ঝান জি’র গল্প : লাভ মাস্ট নট বি ফরগটেন


অনুবাদ : হারুনুজ্জামান

আমার বয়স তিরিশ, ঠিক আমাদের গনপ্রজাতন্ত্রের যা বয়স তা। একটা প্রজাতন্ত্রের জন্য, তিরিশ বছর খুবই অল্প একটা সময়। কিন্তু একজন মেয়ের জন্য এই বয়সটা কার্যত শিকেয় তোলার মতো বয়স।

প্রকৃতপক্ষে, একজন অকৃত্রিম পাণিপ্রার্থী আমার আছে। তোমরা কি কখনো গ্রীক ভাস্কর মাইরনের ডিসকোবোলাস দেখেছ? চে আ লিন (Qiao Lin) হলো সেই চাকতি-নিক্ষেপকারীর প্রতিচ্ছবি। শীতকালে শীত-নিবারনী নরম-ভারী কাপড় সে পড়লেও, তার ভিতর দিয়েও বোঝা যেত যে সে সুঠাম দেহের অধিকারী। ওঁর চেহারা ব্রোঞ্জনির্মিত শিলপকর্মের মতো—বৈশিষ্টপূর্ণ শাণিত মুখমণ্ডলের আদল, প্রশস্ত ললাট এবং বড় বড় চোখ দেখতে এতটাই আকর্ষণীয় যে কেবল ওঁর বাহ্যিক চেহারাই মেয়েদের কাবু করতে যথেষ্ট।

কিন্তু ওঁকে বিয়ে করব কী না সে ব্যাপারে আমি মনস্থির করতে পারছি না। আমি সঠিক বুঝে উঠতে পারছি না কে কাকে আকর্ষণ করছে—সে আমাকে, নাকি আমি ওঁকে। 

আমি জানি লোকজন আমার পিছনে অনেককিছু বলাবলি করছে।

“সে নিজেকে কী এমন ভাবে? কেন সে এত বেশি খুঁতখুঁতে?” ওদের কাছে আমি এমন কেউ না যে কোনোকিছু পাবার জন্য বেশ শক্ত খেলা খেলছে। আমার এরকম অযৌক্তিক ব্যবহারের জন্য আমার প্রতি ওদের দৃষ্টিভঙ্গি বেশ আক্রমণাক।

অবশ্যই, আমার একদম উচিৎ হচ্ছে না তুচ্ছ খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে তর্ক করা। যে সমাজে বাণিজ্যিক উৎপাদন ব্যবস্থা এখনও বিদ্যমান, সে সমাজে এখনও বিয়ে হলো অন্যান্য ব্যবসায়িক লেনদেনের মতো, এক ধরণের বিদ্যমান বিনিময় ব্যাবস্থা।

প্রায় দুবছর ধরে আমি চে আ লিনকে চিনি, তদুপরি আমি তল পাই না ভেবে, কেন কথা বলতে কিংবা কোনো কিছুই না বলতে ওঁর এতটা অরুচি! আমি ওঁর বুদ্ধিমত্তা পরীক্ষা করার জন্য এটা-সেটা সম্পর্কে ওঁর মতামত জানতে চাইলে কিন্ডারগার্টেন স্কুলের শিশুদের মতো সে উত্তর দিয়ে বলে, ‘ভাল’ কিংবা ‘খারাপ।’

একবার আমি ওঁকে জিজ্ঞেস করলাম, “চে আ লিন, তুমি কেন আমাকে ভালবাস?” এই প্রশ্নের কী উত্তর হতে পারে, এতটা গভীরভাবে সে চিন্তা করতে লাগল, যেন বছর লেগে যাবে। সাদা-চোখে দেখে আমার মনে হয়েছিল যে ওঁর কপালটা বেশ মসৃণ, কিন্তু ইতমধ্যে সেই কপালে অনেক চিন্তার ভাঁজ পড়ে গিয়েছে, যেন ওঁর সুন্দর মাথার ভিতরের মগজের কোষগুলো কঠিন কাজ করতে গিয়ে চিন্তায় চিন্তায় শেষ হয়ে গেছে। আমি লজ্জা পেলাম এটা ভেবে যে প্রশ্নটা করে আমি ওঁকে বিপদের মুখে ফেলে দিয়েছি।

শেষমেশ চোখদুটো তুলে শিশুসুলভ দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “কারণ তুমি ভালো।”

আমার অন্তর ভরে গেল একাকীত্বে। “ধন্যবাদ, চে আ লিন!” এটা ভেবে আমি বিস্মিত না হয়ে পারলাম না যে যদি আমাদের বিয়ে করতে হয় তাহলে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে আমরা একজন আরেকজনের প্রতি আমাদের কর্তব্য পালন করতে পারব কী না। হয়তো, আইন এবং নৈতিকতা আমাদেরকে একত্রে বেঁধে রাখবে, কিন্তু কেবলমাত্র আইন এবং নৈতিকতার প্রতি বিশ্বস্ত থাকাটা কী নিদারুণ বেদনাদায়ক এক অভিজ্ঞতা! এর বাইরে এমন কী কিছুই নেই যা কিনা আমাদের দুজনার সম্পর্ক আরো শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড় করাতে পারে।

এরকম ভাবনা যখন আমার মনের ভিতর ঘুরপাক খাচ্ছিল, অদ্ভুত এক অনুভুতি আমাকে গ্রাস করল—মনে হল আমি আর সে মেয়ে নই, যে কিনা গভীরভাবে বিয়ের কথা চিন্তা করছে, আমি যেন হয়ে গেছি বয়স্ক এক সমাজ-বিজ্ঞানী।

সম্ভবত আমি খুব বেশী মানসিক সংকটে ভুগি। আর দশজন বিবাহিত দম্পতির মতো আমরা আমাদের জীবন চালাতে পারি। সন্তান-সন্ততির জন্ম দেয়া থেকে শুরু করে তাদের প্রতিপালন পর্যন্ত যা যা করতে হয় সেসব করা, আইন মোতাবেক একজন অন্যজনের প্রতি বিশ্বস্ত থেকে দিনাতিপাত করা, ইত্যাদি। বিংশ-শতাব্দীর ৭০-এর দশকে বসবাস করেও লোকজনের বিয়ে-সম্পর্কিত ধ্যান-ধারনা রয়ে গেছে সেই পুরোনো দিনের মতো, যা ছিল সহস্র বর্ষ আগে। মূলত সেই সময়ে চিন্তা করা হতো যে বিয়ে মানে বংশবৃদ্ধি বজায় রাখা, একধরনের বিনিময় ব্যবস্থা কিংবা ব্যবসায়ীক লেনদেন, যার মধ্যে প্রেম ও বিবাহ বিষয় দুটোকেই আলাদা করে দেখা হতো। যেহেতু এটাই হলো গতানুগতিক অনুশীলিত আচরণ, তাহলে আমরা কেনইবা সেটা অনুসরন করব না?

কিন্তু এখনও এই ব্যাপারে আমি মনস্থির করতে পারছি না। মনে পড়ছে শিশু-অবস্থায় আমি অকারণে সারারাত কাঁদতাম, নিজে ঘুমাতে পারতাম না এবং বাড়ির বাকি সদস্যদেরও যথেষ্ট বিরক্ত করতাম। আমার পুরোনো সেবিকা, অশিক্ষিত অথচ বেশ চালাক, বলতো, “আমার কানের ভিতর এক খারাপ বাতাস ঢুকে গেছে।” যদিও আমি মনে করি এধরনের বিচার-বিবেচনা বস্তু-সম্পর্কিত অগ্রিম এক চিন্তাধারা, তবুও আমি এই পুরোনো দুর্বলতা থেকে নিজেকে বের করে আনতে পারিনি। বস্তুত যে ব্যাপারটা ধর্তব্যের মধ্যে আনা বোকামি ছাড়া আর কিছুই না, আমি ঠিক সেই ব্যাপারটা নিয়েই নিজেকে অস্থির করে ফেলি। উপরন্তু, একইসময়ে অন্যান্যদেরকেও আমি বিচলিত করে তুলি। আসলে, চাইলেই একজন তার স্বভাবগত চারিত্রিক বৈশিষ্ট বদলে ফেলতে পারে না—এটা বেশ কঠিন এক কাজ।

আমি আমার মায়ের কথা ভাবি। যদি সে বেঁচে থাকত, চে আ লিন সম্পর্কে আমার যে মনোভাব এবং ওঁকে বিয়ে করার বিষয়ে আমার যে পরিবর্তনশীল আচরণ, এইসব ব্যাপারে কী সে বলতো? বারবার আমার সব চিন্তা কেবল মায়ের দিকে ধাবিত হচ্ছে, কারণ এটা নয় যে সে একজন কঠোর-প্রকৃতির মা ছিলেন এবং তার ভূত মৃত্যর পর থেকে আজ পর্যন্ত আমার উপর নজর রাখছে। না, সে কেবল আমার মা-ই ছিল না, সে ছিল আমার সবচেয়ে নিকট বন্ধু। আমি তাকে এতটাই ভালবাসতাম যে আমাকে ছেড়ে তার চলে যাওয়ার ভাবনা আমার মাথায় এলেই আমি মনে কষ্ট পাই।

কক্ষণো মা আমাকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য বক্তৃতা দেননি, শান্ত অথচ গভীর অনারীসুলভ কণ্ঠে তার জীবনের সাফল্য এবং ব্যর্থতাগুলো এমনভাবে আমার সামনে তুলে ধরতেন যাতে আমি তার অভিজ্ঞতা থেকে শিখতে পারি। স্পষ্টত, জীবনে তার তেমন খুব বেশি সাফল্য ছিল না—তার জীবন ছিল ব্যর্থতায় ভরা। জীবনের শেষ দিনগুলোতে তার সুন্দর ও অভিব্যক্তিপূর্ণ চোখগুলো আমাকে কেবল অনুসরণ করত, যেন সে চিন্তিত থাকত এটা ভেবে যে তার অনুপস্থিতিতে আমি আমার জীবন কীভাবে চালাব, এবং যেন আমার জন্য তার কাছে জমা আছে অনেক দরকানি উপদেশাবলী যেগুলো দিতে সে দিধাগ্রস্ত। আমার এলোমেলো এবং কৌতূহলজনকভাবে সরল জীবনযাপনের জন্য সে সবসময় মানসিক অস্বস্তিতে ভুগতো। কোনো গুপ্ত বিষয় বলে ফেলার মতো সে হঠাৎ একদিন বলল, “শানশান, তুমি কী চাও সেটা সম্পর্কে যদি তুমি নিশ্চিত না হও, তাহলে তাড়াহুড়ো করে বিয়ে করতে যেও না—নিজের জীবন নিজে চালাও, এবং সেটাই তুলনামূলকভাবে ভালো!” হয়তো অন্যান্যরা ভাবতে পারে এটা আবার কী ধরনের উপদেশ যা একজন মা তার মেয়েকে দিতে পারে! কিন্তু আমার কাছে এটাই ছিল তার যাপিত জীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতার প্রকাশ। আমি মনে করি না যে সে কোনোভাবে আমাকে কিংবা জীবন সম্পর্কে আমার যে ধারনা তাকে তিনি ছোট করে দেখতে চেয়েছিলেন। মা আমাকে সত্যিই খুব ভালবাসতেন, এবং তিনি চাইতেন না যে আমি জীবনে অসুখী হই।

“মা, আমি বিয়ে করতে চাইনা!” লজ্জাশীলতা কিংবা কপটবিনয়ী হয়ে কথাটা আমি বলিনি। আমি বুঝতে পারি না কেন একজন মেয়েকে অতিমাত্রায় লজ্জার ভান করতে হবে। মা আমাকে বহুদিন যাবত অনেককিছু শিখেয়েছিলেন যা সাধারণভাবে মেয়েদেরকে বলা হয় না।

“যদি তুমি যথার্থ পুরুষকে খুঁজে পাও, তাহলে তাকে বিয়ে করো। কেবল, তাকেই বিয়ে করবে যাকে তুমি তোমার জন্য সঠিক মনে করবে!”
“দুঃখের সাথে বলতে হয় যে সেরকম পুরুষ কোথাও নেই।”
“এটা ঠিক না। তবে এটা কঠিন। পৃথীবিটা অনেক বড়, সত্যি বলতে কী তার সাথে তোমার জীবনে দেখা নাও হতে পারে।”

আসলে আমার বিয়ে হোক কিংবা না হোক, সে ব্যপারে আমার মা তেমন বিচলিত ছিলেন না। কিন্তু তিনি জোর দিতেন বিয়ের গুণগত দিকের উপর।
“স্বামী ছাড়া তুমি কি ভালোভাবে নিজের জীবন চালিয়ে নাওনি?”
“কে বলে এরকম কথা?”
“আমি মনে করি তুমি বেশ ভালই করেছো।”
“আমার আর কোনো উপায় ছিল না...” হঠাৎ কথাটা থামিয়ে সে যেন ভাবনার জগতে হারিয়ে গেল; তার মুখমণ্ডলে যেন এক অস্পষ্ট আকাঙ্খার ছাপ। তার আকাঙ্খাপূর্ন এবং রেখাবৃত্ত মুখমণ্ডল আমাকে বিবর্ণ এক ফুলের কথা মনে করিয়ে দিল যা আমি আমার এক বইয়ের দুই পাতার ভাঁজে রেখেছিলাম।

“কেন তোমার কোনো উপায় ছিলো না?”
“তুমি খুব বেশি প্রশ্ন কর,” বুদ্ধি করে সে প্রশ্নটা এড়িয়ে গেল। কারণ এটা নয় যে সে আমাকে বিশ্বাস করে তার গোপন কথাগুলো বলতে লজ্জায় মরে যাচ্ছে, বরঞ্চ এটা হতে পারে যে সে ভয় পেত এটা ভেবে যে আমি জীবনে হয়তো একটা ভুল সিদ্ধান্তে পৌঁছে যেতে পারি কথাগুলো শুনে। তাছাড়া, প্রত্যেকেই নিজের মধ্যে গোপন কিছু একটা লালন করে যা কিনা সে কবরে যাওয়া পর্যন্ত সংরক্ষণ করে রাখে। খানিকটা হতাশ বোধ করলেও, আমি খোলাখুলিভাবে আমার মাকে প্রশ্ন করি, “তুমি কি আমার বাবাকে ভালবাসনি?”
“না, কক্ষোণো আমি ওঁকে ভালবাসিনি।”
“সে কি তোমাকে ভালবাসতো?”
“না, সে আমাকে ভালবাসতো না।”
“তাহলে বিয়ে করা কেন?”

অল্প কিছুক্ষণ কোনো কথা না বলে, আমার মা ভাবতে লাগল সঠিক কী বললে এই রহস্যের যথাযথ ব্যাখ্যা করা যায়। অতঃপর সে তিক্ততা নিয়ে উত্তর দিল, “তরুণ বয়সে তুমি সবসময় বুঝতে পারবে না তুমি কী খুঁজছো, কী তুমি চাও, এবং লোকজন হয়তো তোমাকে বিয়ে করার কথাও বলতে পারে। যখন তোমার বয়স এবং অভিজ্ঞতা বাড়বে, তখন তুমি বুঝবে কী তোমার সত্যিকারভাবে প্রয়োজন। ততক্ষণে তুমি নির্বোধের মত অনেক কিছুই করবে যার জন্য পরবর্তীকালে তুমি তোমার নিজেকেই পদাঘাত করতে চাইবে। তখন তুমি চাইবে তোমার সবকিছু দিয়ে নুতন জীবন শুরু করতে এবং বিচক্ষণতার সাথে জীবন চালাতে। যারা তাদের ভাগ্যকে নিয়ে পরিতৃপ্ত, তারা সবসময়ই সুখী, ওঁরা বলে। কিন্তু আমি এরকম সুখ কক্ষণো উপভোগ করব না। যেন সে নিজেকে নিজে উপহাস করছে, এমন করে সে আগের বাক্যের সঙ্গে জুড়ে দিল, “একজন হতভাগ্য আদর্শবাদী, এটাই আমি।”

“আমি কি তবে তারই পথে চলছি? আমাদের দুজনার বংশানুগতির নিয়ন্ত্রক উপাদান কি কেবল বদ বাতাসকেই আকর্ষণ করে?”
“তুমি আবার বিয়ে কর না কেন?
“দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে যে আমি এখনও নিশ্চিত হতে পারিনি যে আমি আসলে কী চাই।” তার এই কথাতে পরিস্কার বোঝা গেল যে আসল সত্য কথাটা আমাকে বলতে চাচ্ছে না।

বাবাকে আমার মনে পড়ে না। আমি বেশ ছোট থাকতেই বাবা আর মা আলাদা হয়ে যায়। আমার মনে পড়ছে অপ্রস্তুতভাবে মা একদিন আমাকে বলেছিল যে আমার বাবা ছিল সুদর্শন এবং সুঠাম দেহের অধিকারী। আমি দেখতে পারছিলাম যে সে ভীষণ লজ্জিত বোধ করছিল এই ভেবে যে তাকে মূল্যায়ন করা হয়েছিল তার চেহারার এবং নিস্ফল পছন্দের জন্য। সে আমাকে বলেছিল, “রাতে যখন আমি ঘুমাতে পারতাম না, আমি নিজেকে জোড় করে শান্ত করার জন্য বোকার মতো যেসব ভুল করেছি সেগুলো মনে করতে চাইতাম। অবশ্য এটা এতই অপছন্দনীয় কাজ যে এর জন্য আমাকে লজ্জায় বিছানার চাদরে প্রায়ই মুখ লুকাতে হতো, মনে হতো যেন অন্ধকারের ভিতর দিয়েও কারো চোখ আমার উপর নজর রাখছে। যদিও অরুচিপূর্ণ, তবু আমি এই কাজের ভিতর দিয়ে একরকম দুঃখভোগের আনন্দ পাই।” আমি আন্তরিকভাবে দুঃখ পাই এটা ভেবে যে আমার মা জীবনে আর বিয়ে করল না। কী এক দারুণ চরিত্র তার! যদি সে তার ভালবাসার পুরুষকে বিয়ে করতো, কী যে দারুণ সুখের সংসার আমাদের হতো! যদিও তেমন আহামরি সুন্দরী সে ছিল না, তবুও সে কালো কালিতে আঁকা প্রাকৃতিক ভুদৃশ্যের চিত্রকলার মতো আকর্ষণীয় ছিল। সে একজন ভালো লেখকও ছিল। অন্য আরেকজন লেখক যে তাকে চিনতো ঠাট্টার ছলে বলতো, “ যে কোনো ব্যক্তি তোমার লেখা পড়লে তোমার প্রেমে পড়তে বাধ্য!”

প্রতিবাদ করে মা বলতো, “যদি সে জানতো যে সে তার ভালবাসার বস্তুটি সাদাচুলের এক বিগতযৌবনা বুড়ি, আমি নিশ্চিত সে তখন ভয়ে পালিয়ে যেত।”

তার বয়সে, অবশ্যই সে জানতো সে কী চেয়েছিল, সুতরাং এটা স্পষ্টত প্রতীয়মাণ যে সে আসল কথা এড়িয়ে যাচ্ছিল। একথা আমি বলছি এই কারণে যে এটা তার মুদ্রাদোষ যা কিনা আমাকে বিভ্রান্তিকর এক পরিস্থিতির মধ্যে ফেলেছিল।

উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে যে সে যখনই সংক্ষিপ্ত সফরে বেইজিং থেকে অন্য কোথাও যেত, তার সঙ্গে সবসময় থাকত চেখভের ২৭-খণ্ডের গল্পসমগ্র, যেগুলো প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৫০ এবং ১৯৫৫-এর মধ্যে। সাবধানবানী উচ্চারণ করে, আমাকে সে বলতো, “এই বইগুলো তুমি ধরবে না। যদি তুমি চেখভ পড়তে চাও, তাহলে তোমাকে আমি যে এক প্রস্থ চেখভের বই কিনে দিয়েছি, সেগুলো পড়।” আদৌ আমাকে এতটা সতর্ক করার প্রয়োজন ছিল না। আমার নিজের কাছেই যখন চেখভের বইয়ের একটা সেট ছিল, তখন কেন আমি তার বইগুলো ধরতে যাব? তাছাড়া, এই সতর্কবাণী সে বার বার উচ্চারণ করত, অনেকটা যেন বইগুলোকে সে রীতিমতো পাহারা দিচ্ছে। মনে হতো, বইগুলো যেন তাকে মোহনীয়ভাবে আকর্ষণ করছে।

অতএব, আমাদের বাড়িতে দুই সেট চেখভের গল্পগ্রন্থ ছিল। এর কারণ এই নয় যে আমরা চেখভের লেখা গল্পের ভীষণ ভক্ত ছিলাম। বরঞ্চ ক্ষেত্রবিশেষে আমার মতো অন্যান্য লোকদের প্রশ্নের আঘাত যেন ঠিকঠাক মতো ফিরিয়ে দেয়া যায়, সেটাও লক্ষ্য ছিল। যখন কোনো একজন চেখভের গল্পরাজির একটা খণ্ড মার কাছে ধার চাইতো, মা তখন আমার সেট থেকে একটা খণ্ড নিয়ে তাকে সেটা দিয়ে দিত। একবার, তার অনুপস্থিতিতে, তার এক নিকট বন্ধু তার সেট থেকে একটা খণ্ড নিয়েছিল। যখন সে টের পেল, তখন সে উত্তেজিত হয়ে পড়ল এবং বিনিময়ে তৎক্ষণাত আমার সেট থেকে সেই খণ্ডটা নিয়ে গিয়েছিল। আমার মনে আছে তখন থেকেই সেই বইগুলো তার বুককেসে রাখা। যদিও আমি চেখভের লেখালেখির একজন গুনগ্রাহী, তবুও আমি অবাক হতাম এটা দেখে যে চেখভের লেখা পড়তে আমার মায়ের কোনো ক্লান্তি ছিল না। গত বিশ বছর ধরে কেন প্রতিদিন তাকে চেখভ পড়তে হতো?

কখনো কখনো, যখন সে লিখতে লিখতে ক্লান্ত বোধ করত, সে নিজেই এক কাপ কড়া চা বানিয়ে নিত নিজের জন্য এবং বুককেসের সামনে বসে চেখভের বইগুলোর সেটের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকত। যদি আমি তার ঘরে ঢুকতাম, তখন সে বিচলিত হয়ে পড়ত, এবং তখন হয় তার হাতে থাকা চায়ের কাপ থেকে চা উপচে পড়ে যেত কিংবা একটা মেয়েকে তার প্রেমিকের সাথে ঘনিষ্ঠ অবস্থায় কেউ দেখে ফেললে সে যেমন লজ্জা পায়, ঠিক সেরকম লজ্জায় তার মুখমণ্ডল লাল আভায় ভরে যেত। বিশ বছর ধরে একজন পুরুষ আমার মায়ের সমস্ত অস্তিত্বজুড়ে বসে আছে, কিন্তু সে তার জন্য নয়! আমি বিস্মিত, ভাবছিলাম, মা কি তবে চেখভের প্রেমে পড়েছে? চেখভ বেঁচে থাকলে হয়তো তাই হতো। মৃত্যুর আগমুহুর্তে, যখন মার মন উদ্দেশ্যহীনভাবে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ঘুরে বেড়াচ্ছিল, তখন সে আমাকে কিছু কথা বলেছিল, “সেই সেটটা... .” তার সব শক্তি তখন নিঃশেষিত। সে সেই সেটের শিরোনাম আর বলতে পারল না। কিন্তু আমি বুঝতে পেরেছিলাম সে কী বলতে চাইছিল।

“এবং আমার ডায়েরি ... ‘লাভ মাস্ট নট বি ফরগটেন’ ... আমার শবদেহের সাথে পুড়িয়ে দিও।”

চেখভের লেখালেখি-বিষয়ক যে শেষ নির্দেশনাগুলো আমার মা আমাকে দিয়ে গিয়েছিলেন, আমি সেগুলো অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছি, কিন্তু আমার মায়ের ডায়েরিটা পুড়িয়ে ফেলতে আমার মন কিছুতেই সায় দিচ্ছিল না। আমি ভাবলাম, যদি এই ডায়েরিটা বই আকারে প্রকাশ করা যেত, তবে আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি যে এই বই হতো তার অন্যসব লেখার চেয়েও মর্মস্পর্শী। প্রত্যাশিতভাবে, এই ডায়েরির প্রকাশনা ছিল প্রশ্নাতীত।

প্রথমে আমি ভাবলাম যে ডায়েরিতে অন্তর্গত সংক্ষেপে টুকেরাখা চিন্তাগুলো সম্ভবত তার লেখার কাঁচামাল। সেগুলো কি গল্প, প্রবন্ধ, ডায়েরি নাকি চিঠি, পড়ে কিন্তু স্পষ্ট কোনো ধারনা পাওয়া যায় না! তবে পুরোটুকু পড়ার পর আমি একটা আবছা আভাস পেলাম যা কিনা আমার ত্রুটিপূর্ণ স্মরণশক্তি থেকে উৎসারিত। গভীরভাবে ভেবে দেখার পর, শেষমেষ আমার মনে হল যে এটা কোনো প্রাণহীন পান্ডুলিপি নয়, এটা এক নিদারুণ মানসিক যন্ত্রনাদায়ক প্রেমিক-মনের আকুলতার প্রকাশ। যদিও সেই মানুষটি কক্ষণো তার জন্য ছিল না, ভেবে অবাক হতে হয় কী করে একজন পুরুষ কুড়ি বছরের চেয়ে বেশি সময় ধরে তার মার হৃদয়কে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল! দিনের পর দিন, বছরের পর বছর সেই মানুষটির প্রতি তার অনুভুতিগুলো প্রকাশের জন্য আমার মা তার ডায়েরির অন্তর্গত লেখাগুলোকে সেই ব্যক্তির বিকল্প উপস্থিতি হিসাবে ব্যবহার করেছেন।

স্পষ্টত প্রতীয়মান কেন সে উপযুক্ত বিয়ের প্রস্তাবগুলো কোনোদিনও তার বিবেচনার মধ্যে আনেনি, এবং কেন সে বেকার কথাবর্তা কানে তুলত না, হোক না সেগুলো যথেষ্ট অর্থপূর্ণ কিংবা বিদ্বেষপূর্ণ। তার অন্তর ছিল পরিপূর্ণ, যার ভিতর অন্যকারো কিংবা অন্যকিছুর কোনো ঠাঁই পাওয়া ছিল একেবারেই অসম্ভব। “কোনো সরোবরকেই সমুদ্রের সঙ্গে যেমন তুলনা করা যায় না, তেমন অন্যকোনো মেঘমালার তুলনা করা যায় না উও পর্বতচূড়ার ওপর জমে থাকা ঘন মেঘস্তুপের।” যখন এই লাইনগুলো আমার মনে পড়ে তখন আমি কাতরচিত্তে ভাবি বাস্তবজীবনে হয়ত হাতে গোনা কয়েকজন এরকমভাবে ভালবাসতে পারে! কেউ আমাকে এরকমভাবে ভালবাসবে না, আমি নিশ্চিত!

তিরিশের শেষদিকে আমি এটা বুঝতে পারলাম যখন সেই ব্যক্তি শাংহাইতে দলের গুপ্তকাজে নিয়োজিত, এবং যখন দলের একজন বয়সী কর্মী সেই ভদ্রলোকের প্রাণ বাঁচাতে গিয়ে তার নিজের জীবন দিল। তার স্ত্রী আর এক কন্যাকে রেখে সে মৃত্যুবরণ করেছিল। অতঃপর একধরনের কর্তব্যবোধ, বলা যেতে পারে, মৃত সহকর্মীর প্রতি কৃতজ্ঞতাবোধ এবং শ্রেণীসচেতন অনুভব থেকে একই দলের সেই ভদ্রলোক নিঃসংকোচে মৃতলোকটির মেয়েকে বিয়ে করল। যারা বিয়ে করল ‘প্রেম’ খুঁজে পাবে বলে, যুগলের সেই প্রেম এত ক্রমাগত অশান্তির কারণ হয় কী করে! সে হয়ত সেইসময় এটাই ভেবেছিল।

“হাজার শোকর, আমি ভালোবাসার জন্য বিয়ে করিনি, আমাদের ভালই চলে যাচ্ছিল, একে অন্যকে কাজে-কর্মে সাহায্য-সহযোগীতা করে।”

বছরের পর বছর একজন পুরুষ এবং একজন স্ত্রী হিসেবে ওরা কঠিন সময়ের ভিতর দিয়ে গেছে। সম্ভবত সেই ভদ্রলোক আমার মায়ের সহকর্মী ছিল। তার সঙ্গে কী কখনো আমার দেখা হয়েছিল? মনে হয় না সে আমাদের বাড়ীতেও কোনদিন এসেছিল। তবে সে কে ছিল?

১৯৬২ সালের বসন্তে, আমার মা আমাকে একটা কনসার্টে নিয়ে গিয়েছিল। যেহেতু প্রেক্ষাগৃহটা আমাদের বাড়ির মোটামুটি কাছেই ছিল, আমরা হেঁটেই সেখানে গিয়েছিলাম ঐক্যতানবাদন শুনতে। একটা কালো বিলাসবহুল মোটরগাড়ি এসে নীরবে ফুটপাত ঘেঁষে দাঁড়াল। কালো রংয়ের পশমি আঁটোসাটো স্যূটপরা সাদাচুলের এক ভদ্রলোক গাড়ি থেকে বেরিয়ে এলেন। কী চমকলাগানো সাদাচুলের বাহার! প্রথম দর্শনেই যে ধারনাটা তার সম্পর্কে আমার মনে দাগ কাটল তা হল যে সে বিবেকবান, পার্থক্যকরণযোগ্য, অকৃত্রিমভাবে সৎ এবং কড়া-প্রকৃতির একজন মানুষ। আমার মনে হলো তার দুচোখের শীতল অথচ আকর্ষণীয় দৃষ্টির ঝলক যেন এক বিজলিচমক, কিংবা তার সেই চাহনি অসিচালননৈপুণ্যে সমুজ্জ্বল। কেবলমাত্র একজন নারীর অতিশয় আকুল প্রেম এবং যে নারী তার ভালবাসার যোগ্য, সে নারীই পারে এনে দিতে তার সেই শীতল দুচোখের চাহনিতে প্রয়োজনীয় এক কোমলতা।

হেঁটে সেই মানুষটি আমার মার কাছে এল এবং বলল, “তুমি কেমন আছ, কমরেড ঝন উ? অনেকদিন পর, তাই না!”
“তুমি কেমন আছ!” যে হাতটা দিয়ে আমার মা আমাকে ধরে ছিল হঠাৎ তা বরফের মত শীতল হয়ে একটু কেঁপে উঠল।

কেউ কারো দিকে না তাকিয়ে ওঁরা একজন আরেকজনের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিল, বাহ্যত প্রত্যেকেই বিচলিত যদিও অনমনীয়। রাস্তার পাশের গাছগুলোর উপর মা তার দৃষ্টি নিবদ্ধ করল, যদিও তখন পর্যন্ত তার চোখ গাছগুলোর পাতার উপর পড়েনি। সেই মানুষটি তখন আমার দিকে তাকাল। “কতবড় হয়ে গিয়েছে, মেয়েটা! ভাল, বেশ ভাল—দেখতে তো মায়ের মতোই।”

মায়ের সাথে করমর্দন করার পরিবর্তে, মানুষটি আমার সাথে হাত মেলাল। মায়ের হাতের মতনই ভদ্রলোকের হাতটা হিমশীতল এবং অল্পস্বল্প কাঁপছিল। বিদ্যুৎতরঙ্গ সঞ্চালন হলে যেরকম কম্পন অনুভুত হয়, হঠাৎ আমি সেরকম ধাক্কা অনুভব করলাম আমার শরীরে। এক ঝটকায় আমি আমার হাতটা তার হাত থেকে কেড়ে নিয়ে, চীৎকার করে উঠলাম, “এটা ভালো কোন কাজ না!”

“কেন নয়?” ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা যখন খোলাখুলিভাবে অনেককিছু বলে ফেলে, তখন বড়রা অবাক হয়। অপ্রত্যাশিতভাবে বিস্মিত লোকটা প্রশ্নটা করল।

এক পলকে আমি আমার মায়ের মুখটা দেখে নিলাম। হতাশ হলেও সত্যি যে আমি আমার মায়েরই মত। “কারণ সে দেখতে তেমন সুন্দর না!”

সে হাসল এবং একটু খোঁচা দিয়ে বলল, “এটা সত্যি খুব খারাপ যে একটা ছোট্ট মেয়ে ভাবছে না যে তার মা দেখতে সুন্দর। তোমার মনে আছে ’৫৩ সালে, তোমার মা যখন বেইজিং-এ বদলি হলো, তোমার মা তখন আমাদের মন্ত্রণালয়ে এসেছিলেন কাজে যোগদান করতে। সে তোমাকে কক্ষের বাইরের ব্যালকনিতে রেখে এসেছিল, কিন্তু তুমি বাঁদরের মতো সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠে এলে, দরজার ফুঁটো দিয়ে উঁকি দিলে এবং আমার অফিসের দরজার ফাঁকে তোমার আঙ্গুল আটকে গেল। অতপর আর কী! তুমি তারস্বরে চীৎকার করতে শুরু করলে এবং আমি তোমাকে কোলে তুলে নিয়ে তোমার মাকে খুঁজতে গেলাম।”

“এটা আমার মনে নেই।” কথাটা শুনে আমি বেশ রাগান্বিত বোধ করলাম এই কারণে যে সে এমন একটা সময়ের কথা বলছিল যখন কিনা আমার পিছন-খোলা প্যান্ট পড়ার বয়স।

“আঃ, আমাদের মতো বুড়োদেরই দেখছি স্মৃতিশক্তি বেশ প্রখর।” আকস্মিকভাবে লোকটা দৃষ্টি অন্যদিকে ফিরিয়ে নিল এবং আমার মাকে লেখালেখির বিষয়ে মন্তব্য করল, “আমি তোমার সর্বশেষ লিখিত গল্পটি পড়েছি। অকপটে বলছি, গল্পটাতে বেশকিছু জিনিস আছে যা আমার মনে হয় সঠিকভাবে বলা হয়নি। তোমার উচিত হয়নি গল্পের নায়িকাকে এইভাবে দোষ দেয়া... কারো প্রেমে পড়া দোষের কিছু না যতক্ষণ না পর্যন্ত তুমি অন্যের জীবন নষ্ট না করো... আসলে, গল্পের নায়ক গল্পের নায়িকাকে ভালবাসতেও পারত। কেবলমাত্র তৃতীয় একজন ব্যক্তির সুখের জন্য, ওদের প্রেমকে ওরা পরিত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিল ...।” একজন পুলিশ এল যেখানে গাড়িচালক গাড়ি পার্ক করে রেখেছিল এবং গাড়িচালককে বলল ওখান থেকে সরে যেতে। যখন গাড়িচালক কৈফিয়ত দিতে চেষ্টা করছিল, বয়সী ভদ্রলোক চতুর্দিকে তাকাল। তাড়াতাড়ি ‘গুডবাই’ বলে সে গাড়িতে গিয়ে উঠল এবং পুলিশ কর্মকর্তাকে বলল, “দু:খিত, এটা ড্রাইভারের দোষ না, আমার দোষ ... ”

বেশ বয়সের একজন কাডারকে পুলিশের কঠোর নিয়ামানুর্তিতার প্রতি ভদ্রজনোচিত আচরণ করতে দেখে আমি বেশ মজা পেলাম। ঠোঁটে দুষ্টুমিপূর্ণ হাসি মেখে আমি যখন আমার মায়ের দিকে তাকালাম, মনে হলো সে যেন প্রাথমিক পর্যায়ে পড়ুয়া একজন স্কুলছাত্রী যে তার স্কুলের কঠোর আনুগত্যপ্রতাশী প্রধান শিক্ষিকার সামনে বিব্রতকর অবস্থায় একাকী দাঁড়িয়ে রয়েছে। যে কেউ হয়তো তখন ভাবতে পারত যে আমার মা-ই সেই ব্যক্তি, যাকে শিক্ষা দেয়ার জন্য পুলিশ কর্মকর্তা বক্তৃতা দিচ্ছিল।

গাড়িটা একরাশ ধোঁয়া উড়িয়ে চলে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যে সেই ধোঁয়া বাতাসে মিলিয়ে গেল যেন কোনোকিছুই এখানে ঘটেনি। কিন্তু এই ঘটনাটা আমার মনে গেঁথে রইল।

এখন বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় যে এই সেই পুরুষ যার চারিত্রিক দৃঢ়তা আমার মায়ের হৃদয় জয় করেছিল। আসলে তার সেই তেজী মনোভাবের মূল ভিত্তি ছিল তার রাজনৈতিক বিশ্বাস, বিপ্লবকালে অল্পের জন্য মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পাওয়া, শানিত বুদ্ধিমত্তা, কাজকর্মের প্রতি প্রচণ্ড আগ্রহ ও নিষ্ঠা এবং পরিমার্জিত এক মানসিকতা। তাছাড়া, অবাক করার বিষয় এই যে ওঁরা—আমার মা এবং সেই ভদ্রলোক—দুজনেই ‘ওউবোউ’ (বাদ্যযন্ত্রবিশেষ) বেশ পছন্দ করত। হ্যাঁ, আমি সুনিশ্চিতভাবে বলতে পারি যে সেই মানুষটির প্রতি আমার মায়ের ছিল সশ্রদ্ধ অনুরাগ। একবার মা আমাকে বলেছিল যে যদি কোনো পুরুষকে সে শ্রদ্ধাভক্তি না করতে পারে, তাহলে একদিনের জন্য হলেও সেই লোকটিকে তার পক্ষে ভালবাসা অসম্ভব।

কিন্তু আমি বলতে পারিনি যে সেই লোকটি আমার মাকে ভালবেসেছিল কিনা। যদি না-ই ভালবেসে থাকে, তাহলে আমার মায়ের ডায়েরিতে কেন এই ব্যাপারটি অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল?
“এটা সত্যি খুউব সুন্দর একটা উপহার। কিন্তু তুমি কী করে জানলে যে চেখভ আমার খুব প্রিয় একজন লেখক?”
“তুমিই বলেছিলে।”
“আমি মনে করতে পারছি না।”
“আমি বেশ মনে করতে পারছি। যখন তুমি অন্য একজনের সঙ্গে কথা বলছিলে, তখন আমি সেটা শুনে ফেলেছিলাম।”

এখন এটা বেশ স্পষ্ট যে এই লোকটিই আমার মাকে চেখভের নির্বাচিত গল্পের বইটি দিয়েছেন। মায়ের জন্য এই গল্পগ্রন্থটি প্রেমপত্রের সমতুল্য।

যখন তার চুলে পাক ধরেছিল, সম্ভবত তখন এই লোকটি, যে কিনা প্রেমে কোন বিশ্বাস করত না, বুঝতে পেরেছিল যে তার হৃদয়ে এমনকিছু লুকিয়ে আছে যাকে ভালবাসা বলা যেতে পারে। ইতমধ্যে, যখন সে বুঝতে পারল যে তার আর ভালবাসার অধিকার নেই, তখনই দুঃখজনকভাবে সে তার এই ভালবাসাকে আবিষ্কার করল যার জন্য হয়ত সে জীবনও দিতে পারত। কিংবা ব্যাপারটি কি এর চেয়েও আরো গভীরে প্রথিত?

সেই লোকটির ব্যপারে আমি এই এতটুকুই মনে করতে পারছি। সেই লোকটি, যার প্রতি আমার মা ছিল অনুরক্ত, তাকে জীবনে না পেয়ে আমরা মা যে কতটা মানসিকভাবে বিধস্ত ছিল, সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। লোকটির গাড়িটাকে এক নজর দেখার জন্য কিংবা গাড়িটার পিছনের কাঁচের জানালার ভিতর দিয়ে লোকটির মাথার পিছনের অংশ দেখে, মা চিন্তা করে বের করল কোন পথ দিয়ে লোকটা তার কাজে যায় এবং ফিরে আসে। লোকটা যখন বক্তৃতা করত, মা হলঘরের পিছনের দিকটায় বসে দেখত যে লোকটার মুখটা স্বল্প আলোয় এবং সিগারেটের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে আছে। তখন মায়ের চোখদুটো জলে ভরে যেত, কিন্তু সেই চোখের জল নিজেই সে আবার গিলে খেত। কাশতে কাশতে এক পর্যায়ে লোকটি যখন তার বক্তৃতায় কিছুক্ষণ বিরতি দিত, আমার মা তীব্রভাবে বিস্মিত হয়ে ভাবত কেন কেউ একজন তাকে ধুমপান ছেড়ে দিতে রাজি করাতে পারছে না। মা ভয় পেত এই ভেবে যে লোকটি আবার ব্রংকাইটিসে আক্রান্ত হতে পারে। কেন সেই লোকটি এত কাছের হয়েও এত দূরে?

প্রতিদিন লোকটা, মাকে এক নজর দেখার জন্য, গাড়ির জানালার বাইরে তাকাতো, কিন্তু সর্বাধিক প্রচেষ্টা চালানো সত্বেও তার দৃষ্টি আচ্ছন্ন করে থাকত চলমান সাইকেলের বহর এবং সে ভয় পেত এটা ভেবে যে মা কোনো দুর্ঘটনার কবলে পড়ল কিনা। কালেভদ্রে কোনো সন্ধ্যায়, যেদিন তার কোনো সভা-সমাবেশ থাকতো না, সে ঘুরপথে আমাদের নিকটবর্তী পরিবেষ্টিত এলাকার গেটের সামনে দিয়ে হেঁটে যেত। যতই তার ব্যস্ততা থাকুক না কেন, সে নিয়মিত সময় করে পত্রিকা এবং সাময়িকীর পাতা ওল্টাতো মায়ের লেখা পড়ার জন্য। সবচেয়ে কঠিন সময়েও, কর্তব্য সম্পর্কে সে তার নিজের কাছে অত্যন্ত পরিস্কার ছিল। কিন্তু এখন এই ভালবাসার মুখোমুখি হওয়াতে, সে অনেকটা দুর্বল ও অসহায় হয়ে পড়েছে। যদিওবা তার এই বয়সে ব্যাপারটা বেশ হাস্যকর। জীবন কেন তাকে নিয়ে এই তামাশা করছে?

এতদসত্বেও, কর্মক্ষেত্রে যখন দেখা হতো, ওঁরা একজন আরেকজনকে এড়িয়ে যেতে চেষ্টা করত এবং মাথা নাড়িয়ে অভিবাদন জানিয়ে তাড়াতাড়ি চলে যেত। তবুও, অতি তুচ্ছ এই ঘটনা আমার মাকে পারিপার্শিক পরিবেশ থেকে নিজেকে উদাসীন রাখতে সাহায্য করত। এই পরিস্থিতিতে যদি মায়ের সাথে সহকর্মী ওয়াং-এর সাথে দেখা হয়ে যেত, আমার মা তাকে গুও বলতে ডাকত এবং বিড়বিড় করে অস্পষ্ট কিছু একটা বলতো।

এটা ছিল আমার মায়ের জন্য তার সহ্যক্ষমতার নির্দয় এক পরীক্ষা। আমার মা লিখেছিল :
“আমরা একজন আরেকজনকে ভুলে যেতে রাজি হয়েছিলাম। কিন্তু আমি তোমাকে ধোঁকা দিয়েছি। আমি কক্ষণো ভুলিনি, আমি মনে করি না তুমিও ভুলে গেছ। আসলে আমরা একজন আরেকজনকে ধোঁকা দিয়েই চলেছি, আমাদের দুঃখ-কষ্ট বুকের ভিতর চেপে রেখে। আমি ইচ্ছা করে তোমার সাথে প্রতারণা করিনি, যদিও আমার দিক থেকে আমি আমার সর্ব্বোচ চেষ্টা করেছি আমাদের মাঝে যে বোঝাপড়া হয়েছিল তা চালিয়ে নিতে। প্রায়ই আমি থাকার জন্য বেইজিং থেকে দূরে চলে গেছি এই আশায় যে সময় এবং দূরত্ব তোমাকে ভুলে যেতে আমাকে সাহায্য করবে। কিন্তু যখনই আমি ফিরে আসতাম, ট্রেনটা যে মাত্র ষ্টেশনে এসে দাঁড়াত, আমি বিচলিত হয়ে পড়তাম। রেলস্টেশনের প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে আমি চতুর্দিকে একাগ্রচিত্তে তাকাতাম যেন কেউ আমার জন্য অপেক্ষা করছে। আমি সুনিশ্চিত কেউ ওখানে নেই। তখন আমি আরো বুঝতে পারি যে আমি আসলে কিছুই ভুলি নাই। সবকিছুই অপরিবর্তিত। আমার ভালবাসা অনেকটা গাছের মতো, বছরের পর বছর যেমন গাছের শিকড় মাটির গভীরে চলে যায়—এটাকে উপড়ে ফেলার আর কোনো পথ নেই।’

হ্যাঁ, যাত্রাশেষে মার সাথে দেখা করার জন্য সে আমাকে কক্ষণো স্টেশনে যেতে দেয় নাই। মা অধিকতর পছন্দ করত প্লাটফর্মে একা দাঁড়িয়ে থাকতে এবং ভাবতে যে সেই ভদ্রলোক হয়ত তার সঙ্গে দেখা করতে এসেছে স্টেশনে। গো-বেচারা আমার মা! যদিও মায়ের চুলে পাক ধরেছে, তবুও সে সেই লোকের প্রতি মোহগ্রস্থ থাকতো অল্পবয়সী মেয়ের মতো...

একজন আরেকজনের প্রতি অনুরক্ত বিবাহিত স্বামী-স্ত্রীর মত, ওরাঁ মানসিকভাবে দিবারাত্র একত্ববোধ অনুভব করতো। সত্যি বলতে কী, ওঁরা একত্রে সর্বমোট চব্বিশ ঘণ্ঠার বেশি সময় কাটায় নাই। তদুপরি, এই সময়টুকুর মধ্যে ওঁরা যতটা গভীর সুখানুভূতির অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতে পেরেছিল, সারাজীবনভর চেষ্টা চালিয়েও অনেকেই তা পারে না। শেক্সপিয়র জুলিয়েটকে দিয়ে বলিয়েছিল, “আমার ধন-দৌলতের অর্ধেকও আমি সাকল্য করতে পারব না।” সম্ভবত আমার মায়ের অনুভুতি ছিল অনেকটা সেইরকম।

সুনিশ্চিতভাবে বলা যায় যে সংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় সেই ভদ্রলোককে মেরে ফেলা হয়েছিল। হয়তো সেই সময়ের প্রয়োজনীয় পরিস্থিতির কারণে, ডায়েরির এই অংশটুকু দ্ব্যর্থক এবং অষ্পষ্ট ....। অশ্রু-বিবর্ণ মায়ের ডায়েরির কিছু পাতা থেকে এটা পরিস্কার বোঝা যায় যে সেই লোকটাকে খুব খারাপভাবে ফাঁসিয়ে দেয়া হয়েছিল; কিন্তু দৃঢ়চিত্ত বয়সী লোকটা কতৃপক্ষের কাছে কক্ষণো মাথানিচু করেনি। তার শেষকথাগুলো ছিল : “যতক্ষণ না কার্ল মার্কেসের সঙ্গে আমার দেখা হয়, ততক্ষণ আমি আমার পরিস্থিতির ব্যাপারে লড়াই চালিয়ে যাব।”

১৯৬৯-এর শীতকাল তখন; সেইসময় ঘটনাটা ঘটেছিল। আমার মনে আছে কেন না সেইসময় রাতারাতি আমার মায়ের মাথার চুল সাদা হতে শুরু করল, যদিও মা তখনও পঞ্চাশ পার হয়নি, এবং মা তখন কালো রঙের বাহুবন্ধনী পড়ে থাকত। মা তখন বেশ কঠিন সময়ের ভিতর দিয়ে যাচ্ছিল। শোকপ্রকাশের জন্য এই পুরানো-ভঙ্গির বাহুবন্ধনী পরার জন্য মাকে তখন বেশ সমালোচনার মুখে পরতে হয়েছিল, এবং মাকে বলতে বাধ্য করা হয়েছিল কার জন্য সে ওইভাবে শোক প্রকাশ করছে।

“মা, কার জন্য তুমি এই বাহুবন্ধনী পরছো?” আমি উদ্বিগ্ন হয়ে প্রশ্ন করেছিলাম।
“আমার প্রেমিকের জন্য।” আমি যেন চিন্তিত হয়ে না পড়ি, মা ব্যাখ্যা করে বলেছিল, “তারই জন্য যাকে তুমি কখনো জানো না।”

মায়ের চোখগুলো এতটাই শুকনো ছিল যেন তার চোখে আর কোনো অশ্রু অবশিষ্ট নেই। আমার সবসময় ইচ্ছা করতো মাকে কিছুটা শান্তি দিতে কিংবা তার সুখের জন্য কিছু একটা করতে। কিন্তু মা বলেছিল, “যাও, তুমি এখন এখান থেকে সরে যাও।”

অব্যক্ত এক ভয় আমাকে গ্রাস করতে লাগল, যেন আমার মা আমাকে ইতোমধ্যে অর্ধেক ছেড়ে চলে গিয়েছে। হঠাৎ কোনো গুপ্ত বিষয় বলে ফেলার মতো আমি বলে উঠলাম, “মা!”
কেন আমার নিঃসঙ্গতার ভয়, মা খুব তাড়াতাড়ি ধরে ফেলে নরম কণ্ঠে বলল, “ভয় পেও না। তুমি এখন যাও। আমাকে কিছুক্ষণ একা থাকতে দাও।”

আমার ধারণা সঠিক বলেই মনে হলো। মা লিখলো : 
“তুমি চলে গিয়েছো। আমার অর্ধেক আত্মা তোমার চলে যাওয়ার সাথে সাথে তোমারি সঙ্গে উড়াল দিয়েছে। কী তোমার অবস্থা, সেটা জানার কোনো উপায় আমার ছিলনা। শেষবারের মতো যে তোমাকে দেখব সেটার সম্ভাবনা ছিল না বললেই চলে। না স্ত্রী না বন্ধু হিসেবে কাউকে জিজ্ঞেস করে যে তোমার সম্পর্কে জানবো সেই অধিকারও আমার ছিল না ... এভাবেই আমাদের বাঁধন ছিঁড়ে গেল। তোমার প্রতি যে নির্দয় ব্যবহার করা হয়েছে তার সিকিভাগও যদি আমি ভাগ করে নিতে পারতাম তাহলে তুমি হয়ত বেঁচে থাকতে পারতে! তোমার নাম অপরাধীর খাতা থেকে কেটে ফেলে পুনর্বার কর্মক্ষেত্রে ফিরে, এবং যারা তোমাকে ভালবাসে তাদের জন্য হলেও, তোমার বেঁচে থাকার প্রয়োজন ছিল। আমি জানি তুমি প্রতি-বিপ্লবী হতে পারো না। আমি সুনিশ্চিতভাবে বলতে পারি, যে কজন খুব ভালোমানুষদের মারা হয়েছিল, তুমি তাদের মধ্যে একজন। সেই কারণেই আমি তোমাকে ভালবাসি—এটা প্রকাশ্যে বলতে এখন আমার কোনো দ্বিধা নেই।

সেই পিচঢালা ছোট্ট রাস্তা ধরে, যেখানে আমরা একবার একত্রে হেঁটেছিলাম, আমি একাকী সেই পথে অনেক হেঁটেছি; নিস্তব্ধ রাত্রিতে আমার কানে ভেসে এসেছে কেবল আমার চলার পদধ্বনি... ঐ নির্দিষ্ট জাযগাটায় সবসময় আমি এদিক-ওদিক পায়চারি করতাম, কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম, কিন্তু কক্ষনো এতটা খারাপ বোধ করতাম না যা এখন করি। যদিও তখনও তুমি আমার পাশে থাকতে না, তবুও আমি জানতাম যে তুমি এই পৃথীবিতে আছ, এবং আমি অনুভব করতাম যে তুমি আমার সঙ্গ দিচ্ছ। এখনও আমি বিশ্বাস করে উঠতে পারি না যে তুমি চলে গেছ।

পথের শেষ মাথায় পৌঁছে, প্রতি পদক্ষেপ মনে করে আমি আবার সেই রাস্তার গোড়ায় ফিরে যেতাম, তারপর আবার সেই পথে হাঁটা।

সুরক্ষা-বেড়া ঘুরে সবসময় আমি ফিরে তাকাতাম যেন তুমি সেখানে তখনও দাঁড়িয়ে আছ আমাকে হাত নেড়ে বিদায়-সম্ভাষন জানানোর জন্য। আমাদের শাশ্বত প্রেম লুকাতে, আমরা মলিনভাবে হাসতাম যেন আমরা আকস্মিকভাবে একজন আরেকজনের সাথে পরিচিত।

সেইরকম এক গড়পড়তা প্রারম্ভিক বসন্তের সন্ধ্যায়, নীরবে হেঁটে আমরা যখন একজন আরেকজন থেকে সরে যাচ্ছিলাম তখন বেশ ঠান্ডা বাতাস বইছিল। তোমার দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসকষ্টের অসুখের জন্য তুমি তখন শনশন শব্দসহকারে শ্বাসগ্রহণ ও শ্বাসত্যাগ করছিলে, এবং সেকারণেই মানসিকভাবে আমি একধরনের অস্থিরতায় ভুগছিলাম। আমি প্রানমন দিয়ে চাইতাম যে তুমি ধীরে চল, কিন্তু কোনোভাবেই আমি তা বলতে পারিনি। আমরা দুজনেই বেশ দ্রুত হাঁটতাম, যেন খুবই জরুরি কাজ আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। যাই হোক, যদিও দুজন একত্রে একবারই পায়চারি করতাম, তবুও আমরা আমাদের এই পদচারণাকে যথেষ্ট মূল্য দিতাম, কিন্তু এটা ভেবে শঙ্কিত থাকতাম যে কোনো একসময় আমরা হয়তো আমাদের অনুভূতিগুলোকে আর দমন করতে না পেরে হঠাৎই আমাদের মুখ ফসকে বেরিয়ে যেতে পারে তিন শব্দের সেই বাক্য—“আমি তোমাকে ভালবাসি”—যা কিনা বছরের পর বছর আমাদের নিদারুন যন্ত্রনা দিয়ে আসছে।

সম্ভবত কেউ হয়তো বিশ্বাস করতে চাইবে না যে আমরা একবারের জন্য হলেও একজন আরেকজনের হাত পর্যন্ত ধরিনি। 

না, মা, আমি বিশ্বাস করি। আমিই একমাত্র সেই ব্যক্তি যে কিনা তোমার হৃদয়ের মনিকোঠায় আবদ্ধ সবকিছু দেখতে পারি।

সেই ভদ্রলোক যতদিন বেঁচে ছিলেন, তার জন্য আমার মা ডায়েরিতে তার ব্যাকুল হৃদয়ের কথাগুলো লিপিবদ্ধ করেছে। যেদিন আমার মায়ের আঙ্গুলের ফাঁক থেকে ফসকে তার লেখার কলম মাটিতে পরে যায়, সেদিন পর্যন্ত মা তার লেখালেখি চালিয়ে যায়। মায়ের শেষ বার্তা ছিল :

যদিও আমি বস্তুবাদী, তদুপরি আমার আশা স্বর্গ বলে কিছু যদি থেকে থাকে, তাহলে আমি বিশ্বাস করি, আমি তোমাকে দেখবো যে তুমি সেখানে আমার জন্য অপেক্ষা করছ। আমি তোমার সঙ্গে মিলিত হতে সেখানে যাচ্ছি যেন দুজন একত্রে অনন্তকালের যাত্রায় সামিল হতে পারি। তখন আর কোনোদিন একজন আরেকজনকে ছেড়ে যাবার কিংবা অন্যকারো জীবন নষ্ট হয়ে যাবার ভয়ে আমাদের একজন আরেকজন থেকে দুরত্ব বজায় রেখে চলার প্রয়োজন পরবে না। প্রিয়তম, আমার জন্য অপেক্ষা করো, আমি আসছি —

আমি বুঝতে পারি না কী করে আমার মা, মৃত্যুশয্যায় থাকাকালীন অবস্থায়ও, হৃদয়ের সমস্ত আকুলতা দিয়ে একজনকে এরকমভাবে ভালবাসতে পেরেছিল। এটা আমার কাছে প্রেম বলে মনে হয় না, বরঞ্চ মনে হয় এটা পাগলামি যা কিনা মৃত্যুর চেয়েও শক্তিশালী এক প্রবল অনুরাগ থেকে উৎসারিত। সত্যি যদি মৃত্যুহীন ভালবাসার কোনো অস্তিত্ব থেকে থাকে, তাহলে আমার মায়ের প্রেম এক চরমসীমা ছুঁতে পেরেছে। স্পষ্টত প্রতীয়মান যে আমার মা তৃপ্তির সাথেই মৃত্যুবরণ করেছে, কারণ সে সত্যিকার ভালবাসা কী তা উপলব্ধি করেছিল। এ ব্যপারে তার কোনোই পরিতাপ ছিল না।

এই বুড়ো মানুষগুলোর দেহাবশেষ ছাই হয়ে বিভিন্ন প্রাকৃতিক উপাদানের সঙ্গে মিশে গেছে। কিন্তু আমি জানি, যে কোনো আকার ধারন করুক না কেন, ওঁরা এখনও একজন আরেকজনকে ভালবাসে। যদিও পার্থিব কোনো আইন কিংবা নশ্বরতা দিয়ে ওঁদের ভালবাসার সীমারেখা নির্দেশিত হয় না, যদিও ওঁরা, একবারের জন্য হলেও, একজন আরেকজনের হাত কখনো ধরতে পারেনি, তবুও ওঁদের অব্যক্ত ভালবাসা একজন অন্যজনকে পুরোপুরি আবিষ্ট করে রেখেছিল। কোনো কিছুই ওঁদের একজন থেকে আরেকজনকে আলাদা করতে পারবে না। শতাব্দী পরেও, যদি একটুকরো সাদা মেঘ আরেক টুকরো মেঘের পিছন পিছন চলে, যদি পাশাপাশি দুটো ঘাস জন্মায়, যদি একটা ঢেউ আরেকটা ঢেউকে এসে ছিটকে দেয়, যদি অবিরাম মৃদুমন্দ বাতাস আসা-যাওয়া করে... বিশ্বাস কর, এটা হবে কেবলই ওঁদের জন্য, আর কোনোকিছুর জন্য নয়। প্রতিবারই যখন আমি “লাভ মাস্ট নট বি ফরগটেন” ডায়েরিটার পাতা ওল্টাই, আমি অশ্রু সংবরণ করতে পারি না। প্রায়শ আমি কষ্টকরভাবে কাঁদি যেন আমি নিজেই তাদের এই অভিশাপগ্রস্ত ভালবাসার অভিজ্ঞতার ভিতর দিয়ে গেছি। যদি এটা বাস্তব জীবনের শোকাবহ ঘটনা না হয়, তাহলে এটা খুবই হাস্যকর ব্যাপার। হোক না ঘটনাটা আমার কাছে চমৎকার কিংবা তোলপাড়-করা, তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করার কোনো ইচ্ছা আমার নেই!

থমাস হার্ডি লিখেছেন : “ডাকলেই আগমনকারী কদাচিৎ হাজির হয়, ভালবাসার সঠিক সময়ে ভালবাসার মানুষের দেখা পাওয়া সত্যি বিরল।” ঐতিহ্যগত নৈতিক মানদণ্ডের বিচারে আমি ওঁদেরকে সমালোচনা করতে পারি না। যেটার জন্য আমি অনুশোচনা প্রকাশ করি তা হলো ওঁরা একজন “কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তির” জন্য অপেক্ষা করেনি যে কিনা ওঁদের ডেকে বলতে পারতো কী তাদের করা উচিত।

তাড়াহুড়া করে বিয়ে করার পরিবর্তে আমরা প্রত্যেকে যদি অপেক্ষা করতে পারতাম, তাহলে কত যে ট্র্যাজেডী এড়ানো যেতো!

চলুন, আমরা সবাই ধৈর্যসহকারে আমাদের মনের সঙ্গে যাদের মিল রয়েছে হুবহু সেরকম ব্যক্তিদের জন্য অপেক্ষা করি। যদিও সেই অপেক্ষা বিফলে যেতে পারে, তবুও তা অনিচ্ছুক বিয়ের চেয়ে অনেক ভালো। জীবনে একা থাকাটা খুব যে ভীতিকর বিপর্যয় তা কিন্তু না। আমি বিশ্বাস করি এটা হতে পারে এমন এক ইঙ্গিত যা কিনা সাংস্কৃতিক, শিক্ষা এবং বৈশিষ্টপূর্ণ জীবনযাপনে এগিয়ে চলার জন্য এক বলিষ্ঠ পদক্ষেপ।

**********

লেখক ও অনুবাদকের পরিচিতি : চীনের প্রখ্যাত নারী ঔপন্যাসিক ঝান জি ১৯৩৭ সালে বেজিংয়ে জন্মগ্রহন করেন। চীনের নারীবাদি সাহিত্যে তিনি যথেষ্ট অবদান রেখেছেন। মূলত উপন্যাসিক হলেও, তিনি অনেক ছোটগল্প রচনা করেছেন। তার লেখালেখির কেন্দ্রে ছিল `প্রেম' ও `মানুষ।' ঝান জি পুরোনো ও প্রথাগত চিন্তাধারা ভেঙে বেরিয়ে আসতে সর্বদা সচেষ্ট ছিলেন। ‘লাভ মাস্ট নট বি ফরগটেন’ গল্পে তার প্রগতিশীল ধ্যান-ধারনার প্রতিফলন ঘটে। এই গল্পে তিনি আধুনিক চৈনিক সমাজে বিয়ে-বিষয়ক প্রতিষ্ঠিত চিন্তা-ভাবনার প্রতি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছেন। জার্মান ও ইংরেজি ভাষায় অনুদিত ‘Leaden Wings’ উপন্যাসের জন্য তিনি ১৯৮৫ সালে Mao Dun Literature Prize পান। ঝান জি’র magnum opus ‘Without Words’ হলো আত্ম-জৈবনিক এক এপিক, যা তিনি করুন বিশ শতকের চীনকে বিস্তৃতভাবে বর্ননা করেছেন। এই দীর্ঘ উপন্যাসটির জন্যও তিনি আবারও Mao Dun Literature Prize ২০০৫ সালে।

অপরদিকে, হারুনুজজামান মূলত অনুবাদক (বাংলা থেকে ইংরেজি) হলেও ইংরেজি ও বাংলা উপন্যাস লিখেছেন এবং লিখছেন। লিখেছেন প্রবন্ধ, ইংরেজি ও বাংলা কবিতা। সদ্য অবসরে যাওয়া এই ইংরেজির অধ্যাপক বাংলাদেশের আদিবাসীদের বিলীনপ্রায় ভাষা, সাহিত্য এবং নৃতাত্বিক পরিচয় নিয়ে প্রচুর গবেষণা প্রবন্ধ রচনা করেছেন। হারুনুজজামানের Bangla Baul Series এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামভিত্তিক গল্পের ইংরেজি অনুবাদ সংকলন The Chronicles of 1971 বেশ পাঠকপ্রিয়তা লাভ করে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ