রবিবার, ২৯ মে, ২০১৬

অনামিকা বন্দ্যোপাধ্যায় : অবকাশ

১৪০০০ ফুট এর তফাৎ। পাহাড়ের শিখর । সেখান থেকে নীচে। দেখতে পাচ্ছি। নীচে চড়ে বেড়াছে আমার ক্লিন্ন জব্-লেস দিন, অবোধ শৈশব, আড়ষ্ট শরীর- যা বয়স্ক পুরুষ-তাপে অঘোর, ঘুরে বেড়াচ্ছে আমার ডাইরির প্রথম পাতারা - সমস্ত পয়লা জানুয়ারী, দশ দফা কথাবার্তা : এ বছর ইচ্ছেদের সব পূর্তি হওয়া চাই, স্কুল সিস্টার এর উষ্মা-ঘন মুখের জল-ছাপ, বান্ধবীদের নাক-ফোলানো বেগুনী রঙের হিংসে-আতর, কথা-না-হতে-পারা জুল চাউনির ছেলেরা- যাদের মুখে পাকিস্তানি ক্রিকেটারের আদল লেগে রইল জীবনভর,
রাজাবাজার এড়িয়ে চলা 'বিশ্বস্ত' ড্রাইভার- যার ওপর ছিল আমায় কলেজ পৌঁছে দেবার ভার, শিল্পের শহর, শহরের শিল্প, গোল গোল ঘুরতে থাকা কবিচক্রের পাজল, বল ইন আ মেজ , আকাদেমি , জাতীয়-পুরষ্কার , ভোট ও ভোটার, গণ-খুন, ব্রাহ্মন্যবাদ, চাপাতি, খোলামকুচি এবং শত শত ইল্লি সমূহ; সব ভেসে চলেছে মন্দর মত, ধীর, দিক-শূন্য। এত যে দিন পেরোলাম, তেমন ঠিক ভিড় নেই কোথাও, নিচের ওই মানস প্রতিম দীর্ঘ এবং ঘোলা লেকে ভেসে চলেছে এইসব, যেমন করে আমার ছেলে'র শৈশব প্লাস্টিক ভাসায় বাথটাবে; প্লাস্টিক এর নৌকো, হলদে রঙের পাতি-হাস, ডুবুরী, বিকল হয়ে পড়া ছোট ছোট খেলনা রোবো... এইসব। এখন মাথার ওপর নির্মেঘ নীল আর অদূরে ওই আবছা-আবছা চীনা প্রাচীর।

আমার পাশে রয়েছেন চুর-বাবা, এই নামই দিয়েছি তাকে। দীর্ঘ-শ্মশ্রু। রুদ্রাক্ষময়। হাসিশ এ ঝুম। তিনি দেখছেন তার জন্মাশ্রম? ওপর থেকে আমারই মত ? তার ইউফোরিয়া ভাঙবে মনে হয়না শিগগিরি।

আমার অক্সিজেন এর কষ্ট এখন অনেকই আয়ত্তে। নামার কথা ভাবতে ভাল লাগেনা। দু,এক ধাপ উঁচুতে সঙ্গী-দল । তাদের তখন কাঁচি দিয়ে পাতা ছাঁটা শেষ পর্বে। ধার করে ধরাই। এক টান। দু'টান ।
...........................।
................................................।
..........................................................................।
ই হ জ গ ৎ লি ই সা র ম য়। লাসার কুকুর-গণের মতই ক্ষিপ্র অথচ হাল্কা।

আমি "লিইসার" বুঝতে চাইছি । অতএব মস্তিষ্কের অগম্যে গমন, গমন ও শ্রুত-অশ্রুতের পুনরায় শ্রবণ।

ওপরে যে তুরীয় দৃশ্যমানতা ও contemplation এর কথা বলা হল তার পিছনের ইতিহাস বলা হতে পারে কেবল urban dictionary ধার করে। আপাতত contemplation, এই শব্দ আমার মাথায় মানে করাচ্ছে এক দীর্ঘ, শান্ত, চিন্তাশীল অবলোকন এর স্তরকে ।

এর বিপরীতে যা মানে করাচ্ছে ( যা ঠিক বাইনারি না ) তা ভেবে আমি কয়েকটি শব্দ সাজাচ্ছি ইংরেজিতে--

workaholic workacation workabee workalise workjerk
workamping ইত্যাদি।


এখন খেলা টা এইরকম--

শব্দ গুলো একটু পরপর সাজিয়ে ফেলুন এবং মানে পড়ে ফেলুন। এবার এর থেকে জমিয়ে নিন যেভাবে আমি

জমিয়ে নিচ্ছি রবারের মত সার, মানে যা গাছের বাকল নিঃসৃত। (আমি যেদেশে থাকি সেদেশে রবার ট্যাবু শব্দ -- বলে ফেল্লে মার্কিনীরা বোঝেন : condom। যে শব্দ ব্যাবহারের সতর্কীকরণ আপনি ছাত্রাবস্থার প্রথমেই জেনে ফেলেন, যদি মার্কিন-দেশে ছাত্র হয়ে আসেন )।

শব্দের মানে পড়া শেষ হয়ে থাকলে পাঠক তবে জানলেন, আসলে এই শব্দদের জোটাব বলেই এ প্রপঞ্চ লেখ-মায়া ফেঁদেছি। যা আমাকে রমণ করাবে - অবকাশ। অবকাশ ! ইংরেজিতে- leisure।

এই অবকাশ নিয়ে আমার ভাবনার শুরুটি ঘটায় এক ম্যানিফেস্টো।

১৯০৪ সালের মে'মাসে জার্মান দার্শনিক জোসেফ পিপার রচনা করলেন এক মানিফেস্টো-- Leisure, the Basis of Culture । ইয়োরোপে, শিল্পায়ন-পরবর্তী সমাজ জীবনে উৎপাদন-প্রবণতা মানুষকে কর্ম-ব্যস্ত করে তুলল। এই প্রসঙ্গে ১৮৭২ এ বারট্রান্ড রাসেল লিখছেন ( তার Conquest of Happiness গ্রন্থে )-- ‘আমরা আমাদের পূর্বসুরী দের তুলনায় কম 'বোরড'’ , যার খুব দুর্বল বাংলা বোধহয় 'একঘেয়েমি' । ( এই 'বোরডম' কিন্তু শপেনহাউয়ার এর boredom যে নয়, সে কথায় পরে কখনো আসা যাবে, আমাদের আলোচনা আপাতত অবকাশ নিয়ে )। তবে এখানে হুবহু ইংরেজিটি না দেওয়ার লোভ সামলাতে পারছিনা--

'A generation that cannot endure boredom will be a generation of little men, of men unduly divorced from the slow processes of nature, of men in whom every vital impulse slowly withers, as though they were cut flowers in a vase.'

পিপারে'র সন্দর্ভে আসব । তার আগে, সেনেকা'র একটি চরম মত আছে লিইসার এর সপক্ষে। 'সমস্ত মনুষ্য জাতিতে একমাত্র তিনিই বেঁচে আছেন যিনি অবকাশে থেকে জীবনের দর্শনকে বোঝার চেষ্টা করছেন', বলছেন সেনেকা তার The Shortness of Life গ্রন্থে। তার দু'হাজার বছর বাদ অবকাশ নিয়ে আবার একইরকম চিন্তা ভাবনা করলেন যারা, তাদের মধ্যে আমি পড়লাম কিএরকেগারদে, বারট্রান্ড রাসেল, ডেভিড স্ত্যন্দাল, পিপার এমন কিছু দার্শনিককে। তো সেনেকার সেই মাক্সিম মনে করে, তার দু'হাজার বছর বাদ আবার রাসেল এর সতর্কীকরণ এর পাঠ পড়ে কিএরকেগারদেকে আমাদের মনে পড়ে যাবে। তিনি তার অবকাশকে বর্ণনা করছেন, আবারো আমার ইংরেজিটি রাখার লোভ হচ্ছে ঃ

'like is recognized only by like… I lie prostrate, inert; the only thing I see is emptiness, the only thing I live on is emptiness, the only thing I move in is emptiness. I do not even suffer pain… Pain itself has lost its refreshment for me'

অবকাশের এই ধারনাটি কে রোমান্টিকেরা সাহিত্যে আনছেন এবং একইভাবে কিয়েরকেগারদে কে স্মরণে রেখে পিপার লিখছেন--

" মধ্যযুগের চরমে যা দেখা দিল তা হোল Leisure এর তীব্র অভাব। "

প্রতিদিনের কর্ম থেকে একঘণ্টার ব্রেক বা দুদিনের উইকেন্ড বিরতি বা লঙ-উইকেন্ড এসবই কর্ম-প্রাণ রুটিন জীবনের অংশ, যা কিনা পিপারের ভাষায় "Leisure stands in a perpendicular position with respect to the working process" অর্থাৎ কর্মশীল রুটিন এর ওপর সে সমকোণে দাঁড়িয়ে থাকে।


তা কেমন অবস্থান? কেমন করেই বা তবে অবকাশ অর্জন করা যাবে ? যেখানে পৌঁছাতে পারলে আমাদের কালজ্ঞাণ, কালবোধ সম্পূর্ণ অন্য কক্ষে বা কক্ষবিহীন কোথাও অবস্থান করে। তিনি অনুসন্ধান করে দেখলেন যে-- 'এ এক ছন্দময় যতি-চিহ্ন।' কিন্তু ইংরেজিতে যা idleness, তা নয় কখনোই। এই যে ডেডলাইন ভিত্তিক, সাবওয়েতে দৌড়তে থাকার যে কর্ম-চঞ্চলতা তা আসলে এই ধরনের অলসতা বা idleness এর উলটো-পীঠ। কারন idleness, lack এর বিপরীতে এক ধরনের পূরণ দাবী করে, boredom ও তাই করে। কিছু অর্জনের দাবী। কিন্তু অবকাশ বোঝাতে পিপার আমাদের নজরে আনছেন লাতিন শব্দ acedia কে। তিনি বলছেন acedia'র অন্য একটি অর্থের কথা। তা অলসতা না। আবার তা উৎপাদন-মুখী ব্যস্ততার বিপরীতও না। অবকাশ তার কাছে একরকম - গতিময়তা থেকে ধীর হতে চাওয়া। নিজেকে সহাস্যে অবলোকন করা ও স্থির আনন্দে কর্ম-চিন্তা করা ও তাকে উপভোগ করা। এইটিই অবকাশকে উৎপাদন ভিত্তিক কর্মজীবনের শব্দবন্ধ গুলির প্রতিপক্ষে দাঁড় করায়। সম্ভবত। তাই গোড়াতেই রবারের মত আমরা জমিয়ে নিতে চাইছিলাম কর্ম-সংস্কৃতির চালু ও 'mainstream' ধারণা গুলিকে। এ ধারণা আমাদের মানে করায় ঃ অনেকটা যেন দুই ক্ষতিকর কক্ষে ভাগ হয়ে গেছে বাঁচার মানে-সমূহ, বাইনারির এক ধাঁচায় ঃ এক মুলে 'জীবন' আরেক মুলে 'কর্ম' , যেন কর্ম হল জীবনের দর্শন বিরোধী অথবা জীবন প্রগতি-বিরোধী । কর্মের উলটোপথে তবে কি ? তা কি হোল ক্রীড়া? তা কি ‘টেলিভিষন’ ? তা এক্স-বক্স, মোবাইল- অ্যাপস, তা'কি ভিডিওগেমস? এই যেমন আমরা খেলা শেষ করি ও কাজে যাই। কাজের থেকে খেলায় যাই। এই যে খেলা, তা কৌম মতে পোকার-ক্রীড়া বা কোমর জড়িয়ে নাচ যাই হোক, আসলে তা জীবনের মানে তৈরী করতে অসমর্থ হচ্ছে কি? যদি হয় তবে তা জীবন-দায়ী, মানে-দায়ী হয়ে উঠবেনা। জীবনকে বুঝতে, তার পরিধি বাড়াতে সাহায্য করবেনা। এই হল মোটামুটি অবস্থান পিপারের মানিফেস্টোটির।

লিইসার অতএব এক মানসিক অবস্থান, পিপারের মতে।

কর্মের থেকে অবকাশ ও না তা। তা আসলে কর্মই, অবকাশ থেকে করা কর্ম। এই কোকাকোলাইজেশন, ম্যাকডোনাল্ডাইজেশন আপনাকে এর বিপরীতে ধাওয়া করে। যেমন আমার বাড়ির চিত্রটি আমায় এ ভাবনা ভাবায়- আমার ম্যাকবুক সংসার ঃ যাতে আছে দুটি ম্যাকবুক, একটি আইপ্যাড, একটি আইফোন ও একটি আইম্যাক। আর আছে অক্সিজেন এর মত ইন্টারনেট যোগান। পেইড পরিষেবা। একটি রিমোট- যা আমার সাথে আপেল টিভির দূরত্ব কমাতে পারে। এই যে নিখাদ আপেলায়ন; অফিস ও বাড়ি, পার্ক ও সাবওয়ে, তা সে ফ্লানারিও যদি হয় আসলেতে আমি আপেলায়িত এই জগতে বন্দী। ভাবুন, আপনি সেন্ট্রাল-পার্কে এসেছেন স্রেফ গড়িয়ে-শুয়ে সূর্যাস্ত দেখবেন বলে , কিন্তু করে চলেছেন টেক্সট । একসময় অন্ধকার হয়ে গেল। সূর্যাস্ত দেখা হলনা।

ভিয়েনার দার্শনিক স্ত্যান্দাল ও বলেন তা। তার মতে কাজের বিপরীতে থাকতে পারে খেলা। কাজের যেমন একটা উদ্দেশ্য আছে, খেলার তেমন কোন লক্ষ্য বা goal নেই, সে অর্থে। সেই জন্যেই যতক্ষণ খেলতে ভাল লাগছে, আপনি খেলে যেতে পারেন। যেমন নাচের প্রক্রিয়া, যতক্ষণ ভাল লাগছে আপনি নাচ করতে পারেন। এই নাচের, সত্যি কথা বলতে তেমন কোন উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য তো নেই।

স্ত্যান্দাল দুঃখিত হন এই ভেবে যে আমরা অবকাশ কে শৌখিন ভেবে প্রত্যাশা করি। তাই রেয়ালিটি ইত্যাদি সাপেক্ষে তা ফেলে দেওয়ার কথা বলে কর্ম- নেশার প্রবক্তারা। তিনি আসলেতে মনে করেন অবকাশই আমাদের জীবনের প্রধান চালিকা-শক্তি। তিনি বলতে চান, একটি টেসলা কি একটি মাজারেটির পশ্চাতে ছোটার এই ঘানি-চক্র, দাস-সেবা ভিত্তিক প্রযুক্তি ও উৎপাদন, এর কালজ্ঞান এর বিপরীতে থাকবে সে।

'এই মুহূর্ত থেকে কি আমি ডেডলাইন বাদ দেওয়া একটা জীবন পেতে পারিনা ?' এ প্রশ্ন করেছিলেন নিজেকে জশুয়া মিলসবারন। মিলসবারন এইসময়ের এক জেন-দার্শনিক। দু-এক বছর আগে, একশ দিনের এক অবকাশে ছিলেন জশুয়া মিলসবারন। কি তার অভিজ্ঞ্যতা ? জশুয়া লিখছেন ঃ

" আমি ১০০ দিনের লক্ষ্য-হীন অবকাশে যে জীবন-জ্ঞান অনুভব করেছি তা আর কখনো নয়। "

এখানে, আস্তিনের তলায় যা গোটানো, তা হল এই শব্দ : লক্ষ্য-শূন্য । এই সেই তাস । জশুয়া লিখছেন," অবকাশে থাকার জন্যে খুবই সাধারণ, বাহুল্য বর্জিত এক জীবনের অভ্যেস করতে হল আমাকে। কিন্তু তা এমনকি কঠিন? কঠিন হল : লক্ষ্য-শূন্য এক জীবন রচনা করা।" ২০ বছর কর্পোরেট জীবনের ডেডলাইন সামলে তিনি কি করে ডেডলাইন মুক্ত এক জীবন রচনা করতে পারেন বা আদৌ পারেন কিনা তাই ছিল তার এই পরীক্ষার বিষয়। জশুয়া উত্তীর্ণ হলেন সেইদিন, যেদিন তিনি নিজেকে প্রশ্ন করলেন-- 'আমি কেন ডেডলাইন তাড়া করি ?'

এর উত্তরে তিনি যা পেলেন--

১। আমার ডেডলাইন আছে কারণ আমি কিছু অর্জন করতে চাই।

২। কেন সেই অর্জন ?

৩। কারণ সেই অর্জন আমাকে সুখী করবে।

'ও তাহলে এই গল্প ?' নিজেকে বললেন জশুয়া। 'সুখী হওয়া দরকার। কিন্তু, এক মিনিট ! সুখী হতে গেলে আমায় এই ডেডলাইন কেন তাড়া করতে হবে? এই মুহূর্তে এখানে দাঁড়িয়ে আমি কেন সুখী হতে পারিনা?'

'তাহলে এই মুহূর্তে আমি আমাকে খুশি থাকতে বলছি, কোন কারণ ছাড়াই , কোন লক্ষ্য ছাড়াই। আমি এই যে দাঁড়িয়ে আছি, এই যে দৃশ্য দেখছি , আমি এতেই আছি। খুশি আছি।' ছিলেনও ( অনুধাবন করছি রবীন্দ্রনাথের গানটি একটুও না গেয়ে )। অন্তত মিলসবারন তাই দাবী করছেন ।

জশুয়া বলছেন-- "এর পর যা হল আমি প্রায় ভাবতে পারিনি। আমি সবথেকে উল্লেখযোগ্য আনন্দের কিছু কাজ করতে পারলাম এই সময়। আমি আমার শ্রেষ্ঠ উপন্যাসটি লিখতে পারি এই সময়। কিছু অসামান্য বন্ধুত্বের শুরু এই সময়ে। কিছু শ্রেষ্ঠ কথোপকথনও জীবনের এই সময়ে হয়েছে। আমি যদি মানুষের প্রয়োজনে কখনো পুরোপুরি লেগে থাকতে পারি, সেও এই একই সময়ে পেরেছি।"

এখন তর্ক জুড়তেই পারি-- সেও কি একটা goal নয় যে আমার কোন লক্ষ্য থাকবেনা আজ থেকে, এবং সেটিকে তাড়া করা ? বা আরও কাজ করা, সবথেকে ভাল উপন্যাস লেখা ? সেটাও তো একটা লক্ষ্য হতে পারে?

এইখানে দু'হাজার বছরের পুরনো সেই বিখ্যাত উক্তি মনে আসবেনা, তা হয়না। সেই অ্যারিস্টটল। সেই তার কথায়-- " কার অবকাশ কি দিয়ে ভর্তি সেইটাই হল আসল কথা "।

যাই হোক, তর্কের উত্তরে জশুয়া একটা পার্থক্যের কথা বলবেন। তিনি বলবেন-- এগুলি তার 'চয়েস'; 'গোল' নয়! সে তর্ক আরও উঠতে পারে। কিন্তু আমরা ফিরব ইংরেজি শব্দ Leisure এ, যার গ্রীক প্রতিশব্দ σχoλη । এবং আমাদের মনে পড়বে পিপার লিখছেন--

" In leisure, there is … something of the serenity of “not-being-able-to-grasp,” of the recognition of the mysterious character of the world, and the confidence of blind faith, which can let things go as they will."

অবকাশ সদর্থক। এইখানেই তার সাথে 'একঘেয়েমি" বা boredom এর তফাত। প্রেমিক-প্রেমিকার নির্জন মৃদু কথোপকথনের মত তা ভেতরের নিস্তব্ধতাকে ছুঁতে পারে বলে পিপারের বিশ্বাস।

"In leisure … the truly human is rescued and preserved precisely because the area of the “just human” is left behind… [But] the condition of utmost exertion is more easily to be realized than the condition of relaxation and detachment, even though the latter is effortless: this is the paradox that reigns over the attainment of leisure, which is at once a human and super-human condition."

স্ত্যান্দাল আবার একে মানুষের এক শারীরিক অঙ্গের কাজের সাথে তুলনা করছেন। তার মতে ঃ অবকাশে থাকা মানে কাজ না করে থাকার মানসিকতা, একথা ভুল। অবকাশ কাজের বাইরের কোন স্পেস নয়, বরং কাজের মধ্যেই এর স্থান।

তিনি দেখছেন-- আমাদের হৃদযন্ত্রের কাজ অবকাশময়। Rest এন্ড Play ধর্মী। তাই তা ক্লান্ত হয়না বাকি-সব মাস্ল দের মত। গুচ্ছ-গুছছ পুশ-আপ আপনার হাতের পেশীকে ক্লান্ত করবেই একটা না একটা সময়। কিন্তু আপনার হৃদযন্ত্র ও তার পেশী ? না, সে বা তারা ক্লান্ত হবেনা আপনার জীবনকালে। কারণ প্রতিটি হৃদ-ধ্বনির মধ্যবর্তীতে আছে সামান্য যতি। এই হল আমাদের শারীরিক হৃদযন্ত্রটির স্বরূপ। আর যখন আমরা ' হৃদয়' বলে আরো প্রসারিত হতে চেষ্টা করি, তখন আমরা এই যতিচিহ্ন - এই সূক্ষ্ম বিশ্রামক্ষণটিকে যুক্ত করি, যা আমাদের কাজে উৎসাহ-আনন্দ ইত্যাদি এনে দিতে সক্ষম। সম্ভবত এটিই পিপারও বলতে চেয়েছিলেন। এইটিকেই স্ত্যান্দালও খোঁজার কথা বলেন। এই অবকাশ কার কাছে কিভাবে ধরা দেবে তা নিয়ে তিনি ভাবিত না। খুঁজে যাওয়াটাই জীবনের সিদ্ধান্ত গুলিকে চালাবে ও অবকাশের সন্ধান এনে দেবে আর সেই অবকাশ কখনো তার গতিপথ ঘোরাবে, কারণ এই লিইসার তাকে জীবনকে সময় নিয়ে দেখতে ও অর্থ তৈরি করতে সাহায্য করবে খুব।

আমার ব্যক্তিগত অবকাশটি জীবনে প্রথমবার আসে যখন চূড়ান্ত-নিরুৎসাহিত-আমি নিজে একবার একটি ইউ-টিউব ভিডিও দেখে ফেলি। দেখে ফেললাম, অসীম নিস্তব্ধতায় গাছের উঁচু ডালের ওপর শুয়ে রয়েছেন এক মানুষ, পেছনে মৃদু ঢেউ তুলে চলছে ছোটো এক জলাশয়, তিনি এলিয়ে রয়েছেন আর বলছেন অবকাশের কথা। যিনি নিজেই এক অবকাশ আমদের জীবনে। যার ছবি দেখে প্রাক-যৌবন বেলায় আমরা ধর্মান্তরিত হয়েছি। তার ভাষা অন্য। মাত্র আটটি চলচিত্র নির্মাণ করে তিনি অসীম রহস্যে আমাদের নিউরনে এক বিস্ময় হয়ে থেকে গেছেন। সে এক অসীম অবকাশ। তার চলচিত্রের ভাষা তিনি নিজেই নির্মাণ করেন, ভাঙ্গেন, ধূমায়িত করে আমদের মস্তিষ্কে প্রবেশ করান, যে মস্তিষ্কের অস্তিত্ব আমাদের নিজেদেরই অজানা সময়-সময়। তিনি আন্দ্রেই তারকভস্কি।

আন্দ্রেইকে প্রশ্ন করছেন প্রশ্নকারক, মন্দ্রস্বরে-- আপনি কি কিছু বলতে চান তরুণদের কাছে ?

উত্তরে বলছেন আন্দ্রেই--

"আমি সত্যিই জানিনা। আমি শুধু বলতে পারি যে, তারা নিজেরা একলা হতে শিখুন। নিজেদের সাথে সময় কাটাতে শিখুন। আজকের তরুণ প্রজন্ম এক গর্জনের মধ্যে দিন কাটায়। তারা সামাজিক কোন উৎসব বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নিলে তা হয়ে ওঠে শব্দ-দুষ্ট। আমার মতে প্রত্যেকেরই ছেলেবেলা থেকে শিখে নেওয়া উচিত- কিভাবে নিজের সাথে সময় কাটাতে হয়। এর সাথে একাকীত্বের কোনই সম্পর্ক নেই আমার দৃষ্টিতে"।

বেশ কয়েক'শতবার দেখায়, এই ভিডিওটির প্রভাব আমার ওপর হয়েছিল চরমপ্রকৃতির। এটি আমায় এমনকি ঘরছাড়াও করেছিল। সর্বার্থে। নিছক হাওয়া-বদল না তা । সেই ঘরছাড়া হওয়াই তখন আমি সর্বক্ষণের কাজ হিসেবে দেখছি। যা লিখছি, পড়ছি সবই অবকাশে। আট'ন ঘণ্টার দৈনিক পরিশ্রম-সহ। ঘর ছাড়া মানেই হিমালয় কেন এইসব ক্লিশে তখন আমার মাথায় নেই। আমি তখন উচ্চতা খুঁজছি। বার্ড-ভিউ এর উচ্চতা। নীরবতার উচ্চতা। হিমালয় ছাড়া কাউকে তোয়াক্কা করিনা। এ লেখার শুরুতেই সেই ঘটনার কথা আছে। আর হলিউডি আখ্যানের cause-effect এর মত সুচারুতায় সে হিমালয় আমাকে পরবর্তীতে দেশ-ছাড়াও করল। ১৪০০০ ফুট ওপর থেকে কাঁটা-তার সহজে নজরে আসেনা । নাসার ছবির মত প্রায়। যেভাবে খোলা শস্য-ক্ষেত্রে একের পর এক সীমানা না-মানা ছুটে যাওয়ার প্রবণতা হয়। তেমন কিছু প্রবণতা এই অবকাশে জন্মেছিল। যা হাওয়াবদল, প্রকৃতি ভ্রমণ বা ভ্রমণ-মূলক সাহিত্য রচনার উদ্দ্যেশ্যে বেরিয়ে পড়ার থেকে বেশ কিছু ভাবে আলাদা। আমার কাছে এই অবকাশ চিলেকোঠার অবকাশের সাথে পুরোপুরি এক নয় কখনো । নিউইয়র্ক, কলকাতার মত জনবহুল সাইড-ওয়াকে একা হাঁটাও যেমন আমাকে বিভিন্ন অবলোকনের সুযোগ দিয়েছে ( যা অনেকটাই ফ্ল্যানারিও আমার কাছে ) আবার নির্জনতাও দিয়েছে। হিমালয়-বাস আমাকে প্রথমবার চেনা পরিবেশের সাথে বিছিন্নতা অনুভব করিয়েছিল। তার ফলে অবকাশের স্পেসটিকে আমি চিনতে পারি কর্মের মধ্য ও অনন্ত অবকাশে অন্য পরিবেশে। এদেশে এসে সে অভ্যেস আমার আরও সহজে আয়ত্ত হয়েছে। উদার হাতে ছুঁতে পারা পাহাড় ও ভিড়-বিহীন নিজস্ব বনভূমির মত একক উপত্যকা গুলিতে জীবনে প্রথম বার ঘুরে বেড়াতে থাকলাম। গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন, অ্যারিজোনা, ইউটা। কখনো ক্যাম্পে তারাভরা আকাশের নিচে, কখনো আর্চেস এর বিশালকায় লালরঙা পাথুরে-প্রকৃতিতে, কখনো হলুদ সূর্য-রশ্মির নিচে একাকার হেজ-গ্রস্ত হয়ে। এই ছিল যেমন আমার নিবিড় আকাশ অবলোকন, সঙ্গেীবিহীন সম্পূর্ণ একক এই ভ্রমণ, সেল বিহীন, অ্যাপল বিহীন, নিশ্ছিদ্র অবলোকন; যেন এই পৃথিবী থেকেই মহাকাশের সব ধারণা বুঝে নেওয়া যায়। একই নক্ষত্রমণ্ডল, ছায়াপথ, নেবুলা, চাঁদ, ভারতীয় ভূখণ্ডের তুলনায় ঈষৎ তীব্র নীল আকাশ। তার নীচে সবই প্রায় দেখা যায়। যা দেখতে পাওয়া যায়না, পাঠক জানেন- তা'হল শপিংমল, ব্রাহ্মন্যবাদ বা আইসিস আক্রান্ত অসুস্থ জলাশয়। অতলান্ত কালো আকাশের নীচে রাত কাটানোয় আর যাই মনে হোক না হোক, যা মনে হওয়া অবশ্যম্ভাবী তা হোল ঃ এই মহাকাশ থেকে কেউ ধেয়ে এলে গোটা পৃথিবী সমেত ধুলিসাত হবে সবার পাসপোর্ট, কাঁটা-তার নির্বিশেষে। এই দেখা এক ধরনের দেশকাল বোধের বিচ্ছিন্নতা ঘটাবে, সে প্রায় নিশ্চিত। এই অবকাশের সময় গুলিতে আমি খরা ও জলাভাব কি কর্পোরেট-দস্যুতা বা আইসিস- ব্রাহ্মন্যবাদের থেকে মুক্তি ও তার উপায়, পৃথিবীর পরিবেশ-রক্ষার নিয়মকানুন বা ক্যান্সারের ওষধি এসব কিছুই যে আবিষ্কার করতে পারিনি, একথা না জানালেও চলে নিশ্চয়। আমি নিউটন না তাহা যেমন ঠিক, তেমনই আবার তেলেনাপোতাও ঠিক। তাই যা আবিষ্কার করেছিলাম তাহা আর কিছু না হোক - তেলেনাপোতা নিশ্চয়ই । তা জানা নয়, জানার অক্ষমতা । যাকে বলে Flirting with mystery. যাকে সময়ের ভাষায় অনুবাদ করলে বোধহয় এই শব্দটি পাওয়া যায় ঃ বিলম্বিৎ। ভারতীয় মার্গ-সঙ্গীতে একটি রাগ যখন আলাপিত হ'ন তখন তার গুণগুলি ধীরে ধীরে জমতে থাকে; ধুপের থেকে ধোঁয়া বেরোনোর মত এক ধীর-গতি প্রক্রিয়ায়। রাগটি তার পথ পেতে থাকে, রূপ পায়। সে বড় বিমূর্ত চলন; অনুভব। সে অনুভব একটি রাগের ধারণা তৈরি করে দিছে জন্মের মত। কত মানুষকে টেনে প্রকাশ করবে, ভাবনায় থিতি দেবে এই বিমূর্তায়ন, আমার মত একদা বিলাসী মানুষও মনে ভাবতে জোর পেয়েছি ঃ বিশ্বের সবচে গরীব প্রেসিডেন্টের মত আমিও একদিন কন্স্যুমার পৃথিবীর লোভ থেকে ছাড়া পাব। তার সেসব কর্মসূচী এবং ইত্যাদি সমূহও আমি 'কেবলই দৃশ্যের জন্মের' মধ্যে দেখতে পেয়েছি, যেমনভাবে মার্গারিত দুরাস তার LOVER উপন্যাসে লিখেছিলেন ঃ The art of seeing has to be learnt।

অবকাশে নিউটন আপেলাহত হয়েছিলেন। এখন আপেলায়িত নিউটন অবকাশিত হবেন
​কিনা তাহা এখনকার মত লেখক রাখছেন ইত্যাদি-ইত্যাদি এবং ভাইসি-ভেরসাদির জিম্মায়
গুরুচণ্ডালী এখানে অবশ্যম্ভাবী নয়। তবে ন্যায্যমত আরোপিত ​ফাউ।
যেহেতু, যেমন চিরকাল।


**** একটি ফুট-নোট বর্জিত রচনা। যেহেতু, পাঠক সর্বশক্তিময়।


লেখকের ছদ্ম-নাম :  আনা ভনে শ
লেখকের পেশা : চলচিত্র নির্মাণ, গবেষণা, শিক্ষকতা, গ্রন্থ রচনা
বাস : যুক্তরাষ্ট্র ট
অবসরে : ভারতীয় মার্গ-সঙ্গীত চর্চা ও লঘু অ্যাস্ট্রো-ফিজিক্স অধ্যয়ণ
দিন শুরু করেন তাই-চি দিয়ে । ো
ফেসবুক ছাড়াও নার্সিসিস্টআসক্ত ।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন