শাশ্বত নিপ্পনের গল্প : ডাকাত অথবা প্রেমের গল্প



সকালে হাঁটতে আমার একদমই ভাল লাগে না। শরীরও পারে না। জীবনের পাপে পূর্ণ শরীরটাকে আর বইতে পারে না আমার এই জীর্ণ দেহখানা। আমি কোনোমতে মধ্যবিত্তের জীর্ণ বাজারের ঝোলার মতো শরীরটাকে টেনে হিঁচড়ে ভৈরব নদের ব্রীজের উপরে দাঁড় করাই। রাতের হিমে ভেজা শীতল রেলিং-এ বুক বাঁধিয়ে জিজ্ঞাসা চিহ্ন হয়ে ঝুঁকে থাকি।

মাঘ মাসের শেষের দিক, তবুও দিনশেষের ম্লান আলোর মতো হিমেল আবেশ ঝুলে আছে চারপাশে; ভৈরবের মলিন জলের বুকে ধুসর ধোঁয়া হয়ে কুয়াশা ভাসতে থাকে; পাড়ের আমগাছগুলো মুকুল ধরানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে মনেমনে; ইতোমধ্যেই পাতাগুলো কালচে সবুজ হয়ে উঠেছে। মৃদু বাতাসে কাঞ্চনফুলের সুবাস ভাসে। একটা কোকিল অকারণে গলা ফাটাচ্ছে। একটানা। ঝিরঝির বাতাসে দুলতে থাকে গমের কচি শীষ। আমার প্রতিটা সকাল প্রায় একই রকম। তবে আজ রাস্তায় যেন মানুষ বেশি।

আমি পথচারীদের পা দেখি। বিভিন্ন ধরনের পা। বড়, ছোট, শ্রীহীন, বেঢপ; কারো পা ফাটা। এক পায়ের সাথে অন্য পায়ের মিল নেই। মানুষের পায়ের আকৃতির সাথে মিল রেখেই তাদের চিন্তা, চেহারা, গলার স্বর, এমনকি সেই স্বরের ডেলিভারিও হয় ভিন্ন ভিন্ন। আমি ওদের পাগুলো দেখতে দেখতে শুনি―

‘হেকু ডাকাত মোরি গিয়েচে।’
‘পুলিশের সাথে করচ্ ফাআরে হেকু ডাকাত মরিচে।’
‘গ্যাং ফাইট মনে হয়।’
‘দুটো গুলি লেগিচে বোলে।’
‘প্যাটের মধ্যে বোম ছ্যালো; চাপ নেগি ফেটি গিইলো।’
‘গুলি না কি মাথায় লেগিচে?’―অর্থাৎ ‘হেকু’ ডাকাত মারা গিয়েছে―

এই অঞ্চলের ভয়াবহ ত্রাস, ‘হেকমত’ ওরফে ‘হেকু ডাকাত’ গত রাতে অথবা শেষ রাতে বন্দুক যুদ্ধে মারা গিয়েছে। মৃত শরীরের একটা আবেদন আছে―প্রতিটা দেহই নিথর, নিঃস্পন্দিত শীতল হলেই ‘মরা’ বা ‘লাশ’ হয়ে যায়। সেই লাশের জন্যে এক ধরণের মায়া ছড়িয়ে পড়ে। সাত গ্রামের সাধারণ মানুষ সেই দেহটা দেখতে ছোটে। এই মানুষগুলো হেকমত ডাকাতের মৃতদেহ দেখতে যাচ্ছেন―এই কুয়াশামাখা সকালের বুক চিড়ে। ওদের ঢেঁকে রেখেছে অদম্য কৌতুহলের অদৃশ্য চাদর।

আমি আর সামনে এগুই না। ফিরে আসি আমার পরিচিত চায়ের দোকানে। ‘ছার, হেকু ডাকাত মরিচে’, আমাকে আসতে দেখে চেঁচিয়ে উঠে ছমির। তার গলায় অদ্ভুত এক অনুভূতি। তারপর বলে, ‘বসেন ছার, চা খান।’ পাঠশলার মাথায় আগুন লাগিয়ে সে প্রানপণে চুলা জ্বালাতে চেষ্টা করে। ধীরে ধীরে চুলার কালো ধোঁয়ার মধ্যে ভোরের সূর্যের রঙের শিখা লকলকিয়ে উঠে। তার কিছুপর, ছমিরের কালো জঘন্য কেটলিটার মধ্যের জল গুড়গুড় শব্দ তোলে, বাঁকা নল দিয়ে কুয়াশার মত হালকা ধোঁয়া বেড়িয়ে আসে। আমি অলস বসে থাকি। আমার অলস দৃষ্টি এসব তুচ্ছ বিষয়গুলো উপর দিয়ে ভেসে যায়।

হেকু ডাকাতকে আমি চিনি। মানে চিনতাম। সত্য হল এই যে, ও আমার ছাত্র ছিল। আমাদের ‘যুগশিখা আদর্শ মাধ্যমিক বিদ্যালয়’-এর খাতায় ওর নাম মোঃ হেকমতুল্লাহ, পিতার নামটা মনে নেই। তবে কেউ কেউ বলতেন, হেকমতের বাবা নেই―মানে বাপের ঠিক নেই। আবার কেউ বলতেন, ‘ওর আব্বা মারা গেছে’। কোন এক রাতে কারা হেকমতুল্লাহর আব্বাকে জবাই করে ফেলে যায় খোলা মাঠে। হেমন্তের ফসল কাটা মাঠেই পড়ে ছিল তার লাশ বৈশাখী ঝড়ে উল্টানো কলাগাছের মতো।

আমি ছিলাম হেকমতদের গণিতের শিক্ষক। ছাত্র হিসেবে খুবই খারাপ ছিল সে। বেয়ারা টাইপ। আমার মেয়ে পপি রাণী দাসীর সাথে সেও নবম শ্রেণীতে কেমন করে জানি উঠে এসে মাঝের সারিতে বসে পড়ল একদিন। শীত-গ্রীষ্মে একরকমই অবস্থা তার―না আছে চুলে চিরুনী, না আছে চোখে-মুখে একটু তেল-জল! গ্রামের মা মরা বেওয়ারিশ কুকুর ছানার মতোই ছিল হেকমতুল্লাহ। আমিও পড়ানোর সময় ছোঁয়াচে ঘায়ের মত হেকমতকে এড়িয়ে যেতাম।

সমস্যাটা বাধল মাস তিনেক যেতেই। মনে আছে, তখনো গমের শীষ বাঁধেনি, কাটাখালের মাঠে চাষীদের লাগানো আলুর ভ্যালিতে সবুজ পাতার লতা উঁকি দিতে শুরু করেছিল। কুয়াশার হালকা চাদর ভৈরবের স্থির জলের উপর ভীড় করত; আমাদের স্কুলের গেটের সামনের কাঞ্চন ফুলগাছটিতে একটা দুটো ফুল ফুটতে শুরু করেছে সবে, রাতে একদল শিয়াল গায়ের লোম ফুলিয়ে দল বেঁধে চিৎকার করে ফ্রেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়। এরমধ্যে একদিন আমার মেয়ের বইয়ের মধ্যে থেকে আমি আবিস্কার করলাম এক প্রেমপত্র। অজস্র ভুল বানানে হেকমতুল্লাহর লেখা এক প্রেমপত্র।

স্কুলে গিয়ে দেখলাম শ্রেণি কক্ষের দেওয়ালে, ব্লাকবোর্ডে ছোট বড় করে লেখা “পপি+হেকমত”। আমি নিজ হাতে সেই লেখা মুছতে মুছতে চোখের জলও মুছলাম। বিষয়টি হেড স্যারের কানে গেল। হেকমতকে স্যারের রুমে ডেকে প্রশ্ন করা হলে, সে উত্তর দেয়, ‘আমি লিখেছি স্যার।’
‘আর চিঠি?’ স্যার হুঙ্কার দিয়ে জানতে চান।

‘আমি লিখেছি’, স্পষ্ট করে উত্তর করে হেকমত। 
রাগে কাঁপতে কাঁপতে স্যার আবার চিৎকার করেন, ‘কেন?’ 
‘আমি পপিকে ভালবাসি। আমি ওকে ছাড়া বাঁচবো না ছার।’

আর থাকতে পারিনি আমি। গুনেগুনে ষোলোটা বাড়ি দিয়ে বেত ভেঙে ফেলেছিলাম। তারপর কান ধরে সারা স্কুল ঘুরিয়েছিলেন হেড স্যার। সেই ছিল হেকমতের শেষ স্কুল দর্শন; তারপর থেকে হেকমতের ছায়াও কেউ দেখেনি আমাদের বিদ্যালয়ের আশেপাশে।

আমি পপি রাণী দাসীকে স্কুলে খুব বেশি যেতে দিইনি। এখন সময় খুব খারাপ। এসএসসি পরীক্ষার আগেই পপির বিয়ে দিয়ে ছিলাম, মাগুরা প্রবাসী শ্রীযুক্ত দামুদর কর্মকারের একমাত্র পুত্র শ্রীমান শৈলেন কর্মকারের সাথে। নতুন বাজারের মাঝে মস্ত জুয়েলারির দোকান ছিল ওদের। পপি এখন আমার সাথেই থাকে। জামাই মরার সাথে সাথে এক সন্তানসহ পপি আমার বাড়ি ফেরত আসে বিয়ের বছর চার/পাঁচ পরেই। এক অমাবশ্যার রাতে শৈলেনকে কালো কাপড়ে মুখ বাঁধা একদল ডাকাত তুলে নিয়ে যায়। এই হত্যাকাণ্ডের পর পপিকে উনারা বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিলেন।

রাস্তা কাঁপিয়ে পুলিসের গাড়ি যায়। ফ্যালনা কাগজের সাথে আধা শুকনো ধুলো উড়ে। মজিদ ঠক করে চায়ের কাপটা নামিয়ে রাখে। আমি চমকে উঠি। 
‘চা ন্যান ছার’, মজিদ বলে। 
‘একটা বিস্কুট আর একটু জল দে তো মজিদ।’

দল বেঁধে মানুষ ফিরে আসছে। ফিরে আসছে পা-গুলো। আমি দেখি এখন পা গুলোর গতি কম এলেমেলো ভাবে ওরা ফিরছে। পা গুলোর মাঝে এখন আর কৌতুহল নেই। ওরা নিশ্চিত হয়েছে যে, হেকু ডাকাত মরেছে। আমি বাতাসে ছড়িয়ে পড়া কথা গুলো শুনি―

‘যাক আল্লা ছাড় দেয় ক্যান্ত ছেড়ি দেয় না।’
‘এবার যদি এলাকায় শান্তি আসে।’
‘খানকির ছেলি বেড়িলো ভাই, যা হয় বাড়!’
‘হেকুর চোদনে মেহেরপুর, কুষ্টি, চুঙোডাঙ্গা, ঝিনিদা, মাগুরা তরিক।’
‘আল্লা আল্লা কর গো, আল্লা আল্লা কর! দুদিনের দুনিয়া।’

আমি জল খেয়ে চায়ে বিস্কুট চুবাই। ধোয়াটে গন্ধয়ালা চা। মজিদের দোকানে একে একে খদ্দের আসতে থাকে। মজিদের কালো কেটলির বাঁকা নল থেকে এখন ঘন ধোঁয়া বেরুচ্ছে, ভিতরের জল শব্দ করে ফুটছে। মজিদ ব্যস্ততার সাথে চা বানাতে থাকে। আমি অবাক হয়ে মানুষের ফিরে আসা দেখি। কোকিলটা আবার ডাকতে শুরু করেছে। কোকিলের একঘেয়ে ডাক আমাকে আবার ভাসিয়ে নেয়।

তখনও সন্ধ্যা গাঢ় হয়ে উঠেনি। আমি সন্ধ্যা আহ্নিক শেষ করে বাজারে গিয়েছিলাম সামান্য টুকিটাকি কিনতে। এ সপ্তাহে বেশ জাঁকিয়ে ঠান্ডা পড়েছে। বাজারে খুব বেশি লোকজন নেই। ইদানীং বিদ্যুৎ থাকে না, মাঝেমাঝেই লোডশেডিং চলে। ছোট ছোট চার্জারের অসহিষ্ণু আলোতে চলছে সন্ধ্যা রাতের বিকিকিনি। এই আলো-আঁধারে চেনা বাজারটাকে অচেনা লাগে। এরমাঝে চাদর গায়ে একটা লোক এসে বলল, ‘একটু এদিকে আসেন। আপনি কি যুগল মাস্টার?’
আমি অবাক ও বিরক্তি নিয়ে বলি, কেন? 
‘আপনি আমার সাথে একটু চলেন।’
‘কেন? কোথায়?’
এসব প্রশ্নের উত্তর লোকটা দেয়নি।

কিছু দূর নিয়ে যখন ওরা আমার চোখ আর মুখ বাঁধলো তখন আমি মনে মনে ‘রাধা নাম’ জপলাম। মনে মনে তুলশী তলার উদ্দেশ্যে প্রণামও করলাম।

ওরা আমাকে মোটর সাইকেলে তুলল। খানিক দূর গিয়ে নামালো। তারপর হাঁটা। আমি বুঝতে পারি আকাশে চাঁদ আছে―সাথে ফোঁটা ফোঁটা কুয়াশা। আমি সরু আইল পথ বেয়ে চলেছি, আমার বাঁধা মুখ থেকে লালা গড়াচ্ছে, শুনতে পাচ্ছি শিশির পরছে টপটপ করে, সম্ভবত কলাপাতায়। এরা কি আমাকে হত্যা করবে? কিন্তু কেন? গুলি করবে, না কি জবাই? খুব ব্যাথা লাগবে! মনে পড়ে, ছেলে বেলায়, মা মাছ কাটতেন, আমি মাছ কাটা দেখতে পারতাম না―আমার পেচ্ছাপ পায়, আমি ঘামতে থাকি―আমরা থামলাম। ওরা আমার চোখ খুলে দিল।

ঘন অন্ধকারে আমার মাথা ঘুরে উঠল, উপোসের শরীরটা মহূর্তেই দুলে উঠল। এত অন্ধকার আমি কোনো দিন দেখিনি। কোথাও ঝিঁ ঝিঁ পোকা ডাকছে, শব্দ করে শিশির পড়ছে, প্রথমে পাতায় তারপর পাতা থেকে গড়িয়ে মাটিতে। অন্ধকার থেকে কেউ বলে, ‘ছার ভালো আছেন? বসেন ছার।’
আমি চমকে  ওঠি। এই স্বর আমার খুব চেনা। আমি কিছু একটা বলতে গিয়ে বুঝলাম গলা আটকে আছে।

অন্ধকার সয়ে এসেছে ক্রমেই। অন্ধকারের আলোয় আমি দেখলাম, আমার চারপাশে সমত্ত কলা গাছ। বেশ কটি কলা গাছের শরীর পেড়ে, তার উপরে উঁচু জাজিমের গদি পেতে, আধ-শোয়া অবস্থায় আছে হেকমতুল্লাহ ওরফে হেকু ডাকাত। তার বিছানায় ছড়ানো নানা ধরনের বন্দুক। নাম না জানা এই কালো কালো অথচ চকচকে। মোবাইল ফোন, ওয়ারলেস সেটসহ কতকিছু। স্কুল ছাড়ার পর তার সাথে আমার প্রথম ও শেষ দেখা।

‘ছার কেমন আছেন?’
আমি ঢোক গিলি। 
‘খুব ঠান্ডা পড়চি ছার, কফি খান, আরাম লাগবে। আমাকে চিনতে পেরিচেন ছার?’

কলার পাতার শব্দ হয়। আমি চমকে উঠি। শীত নামানো বাতাসে কলা গাছের মাঝের পাতা সামান্য নড়ে, ফস্ করে কেউ সিগারেট জ্বালায়; আমি সিগারেটের গন্ধ পাই; সাথে কপির। আমার হাতে ওরা তুলে দিয়েছে আগুন গরম এক মগ কপি। দারুন সুগন্ধ! আমি চা খাই, কপি এই প্রথম।

‘খান ছার।’ হেকমত বলল।
আদেশ মনে করে আমি কাঁপা কাঁপা হাতে মগ মুখে তুলতে গিয়ে ছলকে যায়। ‘ধীরে খান ছার’, হেকমত বলে, ‘চিনি ঠিক আছে, ছার?’

আমার চারপাশে কলা বাগান। আকাশে চাঁদ উঠেছে। পৌষের চাঁদ বড়ই উজ্জ্বল। দূরে কুকুর ডাকছে। কলা গাছের লম্বা পাতার ফাঁকে ফাঁকে উড়ছে জোনাকি, দু-একটা। কেউ নিচু গলায় কথা বলে। সামান্য কেশে হেকমত নিচু গলায় বলে, ‘আপনি ভয় পেয়েন না ছার, আমাকে চিনতে পেরেছেন?’ 
হেকমতুল্লাহ।’ আমি খুব কষ্ট করে কাঁপা গলায় উত্তর দিই। 
‘ছিলাম ছার। এখন লোকে আমাকে হেকু ডাকাত বলে।
আমি হু হু করে কেঁদে উঠি, ‘বাবা, আমাকে তুমি মাফ করে দাও; আমার কিচ্ছু নেই, আমি খুবই দরিদ্র শিক্ষক বাবা, আমাকে তুমি মাফ কর।

‘ছার, আমি একটা সিগারেট জ্বালাই’―বলেই দামি লাইটার বের করে হেকমত। আমি অপমানিত বোধ করছি কি? ঠিক বুঝছি না। দুটো টান দিয়ে ও বলে, ‘ছার কিছু মনে নিয়েন না।’

আমি একটা বিচিত্র গন্ধ পাচ্ছি। এটা কি সিগারেট? জানি না। খক্ খক্ করে কেশে উঠে হেকমত। সেই শব্দে একটা পাখি উড়ে যায়, শূন্য ডালটা ছায়ার মতো পড়ে থাকে। হেকমতের হাতের আগুন ঘন কমলা রঙ নিয়ে জ্বলতে থাকে। ‘আমাকে ক্ষমা করে দাও বাবা।’ আমার গলায় আকুতি। ‘আমার কেউ নেই বাবা কিছু নেই।’

কিছুটা ঝিম ধরে থেকে হেকমত বলে, ‘ছার আপনি টাকা পেয়েছেন? মানে চাকরি শেষের টাকা?’ 
‘না বাবা! বিশ্বাস কর পাইনি। মা কালীর কিরে বলছি, চার বছর হল, পাঁচ/ছয় বার হেড অফিসে গিয়েছি বাবা, ওরা আমার কথা শোনেও না, পাত্তাও দেয় না।’ আমার গলা বুঁজে আসে আবার।

হেকমত আকাশের দিকে মুখ তুলে হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, ‘পপি কেমন আছে ছার?’ 
আমার কান গরম হয়ে ওঠে। আমি মূহুর্তেই হেকমতের পায়ের উপর পড়লাম, ‘বাবা আমাকে ক্ষমা কর বাবা। পপি আমার বিধবা মেয়ে। আমাকে মেরে ফেল তোমরা, পপির কিছু করো না বাবা। বড় দুঃখী মেয়ে সে আমার। ও আমার সাথে থাকে, ওর একটা বাচ্চা। বাবা দয়া কর।’
কিন্তু পা ছোঁওয়ার আগেই চোখের নিমিষেই একজন শক্ত হাতে আমাকে তুলে ধরে।

তারপর কেটে যায় অনন্তকাল। পৌষের আকাশের এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্তে ছুটে যায় একটা উল্কা। কালপুরুষের শরীর থেকে তিনটি তারা ছুটে আসে এই অচিন কলা বাগানের দিকে। এক যুগ পর আবার ডেকে উঠে ঝিঁঝিঁ পোকার দল। মাথার উপর দিয়ে উড়ে যায় পেঁচা। তার ডানার বাতাসে সামান্য নড়ে উঠে কলা গাছের মাঝের পাতা।

‘আপনি যান ছার।’ হেকমত বলে হঠাৎ, ‘এই ছারকে রেখে আয়। দেখিস, যেন কোন কষ্ট না হয়।’

‘ছার কি বসবেন? লাশে না কি পচন ধরেছে, কেউ লাশ নিতে আসেনি, পড়েই আছে। যাই, আমিও একটু দেখে আসি।’ ছমিরের কথায় আমি চমকে উঠি। 
চারদিকে তখন উচ্ছ্বল একদিন।

**********

লেখক পরিচিতি : শাশ্বত নিপ্পন গল্পকার। ‘অনতিক্রম’, ‘মেঘমল্লার’, ‘থমকে যাওয়া সময়ের গল্প’, ‘বৃত্তচ্যুত’ তার গল্পের বই। বসবাস করেন মেহেরপুরে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

1 মন্তব্যসমূহ

  1. অসাধারণ একটি গল্প পড়লাম। শাশ্বত নিপ্পনের গল্প পড়া শুরু করলে নেশা ধরে যায়, পুরোটা না পড়ে অন্য কোথাও মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ থাকেনা। ছোট ছোট বাক্যে মানুষের যাপিত জীবনের গল্পগুলো তাঁর নিপুন শব্দের বিন্যাসে মনে গেঁথে যায়।

    উত্তরমুছুন