটস্থ হয়েছে কিনা সন্দেহ হয়। অন্তত বাইরে থেকে তেমন কিছু বোঝা যায়নি। ওর মা বারবার বলতেন ,আমার ছেলেটা যদি নিজে থেকে কাউকে পছন্দ করে বিয়ে করতে পারতো ,তাহলে আমি বেঁচে যেতাম ।অন্তত এই মেয়ে দেখার ঝামেলা থেকে পরিত্রাণ পেতাম। জানিনা মামিমার আগে রক্তে সুগার ছিল কিনা। নির্মলদার বিয়ের পরপরই তাঁর ডায়াবেটিস ধরা পড়েছিল মামিমা বলতেন ,এই নির্মলের মেয়ে দেখে দেখে আর মিষ্টি খেয়ে খেয়েই আমার ডায়াবেটিস ধরে গেল।

কিন্তু এতদিন ওই ফর্সা ডল ডল চেহারার মেয়েটার সঙ্গে ঘরকন্না করে, একটা ছেলে মানুষ করে, ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব মাথায় নিয়ে, নির্মলদা যে কীভাবে একটা যাচ্ছেতাই মেয়ের সঙ্গে ফেঁসে যেতে পারে, তা আমাদের কারুর পক্ষেই বিশ্বাস করা কঠিন। ওই মেয়েছেলেটা শুধু যে কোনো একটা মেয়ে ছিল না, ও একটা সত্যি সত্যি একটা বেশ্যা ছিল। দেখতে শুনতে ও যে এমন কিছু ভালো ছিল ,তাও নয়। ওকে সবাই চিনতো ওর ওই পেশার জন্যই। একদিন বৌদি আমাকে নির্মলদার সঙ্গে এ নিয়ে কথা বলতে বলেছিল। মানে যাতে নির্মলদাকে বুঝিয়ে শুনিয়ে নিজের সংসারের দিকে ফেরানো যায় ,তার জন্য। আমি এসব ব্যাপারে থাকতে চাইনি। কিন্তু রুমা বারবার বলল, একবার কথা বলে দেখো যদি কিছু বোঝে।

নির্মলদাকে কনক বৌদির ব্যাপারে ফের ভাবতে বলেছিলাম। নির্মলদা বলেছিল, আমার আর ফিরে আসার উপায় নেই রে। এর নাম শান্তি। আমি এর কাছে শান্তিতেই আছি।

আমি মুখ নিচু করে বলেছিলাম, তোমার এই শান্তি তো ভালো মেয়ে নয় বলেই শুনি। নির্মলদা হেসে বলেছিল : কী শুনিস? শান্তি বেশ্যা ছিল। হোটেলে হোটেলে রাতে কাজ করত, তাইতো। আমি ওর মুখের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে ছিলাম। একটা কথাও বলতে পারিনি। নির্মলদা ঘাড় উঁচু করে বলেছিল, ঠিকই শুনেছিলি। শান্তি তাই ছিল। আমার ওভাবেই ওর সঙ্গে পরিচয় হয়। এখন আর ওকে যেতে হয় না। আমি পুষিয়ে দিই।

আমার ইচ্ছা হয়েছিল, ওকে জিজ্ঞাসা করি, তোমার ঘেন্না করেনা নির্মলদা? এতগুলো মানুষ ব্যবহার করেছে যে মেয়েটাকে, তার সঙ্গে তুমি...।

কিন্তু করতে পারিনি। রুমার কাছে বলেছিলাম, মানুষ যে এত নির্লজ্জ বেহায়া অসভ্য হয়, তা আগে কখনো বুঝিনি। রুমা বলেছিল, তোমার মায়ের নিজেদের পরিবার নিয়ে কত অহংকার ছিল। ভাগ্যে তাঁকে এসব কথা জেনে যেতে হয়নি।

কিন্তু আমার অনুমান ছিল, মা সব জানতো। কনক বৌদি তাকে সব বলেছিল। আর সেই কারণে মা আর ওদের বাড়ি যেত না।

আজ কনক বৌদির উপরে আমার ভয়ানক রাগ হচ্ছে। মনে হচ্ছিল, হাতের কাছে কিছু পেলে, বোধহয় ওর মাথা লক্ষ্য করে আমি তা ছুঁড়ে মারতাম। কিন্তু এসব রাগ নিষ্ফল। আমি অসহায়ের মত খাটে শুয়ে সমস্ত ক্ষমতা দিয়ে দেয়ালটাকে পা দিয়ে ঠেলছিলাম। একা ঘরে দেয়ালটাতে দুমদুম করে পা দিয়ে লাথি মারছিলাম। বারবার নিজের মনকে বোঝাচ্ছিলাম, আমার এত খারাপ লাগছে কেন? ও আমার কে? ও তো আমার বউ নয়। ওর এই পাঁকে নামাতে আমার কী এসে যায়! লোকে হয়তো কখনো বলবে, এই তোর বৌদিকে অমুক হোটেলের সামনে দেখলাম। কিংবা হয়তো মনে ভাববে, মুখে কিছুই বলবে না। আজকালকার সব সভ্য লোক। মনে থাকলেও মুখে সব কথা বলে না। নির্মলদার ব্যাপারে কজনই বা আমার সঙ্গে আলাপ করেছে।

আসলে দোষ আমাদের এই জায়গাটার। আমাদের এখানে শ্মশানের ধারে জগাবাবার থান খুব বিখ্যাত। শনি মঙ্গলবারে প্রচুর লোক আসে। আগে নাকি এখানে তন্ত্রমন্ত্র হতো। এখন যজ্ঞটজ্ঞ বেড়ে গেছে। উত্তর প্রদেশ থেকে নতুন কজন সাধু এসেছে। তারা তাবিজ কবজ দিয়ে টাকা রোজগার করে। আজকাল লোকে ইলেকট্রিক চুল্লিতে দেহ পোড়ায়। আর নদীর ধারের শ্মশানে রাশি রাশি ধুনি জলে। মচ্ছব হয়। বাইরে থেকে গাড়ি লাগে। নতুন নতুন হোটেল বাড়ে। ঠাকুরপূজো ,দেহপুজো একসঙ্গে হয়। দু-ঘণ্টা, চার ঘন্টার জন্য হোটেল ভাড়া দেওয়া হয়। এ রকম সব হোটেলেই একসময় শান্তি খাটত। আমি দোকান খুলতে গিয়ে সকালে অনেক সময় ওকে হোটেল থেকে বের হতে দেখেছি। হ্যাঁ, ওই বোম্বে হোটেল থেকেও। এখন এই এলাকায় সবচেয়ে ঝলমলে হোটেল হয়েছে বোম্বে হোটেল। যার নিচে আজ আমি নির্মলদার বউকে দেখলাম।

রুমাকে একবার নয় দুবার ফোন করলাম। একবার বিজি বলল, আর একবার ও ধরল না। হয়তো রুমা ওখানে কনক বৌদির জায়গায় দাঁড়াতো, যদি না ও চাকরি করতো। যদি না ওর অফিসের অনেক চাপ হত। মেয়েদের হাতে অঢেল সময় হল অত্যন্ত খারাপ জিনিস। তাতে ওদের মাথা ঘুরে যায়। রুমা বিজি হলেও পরে ফোন ধরল না কেন, কে জানে। পৃথিবীর কারুর ওপর আমার ভরসা হয় না।

নির্মলদার বউটা বেশ সহজ সাধারণ ছিল। একা একা বাজার যেতেও পারতো না। এই সেদিন পর্যন্ত বেশ ভীতু ভীতু লাজুক লাজুক ছিল। ওর ফোলা ফোলা ঠোঁটটায় একটা ব্যাপার ছিল।

তখন নির্মলদা শান্তির বাড়িতে উঠে গেছে। ওদের আইনত ডিভোর্স হয়ে গেছে। একদিন শান্তির জন্যই ওষুধ নিতে নির্মলদা আমার দোকানে এসেছিল। বললাম, বৌদির কথা একবার ভেবো। ওকে ফেলে দিও না। নির্মলদা বলল, আমাকেও তো বাঁচতে হবে। ওর ছেলে আছে। ছেলে বহুদিন আমার সঙ্গে কথা বলে না। মায়ের শিক্ষা। আর এখন আমার কে আছে শান্তি ছাড়া? জমানো সব টাকা-পয়সা তোর বৌদিকে দিয়ে দিয়েছি। ছেলের পড়ানোর সব টাকা আমি দেব। ঘর খরচাটাও দেব। বাকি জীবনটুকু এই মেয়েটার সঙ্গেই কাটাবো। আসিস একদিন তোর নতুন বৌদির বাড়িতে। অবশ্য তোর যদি ঘেন্না না হয়!

ঘেন্না নয়, সেদিন নির্মল দার স্পর্ধা দেখেই অবাক হয়ে গেছিলাম। এই লোকটা চাকরি করে, বউ নিয়ে বাজার করতে যায়, শুনলাম অফিসের পিকনিকেও শান্তিকে নিয়ে গিয়েছিল। রুমা সব শুনে বলল, দয়া করে তুমি আর এইসব চরিত্রহীন লোকদের সঙ্গে কোনও সম্পর্ক রাখবে না।

তবু কিছুদিন আগে কনক বৌদির কাছে আমাকে যেতে হয়েছিল। নিজেরই স্বার্থে যাওয়া। ওদের ছেলে ইংরেজিতে তুখোর ছিল। ওর নোটপত্র রেখে দিতে বলেছিলাম আমার মেয়ের জন্য। সেসব নিতেই একদিন দুপুরবেলায় দোকান বন্ধ করে ওদের বাড়ি গেলাম।

ছেলে হস্টেলে চলে যাবার পর থেকে বাড়িতে একাই থাকে কনক বৌদি। চেহারাটা ছোটখাটো বলে বোধ হয় বয়সটা ওর তেমন বোঝা যায় না। আমাকে খুব যত্ন করে খাওয়ালো। সোফার মধ্যে আমার পাশে বসে নির্মলদার কথা বলে খুব দুঃখ করছিল। কে জানে সেদিন আমার কী হয়েছিল। বললাম, তোমাকে এভাবে দেখতে আমার ভালো লাগছে না। তুমি বিধবার মতন হয়ে আছো কেন

কনক বলল, আমি বিধবার থেকে কি অন্য কিছু? বরং বিধবা হলে ভালো হতো। মনে এত কষ্ট পেতাম না।
বললাম, টিপ পরো না কেন। তোমাকে টিপ ছাড়া মানায় না। আসলে কনক বৌদিকে আমি টিপ ছাড়া কখনো দেখিনি। তারপর আমি নিজেই ওর ড্রেসিং টেবিলে রাখা সিঁদুরের কৌটো থেকে আঙুলে করে সিঁদুরে এনে ওকে পরিয়ে দিলাম। তারপর ওকে ধরে আয়নার সামনে দাঁড় করালাম।

ওকে ধরে ওর পিছনে দাঁড়িয়ে আয়নায় নিজেকে দেখে আমি একটু উত্তেজিত হয়ে গেলাম। মনে হল কনককে একটু খেলিয়েনি। বললাম নির্মলদা চলে গেছে তো কী হলো, আমি তো আছি।
ও বলল, ছেলেটা হোস্টেলে চলে যেতে খুব একা লাগে। তুমিও তো আর আসো না।
বললাম, সময় পাই না।

কনকের এমন অসহায় মুখ, এমন নরম শরীর, লোভ হল। এই সুযোগে ওকে একটু চেপে চুপে ধরলাম। সান্ত্বনা দিলাম। ও আমার উপরে নির্ভর করলো। তারপরই আমি সচেতন হলাম। ভাবলাম এক রাতে বিড়াল মারা ঠিক হবে না। সমস্যায় পড়তে পারি। তখন বাথরুমে গিয়ে নিজেকে ঠিকঠাক করে বেরিয়ে এলাম। মেয়ের জন্য যেসব জিনিসপত্র দরকার ছিল, সেসব খুঁজে নিয়ে বাড়ি ফেরত এলাম।

প্রতিদিন দুপুরটা আমি ফাঁকাই থাকি। দোকান বন্ধ হলেই কনকের কথা মনে পড়ে। কিন্তু ভাবি প্রতিদিন যাওয়াটা ঠিক নয়। আমি সংযমী লোক। নির্মল দার মতো গর্তে পড়ি না। আমাকে কেউ খেলাবে, এমনটা সোজা নয়। আমি অপেক্ষা করি, কনকের ডাকের জন্য। ভাবি, উপোসি মেয়ে, এত তাড়াতাড়ি আমাকে ও ছাড়বে না।

খুব তাড়াতাড়ি নয়, তবু একদিন আমার ডাক পড়ল। কনক ডাকলো। বলল, তার কী একটা অফিসের কাগজপত্র এসেছে। আমি যেন সেসব এসে একবার দেখে যাই। নইলে সে নিজেই আমার বাড়িতে আসতে পারে।

কিন্তু আমি চাই না সপরিবারে কনকের সঙ্গে ফের আত্মীয়তা করতে। রুমা পছন্দ করবে না। ঘরে- বাইরের এত চাপের পর রুমা আর আত্মীয়-স্বজন-দর্শনার্থী নিতে পারে না।

সেদিন একটু তৈরি হয়েই গিয়েছিলাম ওর কাছে। ওর সব সমস্যা শুনলাম। ওর কাগজপত্র দেখলাম। বিশেষ কিছু নয়। জীবন বীমার কাগজপত্র। এদিন ওকে খুব বোঝালাম, একটু ভালো করে একটু পজিটিভ ভাবে বাঁচার জন্য। বললাম, একটু হাসি হাসি মুখ করে থেকো। ওর জন্য লাল একটা নাইটি কিনে নিয়ে গিয়েছিলাম। বললাম , চান করে পরে এসো। ও বাধ্য মেয়ের মত আমার দেওয়া জামাটা পরলো। সত্যি ই খুব ভালো লাগছিল ওকে। বলল, কতদিন কেউ ওকে কিছু কিনে দেয় নি। ‌ ওর জামাটা আমি ঠিক করে দিচ্ছিলাম। দিতে দিতে ওকে নিজের দিকে টেনে নিলাম। ও বাঁধা দিল না। আমি ধীরে ধীরে ওর সবটুকু আবরণ মুক্ত করে দিলাম। আমার বুকে ও নিজের মুখ চেপে ধরেছিল। একটু পরেই বুঝলাম ,ও কাঁদছে। ওর কান্নাটা এমন ছিল, যা আমি সামলাতে পারছিলাম না। আমি থামাতে চেষ্টা করছিলাম। ও খানিক থামছিল। কিন্তু আমার শরীরের আবেষ্টনি থেকে ও কী করে যেন বের হয়ে যাচ্ছিল। আমার বিরক্ত লাগছিল। আমি চেষ্টা করছিলাম ওকে বারবার নিজের মধ্যে নেওয়ার । কিন্তু ও এমন ভাব করছিল, যাতে আমার মনে হচ্ছিল, ও একটা অদ্ভুত অভিনয় করছে। ওকে আমি নির্জন ঘরে, হাতের কাছে নগ্ন অবস্থায় পেয়েছি, তবু একটা কথা না বলে ও নাক টেনে টেনে ছিচকাঁদুনি কেঁদে বুঝিয়ে দিচ্ছিল যে, ও আমার নয়। ও ওই দুশ্চরিত্র নির্মলের। ও আমার গায়ে গা ঠেকিয়ে আমাকে বঞ্চিত করে আমাকে স্রেফ অসম্মান করছিল।

যাইহোক, ব্যাপারটা আমার কুৎসিত লেগেছিল। আমি নির্মল এর বউয়ের সতীত্বের পরীক্ষা নিতে যাইনি , আর রেপ করার জন্য যাইনি। রেপ করতে হলে আমি পয়সা দিয়ে হোটেলে যাব। আমার আর সাদা শুকরির ঘোৎ ঘোৎ সহ্য হল না।আমি ওকে বিছানায় নগ্ন রেখে , ওকে কিছু না বলেই, দরজা খুলে ঘরে চলে এসেছিলাম।

আর তার মাসছয়েক-এর মধ্যেই এই দৃশ্য। আজ সে নিজেই ডাকলো। লিপস্টিক লাগিয়ে টুকটুকে বৌটি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বুক দেখিয়ে শাড়িটা আলগা করে পরতে শিখে গেছে।

তুমি এখানে? ভ্রু কুঁচকে খানিক অবাক হয়েই বললাম।

শুনে কনকের কী হাসি! আশ্চর্য হচ্ছো। খুব একা লাগতো গো। তোমার দাদার কাছে তো হোটেলের সব কথা শুনতাম। ও তো আসতো। ভাবলাম, একবার চেষ্টা করে দেখি। অল্প বয়সে তো বউ হয়ে ঘরেই ছিলাম। চাকরি-বাকরির চেষ্টা করিনি। এখন একটা বাইরের জগত হয়েছে। অনেক চেনাশোনা হচ্ছে।

প্রথম প্রথম অসুবিধা হচ্ছিল। এখন ঠিকঠাক হয়ে গেছি। ডাক্তার টাক্তার নিয়মিত দেখাই। টাকা পয়সাও ভালো। এখন মনে হচ্ছে, বেঁচে আছি। কনক কেমন যেন গা ঝাড়া দিয়ে কথাটা বলে উঠলো।

হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম। তারপর ব্যঙ্গ করেই বলে উঠলাম, বাহ্। ছেলে জানে?
সে জেনে যাবে। ছেলে তো বলে, যাতে তুমি ভালো থাকো তাই করো। হঠাৎ কনক সপ্রতিভ হয়ে গেছে।
বললাম, বেশ, নির্মল দা একটা হোটেলের মেয়েকে বিয়ে করে তোমাকে এই ব্যবসায়ে নামিয়ে দিয়ে গেল।

কনক একেবারে হেসে গড়িয়ে গেল। যা বলেছ। কোন দিন হয়তো দেখব ওই আমার কাস্টমার হয়ে এসেছে।
ওর মুখে এক দলা থুতু মারতে ইচ্ছে হচ্ছিল আমার। আমি মুখ ফিরিয়ে চলে এসেছি । কিন্তু পিছন থেকেই শুনলাম, সে বলছে, তুমিও এসো ঠাকুরপো । খুব মজা হবে। আমারও কিছু নগদ পাওনা হবে।

**********

লেখক পরিচিতি : কবি ও কথাকার অহনা বিশ্বাসের জন্ম আসানসোলে। বিদ্যাচর্চা, গবেষণা শান্তিনিকেতনে। পেশায় কলেজ শিক্ষক। প্রায় সব পত্রপত্রিকায় তাঁর গল্প, উপন্যাস, কবিতা ও প্রবন্ধ প্রকাশিত। বিদেশি ভাষায় অনূদিত হয়েছে তাঁর কবিতা, গল্প। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘অষ্টাবক্ররমণীকথা’, ‘সবুজ শাড়িপরাদের দেশ’ এবং প্রবন্ধগ্রন্থ ‘শক্তির পদ্য, পদ্যের শক্তি’। তাঁর প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ ‘অহনার গল্প’ এবং উপন্যাস ‘আরশিনগরে তাঁবু’, ‘আমাদের মায়াবী সময়’, ‘তিন পুরুষ, এক লতা এবং যদি একে রূপকথা বলি’। মানুষ, পরিবেশ ও শিল্পকলায় তাঁর আগ্রহ। লিখেছেন ‘মেয়েদের হোস্টেল জীবন’ নামক স্মৃতিকথাও।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

2 মন্তব্যসমূহ