ওরহান পামুকের ‘দ্য মিউজিয়াম অব ইনোসেন্স’ উপন্যাসের পর্যালোচনা


রিটন খান

ইস্তানবুলকে অনেকেই মানচিত্রের শহর বলে, কেউ বলে সাম্রাজ্যের ধ্বংসাবশেষ, কেউ বলে মসজিদের গম্বুজ আর বসফরাসের জলের শহর। কিন্তু ওরহান পামুকের কাছে ইস্তানবুল আসলে তার চেয়েও বেশি কিছুর নাম। হারিয়ে যাওয়া জিনিসের গুদাম, ফেলে-আসা মুখের ঠান্ডা ছাপ, ঘরের আলমারিতে বহু বছর ধরে না-খোলা কাঁচের দরজার ভেতর জমে থাকা ধুলো, পুরোনো পরিবারের একটু ভেঙে-পড়া আত্মমর্যাদা, এবং স্মৃতির সঙ্গে এমন এক অন্তরঙ্গ সহবাস, যেখানে শহর আর মানুষ, জিনিস আর আবেগ, ইতিহাস আর ব্যক্তিগত হাহাকার একে অন্যের গায়ে গা ঠেকিয়ে বাস করে। তাঁর ২০০৩ সালের স্মৃতিকথা ‘ইস্তাম্বুল’-এ যে পাঁচতলা পামুক অ্যাপার্টমেন্টের কথা তিনি বলেন, সেটি নিছক একটি বাড়ি নয়, একধরনের অন্ধকার পারিবারিক জাদুঘর, যেখানে চিনির পাত্র, নস্যির কৌটো, ধূপদানি, না-বাজানো পিয়ানো, না-খোলা কাচের আলমারি, পর্দার আড়ালে থমকে থাকা ঘর—সবকিছু যেন সময়ের মধ্যে বেঁচে না থেকে সময়ের ধাক্কা খেয়ে জমাট বেঁধে আছে। সেই ঘরের মানুষেরাও যেন একটু অবহেলিত, একটু পিছিয়ে-পড়া, একটু কাতর; তারা ইউরোপের ভঙ্গি, পোশাক, অভ্যাস, রুচি, শিষ্টতা, আধুনিকতার খবরাখবর মন দিয়ে কুড়িয়ে রাখে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে জানে, ইউরোপ তাদের নিয়ে খুব একটা ভাবে না, বা ভাবলেও দূর থেকে, ঠান্ডা চোখে, পর্যটকের দৃষ্টিতে।

বিদেশিরা ইস্তানবুলকে খুব সহজে ‘পূর্ব’ আর ‘পশ্চিম’-এর মিলনস্থল বলে চালিয়ে দেয়, যেন শহরটাকে দুটো মোটা শব্দে বেঁধে ফেললেই তার হদিস মেলে। পামুক এই কথাটাকেই সরিয়ে দেন। তাঁর কাছে আসল বিভাজনটা ভৌগোলিক বা সভ্যতাগত কোনো বড়ো তত্ত্বে নয়; বরং একদিকে দেশজ অভ্যাস, উত্তরাধিকার, পারিবারিক রীতি, স্মৃতি, পুরোনো সামাজিক বুনন, আর অন্যদিকে আমদানি- করা নতুন জীবনরুচি, ইউরোপীয় কেতা, নকল আধুনিকতা, বাজারে আসা চকচকে পণ্য, সিনেমার পর্দা থেকে ধার-করা ভঙ্গি। পামুকের কৃতিত্ব এখানেই যে তিনি এই টানাপোড়েনকে বিমূর্ত তত্ত্ব বানান না; চুইংগামের মোড়ক, দোকানের সাইনবোর্ড, সোফিয়া লোরেনের সিনেমা, নকল হ্যান্ডব্যাগ, ড্রয়িংরুমের আসবাব, কনের পোশাক, মেয়েদের চুল রাঙানোর ঢং, সবকিছুর মধ্যে তিনি দেখিয়ে দেন দেশ আর আত্মপরিচয়ের বিব্রত রূপ। তিনি নিজেই লিখে গেছেন, এক ধর্মনিরপেক্ষ, পশ্চিমমুখী, স্বচ্ছল পরিবারে বড়ো হয়ে ওঠার অভিজ্ঞতাই তাকে ঠেলে দিয়েছিল তুরস্কের নিজস্ব, কখনো কখনো মরমিয়া, কখনো পুরোনো, কখনো লজ্জিত অথচ নাছোড় ঐতিহ্যের দিকে। আরও কৌতুকের কথা এই, তুরস্কের নিজের ভাষা খুঁজে পেতে তাকে অনেকখানি পথ হাঁটতে হয়েছে বিদেশি বইয়ের ভেতর দিয়ে। 

যুবক পামুক প্রথমে লেখক হতে চাননি; তাঁর ইচ্ছে ছিল চিত্রকর হওয়ার। কিন্তু সেখানেও শুরুটা ছিল নকল দিয়ে : মোনে, সিসলে, পিসারো। ইউরোপ যে শহরকে বহুদিন ধরে খানিকটা বিদেশি, খানিকটা অদ্ভুত, খানিকটা সীমান্তবর্তী বলে দেখেছে, সেই ইস্তানবুলের বাড়িগুলোর ওপর তিনি উত্রিয়োর জানালা বসিয়ে দিচ্ছেন, ইউরোপীয় আলোর ছাঁচে তুর্কি পাড়া আঁকছেন। ফলত যা দাঁড়ায় তা পুরো ইউরোপীয় নয়, আবার প্রথাগত তুর্কিও নয়; বরং সংকর, খানিক বেখাপ্পা, কিন্তু ঠিক সেই কারণেই নতুন। এইখানে পামুকের অভিজ্ঞতার একটি বড়ো সত্য ধরা পড়ে : পশ্চিমই তাকে শিখিয়েছিল নিজের জিনিস দেখতে, নিজের শহরকে নতুন চোখে পড়তে, এমনকি লেখক হওয়ার স্বপ্নও ভাবতে। তার মা নাকি বলেছিলেন, “এটা কিন্তু প্যারিস না।” যেন শিল্পী হওয়ার স্বপ্ন দেখাটা ইস্তানবুলের ছেলের জন্য একটু বাড়াবাড়ি, একটু কল্পনা, একটু অনুপযুক্ত বিলাস।

পামুক আসলে নিজেকে তৈরি করেছেন বিদেশি বইয়ে বাস করতে করতে। দস্তয়েভস্কি তাকে দেখিয়েছেন, ইউরোপের সীমানার ঠিক বাইরে দাঁড়িয়েও এক উগ্র, তীব্র, অস্বস্তিকর লেখক হয়ে ওঠা যায়, যে নিজের দেশের আত্মা, তার নৈতিক বিপর্যয়, তার ইউরোপ-অভিলাষ, তার আধ্যাত্মিক কাঁপুনি নিয়ে নির্মমভাবে লিখতে পারে। নাবোকভ তাকে শিখিয়েছেন, বিশেষাধিকারভোগী শৈশবের স্থির হয়ে থাকা ইন্দ্রিয়জ জগতকে কীভাবে আদর করতে হয়, কীভাবে প্রতিটি খুঁটিনাটিতে স্পর্শের দীপ্তি ধরতে হয়। আর প্রুস্ত, সবচেয়ে বেশি, তাকে দেখিয়েছেন, স্মৃতি শুধু অতীতের রেকর্ড নয়, তা দিয়ে কল্পনার বিশাল স্থাপত্য তোলা যায়; একটি সামান্য বস্তু, একটি গন্ধ, একটি সুর, একটি রাস্তাঘাট, একটি কাচের কৌটোও আবেগের সমগ্র মহাবিশ্ব খুলে দিতে পারে। পামুক ইউরোপের মহান সাহিত্যিক ঐতিহ্যের দিকে যে নিষ্ঠা, প্রেম, আগ্রহ, আর একধরনের ছাত্রসুলভ ভক্তি নিয়ে তাকান, তা আজকের অনেক ইউরোপীয় লেখকের মধ্যেও মেলে না। এর ফলে তিনি নিজের অবস্থানটি আরও তীক্ষ্ণভাবে ধরতে পারেন: তিনি এমন এক সমাজের সন্তান, যা নিজের দেশজতাকে আঁকড়ে রাখতে চায়, আবার বিশ্বায়িত বিশ্বের সদস্য হতেও মরিয়া।

এই সব টানাপোড়েনের সবচেয়ে অন্তরঙ্গ, সবচেয়ে সূক্ষ্ম, সবচেয়ে বিস্তৃত শিল্পরূপ সম্ভবত ‘দ্য মিউজিয়াম অব ইনোসেন্স ‘ উপরিতলে এটি একটি দীর্ঘ, ঢিলেঢালা, ৫৩০ পাতার প্রেমকাহিনি, যেখানে কেমাল নামের এক ধনী, অলস, উচ্চবিত্ত ইস্তানবুলের তরুণ এক আঠারো বছরের মেয়ের প্রেমে পড়ে, বা প্রেমের চেয়েও বেশি, অবসেশনে ডুবে যায়। কেমাল বাবার দেওয়া এক্সপোর্ট কোম্পানির মালিক বটে, কিন্তু তার সত্যিকারের কাজ যেন শহরের এক গোপন অ্যাপার্টমেন্টে গিয়ে ফুসুন কেস্কিনের সঙ্গে দেখা করা। ফুসুন এক দোকানের মেয়ে; তার মা সমাজের অভিজাত মহিলাদের জন্য পোশাক সেলাই করে। ১৯৭৫ থেকে ১৯৮৪ অব্দি, দেখা, বিচ্ছেদ, পুনরায় ঘুরে-ফিরে কাছে আসা, সামাজিক বাধা, সময়ের চাপে বদলে যাওয়া সম্পর্ক, সব মিলিয়ে ফুসুন ধীরে ধীরে কেমালের কাছে শুধু একটি মেয়ে থাকে না; সে হয়ে ওঠে তার যৌবনের ইস্তানবুল, তার হারানো সময়, তার ব্যর্থ আকাঙ্ক্ষা, তার শহর। বহু বছর পরে কেমাল যে ‘মিউজিয়াম অব ইনোসেন্স’ বানায়, যেখানে জমে থাকে ফুসুনকে ঘিরে হাজার রকমের বস্তু, শাদা চীনামাটির লবণদানি, কুকুরের আকৃতির টেপমেজার, যন্ত্রণাদায়ক যন্ত্রের মতো দেখতে ক্যান-ওপেনার, বাটানায় সূর্যমুখী তেলের বোতল, এবং আরও কত কী, তা আসলে কেবল প্রেমের জাদুঘর নয়; তা একটি শহরের, একটি সময়ের, একটি শ্রেণির, এবং এক হারিয়ে-যাওয়া সম্ভাবনার জাদুঘর।

কেমাল ফুসুনের ৪,২১৩টি সিগারেটের অবশিষ্ট টুকরো জমায়, তার বাড়িতে ২,৮৬৪ দিন রাতের খাবার খেতে যায়, বারবার স্মরণ করে তাদের প্রথম দিকের বিকেলগুলো। শুনলে পাগলামি মনে হয়, কিন্তু পামুক এই পাগলামিকে এমনভাবে বুনে দেন যে তা ব্যক্তিগত বিকারের পাশাপাশি সামাজিক নৃবিজ্ঞানে পরিণত হয়। প্রেমের গল্পটি তখন আর নিছক নারী-পুরুষের টান থাকে না; তার ভেতর চাপা পড়ে থাকে লেখকের আসল প্রেম, ইস্তানবুলের প্রতি প্রেম। কেমাল আর ফুসুন অনেক সময় পুরোনো পারসিক মিনিয়েচারের চরিত্রের মতো লাগে, খানিক আদলে বাঁধা, খানিক দূরের, কিন্তু পামুকের ছেলেবেলার আধা-ইউরোপীয়, আধা-দিশেহারা, সেমি-কসমোপলিটান ইস্তানবুল এত নির্দিষ্ট, এত ঠাসবুনোট, এত বস্তুসমৃদ্ধ যে তা শেষ পর্যন্ত সার্বজনীন বলে মনে হয়।

এই উপন্যাসের এক বিরাট শক্তি হলো ধার-করা ধারণায় গড়া একটি সমাজের খুঁটিনাটি ধরতে পারা। উচ্চবিত্ত ইস্তানবুলের লোকজন হারডস নিয়ে কথা বলে, নিস থেকে প্যারাসল আনে, স্কিইং-এ যায়, Cercle d’Orient-এ মেলে, কাউকে “খুব à la Turca” বলে হালকা অপমান করে। কিন্তু এই ধার-করা জগতের মধ্যে একধরনের হাহাকার আছে। পঞ্চাশের দশকে তুর্কিরা গর্ব করে বলত, তারা প্রথম বৈদ্যুতিক ব্লেন্ডার কিনেছে, ক্যান-ওপেনার কিনেছে, ইলেকট্রিক শেভার এনেছে। ইউরোপ থেকে মেয়োনেজ-মেকার পর্যন্ত আনা হচ্ছে, কিন্তু তুরস্কে তার খুচরো যন্ত্রাংশ নেই; ফলে আধুনিকতার প্রতীক খুব দ্রুতই অকেজো ধ্বংসাবশেষে পরিণত হয়। বাহ্যিক আধুনিকতার এমন এক ট্র্যাজিকোমেডি এখানে তৈরি হয়, যেখানে জিনিসগুলো কেবল বস্তু নয়, ব্যর্থ উচ্চাকাঙ্ক্ষার স্মারক।

কেমালের বন্ধু যায়িম তুরস্কের প্রথম দেশীয় সফট ড্রিঙ্ক বাজারে আনছে, শহরময় বিজ্ঞাপন দিচ্ছে, পাশে স্বর্ণকেশী জার্মান মডেল, স্লোগান: “You Deserve It All.” এই একটি বাক্যেই উপন্যাসের অর্ধেক সমাজচরিত্র খুলে যায়। সবাই সবকিছু পেতে চায়, কিন্তু কিছুই পুরোপুরি পায় না। কেউ কেউ ক্রিসমাস ট্রি কেনে, কেউ নকল বিদেশি পানীয় বোতলে ভরে বেশি দামে বেচে, কেউ “East-West” ঘড়ি পরে, এক পিঠে আরবি সংখ্যা, আরেক পিঠে রোমান। যেন সময়ও এখানে দ্বিধাগ্রস্ত, এক পা এগোয়, এক পা থামে। কেমালের সংকট এই যে, সে যেমন ফুসুনকে চায়, তেমনি সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য, ফ্রান্সফেরত, অবসরপ্রাপ্ত কূটনীতিকের মেয়ে সিবেলের সঙ্গেও তার বাগদান হয়। সংবাদপত্রের পাতায় নিখুঁত যুগল হিসেবে যাদের ছবি বেরোচ্ছে, সেই মুহূর্তেই কেমাল গোপনে অন্য এক জীবনে ডুবে আছে। এখানে ব্যক্তিগত নৈতিক ভণ্ডামি আর জাতীয় পরিচয়ের দ্বৈত সঙ্কট একে অন্যের প্রতিবিম্ব হয়ে ওঠে। তুরস্ক যেমন সমাজের নিয়ম মেনে ভালো দেশ হতে চায়, তেমনি মানসিকভাবে সম্মানিত পাশ্চাত্যও হতে চায়; কেমালও তেমন, সামাজিক তুর্কি হতে চায়, আবার সুবিধামতো স্বাধীন পাশ্চাত্য পুরুষও হতে চায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত না সে সব পায়, না তার দেশ।

এই কারণেই ‘দ্য মিউজিয়াম অব ইনোসেন্স’ এক অদ্ভুত আধুনিক Age of Innocence হয়ে ওঠে, তবে স্থানান্তরিত এক বিভ্রান্ত সমাজে, যে বুঝতে পারছে না কতখানি আধুনিক হবে। পামুকের ইস্তানবুলে comme il faut-এর চাপ আছে, একই সঙ্গে au fait হওয়ার লোভও। সত্তরের দশক, প্রথম ডিস্ক জকি, প্রথম সাইকোঅ্যানালিস্ট, সৌন্দর্য প্রতিযোগিতা নিয়ে উৎকণ্ঠিত আলোচনা, প্রথম ইসলামি পর্নোফিল্ম, ইউরোপীয় সেক্স ম্যানুয়াল দেখে অনুকরণ, কিন্তু আবার শালীনতার মুখোশও অটুট। এই সমাজে তরুণ পুরুষেরা লজ্জাশীল, নারীর কাছে অপ্রস্তুত, ত্রিশ বছরের নায়কও তুরস্কে পর্দার বাইরে কোনো চুমু দেখেনি; আবার একই সমাজের যৌন কল্পনা ‘হাই-ক্লাস’ পতিতালয়ে পশ্চিমি নায়িকার সাজে মেয়েদের খোঁজে। তরুণীরা প্যারিস-লন্ডনে শপিংয়ে যায়, কিন্তু বিয়ের দিন কুমারী থাকার সামাজিক দাবি থেকে পুরো মুক্তি নেই। এমনকি ‘flirt’-এর জন্য তুর্কিতে সহজ, স্বাভাবিক শব্দও নেই। এই ভাষাগত শূন্যতাও সামাজিক শূন্যতারই লক্ষণ। 

উপন্যাসের কেন্দ্রীয় মহড়া, কেমাল ও সিবেলের এনগেজমেন্ট পার্টির ৪৩ পাতার অধ্যায়, এই গোটা সামাজিক নাটকের এক ঘন চিত্র। স্থান অবশ্যই হিলটন, যা পামুকের ইস্তানবুলে যেন এক ট্রোজান ঘোড়া; বাহিরে হোটেল, ভেতরে পশ্চিমা আধুনিকতার সশস্ত্র প্রতীক। কালোবাজার থেকে আনা ইউরোপীয় শ্যাম্পেন, উচ্চবিত্ত তুর্কি সমাজের সমাবেশ, প্রত্যেকের মুখে ভদ্রতার ভাষা, ভেতরে ভেতরে উদ্বেগ, কামনা, হিসাব, মুখরক্ষা, দম্ভ, সংকোচ। এই দৃশ্য পামুকের সমাজ-নজরকে শীর্ষে তোলে। মানুষগুলো জানে কীভাবে বাহ্যিকতা পড়তে হয়, কিন্তু নিজেদের অন্তর্গত চাপকে পড়ার ক্ষমতা তাদের কম।

পামুক খুব বেশি সরাসরি নৈতিক ব্যাখ্যা দেন না, কিন্তু কেমালের গোপন বিকেলগুলো, যে বিকেলে সে ফুসুনের সঙ্গে থাকে, সেগুলো তার কাছে স্বর্গ হলেও ফুসুনের জন্য আসলে উল্টো, এক ধরনের নির্বাসন। সে নিজের সুখের জন্য একটি মেয়ের ভবিষ্যৎ, সামাজিক অবস্থান, বিয়ের সম্ভাবনা, সম্মান, সবকিছুকে অনিশ্চয়তায় ঠেলে দিচ্ছে। সমাজ যে-জিনিসকে রক্ষণশীল বলে সাজায়, তার ভেতরকার নিষ্ঠুরতা এখানে খুব নগ্ন। পামুকের নির্ভুলতা এখানেও, বস্তু দিয়ে তিনি নৈতিক বিভাজন ফুটিয়ে তোলেন। কেমাল প্রথম ফুসুনের সঙ্গে দেখা করে সিবেলের জন্য Jenny Colon ব্যাগ কিনতে এসে, পরে জানা যায় তা নকল। ফুসুন নকল ব্যাগের বাজারের ভেতর আছে, সিবেল নকলকে অপমানজনক ভাবে। ফুসুন Samsun সিগারেট খায়, কেমাল গর্ব করে নকল Marlboro টানে, সমাজের রুচি, শ্রেণি, নকল আধুনিকতা, বাজারের জালিয়াতি, সবই এখানে বস্তুগত হয়ে ওঠে।

পামুক আসলে দেখান, ইউরোপের সবচেয়ে বড়ো সম্পদ যা, তুরস্কের তা নেই: ইউরোপকে অগ্রাহ্য করার ক্ষমতা। সিবেলের একটি সংলাপ স্মরণীয়, “ইউরোপে ধনীরা এত পরিশীলিত যে তারা ধনী নয় এমন ভান করতে পারে।” ইস্তানবুলে উল্টো, মানুষ তার অভাব, তার উচ্চাকাঙ্ক্ষা, তার শ্রেণি, তার আধুনিকতালিপ্সা, তার অনুকরণপ্রবণতা, কিছুই গোপন রাখতে পারে না। ইউরোপের দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে মানুষ শেষ পর্যন্ত নিজের দেশেই আরো গৃহহীন হয়ে ওঠে।

উপন্যাসের এক জায়গায় কথক নিজেকে বলে “নিজস্ব অভিজ্ঞতার নৃতত্ত্ববিদ”, পরে “নিজ সমাজের নৃতত্ত্ববিদ”। এই কথাটি খুব জরুরি। কারণ ‘দ্য মিউজিয়াম অব ইনোসেন্স’-এর আসল নায়ক কেমাল বা ফুসুন নয়, শহর। প্রেমকাহিনি যতই চলুক, আমরা পড়তে পড়তে বুঝি, কেমালের মূল সঙ্গিনী ফুসুনের চেয়েও বেশি ইস্তানবুল। নয় বছরের অপেক্ষার পরে মিলনের মুহূর্তে তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে পুরোনো চলচ্চিত্রের ইস্তানবুল, তুষার-ঢাকা রাস্তা, একরঙা পোস্টকার্ড। অর্থাৎ কামনা, স্মৃতি, শহর, সিনেমা, হারানো সময়, সব একসঙ্গে জেগে ওঠে।

যাঁরা পামুকের Istanbul: Memories and the City পড়েছেন, তাঁরা এই উপন্যাসে অনেক আত্মীয় জিনিস চিনতে পারবেন: সুন্দরী মা, যে সমাজকলাম পড়ে; সদালাপী অথচ ঘরে থেকেও অনুপস্থিত বাবা; বাল্যকালের দোকানপাট; বাবার মার্সিডিজে চড়া; বসফরাসে ট্যাঙ্কারের সংঘর্ষ; আগুন দেখতে ছুটে যাওয়া শহর। শেষ দিকে পামুক একটু জোর করেই কেমালকে নিজের বোরহেসীয় ‘অন্য আমি’ বলে সাজান, যেন কেমাল এসে “সম্মানিত ওরহান পামুক”-কে অনুরোধ করেছে তার গল্প লিখতে, আর তার গোপন অ্যাপার্টমেন্টটি পামুক অ্যাপার্টমেন্ট থেকে পাঁচ দরজা দূরে। এই খেলা কখনো কিঞ্চিৎ কৃত্রিম লাগে, কিন্তু পামুকের সাহিত্যিক প্রকৃতি এমনই, সে নিজের জীবনকে কল্পকাহিনির মধ্যে, আর কল্পকাহিনিকে নিজের জীবনের মধ্যে ঢুকিয়ে দিতে ভালোবাসে।

উপন্যাসের দ্বিতীয়ার্ধে কেমাল সমাজের ভুয়া-ইউরোপীয় উচ্চবৃত্ত থেকে ক্রমশ সরে আসে, সিবেলের সঙ্গে বাগদান ভাঙে, ফুসুনের পরিবারের সাদামাটা ফ্ল্যাটে প্রতি সন্ধ্যায় টিভি দেখতে যায়, গরিব মহল্লা, কাদা-ধরা পথ, আধফোলা ফুটবল নিয়ে খেলা করা বাচ্চা, ময়লা সাইডওয়াক, আবর্জনার ড্রাম, এ সব দেখতে দেখতে শহরের এক অন্য কেন্দ্র আবিষ্কার করে। সে লিখে, যেন নিজের কেন্দ্র খুঁজতে বেরিয়েছে। এর ফলে উপন্যাসে একধরনের প্রত্যাবর্তনের সুর তৈরি হয়। আধুনিকতা, অবাধতা, পাশ্চাত্য-স্বপ্ন, যৌন স্বাধীনতা, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য, এগুলোর দৌড়ে হাঁপিয়ে উঠে কেমাল যেন পুরোনো তুরস্কের দিকে ফিরে তাকায়, যেখানে নিয়ম, সংকোচ, বিলম্ব, বাধা, এমনকি নিষেধও প্রেমকে অর্থ দেয়। ফুসুনও বইয়ের প্রথম ভাগের রঙ-করা স্বর্ণকেশী অবয়ব থেকে ধীরে ধীরে নিজের কালো চুলে ফিরে আসে। যেন নকল আধুনিকতার রং ধুয়ে গিয়ে দেশজ অবয়ব ফের দৃশ্যমান হয়।

এখানে পামুক কিছুটা রক্ষণশীল বলেও মনে হতে পারে। যেন তিনি বলছেন, নিষেধ আর সংযম ছাড়া আবেগের ছন্দ ভেঙে যায়। কিন্তু ব্যাপারটা এত সরলও নয়। তিনি আসলে দেখান, মুক্তির নামে যেটা আসছে, তা অনেক সময় অনুকরণ, বাজার, প্রদর্শন, সামাজিক কপটতা আর অসম ক্ষমতার নেটওয়ার্কে জড়ানো। ফলে ‘পুরোনো’ আর ‘নতুন’-র সরল দ্বন্দ্বে তিনি থামেন না; বরং দেখান, উভয়ের ভেতরেই ফাঁক, অভাব, হীনম্মন্যতা, নিষ্ঠুরতা, আকর্ষণ সবই আছে।

পামুকের শক্তি শেষ পর্যন্ত এই দ্বিমুখিতায়। একদিকে তিনি ইস্তানবুলের নকল-সুসমাজকে এমন নির্দয় সূক্ষ্মতায় আঁকেন যে তার পাউডার-ঢাকা মুখের নিচের কাঁপুনি দেখা যায়। অন্যদিকে শহরের পেছনের গলি, পুরোনো পাড়া, দরিদ্র বাড়ি, বসফরাসের ধারে সিনেমা-বাগান, গরিব অথচ জীবন্ত লোকাল সংস্কৃতি, এগুলোকেও তিনি এমন টান দিয়ে লেখেন যে মনে হয় এখানেই শহরের আসল শ্বাস।

উচ্চাকাঙ্ক্ষী চলচ্চিত্রকাররা গদার বা ত্রুফোর তুর্কি সংস্করণ বানাতে চায়, কিন্তু জীবনধারণের জন্য নরম-পর্ন বানাতে বাধ্য হয়। এ দৃশ্য যেমন হাস্যকর, তেমনই বেদনাদায়ক। ইস্তানবুল এখানে সর্বত্র বিভক্ত, সর্বত্র অর্ধেক, সর্বত্র অনুকরণ আর আকাঙ্ক্ষার মাঝখানে দুলছে। পামুককে পড়তে পড়তে বোঝা যায়, তিনি যত গভীরভাবে নিজের শহরের ভেতর ড্রিল করেন, ততই তা কেবল তুরস্কের গল্প থাকে না। দিল্লি, বোম্বে, কারাকাস, আম্মান, টোকিও, এমনকি নানা উন্নয়নোন্মুখ সমাজের মধ্যবিত্ত উচ্চবর্গের অভিজ্ঞতাও এতে প্রতিধ্বনিত হয়। গ্লোবাল হতে চাওয়া, কিন্তু নিজের হতে না-পারা; নিজের হতে চাওয়া, কিন্তু গ্লোবাল মান্যতার আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করতে না-পারা, এই দ্বন্দ্ব আধুনিক বিশ্বের এক বিরাট অংশেরই জীবনগত অভিজ্ঞতা। ফলে পামুক যত বেশি ইস্তানবুলের হন, তত বেশি আন্তর্জাতিক হয়ে ওঠেন।

উপন্যাসের শেষে জাদুঘর-প্রকল্পের কথা আসতে আসতে স্পষ্ট হয়, এটি হারানো সময়ের সন্ধান। কেমাল ৫,৭২৩টি জাদুঘর দেখেছে বলে জানায়, বিশেষত যেগুলো মনোজগতের প্রতিরূপ, যেমন স্যার জন সোয়েনের বাড়ি, এদিথ পিয়াফের জাদুঘর। এখানে প্রুস্তের প্রভাব গভীর। বস্তু হয়ে ওঠে স্মৃতির মাদেলেন। সময়কে স্থানে পরিণত করার যে কথাটি পামুক বলেন, তা তাঁর উপন্যাসেই সবচেয়ে ভালো বোঝা যায়। দাদুর ঘড়ির জায়গায় টিভি সেট এসে সময় জানানোর কাজ নিচ্ছে, “East-West” ঘড়ি সমাজের ছিন্ন-সময়কে দৃশ্যমান করছে, এবং বস্তুগুলি শুধুই জিনিস নয়, তারা স্মৃতি, সামাজিক আবেগ, শ্রেণি, ব্যর্থতা, আকাঙ্ক্ষা, রুচি, অনুকরণ, সবকিছুর পাত্র।

পামুকের সাহিত্যজীবনের দিক থেকেও ‘দ্য মিউজিয়াম অব ইনোসেন্স’ তাৎপর্যপূর্ণ। ‘স্নো’ উপন্যাসে তিনি দ্রুতগামী, সামনের দিকে ধাবিত কাহিনির মধ্যে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিভ্রান্তি ধরেছিলেন। ‘মাই নেম ইজ রেড’ আর ‘দ্য ব্লাক বুক’-এ ছিল শৈল্পিক কসরত, পরিচয়-সঙ্কটের চক্কর, জটিল নির্মাণ।  ‘ইস্তানবুল’-এ তিনি গাঢ় বিষণ্নতার সুরে গিয়েছিলেন। ‘দ্য মিউজিয়াম অব ইনোসেন্স’-এ এসে তিনি যেন এই সবকিছুকে একত্র করলেন: প্রেমের গল্প, স্মৃতির উপাসনা, সামাজিক নৃতত্ত্ব, বস্তু-সংস্কৃতি, শহরের মানসিক মানচিত্র, এবং ব্যক্তিগত উন্মত্ততা।

পামুকের নিজের জীবনও পরে তাঁরই উপন্যাসের মতো বিদ্রূপাত্মক হয়ে ওঠে। ২০০৫ সালে আর্মেনীয় ও কুর্দিদের হত্যাকাণ্ড নিয়ে এক সুইস পত্রিকায় মন্তব্য করার পর তাঁকে ‘জাতীয় চরিত্র অবমাননা’-র অভিযোগে আদালতে টেনে নেওয়া হয়; পরে তিনি খালাস পান, ২০০৬-এ নোবেলও পান, কিন্তু নিজের ভালোবাসার শহরেই ক্রমে একধরনের একঘরে অবস্থায় পড়েন। নিউইয়র্কে কাটানো নির্বাসিত সময় তাকে আরও বেশি স্মৃতিসংগ্রাহক করে তুলেছে। তিনি যেন ইস্তানবুলের প্রতিটি লিন্ডেন গাছ, হালুয়া-বিক্রেতা, গলি, জানালা, পর্দা, পুরোনো ফ্ল্যাট, সামান্য বস্তু, সবকিছুকে লিখে, গুছিয়ে, কাঁচে তুলে, পৃথিবীর সামনে রাখতে চাইছেন, যেন হারিয়ে যাওয়ার আগে অন্তত নাম ধরে ডাকা যায়।

সব মিলিয়ে পামুকের ইস্তানবুল কোনো postcard নয়, কোনো civilizational slogan নয়, কোনো cheap east-meets-west গল্পও নয়। এটি এমন এক শহর, যেখানে আধুনিকতা আসে নকল যন্ত্রের আকারে, ইউরোপ আসে ব্র্যান্ড-সচেতনতায়, ঐতিহ্য ফিরে আসে লজ্জা আর কৌতূহলের মিশ্র ভঙ্গিতে, প্রেম বসে থাকে সিগারেটের ছাইয়ের পাশে, আর স্মৃতি ধীরে ধীরে ধর্মের জায়গা দখল করে।

পামুকের বড়ো শক্তি এই যে, তিনি দেশকে তত্ত্বে নয়, জিনিসে ধরেন; ইতিহাসকে স্লোগানে নয়, পরিবারের আসবাবে ধরেন; আত্মপরিচয়কে ঘোষণায় নয়, সংকোচে ধরেন। তাই তাঁর ইস্তানবুল পড়তে পড়তে মনে হয়, শহর মানে শুধু রাস্তা, সেতু, মসজিদ, প্রাসাদ না; শহর মানে মানুষ কীভাবে নিজের অনুকরণে বাস করে, কীভাবে নকল জিনিসে সত্যিকারের বেদনা জমা রাখে, আর কীভাবে হারানো সময়ের প্রতি ভালোবাসা দিয়ে নিজের ক্ষত বাঁচিয়ে রাখে।

**********

লেখক পরিচিতি : প্রাবন্ধিক, অনুবাদক এবং 'বইয়ের হাট' আন্দোলনের স্থপতি। বসবাস করছেন যুক্তরাষ্ট্রে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ