ঘটনাটি ঘটেছিল পিরানহাস শহরের এক জমজমাট বাজারের দিনে। পিরানহাস ব্রাজিলের আলাগোয়াস রাজ্যের সাও ফ্রান্সিসকো নদীর তীরের একটি শহর। শত শত মানুষ সেই অলৌকিক ঘটনার সাক্ষী হয়েছিল। তাদের মধ্যে ছিলেন ধনী কর্নেল হার্দে রামালহো। তিনি ব্যাকল্যান্ডসের ডাকাত লাম্পিয়াওর বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন। রামালহো থেকে শুরু করে সাধারণ কৃষক পর্যন্ত সাক্ষী ছিল। এই কৃষকরা সেদিন শহরে এসেছিল ম্যানিওক আটা আর তাজা তোলা ভুট্টা বেচতে। সেদিন পিরানহাসে একজন বিশিষ্ট অতিথিকে সংবর্ধনা দেওয়া হচ্ছিল। তিনি আমাদের মহান আঞ্চলিক ঔপন্যাসিক গ্রাসিলিয়ানো রামোসের বিধবা স্ত্রী। তিনিও সেই ঘটনা দেখেছিলেন। দোনা এলোইজা রামোস সত্যবাদী মানুষ হিসেবে সুপরিচিত। তাই তাঁর একার সাক্ষ্যই আমার গল্পের সত্যতা প্রমাণ করার জন্য যথেষ্ট।
এই ঘটনার নায়ক ছিল উবালদো কাপাদোসিও। সে প্রেমিক, গীতিকবি ও জনপ্রিয় কাব্যনাট্যের রচয়িতা—এই তিনটি বিষয়ে তার দক্ষতার জন্য দূরদূরান্তে পরিচিত ছিল। তার লেখা কাব্যনাট্যগুলো বাজারে বিক্রির জন্য লিফলেটে ছাপিয়ে দড়িতে ঝুলিয়ে রাখা হত।
আর এই ঘটনার প্রতিপক্ষ ছিল ক্যাপ্টেন লিন্দোলফো এজেকিয়েল। লিন্দোলফো আলাগোয়াস রাজ্যে থাকত। সেখানে পুরুষরা নিঃসন্দেহে পুরুষই ছিল। লিন্দোলফোর বর্বর সাহস আর নিষ্ঠুরতার কথা সবাই জানত। সে ঠিক কোন ধরনের ক্যাপ্টেন ছিল তা স্পষ্ট নয়, তবে সবাই জানত সে মানুষ খুন করে তার পদ অর্জন করেছে। দুটো কাজে সে বিখ্যাত ছিল—একটি হল ভাড়াটে খুনি হিসেবে কাজ করা। এ কাজটি তাকে ভালো অর্থ এবং সম্মান দিত। আর অন্যটি হল সাবোর স্বামীর পদ। এই পদটির জন্য দরকার ছিল অসাধারণ সামর্থ্য, শক্তি, এবং পুরুষ জনগোষ্ঠীকে সর্বক্ষণ হুমকি দেওয়ার ক্ষমতা। কারণ সাবো, সত্যি বলতে, তার স্বামীর সামরিক পদমর্যাদা বা তার কুৎসিত ভ্রুকুটি বা কোমরে ঝোলানো মারণাস্ত্র—কোনোটাকেই পরোয়া করত না। সাবো সব পুরুষের সামনে নিজেকে প্রদর্শন করে বেড়াত। সে প্রতিটি পুরুষের স্বপ্নে হাজির হত—চৌদ্দ বছরের নিচের ছেলেদের স্বপ্নেও আসত—সে অবিবাহিত হোক, বিবাহিত হোক, বাগদত্তা হোক বা অন্য কারো সাথে থাকুক। কিন্তু ক্যাপ্টেনের খুনে পৌরুষের অহংকারকে জাগিয়ে তোলার ঝুঁকি নেওয়ার সাহস একমাত্র সাবোর নিজেরই ছিল। বাকি সব পুরুষ—যারা সাবোর জন্য পাগল ছিল—দাঁত কিড়মিড় করত, লেজ গুটিয়ে নিত, আর সাবোর দিক থেকে চোখ সরিয়ে নিত।
এক মাত্র উবালদো কাপাদোসিও ছাড়া।
উবালদো বেপরোয়া ছিল না বা সিংহের মতো সাহসীও ছিল না—সে শুধু স্থানীয় রীতিনীতি সম্পর্কে অজ্ঞ ছিল। সে ছিল নিছক একজন পথচারী, পাঠক খুঁজতে আর কোলাহলমুখর বাজারে তার লেখা কাব্যনাটক বেচতে এসেছিল। তার সর্বশেষ রচনা "যে সমাজকুলীন মহিলা একটি ওয়্যারউলফের প্রেমে পড়েছিল তার গল্প" তখন ভালোই বিকোচ্ছিল, এবং তার লেখার গুণেই এই সাফল্য তার এসেছে। এছাড়া সে কনসার্টিনা নামের বাদ্যযন্ত্রটি বাজানো আর মুহূর্তের মধ্যে পদ্য রচনার সুযোগ খুঁজছিল। আর খুঁজছিল একটি আরামদায়ক বিছানা যেখানে সে তার পরিশ্রমের পর বিশ্রাম নিতে পারে এবং কোনো সুন্দরী শ্যামলী মেয়ের কাছাকাছি থাকতে পারে। উদ্দেশ্য যাই হোক, সত্যি ঘটনা হল সে সেই ভয়ঙ্কর লোকটার মুখোমুখি হয়েছিল—আর তা-ও একটা মেয়েলি ছোট্ট নাইটগাউন পরে। ঠিক বলতে গেলে সাবোর গোলাপি বেবি-ডল পায়জামার উপরের অংশটি পরে।
গীতিকবি উবালদো কাপাদোসিও মেয়েদের হৃদয় ভাঙার ক্ষমতা রাখত, আর তাকে দেখতেও ছিল সুন্দর। লম্বা, রোগা, চটপটে, এলোমেলো চুল, সহজ হাসি। যেকোনো আড্ডায় সে ছিল দারুণ কথক—রসিকতা আর জ্ঞান মিশিয়ে কথা বলতে পারত। যেখানেই সে যেত সঙ্গে সঙ্গে একটা জমজমাট আড্ডার আসর তৈরি হয়ে যেত।
বাহিয়া আর সার্জিপের বিশাল প্রত্যন্ত অঞ্চলে সে কাজ করত। এই অঞ্চলটিকে সে ভালোবাসত, কষ্টও করত। এখানকার লোকজন সবাই উবালদোকে ভালোবাসত এবং তার প্রতিভার কদর করত। নামকরণ, বিবাহ অনুষ্ঠানে তার ডাক পড়ত। আর কোনো লোক গেলে তার পাশে জাগরণের যে ধর্মীয় প্রথার চল ছিল সেখানেও সবসময় আমন্ত্রণ পেতো। বর-কনেকে অভিনন্দন জানাতে বা জাগরণে মৃতের পাশে বসে এমন গল্প বলতে তার কোনো তুলনা ছিল না যা মৃত মানুষকেও হাসাতে বা কাঁদাতে পারত। এটা মুখের কথা নয়—সত্যিই হয়েছে, এবং আমি চাইলে বেশ কজন জীবন্ত সাক্ষী হাজির করতে পারব। এখানে শুধু দুজনের কথা বলি—শিল্পী কালাসান্স নেতো আর সার্জিপের ট্রুবাদুর ফ্লোরিসভালদো মাতোস। তারা দুজনেই দেখেছিল মৃত আরিস্তোবুলো নেগ্রিতুদে তার কফিনে মরে পড়ে থেকেও হো হো করে হেসে উঠেছিল যখন উবালদো কাপাদোসিও মারাগোগিপে একটি তিমি মাছ ডাঙায় উঠে আসার গল্পটা বলেছিল। আমার বন্ধু চিত্রকর কার্বেকে সাক্ষী দিতে বলব না, কারণ সে মিথ্যেবাদী বলে সবাই জানে। তার মতে নেগ্রিতুদে শুধু হাসেইনি, গল্পে একটা অশ্লীল মোড়ও যোগ করেছিল। কিন্তু যারা আসল ঘটনা জানে তারা বলে সেই নোংরা অংশটা কার্বে নিজেই ঢুকিয়েছিল—সে কোনো ভদ্রলোক নয়। আরিস্তোবুলো হয়তো সবজান্তা প্রকৃতির ছিল, কিন্তু অন্যের গল্পে নাক গলানোর স্বভাব তার ছিল না। একজন মৃত মানুষের কীভাবে আচরণ করা উচিত, তা সে জানত।
উৎসবেই উবালদো সবচেয়ে বেশি উজ্জ্বল হয়ে উঠত। বুকে কনসার্টিনা চেপে ধরে, রামে ভেজানো কর্কশ গলায় গান গাইত। আবেদনময় মিনতিভরা হয়ে উঠত তার দুই চোখ। আঙুল যন্ত্রের চাবিগুলোর উপর ইন্দ্রিয়সুখে ছুটে চলত। কুমারী মেয়ে, বিবাহিত নারী, রক্ষিতা, পতিতা, শোকার্ত বিধবা—সবার কাছ থেকে উবালদোর বাজনা দীর্ঘশ্বাস আর প্রতিশ্রুতি আদায় করে ফেলত। বিধবাদের সান্ত্বনা দেওয়াটা উবালদোর উদার স্বভাবের সাথে স্বাভাবিকভাবেই মিলে যেত। গভীর দীর্ঘশ্বাস আর উত্তপ্ত প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি সাধারণত হুমকি আর গালিগালাজের বৃষ্টিও আসত, কিন্তু উবালদো ভীরু ছিল না—সে সোজা এগিয়ে চলত।
যাযাবর হলেও তার ঘর ছিল—একাধিক ঘর—বাহিয়া আর সার্জিপেতে। তার চেহারা আর সুনাম থাকতে এতে অবাক হওয়ার কী আছে,? এত এত নারীর মাঝেও উবালদো সবার প্রতি বিশ্বস্ত ছিল, কারণ তার হৃদয় ছিল বিশ্বস্ত ও একনিষ্ঠ। সে কখনো কোনো নারীকে ছেড়ে যায়নি (ব্রাউলিয়ার কথা বাদ দিলে—কিন্তু ব্রাউলিয়া, আরে বাবা...!), কখনো কাউকে তাড়িয়ে দেয়নি। নারীরা নিজেরাই চলে যেত। যখন তারা অন্য নারীদের সঙ্গে সম্পর্কের কথা জানতে পারত তখন তারা জোরে জোরে অভিযোগ করত যে তাদেরকে ব্যবহার করা হয়েছে, তাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে—এইসব অভিযোগ করতে করতে চলে যেত তারা। যদিও একজন রোমান্টিক ভ্রাম্যমাণ গীতিকবি সপ্তাহের পর সপ্তাহ, মাসের পর মাস ঘর থেকে দূরে বসে কীভাবে ব্রহ্মচর্য পালন করবে সেটা আমি বুঝি না। এই আচমকা বিচ্ছেদগুলো কখনো কাপাদোসিওর ইচ্ছায় হত না, আর এগুলো সবসময় তাকে কষ্ট দিত। যখনই কোনো নারী তাকে ছেড়ে যেত, তার মনে হত সে পৃথিবীর একমাত্র নারীটিকে হারিয়েছে। আর যতজনই থাকুক, প্রতিটিই ছিল একমাত্র—এই ধাঁধা যদি তোমাকে বিভ্রান্ত করে, তাহলে তুমি ভালোবাসা সম্পর্কে বেশি কিছু জানো না। এত বারবার এই কৃতঘ্নতা, এই অযৌক্তিক স্বার্থপরতার কারণ কী হতে পারে? উবালদো কাপাদোসিও সবসময় তার নারীদের জন্য রুটিরুজি জোগাড় করেছে। তাদের অবলম্বন হয়েছে, আর তাদের সবাইকে পরিতৃপ্ত করার দক্ষতা ও কল্পনাশক্তিও তার ছিল—তার চেয়েও আরো বেশি কিছু ছিল।
কোনো কোনো নারী অবশ্য তাকে ছেড়ে যায়নি, সে যেমন আছে তেমনভাবেই তাকে গ্রহণ করেছিল। এই কারণেই পিরানহাসের অলৌকিক ঘটনার সময়, বত্রিশ বছর বয়সী উবালদো কাপাদোসিও একজন জনপ্রিয় কবি, কাব্যনাট্যরচয়িতা আর সঙ্গীতজ্ঞ হিসেবে তার উপার্জনে তিনটি পরিবার পালন করছিল। তার কনসার্টিনা আর গিটার, তার কর্কশ গলা আর তার ছন্দ—সমৃদ্ধ হোক বা দুর্বল হোক, তাতে কিছু যেত আসত না—কবিতাই তিনটি স্ত্রীর পাতে খাবার তুলে দিত। তিনজনের একজনও বিবাহিত নয়, আর নয় সন্তানের মধ্যে তিনজন তার নিজের নয়।
তার দুটি পরিবার ছিল স্ত্রী আর ছেলেমেয়ে নিয়ে ঐতিহ্যগতভাবে গঠিত। তৃতীয় পরিবারে তখনো কোনো সন্তান আসেনি। রোসেক্লের নারীটি ছিল সংযোজন। সে এখনো হানিমুনের পর্যায়ে—তার জন্য গর্ভধারণ ও সন্তানজন্মের জন্য তখনো সময় হয়নি। উবালদো অন্য দুজনের চেয়ে রোসেক্লেরের আংটি, চুড়ি, হার আর অন্যান্য গহনায় বেশি খরচ করত। বিনিময়ে রোসেক্লের তাকে দিত উত্তপ্ত কোমলতা—মধু আর মরিচের মিশ্রণ।
তাহলে বলা যায় উবালদো কাপাদোসিও ছিল ছন্দ আর সন্তানে পরিপূর্ণ। সন্তান নয়জনের মধ্যে মাত্র ছয়জন তার নিজের রক্তের—যেমনটা আগেই বলা হয়েছে: রোমিলদার গর্ভে তিনজন, ভালদেলিসের গর্ভে তিনজন। বাকি তিনটি পালিত ছেলের মধ্যে বড়জন এসেছিল রোমিলদার সাথে। এই সুন্দরী মুলাটো নারী ট্রুবাদুরের কনসার্টিনা বাদ্যযন্ত্রের করুণ সুর শুনে তার স্বামীকে আরাকাজুর দোকানের পেছনে রেখে একাকী উবালদোর সঙ্গে চলে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। হ্যাঁ, একাকী আর বিষণ্ন হয়ে কোনো পুরুষ যখন কোনো বিশেষ নারীকে চায়—যখন সে তার জন্য এতটাই ব্যাকুল হয়ে পড়ে যে মাথা থেকে তাকে সরাতে পারে না—তখন সে দিনরাত অন্য নারীদের সাথে মজে থাকলেও আসলে সে একা হয়ে ওঠে। সেই এক জটিল নারীই একমাত্র সঙ্গী যে তাকে চাঙ্গা করতে পারে, তার একাকীত্বের ব্যথা সারাতে পারে। তাকে এতটা বিপর্যস্ত দেখে রোমিলদার মন নরম হয়ে গেল। সে জিনিসপত্র বেঁধে নিল। তবে আগে বলল যে সে স্বামীকে ছাড়তে রাজি আছে কিন্তু ছেলেকে নয়। ছেলেকে ছেড়ে থাকা সম্ভব নয়। "সে আমার ছেলে হবে," নাটকীয়ভাবে বুকে হাত দিয়ে শপথ করল কাপাদোসিও। এক ছেলে আসুক, তিন ছেলে আসুক, চার ছেলে আসুক—তার কিছু যেত আসবে না। সে রোমিলদাকে বিছানায় পেতে, তার বুকে হাত দিতে, তার উরুতে বুলাতে এতটাই পাগল হয়ে গিয়েছিলযে বলেই ফলল, "তোমার ছেলেকে আনো, তোমার ভাগনেকে আনো, চাইলে পুরো পরিবার নিয়ে এসো!"
দ্বিতীয় ছেলেটার নাম দান্তে—কবির নামে নাম। তাকে কাপাদোসিও আর ভালদেলিস দত্তক নিয়েছিল তার মা মারা যাওয়ার পর। ছয় মাস বয়সী শিশুর তখন তীব্র আমাশয়। তাকে তার বাবার কাছে দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। দান্তের বাবা বের্নার্দো সাবেংগা ছিল একজন প্রতিভাবান গল্পকার আর সুরস্রষ্টা। মদ খেয়ে বারের সঙ্গীদের টেবিলের নিচে ফেলে দিতে পারত—কিন্তু শিশু পালনে তার কোনো যোগ্যতাই ছিল না বিশেষত যখন শিশুটার পেট খারাপ আর সে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে।
তৃতীয় ছেলেটার ডাকনাম কেভি—ইঁদুরজাতীয় প্রাণীর মতো পেটুক বলে এই কেভি নামটি সে পেয়েছে। তার বাবা-মা, বয়স, নাম—কিছুই জানা নেই। তাকে পাওয়া গিয়েছিল প্রত্যন্ত এক রাস্তার ধারে। সেখানে বসে সে মাটি খাচ্ছিল। মাটি পুষ্টিকর নয়, তবে স্বাদটা মন্দ নয়। কেভির ফর্সা চুল, নীল চোখ, চটপটে হাত যা কাছে যা পায় তাই লুফে নেয়—কেভির এই চেহারা আর স্বভাব ভালো করে দেখার পর ভালদেলিস সিদ্ধান্তে পৌঁছাল, ছেলেটা একটু অপেশাদার মনোবিজ্ঞানী। তার বাবা নিশ্চয়ই কোনো জমিদার অথবা একজন "ডাক্তারই ছিল হয়তো। আর তার গায়ের শ্যামলা রঙ মায়ের কাছ থেকে পেয়েছে।
যারা কাপাদোসিওর পারিবারিক জীবন সম্পর্কে আরো নির্দিষ্ট তথ্য চান তাদের জন্য শুধু এটুকু বলব— সে মাঝে মাঝে সার্জিপে রাজ্যের লাগার্তোতে সুন্দরী রোমিলদার সাথে থাকত। ভালদেলিস-কাপাদোসিওর বাড়ি ছিল বাহিয়ার আমার্গোসার বারাউনাস গলিতে। প্রেমতৃষ্ণার্ত তরুণী রোসেক্লেরও বাহিয়াতে থাকে — বড় শহর জেকিয়ের একটি উপশহরে। উবালদো কাপাদোসিও তিন স্ত্রীকে হাসিখুশি বিদায় জানাল— "আসি, শিগগিরই ফিরব" — ("বিদায়" কথাটা শুধু শবযাত্রায় যাওয়া মৃত মানুষের বলা উচিত)—আর ভাগ্য গড়তে রওনা দিল বিখ্যাত আলাগোয়াস রাজ্যে । সেখানে জীবন সস্তা কিন্তু কবিতার কদর আছে। প্রতিভাবান গীতিকবি সেখানে করতালি পেতে পারে, ভালো উপার্জন করতে পারে, আর সাহস থাকলে কোনো সুন্দরী শ্যামলীর বিছানাও গরম করতে পারে।
আলাগোয়াসের রুক্ষ প্রত্যন্ত অঞ্চলে উবালদোর অভিযান চমৎকারভাবেই চলছিল। উৎসব, মেলা, নামকরণ, এমনকি আরাপিরাকায় একজন বিশপের পাস্তোরাল মিশনেও উবালদো কাপাদোসিও হাজির হত তার কনসার্টিনা, গিটার আর কাব্যনাট্য ভর্তি স্যুটকেস নিয়ে—সব প্রস্তুত থাকত দড়িতে ঝোলানোর জন্য। সে ভালোই পয়সা আয় করছিল আর এদিক-ওদিক কারো কারো হৃদয় ভাঙছিল। কিছুদিন পর সে সাও ফ্রান্সিসকো নদীতে পৌঁছাল এবং তার তীর ধরে হেঁটে পিরানহাসে এল।
আমাদের গল্পের এই শহরটি বিখ্যাত ছিল তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য। বিখ্যাত ছিল ঔপনিবেশিক আমলের বাড়িগুলোর জন্য। আর বছর খানেক আগে লাম্পিয়াওর দস্যু দলের আক্রমণ রুখে দিয়েছিল এই শহরটি। এই কীর্তিগুলো সেই সময়কার অনেক কাব্যনাটকে গাওয়া হয়েছে। স্থানীয় গর্বের আরেকটি উৎস ছিল পূর্বোল্লিখিত ক্যাপ্টেন লিন্দোলফো এজেকিয়েল আর তার বৈধ স্ত্রী সাবো। তারা এই যে শহরের অভেদ্য পাথরের প্রাচীরের ভেতরে বাস করত ।
সাবোর কথা আগে বলা হয়েছে বটে, কিন্তু সাবো আরো বিস্তারিত বর্ণনার দাবিদার। তার সুগঠিত দেহ, তার চলন নাচের মতো, পশ্চাৎদেশ রীতিমতো কিংবদন্তি, তার গালের টোল, আর সেই দুষ্টু মেয়ের ঠোঁট কামড়ানোর ভঙ্গি যাতে ঠোঁট আরো লাল হয়ে ওঠে—যেন বলছে, ইস, করতে তো ইচ্ছে করছে, আহা, করতে পারলে কতই না ভালো হত—এই রকম আরো কত কী। সাবো আসলে কোনো নারী ছিল না, সে ছিল শয়তানের প্রলোভন যাকে পিরানহাসে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এমন কোন পুরুষ আছে যে সাহস করে সেই ফাঁদে পা দেবে? হ্যাঁ, পিরানহাস ছিল সাহসীদের, নির্ভীকদের, বলিষ্ঠদের শহর—লাম্পিয়াও নিজেই তা সাক্ষ্য দিতে পারত। তবে অন্যদিকে, লিন্দোলফো এজেকিয়েল ইতিমধ্যে বেশ কজন প্রতিবেশীকে পরপারে পাঠিয়ে দিয়েছিল। কাউকে ক্ষমতাবান মানুষের অনুরোধে খুন করেছে। নিজের আর খরুচে স্ত্রীর জন্য ভালো উপার্জনের জন্য মেরে ফেলেছে। যেসব লোকের চোখ পুণ্যবতী সাবোর দিকে যাচ্ছে বলে তার নিজের সন্দেহ হতো—তাদেরকেও পরপারে পাঠিয়ে দিত। ন্যায়পরায়ণ কিন্তু ঈর্ষাপরায়ণ স্বামীর চোখে সাবো ছিল তুষারশুভ্র পায়রা।
আমাদের ট্রুবাদুর উবালদো কাপাদোসিও নারীর ব্যাপারে আগেও একাধিকবার বিপদে পড়েছিল। সে সময়গুলোতে সে জানালা দিয়ে লাফ দিয়েছিল, বেড়া ডিঙিয়েছিল, দেয়াল টপকেছিল, ঝোপের ভেতর দিয়ে ছুটেছিল, সাহায্যের জন্য চিৎকার করতে করতে অন্যের বাড়িতে ঢুকে পড়েছিল, আর পারাগুয়াসু নদীতে মাথা নিচু করে ঝাঁপ দিয়েছিল। একবার একটি গুলি তার জ্যাকেট ঘেঁষে বেরিয়ে গিয়েছিল, কিন্তু তার শক্তিশালী আধ্যাত্মিক গুরু শাংগো তাকে রক্ষা করেছিল। যে প্রতিশোধ নিতে এসেছিল সে সামরিক লোক আর ভালো নিশানাবাজ, তাই সে ইচ্ছে করলেই উবালদোকে মারতে পারত। কিন্তু সে মারেনি—শুধু ভয় দেখিয়েছে। তার মানে গুলি লাগার আসল ঝুঁকি কখনো ছিল না।
পিরানহাসে পৌঁছানোর সাথে সাথে সে সাবোর বিছানার দিকে রওনা দিল। সে বিছানায় পুরোহিত আর বিচারকের স্বাক্ষরিত বিবাহের কাগজ অনুযায়ী লিন্দোলফো এজেকিয়েলেরও সমান অধিকার আছে। ক্যাপ্টেন তখন তার অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে একটু দূরের শহরে ছোট একটা কাজে গিয়েছিল। কাজটা দিয়েছিল একজন সংসদ সদস্য। "রাস্তা ফাঁকা," বেচারি ছোট্ট সাবো আস্তে ডেকে বলল। এ সুযোগটা যতটা পারা যায় কাজে লাগাতে মরিয়া হয়ে ডাকছে সাবো।
এমন নয় যে উবালদোকে সতর্ক করা হয়নি। যে বোর্ডিং হাউজে সে উঠেছিল তার মালিক ছিল একজন সহ-কবি। সে তাকে বলেছিল : "দূরে থাকো বন্ধু, লিন্দোলফোর বন্দুকে ত্রিশটারও বেশি দাগ আছে, পেশাদার খুনি হওয়ার আগের প্রথম কয়েকটা গোনায় ধরলে আরো বেশি হবে।" উবালদো এতে বিশেষ কান দেয়নি। সে জানে আলাগোয়াসের লোকেরা কত বড় বড় গল্প বলে। আর তাছাড়া, তার কাছে নারী সবসময়ই ঝুঁকি নেওয়ার যোগ্য।
সন্ধ্যার পরে সে সাবোর দরজা পেরোল এবং লোকে সেটা দেখলও। পরদিন সকালে রোদ যখন মাথার উপর, সে তখনো সেখানে। স্নেহময়ী মেয়েটার মন ভরছিল না, আর গীতিকবিও যখন যোগ্য সঙ্গী পায় তখন নিজেকে জাহির করতে ভালোবাসে। শুধু তার আগুন আর শক্তি নয়, তার সব পরিশীলিতা আর দক্ষতাও দিয়েও নিজেকে প্রমাণ করতে চায়। সে যৌনতার ব্যাপারে মূর্খ ছিল না। সে এক সময় পাঁচতারা প্রতিষ্ঠানে যাতায়াত করেছিল। তার একটির মালকিন ছিল ফরাসি। আর সেখান থেকে সব শিখেছিল। উবালদো হয়ে উঠেছিল দারুণ এক প্রেমিক।
ঠিক যখন উবালদো আর সাবো উত্তাল, কোমল, চরম অবস্থায় পৌঁছে গিয়েছে—পরিস্থিতি শেষ হবো হবো করছে, সময় কম জেনেও তবু আরো কিছু সময় থাকতে ইচ্ছে করছে, ক্রমশ তারা ক্লান্ত হয়ে পড়ছে, বিচ্ছেদের বেদনায় কাতর হয়ে আলতো আলতো থামছে, ঠিক এই সময়, সাপ্তাহিক বাজারের মাঝে লিন্দোলফো এজেকিয়েল কেন ফিরে এসে পিরানহাসে ফিরে পৌঁছাল সেটা কেউ কখনো জানতে পারেনি। আর এখানে সে এল সেই খুনি হিসেবে-- তার বন্দুক নাড়াতে নাড়াতে, ফুঁসতে ফুঁসতে, এলো প্রকাশ্য চত্বরে খোজাকরণের পর মৃত্যুর হুমকি দিতে দিতে। পেছনে কৌতূহলী জনতা জমে গেল—পবিত্র সপ্তাহের শোভাযাত্রার পর এত বড় ভিড় আর হয়নি।
লিন্দোলফো দরজায় পা দেওয়ার সাথে সাথে সাবো তার পায়ের শব্দ চিনল। "ওটা আমার স্বামী," সে খিলখিল করে হেসে বলল।
উবালদো তাৎক্ষণিক সাড়া দিল। এরকম পরিস্থিতিতে সে সবসময় সাড়া দেয়। নিজের উলঙ্গতা ঢাকার জন্য কিছু একটা খুঁজতে দ্রুত চারদিক দেখল। তার প্রদর্শন বাতিক ছিল না, প্রকাশ্যে ভদ্রভাবে পোশাক পরতেই পছন্দ করত। তাড়াহুড়োয় সে শুধু পেল সাবোর গোলাপি বেবি-ডল নাইটগাউনের উপরের অংশটি, সেটা মাথার উপর দিয়ে গলিয়ে নিল। সে এত লম্বা যে সেই নাজুক পোশাক তার নাভিও ঢাকল না। কিন্তু উলঙ্গ, যেমনটা নিন্দুক মুখেরা বলে, সে ছিল না। যেই মুহূর্তে শিংওয়ালা স্বামী রিভলভার উঁচিয়ে ঘরে ঢুকল, আর তক্ষুণি সে জানালা দিয়ে লাফ দিল।
পবিত্রা স্ত্রী আর নিরীহ শিকার সাবো গীতিকবির বিরুদ্ধে অভিযোগ করল যে সে তাকে প্রলুব্ধ করতে চেয়েছে আর চেষ্টা করেছে ধর্ষণ করতে। কিন্তু সে বীরত্বের সাথে প্রতিরোধ করেছে, এখন সে প্রতিশোধ চায়।
"চিন্তা করিস না বেবি, ওর ওটা ছিঁড়ে নেব, তারপর মাথায় গুলি করব। তোর সম্মান নিয়ে কোনো চিন্তা করতে হবে না।"
দুই পুরুষ বাজারের মধ্য দিয়ে ছুটল। পলায়মান গীতিকবির পরনে ছোট্ট নাইটগাউন, লিঙ্গ সম্পূর্ণ দৃশ্যমান, অভিশপ্ত অণ্ডকোষ ঘণ্টার দুলের মতো দুলছে। পেছনে ছুটছে দাঁত-নখ-অস্ত্রে সজ্জিত ক্যাপ্টেন, হাতে ধারালো শূকর-খোজা করার ছুরি। তাদের পেছনে উৎসাহী জনতা। সারারাতের উৎসব আর সকালের বিদায়ে শ্রান্ত উবালদো কাপাদোসিও পিছিয়ে পড়ছিল। খুনি আর তার ছুরি এগিয়ে আসছিল। উবালদোর অণ্ডকোষে মৃত্যুর শীতলতা অনুভব হল।
তাদের পথের ঠিক মাঝখানে ছিল পাখির বাজার—কাঠের খাঁচার স্তূপ একটার উপর আরেকটা সাজানো। তাতে পথ বন্ধ হয়ে গেছে। গতি আর ভয়ের কারণে উবালদো সরে যেতে পারল না। সে সেই খাঁচার দেয়ালে সরাসরি ধাক্কা খেল। আর পাখিগুলো—শত শত পাখি—উড়ে মুক্ত হয়ে গেল। এক মুহূর্তের জন্য বাতাস পাখিতে ভরে গেল—ঘুঘু আর পাখি, বেনেবউ আর কার্ডিনাল, ক্যানারি আর লাভবার্ড—আর পরক্ষণেই তারা উবালদো কাপাদোসিওকে তার পাতলা নাইটগাউনের কাপড় ধরে তুলে নিয়ে উড়ে গেল। সামনে বারোটি ম্যাকাও মেঘের মধ্যে পথ করে দিল, ট্রুবাদুরকে এগিয়ে নিয়ে চলল—হালকা একটি কবিতার পঙক্তির মতো তাকে মৃদু বাতাস ভাসিয়ে নিয়ে গেল।
লিন্দোলফো এজেকিয়েল চত্বরের মাঝখানে ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। আজও সেখানে সে আছে। সে পরিণত হল একটি চমৎকার শিংগাছে। এটা হলো উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সবচেয়ে বড় শিংগাছ—একটি অনন্য কাঁচামালের উৎস। এটা দিয়ে কারিগররা চিরুনি, আংটি, পানপাত্র আর নানা জিনিস বানায়। এভাবে প্রাক্তন খুনি সত্যিকারের জনউপকারী বস্তুতে পরিণত হল।
আর সাবো এখন পুরো সমাজের সম্পত্তি। কর্নেল হার্দে রামালহোর তার তাৎক্ষণিক সুরক্ষায় দায়িত্বে আছে। কর্নেল হার্দে মনোযোগ দিয়ে তাড়া করার দৃশ্য আর অলৌকিক ঘটনা দুটোই দেখেছিলেন।
পাখিরা উবালদো কাপাদোসিওকে নিয়ে আলাগোয়াসের উপর দিয়ে উড়ে গেল। তার অণ্ডকোষ অক্ষত। সার্জিপের সীমানা পেরোনোর পর তারা তাকে একটি মঠে নামিয়ে দিল। সেখানে সন্ন্যাসিনীরা তাকে ভদ্রভাবে স্বাগত জানাল এবং কোনো প্রশ্ন করল না।
**********
লেখক পরিচিতি : হোর্হে আমাদো (১৯১২-২০০১) ব্রাজিলিয়ান ঔপন্যাসিক। তাঁর জন্ম দক্ষিণ বাহিয়ার গভীর জঙ্গলে একটি ছোট কাকাও বাগানে। লাতিন আমেরিকার সবচেয়ে জনপ্রিয় ও প্রজননশীল লেখক তিনি। তাঁর মা ছিলেন আংশিক আদিবাসী, বাবা ছিলেন সেই কিংবদন্তি "কর্নেলদের" একজন, যারা বন্দুকের নলে প্রত্যন্ত অঞ্চল দখল করেছিলেন। ১৯১৪ সালের বন্যায় পরিবার সব হারায়। চৌদ্দ বছর বয়সে তিনি সালভাদরে সাংবাদিকের কাজ নেন। রিওতে আইন বিদ্যালয়ে পড়ার সময় পড়ার চেয়ে লেখালেখিই বেশি করতেন, তবু ডিগ্রি শেষ করেন।
তাঁর প্রথম প্রতিবাদী উপন্যাস কাকাও (১৯৩৩) পুলিশ বাজেয়াপ্ত করলে তিনি আলোচনার কেন্দ্রে আসেন। পরের বছর সালভাদরের বস্তিজীবনের নির্মম চিত্র সোয়েট (১৯৩৪) তাঁর খ্যাতি পাকাপাকি করে দেয়। ত্রিশের দশকের শেষে তিনি কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন। এই সময়ে লেখা উপন্যাসগুলো আফ্রো-ব্রাজিলিয়ান নিম্নবর্গের মানুষদের দীর্ঘদিন দমিয়ে রাখা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে শক্তিশালী কণ্ঠ দেয়। ফলে তিনি বারবার গ্রেফতার হন, তাঁর বই নিষিদ্ধ ও পোড়ানো হয়।
রাজনৈতিক কারণে তিনি একাধিকবার নির্বাসনে যেতে বাধ্য হন মেক্সিকো, নিউ ইয়র্ক, মন্টেভিডিও, বুয়েনোস আইরেস, প্যারিস, চেকোস্লোভাকিয়ায়। ১৯৪৫ সালে গণপরিষদে আসন জিতে ব্রাজিলে ধর্মীয় স্বাধীনতার আইন পাসের উদ্যোগ নেন। ১৯৫৫ সালে পার্টির সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে পুরোপুরি লেখালেখিতে মনোযোগ দেন।
এরপর একে একে আসে তাঁর বিখ্যাত রচনাগুলো—গাব্রিয়েলা, ক্লোভ অ্যান্ড সিনামন (১৯৫৮), দ্য টু ডেথস অব কুইনকাস ওয়াটারইয়েল (১৯৫৯), দোনা ফ্লোর অ্যান্ড হার টু হাজব্যান্ডস (১৯৬৬)। ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত শোডাউন অনেকের মতে তাঁর শ্রেষ্ঠ রচনা। প্যারিসে তাঁকে লেজিয়ন অব অনার পুরস্কার দেওয়া হয়।
**********
‘পাখিদের অলৌকিক ঘটনা’ গল্পটি নিয়ে একটু আলাপ
হোর্হে আমাদোর ‘পাখিদের অলৌকিক ঘটনা : জীবন, শিল্প ও জাদুর গল্প
পড়তে বসলে মনে হয় একটি মজার লোকগাথা পড়ছি। একজন ভবঘুরে গীতিকবি, একজন ভয়ঙ্কর খুনি, একজন অপ্রতিরোধ্য নারী—আর শেষে পাখিরা নায়ককে উড়িয়ে নিয়ে চলে যায়। কিন্তু হোর্হে আমাদোর ‘পাখিদের অলৌকিক ঘটনা’ শুধু মজার গল্প নয়। এর ভেতরে আছে একাধিক স্তর—জীবনের উদযাপন, ক্ষমতার বিরুদ্ধে শিল্পের লড়াই, এবং ব্রাজিলের উত্তর-পূর্বের লোকসংস্কৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।
জীবনই নায়ক
গল্পের কেন্দ্রে আছে উবালদো কাপাদোসিও—প্রেমিক, কবি, সংগীতজ্ঞ। নৈতিক বিচারে সে নিখুঁত নয়। সে মিথ্যে বলে, পরের বউয়ের সাথে শোয়, তিনটি সংসার চালায়। কিন্তু সে গান গায়, ছন্দ রচনা করে, ভালোবাসে এবং শেষ পর্যন্ত বেঁচে যায়। আমাদো এখানে একটি সাহসী কথা বলছেন। জীবনের আনন্দ, সৌন্দর্য আর ভালোবাসার ক্ষমতা নিজেই একটি নৈতিক শক্তি, যা হিংসা ও ক্ষমতার বিরুদ্ধে টিকে থাকে। উবালদো কোনো আদর্শের প্রতীক নয়, সে জীবনের প্রতীক। আর জীবন, আমাদোর কাছে, সবসময়ই জয়ী।
ক্ষমতা বনাম শিল্প
গল্পের দুই প্রধান চরিত্র আসলে দুটি শক্তির প্রতিনিধি। লিন্দোলফো এজেকিয়েল হল রাষ্ট্রীয় ও পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতার মূর্তি—বন্দুক, খুন, ভয়, নিয়ন্ত্রণ। আর উবালদো হল শিল্পের মূর্তি—গান, ছন্দ, আনন্দ, ভালোবাসা। গল্পের শেষে এই দুই শক্তির পরিণতি তাৎপর্যপূর্ণ। ক্ষমতা একটি গাছ হয়ে চত্বরের মাঝখানে স্থির হয়ে যায়—জড়, অচল, বাকরুদ্ধ। আর শিল্প পাখির ডানায় উড়ে যায়—মুক্ত, জীবন্ত। আমাদো বলছেন, শেষ পর্যন্ত শিল্পই টিকে থাকে। ক্ষমতা নয়।
লোকসংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা
গল্পে বারবার উঠে আসে কর্দেল সাহিত্যের প্রসঙ্গ—দড়িতে ঝোলানো ছাপা ব্যালাড, যা ব্রাজিলের উত্তর-পূর্বের দরিদ্র মানুষের নিজস্ব সাহিত্যরূপ। উবালদো এই ঐতিহ্যের বাহক। আর আমাদো এই গল্পটিকেও সেই ধারায় রচনা করেছেন—অলৌকিক ঘটনা, রঙিন চরিত্র, নাটকীয় পরিণতি। এটি একটি সাহিত্যরূপের প্রতি আরেকটি সাহিত্যরূপের শ্রদ্ধার্ঘ্য—রসিকতা আর মমতা একসাথে।
পুরুষতন্ত্রের তিক্ত রসিকতা
সাবোকে ঘিরে পুরো শহর ভয়ে থরথর কাঁপে। একজন নারীকে ‘নিয়ন্ত্রণ’ করতে গিয়ে একজন পুরুষ খুনি হয়ে ওঠে। কিন্তু শেষে সেই খুনি গাছ হয়ে যায়—তার সব ক্ষমতা, সব ভয় আসলে ফাঁকা প্রমাণিত হয়। আর সাবো ‘পুরো সমাজের সম্পত্তি’ হয়ে যায়। এটি কোনো সুখী সমাধান নয়। এটি পুরুষতান্ত্রিক সমাজের একটি তিক্ত রসিকতা, যেখানে নারী এক মালিকের হাত থেকে সমাজের হাতে যায়, মুক্ত হয় না। আমাদো এই সত্যটি সরাসরি বলেন না, কিন্তু যারা বুঝতে চান তাদের জন্য রেখে যান।
জাদু এখানে ভয় নয়, মুক্তি
এই গল্পে ম্যাজিক রিয়ালিজমের ব্যবহার আমাদোকে গার্সিয়া মার্কেজ থেকে আলাদা করে। মার্কেজের জাদুবাস্তবতায় প্রায়ই থাকে বিষণ্নতা, নিয়তির ভার, ইতিহাসের ক্ষত। আমাদোর জাদু উৎসবমুখর, রঙিন, কামনাময়। গল্পের শুরু থেকেই তিনি অলৌকিক ঘটনাকে সাংবাদিকের মতো বলেন—সাক্ষীদের নাম দেন, সত্যিকারের ঐতিহাসিক মানুষদের টেনে আনেন, যেন এটি একটি প্রতিবেদন। পাঠক বিশ্বাস না করেও অবিশ্বাস করতে পারেন না।
মৃত মানুষ কফিনে হেসে ওঠে। খুনি গাছ হয়ে যায় এবং সমাজের উপকারে আসে। পাখিরা কবিকে উড়িয়ে নিয়ে যায়। এই প্রতিটি অলৌকিক ঘটনা ব্রাজিলের উত্তর-পূর্বের লোকবিশ্বাসের সাথে গভীরভাবে যুক্ত—যেখানে জাদু জীবনের অংশ, ভয়ের বিষয় নয়। আমাদো সেই সংস্কৃতিকেই সাহিত্যের ভাষা দিয়েছেন।
শেষ পর্যন্ত এই গল্পটি একটিই কথা বলে—ভালোবাসা, কবিতা আর আনন্দ মানুষের সবচেয়ে স্বাভাবিক অধিকার। যে সমাজ ভয় আর হিংসা দিয়ে এই অধিকার কেড়ে নিতে চায়, সে সমাজ শেষ পর্যন্ত নিজেই জড় হয়ে যায়। আর যে মানুষ গান গায়, ভালোবাসে, আনন্দ করে—সে উড়তে পারে।

0 মন্তব্যসমূহ