চন্দন আনোয়ারের গল্প : একজন রাষ্ট্রস্বীকৃত খুনির ডায়েরি


৩৫ বছরের জীবন, ৭ বছর জেলে। বিয়োগ করলে আয়ুষ্কাল দাঁড়ায় ২৮—নেহাত কম না। অমরতার আকাক্সক্ষা নেই, অমরাবতীর লোভ নেই। বস্তুত, এ সব আছে কি নেই এই বিষয়ে আমার আগ্রহ নেই। এই শেষ, এখানেই শেষ। জীবনের শেষ গন্তব্য চূড়ান্ত বিলুপ্তি অর্থাৎ এখানে সৃষ্টি, এখানেই বিনাশ—এ রকম একটি বিশ্বাসে ঝুলে আছি ত্রিশঙ্কুর মতো; তথাপি, জীবনের তুচ্ছ, অতি তুচ্ছ জিনিসগুলো অপূর্ব সুন্দর আর লোভনীয় ওঠে। কার্নিশে বসা একটি কবুতরের চাঞ্চল্য আর কালো কাকের রূপ দেখে একটি নির্মেঘ সকাল কেটে যায় অবলীলায়। একটি ফুটন্ত ফুলের দিকে তাকিয়ে স্বপ্নাবিষ্ট নারীর রূপ-সুধা উপভোগের আনন্দ-সুখ জেগে ওঠে। পথে বেরুলে পথ ফুরায় না, যা কিছুই সামনে পড়ে অপূর্ব অপূর্ব বলে নেচে ওঠে মন। স্বপ্ন আর বিশ্বাসে কানায় কানায় পূর্ণ জীবননদী, যে নদীতে সুখ উজানজলের মাছের মতো লাফালাফি খেলে। জীবন সত্যিই সুন্দর!

কনডেম সেল, বাংলায় নির্জন প্রকোষ্ঠ—জেলখানার ভেতরে ছোট্ট একটি জেল, আয়তন দশ ফুট বাই ছয় ফুট, এরমধ্যেই দুটি বেড, একটি বাথরুম, অবশ্য কবুতরের খোপের মতো ছোট্ট একটি জানালাও আছে। আলো-বাতাস প্রবেশের জন্য নয়, ঘরে জানালা থাকতে হয় এজন্য আছে। দিন-রাতের পার্থক্য নির্ণয় দুরূহ, অবশ্য প্রয়োজনও নেই; কারণ, দিন-দুনিয়ার সাথে আমার আর কোন সম্পর্ক নেই, লেনদেন অবশিষ্ট নেই, আমার কাছে আলো-আঁধারের রূপ এক। তারপরেও নিয়ম করে ঠিক সাড়ে ছয়টায় কনডেম সেলে জ্বলে উঠে সূর্যাস্তের রোদের মতো লালচে আলো, আমার চোখে তখন ভেসে উঠে সূর্যাস্তের দৃশ্য, যে দৃশ্যে অস্তগামী সূর্যের মতোই লাল একটি রুমাল নড়ে অদৃশ্য একটি হাত।

যা একবার হারায়, তা আর ফিরে পায় না জীবন। তাই, জীবনের উত্তপ্ত মোহের দিনগুলোর সাথে কনডেম সেলের জীবনের বিন্দুমাত্র বিরোধ নেই; কারণ, জীবিত ও মৃতের বিরোধ হয় না। ২৮ বছরের জীবনের দিকে তাকালে মৃত মানুষের চোখে তাকানো হয়, সেখানে অবশিষ্ট বলে কিছুই নেই, শুধুমাত্র একটি সূর্যাস্তের বিকেল, অতঃপর সন্ধ্যা-উত্তীর্ণ অন্ধকার এবং পরিচিত হওয়া সূর্যের মতো সোনালি মুখের এক যুবতী, যার মুখে সূর্যাস্তের শেষ রোদ পড়েছিল। যুবতীয় বয়স ২৫, ৩০, ২৮, যে-কোনো একটি সংখ্যাই হতে পারে। বসেছিল পুকুরপাড়ের দক্ষিণের একটি বেঞ্চে, যে বেঞ্চটিতে বসে আমি নিয়মিত সূর্যাস্ত উপভোগ করি। পুকুরের চারদিকে সাতপাক দিয়ে বিশ্রাম নেই। ইউ আকৃতির বিশাল পুকুরটির চারদিকে কয়েকটি সরকারি কোয়াটার এবং অদূরেই একটি হাউজিং সোসাইটি। শহরের সূর্যাস্তপ্রিয় ও নির্জনতাপ্রিয় মানুষেরা এখানে আসে।

নিয়মিত বসার কারণে বেঞ্চিটার উপরে আমার একপ্রকার অধিকার জন্মেছে। সম্ভবত, এই অধিকারের টানেই নিঃসঙ্কোচে বসে পড়ি যুবতীর পাশে। ধারণা ছিল, আমার বসাটা ভালোভাবে নেবে না, এবং প্রতিবাদও জানাতে পারে। কারণ, দুদিকে দুটি বেঞ্চ ফাঁকা।

সামান্য সরে যাওয়া ছাড়া আর কোনো প্রতিক্রিয়া নেই যুবতীর। তন্বিষ্ট হয়ে সূর্যাস্ত দেখছে। বিকেলের পড়ন্ত রোদে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে যুবতীর মুখ।

জলজ্যান্ত এক যুবতীর পাশে বসে আছি। মুখে কুলুপ এঁটে কতোক্ষণ আর বসে থাকা সম্ভব! উৎসাহ ও কৌতূহলের প্রবল চাপে বলে ওঠি, সূর্যাস্ত আপনার প্রিয় দৃশ্য?
না। ছোট্ট করে বলে যুবতী।
এবার প্রতিবাদ করি, কিন্তু আপনি তো দেখছেন?
আমরা যা দেখি তাই কি প্রিয় হয়?
অবশ্যই না, আমার প্রিয় কিনা। রোজ এই সময় এখানে বসি। ছেলেবেলা থেকেই কী কারণে যেন সূর্যাস্ত দেখতে দূর্দান্ত ভালো লাগে। বলতে পারেন, ছেলেবেলার নেশা এখনো ছাড়তে পারিনি তাই! বলে যুবতী সোজা আমার চোখের দিকে তাকাল। ঠোঁটে অপূর্ব এক হাসি। তারপর কী একটা ঘটে গেল ভেতরে—আলাপ জমেনি। আলাপের চেয়ে নীরবে বসে সূর্যাস্ত দেখা অর্থপূর্ণ হয়ে ওঠে। উঠে যাবার মুহূর্তে যুবতী বলে, উঠছেন?
ছোট্ট করে বললাম, হ্যাঁ।
রোজ এই সময় বাসায় ফেরেন?
এই সময়েই ফিরতে হয়। ঘরে আলো জ্বালানোর কেউ নেই।
এই শহরে আমি আগন্তুক, এই প্রথম এসেছি। চেনাশোনা কেউ নেই। একটি রাত থাকার ব্যবস্থা করে দিতে পারবেন?

আমি নীরব আছি দেখে, যুবতী ঠোঁটে উজ্জ্বল হাসি ফুটিয়ে বলে, ভুল বুঝবেন না আবার। ভালো একটি হোটেলের ঠিকানা দিতেন যদি। একা থাকব—হোটেলের পরিবেশটা যেন নিরাপদ হয়।
আপনি একা! আপনার বাড়ি কোথায়? কোন বিশেষ কাজে এসেছেন? এই তিন প্রশ্নের উত্তর যুবতী একসঙ্গে উত্তর দিল : আপনি শুধু ভালো একটি হোটেলের ঠিকানা বলুন, আমি নিজেই খুঁজে নিচ্ছি।
দুটি হোটেলের ঠিকানা দিয়ে দ্রুত উঠে বাসা ফিরে আসি।

বাংলাদেশে যুবতী নারীর একা থাকার উপায় নেই। মুহূর্তের মধ্যে মালিক জুটে যাবে। লাওয়ারিশ টাকার যেমন মালিক জুটতে সময় লাগে না। যুবতী কি সত্যিই একা? এবং কেন একা এই অচেনা শহরে? কৃষ্ণপক্ষের চাঁদের মতো যুবতীর মুখের ছবি, ঠোঁটের অপূর্ব হাসি কিছুতেই মন থেকে সরে না। রাত সাড়ে ১১টায় বিছানায় এবং ১২টায় ঘুমিয়ে পড়ার দৈনিক রুটিনে ব্যত্যয় ঘটে। অজানা অচেনা এক যুবতীর জন্য রাতের ঘুম বরবাদ হচ্ছে! রাত দুটো বাজে। একরাতে ঘুমের বিভ্রাট ঘটলে টানা তিনদিনের ফাঁড়া। কিছুতেই ঋণ শোধ হয় না। নির্ঘাত বাড়াবাড়ি হচ্ছে, বিপদ ডেকে আনার পাঁয়তারা, অর্থহীন উদ্বেগ, অযৌক্তিক, ব্যাখ্যাহীন, হাস্যকর ব্যাপার ইত্যাদি যুক্তির পর যুক্তির মালা গেঁথেও লাভ হয়নি। একপ্রকার অজান্তেই দুটো হোটেলে ফোন করি। কোনো একটিতেও উঠেননি। এবার ক্রোধে-ঘৃণায় হাত-পা ছুঁড়ে কেন্নর মতো শরীর গুটিয়ে বিছনায় শুয়ে পড়ি আর ভাবি—ঈভ রূপকথার নারী নয়, মিথ নয়; ঈভ বাস্তব নারী।

চোখে ঘুম নেই, বিছানা ছেড়ে মিনিট দশেক পায়চারি করি। এক মগ দুধ গরম করি। গরম দুধে দু’চামচ চিনি, সামান্য চা ও হরলিক্স মিশিয়ে আরো কিছুটা সময় কাটিয়ে প্রশান্ত মনে শুয়ে পড়ি। কিন্তু কোথায় ঘুম! শরীর দ্বিগুণ চাঙা। এই মুহূর্তে শরীরের ক্লান্তির বিকল্প নেই; কারণ, রাতজাগার ঋণ সুদেআসলে দ্বিগুণ হবে। ঘুমের অব্যর্থ মহৌষধ—বিচিত্র ভঙ্গির কলাকৌশল দেখে সময় নষ্ট করা সময় হাতে নেই। শরীরের আদিবর্জ্য বেরিয়ে আসে দু’মিনিটেই। অবসাদ ও ক্লান্তি নেমে আসে। সুইচ অফ করে কখন যে মোবাইল ছুঁড়ে ফেলেছি টের পাইনি।

দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হয়নি। দরজা খুলেছি কিনা মনে পড়ে না। চোখ মেলে দেখি, যুবতী আমার বেডরুমে, আমার পাশে খাটে বসে আছে। শোয়া থেকে লাফিয়ে ওঠি। এখন গভীর রাত—তথাপি, যুবতীর সোনালি মুখের উপরে সূর্যাস্তের রোদ, ঠোঁটে অপূর্ব হাসি, যেন দীর্ঘদিনের অভিমান ভেঙে বিচ্ছেদের মুখে প্রেমিকের কাছে ফিরেছে। যুবতীর শরীর কাঁপছে লাজে-দ্বিধায়, ঠোঁট কাঁপছে, গাল ফুলেছে, চোখ দুটি ছলছল করছে জলে। দু-তিনবার গাঢ় দীর্ঘশ্বাস ফেলে নতদৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে ক্ষমা প্রার্থনার ভঙ্গিতে বসে আছে। মুখোমুখি আমি আর যুবতী। নির্বাক চোখে তাকিয়ে আছি দুই জন। মনে হলো, পূর্বজন্মে আমরা একত্রে ছিলাম, আমাদের ভাষাহীন চোখে সেই স্মৃতির রোমন্থন চলছে। গাঢ় দীর্ঘশ্বাস ফেলে যুবতী বলে, আপনাকে খুব বিপদে ফেললাম বোধহয়। হঠাৎ যুবতী সূযাস্তের রোদস্নাত মুখে অন্ধকার নামে। আমার বুকের ভেতরে হাহাকার করে ওঠে। এসময় কলিংবেল বেজে ওঠে। জেলখানার পাগলা ঘণ্টাও এতোটা ভয়ঙ্কর শোনায় না। যে-ই আসুক, এখন উঠছি না এবং উঠবো না। আমি বিপদগ্রস্ত, আমি ঈভের ফাঁদে পড়েছি। এই মুহূর্তে ঘুমের চেয়ে আপন কেউ নেই, আমার চেয়ে বিপদগ্রস্ত কেউ নেই।

আর উপায় নেই। কলিংবেল ক্রমেই অস্থির ও অভদ্র হয়ে ওঠে।

তারা ৩ জন। মধ্যবয়সী ১জন, ২জন তরুণ। একই পোশাক—কালো প্যান্টের উপরে সাদা শার্ট। একজনের হাতে রিভলবার।
ঘুমিয়ে পড়েছিলেন বোধহয়? এই বলে অনুমতির অপেক্ষা না করে মধ্যবয়সী ঢুকে পড়ে বাসার ভেতরে, তারপর তরুণ ২জন।
হ্যাঁ, এখন মধ্যরাত।
তাহলে আপনি ঘুমিয়ে পড়েছিলেন? ডাইনিং টেবিলের একটি চেয়ার টেনে নিয়ে বসলেন মধ্যবয়সী।
হ্যাঁ, অবশ্যই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। এখন মধ্যরাত...

২ তরুণ রুম ও কিচেনের লাইটগুলো জ্বালিয়ে দিয়েছে।
আপনি সত্যিই ঘুমিয়ে পড়েছিলেন? কখন ঘুমিয়ে ছিলেন?
এই তো কিছুক্ষণ আগে।
কতোক্ষণ হবে?
১০ মিনিট।
১০ মিনিট! আপনি ১০ মিনিট আগে ঘুমিয়েছেন বলছেন। দুঃখিত, আপনি কিছু মনে করবে না, আপনার পরনের লুঙিটা যদি পাল্টে আসতেন। গন্ধটা ভীষণ উৎকট। বমি ঠেলে আসছে। আপনাকে এখনি যেতে হবে, তাই প্যান্ট পরে ফেলুন।
কোথায় যেতে হবে? কেন যেতে হবে? আমাকে খোলাসা করে বলুন। তারা ২জন কী খুঁজেন?
আপনার বয়স মনে হয় ৩০, তাই না?
না, ২৮।
ঐ একই। কী করেন?
টিউশনি।
শুধুই টিউশনি! অর্থাৎ বেকার।
বেশ বড় বাসা। মাত্র দু’জনের জন্য এতো বড় বাসা!
এই বাসায় আমি একা থাকি।
তাই! এই বাসায় উনি একা থাকেন। এই বলে এক তরুণের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসেন মধ্যবয়সী। যা হোক, আপনি ১০মিনিট সময় পাবেন, এই সময়ের মধ্যে আপনার গোসল করে নেয়া উচিত।

আপনারা কারা? কেন এসেছেন, আর আমাকে কোথায় নিয়ে যাবেন?
এসবের উত্তর আপনি এখনো পাননি?
কী করে পাবো! আপনরা তো বলছেন না।
আপনাকে গ্রেফতার করতে এসেছি।
আমার অপরাধ?
আপনার স্ত্রীর লাশ মর্গে পাঠানো হয়েছে।
আমার স্ত্রী! কে আমার স্ত্রী? আমি তো বিয়ে-ই করিনি।

উচ্চশিক্ষিত যুবক আপনি। মধ্যরাতে নাটক করবেন না আশা করি। ১০মিনিটে প্রস্তুত হয়ে নিন।
আপনাদের ভুল হচ্ছে কোথাও।
আমাদের ভুল হয় না। আপনার সময় ৯ মিনিট।
অবশ্যই আপনারা ভুল করছেন। ঠিকানা ভুল হতে পারে, অভিন্ন নামের কারণে ভুল হতে পারে। আমার স্ত্রীর মৃত্যুর ঘটনা অবাস্তব, হাস্যকরও বটে, কারণ, আমি এখনো অবিবাহিত।
আপনি সময় নষ্ট করছেন। এখন আপনার সময় ৮ মিনিট।
প্লিজ, আমার কথাটি একবার গুরুত্ব দিয়ে শুনুন, আমি অবিবাহিত...
যথেষ্ট গুরুত্ব পেয়েছেন, আপনার সময় আর ৭ মিনিট।

দুর্নিবার অসহায়ত্ব ও ভয়ে কেঁপে ওঠে শরীর। কীভাবে বললে মানুষটি বিশ্বাস করবে, কিছুই বুঝে উঠতে পারি না। ভদ্রলোক ধৈর্য হারিয়ে ফেলছেন। ক্রমেই তার অবয়ব কঠিন ও আক্রমাণাত্মক রূপ ধারণ করেছে, রিভলবার এখন টেবিলে। ইতোমধ্যে ২ তরুণ বাসার ১ ইঞ্চিও তল্লাশি বাকি রাখেনি। আমার মোবাইল ও ল্যাপটপ তাদের হাতে। এ কোনো দুঃস্বপ্ন নয়—নির্মেদ বাস্তব। আমার বাবার দ্বিতীয় স্ত্রীর কথা মনে পড়ে, যে কিনা তিনবার হত্যার পরিকল্পনা করেও ব্যর্থ হয়েছে। এই অবাস্তব ঘটনার সাথে তার কোনো সম্পর্ক নেই তো?

অফিসার, আপনি বিশ্বাস করুন, আমি অবিবাহিত, আমার জীবনে কোনো প্রেম নেই, আমার জীবনে কোনো নারী আসেনি, আমি কাউকে কোনোদিন ভালোবাসিনি, আমার মা’র মৃতমুখের ছবি ছাড়া দ্বিতীয় কোন নারীর মুখচ্ছবি আমার মনে পড়ে না...ডুকরে কেঁদে ওঠে অনুরোধ করি, আপনি বিশ্বাস করুন অফিসার, আমি অবিবাহিত। আমি এই নারীকে চিনি না।
মধ্যবয়সীর চোখে-মুখে বিরক্তি, অস্বস্তি। হাতের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলেন, আপনার সময় শেষ—চলুন।

দরজা দিকে তাকিয়ে খেকিয়ে উঠলেন ২ তরুণ, পিস্তল হাতে নিয়ে তেড়ে গেলেন, আপনার এখানে কেন? রাস্তা পরিস্কার করে দিন, আমরা এখনি বের হবো। এখানে বাড়িওয়ালা আছেন?
বাড়িওয়ালা এগিয়ে এল।
আলামত সংরক্ষণের স্বার্থে আমরা এই বাসা তালা দিচ্ছি। আমরাই খুলে দেবো।

আটতলা ভবনের সবগুলো বাসার দরজা অথবা জানালা খোলা, আলো জ্বলছে। লিফট ব্যবহার করি কদাচিৎ, উঠা-নামায় সিঁড়িই ব্যবহার করি; বিশেষত, উঠার সময় সিঁড়ি গুণে উঠি, ৬তলা তলা থেকে নিচে পর্যন্ত ১০১টি সিঁড়ি। সিঁড়ি গুণে নামছি। প্রতিটি সিঁড়িতে পা ফেলে সময় নিচ্ছি—কিছু একটা ভাবার চেষ্টা করেছি। জীবনের স্বপ্ন কী ছিল, কতদূর যেতে চেয়েছিলাম, বিপরীতে এখন যাচ্ছি কোথায়? পানি বের করে নেয়া ডাবের মতো শূন্য মনে হয় মাথাটাকে—ভেতরে গড়ের মাঠ, ফাঁকা, কিছুই নেই। অতীতের প্রিয় কোনো স্মৃতি, ছেলেবেলার খুনসুটি, প্রিয় কোনো স্থান, প্রিয় কোনো মানুষ, যেমন, ঘনিষ্ঠ বন্ধু, প্রিয় চরিত্র, অন্তরে দাগকাটা শিক্ষক, প্রিয় ছাত্র, আমার মা’র মুখ, এমনকি প্রিয় একটি গান এই মুহূর্তে গুনগুনিয়ে গাইলে মনোযোগ নিজের দিকে ফেরাতে পারি—না, নেই। কিছুই নেই, কিছুই নেই। একটিই ছবি এখন চোখের সামনে—প্রিয় সূর্যাস্তের ছবি, যেখানে রঙধনুর মতো বাঁকা হয়ে ফুটে উঠেছে যুবতীর ঠোঁটের অপূর্ব হাসি। কী অপরাধ হতে পারে—ঠোঁটে যার এমন অপূর্ব হাসি, তাকে কেউ খুন করতে পারে! গভীর একটি দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে বুকের ভেতর থেকেÑআহারে অভাগিনী! বেঁচে থাকার স্বপ্ন নিয়ে এতো দূর এসেছিল, এই শহরে।

অফিসার, আমি মর্গে যেতে চাই।
অবশ্যই। ওয়েলকাম।

হাসপাতালে করিডরে পায়চারি করছিল জিল্লুর, আমাকে দেখেই এগিয়ে আসে, ভাই, আপনি এখানে? রোগী আছে?
আমার ছেলেটার হঠাৎ ডায়রিয়া, রিস্ক নেইনি, তাই হাসপাতালে ভর্তি করেছি। ছেলেটাকে নিয়ে কী যে বিপদে পড়েছি ভাই! বাইরের খাবারের জন্য এমন জেদ করে, পারা যায় না। আপনি রাজার হালে আছেন। বিয়ে করেননি, সংসার করেননি, এই সব ঝামেলা নেই।
মাথা উঁচু করে অফিসারে মুখের দিকে তাকাই, কিন্তু লাভ হয় না। বরং উল্টোটাই ধরে নিয়েছে। পূর্ব-পরিকল্পিত নাটক।

জিল্লুর সাথে কতো স্মৃতি আমার! খুনসুটি-ভালোবাসা। ১টি সিঙারা ২ভাগ করে খেয়ে ক্লাসে গিয়েছি। আরবি সাহিত্যের ছাত্র বলে ভালো টিউশনি পেত না। দিনগুলো কেটেছে কী যে নির্মম টানাটানি আর আতঙ্কে। এই ৪ বছরে জিল্লুর রীতিমতো সংসারি—একটি কলেজের শিক্ষক, একজন নারীর স্বামী এবং এক সন্তানের পিতা।

তোমার ছেলে কোথায়?
১৩ নম্বর ওয়ার্ডে।
ওর ছেলেটাকে একবার দেখে আসি—এই বলে অফিসারের অনুমতি চাইলে জিল্লু চমকে ওঠে। এতোক্ষণ ব্যাপারটি ধরতে পারেনি। আমার সাথে এরা কারা এবং আমি কোথায় যাচ্ছি, এখন ধরে ফেলে।

সামনে হাঁটুন—এই বলে পিঠে ঠেলা মারলে আমি সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ি। অফিসার রূঢ়কণ্ঠে বলেন, এখানে ৩ মিনিট সময় নষ্ট করলেন।

মর্গের ফ্লোরে পা ফেলার স্থান নেই, সারিসারি লাশ, যেন লাশের গোডাউন। দেখে মনে হয়—ক্লান্ত মানুষগুলো ঘুমিয়ে আছে সাঁট হয়ে, আর কিছুক্ষণ পরেই জেগে উঠবে, কারণ, সকাল হতে দেরি নেই। উত্তরদিক থেকে পঞ্চম লাশটি যুবতীর। প্রতিটি লাশের পায়ের কাছে আটকে যায় পা, দাঁড়িয়ে পড়ি। গাঢ় একটি দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে ভেতরে থেকে—মানুষের এ কোন নিয়তি! এ কোন গন্তব্য! স্ত্রী হয়তো জানেই তার স্বামী এখানে, সন্তান জানে না প্রিয় বাবা মর্গে, মা জানে না তার বুকের ধন লাওয়াশি লাশ— তাদের পাশে জেগে থাকার কেউ নেই! কী যে নিঃসঙ্গ আর অসহায় লাগছে লাশগুলোকে! যুবতীর পায়ের কাছে দাঁড়াতেই মায়ের মৃতমুখের ছবি ভেসে ওঠে। মনে হয়Ñমা ঘুমিয়ে আছে এখানে, মুখের কাপড় তুললে মা’র মুখ-ই দেখতে পাবো। বোবাচিৎকার বুকের গভীরে কুণ্ডুলি পাকিয়ে ওঠে, এবং চিৎকার দিয়ে মাকে ডাকতে ইচ্ছে হয়। এই মুহূর্তে চিৎকার দিলে অর্থ দাঁড়াবে অন্য। একজন নারীর মৃতমুখই আমি আমৃত্যু বহন করতে চাই, যুবতীর মৃতমুখ দেখতে চাই না, এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়ে ফিরে যাবো বলে ঘাড় ফেরাতেই অফিসার বলে ওঠেন, মুখের কাপড় খুলতে সাহস হচ্ছে না? এখন মৃত স্ত্রীকে ভয় পাচ্ছেন! এই লাইনে আমার ষোল বছরের অভিজ্ঞতা। আপনি ৪০ মিনিট সময় নষ্ট করেছেন, আর ১মিনিটও না। অন্তত এটুকু দেখে যাওয়া উচিত, এই বলে অফিসার যুবতীর লাশের ডানদিকের কাপড় সামান্য উঁচিয়ে ধরলেন।

যুবতীর হাতের তালুতে গাঢ় মেহেদিরঙের লাভচিহ্ন। চিহ্নের মধ্যে লেখা—সোহেল!
আমি আঁতকে ওঠি, অফিসার, কে এই সোহেল! আমার নাম সোহেল, কিন্তু এই সোহেল কে? এই সোহেল আমি না, এই যুবতীকে আমি চিনি না, আমি এই যুবতীর স্বামী বা প্রেমিক কিছুই না।

আক্রোশ ও ঘৃণায় ছটফট করে ওঠেন অফিসার। মর্গের ভেতরে, তাই, সর্বোচ্চ সৌজন্য ও ধৈর্যের পরীক্ষা দিয়েছেন, শুধুমাত্র ঘাড়ে ধাক্কা দিয়ে মর্গের বাইরে বের করে আনেন।

জীবন এক আশ্চর্য নাটক—দৃশ্যের পরে দৃশ্য আসে। সেদিনের সকালে জাতীয় দৈনিকগুলোর প্রথম পৃষ্ঠায় ঘাতকের ছবি ওঠে, চ্যানেলগুলোর স্ক্রুলে ফিরেফিরে আসে ঘাতকের নাম। অতঃপর এক উচ্চশিক্ষিত যুবকের পতনের কারণ বিশ্লেষণ হয়, বড় বড় ফিচার তৈরি হয়, চ্যানেলগুলোর টকশে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে—যদিও আমি দেখতে পারিনি। ঈশ্বর আছেন, আমি কী দেখেছি? বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারী যুবক, বড় কথা হলো—স্বাধীন বাংলাদেশের একজন নাগরিক, সূর্যাস্তের অব্যবহিত পরে নিজের প্রেমময়ী স্ত্রীকে নৃশংসভাবে খুন করেছে। খুন-প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ করেছে জ্যামিতিক পরিকল্পনা মাফিক এবং নিরেট ঠাণ্ডা মাথায়।

পঞ্চাশোর্ধ এক অকৃতদার প্রত্যক্ষদর্শী আদালতে স্বাক্ষী দিয়েছেন। তার বর্ণনা মতে খুনটি সংঘটিত হয়েছিল এভাবে :

হেমন্তের শেষ সূর্যাস্ত ছিল সেদিন। বৈকালিক পায়চারির সময় পুকুরের উত্তর দিকে একটি বেঞ্চিতে এক যুবদম্পত্তিকে বসে থাকতে দেখেন। তারা সূর্যাস্তের দিকে তাকিয়ে ছিল। অবিশ্বাস্য দৃশ্য নিঃসন্দেহে এবং যুবক-যুবতীর নীরবতা তার কাছে অপার রহস্যের ছিল। তাই, গ্রহণযোগ্য দূরত্বের একটি বেঞ্চিতে তিনি বসেছিলেন। উদ্দেশ্য, যুবক-যুবতীর অভিমান-উত্তর মিলনের দৃশ্য উপভোগ করবেন অথবা বোঝার চেষ্টা করবেন। এক সময় যুবক উঠে দাঁড়ায়, একটি বা দু’টি বাক্য বিনিময় হয়। যুবতী বসেই ছিল, যুবক একাই চলে গেল। বিমূঢ় চোখে যুবকের চলে যাওয়া দেখেছিল যুবতী। ক্রমেই সন্ধ্যা নামে, আলো জ্বলে ওঠে, যুবতীর পেছনে মেহগনি গাছ, তাই আলো-আঁধারীর ছায়া পড়ে তার শরীরে। মিনিট বিশেক পরে যুবক ফিরে আসে। ততোক্ষণে অন্ধকার গাঢ় হয়ে এসেছে। যুবকের মুখচ্ছবি দেখা যায়নি। দুজনের মধ্যে তুমুল তর্ক চলে। হঠাৎ অন্ধকার কাঁপিয়ে চিৎকার দিয়ে ওঠে যুবতী, এবং একবারই চিৎকার দিয়েছিল।

আপনি এগিয়ে গেলেন না কেন? তাৎক্ষণিক হাসপাতালে পৌঁছলে যুবতী বেঁচে যেত নিশ্চিত, কারণ, মৃত্যু ঘটেছে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে। ছোরাটা যুবতীর বুকের খাঁচা ভেদ করে পিঠের চামড়া ম্পর্শ করেছে তার হার্ট ও ফুসফুস নিরাপদ রেখে।Ñবিচারকের জিজ্ঞাসার জবাবে অকৃতদার নির্বাক্যে আপন নিবুর্দ্ধিতা ও অনভিজ্ঞতাকে স্বীকার করেন। বিশ্বকর্মাও একজন পুরুষ কিনা—স্ত্রীর রাগ-মান ভাঙানোর জন্য পুরুষের হাতে শক্তিশালী অব্যর্থ এক দাওয়াই তুলে দিয়েছেন। যুবতীর মরণচিৎকারকে ‘শীৎকার’ ধরে নিয়েছিলেন অকৃতদার, কারণ, একবারই চিৎকার দিয়েছিল। এই ভুলের জন্য আদালতের ক্ষমা-প্রার্থনাও করেন।

বনে আগুন ধরলে সেই আগুন বাতাসে বাড়ে কয়েকগুণ, একই বাতাসে নিভে যায় প্রদীপ। প্রদীপের নিয়তি আমার—জলজ্যান্ত মিথ্যা ক্রমেই অখণ্ডনীয় সত্য হয়ে ওঠে। আমার একার লড়াই কতো তুচ্ছ আমি জানি, হাতির পায়ের তলায় তেলাপোকার বাঁচার লড়াইয়ের মতো—তথাপি, তেলাপোকা কি বাঁচার লড়াই করে না? যুবতীর খুনের বিচারের দায়িত্ব নিয়েছে রাষ্ট্র, আমি এখন রাষ্ট্রের খুনি। আত্মপক্ষ সমর্থন করে যা কিছুই বলি না কেন, রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বলছি। যুবতী আমার স্ত্রী এবং আমিই তাকে খুন করেছি পরিকল্পিতভাবে, ঠাণ্ডা মাথায়—রাষ্ট্র আমার কাছে এই স্বীকারোক্তি চায় এবং এই জন্য টানা ৫ বছর ধরে চলে বিচারকাজ।

আমার উকিলের পরামর্শ এরূপ : আপনি সরলবাক্যে স্বীকার করুন যে, যুবতীর স্বামী আপনি, সাংসারিক মধুর খুনসুটির এক পর্যায়ে আপনার স্ত্রী অভিমান করে ঘরের বাইরে এসেছিল। আপনি অভিমান ভাঙাতে ব্যর্থ হয়ে বাসায় ফিরে গিয়েছিলেন। সন্ধ্যার অন্ধকারে কোনো এক দৃষ্কৃতিকারী আপনার যুবতী স্ত্রীকে একা পেয়ে বলাৎকারের চেষ্টা করেছিল, ব্যর্থ হয়ে বুকে ছুরি বিঁধিয়েছে।

উকিলের মুখের দিকে নির্বিকারভাবে তাকিয়ে ছাড়া কিছুই বলার ছিল না।

জীবনে বিয়োগ বলে কিছুই নেই, সবই যোগ। জন্মেই আমি নজরদারির মধ্যে পড়েছি। আমার দাদা বলতেন, তোর দুই কাঁধে দুই জন লেখক আছেন। উনারা খুঁটিনাটি সব কাজ লিখে রাখেন। তাই কর্ম করবি ভেবেচিন্তে। একবার লিখে ফেললে কিন্তু মোছার উপায় নেই। এ ক্ষমতা উনাদের নেই। সরকারের উকিল যেদিন প্রথম প্রশ্ন করলেন, ‘ছেলেবেলা আপনি একবার আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন।’—প্রথমে আমি কিছুতেই স্মরণ করতে পারিনি, ঠিক কোন বয়সে আমি আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলাম। সেদিন দুই কাঁধের লেখকদের মনে পড়েছিল। তারা নিশ্চয় লিখে রেখেছে। তা না হলে, সরকারি উকিল জানবেন কী করে, আমি ছেলেবেলা আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলাম।

আপনি নীরব কেন? ছেলেবেলায় আপনি একবার আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন। আপনার আমলনামায় লেখা আছে।
সে তো—
উকিল মেদভূঁড়ি কাঁপিয়ে ধমকিয়ে ওঠেন—হ্যাঁ বা না বলুন। আমাদের ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই।
ছেলেবেলায় আপনার বাবার দ্বিতীয় স্ত্রী অর্থাৎ আপনার সৎমাকে হত্যার চেষ্টা করেছিলেন, তাঁর শাড়িতে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিলেন—আপনি অস্বীকার করতে পারবেন?
উনিই তো বরং আমাকে হত্যা করতে তিনবার ফাঁদ পেতেছিলেন। আমার মাকে হত্যা...
এসব আদালতের জানার প্রয়োজন নেই। আপনি তাকে হত্যা করতে চেয়েছিলেন কিনা? হ্যাঁ অথবা না বলুন। আমরা জানি, আপনার না বলার সুযোগ নেই। আপনার আড়াইশো পৃষ্ঠার আমলনামা আমার হাতে, অর্থাৎ রাষ্ট্রের হাতে। ছেলেবেলা আপনার প্রিয় খেলা ছিল কুকুর শাবকের লেজে দড়ি বেঁধে দৌড়ানো; বিলে-মাঠে শকুনের দল নেমে আসলে আপনি ছুটে যেতেন, কারণ, আপনি মৃত গরুর মাংস ছিঁড়ে খাওয়ার দৃশ্য দেখে উল্লসিত হতেন। আপনি গুঁইসাপ ভয় পেতেন না, বরং গুঁইসাপের গলায় দড়ি বেঁধে প্রকাশ্যে হেঁটে বেড়াতেন, আর ভয় দেখাতেন ছোট-বড় সবাইকে। এই পর্যন্ত বলে আমার চোখে চোখ ফেলে সরকারি উকিল অট্টহাসি দিয়ে ওঠেন, আপনি পলিটিক্স করলে এদেশের বিরাট নেতা হতেন!

আমার চোখে-মুখে বিস্ময় ফুটে উঠলে উকিল সাহেব সবজান্তার হাসি দিয়ে জানান, আমি সরকারি উকিল, সরকার মানে নিশ্চয় জানেন? রাষ্ট্রের হাত কতো দূর পৌঁছায় আপনার অজানা নয়। আপনার জন্মের কয়েক শতাব্দীর পূর্বের এবং আপনার মৃত্যুর কয়েক শতাব্দীর পরের নথিপত্রের বিশ্বস্ত বাহক রাষ্ট্র। যা হোক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান আমাদের আলোচ্য না—প্রসঙ্গে আসি। মি. সোহেল, আপনার কী মনে পড়ে—আপনারা স্ত্রীর সাথে শেষ কবে মিলিত হয়েছিলেন? তার মানে, আমি কী জানতে চাইছি, আপনি নিশ্চয় বুঝতে পারছেন।

আমি অবিবাহিত, আমার কোনো স্ত্রী নেই।

আমি যদ্দূর জেনেছি, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আপনার স্ত্রী আপনার প্রেমিকা ছিলেন, আদর্শ জুটি ছিলেন, অনেকের ঈর্ষার কারণ ছিলেন, এসবই জেনেছি গতকালের একটি জাতীয় দৈনিক পড়ে। হঠাৎ উকিলের চোখে-মুখে বিষাদ ফুটে ওঠে। বিচারকের দিকে তাকিয়ে বড় একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। যুবতীর অসহায় করুণ মুখের ছবি মনে করে প্রায় ডুকরে কেঁদে ওঠেন, মাই লর্ড, প্রেমের এ কী পরিণতি! যে বুকে তিলতিল করে ভালোবাসার বটবৃক্ষ তৈরি করেছিল, সংসার-স্বপ্নে বিভোর ছিল, যুবতীর সেই বুকে কিনা পেশাদার আততায়ীর মতো ছুরি ঢুকিয়েছে প্রেমিক। আপন যখন পর হয়, সেই পর কী ভয়ঙ্কর নৃশংস হয়, এই ঘাতক তার দৃষ্টান্ত। উকিল এবার কেঁদেই ফেলেন কিনা!

মি. সোহেল, আপনার স্ত্রীর সাথে শেষ সূর্যাস্ত দেখেছিলেন যেদিন, অর্থাৎ যে সন্ধ্যায় আপনার স্ত্রীকে আপনি খুন করেন, সেদিন দুপুরে আপনার স্ত্রী কী রান্না করেছিলেন, মনে আছে?
আমার বাসায় দুপুরে কখনো রান্না হয়নি। আমার কাজের বুয়া সকালে একবারই আসেন।
আপনি বলতে চাইছেন, আপনার স্ত্রী আপনার রান্না-খাওয়ার ব্যাপারে কোনো প্রকার দায়িত্ব পালন করতেন না?

উকিলের ঠোঁটে বিদ্রুপের হাসি, এবং উপস্থিত সকলের চোখেই হাসি, শুধু বিচারকের চোখে হাসি নেই, চোখের পলক নেই, তার মুখ গম্ভীর এবং শরীর স্থির।

আমরা জানতে পেরেছি, আপনার স্ত্রী রান্নায় পারদর্শী ছিলেন, বিচিত্র রকমের আচার তৈরি করতে পারেন, একটি আচার প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছিলেন। স্বামী-সংসার সামলাবেন, চাকরি করবেন না, স্ত্রীর এই স্থির সিদ্ধান্তে অসন্তুষ্ট ছিলেন আপনি। স্ত্রী সন্তান নিতে চাইলে, সুকৌশলে আপনি সময় ক্ষেপন করছিলেন। আমার বাস্তব অভিজ্ঞতা বলে—সন্তান ইস্যুতেই স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের গুরুতর অবনতি ঘটেছিল, কারণ, যুবতীর বয়স ২৮ ছিল। আর এই অবনতির আকাট্য প্রমাণ হলো আপনার এই অপবিত্র লুঙি, এই মোবাইল।

মাই লর্ড বলে যাত্রামঞ্চের অভিনেতার মতো শরীর মোচড় দিয়ে বিচারকের মুখোমুখি দাঁড়ালেন সরকারি উকিল। ফ্যানের বাতাসে তার কালো গাউন ফুলে উঠেছে নভোচারীর বেলুনের মতো—মাই লর্ড, প্রাগৈতিহাসিত কাল থেকেই মানুষ মানুষকে খুন করে, হাবিল খুন করেছিল ভাই কাবিলকে। স্বভাবতই, মানুষ খুন হয় তার নিকটজন ও বিশ্বাসী মানুষের হাতে। যুবতী খুন হয়েছে, এবং খুনি তাঁর প্রেমিক বনাম স্বামী, এই পর্যন্ত স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু এই একটি খুন জাতির বিবেকতাড়িত মানুষকে ভাবিয়েছে, কাঁদিয়েছে, এবং প্রশ্ন উঠেছে, আমরা কোথায় এসে দাঁড়িয়েছি? আমাদের যুবসমাজের এ কী পরিণতি! অধঃপতনের কোন অতল গহ্বরে তলিয়ে যাচ্ছে? এর গন্তব্য কোথায়? প্রশ্নের পর প্রশ্ন উঠে আসে, যখন জানা যায়, যুবতীকে ঠাণ্ডা মাথায় খুন-ই করেনি যুবক, খুন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করে বাসায় ফিরে গেছে স্বাচ্ছন্দ্যে। বাসায় ফিরে পর্ণোগ্রাফি দেখে মৈথুন উৎসবে মেতে উঠেছে। মৈথুনোত্তর শরীরের সুখ-ক্লান্তির উপভোগকে রগরগে করার উদ্দেশ্যে এক গ্লাস গরম দুধে চা-হরলিক্স মিশিয়ে সময় নিয়ে প্রশান্ত মনে পান করেছে। অতঃপর সুখি মানুষের মতো নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়েছে।

**********

লেখক পরিচিতি : চন্দন আনোয়ার প্রতিশ্রুতিশীল কথাসাহিত্যিক। লিখেছেন অসংখ্য গল্প, উপন্যাস ও প্রবন্ধ। তাঁর উল্লেখযোগ্য গল্পগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে : প্রথম পাপ দ্বিতীয় জীবন, অসংখ্য চিৎকার, পোড়োবাড়ি ও মৃত্যুচিহ্নিত কণ্ঠস্বর, ত্রিপাদ ঈশ্বরের জিভ, ইচ্ছামৃত্যুর ইশতেহার। পেশায় অধ্যাপক।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

2 মন্তব্যসমূহ