অনুবাদ : দীপ মণ্ডল
উমবের্তো একো ইতালির এক বহুমুখী চিন্তাবিদ, উপন্যাসিক, দার্শনিক, সেমিওটিক্স (চিহ্নতত্ত্ব) বিশেষজ্ঞ, এবং সাংস্কৃতিক সমালোচক। তিনি একাধারে মধ্যযুগীয় ইতিহাস, ভাষা, সাহিত্য ও গণসংস্কৃতি নিয়ে গভীর গবেষণা করেছেন। তার সবচেয়ে বিখ্যাত উপন্যাস The Name of the Rose (১৯৮০)। উপন্যাসটিতে একটি মঠে সংঘটিত রহস্যময় হত্যাকাণ্ডের গল্পের মাধ্যমে জ্ঞান, ধর্ম, এবং ক্ষমতার সম্পর্ক বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এই বইটি বিশ্বজুড়ে বিপুল জনপ্রিয়তা পায় এবং পরে চলচ্চিত্রেও রূপান্তরিত হয়।
একোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ ‘
ফুকোর পেন্ডুলাম’, যেখানে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব, ইতিহাস ও কল্পনার মিশ্রণে আধুনিক মানসিকতার সমালোচনা করা হয়েছে। একাডেমিক জগতে একো বিশেষভাবে পরিচিত তার সেমিওটিক্স বিষয়ক কাজের জন্য, বিশেষ করে
A Theory of Semiotics গ্রন্থটি উল্লেখযোগ্য। তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে চিহ্ন ও ভাষা মানুষের চিন্তা ও সংস্কৃতিকে গঠন করে। উমবের্তো একো এমন এক চিন্তাবিদ, যিনি জনপ্রিয় সাহিত্য ও গভীর তাত্ত্বিক বিশ্লেষণকে একত্রে নিয়ে এসে আধুনিক বৌদ্ধিক জগতে এক অনন্য অবস্থান তৈরি করেছেন।
ফুকোর পেন্ডুলাম উপন্যাসটি কেবল একটি কাহিনি নয়, বরং আধুনিক মানুষের চিন্তার ভেতরের এক গভীর প্রবণতাকে উন্মোচন করে : সবকিছুর মধ্যে গোপন অর্থ ও ষড়যন্ত্র খোঁজার প্রবণতা। উমবের্তো একো এখানে দেখিয়েছেন, কীভাবে মানুষ বিচ্ছিন্ন তথ্য, ইতিহাস, প্রতীক ও কল্পনাকে জোড়া লাগিয়ে এমন এক ‘মাস্টার প্ল্যান’ তৈরি করে, যা ধীরে ধীরে তার নিজের কাছেই সত্য হয়ে ওঠে। এই দৃষ্টিভঙ্গি উপন্যাসটিকে কেবল সাহিত্যিক নয়, দার্শনিক ও সাংস্কৃতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে, বিশেষ করে এমন এক সময়ে, যখন ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ও ভুল ব্যাখ্যা সমাজে ক্রমশ প্রভাব বিস্তার করছে।
এই কারণেই একো ব্যাপক প্রশংসা পেয়েছেন একজন দূরদর্শী চিন্তাবিদ হিসেবে। অনেক সমালোচকের মতে, তিনি অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে দেখিয়েছেন ‘overinterpretation’ বা অতিরিক্ত ব্যাখ্যার বিপদ, যেখানে অর্থ খোঁজার আকাঙ্ক্ষা শেষ পর্যন্ত বিভ্রান্তি ও আত্মপ্রতারণায় রূপ নেয়। তার জ্ঞানভাণ্ডারের বিস্তার, মধ্যযুগীয় ইতিহাস, গোপন সংগঠন, ধর্মতত্ত্ব, কাবালা, প্রতীকবিদ্যা—সবকিছুকে একত্রে বুনে ফেলার ক্ষমতা সমালোচকদের মুগ্ধ করেছে।
ফলে তাকে অনেকেই এমন একজন লেখক হিসেবে দেখেছেন, যিনি জনপ্রিয় গল্পের ভেতর দিয়ে গভীর তাত্ত্বিক আলোচনা চালাতে পারেন।
-----------------------------------------------------------------------------------
ফুকোর পেন্ডুলাম
প্রথম অধ্যায়
১.
ঠিক তখনই দোলকটা আমার চোখে পড়ল।
গির্জার কোয়্যার-এর ছাদ থেকে একটা লম্বা তারে ঝুলছে সেই বিশাল গোলক। এক আশ্চর্য রাজকীয় মহিমায় সে দুলছে—সময়ের এক নিখুঁত ছন্দে এপাশ থেকে ওপাশ।
আমি জানতাম—তবে ওই মায়াবী শান্ত নিশ্বাসের মতো দুলুনির ভেতরে যে কেউই সেটা টের পেত—যে, গোলকটার এই দোলার সময়টা আসলে নির্ধারিত হচ্ছে তারের দৈর্ঘ্যের বর্গমূল আর ‘পাই’ (π)-এর অমোঘ নিয়মে।, আর সেই বিশেষ সংখ্যাটি—মর্ত্যের মানুষের কাছে যা যতই অবাস্তব বা গোলমেলে ঠেকুক না কেন, এক উচ্চতর যুক্তিবোধে সমস্ত বৃত্তের পরিধি আর ব্যাসকে তা বেঁধে রেখেছে অবিচ্ছেদ্য বন্ধনে। গোলকটির এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে দুলতে যেটুকু সময় লাগছিল, তা যেন শাশ্বত পরিমাপগুলোর এক গূঢ় চক্রান্তের ফল। ঝুলন-বিন্দুর অদ্বৈত সত্তা, সমতলের দ্বিমাত্রিক বিস্তার, ‘পাই’ (π)-এর শুরুর সেই তিন সংখ্যার রহস্য, বর্গমূলের গোপন প্রকৃতি, আর বৃত্তের সেই অসীম পূর্ণতা—সবাই মিলেমিশে ঠিক করে দিচ্ছিল সেই দোলনের আয়ুষ্কাল।
আমার এও জানা ছিল, মেঝের ঠিক নিচে খুব গোপনে বসানো আছে এক চৌম্বক-যন্ত্র। গোলকটির ঠিক বুকের ভেতর লুকিয়ে থাকা এক চোঙাকে সে নিঃশব্দে নির্দেশ পাঠিয়ে চলেছে, আর তার ফলেই জিইয়ে আছে এই অবিরাম দুলুনি। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে এ এক যান্ত্রিক কারসাজি, কিন্তু আসলে তা নয়। এই যন্ত্রটি দোলকের সেই আদি ও অকৃত্রিম নিয়মকে ক্ষুণ্ণ করছিল না, বরং তাকেই মূর্ত করে তুলছিল। কারণ, বাতাসহীন এক পরম শূন্যতায়, ঘর্ষণহীন এক জগতে, ওজনহীন ও অনমনীয় তারে ঝুলে থাকা কোনো বস্তু তো অনন্তকাল ধরেই দুলে চলে—তা থামানোর সাধ্য কারো নেই।
বিশাল সব রঙিন কাঁচের জানালা চুঁইয়ে আসা সূর্যের শেষ রশ্মিটুকু এসে পড়ছিল তামার গোলকটির গায়ে, আর তা থেকে ঠিকরে বেরোচ্ছিল এক ম্লান, চঞ্চল আভা। গির্জার মেঝেতে যদি আগের মতোই ভেজা বালির আস্তরণ বিছানো থাকত, আর গোলকের তীক্ষ্ণ ডগাটা যদি সেই বালি আলতো করে ছুঁয়ে যেত—তবে প্রতিটি দোলনে ফুটে উঠত সরু সরু সব আঁচড়। খুব গোপনে, অগোচরে সেই আঁচড়গুলো দিক বদলাত, ক্রমশ চওড়া হয়ে তৈরি করত এক অদ্ভুত জ্যামিতিক নকশা—যেন কোনো মন্ত্রপূত মণ্ডল, পঞ্চকোণ, কোনো তারা, কিংবা এক মরমী গোলাপ। না, ঠিক তা নয়। বরং মনে হতো যেন এক বিশাল মরুভূমির বুকে লেখা কোনো আদিম উপাখ্যান, অগণিত যাযাবর কাফেলার ফেলে যাওয়া পায়ের ছাপ। এ এক ধীরলয়, হাজার বছরের দেশান্তরের গল্প—যেমনটা ঘটেছিল যখন আটলান্টিসের মানুষেরা মিউ মহাদেশ ছেড়ে একবুক জেদ নিয়ে পাড়ি জমিয়েছিল তাসমানিয়া থেকে গ্রিনল্যান্ডে, মকরক্রান্তি থেকে কর্কটক্রান্তিতে, প্রিন্স এডওয়ার্ড দ্বীপপুঞ্জ থেকে সভালবার্ডে। এক তুষারযুগ থেকে আরেক তুষারযুগের মাঝখানের সেই সুদীর্ঘ ইতিহাসকে দোলকের ডগাটি যেন এক চিলতে সময়ের মধ্যে নতুন করে লিখছিল। প্রভুদের সেই বার্তাবাহকেরা হয়তো এখনও সেই কাজই করে চলেছে। সামোয়া থেকে নোভায়া জেমলিয়া যাওয়ার পথে ওই ডগাটি হয়তো ছুঁয়ে যাচ্ছিল পৃথিবীর নাভি—সেই অগারথা-কে। আমার মনে হচ্ছিল, উত্তরের বাতাসের ওপারে থাকা অ্যাভালন আর দক্ষিণের মরুভূমিতে শুয়ে থাকা রহস্যময় আয়ার্স রক—সবই যেন এক অদৃশ্য সূত্রে গাঁথা। তেইশে জুনের সেই বিকেল চারটেয়, দোলকটি তখন তার দোলনের এক প্রান্তে পৌঁছে গতি কমিয়ে এনেছে। তারপর আবার বড় অলস ভঙ্গিতে মাঝখানের দিকে গড়িয়ে এল, পথেই কুড়িয়ে নিল গতিবেগ, আর তারপর খুব আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে চিরে দিয়ে গেল সেই অদৃশ্য সামান্তরিক শক্তিবলয়কে—যা তার অমোঘ নিয়তি।
তেইশে জুনের সেই বিকেল চারটেয়, পেন্ডুলামটা তখন দোলনের একেবারে শেষ প্রান্তে পৌঁছে কেমন যেন শ্লথ হয়ে এল। তারপর এক অদ্ভুত আলস্যে গা এলিয়ে আবার গড়িয়ে নামতে লাগল কেন্দ্রের দিকে—পথে সঞ্চয় করে নিল বেগ। বলবিদ্যার যে অদৃশ্য সামান্তরিক ছক তার নিয়তি হয়ে আছে, তাকেই যেন এক সুদৃঢ় প্রত্যয়ে চিরে দিয়ে বেরিয়ে গেল সে।
ঘন্টার পর ঘন্টা যদি আমি ওখানে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতাম, আর অপলক চেয়ে থাকতাম শূন্যে দুলতে থাকা ওই বস্তুটার দিকে—কখনও মনে হয় পাখির মাথা, কখনও বর্শার ফলা, কখনও বা উল্টানো শিরস্ত্রাণ—সে যখন শূন্যের বুকে কোনাকুনি পথ কাটছে, ছুঁয়ে যাচ্ছে তার বিষম পরিধির এমাথা-ওমাথা, তবে আমি নিশ্চিত এক মায়ার ফাঁদে পড়তাম। আমার মনে হতো, দোলকটা যেন তার দোলনের তল ধরে পুরো একটা চক্কর শেষ করে বত্রিশ ঘণ্টা পর আবার ফিরে এল তার শুরুর বিন্দুতে। তৈরি করল এক উপবৃত্ত, যা অক্ষাংশের জ্যামিতিক নিয়মে নিজের কেন্দ্রের চারপাশেই ঘুরপাক খাচ্ছে। সলোমনের মন্দিরের গম্বুজ থেকে ঝোলানো থাকলে এর ঘোরার ভঙ্গিটা কেমন হতো? কে জানে, সেই নাইটরাও হয়তো সেখানে দাঁড়িয়ে এই একই চেষ্টা করে দেখেছিল। হয়তো এর সমাধান, এর শেষ অর্থটা সেই একই দাঁড়াত। হয়তো সেঁ-মার্তা-দে-শঁ-র এই গির্জাই সেই আসল মন্দির। সে যাই হোক, এই পরীক্ষাটা একেবারে নিখুঁত হতো একমাত্র পৃথিবীর মেরু-বিন্দুতে দাঁড়িয়ে। একমাত্র সেখানেই পৃথিবীর বর্ধিত অক্ষের ওপর ঝুলে থাকা দোলকটি চব্বিশ ঘণ্টায় তার পূর্ণ আবর্তন শেষ করতে পারত।
নিয়মের এই যে ব্যত্যয়—যা আসলে ওই নিয়মেরই অঙ্গ—তাতে কিন্তু এই দৃশ্যটার অলৌকিক মহিমা এতটুকুও ক্ষুণ্ণ হয়নি। আমি মনেপ্রাণে জানতাম, পৃথিবীটা ঘুরছে। তার সঙ্গে আমিও ঘুরছি, ঘুরছে এই সেঁ-মার্তা-দে-শঁ, ঘুরছে সমস্ত প্যারিস। আমরা সবাই যেন ওই দোলকটার নিচে ক্রমাগত ঘুরে চলেছি। কিন্তু দোলকটি? সে তার নিজস্ব তলে অটুট, দিকভ্রষ্ট হয় না কক্ষনো। কারণটা বড় গভীর। ওই গির্জার ছাদ ফুঁড়ে, তারটির কাল্পনিক রেখা ধরে যদি অসীমে—সেই সুদূর ছায়াপথের দিকে—তাকানো যায়, তবে সেখানেই রয়েছে ব্রহ্মাণ্ডের সেই একমাত্র স্থির বিন্দু। অনন্তকাল ধরে সে একজায়গাতেই দাঁড়িয়ে আছে, তার কোনো নড়চড় নেই।
তাই আমার চোখ তখন আর মাটির পৃথিবীর দিকে ছিল না, আমার দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল উর্ধ্বাকাশে—যেখানে উদযাপিত হচ্ছিল পরম স্থিরতার এক গভীর রহস্য। দোলকটি আমাকে যেন ফিসফিস করে বলছিল—সব কিছুই চলমান। পৃথিবী, সৌরমণ্ডল, নীহারিকা, কৃষ্ণগহ্বর—মহাজাগতিক প্রসারণের অগণিত সন্তান সবাই ছুটে চলেছে। কিন্তু এর মাঝেও একটি বিন্দু অচল, অটল। সে যেন এক আলম্ব, এক কীলক, কিংবা এক পরম আংটা—যাকে কেন্দ্র করে লাট্টুর মতো ঘুরছে এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড। আর আমি তখন সেই পরম অভিজ্ঞতার অংশীদার হয়ে উঠেছি। সবার সঙ্গে আমিও ভেসে চলেছি গতিপথে, কিন্তু আমি দেখতে পাচ্ছিলাম সেই ‘এক’-কে। তিনিই সেই অটল শিলা, সেই পরম নিশ্চয়তা। এক জ্যোতির্ময় কুয়াশা—যার কোনো শরীর নেই, আকার নেই, ওজন নেই; যার কোনো পরিমাণ বা গুণমান নেই। যিনি দেখেন না, শোনেন না, যাকে ইন্দ্রিয় দিয়ে ছোঁয়া যায় না। যিনি কোনো স্থানে নেই, কোনো কালে নেই। তিনি আত্মা নন, বুদ্ধি নন, কল্পনা বা মতামত নন। তিনি সংখ্যা নন, ক্রম নন, এমনকি পরিমাপও নন। তিনি অন্ধকারও নন, আলোও নন। তিনি ভ্রম নন, আবার সত্যও নন।
হঠাৎ আমার ঘোর ভাঙল একজোড়া তরুণ-তরুণীর নিস্তেজ কথাবার্তায়। ছেলেটির চোখে চশমা, আর মেয়েটির দুর্ভাগ্য—তার চোখে চশমা নেই।
ছেলেটি বলছিল, “এটা হলো ফুকোর দোলক। ১৮৫১ সালে একটা মাটির নিচের কুঠুরিতে এর প্রথম পরীক্ষা হয়েছিল। তারপর দেখানো হলো মানমন্দিরে, আর পরে প্যান্থিয়নের সেই বিশাল গম্বুজের নিচে—সাতষট্টি মিটার লম্বা তার আর আঠাশ কেজি ওজনের গোলক ঝুলিয়ে। ১৮৫৫ সাল থেকে এটা এখানেই আছে, একটু ছোট মাপে, ওই খিলানের মাঝখানের ফুটোটা থেকে ঝোলানো।”
“এটা কী করে? শুধুই ঝুলে থাকে?”
“এটা প্রমাণ করে যে পৃথিবী ঘুরছে। যেহেতু ঝুলে থাকার বিন্দুটা নড়ছে না...”
“কেন নড়ে না?”
“আরে, কারণ বিন্দুটা... মানে একেবারে মাঝখানের যে বিন্দুটা... ওটা তো একটা জ্যামিতিক বিন্দু। ওটা তুমি দেখতে পাবে না, কারণ ওর কোনো আয়তন নেই। আর যার কোনো আয়তন নেই, সে নড়বে কী করে? ডানে-বাঁয়ে, ওপরে-নিচে কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই তার। তাই পৃথিবীর সাথে সে ঘোরে না। বুঝলে? এমনকি সে নিজের চারপাশেও ঘোরে না। কারণ তার কোনো ‘নিজ’ বলে কিছু নেই।”
“কিন্তু পৃথিবী তো ঘোরে।”
“পৃথিবী ঘোরে, কিন্তু ওই বিন্দুটা ঘোরে না। এটাই নিয়ম। আমার কথা বিশ্বাস করে নাও।”
মেয়েটি উদাস মুখে বলল, “হবে হয়তো। ওটা বোধহয় পেন্ডুলামেরই ব্যাপার।”
বোকা! মেয়েটার মাথার ঠিক ওপরেই তো ছিল এই মহাবিশ্বের একমাত্র স্থির স্থানটি, এই নিরন্তর বয়ে চলা সর্বনাশা স্রোত থেকে বাঁচার একমাত্র আশ্রয়—অথচ সে কিনা ভাবল, ওটা পেন্ডুলামের মাথাব্যথা, তার নয়! একটু পরেই ওরা চলে গেল। ছেলেটা তো কোনো এক পাঠ্যবইয়ের বুলি আউড়ে বড় হয়েছে, যা তার অবাক হওয়ার ক্ষমতাটাকেই ভোঁতা করে দিয়েছে। আর মেয়েটা অসাড়, অসীমের সেই শিহরণ অনুভব করার কোনো বোধই তার নেই। ওরা টেরও পেল না যে, ওদের এই দেখাই ছিল সেই পরম সত্তার সঙ্গে প্রথম এবং শেষ মোলাকাত—যিনি ‘এক’, যিনি ‘আইন-সফ১’, যিনি অনির্বচনীয়। এই পরম নিশ্চয়তার বেদীর সামনে নতজানু না হয়ে মানুষ থাকে কী করে?
আমি ভক্তি আর ভয় মেশানো চোখে তাকিয়ে রইলাম। ঠিক সেই মুহূর্তে আমার মনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মাল—জ্যাকোপো বেলবো ঠিকই বলেছিলেন। পেন্ডুলাম সম্পর্কে তিনি যা যা বলেছিলেন, আমি সেগুলোকে এতকাল এক ধরণের নান্দনিক প্রলাপ বলেই ধরে নিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, তাঁর আত্মার গভীরে এক নিরাকার ক্যান্সার দানা বাঁধছে, যা তাঁর অজান্তেই একটা নিছক খেলাকে বাস্তবে পরিণত করে ফেলছে। কিন্তু পেন্ডুলামের ব্যাপারে তিনি যদি সঠিক হন, তবে হয়তো বাকি সব কিছুই সত্যি: সেই মহাপরিকল্পনা, সেই বিশ্বজনীন চক্রান্ত। আর সেক্ষেত্রে, এই গ্রীষ্ম-অয়নান্তের ঠিক আগের মুহূর্তে আমার এখানে চলে আসাটা ভুল ছিল না। জ্যাকোপো বেলবো পাগল ছিলেন না; তিনি নেহাতই খেলার ছলে আচমকা এক অমোঘ সত্যের দরজায় কড়া নেড়েছিলেন।
কিন্তু মুশকিল হলো, সেই পরম অলৌকিক বা দৈব সত্তার মুখোমুখি হওয়ার যে অভিজ্ঞতা—তা মানুষের মাথার ঠিক রাখতে খুব একটা সময় দেয় না।
তখন আমি চোখ সরানোর চেষ্টা করলাম। অর্ধবৃত্তাকারে সাজানো থামগুলোর মাথা থেকে উঠে যাওয়া বাঁকগুলোকে অনুসরণ করলাম—যেগুলো গম্বুজের পাঁজরের গা বেয়ে উঠে গেছে একেবারে মাঝখানের সেই চাবি-পাথরের দিকে। সুচালো খিলানের সেই রহস্য যেন ওখানেই প্রতিফলিত। আসলে ওটা এক পরম, নিশ্চল ভণ্ডামি—যা দাঁড়িয়ে আছে এক শূন্যতার ওপর। সে স্তম্ভগুলোকে বিশ্বাস করায় যে তোমরাই ওই প্রকাণ্ড হাড়-পাঁজরগুলোকে ওপরের দিকে ঠেলে তুলে ধরে আছো; আর ওদিকে ওই পাঁজরগুলোকে বিশ্বাস করায় যে তোমরাই আসলে স্তম্ভগুলোকে মাটির সঙ্গে চেপে ধরে রেখেছো। ওই গম্বুজের ছাদটাই সব, আবার আসলে সে কিছুই নয়; সে একাধারে কারণ, আবার নিজেই তার ফলাফল। কিন্তু তখনই আমার মনে হলো—যে ছাদ থেকে দোলকটা ঝুলছে, সেই দোলককে উপেক্ষা করে শুধু ছাদ বা খিলানের কারুকাজ দেখাটা বোকামি। এ যেন উৎসের সন্ধান না করে শুধু স্রোতের জলেই মাতাল হয়ে যাওয়া।
সেঁ-মার্তা-দে-শঁ-র ওই প্রার্থনা-কক্ষটির অস্তিত্ব কেবল একটিই কারণে—যাতে সেই মহাজাগতিক নিয়ম মেনে দোলকটি ওখানে থাকতে পারে; আবার দোলকটি আছে বলেই ওই কক্ষটির অস্তিত্ব। ওরা একে অপরের পরিপূরক। আমি মনে মনে নিজেকে বললাম, এক অসীম থেকে পালিয়ে অন্য অসীমে আশ্রয় নেওয়া যায় না। নানারকমের ভিড়ে, সেই ‘বহু’-র মায়ার আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে—সেই ‘এক’-এর ধ্রুব প্রকাশকে এড়ানো অসম্ভব।
গম্বুজের খিলানের একেবারে মাঝখানের সেই পাথরটা থেকে কিছুতেই চোখ সরাতে পারছিলাম না। ওদিকে নজর রেখেই আমি পা-পা করে পিছন দিকে হাঁটতে লাগলাম। আসলে ওই কয়েক মিনিটেই ওখানকার পথঘাট আমার একেবারে মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল। আমার দু’পাশ দিয়ে বড় বড় সব ধাতব কচ্ছপ২ যেন সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে ছিল; এতই বিশাল তাদের আকার যে চোখের কোণ দিয়েও বেশ টের পাচ্ছিলাম তাদের ভারিক্কি উপস্থিতি। আমি গির্জার মাঝখানের লম্বা হলঘরটি ধরে সদর দরজার দিকে পিছিয়ে যাচ্ছিলাম। আর ঠিক তখনই আমার মাথার ওপর আবার যেন ছায়া ফেলল তার আর পুরোনো-পচা ক্যানভাস দিয়ে তৈরি সেইসব ভয়ংকর প্রাগৈতিহাসিক পাখিরা। যেন অদ্ভুত সব রাক্ষুসে ফড়িং, কোনো এক অজানা গোপন শক্তি হলঘরটার ছাদ থেকে ওদের ঝুলিয়ে রেখেছে। আমার কাছে ওদের নিছক কোনো শিক্ষামূলক প্রদর্শনী মনে হচ্ছিল না, বরং মনে হচ্ছিল ওরা যেন গভীর কোনো জ্ঞানের এক রূপক—তার চেয়েও অনেক বেশি অর্থবহ। জুরাসিক যুগের পোকামাকড় আর সরীসৃপদের একটা আস্ত ঝাঁক। দোলকটা তার দুলুনিতে যেমন পৃথিবীর বুকে ঘটে যাওয়া দীর্ঘ দেশান্তরের এক গল্প বলে যাচ্ছিল, এরাও যেন তারই এক প্রতীক। রেগে ওঠা কোনো আদিম আর্কন৩-এর মতো তারা তাদের আর্কিওপটেরিক্স৪-এর লম্বা ঠোঁট দিয়ে আমাকে নিশানা করে ছিল। তুমি শুনলে হয়তো অবাক হবে, এগুলো আসলে ছিল ব্রেগে, ব্লেরিও, এনো-র তৈরি আদিম সব উড়োজাহাজ আর দুফো-র সেই হেলিকপ্টার।
প্যারিসের কঁজারভেতোয়ার দেজ আর্স এ মেতিয়ে৫-তে ঢুকতে গেলে প্রথমেই তোমাকে পেরোতে হবে আঠারো শতকের এক পুরনো উঠোন। তারপর তুমি গিয়ে পড়বে এক প্রাচীন গির্জার ভেতর। জায়গাটা এখন একালের একটা বড় কাঠামোর অংশ হলেও, গোড়ার দিকে এটা ছিল একটা মঠেরই অংশ। ভেতরে পা রেখেই তুমি থমকে যাবে এক অদ্ভুত চক্রান্তের সামনে। তুমি অবাক হয়ে দেখবে, স্বর্গের সুচালো খিলানের৬ সেই পবিত্র, মহিমান্বিত জগতের ঠিক পাশেই কেমন গায়ে গা লাগিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তেল-খেকো যন্ত্রপাতির এক অন্ধকার পাতালপুরী।
মেঝে বরাবর সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে নানা রকমের সব যানবাহন—সাইকেল, ঘোড়াবিহীন শকট আর মোটরগাড়ির দল। ওদিকে ছাদ থেকে ঝুলছে উড়োজাহাজ। এর মধ্যে কিছু জিনিস এখনো বেশ আস্ত আছে, যদিও সময়ের কামড়ে রং চটেছে, মরচেও ধরেছে বেশ। দিনের আলো আর বিজলি বাতির এক অদ্ভুত, মায়াবী আলোআঁধারিতে সেগুলোর গায়ে যেন একটা পুরোনো বেহালার পালিশের মতো কালচে আস্তরণ পড়ে গেছে। বাকিগুলো আবার স্রেফ কঙ্কাল বা খাঁচা হয়ে আছে—নানা রকম লোহার রড আর ক্র্যাঙ্কের এমন জটলা, যা দেখলে মনে হয় যেন অবর্ণনীয় কোনো যন্ত্রণার ভয় দেখাচ্ছে। দৃশ্যটা দেখলে তুমি শিউরে উঠে ভাববে—তোমাকে বুঝি এমনি কোনো নির্যাতন-মঞ্চে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রাখা হয়েছে, আর যন্ত্রণাদায়ক কিছু একটা তোমার মাংসে গেঁথে যাচ্ছে, যতক্ষণ না তুমি নিজের সব দোষ কবুল করছ।
একসময়ের সেই সচল, আর এখন একেবারে অচল প্রাচীন যন্ত্রপাতির সারি ছাড়িয়ে গেলে সেই প্রার্থনা-কক্ষটি। ওই যন্ত্রগুলোর আত্মায় এখন শুধুই মরচে। তারা এখন নেহাতই প্রযুক্তির অহংকারের একটা নমুনা হয়ে দর্শনার্থীদের ভক্তি কুড়োচ্ছে। কক্ষটার বাঁদিকে পাহারায় দাঁড়িয়ে আছে বার্থোল্ডির৭ গড়া স্ট্যাচু অব লিবার্টির একটা ছোট প্রতিরূপ, যা তিনি অন্য এক জগতের জন্য বানিয়েছিলেন। আর ডানদিকে দাঁড়িয়ে আছে প্যাসকালের৮ মূর্তি। এখানে দুলতে থাকা দোলকটার দু’পাশে এমন সব জিনিস রাখা, যা দেখলে মনে হয় কোনো পাগল পতঙ্গবিশারদের দেখা দুঃস্বপ্ন—যেন পোকামাকড়ের চেলা, চোয়াল, শুঁড়, খণ্ড খণ্ড দেহ আর ডানা। এগুলো আসলে যান্ত্রিক লাশের এক গোরস্থান, তবে দেখলে মনে হয় যেন যেকোনো মুহূর্তেই আবার চালু হয়ে যেতে পারে—ম্যাগনেটো, সিঙ্গল-ফেজ ট্রান্সফরমার, টারবাইন, কনভার্টার, স্টিম ইঞ্জিন আর ডায়নামো। দোলকটা ছাড়িয়ে পেছনের দিকের ঘোরানো বারান্দায় রাখা আছে অ্যাসিরীয়, ক্যালডীয় আর কার্থেজের সব প্রাচীন মূর্তি। যেন সেই বিশাল সব বাল৯ দেবতা, অনেক কাল আগে যাদের পেট গনগনে আগুনে লাল হয়ে থাকত। আর যেন সেই নুরেমবার্গের কুমারী১০ কন্যারা, যাদের হৃদয়ে আজও বিঁধে আছে অজস্র নগ্ন পেরেক: শুনলে অবাক হবে, এগুলো একসময়ের উড়োজাহাজ বা বিমানের ইঞ্জিন। এখন এরা দোলকটার আরাধনায় মেতে উঠে এক ভয়ংকর নকল মালার মতো তাকে ঘিরে রেখেছে। দৃশ্যটা দেখলে তোমার মনে হবে, যুক্তি আর নবজাগরণের সন্তানদের যেন চিরকালের জন্য অভিশাপ দিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে—যাতে তারা ঐতিহ্য আর প্রজ্ঞার সেই চূড়ান্ত প্রতীকের পাহারাদারি করে।
ডেস্কে নয় ফ্রাঁ গুণে দিয়ে, কিংবা রবিবারের বিনা পয়সার টিকিটে যে ক্লান্ত, একঘেয়েমিতে ভোগা পর্যটকেরা এখানে ঢোকে, তারা হয়তো অন্যরকম ভাবে। তুমি হয়তো তাদের জায়গায় থাকলে ভাবতে, উনিশ শতকের সেইসব বুড়োটে ভদ্রলোকেরা—নিকোটিনের চোটে যাঁদের দাড়ি হলদেটে হয়ে গেছে, জামার কলারগুলো কোঁচকানো আর তেলতেলে, কালো ক্র্যাভাট আর ফ্রক-কোট থেকে ভুরভুর করছে নস্যির গন্ধ, আঙুলে অ্যাসিডের জেদি দাগ, আর পেশাদারি হিংসেয় যাঁদের মনটাও ওই অ্যাসিডের মতোই টক হয়ে আছে, একে অপরকে শের মেত্র১১ বলে ডাকা সেই হাস্যকর ভূতের দল—তাঁরাই বোধহয় বড় কোনো পুণ্য অর্জনের আশায় এই জিনিসগুলো এখানে এমন সাজিয়ে গুছিয়ে রেখে গেছেন। উদ্দেশ্য একটাই—বুর্জোয়া আর কট্টরপন্থী করদাতাদের একটু শিক্ষিত করা, তাদের আনন্দ দেওয়া, আর সেই সঙ্গে প্রগতির চোখ-ধাঁধানো জয়যাত্রাকে একটু উদযাপন করা। কিন্তু না, ব্যাপারটা মোটেই তা নয়। সেঁ-মার্তা-দে-শঁ-র জন্ম তো আদতে একটা মঠ হিসেবে। আর অনেক পরে তা হয়ে উঠেছে একটা বৈপ্লবিক জাদুঘর, গুপ্ত আর রহস্যময় জ্ঞানের এক বিশাল আড়ত। ওই উড়োজাহাজগুলো, নিজে-নিজে চলা ওই যন্ত্রের দল, বিদ্যুত আর চুম্বকের ওই কঙ্কালগুলো—ওরা আসলে নিজেদের মধ্যে এমন এক ভাষায় কথোপকথন চালিয়ে যাচ্ছিল, যার মানে কিছুতেই তোমার-আমার মতো সাধারণের মাথায় ঢুকবে না।
ক্যাটালগটা নেহাতই ভণ্ডামির সুরে আমাকে জানাচ্ছিল যে, এই মহৎ কাজের ভাবনাটা নাকি এসেছিল কনভেনশনের১২ সেইসব ভদ্রলোকদের মাথা থেকে। তাঁদের সাধ ছিল, সাধারণ মানুষের জন্য সমস্ত শিল্প আর কারিগরির এমন একটা তীর্থস্থান গড়ে তোলা, যা খুব সহজেই সবার নাগালে থাকবে। কিন্তু সে কথা আমি বিশ্বাস করি কী করে! এই প্রকল্পটার বর্ণনা দিতে গিয়ে ঠিক সেই শব্দগুলোই তো ব্যবহার করা হয়েছে, যা ফ্রান্সিস বেকন তাঁর নিউ আটলান্টিস ১৩ বইয়ে সলোমনের সেই রহস্যময় ভবনের কথা বলতে গিয়ে লিখেছিলেন!
এমনটা কি হতে পারে যে, কেবল আমিই—আর সেই সঙ্গে জ্যাকোপো বেলবো আর দিওতাল্লেভি—আসল সত্যিটা আঁচ করতে পেরেছি? কে জানে, হয়তো আজ রাতেই আমি আমার উত্তরটা পেয়ে যাব। জাদুঘর বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরও ভেতরে ঘাপটি মেরে পড়ে থাকার একটা উপায় আমাকে বের করতেই হবে, আর তারপর এখানেই অপেক্ষা করতে হবে ঠিক মাঝরাত পর্যন্ত।
ওরা ভেতরে ঢুকবে কী করে? এ ব্যাপারে আমার বিন্দুমাত্র ধারণা ছিল না। প্যারিসের মাটির নিচে জালের মতো ছড়ানো নর্দমা আর সুড়ঙ্গের কোনো একটা গোপন পথ হয়তো শহরের অন্য কোনো মাথার সঙ্গে এই জাদুঘরটাকে জুড়ে রেখেছে—কে জানে, হয়তো সেই পোর্ত সাঁ-দেনির১৪ কাছ থেকেই। কিন্তু এটুকু আমি বেশ বুঝতে পারছিলাম, একবার যদি আমি এখান থেকে বেরিয়ে যাই, তবে ফেরার ওই গুপ্ত পথটা আর কিছুতেই খুঁজে পাব না। তাই এই বিশাল হলঘরের কোথাও না কোথাও আমাকে ঘাপটি মেরে লুকিয়ে থাকতেই হবে।
জায়গাটার ঘোর কাটিয়ে উঠে আমি গির্জার সেই মূল হলঘরটার দিকে এক্কেবারে নিরাবেগ, শীতল চোখে তাকানোর চেষ্টা করলাম। আমি এখন কোনো দিব্যজ্ঞান বা আধ্যাত্মিক উপলব্ধির খোঁজ করছিলাম না, আমার দরকার ছিল নেহাতই কিছু তথ্য। আমার মনে হলো, জাদুঘরের অন্য ঘরগুলোতে প্রহরীদের নজর এড়ানো বেশ কঠিন হবে। বন্ধ হওয়ার সময় ওরা একবার টহল দিয়ে যায়, দেখে নেয় কোথাও কোনো চোর-ছ্যাঁচড় ঘাপটি মেরে লুকিয়ে আছে কি না। কিন্তু এই হলঘরটা তো নানা রকম যানবাহনে একেবারে ঠাসা। রাত কাটানোর জন্য একজন যাত্রীর এর চেয়ে আদর্শ জায়গা আর কী হতে পারে: একটা প্রাণহীন গাড়ির ভেতর লুকিয়ে থাকা এক জ্যান্ত মানুষ! আমরা এর আগে এত রকম খেলায় মেতেছি যে, এই খেলাটাও অন্তত একবার খেলে না দেখলে আমার চলছিল না।
বুকে সাহস আনো, মনে মনে নিজেকে বললাম: এখন আর ওইসব প্রজ্ঞা বা দর্শনের কথা ভেবে কাজ নেই, বরং বিজ্ঞানেরই শরণাপন্ন হওয়া যাক।
**********
টীকা
১. আইন-সফ : আইন-সফ হলো ইহুদি কাবালাহ দর্শনে অসীম ঈশ্বর বা পরম সত্তার একটি নাম।
২. ধাতব কচ্ছপ : মিউজিয়ামে রাখা পুরোনো দিনের ইঞ্জিন ও প্রথম দিককার উড়োজাহাজগুলোকে লেখক রূপক অর্থে প্রাচীন দৈত্য বা দানবের সাথে তুলনা করেছেন।
৩. আর্কন : প্রাচীন নস্টিক (Gnostic) ধর্মতত্ত্বে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড নিয়ন্ত্রণকারী এক ধরনের আধ্যাত্মিক শক্তি, দেবতা বা শাসক।
৪. আর্কিওপটেরিক্স : ডাইনোসর এবং আধুনিক পাখিদের মাঝামাঝি পর্যায়ের এক প্রাগৈতিহাসিক ডানাওয়ালা প্রাণী। লেখক পুরোনো উড়োজাহাজের সামনের দিকটিকে এর লম্বা ঠোঁটের সঙ্গে তুলনা করেছেন।
৫. কঁজারভেতোয়ার দেজ আর্স এ মেতিয়ে : (Conservatoire des Arts et Métiers): প্যারিসের প্রাচীন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জাদুঘর। এটি আগে একটি মঠ (Priory) ও গির্জা ছিল। উপন্যাসের প্রথম অধ্যায়ের পুরো পটভূমিই হলো এই জাদুঘর।
৬. সুচালো খিলান : সুচালো খিলান বা Ogive হলো গোথিক স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্য, যা গির্জার পবিত্রতা এবং ঊর্ধ্বমুখী আধ্যাত্মিকতার প্রতীক।
৭. বার্থোল্ডি (Bartholdi) : ফরাসি ভাস্কর ফ্রেদেরিক ওগ্যুস্ত বার্থোল্ডি, যিনি আমেরিকার বিখ্যাত ‘স্ট্যাচু অব লিবার্টি’ নকশা করেছিলেন। এখানে জাদুঘরে রাখা তাঁর একটি ছোট মডেলের কথা বলা হয়েছে।
৮. প্যাসকাল (Pascal) : ব্লেজ প্যাসকাল, বিখ্যাত ফরাসি গণিতবিদ, পদার্থবিদ ও দার্শনিক।
৯. বাল (Baals) : প্রাচীন কনানীয়দের দেবতা, যাকে সন্তুষ্ট করতে জ্বলন্ত চুল্লিতে বা মূর্তির গনগনে পেটের ভেতর শিশু বলি দেওয়া হতো বলে মিথ আছে। জাদুঘরে রাখা বিমানের বিশাল ইঞ্জিনগুলোকে রূপক অর্থে এর সাথে তুলনা করা হয়েছে।
১০. নুরেমবার্গের কুমারী (Nuremberg Maidens) : মধ্যযুগের এক ভয়ংকর নির্যাতন-যন্ত্র। এটি মেয়েদের আদলে তৈরি একটি লোহার খাঁচা বা বাক্স, যার ভেতরে অজস্র লোহার পেরেক বা কাঁটা গাঁথা থাকত। ইঞ্জিনগুলোর ভেতরের কাঁটা বা তারগুলোকে এর সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।
১১. শের মেত্র (Cher maître) : ফরাসি শব্দ, যার মানে প্রিয় গুরু বা প্রিয় মাস্টার। উনিশ শতকের ফরাসি বিদ্বান বা শিল্পীরা একে অপরকে সম্মান দেখাতে, বা কখনো কখনো একটু ব্যঙ্গ করেও এই ডাকটি ব্যবহার করতেন।
১২. কনভেনশন : ফরাসি বিপ্লবের সময়ের ‘ন্যাশনাল কনভেনশন’-এর কথা বলা হয়েছে। এরাই ১৭৯৪ সালে প্যারিসের এই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জাদুঘরটি (Conservatoire des Arts et Métiers) প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।
১৩. ফ্রান্সিস বেকনের ‘নিউ আটলান্টিস’ (New Atlantis): বিখ্যাত ইংরেজ দার্শনিকের লেখা কল্পরাষ্ট্রের উপন্যাস। এখানকার ‘সলোমনের ভবন’ (House of Solomon) হলো একটি গুপ্ত গবেষণা কেন্দ্র, যেখানে যাবতীয় বৈজ্ঞানিক জ্ঞান জমা রাখা হতো। একোর মতে, এই জাদুঘরটি আদতে সেই গুপ্তজ্ঞানেরই আড়ত।
১৪. পোর্ত সাঁ-দেনি : (Porte St.-Denis) প্যারিসের একটি বিখ্যাত প্রাচীন তোরণ বা স্মৃতিস্তম্ভ। সপ্তদশ শতকে রাজা চতুর্দশ লুইয়ের জয়যাত্রা উদযাপনের জন্য এটি তৈরি হয়েছিল।
1 মন্তব্যসমূহ
সাবলীল অনুবাদ।
উত্তরমুছুন